logo

রবীন্দ্রনাথ ও যামিনী রায়

সু শো ভ ন  অ ধি কা রী

তিরিশের দশকের শেষে নন্দলাল কলাভবনের এক সভায় রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে মুখে মুখে আলোচনা করেছিলেন, ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের সঙ্গে। এমন আলোচনা সভা

শান্তিনিকেতনে প্রায়ই আয়োজিত হতো, আজকের আধুনিক পঠন-পাঠনের কেতাদুরস্ত মতে, আভিধানিক প্রতিশব্দে যাকে ভূষিত করতে পারি ‘ডিসকোর্স’, ‘ইন্টারাকশন’ ইত্যাদি শব্দমালায়। রবিঠাকুরের ‘ইস্কুলে’ গোড়া থেকেই এ-জাতীয় সভা বা ‘ডিসকাসন কর্নার’-এর প্রচলন ছিল। আমরা সকলেই জানি, বিশের দশকের শুরুতে কলাভবন প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই রবীন্দ্রনাথ শিল্প-ঐতিহাসিক স্টেলা ক্রামরিশকে আমন্ত্রণ করে আনিয়েছিলেন, কলাভবনের ছাত্র ও শিক্ষকদের আধুনিক শিল্পকলার বিষয়ে ওয়াকিবহাল করতে। বিনোদবিহারীর লেখা থেকে জানা যায়, স্টেলা কীভাবে গথিক শিল্পের ইতিহাস থেকে আধুনিক যুগের শিল্প-আন্দোলন কিউবিজম পর্যন্ত বিস্তৃত শিল্পের প্রেক্ষাপটটিকে দক্ষতার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। সম্ভবত তিরিশের দশকের শেষ পর্বের এক সভায় স্বয়ং নন্দলাল ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট-আর্ট’ শিরোনামে একটি মূল্যবান রচনা পাঠ ও আলোচনা করেন, যা আমাদের অবাক করতে পারে। তবে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় তাঁর ছবি নিয়ে নন্দলালের আলোচনা করার ব্যাপারটি একটু স্বতন্ত্র। আর হয়তো সেদিক থেকে বিচার করলে নন্দলালই আমাদের দেশে প্রথম চিত্রকর, যিনি রবীন্দ্র-চিত্রকলার আলোচক বা ব্যাখ্যাতা হিসেবে দেখা দিয়েছেন। এখানে মনে রাখা দরকার, সময়ের বিচারে ‘রবিকা’র ছবির বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথের বিখ্যাত আলোচনাটি ঘটেছে এর পরের পর্যায়ে। আর নন্দলালের সেই মুখের কথার নোট অবলম্বনে অনেক পরে রচিত হয়েছে ‘গুরুদেবের ছবি’ নামক প্রবন্ধ, যা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে পুলিনবিহারী সেন-সম্পাদিত রবীন্দ্রায়ণ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে।

তবে ইতিহাসের বিচারে একজন ওয়ার্কিং-আর্টিস্ট, একজন আধুনিক শিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বিষয়ে লিখিতভাবে প্রথম প্রতিবেদন রেখেছেন বোধকরি যামিনী রায়। এই লেখা বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত কবিতা পত্রিকার রবীন্দ্র সংখ্যায় (আষাঢ়, ১৩৪৮) প্রকাশিত হয়। এবং রচনার অপর একটি পাঠ, বলা যায় রচনাটির চুম্বক বা সারসংক্ষেপ সজনীকান্তের ‘শনিবারের চিঠি’র রবীন্দ্র সংখ্যা, আশ্বিন ১৩৪৮-এ প্রকাশিত। এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৩২ সালে কলকাতার চৌরঙ্গী আর্ট স্কুলে, মুকুল দে-আয়োজিত রবীন্দ্র চিত্র-প্রদর্শনীর ক্যাটালগে মুদ্রিত মুকুলের ইংরেজি লেখাটি অবশ্য এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ শীর্ষক যামিনী রায়ের রচনাটি পড়ে ‘বড় আনন্দ’ পেয়েছিলেন স্বয়ং কবি, চিঠি লিখে যামিনীকে জানিয়েছিলেন সে-কথা। ২৫ মে, ১৯৪১ তারিখের সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘তোমাদের মত গুণীর সাক্ষ্য আমার পক্ষে পরম আশ্বাসের বিষয়।… আমার স্বদেশের লোকেরা আমার চিত্রশিল্পকে যে ক্ষীণভাবে প্রশংসার আভাস দিয়ে থাকেন আমি সেজন্য তাদের দোষ দিই নে। আমি জানি চিত্র দর্শনের যে-অভিজ্ঞতা থাকলে নিজের বিচারশক্তিকে কর্তৃত্বের সঙ্গে প্রচার করা যায়, আমাদের দেশে তার কোনো ভূমিকাই হয়নি। সুতরাং চিত্রসৃষ্টির গূঢ় তাৎপর্য বুঝতে পারে না বলেই মুরুব্বিয়ানা করে সমালোচকের আসন বিনা বিতর্কে অধিকার করে বসে। সেজন্য এদেশে আমাদের রচনা অনেক দিন পর্যন্ত অপরিচিত থাকবে। আমাদের পরিচয় জনতার বাইরে, তোমাদের নিভৃত অন্তরের মধ্যে। আমার সৌভাগ্য, বিদায় নেবার পূর্বেই নানা সংশয় এবং অবজ্ঞার ভিতরে আমি সেই স্বীকৃতি লাভ করে যেতে পারলুম, এর চেয়ে পুরস্কার এই আবৃতদৃষ্টির দেশে আর কিছু হতে পারে না।’

আধুনিক শিল্পকলায় অনভিজ্ঞ স্বদেশবাসীর প্রতি রবীন্দ্রনাথের মনের ভাব বোঝাতে উদ্ধৃতি একটু দীর্ঘ হলো বইকি! এ চিঠির প্রতিটি অক্ষরে ধরা আছে তাঁর চিত্রীসত্তার এক সুতীব্র অভিমান, যা দীর্ঘকাল তিনি মনের মধ্যে বহন করে বেরিয়েছেন, এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠবৃত্তের কাছেও। সেইটিই যেন এখানে ফেটে পড়েছে সত্যকার শিল্পী ও প্রকৃত আর্টের সমজদার এক অনুজ শিল্পীর লেখনীর জবাবে।

েস্নহভাজন যামিনী রায়কে রবীন্দ্রনাথ আর একটি অসাধারণ চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে আধুনিক দৃশ্যকলার একেবারে গোড়ার কথাটি নিঃসংকোচে ঘোষণা করেছিলেন তিনি। সে-চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ছবি কি – এ প্রশ্নের উত্তর এই যে – সে একটি নিশ্চিত প্রত্যক্ষ অস্তিত্বের সাক্ষী। তার ঘোষণা যতই স্পষ্ট হয়, যতই সে হয় একান্ত, ততই সে হয় ভালো। তার ভালো-মন্দের আর কোনো যাচাই হতে পারে না। আর যা কিছু – সে অবান্তর – অর্থাৎ যদি সে কোনো নৈতিক বাণী আনে, তা উপরি দান।’ রবীন্দ্রনাথের এই বহুপঠিত, বহুচর্চিত চিঠি আমাদের সকলেরই জানা, তবু ভিস্যুয়াল-আর্ট প্রসঙ্গে তাঁর এই আধুনিক ভাবনা আজকেও আমাদের আশ্চর্য করে। রবীন্দ্র-চিত্রকলা বিষয়ে যামিনীর প্রবন্ধ ও উত্তরে রবীন্দ্রনাথের চিঠির মধ্যে দিয়ে সেই সময়ের অন্যতম দুই আধুনিক শিল্পীর মুক্ত ভাবনার আদান-প্রদানের ছবি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘শনিবারের চিঠি’তে প্রকাশিত ‘চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে যামিনী রায়ের সংক্ষিপ্ত লেখাটি যেন আরো টান টান ঋজুভঙ্গিতে লেখা। শুধুই একতরফা প্রশংসা নয়, রবীন্দ্রচিত্রের নানান দোষ-গুণ প্রসঙ্গেও খোলামেলা সেই লেখার একটু উদাহরণ দেওয়া যাক –

‘(১) রবীন্দ্রনাথ ছবি এঁকেছেন খাঁটি ইউরোপীয় পদ্ধতিতে, সুতরাং তাঁর ছবি বোঝবার যাঁরা চেষ্টা করবেন, তাঁদের পাশ্চাত্য চিত্রশিল্পের ক্রমবিকাশ জানতে হবে। (২) ইউরোপীয় পদ্ধতি অনুসরণ করলেও তাঁর সম্বন্ধে একটি অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, শিল্প-ইতিহাসের পরপর স্তরগুলি সম্বন্ধে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল না, অথচ ছবিগুলি দেখলে বোঝবার উপায় নেই যে তিনি অনভিজ্ঞ ছিলেন, তাঁর কল্পনার অসামান্য ছন্দোময় শক্তিতে তিনি রেখা ও রঙের ব্যবহার আশ্চর্যরকমে আয়ত্ত করেছিলেন। এই নিয়মমাফিক শিক্ষার অভাবহেতু কোন কোন ক্ষেত্রে পতন ঘটেছিল তাঁর। যাঁরা তাঁর চিত্র-সংগ্রহ প্রকাশ করেছেন, এই দিকে তাঁরা সজাগ থাকলে ভাল হত। আশ্চর্য সক্ষমতার সঙ্গে অক্ষমতার মিলন দৃষ্টিকটু। সম্পূর্ণ কল্পনা থেকে আঁকা অবাস্তব ছবির মধ্যে এখানে ওখানে রিয়ালিস্টিক ছোঁয়াচ লাগাতে রসাভাস হয়েছে।’

লেখাটির শেষ কয়েকটি লাইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভেবে দেখলে চল্লিশের দশকের সূচনায় বলা সেই সব কথা আজকের দিনেও প্রায় সমানভাবে প্রযোজ্য। যামিনী রায় সে-রচনাটির শেষে লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি সম্বন্ধে যথোপযুক্ত আলোচনা এখনও হয় নি। সে কাজ করতে হলে ইউরোপীয় শিল্প সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ব্যক্তির প্রয়োজন। যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন অন্ধভক্তি এবং অকারণ বিরূপতা এই দুয়ের মধ্যে শিল্পী রবীন্দ্রনাথকে দোল খেতে হবে।’

এ-কথাগুলো কি আজকেও সমান তাৎপর্যপূর্ণ নয়?

দীর্ঘকাল রবীন্দ্র-চিত্রকলা প্রসঙ্গে আলোচনায় একধরনের একপেশে

অন্তঃসারশূন্য মন্তব্য আমাদের নজরে পড়ে। তাঁর ছবির অন্যতম প্রধান ভর যে আধুনিক ইয়োরোপীয় শিল্পের পটভূমিতে প্রোথিত এবং বিচিত্রভাবে বিস্তৃত, এ-কথা আমরা স্বীকার করতে পারিনি অনেকদিন। গেরুয়া জোব্বায় শোভিত ‘গুরুদেবে’র তকমা-আঁটা রবীন্দ্রনাথ যে আধুনিক পশ্চিম থেকে তাঁর শেষবেলার ফসলের অনেকটা ভাবনা ও রসদ সংগ্রহ করেছিলেন – তা বুঝতে অথবা বুঝলেও বলতে আমাদের কলম দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ভুলে যাই, সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর দুর্মর শিল্পীসত্তার রবীন্দ্ররসে জারিত সমগ্র সৃষ্টিকর্ম ঘিরে আছেন যে রবীন্দ্রনাথ, তিনি আমাদের দ্বিধাদ্বন্দ্বের ওপারে। তবে যামিনীর দুটি রচনাই পাশাপাশি রেখে তলিয়ে বিচার করলে মনে হয়, দ্বিতীয় লেখাটি যেন একটু বেশি সমালোচনাধর্মী। এ লেখাটি রবীন্দ্রনাথ দেখে থাকলেও কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন কিনা জানা নেই। তথ্যের বিচারে যামিনীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের দুটি চিঠিই শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত প্রবন্ধের আগে লিখিত। তাই দ্বিতীয় লেখাটি অর্থাৎ একটু বেশি সমালোচনাধর্মী রচনাটির প্রতি কবির কোনো প্রতিক্রিয়া আমাদের কাছে এসে পৌঁছয় না। আগেও বলেছি, যামিনী রায়ের প্রবন্ধ এবং রবীন্দ্রনাথের চিঠিগুলো আমাদের বিশেষভাবে পরিচিত, একাধিকবার মুদ্রিত হয়েছে এগুলো। কিন্তু আমাদের অনেকেরই জানা নেই যামিনী রায়ের একটি চিঠির কথা – যা তিনি কবিকে লিখেছিলেন প্রথম প্রবন্ধটি রচনার প্রেক্ষাপটে। কলকাতার বাগবাজারের আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের বাড়ি থেকে ২৩ মে ১৯৪১ তারিখের সেই চিঠিতে ‘অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে’ যামিনী রায় রবীন্দ্রনাথকে লিখছেন – ‘আপনার ছবি নিয়ে সম্প্রতি কিছু বলতে হয়েছিল। আপনার ওপর শ্রদ্ধা নিয়ে তাঁরা আমার কাছে এসেছিলেন আপনার ছবি সম্বন্ধে কিছু জানাতে। আমার মনে হয় আমি ঠিকমত তাঁদের জানাতে পারি নাই, তাঁদের পক্ষেও মুস্কিল, আমি আপনার চিত্রশিল্পকে যেভাবে গ্রহণ করেছি, অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদিকে তা বুঝিয়ে দোব।

আপনার ছবি – আমার ছবি আঁকবার কাজে সাহায্য পেতে যেভাবে দেখতে হয় তা অন্যকে, বিশেষ করে যাঁরা ছবি আঁকেন না বা ওভাবে ভাবিত নন তাঁদিকে কথা দিয়ে বুঝান অসম্ভব মনে করি, তবু এইটুকু মনে সান্ত্বনা তাঁরা আপনার ছবির ওপর শ্রদ্ধাশীল, এইটুকু মনে হয়েছিল বোলেই আমি কিছু বলবার চেষ্টা কোরেছিলাম।’

এ চিঠিতে ফুটে উঠেছে যামিনীর এক বিনীত শিল্পীসত্তা। তিনি নিজে চিত্রী ও শিল্পরসিক হলেও ভাষার মাধ্যমে রবীন্দ্র-চিত্রকলার মর্মকথাটি ঠিকমতো প্রকাশ করতে পেরেছিলেন কিনা – এই ভাবনা তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তাই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে নিজের অসমর্থতার কথা জানিয়েছিলেন।

কিন্তু সে-বিষয় বাদ দিয়ে যামিনীর চিঠির শেষ বাক্যটির শুরুর দিকে তাকালে একটু আশ্চর্য লাগে। বাক্যটি শুরু হয়েছে এভাবে – ‘আপনার ছবি – আমার ছবি আঁকবার কাজে সাহায্য পেতে যেভাবে দেখতে হয়’ ইত্যাদি, অর্থাৎ যামিনী রায়, রবীন্দ্রনাথের ছবির মধ্যে খুঁজে পান তাঁর নিজের ছবি আঁকার রসদ। কী সেই রসদ? রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা ঠিক কীভাবে ‘সাহায্য’ করেছে যামিনীর মতো চিত্রীকে? যামিনীর ভাষায় রবীন্দ্রনাথের ছবির সেই কী ‘সতেজ শিড়দাঁড়া’ – যামিনীর মতে যা ‘শৌখিন ভারতীয় শিল্পের’ বিরুদ্ধে রবিঠাকুরের ছবির তীব্র জেহাদ!

কবি বিষ্ণু দে-র লেখায় জেনেছি, তথাকথিত পাশ্চাত্য ভাবনার ছবি থেকে লোকায়ত শিল্পের দিকে সরে আসার মুহূর্তে, যামিনীর মনের অসহায় দোলাচলের গভীর সংকটকালে রবীন্দ্রনাথের একটি লেখা তাঁকে কী আশ্চর্যরকম আলোর পথ দেখিয়েছিল, সে-লেখাটির নাম ‘তপোবন’। বিষ্ণু দে জানিয়েছেন, যামিনীর ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহে থাকা সেই প্রবন্ধের কয়েকটি জায়গায় পেনসিল দিয়ে যামিনী লিখে রেখেছেন – ‘আমার মনের কথা আজ লিখায় পড়লাম।’ অর্থাৎ শুধুই ছবিতে নয়, যামিনী রায়ের শিল্পীজীবনের দ্বন্দ্ব-সংকটের দুর্যোগে নির্ধারিত পথের নিশানা দেখিয়েছেন সেই রবীন্দ্রনাথ। এমনকি ছবির আধুনিক সংজ্ঞা হিসেবে যামিনী রায় যে-কথা বলেন, সে-কথার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা, এমনকি তাঁর ভাষার আদলও সুস্পষ্ট ফুটে ওঠে। যামিনীকে লেখা সেই শেষ চিঠিটিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তার কাছে ‘ছবি’র অর্থ হলো ‘সে একটি নিশ্চিত প্রত্যক্ষ অস্তিত্বের সাক্ষী। তাঁর ঘোষণা যতই স্পষ্ট হয়, যতই সে হয় একান্ত, ততই সে হয় ভালো। তাঁর ভালো-মন্দের আর কোনোরকম যাচাই হতে পারে না।’ আবার বুদ্ধদেব বসুর কাছে সাক্ষাৎকার পর্বে, চিত্রকলা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অত্যন্ত আধুনিক মত ঘোষণা করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘ছবিটা ছবিই, তার বেশি কিছু নয়, তার কমও নয়। … ভারতীয়, অজন্তীয়, ওসব কিছু না।’ পরে যামিনী রায়ের কণ্ঠেও সেই একই সুর, প্রায় সেই একই কথার প্রতিধ্বনি যখন শুনতে পাই, তখন দেখি, রবীন্দ্রনাথের ভাবনার প্রগাঢ় ছায়ায় যামিনী কীভাবে আবৃত রেখেছিলেন নিজেকে! ছবি প্রসঙ্গে যামিনীও বলেছেন – ‘ছবি ছবিই। ছবি মানুষের রচিত। মানুষের রচিত সবকিছুরই মধ্যে তার ধর্ম্ম, তার চরিত্র দৈনন্দিন জীবনের ও চিন্তার, সমস্ত কিছুরই পরিচয় পাওয়া যায়।’ এখানে আমরাও অবাক হয়ে লক্ষ করি, অগ্রজের ভাবনা কীভাবে ধীরে অনুজের মধ্যে অনুরণিত হয়ে ওঠে! জানি না, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে এমনভাবে কতজনের কাছে রবীন্দ্রনাথ নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছেন নিভৃত আশ্রয়, চলার পথে অগ্রপথিক; অন্ধকারে পথ চেনাতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন আলোর মশাল।

লেখায় ধরা থাকলো এই সময়ের দুই অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীমনের ভাবনাবিনিময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

Leave a Reply

*