logo

বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস্-এ কাজী গিয়াসের একক প্রদর্শনী সবুজ শৈবালে দীর্ঘ পৃথিবী

মো বা শ্বি র  আ ল ম  ম জু ম দা র
নীলের শব্দ শুনতে হলে যেতে হবে তাঁর ছবির কাছে। কাজী গিয়াস প্রকৃতির চুম্বক অংশ ক্যানভাসে তুলে আনেন। আকাশ, জল কিংবা নদীর স্বচ্ছ জলের নীল তাঁর কাছে হয়ে ওঠে শব্দময় দ্যুতি। বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে তিনি একাতম হয়ে থাকেন দূর পরবাসে। কাজী গিয়াসের ছবির বিষয় প্রকৃতি, প্রেম, সংগীতের সুর। তিনি সুরে নিজেকে একাতম করেছিলেন গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে। স্বদেশের মাটিতে দেখা প্রকৃতির বিচিত্র রং-রেখা বুনে চলেন স্বদেশ ও বিদেশে। ঢাকা ও টোকিও দুদেশের স্টুডিওতে সৃষ্টি করা শিল্পের মাঝে বাংলার প্রকৃতির দেখা পাই। এ প্রদর্শনীর জলরং ও তেলরঙে অাঁকা মোট ঊনচল্লিশটি কাজে আমরা তাঁর পূর্ববর্তী কাজের ধারাবাহিকতা খুঁজে পাই। ইউরোপীয় চিত্ররচনার ধারা তাঁর কাজে কখনো কখনো হাজির হলেও এশীয় বিমূর্ত রচনার রীতিই তাঁর কাজের প্রধান ধারা। বিষয়ের গভীরে অনুপুঙ্খ অধ্যায়কে নির্বাচন করে ছবি অাঁকার প্রবণতা কাজী গিয়াসকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তাঁর শিল্পীজীবনকে তিনটি অধ্যায় ঘিরে আছে। ১৯৬৬ সালে তিনি গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস থেকে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষা শুরু করে ১৯৭০ সালে স্নাতক ডিগ্রি নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর দিনগুলো কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কলকাতায় আশ্রয় নিয়ে তিনি যুদ্ধকালীন সহায়তা দলে একাতম হন। ১৯৭২ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ১৯৭৫-এ তিনি জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে জাপান যান। ১৯৭৯ সালে টোকিও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আবার চারুকলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

১৯৮৫-তে চারুকলায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন টোকিও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড মিউজিক থেকে। নানা স্তরে তাঁর শিল্পশিক্ষা অর্জনের পথে তিনি ছবি অাঁকার নিরীক্ষা অব্যাহত রেখেছেন। ১৯৭০ সালের একক প্রদর্শনীতে বাস্তবধর্মী বিষয়ের প্রতি তাঁর ঝোঁক দেখা যায়। ক্রমে তাঁর চিত্রতলে স্তর তৈরি হতে থাকে। পৃথিবীর নানা বিষয়ে কৌতূহল দেখা যায়। নক্ষত্র থেকে গ্রহ, ভূমি থেকে আকাশ, জল, বায়ু সবই ছবির বিষয় হয়ে যায়। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত সমকালীন জাপানি চিত্রকলায় মনোযোগী হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে নতুন এক সিরিজের সূচনা করেন ধ্রুপদী সংগীতের মোৎসার্টের সুরে। সে সিরিজ নিয়ে গিয়াস বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে আমি পল ক্লির ইমেজ অনুকরণ করি।’ বিশ্বায়নের সমকালীন শিল্পকলায় গিয়াসের পশ্চিম আর প্রাচ্যের মিশ্রণে নতুন শৈলী গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের শিল্পান্দোলনের শুরুতে পাশ্চাত্যের দিকে বেশ কিছু প্রতিভাবান শিল্পী উচ্চশিক্ষা নেন, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্পকলায় যার প্রভাব পড়ে। বিশেষভাবে মোহাম্মদ কিবরিয়ার বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী আচরণ উল্লেখযোগ্য। কাজী গিয়াস মোহাম্মদ কিবরিয়ার উত্তরসূরি। রঙে হয়তো পরম্পরা অনুসরণ করা হয়নি, কিন্তু ফর্মের ক্ষেত্রে কাজী গিয়াসের কাজে কিবরিয়ার কাজের মিল লক্ষণীয়।

ঢাকার কিবরিয়া স্কুল বাংলাদেশের শিল্পান্দোলনে লক্ষণীয় প্রভাব রাখে। জাপানে অবস্থানকালে বিমূর্তায়নের ব্যাকরণ নেন পল কিল, কিবরিয়া, ক্যান্ডিনস্কি, জন মিরোর কাজ থেকে। প্রতীকবাদী আচরণের সঙ্গে জলরঙের ধোয়া পদ্ধতির মূর্ছনা তাঁর কাজে দেখা যায়। তেলরঙের চড়া প্রলেপের পরিবর্তে ক্যানভাসে জলরঙের ধোয়া পদ্ধতি অনুসরণ কাজের মাঝে স্বচছতা তৈরি করে দেয়। হ্যান্ডমেইড পেপারের অমসৃণ তলে জলের স্থানচ্যুতি বিশেষ এক অনুভূতির জনম দেয়। অনুরণন তোলা মুহূর্তে ছবির বিষয়ে নির্মাণ করে ধ্রুপদী রূপ। সৌন্দর্য সৃষ্টির পাশাপাশি আকৃতিতে দৃঢ় ও শক্তিশালী গড়নের ব্যাপারে প্রত্যয় দেখা যায়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও ইতালির স্কিরা এডিটর কর্তৃক প্রকাশিত কনটেম্পরারি মাস্টার্স অব বাংলাদেশ বইয়ের কলেবরে বিশব শিল্পকলায় বাংলাদেশের শিল্পীর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। কাজী গিয়াসের জীবনাভিজ্ঞতায় অনুভবের গভীরে সুপ্ত পেন্ডুলামের নড়াচড়া বোঝা যায়। প্রকৃতি থেকে সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করেন। বাংলার প্রকৃতির রূপবদলের রং, শৈশবের স্মৃতি তাঁর ক্যানভাসকে মাতিয়ে রাখে। সুরের মূর্ছনা বা ফ্র্যাগমেন্ট অব সাউন্ড ছবির বড় অংশজুড়ে শূন্য পড়ে আছে। জলপ্রপাতের জল একের সঙ্গে জড়িয়ে আরেক জলের গতি মিশে যায়, শব্দ ভঙ্গুর হয়ে প্রকৃতিতে বিলীন হয়। এটি হয়তো গিয়াস অনুভব করেন।

রঙের ব্যাকরণ তিনি মেনে চলেন না। রঙের সঙ্গে চিত্রতলের সম্পর্ক তৈরির নিরীক্ষায় তিনি মনোযোগী। ধীর, শান্ত, রেখা প্রয়োগ, অনুমিত আকৃতি গিয়াসের কাজে স্থিরতা দিয়েছে। ‘বিহাইন্ড মাই স্টুডিও’ ছবিটি এমন সব বাক্যে একীভূত করা যায়। ছবি অাঁকার স্টুডিওর পেছনে এমন ধূসররঙা জলের খেলা তৈরি হয়। ক্যানভাসজুড়ে একটি রং আরেক রঙের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। গাঢ় রঙের রেখা তৈরি হয়ে ক্যানভাসকে বিভাজন করে। সূক্ষ্ম রেখার সাহায্যে কিছু প্রতীক তৈরি করে দেন। ‘রেইনিং’ ছবিতে বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির রূপ তৈরি করেন, বেগুনি রঙের আবহের সঙ্গে রংধনুর রঙের ছায়া বিম্বিত হয় জলের বুকে। বিন্দু রেখা স্বচ্ছ রং প্রয়োগ কাজী গিয়াসের কাজের বৈশিষ্ট্য। একটি বিন্দুর সঙ্গে আরেকটি বিন্দু মিলে গিয়ে তৈরি হয় বর্ণাঢ্য জমিন। ভাঙা রেখার সূক্ষ্ম চালে কোনো কোনো স্থানে অবয়ব গড়ে ওঠে। এ ছবিতে ব্যবহার করেছেন স্বচ্ছ জলরং। এ প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘নোটেশন-রিকনস্ট্রাকটেড’। প্রকৃতির বিন্দু, রেখা, আকৃতি, ছন্দ, বর্ণিল ঋতুবৈভব আমাদের যেভাবে জাগিয়ে রাখে সেভাবে শিল্পীর আত্মাকেও জাগিয়ে রাখে, গিয়াসের শিল্পকর্ম প্রকৃতির বৈভবের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। পুনর্নির্মাণের ঘোষণা দেয়। এই আহরণের উৎসবে গিয়াস মেতে ওঠেন।

‘পুরনো সেই দিনের কথা’ শিরোনামের ছবিতে দেখা যায় প্রকৃতির বন্দনা, সঙ্গে শৈশব, কৈশোর, যৌবনের নানা স্মৃতি। বর্ণ প্রলেপের সময় বুনট তৈরি করে চিত্রতল সৃষ্টি করেছেন, তার গায়ে ভঙ্গুর রেখার সাহায্যে তৈরি করা আকৃতি, ঘুড়ি, মানব অবয়ব, পশু-পাখির অবয়ব খুঁজে পাওয়া যায়। ক্যানভাসে তেলরঙের ধোয়া পদ্ধতির এমন ব্যবহারকে স্মৃতির পুনর্নির্মাণ বলা যায়। ‘সাইলেন্স’ ছবিটি আমাদের নীরবতা দেয়। ছাইরঙা চিত্রতলে উললম্ব গতিতে ফর্ম আনাগোনা করছে। সাদা রেখায় সৃষ্টি করা শব্দের অবয়বকে ঘিরে রেখেছে গাঢ় ছাইরঙা বুনট। ‘মিথ’ বা পুরাণকে অাঁকেন নতুন করে নীলাভ জমিনে সূক্ষ্ম রেখায়। রেখা চলাচল করছে পুরো ক্যানভাসে। বড় আকৃতির সাদা রঙের ফোয়ারা ক্যানভাসকে কেন্দ্রীভূত করেছে। তেমনি ‘আননোন স্টোরি’ বা অজানা গল্পের মুহূর্ত বিবৃত করেন ধূসর নীলাভ জমিনে। গল্প বলাকে কাজী গিয়াস নির্মাণ করেন গল্পের অভ্যন্তরের কাঠামো রচনা করে। এরকম অনেক কাজের মাঝে আমরা আলাদা করে ভাষা শুনতে পাই। প্রকৃতির কাছে কাজী গিয়াসের শিশুসুলভ সন্ধান আমাদের স্বস্তি দেয়। দৃষ্টি, কল্পনা, স্মৃতি, বিস্মৃতি, সুর, ছন্দ সব মিলিয়ে এক দক্ষ তুলিচালকের ভূমিকায় নিজেকে সঁপে দিয়ে গড়ে তোলেন রূপবন্ধ। বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টস্-এর আয়োজনে গত ১৮ এপ্রিল শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হয় ২৬ মে ২০১৫।

Leave a Reply

*