logo

শিল্পী পরিতোষ সেনের জীবনবৃত্ত

(ঢাকা থেকে মাদ্রাজ, কলকাতা, প্যারিস, স্বদেশ-বিশ্বের মহাসমন্বয়)

মৃণাল ঘোষ

 

শিল্পী পরিতোষ সেনের (১৯১৮-২০০৮) জীবনবৃত্ত ও শিল্পপ্রক্রিয়ায় ঢাকা শহর তথা তৎকালীন পূর্ববঙ্গ, এখনকার বাংলাদেশের গভীর ভূমিকা রয়েছে। জীবনের সংকট ও সৌন্দর্যের যে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল ঢাকা শহরের জিন্দাবাহার লেন ও বেলতলী গ্রামের উদাত্ত প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে তাঁর সুদূর শৈশব ও কৈশোরে, তাই ক্রমে ক্রমে পরিপূর্ণতার দিকে গেছে সারাবিশ্বকে আত্মস্থ করে। আবিশ্ব উত্তরাধিকার নিয়ে গড়ে উঠেছেন বাংলার এই মহৎ শিল্পী।

এ সম্পর্কে আমরা পরে আরো বিসত্মৃত আলোচনা করব। তার আগে একটু দৃষ্টিপাত করব শিল্প-ইতিহাসের প্রেক্ষাপটের দিকে। পরিতোষ সেন ১৯৪০-এর দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত একজন শিল্পী। ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। ভারত তথা বাংলাদেশের চিত্রকলায় আধুনিকতা থেকে আধুনিকতাবাদ অর্থাৎ ‘মডার্ন’ থেকে ‘মডার্নিজমে’ বিবর্তনের ক্ষেত্রে ক্যালকাটা গ্রম্নপের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের চিত্রকলায় আধুনিকতার শুরু ১৮৫০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রবর্তিত স্বাভাবিকতাবাদী শিল্পধারা থেকে। রাজা রবি বর্মা, অন্নদাপ্রসাদ বাগচি, বামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পী ছিলেন সেই আধুনিকতার প্রথম পর্বের পথিকৃৎ।

এই আধুনিকতা নানা ধারায় বিবর্তিত হয়েছে। এর পরবর্তী বিবর্তনকে বলা যেতে পারে স্বদেশচেতনা-আশ্রিত আধুনিকতা। ১৮৯৭ থেকে ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত নানা শিল্পীর সৃজনের মধ্য দিয়ে এই আধুনিকতা প্রসারিত হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথের ১৯৩০-এ করা ‘আরব্যরজনী’ চিত্রমালা, ১৯৩৮-এর ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ ও ‘কবিকঙ্কণ চ-ী’ চিত্রমালা স্বদেশচেতনার বিশ্বগত উন্মীলনের অসামান্য দৃষ্টান্ত। ১৯১৬-র পর থেকে নন্দলাল বসুর ছবিও অতীত ভারতকে ছাড়িয়ে প্রবেশ করেছে আধুনিক ভারতের বৈচিত্র্যের ভিতর। সামাজিক পরিস্থিতি যত জটিল হয় শিল্পীর রূপচেতনাও তত সমৃদ্ধ ও মাত্রাময় হতে থাকে। এই বিবর্তনের ফলেই আধুনিকতা আধুনিকতাবাদ বা ‘মডার্নিজমে’ উত্তীর্ণ হয়।

‘ফর্ম’ বা রূপের ভিতর বিশ্ববোধের সঞ্চার ঘটে। শিল্পীর আত্মগত সংশয় ও অমঙ্গলচেতনা রূপকে প্রভাবিত করে। রূপবোধের এই গভীরতা ও জটিলতারই প্রকাশ ঘটে ‘আধুনিকতাবাদে’। আমাদের দেশে আধুনিকতাবাদের সূচনা ঘটেছে প্রথমে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে ১৯২০-এর দশকে। তারপর তা আরো বলিষ্ঠ ও ঘন-সংবদ্ধ হয়েছে ১৯৩০-এর দশকে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে। এই উত্তরাধিকারকেই আরো পরিণতির দিকে নিয়ে গেছেন ১৯৪০-এর দশকের শিল্পীরা।

১৯৪০-এর দশকে আমাদের দেশের সামাজিক পরিস্থিতি জটিলতর হয়েছে। ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন প্রগাঢ় রূপ ধারণ করেছে। ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সমগ্র দেশবাসীর আবেগ আলোড়িত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। তার ঢেউ ভারতের সামাজিক পরিস্থিতিকেও উত্তাল করেছে। ঔপনিবেশিক শোষণ প্রকট রূপ ধারণ করেছে। এরই প্রত্যক্ষ অভিঘাতে সৃষ্টি হয়েছে ১৯৪৩-এর মন্বন্তর। হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছে। এসবের বিরুদ্ধে একদিকে চলছে স্বদেশি আন্দোলন, আর একদিকে মার্কসবাদী আন্দোলন। এই জটিল পরিস্থিতিকে আত্মস্থ করে গড়ে উঠেছে ১৯৪০-এর দশকের শিল্পকলা। পরিতোষ সেনের ছবির গভীরে প্রবেশ করতে এই বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করা দরকার।

১৯৪০-এর দশকের যে আধুনিকতাবাদী চেতনা তাকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। একটি পর্যায় মন্বন্তরের বাস্তবতা থেকে জেগে ওঠা মার্কসবাদী-চেতনা অনুপ্রাণিত তীব্র প্রতিবাদী আঙ্গিক-প্রবাহ। এর প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তিনজন শিল্পীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা হলেন জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ ও সোমনাথ হোর। এছাড়া অন্য অনেক শিল্পীও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে – সংঘবদ্ধ শিল্প-আন্দোলন। ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপে’র সমবেত কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন বিকশিত হয়েছে। কলকাতায় যেমন ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’, তেমনি ভারতের বিভিন্ন শহরেও গড়ে উঠেছিল সংঘবদ্ধ আন্দোলন। মুম্বাইতে ১৯৪৭-এ গড়ে উঠেছিল ‘বম্বে প্রগ্রেসিভ গ্রম্নপ’। দিলিস্নতে ১৯৪৯ সালে ‘দিলিস্ন শিল্পী চক্র’। মাদ্রাজে ১৯৪৪-এ তৈরি হয়েছিল ‘প্রগ্রেসিভ পেইন্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’। কাশ্মীরেও ১৯৪৭-এ তৈরি হয় ‘দ্য ন্যাশনাল কালচারাল ফ্রন্ট’। ১৯৪৮-এ এই সংস্কারই নতুন নাম হয় ‘প্রগ্রেসিভ আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’। এই যে সারা ভারতে সংঘবদ্ধ শিল্প আন্দোলন – এর উদ্দেশ্য ছিল শিল্পের ভিতর দিয়ে সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরা। তা করতে গিয়ে শিল্পীরা পাশ্চাত্য আধুনিকতা ও আধুনিকতাবাদী আঙ্গিককে আত্মস্থ করতে চাইলেন। তার সঙ্গে মেলাতেও চাইলেন দেশীয় লৌকিক ঐতিহ্যকে। পরিতোষ সেনের ছবিতেও এই সমন্বয়প্রক্রিয়া গুরুত্ব পেয়েছে।

এখানে আর একটি সংশয়ের বা সংকটের উৎস সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। সেটি শিল্প-ইতিহাস সংক্রান্ত। ভারতের বিভিন্ন শিল্প-রাজনীতির কেন্দ্র থেকে যে শিল্প-ইতিহাস রচিত হয়েছে, তাতে আধুনিকতাবাদের প্রথম ও প্রধান প্রবক্তা হিসেবে ‘বম্বে প্রগ্রেসিভ গ্রম্নপ’কেই চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে যায়। কেউই মনে রাখেন না বা গুরুত্ব দিতে চান না যে ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’ তৈরি হয়েছিল ‘বম্বে প্রগ্রেসিভ গ্রম্নপ’-এর অনেক আগে। এবং ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’-এর প্রেরণাতেই গড়ে উঠেছিল ‘বম্বে প্রগ্রেসিভ গ্রম্নপ’। সেদিক থেকে আধুনিকতাবাদের ক্ষেত্রেও ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’-এর শিল্পীরাই পথিকৃৎ। কিন্তু তাঁরা তেমন পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচারের আলো পাননি। কিন্তু আজ যদি আমরা তাঁদের শিল্পকৃতি বিচার করি, তাহলে দেখা যাবে যে তাঁদের দায়বোধ, নন্দনচেতনা, রূপের প্রগাঢ়তা কোনো অংশেই কম নয়। নীরদ মজুমদার, গোপাল ঘোষ, সুনীল মাধব সেন, প্রদোষ দাশগুপ্ত, রথীন মৈত্র, গোবর্ধন আশ যে শিল্পকৃতি রেখে গেছেন, তার অভিঘাত মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। পরিতোষ সেনের ছবিও এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার্য। পাশ্চাত্যের আধুনিকতাবাদী রূপচেতনাকে তিনি আত্মস্থ করেছেন। ভারতীয় ঐতিহ্যকেও সম্যক অনুধাবন করেছেন। এই দুই উত্তরাধিকারকে সমন্বিত করে তিনি গড়ে তুলেছেন যে রূপের জগৎ, তা প্রতিনিয়ত প্রবহমান বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রূপকল্প তৈরি করেছে। এখানেই তাঁর আধুনিকতাবাদী চেতনা দেশ-কালের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাঁর ছবি সবসময়ই জীবনকে নিবিড়ভাবে ছুঁয়ে থেকেছে। প্রত্যক্ষ প্রবহমান জীবনই ছিল তাঁর সৃষ্টির উৎস। নানা উৎস থেকে তিনি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্বের আলোয় তা এমনভাবে রূপান্তরিত হয়েছে যে আহৃত উৎসগুলি থেকে তা একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে। কখনো কখনো তিনি আবার নিজের জীবন ও পারিপার্শ্বিককেই শিল্পের বিষয় করে তুলেছেন। নিজেকে নিয়ে কৌতুক করেছেন। সেই কৌতুকের মধ্য দিয়ে সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টিকেও উন্মোচিত করেছেন। আমরা জানি, একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীই শুধু নন, পরিতোষ সেন ছিলেন একজন অত্যন্ত বিদগ্ধ লেখকও। আত্মস্মৃতিভিত্তিক আখ্যানমূলক ও শিল্পকলাবিষয়ক – উভয় ধরনের লেখাতেই এক নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি তৈরি করেছিলেন তিনি। ছবি ও লেখা – এই দুটি দিক নিয়েই উন্মীলিত হয়েছে তাঁর শিল্পীসত্তা।

দুই

 

পরিতোষ সেনের জন্ম ১৯১৮ সালে বর্তমান বাংলাদেশ, তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলায়। যদিও এই তথ্যে সামান্য ভুল আছে। তাঁর সমস্ত জীবনপঞ্জিতে তাঁর জন্মবর্ষ হিসেবে ১৯১৮-ই উল্লে করা হয়। কিন্তু বর্তমান লেখকের সঙ্গে এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে শিল্পী বলেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে তাঁর জন্ম ১৯১৯ সালে। তিনি যখন ইন্দোরে শিক্ষকতা করছেন, তখন তাঁর সুযোগ হয় একজন ব্রিটিশ রাজপুরুষের সহায়তায় পাসপোর্ট করিয়ে নেওয়ার। স্মৃতি থেকে জন্মতারিখ বলতে গিয়ে তিনি ভুল করে ১৯১৮ বলেন। সেটাই তখন তাঁর পাসপোর্টে নথিভুক্ত হয়ে যায়। পরে আর এই তারিখ পরিবর্তন করা যায়নি।

তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে পূর্ববঙ্গে। ঢাকা শহরে তাঁর বাড়ি ছিল ‘জিন্দাবাহার লেন’ নামে এক রাস্তায়। সেখানকার নানা বৈচিত্র্যের কথা আমরা জেনেছি জিন্দাবাহার নামে তাঁর স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ থেকে। এছাড়া তাঁদের আর একটি বাড়ি ছিল ঢাকা শহর থেকে কিছু দূরে ‘বেলতলী’ নামে এক গ্রামে। দুর্গাপূজার সময় তাঁরা সেখানে যেতেন। অন্যান্য ছুটিতেও কখনো কাটাতেন সেখানে। জিন্দাবাহার বইয়ের ‘আমি’ নামের রচনায় এই গ্রামের একদিনের স্মৃতির কথা বলেছেন তিনি। তাঁর বয়স তখন বছর বারো হবে। ‘বেলতলী’তে গেছেন। ডিঙি নৌকায় করে এখানকার খাল-বিলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সহসা ওখানকার প্রকৃতির সমস্ত রূপমাধুর্য তাঁর চেতনাকে অভিভূত, বিস্ময়াবিষ্ট করল। তাঁর নিজের কথায় – ‘এ-নিত্যলোক সত্যিই কী রসময়! কী মধুর! কী মুক্ত জীবন!’ সারা দুপুর নৌকায় ঘুরতে ঘুরতে একসময় গলুইয়ে মাথা দিয়ে শুয়েছেন। ওপরে তাকিয়ে দেখছেন সবুজ প্রকৃতির অসামান্য রূপ। আর একদিকে মাটিতে গাছের ওপরে জীবনের বিপুল সমারোহ। কেঁচো, ক্যাড়া, শ্যামাপোকা, শুঁয়োপোকা, গুইসাপের বাচ্চা, আরো কত কী! আবার নিচের দিকে জলের ভিতরে তাকিয়ে দেখছেন শত শত জীবাণু, জলচর পোকা, মৌরলা, ট্যাংরা, পুঁটি, চিংড়ি ইত্যাদি মাছ ও বিচিত্র সব প্রাণীর সমারোহ। সৃষ্টির এই ‘জটিল নক্সা’ তাঁকে অভিভূত করেছিল তখন, সেই কৈশোরে।

অনেক পরে পরিণত বয়সে তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ভারতীয় ভাস্কর্য বিষয়ে। ইংরেজিতে লেখা সেই প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘ডিনামিজম ইন ইন্ডিয়ান স্কাল্পচার’। সেই লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ১৯৮৪-তে ললিতকলা অ্যাকাডেমি প্রকাশিত কুমারস্বামী শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থে। এই লেখাটিও তিনি শুরু করেছিলেন বেলতলী গ্রামের সেই কৈশোর স্মৃতি দিয়ে। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের তলায় এক ফোঁটা জলের ভিতর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অন্তহীন জীবনের উপস্থিতি দেখে বিস্ময়াবিষ্ট হয়েছিলেন প্রখ্যাত অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী ইয়োহান মেন্ডেল। বিজ্ঞানীর সেই বিস্ময়ের সঙ্গে তাঁর নিজের অনুভূতিকে একাত্ম করতে পেরেছিলেন শিল্পী। আমাদের দেশের প্রকৃতি, জীবন ও শিল্পের মধ্যে এক ঐক্যসূত্র অনুভব করেছিলেন তিনি।

এই সর্বেশ্বরবাদী আধ্যাত্মিকতা যেমন ছিল তাঁর কৈশোর-চেতনার একটি দিক, তেমনি এর এক বিপরীত প্রান্তও ছিল, যা অত্যন্ত বাস্তব। জিন্দাবাহারে তাঁদের ছিল বিরাট এক যৌথ পরিবার। তাঁর পিতা প্রসন্নকুমার সেন ছিলেন একজন নামকরা কবিরাজ। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ডাকসাইটে ও রাশভারী। তাঁর দুই পক্ষের স্ত্রীর মিলিত সমত্মানের সংখ্যা কুড়ি। পরিতোষ তাঁর সপ্তদশতম সমত্মান। তাঁর কনিষ্ঠতম সমত্মানের জন্মের সময় প্রসন্নকুমারের বয়স ছিল পঁচাত্তর বছর। এই কুড়িটি সমত্মানের স্ত্রী পুত্র কন্যা ছাড়াও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন নিয়ে এই বিরাট একান্নবর্তী পরিবারে কেটেছে তাঁর শৈশব। পরিবারের সঙ্গে তাঁর সে অর্থে কোনো একাত্মতা গড়ে ওঠেনি। বরং এক বিচ্ছিন্নতা তাঁর শৈশবকে ভারাক্রান্ত করেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা বিপর্যস্ত করেছে তাঁর শৈশবকে।

পাশাপাশি একটা সৌন্দর্যের বোধও গড়ে উঠেছে তাঁর ভিতর শৈশব থেকেই। এই সহজাত বোধ থেকেই তিনি মুগ্ধ ও বিস্মিত হতে পারতেন দর্জি হাফিজ মিঞার পোশাক তৈরির শৈল্পিক নৈপুণ্যে বা পায়রা ওড়ানোর অসামান্য মুনশিয়ানায়, সিনজেন্টার জিতেন গোঁসাইর অঙ্কনের দক্ষতায়, ডেন্টিস্ট আখতার মিঞার কাল্পনিক গল্প বানানোর প্রতিভায়। ঢাকা জেলায় তাঁদের গ্রামের সেই বিরাট অর্জুনগাছ তাঁর কল্পনাকে নানাভাবে উদ্দীপিত করত। এই যে মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য, যার নাম দেওয়া যেতে পারে বেলতলী-জিন্দাবাহার বৈপরীত্য, সেটাই তাঁর বাস্তবতাবোধকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাস্তবতাবোধকে সৌন্দর্যবোধে জারিত করেছে। সেই সমন্বয় থেকে গড়ে উঠেছে তাঁর শিল্প।

তাঁর শিল্পের আর একটি যে বৈশিষ্ট্য, শরীরময়তা বা সেনসুয়ালিটি, সেটাও হয়তো শৈশবের সেই বাস্তবতা থেকেই এসেছে। যৌথ পরিবারের সেই শিশুটিকে তখনো কেউ পুরুষ বলে গণ্য করত না। ফলে আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে যুবতী নারীর অনাবৃত শরীর অনেক সময়ই উন্মোচিত হতো তাঁর সামনে। সেরকম চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা আমরা অনেক পাই তাঁর লেখায়। এই ইন্দ্রিয়ময়তা শুধু নারীর শরীরের রূপায়ণে নয়, তাঁর সমগ্র প্রকাশেরই অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। তাঁর সমগ্র বাস্তবতার বোধই শরীর-সম্পৃক্ত। এবং গাঠনিক। পরবর্তী জীবনে, তাঁর পরিণত পর্বে, রূপের নির্মাণে তিনি যে পাশ্চাত্য আধুনিকতার পোস্ট-কিউবিস্ট বা উত্তর-ঘনকবাদী আঙ্গিকের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, এর একটা কারণ হতে পারে তাঁর মনস্তত্ত্বের অন্তর্গত সেই শারীরিকতা বা গাঠনিকতার প্রতি সহজাত আকর্ষণ। কিউবিজমের জ্যামিতি দিয়ে তিনি সেই গাঠনিকতাকেই প্রগাঢ় করতে পেরেছেন।

কিন্তু কিউবিজম সত্ত্বেও, পাশ্চাত্য আধুনিকতার আঙ্গিকে মগ্নতা সত্ত্বেও, আমাদের মনে রাখতে হয়, তাঁর মননের এবং সেজন্যই তাঁর সৃজনের শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত ছিল তাঁর স্বভূমিতে। সারাজীবন তিনি অনেক জায়গায় ঘুরেছেন। শৈশব থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত তাঁর পরিক্রমার ক্রমটা অনেকটা এরকম। ঢাকার জিন্দাবাহার, বেলতলী; সেখান থেকে মাদ্রাজ; তারপর কলকাতা, ইন্দোর, প্যারিস, কলকাতা, রাঁচির নেতারহাট, এরপর স্থায়ীভাবে কলকাতা। এর পরেও তিনি ফ্রান্স, সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকায় গেছেন। যখনই যেখানে গেছেন, সেখান থেকে সংগৃহীত হয়েছে কিছু। সঞ্চিত হয়েছে তাঁর চেতনায়। প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর শিল্পে। তাঁর কাজে এই শিকড়ের টান, এই নস্টালজিয়াকে তিনি অনুভব করেছেন সবসময়। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন :

‘জন্মভূমির প্রতি গভীর নাড়ির টান না থাকলে তো ওরকম লেখা যায় না। কোনও সৃজনশীল কাজই করা যায় না।… ঢাকার প্রতি এই অন্তরের টান আমার এখনও কাজ করে। এই যে প্রাণের টান, আত্তিকতা – সেটা আমার সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে নানাভাবে প্রভাব ফেলেছে।’ (বসুধারা, ১৫ আগস্ট ২০০২, দেবাশিস চন্দের নেওয়া সাক্ষাৎকার। পৃ. ৭৪)

 

তাঁর ছবির জগৎ শুরু হয়েছিল স্বদেশচেতনা থেকে। তারপর তা বিশ্ব পরিক্রমা করেছে।

শিল্পের কোনো পারিবারিক উত্তরাধিকার তাঁর ছিল না। বাড়িতে কোনো পড়াশুনো বা শিল্পচর্চার পরিম-ল ছিল না। তবে এও বলেছেন তিনি এক সাক্ষাৎকারে যে তাঁর এক কাকা ছিলেন, যিনি আঁকতে পারতেন। পাড়ার যত বিয়ের পিঁড়ি আঁকার ভার পড়ত তাঁর ওপর। সেই কাকার স্ত্রী অর্থাৎ তাঁর খুড়িমার কথা খুব মজা করে বলেছেন পরিতোষ সেন। তাঁর খুড়িমা নাকি তাঁকে বলেছিলেন একবার :

‘তুমার খুড়ায় এমন সুন্দর বিয়ার পিড়ি আঁকতেন, বিয়ার কুলা আঁকতেন যে পাড়ার লোক চাইয়া থাকত। তিনি যদি আইজ বাইচা থাকতেন তাইলে তুমারে আর মাদ্রাজ আর্ট স্কুলে যাইতে হইত না।’ (বসুধারা পত্রিকার পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকার)।

 

এরকম একটা অনির্দেশ্য উত্তরাধিকারই হয়তো তাঁর মধ্যে ক্রমে ক্রমে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। স্কুলে পড়তে পড়তেই কিছু কিছু আঁকার চেষ্টা করতেন। তখন থেকেই এই সংকল্প দৃঢ় হয়েছিল মনে যে শিল্পী হওয়াই তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

 

তিন

 

দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী (১৮৯৯-১৯৭৫) নাম শুনেছিলেন স্কুলের শেষ ধাপে পৌঁছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখেছেন তাঁর ছবি। দেবীপ্রসাদ তখন মাদ্রাজ গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ। শিল্পী হিসেবে তাঁকেই আদর্শ বলে মনে হচ্ছিল তাঁর। ভাবছিলেন, ছবি আঁকা যদি শিখতে হয়, শিখবেন তাঁর কাছেই। স্কুলের পাঠ শেষ হলে মাদ্রাজ যাওয়ার জন্যই মন স্থির করলেন। বাড়িতে তাঁর দাদারা তখন অভিভাবক। বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। শিল্পী হওয়া তখন এক নগণ্য বৃত্তি বলে গণ্য হতো। তাই পরিবারের সকলেরই ছিল প্রবল আপত্তি। একমাত্র নীরব সম্মতি ছিল তাঁর মা-র। সেইটুকু ভরসা আর প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে ১৯৩৬ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ঢাকা থেকে একা পাড়ি দিলেন মাদ্রাজে। এর আগে দেবীপ্রসাদকে চিঠি লিখে, ছবি পাঠিয়ে সম্মতি আদায় করেছেন তাঁর। মাদ্রাজ আর্ট স্কুলে গিয়ে ভর্তি হলেন তৃতীয় বর্ষে। আঁকার দক্ষতার জন্য দুবছর এগিয়ে ভর্তি করে নেওয়া হলো তাঁকে।

১৯৪০ সালে পরিতোষ সেন মাদ্রাজ আর্ট স্কুলের পাঠক্রম শেষ করে যখন কলকাতায় ফিরে এলেন, তখন দেশের সামাজিক বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিলো। এতদিন তিনি যে ছবি আঁকছিলেন তাতে নব্য-ভারতীয় ঘরানার প্রভাব ছিল অনেকটাই। দেবীপ্রসাদ ও মাদ্রাজ আর্ট স্কুলের শিক্ষকদের পরিচালনায় ছবির নানা আঙ্গিক নিয়ে অনুশীলন করেছেন। স্বাভাবিকতার রীতিতেও তাঁর দক্ষতা গড়ে উঠেছে যথেষ্ট। তবু ১৯৪০-এর কলকাতায় ফিরে তাঁর মনে হলো, এই ভিত্তির ওপর তাঁকে গড়ে তুলতে হবে নিজের প্রকাশের পথ, তাঁর নিজস্ব আঙ্গিক। বাস্তবতার প্রতি তাঁর একটা আকর্ষণ বরাবরই ছিল। তখনকার আলোড়িত ও ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতাকে প্রকাশ করার জন্য আধুনিকতার নতুন ভাষা গড়ে তুলতে হবে, এই বোধও জাগল তখন।

তখন যুদ্ধের প্রয়োজনে ইউরোপ থেকে প্রচুর সৈনিক আসছে এদেশে। তাদের প্রয়োজনে আসছে প্রচুর বিদেশি বই। বিদেশি ছবির বই তখন অনেক সহজলভ্য হয়েছে কলকাতায়। ইম্প্রেশনিজম, পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম থেকে কিউবিজম পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পধারার শিল্পীদের ছবি দেখার সুযোগ হলো তাঁর এইসব বইয়ের মাধ্যমে। তাঁর মনে হলো, আধুনিকতার বিপর্যস্ত বাস্তবতার দৃশ্যরূপ গড়ে তুলতে এই চিত্রভাষাকে নানাভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর সচেতনতা জাগল দেশীয় লৌকিক সম্পর্কেও। ১৯৩০-এর দশকে ভারতের চিত্রকলায় লৌকিকের উজ্জীবন আধুনিকতাতে নতুন অভিমুখ এনেছিল। এ বিষয়ে যামিনী রায় ছিলেন পথিকৃৎ। ১৯৩৭-৩৮ সাল নাগাদ অবনীন্দ্রনাথ ও নন্দলাল বসুর ছবিতেও লৌকিককে আত্মস্থ করার প্রবণতা দেখা যায়। অবনীন্দ্রনাথ ১৯৩৮ সালে এঁকেছিলেন ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ ও ‘কবিকঙ্কণ চ-ী’ চিত্রমালা। তাতে ছিল লৌকিক আঙ্গিকের সুচারু ব্যবহার। নন্দলাল ১৯৩৭-এ এঁকেছিলেন ‘হরিপুরা পোস্টার’ চিত্রমালা, হরিপুরায় কংগ্রেস অধিবেশনের জন্য ম-প সজ্জার ছবি। এ বিষয়ে সুনয়নী দেবীর অবদানও স্মরণযোগ্য।

গান্ধিজি ১৯২০-এর দশক থেকে রাজনৈতিক আন্দোলনকে যেভাবে গ্রামের দিকে, নিম্নবর্গীয় মানুষের দিকে প্রসারিত করেছিলেন, তারই ফলে জেগেছিল লৌকিক সম্পর্কে এই সচেতনতা। চলিস্নশের তরুণ শিল্পীরা যামিনী রায়ের লৌকিক আঙ্গিকের উজ্জীবন দ্বারা গভীরভাবে উদ্দীপিত হয়েছিলেন। পরিতোষ সেন ১৯৪০-এর দশকের গোড়ায় স্বদেশ ও বিশ্বের বাস্তবতা দ্বারা আলোড়িত হচ্ছেন। এই বাস্তবতাকে প্রকাশ করতে গিয়ে দুটি উৎসকে মেলাতে চেষ্টা করছেন। একটি ভারতীয় লৌকিক। দ্বিতীয়টি ইউরোপীয় আধুনিকতার আঙ্গিক। এই সমস্যাসংকুল সময়ে একক প্রচেষ্টা যে যথেষ্ট নয়, এই বোধও জাগছে তাঁর মনে। তাঁর সমবয়স্ক ও সমমনস্ক শিল্পীদের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছেন ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’। দুর্ভিক্ষের বছর ১৯৪৩-এ প্রতিষ্ঠিত এই দলের শিল্পীদের সম্মিলিত উদ্যোগ ভারতীয় শিল্পকলার আধুনিকতায় নতুন অভিঘাত এনেছিল। চলিস্নশের এই সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিতোষ সেনের বাস্তবচেতনা ও নন্দনচেতনকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল।

১৯৪০-এ মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় ফিরে কিছুদিন থাকার পর ওই বছরই পরিতোষ সেন চলে যান ইন্দোরে, ওখানকার ডেলি কলেজে শিল্প-শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে। ১৯৪৯ পর্যন্ত চাকরি করেন ওখানে। কলকাতার সঙ্গে তখন যোগাযোগ রেখেছেন ওখান থেকেই। ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’-এর প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করছেন নিয়মিত। ভিতরে ভিতরে তখন অনুভব করছেন পশ্চিমমুখী টান। আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্পকলার প্রতি তাঁর তখন প্রবল আগ্রহ। সেই আধুনিকতার প্রাণকেন্দ্র ফ্রান্সের প্যারিস শহর। সেখানে যাওয়ার স্বপ্ন তাঁর চলিস্নশের দশকের গোড়া থেকেই। সেই স্বপ্ন সফল হতে সময় লাগল প্রায় এক দশক।

বিদেশে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তখন তাঁর ছিল না। তবু ইচ্ছা থাকলে উপায় হয় – এই বিশ্বাসে নির্ভর করে চেষ্টা করেছেন। উপায় হয়েছে অবশেষে। একটি টিকিট ও কয়েকশো টাকা সম্বল করে ১৯৪৯ সালে তিনি পাড়ি দিলেন ইউরোপের পথে। ডেনমার্কে ভারতীয় দূতাবাসের আনুকূল্যে সেখানে একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হয়েছিল তাঁর। সেই প্রদর্শনী থেকে কিছু টাকা সংগ্রহ হওয়ায় সহজতর হয়েছিল তাঁর ইউরোপ যাত্রা। প্যারিস ছিল তাঁর লক্ষ্য। অবশেষে প্যারিস পৌঁছলেন ১৯৫০-এর শীতের প্রারম্ভে।

প্যারিসে তাঁকে যুক্ত থাকতে হয়েছিল কয়েকটি শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে রয়েছে আঁন্দ্রে লোহতের স্কুল, অ্যাকাডেমি গ্র্যান্ড পামিয়ের, একোল ডি বোজার্ত এবং একোল ডি লুভরে। শেষোক্ত প্রতিষ্ঠানে তিনি পড়েছেন শিল্প-ইতিহাস। কিন্তু ওখানে তাঁর প্রকৃত শিক্ষা ঘটেছে দেখার মধ্য দিয়ে। অবিরত দেখেছেন বিভিন্ন মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। সারা বিশ্বের অনাদিকালের শিল্প-ইতিহাসের সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় হয়েছে সেখানে। ছয় নক্ষত্রের দীপ্তিতে ভাস্বর তখন প্যারিসের শিল্পের আবহম-ল। তাঁরা হলেন পিকাসো, ব্রাক, মাতিস, শাগাল, রুয়ো ও ব্রাঁকুসি। এছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রায় পঞ্চাশ হাজার শিল্পী তখন কাজ করছেন ওখানে। সক্রিয় রয়েছে কয়েকশো আর্ট গ্যালারি। বিপুল এই শিল্পের কর্মকা– প্যারিসের এই মহামিলনমেলায় এসে কী শিখেছিলেন পরিতোষ সেন? ছবিতে বিষয় ও আঙ্গিকের সম্পর্ক সম্বন্ধে এতদিন যা জেনেছিলেন তিনি, এখানে এসে দেখলেন, পাশ্চাত্যের আধুনিকতাবাদী (মডার্নিজম) অনুষঙ্গ সেই সম্পর্কটাকে একেবারে উলটে দিয়েছে। ছবি থেকে আখ্যানের পরিম-ল একেবারেই বিবর্জিত হয়ে গেছে। গল্প বলা নয়, আঙ্গিক বা শিল্পীর স্টাইলটাই ছবির দৃশ্যতার মূল উপাদান। একটি অতি সাধারণ বস্ত্তই হতে পারে শিল্পের বিষয়। তার উপস্থাপনার ভিতর দিয়েই পরিস্ফুট হতে পারে শিল্পীর সমগ্র বিশ্বদৃষ্টি, যার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত ভ্যান গঘের ‘চেয়ার’ বা একটি পরিত্যক্ত বুটজুতো। তাঁর নিজের লেখায় :

‘One of the important lessons I learnt during my stay in paris was the reversal of the old subject-picture relationship. The picture now as a picture took the lead by a total elemination of story-telling. The artist’s aim, I felt, must be to subdue all things to his style beginning with the simplest, least promising objects as exemplified in Van Gogh’s painting of an empty chair or a pair of discarded boots. (Paritosh sen in Retrospect. Mapin Publishing, Ahmedabad, P-60)

 

এই উপলব্ধি শুধু তাঁরই নয়। ভারতবর্ষে ১৯৪০-এর দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীদের আধুনিকতাবাদী প্রকাশের এটাই ছিল একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

পরিতোষ সেনের প্রথম পর্যায়ের প্যারিস প্রবাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। একে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেছেন। প্রথমটি ভাস্কর ব্রাঁকুসির সঙ্গে সাক্ষাৎকার। দ্বিতীয়টি পিকাসোর মুখোমুখি হয়ে তাঁর সঙ্গে অনেকটা অন্তরঙ্গ সময় কাটানো। ১৯৫৩-র ১ মে পিকাসোর সঙ্গে তাঁর প্রথম সামনাসামনি দেখা হয়েছিল প্যারিসের ‘Salon de Mai’ প্রদর্শনীতে। তিনিই এগিয়ে গিয়ে আলাপ করেন পিকাসোর সঙ্গে। নিজেকে একজন ভারতীয় শিল্পী বলে পরিচয় দেন। স্টুডিওতে গিয়ে পিকাসোকে ছবি দেখানোর অনুমতি চান। একদিন বাদ দিয়ে পরের দিন সকাল দশটায় পিকাসো তাঁকে সময় দেন। চলচ্চিত্রকার বারিণ সাহা তখন প্যারিসে। বারিণকে সঙ্গে নিয়ে পরিতোষ নির্ধারিত সময়ে যান পিকাসো সান্নিধ্যে। পিকাসো তাঁর ছবি দেখে প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন ঠিক পথেই চলেছেন তিনি। এরপর পিকাসো তাঁর নিজের ছবি দেখতে আহবান করেন পরিতোষকে। এই ঘটনা তাঁকে অভিভূত করেছিল। পিকাসো বলেছিলেন, প্যারিসের কোনো গ্যালারিতে তিনি পরিতোষের ছবির প্রদর্শনীর জন্য অনুমোদন করে দেবেন। সেখানে প্রদর্শনী করতে পারেন এই তরুণ শিল্পী। পিকাসোর এই মহত্ত্বে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। তাঁর কাছে পিকাসো হয়ে ওঠেন পৃথিবীর তিন শ্রেষ্ঠ মনীষী বা শিল্পীর অন্যতম। বাকি দুজন হলেন : চার্লি চ্যাপলিন ও রবীন্দ্রনাথ।

প্রস্তাবিত সেই প্রদর্শনী করতে পারেননি পরিতোষ সেন। দেশে ফিরে আসার প্রস্ত্ততি তখন তাঁর শেষ হয়ে গেছে। পিকাসোর দেওয়া সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেননি বলে পরে তিনি অনুশোচনা করেছেন। পিকাসো সম্পর্কিত ওই লেখার শেষ অংশে তিনি বলেছেন :

‘I consider myself singularly fortunate to have come face to face with real greatness. The experience has enrichad my life. In the extended university of life, bits and pieces of experience add up to build up a philosophy of life. Along with this most valueable experience I have an equally staggernig remorse; why did I refuse Picasso’s offer of holding an exhibition in paris? The opportuinty is gone for ever.’ (Paritosh sen in Retrospect, Mapin Publishing, Ahmedabad. 2001. Page-101)

 

১৯৪৯-এ ইংল্যান্ড, তারপর ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত প্যারিসে কাটিয়ে তিনি দেশে ফিরে এলেন।

 

চার

 

১৯৪০-এর দশকের অভিজ্ঞতা ও প্যারিসের অভিজ্ঞতা – এই দুইয়ে মিলে তৈরি হলো তাঁর পরবর্তী জীবনের সৃজনের ভিত্তিভূমি। চলিস্নশ ও পঞ্চাশের দশকজুড়ে তিনি কেবলই ‘রূপ’কে ভেঙে ভেঙে নিজের ছবিতে পৌঁছতে চেষ্টা করেছেন। ১৯৪০-এর আগে পর্যন্ত পরিতোষ সেনের ছবির প্রধান প্রবণতা ছিল নব্য-ভারতীয় রূপরীতিকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা। আর্ট স্কুলে তিন বছর অতিক্রম করার পর ছাত্র অবস্থাতেই তাঁর একটি ছবি প্রবাসী পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তখন প্রবাসীতে একটা ছবি বেরোনো যে-কোনো শিল্পীর পক্ষেই ছিল খুবই সম্মানের বিষয়।

তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী হয় ১৯৪১ সালে আলমোরার উদয়শঙ্কর সেন্টারে। দ্বিতীয় একক ১৯৪২-এ লাহোরের লিটারেসি লিগে। তৃতীয় একক ইন্দোরের টাউন হলে ১৯৪৩ সালে। ১৯৪৪ সালে নতুন দিলিস্নর ওয়াইএমসিএ হলে হয়েছিল চতুর্থ একক। পঞ্চম একক হয়েছিল কলকাতায়, মৌলানা আজাদ কলেজে ১৯৪৫ সালে। কলকাতায় এটিই তাঁর প্রথম একক। এছাড়া তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করছিলেন ‘ক্যালকাটা গ্রম্নপ’-এর সম্মেলক প্রদর্শনীতে। ছবিকে সবসময়ই সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শক্তি হিসেবে দেখতে চাইতেন পরিতোষ সেন। ‘দ্য ফিগার ইন ইন্ডিয়ান আর্ট’ নামে ললিতকলা কন্টেম্পোরারি পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে (এপ্রিল, ১৯৭৪) তিনি লিখেছিলেন : ‘In the present situation, I feel it necessary for us to create an art which is powerful as a social force.’

১৯৪৩-এ কলকাতায় যখন দুর্ভিক্ষ চলছে, পরিতোষ তখন ইন্দোরে রয়েছেন। তার মধ্যেই কলকাতায় যখন এসেছেন, দেখেছেন সেই বিপর্যয়ের প্রকট রূপ। ছবিতে ধরতেও চেষ্টা করেছেন সেই বীভৎসতাকে। সেরকম দু-একটি ছবির বর্ণনা পাই ললিতকলা অ্যাকাডেমি প্রকাশিত শাস্তি চৌধুরীর লেখা ভূমিকায়। তিনি লিখছেন :

‘Paritosh was fairly close to the left movement and his paintings on the Bengal famine showed the foreign soldier as a skull with cigar, dying, children oozing out of skeletal mothers, a masquerade of death composed in strong swirling lines, expressing the anger and the anguish of the painter. This concern for his followers was to become a major element in Paritosh sen’s art.’

 

সাধারণ, বিপন্ন মানুষের জন্য তাঁর এই যে concern, এই যে ভাবনা, এটাই ১৯৪০-এর পর থেকে তাঁর ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠতে থাকে।

এটা করতে গেলে ছবির আঙ্গিককে, সেই প্রকাশের উপযুক্ত করে গড়ে নিতে হবে। এই কাজটিই তিনি করেছেন ১৯৪০-এর দশকজুড়ে এবং প্যারিস প্রবাসের সময়। এই প্রক্রিয়ায় তিনি কেবলই দেশীয় রূপরীতির সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট ও কিউবিস্ট রূপরীতিকে মেলাতে চেষ্টা করেছেন। কেমন করে এই সমন্বয় ঘটছে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি ছবির উল্লে করা যায়। ছবিটি ১৯৪২-এর ‘টি পার্টি ইন আ ম্যাঙ্গো গ্রোভ’। গোয়াশ মাধ্যমে আঁকা। এখানে কিউবিজম নেই। আবার সম্পূর্ণভাবে নব্য-ভারতীয় চিত্ররীতির পরিম-লও নেই। পোস্ট-ইম্প্রেশনিজমের কিছুটা আভাস শনাক্ত করা যেতেও পারে। বহুমুখী পরিপ্রেক্ষিত বা মাল্টিপল পার্সপেকটিভের যে ব্যবহার এখানে রয়েছে, তাতে ভারতীয় অনুচিত্রের পরিম-ল ধরা পড়েছে সুন্দরভাবে। নব্য-ভারতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে পাশ্চাত্য আধুনিকতার মূল্যবোধকে মেলানোর প্রয়াস রয়েছে এখানে। ওই একই বছরের ‘গার্লস অন আ সিসাইড’ ছবিটিতে সমুদ্রের নিসর্গে দুই নারীর উপস্থাপনায় ‘সেনসুয়াসনেস’ বা শরীরময়তা স্পষ্টভাবে পরিস্ফুট হয়েছে। ১৯৪৪-এর ‘থার্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্ট’ শীর্ষক গোয়াশে আঁকা ছবিটিতে ট্রেনযাত্রীর বাস্তবতাকে রূপায়িত করেছেন।

১৯৪০-এর দশকেই তাঁর আত্মপ্রতিকৃতি আঁকার শুরু। দুটি আত্মপ্রতিকৃতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৪৮-এ কাগজের ওপর প্যাস্টেলে আঁকা ‘সেলফ পোর্ট্রেট উইথ পাইপ’। স্বাভাবিকতা-আশ্রিত রূপারোপের মধ্যে বর্ণপ্রয়োগে অভিব্যক্তিবাদী আবহ এসেছে। দ্বিতীয়টি ১৯৪৯ সালের কাগজের ওপর কালি-কলমে আঁকা। শিরোনাম সেলফ পোর্ট্রেট। তীক্ষন রেখা ও ছায়াতপের বিন্যাসে আঁকা। আলোছায়ার লুকোচুরির ভিতর দিয়ে এখানেও একটা অভিব্যক্তিবাদী পরিম-ল তৈরি হয়েছে। এরপর থেকে সারাজীবনই তিনি এঁকে গেছেন অজস্র আত্মপ্রতিকৃতি। কখনো কৌতুকে, কখনো করুণায়। আত্মপ্রতিকৃতি সম্বন্ধে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন :

‘আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি যে বক্তব্য প্রকাশের জন্য আমি নিজেকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছি। একজন সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে নিজেকে নানা সামাজিক অবস্থান, ঘটনা, বহমান জীবনের প্রেক্ষিতে          মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়ে এঁকেছি। নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছে, ক্ষক্ষাভ-রাগ দুঃখ-সুখ প্রকাশ করেছি। ব্যঙ্গ, বিদ্রম্নপ, সামাজিক কৌতুক আমার ছবির কম-বেশি মূল সুর। আত্মপ্রতিকৃতিতেও তা এসেছে।’ (বসুধারা, ২৫ আগস্ট ২০০২। পৃ. ৭২)

 

তাঁর ১৯৫০-এর দশকের ছবিতে লৌকিক সারল্যময় রূপবিন্যাসের সঙ্গে তীক্ষন কৌণিক জ্যামিতিকতা মিলতে থাকে। দেশীয় রূপরীতির সঙ্গে কিউবিজমকে মেলানোর শুরু এখান থেকেই। ১৯৫১-র ক্যানভাসের ওপর তেলরঙে আঁকা ‘বয় ইটিং ওয়াটারমেলন’ ছবিটি এদিক থেকে উল্লেযোগ্য। তীব্র কালো প্রেক্ষাপটে লাল রঙের প্রাধান্যে দীর্ঘায়ত একটি বালকের আলম্ব (Vertical) উপস্থাপনা। তার দুহাতে ধরা দুটুকরো লাল তরমুজের ফালি। বালকটির দারিদ্রে্যর করুণা রূপায়িত হয়েছে এখানে দেশীয় লৌকিকের ভিত্তির ওপর কিউবিজম ও এক্সপ্রেশনিজমকে আত্মস্থ করার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে। প্রায় একই আঙ্গিকের ছবি ওই একই বছরে করা ‘গার্ল উইথ আ শিফ অব কর্ন’। তেলরঙে আঁকা ১৯৫৬-র ‘দ্য বার্ড সেলার’ বা ‘দ্য সারঙ্গি পেস্নয়ার’ও অনেকটা একই আঙ্গিকের ছবি। ১৯৫৬-র অনেক ছবির মধ্যে ‘দ্য বাউল সিঙ্গার’ ছবিটি তাঁর এই সময়ের রূপভাবনার বৈশিষ্ট্য বুঝতে সাহায্য করে। তারের বাদ্যযন্ত্র হাতে একজন বাউল দাঁড়িয়ে আছে। তার দুপাশে নারী ও শিশু। লক্ষণীয়, সমগ্র পরিম-লে লৌকিক সারল্য রয়েছে। তার মধ্যেই প্রতিটি অবয়ব জ্যামিতিকভাবে বিশেস্নষিত হয়েছে। লৌকিকের সঙ্গে কিউবিজমের আঙ্গিককে এভাবে মিলিয়ে ছবিতে চিরন্তন জীবনপ্রবাহের ভিতর সাম্প্রতিকের সংঘাতকে প্রতিস্থাপিত করতে পেরেছেন।

১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক নানা সংঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে এভাবেই পরিতোষ সেন তাঁর নিজস্ব রূপরীতি গড়ে তুলেছেন। তাঁর ভাবনায় যে শিল্প হবে ‘powerful as a social force’ তারই ভিত্তি স্থাপিত হলো এই দুই দশকজুড়ে। পরবর্তীকালে এরই নানা রূপান্তর আমরা দেখব।

 

পাঁচ

 

দীর্ঘ পাঁচ বছর প্যারিস প্রবাসের পর ১৯৫৪ সালে কলকাতায় ফিরে এসে এখানকার বাস্তব পরিস্থিতি তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করল। বিদেশে প্রাচুর্য, বৈভব, সংস্কৃতিমনস্কতা দেখেছেন। এখানকার অবস্থা তার বিপরীত। সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রাম খুবই সংকটময়। তবু দারিদ্রে্যর মধ্যে, সংঘাতের মধ্যেও সাধারণ মানুষের জীবনীশক্তি তাঁকে মুগ্ধ করেছে। অতি সাধারণ মানুষের ভিতর অসাধারণ মানবতার দৃষ্টান্তও অনুপ্রাণিত করেছে তাঁকে। জীবনের এই বৈপরীত্যকে তিনি বুঝতে চেয়েছেন।

১৯৫৫ সালে তিনি একটা চাকরি নিয়ে চলে গেলেন রাঁচির নেতারহাটে। ওখানকার একটা স্কুলে শিল্পশিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। দারিদ্রে্যর ভয়ংকর রূপ দেখেছিলেন ওখানে। কিন্তু ওখানে বেশিদিন থাকতে পারেননি তিনি। কঠিন এক অসুখে আক্রান্ত হয়ে ১৯৫৬ সালে কলকাতায় ফিরে এলেন। এই সময় তাঁকে আকৃষ্ট করে জৈন ও রাজস্থানী অনুচিত্রের ছবি। অনুচিত্র ছাড়াও কোম্পানি স্কুলের ছবির প্রতিও আকৃষ্ট হন। এগুলো নিবিষ্টভাবে অধ্যয়ন করেন। ভারতীয়তার এসব সারাৎসার মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেন তাঁর নিজের ছবিতে। ১৯৫৬-তে আঁকা ‘দ্য বাবু’ ছবিটি এর দৃষ্টান্ত।

নেতারহাট থেকে ফিরে এসে ওই বছরই (১৯৫৬) তিনি চাকরি পেলেন যাদবপুরের ‘ইনস্টিট্যুট অব প্রিন্টিং টেকনোলজি’তে ডিজাইন ও লেআউটের অধ্যাপক হিসেবে। এরপর থেকেই তাঁর জীবনে স্থিতি এলো। ১৯৭৯-তে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত ওখানেই চাকরি করেন। কলকাতা হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী বাসস্থান। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত তিনি ছিলেন লেক গার্ডেনস অঞ্চলে। ১৯৬৬ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত দেশপ্রিয় পার্কের কাছে শরৎ ব্যানার্জি রোডে। ১৯৯৮-তে চলে আসেন আলিপুর পার্ক রোডের ‘সোনালী অ্যাপার্টমেন্টে’ তাঁর নিজের ফ্ল্যাটে। যাদবপুরে চাকরি পাওয়ার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৭ সালে তিনি বিয়ে করেন জয়শ্রীকে। যাদবপুরে শিক্ষকতা তাঁকে শুধু অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাই দেয়নি, মানবিক দিক থেকেও অনেক সমৃদ্ধ করেছে। তরুণ ছাত্রদের সঙ্গে মেলামেশার মধ্য দিয়ে একাত্মতা অনুভব করেছেন তাঁদের সঙ্গে।

১৯৫৬-৫৭ সালে কলকাতার পথঘাট, অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের জীবনকে তিনি দেখেছেন নানাভাবে। বসিত্মতে ঘুরে বেড়াতেন। দুঃখ ও দারিদ্রে্যর মধ্যে মানুষের অদম্য জীবনীশক্তি তাঁকে মুগ্ধ করত। সেসবই হয়ে উঠত তাঁর ছবির বিষয়। সামাজিক বাস্তবতার এক নতুন ধরন তিনি তৈরি করেন দেশীয় লৌকিক, অনুচিত্র, এসবের সঙ্গে পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম ও কিউবিজমের সারাৎসার মিলিয়ে-মিশিয়ে। এরকম ৪০টি ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করেছিলেন পার্ক স্ট্রিটের অধুনা বিলুপ্ত ‘আর্টিস্ট্রি হাউসে’। এই প্রদর্শনী কলকাতায় খুব সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু বিক্রি হয়েছিল মাত্র তিন-চারখানা ছবি। এসব ছবিতে বিষয় হিসেবে এসেছিল সাধারণ মানুষ, ভ্রষ্টাচারী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ইত্যাদি। এছাড়া সংগীত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এসেছিল অনেক ছবিতে। সংগীতে তাঁর চিরদিনই গভীর আকর্ষণ ছিল। রাগ-রাগিণী নিয়ে অনেক ছবিও এঁকেছেন পরবর্তীকালে। কৌতুক সবসময়ই তাঁর ছবির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এই সময় থেকেই ছবিতে তা বেশি করে পরিস্ফুট হতে থাকে।

১৯৬০-এর দশকে পৌঁছে তাঁর রূপের এই সারল্যময় সংহতি ক্রমশ ভাঙতে লাগল। ১৯৫০-এর দশকে নতুন স্বাধীন হওয়া দেশে পরিকল্পনা ও উন্নয়নের যে স্বপ্ন ছিল, ষাটের দশকে পৌঁছে তা ভাঙতে লাগল। দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বিশেষ কোনো সুফল ফলাতে পারেনি। বিসত্মৃত দেশে দারিদ্রে্যর কোনো উপশম হয়নি। ব্যাপকভাবে বেড়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্নীতি। এর ফলে সমাজে দেখা দিয়েছে অসমেত্মাষ। রাজনৈতিক আন্দোলন বেড়েছে। প্রগাঢ় হয়েছে ছাত্র-আন্দোলন। ভিয়েতনাম সাধারণ মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। পরিতোষ সেনের মতো বাস্তবমনস্ক, সমাজসচেতন শিল্পী যে এসব ঘটনাপ্রবাহে আলোড়িত হবেন এটাই স্বাভাবিক। এরই প্রতিক্রিয়ায় তাঁর ছবির সেই সরল সৌন্দর্য ভেঙে যেতে লাগল।

১৯৬২ সালে তিনি দ্বিতীয়বার প্যারিস যান। ওখান থেকে লন্ডনে গিয়েও থেকেছেন কিছুদিন। এবারে তিনি গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে, শুধু বেড়ানোর জন্যই। হাতে টাকা বেশি ছিল না। দুজনের জাহাজের ভাড়া ছাড়া আর মাত্র ছয় পাউন্ড সঙ্গে ছিল। শুধু ওটুকু সম্বল করে আর নিজের আঁকা এক বান্ডিল ছবি নিয়ে তাঁরা বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। এই পর্বের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত তিনি বিসত্মৃতভাবে লিখেছেন দূরের মানুষ, কাছের লোক নামে এক আলেখ্যে। এই লেখাটি তাঁর আবু সিম্বাল, পিকাসো ও অন্যান্য তীর্থ নামে বইতে অন্তর্ভুক্ত আছে। লন্ডনে ‘গ্যালারি ওয়াল’ নামে একটি গ্যালারিতে প্রদর্শনী করার সুযোগ ঘটল ভারতীয় চিত্রকর তৈয়ব মেহতার সঙ্গে যৌথভাবে। পরিতোষ সেন দেখালেন ভারতীয় সংগীতের রাগ-রাগিণী নিয়ে আঁকা কিছু ছবি। আধুনিক শৈলীতে, মিশ্র রঙে আঁকা বেশ বড় আকারের ছবি ছিল সেগুলি। প্রদর্শনীটি খুবই সাড়া জাগিয়েছিল। তিনটি ছবি অপ্রত্যাশিতভাবে বিক্রি হয়েছিল তাঁর।

প্যারিসে থাকাকালে ফরাসি সরকারের কাছ থেকে একটি গবেষণা প্রকল্পের জন্য আমন্ত্রণ পেলেন। রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষর থেকে বাংলায় বিশেষ একটি হরফ ডিজাইনের পরিকল্পনা করেন। অনেক দূর এগিয়েও প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। কলকাতার কোনো টাইপ ফাউন্ড্রি এই টাইপ ঢালাই করতে সম্মত হয়নি। কেননা এতে যা ব্যয় হবে সেই তুলনায় চাহিদা তৈরি হবে কিনা, এ বিষয়ে তাদের সংশয় ছিল।

১৯৬০-এর দশকের শেষ পর্বে তাঁর ছবির একটি বৈশিষ্ট্য বাস্তবের শূন্যতা সংহত হতে হতে কখনো সুর হয়ে উঠেছে। নিখিল নাসিত্মও ক্রমশ এক অসিত্মতায় উত্তীর্ণ হতে পারে, এর দৃষ্টান্ত ১৯৬৯-এর ‘বড়ে গুলাম আলি খান’ ক্যানভাসটি। অবয়বের সামান্য আভাসে শিল্পী এখানে বিমূর্ত সংগীতকে মূর্ত করে তুলেছেন। তাঁর ষাটের দশকের এই প্রায়-বিমূর্তায়িত অভিব্যক্তিবাদী ধারার কিছু কিছু আলোকিত সফলতা সত্ত্বেও একসময় তাঁকে বুঝতে হলো, এই বিমূর্তায়ন তাঁর পথ নয়। তাঁকে অনেক বেশি সংশিস্নষ্ট থাকতে হবে জীবনের সঙ্গে। অবয়বের সারল্য ও সুষমার মধ্য দিয়েই ফুটিয়ে তুলতে হবে জীবনের আলোড়ন। পরবর্তী পদক্ষেপে তিনি সেদিকেই অগ্রসর হলেন।

১৯৬৯ সালের শেষদিকে পরিতোষ সেন আবার ইউরোপ গেলেন। এবার তিনি দুটো গ্রান্ট পেলেন। একটি ফরাসি সরকারের। দ্বিতীয়টি জন ডি. রকফেলার থার্ড ফান্ড থেকে। দুবছরের এই ইউরোপ ও আমেরিকা ভ্রমণে তিনি নতুন করে অনুধাবন করলেন কাইনেটিক আর্ট, পপ আর্ট এবং আমেরিকান এক্সপ্রেশনিজম। মার্সেল দ্যুসার (Marcel Duchamp) বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গেও পরিচিত হলেন। এই যাত্রাতেই তাঁর সুযোগ হয়েছিল মিশর ও মেক্সিকো ভ্রমণের। মিশরের আবু সিম্বাল মন্দির দেখা তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার কথা তিনি সবিস্তারে লিখেছেন ‘আবু সিম্বাল যাত্রা’ নামের রচনায়।

১৯৭১-এ যখন কলকাতায় ফিরে এলেন তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল। সর্বত্রই আতঙ্ক ও হিংসার বাতাবরণ। ছবি আঁকাই সম্ভব হলো না বছরখানেক। তারপর ধীরে ধীরে এই ক্রোধ ও হতাশাই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ক্যানভাসে। জীবনের এই যে অভিমুখহীনতা, কোথায় চলেছি না জেনেই এই যে তীব্র বেগে ছুটে চলা, এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী প্রতিমাকল্প উঠে এলো চিত্রপটে। এক সাইকেল আরোহী ও দুর্ঘটনা নিয়ে আঁকলেন এক চিত্রমালা। ১৯৭৩-এর ‘দ্য টানেল’ নামে একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক সুড়ঙ্গের অন্ধকারের ভিতর প্রবেশ করছে এক মোটরসাইকেল আরোহী। এই সমস্ত ছবি নিয়ে ১৯৭৩-এ প্রদর্শনী হয়েছিল কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে। এই প্রদর্শনীতে তিনি একটি ইনস্টলেশন করেছিলেন। পেপারমেশিতে তৈরি করেছিলেন লাইফ-সাইজ এক সাইকেল আরোহীর ভাস্কর্য। চলমান সেই ভাস্কর্যের পেছনে ছিল ট্রাফিক সিগন্যাল। রাস্তার যানবাহনের আওয়াজও ছিল। এটিই ছিল আমাদের দেশে ইনস্টলেশন আর্টের সূচনা। পরবর্তীকালে যা অনেক প্রসারিত হয়েছে।

১৯৮০-র দশকে পরিতোষ সেনের ছবি একদিকে যেমন বাস্তবতাকে নানাভাবে বিশেস্নষিত করে তেমনি আধ্যাত্মিকতার দিকেও যেতে থাকে। আমেরিকায় দেখা ‘ইসাবেল’ নামে এক নিগ্রো তরুণীকে নিয়ে অনেক ছবি এঁকেছিলেন। ১৯৮৪-র সেপ্টেম্বরে কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাঁর একক প্রদর্শনী। গুজরাটের জীবন নিয়ে আঁকা অনেকগুলি ছবি ছিল সেখানে। ১৯৮৩, ৮৪ ও ৮৭-তে আহমেদাবাদের ন্যাশনাল ইনস্টিট্যুট অব ডিজাইনে আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্স হিসেবে ছিলেন তিনি। গুজরাটের সেই অভিজ্ঞতা রূপ পেয়েছিল এসব ছবিতে।

আশির দশকের মাঝামাঝি পৌঁছে পরিতোষ সেনের ছবিতে জীবনের সমস্ত সংঘাতকে আত্মস্থ করেই এক সুষমার আলো উৎসারিত হতে থাকে। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ অবলম্বনে আঁকা ছবি। তিনি বলেছিলেন, ‘কথামৃতে লুকিয়ে আছে চিত্রকল্পের একটি সোনার খনি’। এই চিত্রকল্পগুলোকেই তিনি একের পর এক রূপায়িত করেছিলেন এই চিত্রমালায়। ছবিগুলির রূপারোপে ও প্রতিমায়নে ছিল এক ধরনের সরলতা। তা ঠিক লৌকিক সরলতা নয়। কোম্পানি স্কুলের ছবি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এই চিত্রমালা রচনায়, একথা তিনি জানিয়েছেন। (দ্রষ্টব্য : পরিতোষ সেন ইন রেট্রসপেক্ট, পৃ. ৬৫)। এছাড়া কালীঘাট পটচিত্রের লৌকিক-নাগরিক চরিত্রের কিছু আদল এতে অনুভব করা যায়। এর সঙ্গে কিউবিস্টধর্মী ভাঙন ও বিশেস্নষণও এসেছে কোথাও কোথাও। ১৯৮৫-তে শুরু করেছিলেন এই চিত্রমালা। ১৯৮৮-র ১৫ থেকে ৩০ জানুয়ারি কলকাতার চিত্রকূট আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রদর্শনী। কথামৃত চিত্রমালায় ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্কের কিছু সরলীকরণ ছিল। তবু কৌতুকদীপ্ত সাবলীল চিত্রায়ণের এগুলি ছিল আদর্শ দৃষ্টান্ত।

বয়সের দিক থেকে যতই পরিণতির দিকে এগিয়েছেন পরিতোষ সেন, ততই তাঁর ছবি বহুমুখী বৈচিত্র্যে উজ্জ্বলতর হয়েছে। ১৯৯০-পরবর্তী তাঁর ছবির দিকে তাকালে আমরা দুটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করি। প্রথমত তাঁর শিল্পদৃষ্টি প্রসারিত হচ্ছে জীবনের সর্বস্তরে। রাজনীতি, প্রকৃতি ও জীবন – সবকিছুকেই তিনি দেখছেন কৌতুকের দৃষ্টিতে। দ্বিতীয়ত, পূর্ণতার মধ্যে থাকে যে শেষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা, সে সম্পর্কেও সচেতনতা জাগছে তাঁর মনে। যৌবন হারিয়ে গেছে। সেই এক বিষাদ ভারাক্রান্ত করছে তাঁকে। সেই হারানো যৌবন নিয়ে নিজের সঙ্গে কৌতুকে ও পরিহাসে মগ্ন হচ্ছেন। পূর্ণতা আর রিক্ততা, এই দুই বিপরীতের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া থেকে জেগে উঠেছে তাঁর পরিণত পর্বের ছবি।

 

ছয়

 

পরিতোষ সেন শুধু একজন চিত্রীই নন, লেখক হিসেবেও অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী। প্রথম জীবনে লেখক হওয়ার কোনো অভিপ্রায় তাঁর ছিল না। তাঁর ছবি থেকে বোঝা যায়, তিনি অত্যন্ত রসিক মানুষ। এই রসবোধ তাঁর জীবনের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই পরিব্যাপ্ত। এই রসবোধই তাঁর মধ্যে একজন লেখকের সম্ভাবনা জাগিয়ে রেখেছিল। সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হতে পেরেছিল, যখন তাঁর বয়স প্রায় ষাট বছর। এর আগে তিনি হয়তো ইংরেজিতে শিল্পকলাবিষয়ক কিছু লেখা লিখেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষায় আখ্যানধর্মী কোনো লেখার কথা ভাবেননি।

চিঠির মধ্য দিয়েই তাঁর লেখক প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটে। দুটি কিশোরীকে লেখা এরকম একটি চিঠি পড়ে তাঁদের প্রপিতামহ প্রখ্যাত সাহিত্যিক মনীষ ঘটক তাঁকে অনুরোধ করেন, এই চিঠিটি যেন তিনি কোনো পত্রিকায় প্রকাশ করেন। ‘আম খাইতে ক’জন জানে’ – এই শিরোনামে সেই চিঠি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দেশ পত্রিকায়। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত রম্য রচনা। তখন তাঁর বয়স প্রায় ষাট। এরপর তিনি লিখতে উদ্বুদ্ধ হন। কবিপত্র পত্রিকার সম্পাদক পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে একবার অনুরোধ আসে ওই পত্রিকার জন্য তাঁর
বাল্য-আলেখ্য বিষয়ে একটি রচনা লিখতে। তাঁর স্মৃতি অত্যন্ত প্রখর ও সতেজ। এটা তাঁর চিত্র প্রতিভারই একটি বৈশিষ্ট্য। এদিক থেকে বলা যায় শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতেও তিনি অত্যন্ত পারদর্শী। সেই প্রতিভারই স্ফুরণ ঘটে তাঁর লেখায়। কবিপত্র পত্রিকার সেই লেখার পর তিনি কতগুলি আত্মস্মৃতিমূলক রম্যরচনা লেখেন। লেখাগুলি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল এক্ষণ, অমৃত, কৃত্তিবাস ইত্যাদি পত্রিকায়। এই লেখা নিয়েই তাঁর প্রথম বই জিন্দাবাহার।

এই লেখাগুলি বিদগ্ধ মহলে যথেষ্ট সাড়া জাগায়। তাঁর এই লেখা পড়ে মুগ্ধ সত্যজিৎ রায়, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, মন্তব্য করেছিলেন :

‘পরিতোষবাবুর চিত্রশিল্পের সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। সম্প্রতি তিনি মাঝে মাঝে তুলির পরিবর্তে লেখনীর সাহায্যে ছবি আঁকতে শুরু করেছেন। এ কাজে তাঁর যে নতুন পরিচয়টা পাওয়া গেল সেটা যুগপৎ বিস্ময় ও পুলকের উদ্রেক করে। তীক্ষন স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে তিনি তাঁর জীবনের         নানান ধরনের যেসব অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন এবং লিখছেন, তাতে শিল্পীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির নজির তো আছেই, তাছাড়া আছে বহু বিচিত্র ঘটনা আর চরিত্রের সমাবেশ, যার সুসংবদ্ধ ও সরস বিবরণ তাঁকে সাহিত্যের আসরে স্থান করে দেবে বলে আমার বিশ্বাস।’

 

জিন্দাবাহার প্রকাশের কিছুদিন পরে ১৯৮১-তে প্রকাশিত হয় আমসুন্দরী ও অন্যান্য রচনা। ১৯৮৪-তে আলেখ্য মঞ্জুরি। ১৯৯৬-তে আবু সিম্বাল, পিকাসো ও অন্যান্য তীর্থ। এছাড়া শিল্প-সমালোচনামূলক বাংলা ও ইংরেজি লেখার একটি সংকলন কিছু শিল্পকথা প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। তাঁর রম্যরচনামূলক কয়েকটি লেখা তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং এজন্য ছবি এঁকে প্রকাশ করেছেন ছোটদের জন্য। A Tree in My Village নামে সেই বই প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে আহমেদাবাদের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিট্যুট অব ডিজাইনে’র সৌজন্যে ‘তুলিকা’ থেকে। The Nawab and His mango Orchard বেরিয়েছে ‘লোটাস প্রিন্ট’ থেকে।

এসব লেখার ভিতর দিয়ে শিল্পী হিসেবে, মানুষ হিসেবে এবং মনস্বী চিন্তক হিসেবে পরিতোষ সেনের এক স্বতন্ত্র পরিচয় উঠে আসে। জিন্দাবাহার মূলত আত্মস্মৃতিমূলক লেখা। শৈশবে ও কৈশোরে তাঁর কল্পনাপ্রবণ মনটি কীভাবে গড়ে উঠেছে, তার বিশদ পরিচয় ধরা থাকে এর বিভিন্ন রচনায়। জিন্দাবাহারের সমস্ত রচনার মধ্যে ‘আমি’ নামে রচনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অহং বা আত্মতা (ego) বিকাশের পর্যায়গুলি ধরা আছে এই রচনায়। রয়েছে তাঁর অসামান্য সৌন্দর্যচেতনা ও কবিমনের পরিচয়। তাঁর যৌনচেতনা গড়ে ওঠার প্রথম ধাপগুলির অকপট বর্ণনাও তিনি করেছেন এই লেখায়। যৌনতা ও নারীর শরীরী সৌন্দর্য পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছে তাঁর শিল্পচেতনার এক অবিচ্ছেদ্য মাত্রা। যে অনাবিল সৌন্দর্য তিনি দেখেছেন গ্রামবাংলার বিসত্মীর্ণ নিসর্গে, তা তাঁর মনে চিরস্থায়ী আসন পেতে রেখেছিল। সেই সৌন্দর্যই ছিল তাঁর সৃষ্টির উৎস। আমসুন্দরীর অধিকাংশ লেখাই রম্যরচনা ধরনের। কৌতুকের ভিতর দিয়ে ব্যক্তির ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের বিভিন্ন দিকের পর্যালোচনা। এর প্রথম আখ্যান ‘কালো ষাঁড় ও মি. আইয়ার’ একটি অনবদ্য রচনা। বিশ্বসাহিত্যের যে-কোনো প্রথম শ্রেণির আখ্যানের পাশে এটিকে সসম্মানে দাঁড় করানো যায়।

আলেখ্য মঞ্জুরি একই সঙ্গে এক শিল্পতাত্ত্বিক ও কথাকার শিল্পীর রচনা। গভীর শিল্পবোধ ও দীপ্ত সাহিত্যবোধের পরিচয় এর তিনটি আলোচনায়। তিনটি লেখার শিরোনাম যথাক্রমে ‘এনায়েত খাঁর মৃত্যু অথবা একটি মহান শিল্পকর্মের জন্ম’, ‘কিষাণগড়ের রাঁধা’ এবং ‘ভ্যান গঘের চেয়ার’। প্রথমটি মোগল যুগের চিত্রী বিষেণদাস রচিত ‘মৃত্যুশয্যায় এনায়েত খাঁ’ ছবিটির গড়ে ওঠার গল্প। দ্বিতীয়টি বিখ্যাত রাজস্থানী চিত্র। সকলেরই পরিচিত। তৃতীয়টির কথাও সকলেরই জানা। এই ছবিগুলি তৈরির গল্প বলার মধ্য দিয়ে তিনি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন সেই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে সেই শিল্পীর জীবনালেখ্য। যে-কোনো শিল্পরসিক ও শিক্ষার্থীকে তা আলোকিত করে।

আবু সিম্বাল, পিকাসো ও অন্যান্য তীর্থর কয়েকটি রচনা ভ্রমণকাহিনি। শিল্পীর ইউরোপ প্রবাসের নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতা ধরা আছে এতে। বিভিন্ন মানবিক সম্পর্ককে এর মধ্যে তিনি মেলে ধরেছেন। এর শ্রেষ্ঠ দুটি রচনা ‘আবু সিম্বাল যাত্রা’ এবং ‘শিল্পী পিকাসোর মুখোমুখি’। মিশরের আবু সিম্বাল মন্দির দেখতে যাওয়ার যাত্রাপথের বর্ণনা এবং এই মন্দিরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের বর্ণনার মধ্য দিয়ে একটি প্রাচীন সভ্যতার বৈভবকে তিনি উন্মীলিত করেছেন। পিকাসোর সঙ্গে দেখা হওয়াকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম অভিজ্ঞতা বলেছেন তিনি। এই লেখায় শিল্পী পিকাসোর জীবন ও শিল্পের নানা অজানা দিক তিনি আলোকিত করেছেন। তাঁর ছবি ও তাঁর সাহিত্য এই দুইয়ে মিলেই তাঁর সৃজনের পূর্ণতা।

 

দীর্ঘ জীবনসাধনা ও শিল্পসাধনার পর পরিতোষ সেন ২০০৮ সালের ২২ অক্টোবর প্রায় ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হন। দেশ পত্রিকায় ১৩৯৯ বঙ্গাব্দের সাহিত্য সংখ্যায় ‘স্মৃতিচিত্র’ নামে এক রচনায় তিনি লিখেছিলেন :

‘তুলনামূলকভাবে আমি হয়তো অন্য পাঁচজন নিকৃষ্ট শিল্পীর চাইতে ভালো আঁকি। কিন্তু আমার চাইতে অনেকগুণে ভালো আর্টিস্ট যে এ পৃথিবীতে বহু আছে এ কঠিন সত্যটি আমার চিত্তাকাশে ধ্রম্নবতারার মতো সদাদীপ্তমান হয়ে আছে। যে-সামান্য ক্ষমতার আমি অধিকারী তাকে চাবুক মেরে কত দূর নিয়ে যাওয়া যায়, সেটাই আমার কাছে বরাবরের চ্যালেঞ্জ হয়ে ছিল, আজও আছে। মানুষ তার গঠনে যেটুকু ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় তার বাইরে সে কোনওদিনই যেতে পারে না। কিন্তু সে-গ-ীর প্রসারের চেষ্টায় সে অবিরাম লড়ে চলে।’

 

আজ একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই চ্যালেঞ্জে তিনি সর্বার্থেই জয়ী হয়েছেন। সারাজীবন ধরে নিবিড় নিষ্ঠায় তিনি নিজেকে প্রস্ত্তত করেছেন। শিল্পকর্ম ও সাহিত্যকর্ম মিলিয়ে বিপুল ফসল তিনি রেখে গেছেন। আমাদের আধুনিকতার ইতিহাসে তাঁর এই অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

*