logo

স্লেড-চারুকলা শিক্ষা বিনিময়ের তিন বছর

না সি মু ল  খ বি র

বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় আঞ্চলিক শিল্পজগতের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অন্তত অস্বীকৃত নয়। বরং সমকালীন ধারণা অনুসারে আন্তর্জাতিক শিল্পজগতে শিল্পী ও তাঁর শিল্প-তৎপরতা নিজস্ব সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তিতে উপস্থাপিত হবে – এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতি যেমন অর্থনীতি ও রাজনীতি-নিরপেক্ষ নয়, তেমনি বাস্তবের শিল্প-তৎপরতাও এ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। শিল্পের সৃজন-প্রক্রিয়া ও তার মূল্য বিচারে তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রয়োজন ক্রমাগত স্বাধীন আদান-প্রদান, অভিজ্ঞতা বিনিময়। পশ্চিমের কিংবা উন্নত অর্থনীতির দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মতো উপনিবেশ-উত্তর তৃতীয় বিশ্বভুক্ত দেশের শিল্পজগতের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রাসঙ্গিক তৎপরতার মধ্যে ঐক্যের পাশাপাশি রয়েছে বিস্তর স্বাতন্ত্র্য। এমনই পটভূমিতে গত মার্চ, ২০১৩-তে শেষ হলো বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত তিন বছর মেয়াদি শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমটি।

এ উপলক্ষে গত জানুয়ারিতে ঢাকার চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ‘ইনস্পায়ারড!’ শিরোনামে একটি শিল্প-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীতে চারুকলা ও স্লেডে এই তিন বছরে অনুষ্ঠিত মোট চারটি কর্মশালায় সৃষ্ট শিল্প প্রকল্পগুলোর কিছু নির্বাচিত নিদর্শন উপস্থাপিত হয়। অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিনিময় কার্যক্রমটির মাধ্যমে অর্জিত দ্বিপাক্ষিক পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও তার মূল্যায়নের ভিত্তিতে একই শিরোনামে রচিত একটি প্রামাণ্য প্রকাশনারও মোড়ক উন্মোচন করা হয়। একই সময়ে একটি জাতীয় সেমিনারে উভয়পক্ষের অভিজ্ঞতার বর্ণনা, পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে নিজ নিজ শিল্পশিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে অর্জনসমূহের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু প্রস্তাবনাও উপস্থাপিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের লেকচার থিয়েটারে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী এই সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সকল বিভাগসহ নাট্যকলা, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন, বাংলা বিভাগ এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, জাহাঙ্গীরনগর, ত্রিশাল কবি নজরুল, ইউওডা, শান্ত মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুশিল্প শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদবৃন্দ ছাড়াও ইউসিএলের স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টের দুজন শিক্ষক প্রতিনিধি অংশ নেন।

ঢাকার চারুকলা অনুষদ এবং লন্ডনের স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ ইন রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (ইনস্পায়ার) প্রকল্পের সহায়তায়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এবং যুক্তরাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে অর্থপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক নির্মাণ। উল্লেখ্য, সম্প্রতি এই প্রকল্পের অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে অংশ নেয়। এই প্রকল্পে অন্যান্য বিষয়ের মতো চারুশিল্প শিক্ষার ক্ষেত্রেও কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগ থাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ উক্ত প্রকল্পের অধীনে কার্যক্রম পরিকল্পনায় নিজেদের যুক্ত করতে আগ্রহী হয়।

মোটামুটি ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে এসে চারুকলা অনুষদ ইনস্পায়ার প্রকল্পের অধীনে একটি শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রম প্রস্তাবের সিদ্ধান্ত নেয়। বিনিময় কার্যক্রম প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পদ্ধতি ও কৌশল এবং তার ফলাফল সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন ও বিনিময়ের মাধ্যমে নিজস্ব পাঠ পদ্ধতি ও কৌশলের সমৃদ্ধি সাধন। উদ্দেশ্যগতভাবে এই কার্যক্রমটি ঢাকা চারুকলার জন্য হয়ে পড়ে খুবই সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক। কেননা বিনিময় কার্যক্রমটি এমন সময়ে শুরু হয় যখন বাংলাদেশের চারুশিক্ষার প্রাচীন ও মুখ্য প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ অনুষদে (২০০৮) পরিণত হয়েছে এবং নিজস্ব কারিকুলামটিকে পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে যুগোপযোগী ও অধিকতর কার্যকর করে তোলার কাজটি শুরু করেছে। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চারুকলা অনুষদটি শিল্পশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৪৮ সালে যাত্রা শুরু করে এবং পঁয়ষট্টি বছরের পুরনো এই প্রতিষ্ঠানটি সূচনালগ্ন থেকেই সমকালীন বিশ্বের শিল্পপ্রবাহের সঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কার্যকর শিক্ষাক্রম বহাল রাখার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান রূপকার শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্থানীয় লোক-শিল্পধারার সঙ্গে সমকালের বিশ্ব-শিল্পধারণার যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি আধুনিক শিল্পপ্রতিবেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন। নিজস্ব শিল্পভাবনাকে বিস্তৃত করতে গত শতকের পঞ্চাশের দশকে তিনি ইউরোপ সফরে যান। সেই সফরের অংশ হিসেবে তিনি ১৯৫১ সালে স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টেও যান। বলা যেতে পারে, আবেদিনের স্লেড ভ্রমণের মাধ্যমেই উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথম যোগসূত্র স্থাপিত হয়। বলা বাহুল্য, সেই যোগসূত্র কোনো ধারাবাহিকতা পায়নি। তাই ২০১০ সালে শুরু হওয়া বিনিময় কার্যক্রমটিকে আমরা প্রকৃত যোগাযোগের সূচনা এবং আবেদিনের স্লেড পরিদর্শনের বিলম্বিত ধারাবাহিকতা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতার ব্রিটিশ সংরক্ষণবাদী ধারণায় যে শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে তারই আদর্শে বেড়ে ওঠে ঢাকার চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, শুরু থেকেই ঢাকার প্রতিষ্ঠানটি পূর্বতন ঔপনিবেশিক শিক্ষাধারণাকে ক্রমান্বয়ে সংস্কারের মাধ্যমে অধিকতর স্বাধীন, স্বকীয়, সৃজনশীল শিক্ষা প্রতিবেশ গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকে; যদিও উপনিবেশ-পরবর্তী যে-কোনো দেশেই এ-ধরনের পরিবর্তন-প্রচেষ্টা খুবই কঠিন ও জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। সমাজে প্রতিষ্ঠিত মনোজাগতিক ঔপনিবেশিকতা একে বারবার বাধাগ্রস্ত করে। নিজস্বতা ও বৈশ্বিকতার প্রকৃতি সম্পর্কে দ্বিধা ও টানাপড়েন অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

এই বিনিময় কার্যক্রমের অপরপক্ষ অর্থাৎ ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭১ সালে। বিনিময় কার্যক্রমের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয় কীভাবে তারা ধাপে ধাপে পুরনো ব্রিটিশ সংরক্ষণবাদী শিল্পধারণার বিপরীতে বর্তমানের শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে। এখনকার স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্ট বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি বৈশ্বিক বা বহুজাতিক শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে পেইন্টিং, স্কাল্পচার ও ফাইন আর্ট মিডিয়া নামক তিনটি বিভাগের অধীনে বিএ, বিএফএ, এমএ, এমএফএ, এমফিল ও পিএইচডি কার্যক্রম প্রচলিত। ফাইন আর্ট মিডিয়া অপেক্ষাকৃত নতুন বিভাগ, যেখানে শিল্প প্রকাশের ভাষা হিসেবে যে-কোনো বা গণমাধ্যম হিসেবে প্রচলিত বিভিন্ন মাধ্যমের সংমিশ্রণের চূড়ান্ত স্বাধীনতা রয়েছে। অপর দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরাও প্রকাশের প্রয়োজনে যে-কোনো মাধ্যমকে ব্যবহারের সুযোগ পায়। ফলত সমগ্র স্লেডের শিক্ষাকার্যক্রমে শিল্প উপস্থাপনে আন্তঃমাধ্যমিক (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) প্রতিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে – যা বর্তমানের শিল্পজগতের বাস্তবতারই প্রতিনিধিত্ব করে। বহুজাতিক পরিবেশে স্লেডের শিক্ষার্থীরা তার নিজস্ব শিল্পভাবনা উপস্থাপনে শিক্ষকদের সহায়ক পরামর্শদাতা হিসেবে পায়।

অপরদিকে ঢাকার চারুকলা অনুষদে বর্তমানে রয়েছে আটটি বিভাগ। চারুকলার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিল্পের সুনির্দিষ্ট মাধ্যমভিত্তিক বিভাগসমূহের প্রতিটিতেই বিএফএ ও এমএফএ কার্যক্রম প্রচলিত। আন্তঃমাধ্যমিক অনুশীলনের আনুষ্ঠানিক সুযোগ নেই। মূলত বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাই এখানে পড়তে আসে। ফলে বহুজাতিক বা আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ গড়ে ওঠার সুযোগ কম। উপকরণ ও করণকৌশল-নির্ভর হওয়ায় এখানকার শিক্ষাকার্যক্রম মূলত প্রশিক্ষণ-নির্ভর।

প্রায় বিপ্রতীপ বাস্তবতার কারণে এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমকে অর্থবহ করে তোলা ছিল চ্যালেঞ্জিং। স্লেডের পক্ষে এ ধরনের বিনিময় কার্যক্রমের নিয়মিত অভিজ্ঞতা থাকলেও চারুকলা অনুষদের ইতিপূর্বে এরকম দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণের অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে উভয়পক্ষের ইতিবাচক আগ্রহের কারণে কার্যক্রমটি প্রাণবন্তভাবেই অগ্রসর হয়। বিনিময় কার্যক্রমটির সূচনায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট শিল্প-আলোচক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বিশেষ ভূমিকা রাখেন। মূলত অধ্যাপক ইসলামের আন্তরিক আগ্রহে এবং চারুকলা অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক রফিকুন নবীর সযত্ন প্রচেষ্টায় কার্যক্রমটির সূচনা সম্ভব হয়।

মূলত ২০০৯ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইনস্পায়ার প্রকল্প সম্পর্কে অবগত হয়ে অধ্যাপক নবী এক্ষেত্রে চারুকলা অনুষদের সম্পৃক্ত হবার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের অধ্যাপক নিসার হোসেন এবং ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক লালা রুখ সেলিমকে প্রাথমিকভাবে যুক্ত করেন। প্রাথমিক বিবেচনাতেই একটি শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমের জন্য অংশীদার হিসেবে ব্রিটিশ শিল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউসিএলভুক্ত স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টকে চিহ্নিত করা হয়। অন্যান্য কারণের মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইউসিএল ভ্রমণ, কলকাতা সরকারি আর্ট কলেজের শিক্ষক শিল্পী রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও তাঁর ছাত্র শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্লেড অধ্যয়নের ধারাবাহিকতায় একে ঐতিহাসিকভাবেও আগ্রহোদ্দীপক বলে মনে করা হয়। প্রাথমিক সম্ভাবনা বিচারের উদ্দেশ্যে অধ্যাপক রফিকুন নবী স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্ট পরিদর্শন করেন। স্লেডের তদানীন্তন পরিচালক অধ্যাপক জন এইকেন বিনিময় কার্যক্রমের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং স্লেডের পক্ষ থেকে ফাইন আর্ট মিডিয়া বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক ড. সুসান কলিন্সকে প্রাথমিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। যেহেতু উভয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কাঠামো ও পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে অতএব উভয় ক্ষেত্রের বিনিময়ের আওতাকে কার্যকারিতার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কারিকুলামগত নৈকট্যের কারণে প্রাথমিকভাবে চারুকলার অঙ্কন ও চিত্রায়ণ এবং ভাস্কর্য বিভাগের সঙ্গে স্লেডের পেইন্টিং ও স্কাল্পচার বিভাগকে বিনিময় কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়। যেহেতু আন্তঃমাধ্যমিক শিল্পপাঠ সম্পর্কে ঢাকার বিশেষ আগ্রহ আছে, অতএব সেই বিবেচনায় স্লেডের ফাইন আর্ট মিডিয়া বিভাগটিকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এই বিনিময়ের আওতাভুক্ত করা হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে বিনিময় কার্যক্রম বাস্তবায়নের কালে ঢাকার চারুকলা অনুষদের সকল বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমের জন্য প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি ইনস্পায়ার প্রকল্পের অনুদানপ্রাপ্ত হয়। তিন বছর মেয়াদি বিনিময় কার্যক্রমটি শুরু হয় ২০১০ সালের মার্চ মাস থেকে। স্লেডের পক্ষে অধ্যাপক সুসান কলিন্স এবং চারুকলার পক্ষে অধ্যাপক লালা রুখ সেলিমকে লিড পার্টনার করে শিক্ষাবিনিময় কার্যক্রমের বাস্তব তৎপরতা শুরু হয়।

অধ্যাপক রফিকুন নবীর স্লেড সফর এবং বিনিময় কার্যক্রম নিশ্চিত হওয়ার পর স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টের লিড পার্টনার ফাইন আর্ট মিডিয়া বিভাগের তৎকালীন প্রধান (বর্তমানে পরিচালক, স্লেড) অধ্যাপক ড. সুসান কলিন্স ২০১০ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় আসেন। স্লেডের পক্ষে তাঁর দশদিনের এই সফরে তিনি চারুকলা অনুষদ পরিদর্শন করেন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অধ্যাপক কলিন্স স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্ট সম্পর্কে একটি সচিত্র বক্তৃতা উপস্থাপন করেন। তাঁর উপস্থাপনা সমকালীন শিল্পের পরিপ্রেক্ষিতে স্লেডের শিক্ষাকার্যক্রমের বিকাশ ও বর্তমান রূপ সম্পর্কে অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ধারণা পায়। বিপরীতে বাংলাদেশের জনসংস্কৃতি, শিল্পজগৎ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে বক্তব্য দেবেন অধ্যাপক কলিন্স।

একই বছর অর্থাৎ ২০১০ সালের অক্টোবরে চারুকলা অনুষদের পক্ষে লিড পার্টনার অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম স্লেড পরিদর্শনে যান। মূলত স্লেডের চলমান শিক্ষাপদ্ধতি ও প্রতিবেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে অবহিত হওয়া এবং শুরু হওয়া বিনিময় কার্যক্রমের প্রকৃতি সুনির্দিষ্টকরণ ছিল তাঁর এই সফরের উদ্দেশ্য। চারুকলা ও স্লেডের শিক্ষাকৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা বিবেচনায় রেখে এ সময় দুপক্ষের লিড পার্টনারদ্বয় পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে স্লেডের আন্তঃমাধ্যমিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত করতে ঢাকা চারুকলার শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি অনুশীলনমূলক কর্মশালা অনুষ্ঠানে ঐকমত্য হন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে স্লেডের ফাইন আর্ট মিডিয়া বিভাগের প্রভাষক ও যুক্তরাজ্যের সমকালীন শিল্পের অন্যতম আলোচিত তরুণ শিল্পী ড্রাইডেন গুডউইন ঢাকায় আসেন।

দশদিনের সফরে ড্রাইডেন গুডইউন ঢাকায় অবস্থানকালে চারুকলা অনুষদের লেকচার থিয়েটারে সমকালীন আন্তঃমাধ্যমিক শিল্পতৎপরতা ও তার নিজের শিল্পকর্মের ওপর সচিত্র বক্তৃতা পরিবেশন করেন। সেইসঙ্গে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি ওয়ার্কশপ ফর আর্টিস্টস – কনসিডারিং অবজারভেশন, ক্যাপচারিং, প্রসেসিং, প্রেজেন্টিং স্ট্র্যাটেজিস’ শীর্ষক পাঁচদিনের একটি কর্মশালা পরিচালনা করেন। যদিও বিনিময় কার্যক্রমটিতে চারুকলার ক্ষেত্রে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ এবং ভাস্কর্য  – এই দুটি বিভাগকে আওতাধীন করা হয়েছিল কিন্তু কর্মশালার ধরন ও তাৎপর্য বিবেচনায় চারটি ব্যবহারিক বিভাগের বারোজন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। বিভিন্ন বিভাগের অংশগ্রহণকারী এই শিক্ষার্থীরা হলো শিমুল দত্ত, সাদাত উদ্দিন আহমেদ এমিল, শাম্মী আক্তার সুমি, ইমাম হোসেন সুমন, মীর মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন আলী, সুমন ওয়াহেদ, সাইফুল ইসলাম, মো. জাহিদ হোসাইন, মার্জিয়া ফারহানা, নাদিয়া ইয়াসমিন, মানবেন্দ্র ঘোষ ও সাজ্জাদ মজুমদার। গুডউইন শিক্ষার্থীদের দুজনের জুটি হিসেবে ছয়টি দলে বিভক্ত করেন এবং যৌথ শিল্প তৎপরতায় নিযুক্ত করেন। তিনি ছয়টি দলকেই তাদের পরিচিত ঢাকা শহরের মধ্য থেকে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতাকে সুনির্দিষ্ট করতে বলেন। শিক্ষার্থীরা অভিযানমূলক তৎপরতার মাধ্যমে তাদের পর্যবেক্ষণের সূচনা করে এবং আলোচনা-পুনরালোচনার মাধ্যমে তাদের সেই অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে যায়। প্রত্যেক জুটিভুক্ত দুজন একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করার পর তাদের পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ায় যে পার্থক্য তৈরি হয় তাকেও চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা অন্যের ক্ষেত্রে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তাও বিবেচনায় রাখতে বলা হয়। কর্মশালার স্বার্থেই অংশগ্রহণকারীদের শিল্প অনুশীলনের ক্ষেত্রে তাদের অভ্যস্ত মাধ্যমে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং অর্জিত অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিতে বলা হয়। অতিক্রান্ত অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে তা প্রকাশে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম বা মাধ্যমসমূহের সংমিশ্রণকে উৎসাহিত করা হয়। পর্যবেক্ষণ, গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ ও উপস্থাপনের প্রতিটি পর্যায়ে বিপরীতের দ্বন্দ্ব যেমন আলো/অন্ধকার, চলমান/স্থির, গতিময়/ধীর প্রভৃতিকে বিবেচনায় রাখার জন্য উৎসাহিত করা হয়। প্রথম তিনদিন অতিবাহিত হয়ে যায় পর্যবেক্ষণ, নোট নেওয়া, ছবি তোলা, স্কেচ, ড্রইং এবং উপস্থাপনের উপায় অর্থাৎ গতি, আবেগ, আলো, সময়, পরিসর, রং, শব্দ প্রভৃতির গুণাগুণ ব্যবহারের কৌশল পরিকল্পনায়। শেষ দুদিনে অংশগ্রহণকারীদের অবিরাম শ্রম ও উৎসাহে ছয়টি শিল্পকর্ম রূপ লাভ করে। নিজেদের শিল্প প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা বিচিত্র ও অভিনবভাবে উপস্থাপন করে। মাধ্যমের স্বাধীনতাকে একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবহার করায় প্রতিটি শিল্পকর্মে ধারণার প্রকাশে যথাযথ উপাদান বা উপকরণের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। ফলে দেখা যায়, শিল্পকর্মগুলি অভিজ্ঞতার উৎস থেকে সংগৃহীত উপাদান, ধারণকৃত শব্দ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, রেখাচিত্র, অ্যানিমেশন, আলোকসম্পাতসহ ভাস্কর্য ও চিত্রকলার প্রথাগত উপাদান ও কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিটি শিল্প প্রকাশ্য অনন্য রূপ নেয়। কর্মশালাটি বারোজন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলেও দেখা যায় তাদের কর্মতৎপরতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনুষদের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। সমগ্র কর্মশালাটি একটি কর্ম উৎসবে রূপ নেয়। পাঁচদিনের এই কর্মশালা শেষে অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের তৃতীয়তলাটিকে রূপান্তর করা হয় প্রদর্শন কক্ষে এবং দুদিনের জন্য সকল দর্শকের জন্য মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রথম দিন অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা নিজেদের কর্মপ্রক্রিয়া ও কর্মশালার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে অভ্যাগতদের সামনে। দুদিনের উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে উল্লেখযোগ্য আগ্রহী দর্শকের সমাগম ঘটে।

কর্মশালাটি অনুষদের সংবেদনশীল ও অপেক্ষাকৃত তরুণ শিক্ষকবৃন্দকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। উল্লেখ্য, বিশ শতকের আশির দশক থেকে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনের অভিঘাতে বাংলাদেশের শিল্পজগতে অনেকটা অনানুষ্ঠানিকভাবে আন্তঃমাধ্যমিক প্রবণতার শিল্পচর্চা শুরু হয়। বিভিন্ন প্রদর্শনী স্থাপনা, ভিডিও আর্ট, পারফরম্যান্স প্রভৃতি অভিধায় সৃষ্ট শিল্পকর্মে আন্তঃমাধ্যমিক ঝোঁক লক্ষ করা যায়। প্রকাশকে প্রাধান্য দিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমের মিশ্রিত বা একক ব্যবহারকে বিবেচনায় রেখে ওপরের মন্তব্য করা হলো। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, স্বতঃস্ফূর্ত এ-ধরনের অনুশীলনের উপস্থিতি সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে এর সমর্থনে কোনো পাঠ প্রতিবেশ গড়ে তোলা হয়নি। চারুকলা অনুষদের প্রচলিত ক্রমাগত উপকরণগত করণকৌশল-নির্ভর অনুশীলনের ফলে শিক্ষার্থীর মাধ্যম ব্যবহারের দক্ষতা বিকাশ লাভ করে। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা সন্তোষজনক উপকরণগত দক্ষতা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ধারণার প্রয়োগে সৃজনশীল বা মৌলিক রচনার ক্ষেত্রে দুর্বলতায় ভোগে। এই কর্মশালার পর্যায়ভিত্তিক প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা বিকাশের একটি দৃষ্টান্তমূলক পদ্ধতি হিসেবেও অনেকের নজর কাড়ে।

গুডউইন পরিচালিত কর্মশালার পর একই বছর অর্থাৎ ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দশদিনের আরেকটি সফরে ঢাকায় আসেন স্লেড অধ্যাপক জন এইকেন। প্রখ্যাত এই ব্রিটিশ ভাস্কর তাঁর ভ্রমণকালে ‘সেপিং দ্য স্পেস বিটুইন’ শীর্ষক একটি কর্মশালা পরিচালনা করেন। পাশাপাশি ‘আর্ট, পাবলিক স্পেস অ্যান্ড কালেকটিভ মেমোরি’ শীর্ষক সমকালীন ভাস্কর্যধর্মী শিল্পের ওপর একটি সচিত্র বক্তৃতা ও তার নিজের শিল্প তৎপরতার ওপর ভিত্তি করে আরেকটি সচিত্র বক্তৃতা উপস্থাপন করেন। এই সফরে তাঁর উপস্থাপিত অপর সচিত্র বক্তৃতাটির শিরোনাম ‘অন স্লেড উইথ পার্টিকুলার এমফেসিস অন ফিগার’। এই বক্তৃতায় তিনি উপস্থাপন করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে স্লেডের শিক্ষাপদ্ধতিতে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং স্লেড শিক্ষার্থীদের শিল্পকর্মে মানব অবয়বের উপস্থাপনের প্রকৃতি কীভাবে বদল হয়েছে। এই বক্তৃতাটি ধারণা ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পশিক্ষা পদ্ধতি ও প্রতিবেশের পরিমার্জন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হিসেবে সমাগত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আগ্রহকে উদ্দীপ্ত করে। পূর্বে উল্লিখিত এইকেনের নিজের কাজ ও স্থান এবং শিল্পের সম্পর্কবিষয়ক অপর দুটি বক্তৃতাও ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাওয়া বর্তমান বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মনে করেন। তিনটি বক্তৃতাই বিপুলসংখ্যক দর্শকসমাগমে চারুকলা অনুষদের লেকচার থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয়।

অধ্যাপক এইকেন পরিচালিত কর্মশালাটি মূলত ভাস্কর্য-সংশ্লিষ্ট হওয়ার পরও পূর্ববিবেচনাকে মাথায় রেখে অর্থাৎ আন্তঃমাধ্যমিক প্রতিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মশালায় ভাস্কর্য ছাড়াও অঙ্কন ও চিত্রায়ণসহ অপরাপর বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। চারুকলা অনুষদের সাতটি ব্যবহারিক বিভাগের মোট বারোজন শিক্ষার্থী এই কর্মশালায় অংশ নেয়। স্নাতকোত্তর পর্বের বিভিন্ন বিভাগের অংশগ্রহণকারী এই শিক্ষার্থীরা হলো সুমন কুমার বৈদ্য, ইমতিয়াজ আহমেদ, শিরিন আক্তার, মৌসুমী সুলতানা, সৈয়দ তারেক রহমান, রুপম রায়, শুভ সাহা, এ বি এম রোকন-উজ-জামান, বিকাশ কান্তি কর্মকার, রত্নেশ্বর সূত্রধর, সনদ কুমার বিশ্বাস ও শারমিন আহমেদ শরমি। অধ্যাপক এইকেন বস্ত্ত ও মানব অবয়বকে সামনে রেখে অনুষদের প্রচলিত ড্রইং অনুশীলনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ লাইভ ড্রইংয়ের মাধ্যমে তাঁর কর্মশালা শুরু করেন। অতঃপর শিক্ষার্থীদের আঁকা বস্ত্ত ও মানব অবয়বের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানকে রেখা দিয়ে যুক্ত করে অদৃশ্যমান স্থানের আকারের অস্তিত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করেন। এরপর তাঁদের কার্ডবোর্ড কেটে বিভিন্ন দ্বিমাত্রিক জ্যামিতিক আকার তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং এরকম দুটি জ্যামিতিক আকারের মধ্যবর্তী স্থানকে কার্ডবোর্ডে সৃষ্ট বিভিন্ন আকৃতির সমদৈর্ঘ্যের তল দ্বারা সংযুক্ত করতে বলেন। ফলাফল হিসেবে সৃষ্টি হয় অভিনব সব ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য আঙ্গিক। ভাস্কর্য আঙ্গিক নির্মাণের সহজ-সরল এই প্রক্রিয়া অংশগ্রহণকারীদের বিশেষ আনন্দিত করে। পরবর্তী সময়ে যার যার সৃষ্ট আঙ্গিকগুলোতে নিজস্ব রুচি ও ধারণা অনুযায়ী বর্ণ প্রয়োগ করে এবং বিভিন্ন পরিবেশে স্থাপনের মাধ্যমে আঙ্গিকগুলো এবং সংশ্লিষ্ট স্থানের নান্দনিক অনুভব বদলে দেওয়ার অনুশীলনও শিক্ষার্থীদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে।

এরপর চারুকলা অনুষদের পক্ষে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে শিল্পী অধ্যাপক শিশির কুমার ভট্টাচার্য্য ২০১১ সালের মার্চে স্লেড সফরে যান। তাঁর নির্ধারিত এই দশদিনের সফরের উদ্দেশ্য ছিল স্লেডে শিক্ষার্থী ভর্তিপ্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন বিভাগ বিশেষত পেইন্টিং বিভাগের শ্রেণি কার্যক্রম বা পাঠপদ্ধতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা অর্জন। তিনি সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তির বাছাই ও সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন এবং পেইন্টিং বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পর্বের নিয়মিত সেমিনারের কয়েকটিতে অংশ নেন। শিশির ভট্টাচার্য্য বিভিন্ন বিভাগের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ও তার বিন্যাস ঘুরে দেখেন। বিনিময় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি তাঁর নিজের শিল্পকর্ম ও তার প্রাসঙ্গিক উৎস সম্পর্কে একটি সচিত্র বক্তৃতা উপস্থাপন করেন। তাঁর শিল্প আঙ্গিক নির্মাণের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশের নাগরিক ও লোকায়ত জনপ্রিয় ধারার শিল্পধারা যেমন রিকশাচিত্র, সিনেমার ব্যানার প্রভৃতির স্বরূপও তিনি উপস্থাপন করেন। শিশির ভট্টাচার্য্যের শিল্পকর্মের চিত্রনিদর্শন ও সেইসঙ্গে বাংলাদেশের লোকায়ত ও জনপ্রিয় ধারার শিল্পের নিদর্শন এই বক্তৃতাটি স্লেডে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে এবং বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ ঔৎসুক্য সৃষ্টি করে।

শিশির ভট্টাচার্য্যের পর একই বছর ২০১১ সালের জুনে চারুকলার পক্ষে লিড পার্টনার অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম ও ভাস্কর্য বিভাগের প্রতিনিধি হিসেবে আমি নাসিমুল খবির স্লেড পরিদর্শনে যাই। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল স্লেডের স্কাল্পচার বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের অবকাঠামোগত সুবিধাদি পর্যবেক্ষণ এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির চূড়ান্ত উপস্থাপন ও তার মান নিরূপণ অর্থাৎ পরীক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন। বিনিময় কার্যক্রমের ইতোমধ্যে সম্পন্ন কর্মসূচির মূল্যায়ন ও পরবর্তী কর্মসূচি সুনির্দিষ্টকরণ ছিল লিড পার্টনারদ্বয়ের পৃথক আরেকটি কার্যক্রম।

স্লেডের স্নাতকোত্তর উপস্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চিত্তাকর্ষক কার্যক্রম। স্লেডে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে ভর্তির সুযোগ পায়। এমএ বা এমএফএ কার্যক্রম শেষ হবার পর প্রতিবছর জুনে স্লেডের স্টুডিও ও প্রাঙ্গণজুড়ে চূড়ান্ত ডিগ্রির জন্য শিক্ষার্থীরা তাদের শিল্পকর্ম উপস্থাপন করে। বৃহদাকার এই প্রদর্শনীটি সম্পূর্ণ প্রস্ত্তত হবার পর  শিক্ষকবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত বিচারকমন্ডলী তাদের জন্য নির্ধারিত শিল্পকর্মে ব্যক্তিগতভাবে নম্বর বা মান প্রদান করে। অতঃপর বিচারকমন্ডলী একত্রে বসে সকলে মিলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি মান বা নম্বরে একমত হওয়ার জন্য আলোচনায় বসে। যতক্ষণ না ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় ততক্ষণ পর্যন্ত পারস্পরিক যুক্তি উপস্থাপন চলতে থাকে। আমি ভাস্কর্যের স্নাতকোত্তর বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাই।  আমি প্রত্যেক বিচারকের সযত্ন পর্যবেক্ষণ এবং পারস্পরিক আলোচনায় বিনয়পূর্ণ দার্শনিক যুক্তিযুক্ত বাদানুবাদে মুগ্ধ হই। স্লেডের এই পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শোটি খুবই বিখ্যাত। ডিগ্রি নম্বর প্রদান চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের শীর্ষস্থানীয় জাদুঘর, গ্যালারি, সংগ্রাহক, পৃষ্ঠপোষক, গণমাধ্যম ও সমালোচকবৃন্দ এই পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শোর জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এই বার্ষিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে ভাবীকালের শীর্ষ শিল্পীদের অভিযাত্রা শুরু হয়।

স্নাতক পর্বের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে থাকে একটু ভিন্নভাবে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের মতো এক্ষেত্রেও একইভাবে বিচারকমন্ডলী গঠন করা হয়। তবে শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে তাদের কর্মপ্রকল্প উপস্থাপন করে বিচারকমন্ডলীর সামনে। সাধারণত প্রজেকশনের সহায়তা নিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মধারণা ও প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করে। বিচারকমন্ডলী এই উপস্থাপনের কালে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে এরকম কোনো মূল্যায়ন বা বিচারমূলক মন্তব্য করতে পারে না। বরং শিক্ষার্থী যাতে যথাযথভাবে তার বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারে সেজন্য পরোক্ষে সহায়তা করে। বিচারকমন্ডলী ব্যক্তিগতভাবে তাদের নম্বর বা মান প্রদান করে নিজস্ব নির্ধারিত নম্বরপত্রে। মান নির্ধারণে প্রয়োজনে বিচারকগণ শিক্ষার্থীর মূল কর্মতৎপরতা দেখার জন্য স্টুডিও স্পেসে যান। প্রত্যেকে একমত না হতে পারলে গড় নম্বরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর ডিগ্রির মান নির্ধারিত হয়। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয়ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীর স্বনির্ধারিত ধারণার সঙ্গে সৃষ্ট শিল্পকর্মের আঙ্গিকগত নৈকট্যকে মান প্রদানে মূল বিবেচ্য মনে করা হয়। সকল ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীকে কেবলমাত্র শিক্ষাপ্রত্যাশী হিসেবে নয় বরং একজন শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

স্লেডের এমফিল-পিএইচডি কার্যক্রমের একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের ও তত্ত্বীয় পাঠদানের সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুসারে কীভাবে তাঁরা যাবতীয় তত্ত্বীয় সহায়তা দিয়ে থাকেন। এমএ এবং বিএ কার্যক্রমে নিয়মিত শ্রেণি বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাসঙ্গিক শিল্প ইতিহাস, শিল্পতত্ত্ব ও সমালোচনাতত্ত্বে সমকালীন বিতর্ক ও সমস্যাসমূহকে তত্ত্বীয় পাঠের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নির্বাচন করতে পারে। স্লেড শিক্ষার্থীদের জন্য মাধ্যম বা উপকরণগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। প্রযুক্তিনির্ভর স্টুডিওসমূহ, প্রিন্টমেকিং ও বুক প্রিন্টিং কর্মশালা এবং কাঠ, ধাতু ও সিরামিক কর্মশালাগুলো একই প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। কর্মশালাগুলোতে টেকনিশিয়ানদের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিল্পকর্মের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি কর্ম সম্পন্ন করে। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে লাইফ ড্রইং, প্রিন্টমেকিংসহ বেশকিছু কারিগরি কোর্স পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীরা বাড়তি অর্থের বিনিময়ে এসব কোর্সের মাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে নিতে পারে। বহিরাগতরাও এসব কোর্সে অংশ নিতে পারে।

স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টের বর্তমান পরিচালক ও বিনিময় কার্যক্রমের লিড পার্টনার অধ্যাপক ড. সুসান কলিন্স ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকায় আসেন। ড. কলিন্স তাঁর এবারের সফরে ব্রিটিশ সমকালীন শিল্প-তৎপরতার বর্তমান প্রকৃতির ওপর ‘অফ দ্য ওয়াল’ শীর্ষক একটি সচিত্র বক্তৃতা উপস্থাপন করেন। ব্রিটিশ শিল্পকলা প্রথাগত উপস্থাপনা ও মাধ্যমের সীমাবদ্ধতা ভেঙে বর্তমানে যে রূপ পরিগ্রহ করেছে তার বিশ্লেষণমূলক এই বক্তৃতাটি চারুকলা অনুষদের লেকচার থিয়েটারে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে উপস্থাপিত হয়। তিনি একই সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্বাচিত কয়েকজনের শিল্পকর্ম নিয়ে একটি আলোচনা এবং বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কারিকুলাম প্রশ্নে একটি মতবিনিময় সভায়ও অংশ নেন। তাঁর এই সফরকালেই নিশ্চিত হয় চারুকলার অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগসহ অন্য সকল বিভাগের জন্য অর্থপূর্ণ হবে এমন একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে এবং স্লেডের পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষক লিসা মিলরয় তা পরিচালনা করবেন।

লিসা মিলরয় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় আসেন। তিনি তাঁর নির্ধারিত সফরকালে ‘হোয়াট ইউ সি – হোয়াট ইউ নো’ শীর্ষক একটি ড্রইং কর্মশালা পরিচালনা করেন। কর্মশালার আগে মিলরয় তাঁর নিজের কাজের ওপর ভিত্তি করে একটি সচিত্র বক্তৃতা উপস্থাপন করেন। এই বক্তৃতায় তিনি কীভাবে নৈর্ব্যক্তিক প্রতিনিধিত্বশীল অনুশীলন থেকে পর্যায়ক্রমে নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণ করেন তা চমৎকারভাবে বর্ণনা করেন। চারুকলার লেকচার থিয়েটারে অনুষ্ঠিত বক্তৃতাটি উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিল্প-সম্পর্কিত দর্শকদের কাছে খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় মনে হয়। চারুকলার অনুকরণ-নির্ভর অনুশীলন থেকে শিল্পভাষা নির্মাণের যে পর্যায়ক্রমিক পাঠ্যক্রম প্রচলিত তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়ায় অনেকের কাছেই অনুশীলন থেকে মৌলিক সৃজনশীলতায় পৌঁছানোর একটি পদ্ধতিগত দৃষ্টান্ত হিসেবে লিসা মিলরয়ের বক্তৃতাটি সহায়ক বলে প্রতিভাত হয়। অধ্যাপক মিলরয় পরিচালিত দুই দিনব্যাপী ড্রইং কর্মশালায় চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের মোট বিশজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের এই শিক্ষার্থীরা হলো সোহেল আশরাফ খান, রত্নেশ্বর সূত্রধর, সৈয়দ ফিদা হোসেন, ধীমান সরকার, সোমা সুরভী জান্নাত, কান্তা রহমান, মো. আরিফুল ইসলাম, জাফরিন গুলশান, আসমান হোসাইন, সিনথিয়া আরেফিন, অমিত কুমার নন্দী, মো. রবিউল হোসাইন, মো. শাহানুর মামুন, মাহমুদা খন্দকার, চন্দ্র নাথ পাল, লিটন পাল, অন্তু চন্দ্র মোদক, মো. শফিকুল ইসলাম, আসিফ উদ-দৌলা নুর ও শ্যামল সূত্রধর। দুদিনের কর্মশালায় অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের রেখাচিত্রের মাধ্যমে বস্ত্তর নৈর্ব্যক্তিক অনুকরণকে কী করে ব্যক্তিক আবেগনির্ভর নান্দনিক প্রকাশে পরিণত করা যায় তার অনুশীলন করান। কর্মশালার শুরুতে শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকে তাদের নিজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এরকম একটি করে বহনযোগ্য বস্ত্ত উপস্থাপন করে। কর্মশালায় ঘড়ি, হাতপাখা, রোদ চশমা প্রভৃতি বিচিত্র বস্ত্তর সমাবেশ ঘটে। মিলরয় অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে প্রথমে ওই সব বস্ত্তর বৈশিষ্ট্য, চরিত্র, আবেগ ও ইতিহাসগত গুণাগুণ বিশ্লেষণ করেন। অতঃপর প্রথমে যার যার নিজস্ব বস্ত্তকে সামনে রেখে ও পরে না দেখে অাঁকতে বলেন। এরপর দেখে ও না দেখে অাঁকা বস্ত্তর প্রতিরূপগুলোকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করা হয়। উভয়ক্ষেত্রে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় তা নিয়ে আলোচনা হয়। দেখা ও জানা থেকে যে প্রতিরূপ তৈরিতে সৃষ্ট মূল্য প্রকাশিত হয় তা রেখার নিজস্ব প্রকাশক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। এরপর শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের কাগজে বিভিন্ন অঙ্কন উপকরণ যেমন পেনসিল, কয়লা, কালি-তুলি প্রভৃতির মাধ্যমে বিভিন্ন রকমের রেখা ও চিহ্ন অঙ্কন অনুশীলন করে। নির্দেশনা অনুসারে তারা মোটা-চিকন, দ্রুত-ধীর, গাঢ়-হালকা প্রভৃতি বিভিন্ন মাত্রার রেখা, আকার, বিন্দু অাঁকতে থাকে। রেখা ও আকার অঙ্কনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অন্তর্গত আবেগজাত বোধ যেমন আনন্দ, দুঃখ, ক্রোধ, ভীতি, ক্লান্তি, উদ্যম প্রভৃতিকে যুক্ত করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। ফলে অংশগ্রহণকারী রেখা, আকার প্রভৃতি আঙ্গিকগত উপাদানের প্রকাশক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়। অবশেষে কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মন থেকে তাদের পূর্বনির্ধারিত বস্ত্তগুলোকে কালি ও তুলি ব্যবহার করে অাঁকতে বলা হয় পূর্ববর্তী অনুশীলনে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। ফলাফল হিসেবে যেসব চিত্র অঙ্কিত হয় সেগুলো হয়ে ওঠে অভিনব, দৃশ্যমান বস্ত্ত থেকে স্বতন্ত্র ও নতুন একেকটি অভিজ্ঞতার বিষয়। এই কর্মশালা শিক্ষার্থীদের তুমুল উৎসাহিত করে। কর্মশালার এই স্বল্পসময়ে অাঁকা বিপুল পরিমাণ অনুশীলন থেকে বাছাই করে ব্যাপকসংখ্যক ড্রইং দিয়ে ভাস্কর্য বিভাগের তৃতীয়তলার দেয়ালগুলো আচ্ছাদিত হয়ে যায় এবং পরদিন সকলের জন্য উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে আগত দর্শকদের ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে।

এই বিনিময় কার্যক্রমে চারুকলার শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি কর্মশালার বিপরীতে স্লেডের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত হয় একটি কর্মশালা। স্লেড অধ্যাপক ও ভাস্কর জন এইকেনের কর্মশালা চলাকালে চারুকলার শিক্ষার্থীরা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে। সেখানে তখন সরস্বতী পূজার উৎসব চলছিল। প্যান্ডেল ও প্রতিমার এই বিচিত্র আয়োজন অধ্যাপক এইকেনকে বিস্মিত করে। ওই সফরে তিনি ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে একটি কুমোরপল্লী পরিদর্শনেরও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি বাংলার ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা নির্মাণের কৌশলের সঙ্গে স্লেডের শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। স্লেডের অন্য শিক্ষকরাও বিপুল উৎসাহে এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। একই সঙ্গে তাঁরা স্লেড বক্তৃতামালার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের শিল্পকলার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যনির্ভর একটি ধারণামূলক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের চাহিদা ব্যক্ত করেন। ফলশ্রুতিতে চারুকলা অনুষদের পক্ষে ভাস্কর্য বিভাগের প্রভাষক নাসিমা হক মিতু এবং বিনিময় কার্যক্রমে লিড পার্টনার অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম ২০১২ সালের অক্টোবরে লন্ডনে যান। তাঁরা যৌথভাবে ‘হে অ্যান্ড ক্লে’ শিরোনামে বাংলার প্রথাগত প্রতিমা নির্মাণ-কৌশলনির্ভর একটি কর্মশালা পরিচালনা করেন। তিনদিনের এই কর্মশালায় স্লেডের সকল বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পর্যায়ের মোট বারোজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারীরা হলো বিয়েট্রিচ বোনাফিনি, আনয়া বোরোউই, সিনা জিওহেগান, ফ্রাংক হ্যারিস, সু হি কিম, সেরা পেটিট, ফ্লোরিয়ান রোইথমায়্যর, বাবেট সেমের, ডোভাইল সিমোনাইট, আয়েশা সিং, পাওলা ভেরনিজ্জি ডে রামোস ও জিওন উন। এ কর্মশালার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা থেকে আসা অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা বাংলার প্রথাগত প্রতিমার ধারণা, তাৎপর্য, নির্মাণ উপকরণ ও কৌশল সম্পর্কে অবগত হয়। স্লেডের ক্ষেত্রে এ ধরনের নির্মাণনির্ভর কর্মশালা বিরল। ফলে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা প্রতিমা নির্মাণের উপকরণ বিন্যাস কৌশল ও তার ফলাফল প্রবল আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রাথমিক ধারণা অর্জনের পর কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা যার যার নিজস্ব ধারণা ও কল্পনা অনুসারে নির্মাণ করে অভিনব সব ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম। বাঁশের কাঠামো, পাটের অাঁশ ও খড়যুক্ত মাটি, তেঁতুলবীজের আঠা, জৈব রং প্রভৃতির ব্যবহারে তাদের প্রত্যেকের অভ্যস্ত শিল্পরচনার অভিজ্ঞতায় সুস্পষ্ট প্রভাব ফেলে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে। কর্মশালায় সৃষ্ট শিল্পকর্মগুলো স্লেডে আগত দর্শকদের দ্বারাও বিপুলভাবে সমাদৃত হয়।

স্লেড সমকালীন বক্তৃতামালার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের শিল্পকলাসংক্রান্ত অধ্যাপক লালা রুখ সেলিমের সচিত্র বক্তৃতা অনুষ্ঠানেও বিপুল দর্শক-শ্রোতার সমাগম ঘটে। অধ্যাপক সেলিম ইতিহাস ও সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে শিল্পের বিকাশের প্রকৃতি সম্পর্কে যে বিশ্লেষণমূলক বক্তৃতাটি উপস্থাপন করেন তা উপস্থিত অভ্যাগতদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পর্কে কৌতূহলের জন্ম দেয়। ধারাবাহিক বিনিময়ে শেষ পর্যায়ে এসে এই কর্মশালা ও বক্তৃতাটি স্লেডের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে উন্মোচিত করে। তাঁরা চারুকলা ও স্লেডের মধ্যে নিয়মিত শিক্ষার্থী বিনিময় কার্যক্রম চালুর সম্ভাব্যতা বিবেচনা করার জন্য আহবান জানান। উল্লেখ্য, তিন বছরের বিনিময় তৎপরতার কারণে একই ধরনের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যেও।

বিনিময় কার্যক্রমটি যেহেতু তিন বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তাই এর রীতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানতে হয় ২০১৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যে। তাই সমাপ্তিপূর্ব উপসংহারমূলক তৎপরতা শুরু হয়ে যায় ২০১২ সালের নভেম্বর থেকেই। আগেই নির্ধারিত ছিল তিন বছরের বিনিময়ের তথ্য, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, অর্জন ও সম্ভাব্য নির্দেশনা বর্ণনা করে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হবে। তারই ভিত্তিতে উভয়পক্ষের লিড পার্টনার অধ্যাপক সুসান কলিন্স ও অধ্যাপক লালা রুখ সেলিমের যৌথ সম্পাদনায় ইনস্পায়ারড! শীর্ষক গ্রন্থটির কাজ শুরু হয়। উভয় সম্পাদক ছাড়াও এ গ্রন্থে কর্মশালাগুলোতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা তাদের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া জানায়। যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে বিনিময় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে চারুকলা অনুষদের পক্ষে অধ্যাপক রফিকুন নবী, শিশির ভট্টাচার্য্য, নাসিমা হক মিতু ও নাসিমুল খবির এবং স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টের পক্ষে অধ্যাপক জন এইকেন, লিসা মিলরয় ও ড্রাইডেন গুডউইনের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন স্থান পায় এই গ্রন্থে। বিনিময় কার্যক্রমের পরিকল্পনা অনুসারে উভয় প্রান্তে অর্থাৎ ঢাকা ও লন্ডনে পর্যায়ক্রমে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের মার্চ মাসে লন্ডনে ইউসিএলের স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টে ইনস্পায়ারড! গ্রন্থটির দ্বিতীয় মোড়ক উন্মোচনের মাধ্যমে এই বিনিময় কার্যক্রমটির আনুষ্ঠানিক যতি টানা হয়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইনস্পায়ারড! গ্রন্থের প্রথম মোড়ক উন্মোচনসহ একটি যৌথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বিনিময় কার্যক্রমের ঢাকা পর্বের সমাপ্তি টানা হয়। যেহেতু এই বিনিময়ের বেশিরভাগ কর্মশালা ঢাকাতেই অনুষ্ঠিত হয়, তাই সমাপনী এই প্রদর্শনীটি চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হবে বলে স্থির করা হয়। মোড়ক উন্মোচন ও প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনেই অনুষ্ঠিত জাতীয় সেমিনারটি ছিল চিন্তা-উদ্দীপক ও কার্যকর। চারুকলা অনুষদের লেকচার থিয়েটারে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারের বিস্তৃত আলোচনায় একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রেক্ষিতে আমরা সমকালীন শিল্প-তৎপরতাকে কীভাবে পরিমাপ করব, কীভাবে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা কার্যক্রমকে সমকালীন বাস্তবতার সংগতিপূর্ণ করে বিন্যস্ত করা যায় ইত্যাদি বিবিধ চিন্তা-উদ্দীপক ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়। বিনিময় কার্যক্রমটি আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি বিন্যাসে কোনো ইতিবাচক প্রভাব রাখবে কি না তাও আলোচিত হয়। তরুণ শিক্ষকরা এই বিনিময় তৎপরতার অভিজ্ঞতা তাঁদের দৈনন্দিন পাঠদান পদ্ধতির বিকাশে কাজে লাগাবেন বলে উল্লেখ করেন। চারুকলার ভাস্কর্য বিভাগ তাদের নিজস্ব সিলেবাসে ইতোমধ্যেই এই অভিজ্ঞতার বিচারে কিছু পরিবর্তন সাধন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। অনুষদের অভ্যন্তরে আন্তঃবিভাগীয় আদান-প্রদান বৃদ্ধির তাগিদও অনুভূত হয় এই সেমিনারে। চারুকলা অনুষদে অন্তত স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি আন্তঃমাধ্যমিক বিভাগ সূচনা করা যায় কি না এটা ভাবারও আহবান জানান আলোচকরা। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত প্রতিনিধিরাও সেমিনারের অভিজ্ঞতাকে নিজেদের শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রয়োগের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। স্লেড প্রতিনিধি হিসেবে আগত অধ্যাপক সুসান কলিন্স ও ড্রাইডেন গুডউইনও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তাঁদের শিল্প ও শিক্ষাসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন প্রভাব সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করেন। সেমিনারে উপস্থিত সকলেই বাংলাদেশের চারুশিল্প শিক্ষাকার্যক্রমে আন্তঃমাধ্যমিক অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে নিজেদের শিক্ষাকার্যক্রমকে আপন সংস্কৃতি, আর্থসামাজিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে সমসাময়িক দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত রেখেই সামনে এগিয়ে নিতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন। সেক্ষেত্রে এ-ধরনের স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বিনিময় বিশেষ সহায়ক হবে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।

তিন বছরের এই শিক্ষাবিনিময় শুরু থেকে প্রতিটি পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, চারুকলা অনুষদের ডিন যথাক্রমে অধ্যাপক রফিকুন নবী, অধ্যাপক এ হ মো. মতলুব আলী এবং অধ্যাপক সৈয়দ আবুল বার্ক আল্ভী এই কার্যক্রমকে সযত্ন সহযোগিতা প্রদান করেছেন। স্লেড ও চারুকলার সকল শিক্ষকসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএল, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতো সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের কাছেই এই বিনিময় কর্মকান্ডটিকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে।

গত মার্চে বিনিময় কার্যক্রমটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলে স্লেড ও চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেভাবে পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে পড়েছেন তা ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্টদের বিশেষভাবে আলোড়িত করছে। উভয় প্রান্তের শিক্ষার্থীদের উদ্দীপনা ও আগ্রহকে বিবেচনায় রেখে তাই এ-কার্যক্রমকে ধারাবাহিকতা দেওয়ার উপায়ও অনুসন্ধান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এ-ধরনের বিস্তৃত সময়ব্যাপী শিক্ষাবিনিময়ের তৎপরতা চারুকলা অনুষদের জন্য একটি অত্যন্ত নতুন অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের শিল্পের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ঐতিহ্যের এ-প্রতিষ্ঠানের জন্য এই বিনিময় কার্যক্রম ভবিষ্যতে সমধর্মী আরো বিভিন্ন উদ্যোগকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করা যায়। চারুকলা শিক্ষার মান উন্নয়ন ও বিকাশকে অগ্রবর্তী করতে এ-ধরনের উদ্যোগের অবশ্যই কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Reply

*