logo

সতীর্থ শিল্পী চতুষ্টয় রাজ্জাক, রশিদ, কাইয়ুম ও বশীর

নজরুল ইসলাম

ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউট বা চারুকলা ইনস্টিটিউটে এদেশের শুরুতেই যাঁরা পড়তে এসেছিলেন তাঁরা নেহাতই প্রাণের তাগিদে এমনটি করেছিলেন। জয়নুল আবেদিন – এ নামটিও সম্ভবত তাঁদের কাউকে কাউকে আকর্ষণ করেছে। চল্লিশের দশকের শুরু থেকেই তৎকালীন বাংলার মুসলমানদের কাছে বেশ পরিচিত ও প্রিয় নাম ছিল জয়নুল আবেদিন। যেমন ছিল আব্বাসউদ্দীন, জসীমউদ্দীন, ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নাম। নজরুল তো আগে থেকেই তাঁদের অহংকার।

এদেশের কিছু তরুণের চারুকলায় ছিল যেমন তাদের আপন আগ্রহ, তেমনি এক্ষেত্রের পথিকৃৎ জয়নুল আবেদিনের কৌশলী উদ্যোগের কথাও মনে করতে হয়। তিনি এবং তাঁর কলকাতার শিল্পী বন্ধু ও সহযোগীরা যখন ঢাকায় চারুকলা বিদ্যায়তন খোলার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন একই সঙ্গে উদ্যোগী ছিলেন আগ্রহী মেধাবী ছাত্র জোগাড়ে। প্রসঙ্গত ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা শিল্পী ঢাকার ছেলে আমিনুল ইসলামের কথা মনে করা যায়। তিনি তার স্বপ্নের শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হতে গিয়েছিলেন, ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হয়েছিলেন; কিন্তু ভর্তির আগেই সে কলেজের শিক্ষক জয়নুল আবেদিন তাঁকে ঢাকায় প্রস্তাবিত আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে অনুপ্রাণিত করলেন। আমিনুলও সম্মত হলেন, কলকাতার আর্ট স্কুলে পড়ার পরিকল্পনায় সমাপ্তি টেনে ঢাকায় চলে আসেন ঢাকার ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার জন্য। কিন্তু ক্লাস শুরুর দেরি হতে দেখে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন, কিছু সময় পর ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটে ক্লাস শুরু হলে সেখানে ভর্তি হন। তিনিই আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের একজন ছাত্র। শুরু থেকেই সেরা ছাত্র। ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন প্রথম বিভাগে। ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরের পর। জয়নুল আবেদিনই সব ব্যবস্থা সেরে রেখেছিলেন, সিদ্ধান্ত ছিল এর প্রথম অধ্যক্ষও তিনিই হবেন। অবশ্য কিছুদিনের জন্য তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে একটি ভালো পদে কর্তব্যপালনের জন্য করাচি চলে যান, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পান তাঁর বন্ধু সহযোগী আনোয়ারুল হক। জয়নুল আবেদিন আট মাস পর ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় ফিরে এসে আর্ট ইনস্টিটিউটে নিয়মিত অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন।

আমিনুল ইসলাম জয়নুল আবেদিনের তাগিদেই ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউটে চারুকলা পাঠ শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন হামিদুর রাহমান, নুরুল ইসলাম, ইমদাদ হোসেন এবং অন্যরা, মোট ১৫-১৬ জন (আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশের শিল্প-আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৩, পৃ. ৩৬)। এঁদেরকে নিয়েই আর্ট ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু। ইমদাদ হোসেন কিছুদিন পর পড়া ছেড়ে চলে যান। পরের বছর আবার ভর্তি হন দ্বিতীয় ব্যাচের সঙ্গে। অন্যদিকে বছর তিনেক পর কলকাতা থেকে এসে আমিনুল ইসলামদের সঙ্গে যুক্ত হন (১৯৫১ সালে) বিজন চৌধুরী। এদিকে পাঁচ বছরের পাঠক্রমের বছর দুয়েক শেষ করেই হামিদুর রাহমান আর্ট পড়তে ইউরোপ চলে যান। প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের (ছাত্রী ছিলেন না কেউ) মধ্যে আমিনুল ইসলাম ও বিজন চৌধুরী চূড়ান্ত পর্বে প্রথম শ্রেণি পেয়ে পাঁচ বছরের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেন। প্রথম ব্যাচের ১৫-১৬ জন ছাত্রের মধ্যে অন্তত দুজন, আমিনুল ইসলাম ও হামিদুর রাহমান পরবর্তী সময়ে দেশসেরা শিল্পী হয়েছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন। বিজন চৌধুরী অবশ্য পাশ করার পর ভারত চলে গিয়েছিলেন এবং খ্যাতিমান শিল্পী হয়েছেন। আমিনুল ইসলাম পাশ করার পরপরই বৃত্তি নিয়ে ইতালি চলে যান, ১৯৫৬ সালে দেশে ফিরে ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউটে লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতায় যোগ দেন, ১৯৭৮ সালে অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া পর্যন্ত নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁকে এদেশের আধুনিক ধারার শিল্পচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ গণ্য করা হয়। অর্থাৎ জয়নুল আবেদিন যথার্থ জহুরি ছিলেন। আমিনুল ইসলামকে কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে ঢাকায় প্রস্তাবিত আর্ট ইনস্টিটিউটে পাইওনিয়ার ছাত্র করার ভূমিকা পালন করেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

শুরুতে ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের জায়গা হয়েছিল পুরান ঢাকার জনসন রোডে অবস্থিত তৎকালীন ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল ভবনের একতলার পেছন দিকের দুটি কামরা ও বারান্দায়। এখানেই শ্রেণিকক্ষ, এখানেই

সাত-আটজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসার জায়গা। সম্ভবত সে কারণেই প্রথম দিকের ছাত্রদের আউটডোরে কাজ করতে বেশি উৎসাহ দেওয়া হতো। অতি স্বল্পপরিসর দুই কামরার আর্ট ইনস্টিটিউটেই কেটেছে ঢাকার চারুকলা বিদ্যাপীঠের প্রথম চার বছর। ১৯৫২ সালের মাঝামাঝি ইনস্টিটিউট জনসন রোড থেকে নতুন ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাগানসহ মাঝারি আকারের একটি দোতলা বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। প্রথম ব্যাচের আমিনুল ও সতীর্থরা এখান থেকেই ১৯৫৩ সালে তাঁদের পাঁচ বছরের চারুকলা পাঠক্রম শেষ করেন। তাঁদের মতো একইভাবে একই পরিসরে চারুশিল্প শিক্ষা গ্রহণ করে পরবর্তী আরো তিনটি ব্যাচ।

ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্ররা তাঁদের ক্লাস শুরু করেছিলেন ১৯৪৯ সালে জনসন রোডের বাড়িতে এবং শেষ করেছেন সেগুনবাগিচা থেকে ১৯৫৪ সালে। দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রদের মধ্যে চারজনকে নিয়ে আমার বর্তমান আলোচনা। প্রারম্ভিক ভূমিকাটি ছিল ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক পরিবেশ বোঝার চেষ্টা।

আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, আর্ট ইনস্টিটিউটের জনসন রোডের সেই অতি স্বল্পপরিসর দুই কক্ষের প্রতিষ্ঠানটি চোখে দেখার, ১৯৫১ সালে প্রথম দেখি। ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র আবদুর রাজ্জাক আমার ছোট চাচা, একাধিকবার তাঁর সঙ্গে ইনস্টিটিউট দেখতে গিয়েছিলাম। আমি তখন পুরান ঢাকার নবাবপুর হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, বয়স ১২। সুযোগ পেলেই ছুটির দিনে চাচার সঙ্গে তাঁর আউটডোর স্কেচের সময় সঙ্গী হতাম।

ঢাকার চারুকলার দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রসংখ্যাও সম্ভবত প্রথম ব্যাচের মতোই ১৪-১৫ জন হবে। এই ব্যাচের অন্তত ছয়জনের নাম পরবর্তী সময়ে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল, এঁরা হলেন আবদুর রাজ্জাক, রশিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন ও জুনাবুল ইসলাম। এঁদের মধ্যে একমাত্র মুর্তজা বশীর জীবিত (বয়স প্রায় ৮৬) এবং নিয়ত সৃজনশীল। প্রথম পাঁচজনই একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী, কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে স্বাধীনতা পদকও পেয়েছিলেন। ইমদাদ হোসেন চারুকলার চেয়ে কারুশিল্পে সময় বেশি দিয়েছেন, জুনাবুল ইসলাম বাটিক শিল্পে পারদর্শী হয়েছেন, একপর্যায়ে চারুকলা কলেজের (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ও আরো পরে অনুষদ) অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমান রচনায় আমার মূল আলোচ্য চারুকলা দ্বিতীয় ব্যাচের চারজন অসাধারণ প্রতিভাবান ছাত্র রাজ্জাক, রশিদ, কাইয়ুম ও বশীর। আমি সবসময় ভেবে অবাক হয়েছি, পাকিস্তান আমলে কেমন করে এরকম চারজন তরুণের একত্র সমাবেশ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁরা প্রত্যেকে চারুকলার বিভিন্ন দিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। কোনো কোনো বিষয়ে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমান ও নভেরা আহমেদের (অবশ্য ঢাকার ছাত্রী ছিলেন না) মতো বাংলাদেশের আধুনিক ধারার শিল্পকলার ভিত্তি গড়েছিলেন এই চার শিল্পী। তাঁদের প্রায় সমবয়সী মোহাম্মদ কিবরিয়াও  অন্যতম পথিকৃৎ, তবে তিনি ছিলেন কলকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র। প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের মতো জনসন রোডের অতি স্বল্পপরিসর স্থাপনা থেকে শুরু হওয়া তৃতীয় ও চতুর্থ ব্যাচের ছাত্রদের কৃতিত্বের কথাও বলা যায়, তবে বর্তমান নিবন্ধের আলোচ্য শুধু দ্বিতীয় ব্যাচের চার সতীর্থ শিল্পী। উল্লেখক্রমে তাঁদের বয়স বা জন্মসন ও ম্যাট্রিকুলেশন পাশের সাল বিবেচনা করেছি। এঁদের অফিশিয়াল জন্মসাল প্রথম তিনজনের ১৯৩২ সালের বিভিন্ন তারিখ ও চতুর্থজনের (কাইয়ুমের) জন্মসাল ১৯৩৪। এঁদের মধ্যে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান মাধ্যমিক) পরীক্ষা পাশের সাল রাজ্জাকের ১৯৪৭, বাকি তিনজনের ১৯৪৯। একমাত্র রাজ্জাক ইন্টারমিডিয়েট (আইএসসি) পাশ করে (১৯৪৯) চারুকলা পড়তে এসেছিলেন। তাঁর প্রকৃত জন্ম ১৯৩২-এর সম্ভবত দুই-তিন বছর আগে। সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের একই ব্যাচের এই চার সতীর্থের প্রায় সকল পর্যায়ে এবং চূড়ান্ত পর্বে, পরীক্ষায় সেরা ফল অর্জন করেছিলেন আবদুর রাজ্জাক, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। শিল্পী হিসেবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় উৎকর্ষ দেখিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে জাতীয় পর্যায়ের চিত্রকলা প্রতিযোগিতায় কাইয়ুম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতেও শীর্ষে। তাঁদের মধ্যে তুলনা সম্ভব নয়। চার সতীর্থ প্রত্যেকেই নিজ অঙ্গনে অপ্রতিদ্বন্দ¦ী। শিল্পী হিসেবে ঈর্ষণীয় প্রতিভাধর। চারজনই দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন, সে অবস্থানে তারা নেতৃত্বদানকারী ও অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। ব্যক্তিগতভাবে কেউ ছিলেন নিভৃতচারী আত্মকেন্দ্রিক, কেউ সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে তৎপর। আমার সৌভাগ্য কৈশোর থেকে শুরু করে আমি এঁদেরকে কিছুটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। রাজ্জাক তো ছিলেন পরিবারের একজন, মুর্তজা বশীর আবার ছিলেন নবাবপুর স্কুলে আমাদের ড্রইং টিচার।

রাজ্জাক, রশিদ, কাইয়ুম ও বশীর ১৯৪৯ সালে যখন চারুকলা শিক্ষায় ভর্তি হলেন, তাঁদের প্রত্যেকের ভেতরেই শিল্পী-প্রতিভা সুপ্ত ছিল। তাঁদের জীবনী বা আত্মজৈবনিক রচনা থেকে জানা যায় কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে চারুকলা শিক্ষায় এসেছেন, কেউ বা অন্য কারো প্রণোদনা বা তাগিদে এসেছেন (বশীরের বেলায় যেমন তাঁর কমিউনিস্ট পার্টির তাগিদে)।

রাজ্জাক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন। ইচ্ছা করলে প্রকৌশলবিদ্যায় সুযোগ পেতে পারতেন, ম্যাট্রিক পাশ হলেই চারুকলায় ভর্তি হওয়া যেত, সেখানে তিনি আইএসসি পাশ করে ভর্তি হয়েছেন। গ্রামীণ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের ছেলে, প্রকৌশল বা প্রযুক্তিবিদ্যায় না গিয়ে চারুকলা বেছে নিয়েছেন একান্ত ব্যক্তিগত ভালোলাগা থেকে। বড় ভাই স্বল্প আয়ের সরকারি চাকুরে। তার ছোট ভাড়া বাড়িতেই রাজ্জাকের থাকা-খাওয়া। বেশ অর্থকষ্টের মধ্যেই ঢাকায় তাঁর ছাত্রজীবন কেটেছে, নিজস্ব আয় বলতে হয়তো মাঝেমধ্যে সামান্য কিছু হতে পারত। তাঁর বাবা ছিলেন ঢাকার সার্ভে স্কুলের পাশ করা সার্ভেয়ার। কিন্তু পেশা হিসেবে তা নেননি, বরং গ্রামে নিজের জমিজমা দেখেছেন, গৃহস্থালি করেছেন। রাজ্জাক ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট, সাংসারিক বা পারিবারিক দায়দায়িত্ব তেমন ছিল না। রাজ্জাক শুরু থেকেই ইনস্টিটিউটে তাঁর ক্লাসের সেরা ছাত্র, জয়নুল আবেদিনের খুব প্রিয়। চারুকলায় স্নাতক হয়ে আমেরিকায় ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পান ও কৃতিত্বের সঙ্গে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাপচিত্রে বিশেষজ্ঞতা লাভ করেন। পেইন্টিং ও ভাস্কর্যেও উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। বস্তুত রাজ্জাক এদেশের শিল্পীদের মধ্যে প্রথম চারুকলার মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী। ১৯৫৭ সালে দেশে ফিরে সরাসরি আর্ট ইনস্টিটিউটে যোগদান করেন এবং ২০০৫ সালে মৃত্যুকাল পর্যন্ত শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। চারুকলা মহাবিদ্যালয়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করার মূল দায়িত্ব পালন করেছিলেন রাজ্জাক (১৯৮৩-৮৫)। রাজ্জাক পেইন্টিং, ড্রইং, প্রিন্টমেকিং বা ছাপচিত্রে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, পাশাপাশি ভাস্কর্য শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রসারে পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছেন। নভেরা আহমেদের ভূমিকা ছিল এদেশে আধুনিক ভাস্কর্য পরিচয় করানোতে, অন্যদিকে রাজ্জাক ভাস্কর্য শিক্ষার ভিত্তি দিয়ে গেছেন। সামাজিকভাবেও মাধ্যমটিকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে গেছেন। তিনি নিজেও সৃজনশীল ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছেন, তবে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন গাজীপুরের চৌরাস্তায় স্থাপিত তাঁর ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ শীর্ষক বিশালকায় মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্যটির (১৯৭২) জন্য। চিত্রকলা মাধ্যমে তিনি তাঁর ছয় দশকের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাস্তবানুগ, আধা বিমূর্ত আঙ্গিক থেকে সম্পূর্ণ বিমূর্ত আঙ্গিকে রূপান্তরিত হয়েছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় সতীর্থ রশিদ প্রমুখের সঙ্গে রাত জেগে পোস্টার আঁকা, ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে গোলাগুলির পর রক্তাক্ত আবুল বরকতকে বহনকারী মুর্তজা বশীরকে পরে রিকশায় করে পুরান ঢাকায় তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, এধরনের ঘটনায় যুক্ত থাকা ছাড়া, পরবর্তী সময়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন বা সংগ্রামের সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত হননি, কিন্তু আগাগোড়াই আধুনিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক মানসিকতাসমৃদ্ধ ছিলেন। তাঁর শিল্পকর্মে কোনোরকম ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ আসেনি। এমনকি প্রতীকীভাবেও নয়। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা তাঁর সৃজনকর্মের প্রেরণা ও বিষয় হয়েছে।

রশিদ চৌধুরী রাজবাড়ীর অভিজাত (তবে ক্ষয়িষ্ণু) জমিদারবাড়ির ছেলে, অনেক ভাই-বোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ একজন। চারুকলার ছাত্র হিসেবে রাজ্জাক ও রশিদ খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, ছাত্রাবস্থায় পুরান ঢাকায় একই এলাকায় বসবাস করেছেন। স্নাতক হয়ে বৃত্তি নিয়ে রাজ্জাক গেলেন আমেরিকা (১৯৫৫-৫৭), আর রশিদ স্পেনে (১৯৫৬-৫৭)। পরে আবার ফ্রান্সে (১৯৬০-৬৪)। ফ্রান্সে তিনি ট্যাপেস্ট্রিতে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ইউরোপ থেকে ফিরে প্রথম ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট ও পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। সেখানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে চারুকলা বিভাগ শুরু করেন এবং একজন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। পাশাপাশি ট্যাপেস্ট্রি চর্চায় নিজস্ব স্টুডিও বা কর্মশালা প্রতিষ্ঠা করেন। ট্যাপেস্ট্রি শিল্পে তিনি সম্পূর্ণ নতুন পথ দেখালেন। বলা যায়, সারা দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশেই ট্যাপেস্ট্রিকে আধুনিক সৃজনশিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করার শীর্ষ উদাহরণ রশিদ চৌধুরীর কাজ। তিনি অকালপ্রয়াত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিসম্ভার অতি সমৃদ্ধ। বাংলার লোকজীবন ও লোকশিল্পের নানা মোটিফ বা প্রতীক তিনি তাঁর পেইন্টিং ও ট্যাপেস্ট্রিতে রূপান্তরিতভাবে সংযোজন করেছেন। রশিদ কবিতাও লিখতেন। দু-দুবার ইউরোপে শিল্প শিক্ষা গ্রহণ, ইউরোপীয় মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন, প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার মানুষ রশিদ চৌধুরী, জীবনের শেষ পর্যায়ে কিছুটা আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন, ইসলাম ধর্মীয় মর্মবাণীর প্রতীকী ব্যবহার যুক্ত করেছিলেন। তাঁর অসংখ্য পেইন্টিং ও ট্যাপেস্ট্রিতে ইসলামি আরবি ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পে ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করেছে। এধরনের শিল্পকর্মের বিশেষ ক্রেতা বা পৃষ্ঠপোষক ছিল কিনা জানি না, তবে সেগুলো শিল্পীকে সম্ভবত তৃপ্ত করত।

অনেকটা একই ধরনের বিবর্তন দেখা গেছে মুর্তজা বশীরের চিত্রকলায়। তরুণ বয়সে প্রবলভাবে প্রগতিশীল, সাম্যবাদী, অসাম্প্রদায়িক এবং (সম্ভবত) ধর্ম-উদাসীন বশীরও তাঁর সতীর্থ বন্ধু রশিদ চৌধুরীর মতো ইসলাম ধর্মীয় চিরন্তন বাণী (যথা কলেমা তৈয়বা) অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর চিত্রকর্মে। ‘তাতে সমস্যা কী, মার্ক শাগাল বা অনুরূপ আধুনিক শিল্পীরা কি ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করেননি?’ – এরকম প্রশ্ন তোলেন মুর্তজা বশীর। আসলেই কোনো সমস্যা নেই, শিল্পকর্ম হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব পেলেই তো হলো। বলা বাহুল্য, বিশ্লেষকরা খুঁজতে চাইবেন, কেন তাঁরা এমন ছবি আঁকেন? ভেতরের তাগিদে নিশ্চয়ই? দেখা যায় রশিদ-বশীরের উত্তরসূরি মেধাবী তরুণ শিল্পীরা এ ধরনের কাজে খুব বেশি আকৃষ্ট হন না।

বশীর ১৯৫৬-৫৮ দুই বছর ইতালির ফ্লোরেন্সে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি পেইন্টিং, ফ্রেস্কো বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করেন। একসময় বশীর তাঁর সতীর্থ চার বন্ধুর তুলনায় অনেকটাই বোহেমিয়ান মেজাজের মানুষ ছিলেন। ষাটের দশকের কিছু সময় তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করেন, ছবি আঁকা, প্রদর্শনী করা ইত্যাদিতে ব্যস্ত থাকেন। পেইন্টিংয়ে বশীর তাঁর সতীর্থদের তুলনায় বেশি নিরীক্ষাপ্রবণ ছিলেন, একপর্যায়ে খুবই বিমূর্ত আঙ্গিকের ছবি আঁকেন। বিভিন্ন পর্বে রেখা ও রংপ্রধান অবয়বভিত্তিক কম্পোজিশন করেছেন। নারী তাঁর অন্যতম প্রধান বিষয়। বশীর বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়ালে ফ্রেস্কো করেছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিসৌধে ঝামা ইট ও পাথর ব্যবহার করে অসামান্য এক শিল্পকর্ম সম্পাদন করেন। রশিদ চৌধুরী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনে ট্যাপেস্ট্রি সাজাবার সুযোগ পেয়েছেন। রাজ্জাক বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য দেয়ালচিত্র করেছেন, সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় গাজীপুরের চৌরাস্তায় মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর্য গড়েছেন।

রাজ্জাক, রশিদ, বশীরদের চতুর্থ সতীর্থ প্রতিভা কাইয়ুম চৌধুরী। রাজ্জাকের মতো কাইয়ুমও তাঁর কাজে (মূলত পেইন্টিং) ধর্মবিষয়ক কোনো উল্লেখ রাখেন না, ইশারাতেও তেমন আগ্রহ দেখান না। বরং তিনি বাকি তিনজন থেকে একভাবে আলাদা, তিনি তাঁর পরিণত বয়সে ও শেষের দিকের কাজে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ যুক্ত করেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ তাঁর কাজে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। হয়তো সে কারণে অনেকটা রাষ্ট্রীয় শিল্পীর মর্যাদা পাচ্ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা পুরস্কারও পেয়েছেন (২০১৪ সালে)।

কাইয়ুম তাঁর বাকি তিন সতীর্থ থেকে আরেকভাবেও ভিন্ন। তিনি শিল্পে উচ্চতর শিক্ষার জন্য কখনো বিদেশে যাননি। তাঁর সব প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা দেশে। বেশ পরিণত বয়সে প্রদর্শনী উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। রশিদ চৌধুরী ও মুর্তজা বশীরের মতো কাইয়ুম চৌধুরীও সৃজনশীল লেখালেখি করতেন, কবিতা লিখতেন। বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্কন ও বই নকশায় কাইয়ুম বাংলাদেশে পথিকৃৎ ও অপ্রতিদ্বন্দ¦ী শিল্পী। তিনি প্রচ্ছদ অঙ্কনে সম্পূর্ণ নতুন ধারার প্রবর্তন করেছিলেন, বিশেষ করে বাংলা লিপির নিজস্ব স্টাইল দাঁড় করিয়েছিলেন।

চার সতীর্থ শিল্পীর সকলেই বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, রাজ্জাক ও কাইয়ুম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, রশিদ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। বশীর চট্টগ্রামে। বশীর তাঁর আত্মজীবনী ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে লিখেছেন, শিল্পাচার্য তাঁকে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। এজন্য তাঁর বেশ আক্ষেপ ছিল মনে হয়। তবে চট্টগ্রামে গিয়ে সে সুযোগ পেয়ে তিনি পূর্ণতা পেয়েছেন। তাঁকে নিজের মতো চলতে তাগিদ দিয়েছিলেন শিল্পাচার্য, এজন্য শেষের দিকে বশীর শিল্পাচার্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাই জানিয়েছেন।

চার সতীর্থ শিল্পী ভিন্ন দৈর্ঘ্যরে জীবন পেয়েছেন। রশিদ চৌধুরী বেশ কিছুদিন রোগভোগের পর ঢাকার এক হাসপাতালে ১৯৮৬ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ সময়টা খুব সুখের ছিল না, দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন, কম বয়সী বাঙালি মেয়ে। প্রথম বিয়ে ফরাসি নারীর সঙ্গে, দুই কন্যা ছিল তাঁদের। সংসারে জটিলতা এসেছিল। রাজ্জাকের পারিবারিক শান্তি ছিল, কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র, চারুকলার অত্যন্ত মেধাবী স্নাতক, হঠাৎ অসময়ে মারা গেলে রাজ্জাকের প্রচ- রকম মানসিক কষ্ট হচ্ছিল। তাঁর মৃত্যু ২০০৫ সালে, প্রায় ৭৫ বছর বয়সে। যশোরে চিত্রাঙ্কন কর্মশালায় শিক্ষাদানকালে হার্ট অ্যাটাক হয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান। প্রায় একইভাবে মৃত্যুবরণ করেন কাইয়ুম চৌধুরী, ঢাকায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ২০১৪ সালের সংগীত সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়ে। অত্যন্ত আকস্মিক মৃত্যু। পরিণত বয়সে শান্তিপূর্ণ বিদায়, তাঁর বয়স তখন ৮২। খুবই সৃষ্টিশীল ছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত। মুর্তজা বশীর সতীর্থ চতুষ্টয়ের একমাত্র যিনি বেঁচে আছেন এবং স্বাস্থ্যগত কিছু সমস্যা সত্ত্বেও এখনো অত্যন্ত সৃজনশীল। সম্প্রতি তাঁর স্ত্রীবিয়োগ হওয়াতে সম্ভবত তাঁর মন অশান্ত, কিন্তু শৈল্পিক চেতনা শতভাগ উজ্জীবিত। বছর কয়েক হলো বেঙ্গল পাবলিকেশন্স তাঁর একটি অসাধারণ আত্মজীবনীমূলক  গ্রন্থ প্রকাশ করেছে (২০১৪)। তাতে এদেশের শিল্প-আন্দোলন সম্পর্কে চমৎকার ধারণা পাওয়া যায়। এক জায়গায় তিনি সতীর্থ আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন যে, রাজ্জাক তাঁর সহপাঠী, বন্ধু তবে ব্যক্তিগত বন্ধু নয়, যেমন ছিলেন কাইয়ুম (আমার জীবন ও অন্যান্য, মুর্তজা বশীর, ঢাকা : বেঙ্গল পাবলিকেশন্্স লিমিটেড, ২০১৪, পৃ. ২৪৪)। তেমনটি হতেই পারে, দুজনের ব্যক্তিত্বের অনেক ভিন্নতা ছিল। রাজ্জাক আগাগোড়া ছিলেন শান্ত সৌম্য সংবেদনশীল, বশীর (অন্তত তরুণ বয়সে) ছিলেন অস্থির ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, অনেকটা বোহেমিয়ান। রাজ্জাক গ্রামের ছেলে, বশীর মেট্রোপলিটান, বিখ্যাত প-িত অধ্যাপকের ছেলে, একথা সবসময় মনে রাখতেন। তাঁর জন্ম  ঢাকায়, পিতৃভূমি পশ্চিমবঙ্গ। অন্যদিকে রাজ্জাক ও রশিদের মাঝে একপর্যায়ে খুব সখ্য ছিল। পশ্চিম থেকে ফিরে ১৯৫৮ সালের দিকে দুজন একসঙ্গে সেগুনবাগিচায় ড. কাজী মোতাহার হোসেনের বাড়ির সামনের দিকে একটি কামরা ভাড়া নিয়ে স্টুডিও শুরু করেছিলেন। পরে অবশ্য যার যার কক্ষপথে বেরিয়ে পড়েন। দুজনেরই বাড়ি তৎকালীন ফরিদপুর জেলায়। কাইয়ুম চৌধুরীর জন্ম বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায়। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। চারুকলায় শিক্ষকতা করলেও কমার্শিয়াল কাজে বাইরে প্রচুর সময় দিতেন তিনি। রশিদ চৌধুরীও তাঁর ট্যাপেস্ট্রির বাণিজ্যিক কাজে অনেক সময় দিতেন। তা সত্ত্বেও শিক্ষকতা ও মৌলিক সৃজনকলায় তাঁরা নিবেদিত ছিলেন। কাইয়ুম ও রশিদের তুলনায় রাজ্জাক ও বশীর শিক্ষকতার বাইরে কমার্শিয়াল কাজে কমই ব্যস্ত থাকতেন। রাজ্জাক শিক্ষকতায় অত্যন্ত একাগ্র ও নিয়মানুগ ছিলেন।

পরিণত পর্যায়ে সতীর্থ চার বন্ধুকে খুব বেশি একসঙ্গে দেখা যেত বলে মনে হয় না। দুজনের কর্মক্ষেত্র চট্টগ্রাম, দুজনের ঢাকা। চারজনের মধ্যে কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন অনেকটাই পাবলিক ফিগার। ঢাকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। অবয়ব ও পোশাক-আশাকেও খুব আকর্ষণীয় হয়েছিলেন। তাঁর চুলের বাহার, পাঞ্জাবির উজ্জ্বল প্রাথমিক রং বয়সের সঙ্গে ক্রমেই বিশিষ্টতা পাচ্ছিল। মঞ্চে বলতেনও সুন্দর।

মুর্তজা বশীর প্রবীণ বয়সে মাঝেমধ্যে শিল্পীদের আসরে উপস্থিত হন। খুব সুন্দরভাবে অল্প কথায় মনের ভাব বুঝিয়ে দেন।

সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের অত্যন্ত অপরিসর দুই কামরার স্থাপনা থেকে যাত্রা শুরু করে চার সতীর্থ রাজ্জাক, রশিদ, কাইয়ুম ও বশীর এদেশের শিল্পকলার জগতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসীন হয়েছিলেন। তাঁরা চারজনই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একুশে পদক লাভ করেছেন, কাইয়ুম চৌধুরী স্বাধীনতা পুরস্কারও পেয়েছেন। অসামান্য প্রতিভাধর মুর্তজা বশীর দীর্ঘ ৭০ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে মূল্যবান শিল্প সৃষ্টি করেছেন, এখনো করছেন। স্বাধীনতা পুরস্কার তাঁর তো একান্তই প্রাপ্য।

Leave a Reply

*