logo

সিনেমার অরণ্যে ব্যক্তিগত গেরিলা

মারুফ রসূল

লক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টি কি সরস্বতীর বরপ্রাপ্তির অন্তরায়?

এ প্রশ্ন আর কোনো প্রকাশমাধ্যমে ততটা জরুরি হয়ে ওঠে না, যতটা রাজত্ব করে চলচ্চিত্রে। হয়তো এ কারণেই ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ ককতো (১৮৮৯-১৯৬৩) বলেছিলেন – যতদিন পর্যন্ত না ফিল্ম এক টুকরো কাগজ বা পেনসিলের মতো সস্তা না হয়ে যায় ততদিন পর্যন্ত সিনেমার শিল্প হয়ে ওঠা অসম্ভব। এই বক্তব্যের প্রাথমিক যুক্তিটুকু অস্বীকার করা যায় না। শিল্পালোকে উত্তীর্ণ হতে গেলে চলচ্চিত্রকে অতি অবশ্যই মূর্খ আর রূপসীর ভয়াবহ সঙ্গম পার হয়ে যেতে হবে। সুতরাং সিনেমা আমাদের দরজায় কড়া নাড়েনি শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের মতো। কাব্য অথবা নাটক, চিত্রশিল্প অথবা সংগীত আমাদের মানসপটের আকাশে উড়েছে অনেকটা পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই। অথচ চলচ্চিত্রকে শুরু থেকেই আমরা দেখেছি শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তার চোখে। বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের ক্লাসরুমে ঘুরে এলে আমরা জানতে পারি – একেবারে প্রথমে সে এসেছিল আত্মার অভিব্যক্তি হিসেবে নয়, মনীষার কারুবাসনা হিসেবেও নয়; বরং অনেকটা জাদুকর্মের মতোই – যন্ত্রের কারিকুরি আর অপার বিস্ময় ছাড়া চলমান চিত্রমালাকে আর কিছু ভাবার জো ছিল কি তখন? গ্রামের মেলায় লোকে যেমন ভিড় করে, তেমন ভিড় করত মানুষ ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বা ভোদভিল শোতে। আমোদ ও তামাশার সুর কেটে গেলে জাদুকরের কৌশল সম্বন্ধে যেমন মতামত করি, তেমনি সামান্য প্রাজ্ঞতায় রোদ পোহানো মানুষ সেসময় চলচ্চিত্র দেখে ভাবত – বিজ্ঞানের কী বিস্ময়! স্কুলের বিজ্ঞান মেলায় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রজেক্টগুলো এমন বিস্ময় জাগায়, কিন্তু ভুলেও সেগুলোকে শিল্প ভাবে না কেউ। কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্প – আর্ট এবং ইন্ডাস্ট্রি দুই অর্থেই। আগেই বলেছি, জন্মের পর চলচ্চিত্র খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। চলচ্চিত্রের জনয়িতা বলে যাঁদের নাম সবচেয়ে বেশি ঠোঁটে আসে সেই লুমিয়ের ভাইয়েরা ঠোঁট উলটে বলেছিলেন – আবিষ্কার হিসেবে সিনেমার কোনো ভবিষ্যৎই নেই। তাঁরা নিজেদের পেটেন্ট পর্যন্ত বেচে দিয়েছিলেন। তবুও সিনেমার যৌবনচিহ্ন ফুটে উঠল – যেন সভ্যতার এক উজ্জ্বল উদ্ধার। আজ সে রূপে ও রূপায় ঝলমল করছে। আজ আর কেউ নেই যে সিনেমার চিদাকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি না – সময়ের কী আশ্চর্য যোগ্য মুখপাত্রী! আসলে চলচ্চিত্র কোনো অভিজাত আঁতুড়ঘর থেকে জন্মায়নি। সে ব্রাত্য। সে অনভিজাত। কার্যত সে কারণেই তার রক্তপরীক্ষার প্রতিবেদন গৃহীত হয় গণমানুষের স্বাক্ষরমন্ত্রে। এ কারণেই জন্মমুহূর্তে তাচ্ছিল্য পাওয়া চলচ্চিত্রকে জনতার বিসত্মৃত সাম্রাজ্য রাজটীকা পরিয়ে দিয়েছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে – জনতার রাজটীকা সিনেমার প্রাপ্য ছিল, কেননা তার অনভিজাত কপালে জন্মমুহূর্তের আলো ও বঞ্চনা একইসঙ্গে চোখে পড়ে। এ কারণেই মার্সেল প্রম্নস্ত (১৮৭১-১৯২২) যখন চলচ্চিত্রকে উপেক্ষা করেছিলেন বাস্তবের একটি সস্তা উপঢৌকন হিসেবে; সমসাময়িক গিয়োম আপলেনিয়ার (১৮৮০-১৯১৮) তাকে বাস্তবের সম্প্রসারণ হিসেবে মেনে নিতেও দ্বিধা করেননি। আর রুশ নির্মাণবাদ ও ফরাসি পরাবাস্তববাদের মিলিত আয়নায় চোখ রাখলে আমরা দেখি আপাত তুচ্ছ খেলা চলচ্চিত্রও কীভাবে হয়ে ওঠে আত্মার নৈশবিজ্ঞপ্তি বা চৈতন্যের আলোকিত অপেরা। তবে সিনেমার কাছে মানুষ হয়তো নিজেকে নিবেদন করেছিল আবুল হাসানের সেই নিঃসঙ্গ বালিকার মতো, ‘চেয়েছিলো আরও কিছু কম’ – হয়তো সে কারণেই সিনেমাও হয়ে উঠতে চেয়েছিল একটি আলোকিত কথকতা – ছোট সুখ, ছোট দুঃখ, ছোট রোমাঞ্চকে জড়িয়ে ধরে গতিশীল আখ্যানমঞ্জরি। লুমিয়ের-মেলিয়ে-পোর্টার-গ্রিফিথ পর্যন্ত ঐতিহ্য তো সে কথাই বলে। দু-একবার হয়তো ছন্দপতন ঘটেছে, যেমন গ্রিফিথের (১৮৭৫-১৯৪৮) বার্থ অফ আ নেশন (১৯১৫) জাতিবিদ্বেষের ধোঁয়ায় মলিন হলো, কিন্তু চলচ্চিত্রের আমোদ ও তামাশার সুর কখনোই অন্যমাত্রা পেতে চায়নি। এর অন্যমাত্রা – প্রকৃত প্রস্তাবে ব্রাত্য ও অনভিজাত এই প্রকাশ মাধ্যমের পক্ষে উপনয়ন পর্ব – মূলত সম্পন্ন হয়েছে সের্গেই আইজেনস্টাইনের (১৮৯৮-১৯৪৮) পৌরহিত্যে। অতএব যুদ্ধজাহাজ পটেমকিন (Battleship Potemkin, 1925)-এ চড়েই সিনেমার বিষয়, প্রতিপাদ্য, চিত্রপ্রতিমা, ধারণা – অর্থাৎ ওডেসা সিঁড়ির ধাপে ধাপে চলচ্চিত্রের এক নবদূরাভিযান শুরু হয় – যা নক্ষত্রলোকের ওপারে, কিন্তু সঞ্চারপথ নির্ণীত হয় জীবনের রাজনৈতিক হূৎপি–। সিনেমার জাদুকরী ধারণা অন্তর্হিত হয়। সে হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক সংস্কৃতি সম্বন্ধে সবচেয়ে ক্ষক্ষপ্র ও বিসত্মৃত মন্তব্য করতে পারা সেই জনপদবধূ – যার চৌদিকে আবর্তন করছে একইসঙ্গে প্রাণের হত্যা ও জন্ম, রূপসীর যতি ও যন্ত্রণা, বুদ্ধিজীবীর আপস ও বিদ্রোহ, তারুণ্যের আত্মহত্যা ও আত্মপরিচয়।

 

খুঁজো না হূদয়, তাকে শ্বাপদেরা করেছে নিঃশেষ

 

সিনেমা এখন মন্তব্য জানানোর নির্বিকল্প শক্তিশালী মাধ্যম – শোষকের কাছেও, শোষিতের কাছেও; পুঁজির কাছেও, প্রলিতারিয়েতের কাছেও। আজ আর চলচ্চিত্রের কোনো নিঃসঙ্গ মুহূর্ত নেই। হয় সে বণিক-মহাজনের ব্যবস্থাবিধান মেনে চলা প্রতিবেদক, না হয় সে রাষ্ট্রযন্ত্রের নাচঘরে দ্রৌপদী। কিন্তু যে জনতার ভিড়ের রাজটীকা নিয়ে দীপ্ত করেছিল তার অনভিজাত আঁতুড়ঘর, সেই ভিড়ের সঙ্গে গোপনীয়তা নির্মাণ চলচ্চিত্রের আজন্ম লালিত প্রেম। জনতার আত্মার বিবরণীই চলচ্চিত্রের নিটোল প্রেমিক – তাই এই বাণিজ্যিক খড়খড়ে রৌদ্রে-দাবদাহে, ক্ষমাহীন অ্যাশফল্টে নারী ও নক্ষত্রে চলচ্চিত্রকে ভিড়ের হূদয়ে ফিরে আসতে হবে। চলচ্চিত্র নিজেও জানে সে যাপন করছে এক নরকের জীবন – যেখানে ঋতুতে টাকা, আকাশে টাকা, প্রেম-কাম-দ্রোহ সবই টাকা। চলচ্চিত্র নিজেও দেখে বছরে বছরে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে কেমন উড়ছে টাকা, বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং পড়ে, মিডিয়ার ম্যাকবেথরা হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্রের শল্যচিকিৎসক, কিন্তু কার্যত সেলুলয়েডে পুড়ে ছাই হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের ছাপানো স্বাক্ষর। এই শাসিত্মর অসামান্য প্রতি-প্রস্তাব হলো সেই নিবিড় চুম্বন, যা সমাজ সিনেমাকে ফিরিয়ে দেয়।
ভিড়ে-প্রতিবাদে-মিছিলে-রাস্তায়-একাকিত্বে-যূথবদ্ধতায়-সন্ন্যাসে-সংসারে-বিজনে-বিপন্নতায়-বিলাসে-বিভ্রমে ব্যক্তিগত মোমবাতি হাতে অন্ধকারমুখী হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো দ–ত বন্দির মতো আবিষ্কার করে চলচ্চিত্রকে। সুতরাং এ কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে না যে, নিম্ফোম্যানিয়াকইজমের চিকিৎসা শুরু হলে চলচ্চিত্রের সর্বত্রগামিতার ধর্ম আসলে ব্যক্তিগত সিনেমার প্রেম সংজ্ঞায়িত এক সার্বজনীনতা। এই সার্বজনীনতার সঙ্গে সর্বত্রগামিতার বিরোধ আছে বলেই চলচ্চিত্রের আবরণ ও আভরণ – দুই-ই চিমত্মার কষ্টিপাথরে বিচার করা জরুরি এবং এই বিচার যত স্বচ্ছ হবে ব্যক্তিগত সিনেমার পরিধি তত স্পষ্ট হবে। অতএব পাঠক বিভ্রান্ত হওয়ার আগেই এই কথা বলে দেওয়া জরুরি যে, ইন্ডাস্ট্রি অর্থে চলচ্চিত্রশিল্প ততটুকু স্বীকৃত হতে পারে, যতটুকু আর্ট অর্থে চলচ্চিত্রশিল্পকে সে স্বীকৃতি দেয়। এই কথার পেছনে আমার যুক্তি হলো, শতাব্দীর আর্কিটাইপ হয়ে বেঁচে থাকা চার্লি চ্যাপলিন – যেন শেকসপিয়রের নবতম সংস্করণ – এক মাল্যবাঁধনে লক্ষ্মী-সরস্বতী। কারেন্সি সভ্যতাকে বিদ্রম্নপ করতে গিয়ে এত রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা অন্য কোনো হলিউডি মোসাহেবও করেননি। কিন্তু চার্লির বাণিজ্য সাফল্য তো তাকে শিল্পের স্বর্গ থেকে নির্বাসন দেয়নি। সমস্যাটা হলো এখানেই যে – চলচ্চিত্র যত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, ততই তাকে নিয়ন্ত্রণের নানা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে, হচ্ছে। তাই চলচ্চিত্রকেও বাজারে নামানো হয়েছে অন্যসব শিল্প মাধ্যমেরই মতো। বলা ভালো, চলচ্চিত্রের বাজার অর্থনীতি সবচেয়ে জৌলুসময়। শিল্প যখনই পুঁজিবাদের চরিত্রকে উন্মোচন করে, তখনই তাকে ছিটকে পড়তে হয় বাজার থেকে। প্রমাণ – বোদলেয়ারের পাপের ফুল বা র‌্যাবোঁর নরকে এক ঋতু। আসলে সত্যের সঙ্গে শিল্পের দাম্পত্য হলে সেই শিল্পকে শেয়ারবাজার ঠাঁই দেয় না। তাই শিল্পের বারান্দায় সংখ্যালঘু তত্ত্ব বিচরণ করে – আমরা বলতে পারি, সত্যের সঙ্গে ঘর করা শিল্পীরা আসলে মদন তাঁতির হাতে শিল্প করেন। বুদ্ধের মৃত্যুর পরে কল্কি এসে দাঁড়াবার আগে তাঁদের হাত থেমে যায়। শিল্পের সম্ভ্রম তাঁদের কাছে কার্যত একমাত্র উপাসনা। উলটোদিকে বুর্জোয়া সভ্যতাও সাংস্কৃতিক মতাদর্শ প্রচারের জন্য চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করছে। তাই দ্বন্দ্বটা কেবল পুঁজির বললে বলাটা স্পষ্ট হয় না – দ্বন্দ্বটা রাজনৈতিক এবং সুস্পষ্টভাবে আদর্শের। চক্রটিও তাহলে সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব। পুরো ব্যাপারটি এমন যে – একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শকে কেন্দ্র করে পুঁজির জোগান, ব্যবহার, চলচ্চিত্র নির্মাণ, তাকে বাস্তবের মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে তোলা, অনুমোদিত করা, ছড়িয়ে দেওয়া এবং সবশেষ এই আদর্শের প্রতি-আদর্শকে দমনে পুঁজি-পরিবেশ-অনুমোদন-পরিবেশন ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে বিঘ্ন তৈরি করা। একটি বুর্জোয়া ব্যবস্থা চায় চলচ্চিত্র হোক প্রতিষ্ঠানভাষ্যে ব্যক্তিগত কথোপকথন, সে চায় সময়ের সেবা করতে; অন্যদিকে শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রের দায়িত্ব হলো ব্যক্তিগত ভাষ্যে (মতে ও আদর্শে) প্রাতিষ্ঠানিক কথোপকথন, সে চায় সময়কে চালনা করতে। বুর্জোয়া ব্যবস্থার এই ষড়যন্ত্রকে বহুকাল ধরেই চলচ্চিত্র নানাভাবে মোকাবেলা করে আসছে, কিন্তু লড়াইটা শক্ত হয়ে গেল তখনই, যখন বুর্জোয়া ব্যবস্থা একটি অপরিণত বুদ্ধি দর্শক-সমাজ তৈরি করতে সক্ষম হলো। এখন মানব মুক্তির আদর্শের জিয়নকাঠি হিসেবে ব্যবহূত চলচ্চিত্র বস্ত্তত দর্শক দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, বাজার থেকে খসে পড়ছে, হল থেকে নেমে যাচ্ছে নানা স্তরের নীলনকশায়। উলটোদিকে বুর্জোয়াদের প্রচারিত হিপোক্রেসি সমাজে বিরাজমান আছে রোল মডেলের খ্যাতি নিয়ে। সিনেমা হয়ে উঠছে লঘু বিনোদন। ভাবনা থেকে নির্মাণ, সম্পাদনা থেকে সেন্সর বোর্ড, পরিবেশক থেকে হল মালিক, গণমাধ্যম থেকে গাল-গপ্পো – সিনেমা হয়ে উঠেছে নেমেসিস নিয়ন্ত্রিত দুগ্ধভরাতুর স্তন। প্রাণের অমিয় ধারা বুকে নিয়ে সে ব্যথায় কাতরাচ্ছে কিন্তু নিরুপায়, কেননা অতিক্রম করতে গেলেই তাতে মিশে যাবে নেমেসিসের বিষ। অরণ্য জুড়ে হলস্না, চিৎকার, বক্স-অফিস, তারকাকথন – আসলে চলচ্চিত্রের আর্তনাদ বন্দিশিবির থেকে। ব্যক্তিগত সিনেমা এখানে গেরিলা তৎপরতা; তার কানের কাছে মুখ নিয়ে তাই বারংবার প্রশ্ন – দেখতে কেমন তুমি?

 

সূর্য ধীরে দেখা দেয়, মোমবাতি ডোবে অন্ধকারে

 

আধুনিক প্রযুক্তি চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী পালটে দিয়েছে – এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এটাও স্বীকার্য যে, পুঁজির ব্যাপ্তি প্রযুক্তির সৈকতও ভাসিয়ে নিচ্ছে আগ্রাসী ঢেউয়ের মতো। বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্কও বদলে গেছে গত প্রায় ষাট-সত্তর বছরে এবং এর পেছনেও প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে পুঁজির প্রত্যাশা। হায়! আজ আর কোন বৈজ্ঞানিক অভিসন্দর্ভে মায়ার মতো ফুটে থাকবে জোহানেস কেপলারের (১৫৭১-১৬৩০) গ্রহীয় গতিসূত্র? আজ তো কেবল লাল-নীল লেডের ব্যবচ্ছেদ – কী বৈজ্ঞানিক জার্নাল কী নোবেল কমিটির টেবিলে। কেন? – এ প্রশ্নটি করার আগেই যদি জানিয়ে দেওয়া যায় যে, পৃথিবী এখন আপেক্ষক্ষক তত্ত্বের প্রেম ডিঙিয়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলো-আঁধারে সংসার পাতে না, কেননা পৃথিবীর এখন আইফোন টেনের সিকিউরিটি বড্ড প্রয়োজন – তাহলে আমরা বুঝব বিজ্ঞানকে ব্রাত্য করে তোলাও পুঁজির তৈরি নামাবলিরই বর্ধিত সংস্করণ। সুতরাং বিশ্বব্যাপী অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে প্রযুক্তিতে, মৌলিক বিজ্ঞানে নয়। প্রযুক্তির প্রাইজ ট্যাগ এখন প্রযুক্তির ব্যবহার-নির্দেশিকা। চলচ্চিত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে একপক্ষ – বলা ভালো, তারা আবিষ্কারও করছে; কেননা, তারা চায় চলচ্চিত্রের কেশপাশ আলোকিত হোক তাদেরই নির্মিত প্রযুক্তিতে, যাতে চিমত্মা সেখানে সংজ্ঞা হারানোর যোগ্যতা পায়। এ বিষয়ে রাজনীতি, রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রসদ জোগাচ্ছে। আমরা তো মনে করতে পারি, ২০০৯ সালে ইরানের নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত জয়ের প্রতিবাদে তেহরানের রাস্তায় ত্রিশ লাখেরও বেশি মানুষের একটি সমাবেশ হয়। সেখানে হাজির থেকে তাকে ক্যামেরাবন্দি করার অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হন চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি (১৯৬০-)। ‘জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে’ কাজ করার অপরাধে জাতীয় প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত আদালত তাঁর ছবি তৈরির ওপর জারি করে কুড়ি বছরের নিষেধাজ্ঞা। এরপর থেকে পানাহি শারীরিক এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবন কাটাতে থাকেন, কিন্তু তাঁর কাজ বন্ধ থাকেনি। ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধি এমন তিনটি ছবি তিনি নির্মাণ করেছেন সম্পূর্ণ গোপনে, অনুমোদনপ্রাপ্ত চিত্রনাট্য কিংবা প্রযোজনা ও ছবি তোলার অনুমতি জোগাড় করার মতো শর্তগুলো পাশ কাটিয়ে – অনেকটাই গেরিলা যোদ্ধার মতো। ছবি তিনটির একটি তৈরি হয়েছে তেহরানে পানাহির নিজ বাড়ির ভেতর (দিস ইজ নট আ ফিল্ম, ২০১১), দ্বিতীয়টি তৈরি হয়েছে কাসপিয়ান সাগরের ধারে তাঁর বাগানবাড়ির মানসিক চিত্রপটে (ক্লোজড কার্টেন, ২০১৩) এবং শেষ ছবিটি তৈরি হয়েছে পানাহির নিজ গাড়ির ভেতরে (ট্যাক্সি, ২০১৫)। অভিনয়শিল্পীদের প্রত্যেকেই তাঁর প্রতিবেশী কিংবা বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়-স্বজন। নিজের ওপর আরোপিত দ-াদেশের সঙ্গে কোনোরকমের বোঝাপড়ায় আসার বিষয়টি কমবেশি আবর্তিত হয়েছে তিনটি ছবিতে (ট্যাক্সিতে এই বিষয়টি প্রকট রূপে আছে)। এই যে পানাহির নিষেধাজ্ঞার ভেতরেও ছবি বানিয়ে চলা এবং ছবি নির্মাণের যেসব প্রচলিত ধারণা আছে তাকে নিমেষে নড়বড়ে করে দেওয়া – এখানে ব্যক্তিগত সিনেমার একটি আপাত সংজ্ঞা নিহিত আছে। সুতরাং কাদের টাকায় সিনেমাটা হচ্ছে, কে করছে, কারা দেখাচ্ছে আর কারা দেখছে এবং কারা দেখতে পারছে না, কেন পারছে না – গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো প্রশ্ন। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে অনিবার্যভাবেই আমাদের প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হবে এই কথা স্বীকার করেই যে, প্রযুক্তিরও হাতবদল হচ্ছে এবং তা অর্থের মানদ–ই। সুতরাং প্রযুক্তি হলো সেই প্রেমিক যে চলচ্চিত্রের হাতে হাত রেখে বলতে পারে – তোমার গত জীবনে পাওয়া সমস্ত দুঃখ বনে-বনান্তরে জোনাকির মতো মিলিয়ে দেব – বলতে পারে, যদি কেবল প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারে তার নিজস্ব নিখিলের শক্তি এবং অতিক্রম করতে পারে বাণিজ্যবায়ুর শৃঙ্খল। এই প্রেম যদি চলচ্চিত্রকে বিষয়ের মোহ থেকে বক্তব্যের গভীরে নিয়ে যেতে পারে – তাহলে আমরা ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রের ইশতেহার রচনায় নিজেদের নিয়োজিত করতে পারি। বাস্তবতার একটি প্রতিরূপ রচনার চেষ্টা মানুষের মজ্জাগত, কিন্তু এই মজ্জাগত ধারণাকে অতিক্রম করে চলচ্চিত্রস্রষ্টার আত্মজ্ঞান অর্জনের প্রশ্ন এলেই কেবল ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র আলোচনার দাবি রাখে। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের যুগে সৌন্দর্য সৃষ্টি ততটা সংকটময় ছিল না – উদাহরণ বাইজানটাইন চিত্রকলা বা পার্থেনন। কিন্তু রেনেসাঁস আমাদের জানাল বাস্তবতার নিরিখে সৌন্দর্য রচনারও একটি পদ্ধতি আছে। অতএব, পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত হলো প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র বা সমাজ – মোটা দাগে যে-কোনো প্রতিষ্ঠান শিল্পীর চোখে ‘কোয়াত্রোসেমেত্মা’র মায়াঞ্জন এঁকে দিল, অর্থাৎ জানালা দিয়ে পৃথিবী দেখার ফ্রেমিং এবং সে অনুযায়ী অনুভূতির বাস্তব অনুবাদ। শুরু হলো নান্দনিক বাস্তবতা ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার বিরোধ। এই বিরোধের সবচেয়ে ঘনীভূত রূপান্তর হলো – ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র। তাই চিমত্মাবিদ ওয়াল্টার বেঞ্জামিন (১৮৯২-১৯৪০) যখন অব্যর্থভাবে দেখালেন চলচ্চিত্রে মাধ্যমগত কারণেই সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক অস্থিসংস্থান কার্যত ভঙ্গুর আর সেজন্যই স্থৈতিক পৌত্তলিকতার বদলে চলচ্চিত্র প্রবর্তন করতে পারে গতিশীল অন্তর্ঘাতনার; তখন মূলত তিনি চলচ্চিত্রের শ্রেণিবিন্যাসে আলো ফেললেন। ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফরাসি যুব-ছাত্র বিদ্রোহে দি আওয়ার অফ দ্য ফার্নেসেজ (পরিচালক : ফেরনান্দো সোলানাস ও অক্তাভিও হেতিনো) সিনেমাটি যখন মূল প্রভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ফেলা আলো সাবালক হয়ে ওঠে এবং বিশ্বব্যাপী শিল্প-সত্য সঙ্গমে নিবেদিত তরুণ নির্মাতারা এর চক্ষুদান পর্ব সমাপ্ত করেন। ‘ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র’ নামগ্রহণ করে তার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পদবি বিসর্জন দিয়ে, কেননা পরমতত্ত্বকে ভাঙার যাবতীয় পটভূমি কার্যত তারই রচনা। তাই একজন সালভাদর দালি (১৯০৪-১৯৮৯) বা একজন লুইস বুনুয়েল (১৯০০-১৯৮৩) বা একজন মায়াকোভস্কি (১৮৯৩-১৯৩০) বা একজন ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) বা একজন জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২) যখন নাশকতার বহুপ্রার্থিত দেবদূত হিসেবে চলচ্চিত্রকে কামনা করতেন – তখন মূলত তাঁরা ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রেরই আখ্যানভাগ সমাপ্ত করেন। ঘোষণাপত্র রচিত হয় ‘কাইয়ে দু সিনেমা’র পঞ্চপা-ব – গোদার, ত্রম্নফো, শ্যাব্রল, রোমার ও রিভেতের চলচ্চিত্রকে অদ্বৈত রূপে দেখা চোখে এবং শিল্প ও সমালোচনার ইতিহাস-নির্দেশিত অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে এর ইশতেহার পাঠ ও পরিমার্জন করে চলেছেন গোদার। সিনেমার প্রণয়কূজন বাজারের কোলাহলমুক্ত নয় – এই সত্য আজ যখন আমাদের দ্রষ্টব্য, তখন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্ধারিত ব্যবস্থাপত্রে সহজিয়া সিদ্ধির পথে ছবি করিয়েদের ছবি আসলে মাও সে তুঙের ভাষায় ‘উপরিতলের ঘটনার কুচকাওয়াজ’ হিসেবে পরিহাসতুল্য। প্রযুক্তি এখানে জিয়নকাঠি বলেই যুদ্ধটা অনত্র; রাজকুমারীর ঘুমন্ত শরীরে তার কোনো আন্দোলন নেই। প্রযুক্তির এই নবসমীক্ষা ব্যক্তিগত সিনেমার সমবায়িক প্রয়াস – এতে সন্দেহ রাখা চলে না।

 

বিস্ফোরণের সুতপ্ত রোশনাই

 

বিপস্নব বেহাত হয়ে গেলে যেমন প্রতি-বিপস্নবের শঙ্খচিলে ঢেকে যায় আকাশের মহাপ্রস্থান, যেমন দর্শনের গভীর স্রোতে নির্মাণ করা যেতে পারে প্রতি-প্রস্তাব; তেমনি – সন্দেহ নেই – এই মুদ্রা সভ্যতার মায়ামৃগ প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে প্রতি-প্রযুক্তির সাহসী বিন্যাস। এ যুদ্ধ আজকের নয়। মাইক্রোসফটের পুতুল জানালা বা আধ-খাওয়া আপেলের স্থিতিস্থাপক অহংকারের মুখোমুখি শালবৃক্ষের মতো সিনা টান করে দাঁড়িয়ে আছে ওপেন সোর্স লিনাক্সের স্বাধীনতা। অর্থের জলে ডুবে থাকা খ- খ- এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা উইকিপিডিয়ার মুক্ত বলাকার কাছে এখন মৃতপ্রায়। ৩৫ মিলিমিটারের ঘন অরণ্য থেকে ১৬ মিলিমিটারের নীলাকাশ দেখার প্রয়াস তো আজকের নয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই কিন্তু ১৬ মিলিমিটারের একটি বিপস্নব আমরা দেখেছি। ৩৫ মিলিমিটারে সিনেমা নিয়ন্ত্রিত হয় ত্রিভূতের অন্ধকারে – প্রযোজক-পরিবেশক আর হল-মালিক। এই অশুভ শক্তি সূর্য দীঘল বাড়ি (পরিচালক : শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের, ১৯৭৯) চলচ্চিত্রটি আটকে রেখেছিল দীর্ঘ সময়। একটি সমীকরণ দাঁড় করানো যেতে পারে যে, দহন (পরিচালক : শেখ নিয়ামত আলী, ১৯৮৫), মেঘের অনেক রং (পরিচালক : হারুনর রশীদ, ১৯৭৬) বা আলমগীর কবিরের (১৯৩৮-১৯৮৯) ছবিগুলো দীর্ঘ একটি সময় পর্যন্ত দর্শকদের কাছে পৌঁছায়নি। অন্যদিকে আগামী (পরিচালক : মোরশেদুল ইসলাম, ১৯৮৪), হুলিয়া (পরিচালক : তানভীর মোকাম্মেল, ১৯৮৫) ইত্যাদি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলোর একাধিক প্রিন্ট গোটা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছে। এর মূল কারণই ছিল নির্মাতাদের ৩৫ মিলিমিটার থেকে ১৬ মিলিমিটারের বিপস্নব। সুপার-৮-এর সম্ভাবনাও অগ্নিবলাকার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বেহাত প্রযুক্তির বিরুদ্ধে এই যে
প্রতি-প্রযুক্তির বিকাশ – এর প্রেক্ষণ রচিত হয়েছে মূলত স্বাধীনতায়। কী অলৌকিক সমাপতন! প্রতি-প্রযুক্তির বিকাশ মূলত যূথবদ্ধ এবং তা আজ হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত সিনেমার উজ্জ্বল উদ্ধার। এই মর্মেই বলে রাখা ভালো যে, ব্যক্তিগত সিনেমা মানে কোনো সুনির্দিষ্ট একজনের সিনেমা নয়; বরং সুনির্দিষ্ট একটি দর্শনের সিনেমা, যার নির্মাণ থেকে প্রদর্শনী অবধি সেই দর্শন ও আদর্শের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে। চিত্রগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি একদিকে যেমন পস্নাস্টিকের গোলাপ হয়েছে বুর্জোয়ার ড্রয়িংরুমে, তেমনি একবেলার খাবার হয়েছে প্রলিতারিয়েতের শিল্প-ভাবনায়। সুতরাং মোবাইল ক্যামেরা থেকে জন্ম নিতে পারে একটি কাঙিক্ষত তথ্যচিত্র বা ফিকশন সিনেমা এবং তাতে খেলা করতেই পারে নিজস্ব চিমত্মার রৌদ্র। ডিজিটাল সিঙ্গেল-লেন্স রিফ্লেক্ট (ডিএসএলআর) বা মিররলেস ক্যামেরাগুলো প্রযুক্তির নতুন সমত্মানের মতো চপলতায় ভরিয়ে তুলছে চলচ্চিত্রের সংসার। পদ্ধতিগত চিমত্মার বাইরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যায়ন সম্পন্ন করা হচ্ছে এবং বলা ভালো, যাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে প্রযোজকের টাকা, তারাও ব্যবহার করছেন এই পন্থাগুলো। শব্দ-কৌশল নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি এখন অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করেছে। ব্যক্তিগত কেবল নয় – অনেক বাণিজ্যিক ছবিতেও এখন প্রাকৃতিক শব্দকেই মূল শব্দের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঋত্বিক ঘটক যখন বলেন, সিনেমা হলো কাট টু কাট – তখন আমরা বুঝি, চলচ্চিত্র নির্মিত হয় আসলে সম্পাদনার টেবিলে। প্রযুক্তি সেই টেবিলকে ছড়িয়ে দিয়েছে কি-বোর্ডের শর্টকাটে – একটি বড় আয়োজন সম্পন্ন হচ্ছে সফটওয়্যারে। এখানে প্রতি-প্রযুক্তির ভূমিকাও লক্ষণীয় – কারণ, সম্পাদনার সফটওয়্যারগুলো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে, সুতরাং সিনেমা এখনো মুক্ত নয় সম্পূর্ণ। এক্ষেত্রে আমরা প্রতি-প্রযুক্তির দুটো ধারণা দেখতে পাচ্ছি – একটি আইনের বিধান-অনুযায়ী নেতিবাচক, অন্যটি সৃষ্টিশীলতার বিকাশ অনুযায়ী ইতিবাচক। প্রায় সব সফটওয়্যারের লাইসেন্সই হ্যাক করা যাচ্ছে বা তৈরি করা যাচ্ছে বিকল্প কোনো পন্থা, যাতে না কিনেও গোটা সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা সম্ভব। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ওপেন কোডিংয়ে সম্পাদনার সফটওয়্যার তৈরি। অন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা এমন অসংখ্য কোড পাওয়া যাচ্ছে, যেখান থেকে একজন নির্মাতা তাঁর প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারটি বানিয়ে নিতে পারেন। লেখাই বাহুল্য, এটি একটি বিশেষ যোগ্যতার বিষয়। সে তো ক্যামেরা চালানোর ক্ষেত্রেও সত্য। সুতরাং ব্যাপারটি অসম্ভব কোনো মতেই নয়। উলটো এই ধরনের চর্চা চলচ্চিত্রের সার্বজনীনতার ক্ষেত্রে এক নতুন সূর্যোদয়। সুতরাং প্রযুক্তি বা প্রতি-প্রযুক্তি – যাই বলি না কেন, চলচ্চিত্রে এক ধরনের গণতন্ত্রায়ন ঘটেছে। সিনেমা বানানোর যে মিথগুলো ছিল – প্রচুর খরচ, লোক-লস্কর, নামিদামি তারকা, অফিস কক্ষ – সেগুলো বর্তমানে ভেঙে ফেলা হয়েছে। সুতরাং ছবি করিয়েদের মধ্যে যে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরাজমান ছিল, তা এখন পলকা। এর উলটো বিপদ যে ঘটেনি, তাও নয়; এখন সবাই ছবি বানাচ্ছেন এবং বারবার আমাদের দিয়ে বলিয়ে নিচ্ছেন – সবাই চলচ্চিত্রকার নন, কেউ কেউ চলচ্চিত্রকার। প্রযুক্তি ও প্রতি-প্রযুক্তি সহজলভ্যতার যে ব্যাকরণ তৈরি করেছে, তাকে আমরা আদর্শ বাস্তবায়নের বা মতাদর্শ প্রচারের বা সিনেমাকে সত্যি সত্যি সিনেমা করে তোলার কাজে না লাগিয়ে তাকে ব্যবহার করছি নিজের নামের পাশে ‘ফিল্ম-মেকার’ পরিচয়টি জুড়ে দেওয়ার জন্য। হায়! ‘রেখেছ বাঙালি করে – মানুষ কর নি’ – এই পঙ্ক্তিতে রবীন্দ্রনাথের হাহাকার আমরা টের পাই। অন্যদিকে এই যে সিনেমার একটি অন্তর্গত অভিঘাত রচিত হয়েছে এবং তা শত-সহস্র দুয়ার খুলে দিচ্ছে অহর্নিশ; তা ব্যবহারে আমরা সম্ভবত কূপম-ূকতার পরিচয় দিয়ে চলেছি। এই প্রযুক্তি শেষতক ব্যবহূত হচ্ছে এনজিওর তথ্যচিত্র নির্মাণে – যেখানে ডোনেশন কেটে সংসারের ফর্দ সাজানো হয়। ‘আমি হূদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ’ – ব্যক্তিগত সিনেমা ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে, পরপুরুষ; অথচ তারই থাকবার কথা ছিল হূদয়ের সবটুকু জুড়ে।

 

আলোতে চাবুক মারা ক্ষমাহীন ভবিষ্যৎ

 

ব্যক্তিগত সিনেমা নিয়ে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো – প্রদর্শনী। প্রযুক্তি বা প্রতি-প্রযুক্তি যাকেই ব্যবহার করি না কেন, চলচ্চিত্রের রাগমোচন হয় প্রদর্শনীর নিবিড় বিথারে। রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষুকে আরো রক্তাক্ত করতে আমরা ক্রমাগত দেখে চলেছি করপোরেটের ষড়যন্ত্র। গোটা ব্যবস্থা জুড়ে ফিফথ কলামের ছড়াছড়ি। সুতরাং পাহাড়ে সেনা আগ্রাসনের প্রতিবাদে নির্মিত চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাবে না – এ তো জানা কথাই। রাষ্ট্র যখন জনতার বিপুল ক্যানভাসে পিপার স্প্রের মতো ছড়িয়ে দেয় গণতান্ত্রিক লুলাবি, শিল্পের কণ্ঠে তখন থাকা উচিত উলগুলানের গান। কারণ শিল্পের কাজই হলো অস্থিতি ঘোষণা করা – সংসদ নেতার চেয়ারে যেই থাকুন না কেন। এই সেন্সর বোর্ড কতটা যৌক্তিক বা অযৌক্তিক, সে আলোচনা নিশ্চয়ই জরুরি; কিন্তু প্রসঙ্গত জরুরি মনে হচ্ছে কী এমন ব্যবস্থা আছে, যা অতিক্রম করতে পারে এই নখদন্তবিকশিত রূপকথার জীবন্ত দৈত্যকে? এখানেও প্রতি-প্রযুক্তির ডানার নিচে দেখতে পাই সম্ভাবনার লুকোনো তরবারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই বিপস্নবের এক উচ্চকিত হাতিয়ার। খুব সহজ করে বললে ‘ইউটিউব’-এর একটি চ্যানেল এখন একটি প্রেক্ষাগৃহ। একটি স্বপ্নের সূতিকাগার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্তুঙ্গ গ্রহণযোগ্যতা এবং সর্বগামিতা নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রের অবাধ প্রেক্ষাগৃহ।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি কোনো নির্মাতা প্রশ্ন করেন ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রে কি আর্থিক অনুষঙ্গ একেবারেই সীমানার ওপারে? সহজ উত্তর হলো – ‘না’। কেননা ইউটিউব চ্যানেল এখন পুঁজিবাদের বিপণন কৌশলের অন্যতম স্থান। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও তাই। সুতরাং আর্থিক অনুষঙ্গ এড়ানো যাবে না। নির্মাতা বা চ্যানেলের প্রশাসক না চাইলেও পয়সা তার ঘাড়ে এসে পড়বে। তাহলে কি অন্য কথায় সেই পুঁজিবাদের দাসত্বই করা হচ্ছে না? ক্যামব্রিজ অ্যানালেটিকার কাছে ফেসবুক তার ব্যবহারকারীর তথ্য বিক্রি করে কীভাবে মার্কিনসহ অন্যান্য দেশের নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে – এ বিষয়টি নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়ে তা কি ফেসবুকে দেখানো সম্ভব? বা ইউটিউবের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকার পরও যেভাবে তা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলের ধর্মীয় উন্মাদনা, নারীর প্রতি অসম্মানজনক বক্তব্য সংবলিত ভিডিও প্রকাশিত হচ্ছে – সে বিষয়ে ইউটিউবের উদাসীনতা বা জেগে ঘুমানোর বিষয়টি নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়ে তা ইউটিউবে কতক্ষণ রাখা যাবে? সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, স্বাধীনতা অত সহজ নয়। সেক্ষেত্রেও প্রযুক্তির কারুবাসনায় মুক্তির হাতছানি আছে। এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনলাইন প্রেক্ষাগৃহ নির্মিত হচ্ছে। নেটফ্লিক্সের মতো ব্যবসায়িক উদ্যোগেও নির্মিত হচ্ছে নানা ধরনের অনলাইন সিনেপেস্নক্স। পুঁজির প্রশ্ন এখানেও থাকছে, কিন্তু আগের মতো অত প্রকটভাবে নয়। একজন নির্মাতা চাইলেই একটি ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারেন – সেখানে তিনি তাঁর কাজগুলোর ট্রেলারসহ নানা আলোচনা রাখতে পারেন এবং নির্ধারিত দর্শনীর বিনিময়ে দর্শক চাইলে তাঁর কাজের সবটুকু দেখতে পারে। এখানে সুবিধাটি আরো বেশি, কেননা দর্শকের সঙ্গে নির্মাতা বা কলাকুশলীদের সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব মন্তব্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে।

এখন কেউ যদি এই ভেবে দ্বিমত পোষণ করেন যে, এই পন্থায় কি একটি ব্যবসাসফল ছবি করা সম্ভব? তাহলে আমারও তাঁকে সবিনয়ে মনে করিয়ে দেওয়ার আছে যে, ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রের আখ্যান বক্স-অফিসের স্বপ্ন দেখে না বলেই সে ব্যক্তিগতভাবে যূথবদ্ধ। আরেকটু তেল-নুন-মরিচ দিয়ে ছোট মুখে বড় কথা বলার অভ্যেসবশত এই প্রশ্নটিও ছবি করিয়েদের করা যেতে পারে যে, আপনারা সিদ্ধান্ত নিন শিল্প করবেন নাকি ব্যবসা?

ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে ব্যক্তিগত সিনেমার সম্ভাবনা কেবল বিপুল নয়, বৈপস্নবিক। এই বক্তব্য একইসঙ্গে আশাজাগানিয়া এবং সচেতন পদবিক্ষেপের হুইসেল। কেননা প্রযুক্তি বা প্রতি-প্রযুক্তি যেভাবে তথ্যকে আলোর বেগের সঙ্গে পালস্না দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাতে ব্রাত্যজনের বিপস্নব আসন্ন। যারা সিনেমার নামে যাচ্ছেতাই আর বুদ্ধিজীবিতার নামে উঞ্ছবৃত্তি দেখে বড় হয়েছে নববইয়ের দশকে, তারা এখন সিনেমার জগতে আইপি অ্যাড্রেসের মোটরসাইকেলে করে ঘুরে বেড়ায় – চে’র সাইকেল এখানে রূপান্তর ধর্মের মমত্মাজ। একসময় বাংলাদেশের নাট্যকর্মীরা সেস্নাগান দিতেন – আমাদের মঞ্চ আমরাই বানাব; এখন ব্যক্তিগত সিনেমার রেলিংয়ে ভর দিয়ে নতুন প্রজন্ম আলোর দিকে মুখ তুলে বলছে – আমাদের প্রেক্ষাগৃহ আমরাই বানাব।

১৯৮৭ সালে মস্কোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সংবাদ সম্মেলনে জুরি সদস্য গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, লাতিন আমেরিকায় সিনেমার যে নব অরুণোদয় ঘটেছে তা সম্পর্কে যা কিছু প্রশ্ন আসবে, তার জবাব দিতে তিনি প্রস্ত্তত, অন্য কোনো বিষয়ে নয়, তাঁর নিজের সাহিত্য সৃষ্টি বা নিজের বিষয়ে তো নয়ই। এই বক্তব্যটি নথিভুক্ত করা হলো এইজন্য যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতি-প্রযুক্তির হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটতে থাকা ব্যক্তিগত সিনেমার এই নববিপস্নবে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কী হতে পারে তার স্পষ্ট বয়ান তুলে ধরার জন্য।

চলচ্চিত্রের দীর্ঘযাত্রা এখনো অসংজ্ঞায়িত; অতএব ভবিষ্যতের পূর্ণতা ও শূন্যতা, কেন্দ্র ও পরিধির যাবতীয় অবাঙ্মানসগোচর, অজ্ঞেয় ও অপরিচিতের স্বপ্নও দেখা যায় অকপট। ব্যক্তিগত সিনেমা, আমার মতে, ভেনিসে ঘোষিত বুনুয়েলের সেই বিদ্রোহ – যা একমাত্র এবং একমাত্র যুক্তিপরায়ণ বিকল্প। ‘দ্বিমত’ – এই ক্রিয়াপদটিকেই তবে নিযুক্ত করা হোক ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রের বর্ণমালা হিসেবে।

আরেকটি শতাব্দী অতিক্রান্ত হলে প্রযুক্তির শরীর পালটে যাবে এককোষী অ্যামিবার মতো। প্রতি-প্রযুক্তিও পালটাবে। পালটাবে সিনেমার ভাষা ও মায়া, শরীর ও ছায়া। তখনো মানুষের মুক্তির মিছিল থাকবে, ক্রোধ আর উন্মত্ততার বিরুদ্ধে ফ্রেমে ভেসে থাকবে সাদা পায়রা। তখনো কেউ কেউ থমকে দাঁড়াবেন মানুষের বিপুল বিদ্রোহের সামনে। এই বিদ্রোহের অনুবাদ চলবে পুঁজিতে, রাষ্ট্রে, ক্ষমতায়, ন্যাটো বা জাতিসংঘের অধিবেশনে। কিন্তু ইতিহাস নথিভুক্ত করবে শিল্প আর সত্যের সার্থক সঙ্গমকেই, কেননা ইতিহাস এখনো থমকে দাঁড়িয়ে আছে যুগপৎ প্রযুক্তি আর ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রকে কুর্নিশ করবে বলে। এখানেই শিল্পের শাস্তি, সুদূর মেঘধবলিমা এবং স্বপ্ন-রাত্রির আশ্চর্য হস্তাক্ষর।

Leave a Reply

*