logo

মোহাম্মদ কিবরিয়া নতুন যুগের উদ্ঘাটন

সৈ য় দ  ম ন জু রু ল  ই স লা ম
বিরাশি বছর বয়সে কেউ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেলে তাঁর খুব আপনজন ছাড়া কেউ সেই বিয়োগে তেমন ব্যথিত হয় না, বিলাপ করার মানুষ হয়তো থাকে আরো কম। কিন্তু মোহাম্মদ কিবরিয়ার মৃত্যু শোকগ্রস্ত করেছে অসংখ্য মানুষকে। তারা কষ্ট পাচ্ছে এই কথা ভেবে যে, মানুষটি আরো কিছুদিন স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকলে আরো কিছু হয়তো দিতে পারতেন দেশের শিল্পকলাকে। হয়তো আরেক নতুন পর্যায়ের উদ্বোধন করতেন, যেমন করেছিলেন কয়েক বছর আগে, মৃত্যুর কিনার থেকে ফিরে এসে। তাঁর কর্মস্থল চারুকলা ইনস্টিটিউটে (তখনো অনুষদ হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের) তখন চলছিল এর পঞ্চাশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন, আর কিবরিয়া হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে যুদ্ধ করছিলেন মৃত্যুর সঙ্গে। সে-যুদ্ধে তিনি জয়ী হয়ে ফিরে এসে এক নতুন ক্যানভাস সাজিয়েছিলেন – যেখানে আনন্দ, অন্তত আনন্দের সূক্ষ্ম কিছু অনুভূতি – অকৃপণ নয় এবং দীর্ঘদিন তাঁর প্যালেট থেকে দূরে থাকা লাল রং বেশ বিভা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে সেই ক্যানভাসে। এই পর্যায়টি তাঁর চর্চিত প্রকাশবাদী ধারা থেকে অনেকটাই পৃথক; এই পর্যায়ে নীল হিমশীতল অথবা বিপন্ন নয়; ধূসর এবং ছাই রং কোনো প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কষ্টের, কোনো বর্ণনার অতীত বিচ্ছিন্নতার প্রতিরূপ নয়; গেরুয়া অথবা মেটে রং নোনা ধরা জীবনের প্রতিকল্প নয়। এই পর্যায়ে রংগুলো আরো খোলামেলা, তাদের ভেতর একই সঙ্গে অনেক সম্ভাবনার সমাহার। কিবরিয়া যেন মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে ভিন্ন কোনো অর্থ আবিষ্কার করেছিলেন জীবনের, এর নানা রঙের অথবা রংহীনতার বহুবিচিত্র প্রকাশের। এজন্য তাঁর অভ্যাসের চর্চা থেকে এক পা বেরিয়ে এসে রংকে দেখেছিলেন এক নতুন দৃষ্টিতে, যে-দৃষ্টির সঙ্গে নৈকট্য ছিল আমেরিকান প্রকাশবাদীদের, ইউরোপীয়দের নয়। জ্যাকসন পোলোক অথবা মার্ক রথকো অথবা বার্নেট নিউম্যান রংকে এবং পোলোক ও নিউম্যান প্রায়শই লাল রংকে শুধু যে বিপন্নতা-বিচ্ছিন্নতা-অ্যাঙ্গস্ট-এর প্রতীক হিসেবে দেখেছেন তা নয়, দেখেছেন জীবনশক্তি এবং প্রতিবাদের ভাষা হিসেবেও।
এবার মৃত্যু কিবরিয়াকে সময় দিল না। তাঁর স্বাস্থ্যও তাঁকে বড় এবং পরিব্যাপ্ত কোনো কাজে জড়িয়ে পড়ার অনুমতি দেয়নি। তিনি আর কী দিতে পারতেন, তা নিয়ে তাই শুধু অনুমান এবং আক্ষেপ করা যায়, কিন্তু পেছন ফিরে তাকিয়ে তিনি যা দিয়েছেন, তা নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় এবং সে-সন্তুষ্টিটাও সামান্য কিছু নয়, বরং অসামান্য কিছু সৃষ্টি এবং একটি নতুন যুগকে উপহার হিসেবে পাওয়া এক বড় সন্তুষ্টি।
‘নতুন যুগ’ কথাটাকে একটু ব্যাখ্যা করা যায়। অনেক বছর আগে কিবরিয়ারই সমবয়সী শামসুর রাহমান যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, কিবরিয়াকে বেঙ্গল গ্যালারির একটা অনুষ্ঠানে এক কবিতাপ্রেমিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাহমানের অনুপস্থিতি তিনি কীভাবে নিচ্ছেন? কিবরিয়া বরাবরই কথা কম বলতেন; যেটুকু না বলার নয়, তা-ই বলতেন এবং তাঁর খুব কাছে না বসলে অনেক কথা শোনাই যেত না। কিবরিয়া নিজের বৃত্তের বাইরে এবং বৃত্তটির কেন্দ্র তাঁর পরিবার বাদ দিলে, ছিল চারুকলা অনুষদ, তাঁর সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী, কিছু পরিচিতজন – খুব সামাজিক ছিলেন না। শামসুর রাহমানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল, দুজন দুজনকে সমীহ করতেন, পছন্দ করতেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না। রাহমানের কবিতাও খুব যে মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন কিবরিয়া তা নয়, যদিও বাংলা সাহিত্যে তাঁর পঠন-পাঠন খুব কম ছিল না। কিন্তু সেই কবিতাপ্রেমীকে তিনি বলেছিলেন, যে-মানুষ কবিতায় এক নতুন যুগের উদ্বোধন করেছিলেন, তাঁর চলে যাওয়াটা, শোকের সঙ্গে আক্ষেপেরও। মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসার পর, সুস্থতা এবং স্বাস্থ্য ফিরে পেলে, তিনি আমাকে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তাতে তিনি পঞ্চাশের চিত্রকলা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি নিয়ে কিছু কথা বলেছিলেন। পঞ্চাশের দশকটা ছিল আধুনিকতার শক্তিশালী প্রকাশের। যে-আধুনিকতা বড় বড় ঢেউ তুলে ইউরোপে আছড়ে পড়ছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে, যা কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যকে ছুঁয়ে যায় চতুর্থ দশকের শুরু থেকে এবং গগনেন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলায় যার প্রকাশ আরো কিছু আগে, সেই আধুনিকতার ঢেউ ঢাকার বদ্ধ স্রোতকে নাড়িয়ে দিয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হলো পঞ্চাশের দশক থেকে। এই আধুনিকতার মধ্যে সমকাল নিয়ে প্রশ্ন ছিল, আপত্তি এবং অস্বস্তি ছিল, একে একে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার প্রতীতি ছিল। সমকালের নির্মাণগুলোকে মানবিকতা, অ-প্রাতিষ্ঠানিকতা ও জ্ঞান-যুক্তি-বিজ্ঞানের নির্মোহ বিচারে খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ব্যক্তিকে তাঁর বিশ্বের কেন্দ্রে স্থান দিয়ে তাঁর দৃষ্টিতে বস্তুনিষ্ঠতার একটি মাত্রা দেওয়ার তাগিদও ছিল। এই আধুনিকতা বাংলা সাহিত্য ও চিত্রকলাকে একই সঙ্গে স্থানিক অনিবার্যতা এবং বৈশ্বিক সংযুক্তি দিয়েছিল। পঞ্চাশের চিন্তা ছিল দূরবিস্তারী – তার প্রধান বিবেচনা ছিল পরিবর্তন, নতুন নির্মাণ। সেই পঞ্চাশের প্রধান এক কারিগর শামসুর রাহমান। নতুন যুগের এক বার্তাবাহক, আয়োজক এবং নির্মাতা।
কিন্তু কিবরিয়াও তো ছিলেন ওই একই আয়োজক, বার্তাবাহক এবং নির্মাতা। এ-কথাটা তাঁকে বললে অবশ্য তিনি একটা অস্বস্তির হাসি হাসতেন, অথবা মৃদুকণ্ঠে কিছু বলতেন, অথবা চুপ করে যেতেন, অথবা জয়নুল আবেদিন-সফিউদ্দীন-কামরুল হাসানের প্রসঙ্গ তুলে তাঁদের কাঁধে দায়িত্বটি ছেড়ে দিতেন। ওই তিন অগ্রপথিকের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তো কেউ তুলতে পারে না, কিন্তু কিবরিয়াও তো ছিলেন তাঁদের সঙ্গে, আমিনুল ইসলামও যেমন ছিলেন। এরকম ব্যাখ্যাতেও কিবরিয়ার অস্বস্তির হাসিটি মিলিয়ে যেত না। তিনি বরং পঞ্চাশের ওই সময়টাতে ফিরে যেতেন। বলতেন, দশকটা বাংলাদেশের সৃষ্টিশীলতার নিসর্গটা বদলে দিয়েছিল। কীভাবে বদলে দিয়েছিল, সেই ব্যাখ্যায় যেতেন না। কিন্তু দিয়েছিল যে, সে-কথাটা জোরের সঙ্গে বলতেন।
কিবরিয়ার সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছিল তাঁর ওপর একটি বই লেখার জন্য। বইটি শিল্পকলা একাডেমী প্রকাশ করেছিল। একাডেমীটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি প্রতিষ্ঠান চাইলেই একটা প্রকাশনার পেছনে অনেক টাকা খরচ করতে পারে না। কিন্তু এ-বইটির পেছনে একাডেমীর – বিশেষ করে এর চারুকলা বিভাগের তৎকালীন পরিচালক সুবীর চৌধুরীর আন্তরিকতা ছিল। কিবরিয়াকে তিনিই রাজি করিয়েছিলেন সাক্ষাৎকার দিতে। আমাকে অবশ্য কিবরিয়া সহ্য করে নিতেন, েস্নহও করতেন। কিন্তু একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন, তাঁর সাক্ষাৎকার টেপ করা যাবে না। ততদিনে বাজারে এমন টেপ রেকর্ডার এসে গেছে, যা আমার পকেটে ফেলে রাখলে তাঁর নিচুকণ্ঠ কথাবার্তাও টেপ হয়ে যায়, কিন্তু আমি তাঁর শর্তকে সম্মান করেছি। কিন্তু একদিকে তাঁর কথা শুনব, তাঁকে প্রশ্ন করব, আবার দরকারি কথাগুলো লিখে রাখব, সেটি সম্ভব নয় ভেবে সৈয়দ আজিজুল হকের দ্বারস্থ হয়েছি। দুদিন তিনি আমার সঙ্গে ছিলেন, তৃতীয় দিন আমি একা গিয়েছিলাম, আজিজের কাজ ছিল। প্রথম দিন, প্রথম আধা ঘণ্টা তিনি কথা বলার থেকে বেশি নীরব ছিলেন, তৃতীয় দিন তার বিপরীত। শিল্পী ও মানুষ কিবরিয়াকে জানতে ওই সাক্ষাৎকারগুলো আমাকে প্রভূত সাহায্য করেছিল। তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, তাঁর বড় হওয়া, বেড়ে ওঠা, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর চিন্তার বাইরেও আমি তাঁর রঙের দর্শন, মূর্ত-বিমূর্ত ছবি সম্পর্কে তাঁর চিন্তা-ভাবনা, তাঁর শিল্প-ভাবনা এবং পঞ্চাশের সেই ‘নতুন যুগ’ সম্পর্কে তাঁর উৎসাহের বিষয়গুলো আমি অনেক স্পষ্ট করে বুঝেছি, তাঁর বিমূর্ত ছবিতে কীভাবে এবং কেন বাংলাদেশের নিসর্গ উপস্থিত, সে-সম্পর্কে আমার ধারণার সমর্থন পেয়েছি এবং আধুনিকতার বিষয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু চিন্তার পরিচয় পেয়েছি। সৈয়দ আজিজুল হক সাহিত্য বিষয়েও কিছু প্রশ্ন করেছিলেন কিবরিয়াকে, আমি করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে। আমরা অবাক হয়েছি তাঁর পড়াশোনার পরিধির ব্যাপকতা দেখে। নতুন যুগটি ছিল নিজেদের প্রস্তুত করার, নিজের জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে পৃথিবীর সঙ্গে দূরত্ব কমাবার। পশ্চিমকে একটা অজানা ভূগোল হিসেবে নাগালের বাইরে রেখে দিতে চাননি নতুন যুগের কবি-সাহিত্যিক-চিত্রকররা। কিবরিয়া অথবা আমিনুল, শামসুর রাহমান অথবা সৈয়দ শামসুল হক পশ্চিমকে কোনো মোহ নিয়ে দেখেননি, বরং মনোযোগ দিয়ে একে পড়েছেন, জেনেছেন। যেটুকু নেবার নিয়েছেন, যার প্রয়োজন নেই, ফিরিয়ে দিয়েছেন। পশ্চিমকে অনুকরণ করেন, কোনো কোনো সময় অনুসরণ করলেও, কিন্তু যা নিয়েছেন, নিজের সংস্কৃতির জারকরসে নিকষিত আত্মস্থ করেছেন। ফলে তাঁরা আধুনিক, কিন্তু প্রত্যেকেই নিজের সংস্কৃতির বিচারে সেই আধুনিকতাকে হাজির করেছেন। আধুনিকতা, তাঁদের কাছে সময় অথবা ইতিহাস-রাজনীতি-অর্থনীতির অমোঘ বিবর্তনে তৈরি কোনো অনিবার্যতা শুধু ছিল না, শুধু কিছু মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সামষ্টিক একটি নাম, একটি পরিচয়ও।
আধুনিক সময়কালকে অনিবার্য করেছে নগরায়ণ, শিল্পায়ন, উন্নত ও পরিব্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা, নতুন প্রযুক্তি এবং মহাযুদ্ধ। পশ্চিমে এসবের প্রভাব পড়েছে আগে, আমাদের কয়েক দশক পরে। কিন্তু এই প্রভাব মানুষকে বিপন্ন-বিষণœ-বিচ্ছিন্ন করেছে; তাকে এক বিরূপ বিশ্বে নিয়ত একাকী করেছে, তার বিশ্বাসের ঘরে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে অথবা তাকে শূন্য করে দিয়েছে – এসবই কিবরিয়া জেনে নিতেন। কিন্তু তাঁর কাছে আধুনিকতার আরো কিছু পরিচয় ছিল। মানুষ ক্রমাগত তার শেকড় থেকে দূরে যাচ্ছে; তার কল্পনার অখণ্ডতা আর নেই এবং মানুষ অনেক বেশি দেহকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে; মনকেন্দ্রিক নেই; আর আধুনিক মানুষ মনের দিক থেকে পীড়িতও বটে; তার মনোজগতে আস্থার পরিবর্তে আস্থার অভাব এবং নিশ্চয়তার পরিবর্তে অনিশ্চয়তা এবং অস্পষ্টতা – এভাবেই তিনি বর্ণনা করেছিলেন আমাদের সময় ও মানুষকে। কিবরিয়ার ছবিতে এই বিপন্নতা-খণ্ডতা-বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ ঘটেছে বটে, কিন্তু তাঁর ছবি এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি শেকড়হীনতার পেছনের শেকড়কে খুঁজেছেন, খণ্ড কল্পনার পেছনে ক্রমশ বিলীয়মান অখণ্ডতার সন্ধান করেছেন। আধুনিক মানুষকে তিনি সতত নিরালম্ব ভাবতে চাননি – তার যে কিছু না কিছু অবলম্বন আছে, তা মেনে সেগুলোর তালাশ করেছেন। এ জন্য কিবরিয়ার ছবিতে, তলে তলে, খোঁজার একটা ব্যাপার চলতে থাকে। তাঁর ফর্ম সুবিন্যস্ত, তাঁর ক্যানভাসের কাঠামো অভঙ্গুর, তাঁর রঙের পেছনে একটা নিশ্চয়তার আভাস আছে – এসবই তাঁর ছবি যাঁরা দেখবেন, বলবেন। কিন্তু একটার পর একটা ছবি দেখলে ফর্মের ভেতরের অস্থিরতাটা চোখে পড়বে, কাঠামোকে আর অত অভঙ্গুর মনে হবে না; রংকেও তখন স্পন্দমান, অনুভূতি থেকে অনুভূতিতে বিন্যস্ত বলে ধরা যাবে। কিবরিয়াকে বিশিষ্ট করেছে যেসব কাজ, সেগুলোর সংহতি আর সৌন্দর্য চোখে পড়ে সবার আগে, এগুলোর ভেতরের কম্পন ও পরিবর্তন, তাদের তালাশ আর বিকল্প প্রকাশের বিষয়টি বোঝা যাবে ধীরে ধীরে। তার কারণ কিবরিয়ার ছবিতে নিশ্চিতি-অনিশ্চিতি, খণ্ডতা-অখণ্ডতা ইত্যাদির এক দ্বিবিধ প্রকাশ। তাঁর ছবির সংহতি তাঁর চিন্তার দার্ঢ্য ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন; কিন্তু এর ভেতরের স্পন্দমানতা সময় ও মানুষের ভেতরের দ্বিত্বতা এবং অসংহতির প্রকাশ। কিবরিয়ার ছবির গভীরতা আমাদের নির্দিষ্ট অনেক চিন্তা থেকে বেরোতে সাহায্য করে। যেমন, তাঁর বিমূর্ত ছবির পেছনেও যে তাঁর বালকবেলায় দেখা বর্ধমানের নিসর্গ এবং অতঃপর দেখতে থাকা বাংলাদেশের নিসর্গ ক্রমাগত ছায়া ফেলেছে, এ কথাটা প্রথম দৃষ্টিতে প্রতীয়মান নাও হতে পারে। কিবরিয়া নিজে এই উপস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন, বলেছেন, মানুষের অবচেতনে কখন কোন ছায়া পড়ে এবং তার প্রকাশ কত অবিলম্বে অথবা বিলম্বে হতে পারে, শিল্পীও তা জানেন না।
নিসর্গ, অনেক শিল্পীর ছবিতে, কল্পিত, অথবা পুনর্নির্মিত, অথবা ভিন্নরূপে পুনঃউদ্ভাসিত (মার্ক শাগালের অনেক ছবি এই তৃতীয় সম্ভাবনার চমৎকার বাস্তবায়ন)। কিবরিয়ার ছবি নিসর্গ এক ক্রমশ বিবর্তিত রং-সম্ভাবনার নাম। এজন্যই হালকা সবুজ, এজন্যই মেটে-বাদামি অথবা এক্রু-বেজের প্রতি তাঁর একেক সময়ের সমর্থন। অথবা তাঁর ছবির দেহতত্ত্বের কথাই ধরা যাক। প্রথম পর্যায়ের ছবিতে যা কিছু নারীমূর্তি, ফিগার, অথবা নগ্নতার আভাস, তা এক আধুনিক শিল্পীর মানবদেহকে এবং আধুনিকতার দেহকেন্দ্রিকতাকে বোঝার প্রয়াস। নারীমূর্তি তাঁর ছবিতেও প্রেম-আকাক্সক্ষা-কামনা অথবা কল্পনার প্রতিরূপ; নারীমূর্তিকে ধরা যায়, না সে অধরা, সে কি প্রেমের বিশুদ্ধ রূপ, নাকি রিপুরও অবতার – এসব প্রশ্ন নিয়তই কিবরিয়াকে নিয়োজিত করে, কিন্তু তাঁর বিমূর্ত ছবিতে নারীর সৌন্দর্য আর প্রকৃতির সৌন্দর্য এক হয়ে যায়। নগ্নতা নিয়ে একটা প্রশ্ন করেছিলাম কিবরিয়াকে। তাঁর কথাহীন মৃদু হাসিতে একটা বিব্রতবোধের ছাপ ছিল। প্রশ্নটি অনিষ্পন্ন রেখে ভেবেছি, তাঁর ছবিতেই অনুসন্ধানটা চালাব। এরকম অনুসন্ধান অনেক সময় অনেক অপ্রত্যাশিত আবিষ্কারের সামনাসামনি করে দেয়।
কিবরিয়ার ছবি দেখছি সেই ১৯৬৮-৬৯ সাল থেকে।  তাঁর  এক অনুসারী ছিলেন শাহতাব। তাঁর অকালপ্রয়াণের সময় ময়মনসিংহের কোনো একটি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষকতা করতেন – সম্ভবত। তিনি কিবরিয়াকে গুরু মানতেন এবং আমাকে তাঁর ছবি দেখতে উৎসাহিত করতেন। কিবরিয়ার ছবির ব্যাখ্যাও তিনি দিতেন। শিল্পী শাহতাবের সঙ্গে পরিচয় চারুকলা অনুষদেই – তখন সেটি কলেজ – আমার বন্ধু, শিল্পী মারুফের সৌজন্যে। শাহতাব বলতেন, কিবরিয়ার ফর্ম-চিন্তার যে-গভীরতা, তা খুব কম শিল্পীর ছবিতেই আছে। শাহতাবের এক একক প্রদর্শনীর (সম্ভবত ১৯৭৪ সালের) ওপর বাংলাদেশ অবজারভারে আমি লিখেছিলাম। তাঁর ফর্ম-ভাবনায় কিবরিয়ার ছায়া ছিল; কিন্তু আমার মনে হয়েছিল শাহতাবের ঘনকবাদী ক্যানভাস কিবরিয়া থেকে কিছুটা দূরে যেতে চাইছিল। ততদিনে কিবরিয়া সম্পর্কে শাহতাবের মন্তব্যটি আমি কিছুটা বুঝতে পেরেছিলাম। কিবরিয়ার ফর্ম-চিন্তার গভীরতা বিষয়টি নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা হয়েছিল। আমি বুঝেছিলাম, জাপান যাওয়ার আগে ও জাপান থেকে ফিরে কিবরিয়া যে-ছবি এঁকেছিলেন, সেগুলোতে অনেক পার্থক্য ছিল, পার্থক্য ছিল শৈলীগত। অর্থাৎ আধা-বিমূর্তের চাইতে বিমূর্তের প্রতি পক্ষপাতিত্ব; ছিল রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে (রং এখন অনেক নমিত, ব্যঞ্জনাধর্মী) এবং ফর্ম সাজানোর ক্ষেত্রে (ফর্ম এখন অনেক গতিহীন)। আমি খুব অবাক হয়ে দেখতাম এক ধরনের প্রচ্ছন্ন কাব্যিকতা কিবরিয়ার ক্যানভাসকে অনেক সময় বাক্সময় করেছে। একজন আধুনিক চিত্রকর, বিশেষ করে যিনি প্রকাশবাদী চিন্তাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন, তিনি কেন কাব্যিকতার ছোঁয়া দেবেন তাঁর ছবিতে – এই প্রশ্ন আমার মনে এসেছে। অনেক পরে বুঝতে পেরেছি, কাব্যিকতা নয়, বরং সংগীতের সংহতি ছিল কিবরিয়ার উদ্দিষ্ট। তিনি আধুনিক জীবনের ক্লিষ্ট, ক্লান্ত অথবা বিক্ষুব্ধ এবং পারক্যবোধে আক্রান্ত জীবনকে চিহ্নিত করেছেন ঠিকই, কিন্তু একেই ধ্রুব মানেননি। সেই জীবন থেকে তাঁর দৃষ্টি তিনি ব্যক্তির নানান বোঝাপড়ার ওপরও নিবদ্ধ করেছেন, যে-বোঝাপড়ায় ব্যক্তি একটি আশ্রয় পায় নিসর্গ, শেকড় অথবা জীবনের অশ্রুত সংগীতে। কিবরিয়ার চোখে তাই আধুনিক মানুষ শুধুই জে আলফ্রেড প্র“ফ্রক নয়; বরং সে মানুষ একটা স্থির কেন্দ্রের অন্বেষণও করে, সে-মানুষ স্বপ্নও দেখে এবং তার জীবনে রঙের উপস্থিতি মোটেও শূন্য নয়। আর প্রকৃতির সঙ্গে চাইলেই সে মানুষের ছাড়াছাড়ি হতে পারে না। কিবরিয়ার এই চিন্তার সূত্রগুলো পশ্চিমা নয়, দেশীয়; তাঁর আধুনিকতা ষোলোআনা পশ্চিমা নয়, তার অনেকখানিই গড়ে উঠেছে স্থানীয় সংস্কৃতি, সমাজ, প্রকৃতি এবং ইতিহাসের পথ ধরে। এজন্য তাঁর প্রকাশবাদী ছবিতেও নাগরিক বিকার-বিক্ষোভ-ক্লান্তির পরিবর্তে আছে সময় ও ইতিহাসের বিবর্তনে বিপন্ন মানুষের নানান বোধ-অনুভূতির প্রকাশ। তাঁর জীবনানন্দীয় বিপন্ন বিস্ময় এবং তাঁর বিকল্প ভাবনাও। একসময় সেই মানুষ যখন প্রকৃতি ও শেকড়ে দৃষ্টি দেয় তার ভেতর যে সংহতির জন্ম হয়, তারও প্রকাশ কিবরিয়ার ক্যানভাসে ধরা পড়ে। এই ক্যানভাস তাই নানামাত্রিক; নানা ব্যঞ্জনা ও দ্যোতনায় সমৃদ্ধ।
কিবরিয়ার শিল্পীজীবনকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। তাঁর ছবিগুলো – সেই শুরুর সময় থেকে শেষ আঁকা ছবিটা পর্যন্ত – যদি পাশাপাশি রেখে দেখা যায় (কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে যেটি সহজেই করা সম্ভব), তাহলে দেখা যাবে, তাঁর শুরুর সময়টা ছিল ফিগারকে নানাভাবে দেখার, বস্তুকে তার ভেতর-বাহিরের পরিচিতিতে চিহ্নিত করার, ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি ও বোধগুলোকে ইন্দ্রিয়ের অতীতে স্থাপন করে দেখার একটা পর্যায়। ফিগার ও বস্তুর বাইরের রূপটি মুখ্য ছিল না, কিন্তু অন্তররূপটি খুঁজে বের করার তাগিদটাও তখন তীব্র ছিল না। এই সময়টা, পঞ্চাশের মাঝামাঝি – শেষ পঞ্চাশ পর্যন্ত, তিনি রূপ ও অরূপের দ্বন্দ্বটি বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অচিরেই তিনি   অন্তররূপের প্রকাশগুলোকে চিহ্নিত করেছেন, ঘনকবাদের দর্শনকে নিজস্ব চিন্তার ছাঁচে ফেলে এক আধা বিমূর্ত শৈলী তিনি আয়ত্ত করেছেন এই পর্যায়ে, যা তাঁর জাপান-যাত্রা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, যাতে নাগরিক চিন্তা ও প্রকৃতি-ভাবনা একটা জায়গায় এসে মিশেছে, যেখানে এক সূক্ষ্ম সুররিয়াল চিন্তাও কোথাও যেন বাজে। জাপানে কেটেছে তাঁর তৃতীয় পর্যায়টি – যেটি ছিল এক নবিশি সময়, আগের চিন্তাগুলো সংহত করার এবং তা থেকে একসময় বেরিয়ে আসার সময়। চতুর্থ পর্যায়ে তিনি বিমূর্ততার দর্শনে স্থিত হয়েছেন এবং বিমূর্ততাকে নিজ দেশ, কাল ও সময়ে স্থাপন করে এর এক নিজস্ব ভাষ্য তিনি নির্মাণ করেছেন। বলা যায়, এই ভাষ্যকে এরপর তিনি নানা মাত্রায় বিন্যস্ত করে গেছেন, তার অসংখ্য ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। যেমন, মানুষের শেকড় সন্ধান ও প্রকৃতিমনস্কতা কীভাবে বিমূর্ত চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে সেই বিষয়টি কিবরিয়া অনেক ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমার দেখা মতে, কিবরিয়া মুষ্টিমেয় কয়েকজন শিল্পীর একজন, যাঁরা বিমূর্ততাকে নিজস্বতা ও অভিনবত্বে মণ্ডিত করে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত করে প্রকাশ করতে পেরেছেন।
কিবরিয়ার শেষ পর্যায় ওই গুরুতর অসুখ থেকে মুক্তি পেয়ে জীবনে ফেরার পর তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত। এই পর্যায়ে তিনি জীবনকে রবীন্দ্রনাথের মতোই দেখছিলেন, যেখানে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত,
দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও হঠাৎ হঠাৎ আনন্দ (রবীন্দ্রনাথ খুশি শব্দটিও ব্যবহার করেছিলেন) এবং মুক্তির দেখা মেলে। শেষ পর্যায়ে কিবরিয়া জীবন নিয়ে অনেক ভেবেছেন, ফলে তাঁর ক্যানভাস থেকে ধূসরতা চলে গিয়েছিল। তাঁর ছবি দেখে মনে হতো, যে স্থির কেন্দ্রের অন্বেষণ একসময় তিনি শুরু করেছিলেন, যেন তার সন্ধান কোথায় পাওয়া যেতে পারে, তার হদিস তিনি পেয়েছেন, যদিও তার স্থিরতা অথবা কেন্দ্রিকতা নিয়ে তাঁর সুনির্দিষ্ট কোনো আস্থা ছিল না, তার পরও স্থির কেন্দ্রের চিন্তাটিই তো শূন্যতাবিরোধী।
কিবরিয়ার তেলরং ও অন্যান্য মাধ্যমে আঁকা এবং বিশেষ করে তাঁর ছাপাইছবি, বাংলাদেশের চিত্রকলাকে যে-মহিমা দিয়েছে, তাঁর শুরুর সেই ‘নতুন যুগে’ যেমন ছিল আমাদের সময় ও পরবর্তী সব সময়ে তেমনি নিজস্বতায় ভাস্বর হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

*