logo

বিশ্ব-চলচ্চিত্রের অবিস্মরণীয় ধ্রুবতারা ভিত্তোরিয়ো ডি সিকা

রু বে ল  পা র ভে জ

কল্পনার অলীক জগতের ছোঁয়া আমাদের সবাইকে দিবা-রাত্রি আচ্ছন্ন করে রাখলেও আদতে কল্পনার বাস্তব রূপকে চোখের সামনে দেখতে পেলে সেই কল্পনার মাহাত্ম্য বেড়ে হয় দ্বিগুণ। মানুষ বড় বাস্তববাদী, বাস্তবতার কঠিন, রূঢ় ছোবলে সে প্রতিনিয়ত আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষত-বিক্ষত হলেও সেই বাস্তবতাকে নিয়েই মানুষের যাপিত জীবনের এক দীর্ঘ পথের ইতিহাস রচিত হয়। আদতে বাস্তবতার ওপরই নির্ভর করে কল্পনার আলোকচ্ছটা কতটা বেশি দীপ্তমান হবে।

একসময় শিল্প, সাহিত্য সবকিছুই কল্পনার রঙে অাঁকা হতো, প্রকৃতির রূপ, রস ও সুধা নিয়ে শিল্পী তাঁর আপন সত্তাকে মেলে ধরতেন বসুন্ধরার ক্যানভাসে, শেষ পর্যন্ত তা আশ্রয় পেত মানুষ-হৃদয়ের সুন্দরময় নীড়ে। এটি ছিল সেই সময় যখন মানুষখেকো ‘মানুষরূপী’ হায়েনাদের হিংস্র ছোবল থেকে পৃথিবী অন্তত কিছুটা হলেও শান্ত ছিল, এটি ছিল সেই সময় যখন এই আদমজাত সন্তানদের পথ চলতে এতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়নি, এটি ছিল সেই সময় যখন আইনস্টাইনের মানববিধ্বংসী বোমার আগমনই ঘটেনি। ফলে শিল্পের সঙ্গে বাস্তবতাবর্জিত নিরেট কল্পনার বা বিমূর্ত সৌন্দর্যের একটি জাদুকরী মন্ত্রমুগ্ধ সম্পর্ক গড়ে উঠবে – এটিই স্বাভাবিক।

কিন্তু আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যারা শিল্প শিল্প ‘খেলা’ করি, নিজেকে শিল্পীর আসনে বসাতে চাই, তারাও কি ওই একই পথে হাঁটব? অবশ্য এটা মানতেই হবে, কল্পনা ছাড়া সৃষ্টি সম্ভব নয়। তারপরও তো শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে সময়, বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত, দেশ, সমাজ আর মানুষের নিত্যদিনের পথচলার সমষ্টিতে। কিন্তু আজ বাস্তবতার নির্মম আচরণ তো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, নগরসভ্যতার বুকে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন ঝরানো মূল্যহীন শ্রমের গগনবিদারী ক্রন্দন, আর পৃথিবীময় বোমা-বারুদের ঝাঁঝালো বিস্ফোরণের বন্যায় স্তম্ভিত এই ধরণী। এর মাঝে কীভাবে একজন শিল্পী শুধুই সেই ফ্যান্টাসির জগতে ঘুরে বেড়াবে? বাস্তবতাই তো তাকে তাড়িত করে চক্ষুষ্মান বাস্তবতাকে তার ক্যানভাসে তুলে ধরতে।

চলচ্চিত্রও সেই পথে হেঁটেছিল বহু বছর পর। স্টুডিওনির্ভর চলচ্চিত্র যখন রমরমা ব্যবসা করছিল দুনিয়াজুড়ে, আবেগপ্রবণ আর ফ্যান্টাসিনির্ভর চলচ্চিত্র যখন দর্শক পেট ভরে খাচ্ছিল, তখনো কিন্তু মানুষ এই চলচ্চিত্রকে সমাজের দর্পণ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।

এরপর চলচ্চিত্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শিল্প আন্দোলনের ছাপ লক্ষ করা যায়। আভাঁ গার্দ ধারার জন্মের মধ্য দিয়েই মূলত ওই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে সেই সময়কার অর্থ-বিত্তবেষ্টিত বাস্তবতাকে পরিহার করে বা ভেঙে শিল্পীরা তাঁদের স্ব-স্ব শিল্পচিন্তার উন্মোচন করেছিলেন। এরই আলোকে পরবর্তী সময়ে কিউবিজম, ফিউচারিজম, দাদাইজম, সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের মতো আরো বেশকিছু শিল্প আন্দোলন আমরা দেখতে পাই, সেটা ১৯২০-এর দশকের কথা। ফলে চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে থাকল মানুষের তথা এই বাস্তব সমাজের বয়ানকারী এক দূত হিসেবে। এরই মধ্যে দেশে দেশে চলচ্চিত্রচিন্তনের ক্ষেত্রে তৈরি হতে থাকল আলাদা স্বাতন্ত্র্য। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সেসময় এক অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। কারণ এই যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক আক্রমণের শিকার মানুষের আর্তনাদ তাদের মানসিকতায় এনে দিয়েছিল এক ব্যাপক পরিবর্তন। সমাজের এই দুঃসহ পরিণতির মধ্যেই ফ্যাসিবাদ, বুর্জোয়া, এমনকি বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক দর্শনের মধ্যেও যে ভূত ভর করে আছে তার বিরুদ্ধে এই আভাঁ গার্দ ধারাই এক বিজয়ী যোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছিল।

সবকিছু সেভাবেই চলছিল, কিন্তু কে জানত পৃথিবী আবারও যুদ্ধের মুখ দেখবে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও বেজে উঠল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। তবে এ যুদ্ধে যে কয়েকটি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তার মধ্যে ইতালি অন্যতম। মিত্রবাহিনীর প্রতিরোধে ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির পতন, চোখের সামনেই বীভৎস হাজারো পচা-গলা লাশ,
সন্তানবৎসল গলিত মৃত মায়ের বুকে মুখ গুঁজে নিষ্পাপ শিশুর চিৎকার, বিধ্বস্ত দেশের দিশেহারা ক্ষুধার্ত লাখ লাখ সাধারণ মানুষের দিগ্বিদিক ছুটোছুটি সেই সঙ্গে শিল্প-সাহিত্যচর্চার প্রতিষ্ঠানসহ চলচ্চিত্র স্টুডিওগুলোও ধ্বংস হয়ে গেল। চোখের সামনে নিদারুণ এই বাস্তবতা দেখে ইতালির বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা আলবার্তো লাতুয়াদা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে কিন্তু অসম সাহসিকতা নিয়ে ঘোষণা দিয়ে ফেললেন, ‘আমাদের পোশাক শতচ্ছিন্ন? তবে দেখুক সবাই সেই ছিন্ন পোশাক। আমরা পরাজিত? তবে দেখা যাক, আমাদের বিপর্যয়ের চেহারা।’ আবার ইতালির চলচ্চিত্রনির্মাতা রোবার্তো রোসেলিনি তাই বলেছিলেন, ‘১৯৪৪ সালে ইতালিতে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল – ফিল্ম এবং অন্য সমস্ত কিছু।’ অবশ্য একথা বলেই কিন্তু তিনি বসে থাকেননি। সময়ের স্রোতে পালতোলা শিল্প নামক সেই নৌকাটিতে তিনিও চেপে বসলেন। সেসময় বহমান নব্য-বাস্তববাদ সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়লেন তিনি – ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের অন্যায় আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে অসম সাহসী বিশ্লেষণমূলক এই ধারার প্রতিবাদ তাঁকেও উৎসাহিত করল। তবে মাধ্যম কিন্তু সাহিত্য নয়, তিনি তাঁর প্রয়োগ ঘটালেন চলচ্চিত্রে। রোসেলিনি নিজেই ক্যামেরা কাঁধে নেমে পড়লেন রাজপথে। নির্মাণ করে ফেললেন রোম : ওপেন সিটি (১৯৪৫) নামের একটি চলচ্চিত্র। তিনি প্রমাণ করে দিলেন সাধারণ মানুষ দানবীয় শক্তির কাছে সবকিছু হারিয়ে আপাত অসহায় হয়ে পড়লেও মানুষ কখনো পরাজিত হয় না। হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সিতে তাঁর উক্তি তাই বিজয়ীর বেশ ধারণ করে; তিনি বলেন, ‘মানুষ ধ্বংস হতে পারে কিন্তু পরাজিত হবে না কোনোদিন। ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানুষ তার আত্মিক শক্তি দিয়েই জয় করে সব।’ রোম : ওপেন সিটির (১৯৪৫) এই মর্মবাণী দিয়েই চলচ্চিত্রও প্রবেশ করল নব্যবাস্তববাদের এক জাদুকরী পথে। যুদ্ধ আর বিভীষিকার ঔরসজাত এই নব্যবাস্তববাদ ধারাই পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রনির্মাতাদের আশার আলো হয়ে উঠল। স্টুডিওর বাইরের সাধারণ পরিবেশ, কৃত্রিমতাবর্জিত আর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলোই এর চরিত্র; ব্যস, আর কিচ্ছু না। ধ্বংসের মাঝে সৃষ্টিসুখের উন্মাদনায় ইতালির পথে পথে তাঁরা চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজে নেমে পড়লেন; ফলে সাধারণ দৈনন্দিন যাপিত জীবন নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোই ইতালির পূর্বেকার আপাদমস্তক চলচ্চিত্রের গতি পাল্টানোর আভাস দিয়ে গেল।

 

আলো হাতে ডি সিকা

১৯৪৭ সাল। জার্মানদের হামলায় লন্ডভন্ড পুরো ইতালি। জীবন বাঁচানোর তাগিদেই মানুষ তখন দিশেহারা। যুদ্ধবাজদের কবলে পড়ে সেদেশের হাজার বছরের গড়ে ওঠা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি মৃতপ্রায়। চলচ্চিত্রেও পড়েছে তখন আকাল – ভাঙা স্টুডিও, আর্থিক দৈন্য, সঙ্গে হতাশা সবকিছু কুরে কুরে খাচ্ছিল ইতালির চলচ্চিত্রনির্মাতাদের। কিন্তু এ সংকট আর বেশিক্ষণ রইল না, আলো হাতে সেই দুঃসহ অন্ধকার মুহূর্তে আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়ালেন – বিশ্ব-চলচ্চিত্রের অবিস্মরণীয় ধ্রুবতারা – ভিত্তোরিয়ো ডি সিকা।

‘জীবন যেখানে যেমন ঠিক তেমন করেই তুলে ধরো সেলুলয়েডের ফিতায়’ – এই প্রত্যয় নিয়ে জন্ম নেওয়া নব্যবাস্তববাদ নামক শিল্পদর্শনটির পূর্ণরূপই কিন্তু পায় এই মানুষটির কাছে। রোবার্তো রোসেলিনির কাছ থেকে নব্যবাস্তববাদের পথ খুঁজে পেয়ে এই চলচ্চিত্রপথিক বুকভরা সাহস নিয়ে এগিয়ে এলেন সামনে – উদ্দেশ্য স্বদেশের মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরবেন একেবারে সাধারণভাবে। সঙ্গে তাঁর সঙ্গী হয়ে এলেন ইতালির বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার সিজার জাভাত্তিনি। যাঁর কথা আর চিন্তায় শুধুই মানবিকতা, সংগ্রামমুখর জীবন। যাঁর মন্ত্রই ছিল, ‘films of value to humanity’। ইতালির চলচ্চিত্রপ্রেমীরা যাঁকে ‘he set the standard’ বলেই সম্মান জানান। জাভাত্তিনির দর্শনে মুগ্ধ হতে এতটুকু সময় লাগেনি বুদ্ধিমান সিকার। অতঃপর দুই বোধের সম্মিলনে অর্থাৎ জাভাত্তিনির চিত্রনাট্য আর সিকার পরিচালনা, এই দুইয়ে মিলে পরিপূর্ণতার বীজ বপন করতে লাগলেন নব্যবাস্তববাদী চলচ্চিত্রধারাকে। সিকার প্রায় সব চলচ্চিত্রেরই চিত্রনাট্যকার ছিলেন এই জাভাত্তিনি।

কিন্তু তাই বলে সিকা তাঁদের একান্ত ভালো লাগা, ব্যক্তি-অভিমুখীনতা ও ফ্যান্টাসিকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। তিনি মনে করতেন, নব্যবাস্তববাদী চলচ্চিত্রধারার আগমন সময়ের এক বিশেষ প্রয়োজনে, নিপীড়িত জীবনের না বলা কষ্ট প্রকাশের প্রয়োজনে এবং যা ইতালির সার্বিক তৎকালীন পরিস্থিতির জন্য অবশ্যম্ভাবী। তিনি বলেছিলেন, ‘Its not like one day we sat a table on Via Vento, Rossellini, Visconti, myself and others and said, now let’s create neorialism.’ আসলেই তো তাই ঠিক, সমাজ পরিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, স্থিতিশীল কোনো কিছুকে অতীত করার স্পর্ধা তো কম সাহসের ব্যাপার নয়, পুরনো অকেজোর শিকড় তো আর এমনি এমনি উপড়ে ফেলা যায় না, দরকার সাহস, সততা আর প্রগতির সঙ্গী হওয়া; সিকাও দিব্যি সেই পথে হাঁটা শুরু করলেন।

তবে নব্যবাস্তববাদের মূল বৈশিষ্ট্য ‘Take the camera out into the streets’-এর মধ্যেই শুধু নিজেকে আটকে রাখলেন না, সেইসঙ্গে যোগ করলেন সংবেদনশীলতা ও কবিতার মতো আরো নানা মাত্রা। একেবারে মাটির ঘরের মানুষদের নিয়ে, সাধারণ জীবন নিয়ে তৈরি করে ফেললেন শু সাইন (১৯৪৬)। না, তাঁর এই চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য যুদ্ধবিষয়ক কিছু ছিল না, তিনি চাননি যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার ছলে শাসকদের ভয়ংকর চেহারা দেখিয়ে পুনরায় নির্যাতিতকে ভয় দেখাতে, বরঞ্চ তিনি যুদ্ধবাজদের কবলে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নির্যাতিত, যন্ত্রণাকাতর ও দুর্বিষহ মানুষের বর্ণহীন বিষাদ মুখ তুলে এনেছেন এক সরল ভঙিমায়। শু সাইনের নায়ক সভ্যতার ধ্বজাধারী রোম নগরের পথে পথে ঘুরে ঘুরে জুতো পালিশ করা নিষ্পাপ কিশোরেরা। রাজপথই যাদের অর্থ উপার্জনের উৎসস্থল আবার সেখানেই জীবন বাঁচানোর সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। এমন নষ্ট জীবন বয়ে বেড়ানোর পরও ইতালি নামক রাষ্ট্রের যুদ্ধোত্তর বিভীষিকা আর ভয়াবহতা তাদেরও গ্রাস করেছিল। ফলে এর প্রতিটি চরিত্রের মধ্যকার গড়ে ওঠা মানবীয় সেই মধুর সম্পর্কেও ফাটল ধরে। এই কিশোরদের মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব, কখনো বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে হত্যা, আবার মৃত বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, অনুশোচনার আহাজারি ও পরাজিত স্বদেশ রোমের রাস্তায় মার্কিন সৈন্যদের পা টেনে ধরে ‘বুট পালিশ, বুট পালিশ’; এ যেন এক অজ্ঞাত শক্তি আর লক্ষ্মীছাড়া ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া কিছুই নয়, তারপরও মানবিকতার শুদ্ধবোধ তাদের তাড়িত করে আর অপমানজনক এই জীবনের মাঝেও তাদের স্বপ্ন খোঁজা; এই তো মানুষের পরিচয়, যাকে বলে মানুষের জাত স্বভাব। শু সাইনে (১৯৪৬) এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা, রাষ্ট্র কর্তৃক মানুষকে অমানুষ হতে বাধ্য করা আর পুনরায় মানবিকতার কাছেই মানুষের ফিরে যাওয়ার সহজাত গুণের চূড়ান্ত রূপ ফুটে ওঠে। আর প্রথম এই চলচ্চিত্র দিয়েই সিকা আভাস দিলেন নব্যবাস্তববাদী ধারার চলচ্চিত্রের পথকে তিনি কোথায় নিয়ে যেতে চান।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শু সাইনের জন্য অভিনন্দন পেলেন সিকা; দর্শকহৃদয়ের এই সম্মান তাঁকে করে তুলল ইতালির চলচ্চিত্রের মধ্যমণি। অথচ আশ্চর্যের কথা, সাধারণ মানুষ থেকে বিশ্বের আপামর চলচ্চিত্রবোদ্ধার নিকট থেকে উপযুক্ত প্রশংসা, সম্মান পেলেও রাষ্ট্র তাঁকে নিগৃহীত করতে ছাড়েনি। একদিকে তাদের ছবিতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, অকর্মণ্যতা তুলে ধরার জেদ, আরেকদিকে তাদের মিত্র মার্কিন স্বার্থ পরিপন্থী ধৃষ্টতার আভাস – এই কারণ ও সঙ্গে ইতালির ব্যবসায়ী মনোভাবের চলচ্চিত্রকর্তাদের চোখ রাঙানি; সব মিলে ডি সিকার জন্য এক অসহনীয় পরিস্থিতি। ফলে তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় এক নজরবন্দি অবস্থার। যারা তাঁকে সাহায্য করার মনোভাব পোষণ করেছে তাদেরই পেছন থেকে চোখ রাঙানি দিয়েছে ইতালির নজরবন্দিখানা, মানে স্বরাষ্ট্র দপ্তর। এমনকি কান চলচ্চিত্র উৎসবে পর্যন্ত শু সাইনকে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। কেননা রাষ্ট্র যে চলচ্চিত্রের রূপ চায় তা তো সিকা বা নব্যবাস্তববাদীরা নির্মাণ করতে একেবারেই নারাজ। সিনেমার পর্দায় নাচ, ভিনদেশি উন্মত্ত গান, চটুল ও অশ্লীল চিত্রনাট্যের সম্ভার রাষ্ট্র দেখতে চেয়েছে – যেখানে থাকবে না রাষ্ট্রবিরোধী কোনো মত, দুর্নীতির চিত্র, পুলিশি বর্বর আচরণ ইত্যাদি। কিন্তু নাছোড়বান্দা সিকা তা মেনে নিতে রাজি নন মোটেও – মানবিক বোধের মৃত্যু ঘটুক তা তিনি চান না – তিনি যে মানবিক বোধে গড়ে ওঠা এক মানুষ। রাষ্ট্রের নীতি আর তাঁর নীতির চরম পরস্পরবিরুদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ যেন দেখতে শুরু করল আম-দর্শক। সিকার পণ যেন চলতে থাকা সব ধরনের নীতির বিরুদ্ধে দানা বাঁধতে শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিলেন কেউ সাহায্য করুক আর নাই করুক তাঁর মনের ভেতরে অাঁকা দরিদ্র মানুষগুলোর অর্থনৈতিক দুরবস্থা, নিষ্কলঙ্ক মানুষগুলোর ক্রমশ বাধ্য হয়ে অসৎ হয়ে ওঠা – এ দায়, ব্যর্থতা কি এই মানুষগুলোর নাকি তারা যাদের প্রজা, তাদের যারা রাজা সেই রাষ্ট্রের, ধনী সমাজের? এরকম নানা প্রশ্ন মাথায় রেখে নেমে পড়লেন তা চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার জন্য। তবে টাকা কোথায়? অনেক খুঁজে অবশেষে দেখা পেলেন ডেভিড ও সেলজেনিক নামের দুই প্রযোজকের। কিন্তু বিধি বাম; শর্ত একটাই সিকার স্বপ্নে জাল বোনা চলচ্চিত্রের সেই প্রধান চরিত্রে যার ছবি তার কল্পনায় অাঁকা ছিল, তাকে নয় নিতে হবে বাণিজ্যিকধারার জনপ্রিয় নায়ক ক্যারি গ্রান্টকে। সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন সিকা – কারণ সে যে বাস্তবতাকে ধারণ করে পথ চেয়ে আছে; সে পথ ত্যাগ করার মানুষ অন্তত তিনি নন। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের টাকায় নিজের মতো করেই নির্মাণ করবেন চলচ্চিত্রটি। টাকা রোজগারে আবার ধরলেন সেই পুরনো পথ। ফিরে গেলেন সেই পুরনো দিনের কর্মস্থল মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জগতে। এখানে একদিকে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে টাকা রোজগার, আরেকদিকে কল্পনার মধ্যেই চলচ্চিত্রটির প্লটের পর প্লট সাজানো। অবশেষে তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলল – প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান হলো। এবার পুরোদস্ত্তর নেমে পড়লেন কল্পনায় অাঁকা বাস্তব জীবনের সেই চলচ্চিত্রটি নির্মাণে, হ্যাঁ বলছিলাম – বিখ্যাত, কিংবদন্তিতুল্য সেই চলচ্চিত্র বাইসাইকেল থিভস (১৯৪৮) নির্মাণের ইতিকথা। নব্যবাস্তববাদের পুরো বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে এ এক হৃদয়বিদারক ও জ্বলন্ত বাস্তবতাকে সেলুলয়েডের ফিতায় তুলে ধরার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।

বাইসাইকেল থিভস চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনি ঔপন্যাসিক লুইগি বার্তোলিনির একটি সাধারণ জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। একেবারেই সহজ চিন্তা, সহজ ভাষা আর সহজ কথায় বলা এই উপন্যাসটির চলচ্চিত্রিক যে রূপ সিকা দাঁড় করালেন তা এক কথায় অনবদ্য; অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক মুখরতা, নিটোল মানবিকতা আর অন্তঃদ্বান্দ্বিক বোধের সঙ্গে পরাজিত হৃদয়ের লড়াই; সেইসঙ্গে রাষ্ট্রের কুৎসিত মুখোশ, সব মিলিয়ে মনোমুগ্ধকর প্রামাণ্য-কাব্যে উত্তীর্ণ হওয়া এক চলচ্চিত্র বাইসাইকেল থিভস। এবার দেখা যাক, কী আছে এই চলচ্চিত্রে যা দেখে বিখ্যাত ফরাসি নন্দনতাত্ত্বিক অঁদ্রে বাজাঁ বলেছিলেন, ‘বাইসাইকেল থিভস হলো বিশুদ্ধ চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান নিদর্শন। (এতে) না আছে কোনো অভিনেতা, না কোনো কাহিনি, না কোনো সেট; অর্থাৎ বাস্তবের নিখুঁত নান্দনিক ভ্রম সৃষ্টিতে (তথাকথিত) সিনেমাই আর নেই।’

চল্লিশের দশকে ইতালিতে যেন প্রেতাত্মা ভর করেছিল, আর বিষাক্ত কীটের ছোবলে রাষ্ট্রের শরীরেরও ধরেছিল পচন। অভিশপ্ত ইতালির সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। তারপরও জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটুকু তো করতে হবে। যুদ্ধের আঘাতে সব শেষ; মিল, কারখানা সবকিছুই    ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবুও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথচলা – তারপরও লক্ষ্য শুধুই বেঁচে থাকা। সিকার প্রথম নেওয়া শটটিতেই উঠে আসে যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের সেই ভয়াবহ চিত্র। এরপর দেখা যায়, ছোট্ট একটি কাজের জন্য এরই মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে এসে জড়ো হয় ক্ষুধার্ত পাঁজরভাঙা একদল মানুষ। তাদেরই একজন রিচি ওরফে আন্তনিও। আপাতত সে বেকার-দুর্ভাগাদের বাইরের এক মানুষ – কেননা এত লোকের মধ্যেও সে একটি কাজ পেয়েছে। কিন্তু শর্ত কেবল একটাই – যাতায়াতের জন্য সাইকেলটি তার নিজের হতে হবে। এ যেন ‘ঘর আছে তার দুয়ার নাই’ গানটির মতো অবস্থা। এজন্য সাইকেলের প্রয়োজনই তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। দুই চাকার এক সাইকেলের ওপরই তার পরিবারের সচ্ছলতা, অধরা স্বপ্নকে ধরা আর ছোট্ট দুটি সন্তানের ভবিষ্যৎ – সাইকেলই হয়ে ওঠে তার স্বাধীনতা, সচ্ছলতার প্রতীক। সারাদিন খেটে-মরা স্ত্রী মারিয়াকে এসে     আন্তনিও তার দরকারি সাইকেলটির কথা জানায়। অভাবের তাড়নায় অনেকদিন আগে বন্ধক রাখা সাইকেলটি ছাড়িয়ে আনতে মারিয়া তার বিয়ের শেষ স্মৃতিচিহ্ন বিয়ের পোশাকটি বন্ধক রেখে সাইকেলটি ছাড়িয়ে আনে। এখানে শুধু মারিয়াই নয়, হাজারো মারিয়া তাদের এমন সুখস্মৃতির শেষ সম্বলটুকু বন্ধক রেখে পেটের দায় সারছে। সিকা তাদের বেদনা ও উৎসর্গের গভীরতা বোঝাতে এই প্যানিং শটে দেখিয়ে দিলেন বন্ধকির দোকানে ঝুলে থাকা মারিয়াদের সেই স্মৃতিচিহ্ন। এ যেন লক্ষ নারীর ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নের অপমৃত্যুর বেদনাবহুল মুহূর্তের চিত্র তুলে আনলেন সিকা এক অনবদ্য সরল ভঙিমায়। এরপর, আন্তনিও সাইকেল নিয়ে কাজে যায়, সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যায় আর তার স্ত্রী মানে ভালোবাসার সেই মানুষটি মারিয়াকে নিয়ে রোমাঞ্চিত কিছু আনন্দের মুহূর্ত কাটানো সব মিলিয়ে সাইকেলটি হয়ে ওঠে আশা-আকাঙ্ক্ষা আর সচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তার প্রতীক। কিন্তু তৎকালীন সামগ্রিক বাস্তবতা তো আর এমন ছিল না। দারিদ্রে্যর হাহাকারে হাজারো বেকার ভবঘুরে ‘আন্তনিও’র ক্রন্দিত রাজপথে আন্তনিও-মারিয়ার সুখ কীভাবে স্থায়ী হয়? একপর্যায়ে রাষ্ট্রের নিজস্ব সংকটের বলি হয়ে সব সাধারণ মানুষ ‘অসৎ’ হতে থাকে – এখানেও লক্ষ্য শুধুই বেঁচে থাকা। ফলে আন্তনিওর সেই সাইকেলটি চুরি হয়ে যায় – এক দিশেহারা যুবকের দ্বারা। এ যেন এক টুকরো সুখ নিয়ে রশি টানাটানি। সাইকেল হারিয়ে হতবিহবল হয়ে পড়ে আন্তনিও; দিশেহারা হয়ে পড়ে – তাহলে কি নানা কষ্টে অর্জিত সুখটুকু বাস্তবতার কঠিন জাঁতাকলে বিলীন হয়ে যাবে? দুঃস্বপ্ন বুকে নিয়ে তাই শহরের প্রতিটি জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকেন সাইকেলটি। আন্তনিওর খুঁজে ফেরা রাস্তায় হাজারো মানুষের সারিবদ্ধভাবে হন্যে হয়ে ঘুরেফেরা, স্তূপাকারে সাজানো সাইকেল ও সাইকেলের বিভিন্ন অংশ; চলচ্চিত্রটির এই মুহূর্তের দৃশ্যায়নে সিকা যেভাবে একের পর এক প্যানিং ও ট্র্যাকিং শটের ব্যবহার করেছেন তা সত্যিই অসাধারণ ও লক্ষণীয়। আসলে চলচ্চিত্রটির ন্যারেটিভ বলতে মূলত আন্তনিওর মরিয়া হয়ে সাইকেলটি খোঁজার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাটুকুই।

সাইকেলটি খোঁজার জন্য নিদারুণ দৌড়ঝাঁপের এই সবসময়ের সঙ্গী হিসেবে থাকে আন্তনিওর ছোট্ট অথচ বুদ্ধিমান ও বোধসম্পন্ন ছেলে ব্রুনো। পুরো ছবিতে ছেলের সঙ্গে বাবার এই নৈতিক সম্পর্ক উপস্থাপন করে সিকা যেন রাষ্ট্রকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিলেন। এতটুকু এক অবুঝ শিশু যদি তার পিতার বিপদে পাশে থেকে বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিতে পারে, না খেয়ে সারাদিন যদি পিতাকে সাহস জোগাতে পারে, চড় খেয়ে খানিকটা অভিমানের পরও পিতার কাছেই হাসিমুখে থাকতে পারে, চুরির দায়ে জনগণের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার হাত থেকে পিতাকে রক্ষা করার জন্য যে শিশু আপ্রাণ সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে তাহলে রাষ্ট্র কেন পারবে না সাধারণ একজন মানুষের পাশে সঙ্গী হয়ে থাকতে? রাষ্ট্র কি শুধু ওই শিশুটির বয়সের মতোই অবুঝ? হ্যাঁ, সিকা চোখ রাঙিয়ে এই শিশুটির মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন সম্পর্ক কাকে বলে, জনগণের সেবক কাকে বলে, কীভাবে এগিয়ে আসতে হয় মানুষের বিপদে। তাই এই শিশুটিই সিকার চোখে ধরা দেয় এক সত্যিকারের রাষ্ট্রের স্বরূপ হয়ে। ব্রুনো যেন মানবপ্রিয় রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে ধরা দেয় আমাদেরও সামনে।

তবে শত চেষ্টা করে চুরি হয়ে যাওয়া সাইকেলটি না পেয়ে আন্তনিও একেবারে ভেঙে পড়ে – হাতে আর কোনো অবশিষ্ট নেই যে সে আরেকটি সাইকেল জোগাড় করবে। অবশেষে সিকা দেখালেন সেই অর্থের অভাবে মানুষের নৈতিকতার পতন, আত্মসম্মানের পতন। আন্তনিও সেই চোরটির মতোই কাজ করে বসল; চুরি করল আরেক অভাগার সাইকেল; কিন্তু বিধি বাম – ধরা খেলো জনতার হাতে। মার খেলো সন্তানটির চোখের সামনে – নিদারুণ এই বক্তব্যের বৈচিত্র্য আর ডেফথ অব ফিল্ড সত্যিই অতুলনীয়। সিকা প্রমাণ করে ফেললেন নব্যবাস্তববাদের সফল ও বিশ্বজনীন কোনো চলচ্চিত্র যদি থাকে, তাহলে সেটি এই বাইসাইকেল থিভস। সত্যিই বাইসাইকেল থিভস নব্যবাস্তববাদের শুধু চিত্ররূপ নয়, যুদ্ধবিরোধী মানবতাবাদ ও তৎকালীন ইতালি নামক রাষ্ট্রের গোমর ফাঁস করা দুর্দান্ত নিখাদ এক সংগ্রাম ও প্রতিরোধের আবহমান দলিল।

বাইসাইকেল থিভস দেখে অঁদ্রে বাজাঁ এর সমালোচনা করেন এভাবে, ‘It is the most successful communist film in the world।’ আর রেঁনে ক্লেয়ার অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘বিগত ত্রিশ বছরের শ্রেষ্ঠ ছবি।’ তবে তাঁর এ কথার সঙ্গে এও প্রমাণিত হয়, এটি শুধু বিগত ত্রিশ বছরেরই নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রথম দশটি চলচ্চিত্রেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বটে; তাছাড়া সিকা নিজেই বলেছিলেন, ‘Bicycle Thieves is a good picture. I like very much.’ আর বাস্তবতার কঠিন নিষ্পেষণ যতদিন পর্যন্ত আন্তনিও-মারিয়াদের ঘাড় মটকে দেবে ততদিন থাকবে এই বাইসাইকেল থিভস। এভাবেই সেইসব হতভাগা দৈন্য মানুষের সঙ্গী হয়ে নিম্নবর্গের কাতারে নিজেকে যুক্ত করেন সিকা নিজেকে।

এরপর, এলো ১৯৫০ সাল। ততদিনে দর্শক চিনে গেছে সিকা নামের এই কিংবদন্তিকে। আর এই উৎসাহে তিনি মিরাকল ইন মিলান (১৯৫১) ছবিটি নির্মাণের কাজ শুরু করলেন; এবার তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলেন আরেক বিখ্যাত নির্মাতা ভিসকন্তি। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মিত হলো চলচ্চিত্রটি। সেখানেও সফল। তারপর নির্মাণ করলেন উমবার্তো ডি চলচ্চিত্রটি। এক অসুস্থ বৃদ্ধ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের কিছুটা মান-সম্মান নিয়ে জীবন বাঁচানোর সংগ্রামের কথা বলেছেন সিকা এই চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে। এটিও নব্যবাস্তববাদ ধারার বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করা ডি সিকার অসামান্য এক চলচ্চিত্র। তবে বাইসাইকেল থিভসের মতো অতটা ন্যারেটিভধর্মী, সরলনির্ভর চলচ্চিত্র নয় – এর বিষয়াদি অনেকটা কাব্যধর্মী। খেয়াল করার বিষয়, কেন্দ্রীয় চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক গতিবিধিকে সামাজিক প্রেক্ষাপটের চেয়ে অনেক বেশি ফোকাসে রাখা হয়েছে, যা একজন নব্যবাস্তববাদী চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে সিকা কিছুটা বাইরে সরে এসেছিলেন বলেই মনে হয়।

এছাড়া তিনি বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৬০-এ নির্মিত টু উইমেন চলচ্চিত্রটি। ছবিটি   নব্যবাস্তবতাকে অনেকটা ধারণ করলেও একটি জায়গায় সিকা এর পরিবর্তন ঘটান – সেটি হলো, সেসময়ের বিখ্যাত অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সোফিয়া সম্পর্কে সিকা অবশ্য বলেন এভাবে, ‘I consider Sophia a great – a good actress and a great personality. Because she is a Neopolitan. Like me. We are the same people, the same origin. And we fell together the same. Yes, for me. I am very happy when I work with Sophia.’ বুদ্ধিমান সিকা মেধাও চেনেন; তাঁর কথার প্রমাণও অবশ্যই সোফিয়া রেখেছেন টু উইমেন চলচ্চিত্রে। এ চলচ্চিত্রে সিকা তুলে এনেছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, ক্ষুধিতের আর্তনাদ, মা-মেয়ের জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টা, বুকের শিশুকে খুঁজে ফেরা মায়ের ব্যাকুলতা ইত্যাদি। এই চলচ্চিত্রের মনকাঁদানো একটি দৃশ্যের কথা না বললেই নয়, শিশুসন্তানকে পাগলের মতো খুঁজছে এক হতভাগা মা; তার বুক থেকে দুধ গড়িয়ে পড়ছে : সন্তানকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান, কিন্তু সে আর আসে না, কাকে খাওয়াবে এই দুধ! মাতৃত্বশূন্যতায় একপর্যায়ে সে পাগল হয়ে যায় – অসভ্য শাসকদের নিষ্ঠুরতার কাছে। আবার, মা-মেয়ের যে বাস্ত্তহারা বর্ণনাহীন জীবন তাতেও সিকা তুলে ধরেছেন এক অনন্যতা, এত চড়াই-উতরাই, ঘাতকদের কাছে ধর্ষণের শিকার, তারপরও জীবন থেমে থাকে না, জীবন জীবনের মতো করেই সামনে এগোয়, মা-মেয়েও সেই আগের মতো লড়াই করতে থাকে – সিকার এই অসাধারণ মর্মগাথায় পরিপূর্ণ টু উইমেন।

আলোচিত নব্যবাস্তববাদী এই চলচ্চিত্রগুলো ছাড়াও ডি সিকা জিরো ফর কনডাক্ট (১৯৪০), ডু ইউ লাইক ওম্যান (১৯৪১), দ্য চিলড্রেন আর ওয়াচিং আস (১৯৪৪), দ্য গেইট অব হ্যাভেন (১৯৪৫), হার্ট, হার্ট অ্যান্ড সোল (১৯৪৮), মিরাকল ইন মিলান (১৯৫১), ইট হ্যাপেন্ড ইন দ্য পার্ক (১৯৫৩), দ্য গোল্ড অব ন্যাপেলস (১৯৫৪), দ্য রুফ (১৯৫৬), দ্য লাস্ট জাজমেন্ট (১৯৬১), ইয়েস্টারডে, টুডে অ্যান্ড টুমরো (১৯৬৩), ম্যারেজ ইতালিয়ান স্টাইল (১৯৬৪), এ প্লেস ফর লাভার্স (১৯৬৮), দ্য গার্ডেন অব দ্য ফিনজি কনটিনিস (১৯৭০), সানফ্লাওয়ার (১৯৭০), দ্য নাইটস অব মাল্টা (প্রামাণ্যচিত্র, ১৯৭১), ই ব্রিফ ভ্যাকেসন (১৯৭৩), দ্য ভয়েজ (১৯৭৪) উল্লেখযোগ্য।

চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের কারণে বিশ্বচলচ্চিত্র তাঁকে ভুলে যায়নি, ভুলে যায়নি বিশ্বের আপামর দর্শক তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে। যার প্রমাণ মেলে ১৯৪৬ সালে শু সাইন (১৯৪৬) চলচ্চিত্রটি বিশেষ সম্মানসূচক অ্যাওয়ার্ড, বাইসাইকেল থিভস বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে ১৯৪৯ সালে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার), সেরা চলচ্চিত্র শাখায় ১৯৫০ সালে বাফটা (ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড), এছাড়া ইয়েস্টারডে, টুডে অ্যান্ড টুমরো (১৯৬৩), ম্যারেজ ইতালিয়ান স্টাইল (১৯৬৪), দ্য গার্ডেন অব দ্য ফিনজি কনটিনিস (১৯৭০) এই চলচ্চিত্রগুলোও সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কারে মনোনীত হয়েছিল। এছাড়া দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার মহান এই মানুষটিকে বরণ করে নিয়েছে।

তবে সাধারণ থেকে এত বড় একজন মানুষ অসাধারণ হয়ে ওঠা ও আমাদের চলচ্চিত্র জগতের মধ্যমণি এই ভিত্তোরিয়ো ডি সিকার জীবনবৃত্তান্ত না জানলে লেখাটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। সুতরাং তাঁকে নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহান মানুষটির আদ্যোপান্ত – মানুষটি জন্মেছিলেন ১৯০১ সালের ৭ জুলাই, যদিও কারো কারো মতে তা ৭ জুলাই ১৯০২ – ইতালির লাতিও শহরের সোরাতে। বাবার নাম ম্যানুয়েল ডি সিকা আর মায়ের নাম ক্রিস্টিনা ডি সিকা। ক্ষুধা আর দারিদ্র্যই তাঁর পথচলা জীবনের পাথেয়। বাবার কষ্টের উপার্জনে দিশেহারা হয়েছেন, হোঁচট খেয়েছেন প্রতিটি মুহূর্তে – তবু হাল ছাড়েননি। নিদারুণ কষ্টের মধ্যেও মেধার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছেন নিজেকে। কষ্ট তাঁর জীবনের প্রেরণা হয়ে উঠেছে বারংবার। ক্ষুধা তাঁকে বাধ্য করেছে কোমল হাতে নিদারুণ শক্ত সংগ্রাম করতে। সেই কৈশোরেই কাজ করেছেন একটি অফিসের নিম্নমান সহকারী হিসেবে – উদ্দেশ্য রাক্ষুসে পেটটাকে কিছু দেওয়া।

এরপর আসে তাঁর জীবনে আরেক পরিবর্তন – বদলে যায় জীবনের রঙ্গমঞ্চ। বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করা ডি সিকা একপর্যায়ে যোগ দেন কল্পনার অভিলাষী উপস্থাপনের চমৎকার জায়গা মঞ্চে। প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়ে, রূঢ়, কঠিন বাস্তবতার মধ্যে থেকেও অল্পবয়সী এই ছেলেটি কৌতুক করে বেড়িয়েছেন রাস্তায় রাস্তায়, সবার মনকে ভালো করে দিয়েছেন – অসাধারণ সব বাঙ্ময় ভঙ্গিমা প্রদর্শন করে। ১৯২০ সালে ১৮ বছর বয়সে থিয়েটারে তাঁর প্রবেশ। এভাবে কাজ করতে করতে একসময় তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ইতালিজুড়ে। আস্তে আস্তে ঘুচে যেতে থাকে ক্ষুধার নিপীড়িত যন্ত্রণা আর কষ্ট। পরবর্তী সময়ে তিনি যোগ দেন বিখ্যাত থিয়েটার কোম্পানি তাতিয়ানা পাভলোভা থিয়েটারে – সেটা ১৯২৩ সালের কথা। এখানে দীর্ঘদিন কাজ করে ইতোমধ্যে তিনি নিজেকে আরো বেশি ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন। যার প্রমাণ মেলে ১৯৩৩ সালে তাঁর স্ত্রী Giuditta Rissone-এর সহযোগিতায় একটি থিয়েটার কোম্পানি প্রতিষ্ঠায়। এখানে মূলত নানা ধরনের কমেডি ঘরানার নাটক মঞ্চস্থ করা হতো। যদিও সেখানে লুসিনো ভিসকোন্তির মতো নির্মাতারা নাটক নিয়ে কাজ করতেন; সিকা থিয়েটার কোম্পানিকে আলোকিত করেছেন ইতালিজুড়ে। তারপরও এত আলোর মাঝে নিজেকে জ্বলজ্বল করে তুলে ধরেছেন অসাধারণ সব অভিনয়শৈলী দিয়ে। এমনকি সেসময় নারী দর্শকদের কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় ও আকর্ষণীয় বলতে শুধু ডি সিকাই ছিলেন এক কাঙ্ক্ষিত পুরুষ।

তবে পারিবারিক ক্ষেত্রে তাঁর জীবনে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা আছে। যে নারী সিকার প্রথম জীবনের সার্বক্ষণিক সহযোগী ছিলেন, সিকার ওপরে ওঠার জন্য যে নারীর ভূমিকা চিরকৃতজ্ঞস্বরূপ, তার সেই প্রথম স্ত্রী Giuditta Rissone-এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিবাহিত সম্পর্কের চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটে। যদিও এর মধ্যেই মারিয়া মারসেডার নামের এক স্পেনীয় নারীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে Giuditta Rissone-এর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর ১৯৫৯ সালে মারিয়া মারসেডাকে বিয়ে করেন। তবে সেটা ফ্রান্সে নয় মেক্সিকোতে; কিন্তু দেশটির আইন তাঁদের এ বিয়েকে বৈধতা দেয়নি, অবশেষে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন পর ১৯৬৮ সালে প্যারিসে মারিয়াকে পুনরায় বিয়ে করেন। প্রথম ঘরে একজন ও দ্বিতীয় ঘরে দুইজন, মোট তিন সন্তানের জনক ডি সিকা।

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ার পরও কিন্তু ডি সিকা কারো সঙ্গেই সম্পর্ক ভেঙে দেননি। বরঞ্চ একই সঙ্গে দুই পরিবারকেই আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। এমনকি ছুটির দিনে দুই পরিবারের সবাই একত্রিত হয়ে আনন্দ উৎসব পালন করত। এরকম আরো একটি উদ্যাপনের কথা না বললেই নয়, বড়দিন ও নববর্ষের ঠিক দুই ঘণ্টা আগে ঘড়ি পিছিয়ে রাখতেন, যাতে মারিয়ার বাড়িতে দুই পরিবারের সবার জন্য সে নিজ হাতে কেক বানিয়ে খাওয়াতে পারে। Giuditta Rissone ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ধৈর্যশীল একজন নারী। কেননা সিকার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পরও তিনি চেয়েছেন তাঁর ছোট্ট অবুঝ মেয়েটি যেন বাবাহারা না হয়, বাবার মমতা পেয়েই যেন বেড়ে ওঠে। শুনলে অবাক লাগতে পারে, তারপরও সত্য সিকা একসময় জুয়াখেলার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। যে কারণে তাঁকে প্রচুর পরিমাণে টাকাও গচ্চা দিতে হয়েছে। যদিও তিনি তাঁর এই বিষয়টি কখনো গোপন রাখেননি। এমনকি চলচ্চিত্রপাগল এই মানুষটি তাঁর ব্যক্তিগত এই স্বভাবকে নিয়েই দ্য গোল্ড ন্যাপলস চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় পর্যন্ত করেছেন। ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী এই মানুষ ইতালির কম্যুনিস্ট পার্টিকে সমর্থন করতেন, এমনকি কখনো কখনো নিজেকে এর সঙ্গে গভীরভাবে সক্রিয়ও রাখতেন।

তবে যুদ্ধের বহু বছর কেটে যাওয়ার পর ইতালিতে যখন আর্থিক দৈন্য কেটে যেতে লাগল, সেই পুরনো ভাঙাচোরা বাড়িগুলো হয়েছে অট্টালিকাসম, মানুষ যখন সুখের মুহূর্তগুলো ফিরে পেতে থাকল তখন আস্তে আস্তে করে নিওরিয়ালিজম বা নব্যবাস্তববাদধারার চলচ্চিত্রও তার গতি হারাতে শুরু করল সেখানে। ডি সিকার পরের চলচ্চিত্রগুলোতে নব্যবাস্তববাদের যে নিপুণ বৈশিষ্ট্য থাকার কথা ছিল তা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, দামি নায়িকা, বিশাল ঝকমকে সেট আর বাণিজ্যিক উপযোগিতা সবকিছু মিলিয়ে বাইসাইকেল থিভসের স্রষ্টাকে আর খুঁজে পায় না দর্শক। আস্তে আস্তে ডি সিকা ভুলতে থাকেন তাঁর নিজের হাতে গড়া    বাস্তবতার সেই কঠিন, রূঢ় অথচ মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যকে। একপর্যায়ে সাদা-কালো, নিঃস্ব মানুষের সঙ্গী পথ পাল্টিয়ে চলে গেলেন আলোর আর মেইনস্ট্রিমের জৌলুশ রাঙানো সেই হলিউডের পথে। অথচ এই সিকাই একসময় প্রবলভাবে ঘৃণা করতেন মেইনস্ট্রিমের হাতছানিকে। যে সিকা সরকারকে, রাষ্ট্রকে চোখ রাঙিয়ে নির্যাতিতের ছবি বানাতেন, যে সিকা বড় বড় প্রযোজকদের দেওয়া লোভনীয় প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে এতটুকু ইতস্ততবোধ করেননি, যে সিকা মৃত্যুর নিত্যকার হুমকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে কাজ করে গেছেন, যে সিকা নিজেই বলেছেন, ‘I’ve lost all of my money on these films. They are not commercial. But i’m glad to lose it this way. To have for a souvenir of my life pictures like Umberto D. and The Bicycle Thief.’ সেই মানুষটি কীভাবে পারে নিজের পথ হারাতে? চলচ্চিত্রপ্রেমীদের শিক্ষকতুল্য মহান এই মানুষটি ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৪ সালের ১৩ নভেম্বর প্যারিসে পরলোকগমন করেন।

তিনি নিজের গড়া পথ থেকে নিজে ছিটকে গেছেন ঠিকই কিন্তু তাঁর পথে এমন কিছু ছিল যা অন্যরা বহন করে হয়েছেন মহান – গুরু হিসেবে অবশ্য কৃতিত্বটার অংশীদার কিন্তু সিকাও। ফেদরিকো ফেলিনি, অ্যাঞ্জেলো আন্তনিওনি, ভিসকন্তি, পাসোলিনি, বার্তোলুচ্চি সিকার দেখানো পথেই হেঁটে কুড়িয়েছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। এঁদের মধ্যে বার্তোলুচ্চিকে বলা হয় ভিত্তোরিয়ো ডি সিকার বামপন্থী বিবেক।

তাছাড়া সিকার সেই নব্যবাস্তববাদিতার হাওয়া ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন সব দেশ পেরিয়ে এই ভারত-বাংলার মাটির স্পর্শেও তেজদীপ্ত হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে সত্যজিতের পথের পাঁচালী, নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল, ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), সুবর্ণরেখা (১৯৬২)সহ আরো অসংখ্য চলচ্চিত্র স্বয়ং এই নব্যবাস্তববাদ বা তার চাইতেও বেশি সিকার অনুপ্রেরণার ফসল। কারণ ইতালির তৎকালীন বাস্তবতায় ক্ষুধার্ত মানুষ, নিপীড়িত মানুষের হাহাকার তো আমাদের মতো গরিব দেশের ‘নিত্যদিনের’ স্বাভাবিক অবস্থা। সুতরাং পৃথিবীতে যতদিন বাইসাইকেল থিভসের আন্তনিওনি থাকবে, মারিয়া, রিকি থাকবে ততদিন সিকাও থাকবেন। তাতে তিনি যেখানেই যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন। সুতরাং প্রিয়, ভিত্তোরিয়ো ডি সিকা আপনি আমাদের মানে নিঃস্বদের ছেড়ে চলে গেলেও আমরা কিন্তু আপনাকে ছাড়ছি না। দয়া করে ‘ওদিক’ থেকে মুখ ফিরিয়ে আমাদের দিকে হাত বাড়াবেন কি? n

 

তথ্যসূত্র

.    হায়দার, কাজী মামুন (সম্পা.), ২০১৩, পরাবাস্তব সিনেমার কবির গল্প, ম্যাজিক লণ্ঠন, বর্ষ ২, সংখ্যা ২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।

২.     রায়চৌধুরী, অমিয় (১৪০৪ বাংলা), শতবর্ষের সিনেমা ও চার্লি চ্যাপলিন, কলকাতা, দীপায়ন।

৩.     আউয়াল, সাজেদুল (২০১১), ‘চলচ্চিত্র ধারাসমূহের অন্তর্গত পাঠ’, চলচ্চিত্রকলার রূপ-রূপান্তর, ঢাকা, দিব্য প্রকাশ।

৪.     রাহা, পার্থ (২০০৭), ‘ভিত্তোরিও ডি সিকা আর নব্যবস্ত্তবাদ’, চলচ্চিত্র চিন্তন, কলকাতা, একুশ শতক।

৫.     দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৬), চলচ্চিত্রের অভিধান, কলকাতা, বাণীশিল্প।

Leave a Reply

*