logo

সিনেমা : কী দেখি কীভাবে দেখি

ই রা বা ন  ব সু রা য়
অন্য যে-কোনো শিল্পের তুলনায় সিনেমা অনেক বেশি বাস্তবের বিভ্রম তৈরি করতে পারে। সেক্ষেত্রে চব্বিশটি ফ্রেম এই বিভ্রমকে দেয় এক যাথার্থ্যরে মহিমা, অর্থাৎ বানানো সত্যকে করে তুলতে চায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সব শিল্পই বানিয়ে-তোলা, সেই বানানোর কারিগরি সিনেমায় এতটাই দক্ষ যে, যাচাই করার প্রবণতাকে তা বেশ কিছুটা সময় দমিয়ে রাখতে পারে, বদলে তৈরি করতে পারে এক বিশ্বাসের আবহ। গল্পে-উপন্যাসে-নাটকে চরিত্রগুলোকে পাঠকের কল্পনায় তৈরি করে নিতে হয়, লেখকের সঙ্গে পাঠকের সংঘাত-সমন্বয়ের একটা দ্বন্দ্ব সেখানে চলতেই থাকে। সিনেমায় কল্পনার সেই জায়গাটুকু নেই, চরিত্র, তাদের পরিবেশ, সামাজিক অবস্থান সবই দর্শকের সামনে পরিচালক হাজির করে দিচ্ছেন, দর্শকের কাজ শুধু দেখে যাওয়া, অন্যরকম কিছু ভাবার সুযোগ তাঁর নেই। তাহলে এই এক শিল্প যেখানে রচয়িতার কাছে উপভোক্তা সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, দর্শকের বিকল্প ভাবনার জায়গাটা আগেই আটকে দেওয়া হচ্ছে; কেননা পর্দায় দর্শক যা দেখছেন, সেটা তাঁর কাছে পৌঁছছে এক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিভ্রম নিয়ে। এবং এই বিভ্রম এতটাই শক্তিশালী যে, অনেক সময় তা বাইরের জগতের চোখে-দেখা বাস্তবতাকেও অতিক্রম করে যায়।
যায় যে, তার দায় অবশ্য পুরোটাই সিনেমার রচয়িতাদের নয়। দর্শকও এই বিভ্রমের মধ্যে ঢুকে পড়ার জন্য মনে মনে তৈরি থাকেন। কেননা তাঁর একটা পালানোর জায়গা দরকার – অন্যের কাছ থেকে তো বটেই, নিজের কাছ থেকেও। দর্শক যখন সিনেমা দেখতে ঢুকছেন, বাইরের পরিবেশকে সম্পূর্ণ ভুলতে চাইছেন তিনি। আসনে দর্শক, সামনে পর্দা, বাকি সব অন্ধকার। ওই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে দর্শক একই সঙ্গে একা এবং জনতার অংশ। এখন প্রযুক্তিবিদ্যা অবশ্য সিনেমা দেখার ধরনটাকে বদলে দিয়েছে, ডিভিডির সুবাদে দর্শক আর সিনেমা হলে যান না। তাঁর ঘরে বসেই কফিতে চুমুক দিতে দিতে তিনি পছন্দমতো সিনেমা দেখতে পারেন, ছবির ধ্বনি বা ঔজ্জ্বল্য কমাতে-বাড়াতে পারেন, মাঝখানে বন্ধ করে দিয়ে নিউজ চ্যানেলে গিয়ে খবর শুনতে পারেন, ফোন ধরতে পারেন, অতিথি-অভ্যাগতদের সঙ্গে আড্ডা মেরে নিতে পারেন, এসব কিছু না থাকলেও সিনেমাটিকে ভাগে ভাগে দেখতে পারেন। সিনেমা হলে যে-দর্শক যান, তাঁর এই স্বাধীনতা বা স্বেচ্ছাচারের অধিকার থাকে না। ঘরে বসে যিনি ডিভিডি দেখছেন, তিনি একেবারেই একা, ঘরও অনেক সময় আলোকোজ্জ্বল থাকে, প্রথম থেকেই তিনি যেন কোনো বিভ্রমের শিকার হতে চান না। অর্থাৎ যিনি ঘরে বসে ডিভিডি প্লেয়ারে কোনো সিনেমা দেখছেন, তিনি এক অর্থে স্বাধীন, তাঁর দেখাটা তাঁরই ইচ্ছাধীন। তিনি কীভাবে দেখবেন এবং কতটা দেখবেন, সেটা তিনি ঠিক করতে পারবেন দেখা শুরু করার পরেও। এই দর্শক যদি সিনেমাকে বিনোদন হিসেবে নিতে চান, তাহলে সে-বিনোদনের কতটুকু তিনি উপভোগ করবেন, কতটা করবেন না, এই বাছাইয়ের স্বাধীনতা তাঁর আছে বলে তিনি একভাবে উপেক্ষা করতে পারছেন নির্দেশকের প্রভুত্বকে। নির্দেশকের নির্মাণকে তিনি বদলে নিতে পারছেন, অংশবিশেষ ছেঁটে দিতে পারছেন, এমনকি বিন্যাসের অদলবদলও ঘটাতে পারছেন। আর দর্শকের কাছে সিনেমা যদি শিল্প হয়, তবে সে-শিল্পকে অনুভব করার, বিচার করার অগাধ সময় তাঁর আয়ত্ত, বইয়ের মতোই তিনি তখন সিনেমাকে উলটে-পালটে পড়তে পারবেন। সিনেমা তাঁর ব্যক্তিগত পাঠের বিষয়। টেকনোলজির বিকাশ তাঁকে এই সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু টেকনোলজিকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে এই দর্শক ভুলে যান এই দর্শন বা পাঠের প্রক্রিয়ায় তিনি একক এবং বিচ্ছিন্ন। সিনেমা হলের অন্ধকারে ‘বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’ হওয়া নয়, নিজের ঘরে আলোর মধ্যে একা হয়ে যাওয়া। কিন্তু বই পড়ার সঙ্গে সিনেমা দেখার একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। বই পাঠককে এক বাস্তব নির্মাণে প্ররোচিত করে, পাঠক তাঁর ভাবনাকে নানা দিকে ছড়িয়ে দিতে পারেন। সিনেমা সে-সুযোগ দেয় না, সে এক নির্মিত বাস্তবকে দর্শকের সামনে তুলে ধরে। সে-বাস্তবকে চ্যালেঞ্জ জানানো যেতে পারে, কিন্তু বইয়ের মতো পাঠকে অবলম্বন করে কোনো বিকল্প বাস্তব তৈরি করা যায় না।
ওই যে নির্মিত বাস্তবের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে দর্শককে, তার মোকাবিলা কীভাবে করবেন দর্শক? সিনেমা হলে এই দর্শক অনেকের মধ্যে একজন, তাঁর ভালোলাগা, মন্দলাগা, তাঁর প্রশংসা-সমালোচনা ব্যক্তিক হলেও তা এক সর্বজনীন অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসে। সিনেমা হল থেকে যখন বেরিয়ে আসেন এই দর্শক, কিংবা তার আগেই পর্দায় ‘সমাপ্ত’ ফুটে ওঠার পরই যখন হলের আলোগুলো জ্বলে ওঠে তখনই পর্দায় প্রতিফলিত জগতের সঙ্গে তাঁর নিজের, চারপাশের জগতের একটা বিচ্ছেদ তিনি টের পেতে শুরু করেন, রাস্তায় পা দিয়ে প্রবল আলোর নিচে একটু আগের দেখাটাকে মনে হতে থাকে মায়া, তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় তাঁর আত্মবীক্ষণ। যিনি ডিভিডি প্লেয়ারে সিনেমা দেখছেন তাঁর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। ওই মায়ায় মজে যাওয়ার অবকাশটা তিনি পাচ্ছেন না, তাঁর চারপাশে প্রতিমুহূর্তের ঘরগেরস্তালির চলনটা থেকেই যাচ্ছে, কখনই তিনি তাঁর থেকে সরে থাকছেন না। ফলে তাঁর সিনেমা দেখাও ওই চলনেরই একটা অংশ হয়ে যায়। সিনেমা কোনো মায়া তৈরি করে না, কাজেই সেই মায়া ভেঙে যাওয়ারও কোনো ধাক্কা তৈরি হয় না। ফলে   যে-স্বাধীনতার আনন্দ পাচ্ছিলেন দর্শক, সেই স্বাধীনতা একটা যান্ত্রিক অভ্যাসে পরিণত হয়ে যেতে পারে। সিনেমা হলে শব্দ প্রক্ষেপণের গাম্ভীর্য আর পর্দায় চরিত্রগুলোর জীবনের চেয়ে মাপে বড় উপস্থিতি দর্শককে প্রতিমুর্হূতে এক ধাঁধায় ফেলে দেয়, সম্ভব-অসম্ভবের দ্বন্দ্ব দেখার সময়টাতেই এক গোপন অস্বস্তির জন্ম দেয়। আর এই অস্বস্তি, ওই ধাঁধা শিল্পের পক্ষে এক জরুরি শর্ত, আবেশ এবং আবেশ থেকে বেরিয়ে আসা এই দুই বিপরীতমুখী সত্যের সংযোগ ও সংঘাত ছাড়া শিল্পকে অনুভব করা যায় না। একলা ঘরে বসে যিনি সিনেমা দেখছেন, তিনি দর্শক কিন্তু দ্রষ্টা নন, তাঁর দেখার পরিবেশ মানসিক সংঘাতের জায়গাটা আটকে দেয়, দিতে পারে। সিনেমা দেখার জন্য তাঁর কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না, দেখা হয়ে যাওয়ার পরও দৈনন্দিনে ফিরে যেতে কোনো অসুবিধা হয় না তাঁর। হয়তো এও এক মানসিক স্বাধীনতা, যদিও সে-স্বাধীনতা শিল্পবোধের জন্য কোনো জায়গা ছাড়ে না। আসলে সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাওয়া মানে দেখাটা সেখানে একটা ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়, দৈনন্দিনের রুটিনের মাঝখানে সেটা একটা অন্য অভিজ্ঞতা। আর ঘরে বসে ডিভিডি প্লেয়ারে সিনেমা দেখা ওই দৈনন্দিনেরই একটা অংশমাত্র; চায়ে চুমুক দিতে দিতে, বা আধশোয়া হয়ে, যেখানে-সেখানে ছবি থামিয়ে পরে আবার শুরু করে আর পাঁচটা ঘরোয়া কাজের মতোই হয়ে ওঠে সিনেমা দেখা। শিল্পকে দৈনন্দিনের অংশ করে নেওয়া কি এক অর্থে জীবনের অংশ করে নেওয়া? তখন কি আর শিল্প জীবনকে আবিষ্কার করতে শেখায়? শিল্পের কাছে কি আর জানা যায় কীভাবে দেখতে হবে জীবনকে?
তাহলে প্রশ্নটা দেখার। সিনেমা দর্শকের দেখার জন্য, দর্শককে দেখানোর জন্য। আর এই দেখা, দেখানোর সঙ্গেই এসে যায় শিল্প ও বিনোদনের দুটি জরুরি প্রসঙ্গ – জীবনদর্শন ও পণ্য। কী ভেবে, কী চেয়ে দর্শক সিনেমা দেখেন? সিনেমা হলে আরো অনেক দর্শকের মাঝখানে বসে অন্ধকারে প্রতিফলিত ছায়ামূর্তিগুলোর কাছে কী তাঁর প্রত্যাশা? সিনেমা সম্পর্কে একটা কথা খুব বেশি বলা হয় – এ হলো রূঢ় বাস্তবতার চাপ থেকে একটু পালিয়ে হাঁফ ছাড়ার জায়গা। দর্শক কি সত্যিই তাই চান! সিনেমায় তিনি যা দেখেন, অনেক সময়ই তা এক ইচ্ছাপূরণ। যে-চরিত্রগুলো সেখানে নড়েচড়ে বেড়ায়, তারা জীবনের থেকে মাপে বড়। শুধু পর্দায় প্রতিফলিত প্রতিমূর্তিই যে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় তা নয়, তাদের যাবতীয় কার্যকলাপই বাস্তব জীবনের সম্ভব-অসম্ভবের সীমা ছাড়িয়ে যায়। অসম্ভবকে কেন মেনে নেন দর্শক, কেন সিনেমা চলার সময় তাঁর মনে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন জাগে না! বোধহয় তাঁর অবচেতনে এই বোধ ক্রিয়াশীল থাকে যে এই চরিত্রগুলো, এদের কার্যকলাপগুলো বাস্তবের মতো, কিন্তু বাস্তবের থেকে আলাদা, বা তা এক অন্য-বাস্তব। বেশ কিছুক্ষণ দর্শক সেই অন্য-বাস্তবের মধ্যে ঢুকে যান, তাঁর চোখে দেখাটাই সে-সময়ের সত্য। দেখার বাইরে এসে যখন অন্য-বাস্তবের আচ্ছন্নতা থেকে খানিকটা মুক্ত করে নেওয়া যায় নিজেকে, তখন দর্শক প্রশ্ন করতে শুরু করেন। আর যে-দর্শক ঘরে বসে দেখছেন, তাঁর প্রশ্ন শুরু হয় অন্যভাবে। তাঁর দেখার জায়গাটা ছোট, অন্তত দৃশ্যমান পটটি জীবনের থেকে বড় মাপের নয়, সেক্ষেত্রে অন্য-বাস্তবের আচ্ছন্নতাও ততটা কাজ করে না। সেখানে প্রশ্নটা শুরু হয় একেবারে ব্যক্তিগত স্তর থেকে। কিন্তু প্রশ্ন থাকেই – তা তিনি সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে-আসা জনতার অংশ বা ঘরে-বসে-থাকা একলা দর্শক, যাই হোন না কেন? প্রশ্নটা এই, তাঁকে কী দেখানো হলো?
কে তাঁকে দেখায়? সিনেমা সম্পূর্ণভাবেই পরিচালকের মাধ্যম। পরিচালকের ভাবনাই সিনেমাকে নির্মাণ করে। কিন্তু সিনেমা তো শুধু আর্ট নয়, তা ইন্ডাস্ট্রিও। পরিচালকের ভাবনাকে রূপায়িত করতে গেলে প্রয়োজন অর্থ ও লোকবলের। কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, সংগীত, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা – সবই একজন করতেই পারেন, তবু নানা লোকের সম্মিলিত প্রয়াসের প্রয়োজন কোনোমতেই এড়ানো যায় না। সেখানে অন্য ব্যক্তিদের সহায়তা যদিও বা শুধুই নির্মাণের ক্ষেত্রে, কিন্তু অর্থ জোগান যিনি, তাঁর ভূমিকা কিছুটা নিয়ন্ত্রকের। প্রথমত, তাঁর কাছে সিনেমা প্রধানত একটি পণ্য, সেই পণ্য বেচে তাঁকে মুনাফা করতে হবে। পণ্য বিক্রয়ের যা যা শর্ত, সেগুলোতেই তাঁর আগ্রহ। মনে রাখা দরকার, সিনেমার আবিষ্কার পুঁজিবাদী দুনিয়ায়। প্রযুক্তির নানা অগ্রগতিকে কীভাবে পণ্যে রূপান্তরিত করা যায়, সেটাই পুঁজিবাদী সমাজের প্রধান লক্ষ্য। পণ্য যখন কিনবেন ক্রেতা, তখনো এসে যায় তাঁর দেখার প্রসঙ্গ। অর্থাৎ কী দেখে তিনি প্রলুব্ধ হবেন। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য পণ্যের বাইরের চেহারা আকর্ষক হওয়া প্রয়োজন। বাজারে যে-কোনো বিক্রয়যোগ্য জিনিসের যেমন সাজানো মোড়ক দরকার হয়, সিনেমাকে বেচার জন্যও সেরকম মোড়ক দরকার। কিন্তু অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে বস্তুটি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর মোড়ক তার গায়ে বসিয়ে দেওয়া হয়। সিনেমার ক্ষেত্রে এটা শুরু হয় তার নির্মাণ-ভাবনা থেকেই। কী বিষয় নিয়ে সিনেমা নির্মিত হবে, তার দায়িত্ব অবশ্যই নির্দেশকের, কিন্তু সেই বিষয়ের পণ্যমূল্য সম্পর্কে নিশ্চয়তা দাবি করেন অর্থবিনিয়োগকারী, তাঁর কাছে সিনেমার শিল্পগত বাস্তবতার আবেদন কম। বিক্রয়যোগ্যতার পরিমাপ তাঁর কাছে অনেক বেশি জরুরি। সিনেমার আদি যুগে একে আদৌ শিল্প বলে মনে করা হয়নি, ভাবা হয়েছিল আরেক ঝকমকে খেলনা। যে-খেলনা দর্শককে টেনে আনবে, আর দর্শক-সমাগম মানেই মুনাফা। সিনেমা যখন সেই ঝকমকে খেলনার গণ্ডি ছাড়িয়ে এগোতে চাইল, তখনই প্রশ্ন এলো, কী দেখানো হবে? সেই দেখানোটা দিয়ে কতটা মুনাফা অর্জিত হবে,   সে-ভাবনা তো ছিলই, সেইসঙ্গে ছিল এই দেখার সূত্রে দর্শক কী অর্জন করে নেবে। যা সে পাবে তা নিরাপদ তো, সমাজের পক্ষে, শ্রেণির পক্ষে, রাষ্ট্রের পক্ষে? এই প্রশ্ন ওঠে। কেননা শিল্প সমাজকে, শ্রেণিকে অস্বীকার করে রচিত হতে পারে না। সিনেমা আরো প্রভাবশালী, দৃশ্যমাধ্যম বলেই Ñ সেখানে এই নিরাপত্তার প্রশ্নটা আরো বেশি করে ওঠে। সাহিত্য, চিত্রকলা, নাটক, সংগীত সবই ব্যক্তিবিশেষের রচনা, অর্থলগ্নির পরিমাণ সেখানে কম, তাছাড়া এই শিল্পমাধ্যমগুলোর আবেদন বিশেষ দীক্ষিত উপভোক্তার কাছেই। সিনেমা যেহেতু অনেক বেশি লোকের কাছে পৌঁছতে পারে, তার প্রাথমিক আবেদনে সাড়া দিতে দর্শকের দর্শনেন্দ্রিয়ই যথেষ্ট, ফলে সেখানে বিপদের আশঙ্কা অনেক বেশি। শুধু যে মুনাফা অর্জনের জন্য সস্তা মনোরঞ্জক উপাদান ঢুকিয়ে দেওয়া, ছবিতে তা নয়, মুনাফার নিশ্চয়তা দেবে যে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, মুনাফার পক্ষে কথা বলবে যে দর্শন, সিনেমায় ঢুকে যায় সেসবও। আর তাই দেখতে বাধ্য হন দর্শক। এটা অবশ্য শুধু অর্থলগ্নিকারীর ব্যাপার নয়, নির্দেশকের জীবনদর্শনও এখানে কাজ করে। সিনেমা যখন শৈশবদশা কাটিয়ে উঠছে সেই সময় গ্রিফিথ নির্মাণ করেছিলেন তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্র বার্থ অব আ নেশন। সিনেমার ভাষা তৈরির এই প্রয়াস শিক্ষার্থীদের কাছে অনুশীলনযোগ্য। কিন্তু একটি পারিবারিক কাহিনির সূত্রে আমেরিকান জাতি গড়ে ওঠার ইতিহাস দেখাতে গিয়ে গ্রিফিথ দেখিয়ে দেন তাঁর অনুভূত ইতিহাসের ভাষ্য। বার্থ অব আ নেশন গৃহযুদ্ধ পেরিয়ে আমেরিকান জাতি গড়ে ওঠার ইতিবৃত্ত থাকে না আর, হয়ে ওঠে বর্ণবৈষম্যের পক্ষে এক দলিল। কুখ্যাত ‘কু ক্লুক্স ক্ল্যান’ হয়ে ওঠে গৌরবান্বিত। এ-ছবি তাহলে দর্শককে দেখায় গ্রিফিথের দেখা – অর্থাৎ আমেরিকান ইতিহাসকে গ্রিফিথ যেভাবে দেখেন। গ্রিফিথের এই দেখা ব্যক্তি-গ্রিফিথের, কিন্তু তা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির নয়; গ্রিফিথের দেখার চোখ তৈরি করে তাঁর সামাজিক অবস্থান, তাঁর শ্রেণিপরিচয়। মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের উগ্র জাতিচেতনা গ্রিফিথের মানসিকতায় থেকে যায়। তার বাইরে প্রকাশভঙ্গিতে তিনি সচেতনভাবে তাকে চাপা দিতে চাইলেও তা আত্মপ্রকাশ করে তাঁর শিল্পে। এ জন্য তাঁকে ইতিহাস বদলাতে হচ্ছে না, ইতিহাসকে দেখার চোখটাই শুধু অন্যরকম। আর এই দেখাটাই গ্রিফিথ সঞ্চারিত করে দিতে চান দর্শকদের মধ্যে। দর্শক তাহলে কী দেখবেন? সে-দর্শক যদি মার্কিন হন, যদি মার্কিন জাত্যভিমানে মজে থাকেন, যদি কৃষ্ণকায়দের তিনি নিকৃষ্ট বলে মনে করেন, তাহলে বার্থ অব আ নেশন তাঁর কাছে মনে হবে যথার্থ ইতিহাসবোধের নিদর্শন এবং হয়তো ওই নিরিখেই এ-ছবির শিল্পমূল্যও তিনি মেনে নেবেন। আর যদি দর্শক হন স্বচ্ছ ইতিহাস ও রাজনীতিবোধের অধিকারী কিংবা অমার্কিন, যাঁর দায় নেই মার্কিন জাত্যভিমানের ভার বহনের, তাহলে তিনি এর ইতিহাসভাষ্যকে প্রত্যাখ্যান করবেন, সেই সঙ্গে অস্বস্তিবোধ করবেন এমন শিল্পগুণান্বিত ছবি কী করে এমন ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক হতে পারে! তাহলে নির্দেশকের দেখা ও দেখানোর মতোই দর্শকের দেখাও নির্ভর করে তাঁর অবস্থানের ওপর। দর্শক দেখেন তাঁর জায়গা থেকে। নির্দেশক দেখান তাঁর জায়গা থেকে। মাঝখানে এসে যায় পণ্য বিক্রয়ের নানা পদ্ধতি, যার চাপে দেখা ও দেখানো দুই-ই কিছুটা বিপর্যস্ত হয়। একমাত্র যদি দেখানোটা মুনাফার নিশ্চয়তা দেয় তাহলে অবশ্য পণ্য বিক্রেতার কোনো আপত্তি নেই, এমনকি তা যদি তাঁর শ্রেণিদৃষ্টির বিপরীত হয়ও। হলিউডে ছবি করেছিলেন গিল্লো পন্টিবার্ডো। একদা ইতালীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মী পন্টিবার্ডো যে ছবিটি বানিয়েছিলেন তার নাম কুয়েমাদা, অন্য নাম বার্ন। এ-ছবিতে সময়ের বিস্তারকে গুটিয়ে এনে বুর্জোয়াদের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে চিহ্নিত করেছিলেন পন্টিবার্ডো, কৃষকবিদ্রোহের কাহিনির সূত্রে। কৃষকবিদ্রোহের মহিমার ফলে বুর্জোয়াদের অবমূল্যায়নের এই চিত্রায়ণ হলিউড স্টুডিও মালিকদের শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গিতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ারই কথা; তবু কী করে আনুকূল্য পেলেন, কী করে এ-ছবি তৈরি করতে পারলেন পন্টিবার্ডো? সিনেয়াস্ট পত্রিকার এ-প্রশ্নের জবাবে পন্টিবার্ডো বলেছিলেন – বুর্জোয়ারা যদি মনে করে তার মাকে বেশ্যা দেখালে পয়সা আসবে তাহলে তারা তাই করবে। অর্থাৎ দেখানোটা শুধু পয়সা রোজগার করার জন্য, মানে মুনাফার জন্য। অবশ্যই পন্টিবার্ডোর এই তিক্ত ব্যঙ্গ সত্যের একটি অংশ মাত্র। বুর্জোয়ারা যেসব রকম মানবিক সম্পর্কের ওপরের মায়াবী প্রচ্ছদটি ছিঁড়ে ফেলে, এ-ইঙ্গিত তো মার্কস অনেক আগেই দিয়েছিলেন, বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তাদের কাছে মুদ্রার ঝনৎকারই হলো মধুরতম সংগীত, তবু মনে রাখতে হবে, শ্রেণিস্বার্থ বিসর্জন দেয় না তারা কোনোমতেই। পন্টিবার্ডোর উক্তিটি ব্যক্তি-বুর্জোয়া সম্পর্কে সত্য, শ্রেণি সম্পর্কে নয়। বার্ন ছবিতে যদিও শ্রেণি হিসেবেই বুর্জোয়াদের প্রাথমিক প্রগতিশীল ভূমিকা পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক প্রভুত্ববাদে বদলে যাওয়া দেখানো হয়েছে, তবু হলিউড-প্রযোজকদের তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়নি; কেননা ছবিটি সমকালের কাহিনি নিয়ে নয়, অতীত-ইতিহাসের। ইতিহাস তাদের অত বিড়ম্বিত করে না, কেননা তা থেকে আশু কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। ফলে পুঁজিপতি প্রযোজকের স্টুডিওতে তৈরি হতে পারে বিপ্লবী বামপন্থী পরিচালকের তীব্র ইতিহাস-সচেতন শ্রেণিসংগ্রামের ছবি, প্রযোজকের মুনাফা-উৎসাহকে কাজে লাগিয়ে পরিচালক দর্শককে টেনে আনতে পারেন তাঁর দেখার জায়গায়, দর্শকের মধ্যে সঞ্চারিত করে দিতে পারেন তাঁর ‘দর্শন’। আর এটাই সিনেমা দেখার মূল কথা।
প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সিনেমার কথা বাদ দিলেও, মনে রাখতে হবে সিনেমা দেখা স্পষ্টতই পরিচালকের দেখানো। পথের পাঁচালী সিনেমাটিতে অপুর রেলগাড়ি দেখার দৃশ্য আছে। ওই অবিস্মরণীয় সিকোয়েন্সটির অপু-দুর্গা বাড়ি থেকে অনেক দূরে কাশবনে বসে হঠাৎ রেলের শব্দ শুনতে পায়। এর পরের শটগুলোতে দর্শক বারবার অপু ও দুর্গাকে দেখেন, দেখেন দূরে রেলইঞ্জিনের কালো ধোঁয়া। দর্শক অপুকে দেখেন, দুর্গাকে দেখেন, তাদের রেললাইনের দিকে দৌড়ে যাওয়া দেখেন, টেলিগ্রামের থামে কান রেখে দুর্গা ও অপুর বিস্ময়ও দেখেন। অপু রেললাইন পর্যন্ত পৌঁছয়। অপুর সঙ্গেই দর্শক এতক্ষণ ইঞ্জিনের ধোঁয়া দেখছিলেন, কিন্তু রেললাইনের কাছে পৌঁছতেই কাট করে ক্যামেরা চলে যায় উলটোদিকে, দর্শক ট্রেনটি দেখতে পান কিন্তু তা আর অপুর চোখ দিয়ে নয়, এখন তিনি ক্যামেরার পেছনে, তিনি আসলে চলে-যাওয়া রেলগাড়ির কামরার ফাঁক দিয়ে অপুকে দেখছেন বা বলা ভালো অপুর রেলগাড়ি-দেখাটাকে দেখছেন। অপুর সাবজেকটিভ দৃষ্টিকোণের বদলে দর্শকের অবজেকটিভ দৃষ্টিকোণ এসে গেল – দর্শককে এটাই দেখালেন পরিচালক। সাহিত্যের সঙ্গে ফিল্মের এটাও একটা বড় তফাৎ। সাহিত্যে লেখককে ভাষা দিয়ে সবই বর্ণনা করতে হয়, তিনি না বলে দিলে পাঠক কিছুই জানতে পারেন না। সিনেমায় নির্দেশক বলেন না, দেখান দৃশ্য ও দর্শককে মুখোমুখি রেখে দিয়ে তিনি চলে যেতে পারেন, কী দেখবে দর্শক, সেটা অবশ্য তিনি আগেই ঠিক করে দেন। সাহিত্যে লেখক কোনো চরিত্রের মনের মধ্যে উঁকি মেরে সে কী ভাবছে সেটা পাঠককে জানিয়ে দিতে পারেন। বিভূতিভূষণের উপন্যাসে সর্বজয়ার মৃত্যুর খবর জেনে হঠাৎ অপুর মনে একটা মুক্তির স্বাদ জাগে, এই নিষ্ঠুর অপ্রিয় ভাবনাটি বিভূতিভূষণ পাঠককে জানান। চলচ্চিত্রকারের এই সুযোগ নেই, তাই তাঁকে দেখাতে হয় একলা সর্বজয়ার নিষ্ফল প্রতীক্ষা, অন্যদিকে কলকাতায় বসে অপুর অদ্ভুত ঔদাসীন্য, তারপর খবর পেয়ে মনসাপোতায় এসে বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়া, এই নির্বাক মুহূর্তই সিকোয়েন্সটির নিষ্ঠুরতা প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। সিনেমা আসলে দৃশ্য – চলচ্চিত্র যেদিন সবাক হলো কেউ কেউ মনে করেছিলেন এবার সিনেমার জাত গেল। সে আর বিশুদ্ধ রইল না। সিনেমায় দর্শক দেখবে, বাড়তি হয়তো শুনবেও, কিন্তু সে-দেখাটা চরিত্রের দেখা নয়, চরিত্রকে দেখা। কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিতে সব কটি চরিত্রই দার্জিলিং-বাসের শেষ কয়েক ঘণ্টা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবার আশা করেছে, তারা দেখেনি। দর্শকও দেখেননি, তার বদলে দর্শক দেখেছেন চরিত্রগুলোর টানাপড়েন; শেষ সিকোয়েন্সে মেঘ কেটে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু দর্শক আসলে দেখছেন চরিত্রগুলোর জীবনে মেঘ কেটে যাওয়া। দর্শককে কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষারদৃশ্য দেখাতে চাননি নির্দেশক, রায়বাহাদুর ইন্দ্রনাথ চৌধুরীর পারিবারিক স্বৈরতন্ত্রের ভেতর থেকে চাপা-পড়া কণ্ঠস্বরগুলো কীভাবে জেগে উঠছে সেটাই দেখাতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই জেগে-ওঠার একটা প্রতীক হয়ে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা, দর্শক সেটাই দেখেন; সেইসঙ্গে দর্শক এও দেখেন, ওই সত্যকে দেখতে চান না রায়বাহাদুর ইন্দ্রনাথ, তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যান। দর্শক রেলগাড়ি-দেখতে-পাওয়া অপুর বিস্ময়বোধের শরিক হোন এটা চাননি সত্যজিৎ, অপুর বিস্ময়টাই দর্শক দেখুক, এটাই চেয়েছিলেন তিনি। অন্যভাবেও অবশ্য দেখা যায়। সত্যজিৎ মনে রাখেন সিনেমা সম্পূর্ণভাবেই পরিচালকের মাধ্যম, যতই সম্মেলক সৃষ্টি হোক না কেন, সিনেমা আসলে পরিচালকেরই ভাবনার ফসল। ফলে তাঁর দৃষ্টিকোণটাই এখানে মুখ্য। চরিত্র নয়, কাহিনিও নয়, পরিচালক তাদের কীভাবে গড়বেন, ভাঙবেন দর্শক সেটাই দেখবেন। ঋত্বিকের ছবিতে, দর্শকের মনে হতে পারে, যেন এই দেখানোটা ঘটে অন্যভাবে। খুব স্থূলভাবে সত্যজিৎ ও ঋত্বিকের প্রবণতাকে আলাদা করতে গেলে বলা যায় সত্যজিৎ যেখানে বিশ্লেষণপ্রবণ, ঋত্বিক সেখানে অনেকটাই আবেগের উৎসারণেই মনোযোগী। এটা অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে, যদি না পরিচালক ও দর্শক দুজনেই সচেতন থাকেন। দর্শক এই সিনেমা দেখার পর্বে সচেতন থাকবেন না মায়ায় মজবেন? পরিচালককে থাকতে হয়, কেননা আবেগ তাঁর কাছে দেখানোর একটা পদ্ধতি, দর্শকের ভাবালুতাকে উসকে দিয়ে তাঁকে মোহগ্রস্ত করে তোলা নয়। ঋত্বিক প্রবল আত্মসচেতন শিল্পী, তিনি কী করতে যাচ্ছেন সে-ব্যাপারে পরিপূর্ণ অবহিত, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবেই তিনি চরিত্রদের দ্বন্দ্বের মধ্য থেকে আবেগকে নিংড়ে আনেন। এখানে দুটো ব্যাপার ঘটে। পরিচালক আর চরিত্রকে ‘অবজেক্ট’ হিসেবে দেখছেন না, তিনি তখন চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন, আর দর্শককে একাত্ম হতে ডাকছেন। মেঘে ঢাকা তারায় নীতাকে যেভাবে দেখেন দর্শক, তাতে তিনি কেবলই নীতার মধ্যে ঢুকে পড়তে থাকেন, নীতার ট্র্যাজেডিকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে ভাবতে শুরু করেন। গোটা ছবিটাই দর্শক নীতা হয়ে দেখেন, নীতাকে দেখেন না। পাহাড়ে স্যানাটোরিয়ামে নীতার অন্তিম আর্তনাদের সময় ক্যামেরা তাই নীতার কাছ থেকে সরে গিয়ে পাহাড়, জঙ্গল, আকাশের ওপর প্যান করতে থাকে। ক্যামেরা আর নীতার ওপর স্থির থাকতে পারে না, কেননা দর্শক এখন নীতাকে দেখছেন না, নীতা হয়ে দেখছেন। পরিচালক যখন চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের এই আত্মীয়তা তৈরি করে দিতে চান তখন আশঙ্কা হতে পারে দর্শক যেন বিচার করার সুযোগ পাবেন না। ঋত্বিকের ছবিতে এ-সমস্যাটা প্রায়ই হয়। দর্শক যা দেখেন তা দেখেন আত্মগতভাবে, ফলে বিচারবোধ কিছুটা চাপা পড়ে যায়। যুক্তি তক্কো আর গপ্পো সিনেমায় বঙ্গবালার দিকে তাকিয়ে ‘কেন চেয়ে আছ গো মা’ গানটির চিত্রায়ণ এর একটা বড় উদাহরণ। ওই সিকোয়েন্সে ক্যামেরা যখন বঙ্গবালার মুখের ওপর, তখনো দর্শক আসলে বঙ্গবালাকে দেখছেন না, বঙ্গবালার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে অনুভব করতে চাইছেন, কেননা পরিচালক তাই চান। যেহেতু এই অনুভব আবেগনির্ভর, তাই তা চোখের দেখাকেও ছাপিয়ে উঠতে চায়। কোমল গান্ধারে ভৃগু-অনসূয়াকে যখন পদ্মার পারে রেললাইনের বাফারের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন ঋত্বিক, তখন দর্শক ভৃগু-অনসূয়াকে দেখেন না, তাদের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকেই খোঁজেন। দেখানোর এই পদ্ধতিটা, দেখার এই ভঙ্গিটা ভালো কী মন্দ সেটা কোনো প্রশ্ন নয়, মূল কথা হলো সিনেমা পরিচালকের দেখানো আর দর্শকের দেখার মিলে যাওয়া। সুবর্ণরেখায় ঋত্বিকই বদলে নেন দেখানোর পদ্ধতি। সীতার সঙ্গে দর্শক আবেগে মিলে যান না। সেই ভয়ংকর আত্মহত্যার সিকোয়েন্সে পর্দায় সীতার স্তম্ভিত মুখাবয়ব, ঈশ্বরের বিস্ফারিত দৃষ্টি, দর্শক এর কোনোটারই মধ্যে নেই, তিনি আলাদা, বাইরে থেকে দেখে যান এই ট্র্যাজেডি, আর বাইরে থেকে দেখা বলেই বারবার ‘কেন’ – এই প্রশ্নটা তাঁকে তাড়া করতে থাকে। ঋত্বিক তাহলে এভাবেও দেখেন। যেমন জলসাঘরে সত্যজিৎ দর্শককে বাইরে থেকে দেখার সুযোগ দিতে চান না। গোটা ছবিটাই নির্মিত হয় জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের দেখার ধরনকে অনুসরণ করে। তাই দেখতে হয় দর্শককে, বিশ্বম্ভরের পাশে দাঁড়িয়ে। কেননা পরিচালকও সেভাবেই দেখছেন। ছবিটিকে তাই মনে হতে থাকে হৃতগৌরব সামন্ততন্ত্রের দীর্ঘশ্বাস বলে, ঘোড়ার পিঠ থেকে বিশ্বম্ভরের পড়ে যাওয়ায় যেন দর্শকেরও হাহাকার বেজে ওঠে; দর্শক সুযোগ পান না ভাবার যে ইতিহাসের নিয়মে বিশ্বম্ভরদের সরে যেতেই হয়, নিষ্ঠুর হলেও তা স্বাভাবিক। সুযোগ পান না, কারণ দর্শক আর এখানে ঘটনার সাক্ষী নন, তিনি যেন ওই ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়িরই এক অংশ।
দেখানোর এই ধরন থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পুরনো কথাটাই – সিনেমা সম্পূর্ণই পরিচালকের মাধ্যম। দর্শককে নিজের অভিপ্রেত পরিমণ্ডলের মধ্যে টেনে আনতে পারাটা পরিচালকেরই মুন্শিয়ানা। হয়তো তা দর্শকের দিক থেকে কিছুটা অসহায়ত্বও। দেখা ও দেখানোর খেলায় এক পক্ষ দর্শক, তাঁর নিজস্ব বোধবুদ্ধি যদি আচ্ছন্ন হয়ে যায় তবে কিছুটা আশঙ্কা থেকেই যায়। ক্ষমতাবান পরিচালক সস্তা বিনোদনের জায়গায় না গিয়েও দর্শককে টেনে আনতে পারেন বিপজ্জনক বৃত্তে – সেটাই সিনেমার রাজনীতি।
পরিচালকের যেমন আছে নিজস্ব শ্রেণি অবস্থান, আছে প্রকাশ্য অথবা গোপন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, তেমনি দর্শকেরও আছে নিজস্ব অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি। দুজনেরই আছে ইতিহাস, তা ততটা ব্যক্তিগত নয়, অনেক বেশি সামাজিক। এই দুই ইতিহাসের সম্পর্কটা মুখোমুখি দাঁড়ায় যে-কোনো শিল্পেই, সিনেমা দৃশ্যমাধ্যম বলে এটা অনেক স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ। ব্যাটলশিপ পটেমকিন ছবিতে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে আইজেনস্টাইন দর্শকের সামনে তুলে ধরছিলেন, যেন দর্শককে এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান – বেছে নাও, তুমি কোথায়। বিখ্যাত ‘ওডেসা স্টেপসে’ সিঁড়ির ওপর নানা মানুষের ভিড়, কখনো ক্যামেরা সমগ্র ভিড়কে ধরে, কখনো একজন একজন করে নানা মুখ, দর্শক তাদের যাচাই করতে থাকেন, তার পরই সিঁড়ি দিয়ে যান্ত্রিক তালে নেমে আসতে থাকে সৈনিকেরা আর তাদের বন্দুকের গুলিতে একের পর এক লুটিয়ে পড়তে থাকে মানুষ। শেষে সেই বাচ্চাসহ প্যারাম্বুলেটরটি – আইজেনস্টাইন যেন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মাত্র, যদিও ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলে, দৃশ্য-প্রতিস্থাপনে, জনতার প্রতিক্রিয়ায়, সৈন্যদের নিষ্ঠুর মুখাবয়বে তাঁর পক্ষপাত কোনদিকে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবু আইজেনস্টাইন দর্শকদের এর মোকাবিলায় নামিয়ে দেন, তাঁর নিজের অবস্থান অনুযায়ী দর্শক বিচার করবেন, ঠিক করবেন কোন পক্ষে তিনি। এ যেন দর্শককে চ্যালেঞ্জ ছোড়া – আমি এভাবে দেখাচ্ছি, তুমি কীভাবে দেখবে ঠিক করো। স্পষ্টতই দেখানোর এই ধরনটির আবেদন দর্শকের যুক্তির কাছে। আর অন্য ধরনে দর্শকের আবেগকে উৎসারিত করে দিতে চাওয়াই পরিচালকের লক্ষ্য। একটিতে চরিত্রকে প্রতিমুহূর্তে দর্শকের সমালোচনার সামনে ছেড়ে দেন পরিচালক। অন্যটিতে দর্শককে তিনি জায়গা ছেড়ে দেন চরিত্রকে আত্মস্থ করার জন্য। দুর্গার মৃত্যুর পর হরিহর বাড়ি ফিরে এলে, দুর্গার জন্য আনা শাড়িটিকে আঁকড়ে সর্বজয়ার যে-কান্না, সেই দৃশ্য সমানে দর্শককে ধাক্কা মারতে থাকে, তাঁকে অস্থির করে তুলতে চায়। এখানে ক্যামেরার সামনে সর্বজয়া, ক্যামেরার পেছনে পরিচালক ও দর্শক, তাঁরা ওই বিপর্যয়টাকে ধারাবাহিক দেখে যান, দর্শক দেখতে দেখতে আলোড়িত হতে থাকেন আর আত্মজিজ্ঞাসায় বিদ্ধ হতে থাকেন। ভেঙে-পড়া গোয়ালঘর, বাড়ির পাঁচিল, জলকাদার পাশ দিয়ে এগোতে থাকা হরিহরের বিমূঢ় বিস্ময়ে বিপর্যয়ের যে চিহ্নগুলো ধরা পড়ে, সর্বজয়ার কান্নায় তারই সম্পূর্ণতা। বিপর্যয়ের অন্য চিহ্নগুলোর মতো সর্বজয়াও একটি ‘অবজেক্ট’, এখানে সিনেমার ন্যারেটিভে দর্শক ঢুকে পড়তে পারেন না, কেননা ঢুকে পড়লে ওই বিপুল অভিঘাতটি তৈরি হবে না। দর্শক বাইরে থেকে দেখছেন বলেই ধাক্কাটা এসে তাঁকেও সমূলে উৎপাটিত করে দেয়, অস্তিত্ব সম্পূর্ণ নড়ে যায়। কেননা তিনি মনে মনে এক নিরাপত্তার বলয়ে বসে থাকেন, সিনেমা সেখানে এগিয়ে এসে তাঁকে আক্রমণ করে। সিনেমা তাঁর তৈরি-করা বাস্তবতা দিয়ে দর্শকের বাস্তবতায় আঘাত করে বলে দর্শককে এতটা নাড়া খেতে হয়। অন্যদিকে মেঘে ঢাকা তারার নীতার বাস্তবতা, তাও তো পরিচালকের তৈরি করা, দর্শক সেখানে নিজের বাস্তবতা নিয়ে মিশে যেতে চান, ফলে নীতার মতো তিনিও ভাঙতে থাকেন, কষ্টটা তাঁকে কুরে কুরে খায়। এক্ষেত্রে একটা বিপদের আশঙ্কা থেকেই যায়। সিনেমা শেষ হয়ে গেলে দর্শক তাঁর বাস্তবতাকে আবার আলাদা করে নেন নীতার বাস্তবতা থেকে। সেটা যেমন তাঁর পক্ষে স্বস্তিদায়ক নয়, তেমনি তিনি আবার একধরনের মুক্তির আস্বাদও পেতে পারেন। দর্শক হিসেবে অসুবিধা হলো এই যে, তিনি যদি নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখতে না চান, বা পরিচালকের মুন্শিয়ানায় রাখতে না পারেন, তাহলে আর প্রশ্ন করতে পারেন না। আর এখানেই এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়। প্রশ্ন বা সংশয়ের জায়গা না থাকা মানে শর্তহীন আনুগত্য – এই শর্তহীন আনুগত্য ফ্যাসিবাদের রাস্তা খুলে দেয়। সিনেমা যেহেতু দৃশ্যমাধ্যম, সেহেতু তা বানিয়ে তুলতে পারে এক ছদ্মবাস্তব, দর্শক প্রশ্ন করতে ভুলে গেলে, সংশয়হীন আনুগত্য দেখালে, নির্দেশক মিথ্যাকে বাস্তব করে তুলতে পারেন। পরিচালক যদি প্রতিভাবান হন, তাহলে তাঁর নির্মাণও হবে প্রবল কুশলী, সেই দক্ষ নির্মাণের মাঝখানে বসে দর্শক তখন মেনে নিতে থাকবেন মায়াবী মিথ্যাকে, জেনে নেবেন এটাই বাস্তবতা। আর যদি তাঁর নিজের বাস্তবতায় কোনো অলীক মিথ্যার কুয়াশা জড়ানো থাকে, তখন বিভ্রম সত্য হয়ে ওঠে। ফ্যাসিবাদের পক্ষে যা সুবর্ণ সুযোগ। সেই উদ্দেশ্যেই তো রচিত হয়েছিল হিটলার ও নাৎসিবাদের মহিমাকীর্তনের আলেখ্য লেনি রিয়েফেনস্টালের ট্রায়াম্ফ অব উইল, যে-সিনেমা জার্মান জাতিকে মনে করাতে চেয়েছিল হিটলারের নেতৃত্বে তাদের বিপুল অগ্রগতির কথা। সাময়িক মোহগ্রস্ত জার্মান জাতির কাছে এ-ছবি হয়ে উঠতে চেয়েছিল এক সাংস্কৃতিক সমর্থন। অর্থাৎ রিয়েফেনস্টালের দেখানো তাঁর রাজনীতি। এটা একটা সিনেমার রাজনীতির প্রত্যক্ষ উদাহরণ। মনে রাখা দরকার, সিনেমা দেখানোর মধ্য দিয়ে সবসময়ই কাজ করে রাজনীতি। যেহেতু সিনেমাকে নির্ভর করতে হয় পুঁজিলগ্নিকারীর ওপর, যেহেতু সিনেমার ওপর রাষ্ট্রের খবরদারি খুব কড়া, আর সে-ব্যাপারে তার হাতে রয়েছে সেন্সরশিপের মতো আইনানুমোদিত ব্যবস্থা, তাই সিনেমায় শাসকশ্রেণির রাজনীতির কথাই বেশি আসবে – এটাই প্রত্যাশিত। রাষ্ট্রে ও সমাজে যে মূল্যবোধগুলো নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়, সিনেমা চট করে তা থেকে সরে আসতে পারে না। ফলে সিনেমায় দর্শক দেখে সেই সব মূল্যবোধেরই প্রতিফলন, যে-মূল্যবোধ স্থিতাবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আর এই মূল্যবোধ অনেক সময় বাস্তবতারহিত অতিকথা হয়ে যায়, সংস্কারে পরিণত হয়, ফলে তা থেকে সরে আসা অনেক বিরোধিতার জন্ম দেয়। সত্যজিৎ রায় যখন অপরাজিত ছবিতে মা ও ছেলের সম্পর্কের দূরত্ব দেখিয়েছিলেন, বিশালসংখ্যক দর্শক মেনে নিতে পারেননি, কেননা তাঁদের সযতœলালিত সংস্কারে মা ও ছেলের সম্পর্ক শুধুই ভালোবাসার। সেখানে এরকম একটি নিঠুর সত্যকে দেখালেন পরিচালক, দর্শকের পক্ষে তা বড় ধাক্কা হয়ে যায়। কেননা সিনেমাতেও দর্শক আসলে সত্যের মুখোমুখি হতে চান না, বরং সত্য থেকে পালাবার জন্যই সিনেমাকে বেছে নেন তিনি। আর কোনো কোনো সময় এভাবে তাঁর দেখতে চাওয়া আর পরিচালকের দেখাতে চাওয়ার মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়। যাকে বলা হয় বাণিজ্যিক ছবি, সেখানে এই সংঘাতের কোনো জায়গা দেওয়া হয় না। আসলে অর্থনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে দর্শক পরিবর্তন চাইতেই পারেন; কিন্তু সামাজিক সংস্কার ও অনুশাসনের ক্ষেত্রে তিনিই চট করে পরিবর্তনের পক্ষ নিতে পারেন না। সিনেমায় যে বারবার পরিবারতন্ত্রের জয়গান করা হয়, নারী-স্বাধীনতা বলতে বোঝানো হয় নারীর মধ্য দিয়ে পুরুষতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, এগুলো একদিকে দর্শককে নিরাপত্তা দেয়, অন্যদিকে তা যেমন নির্মাতাদের পক্ষে, তেমনি রাষ্ট্রের পক্ষেও স্বস্তিদায়ক। কেননা পরিবারকে প্রশ্নহীনভাবে মানতে শিখলে, তা থেকে রাষ্ট্রকেও মানতে শেখা হবে, রাষ্ট্রও তো একটা বড় পরিবার, কেননা পরিবারের বড় কর্তার মতো রাষ্ট্রও তো ব্যক্তি ও সমাজের অভিভাবক। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ছবিতে যা দেখানো হচ্ছে তা শুধু মুনাফা অর্জনের জন্য নয়, রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রের দর্শনকে যাথার্থ্য দেওয়ার জন্যও। আর এই ছবিই দর্শককে দেখতে হয়, কেননা কী ছবি দেখবেন তা দাবি করার কোনো উপায় তাঁর নেই, পরিবেশক-প্রদর্শকরা যা তাঁর সামনে সাজিয়ে দেবেন তা থেকেই তাঁকে বেছে নিতে হবে তিনি কী দেখবেন। সিনেমা পণ্য, কিন্তু পণ্যেরও রাজনীতি থাকে। এমন পণ্য বেচা যায় না, যা দর্শককে, অর্থাৎ ক্রেতাকে পণ্য বিক্রেতার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেবে।
তাহলে কী করে অন্য ধরনের সিনেমা তৈরি হয়? মনে রাখা দরকার, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, শ্যাম বেনেগালরা যখন সিনেমা করেছেন, তাঁদের ছবিতে যেমন প্রত্যক্ষ রাজনীতির কথা নেই, তেমনি কোনো বড় রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রসঙ্গও নেই। তাঁরা যা দেখাতে চান তা আসলে এক ধরনের সামাজিক প্রশ্নের অবতারণা। সীমাবদ্ধ ছবিতে সত্যজিৎ যখন শ্যামলেজ্জর ওপরে ওটাকে তিক্ত ব্যঙ্গে চিত্রায়িত করেন, তখন তার শ্রেণিপরিচয় চিহ্নিত হয় ঠিকই, কিন্তু তা কোনো শ্রেণিসংগ্রামের ডাক দেয় না। তবু হয়তো এ ছবিগুলোতে বিপদের আশঙ্কা থেকে যায়, দর্শক যেটুকু দেখেন তা থেকে এগিয়ে গিয়ে ভেবে নিতে পারেন অনেক কিছু। অথচ এ-ছবিগুলোকে আটকানো যায় না নানা কারণেই। সেন্সর আটকায় না, রাষ্ট্র বিরুদ্ধতা করে না, তার বদলে তাকে আলাদা করে দেওয়া হয়, তাকে আলাদা খোপে পুরে দেওয়া হয়, নাম দেওয়া হয় ‘আর্ট-ফিল্ম’। আর্ট-ফিল্ম অর্থাৎ তা সবার জন্য নয়, নির্দিষ্ট সীমিত কিছু দর্শকের জন্য। আর্ট-ফিল্ম শুনলেই সাধারণ দর্শক জেনে যাবেন, ওটা তাঁদের দেখার জন্য নয়। ফলে সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে, ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে, মৃণাল সেনের ছবিতে দর্শকের নিজেকে চেনার, নিজের অবস্থানকে জানার যে সুযোগ তৈরি হয়, তা নিতে পারেন মুষ্টিমেয় কয়েকজনই। খণ্ডহর ছবিতে মৃণাল পেটি-বুর্জোয়া মধ্যশ্রেণির রোমান্টিকতার সঙ্গে মিলে থাকে যে কাপুরুষতা ও পলায়নবাদ তাকে নগ্ন করে দেখিয়েছিলেন, কিন্তু দেখেছিলেন কজন? আর্ট-ফিল্ম তাই বিঘিœত করে না অচলায়তনকে। বরং এসব ছবি রাষ্ট্রের বেশ শিল্পমনস্ক ভাবমূর্তি রচনা করতে সাহায্য করে।
যেমন করে বাণিজ্যিক সিনেমার সাম্প্রতিক ঝোঁক। মুম্বাই সিনেমায় কয়েক বছর ধরে যেমন অপরাধী-রাজনৈতিক নেতা-প্রশাসন-পুলিশ যোগসাজশের বিষয় দেখানো হচ্ছে, তা আপাতভাবে বিস্ময়কর বলে মনে হতে পারে, মনে হতে পারে এক ধরনের দুঃসাহসিকতা বলে। এখানে অনেকগুলো ব্যাপার কাজ করে। দর্শক যা দেখেন, তা কিন্তু তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় আগে থেকেই জানেন, ফলে বেশ ‘সত্যি ব্যাপার’ দেখলাম এরকম একটা উপলব্ধি তাঁর হয়। আর এই ‘সত্যি ঘটনা’ দেখানো হয়েছে, তাকে বাধা দেওয়া হয়নি। ফলে আমরা কত সত্যবাদী, কত সৎ – পুঁজিলগ্নিকারীরা এরকম একটা ভান করার সুযোগ পেয়ে যান। আর রাষ্ট্র নিজেকে অনেক বেশি উদার ও গণতান্ত্রিক বলে প্রমাণ করার সুযোগ পায়। তাছাড়া এসব ছবিতে শেষ পর্যন্ত তো রাষ্ট্রের ক্ষমতাই জয়ী হয়। দর্শক দেখে অনেক গলদ সত্ত্বেও আইন, বিচারব্যবস্থা অন্যায়কে শাস্তি দিচ্ছে, রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস, আস্থা দৃঢ় হয়। সেজন্যই এসব ছবি দেখানো হয়, দর্শককে দেখতে হয়। আর কী দেখবেন তিনি!
প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ঘটনার বেলায় ব্যাপারটা বদলে যায়। সিনেমায় কোনো সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনা দেখানো যায় না, সেন্সর সেখানে বাধা দেবেই। তখন দর্শক যা ‘সত্যি’ বলে জানেন তা দেখতে পাবেন না। তাই সিনেমায় অনতি-অতীতের কোনো কৃষকবিপ্লব বা শ্রমিকসংগ্রাম কখনো কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে আসে না। দূর-অতীত আসে, যেমন আঠারোশো সাতান্নর মহাবিদ্রোহকে নিয়ে সিনেমা করা যায়, ব্রিটিশ-ভারতে স্বাধীনতাসংগ্রাম নিয়ে কিন্তু সহজে করা যায় না। তার কারণ আঠারোশো সাতান্নর মহাবিদ্রোহের প্রায় সর্বজনস্বীকৃত জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা আছে, সে-ইতিহাস দর্শকের আবেগকে উদ্বেল করতে পারে। কিন্তু তা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে না। ব্রিটিশ-ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের কিন্তু কোনো স্থির, বিবাদহীন ভাষ্য নেই, ফলে যা দর্শককে দেখানো হবে তিনি তাই দেখবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তাহলে দর্শক কী দেখবেন আর তাঁকে কী দেখানো হবে – এ দুই সবসময়ে মিলতে নাও পারে। প্রথমত, যাঁরা দেখবেন তাঁরা অনেক, কিন্তু প্রত্যেকেই একক আর যাঁরা দেখাবেন তাঁরা অনেক – নির্দেশক, প্রযোজক, পরিবেশক, প্রদর্শক। কিন্তু এক জায়গায় তাঁরা এক হচ্ছেন। ফলে দেখানো ও দেখায় একটা পদ্ধতিগত ও বিন্যাসগত পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে। আর সেক্ষেত্রে আবার উঠে আসছে স্বাধীনতার প্রশ্ন। দর্শক যা দেখেন, সে-ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা কতটুকু। তাঁকে যা দেখানো হবে, যেটুকু বা যা দেখানোর সুযোগ দেওয়া হবে, তাই তাঁকে দেখতে হবে। তাঁর একমাত্র স্বাধীনতা না দেখার। একমাত্র এভাবেই তিনি ‘দেখানো’কে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। অন্যথায় বড়জোর যা দেখানো হচ্ছে তার মধ্য থেকে বাছাই করার স্বাধীনতা আছে তাঁর। অর্থাৎ বাজারে যে পণ্য আসছে কেবল তাঁর ভেতর থেকেই তাঁকে বাছতে হবে, তিনি দাবি করতে পারেন না – আমার এই সিনেমা চাই। আর এখানে প্রত্যেক দর্শকই সিনেমা হলের ভেতরে বা বাইরে সম্পূর্ণ একা। যে-দর্শক বাড়িতে বসে ডিভিডি দেখছেন, তাঁর অবস্থা সামান্য ভালো, কেননা তাঁর সামনে পণ্যের জোগান একটু বেশি, অর্থাৎ বাছাইয়ের একটু বেশি সুবিধা।
কীভাবে তাহলে দর্শক দেখতে পারেন নিজের মতো করে? গত শতাব্দীর সত্তর-আশির দশকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ফিল্ম দেখানোর একটা ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সেটা অবশ্য শুধু ফিল্ম দেখানো নয়। ফিল্ম নির্মাণেরই এক বিকল্প ব্যবস্থা; সেটাও সম্ভব হয়েছিল বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থায়। লাতিন আমেরিকার নানা দেশে, সামরিক বা অসামরিক নয়তো একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণসংগ্রাম চলছিল, পাশাপাশি ছিল নানা গেরিলা কার্যকলাপ। সিনেমা তৈরি সেই গেরিলা কার্যকলাপেরই একটা অংশ ছিল। চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার সবাই মিলে লুকিয়ে কিছুটা শুটিং করতেন, তারপর সেই টুকরো টুকরো অংশগুলো জড়ো করে কোথাও, গ্রামে বা শহরে লুকিয়ে দেখাতেন তাঁরা। তারপর আবার ফিল্মটাকে নানা অংশে ভাগ করে ছড়িয়ে যেতেন নিজেরাও। এর রাজনৈতিক দিকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে দর্শক জানতেন তিনি কী দেখতে চান, সিনেমাকর্মীরা জানতেন তাঁরা কী দেখাতে চান। এবং যেহেতু গেরিলা পদ্ধতিতে প্রদর্শন হচ্ছে, ফলে সিনেমাটার  সঙ্গে দর্শকরা জড়িয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা আর নিষ্ক্রিয় দর্শক থাকছেন না। দর্শকের দেখা আর সিনেমাকর্মীদের দেখানো এভাবে মিলে যাচ্ছিল সেখানে।
তবে এটা তো একটা রাজনৈতিক কার্যক্রমের অঙ্গ। অন্য কীভাবে এটা করা সম্ভব! ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছোট আয়োজনে ভিডিও ক্যামেরায় কেউ কেউ ছবি তুলছেন। তাঁদের চেনাশোনা জগতেই এই ছবির দর্শকরা আছেন। সেখানেও হয়তো দেখা-দেখানোর এই মিলন সম্ভব। যদিও এর সার্থকতা ও সাফল্য খুবই সীমিত। বড় হলে বিশাল পর্দার সামনে যে-দর্শকরা বসে থাকেন, ওই বড়ত্বের জন্যই তাঁদের হতে হয় অন্যের ইচ্ছাধীন, আর যে-দর্শক ঘরে বসে ডিভিডি দেখছেন, তিনি  ক্রমশ একলা হয়ে যাচ্ছেন। এর বিকল্প কী! হয়তো বাণিজ্যের সমান্তরালে সিনেমার অন্য কোনো পথ ভাবা যায়, তাহলে সিনেমা নির্মাতাদের অভিপ্রায় ও দর্শকের অভিপ্রায় মিলতে পারে। মিলে যেতে পারে দেখা ও দেখানো।

Leave a Reply

*