logo

মকবুল ফিদা হুসেন নিঃসঙ্গতার ১০০ বছর

শি কো য়া  না জ নী ন

মকবুল ফিদা হুসেনকে আখ্যা দেওয়া হয় ‘ভারতের পিকাসো’। কাজের বিষয়বৈচিত্র্য, চরিত্রের বর্ণময়তা আর সৃষ্টির নির্বিচার সমারোহ হয়তো এর কারণ অথবা ’৭১ সালে আঁকা ‘অ্যাগনি’ ছবির ঊর্ধ্বমুখ ঘোড়াটিকে দেখলে অবধারিতভাবে পিকাসোর ‘গুয়ের্নিকা’র কথা মনে পড়ে।
হুসেনের জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯১৫-তে। মুম্বাইয়ের খুব কাছে পান্ধারপুরে। তিনি যখন দেড় বছরের শিশু তখন তাঁর মা জৈনব মারা যান। তাঁর পিতা ফিদা আবার বিয়ে করেন এবং পরিবার নিয়ে ইন্দোর চলে যান। ইন্দোরে হুসেন প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত হন। দাদার সঙ্গে হুসেনের সখ্য ছিল। দাদা স্যাকরার কাজ করতেন। আলো নিয়ে কাজ করতেন। হারিকেন, কুপি ইত্যাদি বানাতেন। পরবর্তী জীবনে এই দাদা বারবার হুসেনের ছবিতে ঘুরেফিরে এসেছেন। বাল্যকালে হুসেন কিছুদিন মাদ্রাসায় পড়েছিলেন। তারই প্রভাবে হুসেনের ছবিতে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ক্যালিগ্রাফিক জ্যামিতিক গড়ন, তার প্রলম্বিত এবং আনুভূমিক রেখা সরব হয়ে ওঠে। বয়স তখন ২০ তাঁর। মুম্বাইয়ে এসে জে জে স্কুল অব আর্টসে শিক্ষানবিশি শুরু হয় হুসেনের। বাস করতেন এক অখ্যাত পল্লিতে। বেশিরভাগ সময় ফুটপাতে, রেলস্টেশনে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন সিনেমার হোর্ডিংয়ের কাজ পেলেন। সেটা শিখতে অবশ্য অনেকদিন সময় লেগেছিল। ধীরে ধীরে রং তৈরি করা, কাপড় বাঁধা, ফ্রেম বানানো ইত্যাদি মন দিয়ে দেখতেন। আর শেখা শেষ হলে বিরাটাকৃতির সিনেমার পোস্টার আঁকতে শুরু করেন তিনি। তাঁর হাতে সিনেমার পোস্টার আলাদাভাবে নান্দনিক মাত্রায় উত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। হুসেনের প্রিয় বিষয় ছিল চলচ্চিত্র। তিনি বলতেন – ‘দৃশ্য চিত্ররূপের গতিময়তা’ তাঁর কাছে সবচাইতে শক্তিশালী শিল্পভাষা। শব্দ দিয়ে তিনি একটি পরিপূর্ণ শিল্পভাষা নিজে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৭-তে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র থ্রু দ্য আইজ অব আ পেইন্টার নির্মাণ করেন। এটি বার্লিনে চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন বেয়র পুরস্কার পায়। হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র, হিন্দু দেবী তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল। এছাড়া বিষয় হিসেবে নারী, ঘোড়া তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। তাঁর ছবির বক্তব্য অকপট। রং, রেখা বলিষ্ঠভাবে তাঁর ছবির আকারবিন্যাসকে জারিত করে রাখে। উজ্জ্বল লাল, নীল, বাদামি রং ইত্যাদি স্বকীয় চরিত্র পায় হুসেনের ছবিতে।
চল্লিশের দশকে হুসেন ফ্রান্সিস নিউটন সুজার নেতৃত্বে বম্বে প্রগ্রেসিভ গ্রুপে যোগ দিলেও পরবর্তীকালে তাঁর ছবি হয়ে ওঠে হুসেনেরই নিজস্ব ব্যক্তিত্বের সহায়ক। মহাভারত, রামায়ণ, মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসা, ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন – এ সবকিছুই তাঁর বিবিধ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে। সমসাময়িক ঘটনার প্রতি তিনি নিরুত্তর থাকতে পারেননি। শৈশবে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী একটি পরিবেশে আর্থিক দুর্দশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তিনি। মূলত স্বশিক্ষিত তিনি। অনেকে মনে করেন, অ্যাকাডেমিক কুশলতা ছিল না বলেই হুসেনের ছবি ভারতের সমকালীন শিল্পধারায় নিজস্ব একটি ঘরানা নির্মাণ করেছে, যদিও এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করার মতো উপাদান আমাদের কাছে নেই। তিনি পশ্চিমকে অকাতরে গ্রহণ করেছেন, আবার একই সঙ্গে ভারতের ঐতিহ্যকে সমকালের প্রেক্ষাপটে অবিনশ্বর করে তুলেছেন। এই দ্বিবিধ পারা তাঁকে প্রতিভাধর শিল্পী হিসেবে প্রতিস্থাপন করে আমাদের কাছে। দেখা গেছে, বিষয়ের কুশলে তিনি আঙ্গিক নির্বাচন করেন। বিষয়কে প্রধান রেখে তাঁর শিল্পভাষা পথ প্রবর্তন করে। প্রগ্রেসিভ আর্ট গ্রুপে থাকার সময় তিনি অ্যাকাডেমিক শিল্পভাষাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পশ্চিমের বাস্তববাদ, ন্যাচারালিজম এদিকে ভারতবর্ষের অবনীন্দ্র-নন্দলালের বেঙ্গল স্কুলের সুললিত সাহিত্যিক ভাবব্যঞ্জনাকে তিনি খারিজ করে দিলেন। আঁকলেন নতুন ছবি। সেখানে গুহাচিত্রের প্রেরণা যেমন রইল, তেমনি স্পন্দিত হলো রেনেসাঁস-পূর্ব রোমের সরল ফর্ম। কাব্যপুরাণও নয়, রসহীন অ্যাকাডেমিও নয়। এই ছবিতে তাঁর বর্ণ প্রয়োগের যে-তীব্রতা তা লক্ষিত হয় ফর্মকে উপযুক্ত মূল্য দেওয়ার অনুকূলে। মকবুল ফিদা হুসেনের শিল্পশৈলী তাই  বৈচিত্র্যের আস্বাদে জারিত। বোঝা যায়, তিনি তালগাছের মতো একটিমাত্র ঋজু রেখায় আকাশের দিকে ওঠার পক্ষপাতী নন বরং বটগাছের মতো অসংখ্য ডালপালায় নিজেকে চারদিকে বিস্তীর্ণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন রামমোহন, বিবেকানন্দ, তিলক, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীর দর্শন; যাঁদের জীবনে ভারত, অভারত দুই-ই রয়েছে। ভারতীয়ত্বের ছাপ ত্যাগ করার ফলেই যাঁদের ভারতীয় শেকড় শক্ত হয়েছিল। মকবুল ফিদা সেই অর্থে ভারতীয় ছিলেন। প্রাচ্য সবসময় আকর্ষণীয় তাদের চিত্রের বিশুদ্ধ জ্যামিতিক নকশা, রূপ, ফর্ম এবং বাহুল্যবর্জিত সারল্য, বস্তুর স্পষ্ট, অপচয়হীন সহজ প্রকাশ, দৃশ্যমান জগতের নানাবিধ গড়নের অসামান্য আবেদনের কারণে। বহু ঐশ্বর্য, জটিল অভিজ্ঞতা, সুদূর ঐতিহ্য প্রাচ্যকে আত্মপ্রত্যয়শীল করেছে। ইউরোপের অনেক শিল্পী যেমন পিকাসো প্রাণিত হয়েছিলেন বাশোলি ও জৈন চিত্র থেকে। জাপানি কাঠখোদাই থেকে প্যারিসে ইমপ্রেশনিজমের মতো শিল্প-আন্দোলনের উৎপত্তি হতে পেরেছিল। মকবুল ফিদা হুসেন অকাতরে পশ্চিমের দান গ্রহণ করেছেন। পশ্চিমা শিল্পী দ্বারা প্রাণিত হয়েছেন বারবার। অন্যদিকে ভারতের ঐতিহ্যলগ্নতা তাঁর ছবির প্রধান চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। বিচিত্রভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন প্রাচ্য-প্রতীচ্য পুরাণের বৈভব।
নানারকম সাম্প্রদায়িক দায় নিতে হয়েছে হুসেনকে। তাঁর ছবির প্রদর্শনীকক্ষ ভাঙচুর হয়েছে। গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীর আন্দোলনে তিনি ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। নগ্ন ভারতমাতা কিংবা সরস্বতী দেখে তাঁর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন বহু শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষ। যাঁরা হয়তো কখনো ভারতীয় প্রাচীন ঐতিহ্য অজন্তার ছবি দেখেননি। খাজুরাহোর মিথুন ভাস্কর্যের নন্দনতত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা যাঁদের নেই তাঁদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে ওঠেন ফিদা হুসেন। ১৯৭০ সালে আঁকা হুসেনের নগ্নিকারূপী দুর্গা ও সরস্বতীর চিত্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি ব্যবহার শুরু করে। প্রদর্শনীতে হামলা থেকে শুরু করে শারীরিক হুমকি পর্যন্ত তাঁকে দেওয়া হয়। মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ইত্যাদি তাঁকে ঘিরে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করেছিল। ভারতের শিল্প-সাহিত্য মহলের নাগরিক সমাজ খুব যে বেশি প্রতিবাদ করেছিল তাও নয়। ১৯৯৮ সালে উগ্র সাম্প্রদায়িক বজরং দলের লোকজন তাঁর বাড়ি আক্রমণ করে চিত্রকর্মে অগ্নিসংযোগ করে। নানা প্রদর্শনী থেকে তাঁর ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। তাঁর ‘ভারতমাতা’ ছবির জন্য ২০০৬ সালে আবার তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। জামিন ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন দেশত্যাগ করেন। কাতার এবং যুক্তরাজ্যে তিনি প্রবাসজীবন বেছে নেন। যত সমালোচনাই হোক, শিল্পী নিজে খুব একটা ভাবিত ছিলেন না। তিনি অনেকবারই বলেছেন, ‘ঈশ্বর আমার দেহের মধ্যে রয়েছেন, বাইরের কোনো ঈশ্বর আমি মানি না।’ বলেছিলেন, ‘আমার কোনো ঘরানা নেই’, ‘আমি ব্যাকরণ মানি না। আমার রং মেশাবার কৌশল আমারই মতো।’ হুসেনের শিল্পকর্ম ভারতের সমকালীন শিল্পধারায় একটি নিজস্ব ঘরানা নির্মাণ করেছে। কঠিন ক্যালিগ্রাফিক রেখা, ছবির জমির নিপুণ বিশ্লেষণ ও পুনঃসংগঠন মকবুল ফিদা হুসেনকে ভারতের চিত্রশিল্পের ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন দেবে। নানা রং মেশাবার অভিনব সব পদ্ধতি তিনি বের করেছেন। চিরাচরিত পথে তিনি হাঁটেননি কখনো। লোকশিল্পের প্রতি, দেব-দেবীর প্রতি মকবুল ফিদা হুসেনের দুর্নিবার আকর্ষণের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যায় সামান্য রূপ-তৃষ্ণা বা সহজ করণকৌশলের প্রয়াস কোনোটাই এর নিয়ামক নয়। তিনি এমন একটি দর্শনের স্থির সিদ্ধান্ত চাইছিলেন, যা একই সঙ্গে সমাজ-সময়ের ঘেরাটোপে লালিত আবার অন্যদিকে জীবনের বিচিত্র সংঘর্ষে শাশ্বত। তাঁর ছবির মানুষ, প্রাণী বা ইমেজগুলো তারই প্রতীক। ঐতিহ্যলগ্ন হয়েও হুসেন ছিলেন আধুনিক। নীতি, ধর্ম,  জাতীয়তাবাদ, ছবির মধ্য দিয়ে গল্প বলা, ছবিতে কবিতার প্রবেশ, গল্পের প্রবেশ – এসবই তাঁর সৃষ্টিশক্তির অন্তর্গত। হুসেনের মানস বিশ্ব নিরীক্ষা করে বলা যায়,  যথার্থ সৃষ্টি বাধা পথে চলে না। প্রলয়শক্তি তার পথ করে নেয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে বিভেদের বেড়া অটল থাকলেও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনেকাংশে তা শিথিল। হুসেন তা বিশ্বাস করতেন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ধ্যানি শিল্পী। তিনি বলতেন ‘সাধনাই সব’। নগ্ন গায়ে থাকতেন। আকাশছোঁয়া ছিল না তাঁর স্বপ্ন। বৈভব-বিলাসিতাকে খুব গ্রাহ্য করেছেন, তাঁর জীবনাচার দেখলে তা মনে হয় না। স্নিগ্ধ কোমল আনন্দিত একজন মানুষ ছিলেন ব্যক্তিজীবনে। বলতেন, ‘আমার কোনো ঘরানা নেই। আমি গুহামানবের দৃষ্টিতে জগৎ দেখি, জীবনকে দেখি, সেই দেখার আনন্দই আমার ছবি।’
মকবুল ফিদা হুসেন হিন্দু ধর্ম, পুরাণ, ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য, ব্যক্তিত্ব, সমসাময়িক সমস্ত কিছু থেকে তাঁর ছবির প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। আর শুধু চিত্রকলা অথবা চলচ্চিত্র নয়, তিনি লিখেছেন কবিতা। ১৯৫০ সালে হয় তাঁর প্রথম প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তিনি শিল্পী হিসেবে প্রাথমিক পরিচিতি পান। সেই বছরই ফ্রান্সিস নিউটন সুজার আমন্ত্রণে তিনি প্রগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্র“পে যোগ দেন। এই সংগঠনের সূত্রে তিনি পরিচিত হন এমিল নোলডে আর অস্কার কোকোশ্কার মতো জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের কাজের সঙ্গে। ললিতকলা অ্যাকাডেমি আয়োজিত ১৯৫৫-তে প্রথম জাতীয় প্রদর্শনীতে প্রথম পুরস্কার, চীন ও ইউরোপ ভ্রমণ শেষে প্রদর্শনী হয়। ১৯৭১ সালে পাওলো বিয়েনালে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভের পর হুসেন ভারতে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, টোকিও বিয়েনাল পুরস্কারসহ পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। নেহরু পরিবারের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর ছবি এঁকেছেন। মাদার তেরেসা তাঁর প্রিয় বিষয়। এই নারীকে তিনি বারবার এঁকেছেন।
সংসারে আর্থিক অনটনে বেড়ে ওঠা ফিদা হুসেন একসময় কিংবদন্তির নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। আধুনিক ভারতের আর কোনো চিত্রশিল্পী তাঁর মতো প্রাণস্পন্দিত স্বতন্ত্র স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন জানা যায় না। দৃশ্যকলার জগতে তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর প্রণোদনা আর জীবনযাপন হয়ে উঠেছিল মিথ। সাক্ষাৎকারে তিনি চটপটে, চৌকস, স্পষ্টভাষী এবং কখনই আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বাক্যবাণ ছিল না। মনে হয় যেন জীবনে কোনো অপ্রাপ্তি ছিল না তাঁর। শেষ পর্যন্ত তাঁর বিনয় আর দেশের প্রতি আশ্চর্য ভালোবাসার উচ্চারণই দেখেছি আমরা। মৃত্যুর পর ভারতের মাটিতে সমাহিত হতে চেয়েছিলেন। সে-ব্যাপারে ভারত সরকার কোনো উদ্যোগ নিয়েছে এমনটি জানা যায়নি। নব্বই-ঊর্ধ্ব এই শিল্পী ব্যক্তিগত হতাশা, নিঃসঙ্গতা অথবা মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য সবকিছু ছাপিয়ে শিল্পীই হয়ে উঠেছিলেন। ছবি এঁকে যাচ্ছিলেন ক্রমাগত। সৃষ্টিশীলতার প্রতি, মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন একাগ্র, নির্মল, সৎ। উপমহাদেশের অর্ধবিকশিত সমাজে কৌলিকবৃত্তির আবহমান পরম্পরা ভেঙে যে-শিল্পজীবিকা তিনি বেছে নিয়েছিলেন তা ছিল অনেকটা এই সাবেকি সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেই এক প্রতিবাদ। তাই তাঁর ছবি এত দাহ ছড়িয়েছিল।
ইউরোপের বাস্তবধর্মী চিত্রের পুরো মডেলিং নেই তাঁর ছবিতে, শুধু আছে ফর্মের নকশা। আধুনিক জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে এড়িয়ে চলেননি কখনো। ছবিতে যা যা প্রয়োজন – বস্তু ও নির্মিতির জ্ঞান, কল্পনা, সহনশীলতা আর অভিব্যক্তির অন্বয়, কম্পোজিশন ইত্যাদির কোনো বাধা পথে তিনি হাঁটেননি। তবু তাঁর ছবি শেষ পর্যন্ত এই সমস্ত সন্নিহিতি আর রূপবন্ধগুলোকে একত্র করতে সমর্থ হয়েছে। অবয়বের অন্তর্গত যে জগৎকে তিনি দৃষ্ট করে তুলেছেন তা স্থূল মাপজোকের বাইরে। নান্দনিক সমস্যা নিয়ে, তাঁর ছবির অধ্যাত্ম চেতনা নিয়ে অনেক বিতর্কই হতে পারে। ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকার ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি তিনি উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে উপলক্ষ হিসেবেই শুধু ব্যবহার করেছেন। সাদৃশ্যধর্মিতার দায় বহন করেননি। মাধ্যম হিসেবে চিত্রকলা বরাবরই রূপক, প্রতীক, সংকেত ইত্যাদিরও আশ্রয় নেয়। তাই শিল্পে রূপক, প্রতীক, সংকেতে বাস্তবনিষ্ঠতার সম্পর্ক প্রকাশের প্রশ্ন্ও উপেক্ষিত নয়। কিন্তু আঙ্গিকবাহুল্য ও প্রকাশের সমস্যায় চিত্রকলায় যে বিমূর্তায়নের সংশয় থেকে যায় তা তাঁর ছবিতে নেই। কারণ হয়তো এই যে, বস্তু ও রূপের উপরিতল অতিক্রম করে তিনি গভীরে যেতে পেরেছিলেন। এই গভীরতা থেকে তিনি জেনেছিলেন ছবির কনফিগারেটিভ এলিমেন্ট বা আকার গঠনের উপাদান রং, রেখা, ফর্ম ইত্যাদি কোনো নি®প্রাণ প্রক্রিয়া নয়। এগুলোর ভেতরে প্রাণের সন্ধান করেছিলেন তিনি। এখানেই তিনি অনন্য। তাই অনুভবেদ্য রেখা জীবনের অনুকূলে প্রবাহিত হয়েছিল তাঁর। তাই তিনি ভারতীয় মোগল মিনিয়েচার ঐতিহ্য, অজন্তা, কিংবা নব্য বঙ্গ ঘরানা, তারপর আধুনিকতার প্রবাহিত ধারায় শিল্পকলার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।
সাবেক চিত্রভাষা তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন। শিল্পী ও সমাজের সম্পর্কটি তিনি একটি ঐতিহাসিক পরম্পরায় বিধৃত করেছিলেন। এদিক থেকে শৈশবে শত প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁর শিল্পী হিসেবে আবির্ভাবের সামাজিক তাৎপর্য তাই অপরিসীম।

Leave a Reply

*