logo

স্মরণ – শর্বরী রায় চৌধুরী

সু শো ভ ন অ ধি কা রী

প্রখ্যাত ভাস্কর শর্বরী রায় চৌধুরী সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। তিনি যে কেবল বড়মাপের শিল্পী ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন ভারি আশ্চর্য এক মানুষ। তাঁর বন্ধুত্ব, তাঁর আতিথেয়তার কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। এ-ব্যাপারটা তাঁরা বিশেষভাবে জানেন – যাঁরা পেয়েছেন তাঁর আতিথ্য আর বন্ধুতা। সারাক্ষণ তিনি যেন মগ্ন থাকতেন কাজের মধ্যে। তাঁর চোখের তারায় ছিল এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা। এবং সেই দৃষ্টিতে একই সঙ্গে মাখানো ছিল বৈদগ্ধ আর কৌতুকের আশ্চর্য মিশেল। সম্প্রতি একটু কাহিল হয়ে পড়েছিলেন তিনি। শরীরটা হয়তো তাঁর কাজে তেমন সহযোগিতা করতে চাইছিল না। কিন্তু বরাবরের মতো স্বল্পভাষ শর্বরী ডুবে থাকতেন নিজের জগতে। তাঁর সান্নিধ্যের এক দুর্মর আকর্ষণে তিনি অন্যদের কাছে টেনে রাখতেন চুম্বকের মতো।
শর্বরীর জন্ম ১৯৩৩ সালে, বাংলাদেশের ফরিদপুরে। মায়ের কাছেই তাঁর শিল্পশিক্ষার প্রথম পাঠ। মা আলপনা দিতেন, পুতুল গড়তেন, কখনো বা একটু-আধটু ছবি অাঁকতেন। যা শিশুকাল থেকেই তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর কথা শুনে আমাদের মনে হয়, চার ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শর্বরীই বুঝি মায়ের স্নেহ-আবদার কেড়েছিলেন সবচেয়ে বেশি। ছোটবেলায় নিয়মমাফিক পড়াশুনো তাঁকে তেমন আকর্ষণ করত না। তার চেয়ে মন টানত নরম মাটির তাল নিয়ে খেলায়, আর তাই নিয়ে নানা রকম মূর্তি বানাবার দিকে ঝোঁক সেই সময় থেকে। কিছু পরে তাঁকে কলকাতায় চলে আসতে হয়। কলকাতায় এসে প্রথমে ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ভর্তি হন শর্বরী। এক বছর পরে কলেজ ছেড়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রদোষ দাশগুপ্তের কাছে কাজ শিখতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে প্রদোষ দাশগুপ্ত কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দিলে শর্বরীও সেখানে এসে ভর্তি হলেন। এবং ১৯৫৬ সালে তিনি সরকারি আর্ট কলেজ থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরের বছর ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্রথমে প্রদোষ দাশগুপ্ত ও পরে শঙ্খ চৌধুরীর কাছে পাঠ নিয়েছেন। আবার বছরদুয়েক ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে শিক্ষকতা করে ইতালি সরকারের বৃত্তি নিয়ে শর্বরী সেখানকার ফ্লোরেন্স অ্যাকাডেমিতে যোগদান করলেন। আর এ-কথা সত্যি যে, শিল্প আর সংগীতের মায়ায় ফ্লোরেন্স যেন নতুন আলো দেখিয়েছে তাঁকে। দিনের পর দিন ঘুরে বেরিয়েছেন নানা গ্যালারিতে আর ভিড় করেছেন বিভিন্ন মিউজিক কনসার্টে। তাঁর দেখার চোখ আর শোনার কান নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ হয়েছে ফ্লোরেন্সের শিল্প আর সংগীতের এইসব আসরে। ইতালির এ সময়টায় ক্লাসিক্যাল আর্টের অন্যতম পীঠস্থানটি তিনি তন্ন তন্ন করে ঘুরে বেরিয়েছেন। আরো একটা ব্যাপার ঘটেছিল এই পর্বে। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক আর ভারতীয় মার্গসংগীতের প্রতি শর্বরীর আকর্ষণ বরাবরের, তবে তা বোধকরি আরো তীব্রতর হয়েছে এই সময়ে – যা আজীবন তিনি গভীরভাবে লালন করেছিলেন। সংগীতের প্রতি এই আকুলতা তাঁকে আমৃত্যু দৃঢ়ভাবে বেঁধে রেখেছিল।
সারা জীবনে যে কয়েকজন অলকসামান্য শিল্পীর সান্নিধ্যে শর্বরী এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হেনরি মুর, অ্যালবার্তো জিয়াকমেতি, মারিনো মারিনি প্রমুখ প্রথিতযশা শিল্পী – যাঁরা ভাস্কর্যজগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। এইসব শিল্পী শর্বরীর কাজ দেখে রীতিমতো আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ তাঁদের সংগ্রহে রেখেছেন শর্বরীর ভাস্কর্য। যেমন – জিয়াকমেতি সানন্দে কিনে নিয়েছিলেন তাঁর একটি ব্রোঞ্জের কাজ এবং শর্বরীকে ‘সিটিং’ দিয়েছিলেন প্রতিকৃতি তৈরির জন্যে। একজন তরুণ শিল্পীর পক্ষে এ যে কত বড় সম্মান, কত বড় গৌরব তা বলা বাহুল্য। এখানে আর একজন কিংবদন্তি শিল্পীর কথাও আমাদের নিশ্চিতভাবে মনে পড়বে, যাঁর সঙ্গে শর্বরীর নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছিল ছয়ের দশকের শেষ থেকে। তিনি শান্তিনিকেতনের রামকিঙ্কর। শর্বরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল একাধারে শিক্ষকের মতো, আবার কখনো ছাত্র বা সহকর্মী হিসেবে – স্নেহে ও শ্রদ্ধায়। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, সোমনাথ হোর, সনৎ কর, সুহাস রায় প্রমুখ শিল্পীর মতো শর্বরীকেও শান্তিনিকেতনে টেনে এনেছিলেন দিনকর কৌশিক – যাঁকে আমরা সহজেই কলাভবনের নতুন পর্বের কারিগর বলতে পারি। কলাভবনের এই উদার আবহাওয়া, শান্তিনিকেতনের মাটি আর রামকিঙ্করের প্রাণময় সান্নিধ্য বোধকরি আজকের শর্বরীকে নির্মাণ করেছিল। জীবনের প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত ‘কিঙ্করদা’র কথা বলতে গেলে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি যেন পালটে যেত, আলোকিত হয়ে উঠত শর্বরীর মুখমন্ডল; যদিও তাঁর কাজের মধ্যে রামকিঙ্করের প্রভাব কখনই ফুটে ওঠেনি। ফর্মকে বাঁকিয়ে তিনি এক আশ্চর্য তরঙ্গমালা নির্মাণ করেন, যা একটা গানের তানের মতো যেন ঘুরে ঘুরে আসে দর্শকের কাছে। তাঁর কাজের মধ্যে কী এক নির্জনতা, কী এক গভীর একাকিত্ব মিশে থাকে। ভাস্কর্যের প্রধান গুণ তা চারদিক থেকে ঘুরে দেখবার, ছবি বা প্রতিমার মতো তা কেবল ফ্রন্টাল নয়। শর্বরীর কাজে আকারের উত্তল-অবতল ভঙ্গিমা ও তার অনুভবী সারফেস টেক্সচার দর্শকের চোখকে সরতে দেয় না। যেমন তাঁর ‘গেট অফ হ্যাভেন’ নামের কাজটি এক অব্যক্ত সুরমূর্ছনার মতো – আকারের স্নিগ্ধতা ও সারফেসের স্পর্শময়তায় সে বুঝি এক ইন্দ্রজাল তৈরি করে। আর তাঁর অসাধারণ প্রতিকৃতিগুলির কথাও এখানে আমাদের মনে পড়ে।
শর্বরী রায় চৌধুরীর সংগীতপ্রীতির সঙ্গে তাঁর সংগীত সংগ্রহের দিকটিও জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। ক্লাসিক্যাল গানের রেকর্ড অনুসন্ধান করা আর তা সংগ্রহ করা, তাঁর কাছে ছিল একটা দুর্মর অবসেশনের মতো। এই সংগ্রহটি যে-কোনো প্রফেশনাল মিউজিক-আর্কাইভের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। এ কাজে তিনি কোথায় না ঘুরে বেরিয়েছেন এবং কত না বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে ফিরেছেন তার ইয়ত্তা নেই। গানের প্রতি এই সুগভীর প্রেমের জন্যই হয়তো ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি, আলি আকবর খান বা সিদ্ধেশ্বরী দেবী প্রমুখ উচ্চাঙ্গসংগীতের নক্ষত্রমালার প্রতিকৃতি তাঁর হাতে অমন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
দেশে ও দেশের বাইরে তাঁর অনেক কৃতী ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে আছে। তবে শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন একেবারে অন্যরকমের। উদাসীর মতো হঠাৎ হঠাৎ ক্লাসে ঢুকে কী যেন দেখতেন, ছাত্রদের কাজে কিছু একটা খুঁজতেন – তারপর আবার দমকা বাতাসের মতো উধাও হয়ে যেতেন! তাই কর্মরত অবস্থায় তাঁকে দূর থেকে লক্ষ করে যাওয়া ছিল ছাত্রের কাছে সবচেয়ে বড় পাঠ, আর সৃষ্টিরত ভাস্করের এই নিঃশব্দ সান্নিধ্যই ছিল ছাত্রছাত্রীর পক্ষে সত্যিকারের শিক্ষা। এছাড়া তাঁর অগোছালো সাজ, তাঁর রসিকতা, তাঁর অ্যাপিয়ারেন্সের কথা না বললে শর্বরীর কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর চলাফেরার মধ্যেই ছিল এক অমোঘ আকর্ষণ। ছোট্ট গোলাকার সোনার ফ্রেমের চশমার ফাঁক দিয়ে তাঁর কৌতুকমাখা ধারালো দৃষ্টি আর গিঁট দিয়ে বাঁধা ঘন কালো দাড়ির ফাঁকে গুঁজে রাখা ফুটন্ত হলুদ রঙের কলকে ফুলে সজ্জিত শর্বরীকে দেখে আকৃষ্ট হননি এমন মানুষ বোধহয় বিরল। ইয়োরোপের শিল্পীদের আমরা যেমন দেখি জীবদ্দশাতেই একটা মিথে পরিণত করেন নিজেদের। সালভাদার দালি বা পিকাসোদের নিয়ে শিল্পমহলে যে কত বিচিত্র রকমের গল্প তৈরি হয়ে আছে, তার সীমা নেই। আমাদের দেশে বোধহয় শর্বরী সেই জায়গা কিছুটা ছুঁতে পেরেছিলেন।
দেশ-বিদেশে তাঁর বহু প্রদর্শনী হয়েছে, আদৃত হয়েছে তাঁর ভাস্কর্য, পেয়েছেন একাধিক সম্মান। তাঁকে নিয়ে একাধিক তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। তবু নিজের কাজ নিয়ে সহজাত বিনয় পোষণ করে এসেছেন বরাবর। খুঁতখুঁতে শর্বরী তাঁর কাজে নিজেকে তৃপ্ত করতে পারেননি কোনো দিন। বড় মাপের শিল্পীমনের এ একটা প্রধান লক্ষণ। নিজের কাজের কথায় মায়ের প্রসঙ্গে চলে যেতেন বারবার। তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন – ‘মনে আছে, আমি তখন খুব ছোট, একটা কুকুর বানিয়েছি। তার কোমরটা সোজা হয়ে গেছে। মা বুকের দিকটা চওড়া করে কোমরের দিকটা সরু করে দিলেন। এইভাবে একটু-আধটু বলে দিতেন। তাতেই আমার কত সুবিধে হতো। এখন এই বুড়ো বয়সে কত কী মিস করি, ভুলে যাই, কিন্তু মায়ের সঙ্গে ছেলেবেলার সেই দিনগুলো এখনো ভুলতে পারিনি।’
কাজ নিয়ে ভাঙা-গড়ার কথায় এসেছে রামকিঙ্করের প্রসঙ্গ। বলেছেন, ‘কাজ করতে গেলে, কাজ ভাঙতে ইচ্ছে করে। কিঙ্করদাও কথাটা মানতেন। কম ভেঙেছেন তিনি? আমরা অল্পে সন্তুষ্ট বলেই পারি না। আরো তিনটে জন্ম আমি আমাদের দেশের মিনিয়েচার আর্ট, স্কাল্পচার আর মিউজিক শুনে যেতে পারলে, হয়তো পরের জন্মে কিছু করতে পারি। এটা কোনো বানানো কথা নয়। আমার হৃৎপিন্ডের ভিতরের কথা।’ জানি না, আজকের দিনে আমরা কজন করতে পারি এমন বিনম্র স্বগতোক্তি!
শর্বরীর প্রয়াণে শিল্পজগতের একটা বড় জায়গা প্রকৃত অর্থেই শূন্য হলো। সেতুর মতো তিনি আমাদের ধরে করে রেখেছিলেন এক আলোকময় ভুবনের সঙ্গে। স্পর্শ করেছিলেন বিশ্বশিল্পের যে সোনার তারটি, তা বুঝি ছিন্ন হলো। ব্যক্তিগত জীবনে, তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে একজন সরোদ বাজিয়ে, আর অন্যজন ভাস্কর। আর শর্বরীর স্ত্রী, সংগীতশিল্পী অজন্তা দেবী – যিনি অলৌকিক দক্ষতায় সামলেছিলেন শর্বরীর মতো মানুষকে – তিনি ও তাঁর পরিবারের জন্য আমাদের আন্তরিক সমবেদনা রইল। 

Leave a Reply

*