logo

যত আমার বয়স বাড়ছে

বো র হা ন উ দ্দি ন  খা ন  জা হা ঙ্গী র

যত আমার বয়স বাড়ছে, যত দেশান্তরে যাওয়া বাড়ছে, ততই বাড়ছে চোখের অভিজ্ঞতা। চোখের দিক থেকে তাকানো, বিশ্বময় তাকানো। তাকালেই বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা ভিড় করে আসে। এসব অভিজ্ঞতাই একজন শিল্পীর সঙ্গে অন্য একজন শিল্পীর তফাত তৈরি করে উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের দিক থেকে। সেজন্য শিল্প কখনো নিরাপদ নয়, চোখ ছাড়া। শিল্পীদের চোখে জড়ো হয় সব ধরনের অভিজ্ঞতা : নৈসর্গিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রাণিজগতের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভিদ জগতের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্পেসের অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তি নির্মিত সত্তা। এই সত্তায় ছড়ানো নতুনত্ব, একই সঙ্গে প্রাত্যহিকতার ডকুমেন্টেশন। সাদামাটা ব্যক্তিকতা তাঁরা ব্যবহার করেন; প্রত্যেকের দৈনন্দিন ব্যক্তিকতার কেন্দ্র তাঁদের অভিজ্ঞতা, এই অভিজ্ঞতা অনুপুঙ্খভাবে তাঁদের কাজে ধরা দেয়। তাঁরা নিজেদের উদ্ভাবন করেন : নিজেদের অভিজ্ঞতা। এই উদ্ভাবনই সাবজেক্ট হিসেবে তাঁদের সত্তার গঠন। অনন্য ব্যক্তিক সত্তার উদ্ভাবন হচ্ছে তাঁদের কাজ, দেখা ও বর্ণনার বিষয়। সাদামাটা সত্তার উদ্ভাবন অন্যদের, পাবলিকের দেখার অবজেক্ট হিসেবে তাঁরা পরীক্ষা করেন, সে-পরীক্ষায় সরলতা তাঁরা ব্যাখ্যা ও ব্যবহার করেন; কিন্তু সরলতা শেষ পর্যন্ত সরলতা নয়, সরলতা হচ্ছে প্রতারক অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা নিজেদের চোখে এবং অন্যদের চোখে উদ্ভাবন করে দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র। পুঙ্খানুপুঙ্খতার বিশদ বিস্তৃতি তাঁরা পাবলিকের চোখে তুলে ধরেন এবং এখানেই পাবলিকের বিচার। এভাবে তাঁরা নিজেদের লিবারেশনের মাধ্যম করে তোলেন। এই যাত্রা দৈনন্দিনকে ধরার চেষ্টা, সেজন্য তাঁদের কাজে উদ্ভাসিত রাজনীতি। আমাদের সমাজব্যবস্থায় নির্যাতন আছে, ক্লেদ আছে, ক্লেশ আছে। সেজন্য তাঁরা ভেবেছেন, শিল্পের মধ্যে সমাজ বদলের একটা ঝোঁক থাকা দরকার। এই ঝোঁকটাই তাঁদের দেশ, সমাজ, রাষ্ট্রের কাছে টেনে এনেছে।

 

দুই

আমার যত বয়স বাড়ছে, দেশান্তরে যাওয়া তত বাড়ছে। বিদেশে যাই, বিদেশের বিখ্যাত মিউজিয়াম ও গ্যালারির কাজ দেখার জন্য। হাজার ব্যস্ততার মধ্যে সময় খুঁজে বার করি, সেই সময় কাটাই মিউজিয়ামে মিউজিয়ামে, গ্যালারিতে গ্যালারিতে। পাগলের মতো দেখতে থাকি শিল্পীদের কাজ। চোখের অভিজ্ঞতার শেষ নেই, আমাকে শিল্পীরা অভিজ্ঞ করে তোলেন। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিউজিয়ামের বিভিন্ন কাজ দেখতে থাকি, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন।

 

তিন

যত আমার বয়স বাড়ছে, আমি গ্যালারি ও মিউজিয়ামে, ফ্লোরে ফ্লোরে, এখন আর ঘুরি না। আমি একটা ছবি দেখি, একটাই, অন্য ছবি দেখি না। একটা ছবির সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকি কিংবা বসে থাকি। দেখতে থাকি একটা কাজ, একটা শিল্প, বুঝতে থাকি কাজটি, শিল্পটি কী অর্থ তৈরি করেছে।

লন্ডনে, রয়েল অ্যাকাডেমিতে, আমি এখন একটা কাজ দেখতে যাই। মনের : ওয়াটারলিলি। দেখি এবং আমার চোখে একটা রূপান্তর হতে থাকে। এই কাজটিতে মনে, অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, তিনি মিলিয়েছেন ফুল, প্রতিচ্ছায়া, সূর্যের আলোক, পানির নিচেকার জলজ কায়া, চূর্ণ চূর্ণ আলোক ও চূর্ণ চূর্ণ জলজ কায়া, ঢেউয়ের দোলা, সারফেস, ডেপথস, মূল লক্ষ্য আলংকারিক নয়, অক্ষি গোলক নয়, মূল লক্ষ্য : বাগানের অন্তঃসার সংরক্ষণ করা, যে-বাগান তিনি তৈরি করেছেন, যে-বাগানটি, তিনি এখন, বৃদ্ধ বয়সে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তিনি সবকিছুর ভেতরে রং বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশ্লেষণ তাঁর জীবনে একইসঙ্গে আনন্দ ও যন্ত্রণা। আনন্দ ও যন্ত্রণার বৈপরীত্য থেকে তিনি উদ্ভাবন করেছেন সময় ও স্পেস, যেখানে তিনি সংরক্ষণ করেছেন তাঁর অভিজ্ঞতা। একটা কিছু ঘটছে তাঁর চোখে ও চারপাশে, একটা কিছু ঘটছে আমার চোখে ও চারপাশে।

চার

আমি অসলোতে, এখন যাই মুঙ্ক মিউজিয়ামে, মুঙ্কের কাজ দেখতে, কিংবা মুঙ্কের একটামাত্র কাজ দেখতে। কাজটার নাম : ক্রাই। কাজটা যতবার দেখি, চোখে ভাবনা জাগায়। আমি ভাবি, ভাবতে বাধ্য হই, কান্না এবং চিৎকার পরস্পর প্রবিষ্ট হয়ে একটা হাহাকার তৈরি করেছে। এই হাহাকার জেন্ডারের পরপারে অবস্থিত, যেন প্রকৃতি নিসর্গ ঈশ্বর মথিত, যেন সর্বত্র ধ্বনিত এবং প্রতিধ্বনিত রোদন, এই রোদন পুরুষ ও নারীর এবং ঈশ্বরের। এই কাজটি আমার মধ্যে বিভিন্ন দ্যোতনা তৈরি করে। চিৎকারে খান খান হয়ে গেছে চারপাশ, কান ঢাকার পরও চিৎকারে ফেটে যাচ্ছে পরিপার্শ্ব, এই চিৎকার কিংবা হাহাকারের কোনো জবাব নেই, একটা অসম্ভব চারদিক ঘিরে ধরেছে। মুঙ্ক এই ভয়টাকে এই রোদনটাকে এই চিৎকারটাকে এই হাহাকারটাকে আমার সামনে উপস্থাপিত করেছেন। চিৎকারটা রোদনটা ভয়টা রং হয়ে গলে যাচ্ছে চোখ থেকে, সর্বগ্রাসী চোখে রঙের অস্তিত্ব আছে, আর কোনো অস্তিত্ব কোথাও নেই। আমি ভাঙনের অস্তিত্ব নিয়ে বেরিয়ে আসি, আমার পেছনে মিউজিয়ামের ফটক বন্ধ হয়ে যায়।

 

পাঁচ

আমি আমস্টারডাম গেলে, ভ্যান গঘ’ মিউজিয়ামে, ভ্যান গঘ’র একটা কাজের সামনে দাঁড়াতে বাধ্য হই : দি কর্নফিল্ড উইথ এ লার্ক। কাজটা দেখতে দেখতে আমি শান্ত হয়ে যাই, আমার অস্থিরতা শেষ হয়। বাস্তবতা আমাকে সাহস দেয়, শান্ত করে তোলে। এ যেন রূপান্তর, দ্রুত নিরাময়। এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে উন্মীলিত করে আমার বেঁচে থাকার বিভিন্ন দিক : আমার বেঁচে থাকার সূত্র তৈরি হয় শিল্পী ভ্যান গঘের জীবনের সঙ্গে। সারাটা জীবন ধরে ভ্যান গঘ রিয়ালিটি খুঁজেছেন। রং, ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু, সূর্যের আলোক, তাঁর দিক থেকে রিয়ালিটির দিকে যাত্রা করা। এই আকুলতা তীব্র হয়েছে যখন তাঁর মধ্যে নানা সংকট তৈরি হয়েছে, যখন তাঁর মনে হয়েছে কোনো রিয়ালিটি উদ্ধার সম্ভব না। তাঁর বিশ্বাস ছিল রিয়ালিটির কাছে পৌঁছনোর উপায় কাজ করা। কারণ রিয়ালিটি হচ্ছে এক ধরনের উৎপাদন। এই দেখাটাই রিয়ালিটি, উৎপাদনের মধ্যে দিয়ে তাঁর জন্য এবং আমার জন্য তৈরি করে রিয়ালিটি, ভাঙাচোরা জীবনে তাঁর হাত ধরে খুঁজে পাই অর্থ : অর্থের দিকে যাত্রাই রিয়ালিটি।

Leave a Reply

*