logo

মৃত্যুচতুর্শতবার্ষিকী স্মরণ ক্যানভাসে শেকসপিয়রের নায়িকারা

আ ন্দা লি ব  রা শ দী

পৃথিবী যাকে শেকসপিয়র হিসেবে চেনে, তিনি আদৌ শেকসপিয়র কি না, কিংবা তা হয়ে থাকলেও হ্যামলেট, ম্যাকবেথ, কিং লিয়ার, রোমিও জুলিয়েট, মার্চেন্ট অব ভেনিসের মতো কালজয়ী কাব্য-নাটকগুলো আদৌ তাঁর লেখা কি না – শুঁড়িখানার কলহে ছুরিকাহত ক্রিস্টোফার মার্লোর মৃত্যুর ঘটনাটি বানোয়াট কি না, আড়ালে ক্রিস্টোফারই শেকসপিয়র নাম নিয়ে একটার পর একটা ভুবনজয়ী নাটক রচনা করেছেন কি না – এসব কূটতর্ক থাকবেই। তারপরও ১৯৬৪ সালে শেকসপিয়রের জন্মচতুর্শতবার্ষিকীর স্মৃতি এখনো জীবমত্ম, মাত্র বায়ান্ন বছর পর ২০১৬ চিহ্নিত হচ্ছে তাঁর মৃত্যুচতুর্শতবার্ষিকীর বছর হিসেবে। এই সংক্ক্ষিপ্ত জীবনে শেকসপিয়র নিজেকে সমকাল ও আগামীকালের প্রধান স্রষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে গেছেন। তিনি কেবল সাহিত্যজগৎকে মাতিয়ে দিয়ে গেছেন এমন নয়, মঞ্চ ও সেলুলয়েড তো রয়েছেই, চিত্রশিল্পের ভুবনেও তাঁর সৃষ্টির অমোচনীয় ছাপ রয়ে গেছে।

কেবল হেমলেট ট্র্যাজেডির ওফেলিয়ার কথাই ধরা যাক।

অসাধারণ মমতায় তাকে ক্যানভাসে তুলে এনেছেন জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউস (১৮৯৪), জন এভারেট মিলাইস (১৮৫২), আলেকজান্দ্রে ক্যাবানেল (১৮৮৩), বেঞ্জামিন ওয়েস্ট (১৭৯২), ম্যারি ক্যাথরিন বোল্টন (১৮১৩), ফ্রান্সেস ম্যাকডোনাল্ড (১৮৯৮), থোমাস ফ্রান্সিস ডিকসি (১৮৬১), আর্থার হিউজেস (১৮৫১-৫৩), মার্কাস স্টোন (১৮৮৮), অ্যানা লি মেরিট (১৮৮০), দামেত্ম গ্যাব্রিয়েল রসেটি (১৮৬৪), জর্জ ফ্রেডেরিক ওয়াটস (১৮৮০), ইউজিন ডেলাক্রয় (১৮৪৩) এবং আরো অনেকে।

একই ধরনের জনপ্রিয় চরিত্র জুলিয়েট।

১৮৮৮ সালে ইংল্যান্ডের সাপ্তাহিক গ্রাফিক একুশজন শিল্পীকে দিয়ে শেকসপিয়রের একুশজন নায়িকাকে অাঁকিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করে। প্রদর্শিত শেকসপিয়র চরিত্র এবং অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের নাম :

 

চরিত্র                                                                  চিত্রশিল্পী

প্রথম ভাগ

ডেসডিমোনা (ওথেলো)                                           ফ্রেডেরিক লেইটন

পোর্শিয়া (দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস)                              হেনরি উডস

সিলভিয়া (দ্য টু জেন্টলম্যান অব ভেরোনা)                  সি ই পেরম্নগিনি

জেসিকা (দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস)                               স্যামুয়েল ফিল্ডস

রোজালিন্ড (অ্যাজ ইউ লাইক ইট)                              আর ডবিস্নউ ম্যাকবেথ

 

দ্বিতীয় ভাগ

ওলিভিয়া (টুয়েলফথ নাইট)                                     এডমন্ড লেইটন

অ্যান পেইজ (দ্য মেরি ওয়াইভস অব উইন্ডসর)                  জর্জ ডি লেসলি

ওফেলিয়া (হ্যামলেট)                                             মার্কাস স্টোন

অড্রে (অ্যাজ ইউ লাইক ইট)                                     পি আর মরিস

 

তৃতীয় ভাগ

বিয়াত্রিচ (মাচ এডো অ্যাবাউট নাথিং)                        ফ্রাঙ্ক ডিকসি

জুলিয়েট (রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট)                            ফিলিপ ক্যালভারন

ইমোজিন (সিম্বেলিন)                                             হার্বার্ট স্মাল্জ

কর্ডেলিয়া (কিং লিয়ার)                                          ডবিস্নউ এফ ইয়েমেস

 

চতুর্থ ভাগ

ক্লিওপেট্রা (অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা)                          জে ডবিস্নউ ওয়াটারহাউস

ইসাবেলা (মেজার ফর মেজার)                                ফ্রান্সিস টপহ্যাম

পোর্শিয়া (জুলিয়াস সিজার)                                      লরেন্স আলমা-তাদেমা

ক্যাথরিন (কিং হেনরি দ্য এইটথ)                              এডউইন লঙ্

 

পঞ্চম ভাগ

মিরান্ডা (দ্য টেম্পেস্ট)                                            ফ্রেডেরিক গুডাল

মারিয়ানা (মেজার ফর মেজার)                                ভ্যাল প্রিনসেপ

ক্রেসিডা (ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা)                               এডওয়ার্ড পয়েন্টার

কুইন ক্যাথরিন (হেনরি দ্য ফিফথ)                            লরা আলমা-তাদেমা

 

ক্যানভাসের এই চরিত্রগুলোর কজন শিল্পীর পরিচিতি উপস্থাপন করা হচ্ছে। এ তালিকার বাইরেও কজন উপস্থাপিত।

১৭৫০ সালে জন ওটন ম্যাকবেথ নাটকের তিন পেত্নী, বাঙ্কো ও ম্যাকবেথের বৈঠকের ছবি অাঁকেন। রিচার্ড পার্কস বনিংটন (১৮০২-১৪) ‘শেকসপিয়রিয়ান পেইন্টার’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

শেকসপিয়র যেমন প্রভাবিত করেছেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের, চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকের প্যানেল শিল্পীরাও শেকসপিয়রকে প্রভাবিত করেছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

সালভাদর দালি জুলিয়েটকে নিয়ে দশটি ছবির একটি সিরিজ এঁকেছেন।

 

জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউস

শেকসপিয়রের চরিত্র ঊনবিংশ শতকের ইংরেজ ও ফরাসি চিত্রশিল্পীদের প্রভাবিত করেছে। শেকসপিয়রের বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলো বহুভোগ্যা নারীর মতো একের পর এক শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে যেন তাঁদের ক্যানভাসে এই নারীদের তুলে ধরেন।

উজ্জ্বল রং ও রিয়েলিস্টিক ধারার প্রি-র‌্যাফেলাইট-শৈলীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউস। ইংরেজ মা-বাবা উইলিয়াম ও ইসাবেলা ওয়াটারহাউস দুজনেই চিত্রশিল্পী, তাঁদের ঘরে জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউসের জন্ম ইতালির রোমে ৬ এপ্রিল ১৮৪৯। সে বছরই দামেত্ম গ্যাব্রিয়েল রসেটি, জন এভারেট মিলাইস, উইলিয়াম হোলম্যান প্রমুখ প্রি-র‌্যাফেলাইট ব্রাদারহুডের সদস্যরা একত্রিত হয়ে প্রি-র‌্যাফেলাইট আন্দোলন শুরম্ন করেন। ইতালি ও গ্রিক তাঁর শৈশবস্মৃতি আচ্ছন্ন করে রাখে, পরিণত জীবনের কীর্তিতে তাঁর এই প্রেক্ষাপট স্পষ্ট হয়ে আছে।

১৮৫৪ সালে লন্ডনের সাউথ কেনসিংটনে পারিবারিকভাবে স্থিত হন। বাড়ির পাশেই নবপ্রতিষ্ঠিত ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়াম, ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও ন্যাশনাল গ্যালারিও খুব দূরে নয়। পরিবারের সমর্থন ও উৎসাহে ড্রইং করতে থাকেন, জাদুঘরের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর অনুসরণে নিজের স্কেচ বই ভরে ফেলেন।

তিনি রয়াল অ্যাকাডেমি অব আর্টে ভর্তি হয়েছিলেন মূলত ভাস্কর্য পড়ার জন্য; কিন্তু যেখানে তাঁর স্বসিত্ম সবচেয়ে বেশি সেই পেইন্টিংয়ে চলে আসেন।

১৮৭৪ সালে অাঁকা সিস্নপ অ্যান্ড হিজ হাফ ব্রাদার ডেথ রয়াল অ্যাকাডেমির গ্রীষ্মকালীন প্রদর্শনী মাত করে দেয়। জন উইলিয়াম ওয়াটারহাউস অনুপ্রেরণার জন্য বারবার সাহিত্যের কাছে ফিরে গেছেন। আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের দ্য লেডি অব শ্যালট অনুসরণে একই নামের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ছবি এঁকেছেন ১৮৮৮, ১৮৯৪ এবং ১৯১৬ সালে। তাঁর আর একটি প্রিয় বিষয় শেকসপিয়রের ওফেলিয়া – তাঁকে নিয়ে চারটি ছবি এঁকেছেন। রয়াল অ্যাকাডেমি থেকে ডিপ্লোমা লাভের জন্য তিনি ১৮৮৮ সালে অাঁকা ওফেলিয়া দাখিল করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল মারমেইড দাখিল করবেন, কিন্তু পরীক্ষার আগে এই মৎস্যকন্যার কাজ শেষ করতে পারেননি।

তাঁর প্রথম দিককার ছবি প্রি-র‌্যাফেলাইট ধাঁচের নয়, ধ্রম্নপদ ঘরানার। এইলিংয়ের একজন স্কুলশিক্ষকের কন্যা এসথার কেনওয়ার্দিকে বিয়ে করেন ১৮৮৩ সালে; এসথার নিজেও শিল্পী ছিলেন।

অসুস্থতার কারণে তিনি তাঁর একটি পরিকল্পিত ছবি ওফেলিয়া ইন চার্চইয়ার্ড শেষ করে যেতে পারেননি। ১৯১৭ সালের ১০ ফেব্রম্নয়ারি তিনি ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কয়েকটি উলেস্নখযোগ্য চিত্রকর্ম :

মিরান্ডা (১৮৭৫), কনসাল্টিং দ্য ওরাকল (১৮৮৪), দ্য লেডি অব শ্যালট (১৮৮৮), ক্লিওপেট্রা (১৮৮৮), ওফেলিয়া (১৮৮৯), ইউলিসিস অ্যান্ড সাইরেন (১৮৮৯), প্যানডোরা (১৮৯৬), জুলিয়েট (১৮৯৮), দ্য সাইরেন (১৮৯০), দ্য মারমেইড (১৯০১), জেয়সন অ্যান্ড মিডিয়া (১৯০৭), দ্য সোল অব দ্য রোজ (১৯০৮)।

 

ফোর্ড ম্যাডক্স ব্রাউন

১৮৭০ সালে তেলরঙে অাঁকা রোমিও ও জুলিয়েটের ব্যালকনি দৃশ্য ফোর্ড ম্যাডক্স ব্রাউনের একটি স্মরণীয় কাজ।

খ্যাতিমান ইংলিশ পেইন্টার ফোর্ড ম্যাডক্স ব্রাউনের জন্ম ১৬ এপ্রিল, ১৮২১। তাঁর পিতামহ বিখ্যাত মেডিক্যাল তাত্ত্বিক জন ব্রাউন (ব্রাউনোলিয়ান সিস্টেম অব মেডিসিনের উদ্ভাবক), বাবা ফোর্ড ব্রাউন ব্রিটিশ রয়াল নেভির পার্সার, নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পর চাকরি ছেড়ে দেন এবং অর্থকষ্টে পড়েন। সসত্মায় আবাসন লাভের জন্য পরিবারটিকে কখনো ক্যালাইসে ভাড়া বাড়িতে, কখনো কেন্টে আত্মীয়দের বাড়িতে থাকতে হয়েছে। ব্রাউনের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা খুবই সীমিত। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে নৌবাহিনীর চাকরি বেছে নিক, কিন্তু ছেলের আগ্রহ চিত্রশিল্প, বিশেষ করে ওল্ড মাস্টার্সদের অাঁকা ছবির অনুকরণে একই ধরনের ছবি অাঁকা। তিনি পিটার ভ্যান হ্যানসলেয়ার ও গুসত্মাভ ওয়াপার্সের কাছে পেইন্টিংয়ের দীক্ষা নেন।

ব্রাউন লর্ড বায়রনের কবিতায় (The Giaour এবং Manfred) অনুপ্রাণিত হয়ে দ্য এক্সিকিউশন অব কুইন ম্যারি এবং ম্যানফ্রেড অন দ্য জাঙ্গফ্রাউ অাঁকেন। তাঁর প্রথম দিককার চিত্রকর্মের একজন প্রধান ভক্ত দামেত্ম গ্যাব্রিয়েল রসেটি (১৮২৮-১৮৮২); তাঁর মাধ্যমেই প্রি-র‌্যাফেলাইট ব্রাদারহুডের চিত্রশিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি কখনো ব্রাদারহুডের সদস্য হননি; কিন্তু উইলিয়াম হলম্যান হান্ট (১৮২৭-১৯১০) এবং জন এভারেট মিলাইসের উজ্জ্বল রং এবং রিয়েলিস্টিক স্টাইল অনুসরণ করেন। হবেইন, ফ্রেডেরিক ওভারবেক এবং পিটার কর্নেলিয়াস তাঁকে প্রভাবিত করেন। ১৮৪০ সালে লন্ডনে রয়াল অ্যাকাডেমিতে প্রথম প্রদর্শনী করলেও পরবর্তী বারো বছর তাঁর ছবির ক্রেতা জোটেনি। একপর্যায়ে শিল্পী ভারতে অভিবাসী হওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। ১৮৫৯ সালে তাঁর দ্য লাস্ট অব ইংল্যান্ড ৩২৫ গিনিতে (এখনকার হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড) বিক্রি হয়।

তাঁর আঁকা ছবির ব্যাপারে রয়াল অ্যাকাডেমির নিস্পৃহতা তাঁকে হতাশ করে এবং কিছু সময়ের জন্য তিনি ছবি অাঁকা থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। ব্রাউনের দুটি সেরা কাজের একটি ওয়ার্ক (১৮৫২-৬৫) এবং ম্যানচেস্টার টাউন গ্রেট হলে বারোটি ছবির সিরিজ দ্য মানচেস্টার ম্যুরাল। তাঁর প্রথম স্ত্রী এলিজাবেথ ব্রমলি অল্প বয়সে প্রয়াত হন। দ্বিতীয় স্ত্রী এমা হিল এক রাজমিস্ত্রির অবৈধ সমত্মান, ব্রাউনের মডেল এবং একদা রক্ষিতা। ৮ অক্টোবর ১৮৯৩ ফোর্ড ম্যাডক্স ব্রাউন প্রয়াত হন।

 

হেনরি উডস

হেনরি উডসের হাতে মূর্ত হয়ে উঠেছে শেকসপিয়রের মার্চেন্ট অব ভেনিসের পোর্শিয়া। ১৮৮৭ সালে আঁকা পোর্শিয়া তাঁর অন্যতম শিল্পকর্ম।

হেনরি উডসের জন্ম ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার (এখন চেশয়ার) কাউন্টির ওয়ারিংটন শহরে, ২২ এপ্রিল ১৮৪৬, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা বন্ধকি কারবারি আর মা দোকানি। হেনরি নয় সমত্মানের মধ্যে সবার বড়। পড়াশোনা করেছেন ওয়ারিংটন স্কুলে, সেখান থেকে বৃত্তি পেয়ে লন্ডনের কেনসিংটন আর্ট স্কুলে। সেখানে বন্ধু হিসেবে পেলেন সহশিল্পী স্যামুয়েল লিউক ফিল্ডসকে – দুজনের স্মরণীয় বন্ধুত্ব আমৃত্যু টিকে ছিল।

১৮৬৯ সালে দুজন একই সঙ্গে দ্য গ্রাফিক্সের অঙ্কনশিল্পী হিসেবে যোগ দেন এবং জন এভারেট মিলাইস, হিউবার্ট ফন হারকোমার ও ফ্রাঙ্ক হোলের মতো শিল্পীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন। ফিল্ডস পরে উডসের বোন চিত্রশিল্পী ফ্যানিকে বিয়ে করেন।

হেনরি উডস ১৮৭৬ সালে ভেনিসে যান এবং সেখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধামত্ম নেন। তিনি ভেনিসের জীবন ও ভেনিসের মানুষের ছবি অাঁকতে শুরম্ন করলেন। লুডভিগ প্যাসিনি, ভ্যান হানিন, ইউজিন বস্নাস, অগাসত্ম ফন পেটেনকোফেন প্রমুখ শিল্পীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাঁর বন্ধুর তালিকায় পরে যোগ হন হেনরি সিঙ্গার সার্জেন্ট।

তাঁর ভেনিসভিত্তিক ছবি অ্যাট দ্য ফুট অব রিয়াল্টো এবং দ্য গন্ডোলিয়ার্স কোর্টশিপ প্রদর্শিত হওয়ার পর ১৮৮২ সালে তাঁকে রয়াল অ্যাকাডেমির সহযোগী সদস্য করে নেওয়া হয়। ১৮৯৩ সালে হেনরি মুর এবং জন ম্যাকহোয়ার্টারের সঙ্গে অ্যাকাডেমির পূর্ণাঙ্গ সদস্য হন।

হেনরি উডসের উলেস্নখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে : গোয়িং হোম (১৮৭৩), স্ট্রিট ডিলার্স ইন ভেনিস (১৮৮০), এ ভেনিশিয়ান ফ্যান সেলার (১৮৮২), কিউপিডস স্পেল (১৮৮৫), ভেনিশিয়ান ওয়াটার সেলার (১৯০২), এ ভেনিশিয়ান বিউটি (১৯০৬), হানিমুন (১৯১২)।

জীবনের শেষ সময়টা কেটেছে ভেনিসের ক্যালসিনা হোটেলে। ১৯২১ সালের ২৭ অক্টোবর ভোরে তিনি ডুকাল প্যালেসে ছবি অাঁকতে যান। গন্ডোলায় চড়ে দুপুরের খাবার খেতে হোটেলে ফেরেন। গন্ডোলার মাঝি যখন তাঁকে আবার নিতে আসে দেখতে পান নিজের ইজেলের পাশে শিল্পী হেনরি উডস পড়ে আছেন, নিষ্প্রাণ।

 

ফ্রেডেরিক লেইটন

ফ্রেডেরিক লেইটনের ১৮৯৯ সালের ক্যানভাসে তেলরঙের ছবি ডেসডিমোনা সে সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি চিত্রকর্ম।

ফ্রেডেরিক লেইটনের জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৮৩০ ইংল্যান্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ারের ছোট শহর স্কারবরাতে। তাঁর পরিবার আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় বেশ সচ্ছল ছিল। পড়াশোনা করেন লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুলে। ছবি আঁকার দীক্ষা নেন এদুয়ার্দ ফন স্টিনলে এবং জিওভানি কোস্টার কাছে। বয়স যখন চবিবশ বছর তিনি ফ্লোরেন্সের শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে পাঠ নেন। ১৮৫৫-৫৯ – এ সময়টা তাঁর কাটে প্যারিসে, তখনকার শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সান্নিধ্যে। ১৮৬০ সালে লন্ডনে ফিরে এসে প্রি-র‌্যাফেলাইট ব্রাদারহুডে যোগ দেন।

তিনি স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক হিসেবে ৩৮ মিডলসেক্স রাইফেলে যোগ দেন। নেতৃত্বগুণে শুরম্নতে তিনি কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ক্রমেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যমত্ম পদোন্নতি পান, ১৮৮৩ সালে কমান্ডিং অফিসারের পদ থেকে সরে আসেন। একই সঙ্গে রয়াল অ্যাকাডেমিতে যুক্ত হয়ে ১৮৭৮-এ রয়াল অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট পদ অলংকৃত করেন। চিত্রশিল্পী জেমস হুইসলার ঠাট্টা করে বলেন, তিনি রয়াল অ্যাকাডেমির কর্নেল আর আর্টিস্টস রাইফেলের প্রেসিডেন্ট, তাঁর ছবি অাঁকার সময় কোথায়?

ফ্রেডেরিক লেইটন শিল্পকর্মকে উপেক্ষা করেননি। তাঁর ভাস্কর্য আর্টিস্ট রেসলিং উইথ আ পাইথন সম্পর্কে বলা হয়, এ কাজটি ব্রিটিশ ভাস্কর্যে নতুন রেনেসাঁ এনে দিয়েছে। কেনসিংটন মিউজিয়ামের আর্চওয়ে ফ্রেসকো সজ্জিত করার কথা যখন ওঠে মার্কিন শিল্প-সমালোচক আর্ল শিনে বলেন, ফ্রেসকোতে সঠিক অবয়ব আনতে হলে ফ্রেডেরিক লেইটনের বিকল্প কেউ নেই। এই শিল্পীর হল্যান্ড পার্কের বাড়িই এখন লন্ডনের লেইটন হাউস মিউজিয়াম। চিত্রশিল্পীদের মধ্যে তিনিই প্রথম স্যার খেতাবপ্রাপ্ত হন। স্যার খেতাবপ্রাপ্ত হয়ে পরদিনই তিনি প্রয়াত হন।

তিনি অবিবাহিত ছিলেন। তবে কবি হেনরি উইলিয়াম গ্রেভিলের সঙ্গে তাঁর একটি সমকাম সম্পর্ক ছিল বলে অনুমান করা হয়। একজন মডেলের গর্ভে তাঁর একটি সমত্মান জন্মগ্রহণ করেছে বলে মনে করা হয়।

তাঁর সেরা চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্লেমিং জুন (১৮৯৫), দ্য ফিশারম্যান অ্যান্ড দ্য সাইরেন (১৮৫৬-৫৮), দ্য ডিসকভারি অব জুলিয়েট অ্যাপরেন্টলি লাইফলেস (১৮৫৮), আফটার ডেসপার্স (১৮৭১), দ্য বাথ অব সাইকি (১৮৮৯-৯০), দ্য পেইন্টার্স হানিমুন (১৮৬৪)।

 

এডওয়ার্ড জন পয়েন্টার

শেকসপিয়রের ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডার বুদ্ধিদীপ্ত নায়িকা ক্রেসিডা স্যার এডওয়ার্ড জে পয়েন্টারেরও নায়িকা। ১৮৮৮ সালে সে শেকসপিয়রের একুশ নায়িকার প্রদর্শনীতে ঠাঁই পেয়েছিল।

এডওয়ার্ড জন পয়েন্টারের জন্ম ২০ মার্চ, ১৮৩৬ প্যারিসে। তাঁর বাবা স্থপতি অ্যামব্রোস পয়েন্টার ছেলের জন্মের পরপরই ব্রিটেনে ফিরে আসেন। তাঁর পড়াশোনা ব্রাইটন কলেজ ও ইপসউইচ স্কুলে – কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। শীতকালগুলো পর্তুগালের মেদিরা ও ইতালির রোমে অতিবাহিত করেন। বয়স তখন সতেরো বছর, রোমে দেখা পেলেন ফ্রেডেরিক লেইটনের। ছবি অাঁকাঅাঁকির সিদ্ধামত্ম নিয়ে লন্ডনে ফিরে এসে লেইস অ্যাকাডেমি এবং রয়াল অ্যাকাডেমির আর্ট স্কুলে পড়াশোনা শুরম্ন করলেন। তারপর প্যারিসে চিত্রশিল্পের দীর্ঘ পাঠ। ওলভারহাম্পটনের রেভারেন্ড ম্যাকডোনাল্ডের সুখ্যাত সুন্দরী কন্যা অ্যাগনেস ম্যাকডোনাল্ডকে বিয়ে করলেন। অ্যাগনেসের বোন এলিস নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী প্রথম ইংরেজ লেখক রম্নডিয়ার্ড কিপলিংয়ের মা। অপর বোন লুইসার ছেলে স্ট্যানলে বল্ডউইন তিনবার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আরেক বোন জর্জিয়ানার স্বামী চিত্রশিল্পী এডওয়ার্ড-বার্ন জোন্স।

তিনি ব্রিটেনের বেশ কয়েকটি গুরম্নত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং ১৮৯৬ সালে রয়াল অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট পদ অলংকৃত করেন। একই বছর নাইট খেতাবপ্রাপ্ত হন। এডওয়ার্ড পয়েন্টারের উলেস্নখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে ইজরায়েল ইন ইজিপ্ট (১৮৬৭), ওয়েস্টমিনস্টার লবিতে মোজাইক সেইন্ট জর্জ ফর ইংল্যান্ড (১৮৬৯), দ্য কুইন অব শেবা (১৮৭১-৭৫), কিং সলোমন (১৮৯০), অ্যান্ড্রোমিডা (১৮৬৯), দ্য সাইরেন (১৮৬৪), অ্যাট লো টাইড (১৮৬৪), দ্য কেইভ অব দ্য স্টর্ম নিম্ফেট (১৯০৩)।

 

স্যামুয়েল লিউক ফিল্ডস

মার্চেন্ট অব ভেনিসের শাইলক কন্যা জেসিকা বিনির্মিত হয়েছে স্যার স্যামুয়েল লিউক ফিল্ডসের ব্রাশ ও তেলরঙে।

স্যামুয়েল লিউক ফিল্ডসের জন্ম ৩ অক্টোবর ১৮৪৩, ইংল্যান্ডের লিভারপুলে। তাঁর পিতামহী ম্যারি ফিল্ডস ছিলেন বিপস্নবী রাজনৈতিক নেত্রী, নারী অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাঁর জন্য ছবি অাঁকতে গিয়ে স্যামুয়েল চিত্রশিল্পে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাঁর বয়স যখন চৌদ্দ ম্যারি ফিল্ডস নাতিকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন।

সতেরো বছর বয়সে ভর্তি হন ওয়ারিংটন আর্ট স্কুলে, সেখান থেকে সাউথ কেনসিংটন স্কুলে। ব্রিটেনের সোস্যাল রিয়েলিস্ট মুভমেন্টের বড় নেতা ফ্রেডরিক ওয়াকারের প্রভাবে কেনসিংটন স্কুলের হিউবার্ট হার্কোমার, ফ্রাঙ্ক হোল এবং স্যামুয়েল ফিল্ডসও রাজনীতি-সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। দরিদ্রদের পক্ষে অবিচারের বিরম্নদ্ধে তাঁরা ছবি অাঁকতে শুরু করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ভিজ্যুয়াল ইমেজ দ্রম্নত জনমত বদলে দিতে পারে।

দ্য গ্রাফিকসের শুরম্ন থেকেই অলংকরণের কাজ করে আসছিলেন। চার্লস ডিকেন্সের মৃত্যুর পরদিনের সংবাদের সঙ্গে স্যামুয়েল ফিল্ডসের অাঁকা ডিকেন্সের শূন্য চেয়ার গোটা পৃথিবীকে স্পর্শ করেছে, বহু দেশে ছবিটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। এ ছবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ এঁকেছেন দ্য ইয়েলো চেয়ার। ‘বাস্ত্তহারা দরিদ্র বিল’ যখন উত্থাপিত হয় সঙ্গে ছাপা হয় তাঁর হাউসলেস অ্যান্ড হাঙ্গরি। ছবিটি খ্যাতিমান শিল্পী জন এভারেট মিলাইসের নজরে পড়ে, তিনি ছবিটি চার্লস ডিকেন্সকে দেখান। ডিকেন্স সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উপন্যাস দ্য মিস্ট্রি অব এডউইন ড্রুডের অলংকরণের জন্য স্যামুয়েল ফিল্ডসকে নিয়োগ করেন। কিন্তু উপন্যাস শেষ হওয়ার আগেই ডিকেন্সের মৃত্যু হয়।

তাঁর ১৮৯১ সালের ছবি দ্য ডক্টর আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুমানের স্বাস্থ্যনীতির বিরম্নদ্ধে ব্যবহার করেছে। শেকসপিয়র স্যামুয়েল ফিল্ডসকে আকৃষ্ট করেছেন।

বড় ছেলে ফিলিপের যক্ষ্মাজনিত মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে দ্য ডক্টর ছবিটি তিনি এঁকেছিলেন। তাঁর অপর সমত্মান স্যার পল ফিল্ডার্স একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী। ১৯১৮ সালে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড তাঁকে ‘নাইটহুড’ প্রদান করেন।

তাঁর উলেস্নখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে : এ ভেনিশিয়ান ফ্লাওয়ার গার্ল (১৮৭৭), পোর্ট্রেট অব মিসেস আর্থার জেমস (১৮৯৫), এ ভিউ অব ভেনিস (১৮৭৬), সোফিয়া (১৮৭৫), এ জিপসি গার্ল (১৮৮৯)।

 

ফ্রান্সিস উইলিয়াম টপহ্যাম

১৮৮৮ সালের প্রদর্শনীতে শেকসপিয়রের মেজার ফর মেজার নাটক থেকে জটিল চরিত্র ইসাবেলাকে ক্যানভাসে তুলে এনেছেন ফ্রান্সিস উইলিয়াম টপহ্যাম।

ফ্রান্সিস টপহ্যামের জন্ম ১৫ এপ্রিল ১৮০৮, ইংল্যান্ডের লিডসে। শৈশবেই তিনি চাচার অধীনে খোদাইকারকের পেশায় কর্মজীবন শুরম্ন করেন। পরে এক প্রকাশকের ছাপাখানায় খোদাই ও ছাপমুদ্রণের কাজ করেন। আরো কিছুকাল পর উইলিয়াম হেনরি বার্টলেট এবং থোমাস অ্যালোমের ল্যান্ডস্কেপ অনুসরণে পেশাদার খোদাইশিল্পী হিসেবে ল্যান্ডস্কেপ করতে থাকেন। ১৮৫০ সালে চার্লস ডিকেন্সের কোম্পানিতে অভিনয়শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। পছন্দের ল্যান্ডস্কেপের সন্ধানে কিছু সময়ের জন্য স্পেন চলে যান। রয়াল অ্যাকাডেমির প্রদর্শনীতে তিনি তেলরঙের ছবি পাঠালেও তাঁর মূল আগ্রহ জলরঙে। তিনি নিউ সোসাইটি অব পেইন্টার্স ইন ওয়াটারকালারের সক্রিয় সদস্য হন।

তাঁর ছবির জগৎটি মূলত আইরিশ ও ওয়েলস কৃষকজীবন নিয়ে। ১৮৫০ সালে ডিকেন্সের বার্নাবি রম্নজ থেকে দৃশ্য তুলে এনে তাঁর ছবিতে বৈচিত্র্য আনার সূচনা করেন। তিনি রবার্ট বার্নসের পোয়েমস, থোমাস মুরের মেলোডিজ অ্যান্ড পোয়েমস, চার্লস ডিকেন্সের এ চাইল্ডস হিস্টরি অব ইংল্যান্ড গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেন।

তাঁর উলেস্নখযোগ্য চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে : ফরচুন টেলিং… আন্দালুশিয়ান অ্যান্ড স্প্যানিশ জিপসি (১৮৫৪), দ্য আন্দালুশিয়ান লেটার রাইটার (১৮৫৫), স্প্যানিশ গসিপ (১৮৫৯), দ্য অ্যাঞ্জেল হুইসপার্স (১৮৬৪), আইরিশ পেজেন্ট অ্যান্ড দ্য হলি ওয়েল (১৮৬৪), দ্য ফরমেশন অ্যাট ক্যাপ্রি (১৮৭০)। ১৮৩২ সালে সহকর্মী খোদাইশিল্পী হেনরি বেকউইথের বোন ম্যারি অ্যান বেকউইথকে বিয়ে করেন এবং দশটি সমত্মানের অধিকারী হন। তাঁর ছেলে ফ্রাঙ্ক উইলিয়াম ওয়ারউইক টপহ্যাম (১৮৩৮-১৯২৪) শিল্পী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।

 

ফ্রেডেরিক গুডাল

ফ্রেডেরিক গুডালের অাঁকা দ্য টেম্পেস্টের মিরান্ডা, পনেরো বছরের কিশোরী ১৮৮৮ সালে প্রদর্শিত হয়েছে।

ফ্রেডেরিক গুডালের জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর ১৮২২, লন্ডনে। তাঁর বাবা এডওয়ার্ড গুডালও নামকরা খোদাইশিল্পী ছিলেন। তাঁর বয়স যখন ষোলো বছর তাঁর অাঁকা চারটি জলরং রয়াল অ্যাকাডেমিতে প্রদর্শিত হয়। ১৮৩৮-৫৯-এর মধ্যে ফ্রেডেরিক রয়াল অ্যাকাডেমিতে সাতাশটি প্রদর্শনীতে অংশ নেন। নিজের অাঁকা ছবিকে নির্ভুল ও বস্ত্তনিষ্ঠ করার জন্য তিনি মিশরে গিয়ে বেদুইনদের সঙ্গে ক্যাম্প করে থেকেছেন। মিশর থেকে ব্রিটেনে মেষ ও ছাগল নিয়ে এসেছেন। মিশরীয় থিমের ওপর তাঁর ১৭০টি ছবি ছেচলিস্নশ বছরেরও বেশি সময় রয়াল অ্যাকাডেমির গ্যালারিতে সাজানো ছিল।

ফ্রেডেরিক গুডাল শিল্পী হিসেবে জীবদ্দশায় যথেষ্ট সমাদৃত হন, তাঁর ছবি বহুমূল্যে বিক্রি হয়। তিনি গ্রিমস ডাইকে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেন। সেখানে প্রিন্স অব ওয়েলসের (পরে সপ্তম এডওয়ার্ড) মতো অতিথিদের আপ্যায়ন করেন।

তাঁর ভাই এডওয়ার্ড অ্যাঞ্জেলো গুডাল এবং ওয়াল্টার গুডালও নামকরা শিল্পী ছিলেন। তাঁর সমত্মানদের মধ্যে ফ্রেডেরিক ট্রেভলিন, হাওয়ার্ড ও হার্বার্টও শিল্পী হিসেবে দক্ষতার ছাপ রেখেছেন।

ফ্রেডেরিক গুডালের উলেস্নখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে : দ্য টায়ার্ড সোলজার্স রেস্টিং অ্যাট এ রোড সাইড ওয়াল (১৮৪২), দ্য ভিলেজ হলিডে (১৮৪৭), দ্য পস্নাউম্যান অ্যান্ড দ্য শেফার্ডেস : টাইম অব দ্য ইভনিং প্রেয়ার (১৮৯৭), পাম অফারিং (১৮৬৬), এ ব্রিটানি ওয়েডিং (১৮৪০-৪৪), অন দ্য ফ্রিজ অব দ্য ডেজার্ট (১৮৮৪), ফাইন্ডিং অব দ্য মোজেস।

 

ভ্যালেন্টাইন ক্যামেরন প্রিনসেপ

১৮৮৮ সালে প্রদর্শনীর জন্য ভ্যাল প্রিনসেপ (এ নামেই বেশি পরিচিত) এঁকেছিলেন মেজার ফর মেজারের মারিয়ানাকে।

ভ্যাল প্রিনসেপের জন্ম কলকাতায় ১৪ ফেব্রম্নয়ারি ১৮৩৮। তাঁর বাবা হেনরি প্রিনসেপ ষোলো বছর কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার সদস্য ছিলেন। তাঁর মা সারাহ মন্কটনের এক বোন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার জুলিয়া মার্গারেট ক্যামেরন এবং অন্য বোন মারিয়া জ্যাকসন সাহিত্যিক ভার্জিনিয়া ওলফ ও ভেনেসা বেলের পিতামহী।

সচ্ছল পরিবারের সমত্মান, সেইসঙ্গে পিতার আগ্রহ তাঁকে চিত্রশিল্পের প্রধান তীর্থগুলোতে অবস্থান এবং অধ্যয়নের সুযোগ করে দিয়েছে। প্যারিসে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন হুইসলার, পয়েন্টার এবং দুফেন দু মরিয়ার। দুফেনের উপন্যাস ট্রিলবির ট্যাফি চরিত্রটি তাঁরই। তারপর এলেন ইতালি। রবার্ট ব্রাউনিংয়ের সঙ্গে সখ্য স্থাপিত হয়, দুজন রোম ঘুরে বেড়ান। তাঁর বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন জন এভারেট মিলাইস এবং এডওয়ার্ড বার্ন জোন্স। বন্ধুদের নিয়ে রসেটির সঙ্গে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন হল সজ্জার কাজ করেন। তাঁর প্রথম ছবি বিয়াঙ্কা কাপেলা ১৮৬২ সালে যখন রয়াল অ্যাকাডেমি অব আর্টসের প্রদর্শনীতে এলো, তিনি সবার দৃষ্টি কেড়ে নিলেন। তারপর প্রতিবছরই তিনি প্রদর্শনী করেছেন।

১৮৭৭ সালে তিনি ভারতে গিয়ে দিলিস্নর দরবারের বিশাল একটি ছবি অাঁকেন। ভারত সরকার তা রানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দেয়। ছবিটি বাকিংহাম প্রাসাদের দেয়ালে ঝুলছে।

প্রিনসেপ দুটি নাটক লিখেছেন, কাজিন ডিক ও মঁশিয়ে লে ডাক; দুটোই লন্ডনের থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছে। তাঁর দুটো উপন্যাসও রয়েছে। তাঁর আরেকটি স্মরণীয় গ্রন্থ ইম্পেরিয়াল ইন্ডিয়া : অ্যান আর্টিস্টস জার্নাল (১৮৭৯)।

১১ নভেম্বর ১৯০৪, তিনি লন্ডনে হল্যান্ড পার্কে মৃত্যুবরণ করেন। ভ্যাল প্রিনসেপের উলেস্নখযোগ্য চিত্রকর্মের মধ্যে রয়েছে :  মিরিয়াম ওয়াচিং দ্য ইনফ্যান্ট মোজেস (১৮৬৭), এ ভেনিশিয়ান লাভার (১৮৬৮), নিউজ ফ্রম অ্যাব্রড (১৮৭১), দ্য লিনেন গ্যাদারার্স (১৮৭৬), মাই লেডি বেটি (১৮৬৪), দ্য কুইন ওয়াজ ইন দ্য পার্লার (১৮৬০)।

 

জন সার্জেন্ট সিঙ্গার

 

গ্রাফিক সাপ্তাহিকীর ১৮৮৮ প্রদর্শনীতে জন সার্জেন্ট সিঙ্গার ছিলেন না, কিন্তু ঠিক এক বছরের মধ্যে তিনি অাঁকলেন এলেন টেরি অ্যাজ লেডি ম্যাকবেথ (১৮৮৯), তিনি শেকসপিয়রের একটি উলেস্নখযোগ্য চরিত্র; উচ্চাকাঙক্ষা ও অপকর্মের মিশেলে তৈরি, যার নিষ্ঠুরতায় স্বামীকে বলতে হয় : ‘তুমি আর যা-ই করো না করো কোনো নারী সমত্মানের জন্ম দিয়ো না। তোমার যে নিঃশঙ্ক তেজ তাতে তোমার পুত্র সমত্মান ভিন্ন অন্য কিছু সৃষ্টি হওয়া উচিত নয় (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অনুবাদ)।

জন সার্জেন্ট সিঙ্গার আমেরিকান চিত্রশিল্পী। তাঁর জন্ম ইতালিতে, ১১ জানুয়ারি ১৮৫৬। বাবা ফিটজ উইলিয়াম সার্জেন্ট চক্ষুচিকিৎসক হলেও মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ ব্যয় করে একটি আমত্মর্জাতিক যাযাবর জীবনযাপন করেন। প্যারিসকে আবাসনের কেন্দ্রে রেখে পরিবারটি ঘুরে বেড়ায় জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ডে। প্রকৃতির নিবিড় পর্যবেক্ষণকারী সার্জেন্ট শৈশবেই তাঁর দেখা এবং ভালোলাগা প্রায় সবকিছুই হুবহু স্কেচ করতে অভ্যসত্ম হয়ে উঠেছিলেন। মায়ের নার্ভাস ব্রেকডাউনজনিত সমস্যা থাকলেও একজন শৌখিন চিত্রশিল্পী হিসেবে ছেলের সামনে শিল্পজগতের অমিত সম্ভাবনা তুলে ধরতে পেরেছেন।

সার্জেন্ট তেরো বছর বয়সে জলরঙে কাজ করার শিক্ষা নেন জার্মান ল্যান্ডস্কেপ শিল্পী কার্ল ওয়েলসের কাছে। প্রথাগত শিক্ষার তোয়াক্কা না করে তিনি বেড়ে ওঠেন চিত্রশিল্পসংগীত ও সাহিত্যে সমৃদ্ধ এক কসমোপলিটান তরম্নণ হিসেবে। মাতৃভাষা ইংরেজিতে তো বটেই, ফরাসি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা অর্জন করেন। ওল্ড মাস্টার্সদের শিল্পকর্ম মুগ্ধ হয়ে দেখেন, মাইকেলেঞ্জেলো এবং টিশিয়ানের পরই যে শিল্পী টিনতরেত্তোর নাম উচ্চারিত হওয়া উচিত, তা ভেনিসে গিয়ে সরেজমিনে দেখে আসেন।

একথাও সত্য, ফ্লোরেন্স অ্যাকাডেমিতে ছবি অাঁকার শিক্ষা নিতে গিয়েও তা করা হয়নি, তিনি প্যারিসে এসে তরম্নণ পোর্ট্রেট শিল্পী ক্যারোলাস ডুরানের কাছে পোর্ট্রেট অাঁকার শিক্ষা নেন। প্রথম দিকে তাঁর আগ্রহ ছিল ল্যান্ডস্কেপে। এক শিল্পীজীবনে সার্জেন্ট প্রায় নয়শো তেলরং ও দুই হাজার জলরঙের ছবি এবং বিপুলসংখ্যক চারকোল ড্রইং এবং স্কেচ করেন। জীবদ্দশায় ছবি যাঁদের বিত্তবান করেছে জন সার্জেন্ট সিঙ্গার তাঁদের অন্যতম। পৃথিবীর বিখ্যাত গ্যালারিগুলোতে সার্জেন্টের অাঁকা ছবিগুলো এখন দুর্লভ সংগ্রহ বলে মনে করা হচ্ছে।

সার্জেন্টের উলেস্নখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে : আর এল স্টিভেনসনের তিনটি পোর্ট্রেট, এ ডিনার টেবিল অ্যাট নাইট (১৮৮৪), কারনেশন লিলি লিলি রোজ (১৮৮৫-৮৬), এলেন টেরি অ্যাজ লেডি ম্যাকবেথ (১৮৮৯), বেদুইনস (১৯০৫-০৬), লেডি উইথ দ্য রোজ (১৮৮২), ক্লদ মান পেইন্টিং বাই দ্য অ্যাজ অব এ উড (১৮৮৫), ইজিপশিয়ান গার্ল (১৮৯১), দ্য চেজ গেম (১৯০৬)।

সার্জেন্ট বিয়ে করেননি। ১৪ এপ্রিল ১৯২৫, তিনি ইংল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রম্নকউড সিমেট্রিতে সমাহিত হন।

জন এভারেট মিলাইস

১৮৫২ সালে রয়াল অ্যাকাডেমির প্রদর্শনীতে জন এভারেট মিলাইসের ওফেলিয়া নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। ছবিতে ওফেলিয়া মৃত অবস্থায় ভাসমান। নাটকে হ্যামলেটের মা গার্ট্রুডের বর্ণনা অনুসরণ করে ছবিটি অাঁকা। সমালোচকরা বলেছেন, শিল্পীর ছবি অাঁকার হাত ভালো হলেও তাঁর অনভিজ্ঞতা ও অপরিপক্ব তারম্নণ্যের উচ্ছ্বাসের কাছে ছবির বিষয় অঙ্কিত ছবি মার খেয়ে গেছে। তিনি ভায়োলেট, পেনসি, ডেইজি ফ্রিটিলারি পপি, লুজস্ট্রাইফ, ফরগেট-মি-নট, নেটল, উইলো – এতসব ফুলের সমারোহ ঘটিয়েছেন কোন ফুল বেদনার, কোন ফুল ভালোবাসার প্রতীক তা না জেনেই। ওফেলিয়াকে অাঁকার জন্য যে নিসর্গ তিনি বেছে নেন, সেখানে অনধিকার প্রবেশের কারণে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে হাজিরার হুমকি দেওয়া হয় তাঁকে। তাঁর অাঁকা এই ছবিটি একজন আর্ট ডিলার তিনশো গিনিতে কিনে নেন, ১৮৬২ সালে ডিলার তা বিক্রি করেন সাতশো আটচলিস্নশ গিনিতে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওফেলিয়া এখন ডাকে উঠলে পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার পর্যমত্ম দাম উঠতে পারে।

জন এভারেট মিলাইসের জন্ম ৮ জুন ১৮২৯, ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে। মা এমিলি ম্যারি তাঁকে শিল্প ও সংস্কৃতির দিকে উৎসাহিত করেন। শৈশবেই রং-তুলিতে তাঁর শক্তি ও দক্ষতা এতটাই প্রকাশিত হয়ে ওঠে যে, তিনি চিত্রশিল্পের চাইল্ড প্রডিজি হিসেবে বিবেচিত হতে শুরম্ন করেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে রয়াল অ্যাকাডেমি স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন। ১৮৫০ সালে অাঁকা তাঁর তেলচিত্র ক্রাইস্ট ইন দ্য হাউস অব হিজ প্যারেন্টস তাঁর ধর্মজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেয় এবং তাঁকে বিতর্কিত করে তোলে।

রয়াল অ্যাকাডেমি স্কুলে পরিচিত হন উইলিয়াম হোলম্যান হান্ট এবং দামেত্ম গ্যাব্রিয়েল রসেটির সঙ্গে, তাঁদের নিয়ে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে গাওয়ার স্ট্রিটে নিজ বাড়িতে শুরম্ন করেন প্রি-র‌্যাফেলাইট ব্রাদারহুড শিল্প আন্দোলন।

তাঁর এককালীন সুহৃদ ও সহায়তাকারী জন রাস্কিনের স্ত্রী এফির সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জন রাস্কিন স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর দুজন বিয়ে করেন এবং আট সমত্মানের জন্ম দেন। এফির ছোট বোন সোফিকে তিনি মডেল হিসেবে ব্যবহার করেন এবং তার সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

জন এভারেট মিলাইস যখন বলছেন তিনি তাঁর স্টাইল নিয়ে সন্তুষ্ট এবং ছবিতে আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী তখন জন রাস্কিন বলেন, মিলাইস ধ্বংস হয়ে গেছেন। বড় পরিবার লালন-পালনের জন্য যখন অাঁকা ছবির সংখ্যা বাড়াতে থাকলেন উইলিয়াম মরিস বললেন, সসত্মা জনপ্রিয়তা পেতে এবং টাকার লোভে মিলাইস নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন।

১৮৯৬ সালে তিনি রয়াল অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে বছরই গলার ক্যান্সারে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন কমিটিতে সভাপতিত্ব করেছেন প্রিন্স অব ওয়েলস, পরবর্তী সময়ের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড। জন এভারেট মিলাইসের উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে ডটার্স অব শিলো (১৮৪৭), ইসাবেলা (১৮৪৯), ক্রাইস্ট ইন দ্য হাউস অব হিজ প্যারেন্টস (১৮৫০), দ্য প্রোসক্রাইবড রয়ালিস্ট (১৮৫১), দ্য ব্লাইন্ড গার্ল (১৮৫৬), এসথার (১৮৫৭), দ্য টু প্রিন্সেস এডওয়ার্ড অ্যান্ড রিচার্ড ইন দ্য টাওয়ার (১৮৭৮), চেরি রাইপ (১৮৭৯), দ্য ফার্মার্স ডটার (১৮৬৩)। n

Leave a Reply

*