logo

সত্তরের দশকের শিল্প ও শিল্পী : অন্যতম প্রেরণা মুক্তিযুদ্ধ

ন জ রু ল ই স লা ম
পঞ্চাশ ও ষাট, এ দুদশকের মধ্যেই বাংলাদেশের চারুকলা যথেষ্ট আধুনিক চরিত্র অর্জন করেছিল, মূলত ইউরোপীয় বা পাশ্চাত্য শিল্পের শৈলী ও কৌশলাদিকে অবলম্বন করে। তবে একই সঙ্গে পাশাপাশি বাংলার লোকশিল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য উৎসারিত আঙ্গিক ও নানা প্রতীকনির্ভর নিজস্ব জাতীয় শিল্পধারা নির্মাণের প্রয়াসও চোখে পড়েছে, বিশেষত জয়নুল আবেদিন (১৯১৪-৯৬) ও কামরুল হাসানের (১৯২১-৮২) কাজে।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি ও সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, আর বাংলাদেশের চূড়ান্ত মুক্তির আন্দোলন শুরু হয়েছিল সত্তরের দশকের একেবারে শুরুতেই। ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ – এরকম রাজনৈতিক স্লোগানের পরিপূরক শৈল্পিক আন্দোলন ছিল জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় আয়োজিত ‘নবান্ন’ চিত্রকলা প্রদর্শনী। এ উপলক্ষে জয়নুল অাঁকেন তাঁর ঐতিহাসিক পঁয়ষট্টি ফুট দীর্ঘ ‘নবান্ন’ স্ক্রল চিত্রটি। এতে একসময়ের সোনার বাংলা কীভাবে শ্মশানে পরিণত হয়েছিল সে-কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এ-বছরেই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ১২ নভেম্বর সংঘটিত হয় মানব ইতিহাসের ভয়ংকরতম ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, যাতে তিন লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। জয়নুল আবেদিন অাঁকেন তাঁর আরেকটি অবিস্মরণীয় স্ক্রল চিত্র ‘মনপুরা ৭০’। ঝড়ের পরপর অনুষ্ঠিত হয় তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন ও বাঙালির ভাগ্যনির্ধারণী বিজয়। কিন্তু বিজয়ের স্বাদ পেল না বাঙালি, বরং তাকে শুরু করতে হয় এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে শহীদ হন তিরিশ লাখ বাঙালি। লাখ লাখ নারীর মর্যাদাহানি হয়। অবকাঠামো ও অর্থনীতি সর্বাত্মকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাঙালি স্বাধীন হলো, তারা তাদের নেতা শেখ মুজিবকে নিজেদের মাঝে ফিরে পেল ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। তিনি দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করলেন, মাত্র এক বছরের মধ্যেই স্বাধীন দেশের নিজস্ব সংবিধান উপহার দেন, তাতে অবদান রাখার সুযোগ করে দেন জয়নুল আবেদিনসহ অন্য শিল্পীদের। শিল্পাচার্যের পরামর্শে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমী প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালে (১৫-৩০ মার্চ) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো। বাঙালির এমনই ভাগ্য, ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন, ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হলো। বাঙালিত্বকে ধ্বংস করাই ছিল খুনিদের অন্যতম উদ্দেশ্য। পাকিস্তানি মানসিকতার সামরিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তাদের নিজস্ব আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে – এটাই ছিল স্বাভাবিক। তবে এদেশের চারুশিল্পীরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালিত্বের প্রতি ছিলেন পুরোপুরি নিবেদিত। শিল্পাচার্য ১৯৭৬ সালে পরলোকগমন করলে কামরুল হাসান ও অন্য শিল্পীগণ চারুকলার শক্তিশালী প্রগতিশীল আধুনিক ধারা অব্যাহত রাখেন, নতুন নতুন মাধ্যম ও শৈলীও যুক্ত হতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সত্তরের দশকের চারুশিল্পে অবশ্যই বড় ভূমিকা রেখেছে, তবে তা আরো অর্থবহ হয়েছে পরবর্তী দশকসমূহে। অবশ্য বলতেই হয়, এদেশের আধুনিক চারুশিল্প আগাগোড়াই খুব সেক্যুলার ঘরানার। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ কিছুটা ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছু শিল্প সৃষ্টিতে উৎসাহী হয়েছেন, তাঁরা আবার মূল সেক্যুলার ধারাতে ফিরেও এসেছেন।
শিল্প ও শিল্পী ত্রৈমাসিকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত আমার রচনার ধারা অনুসরণ করেই বলতে চাইব যে, সত্তরের দশকের চারুশিল্পের বর্তমান পর্যালোচনাতে এই দশকে সৃজিত ও প্রদর্শিত এদেশের পূর্বতন প্রজন্মের শিল্পীদের শিল্পকর্ম এবং এই দশকে আবির্ভূত (অর্থাৎ মূলত ১৯৭০ থেকে ১৯৭৯-এর স্নাতক) শিল্পীদের কাজই বিবেচিত হবে। প্রধানত ১৯৭২ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় প্রদর্শনী ও শিল্পীদের একক বা দলীয়/গোষ্ঠী প্রদর্শনী দশকের শিল্পকর্ম মূল্যায়নে সহায়তা করেছে।

প্রাক-সত্তর প্রজন্মের শিল্পীদের সত্তরের দশকের কাজ সত্তরের দশকের শুরুতে আমরা দেখি জয়নুল আবেদিনই এদেশের চারুশিল্পে সৃজনশীলতার নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেন ১৯৭০ সালে অাঁকা ‘নবান্ন’ দীর্ঘ চিত্র বা ‘স্ক্রল’ দিয়ে। বাংলাদেশের লোকচিত্রকলার ঐতিহ্যের অনুসরণে তিনি অাঁকলেন পঁয়ষট্টি ফুট দীর্ঘ ‘নবান্ন’ শীর্ষক জড়ানো বা গোটানো পট। সোনার বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঔপনিবেশিক শক্তির চাপে কীভাবে ক্রমান্বয়ে অভাবী বাংলায় পর্যবসিত হলো এবং অন্তিমে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় গ্রামের মানুষকে নিঃস্ব করে শহরমুখী হতে বাধ্য করেছিল, সে কাহিনি অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও দক্ষতার সঙ্গে জয়নুল তুলে ধরেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির জাত্যভিমান জাগ্রত করা। আর কাজটিতে তিনি হাত দিয়েছিলেন ’৭০-এর ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই।
নবান্ন স্ক্রল অাঁকায় তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর প্রিয় মাধ্যম, সাদা কাগজে কালো কালি। তুলির বলিষ্ঠ রেখা, সঙ্গে যুক্ত করেছেন জায়গায় জায়গায় কিছু হালকা রং এবং মোমের রেখা। কাহিনিনির্ভর স্ক্রলটি এর দৈর্ঘ্যের কারণেও বিশিষ্টতা দাবি করতে পারে। ‘নবান্ন’তে জয়নুল আরেকটি বিষয় যোগ করেছিলেন, এটি অবশ্য আগেও তিনি তাঁর কোনো কোনো জলরং কাজে ব্যবহার করেছেন, তা হলো তাঁর ছবির এক দিকে তাঁর দর্শকদের স্বাক্ষর দিতে উৎসাহ দেওয়া। এভাবে শিল্পীর সঙ্গে দর্শকের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের অত্যন্ত অগ্রসর চিন্তার তিনি দৃষ্টান্ত রেখেছেন।
১৯৭০ সালেই জয়নুল আরেকটি বৃহৎ শিল্পকর্ম সৃজন করেন,‘মনপুরা ৭০’। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সংঘটিত মহাদুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস বিষয়ক শিল্পকর্মটি নবান্নের মতোই একটি দীর্ঘ জড়ানো পটচিত্র, পঁয়ত্রিশ ফুট লম্বা, চার ফুট প্রশস্ত কাগজে অাঁকা। ‘নবান্নে’র মতোই মোটা তুলির অাঁচড়ে কালো কালির রেখাসমৃদ্ধ। স্ক্রলটিতে শুধুই সাদা-কালো, অন্য কোনো রং নেই। অসংখ্য মানুষের সারি সারি লাশ, নারী-পুরুষ, শিশু, সঙ্গে গৃহপালিত পশু, অত্যন্ত করুণ দৃশ্য। সবশেষে মাথা নিচু করে বসে থাকা একজন বলিষ্ঠ পুরুষ। পর্যুদস্ত, অবসন্ন কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ জীবনেরও প্রতীক। সারি সারি মৃতদেহ, এই দৃশ্য নিয়ে একটি মর্মস্পর্শী মন্তব্য ছিল জয়নুলের, ‘আমরা বাঙালিরা শুধু মৃত্যুতে এক হই।’
জয়নুল ছিলেন মানুষের শিল্পী। উপকূলের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সংবাদ পেয়ে তিনি সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন, রিলিফ বা সাহায্য বহনকারী দলের সঙ্গে। কিন্তু ওখানে গিয়ে স্বভাবতই তাঁর শিল্পীমনে প্রচন্ড ধাক্কা লাগে। যেমন লেগেছিল তরুণ শিল্পী জয়নুলের মনে ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষের দৃশ্যাবলিতে। জয়নুল ঘূর্ণিঝড় বিষয়ে ‘মনপুরা ৭০’ শীর্ষক দীর্ঘ স্ক্রল ছাড়াও আরো বেশ কিছু বড় ছবি এঁকেছিলেন। একটিতে দেখিয়েছেন অসংখ্য সাপের ফণার মতো মহা ঢেউ, যা সহজেই জাপানি শিল্পী হুকোসাইয়ের সুনামি ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনীয়। আরেকটি ছবিতে এঁকেছেন জলোচ্ছ্বাসে ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখানো জননেতা মওলানা ভাসানীর প্রতিকৃতি। সৃজনশীল শিল্পকর্মে এভাবে রাজনৈতিক নেতাকে উপস্থাপনের দৃষ্টান্ত সম্ভবত বাংলাদেশে জয়নুলই স্থাপন করেছেন। পরবর্তী সময়ে শাহাবুদ্দিন, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, শাহজাহান বিকাশ প্রমুখ এরকম ছবি অাঁকেন। শিল্পশৈলীর দিক থেকে আমার কেবলই মনে হয়, ‘মনপুরা ৭০’ জয়নুল আবেদিনের মহত্তম কাজের একটি যে শুধু তা-ই নয়, এটি জীবননির্ভর আধুনিক বিশ্ব চিত্রশিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বর্তমান সময়ে দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনে মানবিক বিপর্যয় বিষয়ক যে আলোচনা তাৎপর্য পাচ্ছে তাতে একজন বড়মাপের শিল্পীর প্রতিক্রিয়া হিসেবে জয়নুলের ‘মনপুরা ৭০’ অবশ্যই স্মরণীয়।
জয়নুল আবেদিন শুধু তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমেই যে বাঙালি জাতীয়তাবোধের দৃষ্টান্ত রেখেছেন তা-ই নয়, তিনি সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলনেও যুক্ত হয়েছেন। ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে, অর্থাৎ প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর এক মাস আগেই তিনি ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত মওলানা ভাসানীর এক জনসভায় অংশ নিয়ে বক্তৃতা করেন এবং পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত তাঁর ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধি বর্জন করেন। এদিক থেকেও তিনি অগ্রণী ও অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জয়নুল শিল্পকলার সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী স্থাপনে বিশেষ অবদান রেখেছেন। লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠায়ও পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তাঁর শিল্পকর্মের নিদর্শন নেহাতই সীমিত। ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা বা ’৭০-এর নবান্ন কিংবা ‘মনপুরা ৭০’-এর মতো বড়মাপের কাজ করতে পারেননি। একমাত্র দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক স্বাক্ষর ও তারিখবিহীন তাঁর ছোট একটি স্কেচ, যেখানে দেখানো হয়েছে সাত-আটজন মুক্তিযোদ্ধার একটি আক্রমণাত্মক দল অপারেশনে যাচ্ছে। তবে স্বাধীনতা তাঁকে মুক্তমনে আধুনিক বিমূর্ত বা সমবির্মূত আঙ্গিকে কাজ করতে আগ্রহী করেছে। ১৯৭২ সালে অাঁকা ‘বিমূর্ত কম্পোজিশন’ শীর্ষক তেলরং কাজটি এমনি একটি চমৎকার উদাহরণ। তাঁর এধরনের কাজ তরুণ শিল্পীদের আধুনিকতার দিকে অগ্রসর হতে উৎসাহ দিয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে ছবি অাঁকতে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ বা বলা যায় বাধ্য করেছে শিল্পী কামরুল হাসানকে। যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর অাঁকা ইয়াহিয়ার মুখ ‘এই সব জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ শীর্ষক শক্তিশালী পোস্টার অসাধারণ তাৎপর্য বহন করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সত্তরের দশকের পুরো সময় ধরে কামরুল হাসান মানুষনির্ভর, বিশেষত নারী বিষয়ক, আধা-বাস্তববাদী অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। বস্ত্তত সত্তরের দশক কামরুল হাসানের শিল্পীজীবনের অত্যন্ত সৃষ্টিসফল সময়। ১৯৭২ সালে অাঁকা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক তাঁর একটি তেলরং ছবি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অাঁকা কাজ হিসেবে উল্লেখযোগ্য। দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষ বছর পর্যন্ত তিনি অসংখ্য অনবদ্য চিত্র সৃজন করেছেন, এদের মধ্যে স্মরণীয় ‘নায়র’ (১৯৭৫), ‘গরুর পাল’ (১৯৭৫), ‘কলসী কাঁখে’ (১৯৭৪) বা ‘বাংলা একাডেমীর বটতলা’ (১৯৭৯)। আঙ্গিকেও নতুনত্ব এনেছেন তখন। উজ্জ্বল প্রাথমিক রং ব্যবহার করে ফর্ম ভেঙে অবয়বপ্রধান প্রকাশবাদী আঙ্গিক। দশকের প্রথম দিকে প্রচুর কাঠখোদাই কাজ করেন। ছোট-বড় বিভিন্ন মাপের কাজ। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিশৃঙ্খল ও অরাজক পরিস্থিতি তাঁকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে। তিনি বেশ কিছু তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক কাজ করেন এই সময়কে নিয়ে।
সফিউদ্দীন আহমেদ নিসর্গ, মাছ ধরার জাল, বন্যা, গ্রাম ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে আধা-বিমূর্ত ও প্রতীকসমৃদ্ধ তেলরং ও ছাপচিত্র অাঁকেন সত্তরের দশকে। পরবর্তী সময়ে তিনি একাত্তর-প্রভাবিত ‘চোখ’ সিরিজ অাঁকেন, রেখানির্ভর কাজ। মোহাম্মদ কিবরিয়া সত্তরের দশকে আগের মতোই বিশুদ্ধ বিমূর্ত থেকে যান, মূলত রং, ফর্ম ও বুনটের মুন্শিয়ানা প্রমাণ করেন।
প্রবীণ শিল্পীদের মধ্যে এস এম সুলতান সত্তরের দশকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে উপস্থাপন করেন। প্রথমে ১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় চারুশিল্প প্রদর্শনীতে এবং অল্পদিনের মধ্যে তাঁর বিশেষ একক প্রদর্শনীর মাধ্যমে। বাংলার ভূমিপুত্র কৃষকের জীবনসংগ্রাম, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি তাঁর বিশাল বিশাল ক্যানভাসে উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধও তাঁর বিষয় হয়েছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ যুগের চিত্রশৈলীর সঙ্গে নিজস্ব আঙ্গিক যোগ করে উপমহাদেশের চারুশিল্পে নতুন এক শৈলী নির্মাণ করেন। গোটা দশক এবং আমৃত্যু সুলতান বাংলাদেশের চিত্রকলায় দাপট দেখিয়েছেন তাঁর চিত্রশৈলী ও ব্যক্তিগত জীবনধারার মাধ্যমে। ঐতিহ্য ভাঙার দৃষ্টান্ত তাঁকে বিশিষ্ট করেছিল। সুলতান বস্ত্ততই শিল্পকলার জগতে সত্তরের দশকের বড় চমক।
পঞ্চাশের দশকের শিল্পী আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর প্রমুখ সত্তরের দশকে তাঁদের কাজে সমৃদ্ধি দেখিয়েছেন। প্রত্যেকের কাজেই মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব অথবা প্রতীকী প্রভাব প্রত্যক্ষ করা গেছে। আবদুর রাজ্জাক তেলরঙে নিসর্গনির্ভর আধা-বিমূর্ত ধারা বজায় রেখেছেন কিন্তু ভাস্কর্যে মুক্তিযোদ্ধাকে মহত্ত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্য চর্চার সুযোগ প্রসারিত হয়েছে মূলত রাজ্জাকের নেতৃত্বে। কাইয়ুম চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধ ও পল্লী নিসর্গকে অসাধারণ আধা-বিমূর্ত আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তী দীর্ঘ সময়েও তিনি সচল ও শক্তিশালী শিল্পী। ‘৭ই মাচ ৭১’ (১৯৭২), ‘প্রতিবাদ’ (১৯১২) ‘বাংলাদেশ ’৭১’ (১৯৭২), ‘স্বাধীনতা’ (১৯৭২) ‘শহীদ ’৭১’(১৯৭২) ইত্যাদি কাজ উল্লেখযোগ্য। কাজগুলো বেশ জটিল কম্পোজিশন তবে পরবর্তী সময়ে কাইয়ুম ‘আমার গ্রাম’ শীর্ষক এবং অন্য অনেক সাজানো সুন্দর ছবি এঁকেছেন। রশিদ চৌধুরী ট্যাপিস্ট্রি ও তেলরং উভয় মাধ্যমে অবয়ব ও ঐতিহ্যনির্ভর উজ্জ্বল আধা-বিমূর্ত কাজ করেছেন সত্তরের দশকজুড়ে। মুর্তজা বশীরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভিত্তিক বিমূর্ত সিরিজ ‘এপিটাফ’ সত্তরের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ দেশি ইট দিয়ে চমৎকার ‘অক্ষরবট’ শীর্ষক মোজাইক করেন তিনি। এককালের বাম রাজনীতিতে বিশ্বাসী এই শিল্পী পরবর্তী সময়ে ‘কলেমা তৈয়বা’ শীর্ষক একটি আকর্ষণীয় ক্যালিগ্রাফি-নির্ভর আধা-বিমূর্ত চিত্রমালা সৃজন করেন। অবশ্য স্বল্পস্থায়ী ছিল তাঁর এই মনোযোগ।
ষাটের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের অধিকাংশ অবশ্য সত্তরের দশকে এসে নিজেদের বিশিষ্টতা প্রমাণ করার সুযোগ পান। এঁদের মধ্যে মনিরুল ইমলাম স্পেনে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়ে দীর্ঘকাল সেদেশেই অবস্থান করেন এবং সুনাম ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ছাপচিত্রে দক্ষ এই শিল্পী তেলরং, অ্যাক্রিলিক, জলরং, কোলাজ ইত্যাদি মাধ্যমেও কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধ তাঁকেও অনুপ্রাণিত করেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী আধা-বিমূর্ত ক্যানভাস চয়নে। কাছাকাছি সময়ের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হাশেম খান, রফিকুন নবী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি এঁকেছেন। মূলত নিসর্গ ও জীবনঘনিষ্ঠ কাজ করেন, আধা-বিমূর্ত আঙ্গিকে। রফিকুন নবী গ্রিসে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, হাশেম খান দেশেই শিল্পচর্চা করেছেন। শহিদ কবীর মনিরুল ইসলামের মতো স্পেন প্রবাসী ছিলেন, মানব-অবয়ব ও আধ্যাত্মিক বিষয়নির্ভর আধা-বিমূর্ত ছবি এঁকেছেন। মাহমুদুল হক জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন, ছাপচিত্র ও তেলরঙে শিল্পী বিমূর্ত প্রকাশবাদী ঘরানার কৃতী শিল্পী। মুক্তিযুদ্ধ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক কিংবা পরিবেশগত বিপর্যয় তাঁর কাজে প্রত্যক্ষ প্রভাব রাখে না। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালেদ ভাস্কর্য শিল্পে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত তার ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যটি রীতিমতো একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ষাটের দশকের প্রবীণ শিল্পী আবু তাহের সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প সৃষ্টি করেছেন। বিশেষভাবে স্মরণীয় তাঁর ‘তিন শহীদ’ শীর্ষক একটি কাজ, যেটি সত্তরের দশকে জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শিত হতো। আধা-বিমূর্ত অবয়বভিত্তিক কাজ। হাত পিছমোড়া করে দুচোখ বাঁধা অবস্থায় তিনজন মুক্তিকামী বাঙালিকে হত্যা করে খাদে ফেলে রাখা হয়েছে। টেক্সচার-প্রধান তেলরং। যুদ্ধের অমানবিকতার প্রাণস্পর্শী শিল্পকর্ম।
ষাটের দশকের আরো বেশ কয়েকজন শিল্পী সত্তরের দশকে নিজস্ব শৈলী নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। শাহতাব বিনম্র ভঙ্গিতে আধা-বিমূর্ত অবয়বী ও নিসর্গ চিত্র সৃজন করেছেন, প্রধানত ধূসর ও নীল জাতীয় বর্ণবিন্যাসে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছবিও এঁকেছেন, তবে তাঁর রোমান্টিক মেজাজের তেলরঙের কাজগুলোই মনে পড়ে। ১৯৭৩ সালে আয়োজিত তাঁর একক প্রদর্শনীটি নানা দিক থেকে ছিল উল্লেখযোগ্য।
ষাটের শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, শামসুল ইসলাম নিজামী, মোহাম্মদ মোহসীন, আবদুল মুকতাদির, মিজানুর রহিম, আবুল বারক আলভী, মতলুব আলী, বীরেন সোম, রেজাউল করিম, কালিদাস কর্মকার প্রমুখ নিজস্ব আঙ্গিক নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন সত্তরের দশক বা তারও পরে।
ষাটের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের মধ্যে হামিদুজ্জামান খান সত্তরের দশকে সৃজিত তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ব্রোঞ্জ ও অন্যান্য ধাতু ও কংক্রিটের অনবদ্য ভাস্কর্যকর্মের জন্য বিপুলভাবে প্রশংসিত, বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের গায়ে বসানো তাঁর ‘সংশপ্তক’ যথার্থই মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য প্রতীকী কাজ। তাছাড়া দশকের প্রথমার্ধে বরোদায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণকালে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বেশ কিছু ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য করেন। পরবর্তী সময়ে হামিদুজ্জামান দেশে ও বিদেশে বেশ কিছু উচ্চমান স্থাপনা ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন সত্তর ও আশির দশকে।

সত্তরের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের শিল্পচর্চা সত্তরের দশকে চারুবিদ্যায় আনুষ্ঠানিক স্নাতক নিয়ে শিল্পাঙ্গনে আবির্ভূত হয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিভাবান শিল্পী। এঁদের অধিকাংশই ঢাকার চারুকলা কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়েছেন। কাজী রকিবের মতো দুয়েকজন অবশ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের স্নাতক। এঁদের অধিকাংশের জন্ম ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮-এর মধ্যে, স্নাতক লাভ করেন ১৯৭০ থেকে ১৯৭৯-এর মধ্যে, সে হিসেবে সত্তরের দশকের শিল্পী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। সত্তরের দশকে স্নাতকপ্রাপ্ত শিল্পীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় আবদুস শাকুর শাহ্কে, তাঁর জন্ম ১৯৪৭ সালে, তবে স্নাতক লাভ করেন ১৯৭০ সালে। একই সালে স্নাতকপ্রাপ্তদের মধ্যে আরো ছিলেন স্বপন চৌধুরী ও কাজী গিয়াস উদ্দিন। সত্তরের দশকের শিল্পীদের মধ্যে স্নাতক লাভের দিক থেকে কনিষ্ঠ গোলাম ফারুক বেবুল, তিনি ১৯৭৯ সালে স্নাতকপ্রাপ্ত হন। মধ্যবর্তী সময়ে, অর্থাৎ ১৯৭১ থেকে ১৯৭৮-এর মধ্যে স্নাতক লাভ করেছেন সত্তরের দশকের উল্লেখযোগ্য শিল্পী আবদুস সাত্তার, মনসুর উল করিম, অলোক রায়, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, চন্দ্র শেখর দে, হাসি চক্রবর্তী, কে এম এ কাইয়ুম, মারুফ আহমেদ, এ কে এম আলমগীর হক, অলকেশ ঘোষ, মোমিনুল রেজা, শাহাদত হোসেন, রুহুল আমিন কাজল, মোস্তাফিজুল হক, নাসিম আহমদ নাদভী, নাজলী লায়লা মনসুর, ফরিদা জামান, নাইমা হক, নাসরিন বেগম, কুহু, জামাল আহমদ, রনজিৎ দাস প্রমুখ।
সত্তরের দশকের বাংলাদেশের প্রতিভাবান শিল্পীরা মূলত ঢাকার চারুকলা কলেজের স্নাতক, তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ ও চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ থেকেও স্নাতক বের হয়েছে সত্তরের দশকের মাঝ ও শেষ দিকে। ষাটের শেষ ও সত্তরের দশকের বিভিন্ন সময়ে দেশে স্নাতকপ্রাপ্ত অনেক তরুণ শিল্পী দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। কয়েকজন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, যেমন স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা জার্মানিতে গিয়েছেন, কেউ কেউ জাপানে; তবে বেশিসংখ্যক গিয়েছেন ভারতে, প্রধানত গুজরাটের বরোদায় ও পশ্চিম বাংলার শান্তিনিকেতনে।
সত্তরের দশকে আবির্ভূত কোনো কোনো শিল্পীর প্রধান প্রেরণা ছিল অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধ। তবে তাঁদের কারো কারো মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিল্প সৃজন হয়তো ওই দশকেই তেমনটি হয়নি বরং হয়েছে পরবর্তী দশকে। শিল্পীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যোদ্ধা হিসেবে অথবা নানাভাবে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছেন এমন শিল্পীও ছিলেন – আবুল বারক আলভী, স্বপন চৌধুরী, শাহাবুদ্দিন প্রমুখ।
সত্তরের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের কাজে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বাস্তববাদী অথবা আধা-বিমূর্ত আঙ্গিকে। তাছাড়া পূর্ব প্রজন্মের শিল্পীদের মতো সত্তরের দশকের শিল্পীদের কাজে সমকালীন অন্যান্য ধারার অনুসরণ দেখা গেছে, যেমন কিউবিজম ধর্মী আধাবাস্তব ও অবয়বী, পরাবাস্তব বা প্রতীকসমৃদ্ধ আঙ্গিক ইত্যাদি। তখন অবশ্য শিল্পীদের কাছে নিসর্গ খুব প্রিয় ছিল বলে মনে হয় না।
স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই, ১৯৭২ সালে চারুকলা কলেজের বার্ষিক প্রদর্শনীতে তখনকার শেষ বর্ষের ছাত্র চন্দ্রশেখর দে উপস্থিত হন এক অসাধারণ শিল্পকর্ম নিয়ে। অত্যন্ত বাস্তবধর্মী কিন্তু শক্তিশালী প্রতীকী চিত্র। বিমূর্ত চিত্রের বিন্যাসসমৃদ্ধ কাজ। মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য করুণ কাহিনির একটির মর্মস্পর্শী রূপায়ণ। একটি বাড়ির আধা-খোলা সদর দরজায় সদ্য গুলিবিদ্ধ মহিলার পায়ের পাতা দুটো ও সাদা শাড়ির কিছুটা দর্শকের সামনাসামনি। দরজা গাঢ় সবুজ, দেয়াল ধূসর ও ঘোলাটে সাদা, দেয়ালে অাঁচড় কাঁটা কাঁচা হাতের লেখালেখি ও রেখাচিত্র। বাড়িটা হিন্দু পরিবারের হবে বলেই মনে হয়। কাঠের দরজার সবুজ রঙের ওপর সিঁদুর মাখানো। উল্লম্ব ও আনুভূমিক ক্ষেত্র বিভাজনে অতি সহজ কম্পোজিশন। অত্যন্ত যত্ন করে টেক্সচার তৈরি করা হয়েছে। অসাধারণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে ছবিটি। তরুণ চন্দ্রশেখরের অনবদ্য শিল্পকর্ম। তিনি অবশ্য পরবর্তী সময়ে সরে গেছেন জটিল অলংকরণ ও উচ্চকিত রঙের দিকে। সে ধারাতেও ভালো কাজ করেন।
সত্তরের দশকের আরেক শক্তিশালী শিল্পী আবদুস সাত্তার। তিনিও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রতীকী বিমূর্ত শিল্পকর্ম সৃজন করেছেন। গুলিবিদ্ধ ক্যানভাস, বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রভাবিত কাজ। সাত্তার কিছুদিন ভারতীয় প্রাচ্য ধারায় সুন্দর কাজ করেছেন, তবে মূলত বিশুদ্ধ বিমূর্ত শিল্প আঙ্গিক তাঁর বৈশিষ্ট্য। সাত্তার একাধারে শিল্পকলাবিদ্যার গবেষকও, তিনি দারুশিল্পের ওপর ডক্টরেট করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
সত্তরের দশকের প্রথম দিককার আরেক স্নাতক কাজী গিয়াস উদ্দিন, তাঁর শিল্প-প্রতিভার প্রকৃত বিকাশ ঘটেছে জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও পরবর্তী জাপান প্রবাসে। মূলত বিমূর্ত ধারায় অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্পী। বাল্যস্মৃতি তাঁকে নস্টালজিক করে। বাংলাদেশের দুর্যোগ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক ঘটনা-দুর্ঘটনা ইত্যাদি তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে খুব একটা প্রভাবিত বা আলোড়িত করেছে বলে মনে হয় না। নিসর্গ নিমগ্ন অনুভূতির প্রকাশ তাঁর সূক্ষ্ম শৈলীর তেলরং কাজে। জলরঙেও অত্যন্ত দক্ষ ও নিজস্বতাসম্পন্ন শিল্পী। তেলরং কাজে ক্ষুদ্রাকৃতির সংকেত বা ইমেজ ব্যবহার করেন। বাংলা বর্ণমালা, সংখ্যা, কথা, কবিতা, গানের কলি ইত্যাদি প্রতীক হিসেবে এনেছেন কখনো কখনো। সত্তরের দশকে তাঁর কাজ অবশ্য কিছুটা প্রথাগত বিমূর্ত-প্রকাশবাদী আঙ্গিকের ছিল, যেখানে গাঢ় রঙের ক্ষেত্র তৈরি হতো এবং ইম্প্যাস্টো টেক্সচার। ক্রমান্বয়ে তিনি বিমূর্ত সূক্ষ্মতার দিকে অগ্রসর হয়েছেন এবং দেশ-কাল অতিক্রম করে গেছেন, বিমূর্ততার অপূর্ব এক নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন। তিনি নিজেকে মনে করেন নিসর্গাশ্রয়ী। বাংলাদেশের বৃষ্টি, প্রকৃতির ঘ্রাণ তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। সত্তরের দশকের বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত অন্যতম শিল্পী গিয়াস। কাজী গিয়াস চারুকলায় পিএইচ-ডি করেছেন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে।
গিয়াস ও সাত্তারের প্রায় সমসাময়িক শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর ব্যক্তিসত্তা ও শিল্পীসত্তাকে পরিপূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। শাহাবুদ্দিন সত্তরের দশকে বাস্তববাদী ও
আধা-বাস্তববাদী আঙ্গিকে জীবনভিত্তিক ছবি এঁকেছেন। একপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাই তাঁর কাজের মূল প্রেরণা ও বিষয় হয়ে যায়। বছরের পর বছর প্রায় একই বিষয় নিয়ে কাজ করতে থাকেন। নিজস্ব শৈলী নির্মাণ করেন। বিক্রমশালী, পেশিবহুল, দ্রুতগামী মুক্তিযোদ্ধা, ক্যানভাসে হয়তো শুধু একজন যোদ্ধা, অথবা একাধিক, কখনো দলবদ্ধ। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নিয়েও ছবি এঁকেছেন শাহাবুদ্দিন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর বেশ কিছু অবিস্মরণীয় কাজ করেছেন। আশির দশকের শেষ দিকে সামরিক শাসনামলে যখন সাধারণত কেউ ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দ উচ্চারণ করতেও সাহসী হতো না, তখন বঙ্গবন্ধু ও ভাসানীকে নিয়ে বিশাল ক্যানভাস প্রদর্শন করে মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু-প্রেমিক শাহাবুদ্দিন তাঁর প্রত্যয় প্রকাশ করেন। সমকালীন বিমূর্ত প্রকাশবাদী, পরাবাস্তববাদী বা প্রতীকী চিত্রধারার পাশাপাশি বাস্তববাদী অবয়বী ছবি এঁকেও শাহাবুদ্দিন নিজস্বতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, এটি বিশাল অর্জন। তাঁর মানুষ-প্রধান কাজ অবশ্য এক হিসেবে
আধাবাস্তব, অনেক ক্ষেত্রে তাঁর মানুষদের মাথা থাকে না, অথবা অপ্রদর্শিত থাকে একটি হাত বা পা। বিশাল ক্যানভাসের বড় একটি অংশ খোলা রাখার পদ্ধতিও তিনি ব্যবহার করেন। শাহাবুদ্দিন মূলত প্যারিস প্রবাসী, তবে ইদাীনং ঢাকায় বসেও প্রচুর কাজ করেন।
সত্তরের দশকের ঢাকার শিল্পী শাহাদৎ হোসেন, মারুফ আহমেদ, রুহুল আমিন কাজল প্রমুখও ইউরোপ প্রবাসী। এ কে এম আলমগীর হক কানাডা প্রবাসী, চমৎকার বিমূর্ত ধারার মেধাবী শিল্পী।
সত্তরের দশকের প্রথম দিককার স্নাতক আবদুস শাকুর শাহ্ অবশ্য সৃজনশীল শিল্পী হিসেবে সেই দশকেই তেমন উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেননি। তিনি বিকশিত হয়েছেন নববইয়ের দশকের শুরুতে।
মৈমনসিং গীতিকার কাহিনি ও কথানির্ভর এক সুন্দর লোকজ আধুনিক শিল্পধারার সূচনা করেন এবং দ্রুত প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তিনি। প্রধানত মুখাবয়ব, নারী ও পুরুষের সম্মুখ দৃশ্য কিংবা প্রোফাইল, চড়া রং, মুখের বা শরীরের রং পরাবাস্তবভাবে লাল, নীল বা কালো, গীতিকার পংক্তিসহ জ্যামিতিক বিন্যাস ইত্যাদি শাকুরের কাজের মূল বৈশিষ্ট্য।
মনসুর উল করিম সত্তরের দশকের আরেকজন প্রতিভাবান শিল্পী, তবে তাঁকেও নিজস্বতা পেতে সময় নিতে হয়েছে। প্রথম দিকে আধাবিমূর্ত অবয়বী কাজ করেছেন, পরে নববইয়ের দশকে নিসর্গ, শস্যক্ষেত্র, কৃষক এমন বিষয় নিয়ে অনেকটা সাংকেতিকভাবে রং ও রেখার চমৎকার চিত্রপট সৃজন করেন। তাঁর সবুজ কলাপাতা সবুজ, তাঁর নীল গাঢ়, তবে খয়েরি, ধূসর, হলুদ ও বাদামিও ব্যবহার করেন প্রচুর। তাঁর রেখা সরু ও অসংলগ্ন, এসব রেখায় রং-এলাকা যুক্ত হয় বা বিভাজিত হয়। মানব অবয়ব অনেকটাই পরাবাস্তব, তাদের বলিষ্ঠ দেহে হয়তো মাথা থাকে না, হাত কিংবা পা অসম্পূর্ণ।
সত্তরের দশকের শেষ দিকের স্নাতক কাজী রকিব, তরুণ ঘোষ, রনজিৎ দাস, জামাল আহমদ কিংবা মুহম্মদ ইউনুসরা প্রত্যেকেই প্রতিভাবান শিল্পী। জামালের নিজস্বতা আধুনিক বাস্তববাদী আঙ্গিকে অবয়বী চিত্র বা নদী-নিসর্গ অাঁকায়, ইউনুস পরিপূর্ণ বিমূর্ত, অসাধারণ বুনট তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য। রনজিৎ দাস বাস্তব অবয়বের সঙ্গে বিমূর্ত বিন্যাসের সমন্বয় ঘটান, ক্যানভাসে আড়াআড়ি বা উল্লম্ব চওড়া রেখা অাঁকেন, যেন এগুলো অনেকটাই তাঁর সিগনেচার। অলক রায় একই দশকের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী, যিনি টেরাকোটা মাধ্যমে নতুন শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন, অনেকটাই এগুলো স্থাপনা শিল্প। তবে এসব শিল্পীর কাজে নিজস্বতা সত্তরের দশকের নয়, বরং পরবর্তী সময়ের।
সত্তরের দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এক ঝাঁক খুবই মেধাবী মহিলা শিল্পীর আবির্ভাব। ফরিদা জামান, নাইমা হক, নাসরীন বেগম, নাজলী লায়লা মনসুর, দীপা হক, কুহু – এঁরা সব এই দশকের শিল্পী, অনেকেই অবশ্য পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ফরিদা জামান তাঁর প্রিয় বিষয় নারী, মাছ, বিড়াল, জাল, নৌকা, নদী – সবকিছু চমৎকার আখ্যানে গেঁথে ফেলেন। হালকা রং ও সরু রেখা ব্যবহার করেন, কিছু রঙের ক্ষেত্র অসংখ্য ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। ফর্মে ও রঙে নারীই তাঁর প্রিয়। ‘সুফিয়া’ নামের একটি সাধারণ নারীর চরিত্র দাঁড় করিয়েছেন। ফরিদা জামান উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন ভারতের বরোদার এম এস বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বিশ্বভারতীতে। ডক্টরেট করেছেন বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলায় লোকশিল্প কলার প্রভাব বিষয়ে। নাসরীন বেগম মূলত নারী ও প্রকৃতির আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে পরাবাস্তব বক্তব্য রাখেন। অসাধারণ সুন্দর বিমূর্ত বিন্যাসে জলরং করেছেন তিনি। নাজলী মনসুর অসম সাহসী শিল্পী, শহুরে নারীর বিপর্যস্ত পরিস্থিতি পরাবাস্তব অবয়বী আঙ্গিকে উপস্থাপনা করেন। দীপা হক অল্প বয়সে লোকান্তরিত হয়েছেন, বারবনিতা ও অন্যান্য প্রান্তিক নারীর কথা তুলে ধরেছেন। নাইমা হক প্রতীকী বির্মূত কাজ করেন, রং ও ফর্মের সামান্যীকরণ তাঁর বৈশিষ্ট্য।
সত্তরের দশকে সৃজিত ও প্রদর্শিত শিল্পকলার দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, প্রবীণতম শিল্পীদের মধ্যে দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি, সমাজ এবং বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ উল্লেখযোগ্য প্রভাব রেখেছে। তরুণদের মধ্যে শাহাবুদ্দিনকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ফসল মনে হয়। ভাস্কর্যে হামিদুজ্জামান খান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
সমাজব্যবস্থা বা সামাজিক অব্যবস্থায় বিশেষ করে নারীর প্রান্তিক পরিস্থিতি এই দশকের দুয়েকজন তরুণ মহিলা শিল্পীকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। উল্লেখ্য, নারী শিল্পীদের কাজে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন বা সরাসরি প্রভাব চোখে পড়ে না। আঙ্গিক ও শিল্পশৈলী ও মাধ্যম নির্বাচনের ক্ষেত্রে এদেশের সত্তরের দশকের তরুণ শিল্পীরা আন্তর্জাতিকতার বিশ্বস্ত অনুসারী হতে উৎসাহী হয়েছেন। তবে এক্ষেত্রেও দুয়েকজন, কিছু সময় পরে হলেও, দেশজ লোকজ শিল্পশৈলীর উৎস ধরে এগিয়ে গেছেন এবং সফলতা লাভ করেছেন। ভাস্কর্য, টেরাকোটা ও ছাপচিত্রে নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। চারুশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা সুদৃঢ় হয়েছে। শিল্পশিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার চারুকলা কলেজের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ ও চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ, ভারতের বরোদার এম এস বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিম বাংলার শান্তিনিকেতন ও জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই দশকের মাঝামাঝি এদেশের শিল্পের মহাবনস্পতি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পরলোকগমন করেন। অন্যদিকে এই দশকে আবির্ভূত কিছু তরুণ পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে মর্যাদাপূর্ণ আসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। সত্তরের দশক যথার্থই বাঙালি জাতির জন্য যেমন ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যময়, বাংলাদেশের আধুনিক চারুশিল্পের জন্যও বেশ গর্বের। 

 

Leave a Reply

*