logo

মানজারেহাসীন মুরাদের সাক্ষাৎকার

মানজারেহাসীন মুরাদের সাক্ষাৎকার
‘আমাদের ধারার আন্দোলনে কোনো শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি’
সাক্ষাৎকার গ্রহণে ফৌজিয়া খান
মানজারেহাসীন মুরাদ। চলচ্চিত্র-নির্মাতা। নবীন নির্মাতাদের নিকট ভরসার জন তিনি। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ – এর প্রচার, প্রসার ও প্রশিক্ষণে তাঁর সক্রিয়তা বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের এই শক্তিশালী মাধ্যমটির চর্চা বাড়িয়েছে শতগুণ। সম্প্রতি তাঁর চলচ্চিত্র চিন্তা, ডিজিটাল মাধ্যমের বিকাশ এবং বাংলাদেশে বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলনের নানান দিক নিয়ে কথা বলেন চলচ্চিত্র-নির্মাতা ফৌজিয়া খান। তাঁদের কথোপকথনের কিছু অংশ এবার আমাদের পাঠকদের জন্য।

ফৌজিয়া : ফিল্মে আগ্রহ হলো কেমন করে – এই প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু করি আমরা।
মানজারেহাসীন : এটা একটু কাকতালীয় বলতে হবে। ওইভাবে চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ – অন্তত কলেজজীবন পর্যন্ত ছিল না। ১৯৭২ সালের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন মাহবুবুল আলমের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং মাহবুবুল আলমের সূত্রেই সম্ভবত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের প্রদর্শনীতে আসা শুরু করি। মাহবুবুল আলম – দীর্ঘদিনের চলচ্চিত্র সংসদকর্মী, চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখক, সমালোচক। চলচ্চিত্র সংসদে গিয়ে বেশ কিছু ছবি দেখার পর মনে হলো, চলচ্চিত্র বেশ আকর্ষণীয় একটা শিল্পমাধ্যম। আমার দেখতে ভালো লাগছে। চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারটা আরো একটু বেগমান হয় একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। ভারতের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন বিভাগের প্রধান ছিলেন সতীশ বাহাদুর। তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় – চলচ্চিত্র অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করার জন্য।
ফৌজিয়া : ওটা কত সালের কথা?
মানজারেহাসীন : ১৯৭৪ সালে। আমরা যারা চলচ্চিত্র সংসদে পরে যোগ দিয়েছিলাম, তাদের পক্ষে ওই কোর্সে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়নি। দুবছর পরে আরেকটি ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স – যেটি সতীশ বাহাদুর এবং আরেকজন অধ্যাপক পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটের – এই মূহূর্তে তাঁর নাম মনে পড়ছে না – ওনারা দ্বিতীয়বারের মতন আসেন। তখন আমি চলচ্চিত্র অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাই। ওটা আয়োজন করেছিল ‘সায়েন্স সিনে ক্লাব’। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজেকে একভাবে প্রস্তুত করা। চলচ্চিত্র দেখাতেই আনন্দ ছিল, তখনো চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা আমাদের মাথায় আসেনি।
ফৌজিয়া : ফিল্ম বানানোর কথা কবে থেকে ভাবলেন?
মানজারেহাসীন : ফিল্ম বানানোর কথা খুব যে জোরেশোরে ভেবেছি – তা নয়। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ-আয়োজিত চলচ্চিত্র কর্মশালা শেষ করার পর থেকেই ভাবছিলাম, সরাসরি ফিল্ম না বানিয়ে যদি কোথাও পড়তে যাওয়া যায়। ১৯৮৩ সালে চেক সরকারের বৃত্তি পেয়ে আমি চেকোস্লোভাকিয়ায় যাই। আমি গিয়েছিলাম ফিল্ম ডিরেকশন পড়তে। পড়া শেষে ১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে আসি।
ফৌজিয়া : আমাদের দেশে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন কীভাবে শুরু হলো? একজন সক্রিয় সংগঠক এবং কর্মী হিসেবে এই আন্দোলনকে এখন আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
মানজারেহাসীন : স্বাধীনতার পর থেকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের মধ্যে ছিলাম। তখন থেকেই আমরা ভাবতাম, দেশ-বিদেশের ছবি দেখে আমাদের রুচি উন্নত করব, নাকি এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকেও যাব? এটা নিয়ে দ্বন্দ্ব কিন্তু সবসময় চলচ্চিত্র সংসদগুলোর মধ্যে ছিল – অন্তত তখন ছিল; এখন অবশ্য কমে এসেছে দ্বন্দ্বটা।
আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের ওপর সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় যে অনুশাসনগুলো আছে সেগুলো একলা ফেস করা যায় না। সেই সময় – আমি মধ্য আশির কথা বলছি, তখন কিন্তু একে অন্যকে সহায়তার ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই উপলব্ধি থেকেই এই ধারার নির্মাতাদের একত্রিত হবার প্রয়োজন দেখা দেয়। একটা সংগঠনের আওতায় এসে তাদের ইউনিফায়েড ভয়েস এবং সেই স্ট্রেংথটাকে ব্যবহারের চেষ্টা দেখা দেয় এবং তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮৬ সালে জন্ম হয় বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম। আমি সবসময়ই বলি, বিকল্প ধারার প্রথম চলচ্চিত্র হচ্ছে জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড; আর বিকল্প ধারার আন্দোলনের প্রথম চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে আগামী এবং হুলিয়া। স্টপ জেনোসাইড বিবেচনা করলে দেখব – তার বিষয়, এক্সপ্রেশন, মোড অব প্রডাকশন – সবই বিকল্প ধারার।
দ্বিতীয় যে-বিষয়টা বলা দরকার, বিকল্প বলতে কী, কিসের বিকল্প? বিকল্প বলতে তখন আমরা বলেছিলাম, চলচ্চিত্র হবে এমন শিল্প, যা মানুষের ভাবনা উজ্জীবিত করবে, বোধকে আরো বেশি করে জাগ্রত করবে, ইতি-নেতির পার্থক্যটা আরো সচেতনভাবে সামনে আনবে, মানুষকে ভবিষ্যমুখী স্বপ্ন দেখতে এবং তার সময়কার বাস্তবতা ডকুমেন্টেশনে সহায়তা করবে। এই জিনিসগুলো তখন আমাদের সিনেমা থেকে অনুপস্থিত হতে হতে এমন একটা জায়গায় গিয়ে ঠেকেছিল – যেখানে সিনেমা কেবল কিছু অডিও-ভিজুয়াল রিপ্রডাকশনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেটা রিপ্রেজেন্টেশন না বলে বলা ভালো বিকৃত উপস্থাপনা। সেই জায়গা থেকে চলচ্চিত্রকে ফিরিয়ে আনার যে-উদ্যোগটা সেটাই কিন্তু আমাদের বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলন। এর একটা ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়েছে। বড় ইমপ্যাক্ট হচ্ছে, প্রথাগত চলচ্চিত্র নির্মাণে ইনফ্রাস্ট্রাকচারের বাইরে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা গেছে।
প্রতিটি আন্দোলনে একটা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনকে অ্যাড্রেস করে কিছু করা হয় আর কিছু লং টার্ম অবজেক্টিভস থাকে। আমরা বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের মধ্য দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনকে খুব ইফেক্টিভলি  অ্যাড্রেস করতে পেরেছি। কিন্তু ওভার দ্য ইয়ারস একটা আন্দোলনে নিজেদেরকে মোর ইফেক্টিভ করার জন্যে যে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করতে হয়, এটাকে সচল রাখতে হয়, একে সজীব রাখতে হয় – সেইটি হয়তো আমরা করতে পারিনি। আমাদের প্রধান প্রধান নির্মাতা-সংগঠক অনেক বেশি করে প্রফেশনাল বিষয়ের দিকে ঝুঁকে গেছেন। তার ফলে নানাভাবে আমাদের কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে।
আরেকটা বড় ব্যাপার, আমরা আমাদের ধারার আন্দোলনের কোনো শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, অ্যাসথেটিকে কোনো কমন ল্যাঙ্গুয়েজ নেই – যেটা ডিসটিংক্টিভলি অন্যদের থেকে আমাদের আলাদা করে দেবে। তার ফলে আমাদের ধারার যারা সূচনাকারী-পাইওনিয়ার ফিল্মমেকার – তাঁরাই একসময় বলেছেন যে, বিকল্প বলে কোনো কিছু নেই। কোনো সময় এমনও উচ্চারিত হয়েছে যে, বিকল্প ধারা ক্রমশ মূলধারায় রূপান্তরিত হবে। এটা তো কোনো দেশে হয়নি, হওয়ার মতনও না। বিকল্প ধারাটা সবসময়ই একটা আভাঁ গার্দ ধারা। এই আভাঁ গার্দ ধারাটা যত সক্রিয় থাকবে, তত বেশি করে মূলধারা পালটাতে থাকবে। আভাঁ গার্দ কখনো শেষ হবে না, মূলধারাও কখনো শেষ হবে না; এটা পৃথিবীর কোনো দেশে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হয়নি। একটা শক্তিশালী বিকল্প ধারার উপস্থিতি বাণিজ্যিক ধারাটাকে আস্তে আস্তে প্রভাবিত করে। করতে বাধ্য।
ফৌজিয়া : আপনার পরিচিতি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে। এমন কি কোনো ব্যাপার আছে যে ফিকশন না, প্রামাণ্যচিত্রেই আপনি নিজেকে এক্সপ্রেস করতে চান?
মানজারেহাসীন : এরকম দিব্যি দিয়ে কাজটা শুরু করিনি। প্রামাণ্যচিত্র পাঠ এবং কিছুদিন চেকোস্লোভাকিয়ায় অবস্থানের কারণে আমার সুযোগ হয়েছিল প্রামাণ্যচিত্রের কিছু ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক্স দেখার। ওটা আমাকে খুব আন্দোলিত করেছিল – আচ্ছা এরকমও চলচ্চিত্র হতে পারে! যেসব দেশে ওগুলো তৈরি হয়েছে, সেখানকার সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা যখন জানতে পেরেছি, তখন সেটা আমাকে খুব আকর্ষণ করেছে। আর নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে কাহিনিচিত্র নির্মাণের মতন বাজেট আমি সংগ্রহ করতে পারিনি। যেভাবে যতটুকু অর্থ আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি – বেশিরভাগই এসেছে একধরনের প্রেসক্রাইবড, কমিশনড প্রডাকশনের মাধ্যমে; সেখানে মূলত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ আমি পেয়েছি। সুতরাং একটা সময় প্রামাণ্যচিত্রই প্রধানত আমার কাজের ধারা হয়ে গেছে। আমি যখন নির্মাণের মধ্যে গেছি, দেখেছি যে, প্রামাণ্যচিত্রের মধ্য দিয়ে সরাসরি বাস্তবজীবন, বাস্তব মানুষের সঙ্গে একটা দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে নির্মাতা হিসেবে আমি খুব তৃপ্ত হই, আন্দোলিত হই। ক্যামেরার মধ্য দিয়ে আরেক বাস্তবতা, আরেক অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমি নেগোশিয়েট করতে পারি – এই নেগোসিয়েশন প্রসেসটা আমার জন্যে খুব এক্সাইটিং।
আমার জন্যে সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। প্রামাণ্যচিত্র যত সরাসরি রাজনৈতিক বা সামাজিক ভাবনাকে অ্যাড্রেস করতে পারে চলচ্চিত্রের পর্দায় – প্রথাগত কাহিনিচিত্র ওটা ওভাবে পারে না। পারলেও অনেক ঘুরিয়ে, ইনডাইরেক্ট প্রসেসের মধ্য দিয়ে এটা দেখায়। একটা সময়ে মনে হয়েছে, আমি যে-ধারাটি নিয়ে কাজ করছি – এই ধারাটি নিয়ে আমার এখনো অনেক কিছু করার আছে। বাংলাদেশে এই ধারাটি যদি প্রতিষ্ঠা পায় এবং এই ধারায় যদি আমি আরো নতুনদের আগ্রহী করে তুলতে পারি, তাহলে আমাদের দেশে সামগ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণে যে-ধারাটি অবহেলিত ছিল, সেটি প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। আমি মনে করি যে, এটিও কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ না। কিন্তু এখানে প্রধান যে-বিষয়টি আমার মাথায় ছিল, কাহিনিচিত্রই হোক বা প্রামাণ্যচিত্রই হোক – চলচ্চিত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হতে হবে। এর বিষয়-ভাবনা, এর প্রকাশভঙ্গি, এর কারিগরি উৎকর্ষ শিল্পসম্মত হতে হবে। আমার মনে হয় যে, আমাদের এই ব্যাপারটি খুব কম চলচ্চিত্রই উতরাতে পেরেছে – আমিও এর থেকে বাদ যাই না।
ফৌজিয়া : আপনার বানানো চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলি আমরা। চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ফিরে ছবি বানাতে শুরু করলেন?
মানজারেহাসীন : ফিরে কিছুদিন বিজ্ঞাপনচিত্র বানিয়েছি। পরে মনে হলো, এই মাধ্যমটা ঠিক আমার জন্য না। তারপর থেকে পূর্ণকালীন চলচ্চিত্র নির্মাণে এলাম। সুফিয়া কামালকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের শুরুটা হয় ১৯৮৯ সালে। একই সময়ে গে্যঁটে ইনস্টিটিউট-জার্মান কালচারাল সেন্টার এবং বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম একটা ওয়ার্কশপ করে। জার্মানি থেকে ক্রিস্তভ উভনার এসেছিলেন। ওই ওয়ার্কশপে তিনজনের একটা ডিরেক্টরিয়াল টিম তৈরি করা হলো; টিমে ছিলাম আমি, তারেক মাসুদ এবং তানভীর মোকাম্মেল। আমরা ছিলাম ডিরেকশনে; বেবী ইসলাম এবং মিশুক মুনীর ছিলেন ক্যামেরায়। ক্রিস্তভ উভনার ছিলেন ডিরেক্টরিয়াল অ্যাডভাইজার। শুটিং মোটামুটি আমরা সকলে মিলেই করি – তানভীর, তারেক, আমি এবং ক্রিস্তভ। পরে তানভীর এবং তারেক নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তখন পোস্ট প্রডাকশনের কাজটা আমি করেছি। ১৬ মিলিমিটারে ছবিটি নির্মিত হয়েছিল। ওটা ছিল জেলেদের নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র  – কৃষ্ণনগরে একদিন, শেষ হয় ১৯৯৩ সালে। এরপর একটা কাজ পেলাম – বিল ডাকাতিয়ার কথা। ওটা পাওয়ার পর মনে হলো, আমি যে-বিষয়ে কাজ করতে চাই, তার কাছাকাছি কাজ পাওয়া গেছে।
ফৌজিয়া : আপনি প্রায়ই এক্সপেরিমেন্টাল ছবির কথা বলেন। আপনার বানানো ছবিগুলো আবার অনেক বেশি ন্যারেটিভ। এই ব্যাপারটা আপনি কীভাবে দেখেন?
মানজারেহাসীন : অনেক বেশি ন্যারেটিভ, ঠিক এই কথাটায় অতটা সায় নেই আমার। শুরুর দিকের ছবি যদি বলি – যে-কাজটা প্রথম শুরু করেছিলাম, অপরাজিতা। সুফিয়া কামালের বায়োগ্রাফিক্যাল ছবি। সেটি এক ধরনের ন্যারেটিভ। ন্যারেটিভ বলতে যদি বলি সাদামাটা গল্প বা ধারাবাহিকতা রেখে একটা ছবি করা – সেটা আছে। ওই অর্থে নিরীক্ষাধর্মী ছবি – সেটা তো আমি বানাইনি। আমি বানাতেও চাই না। কেবল ফর্মের এক্সারসাইজ চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে, দৃশ্য নিয়ে বা শব্দ নিয়ে – আমি সেই ধরনের ছবি নির্মাণ করতেও চাইনি কখনো। কিন্তু আমি চেয়েছি এমন একটা চলচ্চিত্র ভাষা তৈরি করতে, যেখানে পুরনো ফর্মের মধ্যেই নতুন নতুন কিছু অনুষঙ্গ যুক্ত করা যায়। কতটা সফল হয়েছি জানি না। সেদিক থেকে আমার মনে হয় যে, বিল ডাকাতিয়ার বৃত্তান্তে কিছু কাজ ছিল। যেমন ধরুন, বিল ডাকাতিয়ার বৃত্তান্তে সাবজেক্টিভ ভিউকে আমি খুব সরাসরি এনেছি। বিশ্ব সিনেমায় এই ট্রিটমেন্ট আছে। আমি চেষ্টা করেছি ভিজুয়ালি অবজেক্টিভ থেকে কমেন্ট্রিতে সাবজেক্টিভ ভিউটা ইমপোজ করতে। সেই কমেন্ট্রি একজন ফিল্মমেকারের সাবজেক্টিভ পারস্পেকটিভ থেকে পারসোনাল মনোলগের মতন করে এসেছে, প্রথাগত কমেন্ট্রির মতন নয়। কিছু কিছু জায়গায় দৃশ্য – বিশেষত সংগীতের ব্যবহার আমি চেষ্টা করেছি একটু অন্যভাবে করতে।
ফৌজিয়া : কী রকম সেটা?
মানজারেহাসীন : আমি চেষ্টা করেছি সংগীতের ব্যবহার সবসময় যাতে ইলাস্ট্রেটিভ না হয়। যন্ত্রসংগীতের ব্যবহার আমার ছবিতে কম। একমাত্র অপরাজিতাতে যন্ত্রসংগীতের ব্যবহার একটু উচ্চকিত। ছবিতে কণ্ঠসংগীতের ব্যবহার – ওটাই মূলত আমার সংগীত। কণ্ঠসংগীতে আমি ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহারের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, দৃশ্যের সঙ্গে শব্দের যোগটা, বিশেষত ইনস্ট্রুমেন্টাল সাইডের যোগটা সবসময় খুব যায় না। যেখানে অ্যামবিয়েন্সের পার্ট হিসেবে গানটা আসছে, সেখানে যদি ইনস্ট্রুমেন্ট থাকে সেটা তো থাকেই। তাছাড়া কিন্তু আমি ছবিতে যন্ত্রানুষঙ্গে গান ব্যবহার করি না।
রোকেয়া যদি দেখেন – ওখানেও কমেন্ট্রিতে সাবজেক্টিভ ট্রিটমেন্টটা আছে। রোকেয়াতে আমি ইফেক্টিভলি কনস্ট্রাকটেড ইমেজ এবং ডকুমেন্টারি ইমেজ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলাম। এটাকে আপনি রিকনস্ট্রাকশন বলতে পারবেন না, কিন্তু ইটস এ কাইন্ড অব কনস্ট্রাকটেড ইমেজ – লাইফ ফিকশন ইমেজ। এটা ঠিক প্রথাগত রিকনস্ট্রাকশন নয় – ডকুমেন্টারিতে যে-কারণে পাস্টকে রিকনস্ট্রাক্ট করা হয়। এটা এমনভাবে করা যে, ডকুমেন্টারিটাকেই কনটেম্পোরারি আসপেক্টে প্রেজেন্ট করছে। খেয়াল করে দেখবেন, দুটোর লাইটিং-টাইটিং – সব কিন্তু আলাদা। ডকুমেন্টারি ইমেজ থেকে নন-ডকুমেন্টারি ইমেজ, মানে কনস্ট্রাকটেড ইমেজের ট্রানজিশনগুলো মোটামুটি রিজনেবল হয়েছে। এইভাবে যদি আমার ছবিগুলো দেখেন – আমি বলব না এগুলো এক্সপেরিমেন্ট অ্যাজ সাচ – কিন্তু একটু অন্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি।
আমি বলব, আমার আমাদের ছেলেরা অনেক বেশি করে নন-ন্যারেটিভ সিনেমা। দেয়ার ইজ নো সেন্ট্রাল স্টোরি অ্যাজ সাচ। এটা   ভাবনার ছবি অন মাসকুলিনিটি র‌্যাদার দ্যান অ্যাবাউট স্টোরিজ অব ডিফারেন্ট ক্যারেকটারস। একটা সিকোয়েন্স থেকে যখন আরেকটা সিকোয়েন্সে যাচ্ছে, তখন এমন অ্যাবরাপ্টলি যাচ্ছে যে একটা ন্যারেটিভ তৈরি হতে হতে সাম পয়েন্টে ভেঙে যাচ্ছে ওটা। কনসাসলি ওটা ভাঙা, যাতে ওই ন্যারেটিভটা তৈরি না হয়। কারণ, ছবিটা কোনো ভাবনার কংক্রিট কোনো ইমেজও দেয় না। কারণ, দেয়ার ইজ নো প্রেসক্রাইবড থট অ্যাবাউট মাসকুলিনিটি। ছবিটা তৈরিই করা হয়েছে এই ভাবনা থেকে যে, লেটস থিঙ্ক অ্যাবাউট মাসকুলিনিটি – এটাই বলার জন্য। সেই কারণে কিন্তু আমাদের ছেলেরায় এই জিনিসগুলো করার চেষ্টা করেছি আমি।
আপনি যদি আমার চারুকলায় মুক্তিযুদ্ধ দেখেন, তাহলে দেখবেন যে ওখানে ভিজুয়াল এক্সপেরিমেন্টেশনটা একটু বেশিই আছে। একটা হিস্টোরিক্যাল পাস্ট এবং তার ইমপ্যাক্টকে আপনি কী করে রিলেট করবেন – সরাসরি ইমপ্যাক্ট নয় – একটা ক্রিয়েটিভ মাধ্যমে তার রিফ্লেকশনের তো সরাসরি কিছু নেই। সবচেয়ে ডিজাস্ট্রুয়াস হয়েছিল শিল্পী হাশেম খানকে নিয়ে করা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন-প্রযোজিত ছবিটি। এখানে আমি রিয়ালিটির সরাসরি রিপ্রেজেন্টেশন কীভাবে উনার ছবিতে আসছে, ওটা দেখাতে গিয়ে হাস্যকর একটা ট্রিটমেন্ট করেছিলাম। রিয়ালিটি ইমেজ এবং তাঁর পেইন্টিং পাশাপাশি স্ক্রিনে রেখে জাক্সটাপোজ করেছি – তাতে ওটা একটা হাস্যকর জিনিসে পরিণত হয়েছে।
যারা এক্সপেরিমেন্টাল ছবি বানিয়েছেন – পিওর অ্যান্ড সিম্পল ভিজুয়াল এক্সারসাইজ – কোনো থিম নিয়ে কাজ করেননি, কোনো বক্তব্যও না, কোনো গল্পও না, কোনো প্লটও নেই – সেই ধরনের ছবি তো আমি বানাতে চাইনি। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, আমাদের ছবিগুলো তো একটু ভিন্ন ধারার ছবি – প্রামাণ্যচিত্র, ‘প্রামাণ্যচিত্র’। এর প্রতি দর্শকের একধরনের অনীহা আছে, আগ্রহ কম। তার পরে যদি আবার ওই ধরনের এক্সপেরিমেন্টে যাই, তাহলে দর্শক অনেক ছোট হয়ে আসবে। আর আমার চলচ্চিত্র-ভাবনার সঙ্গে রাজনৈতিক-সামাজিক ভাবনা যুক্ত। আমি চাই, অনেক বেশি দর্শকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে। কমিউনিকেট করার মধ্য দিয়ে নতুনভাবে কী করা যায়, সেটা করার চেষ্টাটা আমি করার চেষ্টা করেছি। আমার সবসময়ই মনে হয়েছে, প্রথাগত চলচ্চিত্র-ভাবনা বা স্টাইলের মধ্যে থেকেও যদি একটু অন্যভাবে ভাবা যায়।
ফৌজিয়া : হেনা দাসকে নিয়ে নির্মিত আপনার প্রামাণ্যচিত্রটি বেশ বড় ছবি। নব্বই মিনিট দীর্ঘ। আমার যতদূর মনে পড়ে, আপনি ফিচার লেংথ ডকুমেন্টারির কথা বলেন। কেন? ফিকশন ছবির সচরাচর একধরনের দৈর্ঘ্য থাকে, সেই জন্যে কি?
মানজারেহাসীন : না, না। ফিকশনের ডিউরেশনে প্রামাণ্যচিত্র করতে চাই – ব্যাপারটা এমন নয়। আমাদের দেশে সবসময় ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, ডকুমেন্টারি হবে শর্ট লেংথের। এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণটা এরকম যে, ডকুমেন্টারি এতক্ষণ লোকে দেখে না। এটার কারণটা কী? ধরেই নেওয়া হয়, ডকুমেন্টারি এমন কিছু দেখায় না যা মানুষের আকর্ষণকে লম্বা সময় ধরে রাখতে পারে। ফিকশনের জন্য কিন্তু মানুষ উলটোটা চিন্তা করে – এটা শর্ট না হয়ে লম্বা ফিকশন কি না। আমার সবসময় মনে হয়, এমন কোনো সাবজেক্ট ডিল করা যায় কি না, যে-সাবজেক্ট ডিমান্ড করে পর্দায় একটা লম্বা সময় – তাহলে হয়তো এই ট্যাবুকে কিছুটা নাড়া দিতে পারব। এটা হচ্ছে একটা পয়েন্ট। আরেকটা পয়েন্ট, আমি কোনো ফিল্মকে এখন আর টেলিভিশনের টাইমিংয়ের মধ্যে বাঁধতে চাইছি না। কারণ আমি মনে করি, ফিল্মের এখন আবার আলাদা জায়গা নতুন করে তৈরি হতে হবে। এখন পোস্ট টেলিভিশন ফিল্ম হতে হবে। ছবি যে-কোনো লেংথের হতে পারে। তৃতীয়ত, আপনি যদি সেরকম একটা সাবজেক্ট নেন, যে-সাবজেক্ট ইটসেলফ ডিমান্ডস একটা লম্বা স্পেস – একটা লম্বা ট্রিটমেন্ট, তাহলে আপনি সেটা কেন নেবেন না? আমি খুব ফরচুনেট যে, হেনা দাসের ওপর ছবিটা – অভিযাত্রী, দর্শকরা কিন্তু আমাকে বলেননি ওটা বোরিং হয়েছে, আননেসেসারি লম্বা হয়েছে। আসলে প্রত্যেক মানুষের একটি হিস্টোরি থাকে, সেই হিস্টোরি আবার জাতীয় হিস্টোরি পার্ট হয়ে ওঠে। তার মধ্যে আপনি সোশ্যাল-পলিটিক্যাল হিস্টোরি পাবেন। তাঁরা হচ্ছেন সেই ধরনের মানুষ, যাঁদের জীবনের মধ্য দিয়ে সেই সময় এবং সেই সমাজের রিফ্লেকশনটা পাওয়া যায়। আপনি যদি অভিযাত্রী দেখেন, দেখবেন – ব্যক্তি হেনা দাস অত প্রমিন্যান্ট নয়; তাঁর সময়টা অনেক বেশি প্রমিন্যান্ট। ইনডিভিজুয়ালের মধ্য দিয়ে তাঁর সময়টাকে দেখা সেই সময়ের জাতীয় ইতিহাসকে দেখারও ব্যাপার এটা। অভিযাত্রীতে এটা আছে, রোকেয়াতেও সেটাই আছে।
ফৌজিয়া : আমরা এবার ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে আসি। টেকনোলজিক্যাল নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র এখন ডিজিটাল যুগে ঢুকে পড়েছে। এর কারিগরি একটা দিক আছে। টেকনোজিক্যাল এই আসপেক্টের কারণে ফিল্মের এক্সপ্রেশনে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?
মানজারেহাসীন : অডিও-ভিজুয়াল রেকর্ডিং এবং রিপ্রডাকশন – টেকনোলজি-নির্ভর; এই টেকনোলজি যত পরিবর্তন হবে – কম হোক, বেশি হোক আমাদের নির্মাণ প্রদর্শন-প্রক্রিয়াতে তার প্রভাব থাকবে। ডিজিটাল টেকনোলজি আসার পরে নতুন কিছু সম্ভাবনা তৈরি করছে। কারণ, এটা এমন একটা টেকনোলজি যেখানে রেকর্ডেড ভিজুয়াল এবং সাউন্ডকে আপনি ক্রিয়েটিভলি অনেকভাবে ম্যানিপুলেট করতে পারেন। অর্থাৎ আপনার এক্সপ্রেশনের হরাইজনটাকে অনেক বড় করে দিচ্ছে। এখন এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব, যেটা ফিল্ম ফরম্যাটে সম্ভব নয়। যেমন ধরুন, কম্পিউটার বেজড ভার্চুয়াল রিয়ালিটি – যেটা মূলত সায়েন্স ফিকশন বা অন্যান্য ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা নতুন ধরনের ভিজুয়াল তৈরি করতে পারছি। ফিল্মে আগে ইমেজের বিশ্বাসযোগ্যতা এক বড় বিষয় ছিল। ডিজিটাল টেকনোলজিতে এখন কিন্তু আপনি ইমেজের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আইদার বাড়িয়ে দিতে পারেন, অর্থাৎ হাইপার রিয়ালিজমের দিকেও যাওয়া যায়, আবার অবিশ্বাস্য রিয়ালিজমও তৈরি করা সম্ভব। যাকে আমরা বলছি ভার্চুয়াল রিয়ালিটি। এ দুটি বিষয়কে সদর্থে ব্যবহার করে নতুন ধরনের সিনেমা বা নতুন ধরনের অডিও-ভিজুয়াল নির্মাণ।
স্বল্প বিনিয়োগে এমন টেকনোলজি আমরা পাচ্ছি, যা গ্র্রহণযোগ্য  অডিও-ভিজুয়াল রেকর্ডিং এবং রিপ্রডাকশনের সুযোগ দিচ্ছে। তার ফলে অনেক বেশি মানুষ সেলফ এক্সপ্রেশনের জন্য অডিও-ভিজুয়ালকে ব্যবহার করতে পারছে; ট্র্যাডিশনাল ফিল্ম প্রডাকশনে এই সুযোগটা ছিল না। একটা ৩৫ মিলিমিটার ক্যামেরা দিয়ে আপনি আপনার জীবনের দিনলিপি ভিজুয়ালাইজ করতে পারবেন না। সম্ভব নয়; কিন্তু এখন ডিজিটাল ক্যামেরায় এটা সম্ভব। তার ফলে আমরা নতুন ধরনের এক্সপেরিয়েন্স, নতুন ধরনের ইমেজ, নতুন ধরনের ভাবনাকে পর্দায় দেখার সুযোগ পাচ্ছি। এতে সমগ্র সিনেমার চরিত্রটাকেই পালটে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সিনেমা অনেক বেশি করে নতুন সিনেমার দিকে যাচ্ছে। কথার কথা, উইদাউট ক্যামেরা সিনেমা বানানোর যে-সুযোগ – কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজ দিয়ে – তার উদাহরণও কিন্তু আমাদের সামনে আছে। রাশান আর্কের মতন ছবি, যেটা এক শটের সিনেমা; এটা ট্র্যাডিশনাল টেকনোলজিতে সম্ভবই ছিল না। বা রিটার্ন অব দ্য ক্লোন, স্টার ওয়ারস-২ – এ ধরনের বিগ বাজেটের কম্পিউটার জেনারেটেড ছবি কিন্তু আগে তৈরি করার কোনো স্কোপই ছিল না। আবার সেলিব্রেশনের মতন একেবারে লো অ্যান্ড টেকনোলজি দিয়ে বিশ্ব কাঁপানো ফিকশন ফিল্মও তৈরি করার কথা কিন্তু ভাবা যেত না। রাশান আর্ক ওয়ান শট ফিল্ম। আসলে ওয়ান শট মানে তো শুধু ওয়ান শট নয়, ওয়ান শট মানে আসলে ওখানে ফিল্মের ল্যাঙ্গুয়েজটাকেই পালটে দেওয়া হয়েছে, ফিল্মের ন্যারেটিভটাকে পালটে দেওয়া হয়েছে। এই যে টাইমকোড বলে বিখ্যাত একটা ডিজিটাল ফিল্ম আছে, যেখানে একই স্ক্রিনকে চারটা স্পি­ন্ট করে চারটা ইমেজ ব্যবহার করেছেন পরিচালক। একই গল্পের চারটা ভার্সন সিমালটেনাসলি চলছে। মনে হতে পারে, এটা খুব ডিসটার্বিং হবে – কিন্তু দেয়ার আর পসিবিলিটিজ টু টেল ইয়োর স্টোরি ডিফারেন্টলি।
কিছুদিন আগে থাই এক ফিল্মমেকারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। উনি একজন মঙ্ক, ব্যাংককের বাইরে থাকেন, সিনেমা বানান। তিনি ডকুমেন্টারি জাতীয় সিনেমা বানান মাঝেমধ্যে। বেশ নাম করেছেন উনি।  উনি একটা স্লোগান দেন – ওয়ান ক্যামেরা অ্যান্ড ওয়ান কম্পিউটার ক্যান ক্রিয়েট অ্যা মুভমেন্ট অব নিউ ফিল্ম। উনি বলছেন, আমার কাছে যদি একটা ক্যামেরা থাকে আর কম্পিউটার থাকে, তাহলে নতুন সিনেমা
বানাবার আন্দোলন করতে পারি আমি। এটা কী – এটা তো ওয়ান ম্যান সিনেমাটোগ্রাফি, ওয়ানম্যান ফটোগ্রাফি, ওয়ানম্যান ফিল্ম মেকিং। এর মধ্য দিয়ে কোলাবোরেটিভ প্রসেসে ফিল্মমেকিংয়ের নেগেটিভ আসপেক্টকে কিন্তু খুব সহজে আমরা ডিসকার্ট করতে পারব। একজন ইনডিভিজুয়াল মানুষ তার ইনডিভিজুয়াল স্কিল দিয়ে একটা ফিল্ম তৈরি করতে পারবে। অন্যান্য ক্রিয়েটিভ আর্ট ফর্মের শিল্পীর মতন এখন একজন ফিল্মমেকার নিজের শিল্প সৃষ্টি করতে পারবেন। আবার আপনি চাইলে ফিল্মমেকিংয়ের কোলাবোরেটিভ প্রসেসের মধ্যেও এই টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারেন।
ইয়োনেস মেকাস বলে আমেরিকায় বিখ্যাত একজন এক্সপেরিমেন্টাল ডকুমেন্টারি মেকার কাম কিউরেটর আছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, প্রতিদিন একটা করে ছবি বানাবেন। তাঁর ওয়েবসাইটে গেলে দেখবেন, একশ কয়টা ছবি যেন তিনি পোস্ট করে দিয়েছেন। নানা লেংথের ছবি। এই যে নতুন ধরনের ফিল্মিক এক্সপ্রেশন তৈরি হয়েছে, এর যে সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছে – এটা কিন্তু ডিজিটাল টেকনোলজির জন্যেই হয়েছে। ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে তো আরো বলব। ডিজিটাল টেকনোলজি কিন্তু ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউশনের হরাইজনটাকেও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এগনেস ভার্গা, যাকে বলা হয় মাদার অব নিউ ওয়েভ – ফরাসি নিউ ওয়েভ; বয়স হয়েছে আশি বছর। কিছুদিন আগে তাঁর একটা ছবি দেখছিলাম। তিনি এখন যে ছবিগুলো বানান সবই কিন্তু ছোট হ্যান্ডিক্যাম ক্যামেরায়। এই যে গ্লিনারস অ্যান্ড আই বলে যে ছবিটা আমরা এখানে দেখিয়েছি – সেটা একটা জগদ্বিখ্যাত ছবিতে পরিণত হয়েছে। একেবারে কনজিউমার ভিডিও ফরম্যাটের ছবি। এই ধরনের ছবি কিন্তু ট্র্যাডিশনাল ফিল্ম ফরম্যাটে বানানো সম্ভব নয়।
ফৌজিয়া : আপনি যে ফিল্মের উদাহরণগুলো দিলেন, সেগুলো সব বাইরের ছবি। বাংলাদেশে এমন ডিজিটাল ফিল্মের নজির কিছু আছে কি?
মানজারেহাসীন : আমি বলব যে, এই জায়গাটার ক্ষেত্রে আমাদের একটু চিন্তার দুর্বলতা আছে। আমাদের দেশে ফিল্মমেকিংয়ের ক্ষেত্রে  – সেটা ডকুমেন্টারি বা ফিকশন যা-ই হোক না কেন – ডিজিটাল টেকনোলজিকে বিবেচনা করা হচ্ছে এভাবে, এ-দিয়ে ফিল্ম-ফরম্যাটের কাছাকাছি কাজ করা যায়। এখানে আমার মনে হয় যে, একটু বোঝার ভুল আছে – মানে বোঝার একটু খামতি আছে। এখানে আটকে থাকলে ডিজিটাল টেকনোলজির পূর্ণাঙ্গ সুযোগটা আমাদের নেওয়া সম্ভব হবে না। ডিজিটাল টেকনোলজি যে ইটসেলফ অডিও-ভিজুয়াল প্রডাকশনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে – সেটা কিন্তু আমাদের দেশের ছবিতে তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। কিছু ছোটখাটো উদাহরণ আছে। যেমন বলা যায়, ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে ইয়াসমীন কবীরের কাজগুলো। ওয়ান পারসন সিনেমা মেকিংয়ের কাছাকাছি সে গেছে। তার রিসেন্ট ছবিতে অবশ্য পোস্ট প্রডাকশনে সে অন্য অনেক মানুষের সাহায্য নিয়েছে – বিশেষ করে কালারিংয়ের ক্ষেত্রে। কিন্তু শুটিং পর্যায়ে সে ওয়ান পারসন টেকনোলজি ব্যবহার করেছে। তার ফলে এমন কিছু ইমেজ সে ক্যাপচার করতে পেরেছে, যে ইমেজগুলো খুব কাজের ইমেজ। আমরা ডকুমেন্টারি ক্ষেত্রে অল্প কিছু চেষ্টা করছি। আমি শিল্পী রফিকুন নবীর ওপর যে-ছবিটা বানিয়েছি – স্মৃতির শহর, সেখানে আমি এইচডিভি ফরম্যাটটাকে ব্যবহার করেছি। তার ফলে ইমেজে যে-কালার আমি পেয়েছিলাম, কালার রিপ্রডাকশন যেটুকু হয়েছিল – সেটা কিন্তু অনেক আর্টিস্ট দেখে আমাকে বলেছিলেন, এরকম কালার আমরা সিনেমায় দেখিনি। এটা আমার কৃতিত্ব নয়। কৃতিত্ব ওই এইচডিভি ফরম্যাটের। এইচডিভিতে ধারণ করা ইমেজের রেজুলেশন বেশি, কালার স্যাচুরেশনের মাত্রা অনেক বেশি। যিনি ক্যামেরা পারসন (মাকসুদুল বারী), তিনি লাইটকে প্রপারলি কন্ট্রোল করে ওই কালারটা নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিলেন।
ফৌজিয়া : ডিজিটাল টেকনোলজি চলচ্চিত্র ছাড়া অন্য কোনো ভিজ্যুয়াল মাধ্যমেও নতুন কিছু কি যোগ করছে?
মানজারেহাসীন : হ্যাঁ, করছে। আমরা জানি, সিনেমা অনেক বেশি অন্যান্য আর্ট থেকে ধার করেছে। সবচেয়ে বেশি ধার করেছে সম্ভবত পেইন্টিংস থেকে। এখন কিন্তু সিনেমার দেওয়ার পালা। আমি বলব, এই টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি বা গত সেঞ্চুরির শেষের দিকে নতুন যে ফাইন আর্টস, সে এখন যে-হারে মুভিং ইমেজ এবং সাউন্ড ব্যবহার করছে – এতে সিনেমার আবার ওই মাধ্যমকে তার ঋণ শোধ করার পালা শুরু হয়েছে। এখন নিউ মিডিয়ার আর্টিস্টরা সিনেমার প্রধান উপাদান মুভিং ইমেজকে যেভাবে ব্যবহার করছেন – তাতে মিডিয়ামগুলোর মধ্যে একটা দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সিনেমা কিন্তু ফাইন আর্টসকে অনেক বেশি করে প্রভাবিত করতে চলেছে। এটা আমাদের দেশেও দেখতে পাচ্ছি। এর মধ্য দিয়ে, আমি তো বলব, সিনেমা আরো বড় হচ্ছে, আরো মহৎ হচ্ছে। ওটাকে সিনেমা বলব না। তবে সিনেমা যখন ফাইন আর্টস থেকে নিয়েছে, তখন হুবহু তো নেয়নি। সিনেমার মতন করে সেখান থেকে আহরণ করেছে। সেটা ফ্রেমিং হোক, কালার হোক, কম্পোজিশন হোক – সিনেমার মতন করে ব্যবহার করেছে। এটা কিন্তু একটা ইন্টারেস্টিং জায়গা। ডিজিটাল টেকনোলজির কারণে কিন্তু এটা খুব বড় আকারে করা সম্ভব হয়েছে। এখানে মাল্টি মিডিয়ামের দেওয়া-নেওয়ার একটা সম্পর্ক তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফৌজিয়া : এবার আবার আপনার ছবি প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সাক্ষাৎকারের একটা পর্যায়ে আপনি বলেছেন, শুটিংয়ের সময়টা আপনার সবচেয়ে ভালো কাটে। মানুষের সঙ্গে ইন্টার‌্যাক্ট করতে ভালো লাগে। আবার আপনার ছবিতে সাবজেক্টিভ পয়েন্ট অব ভিউ ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। তো, ছবি বানানোর মধ্য দিয়ে কি নিজের সঙ্গেও একধরনের একটা ডায়ালগ হয়?
মানজারেহাসীন : প্রামাণ্যচিত্রের তো নানা ধরনের ধারা এত দিনে তৈরি হয়েছে। আমি এখন খুব কমফোর্টেবল ফিল করি দুটো মোড অব ডকুমেন্টারি এক্সপ্রেশনে। একটা যাকে অনেকে বলছে পার্টিসিপেটরি মোড। এটা হচ্ছে, যে বাস্তবতাটাকে আমি দেখব, ফিল্মমেকার এবং তার সাবজেক্টের মধ্যে ঘটা ইন্টার‌্যাকশনের একটা নির্যাস আপনি ছবিতে দেখবেন। আরেকটা হচ্ছে অবজারভেটরি মোড – যেখানে আপনি কেবল দর্শক, নির্মাতা হিসেবে আপনি যা দেখলেন তা-ই শুধু দর্শকের সামনে নিয়ে এলেন। আমি সেই জায়গাটায় দাঁড়াতে চাই না। চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে আমি ওই বাস্তবতাটাকে অনুভব করি বা ওই বাস্তবতার মধ্যে আমি ঢুকতে চাই – সেটা ব্যক্তি হোক, সেটা পরিবেশ হোক, সেটা স্থান হোক। এই ইন্টার‌্যাকশনটা আমার জন্য জরুরি। এই কারণে আমার বেশিরভাগ ছবিতে সাবজেক্টিভ ট্রিটমেন্ট থাকে কোনো না কোনো ফর্মে। কিছু কিছু সাবজেক্টিভ শট থাকে। জার্নির মতন দু-একটা শট থাকে। আমি কনসাসলি করেছি, আবার দেখেছি এডিটিং প্রসেসের মধ্যে আনকনসাসলিও করেছি অনেক সময়। শুটিংয়ের সময় ওরকম শট নিয়ে রেখেছি, যা এডিটিংয়ের সময় এসেই গেছে। এটা কিন্তু ছবিতে এমনভাবে আসে – যে-মানুষটাকে তার আগে দেখানো হয়েছে, নট নেসেসারিলি তার পয়েন্ট অব ভিউ।
আরেকটা যেটা ইদানীং আমি করার চেষ্টা করছি – এসে (Essay) ডকুমেন্টারি। সেটা যদি করতে চাই, সেটা দুভাবে হতে পারে। একটা হতে পারে, পিওর ভিজুয়াল এক্সারসাইজের মধ্যে – সেটা কেয়ারফুল সিলেকশন অব ভিজুয়ালস। আরেকটা হতে পারে ভিজুয়ালকে একটা ডেফিনিট ইন্টারপ্রিটেশনের দিকে নিয়ে যাওয়া। ওই ধরনের ছবি কিছুটা ক্রিস মার্কার শুরু করেছিলেন। ওই ধরনের ছবির প্রতি আমার আকর্ষণ আছে। আমার ইচ্ছা আছে, একটু ওই ধরনের চেষ্টা করে দেখা। আবার আমি ফিল্মমেকিং প্রসেসটাকেও হাইড করতে চাই না।
ফৌজিয়া : সামনে কী ধরনের ছবির কথা ভাবছেন?
মানজারেহাসীন : আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যে ছবি, ফুটেজ – সেগুলো বহুল ব্যবহৃত। ছবির সংখ্যা কম। নতুন ছবি আমরা সংগ্রহ করতে পারছি না। আছেও কি না জানি না। আমরা ওগুলোকে একধরনের স্টিরিওটাইপ করে ফেলেছি। আমার একটা পরিকল্পনা আছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজ যেগুলো, সেগুলোকে আমি একটা ইন্টারপ্রিটেটিভ মোডে এক্সপ্লেন করব। কোনো ইন্টারভিউ, কোনো কমেন্ট্রি টু এক্সপ্লেন অর প্রভাইড ইনফরমেশন – এগুলো কিছুই থাকবে না।
এটা আমি কিছুটা চেষ্টা করেছি। খুব ছোট আকারে। চারুশিল্পে মুক্তিযুদ্ধ যে-ছবিটা ছিল – সে-ছবির শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের একটা ভাষণ আছে। ভিজুয়ালের ওপর নির্মলেন্দু গুণের একটা কবিতার পাঠ ব্যবহার করেছি। শেষে যেখানে এসে বঙ্গবন্ধু বলছেন যে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ – ওইখানে কবিতাটি একসময় অ্যাবরাপ্টলি বন্ধ করে গুলির শব্দ আসে। আপনি যখন নির্মলেন্দু গুণের ওই কবিতা শুনছেন, তখন কিন্তু একই সেন্স প্রভাইড করছে – ইভেন একই শব্দ উনি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এটা ঠিক বঙ্গবন্ধুর মুখের শব্দ নয়। তার ফলে কিন্তু একটা বেসিক ডিফারেন্স তৈরি হচ্ছে ওখানে। ডিফারেন্সটা কী – এটা একধরনের সাবজেক্টিভ ইন্টারপ্রিটেশন। কিন্তু এটা আবার রিয়ালিটিকে ডিসটর্ট করছে না। আমার ধারণা, সেটা রিয়ালিটিকে আরো রিইনফোর্স করছে।
এই রকম করে ভাবার বড় কারণ হচ্ছে, একই ইমেজ দেখতে দেখতে একটা মনোটনি তৈরি হয়েছে। ওই ইমেজ আর আমাদের মধ্যে কোনো আবেদন সৃষ্টি করে না। কিন্তু এই ইমেজ আর আবেদন সৃষ্টি না করুক, এটাও আমরা চাই না। এটা সচেতনভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই চাই না। কারণ, এই ইমেজগুলো যদি ভুলে যাই, এর আবেদন যদি আর আমাদের মধ্যে না থাকে, তাহলে কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে যেতে বসব। সুতরাং এটার একধরনের রিভাইটালাইজেশন দরকার আছে। সেই ভাইটালাইজেশনের একটা চিন্তা থেকে এই এক্সারসাইজ – জানি না কী হবে। আমার ধারণা, এটা সফল হতেও পারে। সেখানে যদি ওই ইন্টারপ্রিটেশনটাকে জেনারেল ফর্মে আনা যায় – তাহলে হয়তো সেটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
ফৌজিয়া : অনেক আলাপ হলো। ধন্যবাদ।
মানজারেহাসীন : আপনাকেও ধন্যবাদ।
[সাক্ষাৎকার ধারণ : জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ, ২০১২]

Leave a Reply

*