logo

মাটিলগ্ন স্বপ্নদ্রষ্টা : মরণচাঁদ পাল

সি ল ভি য়া  না জ নী ন

মাটিই মানুষের প্রথম আত্মীয়; ধুলো-মাটি-কাদার পৃথিবী মানুষের যাপিত জীবনকে করেছে সহজ, সহনীয় ও আরামদায়ক এবং আনন্দময়। শারীরিক ও মানসিক দুধরনের প্রয়োজনেই আমরা মাটির দ্বারস্থ হই; মাটি আমাদের আশ্রয় দিচ্ছে, আবার শিল্পিত রূপে দিচ্ছে ব্যবহার্য ও আনন্দ-উপকরণ। মানব ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনে মৃৎশিল্পের উদ্ভব ও বিস্তার উল্লেখযোগ্য। ভৌগোলিক অবস্থান আর জলবায়ু একটি অঞ্চলের মৃৎশিল্পের বিস্তৃতিতে সহায়ক আর বাংলাদেশ ব-দ্বীপ অঞ্চল, তাই এখানকার মাটি উর্বর, মৃৎশিল্প নির্মাণের জন্য উপযোগী, এ মাটির স্থায়িত্ব অনেক বেশি। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত প্রাচীন প্রত্নসম্পদ, স্থাপত্য এদেশের মৃৎশিল্পের সমৃদ্ধ ইতিহাসের স্মারক। পরবর্তীকালে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য তৈজসপত্র, খেলনা, সাজসজ্জা, পোড়ামাটির পুতুল, অলংকার প্রভৃতি ক্ষেত্রে মৃৎশিল্পের দৃষ্টিনন্দিত ব্যবহার লক্ষণীয়। তবে মাটির দৃষ্টিনন্দন বা শিল্পিত রূপ একদিনেই সম্ভব হয়নি। বাঙালির চেতনা আর উপলব্ধিতে হয়তো ছিল কিন্তু চারুশিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক রূপে তিনি প্রথম ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে সমন্বয়ের একনিষ্ঠ উদ্যোগ নিয়েছেন।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৪৮ সালে শিল্পশিক্ষার প্রতিষ্ঠান পূর্ব   পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬১ সালে এ  প্রতিষ্ঠানে মৃৎশিল্প বিভাগ যাত্রা শুরু করে। শিল্পী মীর মোস্তফা আলী এ বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। তিনি  মৃৎশিল্প তৈরির প্রক্রিয়া দেখা এবং শেখার জন্য রায়েরবাজার এলাকার পাল সম্প্রদায়ের কাছে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। কিন্তু পালশিল্পীরা তাঁকে শেখানোর ক্ষেত্রে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। কারণ এই শিল্প মূলত বংশপরম্পরায় এগিয়ে যায় বলেই ধারণা ছিল। এই সময়ে শিল্পী মীর মোস্তফা আলী লক্ষ করেন, এক কিশোরের আশ্চর্য দক্ষতা! এই কিশোর হুইল থ্রোইংয়ের মাধ্যমে চমৎকার সব মৃৎশিল্প দ্রুততায় বানিয়ে চলেছেন – নাম লক্ষ্মীনারায়ণ পাল। শিল্পাচার্যকে মীর মোস্তফা জানিয়েছিলেন এই কিশোরের প্রতিভার কথা। আর শিল্পাচার্য এই কিশোরকে কোনো ধরনের অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু তার কারিগরি দিক বিবেচনা করে ভর্তি করে নিয়েছিলেন মৃৎশিল্প বিভাগে। এই সিদ্ধান্ত যে যুগান্তকারী ছিল তা পরবর্তীকালে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শিল্পী মীর  মোস্তফা আলী এবং জাপানি মৃৎশিল্পী কোইচি তাকিতার তত্ত্বাবধানে অল্প কজন ছাত্র নিয়ে বিভাগের সূচনা ঘটে। লক্ষ্মীনারায়ণ কখন মরণচাঁদ পাল হয়ে ওঠেন, তার প্রকৃত তথ্য পাওয়া না গেলেও সূত্রমতে শিল্পাচার্য তাঁকে এই নামে প্রতিষ্ঠিত করেন। শিল্পী মরণচাঁদ সেই শুরু থেকে দক্ষতা আর কর্মনিষ্ঠায় মৃৎশিল্প বিভাগ থেকে সফলভাবে লেখাপড়া শেষ করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি মৃৎশিল্পের বিভাগীয় শিক্ষক হিসেবে চারুকলা অনুষদে যোগদান করেন।

মরণচাঁদ পাল বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৪৫ সালে রুদ্রপাল সম্প্রদায়ের সাধারণ এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রতিভাধর শিল্পী মরণচাঁদ পাল। পারিবারিক ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে আধুনিক শিল্পশিক্ষার সংমিশ্রণে মৃৎশিল্পে প্রাণের জাগরণ সৃষ্টি করেন তিনি।

শিল্পীর দক্ষতাকে চিন্তা আর বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে উপস্থাপন করা হয় শিল্পকর্মে। বাংলাদেশের লোকশিল্পের ঐতিহ্য আর সৃষ্টিশীলতার সংমিশ্রণে শিল্পী মরণচাঁদ সৃজন করেছেন নতুন ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম, যা পরবর্তীকালে একটি ঘরানার সৃষ্টি করেছে। শিল্পী মরণচাঁদ বাংলার বিলুপ্তপ্রায় টেপা পুতুলকে নিজস্ব সৃজনশৈলীতে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি শিল্পকর্মে মূল ফর্ম এ-অঞ্চলের বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে গ্রহণ করেছেন এবং নিখুঁত যত্নে নিজস্ব    চিন্তা সংযোজন করে স্বাতন্ত্র্য নির্মাণ করেছেন। ফর্ম ভাঙার দক্ষতা, ফর্মের সরলীকরণ, দেশীয় প্রকাশভঙ্গি, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মৃত্তিকার জাদুকর হিসেবে সমাদৃত করে এই শিল্পীকে।

বাংলাদেশ হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ মৃৎশিল্পী হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন থেকে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসেবেও পুরস্কৃত হন। কারিকা বাংলাদেশ হস্তশিল্প সমবায় ফাউন্ডেশন লিমিটেড কর্তৃক ২০০০ সালে মাস্টার ক্র্যাফটসম্যান সম্মাননা প্রদান করা হয় তাঁকে। আর জাতীয় কারুশিল্পী পরিষদ থেকে ২০০১ সালে ‘শিলু আবেদ পুরস্কার’ লাভ করেন।

শিল্পী মরণচাঁদ দীর্ঘ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগে শিক্ষকতা করেন। এছাড়া তিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কারিকা বাংলাদেশ হস্তশিল্প সমবায় ফেডারেশন লিমিটেডের পরিচালকের দায়িত্ব এবং ১৯৭৬-৭৭ পর্যন্ত সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শিল্পী মরণচাঁদ পালের শিল্পকর্ম বিভিন্ন দেশকে উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। ‘মা ও শিশু টেপা পুতুল’ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরকালে প্রদান করা হয়, যা বর্তমানে হোয়াইট হাউসে সংরক্ষিত রয়েছে। ফোকলোর প্রফেসর হেনরি গ্লাসি তাঁর আর্ট অ্যান্ড লাইফ ইন বাংলাদেশ গ্রন্থে শিল্পী মরণচাঁদ পালের শিল্পীজীবন এবং শিল্পকর্মের ওপর গবেষণা সংযুক্ত করেছেন।

একজন আত্মমগ্ন-প্রচারবিমুখ শিল্পী হিসেবে মরণচাঁদ পাল সবসময়ই সমসাময়িককালের অগোচরে জীবন অতিবাহিত করে গিয়েছেন। সম্প্রতি শিল্পী মরণচাঁদ পালের দীর্ঘ সমৃদ্ধ কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের ইতিহাসে তাঁর অবদান শিল্পানুরাগীরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবেন।

শিল্পী মরণচাঁদ পাল : জন্ম ১৯৪৫ সালে। বাবা গোপাল হরিপাল, মাতা সুরবালা পাল। মৃত্যু : ২০১৩ সালে।

Leave a Reply

*