logo

ভারতের স্থপতি চার্লস মার্ক কোরিয়া

রবিউল হুসাইন
স্থপতি ফিলিপ জনসন বলেছেন, সব স্থপতি মহাপ্রয়াণের পরেও তাঁদের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে বেঁচে থাকেন। সেইরূপে বলা যায়, ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের আমত্মর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যশস্বী স্থপতি চার্লস মার্ক কোরিয়া যিনি গত জুন ১৬, ২০১৫-তে ৮৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে চলে গেলেন, তিনি মানুষের মাঝে তাঁর সৃষ্টিশীল স্থাপত্যকর্মের ভিতর চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
১৯৩০ সাল, সেপ্টেম্বর ১-এ কোরিয়া হায়দ্রাবাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ভারতের তিনি অন্যতম প্রতিভাবান স্থপতি হিসেবে দেশ-বিদেশে নন্দিত ও প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪৬-৪৮ সালে মুম্বাইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যয়ন করার পর আন আরবারে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যে স্নাতক হয়ে বাক মিনস্টার ফুলার ও ওয়াল্টার স্যান্ডার্সের অধীনে ১৯৪৯-৫৩ সালে কেমব্রিজে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, এমআইটি থেকে আবার বাক মিনস্টার ফুলার ও লরেন্স এন্ডারসনের শিÿকতায় ১৯৫৩-৫৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
মুম্বাই সমুদ্রবন্দরের অদূরে ২০ লাখ নাগরিকের জন্য নভি মুম্বাই নামে নতুন শহর পরিকল্পনার প্রধান স্থপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭০-এ। নগর পরিবেশ ও নাগরিক জনপদের উন্নয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৮৪ সালে মুম্বাইয়ে আরবান ডিজাইন রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে ন্যাশনাল কমিশন অন আরবানাইজেশনের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
চার্লস কোরিয়া একদিকে যেমন একজন ক্ষণজন্মা স্থপতি ছিলেন, অন্যদিকে মেধাবী নগর পরিকল্পক, প্রয়োগবিদ, তাত্ত্বিক ও বাগ্মী হিসেবে উজ্জ্বল, সাফল্যম–ত ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন।
তাঁর উলেস্নখযোগ্য স্থাপত্যকর্মের মধ্যে আহমেদাবাদে সবরমতি আশ্রমের মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়াল মিউজিয়াম; মুম্বাইয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা অ্যাপার্টমেন্ট; ভোপালে মধ্যপ্রদেশ বিধান ভবন; জয়পুরে ১৯৮৬-৯২-এ নির্মিত জওহর কলাকেন্দ্র; বোস্টনে স্থাপিত এমআইটি ম্যাকগভার্ন ইনস্টিটিউটের ব্রেন অ্যান্ড কগনিটিভ সাইনসেস সেন্টার; এলআইসি সেন্টার, মরিশাস; বে আইল্যান্ড রেসর্ট, পোর্ট বেস্নয়ার, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ; সিদাদে দে গোয়া, দোনা পলা, গোয়া; বিশ্বঐশ্বর্য সেন্টার, বেঙ্গালুরম্ন; ব্রিটিশ কাউন্সিল ও জীবন ভারতীয় ভবন, নিউদিলিস্ন এবং লিসবনে শ্যাম্পালিমদ সেন্টার ফর দি আননোন স্থাপনাগুলোর নাম করা যেতে পারে। তাঁর স্থপতি জীবনের শেষ স্থাপত্যসৃষ্টি ছিল ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে সাম্প্রতিক ও আধুনিক রীতির আলোকে স্থাপিত টরন্টোর ইসমাইলি সেন্টার নির্মিতির অনন্য উদাহরণ, যা আমত্মর্জাতিক স্থাপত্যকর্মে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।
তিনি স্থপতি হিসেবে বহু স্থাপত্য-পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যেমন ১৯৮৪-এ রিবা রয়াল গোল্ড মেডেল, ২০০৬-এ পদ্মবিভূষণ, ১৯৯৪-এ জাপানের প্রিমিয়াম ইমপেরিয়াল, ২০০২-এ এ+ডি অ্যান্ড স্পেকট্রাম ফাউন্ডেশন আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড, ১৯৯৮-এ মধ্যপ্রদেশ বিধান ভবন স্থাপনার জন্য সপ্তম আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার এবং ১৯৯০ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব আর্কিটেকটস, ইউআইর তৃতীয় স্বর্ণপদক লাভ।
এসব ছাড়াও চার্লস কোরিয়া স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা বিষয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করে স্থপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সেমিনার ও আলোচনা সভায় যেমন প্রধান বক্তা হিসেবে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, তেমনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও শিক্ষকতা করে নিজের চিমত্মাভাবনা, মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান অনেকে মনে করেন এমন যে, তিনি শিল্পঐতিহ্যের যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ধারা বা পরম্পরায় হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মজাত সংস্কৃতি, পরবর্তী সময়ে ইসলামি মোগল শাসন ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক-উদ্ভূত এবং সাম্প্রতিক সময়ের ইউরোপীয় পশ্চিমা আধুনিক স্থাপত্যধারা যেটি স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিকশিত হয়েছে – এগুলো নিয়ে একটি সমন্বিত স্বরূপকে ক্রমাগত আবিষ্কারে এক বহুত্ববাদী দর্শনের আলোকে ভারতীয় স্থাপত্যের মূলধারায় খুঁজে পেতে ও দৃশ্যমান করতে আজীবন সচেষ্ট হয়ে সফলকাম হয়েছেন।
এই সঙ্গে শহরের দরিদ্র জনগণ ও বসিত্মবাসীদের বসতবাড়ি এবং তাদের চাহিদা বা প্রয়োজন মেটাতে নানারকম উন্নয়ন প্রকল্পে দেশীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, স্বল্পমূল্যে প্রয়োগ, স্বউদ্যোগ গ্রহণ করে নির্মাণ ও স্থাপনা ইত্যাদিতে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন।
দীর্ঘ পাঁচ দশকব্যাপী পেশাজীবনে সকলের কাছে তাঁর সৃষ্টিশীলতার জন্য সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বে ভারতে কোনো সৃষ্টিকর্ম করা জীবনের জন্য এক বিরাট সুযোগ, নিজের সত্তার চেয়ে বড় বড় বিষয় বিদ্যমান এখানে, যেগুলো বেড়ে ওঠার পথকে সুগম করে তোলে।’ তরম্নণ স্থপতিদের স্থাপত্যকর্মে তিনি ভীষণ উৎসাহী ছিলেন এবং তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কোরিয়া বলেছেন, ‘স্থপতি হয়ে ওঠার অনেক উপায় আছে। এবং সবই সমাজের জন্য উপযোগী ও উপকারী। নিশ্চয়ই কিছু স্থপতি বাণিজ্যিক দিক থেকে খুব ভালো করছেন এবং বিপণন ব্যবস্থা ও কেন্দ্র সেরকম দাবি করে। তবে আরো অনেক ভারতীয় স্থপতি আছেন, যাঁরা সত্যিকার সৃষ্টিশীল কাজে মগ্ন। আমি তরম্নণ স্থপতিদের এমন অনেক কাজ দেখে মুগ্ধ ও চমৎকৃত।’ তিনি বিশ্বাস করতেন এমন যে, স্থাপত্যকর্ম দেখার বিষয় নয়, বরং এটি এক শক্তি ও তেজময় ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত অগ্রসর হওয়া। স্থাপত্যশিল্প অসাধারণ, কারণ এটি মনের পরাভবতাকে নিয়ে এমনভাবে ব্যাপৃত হয় যে বিষয় এখনো ব্যক্ত বা সৃষ্টি হয়নি। আবার বলেছেন যে, স্থাপত্যশিল্প বা বিদ্যা শেখানো যায় না। আপনি শিখতে পারেন কিন্তু শেখানো নয়। ভালো শিক্ষায়তন সেটিই যেটি আপনাকে স্থাপত্যশিল্প সম্বন্ধে আবেগী করে তুলতে সাহায্য করে এবং যেটি আপনাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। কীভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে হয় এবং প্রশ্ন করার কৌশল যদি জানেন, তাহলে তখন থেকেই নিজের দর্শন ও দৃশ্যরূপের শব্দাবলি প্রণয়ন করতে আপনি সক্ষম হবেন এবং বিভিন্ন প্রশ্ন আর উত্তরমালার মধ্য দিয়ে এটি চলতেই থাকবে।
১৯৫৩ সালে স্থাপত্যে সণাতক হয়ে কোরিয়া প্রথমে স্থপতি মিনোরম্ন ইয়ামাসাকি, যিনি নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার বা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের স্থপতি, ১৯৭৪ সালে নির্মিত এবং ২০০১ সালে সেপ্টেম্বর ১১ বা নাইন-ইলেভেনে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তাঁর কার্যালয়ে কাজ করা শুরম্ন করেন। এরপর ১৯৫৬-৫৮ সালে মুম্বাইয়ে জিএম ভুটা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে অংশীদারিত্বে যোগ দেন। ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি স্বাধীনভাবে স্থাপত্যপেশা চর্চা করে আসছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালে এমআইটিতে আলবার্ট বেমিস অধ্যাপক, ১৯৬৩ ও ১৯৭৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ক্রিটিক, ১৯৬৪-তে খড়গপুর আইআইটি ও রম্নড়কি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ সালে বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৬৭ সালে আহমেদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৭০ সালে মুম্বাই আইআইটিতে, ১৯৭১-এ দিলিস্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৭৩-এ ব্রিসবেনের কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে অংশ নেন। ১৯৭৪-এ ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ব্যানিস্টার ফ্লেচার অধ্যাপক, লন্ডনের আর্কিটেকচারাল অ্যাসোসিয়েশন স্কুল অব আর্কিটেকচার, এএ; কানেকটিকাট, নিউ হ্যাভেনের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, ফিলাডেলফিয়ার ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া ও ১৯৭৬ সালে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দান করেন।
১৯৭২ সাল থেকে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকটস, আইআইএর কাউন্সিল সদস্য ছিলেন। এছাড়া ভারতের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের উপদেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যেমন, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, বেঙ্গালুরম্ন কর্ণাটক সরকার ইত্যাদিতে।
১৯৭৭ সাল থেকে আগা খান আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৩ সালে গুজরাটের স্বল্পমূল্য আবাসিক প্রকল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে টাইম ম্যাগাজিনের নতুন নেতৃত্বদানকারী সংখ্যায় একজন প্রভাবশালী স্থপতি হিসেবে স্থান পান।
এরকম স্থাপত্যশিল্প ও স্থাপত্যপেশা জগতে চার্লস কোরিয়া এক বর্ণাঢ্য কৃতী পুরম্নষ হিসেবে ভারত ও বহির্ভারতে অসামান্য ও অনন্য সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সম্বন্ধে দার্শনিক পল রিকুয়ারের কথা যথার্থ বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বজনীন সভ্যতা এবং জাতীয় সংস্কৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে, প্রত্যেক সংস্কৃতি আধুনিক সভ্যতার অভিঘাত গ্রহণ ও সহ্য করতে পারে না। এটা স্ববিরোধী হলেও সত্যবর্জিত নয় কীভাবে আধুনিক হতে হবে এবং একই সঙ্গে মূলধারায় ফিরে যেতে হবে ও কীভাবে পুরাতন, সুপ্ত সভ্যতা পুনঃপ্রচলিত করে বিশ্বজনীন সভ্যতায় অংশ নিতে হবে, সেটা জানতে ও বুঝতে হবে।
এবার স্থপতি চার্লস মার্ক কোরিয়ার কিছু বিখ্যাত স্থাপত্য নিদর্শন সম্বন্ধে আলোকপাত করা যেতে পারে। ১৯৯২ সালে নির্মিত জওহর কলাকেন্দ্র জয়পুরে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরম্নর স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত। ভবনটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বিশ্বব্রহ্মা–র প্রাচীন ধারণা নবগ্রহম-ল অনুযায়ী নয়টি বর্গাকার ক্ষেত্র যার নবমটি একটু স্থানচ্যুত, ভারতীয় বর্ণ-গোলাপি, কমলা ও গেরম্নয়া ব্যবহার প্রক্রিয়া-নির্ভর হয়ে গড়ে উঠেছে। এখানে জয়সিলমার, ফতেহপুর সিক্রি বা মা-ুর স্থাপত্যঐতিহ্য নতুনভাবে খুঁজে পাওয়া যায়।
মুম্বাইয়ের শতাব্দীপ্রাচীন পর্তুগিজ গির্জা ভবনকে পুনর্নির্মাণ করেছেন নতুন বর্ণাঢ্য নকশা ও আলোময়তায়, যেখানে প্রখ্যাত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন দেয়ালচিত্র সৃষ্টি করেছেন। কলকাতার সল্টলেক সিটিতে সিটি সেন্টার মল খুব উলেস্নখযোগ্য বাণিজ্যিক বিপণিকেন্দ্রের স্থাপত্যনিদর্শন। সাম্প্রতিক সময়ে টরন্টোর ইসমাইলি সেন্টার ভবনে ঐতিহ্যপূর্ণ ইসলামি স্থাপত্যে আধুনিক বিন্যাস অসাধারণ পারদর্শিতায় ব্যবহার করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেটি ওন্টারিও অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেকটস কর্তৃক সর্বোচ্চ ডিজাইন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
মুম্বাই নগরী কেমন দৃশ্যমান ও অবয়বে বাসত্মবায়িত হবে সেটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যমণি ছিলেন কোরিয়া। ৩২-তলা কাঞ্চনজঙ্ঘা আবাসিক ভবন সুউচ্চতায় মুম্বাইয়ের আকাশসীমায় যেটি নির্মিত যেন অনেকগুলো বসবাসগৃহ একটির ওপর আর একটি বসিয়ে জড়ো করা হয়েছে। মাঝখানে লিফট, সিঁড়িসহ প্রধান নির্মিতি পার্শ্বিক ভরকে সহ্যক্ষমতাসম্পন্ন করে তুলেছে, রিইনফোর্সড কংক্রিট কাঠামোর প্রায় ২০ ফুট প্রসারিত ঝুলবারান্দাসহ সরাসরি অব্যাহত আলো-বাতাস প্রবাহিত হয়ে চার ধরনের আবাসগৃহ সাজানো, রোদ-বৃষ্টি আগলে রাখার কৌশলও সেখানে বিদ্যমান, যা স্পষ্ট হয়ে দ-ায়মান।
কোরিয়ার স্থাপত্য সৃষ্টিকর্মে সৃষ্টিশীল কল্পনাকে না বদলিয়ে কেমন করে ঐতিহাসিক স্মরণকে একীভূত ও আপন করা যায়, সেটি দেখা যায়। অর্থপূর্ণ স্থাপত্যনিদর্শন সৃষ্টি করার জন্য ইতিহাসকে ব্যঙ্গাত্মক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে এটির পুনঃসৃষ্টিতে নিমগ্ন হতে হবে। এই সংস্কৃতিতে ভবনসমূহের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রতীক ধরতে ও রূপামত্মর ঘটাতে হবে এবং এভাবে তা কমিয়ে গ্রাহকদের কাছে গ্রহণীয় এবং আবার পুনর্গ্রহণ করাতে হবে, সেখানেই একজন প্রকৃত স্থপতি-তারকার স্থান ও মর্যাদা নিহিত।
জলবায়ু ও আবহাওয়া কীভাবে স্থাপত্যশিল্পকে গড়ে তোলে, সে সম্বন্ধে কোরিয়া বলেছেন, ‘এটা আশ্চর্য, কীভাবে জলবায়ু স্থাপত্যগঠনকে সৃষ্টি করে। এটা ইগলুর জন্য যেমন সত্য, তেমনি আবার প্রশামত্ম সাগর দ্বীপপুঞ্জের জন্যও। সর্বত্রই সত্য। আপনাকে স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী ও কলাকৌশলের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে এবং তখন শিল্পসম্মত মাধুর্যময় স্থাপত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।’
নিউ দিলিস্নর এলআইসি বাণিজ্যিক ভবন, ন্যাশনাল ক্রাফটস মিউজিয়াম, নিউইয়র্কের জাতিসংঘে ভারতের পার্মানেন্ট মিশন ভবন, দিলিস্নর ব্রিটিশ কাউন্সিল ভবন, সর্বত্র তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
ফ্রান্সের স্থাপত্যতাত্ত্বিক উইলিয়াম জে কার্টিস কোরিয়া সম্বন্ধে বলেছেন, বছর বছর ধরে কোরিয়া ভারতীয় বাসত্মবতার স্থাপত্যসত্তাকে অতীত ও বর্তমানের ভিতর দেশে দৃষ্টি দিয়ে খুঁজে বেড়িয়েছেন, সেইসঙ্গে বহির্দৃষ্টি দিয়েছেন আমত্মর্জাতিক ক্ষেত্রের স্থাপত্যশিল্পজাত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আধুনিকতার বিশ্বায়ন-উত্তরাধিকারের প্রতি।
ভারতের আর একজন প্রখ্যাত স্থপতি কোরিয়ার বিশেষ বন্ধু যিনি তাঁর সময়ে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন, সেই বিভি যোশী বলেছেন, ‘তাঁর মৃত্যুতে আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে হারিয়েছি, যিনি আমাদের চিমত্মা ও কর্মকে বদলে দিয়েছেন।’
চার্লস কোরিয়া স্থাপত্যাচার্য মাজহারম্নল ইসলামের কার্যালয় বাস্ত্তকলাবিদে আগা খান স্থাপত্য সেমিনারে যোগদান উপলক্ষে ঢাকায় এসেছিলেন। তখন একবার এবং তারও আগে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি অপেরা হাউসে কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেকটস সিএএ কনফারেন্সে প্রধান বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দেওয়ার সময় এই নিবন্ধকারের সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী মনিকা সিকুইরা কামাতসহ আলাপ-পরিচয়ের সৌভাগ্য হয়েছিল। তাঁদের চমৎকার, অমায়িক ও আকর্ষণীয় ব্যবহার কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়।
চার্লস কোরিয়া সৃষ্টিশীল স্থাপত্যকর্মের মাঝে চিরজীবী হয়ে থাকবেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রগাঢ় সম্মান আর আমত্মরিক শ্রদ্ধা। 

সহায়ক গ্রন্থ ও পত্রিকা :
১. মুরিয়েল এমানুয়েল-সম্পাদিত কন্টেম্পোরারি আর্কিটেকটস।
২. ইনসাইড আউটসাইড, দি ইন্ডিয়ান ডিজাইন ম্যাগাজিন, জুলাই-২০১৫।
৩. আর্কিটেকচার+ডিজাইন, অ্যান ইন্ডিয়ান জার্নাল অব আর্কিটেকচার, আগস্ট, ২০১৫।

Leave a Reply

*