logo

সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাট্যের প্রস্ফুটিত শতফুল

অ লো ক  ব সু
২০১১ সাল ছিলো রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে অজস্র অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিলো বছরজুড়ে। রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতার আবৃত্তি, নাটক, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্যের আয়োজন যেমন ছিলো উল্লেখ করার মতো, তেমনিভাবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রবীন্দ্র-উত্তরকালের চিত্রশিল্পীদেও চিত্র-প্রদর্শনী এবং রবীন্দ্রচিত্রকলার প্রদর্শনী ছিলো সবিশেষ স্মতর্ব্য ঘটনা। আর গত বছরের শেষ তিনদিন তো বাংলাদেশ রবীন্দ্রময় হয়ে উঠেছিলো।
‘সুরের ধারা’র আয়োজনে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উদ্যাপিত হয় রবীন্দ্র উৎসব। এ উৎসবে রবীন্দ্রনাথের দুই হাজার দুশো বাইশটি গানের রেকর্ড-সংবলিত ‘শ্রুতি-গীতবিতান’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্র উৎসবের উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. আনিসুজ্জামান। সমস্ত রবীন্দ্রপ্রেমী বাঙালির মনোযোগ ছিলো রবীন্দ্র উৎসবের দিকে।
এত বড় উৎসবের সময়ে রবীন্দ্রনাট্যের ক্ষেত্রে আরো দুটি বড় ঘটনা ঘটে যায় বাংলাদেশে। প্রথম ঘটনাটি হলো রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটকের দ্বিশততম মঞ্চায়ন। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন দলের প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের কোনো কোনো নাটকের অসংখ্য প্রদর্শনী হয়েছে কিন্তু কোনো একটি নাট্যদলের প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের কোনো একটি নাটকের দ্বিশততম মঞ্চায়ন এই প্রথম। রবীন্দ্রনাট্যের ইতিহাসে এই নতুন কৃতিত্বের, নতুন ইতিহাসের দাবিদার চট্টগ্রামের তীর্যক নাট্যদল। আহমেদ ইকবাল হায়দারের নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটকের ২০০তম মঞ্চায়ন হয় থিয়েটার ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রামে ৩০ ডিসেম্বর ২০১১-এ, যখন ঢাকায় চলেছে রবীন্দ্র উৎসব। বিসর্জন নাটকের ২০০তম মঞ্চায়ন উপলক্ষে তীর্যক নাট্যদল দুদিনের এক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেছিলো চট্টগ্রামে। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-প্রযোজিত রক্তকরবী নাটকের শততম মঞ্চায়ন হয় রবীন্দ্র উৎসবের সামান্য কিছুদিন আগে। রবীন্দ্র উৎসবের সঙ্গে কোনোরকম সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও কাকতালীয়ভাবে আতাউর রহমান-নির্দেশিত ও নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-প্রযোজিত রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটকের ১০১তম মঞ্চায়ন হয় কিন্তু রবীন্দ্র উৎসবের প্রথমদিনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায়। গত বছরের শেষ তিনটি দিনকে রবীন্দ্রময় প্রমাণ করতে গিয়ে আমাকে এভাবে সমীকরণ মিলিয়ে বলতে হলো। না মেলালেও অসুবিধা ছিলো ন। পাঠকমাত্রেই অবগত আছেন, গত বছর অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে বছরজুড়েই ছিলো রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিক উপস্থাপনায় পূর্ণ। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ব্যাপার ছিলো রবীন্দ্রনাথের নাটকের মঞ্চায়ন। বাংলাদেশ সরকারের অনুদানের আওতায় এবং অনুদানের বাইরে বিশটির মতো রবীন্দ্রনাটকের প্রযোজনা হয়েছে বাংলাদেশে এবং এর বেশিরভাগ হয়েছে ঢাকায়। এ বিষয়ে পরবর্তীকালে কোথাও আলোচনার সুযোগ গচ্ছিত রইলো। তবে এসব ঘটনা, রবীন্দ্র জন্মসার্ধশততম বার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাট্যের পুষ্পেপত্রে পল্লবিত ও প্রস্ফুটিত হওয়ার মতোই ঘটনা নিঃসন্দেহে।
নাগরিকের রক্তকরবী শততম মঞ্চায়ন পেরিয়ে
রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলোর মধ্যে রক্তকরবী সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাটক। রক্তকরবী নাটক নিয়ে নানা পণ্ডিতের অনেক পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখার সঙ্গেও আমরা পরিচিত। কিন্তু যাকে নিয়ে এতকিছু সেই রক্তকরবীর মঞ্চরূপ দেখার সুযোগ খুব কমই চোখে পড়েছে। কলকাতার বহুরূপী নাট্যদলে প্রয়াত শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় রক্তকরবী নাটকের প্রযোজনা নিয়ে আমরা যতটুকু জানতে পারি, তা আমাদের কাছে প্রায় কিংবদন্তি সমান। আমার মতো অনেক দর্শকেরই সেই প্রযোজনা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কৈশোরে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায় একটি রক্তকরবী টেলিভিশন প্রযোজনা দেখার সৌভাগ্য হলেও সেটি থেকে মঞ্চনাটকের মৌলিক স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ ছিলো না। একালের দর্শকদের জন্য নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের রক্তকরবীই প্রধান ভরসা। অন্য আরো কিছু দলের রক্তকরবী প্রযোজনা থাকলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত শক্ত মাটির ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। তবে ব্যতিক্রম ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সুদীপ চক্রবর্তী ও ড. সাইফুল ইসলামের নির্দেশনায় রক্তকরবী প্রযোজনা। নির্দিষ্ট একটি সময়ের পরে ছাত্রছাত্রীরা পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাওয়ায় এই রক্তকরবীর মঞ্চায়ন আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ঊনিশটির মতো প্রদর্শনী হয়েছিলো উল্লিখিত রক্তকরবীর। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাবাহিনী কর্তৃক ছাত্র নিপীড়ন এবং শিক্ষক গ্রেফতারের প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এই রক্তকরবী নেমে এসেছিলো উত্তাল সড়কে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগের এই রক্তকরবীর উপস্থাপন ছিলো পালা আঙ্গিকে। এ প্রযোজনাটিও ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলো উপস্থাপন-নৈপুণ্যে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত আতাউর রহমান-নির্দেশিত এবং নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়-প্রযোজিত রক্তকরবীর ললাটেই শততম মঞ্চায়নের মণিকাঞ্চন যুক্ত হয়। নাগরিকের রক্তকরবী বিপুল দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতেই শততম সফল মঞ্চায়নের গৌরব অর্জন করে।
রক্তকরবী নাটকের প্রতি দর্শকদের এত আগ্রহের প্রধান কারণ সম্ভবত এর টেক্সট। রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের লেখা নাটক এটি। যখন তিনি এ-নাটক লেখেন, তখন তিনি অতিক্রম করে গেছেন নাট্য-সম্পর্কিত তাঁর কৈশোর-যৌবনের ধ্যান-ধারণা। তিনি ফাল্গুনী নাটকের মঞ্চসজ্জা নিয়ে বলতে গিয়ে ততদিনে চিত্রপটের পরিবর্তে চিত্তপটের কথা বলে দিয়েছেন, অনুভব করেছেন দেশজ, তথা প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর কথা।
রক্তকরবী নাটকের নেপথ্যের চরিত্র অর্থাৎ রাজা সবসময়ই আড়ালে থাকেন, নিজেকে একটা দূরত্বে রাখেন। একটা জালের অন্তরালে থেকে তিনি তাঁর কাজ করে যান। পৃথিবীর সমস্ত সাম্রাজ্য ও সামন্তবাদী নৃপতিরা নিজেদের আবরণ ভেঙে কখনই বেরিয়ে আসেন না। যক্ষপুরীর রাজাও তাই। এই রাজার ইচ্ছের কাছে পরাধীন কিছু শ্রমিক, যারা সুড়ঙ্গ কেটে সোনার তাল এনে তার হাতে দিতে জীবনবাজি রেখে পশুর মতো শ্রম দিয়ে চলেছে। সোনার খনির সুড়ঙ্গের খোদাইকরেরা যেন মানুষ নয়, এক একটি নম্বর বা সংখ্যা। ‘এই রাজ্যের যারা সর্দার তারা যোগ্য লোক এবং যাকে বলে বহুদর্শী। রাজার তারা অন্তরঙ্গ পার্ষদ। তাঁদের সতর্ক ব্যবস্থাগুণে খোদাইকরদের কাজের মধ্যে ফাঁক পড়তে পায় না এবং যক্ষপুরীর নিরন্তর উন্নতি হতে থাকে।’ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই এই নাটকের নাট্যপরিচয়ে এমন কথা বলে গেছেন। এর মাঝেই আমরা এস্টাবলিশমেন্টের চিরন্তনী একটা গন্ধ পেয়ে যাই। সেই এস্টাবলি¬শমেন্টে পদবৃদ্ধি, উপাধি লাভের আড়ালে চলতে থাকে শাসককেন্দ্রিক সম্পদের পাহাড়বৃদ্ধির চিরায়ত কৌশল। সেই এস্টাবলি¬শমেন্টের পকেটের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে ধর্মের ধ্বজাধারী গোঁসাই নামক (আ)জীব, ‘তিনি নাম গ্রহণ করেন ভগবানের কিন্তু অন্ন গ্রহণ করেন সর্দারের।’
এই অন্ধকারের নোংরা ব্যবস্থার মধ্যে হঠাৎ আলো হয়ে দেখা দেয় প্রেম। খুনোখুনি, কাড়াকাড়ির অভিসম্পাতের মাঝে মোহন বাঁশির সুর  হয়ে আসে প্রেম। এই প্রেমই রক্তকরবী নাটকের মূল চরিত্র নন্দিনী। নন্দিনী সকলকে আলোর পথে আহ্বান করে। নন্দিনী এক বিস্ময় হয়ে সকলকে নাড়া দিয়ে যায়। নন্দিনী যে-আলোর সওদা নিয়ে যক্ষপুরীতে আসে, সে এক নতুন উপলব্ধি। অধ্যাপককে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলান – ‘সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেওয়ালের ফাটল দিয়ে আলো আসে সে আর-এক কথা। যক্ষপুরে তুমি সেই আচমকা আলো।’
নন্দিনীর আহ্বানে চঞ্চল সবার চিত্ত। সকলের মাঝে সঞ্চারিত হয় মুক্তির স্বাদ। সকলেই পেতে চায় নন্দিনীকে। কিন্তু নন্দিনী কারো কাছে ধরা দেয় না। নন্দিনী পেতে চায় রঞ্জনকে। যে-রাজা উপলব্ধি করে ‘বিশ্বের বাঁশিতে নাচের যে ছন্দ বাজে সেই ছন্দ’ হলো নন্দিনী। সেই নন্দিনীকে সেও পেতে পায়। নন্দিনী তাকে বাইরে বেরিয়ে আসতে বলে। কিন্তু রাজার পক্ষে তা অসম্ভব। তারপরও রাজা তাকে কামনা করে। যদিও রাজা জানে তার আর রঞ্জনের মাঝে তফাৎটা কী – ‘আমার মধ্যে কেবল জোরই আছে, রঞ্জনের মধ্যে আছে জাদু’। অথচ রঞ্জন এক অদৃশ্য শেকলে বন্দি। শেষ পর্যন্ত জোরের কাছে জাদুর পরাজয় ঘটে, এ যেন সামন্ততান্ত্রিকতা, যান্ত্রিকতা, পুঁজিতন্ত্রেরই ব্রহ্মত্বলাভ!
রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী ঢাকার মঞ্চে একটি নান্দনিক প্রযোজনা হিসেবে উপস্থাপনের কৃতিত্বের দাবিদার নির্দেশক আতাউর রহমান। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্যের কথা আমাদের জানা। তিনি তাঁর শ্রম ও মেধা দিয়ে রক্তকরবীকে প্রস্ফুটিত করেছেন, বিকশিত করেছেন। তাঁর কর্মচেষ্টা যে সফল হয়েছে তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ এই নাটকের শততম মঞ্চায়ন। নিঃসন্দেহে তিনি সাধুবাদ প্রাপক। তবে একটি বিষয় আমাকে আন্দোলিত করে চলেছে।
নির্দেশক এ-নাটক সম্পর্কে স্মরণিকায় বলেছেন – ‘পাণ্ডিত্য, আবিষ্টতা ও প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে রক্তকরবীকে আজকের দর্শকদের কাছে অর্থবহ ও মনোগ্রাহী নাট্য প্রযোজনা হিসেবে তুলে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছি।’ তাঁর এ-কথাটির একটি অংশের অর্থ আমার বোধগম্য নয়। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে তিনি আবিষ্টতা ও প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে তাঁর নিজের কাজটি করবেন – এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি পাণ্ডিত্য থেকে মুক্ত থাকার কথা বলবেন কেন? হতে পারে তিনি তাঁর প্রযোজনার গায়ে এমন কোনো পাণ্ডিত্যের অলংকার পরাতে অনিচ্ছুক, যাতে পাণ্ডিত্য দেখানোর ব্যাপারটি দর্শকের চোখে লাগে। কিন্তু পাণ্ডিত্য থেকে মুক্ত থেকে রক্তকরবীর মতো প্রযোজনা করা কি আদৌ সম্ভব? সহজ কথা যায় না বলা সহজে। সাধারণের পক্ষে তো সহজ কথা সহজে বলা সম্ভব নয়। সত্যিকারের পণ্ডিতই তো পারেন সহজ করে সহজ কথাটা বলতে।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এ-প্রযোজনাটির প্রথম দিককার একটি এবং ১০১তম মঞ্চায়ন দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। প্রযোজনাটি দর্শকনন্দিত হয়েছে। তবে শুরুর দিকের প্রদর্শনীতে নাটকটিতে যে টানটান ব্যাপারটি ছিলো ১০১তম প্রদর্শনীতে যেন তার ছন্দপতন অনুভূত হলো। বারবার অভাব বোধ করেছি বিশুরূপী খালেদ খানের। এই কীর্তিমান অভিনেতা শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে অভিনয় থেকে দূরে আছেন। এ আমাদের জন্য অপরিমেয় ক্ষতি ও দুর্ভাগ্য। ফাগুলাল চরিত্রে লুৎফর রহমান জর্জের অনুপস্থিতিও চোখে পড়ে। তবে বর্তমানে বিশু চরিত্রে রাজীব দে এবং নন্দিনী চরিত্রে নায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলির সপ্রাণচেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। মঞ্চ পরিকল্পনায় মোঃ সাইফুল ইসলাম যক্ষপুরীর চমৎকার আবহ তৈরিতে সমর্থ হয়েছেন। আলোক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নাসিরুল হক খোকন দারুণ পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর আলো নাটকের অন্তর্লোক ও বহির্লোককে সমানভাবে আলোকিত করতে সমর্থ হয়েছে। শব্দ ও সংগীত পরিকল্পনায় ছিলেন প্রাজ্ঞ নাট্যজন কে বি আল আজাদ। তাঁর কাছে আমাদের চাহিদা অনেক বেশি। তাঁর মেধার সম্পূর্ণ স্ফুরণ এ-নাটকে লক্ষ করা যায়নি।

বিসর্জন নাটকের দ্বিশততম মঞ্চায়ন : রবীন্দ্রনাট্যে
নতুন ইতিহাস গড়লো তীর্যক
চট্টগ্রামের তীর্যক নাট্যদলের প্রযোজনায় বিসর্জন নাটকের ২০০ ও ২০১তম প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের কথা আগেই বলেছি। দ্বিশততম মঞ্চায়নের বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তীর্যক নাট্যদল ২০১১ সালের ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর থিয়েটার ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রামে দুই দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি, শিক্ষাবিদ ড. অনুপম সেন, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, শিশু-শিক্ষা ও সংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রগণ্য ব্যক্তি শিলা মোমেন, ভারতের নাট্য-গবেষক নৃপেন্দ্র সাহাসহ উপস্থিত ছিলেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নাট্যকর্মীবৃন্দ। দুদিনের এ অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিলো নাট্যকর্মীদের জন্য এক সুপ্রীতি মিলনমেলা।
উল্লেখ্য, তীর্যক নাট্যদল ১৯৯৫ সালে আহমেদ ইকবাল হায়দারের নির্দেশনায় বিসর্জন নাটকটি মঞ্চে আনে। মাঝে বার দু-তিনেকের বিরতির পরে আবার তারা এ-নাটকের মঞ্চায়ন অব্যাহত রাখে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, বিসর্জন নাটকেরও প্রচুর মঞ্চায়ন হয়েছে বিভিন্ন দলের প্রযোজনায়। তবে একটি দলের প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটকের দ্বিশততম মঞ্চায়নের নজির প্রথম স্থাপন করলো তীর্যক নাট্যদল। তীর্যক নাট্যদল যে বিরল দৃষ্টান্ত রাখলো তা রবীন্দ্রনাট্যের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য নাটকগুলোর মধ্যে বিসর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিসর্জন নাটকের বিষয়বস্তু ও সংলাপের কাব্যগুণ পাঠক ও দর্শকদের চিত্তকে আন্দোলিত করে। প্রেমের সঙ্গে প্রতাপের যে-দ্বন্দ্ব
সে-দ্বন্দ্বই প্রকাশমান বিসর্জন নাটকে। ধর্মের নামে পশু বলির নারকীয়তার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কলম সোচ্চার করেছিলেন তাঁর বিসর্জন নাটকে এবং রাজর্ষি উপন্যাসে। রাজর্ষি সম্পর্কে কবি বলেন – ‘প্রেমের অহিংস পূজার সঙ্গে হিংস্র শক্তিপূজার বিরোধ।’ আর বিসর্জন নাটকে গোবিন্দমাণিক্যের মুখ দিয়ে কবি বলান –  ‘… এতদিন স্বপ্নে ছিনু,/ আজ জাগরণ। বালিকার মূর্তি ধরে/ স্বয়ং জননী মোরে বলে গিয়েছেন,/ জীবরক্ত সহে না তাঁহার।’
রবীন্দ্রনাথ বিসর্জন নাটকে মাত্র গুটিকয়েক চরিত্রের মাঝে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি করে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। হিংস্র-অমানবিকতার বিপরীতে মানুষের শুভবুদ্ধির জয়গান গেয়েছেন।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, তীর্যকের বিসর্জন ছাড়াও আরো বেশ কটি দলের বিসর্জন-প্রযোজনা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেসব প্রযোজনার মাঝে নায়লা আজাদ নূপুরের নির্দেশনায় দশ রূপকের বিসর্জন এখনো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। এ প্রযোজনাটিতে নানারকম নিরীক্ষার কাজ ছিলো, যা সত্যিই দর্শকদের আনন্দদানে সার্থক হয়েছিলো। আর একটি বিসর্জনের কথা জানতে পেরেছি, কিন্তু দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কলকাতার দল তৃতীয় সূত্রর প্রযোজনায়, সুমন মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় বিসর্জন নাটকের খ্যাতির কথা কানে এসেছে, সে-প্রযোজনাটি চোখে দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।
বলছিলাম বিসর্জন প্রসঙ্গে। এখানে বাঞ্ছনীয় হলো তীর্যকের বিসর্জন প্রযোজনা নিয়ে কথা বলা। তীর্যকের এ-প্রযোজনায় বিসর্জন নাটকের মূল সুরটি উপস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছেন নির্দেশক আহমেদ ইকবাল হায়দার। গুণবতী ও অপর্ণা এ-নাটকে পরস্পর বিপরীত দুই চরিত্র। আবার জয় সিংহ দ্বিধাদ্বন্দ্বে দোদুল্যমান। একদিকে পিতৃসম রঘুপতির আদেশ, অন্যদিকে তার নিজের বিবেক, গোবিন্দমাণিক্যের প্রজ্ঞা, অপর্ণার
সহজ-সরল চিন্তাভাবনা নাট্যঘন মুহূর্তের সৃষ্টি করে বারে বারে। সবশেষে জয় সিংহের আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে রঘুপতির আত্মোপলব্ধির বিষয়টি বেশ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এ-নাটকে।
তীর্যকের এ-প্রযোজনাটি অবশ্যই একটি অনন্য প্রযোজনা। দীর্ঘদিন ধরে প্রযোজনাটি চললেও তার গাঁথুনিতে একটুও মেদ জমেনি। এর কৃতিত্ব অবশ্যই নির্দেশক আহমেদ ইকবাল হায়দারের। তিনি যে প্রতিনিয়ত প্রযোজনাটির উৎকর্ষ সাধনে সচেষ্ট তা প্রযোজনাটি দেখলেই চোখে পড়ে। দৃশ্যান্তরের সময় পূজামণ্ডপে বিসর্জনের ঢাক বাদনের সঙ্গে আলো ও কোরিওগ্রাফির ব্যবহার বেশ হৃদয়গ্রাহী। তবে বিষয়টির অতিব্যবহার মাঝে মাঝে একঘেয়ে মনে হয়। নির্দেশক বিষয়টি নিয়ে আর একটু ভাবলে ভালো হয়। এ নাটকের মঞ্চপরিকল্পনা বেশ ভালো, তবে সেট কম্পোজিশনে আরো সিমেট্রিক হওয়া গেলে, অভিনেতৃমণ্ডলীর সঙ্গে সেটের একটা সুষম সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারতো। বিসর্জনের আলো গড়পড়তা। আলোর বিন্যাস কখনো কখনো নাটকের মেজাজকে উসকে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
নাটকের অভিনয়শিল্পীদের দু-একজন ছাড়া সকলেই কুশলী ছিলেন। রঘুপতি চরিত্রে আহমেদ ইকবাল হায়দার, গুণবতী চরিত্রে রুকসানা করিম মুক্তি, অপর্ণা চরিত্রে শায়লা শারমিন বেশ চমৎকার অভিনয় করেছেন। তবে জয় সিংহ চরিত্রে সুজিত চক্রবর্তী এবং গোবিন্দমাণিক্য চরিত্রে এ কে এম ইছমাইলের অভিনয়ে আরো পারঙ্গমতা দাবি রাখে। আর একটি বিষয় এ-নাটকের শিল্পীদের মনে রাখা এবং চর্চা করা জরুরি – কোনোভাবেই যেন উচ্চারণে কোনো একটি শব্দও আঞ্চলিকতার দোষে দুষ্ট না হয়।
তীর্যক তাদের বিসর্জন নাটক দিয়ে রবীন্দ্রনাট্যের যে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলো তাকে সাধুবাদ। অভিনন্দন তীর্যক নাট্যদল।

Leave a Reply

*