logo

সৃজন সারথি শিল্পাশ্রম

সি ল ভি য়া  না জ নী ন

সভ্যতার পথে মানুষের প্রথম পদক্ষেপ শিল্পচর্চা। শিল্পের সারণি ধরেই ক্রমাগত যাপিত জীবনের উত্তুঙ্গ শিখরকে স্পর্শের সমর্থতা তৈরি হয়েছে আজকের উত্তরাধুনিক মানুষের। শিল্প সৃষ্টির প্রয়াস এক সুদীর্ঘ সাধনার নান্দনিক রূপায়ণ। দীর্ঘ সময়ের ভাবনা, বেঁচে থাকার যাতনাকে সরলীকরণের প্রচেষ্টায় প্রাগৈতিহাসিক মানবসন্তান তাঁর অনুভূতিকে অন্ধকার গুহায় বিবৃত করেছে রং-রেখার নানাবিধ সরল বিন্যাসে। প্র ত্নমানবের সীমিত উপকরণ, নিজস্ব করণকৌশল – বিশাল পরিধিতে বিবৃত হয়েছিল আশ্চর্য দক্ষতায়! প্রকৃতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল ছবি আঁকা, প্রকৃতিই ছিল তাঁদের আঁধার-আঁধেয় এবং আরাধনা। তাই এই শিল্প স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বতঃস্ফূর্ত। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান তাদের শিখিয়েছে আটপৌরে জীবন ও শিল্পচর্চা একে অন্যের পরিপূরক। প্র ত্নপ্রস্তর যুগে মানুষ নিজেকেই প্রত্যক্ষণ করেছে; প্রত্যক্ষণ করেছে তাঁর আরাধ্য জীবনধারণকে। হাজার হাজার বছর পরে ইম্প্রেশনিস্টদের ছবিতে মুহূর্তকে উপস্থাপনের প্রবণতা আমাদের পূর্বপুরুষদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তবে প্রাচীন মানুষ নান্দনিকতা নয় বরং জীবনের কঠিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকেই এঁকেছেন। নব্যপ্রস্তর যুগে মানুষের স্বাধীন সত্তার পরিবর্তন হয়। কৃষির উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে সঞ্চিত হয় খাদ্য, কায়িক শ্রমের ভিত্তিতে তৈরি হয় শ্রেণিবিভাজন; এ-সময়ে শিল্প-সম্পর্কিত ধারণায় সমাজব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিল্পীরা ধর্ম সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য সাধনেই নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। এ সময় থেকেই পৃষ্ঠপোষক শিল্পচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। পাশাপাশি লোকধর্মও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষত মিশর ও ভারতবর্ষে। মিশরীয় সভ্যতায় পারলৌকিক জীবন ইহলৌকিক জীবনের সম্প্রসারণ হিসেবেই ব্যাপ্ত। মিশর, ভারত, পশ্চিম এশিয়ার হাজার বছরের শিল্পকলার ইতিহাসে রাজা ও রাজবংশের কথা বিবৃত হয়েছে। কোথাও পাওয়া যায়নি কোনো শিল্পীর নাম। মিশরের পিরামিড গড়ে ওঠার পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষেও সিন্ধু সভ্যতার বেশ কিছু জনপদে ব্যবসা-বাণিজ্যভিত্তিক সভ্যতা গড়ে ওঠে। এ-সময়ে শিল্পসৃজনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়। সিন্ধু সভ্যতায় দালান-ইমারতে কোনো উৎকীর্ণ মূর্তি পাওয়া যায়নি, তবে দৈনন্দিন ব্যবহার্য তৈজসপত্রে যে নকশা পরিলক্ষিত হয়, তা শিল্পীদের রুচিশীলতার প্রমাণ বহন করে। অসংখ্য সিলমোহর, অলংকার, মৃৎপাত্র ও কিছু ভাস্কর্যের সন্ধান পাওয়া যায়, যা উন্নত চিত্ররুচির পরিচয় বহন করে। এ-সময়ের প্রায় সকল সমাজব্যবস্থায় শিল্পকে উচ্চমার্গীয় ভাবা হলেও শিল্পীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত নিচু। পুরোহিত, রাজা, রাজতন্ত্র শাসিত সমাজে শিল্পীদের ওপর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের নান্দনিক বোধের প্রয়োগে অসাধারণ সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন। সিন্ধুসভ্যতা থেকে আধুনিককালের পূর্ব পর্যন্ত ধর্মের আশ্রয়ে শিল্পের এই দীর্ঘ ইতিহাসে শিল্পীদের কোনো নাম পাওয়া যায়নি। বিশেষত ভারতবর্ষের ইলোরার কৈলাশমন্দির স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের এক অভাবনীয় এবং অনন্য সৃষ্টি। এই স্থাপত্যিক নিদর্শনের নির্মাতা হিসেবে রাজা প্রথম কৃষ্ণের নাম উল্লেখ থাকলেও কোনো শিল্পীর নাম উৎকীর্ণ নেই। পরবর্তীকালে রাজা অশোকের সময় বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রচার শুরু হয়;

এ-সময়ে আফগানিস্তানসহ ভারতবর্ষে বুদ্ধের বৃহদায়তন ভাস্কর্য ব্যাপক আকারে নির্মিত হতে থাকে। মূলত গুপ্তযুগেই স্থপতি, প্রতিমাকার, চিত্রকর ধর্ম তথা সামন্তবাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। শিল্পকলার অগ্রগতিতে গুপ্তযুগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ষোড়শ শতকে মুঘল ও রাজপুত দুই বিশেষ ধারার চিত্রকলার বিকাশ ঘটে ভারতবর্ষে; এ ক্ষেত্রে মুঘল পৃষ্ঠপোষক একটি রাজবংশ। সম্রাট আকবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত এক একটি সময়ে তাঁদের অভিরুচি অনুযায়ী শিল্পকলার গতি এগিয়েছে। অন্যদিকে রাজস্থান ও পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে রাজপুত ছবির বিকাশ ঘটেছিল। সম্রাট এবং হিন্দু-পারসিক শিল্পীদের সম্মিলিত উদ্যোগে মুঘল আমলে ধর্মনিরপেক্ষ, প্রাত্যহিক জীবনাচরণ, স্বতঃস্ফূর্ত অলংকরণসমৃদ্ধ চিত্রকলা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। পরবর্তীকালে ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে তখন স্বভাবতই শিল্পীরা নতুনভাবে তাঁদের পৃষ্ঠপোষক খুঁজতে শুরু করেন। এ-সময়ে ইংরেজদের ধনিক শ্রেণি তাঁদের অভিরুচি অনুযায়ী শিল্পীদের ছবি আঁকাতে নিযুক্ত করেন। আর্ট স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। ইংরেজ শিল্পীদের আনাগোনায় ব্রিটিশ রীতিতে ভারতীয় জীবন-নিসর্গ অঙ্কন শুরু হয় তখন। বাঙালি শিল্পীদের চিত্রকর্ম বিপুল পরিমাণে বিক্রি ও সংগৃহীত হতে থাকে। বাঙালির শিল্পবোধ এবং ভাবনা পাশ্চাত্য আদর্শে গড়ে ওঠে; তবে চিত্রকলার উন্মেষের ধারাবাহিকতায় ভারতীয় চিত্রকলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য প্রাতিষ্ঠানিক রীতিতে এবং পৃষ্ঠপোষকদের সহায়তায় এক নতুন ভিত্তিভূমিতে অধিষ্ঠিত হয়। পুঁজিবাদী সমাজে প্রত্যেক মানুষ সমাজের মুখোমুখি একা। রোমান্টিসিজমের অসংলগ্নতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে পুঁজিবাদ বিকাশের পরপরই। জার্মান রোমান্টিক শিল্পী নোভালিস বলেছিলেন, ‘ব্যবসার জীবনীশক্তিই হলো পৃথিবীর জীবনীশক্তি। এ এক বিস্ময়কর জীবনীশক্তি, খাঁটি এবং সরল। এ শক্তি সকল বস্তুর প্রাণসঞ্চার করে, তাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। জন্ম দেয় শহর এবং দেশ, জাতি এবং শিল্পকর্ম। এই হলো সংস্কৃতির জীবনীশক্তি, মানবজাতির পূর্ণতার জীবনীশক্তি।’ শিল্পবস্তুর সঙ্গে হাজার সামাজিক সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে, যা তার নিজ চরিত্র, নিজ যুগ, নিজ জাতি ও নিজস্ব প্রতিভা থেকে উদ্ভূত।

শিল্পীর সৃষ্টিতে ব্যক্তিগত, জাতিগত প্রতিভাই ব্যক্ত হয়। উনিশ শতকের শেষের দিকে ঠাকুর পরিবারের স্পষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা উপমহাদেশের শিল্পকলার স্বকীয়তাকে দ্যুতিময় করে তোলে। বাংলাদেশে ১৯৪৮ সালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ধীরে ধীরে শিল্পকলার প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং ধনিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায়

এদেশেও শিল্পের অগ্রগতি সম্ভবপর হয়েছে। কোনো শিল্পকর্মের মূল্য নির্ধারণ কঠিন; তবে পৃষ্ঠপোষক বা সংগ্রাহক শিল্পীদের অনুপ্রেরণার অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগ তেমন কার্যকর না হলেও বেশ কিছু বেসরকারি উদ্যোগ সময়ের প্রেক্ষিতে বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে চলছে। ‘বেঙ্গল ফাউন্ডেশন’ এমনই একটি শিল্পানুরাগী পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান। মানুষ সময় এবং পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; চিত্রকলা সময়ের দিনলিপি। সময়, পরিবেশ, অভিজ্ঞতা, স্ব-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ তীব্র বলেই এই ফাউন্ডেশনটি আজ আমাদের শিল্পকলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাঙালির সংস্কৃতিকে আরো সৃজনশীল করে তোলার নানামুখী তাগিদ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বাংলাদেশের এক দীর্ঘ সময় কেটে গিয়েছে। তবে আমাদের শিল্পকলার পটভূমি খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি; পরবর্তী সময়ে সংস্কৃতমনা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে এসেছেন আমাদের শিল্পের পথকে সমৃদ্ধ এবং দীর্ঘতর করতে। এভাবেই বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। শিল্পকলা বিশেষত চিত্রকলার উন্নয়নে বেঙ্গলের নিবেদন বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলাদেশের শিল্পকলার প্রতি অনুরাগ আন্তরিকতায় স্বল্প সময়ে এক স্থায়ী আসন করে নিয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। শিল্প-সংস্কৃতির নানান দিক নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বেঙ্গল। এই অগ্রযাত্রায় তারা চিত্রকলাকে এক বিশেষ স্থানে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। শিল্পের বিকাশে নিজস্ব সংস্কৃতির মৌলিকত্ব সংরক্ষণ নিয়ে সচেষ্ট ছিল তারা শুরু থেকেই।

বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস্রে যাত্রা ২০০০ সালের এপ্রিল মাসে। দেশের বরেণ্য শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার একক চিত্রপ্রদর্শনীর মাধ্যমে বেঙ্গল শুরু করেছিল তাদের গ্যালারির আয়োজন। বাংলাদেশের শিল্পকলায় যাঁর অবদান অনস্বীকার্য সেই প্রথিতযশা শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার একক প্রদর্শনী দেখার বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছিল এই চিত্রশালায়। শুরু থেকেই তাদের সৃষ্টিশীল ভাবনা, সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শিল্পের বিস্তীর্ণ ভূমিকে আরো বিস্তৃত করে তুলবে বলে আশাবাদ তৈরি হয়। ইতোমধ্যেই বেঙ্গল শিল্পালয় পার করেছে দশ বছর। দীর্ঘ দশ বছর বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস্ নানাভাবে এদেশের শিল্পক্ষেত্রে অবদান রেখেছে; সবসময় এই পথ এত মসৃণ হয়নি, তবুও তাদের নিষ্ঠা, দায়িত্ব, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা, জীবনের সব চড়াই-উতরাই পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া নিরলসভাবে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবুল খায়ের। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে চিত্রকলার অবিসংবাদিত সব শিল্পীর চিত্রকর্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেজ, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, এস এম সুলতানের কাজ রয়েছে তাঁর সমৃদ্ধ তালিকায়। এই সব প্রসিদ্ধ শিল্পীর চিত্রসম্ভারে বেঙ্গল আয়োজন করেছিল এক বৈচিত্র্যময় প্রদর্শনী। গুরু শিল্পীদের চিত্রকর্মের চমৎকার এক প্রদর্শনী মোহিত করেছিল এ দেশের শিল্পানুরাগীদের।

শিল্পীদের ভাবনাবিনিময়ের জন্য বেঙ্গল আয়োজন করে নানান পরিসরে আর্ট ক্যাম্প; বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের অংশগ্রহণে সমকালীন বাঙালি শিল্পীদের কর্মশালা, কনটেম্পোরারি এশিয়ান আর্ট ওয়ার্কশপ, নবীন ও মূলধারার বাইরের শিল্পীদের নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল জলরং কর্মশালা। এসব কর্মশালা ও প্রদর্শনীর প্রাপ্তি অনেক; নবীন-প্রবীণ-প্রতিভাবান শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয়, নতুন জিজ্ঞাসা, ভাবনাবিনিময় শিল্প পথযাত্রীদের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস্ ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহায়তায়  আয়োজন করেছিল হেনরি মুরের প্রিন্ট এবং ভাস্কর্য প্রদর্শনী। এ ধরনের চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজন করা সবসময় সহজ নয়, দেশের বাইরে আয়োজন করা বা দেশে ভিনদেশি শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রদর্শন করাও দুরূহ; এক্ষেত্রে তাদের এই আয়োজন নিঃসন্দেহে দর্শক-শিল্পী-বোদ্ধাদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

শিল্পবিশ্বে আমাদের শিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। কলকাতা, মুম্বাই, দুবাই, সিঙ্গাপুর, আমেরিকায় আর্ট ফেয়ারে সীমিত পরিসরে হলেও বাংলাদেশের জন্য স্টল নিয়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিল। বাংলাদেশের শিল্পকলার ক্ষেত্রে তাদের এই তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন ভবিষ্যৎ শিল্পীদের আশাবাদী করে তুলছে প্রতিনিয়ত। তাদের সর্বশেষ উদ্যোগে ভেনিস বিয়েনালে বাংলাদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে যা সহায়তা প্রয়োজন ছিল তা তারা করেছে।

দশ বছরের এই পথ পরিক্রমণে বেঙ্গলের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার এতটাই শক্তিময় যে বাংলাদেশের শিল্পকলাকে আরো প্রসারিত করার উদ্যোগ ফলপ্রসূ করতে পারবে। যুগে যুগে শিল্পকলা এগিয়েছে শিল্পী-রসিক-পৃষ্ঠপোষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ও আন্তরিকতার ছোঁয়ায়। বেঙ্গল তার শিল্পানুরাগী মননে বাংলাদেশের শিল্পের পথে এগিয়ে চলাকে আরো মসৃণ করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস ও প্রত্যাশা।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশন শিল্পচর্চার পথে এই দশ বছরকে উদ্যাপনের লক্ষ্যে ‘সৃজনে শেকড়ে’ শিরোনামে বছরজুড়ে দশটি আয়োজনের মাধ্যমে তাদের নির্বাচিত একশজন শিল্পীর চিত্র-প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই প্রদর্শনীগুলোতে দেশের বরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ শিল্পীদের শিল্পকর্ম দেখার সুযোগ তৈরি হয়। প্রথম প্রদর্শনীতে এদেশের শিল্পকলার প্রথম সারির শিল্পীদের সম্মিলন ঘটেছে;

শিল্পচর্চার অগ্রগণ্য পথিক শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের বাস্তববাদী চিত্রকর্ম এদেশের শিল্পকলায় ভিন্ন উত্তরণ ঘটিয়েছে।

তাঁর উড এনগ্রেভিংয়ে কাঠের বিভিন্ন রূপে ব্যবচ্ছেদ, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অভিব্যক্তি শিল্পীর অন্তঃপুরের রহস্যকে ব্যাপ্ত করে। মানুষ-জীবন, নিসর্গের

আলো-আঁধারি-প্রকৃতির বহুভঙ্গিম রূপ – এসবের মাঝেই শিল্পভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন।

বাংলাদেশের বিমূর্ত শিল্পকলার প্রাণপুরুষ শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার রূপময় পৃথিবী দেখার সুযোগ ঘটে ‘সৃজনে শেকড়ে-১’ প্রদর্শনীতে। শিল্পী ধূসর রঙের ঘোরেই এঁকেছেন জীবনের নানা অভিজ্ঞতার ছবি। স্পেস, রঙের পরিমিত ব্যবহার, রেখা, টেক্সচার সব মিলে তৈরি হয় অদ্ভুত এক অধ্যাস। যেখানে রয়েছে মাটিময় গন্ধ, রঙের নিঃসঙ্গতা, জটিল জীবনের শূন্যতা; ধূসর, সাদা, কোবাল্ট, অকার, ব্ল্যাক অথবা বার্ন্ট আম্বার দর্শকের দৃষ্টিকে নতুন পৃথিবীতে নিয়ে যায়। শিল্পীর সংবেদনশীল মন দর্শকের মাঝে শূন্যতার অভিব্যক্তি ছড়িয়ে দেয়। শিরোনামহীন বিমূর্ততায় আকার, বুনট, রেখা চেতনাকে রহস্যময় করে তুলেছে।

শিল্পী মুর্তজা বশীর ‘উইংস’ সিরিজের চিত্রকর্ম বরাবরের মতোই দর্শক-সমাদৃত হয়। তাঁর দ্বিমাত্রিক পরিসরে সরলীকরণের অনুভব ধরা দেয় স্বভাবসিদ্ধরূপ ব্যঞ্জনায়। রঙের মাধুর্য, কম্পোজিশনের বৈচিত্র্য সর্বোপরি জীবনঘনিষ্ঠতায় মুর্তজা বশীরের কাজ দর্শকদের আলোড়িত করে।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ‘হোমেজ টু এমব্রর্ডাড কোয়ার্ট’ শিরোনামের শিল্পকর্মে প্রকৃতির শুদ্ধতা উপস্থিতি প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। ভারমিলিয়ন রেড, কোবাল্ট ব্লু, স্যাপ বা ভিরিডিয়ান গ্রিন, টিটেনিয়াম হোয়াইট শিল্পীর নিজস্ব শৈলীকে নতুন করে বিনির্মাণের কুশলতায় আবৃত। স্পেসে রং, রেখার উপস্থাপনার দক্ষতা, ছন্দোময় অনুভব, মনোভঙ্গি শিল্পী কাইয়ুমের সৃজনচৈতন্যকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর অবশ্যই মনে করিয়ে দেয় বাংলার শ্যামল মুখের চিরায়ত রূপভঙ্গি।

শিল্পী রফিকুন নবী স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দেন তাঁর ক্যানভাসে। জীবনযাপনের সরলতা, অবয়ব, প্রকৃতি, সময় – আকণ্ঠ পাওয়া যায় তাঁর শিল্পকর্মে। রঙের দৃষ্টিনন্দন ব্যবহারের মুন্শিয়ানায় সাবলীল রেখার বিচরণে তৈরি হয় বিস্ময়কর সুন্দর জগৎ। দর্শকদের অপার্থিব জগতের ইঙ্গিত তিনি মাঝে মাঝেই দাঁড় করিয়ে দেন রুদ্র বাস্তবতার সামনে। বিখ্যাত ‘টোকাই’-এর স্রষ্টা রফিকুন নবী কখনই বিস্মৃত হন না তাঁর যাপিত জীবনের সাতকাহন।

এছাড়া সৈয়দ জাহাঙ্গীর, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, মাহমুদুল হক ও শিল্পী শাহাবুদ্দিনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘সৃজনে শেকড়ে-১’ প্রদর্শনীটি হয়ে উঠেছিল কলারসিকদের জন্য উপভোগ্য ও অবশ্য দ্রষ্টব্য বিষয়। বেঙ্গল শিল্পালয়ের আয়োজনে এমন সৃজনশীল ভাবনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং বাংলার শিল্পবিকাশের গতিধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এদেশের শিল্পকলা বৈচিত্র্যসন্ধানী হয়েও প্রাণময় হয়ে উঠেছে তার উপলব্ধির জন্য এই প্রদর্শনীগুলো এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

শিল্পী ফরিদা জামান ‘সৃজনে শেকড়ে-২’ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী একজন শিল্পী। তিনি প্রকৃতিকে উপলব্ধি করেন একান্ত নিজের মতো করে। তাঁর জীবনদর্শনে প্রকৃতির সরলতা প্রতীকী বারতায় উপস্থাপন করেন। তিনি সাধারণ দর্শকের এবং সমালোচকের আকাক্সক্ষা পূরণে সক্ষম হয়েছেন সর্বদা। তাঁর চিত্র পরিসরে স্নিগ্ধ বর্ণের ব্যবহার, আঙ্গিকের সৌন্দর্য দর্শককে তাড়িত করে, সৌন্দর্যবোধকে আলিঙ্গন করে শিল্পী ফরিদা জামানের ক্যানভাসে স্পেসের সুচিন্তিত ব্যবহার দর্শনেন্দ্রিয়কে পরিতৃপ্ত করে।

এ-সময়ের অন্যতম প্রধান শিল্পী রোকেয়া সুলতানা; তাঁর চিত্রকর্মে এসেছে বিষয়কেন্দ্রিক ভাবনা, প্রতীকী আকারে নানা রূপকের ব্যবহার এবং বাস্তবধর্মী নানা উপাদান। এছাড়া তাঁর ছবিতে উঠে আসে ব্যক্তিগত জগতের দুঃখবোধ, আবেগপ্রবণ অনুভূতি, নারীর একাকিত্ব এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাঁর চিত্রপট আবেগময়, তরল এবং একাধিক মাত্রার। রঙের প্রয়োগ বর্ণনাতীত। বিমূর্ত চিত্রপটের ওপর সরল ভঙ্গিতে আঁকা ড্রইংধর্মী ফিগারগুলোতে ভঙ্গিতে নিশ্চয়তা ও অনিশ্চয়তার মিশ্রণ বিদ্যমান, যা বৃহৎ অনুভূতির নির্দেশক।

শিল্পী ঢালী আল মামুনের চিত্রকর্মে স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় দেখা যায়। সামাজিক ইতিহাসও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে অভিজ্ঞতাকে স্পর্শ করে। তাঁর ক্যানভাস বাহুল্যবর্জিত। তিনি অতি পরিচিত বাস্তব-জীবনের জটিলতা অবলীলায় উপস্থাপন করেন।

‘সৃজনে শেকড়ে-২’-এ আরো অংশগ্রহণ করেছেন – সমরজিৎ রায়চৌধুরী, আবদুল মুক্তাদির, কালিদাস কর্মকার, শহিদ কবীর, আবদুস শাকুর শাহ, কাজী গিয়াসউদ্দিন, মোহাম্মদ ইউনুস প্রমুখ।

শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য। সমাজসচেতন ও রাজনীতিমনস্ক আমাদের বিরল শিল্পীদের মাঝে তিনি অন্যতম। তাঁর শিল্পকর্ম অনিয়ম, অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সততই তেজোদ্দীপ্ত এবং বিদ্রোহী। জীবনবোধের গভীরতা, সমাজবাস্তবতার সাবলীল প্রকাশ ও চেতনার চাবুকে হিস্ হিস্ করে ওঠে তাঁর সাদা-কালো ক্যানভাস। শিল্পের দায় এবং শিল্পীর দায়িত্ববোধ ভুলতে বসা সময়ে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।

‘সৃজনে শেকড়ে-৩’-এ এছাড়া ছিলেন – মুস্তাফা মনোয়ার, আবু তাহের, আবুল বারক আলভী, স্বপন চৌধুরী, অলক রায়, রণজিৎ দাস, নাসরিন বেগম, কনক চাঁপা চাকমা।

‘সৃজনে শেকড়ে-৪’-এ অংশগ্রহণ করেছেন মোস্তাফিজুল হক। তাঁর শিল্পকর্মে বিমূর্ততা নতুন মাত্রা তৈরি করে। বস্তু থেকে নির্বস্তুক ভাবনার পথ সরল নয়; পূর্ববর্তী কাজে বিষয়, ভাবনা, প্রয়োগ, বিন্যাসের আধিক্য দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবর্তন এসেছে। তিনি সীমিত রেখা, রং, আকার, গড়ন, আলোছায়ার মাধ্যমে পরিসরকে নতুনভাবে সৃজন করেছেন। মৌলিক সৌন্দর্য নিজস্ব স্বরূপে ফুটিয়ে তুলেছেন চিত্রপটে।

এছাড়া ছিলেন – মনসুরুল করিম, চন্দ্রশেখর দে, অলকেশ ঘোষ, কেএমএ কাইয়ুম, খালিদ মাহমুদ মিঠু, দিলারা বেগম জলি, শেখ আফজাল হোসেন ও মাহবুবুর রহমান।

‘সৃজনে শেকড়ে-৫’-এ অংশগ্রহণ করেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান, রেজাউল করিম, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, বীরেন সোম, হাসি চক্রবর্তী, তরুণ কুমার ঘোষ, ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ, আহমেদ নাজির, রফি হক ও তোসাদ্দেক হোসেন দুলু।

‘সৃজনে শেকড়ে-৬’-এ অন্যতম সুপরিচিত শিল্পী ওয়াকিলুর রহমানের চিত্রপটে অর্বাচীন শূন্যতা রূপকল্পের মতো ভেসে বেড়ায়। রাজনীতি-সমাজ ভাবনা-অভিজ্ঞতা, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে শিল্পশিক্ষা অনুরণিত করে তাঁর শিল্পভাবনাকে। বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তাঁর মৌলিক ভাবনায় নতুন দৃশ্যপট বিনির্মাণ করে চলেছে।

এছাড়া আরো ছিলেন নাসিম আহমেদ নাদভী, গোলাম ফারুক বেবুল, আহমেদ শামসুদ্দোহা, সাইদুল হক জুইস, আতিয়া ইসলাম এ্যানি, মোঃ মনিরুজ্জামান, রনি আহম্মেদ, মোহাম্মদ ইকবাল, মুস্তফা জামান প্রমুখ।

নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা ‘সৃজনে শেকড়ে-৭’-এ অংশগ্রহণ করেছেন;

নারী-ভাবনা তাঁর কাজের প্রধান অনুষঙ্গ। ক্রমাগত সামাজিক অবক্ষয়ের মুখে প্রিমার সংবেদনশীল মনন প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে শিল্পকলায়। নারী কখনো শক্তি, কখনো নিষ্পেষিত মানবগোষ্ঠীর অংশ। শিল্পী নারীর অপলক চোখে, বাকরুদ্ধ অবয়বে, দুঃখ বা সুখের অন্বেষণ না করে ভীষণভাবে প্রতিবাদী অভিব্যক্তি প্রতিফলিত করেন। নারীর অবস্থানগত বৈষম্য, সামাজিক অবক্ষয়, দৈন্য, অসমতা দৃশ্যমান করে চিত্রভাষায় প্রতিভাত করেন তিনি।

‘সৃজনে শেকড়ে-৭’-এ অংশগ্রহণ করেছেন – ইবরাহীম, কুহু, সৈয়দ হাসান মাহমুদ, নাজমা আকতার, মুর্শিদা আরজু আল্পনা, গুলশান হোসেন, গৌতম চক্রবর্তী, শামসুল আলম আজাদ ও দেওয়ান মিজান,

‘সৃজনে শেকড়ে-৮’-এ যাঁরা ছিলেন – মোহাম্মদ মোহসীন, ইফ্ফাত আরা দেওয়ান, মোমিনুল ইসলাম রেজা, আনিসুজ্জামান

কাজী রকিব, ফারেহা জেবা, মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, লায়লা শারমিন, শাহজাহান আহমেদ বিকাশ, আনিসুজ্জামান ও মাকসুদা ইকবাল নিপা।

নাজলী লায়লা মনসুর ‘সৃজনে শেকড়ে-৯’-এ অংশগ্রহণকারী অন্যতম উল্লেখযোগ্য শিল্পী। একজন শিল্পী হিসেবে, সর্বোপরি আমাদের সমাজের একজন নারী হয়ে কী করণীয় তার সিদ্ধান্তে আসতে নাজলী লায়লাকে বাড়তি কিছু করতে হয়নি বলা যায়। তাঁর চিত্রকলায় এ পর্যন্ত যে জগৎ বা পরিধি তৈরি হয়েছে  সেখানে আমাদের সমাজে আমাদের নারীদের অবস্থান, আনুষঙ্গিক ভাবনা-চিন্তা পরিলক্ষিত হয়। সামাজিক এই অবক্ষয়ে নাজলী অসহায়, তাঁর এ ধরনের চিত্রকর্মে সমাজ বদলে যাবে না, সেই ক্ষোভ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। নারী চরিত্র একটি বিশেষ তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে নাজলী লায়লার কাজে। কোমল সহমর্মী ব্যঞ্জনাময় নারী চরিত্র আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে অন্তর্দহন ও প্রকৃতির সম্মিলনে উপস্থিত হয়।

প্রদর্শনীতে ‘সৃজনে শেকড়ে-৯’-এ অংশগ্রহণ করেছিলেন নজীব মোহাম্মদ, রেজাউন নবী, মোখলেসুর রহমান, নিলুফার চামান, কাজী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমিরুল মোমেইন চৌধুরী, মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান, তৈয়বা বেগম, গোলাম রব্বানী প্রমুখ।

তৈয়বা বেগম লিপির দ্বিমাত্রিক তল পরিবর্তিত হয় বিষয়বস্তুর স্পর্শকাতরতায়। অনুভূতির অবরুদ্ধ মনোভূমি অব্যক্ত নারীর অস্তিত্বের চৈতন্যকে ধারণ করেন শিল্পের শক্তিতে। সৃজনপ্রিয় এই শিল্পী

দুঃসহ-বিদীর্ণ-ক্ষয়িষ্ণু দোলাচলে বহমান জীবনের গতিকে স্পষ্ট করে তুলেছেন নিরীক্ষার কৌণিক অবস্থান থেকে।

বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস্-এর দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তাদের নিয়মিত প্রদর্শনীর সর্বশেষ ‘সৃজনে শেকড়ে-১০’; এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের খ্যাতিমান শিল্পী আমিনুল ইসলামের অংশগ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। শিল্পানুরাগীদের সুযোগ হয়েছে তাঁর শিক্ষাজীবনের দুর্লভ শিল্পকর্ম দেখার। বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসের প্রবাদপুরুষ হিসেবে স্বীকৃত শিল্পী আমিনুল ইসলাম। শিল্প সৃজনে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং নিরীক্ষাপ্রবণতা তাঁর মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে। সুনির্দিষ্ট তত্ত্বকে আঁকড়ে না ধরে নিজের সত্তাকে বিকশিত করতে তাঁর ক্যানভাস রঙিন হয়ে ওঠে। আমিনুল ইসলামসহ সমসাময়িক শিল্পীদের দায়বোধ তীব্র হয় ভাষা আন্দোলনের সময়ে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, বেয়োনেট, রাইফেল, অবিশ্বাস্য নির্যাতন, হতাশা, মুক্তির আকাক্সক্ষা, প্রতিরোধ – এসব সংশ্লেষিত হয়ে শিল্পের বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়। শিল্পী এই আঘাত-ক্ষত-অভিজ্ঞতায় তাঁর ক্যানভাসে সাবলীলতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর সৃজনচৈতন্যকে।

এই প্রদর্শনীতে আরো অংশগ্রহণ করেছেন – এএসএম মুস্তফা জামিল আকবর, কাজী সাঈদ আহমেদ, সুলেখা চৌধুরী, সৈয়দ জাহিদ ইকবাল, শাফিন ওমর, সরকার নাহিদ নিয়াজী, শহিদ কাজী, বিশ্বজিৎ গোস্বামী, এম এম ময়েজউদ্দিন প্রমুখ।

বছরজুড়ে ‘সৃজনে শেকড়ে’ শিরোনামে বেঙ্গল শিল্পালয়ের ১০টি প্রদর্শনীর মাধ্যমে ১০০ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রাণভরে উপভোগ করার সুযোগ হয়েছিল শিল্পানুরাগী দর্শকের। যে-কোনো বিবেচনায়ই এই উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে।

তবে কিসের ভিত্তিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের এই শিল্পী নির্বাচন তা নিয়ে নানা মতবিরোধ রয়েছে। ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পীদের অংশগ্রহণের আধিক্য হতাশা বাড়িয়েছে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিল্পীদের। সবসময়ই দেখা যায়, রাজধানীতে সুযোগ বেশি, তাই বেঙ্গল এক্ষেত্রে ভিন্ন উদ্যোগ নিতে পারতো। এমনকি তরুণ শিল্পী নির্বাচনের জন্য শিল্পকর্ম বাছাইয়ের পরিকল্পনা করা যেতো। এছাড়া তরুণ শিল্পীদের শিল্পকর্মের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিল্পবোধের গভীরতা, শিল্পের নিগূঢ় তাড়না,  শিল্পভাবনার সঙ্গে একাত্মবোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।  বেঙ্গলের এই শিল্পযাত্রায় নিরীক্ষা-সম্ভাবনা-পূর্ণতা-মান ইত্যাদি বিবেচনার মতো বিষয়াবলিতে আরো যতœবান হলে উপকৃত হতো এ দেশের শিল্পকলা। শিল্প শিল্পের জন্য না জীবনের জন্য – এই বিতর্ক রয়েই যায়; তবে শিল্পীর আত্মতুষ্টির প্রবণতা-ফরমায়েশি ছবির বাজার তৈরি – শিল্পকে পণ্যের মতো বিবেচনা-বিশ্লেষণহীন প্রশংসা – শিল্পের মান ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্নও করে।

তবে সবকিছুর ভার সময়ের হাতে আর বর্তমানের বিবেচনার জন্য রয়েছেন বাংলার আপামর শিল্পী-দর্শক-সমালোচক।

বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন যে পথনির্মাণ করেছেন তার কাক্সিক্ষত বাস্তবায়নে এমন ব্যক্তিগত-প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রশংসনীয়। শিল্প অভিরুচি তৈরি, শিল্পের বাজার সৃষ্টি, শিল্পানুরাগী দর্শকের অভিষেক এবং সংগ্রাহক সৃষ্টি করে শিল্পীদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিল্পচর্চার এমন ধারাবাহিক উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরির জন্য বেঙ্গল শিল্পালয় আমাদের শিল্প-ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

*