logo

মুক্তিযুদ্ধ ও গতির রূপকার

শাহাবুদ্দিন আহমেদ

চিত্রশিল্পী হিসেবে যে কজন বাঙালি কৃতী সন্তান বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ তাঁদের অন্যতম। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস থেকে বিএফএ ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ১৯৭৪ সালে বৃত্তি নিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ফ্রান্সে। সৃজন-প্রতিভার গুণে সেখানেই তিনি একটি বলিষ্ঠ অবস্থান করে নেন। অব্যাহত চর্চায় ও শিল্প উৎকর্ষে তিনি শিল্পানুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন। তাঁর ছবিতে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও শৌর্য বিশেষ মর্যাদায় প্রতিফলিত হয়েছে। দেশ-বিদেশে তিনি প্রচুর প্রদর্শনীতে অংশ নেন এবং উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। সম্প্রতি ফরাসি সরকার এই কীর্তিমান বাঙালি শিল্পীকে সেদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব Knight in the order of Arts and literature সম্মানে ভূষিত করেছে।

১৯৯২ সালে তিনি বিশ্বের পঞ্চাশ জন মাস্টার পেইন্টারের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হন। দীর্ঘকাল তিনি একজন পেশাদার শিল্পী হিসেবে ফ্রান্সেই প্রবাসজীবন কাটান। মাঝে মাঝে দেশে আসেন। ২০০৯ সালে বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস্-এ তাঁর একটি একক চিত্র প্রদর্শনী হয় – সেই সময় প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে এক অন্তরঙ্গ পরিবেশে তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত

 

আবুল হাসনাত : প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি কখন এবং কীভাবে আঁকাআঁকির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন? কীভাবে আর্ট কলেজে ভর্তি হন? এটা অনেকেই জানেন না – এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

শাহাবুদ্দিন : এই যে আমার হাসি, হাসলে গালে টোল পড়ছে, এটা জন্মগত নয়। লেখাপড়া বাদ দিয়ে ছবি আঁকতাম বলে বাবা আমাকে মেরেছিলেন। সেটা ছোটবেলার কথা। নিজের অজান্তেই বিভিন্ন বইয়ে যেসব ছবি থাকত সেসব কপি করতাম। এর মধ্যে ছিল নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষ বসুর ছবি। সে-সময় এত ছবি ছিলও না। আমার ভাইয়েরা ওপরের ক্লাসে পড়ত, আমি তাদের বইগুলো দেখতাম। সেখান থেকে ছবি নকল করতাম। সেভাবেই আমার শুরু। আমার অন্য ভাইয়েরা যারা পড়াশোনা করত, তারা আমার ছবি আঁকার ব্যাপারটা নিয়ে বাবার কাছে অভিযোগ করত। লেখাপড়া বাদ দিয়ে ছবি আঁকার কারণে বাবা আমাকে মারেন। আমার মুখের ডান পাশটা ফুলে যায়। এরপর বাবা অবশ্য আর কোনোদিন মারেননি। এই হলো আমার যাত্রা। মূলত যখন ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে উঠি তখন আমার বয়স বারো কি তেরো। একটা কথা আমার মনে আছে। সুভাষ বসুর একটা ছবি ছিল। সেটা মাথার তেলে ঘষা কাগজে কপি করেছিলাম। তারপর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল – এভাবে আঁকতে থাকি।

আবুল হাসনাত : আপনি যখন আর্ট কলেজে পড়তে চাইলেন তখন বাড়ি থেকে কোনো বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন কি না।

শাহাবুদ্দিন : না না, মার খেতে খেতে, বাধা পেতে পেতে পরে এমন একটা পর্যায়ে আসি, তখন পরিবার থেকেই আমাকে প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হলো। আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই ওখানেই ছোটদের আঁকাআঁকির একটা স্কুল ছিল, শামসুন্নাহার শিশুকলা ভবন। ১৯৬৫ বা ১৯৬৬-এ ওখানে তখন ছুটির দিনে অর্থাৎ শুক্রবার ও রোববার শিশুদের ছবি আঁকার ক্লাস নেওয়া হতো। আমার মনে আছে, এক শুক্রবারে মা আমাকে রিকশায় করে নিয়ে গেলেন ওখানে। তখন তো আমি ছোট। আর্ট কলেজ চিনি না। যাহোক, মা রিকশা থেকে নামার সময় আমি তাঁর আঁচল ধরে চিৎকার করতে লাগলাম, আমি যাব না। কেননা পরিবেশটাই আমার কাছে মনে হচ্ছিল বিদেশি বা অচেনা। তার কারণ হলো ওখানে যেসব বাচ্চা আসত তারা প্রায় সবাই ছিল অবাঙালি। যেমন ইস্পাহানীদের মতো এলিট শ্রেণির ছেলেমেয়েরা। তাদের ভাষাও বাংলা ছিল না – উর্দু ও ইংরেজি। ওদের ভাব বা চালচলন দেখে আমার নিজেকে খুব গরিব মনে হচ্ছিল। মধ্যবিত্তের যা হয়। তখন আমি মাকে বললাম, না না, আমি এখানে ভর্তি হব না। মা আমাকে অতদূর থেকে রিকশায় করে নিয়ে এসেছেন – তিনি আমার আপত্তির তোয়াক্কা না করে আমাকে ভেতরের দিকে নিয়ে গেলেন। ভেতরে গিয়ে দেখি, মোহসীন ভাই ও শফিকুল আলম – অর্থাৎ স্কুল চালান যিনি। আর দেখলাম হান্নানকে। তো হান্নানের লুঙ্গি পরা দেখে শান্তি পেলাম। হান্নান আমাকে আন্তরিকভাবে কাছে ডাকলেন। তখন কিন্তু স্কুলের ভেতরে কেউ ছিল না। সবাই গাছের নিচে এখানে-ওখানে বসে আঁকাআঁকি করছিল। ওরা ইংরেজি আর উর্দুতে কথা বলছিল, যার কারণে ওদেরকে আমি বিদেশি মনে করছিলাম। যাহোক, ভেতরে গিয়ে তো বাঙালি পেয়ে গেলাম। তারপর মোহসীন, মান্নান ওঁরা তো গরিব, তাই সবাইকে আপন মনে হতে লাগল। মায়ের মুখ থেকে আঁকার কথা শুনে ওনারা আমাকে আঁকার রং-কাগজ দিলেন এবং বললেন, দেখি তো কেমন আঁকো। আমার আঁকা দেখে তাঁরা তো ভীষণ খুশি। তুমি তো দারুণ আঁকো। ওরা তো তেমন আঁকতেই পারে না। প্রশংসা শুনে আমার এতদিনের স্বপ্নের পালে যেন হাওয়া লাগল। আমি খুব উৎসাহ বোধ করেছিলাম।

আবুল হাসনাত : কী রং দিয়েছিল আঁকতে?

শাহাবুদ্দিন : গোয়াশ ধরনের রং। শুক্রবার আর রোববারের অপেক্ষায় থাকতাম আমি। তখন আমি তেজগাঁও স্কুলের ছাত্র। সিক্স থেকে সেভেনে উঠব। স্কুলের ক্লাস করা তখন আর আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি অপেক্ষায় থাকতাম শুক্রবারের আর রোববারের। আমি ক্লাসের আগেই পৌঁছে যেতাম আর্ট কলেজে। তারপর সারাদিন সেখানেই পড়ে থাকতাম। আমার মনে আছে, আমি আর্ট কলেজে বড়দের পেইন্টিং করা দেখতাম। মনে হতো একটা স্বপ্নের ভুবনে আছি। স্বপ্ন দেখতাম কীভাবে একদিন আমি তাঁদের মতো পেইন্টিং করব। তখন তো ইউনিভার্সিটির ওইদিকটা খোলামেলা ছিল। আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখানে-ওখানে ছবি আঁকত। আমি ঘুরে ঘুরে তাঁদের আঁকা দেখতাম।

আবুল হাসনাত : আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীরা আউটডোরের কাজ করত?

শাহাবুদ্দিন : হ্যাঁ, আমি তাঁদের কাজ আগ্রহসহকারে দেখতাম এবং রপ্ত করার চেষ্টা করতাম। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন শামসুন্নাহার শিশুকলা ভবনের মোহসীন ভাই, মান্নান এবং আমিন স্যার বললেন, তোমার ছবি আমরা করাচিতে পাঠিয়েছি। কম্পিটিশনে। আল্লা আল্লা করো – পুরস্কার পেয়েও যেতে পারো। তখন বিশ্ব শিশু দিবসে প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হতো – আইয়ুব খানের সময়ে। আমি এসব জানতাম না।

আবুল হাসনাত : আপনি তো গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন।

শাহাবুদ্দিন : হ্যাঁ। আরো ঘটনা আছে, সেটা অনেকেই জানে না। ওনারা তো বললেন আল্লা আল্লা করো। তখন তো বাঙালিদের ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। বিষয়টা আমি কাউকে বলি না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আল্লা আল্লা করতে থাকি। তখন সরকার কবির উদ্দিন রেডিওতে খবর পড়তেন বাংলায়। সে-সময়ে রেডিওটাই ছিল বাঙালিদের বড় মাধ্যম। টেলিভিশন বা খবরের কাগজের এত প্রাধান্য ছিল না। ক্রিকেট থেকে পলিটিকস – সব খবরের জন্য মানুষ রেডিওনির্ভর ছিল। তো যেদিন বিশ্ব শিশু দিবস হবে তার আগের দিন ঘোষণা করে। প্রতিদিনের মতো সেদিন সকালে বাবার সঙ্গে আমরা ভাইয়েরা সবাই নাশতার টেবিলে বসেছি। বাবা খুব রাগী মানুষ ছিলেন। তিনি নাশতা খেতে খেতে সকালের খবর শুনতেন। একটা গোপন উত্তেজনা ও উদ্বেগ আমার ভেতর ঝড় তুলছে। বাড়িতে কেউ কিছুই জানেন না। আমি খবরের অপেক্ষায় আছি। আর ভেতরে ভেতরে আল্লার কাছে প্রার্থনা করছি। খবর শুরু হয়ে গেছে। একপর্যায়ে সরকার কবির উদ্দিন তাঁর শিল্পিত কণ্ঠে বললেন, আজ বিশ্ব শিশু দিবস। এই দিবস উপলক্ষে সাতজন শিশুকে প্রেসিডেন্ট পদক দেওয়া হচ্ছে – তার শিরোনাম আগে বললেন। তারপর পর্যায়ক্রমে একেকটি বিষয় ও বিজয়ীর নাম। আমার তো ভেতরে ঝড় বইছে। প্রথমে ইংরেজি সাহিত্য, উর্দু সাহিত্য এভাবে একপর্যায়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার ফলাফল। এ বিষয়ে ছিল দুটি শাখা – ক ও খ। আমি ছিলাম ক শাখায়। সরকার কবির উদ্দিন যখন বললেন ক শাখায় প্রথম হয়েছে শামসুন্নাহার শিশুকলা ভবন স্কুলের শাহাবুদ্দিন আহমেদ, আমি তখন টেবিলে রুটি ফেলে দিয়ে লাফ দিয়েছি। ‘বাবা, এইটা আমি, আমি, এইটা আমি’ – বলে চিৎকার করছিলাম। কিন্তু বাবা রাগত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী হলো? এদিকে খাবার টেবিলে আলু ভাজির বাটি উলটে সব একাকার। কেউ বুঝতে পারছে না কী ঘটেছে। কেউ বিশ্বাস করে না, তারা কেউ খেয়াল করতে পারেনি। আমারও আবার দ্বন্দ্ব কাজ করতে শুরু করল। অন্যরা গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মনে হচ্ছিল তাহলে ওটা মনে হয় আমি নই। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আগের দিন আর্ট স্কুলের শফিকুল আলমের কাছে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল। টেলিগ্রামে তারা জানিয়েছে, তোমাদের স্কুলের শাহাবুদ্দিন আহমেদ ক বিভাগে এই পুরস্কার পেয়েছে। সকাল ৮টার খবর শেষ হওয়ার পর ৯টার দিকে আর্ট স্কুলের পিয়ন হান্নান টেলিগ্রাম হাতে করে আমাদের বাসায় এসে হাজির। টেলিগ্রাম দেখার পর বাবা ও ভাইয়েরা নিশ্চিত হলো। তাহলে আমিই! এই নিয়ে পাড়ায় হৈচৈ পড়ে গেল। আমার ছেলে, আমার ছেলে।

আবুল হাসনাত : সালটা কত?

শাহাবুদ্দিন : ১৯৬৭ সাল।

আবুল হাসনাত : তারপর কী হলো?

শাহাবুদ্দিন : তারপর তো দুয়ার খুলে গেল।

আবুল হাসনাত : আর্ট কলেজে প্রথমদিন কেমন লেগেছিল আপনার?

শাহাবুদ্দিন : আগে থেকেই যাওয়া-আসা থাকায় নতুন করে কিছু মনে হয়নি। যা হওয়ার হয়েছিল আর্ট স্কুলে পড়ার সময়। আমি যখন আর্ট কলেজে ভর্তি হই, অনেকেই মনে করত আমি সেকেন্ড বা থার্ড ইয়ারের ছাত্র।

আবুল হাসনাত : মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আপনার একটা সংশ্লিষ্টতা জড়িয়ে আছে। কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে গেলেন – এ বিষয়ে কিছু বলুন।

শাহাবুদ্দিন : সামান্য কথায় এটা বলা একটু কঠিনই হয়ে যায়। তবু বলছি। কবি, সাহিত্যিক বা শিল্পীরা যখন যুদ্ধে যায়, সেটা সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু আলাদা মাত্রার হয়ে থাকে। এটা সাধারণত হয় না। এটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত এরকম নজির খুব কম পাওয়া যায়। আমার ব্যাপারটাও একটু ব্যতিক্রম। আমরা সর্বমোট আট ভাই। আমার অন্য ভাইয়েরা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর সমবয়সী। তাঁরা কলকাতায় একসঙ্গে থেকেছেন, একসঙ্গে রাজনীতি করেছেন। আমাদের পরিবারের একমাত্র আমিই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমার ধ্যানজ্ঞান ছিল ছবি। আমি যখন ঘরে বসে ছবি আঁকি, তখন বাবা তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে রাজনীতি বা দেশ নিয়ে কথা বলতেন। আমি সেসব
আলাপ-আলোচনা শুনতাম, উপলব্ধি করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু যখন আর্ট কলেজে যেতাম, সেটা একটা ভিন্ন জগৎ। সেখানে ৯৯ শতাংশই ছিল মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন। আমি ঘরে গিয়ে শুনি একরকম, আর্ট কলেজে গিয়ে শুনি অন্যরকম। ভেতরে যা-ই ভাবি, আমার কাজ আমি করে যেতাম। কিন্তু একদিন দুইদিন তিনদিন – তখন ছাত্র আন্দোলন তেতে উঠেছে। আসাদ যেদিন মারা যায় তার আগের দিন ১১ দফা আদায় করার লক্ষ্যে ১০টি ছাত্রসংগঠন একমঞ্চে দাঁড়িয়ে গেছে। বাসায় আলোচনা ও আড্ডায় শুনি কাউকে বলা হচ্ছে আমাদের নয়নমণি, আমাদের নেতা। তাদের কথায় আমি বেশ শিহরণ বোধ করতাম। কিন্তু আর্ট কলেজে এসে দেখি তার তেমন কোনো মূল্যই নেই।

আমার ছোট ভাই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। শেখ কামাল এবং এরা একসঙ্গে রাজনীতি করত। আমরা একই প্রজন্মের। আমরা একসঙ্গে ঘুমাতাম। ওরা আমাকে পটানোর চেষ্টা করে – এই চলো না একটু ইকবাল হলে (এখন জহুরুল হক হল)। দাদাভাই ডাকে, তোমার কথা শুনেছে যে তুমি আর্ট কলেজে পড়। হি ইজ এ গ্রেটম্যান। শুনে আমার মনে হলো, আরে ছাত্রলীগের ছেলে, লেখাপড়া করে না, গ্রেট হয় কীভাবে! অনেকদিন পটাল আমার ভাই। আমার খারাপ লাগছিল। ওরা বলে তোর ভাই থাকতে আমাদের অন্য দলের শিল্পীদের কাছে ধরনা দিতে হয়। ছাত্রলীগের সব ব্যানার-পোস্টার ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেমেয়েদের দিয়ে করানো হতো পয়সা দিয়ে। ওদের কোনো আর্টিস্ট কর্মী নেই। একদিন আর্ট কলেজে যাওয়ার সময় আমার খুব মায়া হলো। আমি আমার ভাইকে বললাম, চল তো দেখি তোর দাদাভাইটা কে?

আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই সকাল দশটার দিকে ইকবাল হলে গেলাম। গিয়ে দেখি ছাত্রলীগের ছেলেদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা। কেননা পরের দিন প্রোগ্রাম। আমি খুব ভাগ্যবান, সেই চেতনা আমাকে স্পর্শ করেছিল। যাই হোক, আমি শিল্পী, আবার আমার ভাই ঢাকা মহানগরী ছাত্রলীগের সভাপতি, ফলে আমার আদরের ঘাটতি ছিল না। আমি খুব সম্মান পেলাম তাদের মাঝে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি দোতলায় ওঠার সিঁড়ির টার্নিং স্পেসে গেঞ্জি গায়ে বসে আছেন এক ভদ্রলোক, মুখে দাড়ি। পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো আমাকে তাঁর সঙ্গে। তিনিই দাদাভাই (সিরাজুল আলম খান)। তাঁকে প্রথম দর্শনেই আমার ভালো লাগল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিলেন। অনেক ছাত্রছাত্রী ছিল সেখানে। তিনি আমাকে যথেষ্ট সম্মান দেখালেন। আমাকে আপনি করে সম্বোধন করলেন। পাশে বসালেন। বললেন, এই চা-টা নিয়ে আয়। তিনি এমন একটি স্লোগান বললেন, যা আমার চেতনার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি বললেন, ওরা বুঝতে পারছে না। আপনি তো শিল্পী; আপনি বুঝবেন। ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’। আমার ধারণা ছিল উনি হয়তো তেমন লেখাপড়া করেননি। কিন্তু স্লোগান শুনে আমি মুগ্ধ এবং অবাক হয়ে গেলাম। যা ভেবেছিলাম ব্যাপারটা হয়ে গেল উলটো। আমি নীরব হয়ে গেলাম। আমি বললাম, আরেকটা বলেন তো। ‘জয় বাংলা’। দারুণ! আমার ভেতরটা পালটে গেল। মনে হলো আমার ভেতর অন্য একটা সত্তা জেগে উঠল। আমি বললাম, কী করতে হবে বলুন। ওরা পেয়ে গেল আমাকে, আর আমি পেয়ে গেলাম আমার ঠিকানা। সেই সময় এরকম নতুন স্লোগান। কী চমৎকার! স্লোগানের সঙ্গে মিলিয়ে আমি ছবি আঁকতে শুরু করলাম। লাঙল, নদী, মাঝি, গরু আরো কত কি! তারপর মিছিলেও গেলাম, যেদিন আসাদ মারা যায়। এরপর আর্ট কলেজে আমার আর ভালো লাগে না। আমি একা। পরিবেশের সঙ্গে যেন আমার চেতনা আর মিলছে না। কাউকে সঙ্গে নিতে পারছি না। তারপর একজনকে পেয়ে গেলাম। আপনি হয়তো চিনবেন – ওর নাম কামরুল হাসান কালন। মিছিলে গিয়ে ও-ই টিয়ারশেল খেল। ওকে নিয়ে মেডিক্যালে… আরো অনেক কাহিনি।

আবুল হাসনাত : আপনি যা বললেন, অনেক কিছুই যেন খুলে গেল -।

শাহাবুদ্দিন : তারপর ২৫ মার্চের মর্মান্তিক ঘটনার পরে সবাই পাড়া ছেড়ে চলে গেছে। গোটা এলাকা (কলাবাগান) ফাঁকা। আমি বাড়িতে রয়ে গেলাম একা। বাইরে তালা লাগিয়ে, যাতে কেউ মনে করতে না পারে ভেতরে কেউ আছে। বন্ধ ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে ছবি আঁকছি। তবু ভেতরে অস্থিরতা, মাঝে মাঝে চুপি চুপি রেডিও শুনি। আকাশবাণী থেকে খবর পড়া হচ্ছে – পূর্ববঙ্গে গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ভাবনা এবং তাড়না আমাকে অস্থির করে তুলল। মনে হচ্ছিল, এখন আর ছবি আঁকার সময় নয়। মুক্তিযুদ্ধে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। ওই কেমন লাগে না…।

আবুল হাসনাত : তখন তো প্রেক্ষাপটই আলাদা। ভীষণ অন্যরকম। এখন পালটে গেছে সব। এখনকার প্রজন্ম মিস করছে সেই প্রেক্ষাপট, সেই চেতনা।

শাহাবুদ্দিন : যখন যুদ্ধের কথা শুনি রেডিওতে, তখন আঁকাআঁকি আর আমার হতে চায় না। হলো না। কেমন লাগে। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষ মরছে। বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আয়োজন করছে। আমার রক্তের ভেতর এক যোদ্ধার দ্রোহ উসকে উঠছে। সে কী অনুভব, বাঙালিরা জেগে উঠেছে। আমি কত রকমের সাবধানতা অবলম্বন করে আগরতলা গেলাম। ক্যাম্পে পৌঁছলাম।

আবুল হাসনাত : তারপর তো ট্রেনিং নিলেন। কোম্পানি কমান্ডার হলেন।

শাহাবুদ্দিন : না, কোম্পানি কমান্ডার না, প্লাটুন কমান্ডার। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন মানিক। মানিক মারা গেলেন। তারপর কমান্ডার হলেন বাচ্চু।

আবুল হাসনাত : তখন তো ঢাকায় বেশ কয়েকটা অপারেশন করলেন।

শাহাবুদ্দিন : হ্যাঁ, বেশ কয়েকটা। তখন আর ছবি নয়, দেশকে বাঁচানোর তাগিদটাই বড় মনে হয়েছিল। আর এই চেতনা তো আরোপ করে ধারণ করা যায় না। এটা আমার ভেতর থেকেই কাজ করেছে – আমরা বাঙালি হিসেবে বাঁচতে চাই। ঘরে বসে চুপচাপ ছবি আঁকা আমার হবে না। সেটা আমি বুঝে গেছি তখন। আমাকে যুদ্ধে যেতে হবে। সঙ্গীদের খোঁজা আরম্ভ করলাম। মেলাঘর, খালেদ মোশাররফ, হায়দার – ওদেরকে তো হারিয়েই ফেললাম। ওদের কী যে অবদান ভাবলেই চোখে পানি চলে আসে। ওরা কী যে আদর করত আমাকে। যেই শুনেছে আর্ট কলেজ থেকে এসেছি, ওরা আমাকে বাধা দিলো। বলল, না, তুমি যেয়ো না শালদা নদীর ব্যাটল ফিল্ডে। বরং তুমি পাইলট হও। পাইলটের ট্রেনিং নাও। আমাদের পাইলটের অভাব। তুমি শিক্ষিত ছেলে – তুমি পারবে। একজন আর্টিস্টকে ওরা এত আদর-সম্মান দেখাল। আমাকে দিল্লি গিয়ে পাইলটের ট্রেনিং নিতে বলল। আমার তো রাতে ঘুম হয় না। আমার মনে হলো পাইলট হলে হয়তো জীবনে আর ছবি আঁকা হবে না। ছবির প্রেম এমনভাবে আমাকে অস্থির করে ফেলল যে মুক্তিযুদ্ধ যদি ব্যর্থও হয়ে যায় তবু আমি ছবি আঁকব। ফলে রণক্ষেত্রে থেকেও আমি জঙ্গলের মধ্যে ছবি এঁকেছি। প্রদর্শনী করেছি। পঞ্চাশ-ষাট কিলোমিটার দূর থেকেও অন্য সহযোদ্ধারা এসেছে মেলায়। সেখানে গান-বাজনা, ছবি ইত্যাদির আয়োজন করা হয়েছিল সার্বিক কষ্টের ভেতরেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত রাখার জন্য। বিশ্রামনগর থেকে টুলু আপা ও লুলু আপারা এসেছিলেন। অনেকদিন পর কাছের মানুষদের দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম, অনেকেই বেঁচে আছে তাহলে!

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের গেরিলা দল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি স্থানে অবরুদ্ধ হয়ে ছিল প্রায় চবিবশ ঘণ্টা। কারণ তারা সংখ্যায় ছিল অনেক বেশি। পোকামাকড় ও জোঁক আমাদের শরীরের রক্ত শুষে নিয়েছিল। ঘন ঝোপের ভেতর লুকিয়ে ছিলাম। পাকিস্তানি সেনারা টের পেলে আমাকে হত্যা করত।

আবুল হাসনাত : আপনি তো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ছবি এঁকেছেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আপনিই প্রথম প্রতিবাদী ভঙ্গিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকে প্রতিবাদ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে এত দীর্ঘদিন যাবৎ এত ছবি কেউ আর আঁকেননি। এই ছবির ভেতর দিয়ে কি আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস, পৌরুষ – এসব বোঝাতে চেয়েছেন? নাকি নিজস্ব অন্য কিছু বোঝাতে চেয়েছেন বা বলতে চেয়েছেন? মুক্তিযুদ্ধকে কেন আপনি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন?

শাহাবুদ্দিন : চিত্রশিল্পী হিসেবে দায়বদ্ধতার কারণেই হয়তো এটা হয়েছে। আজ আমি যদি চিত্রশিল্পী না হয়ে কবি-সাহিত্যিক হতাম তাহলে হয়তো লিখতাম। গায়ক হলে মুক্তিযুদ্ধের গান করতাম। যেমন শাহিন মাহমুদরা গেয়েছিলেন। সবাই তাঁদের চেনে। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি তাঁরা আমার মতোই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগিয়ে রাখতেন। দুর্ভাগ্য হলো, খুব কম লোকই গেছে। ওই যুদ্ধ ক্যাম্পে চিত্রশিল্পী হিসেবে আমি একাই ছিলাম। তাই আমাকেই এমন ছবি আঁকতে হয়েছে বা হচ্ছে। অন্যরা যদি থাকত তাহলে কী ব্যাপার হতো বুঝতে পেরেছেন। এদেশ থেকে যখন আমি বাইরে গেলাম চিত্রকলা নিয়ে লেখাপড়া করার জন্য – ওখানে গিয়ে তো নিজের দেশের ঐতিহ্য নিয়ে ছবি আঁকতে হতো। ধরুন, যদি আমি মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়ে দিই তাহলে আমাকে কী আঁকতে হতো? কী থাকত আমার ছবিতে? গাছপালা, নদীনালা আর হাড্ডিসার মানুষের ছবি – এই তো ছিল বাংলার মুখ। আমি তো আর গুলশান-বনানীর মানুষের ছবি এঁকে দেশের ছবি আঁকতে পারতাম না। আমাকে কুঁড়েঘর, কলাগাছ, মেঘনা নদী ইত্যাদি আঁকতে হতো। এসব কাজ অনেক হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নন্দলাল বসু হয়ে অনেকেই এ কাজ করেছেন বা করছেন।

কিন্তু আসল পয়েন্ট বা স্পিরিট যেটা – যার জন্য বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সেটাকে কীভাবে এড়িয়ে যাবেন? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মই তো হলো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। অন্যান্য জাতির সঙ্গে মিলেমিশে বাঙালি জাতির হয়তো একটা অস্তিত্ব বা ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে জন্মের পর তার পরিচয় তো ভিন্ন। এই স্বাধীন-সার্বভৌম সত্তার গল্পের নামই তো মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিলে আমাদের আর কী থাকতে পারে? আমাদের তো পতন হবেই। তাই বিষয়বস্ত্ত হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিলাম। এ কারণেই আমি এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এতবড় ওজনদার বিষয় বহন করতে শক্তি ও সময় প্রয়োজন। হুট করেই শেষ করার ব্যাপার নয়। আজ এই যে আমি আপনি এখানে এ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছি – তার কারণও এই স্বাধীনতা, স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীনতাযুদ্ধ একটা জাতির জন্য একবারই হয়। বারবার হয় না। শিল্পী হিসেবে আমি হয়তো ভাগ্যবান যে আমি ধীরে ধীরে হলেও স্বাধীনতার প্রসঙ্গকে আমার ছবির বিষয় করতে পেরেছি। অন্যান্য জাতির মানুষের কাছে আমি আমার দেশের একটা বিশাল গৌরবময় অধ্যায়ের গল্প ছবিতে ব্যক্ত করতে পেরেছি। এর জন্য আমাকে শিল্পকলার এক উচ্চ স্তরের ভাষাকে রপ্ত করতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ আমার জন্য অহংকার তো বটেই – আমার জীবনও বটে। এটার জন্যই বেঁচে আছি আমি। স্বাধীনতা সবাইকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

আবুল হাসনাত : ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্ব জড়িত রয়েছে। সেজন্যই কি আপনি এটাকে বারবার খুব ইন্টারেস্টিং ওয়েতে আনছেন?

শাহাবুদ্দিন : রাজনৈতিক কারণে অনেকে হয়তো অনেক কিছুই খোলামেলাভাবে বলতে পারেন না। এখন তো সেই সিচুয়েশন নেই। যুদ্ধ চলাকালীন, যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে এমন কেউ নেই যে জয় বাংলা বলেনি।

আবুল হাসনাত : অবশ্যই বলেছে। পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধভাবেই বলেছে।

শাহাবুদ্দিন : ধরুন, বিএনপি যদি ভালো জিনিসটা নিত – কার কি এসে যায় এটা না ভেবে, তাহলে কী হতো? ভালো হতো। ভালোকে গ্রহণ করতে অসুবিধাটা কী? জয় বাংলাকে এখন সবাই গ্রহণ করতে পারছে না – এটাই আমাদের সমস্যা। এই মেনে না নেওয়াটা আমাদের সবার জন্যই ক্ষতির ব্যাপার। এই বিভাজিত বিষয়টি যাতে এক না হয় সেজন্য বহির্বিশ্বের চাপও আছে। আমি বাইরে থাকি, আমি জানি।

আবুল হাসনাত : শাহাবুদ্দিন ভাই, আমাদের দেশের শিল্পকলার চর্চা তো আর্ট কলেজকেন্দ্রিক হয়ে আসছে দীর্ঘদিন। কীভাবে এটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রজেক্ট করা যায়? বা কীভাবে অন্যদের মাঝে আমাদের শিল্পকলাকে আমরা তুলে ধরব? আমাদের অবস্থান কোথায়? বা কোথায় যাচ্ছি আমরা, দূর থেকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আপনি তো অনেকদিন বিদেশে আছেন, সেই অভিজ্ঞতায় কিছু বলুন।

শাহাবুদ্দিন : আমি আমার মতো করে সাধ্যমতো করার চেষ্টা করি। এটাই আমার চরিত্র। প্যারিসে গিয়ে আমি কত কী না চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের শিল্পকলা নিয়ে প্যারিসে আজ অবধি যা কিছু ঘটেছে – আমার মাধ্যমেই হয়েছে। অনেকে অনেক কথাই হয়তো বলবেন – কিন্তু তাতে আমার কিছু এসে যায় না। অনেকে অনেকভাবেই নাম কিনেছেন। ফ্রান্সে বাংলাদেশের যত চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে আমার মাধ্যমেই হয়েছে। আমি চাইলে একটা দূরত্ব তৈরি করে একটা ভিন্ন অবস্থানে থাকতে পারতাম। যাহোক, বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের শিল্পকলার বিকাশের বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। আমি ফ্রান্স থেকে যে যে পরিকল্পনা করি, দেখি এখানে এসে সব পরিবর্তন হয়ে যায়। একবার দুইবার তিনবার – এভাবে ক্রমাগত মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে আমার অনেক উদ্যোগ। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। গত টার্মে যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন ফ্রান্স থেকে আমি লোকজন নিয়ে এসেছিলাম, যাতে তারা এখান থেকে রিয়েল পেইন্টিং বেছে খুঁজে বের করতে পারে। অসচ্ছল মেধাবী তরুণরা যাতে ইউরোপে প্রদর্শনীর সুযোগ পায়। পোস্টার গ্রাফিক – এগুলো দিয়েও শিল্পকর্ম করা যায়। কিন্তু অরিজিনাল পেইন্টিং তো অন্য বিষয়। আমি চেয়েছিলাম মৌলিক মেধার সম্ভাবনাময় তরুণরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর সুযোগটা পাক। কিন্তু হলো কি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল আমাদের নির্বাচিত শিল্পীদের তালিকা পরিবর্তন হয়ে গেছে। ফলে উদ্দেশ্যটা সফল হলো না। আমাদের রাজনৈতিক স্থিতির অভাবও আমাদের শিল্পকলার বিকাশকে ব্যাহত করছে, অন্যান্য বিষয়ের মতোই। যারা নিজেদের টাকা-পয়সা খরচ করে আমাদের তরুণ শিল্পীদের নিতে এসেছিল, সেই ফরাসিরাও অবাক ও নিরাশ হয়ে গেল। এতে আমাদের দেশের ক্ষতি হয়ে গেল। হয়তো বিষয়টা অনেকেই জানে। অতএব দেখা যাচ্ছে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের শিল্পসংস্কৃতিকে কীভাবে পিছু টেনে ধরে রাখছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন স্থিতিশীল থাকে তখন দেখা যায় অন্যান্য বিষয়ের মতো শিল্পচর্চাও এগিয়ে চলে। আসলে আমাদের মধ্য থেকে সেক্রিফাইসের ব্যাপারটা উধাও হয়ে যাচ্ছে। আমরা স্বার্থপর হতে গিয়ে আরো পিছিয়ে পড়ছি। উন্নয়নের জন্য আমাদের ত্যাগ করা শিখতে হবে।

এ প্রসঙ্গে আমি খোলামেলাভাবে বলছি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন দেশের জন্য ধৈর্যসহকারে অনেক ত্যাগ স্বীকার করছে। এরকম ভালোবাসাই দেশের অন্যান্য সেক্টরে দরকার। দেশের শিল্প-সাহিত্যকে উঁচুতে তুলে ধরার কাজ করছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। তারা এটাকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে। এটা একটা বিশাল উদ্যোগ। আপনাদেরও তো একটা সাহস দরকার। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হলেও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কোনো উদ্যোগ যেন ব্যাহত না হয়। দেশের স্বার্থেই এটা রাজনীতিবিদদের ভালো করে বুঝতে হবে। আমি বলতে চাই, আপনাদের দ্বনেদ্বর কারণে দেশ যাতে পিছিয়ে না যায়। এগিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। অথচ এমন সব ঘটনা ঘটছে, তার জন্য আমি গভীরভাবে আঘাত পাচ্ছি। এই আঘাতের চিহ্ন আমার ছবির ভেতর ঝলসে উঠছে। আপনারা হয়তো লক্ষ করেছেন। একা পথ চলা যায় না। দীর্ঘ পথে যারা দৌড়ায় বা সাইকেল চালায় দেখবেন রাস্তার দুপাশ থেকে তাদের পানি বা বরফ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। এসব আমাদের নেই, দৌড়াতে গিয়ে এসব আমি পাচ্ছি না। ফলে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়।

আবুল হাসনাত : আপনি তো দীর্ঘদিন বিদেশে আছেন। আপনি এত দেশে এত গ্যালারিতে এত ছবি দেখেছেন – সেই আলোকে আপনার কী মনে হয়, আমরা কোন জায়গায় আছি? নাকি আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার ভাবনায় বুঁদ হয়ে একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি? আসলে আমাদের অবস্থানটা কোথায়?

শাহাবুদ্দিন : পৃথিবীর  বিভিন্ন দেশের একেকটা ঐতিহ্য আছে। যেমন ধরুন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার কথা। তাদের ফুটবল আছে, তাদের ম্যারাডোনা আছে। যেভাবে আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্গবন্ধু, জয়নুল, ড. ইউনূস বলেন, আর শাহাবুদ্দিন অথবা শামসুর রাহমান বলেন, একটা লেভেল আছে। আমাদের হয়তো ফুটবলার নেই, কিন্তু এগুলো আছে। সাহিত্যে ও আর্টে আমাদের এই ঐতিহ্য আছে। না হলে আমি এতদূর যেতে পারতাম না। হঠাৎ করে এসব হয় না কখনো। আমাদের ঐতিহ্যের ভেতর সেই মেধা বা ট্যালেন্ট আছে। সেদিন শাবানা আজমী ওই কথাটাই বললেন – এদেশে ট্যালেন্টেড পিপুল আছে। এটা গরিব বা ধনীর ব্যাপার নয়। এটা এখানে আছে। বিশ্বাঙ্গনে একটা অবস্থানে যেতে হলে অর্থনীতি, রাজনীতি, তারপর সামরিক ক্ষমতার উন্নতির একটা ব্যাপার লাগে। ওইসব ক্ষেত্রে আমরা বেশি এগোতে পারছি না, কিন্তু আমাদের মেধা-সংস্কৃতির ভেতর সেই উচ্চতা আছে। আমরা পটেনশিয়াল। একটা বেলুনকে যেমন ফুঁ দিয়ে বড় করা যায়, আমরা সেই রকম ফুঁ দিয়ে আমাদের অনেক মেধাকে বড় বানাতে পারছি না। মেধা বিকাশের পথে আমাদের রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। শক্ত বেলুনকে আমরা ফোলাতে না পেরে ফেলে দিচ্ছি। শিল্প বিকাশের জন্য যে শক্তি বা প্রণোদনা প্রয়োজন তা এখান থেকে দরকার। এই মাটি থেকে দরকার। তাই এখানে যে বিশৃঙ্খলা হয়, বাইরেও সেই বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। আমি দৌড়াচ্ছি। কিন্তু পানি তো পাচ্ছি না। আমি থাকতে পারি প্যারিস, কিন্তু আমার তো নিজ মাটির আশীর্বাদ ও প্রেরণা দরকার। তারপরও আমাদের একটা অবস্থান আছে। শুধু পাক-ভারতের কথা বলছি না – আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমাদের একটা ভালো অবস্থান আছে। তবে ইউরোপের তুলনায় আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। এখানে বাড়িয়ে বলে লাভ নেই। কারণ ইউরোপের ব্যাপারটা হলো কি, ওরা তো একজন নয়, দুজন নয় – প্রতিটা দেশে-জাতিতে ওদের বড়মাপের শিল্পী আছে। যেমন স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, পর্তুগাল বা হল্যান্ড, গ্রিস, ইংরেজ সবারই রয়েছে বড়মাপের শিল্পী। দে আর টেরিফিক। তাহলে সব মিলিয়ে তো ইউরোপ। ভেবে দেখুন। ওরা পর্তুগাল থেকে এক ঘণ্টায় পেইন্টিং নিয়ে আসে প্যারিসে। আমাদের মাঝে তো সেই নৈকট্য নেই। আমাদের পাশেই ভারত, নেপাল – আরো অন্যান্য দেশ রয়েছে যাদের ইতিহাস বা ঐতিহ্যগত মিল বা বন্ধন থাকলেও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কারণে আমাদের মধ্যে কনসার্টেড কোনো ভাবনা নেই। তারপর রাজনৈতিক সংকট তো রয়েছেই। ফলে মহাদেশীয় বা উপমহাদেশীয় সংকটও শিল্প-সাহিত্যের ওপর প্রভাব ফেলে বৈকি।

আবুল হাসনাত : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শাহাবুদ্দিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

*