logo

শুনতে কি পাও নিয়ে কিছু কথা

না সি মু ল  হা সা ন

২০১৩ সালের শুরুর দিকে একদিন যখন কামার আহমাদ সাইমন ও সারা আফরীনের শুনতে কি পাও-এর প্রথম বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন চলছে পাবলিক লাইব্রেরির সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে, ঠিক তখন থেকে একশ বছর আগে ১৯১৩ সালে ভূ-গোলার্ধের আরেক বিজন প্রান্তে আপাত অনাবিষ্কৃত এক বরফজমা অঞ্চলে পা পড়েছে কানাডিয়ান রেলওয়ের এক নবীন কর্মচারীর। সঙ্গে বিশাল এক কর্মী বাহিনী। উদ্দেশ্য এই অদেখা ভুবনের নিদারুণ কষ্ট আর ক্ষুধার মধ্যেও মাথা তুলে বেঁচে থাকা অচেনা মানুষগুলোর যতটুকু পারা যায় ফুটেজ জোগাড় করে সভ্য দুনিয়ায় তুলে ধরা। নেহায়েত চাকরি বলে কথা, নয়তো দুনিয়াতে এত বিষয় থাকতে এমন একটা ঝুঁকিপূর্ণ আর সময়সাপেক্ষ কাজে নিজেকে কেউ নিজের ইচ্ছায় নিয়োগ করে? তারপর আবার জীবনে প্রথম ক্যামেরা হাতে নিয়ে কোনো কাজ। কিন্তু এমন লোকও আছেন, যাঁরা জানেন যে এই ব্যক্তি একটু পাগলাটে হলেও অসম্ভব কিছু একটা করে ফেলতে পারার চেষ্টায় মরিয়া থাকেন সবসময়। ভদ্রলোকের নাম রবার্ট ফ্ল্যাহার্টি। দলবলসহ নেমে পড়লেন তিনি অসাধ্য সাধনে। এভাবেই সেই একশ বছরের পুরনো গল্পের শুরু। যদিও সেই যাত্রার ফুটেজ থেকে যা তিনি তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে নিজে থেকে মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি ফ্ল্যাহার্টি। কারণ হয়তো ছিল যা তিনি তৈরি করেছিলেন তা সেই এলাকা, জীবনযাত্রা ও বাঁচার পদ্ধতির কথা বললেও বলেনি কোনো মানবিক গল্প। তাই হয়তো মানুষের কাছাকাছি একটা সরলরৈখিক গল্পের খোঁজে ফ্ল্যাহার্টি আবার পাড়ি জমালেন আর্কটিকে। সাহসী শিকারি নানুকের পরিবারকে বেছে নিলেন ফ্ল্যাহার্টি গল্পের খাতিরে। শত প্রতিকূলতার মধ্যে সেই একটি পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প নানুক অফ দ্য নর্থ তারপর হয়ে ওঠে ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের পথ ধরেই যখন সাইমন ও সারার শুনতে কি পাও দেখতে থাকি, তখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানুকের সহজ-সরল অথচ কঠোর আর পরিশ্রমী একটা মুখ। আমার কাছে মনে হয় এই তো সেই পুরনো হাসি। যে হাসি লোকগুলো কত সহজে হাসছে অনমনীয় এই প্রকৃতির বিরুদ্ধে, এক হাতে ঢাল আর এক হাতে তলোয়ার নিয়ে। সেই এক চরিত্রই তো সব। সেই নানুক, তার স্ত্রী আর সন্তান। সেই পুরনো যুদ্ধ। প্রযুক্তিগত দিক থেকে পৃথিবীটা অনেক এগিয়ে গেলেও একশ বছর পরেও মানবজাতি লড়াই করেই যাচ্ছে প্রকৃতিমাতার সঙ্গে। তারেক মাসুদ বেঁচে থাকলে অত্যন্ত খুশি হতেন এটা জেনে যে তাঁর অন্যতম সহযোদ্ধা কামার আহমাদ সাইমন ও সারা আফরীন এমন একটি মানবিক গল্প তাঁদের প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরতে পেরেছেন, যা এর আগে বাংলা ভাষায় খুব কম লোকই সফলভাবে চলচ্চিত্রের এই ধারাটিতে বলতে পেরেছেন।

আর দশটা প্রামাণ্যচিত্র থেকে একটু আলাদাভাবে শুনতে কি পাও-এর গল্পটি ডালপালা মেলে। চলচ্চিত্রটির একদম শুরুর দৃশ্যটি বুকের ভেতর একধরনের ধাক্কা দেয়। গহিন অতর্কিত সন্ধ্যা নেমে আসা কোনো প্রাচীন গ্রামের দৃশ্য শুধু নয়, তার সঙ্গে মিলিত কণ্ঠে যখন উলুধ্বনি বেজে ওঠে, তখন যেন দর্শককে এমন এক বাংলার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়, যা এখনো রয়ে গেছে আদি ও অকৃত্রিম। যেন উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের কোনো লেখা হতে। সিনেমাটি তার পথ খুঁজে নেয় একটি পরিবারের গল্পের মধ্য দিয়ে। ভদ্রা নদীর পারে বেড়িবাঁধের ধার ঘেঁষে এমন আরো অনেক পরিবার আসলে যে-কোনো প্রাচীন গ্রামে থাকে না, একটা দানবস্বরূপ ঝড় এসে যে তাদের আদি ভিটেবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে, তা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দর্শকের কাছে। রাখী আর সৌমেনের পরিবার সেই অনেক পরিবারের মাঝে একটি। আর দশটা পরিবারের মতো একই পরিণতির শিকার হলেও রাখী, সৌমেন ও তাদের একমাত্র সন্তান রাহুলের গল্পটা বোধহয় একটু আলাদা অন্যদের চেয়ে। অর্থনৈতিকভাবে একটু সচ্ছল, শিক্ষাগত দিক থেকে একটু অগ্রগামী পরিবারটি সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটা গোষ্ঠীর, যারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও এগিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র ছেলে রাহুলকে পড়াশোনা শেখানো শুধু নয়, রাখীর নিজের একটা লড়াইও দেখা যায় পড়াশোনা নিয়ে। গ্রামের পাঠশালায় বাচ্চাদের শিক্ষিকা হওয়ার বাইরেও তার ইচ্ছে আরো পড়াশোনা করা। প্রয়োজনে ঋণ নিয়ে হলেও কলেজে ভর্তি হওয়া। অন্যদিকে স্বামী সৌমেন স্বপ্ন দেখে একটা সুন্দর ভবিষ্যতের। আর তার জন্যই পরিবারকে নিয়ে, তার চারপাশের পরিবেশকে নিয়ে সবসময় চিন্তায় ডুবে থাকার মাঝেও সদা পরিশ্রমী ও প্রতিবাদী সৌমেনকে আমরা পাই। সৌমেন একদিকে যেমন সরকারি ত্রাণের জন্য খাবার জোগাড়ে ব্যস্ত, পাশাপাশি বাড়ির স্যানিটারি ব্যবস্থা ঠিক করতেও মরিয়া। নদীর গতিপথ বদলাতে যে বাঁধের কাজ চলছে তার সঙ্গেও অন্যদের মতো আছে সৌমেন। রাখী আর সৌমেন, এই দুজন বৃত্ত করে ঘুরছে তাদের একমাত্র সন্তান রাহুলকে ঘিরে। রাহুলকে যথাসম্ভব সব ধরনের অভাব থেকে দূরে রেখে শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাই মা-বাবার পরিকল্পনা। চোখে স্বপ্ন ভাসে ওদের, নদীতে বাঁধ পড়লে নিজের হারানো জায়গাটা ফেরত পাওয়া যাবে। সেই স্বপ্নেই তাদের পথচলা, বেঁচে থাকা। সেই পথচলায় ভালোবাসা যেমন আছে, মান-অভিমানও আছে, শত অভাব আর অভিযোগও আছে। কিন্তু জীবনধারণের অপ্রতিরোধ্য অদম্য যে শক্তি এই মানুষগুলোর মাঝে আছে, তা আর কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়। এই তুলনামূলক আধুনিক পরিবারে আমরা প্রযুক্তির আগমনধ্বনিও শুনতে পাই। যেখানে পুজোর জন্য একমাত্র ছেলেকে কাপড় দিতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি, সেখানে বাড়িতে দ্বিতীয় একটা মোবাইল কেনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাখীর কাছে। আর দশটা সংখ্যালঘু পরিবারের মতো রাখীর মনে ভারতে চলে যাওয়ার একটা আকাঙ্ক্ষাও জাগে। রাখী সৌমেনকে বোঝানোর চেষ্টা করে এই বলে যে, যারা যাচ্ছে তারা আসলে নিজের দেশ ছাড়ছে শুধুমাত্র একটা ভালো জীবনের তাগিদে। তবে সৌমেনকে এ দেশে থাকার আর লড়াই করে বাঁচার কথা বলতেই শোনা যায়। এ দেশের আপন মাটি, পানি আর বাতাস আঁকড়ে ধরেই বাঁচার স্বপ্ন দেখে সৌমেন। এসবের মাঝেই সমান্তরালভাবে আরেকটি ঘটনা এগিয়ে যায়। ভদ্রা নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথ আইলার আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে যে বিশাল বাঁধ তৈরির কাজ চলছে, তার সঙ্গে সুতারখালীর সবার জীবনের, ভাগ্যের জড়িয়ে যাওয়াকেও পাশাপাশি অনুভব করি। আমরা দেখতে পাই কীভাবে গ্রামের চায়ের স্টলে সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ছে সরকারি ত্রাণের বণ্টন ও স্বচ্ছতা নিয়ে, বাঁধ নির্মাণে দেরি হওয়া নিয়ে। কর্তৃপক্ষকে আমরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে উচ্চমহলের দোষ দিতে দেখি। কিন্তু এসব কথাবার্তা গ্রামের মানুষের কাছে টালবাহানা মনে হয়। দর্শক নিজে থেকে অনুভব করতে বাধ্য হয় – এই আপাত নিরীহ মানুষগুলো কি তাহলে জেগে উঠছে? দেরিতে হলেও একসময় বাঁধ তৈরির সব সরঞ্জাম চলে এলে পূর্ণ উদ্যমে গ্রামের নারী-পুরুষ মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁধটি নির্মাণে। এভাবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাঁধটি তৈরি হয়। নদীর পানি সরে যায় দখল করা জায়গা থেকে। আর দশটা পরিবারের মতো রাখী-সৌমেনের পরিবারও শেকড়ের টানে ছুটে আসে নিজেদের হারানো ভিটাতে। কিন্তু উপকূলের জীবন যে বড় ক্ষণস্থায়ী! তাই দিন ফুরোনোর আগেই আবার ঝড় আসে দিগন্ত ছাপিয়ে। কিন্তু আমাদের সেই পরিবারটি ছোটখাটো এসব ঝড়ের আর পরোয়া করে না। আঁকড়ে ধরে থাকে আপন আশ্রয়কে। কিন্তু এসব কিছুর মাঝেও আমরা গ্রামের একটা রেডিওতেই বাজতে শুনি কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে জলবায়ুর এই অস্থিরতা থেকে বাঁচানোর বৈশ্বিক তথা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মিলিত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অনুভব করা যায় যে প্রকৃতির বাইরেও মানুষের মাঝেই এমন দানব আছে, যার সঙ্গে সুতারখালী গ্রামের এই সংগ্রামী মানুষদের লড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

শুনতে কি পাও-তে আমরা কি শুধু রাখী, সৌমেন আর রাহুলের পরিবারটিকেই দেখি? না, দেখি আরো অনেক মানুষকে, আরো অনেক কর্মযজ্ঞে সেই মানুষদের জড়িয়ে যেতে। আমরা কিছু মানুষকে প্রতিবাদী হতে দেখতে পাই অন্যায় আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে, মানুষকে অসহায় হতে দেখি পানি আর খাবারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা লাইনে, কিছু মানুষকে বাঁধ নির্মাণের কাজে অদম্য দেখতে পাই। কিন্তু তাদের আমরা কতটুকু মনে রাখি। মনের মধ্যে একটা কী যেন শূন্যতা রয়ে যায় ছবিটি শেষ হলে। অনুভব করি রাখী আর সৌমেনের তাদের সন্তানকে নিয়ে গল্পটি কেমন যেন পরিপূর্ণতা পেতে পেতে খেই হারিয়ে ফেলেছে। আমরা যখন চরিত্রগুলোকে একটু একটু বুঝতে শুরু করেছি, ঠিক তক্ষুনি সিনেমাটি শেষ হয়ে যায়। এটা পরিচালকের ইচ্ছাকৃত হতে পারে কিন্তু এটাও বোধ করছি যে সিনেমাটি যদি আর একটু সময় নিয়ে চরিত্রগুলোকে বুঝতে পারার জন্য জায়গা ছাড়ত তাহলে হয়তো এই শূন্যতার জায়গাটা থাকত না। আর একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো রাখী আর সৌমেনের সামাজিক অবস্থান। পরিবারটি যে অবস্থানে আছে, তা কি একটা বড় জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে? কারণ রাখী-সৌমেনের পরিবারটিকে শিক্ষা বা অর্থ দুই দিক থেকেই অন্যদের চেয়ে কিছুটা অগ্রগামী মনে হয়। তাহলে যারা পিছিয়ে আছে, যাদের মাঝে শিক্ষার কোনো আলো কোনোকালে পড়েনি বা যাদের একটি মোবাইল ফোন অর্জন করার সামর্থ্য হয়নি, তাদের গল্পটা আসলে কেমন? তার কোনো ইঙ্গিত আমরা এখানে পাই না। শুধু রাখী যখন একটা নৌকায় করে বড় বাজারের উদ্দেশে যেতে থাকে তখন একজন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার কথোপকথন থেকে বুঝতে পারা যায় কীভাবে খুব সামান্য টাকা ধারদেনা করে গ্রামের অসহায় মানুষগুলো তাদের নগণ্য জীবন বাঁচিয়ে রাখতে চায়। রাখীকে সেই নৌকার ভেতর আমরা সহানুভূতিশীল হবার বদলে ব্যাপারটাকে উপভোগ করতে দেখি। হয়তো সায়মন আমাদের একটা পরিবারের গল্প বলতে চেয়েছেন, বাঁধের কাজকে দেখাতে চেয়েছেন সমান্তরালে, যাতে দর্শকদের  চিন্তা এসবের বাইরে খুব বেশি ছড়িয়ে পড়তে না পারে। যাতে একটা গল্প আর সময়কে ধরে এগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আমার মতো কিছু দর্শকের বোধ হয় আফসোস থেকে যাবে আরো বেশি, আরো গভীর থেকে সুতারখালী গ্রামকে, তার মানুষের জীবনকে না দেখতে পারার।

১৯২১ সালে মুক্তি পাওয়া নানুক অফ দ্য নর্থ ব্যবসায়িক সফলতা পেলেও সমালোচক মহলের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিল ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ কিছু দৃশ্য নাকি পুরোপুরি আরোপিত ছিল এই বলে। এমনকি যাকে আমরা সবাই নানুক বলে চিনি তার বাস্তব নাম নানুক নয়। নানুকের যে স্ত্রীকে আমরা দেখতে পাই সেও নানুকের সত্যিকারের স্ত্রী নয়, সিনেমার খাতিরে সাজানো আর একজন আদিবাসী মাত্র। তার মতো আরো অনেক আদিবাসী ছবিটি নির্মাণে সরাসরি কারিগরি সহায়তা করেছে। উত্তর গোলার্ধের শীতলতম স্থানগুলোর একটিতে শুটিং করতে গিয়ে পুরো পরিস্থিতি কিন্তু ফ্ল্যাহার্টির নিজের অনুকূলে ছিল না। তাঁকে আরোপিত দৃশ্যের, এমনকি চরিত্রের ব্যবহার করতে হয়েছিল, কারণ গল্পের মতো করে একটি মানবিক আবেদন তৈরি করার এর চেয়ে ভালো কোনো পদ্ধতি ছিল না মানব সভ্যতা থেকে অনেক অনেক দূরের বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য। পরবর্তী সময়ে ‘সিনেমা ভ্যারিটে’-এর অনুসারীরা ছবিটিতে বাস্তবতা তুলে ধরা হয়নি বলে অভিযোগ করে। কিন্তু এসব কিছুর পরও নানুক অফ দ্য নর্থ প্রামাণ্যচিত্র ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি।

শুনতে কি পাও নিয়ে নানুকের মতো অতটা সমালোচনার ঝড় না উঠলেও যা উঠেছে তা হলো যাকে বলে চায়ের কাপে বিতর্ক। গ্রামের চায়ের স্টলে মানুষের প্রতিবাদের ঝড় তোলা, রাখীর স্কুলে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক বোঝানোর পাশাপাশি দেশের গান গাওয়া, কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের বেতারবার্তা ভেসে আসা ইত্যাদি বেশ কিছু দৃশ্যকে কমবেশি আরোপিত মনে হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে পরিচালক যেভাবে ছবিটি আমাদের দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন, তার জন্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই দৃশ্যগুলো জরুরি ছিল। গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে কোনো দৃশ্য আরোপিত কি আরোপিত নয়, তা আসলে গৌণ হয়ে যায়। তাই একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় এটি ফিকশন না নন-ফিকশন, এ ব্যাপারটিও। সাইমন ও সারা দুজনেই ব্যাপারটিকে খুব ভালোভাবে উপভোগ করছেন বলে জানতে পেরেছি। চিন্তা করে দেখলে বোঝা যাবে ব্যাপারটা আসলেই বাংলা সিনেমার জন্য অনন্য। কারণ আমরা যারা সিনেমা দেখি এবং সিনেমা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসি তারা শেষ কবে একটা সুস্থ বাংলাদেশি সিনেমা নিয়ে তর্কের টেবিলে বসেছি, তা আসলে বলা কঠিন।

কারিগরি দিক থেকে শুনতে কি পাও একটি অনন্য অর্জন। আমাদের প্রামাণ্যচিত্রগুলোর তথাকথিত ফিক্সড ক্যামেরার মন্ত্র থেকে বের হয়ে ক্যামেরাকে নড়তে দেখা যায়। ছুটতে দেখি চরিত্রগুলোর পেছনে। কথা বলতে দেখি তার চরিত্রের সঙ্গে। যেন ক্যামেরাটাও একটা চরিত্র হয়ে ওঠে এই ছবিতে। যা দর্শককে টেনে নেয়, যুক্ত করে দেয় এই সত্যের সঙ্গে যে তারা একটা    বাস্তবতাকে দেখছে। পরিচালক নিজেই সিনেমাটোগ্রাফার হওয়ায় নিজের চাওয়াটাকে একশ ভাগ স্বাধীনভাবে পূর্ণ করতে পেরেছেন বোধ করি। নদীর বয়ে যাওয়া স্রোত, ভাঙা নৌকা, বয়া, কুয়াশা, কাদা, বাচ্চাদের খেলনা, জানালা থেকে গড়িয়ে পড়া আলো, বালতিতে বৃষ্টির পানি জমা, শীত-বর্ষার আকাশের রং থেকে শুরু করে দরকারি-অদরকারি সব কিছু এমনভাবে এসে মিশেছে, যার সঙ্গে আমাদের দর্শকদের পরিচিতি বহুদিনের। যার জন্য মানুষগুলোকেও মনে হয় আমরা চিনি। যা আমরা সবসময় দেখি না তা হলো বাঁধ নির্মাণের সময় মানুষের যে সম্মিলিত প্রচেষ্টা সেটি। স্রোতস্বিনী ভদ্রা নদীর ওপর বাঁধ তৈরির মতো দুরূহ কাজটিকে সাইমন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে পেরেছেন। অসাধারণ কিছু ল্যান্ডস্কেপ শটে কাজটির বিশালত্বকে বোঝাতে চেয়েছেন বারবার। এতগুলো মানুষের একসঙ্গে বাঁধের কাজে নিয়োজিত হতে দেখে আমার বারবার মনে পড়েছে ওয়ার্নার হার্জগের ফিতজ্যারাল্ডো সিনেমাটির কথা। যেখানে এক পাগলাটে জাহাজের নাবিক হাজার হাজার আদিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তার জাহাজটিকে পাহাড়ের একপাশ থেকে আরেক পাশে নিয়ে আসেন। ফিকশন হলেও সেই অসাধ্য সাধনকে মনে হয়েছিল একসঙ্গে অনেক মানুষের কর্মযজ্ঞের একটি ডকুমেন্টেশন। সেখানে শুনতে কি পাও সিনেমাটিতে আমরা দেখতে পাই একটা সত্যিকারের বাঁধ তৈরি হতে আর তা দেখে মনে হয় যেন গল্পের মতো মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায় সবকিছুই সম্ভব হয়ে উঠছে।

সম্পাদনায় অনেক পরিশীলিত কাজ হয়েছে। একটি পরিবার ও একটি বাঁধ তৈরি হওয়ার গল্প একটির সঙ্গে আরেকটি কীভাবে মিশে গেছে তা আলাদা করে বুঝতে পারার উপায় নেই। শুনতে পেয়েছি সৈকত শেখরেশ্বর রায় যখন সম্পাদনায় হাত দেন তখন নাকি তাঁর হাতে প্রায় একশ সত্তর ঘণ্টা বা তার বেশি ফুটেজ ছিল। সেখান থেকে নববই মিনিটের একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ সহজ হতো না যদি পরিচালক সায়মনের গল্পের ভাবনাটা প্রস্ত্তত না থাকত। বাঁধ তৈরি হওয়ার সময় ক্যামেরায় যেমন অসাধারণ সব কাজ করা হয়েছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সম্পাদনায়ও অনেক মুনশিয়ানা দেখানো হয়েছে। সিনেমাটি দেখে কোনো শটকে মনে হয়নি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঢোকানো হয়েছে বা গল্পকে টানা হয়েছে। বরং সিনেমাটা শেষ করার পর আরো কিছু দেখার ইচ্ছেটা আমাকে বেশ কিছুদিন ভুগিয়েছে।

সুকান্ত মজুমদার শব্দ নিয়ে যে খুব ভালো কাজ করেছেন তা যে-কোনো দর্শকই বলবে। সুতারখালী গ্রামের বিভিন্ন মৌসুমের সারাউন্ড যেভাবে এসেছে তা থেকে জায়গাটিকে আমরা অন্য আরেকটা ডাইমেনশনে ফেলে ভাবতে থাকি। আর নদীর চিরচেনা শব্দগুলো তো রয়েছেই। একটা ট্রলারের চলে যাওয়া, নৌকার বৈঠা চালানো থেকে শুরু করে স্রোতের ওঠানামার শব্দ পর্যন্ত প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে ছবিটিতে। এছাড়া বাঁধ নির্মাণের সময় হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেওয়ার ব্যাপারটির বিশালত্ব বোঝাতে বারবার মাইকের আহবান, নদীতে বস্তা পড়ার শব্দ, মানুষের ভেতরের চাপা উৎসাহ-গুঞ্জন দক্ষতার সঙ্গে দর্শকদের শোনানো হয়েছে।

আর পরিচালনার কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলতে হবে, সিনেমার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসার জায়গা থেকে ছবিটি নির্মিত হয়েছে। যে দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রম এ ছবিটি তৈরি করতে গেছে তা সিনেমার প্রতি খুব বেশি নিবেদিত না হলে সম্ভব নয়। কামার আহমাদ সাইমন পরিচালনার পাশাপাশি প্রায় সব বিভাগেই কমবেশি অংশগ্রহণ করে শুনতে কি পাও-কে ব্যক্তিগত সিনেমার খুব কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। যা আমাদের মেধাশূন্য সিনেমার আঙিনায় আশাবাদের জানান দেয়।

শুনতে কি পাও অবশ্যই একটা নতুন শুরুর ইঙ্গিত দেয়। যারা প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে মানুষের জীবনকে তুলে ধরতে চান, একটা না-শোনা মানবিক গল্প শোনাতে চান, তাদের জন্য হতে পারে সিঁড়ির আরেকটা বড় ধাপের মতন। তারেক মাসুদের মাইলফলক প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির গান যেমন সে-সময় একটা নতুন ধারা জন্মের আভাস দিয়েছিল, এই ছবিটিও কোনো অংশে কম নয়। একটা প্রামাণ্যচিত্র ছবি মুক্তি পাওয়া উপলক্ষে সে ছবির পোস্টারে সমস্ত ঢাকা শহর সয়লাব হওয়ার ব্যাপারটি আসলে আমাদের বর্তমান সিনেমার প্রেক্ষাপট থেকে একটু আলাদা, একটু চোখে পড়ার মতো ব্যাপার এবং অবশ্যই তা অত্যন্ত ইতিবাচক ব্যাপার। প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি শুধু মুক্তি পায়নি, একাধিক সপ্তাহ ধরে চলেছে শুধু মানুষ ছবিটি দেখতে চায় বলে, ভালো ছবির দর্শক সবসময়ই ছিল বা আছে বলে। তাই আমরা কামার আহমাদ সাইমন ও সারা আফরীনের কাছ থেকে আরো কিছু অনবদ্য সিনেমা আশা করতেই পারি।

প্রামাণ্যচলচ্চিত্র অন্য যে-কোনো ধারার চলচ্চিত্র থেকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল সমাজের প্রতি, সমাজের মানুষের প্রতি। কিন্তু অতীতের মতো এখনো থেমে থাকেনি প্রচারণামূলক প্রামাণচিত্র তৈরি করা কারো কারো বৃহত্তর স্বার্থ উদ্ধারের নিমিত্তে। তেমনি থেমে থাকেনি এমন ইস্যু নিয়ে কাজ করার প্রবণতা, যা পশ্চিমের দর্শকরা বুকে টেনে নেবে। লক্ষণীয় একটা ব্যাপার হলো যে টুইন টাওয়ার ট্র্যাজেডির পর থেকে বিশ্বের ছোট-বড় অনেক দেশেই ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কিছু তৈরি করলেই খুব সহজে ফান্ডিং ম্যানেজ করতে পারত, এমন একটা ধারণা অনেকের মধ্যেই ছিল বা আছে। ব্যাপারটি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে কিন্তু এখন বোধহয় সেই ট্রেন্ডটি জলবায়ু নিয়ে। তাই যখন জলবায়ুর মতো একটা আলোচিত-সমালোচিত ইস্যুকে সামনে রেখে বাংলাদেশে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়, যার প্রধান চরিত্রে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা আছেন, তখন সংশয়বাদীরা শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক আমাদের দেশের জন্য। কারণ আমরা সিনেমার থেকে বেশি সিনেমার পেছনের রাজনীতি খুঁজি। হাজারো প্রশ্ন খুঁজে বেড়াই। যার উত্তর দিয়ে তারপর কেউ এখানে সিনেমা বানাতে পারে। যা-ই হোক, শুনতে কি পাও আমাদের এসব প্রশ্নের প্রতি একটা মানবিক উত্তর। সিনেমাটি শুধু অসাধারণ একটি মানবিক গল্প বলে না, পশ্চিমাদের কাছে এ খবর জানান দেয় যে শত বাধা আর প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আমরা এগিয়ে আসছি। পায়ে পা মিলিয়ে আমরা হাজার লাখো মানুষ, গ্রাম থেকে, শহর থেকে, দূরদূরান্ত থেকে।

আমাদের সেই পায়ের আওয়াজ তোমরা… শুনতে কি পাও? শুনতে কি পাও চলচ্চিত্রটির পুরস্কার ও অফিসিয়াল সিলেকশনের তালিকা :

১।    ২০১৩ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠেয় ইউরোপের অন্যতম প্রধান প্রামাণ্যচিত্র উৎসব সিনেমা দ্যু রিল-এর ৩৫তম আসরে সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘গ্রাঁ প্রি’ অর্জন।

২।    উপমহাদেশের অন্যতম প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসব ফিল্ম সাউথ এশিয়া ফেস্টিভ্যালে ‘জুরি-অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন।

৩।   ২০১৪ সালে এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ মুম্বাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (মিফ)-এর শ্রেষ্ঠ ছবির জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘স্বর্ণ শঙ্খ’ অর্জন।

৪।    ২০১২ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন প্রামাণ্য উৎসব ডক-লাইপজিগ (জার্মানি)-এর ৫৫তম আসরের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে নির্বাচিত।

৫।    বিশ্বের বৃহত্তম প্রামাণ্য উৎসব ইডফা (নেদারল্যান্ডস)-এর ২৫তম আসরে আনুষ্ঠানিক ছবির আমন্ত্রণ।

৬।   অফিসিয়াল সিলেকশন, ইয়ামগাতার (জাপান)।

৭।    অফিসিয়াল সিলেকশন, অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক প্রামাণ্যচিত্র উৎসব অ্যান্টেনা।

৮।   অফিসিয়াল সিলেকশন, যুক্তরাজ্যের টেক ওয়ান অ্যাকশন।

৯।    অফিসিয়াল সিলেকশন, তুরস্কের ২০তম গোল্ডেন বোল চলচ্চিত্র উৎসব।

১০।     অফিসিয়াল সিলেকশন, কসোভোর প্রি-ফিল্ম ফেস্ট।

 

Leave a Reply

*