logo

স্থাপত্যশিল্পের অনন্য : রূপ ও রূপান্তর

র বি উ ল  হু সা ই ন

মানুষের বিচিত্র জীবনযাপনের বিবিধ চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা সাধারণত বিশেষায়িত হয়ে স্থাপত্যে সন্নিবেশিত হয়। ব্যবহারিকতা বিশেষ করে স্থাপত্যে – মানুষকেন্দ্রিক, যা ব্যবহারকারীর ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সহজলভ্য সুবিধাদির কর্মকা- থেকে উৎসারিত। মানুষের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী স্থাপত্য তার রূপারূপ গঠন করে। চাহিদার বিভিন্নতা অনুসৃত হয়েই স্থাপত্যের শ্রেণি ও প্রকার এবং সেই অনুযায়ী এর নানাবিধ গঠনাকার রূপ নেয় আর সেগুলোই সেই নির্দিষ্ট ভবনে প্রকাশিত হয়।

একটি ভবন যেন একটি অদৃশ্য বা দৃশ্যমান বস্ত্তনিচয় দ্বারা খাঁচাসদৃশ্য আধার। অমত্মরঙ্গে অমত্মরঙ্গ, মানুষ বা ব্যবহারকারীর নানাবিধ গোপন বা সরব কার্যাদি, বহিরঙ্গে বৈরী প্রকৃতি থেকে বাঁচার নিরাপদ কৌশলাদি, উপকরণ এবং প্রকৃতিতে পাওয়া গাছপালা, ছায়া বা রোদের তাপ, বৃষ্টির জল, প্রবহমান বায়ুশক্তি – সবকিছুর চতুর ব্যবহার, বৃষ্টি-বন্যা, উত্তাপ-খরা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, অগ্ন্যুৎপাত-ভূমিকম্প থেকে এবং সর্বোপরি জীবজন্তু ছাড়াও মানুষ নামক ঘাতক-আততায়ী থেকে রক্ষা বা বাঁচা বা রেহাই পাওয়ার এমন একটি বুদ্ধিগত সৃজনশীলতার সাহায্য এবং ব্যবহার দ্বারা ব্যবস্থা সৃষ্টি, যাতে নিরাপদ ও শ্রীম–ত আশ্রয়ে নিশ্চিত অবস্থা সহজে পাওয়া যায়।

স্থাপত্য শব্দটির উৎস – স্থাপন বা গঠন। আশ্রয় সৃষ্টি বা গঠন করাই মূল বিষয় এবং মানুষের জীবনযাপনের জন্যে যতগুলি কার্যসম্পাদন করতে হয় জন্ম থেকে মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী সময় পর্যমত্ম, প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্যেই পৃথক পৃথক স্থাপত্যের বিশেষ বিষয় বা প্রকার বা বিভাগ পরিলক্ষিত হয়। বাসগৃহ, স্কুল, কলেজ,  আপিস, কারখানা, হাসপাতাল, হোটেল, পুলিশের থানা, উপাসনালয় থেকে বেশ্যালয়, চিত্তবিনোদনগৃহ, দোকানপাট, বিমানবন্দর, নৌবন্দর, সচিবালয়, সংসদ ভবন, সেনানিবাস, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ভবন, ব্যায়ামাগার, সড়ক, উদ্যান, পার্ক, পাঠাগার, জাদুঘর, জলাশয় – এসব নিয়েই একটি জনপদ গড়ে ওঠে যেখানে গোরস্থান, শ্মশান অর্থাৎ মানুষের ব্যবহারের জন্যে প্রতিটি ক্ষেত্র পর্যমত্ম স্থাপত্যের বিচরণ এবং একেকটি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। এই বৈশিষ্ট্য আসলে আলাদা আলাদা ব্যবহারিকতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে এবং সেইমতো ভবনটির আকার ও রূপ নেয় এমন অন্যভাবে, যা আরেক ভবনের সঙ্গে একই রকম হয়ে ওঠে না।

আমেরিকার স্থপতি লুই সুলিভান আধুনিক স্থাপত্যে এই কথাটিই ফর্মুলার মতো সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেন – Form follows function – কোনো ভবনের আকার বা গঠন তার ব্যবহারিকতাকে অনুসরণ করে গড়ে ওঠে। একটি ভবনের কার্যকারিতা সর্বপ্রথমে লক্ষ করার বিষয়। যে উদ্দেশ্যে ভবনটি ব্যবহৃত  হবে সেটিকে অবশ্যই সার্থক হতে হবে এবং তার সঙ্গে আরো দুটি বা ততোধিক বিষয় সন্নিবেশিত হবে। যেমন আকার, সৌন্দর্য, ব্যয়, ঐতিহ্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ, কলাকৌশল, নির্মাণসামগ্রী ইত্যাদি। সার্থক স্থাপত্যসৃষ্টি তখনই হবে যখন প্রাগুক্ত গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্য – সবগুলিই একটির ভেতরে সম্মিলিত, পরিপূরিত ও সার্থকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে উঠবে যেন একের ভেতরে অনেক এমন। এই আরাধ্য কাজই স্থপতির বিষয়, যা আপাত সহজ বলে মনে হয় কিন্তু বাসত্মবে খুব কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। আধুনিক সময়ের এই পর্যায়ে স্থপতিদের কার্যক্রমই দেশে দেশে নগর-শহর গঠনে সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছে। একটি দেশের একটি জনপদের বহির্দৃশ্য আমূলভাবে পরিবর্তিত করার আশ্চর্য ক্ষমতা রাখেন এই সৃজনশীল স্থপতিবৃন্দ তাদের স্থাপত্যসৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

একটি ভবন ভাস্কর্যের মতো শুধুমাত্র দৃশ্যমান ও সৌন্দর্যপূর্ণ হলেই চলবে না, এই সঙ্গে এর ব্যবহারিকতা বা উদ্দেশ্য থাকতে হবে। রবিঠাকুর বলেছেন, সেই সৌন্দর্যই উন্নতমানের যার কার্যকারিতা নেই, যেমন ময়ূরপুচ্ছ। আসলে একদা গ্রিক পুরাণে শিল্পের উৎকর্ষ নিরূপণে বিমূর্ততার উপস্থিতি অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে গণ্য হতো। রবীন্দ্রনাথের কথাতেও সেই সুর অন্যতম হয়ে ওঠে, কথার নির্যাসে হয়তো তিনি এই কথাই বলতে চেয়েছেন।

গ্রিকরা প্রথমে সংগীত, তারপর কবিতা এবং ধারাবাহিকতায় স্পষ্টভাবে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নাটক, স্থাপত্য, রন্ধনক্রিয়া – এসবের শ্রেণিকরণে শিল্পের উৎকর্ষ অনুযায়ী সাজিয়েছেন। লক্ষ করা যায়, প্রত্যক্ষ মাধ্যম, কার্যকারিতা বা ব্যবহারিকতা যে শিল্পের যত কম সেই শিল্পই তত উন্নত উৎকর্ষগুণম–ত। খুব কম উপকরণ-মাধ্যম লাগে যে শিল্পসৃষ্টিতে এবং খুব কম ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার যে-শিল্পে, সেই শিল্পই শ্রেষ্ঠমানের বলে গণ্য হওয়ার বিবেচনায় আসে। যেমন নৈর্ব্যক্তিক সংগীত, শুধুমাত্র বাদ্যযন্ত্র এবং শ্রবণেন্দ্রিয়বাহিত, না দেখলেও চলে। সংগীতের সুরলহরি মরমে পৌঁছে যায় কানে কানে শুনে, তারপর অনুভবের আশ্চর্য জগতে।

এরপর কবিতা – কালি, কলম, কাগজ, তারপর শব্দের প্রতিঘাত সংগীতের চেয়ে একটু জটিল, যদিও সংগীতের মতোই কানের সাহায্যে শ্রম্নতিতে বোধগম্য হলেও দৃষ্টি লাগে পাঠোদ্ধার করতে, অবশ্য কেউ পড়েও শোনাতে পারে, তারপর মরমে পৌঁছে বোধগম্য হয় বা হয় না। হয়তো মাধ্যমটি বেশ পরোক্ষ এটা প্রমাণিত হয়, এই জন্যেই সংগীতের পর কবিতার স্থান। এইভাবে তলিয়ে দেখলে স্থাপত্যশিল্প শিল্প হিসেবে বেশ নিচের দিকের।

প্রাচীন আমলের শিল্পের এই বিভাজিত শ্রেণিবিন্যাস কিন্তু এই সময়ে আর চলছে না। কারণ, স্থাপত্যশিল্পকে চিহ্নিত করা হয় সমগ্র শিল্পের মাতৃউৎস রূপে। এই কথাটি সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয় ইউরোপীয় রেনেসাঁস বা নবজাগৃতির আমলে, প্রাচীন জগৎকে বিশেস্নষণ করার পর। এই স্থাপত্যশিল্পে দেখা যায় ভাস্কর্য, চিত্রকলা, ব্যবহারিকতা, নির্মাণকৌশল, জীবনযাপন প্রণালি, বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহার, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর স্থাপনার জন্যে, গুরম্নত্বপূর্ণ সিদ্ধামত্ম, পরিমার্জন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন – সবকিছুই স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। সব শিল্পের প্রকাশ এই একটি মাত্র শিল্পমাধ্যম থেকে সৃষ্টি হয়ে এটি আশ্চর্য এক সর্বশিল্পের উৎসাধার হয়ে দাঁড়ায়।

স্থাপত্যশিল্প ও সংগীত নিয়ে মহাকবি গ্যেটে বলেছেন, Architecture is petrified or frozen music while music is liquid architecture. স্থাপত্যশিল্প হচ্ছে জমে যাওয়া সংগীতের মতো আর সংগীত হলো তার বিপরীতে তরলীকৃত স্থাপত্যরূপ। অনুপম ও সার্থক স্থাপত্য জমাট বাঁধা সংগীত লহরি হয়ে দিগমত্মকে পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। তাই বলা যায়, প্রাচীনকালের নিরিখে স্থাপত্যের শিল্পমান অন্যরকম থাকলেও এই বর্তমান সময়ে এটি একটি অতীব গুরম্নত্বপূর্ণ শিল্পমাধ্যম, যার সাহায্যে আধুনিক সময় অনেক বৈচিত্র্যময় হয়ে গড়ে উঠেছিল, উঠেছে এবং উঠছে। ইদানীংকালের একমাত্র রন্ধনশিল্প ও চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে এই যৌগিকশিল্পের তুলনা চলে। একটি স্থাপত্যকর্ম সৃষ্টি করতে যেমন বিভিন্ন পেশার মানুষজনের সক্রিয় সাহায্য-সহযোগিতা, শ্রম, বোধ-কৌশল-জ্ঞান-উপকরণ দরকার, তেমনি রন্ধন ও চলচ্চিত্রশিল্পের যৌগিক ও সম্মিলিত এবং সমন্বিত সৃষ্টি প্রক্রিয়াতেও।

স্থাপত্যশিল্পই একমাত্র শিল্পমাধ্যম, যার ভেতরে মানুষ বসবাস করে। অন্যান্য শিল্প যেমন শুধুমাত্র একটি ইন্দ্রিয় থেকে উৎসারিত হয়ে অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিয়ে সমসত্ম সত্তাকে জাগিয়ে দেয়, যেমন সংগীত-শ্রবণেন্দ্রিয়, কবিতা-শ্রবণ ও মনশ্চক্ষু দৃশ্যনির্ভর বোধানুভব, চারম্নকলা ও ভাস্কর্য-দর্শনেন্দ্রিয়জাত সর্বপ্রথমে হয়ে অন্যান্য ইন্দ্রিয়কে জাগরূক করে তোলে অনুভবে ও মননে। স্থাপত্য এইসব লালন ও পালন তো করেই, তদুপরি সেই সৃষ্টিকর্মের সম্পূর্ণ অভ্যমত্মরে গিয়ে ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি বাহিনীকে সক্রিয় করে তোলে। এইদিক থেকে স্থাপত্য অভিনব ও অনন্য এক যৌগিক ও যৌথগুণের শিল্পমাধ্যম, যার উদাহরণ বা তুলনা অন্য কোনো শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে, চলচ্চিত্র ব্যতিরেকে, হয় না বললেই চলে। তাছাড়া হয়তো ভাস্কর্যে একটু হতে পারে এই অভিজ্ঞতার অনুভব, যদি তা বিশালাকারে স্থাপত্যগুণম–ত হয়। এইজন্যে ভাস্কর্যের সঙ্গেও স্থাপত্যের আকার, রূপ এবং সৌন্দর্যের দিক থেকে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই বলা হয়, শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকর্মে ভাস্কর্য-শিল্পগুণের বহিঃপ্রকাশ থাকবেই।

স্থাপত্যে ব্যবহারিকতা আসলে তিন প্রকার। প্রথমত, মানুষ বা যেকোনো ব্যবহারকারী জীবজন্তু, পাখি, প্রাণী ইত্যাদি যার জন্যেই হোক না কেন তার জীবনযাপনের যে সুযোগ-সুবিধা-চাহিদা আছে তা যথাযথভাবে লক্ষ করে সেই অনুসারে একটি নির্দিষ্ট ভবনের নির্মিতি হতে হবে অর্থাৎ ব্যবহারকারী দ্বারা অভ্যমত্মরীণ ব্যবহারের সহজ, সাবলীল এবং অনায়াসলব্ধ কার্যকারিতার নিশ্চিত ব্যবস্থা থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যে ভবনটি নির্মিত হলো তার উপকরণ-ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থাৎ ইট, সিমেন্ট, বালু, লোহা, কাচ, কাঠ ইত্যাদির সাহায্যে এর গুণাগুণ – দৃঢ়মূল কাঠামোগত স্থাপন প্রকৃতির বিরূপতা, বিরম্নদ্ধতা, যেমন রোদ, বৃষ্টি, উত্তাপ, শৈত্য, ঝড়-বাদল, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, বন্যাসহ মানুষের বৈরিতা, যেমন চুরি-ডাকাতির মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক অনিষ্টকর কার্যাদি থেকে নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া নির্মাণ-কলাকৌশল এমন করতে হবে যাতে বহুদিন যাবৎ এর স্থায়িত্ব লাভ হয়।

তৃতীয়ত, পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি, গাছপালা, ঘাস, পানি – এই বহির্জগতের সঙ্গে ভবনটি যেন মিলেমিশে থাকে। ভেতরের পরিসর এবং বাইরের প্রকৃতি-পরিসর পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে একটি স্বয়ংক্রিয়  মাত্রায় ও যোগসূত্রে স্থাপিত হয়ে যেন একে অপরের পরিপূরক হয়। সামাজিক ও পরিবেশগত বিচারে ভবনটির উপস্থিতি যেন আনন্দদায়ক, দৃষ্টিনন্দন ও এলাকার সবার সম্মান ও মূল্যায়ন বৃদ্ধিতে কাজে লাগে অর্থাৎ স্থাপত্যে অভ্যমত্মরীণ-বহিরাঙ্গন ও নির্মাণশৈলী এবং প্রাকৃতিক, সামাজিক – এই যে তিনটি ব্যবহারিকতা পরিলক্ষিত হয় এসবের দ্বারা সার্থকভাবে স্থাপত্য সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে তা সাবলীল, সহজ ও সুন্দররূপে প্রকাশিত হওয়া চাই।

স্থাপত্যের সংজ্ঞা নির্ধারণে বলা হয়ে থাকে, স্থাপত্যশিল্প আসলে পরিসরসৃষ্টির গঠনপ্রক্রিয়া। স্থাপত্যের পরিসর বলতে ব্যবহারকারীর ব্যবহারের নির্দিষ্ট জায়গাকেই বোঝায়। স্থাপত্য উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে, সেইজন্যে ভীষণভাবে তা এক সামাজিক শিল্প হিসেবে পরিবেশিত। মানুষের ব্যবহারের জন্যে পরিসর উন্মুক্ত, আধা-উন্মুক্ত, বন্ধ বা বদ্ধ হয়ে থাকে। এর সৃষ্টি হয় উপকরণের ব্যবহার দ্বারা, চারদিকে দেয়ালের গ–, মাঝেমধ্যে জানালা, দরোজা, ঘুলঘুলি, ওপরে ছাদ-আচ্ছাদন – এটা খুব ছোট হলে জেলখানার নির্জন কক্ষ, বড় হলে হলঘর, মিলনায়তন – পরিসরের তারতম্যে এরকম হয়।

পরিসর সাধারণত তিন প্রকারের – ত্রিমাত্রিকতায় দেয়াল ও ছাদঘেরা জানালা-দরোজাসহ কক্ষ, অর্ধউন্মুক্ত-বারান্দা এবং উন্মুক্ত মাঠ, খোলা ছাদ। একজন দক্ষ সৃজনশীল স্থপতি এই তিন ধরনের ত্রিমাত্রিক পরিসর নিয়ে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানসহ বোধ-অনুভব দিয়ে স্থাপত্যরূপ সাজান ভেতরে, বাইরে ও প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে, সবশেষে সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার মূল্য দিয়ে। সাধারণত ব্যবহারকারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মূল্য বা সম্মান দিয়ে বা না দিয়ে এই সৃষ্টি বাসত্মবায়িত হয়। তবে একজন শিক্ষিত, রম্নচিবান ব্যবহারকারী অবশ্যই স্থপতির নতুন সৃষ্টিকে স্বাগত জানাবেন যদি তিনি শিল্পপ্রেমিক ও বিবেকবান হয়ে থাকেন। এই কারণে ও বিষয়ে আমেরিকার স্থপতি পল রম্নডলফের বিখ্যাত উক্তি আছে যিনি আমাদের দেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ স্থাপত্যাচার্য মাজহারম্নল ইসলামের শিক্ষক ছিলেন ও ময়মনসিংহ কৃষিবিদ্যালয়ের অনেক ভবনের স্থপতি, তিনি বলেছেন – Any fool can design a functional buidling – যে-কোনো আহাম্মক ব্যবহারিক গুণসম্পন্ন ভবন নকশা করতে পারে। আসলে তিনি বলতে চেয়েছেন – শুধু ব্যবহারিকতা সুচারম্নভাবে সাজালেই অনুপম স্থাপত্য সৃষ্টি হয় না, আরো অন্যান্য জিনিসের দরকার। কারণ, স্থাপত্যশিল্প হচ্ছে একটি যৌগিক শিল্প, শুধু একটি নয়, এর বাসত্মবায়ন যথার্থরূপে প্রতিফলিত করতে বহু শৃঙ্খলার প্রয়োজন।

স্থাপত্য ও প্রকৌশল বিষয়ে পরামর্শক ফার্মের প্রকৌশলী ব্যবস্থাপনা-পরিচালক আজকাল দেখা যায়, স্থাপত্যশিল্প সম্বন্ধে সরকারি আমলা, দৈবাৎ প্রশাসনিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত অশিক্ষিত নীচু মানসিকতার কর্মকর্তাবৃন্দ স্থাপত্যশিল্পে অযাচিতভাবে নিজেরাই নকশা করতে আসে নির্লজ্জভাবে সীমা লঙ্ঘন করে স্থপতি থাকা সত্ত্বেও। আরো দেখা যায় অর্বাচীনের মতো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দ্বারা অনুমোদিত নকশা অবলীলায় ভঙ্গ করে সীমানা পর্যমত্ম ভবন অযাচিতভাবে সম্প্রসারণ করতে তাদের বাধে না। অথচ তারাও পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য, সংস্থান থেকে এই ধরনের অবৈধ কর্মকা– নিষেধ থাকা সত্ত্বেও তারা মানসিক রোগীর মতো অদ্ভুত কাজ করতে এগিয়ে আসে এবং এতে বিজাতীয় ক্ষমতার স্পর্শে এক ধরনের আনন্দ পায়। যা কক্ষনো সার্বিক বিচারে হওয়া উচিত নয় এবং এইভাবে একটি ভবনের মধ্যে আরেকটি ভবনের দূরত্ব থাকে না। শহর ঘিঞ্জি, অপরিকল্পিত ও অশালীনভাবে বেড়ে ওঠে। আর সংশিস্নষ্ট করপোরেশন বা কর্তৃপক্ষ কোনো শাসিত্মর ব্যবস্থাও করে না, যা খুব দরকার। পেশাজীবী সংস্থা শুধু এইসব অপরাধীকে কালো তালিকাভুক্ত করে থাকে অথচ বিদেশে এদেরকে দোষী সাব্যসত্ম করে পেশাচর্চা থেকে বহিষ্কার করে পেশাকে বৈধ ও দুর্নীতিমুক্ত করে নিয়মনীতির আওতায় নিয়ে আসতে সচেষ্ট হয়।

তারা মনে করে, সরকারি খরচে ইউরোপ, আমেরিকা, হংকং, সিঙ্গাপুর, বেজিং-সাংহাই ভ্রমণ করেছে এবং পাঁচতারা হোটেলে ছিল বলে স্থাপত্য বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান লাভ হয়েছে। তাই স্থাপত্যজ্ঞানে জ্ঞানী হয়ে এভাবে নিজের বিষয় বাদ দিয়ে অন্যের বিষয়ে হসত্মক্ষেপের হাস্যকর অবৈধ ক্ষমতার অধিকার পেয়েছে। এরা স্থাপত্যশিল্পের শত্রম্ন এবং তাদের  নিয়ে অদ্ভুত এরকম পীড়িত মনমানসিকতা ভরপুর এই অভব্য খিচুড়ি সমাজ!

এর পরিপ্রেক্ষিতে আরো বলা যায়, ব্যবহারিকতাসম্পন্ন ভবন যে শুধু সেই ব্যবহারিকতা ছাড়া অন্যকিছুর রূপামত্মর করা যাবে না তাও ঠিক নয়। আমাদের দেশে বা অন্য দেশেও দেখা যায় হোটেলকে হাসপাতাল, বসতবাড়িকে হোটেল, ক্লিনিক কিংবা আপিস ভবনকে স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ে হরহামেশা রূপামত্মরিত করা হচ্ছে। যা ঢাকা ও অন্যান্য শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রমাণিত হয় পল রম্নডলফের যথার্থ উক্তির সারবত্তা এবং প্রকৃত স্থাপত্যসৃষ্টিতে এই অশুভ প্রক্রিয়া বিঘ্ন ঘটায়, এ কথা বলা যায়।

স্থাপত্য সৃষ্টিতে একেকজন সর্বকালের স্থাপত্যপ্রতিভা একেক রকম দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে গেছেন, তবে সম্মিলিতভাবে তাঁদের চিমত্মাভাবনা স্থাপত্যশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। পরিসর এবং ব্যবহারিকতার নিশ্চিতকরণ ছাড়াও তাঁরা একটি বিষয়ের দিকে লক্ষ রেখে সার্থকভাবে স্থাপত্যকর্ম সাধন করেছেন এবং তার কালে সেটি বেদবাক্য হলেও পরবর্তী সময়ে অন্য একজন প্রতিভা এসে সেটাকে পরিবর্তন করে ভিন্নমতাবলম্বী হয়েছেন। যেমন মিজ ভান্ডার রো বলেছেন ভবনের খুঁটিনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খতা বিষয়ে, যা নান্দনিকতারূপের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান – God is in details – খুঁটিনাটি কর্মসাধনে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়। তার আর একটি বচন – Less is more – কমই অনেক। একটি ভবনের সৌন্দর্য সুন্দরভাবে প্রকাশিত হতে পারে অলংকার-সাজসজ্জা ছাড়া সহজ-সরল প্রয়োগে।

পরবর্তী সময়ে রবার্ট ভেঞ্চুরি বলেছেন – Less is bore  – খুব কম করা বিষয়টি খুব একঘেয়ে। মিজ যেমন কাজের গুরম্নত্ব বাড়াতে ঈশ্বরকে টেনেছেন, তেমনি স্থপতি-দার্শনিক লুই কান যিনি আমাদের সংসদ ভবনের স্থপতি, তিনি স্থাপত্যগুণ বিশেস্নষণে মানুষের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

আবার লে কর্বুসিয়ের বলেছেন তার বিপরীতে – A house is a machine to live in – দালান বা বসতবাড়ি একটি যন্ত্র বিশেষ, যার মধ্যে মানুষ বসবাস করে থাকে। সেখানে বিদ্যুৎ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পয়োনিষ্কাশন পদ্ধতি, পাইপলাইন ইত্যাদির সাহায্যে সবকিছু বসবাসকারীর সহজ ও সাবলীলভাবে বসবাস করার কাজে লাগে তা একটি যন্ত্রের মতো এবং তা প্রয়োজন মেটায়, সেইজন্য কর্বু এমন বলেছেন।

স্থাপত্যে আবার লুই কান মানুষের জয়গান করেছেন। একটি ভবনকে তিনি মানুষের জীবন ও দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন : মানুষের যেমন জীবন, জন্ম-মৃত্যু আছে, একটি দালানেরও তেমনি। পৃথিবীরও তেমন।

পরিবেশপ্রেমিক মার্গালিস ও লাভলক যেমন এই গ্রহের নাম দিয়েছেন Gaia – গাইয়া। গ্রিক পুরাণের পৃথিবীর দেবীর নামে, মানুষ বা প্রাণীর মতো তার জন্ম-মৃত্যু, আশা, দুঃখ, অনুভূতি, স্বপ্ন – সব  আছে।

দালানের জানালাকে লুই কান মানুষের চোখ হিসেবে ভেবেছেন। ভবনের খুঁটি, সত্মম্ভ বা দেয়ালকে তিনি মানুষের জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলিয়েছেন। মানুষের জীবন যেমন দৃপ্ত-দৃঢ় আশার ওপর দাঁড়িয়ে, তেমনি একটি দালান সুদৃঢ়, সুগঠিত শক্ত খুঁটি বা সত্মম্ভের ওপর।

আবার তিনি একটি বসতবাড়িকে একটি আদর্শ শহর হিসেবে মনে করেছেন, যেখানে বসা ও খাওয়ার ঘর হচ্ছে খোলা মাঠ, জলাধার ঘেরা উদ্যান, বিনোদন কেন্দ্র, আপিসপাড়া, রান্নাঘর, শিল্প-কারখানা এলাকা, হাট-বাজার, ফসলের মাঠ, কৃষিভূমি; শোবার ঘর-হোটেল, মিলনায়তন, দোকানপাট, আমোদ-প্রমোদের চিত্তানন্দ এলাকা ইত্যাদির মতো। মূল কথা মানুষের জীবনের সঙ্গে স্থাপত্যশিল্প সব দিক থেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, একটি থেকে আরেকটিকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।

এইসঙ্গে বলা যায়, স্থাপত্য বা যে-কোনো শিল্পের বিষয় সর্বজনীনভাবে এক ও অভিন্ন। কিন্তু যখন চর্চা করা হয় তখন তা স্থান, কাল, প্রেক্ষিত এবং সেই জায়গা ও পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে।

সব দেশে সব শিল্পের ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে কথাটি সবসময় প্রযোজ্য। বিশেষ করে একদা বহু বছরব্যাপী বহু বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে শোষিত ও শাসিত বর্তমানে স্বাধীন, যদিও Colonial hangover বা ঔপনিবেশিক খোয়ারি থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি সেইসব দেশে তবুও এর মধ্যে নিজেদের রাজনীতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা, শিল্প, কৃষি, সংগীত, ক্রীড়া ইত্যাকার সম্বন্ধে স্বদেশে ফেরার প্রক্রিয়া সচেতনভাবে শুরম্ন হয়েছে।

পরাধীন আমলে বা ঔপনিবেশিক সময়ে কালপরিক্রমায় ইউরোপীয় পশ্চিমা বা প্রতীচ্য সংস্কৃতি-বিজ্ঞাননির্ভর হয়ে নিজের স্বকীয়তা ছেড়ে ঘরের বাইরে গিয়ে আধুনিক হতে বাধ্য হয়েছিল এবং পরে যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়ে সবকিছু বুঝতে পেরে নিজের কাছে নিজের ঘরে ফেরা শুরম্ন হলো, তখন উত্তরাধুনিকতা এই সময়ে শুরম্ন হলো এবং এখন সেই কাল চলছে যাকে বলে আত্মোপলব্ধির কাল।

বর্তমানে Think globally and act locally বিশ্ব নিয়ে সার্বিকভাবে ভেবে নিজের দেশে সক্রিয় হয়ে সবকিছু গড়তে হবে – এই উক্তি প্রথমে নগর পরিকল্পক প্যাট্রিক গেড্ডেস করেছিলেন, পরে গেড্ডেস, ডেভিড গ্রাউনার এটাকে সম্প্রসারিত করে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, যিনি ১৯১৭ সালে ঢাকা নগরীকে গার্ডেন সিটি বা উদ্যান নগরে রূপ দেওয়ার প্রসত্মাব করে পরিকল্পনা করেছিলেন, যদিও তা হয়নি তখন, তবে পরবর্তী সময়ে ভুবনেশ্বর শহর তেমনভাবে কিছুটা গড়ে উঠেছিল এমন দেখা যায়।

এখন এই ঘরে ফেরার পরিক্রমা চলছে যখন নিজের ব্যক্তি বা সমষ্টিগত মা, মাটি ও মানুষকে নিয়ে নিজেদেরকে Polyvalent vision – বহুদিকব্যাপী দূরদৃষ্টি নিয়ে সামনে এগোতে হবে। কেননা, মানুষের জন্যে স্থাপত্য। তাই ব্যবহারিকতা এবং পরিসরের প্রসঙ্গ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে। সব শিল্পের মতো স্থাপত্যশিল্প স্বাভাবিকভাবে অতি প্রকৃতি ও মানবমুখী এবং তা পরিবেশ ও মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। সৃষ্টিশীলতার ধর্মই তাই, একথা সর্বকালে সর্বদা প্রযোজ্য ও অবশ্য মান্য।

Leave a Reply

*