logo

মুখোমুখি : কে জি সুব্রহ্মণ্যন্

সু শী ল  সা হা

 

প্রশ্ন : আপনার শামিত্মনিকেতন পর্ব দিয়েই শুরম্ন করা যাক। ১৯৪৪ সালে যে আপনি শামিত্মনিকেতনে এলেন সে কি দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর অনুপ্রেরণায়? আপনার কী মনে হয়?

উত্তর : দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার যে আলাপ-পরিচয় তার সঙ্গে আমার শামিত্মনিকেতনে যাওয়ার কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ নেই। তবে এই আলাপ-পরিচয়ের দৌলতে শিল্পের প্রতি আমার যে বরাবরের আগ্রহ সে বিষয়টায় বেশ গুরম্নত্ব দিয়ে শুরু করেছিলাম, সে কথা নিশ্চিত। তার চেয়েও বড় কথা হলো, আমার পরিবারের মানুষজনকে এ-কথা বোঝাতেও পেরেছিলাম যে, শিল্পকলাকেই যদি আমার চর্চার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করি তবে সেটা একটা বিকল্প পেশা হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু ১৯৪২ সালে দেবীপ্রসাদ যখন প্রথম আমার অাঁকা দেখেন এবং বেশ উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া জানান তখন আমি ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে এমনভাবে জড়িয়ে গেছি যে, তাঁর মমত্মব্যে সত্যিই বিশেষ মনোযোগী হতে পারিনি।

তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর শিক্ষা-সংক্রামত্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে বহু বছর যাবৎ আমার আগ্রহ। মাহেতে (ভারতের পশ্চিম উপকূলের একটি ফরাসি উপনিবেশ) স্কুলে পড়ার সময়েই এর শুরু। স্কুলের পড়া যখন সাঙ্গ হলো (১৩৩৯ সালে) তার মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং গল্প যেগুলো ইংরেজিতে পাওয়া যায় তার অনেকটাই পড়ে ফেলেছি। আর মডার্ন রিভিউয়ের মতো সাময়িকপত্র থেকে তাঁর কাজ এবং নানা প্রসঙ্গে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এসব অনেক কিছুই জানা হয়ে গেছে। মনে মনে অমন একজন লেখক হওয়ার গোপন অভিলাষ তখন থেকেই লালন করতে শুরু করেছি।

এরই পাশাপাশি ওখানকার (মাহের) পাবলিক লাইব্রেরি – ওখানে নিয়মিত একটা শিল্পকলা বিভাগ চালু ছিল – সেখানে কিছু ফরাসি জার্নালের সঙ্গে পরিচয় হলো। ফলে বিশ্বের শিল্পকলা দৃশ্যপট সম্পর্কে আমার জ্ঞানগম্যি বেশ বেড়ে গেল। এতে প্রতিষ্ঠিত শিল্পকলাকেন্দ্রগুলোর নানা কর্মসূচি বেশ সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখার ক্ষমতা জন্মাল আর সেইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মনে এ বিষয়ে যেসব উদ্ভাবনী ভাবনা ছিল তাদের সেলাম না জানিয়ে পারলাম না।

অতএব, দেবীপ্রসাদের প্রতিক্রিয়া যদিও আমার মাথা ঘুরে যাওয়ার মতোই ছিল, তবু তাঁর স্কুলে ভর্তি হওয়ার কোনো প্রবল আকাঙক্ষা আমার ছিল না। ১৯৪৩ সালে, ছমাস জেল খাটার পর, যখন আমি বাইরে এলাম তখন সরকারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে আমার ওপর তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ। কাজেই তখন আমার সামনে এ সুযোগ আর ছিল না।

 

প্রশ্ন : ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চলে গেলেন। তার প্রায় তিন বছর পর আপনি শামিত্মনিকেতনে এলেন। সে সময় রবীন্দ্রনাথ যদিও সেখানে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত তবু কার্যত সর্বত্র তাঁর প্রবল উপস্থিতি – এই পরিবেশ আপনার কেমন লেগেছিল?

উত্তর : আমি যদিও রবীন্দ্রনাথের কাজ এবং আদর্শে অত্যমত্ম প্রভাবিত হয়েছিলাম; কিন্তু অন্যেরা যেমন তাঁর প্রয়াণে অত্যমত্ম ভাবমেদুর ছিলেন আমার ঠিক তেমনটা হয়নি। আসলে তাঁর এই অনন্যসাধারণ প্রতিভা, এখানে যেমন মুখে মুখে অত্যমত্ম চর্চিত, তার খবর বাংলা থেকে কেরলে তেমনভাবে পৌঁছেনি। বস্ত্তত আমাদের প্রজন্মের অনেক অবাঙালি তরুণের কাছে তিনি অনেকটা ফুলবাবুগোছের কিংবা নিজের গুণ জাহির করে বেড়ানো একজন মানুষ। আমি নিশ্চিত, তাঁর সঙ্গে একবার আমার মুখোমুখি দেখা হলেই অন্য অনেকের মতো আমারও সমসত্ম সংশয় উধাও হয়ে যেত। সে যাই হোক, তাঁর অনুপস্থিতিতে আমি মোটেই বিহবল হয়ে পড়িনি, কেননা তখনো পর্যমত্ম চারদিকে – আশ্রমের নানা কাজকর্মে তাঁর প্রত্যক্ষ প্রভাব অনুভব করা যেত – সেখানকার শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা, সামাজিকতার ধারণা, অসাধারণ সৌন্দর্যবোধ এবং তাঁরই আদর্শে তন্বিষ্ঠ হয়ে কাজ করে যাওয়া – সবই তাঁর বেশ কয়েকজন সহকারীর মধ্যে তখনো সমান তাজা ছিল।

তাঁদের বেশিরভাগকেই আজ আর ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখতে পাই না।

 

প্রশ্ন : ১৯৪৭-৪৮ সালে শামিত্মনিকেতনের হিন্দি ভবনে ‘মধ্যযুগের সমত্ম’ – এ বিষয়ে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় একটি ম্যুরাল করেছিলেন। এই কাজে তাঁর সহকারী হিসেবে আপনার কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাদের একটু বলবেন?

উত্তর : হিন্দি ভবনের তিন নম্বর দেয়ালের ম্যুরালে বিনোদবাবুর সহকারী হিসেবে প্রায় পুরো কাজেই তাঁর সঙ্গে ছিলাম। শুরুর সময়টায় যখন আমি ছিলাম না তখনো কিন্তু কাজটা আমি সারাক্ষণ নজর করে দেখেছি। প্রথম পর্বে বিনোদবাবুর সহকারী ছিলেন তাঁর স্ত্রী লীলা আর আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জিতেন্দ্র কুমার। ওঁরাই তাঁকে তখন সাহায্য করতেন। মধ্যবর্তী পর্বে দেওকীনন্দন শর্মা (যাদবপুর স্কুল অব আর্টের শৈলেন্দ্রনাথ দের একজন ছাত্র) সাহায্য করতে এলেন; অল্প কয়েকদিনের ছুটি কাটানোর মেজাজে দেওকী শামিত্মনিকেতনে এসেছিলেন। পরে আমি জানতে পারি, বিনোদবাবু যে আগে আমাকে ডাকেননি তার কারণ হলো, আমার তো নানা বিষয়ে আগ্রহ, তাই ওনার মনে হয়েছিল নিছক টেকনিক্যাল সহকারী হিসেবে কাজ করার প্রসত্মাব আমি ফিরিয়েও দিতে পারি। তাঁর চিত্রকরে অল্প পরিসরে তাঁর এই মানসিক বাধার কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যমত্ম নন্দবাবু যখন এমন একজনকে পাঠানোর কথা বললেন যিনি এলে বিনোদবাবুর মতে কাজের চেয়েও বাধা পড়বে বেশি, তখনই তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন।

কোনো একটা লেখায় এ অভিজ্ঞতার কথা আমি লিখেছি। শামিত্মনিকেতনে তিন বছরে যা শেখা হয়েছিল এই কমাসে তার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি। চোখের সামনে দেখেছি কেমন করে ভাবনা থেকে চিত্ররূপ আসে – বিকশিত হয় – প্রতিটি পরিস্থিতিতে যে যে সমস্যা বা প্রশ্ন সময়ে সময়ে আসত কেমন করে তাঁর মতো একজন শিল্পী তাদের মুখোমুখি হতেন – এসব দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর আস্থা যখন অর্জন করতে পারলুম, তিনি বুঝলেন যে, তিনি কী চাইছেন সেটা আমি বুঝতে পারছি তখনই আমাকে সামান্য একটু অংশ একলা করার অনুমতি দিলেন। অনেক কিছু শিখলাম আমি – শিল্পের ভাষা, তার মেজাজ, কার সঙ্গে কোনটা মানানসই, কোনটা নয় – এমনকি প্রামিত্মক বিকিরণের গুণাগুণ – তাও শিখলাম। ওনার মতো একজন মানুষ – দৃষ্টির এহেন যাঁর প্রতিবন্ধকতা – তিনি কেমন করে নিজের জন্য একটা ঠিকঠাক কাজের প্রক্রিয়া তৈরি করে নিয়েছিলেন – সেটাই দেখার মতো।

 

প্রশ্ন : ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কথা সর্বজনবিদিত। কেমন করে সেই সম্পর্কের সূত্রপাত এবং শিল্পী রামকিঙ্করের কাজ সম্পর্কে আপনার কী ধারণা সে ব্যাপারে একটু আলোকপাত করবেন?

উত্তর : কিঙ্করদা আর বিনোদদার সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগের সূত্রপাত হলো এইভাবে :

ক. নন্দবাবু একদিন আবিষ্কার করলেন যে, মাহে এবং মাদ্রাজে, এখানে আসার আগেই, বিদেশি জার্নাল এবং বইপত্তর ঘেঁটেঘুটে দেখে নেওয়ার জন্য আধুনিক ইয়োরোপীয় চিত্রকলার দিকে অন্যদের চেয়েও আমার যেন একটু বেশি ঝোঁক। আমার আগেকার যেসব কাজ সঙ্গে এনেছিলাম তাতে কিছু বেশি স্বাধীনতা নিয়েছিলাম, সেটাই হয়তো তাঁর চোখে পড়েছিল। একদিন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, পোশাকে-আশাকে যদিও আমি ভারতীয়; কিন্তু আমার ভাবনাচিমত্মার ধরন বিদেশিদের মতো। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তাঁর কথার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আমাকে বললেন, বিনোদদা আর কিঙ্করদার পরামর্শ হয়তো আমার উপকারে আসবে।

অতএব, এই দুজন শিল্পগুরুর কাছে যাওয়ার সরকারি ছাড়পত্র পেয়ে গেলাম।

খ. অবশ্য তার আগেই আমার কয়েকজন বন্ধু যারা ওঁদের বাড়িতে প্রায়ই যাতায়াত করত তাদের সঙ্গে আমিও ভিড়ে গিয়েছিলাম। ওদের একজন হলো মুথুস্বামী (অসাধারণ ছবি-তুলিয়ে – সিনেমাটোগ্রাফিতে তখনই ওর প্রশিক্ষণ ছিল) – সে মাঝেমধ্যেই ওনাদের কাজ লেন্সবন্দি করার জন্য ওঁদের বাড়ি যেত – বলাই বাহুল্য সঙ্গে আমিও যেতাম। মুথুস্বামীর সাহিত্যেও গভীর আগ্রহ ছিল। আরেকজন জিতেন্দ্র কুমার, দিলিস্নর ছেলে (ও আমার আজীবনের বন্ধু হয়ে গেল) – সে ওর নিজের শহরে বিনোদদা আর কিঙ্করদার শিল্পকলা প্রদর্শনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। ঘটনাচক্রে ওর কাকাকে সঙ্গে পেয়ে গেল – দিলিস্নতে একটা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হলো। ও নিজেই আমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে বলল। এভাবে মেলামেশা করতে করতে শিল্পী দুজনের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে গেল। সেইসঙ্গে ওনাদের কাজের বেশিরভাগই আমার দেখা হয়ে গেল।

গ. এছাড়া শিল্প ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশের নতুন নতুন খবরাখবর আমি সারাক্ষণ পড়তাম। সে সুবাদে ওনাদের বাড়িতে যাতায়াত বাড়ল। প্রায়ই উভয়পক্ষের পারস্পরিক আগ্রহেই এ-সংক্রামত্ম নানা লেখা, যা আমি পেতাম, ওনাদের পড়ে শোনাতাম।

ঘ. কিঙ্করদা বিকেলবেলা যখন অাঁকতে বেরোতেন, তখন প্রায়ই ওনার সঙ্গী হতাম। অবশ্য আমি কিছুই করতাম না, দেখতাম উনি অাঁকছেন, শুনতাম উনি যা যা বলছেন। তাতেও শেখা হতো অনেক কিছু।

রামকিঙ্কর হয়তো একেবারে ছোট্ট একটা গ্রাম্য পরিবার থেকে এসেছিলেন; কিন্তু এখানে শামিত্মনিকেতনে এসে গোটা দুনিয়ার উত্তরাধিকার তিনি হাতের মুঠোয় পেয়েছিলেন। তারই সিংহদরোজা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এতেই বিরাট একটা ফারাক হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ সমসত্ম পৃথিবীকে আপনার করে চেয়েছিলেন বটে; কিন্তু নিজস্ব শর্তে সেই চাওয়াকে বেঁধেছিলেন। বাইরের যা কিছু তিনি গ্রহণ করেছিলেন সবই তাঁর আপনার অভিজ্ঞতার নির্যাসে ভিজিয়ে নিজের একামত্ম করে নিয়েছিলেন। রামকিঙ্করও ঠিক তেমনটিই করেছিলেন। বেশিরভাগ ভারতীয় শিল্পী যাঁরা বিশ্ব শিল্পকলার চর্চা করতেন বা কোনো না কোনোভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, তাঁদের বেশিরভাগই শিল্প আঙ্গিকের বহিরঙ্গে কিংবা অদ্ভুত সব শৈলীর বিচিত্রতায় একেবারে মগ্ন ছিলেন। কিন্তু রামকিঙ্কর প্রথমে বিশ্বের আলোয় নিজের চারপাশের জগৎকে নতুন করে পড়তেন – ব্যাখ্যা করতেন – তারপর কাজে মন দিতেন। তাঁর তথাকথিত আধুনিক বা বিমূর্ত শিল্পসৃষ্টি – তাদের প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় সৃষ্ট। তাই তারা একেবারে মৌলিক বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর।

 

প্রশ্ন : আপনার সমসাময়িক শিল্পীরা যেমন সত্যজিৎ রায়, দিনকর কৌশিক তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রভূত যশ অর্জন করেছিলেন। তাঁদের সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত অভিমত কী?

উত্তর : সত্যজিৎ রায় আর দিনকর কৌশিক – এঁরা দুজনেই আমার সমসাময়িক – তবে একটু উঁচু ক্লাসে পড়তেন। কিন্তু আমি শামিত্মনিকেতনে পৌঁছবার আগেই সত্যজিৎ সেখানে থেকে চলে গিয়েছিলেন। তবে দিনকর তখনো ছিলেন। বোলপুর রেলস্টেশনে মাঝেমধ্যে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে – এই মাত্র তাঁর সঙ্গে আমার জানাশোনা। ওনাকে সরাসরি জানার কোনো সুযোগ আমি পাইনি। কিন্তু ওনার যে নিজস্ব কাজের জগৎ – গ্রাফিক নকশা আর চলচ্চিত্র – সেখানে তাঁর সাফল্যের সমসত্ম খবরাখবরই আমি রাখতাম। তাঁর সময়কালের গ্রাফিক নকশার দৃশ্যপটে তাঁর গ্রাফিক আর টাইপোগ্রাফির বেশ কিছু প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু তাঁর ফিল্ম – বেশ কিছুসংখ্যক ফিল্ম – সেগুলো একেবারে মাস্টারপিস – সারা দুনিয়ায় তাদের সমাদর। আর তার যোগ্যও তারা। ওনার জীবনীকার অ্যান্ড্রু রবিনসনের কাছে জানলাম যে, আমি যেমন তাঁর কাজ সম্পর্কে জানি উনিও তেমনি আমার কাজের বেশ ভালোই খবরাখবর রাখেন। এমন কেউ কেউ নিশ্চয়ই ছিলেন যাঁরা আমাদের দুজনেরই বন্ধু কিংবা চেনাজানা মানুষ – তাঁরাই হয়তো এ বিষয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন।

দিনকর কৌশিক আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন – আমার শুভাকাঙক্ষীও বটে। নানা সময় নানা কাজে ওঁর সাহায্য পেয়েছি। যখন তিনি দিলিস্নতে ছিলেন তখন দিলিস্নর শিল্পীচক্রকে দিয়ে দিলিস্নতে আমার প্রথম প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন (১৯৫৪ সালে)। লখনৌর রবীন্দ্রালয়ে আমাকে একটা বড় টেরাকোটার কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন (১৯৬৩ সালে)। আবার যখন কলাভবনের অধ্যক্ষ হয়ে শামিত্মনিকেতনে ফিরে এলেন তখন এখানে অনেক অদলবদল ঘটালেন আর আমাকে ডেকে নিলেন। শেষ পর্যমত্ম (১৯৮০ সালে) আমাকে চিরদিনের মতো এখানে টেনে আনলেন। তিনি ছিলেন স্থপতি – প্রতিষ্ঠানকে রূপ দিয়েছিলেন (শামিত্মনিকেতনের শিক্ষাগুররুদের মনে আশ্রমের রূপটি যেমন ছিল তাকেই তিনি অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিলেন)। তাই তাঁর নিজের যে কাজ, শিল্পকলার চর্চা সে কাজের জন্য এতটুকু সময় পেতেন না তিনি। সে কারণে সত্যজিৎ যেমন ফিল্মের জগতে কিংবদমিত্ম হয়ে উঠেছিলেন, দিনকর শিল্পকলার জগতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে কলাভবন নতুন শক্তি পেয়েছিল – নতুন উদ্দেশ্যের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়েছিল।

 

প্রশ্ন : শামিত্মনিকেতন এবং সেস্নড স্কুল অব আর্ট – দুটি প্রতিষ্ঠানেই যেহেতু আপনি নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাই আপনার কাছে জানতে চাই যে দুটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষণ-পদ্ধতির মধ্যে কী পার্থক্য ছিল?

উত্তর : সিগাল থেকে আমার একটা বই বেরিয়েছিল – Sketches, Scribbles and Drawings – তারই ভূমিকায় সেস্নড স্কুল অব আর্ট (পাঁচের দশকের প্রথম দিকে) সম্পর্কে আমার ধারণা কেমন সে কথা লিখেছিলাম। ওখানকার পরিবেশ খোলামেলা, কাজের স্টুডিও অপ্রতুল, ওখানে কাজ করবে কেউ যদি মনস্থ করে তবে সবার আগে সকাল-সকাল ঢুকে পড়তে হবে। ড্রইংয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত চাপ। হয়তো সেজন্যই পেইন্টিংয়ের ক্ষেত্রে যতটুকু স্বাধীনতা দরকার তাতেও বাধা। অনবরত আমন্ত্রিত শিক্ষকরা আসেন – বন্যার স্রোতের মতো। প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি। চারদিক থেকে আসা তাঁদের এই নানাবিধ অভিঘাত থেকে বাঁচতে হলে প্রত্যেকটি ছাত্রের স্বকীয়তার একটা জোরদার অনুভব থাকতেই হবে। আমি তো ছিলাম রিসার্চ স্কলার – ধরাছোঁয়ার বাইরে। বেশ মজা করেই নিজের রোজকার কাজকর্ম সেরে ফেলতাম। তারপর বরিষ্ঠ শিল্পীদের সঙ্গে আলাপ-সালাপ চলত – শেরি রিচার্ড, ভিক্টর রোজমুর প্রমুখ ছিলেন। গ্রাফিক স্টুডিওতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতাম।

শামিত্মনিকেতনের ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা অত্যমত্ম আনন্দদায়ক। খুব স্বাধীন ছিলাম। কেননা সবটাই আমাদের উৎসাহ-উদ্যোগের ভরসাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষকরা ছিলেন অনুঘটকের মতো – কোন রাসত্মা বেছে নেব সে ব্যাপারে একটু পরামর্শ দিলেন কি উৎসাহিত করলেন – কোনো শিল্পসৃষ্টি চোখে দেখে যা ভাবছি বা তার উপস্থাপনার গূঢ় ব্যঞ্জনা এসব অনুধাবনে একটু ভরসার হাত বাড়ালেন – এ পর্যমত্ম। কোনো বাঁধাধরা পাঠ্যসূচি তো ছিল না। শুধু মাঝেমধ্যে একেবারে চক্রাকার পরিক্রমণে শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের মুখোমুখি আলাপচারিতার ব্যবস্থা ছিল। নন্দলাল, বিনোদবিহারী, রামকিঙ্কর এঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এলে মনে মনে উত্তেজিত হয়ে পড়তাম – এত মগ্ন শিল্পী এঁরা প্রত্যেকেই -এমন উদ্দীপনা জাগানো অমত্মর্দৃষ্টি এঁদের। বাকিদের সঙ্গে আলাপের সময়টায় তেমন কিছু সুবিধে হতো না। যদিও নন্দলালের ভাবনায় গড়া কাঠামোর মধ্যেই তাঁরা কাজ করতেন, তবু নিজেদের ছড়িয়ে দেওয়ার মতো জ্ঞানের প্রাচুর্য তাঁদের ছিল না কিংবা ওপরের দুজনের মতো কোনো নির্দিষ্ট শিল্পের নতুন নতুন ব্যাখ্যাও তাঁরা দিতে পারতেন না। প্রতিষ্ঠানটি আকারে-আয়তনে তখন বেশ ছোটই ছিল। তাই ছাত্রদের উদ্যোগেই অনেক কাজ করে নেওয়া যেত। একটু জানে-বোঝে এমন ছাত্র এই পরিবেশে ইচ্ছামতো কাজ করার জন্য দরকারি সব সুবিধে হাতের মুঠোয় পেয়ে যেত। কাজেই ছাত্র যত বেশি কাজ করায় আগ্রহী ততই তার কাজ আরো উন্নত, আরো ভালো হয়ে উঠত। কিন্তু যাদের নিছক অ্যাডভেঞ্চারে ঝোঁক কিংবা যার নিজের ভেতরে কোনো উদ্দীপনা নেই – তেমন ছাত্রদের খুব অসুবিধে হতো।

 

প্রশ্ন : শিল্পের একজন সফল তাত্ত্বিক হিসেবে আপনি পরবর্তীকালে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এ বিষয়ে ‘শিল্প এবং বিভ্রম’ (Art and illusion)-এর স্রষ্টা শ্রীযুক্ত গোমরিখের কাজের কতটা প্রভাব আপনি নিজে অনুভব করেন?

উত্তর : গোমরিখের সঙ্গে যে আমার খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তেমন দাবি কিন্তু আমি করতে পারি না। আমি শুধু ইয়োরোপীয় শিল্পকলার ইতিহাসে ড্রইংয়ের বিকাশ সম্পর্কে তাঁর কিছু উদ্দীপনাময় বক্তৃতার পাঠক্রমে উপস্থিত ছিলাম। বক্তৃতাগুলো এই অর্থে উদ্দীপনাময় যে, শুনলে আপনাকে আগামীর কথা ভাবতে হবে, এমনকি আপনার চারপাশে যে পরিস্থিতি, যে প্রেক্ষাপট তারও ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।

শিল্প-বিভ্রম (Art illusion) – সে বেশ একটা সহায়ক বিশেস্নষণ। কিন্তু মুশকিল হলো একজন ইয়োরোপীয় এবং একজন এশিয়াবাসীর কাছে এই ‘বিভ্রম’ শব্দের অর্থ এক নয়। নিশ্চয়ই এর অনেক অমত্মর্লীন দিক আছে; কিন্তু সব সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি এর হাতে নেই। ওনার ড্রইং সম্পর্কিত বক্তৃতায় উনি বেশ মজাদার ভঙ্গিতে দেখাতে চেয়েছেন যে, পিসানেলেস্নার পর থেকে সত্মরে সত্মরে এটি বিন্যসত্ম হয়েছে। এক প্রজন্মের ক্ষমতাবান শিল্পী আগের প্রজন্মের ব্যবহৃত পরিকল্পনা বা মেজাজকে উলস্নম্ফনের পাটাতন হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন (প্রথমে আটকে থেকেছেন বর্ণনায়, তারপর গেছেন অভিব্যক্তিতে)।

ওনার ‘স্কিম’ বা পরিকল্পনার ধারণাটি আমাকে বেশ আকর্ষণ করেছিল। ক্রমেই দেখলাম ওই ‘schema’ (বা উপকাঠামো) – তার মধ্যে পর্যবেক্ষণ এবং উপস্থাপনার নানাবিধ ভাবতরঙ্গ বেশ কাজে লাগল – বিশেষত যে-কোনো চিরায়ত প্রকাশভঙ্গির মধ্যেও সামনের দিকে এগিয়ে চলার সূত্র ‘schema’ দিতে পারে। তবে এর প্রভাবে আমি মোটেই তাত্ত্বিক হয়ে উঠিনি। সাধারণ জীবনচর্চার শরীর থেকে যেসব তত্ত্বের জন্ম হয়নি তাদের আমি কোনোদিনই বিশ্বাস করি না।

প্রশ্ন : ১৯৬৩ সালে লখনৌর রবীন্দ্রালয়ে আপনি ‘The King of the Dark Chamber’ নামে একটি ম্যুরাল সৃষ্টি করেন। সেটি আপনার প্রথম উলেস্নখযোগ্য কাজ হিসেবে স্বীকৃত। এ মমত্মব্যের সঙ্গে কি আপনি একমত? এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পকর্মটি সৃজনের অভিজ্ঞতা এবং এর দার্শনিক প্রেক্ষিত সম্পর্কে যদি একটু কিছু বলেন।

উত্তর : ১৯৬৩ সালে রবীন্দ্রালয়ের ম্যুরালের কাজটি করেছিলাম। সেটা চোখে পড়ার মতো হয়েছিল না কি সেটা আমার প্রথম বড় মাপের কাজ – এসব নিয়ে অন্যেরা কথা বলবে। একজন শিল্পীর কাছে যে কাজই তিনি করেন তারই একটা বিশেষ তাৎপর্য থাকে। তবে রবীন্দ্রালয়ের ম্যুরালটি নিঃসন্দেহে সেই সময়কালের সবচেয়ে দীর্ঘ টেরাকোটার কাজ। ৮১ ফুট লম্বা আর ৯ ফুট উঁচু তার মাপ। প্রায় ১৩ হাজার টেরাকোটার টুকরো জুড়ে জুড়ে একটা মোজাইকের রিলিফ – টেরাকোটার টুকরোগুলো চকচকে স্বচ্ছ মসৃণ প্রলেপে সুরক্ষক্ষত। রবীন্দ্রনাথের নাটক অরূপরতন (The King of the Dark Chamber)-এর বিষয়বস্ত্ত একের পর এক দৃশ্যবিন্যাসে বিধৃত – এটাই ম্যুরালের ভাববস্ত্ত। দুবছর আগে অরূপরতন নাটকের জন্য (রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে) মঞ্চসজ্জা ও পোশাক পরিকল্পনা করার সময় কাজটা আমার মাথায় এসেছিল। ম্যুরাল তৈরির প্রসত্মাব যখন এলো তখনই আমার মনে একটা ভাবনা ঝিলিক মেরে উঠল – মনে হলো থিয়েটারের আসল কাজটা বোঝানোর পক্ষে এই নাটকের বিষয়বস্ত্ত যথাযথ। উন্মুক্ত দিবালোকের সত্যের যে স্বরূপ ধরা পড়ে না থিয়েটারের (হলের) ভেতরকার অন্ধকারে তা-ই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন : আপনার শিল্পীজীবনের প্রাথমিক পর্বে কিউবিজম এবং জর্জ ব্রাকের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। রামকিঙ্করও তাঁর শিল্পীজীবনের শুরুতে এদের আকর্ষণ অনুভব করেছেন। সেজন্যই কি আপনার প্রথম দিকের কাজে আপনি রামকিঙ্করের পথ ধরে চলেছেন?

উত্তর : আমি বিষয়টাকে যেভাবে দেখি সেটা হলো এ রকম – পাশ্চাত্যের শিল্পীরা মূলত পরিপ্রেক্ষিতকে একটু খাটো করে, গতির বিভিন্নতাকে একে অপরের ওপর চাপিয়ে, কাছে-দূরের বিভাজনকে নস্যাৎ করে ইত্যাদি নানা পদ্ধতিতে তাঁদের ছবির পরিসরকে আরো চ্যাপ্টা করতে চাইলেন আর তখনই ত্রিমাত্রিকতার প্রচলিত রীতিকে উলটে-পালটে দেওয়ার পথে গেলেন। একেই বলি কিউবিজম। আর পরবর্তী পর্বে একটা দলবাঁধা বস্ত্তকে (অবজেক্ট গ্রম্নপ) একেবারে একক বস্ত্ত (অবজেক্ট) হিসেবে দেখতে চাওয়া সেখান থেকে এলো যে ছবি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল তারও বি-সংগঠন – আরো পরে তাদেরও টুকরো করে ফেলা অর্থাৎ বিশেস্নষণ। এরকম উলটো পথে চলার প্রচুর উদাহরণ আমাদের চিত্রাঙ্কন-পরম্পরায় আগেই ছিল – তাদেরই টুকরো টুকরো উপস্থাপন। কিন্তু সমসত্ম দৃশ্যখ-কে অবশেষে একত্রে বিন্যসত্ম করা সেটাই হলো এর বিশেষ আকর্ষণ। বিশেষত সৃজনের পুরনো গল্পগুলোকে পাশাপাশি রেখে যদি কোনো একটা দৃশ্যে বিধৃত দৃশ্যমান বিবৃতির যৌক্তিক পারম্পর্য লক্ষ করতে শুরু করা যায় তাহলেই ব্যাপারটা দারুণ।

রামকিঙ্কর যে এভাবেই গোটা বিষয়টা দেখতেন আমি মোটেই সে কথা বলার চেষ্টা করছি না। কিংবা তাঁর ওপর ব্রাকের কতটা প্রভাব ছিল সে কথাও বলতে চাই না। তিনি সম্ভবত চোখের সামনে যা আছে তারই ভেতরের কথাটা পড়ার চেষ্টা করতেন (সেজানকে অনুসরণ করে) একদিক থেকে, অন্যদিকে সমতলের স্থানামত্মর ঘটিয়ে (ফিউচারিস্টদের অনুসরণে) গতি সঞ্চার করতেন তারপর গোটা অবয়বকেই তিনি আইকন করে তুলতেন অথবা অভিব্যক্তির একটা ভাঙাচোরা রূপ উপস্থাপন করতেন (অনেকটা পিকাসোর মতো)।

 

প্রশ্ন : একজন শিক্ষক এবং একজন শিল্পী হিসেবে আপনার ভেতরে অসাধারণ এক সংশেস্নষণ রয়েছে। শিল্পী হিসেবে আপনার যে প্রবল সাফল্য তাতেই শিক্ষকজীবন ফলপ্রসূ হয়েছে?

উত্তর : একজন জীবমত্ম শিল্পী নিজে নিজেই কিছু সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। অন্যেরা সমস্যা কীভাবে কব্জা করছেন সেটা দেখেও তিনি অনেক কিছু শিখে নেন। এমনকি ‘সেই একজন’ যদি তাঁর ছাত্রও হয় তাতেও শেখাটা হয়। কাজেই শেখানোর কাজটা হলো আসলে অনেক বেশি নিজে শেখা। কোনো শিক্ষক যদি তাঁর স্বকৃত সমাধানের তালিকায় একবার সন্তুষ্ট হয়ে পড়েন তাহলে তিনি নিষ্ফল হতে বাধ্য।

 

প্রশ্ন : বাংলার ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক পরম্পরা সম্পর্কে আপনার গভীর আগ্রহ। অন্য প্রদেশের একজন মানুষের মনে এমন শ্রদ্ধা বিস্ময়কর। এর প্রকৃত কারণ কী? অনেক বছর কাটিয়েছেন শামিত্মনিকেতনে, নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে তাতেই কি বাংলার এমন সত্যিকারের একজন গুণগ্রাহী হয়ে উঠলেন?

উত্তর : যাকে বলা হয় ভারতীয় রেনেসাঁ, সেখানে বাংলার একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে। ঔপনিবেশিক ভারতের প্রথম ক্ষমতাকেন্দ্র বাংলা। অথচ তার সামাজিক বিন্যাসে অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু এখানে অসাধারণ মেধার সমন্বয়ে গড়া একটি উচ্চতর শ্রেণি এই ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে লড়াইটা জারি রেখেছিলেন – এই সামাজিক দুর্বলতা দূর করার সর্বতো চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কাজেই সংস্কারপন্থীদের একটা জোরালো কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বাংলা – সমসত্ম সত্মরে দেশীয় সক্ষমতার সবল বহিঃপ্রকাশ সেখানে প্রতিভাত। বস্ত্তত ভারতের মধ্যে সবচেয়ে টগবগে তপ্ত অঞ্চল ছিল বাংলা। শিক্ষা, গূঢ় চিমত্মন, সামাজিক সংস্কার, রাজনৈতিক কর্মকা-, ধর্মীয় মতাদর্শ, সাহিত্য, শিল্প – সর্বক্ষেত্রে এদেশের শ্রেষ্ঠতম মানুষজন ছিলেন বাংলায়। বাংলা তো শুধু বাংলা ছিল না, বঙ্গভূম ছিল ভারতবর্ষের মসিত্মষ্ক এবং হৃদয়। সত্যি বলতে কি, এখানকার সমসত্ম মহান মানুষেরা তাঁরা শুধু বাংলার কথা বলেননি, বলেছেন গোটা দুনিয়ার কথা।

বাংলার এই অপূর্ব দৃশ্যপটের কথা এখানে আসার আগেই আমি জানতাম। যখন স্কুলের ছাত্র তখনই বাংলার সত্যিকারের যাঁরা মহান মানুষ – রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ – তাঁদের জীবন, চিমত্মাভাবনা তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। বাংলার নির্ভীক রাজনৈতিক বিপস্নবীরা – তাঁদের কথাও জানতাম আমি। মডার্ন রিভিউ থেকে শিল্পীদের নামও তো জানা ছিল। কিন্তু শামিত্মনিকেতনে আসার পরই বিনোদদা আর কিঙ্করদাকে জানলাম, চিনলাম।

বাংলার সাংস্কৃতিক দৃশ্যপটকে এই যে চিনে-জেনে নেওয়া সে ব্যাপারে ওনাদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। তবু ওনাদের যে জেনেছিলাম তাতেই নানাভাবে এই দৃশ্যাবলি বুঝে নিতে আমার অবশ্যই কিছু সুবিধা হয়েছিল।

 

প্রশ্ন : শামিত্মনিকেতনের নতুন প্রজন্মের শিল্পী এবং শিল্প-ঐতিহাসিকদের সম্পর্কে আপনার কী অভিমত?

উত্তর : নন্দলাল, অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, বিনোদবিহারী এবং রামকিঙ্কর সম্পর্কে প্রকাশিত নতুন বইগুলো উলটে-পালটে আমার মনে হয়েছে যে, তরুণ প–তরা অত্যমত্ম গুরুত্বসহকারে এই দৃশ্যপটের পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন; কিন্তু সেইসঙ্গে চিমত্মন থেকে অকারণ আবেগময় অবশেষ এবং নিছক অতীতমুখীনতাও দূর করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর।

প্রশ্ন : ইনস্টলেশন, ফোটোমমত্মাজ ইত্যাদি বর্তমানের নতুন যে শিল্প-আঙ্গিক – এদের বিষয়ে আপনার কী বিচার?

উত্তর : যে-কোনো নতুন করণ-কৌশল এবং যন্ত্রশিল্প-আঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে যদি এদের ব্যবহারে দর্শকের নজরে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করা যায়।

 

প্রশ্ন : কাজ, কাজ আর কাজ – কাজই আপনার জীবনের মৌলিক নীতি। ভবিষ্যতে আর কোন নতুন সৃজনের স্বপ্ন আপনার?

উত্তর : আমার মতো শিল্পীরা ব্যসত্ম থাকতে বাধ্য। প্রতিদিনের ভোরই আমার কাছে একটা নতুন জগৎ – মনে হয় সেই জগৎকে কেটেছিঁড়ে দেখতে হবে – তার ব্যাখ্যা করতে হবে। এটা তো স্বপ্ন নয়, জীবনের বাধ্যবাধকতা। কিন্তু চিমত্মনের এই পথে একসময় মনে আকাঙক্ষা জাগবেই – বেশ তো, এই জগৎটাকে একটু নতুন ছাঁচে ঢালা যাক, কিংবা নতুন একটা নকশা কাটা যাক ওর ওপর। হতে পারে সে হয়তো স্বপ্নের রাজপাটে – তা হোক কিন্তু এ দৌড় তো থামবার নয়। n

 

অনুবাদ : কাবেরী বসু

Leave a Reply

*