logo

ষাটের দশকের শিল্প ও শিল্পী : বিমূর্ত আঙ্গিকের প্রাধান্য

ন জ রু ল  ই স লা ম

Zainul Abedin Beauty Regime 1967

Zainul Abedin Beauty Regime 1967

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার প্রাতিষ্ঠানিক শুরুটা ১৯৪৮ সালে হলেও পঞ্চাশের দশকেই আশ্চর্যজনকভাবে এদেশের চিত্রকলায় পাশ্চাত্য ধারার সমকালীন আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটতে থাকে জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীনের মতো চল্লিশের দশকের শিল্পীদের উদার নেতৃত্বে এবং পঞ্চাশের দশকের অগ্রসর চিন্তার তরুণ শিল্পীদের আগ্রহ ও উদ্যোগে। বিশেষ করে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পকলায় উচ্চতর শিক্ষাপ্রাপ্ত কতিপয় শিল্পীর নিরীক্ষা-মনস্কতা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের (তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) চিত্রকলায় কিউবিজম, স্যুররিয়ালিজম বা বিমূর্ত প্রকাশবাদী ইত্যাদি আধুনিক শিল্পধারার অনুসরণ ও অনুশীলনে। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমান, মুর্তজা বশীর, আবদুর রাজ্জাক, রশিদ চৌধুরী, কাজী আবদুল বাসেত, সৈয়দ জাহাঙ্গীর প্রমুখ। তাছাড়া দেশে থেকেই পঞ্চাশের দশকে আধুনিক পাশ্চাত্য আঙ্গিকের শিল্পচর্চা করেছেন মোহাম্মদ কিবরিয়া, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ।
পঞ্চাশের দশকেই পূর্ব পাকিস্তানে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন ও ’৫৪-র নির্বাচন জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছে। চিত্রকলাও তার বাইরে ছিল না, বিশেষ করে জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের সমসাময়িক কাজে তার প্রতিফলন দেখা গেছে জাতীয় ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে। পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত শিল্পীরা অধিকাংশই অবশ্য দেশজ শিল্পের ঐতিহ্যের দ্বারা তখন তেমন প্রভাবান্বিত ছিলেন না।
পঞ্চাশের দশকের শিল্পীরা ষাটের দশকে আরো বেশি প্রবলভাবে পাশ্চাত্য শিল্পরীতির প্রতি অনুগত থাকেন। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ’৫৮-৬৮ পুরো এক দশক এবং পরবর্তীকালে ইয়াহিয়ার দুঃশাসন ’৭১ পর্যন্ত সম্প্রসারিত। অর্থাৎ গোটা ষাটের দশক বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসনের অধীনে। তাছাড়া ’৫৬-র সংবিধানে দেশটিকে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, ইসলামি রাষ্ট্রতন্ত্র এবং সামরিক শাসনের কারণে এদেশের শিল্পীরা ব্যাপকভাবে নির্বস্তুক আঙ্গিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন। ব্যাখ্যাটি আংশিক গ্রহণযোগ্য। কেননা আমরা দেখি জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদরা দিব্যি মানব-অবয়বভিত্তিক ছবি এঁকে গেছেন। জয়নুল দুই মহিলার ‘প্রসাধন’ (তেলরং, ১৯৬৭) ছাড়াও প্রচুর অবয়বভিত্তিক ছবি এঁকেছেন। বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী গরু’ (১৯৬৬), ছবিটিও এই দশকের আঁকা। কামরুল হাসান আধা-বিমূর্ত এবং স্টাইলাইজড নারী-অবয়ব এঁকেছেন প্রচুর। অনেক ক্ষেত্রেই নারী চরিত্র স্বল্পবসনা বা একেবারেই আদুল গা ও আকর্ষণীয় স্তনাধিকারী (১৯৬৭-১৯৬৮’র কাজ)। জলরঙেই বেশিরভাগ কাজ। এসব কাজ প্রদর্শনীতে তেমন উপস্থাপিত না হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিশ্চয় বিনিময় হয়েছে। সফিউদ্দীন আহমেদ আধা-বিমূর্ত আঙ্গিকে এগোচ্ছিলেন, তবে তিনি প্রচুর মানব-অবয়বভিত্তিক ড্রইং করেছেন পেনসিল, চারকোল বা কার্বন-পেনসিলে। এচিং, অ্যাকুয়াটিন্টে আধা-বিমূর্ত অবয়বপ্রধান কাজ করেছেন (১৯৬৪-৬৮ সালে)। অবশ্য তিনি একক প্রদর্শনী প্রায় করেনইনি ষাটের দশকে, তাই তাঁর বেশিরভাগ কাজের সঙ্গে সাধারণ দর্শকের পরিচয় ঘটেনি।
শুধু চল্লিশের দশকের শিল্পীরাই নন, পঞ্চাশের দশকের আধুনিক ধারার শিল্পীদেরও কেউ কেউ অবয়বভিত্তিক ছবি এঁকেছেন। আমিনুল ইসলামের ১৯৬০-এ আঁকা তেলরং চিত্র ‘মহিলা ওঝা’ অথবা ১৯৬২-র তেলরং ছবি ‘লাল রঙে নারী’ আধা-কিউবিস্ট আঙ্গিকের কাজ। লাল, কালো, খয়েরি ও সাদা রং ফর্মের কম্পোজিশন, স্টেইন গ্লাস শিল্পের আভাস। তিনি মধ্য ষাটে মানব-মানবীর ‘ন্যুড’ ড্রইং করেছেন কালি-কলমে। অবশ্য দশকের শেষ পর্যায়ে আমিনুল ইসলাম প্রায় পূর্ণ বিমূর্ততার দিকে এগিয়ে যান, রং-ফর্ম আঙ্গিকের বিমূর্ততা, মেজাজে প্রকাশবাদী। পুরো দশকজুড়ে অসংখ্য শক্তিশালী কাজ করেছেন তেলরঙে, শেষ দিকে অ্যাক্রিলিকের সঙ্গে কোলাজ করেছেন। তিনি অবয়ব-ভিত্তিক চিত্র-নির্মাণে ফিরেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে। কাঁচ-কোলাজনির্ভর মিশ্র মাধ্যমে পরাবাস্তবধর্মী বিশাল বিশাল ছবি নির্মাণ করেছেন। বিশুদ্ধ তেলরঙেও এরকম কাজ করেছেন। ‘ডালির স্মরণে’ (১৯৮৪) এদেশের এক প্রধান শিল্পীর অত্যন্ত সাহসী কাজ, যাতে বাস্তববাদী ঢঙে আঁকা পাঁচ নগ্ন নারী-পুরুষ জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে নদীর তীরে।
পঞ্চাশের দশকের অন্য শিল্পীদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক, রশিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর প্রমুখ ষাটের দশকে কখনো আধা-বিমূর্ত, কখনো অবয়ব বা নিসর্গনির্ভর। আবদুর রাজ্জাক পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি ভাস্কর্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর ষাটের দশকের ভাস্কর্য প্রায় সবই মানব-অবয়ব, বিশেষত মুখ বা ঊর্ধ্বাঙ্গনির্ভর অবশ্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাঁর ভাস্কর্য অনেকটাই বিমূর্ত।
রশিদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী ও সৈয়দ জাহাঙ্গীর ষাটের দশকে বাংলার প্রকৃতি, নদী, নৌকা এবং বিভিন্ন লোক-প্রতীকনির্ভর স্টাইলাইজড ছবি এঁকেছেন। কাইয়ুম চৌধুরী দেশি নৌকার গলুইয়ের নকশা করা চোখ বা অন্যান্য প্রতীক কাজে লাগিয়েছেন তাঁর আধুনিক কম্পোজিশনে। এরকমটি করতে তিনি জয়নুল আবেদিনের পরামর্শ পেয়েছেন বলে তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন।
পঞ্চাশের অপর এক শক্তিশালী আধা-বিমূর্ত ধারার শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া জাপান প্রত্যাগত হয়ে ষাটের দশকের শুরু থেকে পরিপূর্ণভাবে বিমূর্ত শিল্পী হিসেবে উপস্থিত হন এবং পরবর্তী চার দশক মূলত এ ধারাতেই তাঁর চরম উৎকর্ষ দেখান। তাঁর বিমূর্ত কম্পোজিশন রং-ফর্মভিত্তিক, রঙের নির্মাণে মেধাবী, টেক্সচার গঠন উদ্ভাবনী। বস্তুত কিবরিয়ার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উচ্চমান শিল্প-আঙ্গিকের কারণেই বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার ষাটের দশক বিমূর্ত ধারার দশক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, এমনটি বলা যায়।
পঞ্চাশের দশকের আরেক আধা-বিমূর্ত ধারার শিল্পী মুর্তজা বশীর ষাটের দশকে তাঁর ‘দেয়াল সিরিজের’ মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণ বিমূর্ত আঙ্গিকের শিল্পীতে রূপান্তরিত হন। পাশ্চাত্যের সমসাময়িক শিল্পধারার সঙ্গে বশীরের মানসিকতা ও শিল্প-ভাষা সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে।
চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের ষাটের দশকের কাজকে তাই সামগ্রিকভাবে মূলত অবয়ব ও নিসর্গভিত্তিক সম-বিমূর্ত এবং পূর্ণ-বিমূর্ত ধারার বলে চিহ্নিত করা যায়। স্মরণীয়, একই সময়ে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের আধুনিক শিল্পীদের মধ্যে এমন ধারারই অনুসরণ ছিল, পাশাপাশি সাদেকীন বা শেমজা প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীর কাজে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার লক্ষণীয় ছিল। বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজে কোনো রকম ধর্মীয় ইমেজ বা প্রতীক ব্যবহার খুব একটা দেখা যেত না। মূলত তাঁরা জীবনধর্মী সেক্যুলার অথবা বিমূর্ত শিল্পকলা নির্মাণ করেছেন, এমনটি বলা যায়। ষাটের দশকজুড়ে যেমন ছিল আইয়ুবী সামরিক শাসন, পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল ’৬২-র ছাত্র-আন্দোলন এবং ’৬৯-এর গণআন্দোলন। কিন্তু ষাটের দশকে সৃজিত বাংলাদেশের চিত্রকলায় এসব আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন তেমন দেখা যায়নি। তবে দশকের একেবারে শেষ পর্যায়ে, সঠিক বললে ’৭০-এর শুরুতে, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের তুলিতেই প্রতিফলন হতে থাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার। তাঁর ‘নবান্ন’ শীর্ষক বিশাল স্ক্রল (১৯৭০) প্রসঙ্গত স্মরণীয়। ১৯৭০ সালের উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডববিষয়ক অপর স্ক্রল ‘মনপুরা ’৭০’ বা ‘মাওলানা ভাসানী’ ছবিগুলো উল্লেখযোগ্য।
এবার চোখ ফেরানো যায় ষাটের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের দিকে। বেশ কজন প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছিল এই দশকে। সবাই ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট তথা কলেজের øাতক। এঁদের মধ্যে ছিলেন আবু তাহের, আবদুল মুকতাদির, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আনোয়ার জাহান, গোলাম সারোয়ার, প্রাণেশ কুমার মণ্ডল, মোহাম্মদ মহসীন, হাশেম খান, মনিরুল ইসলাম, আনোয়ারুল হক পিয়ারু, রফিকুন নবী, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, মিজানুর রহিম, মাহমুদুল হক, রেজাউল করিম, আবদুল মান্নান, হামিদুজ্জামান খান, কালিদাস কর্মকার, মতলুব আলি, শহিদ কবীর, বীরেন সোম, আবুল বারক আলভী প্রমুখ।
এইসব শিল্পীর জন্ম ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৯-এর মাঝে, বর্তমান বয়স ৭৫ থেকে ৬২। অন্তত দুজন (আনোয়ার জাহান ও গোলাম সারোয়ার) ইতোমধ্যে লোকান্তরিত। ১৯৬৯ সালের পর থেকে এঁরা ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট/ কলেজ থেকে øাতক লাভের পর অনেকেই দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চতর শিল্প শিক্ষা নিয়েছেন। কেউ স্পেনে, কেউ বেলজিয়ামে, কেউ গ্রিসে, কেউ জাপানে, কেউ ভারতে। যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ডেও গেছেন কেউ কেউ। দেশেও øাতকোত্তর ডিগ্রি করেছেন দু-একজন। মনিরুল ইসলামই একমাত্র যিনি ষাটের দশকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেয়েছিলেন, অন্যরা পরবর্তী সময়ে বিদেশে যান।
ষাটের দশকের শিল্পীদের উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা যেমন বিভিন্ন দেশে, মাধ্যমগত বিশেষজ্ঞতাও তেমনি নানা ধরনের। তবে এঁদের অনেকেই ছাপচিত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মনিরুল ইসলাম, রফিকুন নবী, মিজানুর রহিম, কালিদাস কর্মকার, মাহমুদুল হক এবং আলভী প্রত্যেকেই ছাপচিত্রী, একই সঙ্গে তাঁরা পেইন্টিংয়েও প্রতিভাবান শিল্পী। আনোয়ার জাহান মূলতই ছিলেন ভাস্কর। বিশেষ করে কাঠের মাধ্যম ছিল তাঁর প্রিয়। খালিদের পরিচয় ভাস্কর হিসেবে। তবে পেইন্টিংও করেন। হামিদুজ্জামান খান সব্যসাচী ভাস্কর। তিনি সিমেন্ট, কংক্রিট, কাঠ, ধাতু বিশেষ করে ব্রোঞ্জ, স্টেইনলেস স্টিল, প্লাস্টিক, ফাইবার গ্লাস ইত্যাদি নানা মাধ্যমে কাজ করেন। ড্রইং-পেইন্টিংয়ে প্রচুর সময় দেন। বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বর্পূণ মাধ্যম স্থাপনা শিল্পেও তাঁর আগ্রহ। কালিদাস কর্মকারও বহুমাত্রিক শিল্পী, একাধারে ছাপচিত্রী, চিত্রশিল্পী, স্থাপনা শিল্পী। শহিদ কবীর মিশ্র মাধ্যম পছন্দ করেন।
ষাটের দশকে আবির্ভূত শিল্পীরা সেই দশকেই নিজস্ব শিল্প-আঙ্গিকে তেমন জোরালোভাবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দেখিয়েছেন এরকম দাবি হয়তো করা যাবে না, তবে পরবর্তী দিনে তাঁদের অনেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান হয়েছেন।
ষাটের দশকের শিল্পীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ আবু তাহের (জ. ১৯৩৪) তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম পর্বে অনেকটাই পাবলো পিকাসোর কিউবিস্ট ধারার শিল্পরীতি দ্বারা বেশ প্রভাবিত ছিলেন। মানব-অবয়ব, বিশেষত নারীদেহের আধা-বিমূর্ত খোলামেলা উপস্থাপনায় উৎসাহী ছিলেন। পরবর্তীকালে বিশুদ্ধ প্রকাশবাদী বিমূর্ত রীতিতে মনোনিবেশ করেছেন। ইমপ্যাস্টো পদ্ধতিতে অমসৃণ বুনটে আগ্রহী হয়েছেন, নানা রকম কোলাজও তাঁর অন্যতম প্রধান প্রেরণা। সমরজিৎ রায় চৌধুরী (জ. ১৯৩৭) মূলত ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে কাজ করেন, আঙ্গিকের দিক থেকে আধা-বাস্তববাদী। বাংলাদেশের গ্রাম ও নগরজীবনের উৎসব, বিশেষ করে ঘুড়ি ওড়ানোর বিষয় নিয়ে বেশ চমৎকার প্রতীকী উপস্থাপনা করেন। অবশ্য এরকমটি তাঁর সাম্প্রতিক প্রবণতা। ষাটের দশকে তাঁর হাতে ততটা পরিণত কাজ দেখা যায়নি। একই কথা প্রযোজ্য ষাটের অপর এক শিল্পী আবদুল মুকতাদিরের (জ. ১৯৩৬) বেলায়। নিজস্ব স্টাইল (পরাবাস্তবই বলা যায়) নিয়ে তাঁর আবির্ভাব অনেক পরে। মোহাম্মদ মহসীন (জ. ১৯৪৯) আগাগোড়াই রং-ফর্মভিত্তিক বিমূর্ত প্রকাশবাদী শিল্পী।
হাশেম খান (জ. ১৯৪১), বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পী, প্রধানত বাংলাদেশের নিসর্গ, ঋতুবৈচিত্র্য, গ্রামজীবন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিষয় অবলম্বন করে  আধা-বাস্তববাদী ছবি আঁকেন। প্রিয় মাধ্যম অ্যাক্রিলিক ও জলরং। স্টাইলাইজড অবয়ব ও উজ্জ্বল রং তাঁর চিত্রভাষার বৈশিষ্ট্য। বাংলা বর্ণমালা অথবা রাজনৈতিক ও দেশাত্মবোধক স্লোগান, কবিতা-পঙ্ক্তি এবং বঙ্গবন্ধু তথা অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর সমসাময়িক সময়ের ছবির বিষয়।
রফিকুন নবী (জ. ১৯৪৩), ষাটের দশকের অপর এক প্রতিভাবান শিল্পী। রঙিন কাঠখোদাই ছাপচিত্রে অসাধারণ শৈলী ও নান্দনিকতার সমন্বয় ঘটান, জলরঙে অত্যন্ত সুন্দর ও সংবেদনশীল, নিসর্গদৃশ্যের রূপকার, তেলরঙে ভীষণ পারদর্শী। মূলত প্রথাসিদ্ধ ক্যানভাস-শিল্পী, মানুষ, গ্রাম ও শহর দৃশ্য, কৃষক কিংবা মৎস্যজীবী মানুষ, প্রকৃতি ইত্যাদি বিষয় অবলম্বন করে ফর্ম ভেঙে নতুন ফর্ম নির্মাণ করে আকর্ষণীয় ও দর্শকপ্রিয় জীবনঘনিষ্ঠ শিল্প সৃষ্টি করেন। অসাধারণ দক্ষ ড্রইংয়ের হাত। একাধারে তিনি একজন সৃজনশীল কার্টুনিস্ট ও কথাশিল্পীও।
ষাটের দশকের শিল্পীদের মধ্যে নিঃসন্দেহে মনিরুল ইসলাম (জ. ১৯৪৩) সর্বাপেক্ষা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। স্পেনের মাদ্রিদ শহরে ছাপচিত্র ও চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও দীর্ঘকাল শিল্পচর্চা করেছেন। নানা গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও পদক লাভ করেছেন। মননশীল ও সৃজনশীল প্রতিভার সমন্বয় হয়েছে মনিরের মধ্যে। তাঁর ছাপচিত্রে যেমন রয়েছে ব্যাপকতা ও একই সঙ্গে সূক্ষ্মতা, তেমনি মাধ্যম ব্যবহারে কুশলতা। স্পেন ও বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, নিসর্গ অনেক কিছুই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপিত হয় তাঁর ক্যানভাসে বা পটে। নানান  জ্যামিতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতীকের ব্যবহার করেন তিনি। বাংলা ভাষার নানা কবিতা পঙ্ক্তি, বাক্যাংশ, গানের কথা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা স্মৃতি জাগানিয়া ভঙ্গিতে, অত্যন্ত সুচারু কিন্তু স্বতঃর্স্ফূত ও সহজভাবে বিন্যস্ত হয় চিত্রপটে। অনেক সময় পঙ্ক্তিমালা প্রতিবিম্বিতভাবে উপস্থাপিত, নেহাৎ নকশা হিসেবে। রেখা, রং ও স্পেসের চমৎকার খেলা থাকে তাঁর ক্যানভাসে। ক্রমান্বয়ে মনিরের ছবি সামান্যীকরণের দিকে এগিয়েছে। স্পেস ছাড়ার অসাধারণ কৌশল তাঁর। মনিরের ছবি ক্যানভাসের সাধারণ ফ্রেমের মধ্যেই সাজানো থাকে। তবে সবকিছু মিলিয়ে তাঁর কাজ যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি চিন্তা-উদ্রেকী।
হামিদুজ্জামান খান (জ. ১৯৪৬) ১৯৬৭ সালে ঢাকার চারুকলা কলেজ থেকে øাতক ডিগ্রি লাভ করেন। শিল্পী হিসেবে ষাটের দশকে আনুষ্ঠানিক আবির্ভাব হলেও এই দশকের অন্য প্রতিভাবান শিল্পীদের মতো তাঁরও যথার্থ শৈল্পিক বিকাশ ঘটে সত্তরের দশকে। ক্রমশ পরবর্তী সময়ে তিনি ভাস্কর হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, বিশেষ করে ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক উপলক্ষে স্থাপিত উদ্যানে তাঁর কাজ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের সুযোগের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাঁর ভার্স্কয স্থাপিত হয়েছে। ব্রোঞ্জ এবং ইস্পাতের আধা-বিমূর্ত ও বিমূর্ত জ্যামিতিক ভাস্কর্য বা স্থাপনার জন্য তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর ভাস্কর্যের অন্যতম মূল বিষয়। তিনি বেশ কিছু স্মরণীয় ভাস্কর্য রচনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে।
কালিদাস কর্মকারও (জ. ১৯৪৪) ষাটের দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী। তিনি ছাপচিত্র, চিত্রকলা ও স্থাপনা শিল্পকর্মের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি অর্জন করেছেন। আধ্যাত্মিক, বিশেষ করে তান্ত্রিক শিল্প চৈতন্য, তাঁকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। ক্যানভাসে রঙের সঙ্গে মাটি এবং অন্যান্য বহিস্থ বস্তুর মিশ্রণ বা কোলাজ করে টেক্সচার-সম্পন্ন চিত্রকলা নির্মাণ করতে পছন্দ করেন। নানা রকম জ্যামিতিক আকার সমন্বয় করেন। তাঁর চর্চিত সকল মাধ্যমেই কুশলী দক্ষতার প্রমাণ থাকে।
ষাটের দশকের মাহমুদুল হক (জ. ১৯৪৫), সত্তরের দশক ও পরবর্তী সময়ে সৌকর্য লাভ করেছেন। তিনি মূলত প্রকাশবাদী বিমূর্ত ধারার শিল্পী, মোহাম্মদ কিবরিয়ার বিশ্বস্ত অনুসারী। ছাপচিত্র ও পেইন্টিং দুটোতেই পারদর্শী।
সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ (জ. ১৯৪৫) ভাস্কর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, তবে চিত্রকলাতেও উৎসাহী। মিজানুর রহিম (জ. ১৯৪৬) ছাপচিত্রী, অংকন শিল্পী হিসেবেও পরিচিত। শহিদ কবীর (জ. ১৯৪৭) দীর্ঘদিন স্পেন প্রবাসের পর বর্তমানে ঢাকাবাসী, মিশ্র মাধ্যমে কখনো অবয়বনির্ভর, কখনো বিমূর্ত ছবি আঁকেন। আলভী (জ. ১৯৪৯) আগাগোড়াই বিমূর্ত ধারার ক্যানভাস-চিত্রী। বীরেন সোম (জ. ১৯৪৫) মূলত মানববিষয়ক আধা-বাস্তববাদী শিল্পী। তেলরং ও জলরঙে পারদর্শী। বাদামি-খয়েরি রঙের প্রতি পক্ষপাত, বিষয় উপস্থাপনে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
সংক্ষেপে বলা যায়, ষাটের দশকে আবির্ভূত বা অন্তত ¯œাতকপ্রাপ্ত শিল্পীরা প্রধানত বিমূর্ত প্রকাশবাদী বা জীবন ও নিসর্গনির্ভর আধা-বিমূর্ত শিল্পকলা সৃষ্টি করেছেন। আধ্যাত্মিক প্রতীক ব্যবহার ও পরাবাস্তব উপস্থাপনাও কারো কারো কাজের বৈশিষ্ট্য। বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা ও চিত্রভাষার কুশলী ব্যবহার এই দশকের একাধিক শিল্পীকে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে পরিচিতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁদের পরিণত পর্যায়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রেরণা। সাধারণ মানুষের জীবনও একেবারে নির্বাসিত নয় তাঁদের ক্যানভাস থেকে।

Leave a Reply

*