logo

বাংলা গান থাকুক সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী

আ ব দু শ  শা কু র

বেকনীয় হৃদয়নিরপেক্ষ-মস্তিষ্ক-সংবাদী না হয়ে বাংলা গান থাকুক মঁতেইনীয় ‘সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী’, থাকুক রবীন্দ্রনাথীয় ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’। সীমাবদ্ধ কথা, সুর, তাল, লয় ও ছন্দে গড়ে ওঠা গানের আবেদনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে শ্রোতাকে সীমাহীন ব্যাকুলতায় উৎকণ্ঠিত করার গুণের ওপর। রস ও ভাবের পূর্ণ অনুভূতিতে ব্যাপ্ত গান বিশেষ থেকে নির্বিশেষেই শুধু নয় – মানবচিত্তকে বয়ে নিয়ে যায় অনন্ত এক শাশ্বত আনন্দলোকে। এজন্যেই গানের আবেদনে সাড়া না দিয়ে পারে না শুধুমাত্র মানুষই নয়, জীবজন্তু এমনকি গাছপালাও।
সকল শিল্পকলার মধ্যে একমাত্র গানই সর্বজনগ্রাহ্য। কারণ এ চারুশিল্পটি সবচেয়ে বিমূর্ত। আঁকা দেখা যায়, লেখাও দেখা যায়। দেখা যায় না কেবল গাওয়া। কারণ ওটা অদৃশ্য হাওয়াজনিত ধ্বনিমাত্র। আমার এ দাবিটির সমর্থনে উপস্থিত প্রমাণ হল আজকালকার গাওয়া, যা দেখানো হয় বলে গান হয়ে ওঠে না – যে গানকে উপলব্ধি করতে হয় দৃষ্টির অলক্ষ্যে, শুধুমাত্র কান ও মন দিয়ে শুনে। জীবনের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ এবং অবিচ্ছেদ্য শিল্প এই গানেই যেন চিত্তের শান্তি এবং আত্মার মুক্তি। মানুষের পরম বিশ্বস্ত সার্বক্ষণিক সঙ্গী এই গান তাই কোনও প্রতিকূলতাতেই তার পর হবার নয়।
এদেশীয় সংগীতের বহুবিচিত্র সম্ভারের অন্তর্গত বাংলা গান নানা পরিবর্তনের মধ্যে লালিত হয়ে সাম্প্রতিক রূপটি পরিগ্রহ করেছে। সুতরাং উপমহাদেশীয় সংগীতের ক্রমবিবর্তনের ধারা ও রূপটির ওপর দ্রুত নজর বুলিয়ে নিলে বাংলা গানের প্রাণবস্তু মর্মঙ্গম করতে সুবিধে হবে।
এক
বন্যজীবনে মানুষের যখন মাথা গোঁজার জন্য বাসা বাঁধার কথাও চিন্তার অতীত ছিল, তখনই কিন্তু তাঁদের জীবনে গান বাসা বেঁধে ফেলেছিল। কারণ নিরন্তর কঠিন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি জীবনে শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য প্রাণপণ লড়াইয়ের মধ্যেও গানে তারা প্রাণের আরাম লাভ করত। শিল্পতাত্ত্বিক জর্জ টমসনের ভাবনায় এই কথার আভাস মেলে। গানের উৎসে তিনি বাঁচার জন্য স্থাবর-জঙ্গম সংবলিত প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংগ্রামজনিত ক্লান্তিকর শ্রমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন।
The Human Essence-নামক গ্রন্থে তিনি বলেন, মূলত ‘Labour cry’ থেকে গানের উদ্ভব। তাঁর বিশ্বাস, অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে সেই সময়ে প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের জন্য যে পরিশ্রম আর যন্ত্রণা ছিল – তার উপশমকল্পে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মুখ থেকে যে আয়াসজনিত দীর্ঘ ধ্বনি নির্গত হত, সেই ধ্বনি থেকেই ‘শ্রমসঙ্গীতে’র উদ্ভব হয়েছে। আদিম সংগীত মানুষের সমস্যাসংকুল জীবনযাপন এবং বাঁচার জন্য জীবনমরণ সংগ্রামের সঙ্গেই অধিক সম্পর্কযুক্ত ছিল – আর্নস্ট ফিশারের এই মতটির সমর্থন মেলে বিশিষ্ট পাশ্চাত্য সংগীতবিদ এম. স্নাইডারের কথায়। তিনি বলেন ‘Primitive music is a separate field of its own, but to a much greater extent than art and music it is bound up with every day life and with its many special factors…’।
আবার প্রাচীন এক মতানুসারে ময়ূরের ডাক থেকে ষড়জ, বৃষের ডাক থেকে ঋষভ, ছাগের ডাক থেকে গান্ধার, ক্রৌঞ্চের ডাক থেকে মধ্যম, কোকিলের ডাক থেকে পঞ্চম, অশ্বের ডাক থেকে ধৈবত এবং কবুতরের ডাক থেকে নিষাদ – এই সপ্তস্বর এবং তাদের সমন্বয়ে গানের উৎপত্তি হয়েছিল। এই মত অসঙ্গত। কারণ মানুষের বাকযন্ত্রে এই সাতটি বর্ণের উচ্চারণ স্থান এবং উল্লিখিত পশুপাখির ডাকের উৎসস্থল – এই দুইয়ের মধ্যে কোনও মিল নেই। আসলে সহজ সরল কথাটি হল – মানুষের কল্পনাবৃত্তি যেমন সহজাত, তেমনি সহজাত হল তার সুর-প্রীতির প্রবৃত্তি। এই দুই প্রবৃত্তির মিলনে মানুষ তার কৃত্রিম স্বরোৎপাদনের ক্ষমতার সাহায্যে গান সৃষ্টি করেছিল।
আদিম যুগে পরিবার না থাকায় যূথবদ্ধ মানুষ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বনে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, গুহায় বাস করত। প্রতিকূলতাসর্বস্ব জীবনে বিপর্যস্ত মানুষেরা তখন মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য নানা ইঙ্গিত ও ধ্বনির ব্যবহার করত। দুটি বা তিনটি স্বরে ব্যবহৃত ধ্বনিগুলি ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে প্রয়োগ করত তারা। বিভিন্ন দলের মানুষেরা অভিন্ন ধ্বনি অনুকরণ করত না। কারণ, প্রাণিজগতে একমাত্র মানুষই কল্পনাশক্তির অধিকারী। ফলে সে আপন কল্পনা, দক্ষতা ও প্রবণতা অনুযায়ী স্বকীয় ও দলীয় ধ্বনির অনুসরণ করত।
ধ্বনির প্রয়োগও নির্দিষ্ট করে দিত মানুষের আনুষঙ্গিক প্রকৃতি। যেমন কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উচ্চগ্রামে প্রযুক্ত হত উল্লাস, আহ্বান, বিরক্তি, ক্রোধ ইত্যাদি প্রকাশ করার জন্য। আবার দুঃখ, বেদনা, ক্লান্তি, অবসাদ এবং গোপনীয়তা বোঝাবার জন্য স্বভাবতই নির্দিষ্ট হত নিম্নগ্রামীয় কণ্ঠস্বর। বৈদিক যুগের শুরুতেই স্বরের উচ্চাবচতার তিনটি মাত্রার কথা শোনা যায় – ‘উচ্চ’, ‘নিচু’ এবং ‘মধ্য’। আজকের স্বরসপ্তকও তদনুযায়ীই বিভাজিত হয় – মন্দ্র (নিচু), মধ্য (মধ্য) ও তার (উচ্চ)।
আদিম মানুষেরা শুধু গানই নয়, নাচও করত। আদিম নৃত্যে উদ্দাম গতির প্রাবল্য ছিল। নানান শব্দের গানে এবং নানান ছন্দের নাচে করতালি দিয়ে ছন্দ বজায় রাখত তারা। নৃত্য-গীতের সূচনালগ্নেই যে তারা মৃদঙ্গ এবং বাঁশির ব্যবহারও করত, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিভিন্ন খননে। আদিম গান বা নাচ যে সুর এবং যে ছন্দেই পরিবেশিত হয়ে থাকুক না কেন – একঘেয়ে জীবনে দুর্বিষহ, অবসাদগ্রস্ত, ক্লান্ত মানুষের কাছে তা ছিল একটা অপূর্ব সুখের মনকাড়া মাধ্যম। সেই গান ও নাচ আদিম জনজীবনে একটা শক্তির সঞ্চার করত। যার বলে তারা জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার প্রেরণা পেত। অথচ আদিম গানে কোনও ভাষা ছিল না। অনুকার্য এক জাতীয় ধ্বন্যাত্মক শব্দসমষ্টিকে গানের রূপ দেওয়া হয়েছিল মাত্র।

দুই
ঐতিহাসিকগণ ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসকে মোটামুটি তিনটি ভাগে চিহ্নিত করেছেন। প্রাচীন যুগ – খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০-এর পূর্ব থেকে ১২০০ সাল। মধ্যযুগ – ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৫৭ সাল। আর আধুনিক যুগ – ১৭৫৭ সালের পর থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত। এই হিসেবে বৈদিক যুগ হল প্রাচীন যুগের মধ্যবর্তী পর্যায়টি। সে যুগের গান বলতে মূলত সুরে পাঠ্য বৈদিক মন্ত্র বা ঋকগুলিকে বোঝাত। এই পর্বে ভাষার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে গান অর্থাৎ সুশ্রাব্য স্বরেরও বিকাশ ঘটতে থাকে। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে এক এক রকমভাবে স্বর প্রয়োগে মন্ত্রগুলি পাঠ করা হত।
অর্থাৎ বিভিন্ন গোষ্ঠীর ও বিবিধ যজ্ঞের পুরোহিতরা একই স্বরে বা ভঙ্গিতে বৈদিক মন্ত্রগুলি পাঠ করতেন না। এটা সহজেই অনুমেয় যে সেই সময় সংগীত সাধারণ্যে চর্চিত বিষয় ছিল না। বৈদিক সংগীত প্রচলিত ছিল প্রধানত যাজ্ঞিক সম্প্রদায় তথা ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের মধ্যেই। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পুরোহিতরা ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে গান গাইতেন বা মন্ত্র পাঠ করতেন। সভ্যতা তথা সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রচেষ্টার সঙ্গে মন্ত্রপাঠের পৃথক প্রকৃতি এবং ভঙ্গি বৈদিক সংগীতকে ক্রমশ উন্নত করেছিল।
বৈদিক যুগের মধ্যপর্বে গ্রামগেয়, অরণ্যগেয়, ঊহ ও ঊহ্য গানের কথা জানা যায়। এই চার প্রকার গানের বিভাগগুলিকে নিয়ে সামবেদের গাথা বা সংগীতাংশ রচিত। ‘সাম’ অর্থে বৈদিক গান বা ঋকগুলিকে বোঝানো হত। নগরের অস্তিত্ব না থাকায় গ্রামকে কেন্দ্র করে বৈদিক সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটেছিল। কিন্তু গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সর্বত্র উল্লিখিত চার প্রকার গান সকলের গেয় ছিল না। গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ বা শ্রেয়োকামীরা বিভিন্ন গ্রামে অনুষ্ঠিত যাগযজ্ঞে গ্রামগেয় গান গাইতেন। অরণ্যগেয় গান নির্ধারিত ছিল অরণ্যবাসী ঋত্বিক ও সামগদের জন্য। এঁরা বানপ্রস্থকালে অরণ্যজীবনের যাগযজ্ঞে অরণ্যগেয় গান গাইতেন।
ঊহ গানের সুর বা স্বর-প্রকৃতি অরণ্যগেয় গানের সুর বা স্বরানুযায়ী ছিল না। অরণ্যগেয় গানের পর এই গান শেখান হত। সন্ন্যাস জীবনের ঔপনিষদিক আদর্শে অনুসরণীয় ক্রিয়াকলাপে ঊহ ও ঊহ্য গানের প্রচলন ছিল। আজ এতকাল পরেও ভাবলে অবাক হতে হয়, তখনকার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের নির্দিষ্ট এবং নির্ধারিত সাংগীতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আনুগত্য বা সম্মান প্রদর্শনের প্রকাশ দেখে। সাধারণ গ্রাম্য গৃহস্থ, অরণ্যচারী, বা সন্ন্যাসীগণ প্রত্যেকেই কি একে অপরের গেয় গান অনুকরণ করে বিভিন্ন সময়ে গান করতে পারতেন না? পারলেও করেননি, অন্তত প্রাপ্ত তথ্যমতে। না করার কারণে বিভিন্ন ধারার গান বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতিযোগে স্বতন্ত্ররূপে চর্চিত, প্রচলিত এবং প্রসারিত হবার সুযোগ পেয়েছিল।
সংগীতের আবেদন মূলত বোধ, আবেগ, অনুভূতি ও উপলব্ধির কাছে। আদিম গান শৈল্পিক উৎকর্ষের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিল জৈবিক আবেদনে। ক্রমাগত জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গানও উত্তরণের পথে এগিয়ে গেছে। ভাষাহীন স্তোত্রজাতীয় কথা বা তথাকথিত অবরোহীগতিক গানে সহজ দুটি অথবা তিনটি স্বরের পুনঃ পুনঃ উচ্চারণের মধ্যে তারা প্রাণের আরামের সঙ্গে উপলব্ধি করত একটা দৈবশক্তির ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আভাসও। তাদের ধারণা ছিল এমনি উচ্চারণের মাধ্যমেই সকল প্রতিকূলতাকে নিজেদের বশে আনা সম্ভব। অন্যদিকে কল্পনাশক্তির বিকাশও সম্ভব হয়েছিল একই ধারণার অনুগামী হয়েই।
শিল্পের উন্নতির জন্য উৎসর্গিত চর্চার প্রয়োজন। কিন্তু একনিষ্ঠ   সাধনার অবকাশ আদিম মানুষের ছিল না। অক্লান্ত জীবন-সংগ্রামের ফাঁকে ফাঁকে যেটুকু প্রচেষ্টা বা প্রেরণা, সেটুকুই তাদের সম্বল ছিল। ক্রমশ প্রকৃতিকে জয় করতে লাগল মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক পরিবর্তনও ঘটে চলল। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শ্রমবিভাজন, গোষ্ঠীভিত্তিক কর্মদক্ষতা, এক শ্রেণির ওপর আরেক শ্রেণির আধিপত্য ইত্যাদিও অনিবার্যভাবেই প্রকাশ পেতে থাকল। এই প্রক্রিয়াতেই মানবজীবন এবং তার অন্তর্গত সংগীতের অগ্রগতি একই সঙ্গে হতে থাকল।
শিক্ষাকার নারদ বলেছেন – সাত স্বর, ষড়জ-মধ্যম-গান্ধার তিন গ্রাম, একুশ মূর্ছনা, একান্ন তান প্রভৃতি স্বরমণ্ডলের ব্যবহার আমরা দেখি বৈদিকোত্তর যুগে। বিভিন্ন মনীষীদের মতানুসারে বৈদিক যুগের বিভিন্ন স্তরে নতুন নতুন শ্রেণির  গানের  উদ্ভব  ও  প্রচলন হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, একই সময়ে এক একটি গানে একাধিক পর্বও থাকত। কোনও কোনও পর্ব আবার একাধিকবার গাওয়াও হত। ভাষার উন্নতির ফলে পাঁচ রকম উচ্চারণ করার ভঙ্গিও গানে দেখা গিয়েছিল। যেমন কথা ও স্বরের ওপর জোর দেওয়া, দুটি উচ্চারণ রীতির ব্যবধান নির্ণয় করা ও তাদের পছন্দ মতো সাজানো, স্বরের উচ্চতা ও দীর্ঘতা নিয়ন্ত্রণ করা, কথা বা সুরের সৌষ্ঠব বৃদ্ধি করা, বিভিন্ন উচ্চতা বা দীর্ঘতার মাঝে মাঝে সুর বা স্বরের পারস্পরিক পরিমাপ নির্ণয় করা। এছাড়া সুরের তথা স্বরের বিরামও থাকত। বৈদিক যুগে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের কয়েকটি হল – ক্ষোণী, অঘাটি (আঘাতি), ঘটলিকা (ঘাতলিকা), কাণ্ড, বার্ণ, কাত্যায়নী, পিচ্ছোরা প্রভৃতি বেণু ও বীণা, চর্মনির্মিত বাদ্যযন্ত্র দুন্দুভি, ভূমিদুন্দুভি, একশোটি তন্ত্রীযুক্ত বাণবীণার কথাও স্মর্তব্য।
আপাতদৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও বৈদিক সংগীতের উল্লিখিত এই অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনার গুরুত্ব অনুভব করি দুটি কারণে। প্রথমত, বৈদিক সংগীতের এই বিকাশ মানুষের রুচি ও সৌন্দর্যবোধের বিকাশের স্তরে স্তরেই হয়েছিল; দ্বিতীয়ত, এই উন্নয়ন যাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় হয়েছিল তাঁরা হলেন ব্রাহ্মণ, পুরোহিত, সামগ প্রমুখ নির্দিষ্ট এক শ্রেণির মানুষ। যে-কোনও শিল্পের প্রসার ও বিকাশের ক্ষেত্রে শিল্পী ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে প্রায় সমান সমান। বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণ ও  পুরোহিতকেন্দ্রিক সংগীতচর্চা তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, বিদ্যা, বুদ্ধি অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই চর্চিত ও বিকশিত হয়েছিল বলে এ গানে এই শ্রেণির ব্যক্তিরুচিই প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যকথায়, বৈদিক গান সাধারণের গান হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সেই গানের যে জমি – তার উপরেই পরবর্তী গানের ইমারত গড়ে উঠেছিল। জমিটি মূলত কী ছিল? শুধুই হৃদয়। আর কোনও উপাদান বা উপকরণ নয়, এমনকি মস্তিষ্কও নয়।

তিন
বৈদিক যুগের শেষভাগ থেকে নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে প্রসারিত হওয়ার প্রেরণায় গানে রূপান্তর ঘটল। পুরোহিত এবং যাজ্ঞিক সম্প্রদায়ের চর্চার আঙিনা ছেড়ে গান সাধারণের জীবনে সংক্রামিত হল। সেই গান ব্যাপকতা লাভ না করলেও বিজ্ঞানমনস্ক সংগীতসাধক গান্ধর্ব গুণীদের প্রতিভাবলে গান্ধর্বসংগীতের উদ্ভব হয়েছিল – সামগানের সাংগীতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে লৌকিক গানের সংমিশ্রণের ফলেই।
শোনা যায় হিন্দুস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী কান্দাহার বা গান্ধার দেশের অধিবাসী গন্ধর্বরা ছিলেন সংগীতের জন্মগত সাধক। যে গান সকলের শেখার বা গাইবার অধিকার ছিল না, সেই গান ক্রমে সকলের গান হয়ে উঠেছিল। শ্রুতিমতে, গান্ধর্বগুণীদের অবাধ যাতায়াত ছিল দেবকুলে এবং মনুষ্যসমাজে। ফলে তাদের গান পুষ্ট হয়েছিল সংগীতচর্চার সেই সুবিস্তৃত পরিসরে। ঘটেছিল দেবসমাজ ও লোকসমাজের সাংগীতিক ঐতিহ্যের সুসমন্বয়।
সামগানের সাংগীতিক ঐতিহ্য মূলত তথাকথিত বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটকেন্দ্রিক ছিল। তাই সেই অলৌকিক গানে মানুষের মনের ‘সাধারণ অবস্থা’র প্রকাশ ঘটত না, ফলে গানও মানবিক হয়ে উঠত না। লৌকিক সুরমিশ্রিত গান্ধর্ব গানই কালে কালে মানুষের গান হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিল। কারণ এ গান বৈদিক সংগীতের স্তোম, স্তোত্র, ঋক, সাম গাথা প্রভৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সামগানের সাংগীতিক উপাদানের সঙ্গে লৌকিক গানের সামাজিক উপকরণের সংমিশ্রণ এবং গান্ধর্বগুণীদের কল্পনাবৃত্তির কৌলীন্য মিলে সমাজের প্রয়োজন এবং চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সকল সংগীতমনস্ক ব্যক্তির গাওয়ার উপযোগী হয়ে উঠেছিল গান্ধর্বগান।
এটা সাধারণ জ্ঞান যে, অনুকরণে শিল্প ও সংস্কৃতি বিপন্ন হয়। বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী গান্ধর্বসংগীতজ্ঞগণ তাই বৈদিক গানের সূক্ষ্ম সৌন্দর্য, ভাব, রস, সহজ ভঙ্গি ইত্যাদির অনুসরণে সৃষ্টি করেছিলেন গান্ধর্বগানের – অনুকরণে নয়। এর সঙ্গে দেশি বা আঞ্চলিক গানের বৈশিষ্ট্যগুলি যুক্ত হয়ে গান্ধর্বগানে এসেছিল এক নতুন মাত্রা। সভ্যতার আদিযুগের ফসল গান্ধর্বগান উপমহাদেশীয় সংগীতের ক্রমবির্বতনে এক অত্যুজ্জ্বল পর্ব।
বিবর্তনের বর্ণিত প্রক্রিয়াটিতে লক্ষণীয় যে সংগীত স্বভাবতই দেশি হয়ে যেতে চায়, কারণ সংগীতের জন্য কান পেতে থাকে জনপদের হৃদয়। একই কারণে মার্গসংগীত উঠে যায় শাস্ত্রের পাতায়। ইতিহাস-সেরা সংগীতাচার্য শার্ঙ্গদেবও বলেছেন – যা সমসময়ে মঞ্চে গীত ও শ্রুত হয় তাই ‘পারফর্মিং মিউজিক’ কিংবা ক্রিয়াত্মক সংগীত বা ক্রিয়াসিদ্ধ সংগীত। বাকি সবই শাস্ত্রীয় সংগীত বা তত্ত্বীয় সংগীত।

চার
সমাজের পালাবদল পরিবর্তন আনে মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য বৃত্তি সংগীতেও। এ পরিবর্তনের ধারাপথ বেয়ে বেদান্ত-যুগে বুদ্ধদেবের আবির্ভাবকালে সমাজের নানা ক্ষেত্রে একটা ভিন্নমাত্রার রূপান্তর লক্ষ করা গেল। এই পর্বে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি ছিল ধর্মীয় আধিপত্য থেকে দৈনন্দিনের যাপিত জীবনে মানুষের মুক্তির আকুলতা। বেদান্তযুগে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মের শৃঙ্খল মোচনে উদগ্রীব এই নতুন চিন্তাধারার অগ্রদূত ছিলেন ‘পরিব্রাজক’ ও ‘শ্রমণ’ নামে পরিচিত দুই সন্ন্যাসীগোষ্ঠী।
প্রখ্যাত ভারতবিদ ব্যাসামের মতে ভারতবর্ষের গ্রামকেন্দ্রিক সভ্যতা এই বৌদ্ধযুগ থেকে ক্রমে নগরকেন্দ্রিক হতে থাকল। শ্রম-বিভাজনের ফলে নানা শ্রেণির মানুষের জীবনচারিতা, চিন্তাধারা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও বিভিন্নতা দেখা দিতে লাগল। এই রকম এক সামাজিক পটভূমিতে বৈদিক অনুশাসন, ধর্মীয় গোঁড়ামি, নানাবিধ অবিচার-অত্যাচার ইত্যাদির অবসানকল্পে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নতুন নাগরিক গোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হল। রক্ষণশীল সনাতনধর্মে বিশ্বাসীদের সঙ্গে প্রগতিশীল বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের উদার আদর্শগত এই ব্যবধানের ফলে শ্রেণিশাসিত মানুষ নতুন পথের সন্ধান পেল।
বৌদ্ধধর্ম প্রভাবিত সমাজে মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য ছিল ‘মুক্তি’। সেই সত্যকে মানুষ বিশেষভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলেই তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডে তার প্রকাশ ঘটেছিল। ফলে সে সময় রাষ্ট্রিক, সামাজিক ও আর্থনীতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য কমে গিয়েছিল। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। উদাহরণস্বরূপ বৌদ্ধযুগের সাংগীতিক বিকাশের দিকে তাকিয়ে দেখা যায়। বৈদিক সংস্কৃতিতে উচ্চমানসম্পন্ন গান্ধর্ব-গানের উদ্ভব এবং সমৃদ্ধি ঘটেছিল ঠিকই। তবু তার আকর্ষণক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা সীমাবদ্ধ ছিল একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই।
তবু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে চর্চিত গান্ধর্বগান ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে একটি দিকচিহ্ন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই গান্ধর্বগানও বিলুপ্ত হয়েছিল সকলের গেয় বা অনায়াস চর্চার উপযুক্ত ছিল না বলে – গান যেহেতু একাকী গায়কের নয়। লৌকিক সুরসমৃদ্ধ হলেও গান্ধর্বগানের চর্চাও ছিল দেবাঙ্গনকেন্দ্রিক। সংগীতশাস্ত্রে উচ্চজ্ঞানসম্পন্ন গন্ধর্বগুণীরা বিজ্ঞানসম্মত বিশুদ্ধতা পূর্ণ মাত্রায় বজায় রেখে গান্ধর্বসংগীত পরিবেশন করতেন মূলত মন্দিরে। ভাষার সীমাবদ্ধতাও পরবর্তীকালে গান্ধর্বগানের বিলুপ্তির অন্যতম কারণ ছিল।
দেবাঙ্গনের গান নি®প্রভ হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের কণ্ঠে ধারণ করার পর্যাপ্ত অবকাশ না থাকায়। অথচ বৈদিকযুগের গানের তুলনায় বৈদিকোত্তর গান্ধর্বগান আলঙ্কারিক গুণে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু সেই অলঙ্কার বা বৈশিষ্ট্য আত্মীকরণের ক্ষমতা তো সবার ছিল না। এখনও সকলের নেই উচ্চাঙ্গসংগীতের জটিল কারুকার্য আয়ত্ত করার দক্ষতা। তাই আঙ্গিকের দিক থেকে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও গান্ধর্বগান শ্রোতার বাঞ্ছিত আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত রয়েই গিয়েছিল। এককথায় বলা যায় গান্ধর্বগানও জনচিত্তের উপযোগী গান হয়ে ওঠেনি।
বৌদ্ধযুগে সংগীতের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় ছিল প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গান্ধর্বসংগীতের ক্রমিক অবলুপ্তি এবং দেশি বা আঞ্চলিক গানের শ্রীবৃদ্ধি ও আভিজাত্য অর্জন। গৌতম বুদ্ধের সময় থেকেই বৌদ্ধ রাজাদের কল্যাণে জনপ্রিয় দেশজ বা আঞ্চলিক সুরগুলি কিঞ্চিৎ শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে ‘দেশি রাগ’ হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে। প্রসঙ্গত মতঙ্গমুনি (খ্রি. ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দী) তাঁর ‘বৃহদ্দেশী’ গ্রন্থে বলেছেন :
‘তত্রাদৌ, স্বরবর্ণাবিশিষ্টেন
ধ্বনিভেদন বা পুনঃ।
রজ্যতে যেন সচ্চিত্তং স রাগঃ
সম্মত সতাম ॥
অথবা, যোহসৌ ধ্বনিবিশেষস্ত
স্বরবর্ণ বিভূষিতঃ।
রক্তকো জনচিত্তানাং স রাগঃ
কথিতো বুধৈ ॥’
বিশেষজ্ঞগণ সংজ্ঞাটির অর্থ করেছেন – স্বর ও বর্ণের বিশিষ্ট প্রয়োগ অথবা সুসঙ্গত ধ্বনিভেদ দ্বারা যদি ‘সৎচিত্ত’ ব্যক্তিদের মন রঞ্জিত করা যায় তবে তাকে ‘রাগ’ বলতে হয়। অথবা স্বরবর্ণ বিভূষিত এইরূপ বিশিষ্ট ধ্বনি যদি ‘জনচিত্ত’ রঞ্জকের কারণ হয়, তবে পণ্ডিতগণ তাকেও রাগ বলবেন। উল্লিখিত সংজ্ঞাটি থেকে একথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ‘জনচিত্ত’ বলতে সাধারণ শ্রোতাদের কথা বোঝানো হয়েছে। এঁদের মন এবং কান – কোনওটাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বা তৈরি নয়। ‘সৎচিত্ত’ কথাটি দ্বারা সংগীত বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী শ্রোতার কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতানুযায়ী ‘সৎচিত্ত’বান শ্রোতা বা সংগীতগুণীরা মার্গ-রাগের প্রতি অনুরক্ত। প্রতিপক্ষে ‘জনচিত্ত’বান শ্রোতা তথা গণমানুষ আসক্ত দেশি রাগের প্রতি। সারকথা – দুধরনের শ্রোতা দুধরনের রাগ দ্বারা রঞ্জিত হন। বিভাজনটি এখনও বলবৎ আছে।
সনাতন ধর্ম প্রচলিত, কিন্তু বৌদ্ধধর্ম প্রচারিত। ফলে উদারতাই এই নবধর্মের বৈশিষ্ট্য। বৈদিক ঐতিহ্যের স্বাভাবিক আভিজাত্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদের কৃত্রিম অহংকারের পরিবেশে সংস্কৃত ভাষাকেন্দ্রিক সংগীতচর্চা কখনওই
ধনী-নির্ধন, জ্ঞানী-মূর্খনির্বিশেষে সাধারণের হয়ে ওঠেনি। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম প্রভাবিত সমাজে দেশজ সংস্কৃতি মূলত প্রাকৃত ভাষাকে কেন্দ্র করে স্থান-কাল-পাত্রভেদে অনায়াস এবং অবাধ চর্চার আনুকূল্যে বিকশিত হয়েছিল প্রাণবন্তভাবে। তাই এই পর্বে গান্ধর্বসংগীত বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে স্মর্তব্য যে – গান্ধর্ব সংগীতের মুন্সিয়ানা, সংস্কৃত ভাষাভিত্তিক সংগীতশাস্ত্রীয় বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি আত্মস্থ করেই বৌদ্ধ যুগের সংগীত পুষ্ট হয়েছিল।
বৌদ্ধযুগের অমূল্য জাতকগুলি থেকে আমরা সমকালীন নৃত্য, গীত, বাদ্য সম্পর্কে বিশেষভাবে জানতে পারি। জাতকগুলির মধ্যে সাংগীতিক বর্ণনার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মৎস্য-জাতক, গুপ্তিল-জাতক, বিশ্বম্ভর জাতক প্রভৃতি। এর মধ্যে মৎস্য-জাতকে ‘মেঘগীতি’ এবং গুপ্তিল-জাতকে ‘উত্তম’ ও ‘মধ্যম’ মূর্ছনার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সকল বর্ণনা থেকে বৌদ্ধযুগে, সৃজনশীল এবং পূর্বোক্ত গীতিধারাগুলি থেকে পৃথক, উন্নত এক সাংগীতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে আমরা পরিচিত হই।

পাঁচ
নিয়মনিষ্ঠ এবং বর্ণসচেতন যাজ্ঞিক পুরোহিত, পণ্ডিত, ব্রাহ্মণদের আধিপত্যবর্জিত গান বৌদ্ধ যুগে বিভিন্ন সংগীতজ্ঞ রাজা এবং সংগীতমনস্ক সাধারণ মানুষের সমবেত প্রচেষ্টায় বিকাশ লাভ করেছিল। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষা, সুরপ্রয়োগ ও  গায়নপদ্ধতি একটা সমবায়ী ভূমিকা পালন করেছিল। বেদান্ত যুগের তুলনায় বৌদ্ধযুগ থেকে গানের একটা গুণগত পার্থক্য স্পষ্টতই লক্ষণীয়। এই পার্থক্যের মধ্যে আঞ্চলিকভাবে প্রচলিত জনপ্রিয় সুর, গানের সরল গঠন, ভাষার সহজবোধ্যতা, সমাজের গ্রহণবর্জন প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি শ্রোতার রুচির গুরুত্ব ছিল প্রধান।
চালুক্যবংশের রাজা এবং মানসোল্লাস গ্রন্থের রচয়িতা তৃতীয় সোমেশ্বরের (খ্রি. ১১২৭-১১৩৭) পুত্র ছিলেন জগদেকমল্ল। সংগীত চূড়ামণি নামক গ্রন্থে তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, এই সময়ে দেশজ বা আঞ্চলিক গানগুলি সংগীতের নানাবিধ গুণ ও লক্ষণযুক্ত হয়ে ক্রমশ উন্নতরূপে আর্য ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল ‘প্রকীর্ণ’ নামে। পরবর্তীকালে আরও উন্নত এবং পরিমার্জিতরূপে পরিবেশিত প্রকীর্ণ গানকে ‘বিপ্রকীর্ণ’ সংগীত নামে অভিহিত করা হয়। গুপ্তযুগের শুরুতে ‘বিপ্রকীর্ণ’ শ্রেণীর কিছু কিছু গানে গান্ধর্বসংগীতের সুকঠিন সাংগীতিক বিধি সন্নিবিষ্ট করে সংগীত পণ্ডিতেরা সৃষ্টি করেন ‘প্রবন্ধ’ নামক ‘অভিজাত’ ধরনের এক প্রকার দেশি গান। চর্যাগানের উৎসও এই প্রবন্ধ গান।
প্রবন্ধ গানে বিভিন্ন পদ, তাল ও ছন্দের প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটা পরিমিতিবোধের প্রকাশ ছিল। এ গানে রাগ-রাগিণীর ব্যবহার হত। রাগের উদ্দেশ্য হল একটা সুনির্দিষ্ট সাংগীতিক পরিকাঠামোর মাধ্যমে কথা ও সুরের ভাব যথাযথভাবে প্রকাশ করে মানুষের মনোরঞ্জনের নিশ্চয়তাবিধান। এই পরিকাঠামোর প্রথম স্তর হল ‘আলাপ’, যাকে বলা যায় পরম শুদ্ধ সংগীত। ভাষাহীন আলাপে শ্রোতা পরম শুদ্ধরূপে কোনও রাগ বা রাগিণীর সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পান। আলাপের পর বিস্তার। বিস্তারের স্তরে শ্রোতার মনে ভাব স্থায়ী আসন পাতে। ভাব স্থায়ী হবার আগে রসের সঞ্চার হয় না! আবার ভাবকে নির্দিষ্টরূপে প্রকাশের জন্য ভাষার প্রয়োজন। এই ভাবেই ধীরে ধীরে সুর ও  কথার একটা সম্মোহনী
দোলায় শ্রোতার মন মেতে ওঠে। সার্থক হয় গান।
এখানে উল্লেখ্য যে, কথা ও সুরের যথার্থ আত্মীয়তা বা মেলবন্ধনের স্বরূপ উদ্ঘাটনের মাধ্যমেই এদেশীয় সংগীতের প্রকৃত উপলব্ধি ঘটে। যুগে যুগে বিভিন্ন সংগীতগুণী তাঁদের উপলব্ধ জ্ঞান, অনুভূতি ইত্যাদির দ্বারা যে ঐশ্বর্যমণ্ডিত গানের সৃষ্টি করেছেন – সেই সৃষ্টির মধ্যে পূর্বাপর অনুক্রমে পারম্পর্য রক্ষিত হয়। কিন্তু সেই পারম্পর্য কতটা রক্ষিত, সেই বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। উপমহাদেশীয় সংগীতের ইতিহাসে বাংলা গান ‘রাগে’র জন্মক্ষণ থেকে সুদীর্ঘকালীন বিবর্তন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, যার সর্বশেষ প্রজন্মের নাম আধুনিক বাংলা গান। তাই বলা যায় যে, সাংগীতিক ঐতিহ্যের এই শাস্ত্রীয় ধারা থেকে কখনও বিযুক্ত না হওয়াটা বাংলা গানের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
ফিরে যাই প্রবন্ধ গানে। পণ্ডিত এবং সংগীতশাস্ত্রীদের রচনা থেকে আমরা প্রবন্ধ গানের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগের কথা জানতে পাই। সেই শ্রেণিবিভাগের ফলে আজ আমরা ধ্র“পদ গান এবং সেই গানকে অন্তরা, আভোগ, সঞ্চারী প্রভৃতি অংশে সাজাবার অবকাশ পেয়েছি। বাংলায় প্রথম ধ্রুপদ গানের প্রচলনের ক্ষেত্রে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহসুজার অবদান আছে। তিনি দিল্লি থেকে বিলাস খাঁর শিষ্য বিখ্যাত ধ্রুপদগুণী মিশ্রি সিং ঢাড়ীকে বাংলায় নিয়ে আসেন, সম্ভবত ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে। ভারতবর্ষে ধ্রুপদের প্রবর্তন এবং প্রসারের ক্ষেত্রে নায়ক গোপাল এবং নায়ক বখশুর নাম চিরস্মরণীয়, যাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি হলেন মিয়া তানসেন। তাঁর কন্যাবংশীয় উস্তাদদের কাছ থেকেই বাংলা তার ধ্রুপদ গান পেয়েছে।
ধ্রুপদ গান প্রসঙ্গে চিরকালই অবশ্য-স্মর্তব্য থাকবেন মহাসংগীতকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বহু ধ্রুপদাঙ্গ গানে রবীন্দ্রসংগীতের কালজয়ী ভাণ্ডার সমৃদ্ধ। তিনি কিন্তু ধ্রুপদকে অনুকরণ করেননি, করেছিলেন অনুসরণমাত্র। এই মহাবাগ্মেয়কারের হাতে বাণীর মহিমায় ও ভাবের সৌরভে গানগুলি এতটাই সমৃদ্ধ হয়েছে যে তাতে শ্রোতা চিরকালই অভিভূত হতে থাকবেন। আঙ্গিককে অক্ষুণ্ন রেখে, মনোমত বাণীর সংযোজনায় গানের অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনাটি তাঁর সৃজনে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে তার তুলনা মেলা ভার। কথা ও সুরের যুগলসম্মিলনে কবির ধ্রুপদাঙ্গ গানগুলি তৃতীয় এক ভাবের ভাষা নির্মাণ করেছে। তান-বোলতান-ঠাট-বাট বর্জিত সেই গানগুলি যতটা নির্ভার-নিটোল ততটাই সারগর্ভ। প্রাচীন যুগের শেষ  প্রান্তের সুপরিণত গান ছিল প্রবন্ধ, যার প্রমাণ মেলে রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদী গানে।

ছয়
প্রবন্ধ গানের পরেই গুপ্তযুগে গানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত উন্নয়নের এক চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়। এই উন্নতি ছিল মূলত বাদ্যযন্ত্রকেন্দ্রিক। বাদ্যযন্ত্রের ইতিহাসে গুপ্তযুগের একটা বড় অবদান ছিল – জীবজন্তুর নাড়ী-নির্মিত তন্ত্রীর অবলুপ্তি ঘটিয়ে ধাতুনির্মিত সূক্ষ্ম তারযুক্ত নানাবিধ বীণার ব্যাপক প্রচলন ও প্রসার। একমাত্র তন্ত্রীযুক্ত বাদ্যযন্ত্রেই সমস্ত শ্রুতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রকাশ সম্ভব। তাই গানের উৎকর্ষের ক্ষেত্রে এই প্রকার বাদ্যযন্ত্রের গুরুত্ব অপরিমেয়।
সম্রাট সমুদ্র গুপ্ত সংগীতের একজন প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। গানে তাঁর অসামান্য পারদর্শিতা সর্বজনগ্রাহ্য। বিশেষ করে তাঁর বীণাবাদন বহু প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর ঈর্ষার কারণ ছিল। তাঁর সুযোগ্য পুত্র বিক্রমাদিত্য চন্দ্রগুপ্তও শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। গুপ্ত রাজাদের অবদানে দেশীয় ও জাতীয় সুর বা গান গান্ধর্ব সংগীতের লক্ষণাদি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে উপমহাদেশীয় সংগীতকে বিস্তৃত এবং সমৃদ্ধ করেছিল। ইতিমধ্যে প্রচলনে চলে আসা নাটকে ও নৃত্যে এসব তারযন্ত্রসমৃদ্ধ সংগীতের অনেক বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয় – যা রঙ্গনটীদের কলানৈপুণ্য, কলামাধুর্য, অঙ্গভঙ্গি ও রস পরিবেশনকে নানা কলেবরের নানা ঝংকারে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছিল।
আনুমানিক খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দী থেকে ৩য় ও ৪র্থ শতাব্দীর মধ্যে শিক্ষাকার নারদ, ভরত, কোহল, দত্তিল, যাষ্টিক, নন্দিকেশ্বর প্রমুখ সংগীতগুণীর অবদানে উপমহাদেশীয় সংগীত ক্রমশ স্তর থেকে স্তরে উন্নীত হয়েছিল। এঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী পরবর্তীকালের গানের পৃষ্ঠপোষকগণ সংগীতের ঐতিহ্যকে যথাযথ  মর্যাদায়  লালন  করেছিলেন।  নৃত্যের  সৌন্দর্য এবং  গানের মাধুর্য
প্রকাশের জন্য নর্তক-নর্তকী এবং গায়ক-গায়িকাদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। এই সকল নিদর্শন থেকে বোঝা যায় যে রাজকীয় প্রেরণায় সংগীতের উন্নয়নে গুপ্তরাজত্বকালে এক নবযুগই প্রবর্তিত হয়েছিল।
পরিশীলিত শিল্পসংস্কৃতির ব্যাপক চর্চার ক্ষেত্রে শাসকশ্রেণির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কলাকুশলী, শিল্পী ও সর্বস্তরের মানুষের প্রাণোচ্ছল অংশগ্রহণ। গান্ধর্বযুগের পরবর্তী গানের প্রেক্ষাপটে
রাজা-রাজড়া, শিল্পী-শ্রোতা প্রমুখের সমবেত প্রচেষ্টায় সংগীতের আলোকচ্ছটা যেন উপমহাদেশের সমগ্র অধিবাসীকেই উদ্ভাসিত করেছিল। এতখানি যে, গুপ্তযুগেই সর্বপ্রথম স্বদেশি সংগীতের সঙ্গে বিদেশি সংগীতের সংমিশ্রণ ঘটে।

সাত
পরিবর্তনশীল সমাজের গতিময়তায় অনেক সময় ছন্দপতন ঘটে থাকে। তাই বলে গতি কখনওই স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে না। অতীতকে সঙ্গী না করে বর্তমান এগোতে পারে না। এই প্রক্রিয়াতে গানের ক্ষেত্রেও অতীত  নানাভাবে মিশে থাকে। সেই আদিমাবস্থা থেকে সমাজের সঙ্গে গানের গাঁটছড়া বাঁধার কাজটা সম্পন্ন করেছিল প্রাচীন মানুষ। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেই বন্ধনকে যুগোচিত চেতনায় আরও মজবুত করে তুলেছে মধ্যযুগের এবং আধুনিক যুগের মানুষ।
যুগে যুগে সমাজ-অঙ্গের নানা পরিবর্তনের প্রভাব সংগীতের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়ভাবেই বর্তায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তো কখনওই এড়িয়ে যাবার নয়। তাই বোঝাতেই বুঝি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – ‘সংগীতে এতখানি প্রাণ থাকা চাই, যাহাতে সে সমাজের বয়সের সহিত বাড়িতে থাকে। সমাজের পরিবর্তনের সহিত পরিবর্তিত হইতে থাকে, সমাজের উপর নিজের প্রভাব বিস্তার করিতে পারে ও তাহার উপরে সমাজের প্রভাব প্রযুক্ত হয়।’ (সংগীত)।
মধ্যযুগের প্রথমদিকের পরেপরেই ভারতবর্ষে মুসলিম প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হল। স্বাভাবিকভাবে এই পর্বের গানও মূলত মুসলিম প্রভাব ও ভাবধারায় উন্নত হয়েছিল। প্রধানত উত্তর ভারতকে কেন্দ্র করে মুসলিম গীতধারার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। এক্ষেত্রে অসাধারণ সংগীতগুণী আমীর খসরুর নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তাঁরই বিস্ময়কর প্রতিভাবলে ভারতীয় সংগীতের পরিবারে প্রবন্ধ ও ধ্রুপদের সঙ্গে মিলল নতুন কয়েকটি গীতধারা – কাওয়ালি, তারানা, খেয়াল, টপ্পা, ঠুংরি, হোরি, চৈতী, মান্দ, গজল, গীত ইত্যাদি। কিন্তু এ সবই ছিল বিজ্ঞানসম্মত কৌশলসর্বস্ব গানবাজনা – যাতে হৃদয়ের আর্তি থেকে বেশি প্রকট হত কালোয়াতি।
মূলত রাজা-রাজসভা, নবাব-বাদশা প্রমুখের পৃষ্ঠপোষকতায় উস্তাদদের পারদর্শিতা প্রকাশ এবং উচ্চাঙ্গের সংগীতবোধ-সম্পন্ন শ্রোতাদের রসাস্বাদনের জন্যেই এই সব গীতধারার চর্চা হত। ফলে সে যুগে গীত পরিবেশন এবং চর্চার ক্ষেত্রে উস্তাদদের আধিপত্য এবং রাজকীয় অর্থেরও একটা বড় ভূমিকা ছিল। এর সঙ্গে রাজা ও রাজসভার সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নও ছিল বিশেষভাবে জড়িত। মোটকথা, গানের চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণার একটা বিরাট উৎস ছিল মর্যাদার যুদ্ধ ও রাজানুকূল্য।
জাঁকজমকপূর্ণ রাজসভার উদ্যাপিত কালোয়াৎ বা একালের সেলিব্রিটি হবার জন্যে আড়ম্বরপূর্ণ জীবনচারিতায় অভ্যস্ত উস্তাদগণ একটা নির্দিষ্ট উচ্চবিত্তের গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকেই সংগীতচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই সকল কারণে মুসলিম প্রভাবিত মার্গসংগীতের ধারাও সর্বস্তরের শ্রোতার মনোরঞ্জনের উপযুক্ত ছিল না। তবে শুধু শাস্ত্রীয়সংগীতের গভীর কর্ষণই নয়, দেশীয় গানের ব্যাপক প্রসারও এই সময়ের গানের পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করেছিল।
উত্তর ভারতীয় সংগীতের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতগুণীরাও মধ্যযুগে সংগীতকে এক গৌরবোজ্জ্বল স্তরে উন্নীত করেছিলেন। তাঁদের অবদানস্বরূপ রাগমালিকা, পদম্, কীর্তনম্, কৃতি প্রভৃতির উদ্ভবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কিন্তু উত্তর এবং দক্ষিণের এই সময়ের প্রচলিত গীতরীতিগুলি ছিল বাঁধা-ধরা নিয়মকানুন ও পদ্ধতির অনুসারী। তাই এই জাতীয় গান সর্বস্তরের মানুষের মনে দানা বাঁধতে পারেনি। উস্তাদি গানের শিল্পীগণের অবস্থান ছিল সাধারণ শ্রোতাদের ধরা-ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে বা আওতারই বাইরে।
যে-কোনও মৌলিক শিল্পের মতো সংগীতেরও চরম এবং পরম সার্থকতা রসিকজনের হার্দিক পরিতৃপ্তিতে। শ্রোতা বিনে গান মিছে। সার্থক গান শ্রোতাকে সীমার বাঁধন ছাড়িয়ে বাধাবন্ধনহীন অসীমে নিয়ে গিয়ে মুক্তি দান করে। সেই মুক্তি শুধু মস্তিষ্কসৃষ্ট গান দিতে পারে না, দিতে পারে কেবল হৃদয়যুক্ত গান। তাই গানের বিকাশ বা সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর জন্মস্থান এবং শ্রোতার রুচির ওপর তার প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবজ্ঞাত হলে চলে না। শ্রোতাসাধারণ গ্রহণ না করলে সংগীতের আবেদন একসময় ব্যর্থ হয়, তার অগ্রগতিও হয়ে যায় স্তব্ধ।
উত্তর ও দক্ষিণী সংগীতজ্ঞরা ভারতবর্ষীয় সংগীতের যে-ভিত রচনা করে দিয়েছিলেন, আজকের বাংলা গানও সেই ভিতের উপরেই পারফর্ম করে যাচ্ছে – কথাটা যতই কষ্টকল্পিত শোনাক না কেন। মধ্যযুগে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতগুণীরা ক্ষণকালের আভাস হতে ফুটিয়ে তুলে সাজিয়ে গুছিয়ে চিরকালের তরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন গানের বিবিধ সম্ভার – যেমন বিজ্ঞানভিত্তিক বাইশটি শ্রুতির শনাক্তি, বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর বিন্যাস, উপস্থাপনার সময়চক্র এবং প্রয়োগকৌশল প্রভৃতি।
বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী আমীর খসরু উদ্ভাবিত স্বর-ব্যবস্থার ফলে দরবারের ক্রিয়াত্মক গানের আসরে শুদ্ধ ও কোমল স্বরযুক্ত সপ্তকের প্রচলন সম্ভব হয়। এই স্বর ব্যবস্থার প্রয়োগ মুসলিম ঠাটপদ্ধতির উদ্ভাবনেও সহায়ক হয়। ঠাট দ্বারা রাগ-রাগিণীর বর্গীকরণ, পুরুষ রাগের স্বরকাঠামোকে অপরিবর্তিত রেখে স্বরের অল্পত্ব-বহুত্ব ঘটিয়ে অংশ-স্বর ও গ্রহ-স্বরের প্রচলন এবং বিশেষত খেয়ালের প্রবর্তন প্রভৃতি মুসলিম-অবদানের কথা উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ সংগীতকলার এসমস্ত পুষ্টিবিধায়কের শুভ প্রভাব উপমহাদেশীয় সংগীতের সকল শ্রেণির সঙ্গে বাংলা গানেও নানাভাবেই বর্তেছে – সেসব আপাতদৃষ্টিতে দুর্নিরীক্ষ্য হলেও।

আট
সমাজের সঙ্গে সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে সামাজিক পরিবর্তনের পথ ধরে সাংগীতিক রূপান্তরও স্বভাবতই ঘটে থাকে। এই প্রক্রিয়াতেই নবাব-বাদশাদের আনুকূল্যনির্ভর দরবারি ও পেশাদারি শাস্ত্রীয়সংগীতের প্রাধান্য ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেয়েছিল। কারণ মূলত সমাজের ওপরতলার মানুষদের মনোরঞ্জনের জন্য রচিত উচ্চাঙ্গ সংগীতশাস্ত্রীদের গান সমাজের অপেক্ষাকৃত নিচে অবস্থানকারী বৃহত্তর গণমানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এর পর ছিল ইউরোপীয়দের আগমনকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রভিত্তিক শাসনের কারণে পরাধীন ভারতবর্ষবাসী দেশজ সংস্কৃতিকে আগলে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির তরঙ্গকে রুখে দাঁড়াতে পারেনি। এই পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যযুগে শাস্ত্রীয় সংগীতের যে ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল ক্রমশ তা জনমানস থেকে দূরে সরে যেতে থাকে বিস্মৃতির দিকে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থায় শ্রোতাসাধারণ আঞ্চলিক ভাষা ও লোকজ সুরভিত্তিক গানের প্রয়োজন বেশি করে উপলব্ধি করতে লাগল। কিন্তু সেক্ষেত্রেও প্রতিকূলতা ছিল নানাবিধ। সামাজিক উত্থান-পতন, গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানব-সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরণ,  জয়যাত্রা
কখনও অবক্ষয় – অতঃপর বিলুপ্তির কিনার থেকেও আবার বেঁচে ওঠা। আদিম যুগের অপরিণত গান তো বৈদিক এবং বেদান্ত যুগে অনেকটাই উন্নত হয়েছিল। তবু সময়ের ব্যবধানে মধ্যযুগের সংগীতের প্রেক্ষাপটে এসে দেখা গেল সে-গানের অনেক রূপ ও আঙ্গিকই জীর্ণ পরিধেয়ের মতো পরিত্যক্ত হয়েছে অযত্ন, অথবা সযেেত্নই।
মধ্যযুগের উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতধারা কখনওই উপমহাদেশের বৃহত্তর লোকসমাজকে বা সমাজের লোকায়ত জীবনাচরণকে স্পর্শ করেনি। যে-কোনও জাতি বা দেশের নরনারীর হৃদয়ের আকুতি লোকগীতিতে সহজ সরলভাবে প্রকাশ পায়। তাদের আশা-নিরাশা আনন্দ-বেদনা লৌকিক গায়নে এবং স্থানীয় বাদনে মূর্ত হয়ে ওঠে। নিত্যকার জীবন সংগ্রামের বাণী সুরের ছোঁয়ায় গান হয়ে মানবমনকে উদ্বেল করে – যেমন বৈষ্ণবের কীর্তন, মাঝির ভাটিয়ালি, মৈষালের ভাওয়াইয়া। তাই মধ্যযুগের শেষ পর্বে গানের নব নব রূপায়ণের ফলপরিণামে নানা ধরনের লোকগান বা পল্লীগীতির উদ্ভব ও প্রসার ঘটে।
বর্তমান ও অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে মার্জন ও সংশোধন করার জন্যও প্রয়োজন ভালোমন্দভেদে অতীতের সঙ্গে যোগসূত্র রাখার। মোটামুটিভাবে মধ্যযুগ থেকেই এই যোগসূত্র জোরালো হতে থাকে। এর প্রমাণ মেলে চর্যাগানে। বাংলা ভাষায় প্রাচীনতম সংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নিদর্শন সর্বপ্রথম সিদ্ধাচার্যদের সাধনতত্ত্বজ্ঞাপক ও অধ্যাত্ম অনুভূতি পরিচায়ক চর্যাগীতিগুলিতেই পাওয়া যায়।

নয়
সিদ্ধাচার্যগণ দশম-একাদশ শতাব্দীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে ধরে নেওয়া হয়। সেই সময় সাধারণ লোকের মধ্যে গানের যে রীতি প্রচলিত ছিল সে রীতি অবলম্বনেই চর্যাগীতিগুলি রচিত হয়েছিল। প্রাচীন বাংলা ভাষায় লেখা হলেও, চর্যাগীতিগুলিতে অবহট্টের নিদর্শন বিদ্যমান। চর্যাগানে একেবারে সাধারণ মানুষের জীবনচারিতার নানা বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। যেমন চোলাই মদের ব্যবসা, নৌকো চালানো, পশুপাখি শিকার, মাছ ধরা, দই বেচা থেকে শুরু করে নিঃস্ব ব্রাহ্মণ, ডোম, গুরু-গোঁসাই, নর-নারীর প্রেম ইত্যাদি। এই ছিল পরবর্তীকালের ঐশ্বর্যময় বাংলা কাব্যগীতির সূচনা। বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী অষ্টাদশ-উনবিংশ শতকের বাউল গানেও এইসব চর্যার প্রভাব লক্ষণীয়।
এর পরের অধ্যায় দ্বাদশ শতকের ‘গীতগোবিন্দ’। রাধাবিরহের বিষয়কে কেন্দ্র করে গীতগোবিন্দ গীতিনাট্যটি রচনা করেন জয়দেব। এতে মোট চব্বিশটি গান রয়েছে। গানগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য ধ্বনিঝংকার ও ছন্দোলালিত্য। গীতগোবিন্দের গানগুলিতে গুর্জর, বসন্ত, মালব, গৌড়, ভৈরবী প্রভৃতি দ্বাদশ রাগ এবং একতাল, রূপক, অষ্টতাল প্রভৃতি পাঁচটি তালের উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীকালের অশেষ বৈভবের বাংলা গান নানাভাবে ‘গীতগোবিন্দ’র আবেদন ও অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে।
চতুর্দশ শতাব্দী থেকে মঙ্গলকাব্যের প্রচলন ও প্রসার ঘটে। মঙ্গলকাব্যগুলির সেই ধারা উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত জনচিত্তকে রসাবেশে আবিষ্ট করে রেখেছিল। ধর্মের অলৌকিক মহিমায় আচ্ছাদিত সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-কাঠামোতে স্থাপিত মঙ্গলকাব্যগুলিতে একাধারে দেবদেবীর মাহাত্ম্য আর ধর্মের এক ভীতিজনক দিক – দুটি বিষয়ই অত্যন্ত প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের ধর্মাশ্রিত জনজোয়ার বাঙালির জনজীবনে এক আলোড়ন সৃষ্টি করা ঘটনা। চৈতন্যদেবের ধর্মপ্রচারের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তিনি সকল সংস্কারের ঊর্ধ্বে মানবমিলন-ধর্মের মহাপ্লাবন এনেছিলেন। এখানে প্রচলিত ধারার দেবদেবী বিষয়ক ভক্তিরসের কোনও স্থান ছিল না। শ্রীকৃষ্ণই ছিলেন তাঁর একমাত্র আরাধ্য। শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবে জনজীবনে উন্নত রুচির সহায়কের ভূমিকা পালনের মাধ্যমে বৈষ্ণবসাহিত্য ও সংগীত  উৎকর্ষের চরম শিখরে উন্নীত হয়েছিল। চৈতন্যের ভক্তিরসে দেশের মানসিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। চৈতন্যদেব এবং তাঁর শিষ্য-শিষ্যা দ্বারা প্রচারিত সংকীর্তনের প্লাবনে পদাবলি গান সাধারণের সাধনার বিষয়রূপে গণ্য হয়েছিল। সেই সাধনার প্রেক্ষিতে মানব-মিলনধর্মের
চর্চা বাংলার সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পটভূমিকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছিল। মানবধর্ম এবং পদাবলি গান – এই দুয়ে মিলে সমগ্র দেশকে সম্পৃক্ত এবং জনসাধারণকে আলোড়িত করেছিল।
এই পরিবেশেই অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বড়– চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচিত হয়েছিল বলে পণ্ডিতজনেরা মনে করেন, লেখকের নাম নিয়ে মতভেদ থাকলেও। প্রাচীন পাঁচালি কাব্যের আধারে বিন্যস্ত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বস্তুত নাট্যগীতি। চর্যাপদের পর শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে মধ্যকালীন বাংলা ভাষার অবিকৃত রূপটি দেখা যায়। অনন্তাবতার বলরামের মথুরায় নীত হবার পর থেকে শুরু করে কৃষ্ণের মথুরাগমন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে রাধার প্রতি কৃষ্ণের আকর্ষণ, নানা ছলে উভয়ের মিলন, রাধার প্রেমে বিরক্ত হয়ে কৃষ্ণের বৃন্দাবন ত্যাগ ইত্যাদি বিষয়কে অবলম্বন করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচিত।
অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই সংস্কৃতির পট বদলের সূচনা দেখা দেয়। ফলে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে রুচি-বৈভবের অবনতি ঘটে চলে। ঐতিহাসিক মূল্যায়নে পলাশির যুদ্ধের পর থেকেই আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলি সমাজে নানাভাবে প্রকাশ পেতে থাকে। এই সময় ক্ষয়িষ্ণু গ্রাম্য অর্থনীতিতে ভাঙন, সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অবসান এবং ধনতান্ত্রিক সমাজের উদ্ভব, কলকাতার পত্তন, ইংরেজিমনস্ক ব্যবসায়ী-মুৎসুদ্দিদের আর্থিক উত্থান, প্রাচীন কাব্যধারার অবসান ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার সামাজিক, আর্থনীতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে একটা বড় ধরনের পরিবর্তনের ঝাপটা এসেছিল।
ইতিমধ্যে ১৭৬০ সালে বাংলা গানের প্রথম আধুনিক গীতিকার রায় গুণাকর ভারতচন্দ্রের (১৭১২-১৭৬০) মৃত্যু হয়। ভারতচন্দ্রের আদিরসাত্মক কাব্য ‘বিদ্যাসুন্দর’ মূলত নরনারীর দেহঘটিত মিলন বর্ণনায় সমৃদ্ধ হলেও মাতৃভাষায় সহজ, সরল বা প্রাঞ্জল উপস্থাপনার গুণে তৎকালীন নাগরিক জীবনকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল – (‘কী বলিলি মালিনী! ফিরে বল বল/তোর রসে তনু ডগমগ মন টল টল ॥’)।
বাংলা গানের সমসাময়িক অপর প্রবাদপুরুষ হলেন কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন (১৭২০-১৭৮১) – (‘মা হওয়া কি মুখের কথা/শুধু প্রসব করলে হয় না মাতা ॥’)। আদিরস, নরনারীর প্রেম ইত্যাদি বিষয়ের প্রভাবকে সযতেœ এড়িয়ে এই মাতৃভক্ত মজেছিলেন বাৎসল্যরসের একমুখী সংগীতসাধনায়। আত্মমগ্ন মাতৃ উপাসনা এবং মানববৃত্তিপ্রধান আধ্যাত্মিকতার মহিমামণ্ডিত অপার্থিব গীতিকবিতার স্রষ্টারূপে রামপ্রসাদ প্রাতঃস্মরণীয়। কারণ তিনি একান্তই নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও সুরশৈলীতে সমগ্র বাংলাদেশকে চিরকালের মত বিমোহিত করে গেছেন। তাঁর প্রসাদী গানের প্রভাব বাংলা গানের পরবর্তী সকল স্রষ্টার ওপরই লক্ষণীয়, এমনকি রবীন্দ্রনাথের ওপরও (‘প্রিয়ে, তোমার ঢেঁকি হলে যেতেম বেঁচে/রাঙা চরণতলে নেচে নেচে ॥’)।

দশ
এর পরবর্তী যুগে বাংলা কাব্যসংগীতের নবজাগরণ ঘটে রামনিধি গুপ্ত (১৭৪১-১৮৩৯) ওরফে নিধুবাবুর টপ্পা গানের অবদানে (‘এ কি তোমার মানের সময়? সমুখে বসন্ত!)। লক্ষেèৗ নিবাসী গোলাম নবী ওরফে শোরী মিঞা (১৭৪৯-১৭৯৯) টপ্পা গানের সূচনা করেন। নিধুবাবু ১৮ বছর ছাপরায় ছিলেন ১৭৭৬ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত। সেখানেই তিনি গোলাম নবীর টপ্পার তালিম পান। সেই টপ্পার আদর্শে একটু বাঙালিয়ানা মিশিয়ে নিধুবাবু নিজস্ব ঢঙের টপ্পা রচনা শুরু করেন ১৭৯৪ সালে চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরেই।
তাঁর স্বরচিত গীতিসঙ্কলনগ্রন্থ ‘গীতরতœ’ দীর্ঘায়ু এই সংগীতকারের ৯৭ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় – যাতে কয়েকটি আখড়াই ও ব্রহ্মসংগীতসহ ১০৩টি রাগে রচিত সর্বমোট ৫৫৪টি গান আছে, যার প্রায় সবই টপ্পা। এর বাইরে আরও ৬৩টি গান সংগৃহীত হয়েছে এবং বাকি বহু গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে বাংলা গানের এই টপ্পাসম্রাট সংস্কার সাধন করে প্রচলিত আখড়াই গানকেও উল্লেখযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি হিন্দুস্তানি টপ্পার ক্ষিপ্র গতি ও অলঙ্করণ পদ্ধতি ত্যাগ করে মধ্যলয়ে আন্দোলিত তান সহযোগে একপ্রকার মর্মস্পর্শী পায়নরূপ সৃষ্টি করেন। নিধুবাবু প্রবর্তিত এই গানের ধারা পরবর্তী বিংশ শতকজুড়েও বাংলার গীতপরিমণ্ডলকে অনুরক্ত করে রাখে। শ্রীগুপ্ত তাঁর টপ্পা গানের বাণীতে অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যক্তিগত চেতনাকে বিকশিত করে তোলেন। বলা হয় যে তাঁর গানেই আধুনিক যুগের রোমান্টিক চেতনার প্রথম উদ্ভাস ঘটে। তিনিই প্রথম নাগরিক কাব্যসংগীত রচয়িতারূপে চিহ্নিত হয়ে থাকেন। রামনিধি গুপ্ত নিরঙ্কুশ মানবপ্রেম, একান্ত ব্যক্তিগত হৃদয়াবেগ এবং হৃদয়মন্থী এক ধরনের বিষণœ সুরলহরীর সাহায্যে বাংলা কাব্যসংগীতের আধুনিক যুগের পত্তন করেন। এ গানে বাংলার নিজস্ব রুচি ও মেজাজের প্রভাব স্পষ্ট। মিতায়তন কবিতার ভাবগর্ভতার মধ্য দিয়ে হৃদয়-ছোঁয়া সুরের মোটা দানার মসৃণ তরঙ্গে ফুটিয়ে তোলা আবেদনেই বাংলা টপ্পা গানের সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে।
তাই এই চিত্তাকর্ষক গানের পরবর্তী স্বনামধন্য রচয়িতাদের সৃষ্ট অনেক জনপ্রিয় টপ্পাও নিধুবাবুর নামে প্রচলিত হতে দেখা যায়, যেমন শ্রীধর ভট্টাচার্য (১৮১৬-?) ওরফে শ্রীধর কথকের ‘ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে’। নিধুবাবুর নামে চলে কালীদাস চট্টোপাধ্যায় (১৭৫০-১৮২০) ওরফে কালী মির্জার অনেক টপ্পাও, যেমন ‘তুমি জান সই, আমি যত সই, এত কে পারে’, (‘সংগীতরাগ কল্পদ্রুম’) – যিনি বস্তুত টপ্পা গানের গায়ক ও রচয়িতা হিসেবে নিধুবাবুরও পূর্ববর্তী।
এর পরের পর্বে উদ্ভব হয় কবিগানের। ১৫ নভেম্বর ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ‘সংবাদ প্রভাকরে’ প্রকাশিত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তর বক্তব্য অনুযায়ী আখড়াই ও কবিওয়ালার গান বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে উদ্ভূত হয়েছিল প্রায় একই কালে। প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন দুই দলের মধ্যে উত্তর-প্রত্যুত্তরের মধ্য দিয়ে কবিগান পরিবেশিত হত। কবিগানের আঙ্গিকে একটা মজাদার ভঙ্গি ছিল। গানেরও ছিল একাধিক পর্যায়। যেমন আগমনী বা উমা-সংগীত, বিরহ, সখীসংবাদ, খেউড়। যদিও মৌলিকতার অভাবদোষে দুষ্ট, ইতিহাসের সাক্ষ্যে প্রায় দেড়শো বছর ধরে কবিগান বাংলাদেশে পুরোদমে প্রচলিত ছিল।
এই মর্যাদাহীন গান সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথ ‘লোকসাহিত্য’ নামক প্রবন্ধে বলেন, ‘ভাবের উদ্দীপনাতেও নহে, রাজার সন্তোষের জন্যও নহে, কেবল সাধারণের অবসর রঞ্জনের জন্য গান রচনা বর্তমান বাংলায় কবিওয়ালারাই প্রথম প্রবর্তন করেন।’ তৎকালীন সমাজের নিম্নগামী রুচির অপ্রতিহত প্রভাব ও চাহিদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল এই গান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কবিওয়ালাদের অশিক্ষিত পটুত্ব। এসব সত্ত্বেও কবিগানের ব্যাপক প্রচলন এবং দীর্ঘ স্থায়িত্ব গানের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণে লোকপ্রিয়তার শক্তির জানানি দেয়।
টপ্পার পর সম্পূর্ণ অন্য ধরনের আরেকটি গীতধারারূপে কীর্তনের প্রচলন হয়। মূলত উচ্চস্বরে ভগবানের নামলীলা ও গুণসমূহের অনুশীলনের নাম কীর্তন। কীর্তন বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যের একটি গীতরীতি। চৈতন্যদেবের পূর্বেই ভগবদভক্তি বিষয়ক এই ধরনের কীর্তনের রীতি প্রচলিত ছিল। সেকালে ‘গীতগোবিন্দ’ তো কীর্তনের ঢঙেই গীত হত। কারও কারও মতে প্রাচীন প্রবন্ধ গান থেকেই কীর্তনের উৎপত্তি। সত্যজিৎ রায় বলেন, ‘চৈতন্যদেবের আমলে রাগ-সংগীতকে গড়েপিটে বাঙালি করে কীর্তন গানের সৃষ্টিতে একটা প্রথম শ্রেণীর সংগীত প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। কীর্তনে বাঙালিয়ানা তার ভাবে, ছন্দে, সুরে, অলঙ্কারে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে।’ পদাবলি কীর্তনে বাঙালির মর্মকথা ধ্বনিত। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথের এত বেশি সংখ্যক গান কীর্তনের সুরভঙ্গিতে আধারিত।
পরবর্তী পর্বে ব্রাহ্মধর্মের প্রসারে বাংলাদেশে ব্রহ্মসংগীতের উদ্ভব ঘটে। ব্রাহ্ম ধর্মান্দোলনের পুরোহিত রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) ছিলেন ব্রহ্মসংগীতের প্রবর্তয়িতা। বাংলা কাব্যসংগীতের ইতিহাসে ব্রহ্মসংগীতের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাহ্মধর্ম, ব্রহ্মোপাসনা, ব্রহ্মচিন্তাকে অন্তর্মুখী নিবিড় ও প্রাণময় করার জন্যই ব্রহ্মসংগীতের সৃষ্টি।  সকল  সংস্কারের  সংকীর্ণতাকে রামমোহন একাধারে দার্শনিক এবং নান্দনিক আবেদনে সমৃদ্ধ গানের ঝরনাধারায় ধুয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বহু খ্যাত-অখ্যাত গীতিকারদের ব্রহ্মসংগীত রচনায় বাংলা কাব্যগীতির একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হয়েছিল। শাস্ত্রীয় সংগীতগুণী যদুভট্ট, বিষ্ণু চক্রবর্তী প্রমুখ বহু শীর্ষ সংগীতকার ব্রহ্মসংগীতের সুর-সংযোজন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ রচিত ব্রহ্মসংগীতগুলি স্বশ্রেণির উন্নততম মানের বলেই এখনও তাঁর নিজের সংগীতভাণ্ডারের জনপ্রিয়তম অংশে বিরাজ করে। মোটকথা, বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর সমন্বয়ে ধ্রুপদী আঙ্গিকে রচিত ব্রহ্মসংগীত-শীর্ষক প্রকরণটি বাংলা গানের মহাফেজখানায় একটি বিশেষ সময়ের দলিল হিসেবে স্থায়ী সম্পদরূপে সংরক্ষিত থাকবে।
অষ্টাদশ শতকের শেষে, আনুমানিক ১৭৭৪ সালে বাংলা লোকগানের আঙিনায় লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০)-নামে এক বিরল প্রতিভাশালী বাউলসাধক ও সংগীতকারের আবির্ভাব ঘটে। এই মহাত্মার রচিত বাউল গান বাঙালির গানের ভাণ্ডারের এক অবিস্মরণীয় সম্পদ। লালনের গানে সবার উপরে মানুষের জয় ঘোষিত হয়েছে। বিভেদের সকল বেড়াকে ভেঙে দিয়ে গান কত গভীরভাবে মানুষের মনকে স্পর্শ করে তা একবার চৈতন্যদেব দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে লালনের গানে সেই লক্ষণ পুনর্বার দেখা যায়। লালন শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তিবিশেষের নাম থাকে না, কালে কালে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম হয়ে ওঠে। গানের এই ধারাটি শাস্ত্রীয় আচারসর্বস্ব মৌলবাদের প্রতিপক্ষে বস্তুবাদী মানবতাবাদের জয় ঘোষণা করে।
অষ্টাদশ শতকে রামপ্রসাদ, রামনিধি, রামমোহন প্রমুখের অবদানে বাংলার গানের ডালি সুসজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও শতকটির মধ্যভাগ থেকে অন্যান্য শিল্পসাহিত্যের মতো গানের জগতেও একটা অবনমন দেখা দেয়। অবনমনের এই দুষ্কালে খেউড়, আখড়াই, হাফ-আখড়াই, কবিগান ব্যাপকভাবে বাংলার জনচিত্তকে গ্রস্ত করে রেখেছিল। গ্রামীণ মানুষ তো বটেই, কলকাতার শিক্ষিত-অশিক্ষিত লোকও দীর্ঘদিন ধরে এই অমার্জিত, চটুল গানে অত্যন্ত আমোদ বোধ করতেন। এই অবক্ষয় গ্রাস করে রাখে উনবিংশ শতকের প্রথমাংশেরও অনেকটা কাল।
প্রসঙ্গত লক্ষেèৗর নবাব ওয়াজিদ আলি শা’র (১৮২২-১৮৮৭) কথা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। আজকের বাংলা গানের যে কালচার তাতে এই সংগীতগুণীর অবদান কম নয়। তাঁরই সৃজনশীলতার পথ ধরে বাংলায় গজল, ঠুংরি, কাওয়ালি ইত্যাদির প্রসার ঘটেছিল। তদানীন্তন যুক্তপ্রদেশ থেকে ১৮৫৬ সালে তাঁকে কলকাতায় নির্বাসিত করেন লর্ড ডালহৌসি। নবাব তাঁর  নাচ-গানের গোটা দলটাই সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং নির্বাসিত জীবনেও নৃত্যসংগীত চর্চায় মগ্ন থেকে বাংলার সংগীতভুবনে একটি বিশেষ মাহাওল বা আবহাওয়ার সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।
চর্যাপদ, গীতগোবিন্দ, মঙ্গলকাব্য, নগরসংকীর্তন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, কবিগান, টপ্পা, কীর্তন, রামপ্রসাদী, ব্রহ্মসংগীত, বাউল ইত্যাদি সকল শ্রেণির গীতধারার রূপে, রসে, গন্ধে, বর্ণে মিলেমিশে একাকার আজকের বাংলা গান। ফলে আধুনিক বাংলা গানে এমন এক অন্তর্লীন গুণপনা বর্তেছে যা মানব-হৃদয়ের তন্ত্রীতে এক অপ্রতিরোধ্য তরঙ্গ তোলে। অবশ্য হালের গানের এই মেলামেশার পালা শুরু হয়েছিল আদিম গান থেকেই। তাই আজকের আধুনিক বাংলা গানও এমন যে, তার দেহে যে-কোনও সাংগীতিক অলঙ্কার যেন অনায়াসেই মানিয়ে যায়। তাই অফুরান বৈচিত্র্যে ভরা এ গান সংগীতের শ্রেণিসচেতনতা মানে না। সুরে শুরু এবং সুরেই সারা – কথার ক্ষেত্রেও এই গানের প্রান্তর যেন তেপান্তর।

এগারো
ইতিমধ্যে কলকাতাকে কেন্দ্র করে লোকসংগীত, মার্গসংগীত, হিন্দুস্তানি সংগীত, পাশ্চাত্য সংগীত ইত্যাদির বহুবিচিত্র বর্ণচ্ছটায় বাংলা গানের জগতে বর্ণাঢ্য এক বৈচিত্র্যময় পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্ররূপে স্বীকৃত হয়েছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এবং এই পর্বেই সেই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব। ভাব ও ভাবনায় তাঁর গান বিকশিত হয় এই পরিমণ্ডলেই। রবীন্দ্রনাথ লালিত হয়েছিলেন বৃহত্তর ভারতবর্ষীয় সংগীতের ঐতিহ্যে। তাই উপমহাদেশীয় গানের সকল ধারাই তাঁর গানের পারাবারে এসে মিশেছিল। তা ছাড়াও পাশ্চাত্য সংগীতের  বহু  সুরও  রবীন্দ্রসংগীতকে
বিশেষভাবে সুসজ্জিত করেছে।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানকে জাতে তুলে নেননি, তাঁর হাতে বাংলা গান রূপ পেয়েছে একটি নতুন জাতির। জাতিটিকে আধুনিক গান নামেই অভিহিত করতে হয়। বাংলার তথা ভারতবর্ষের সকল সংগীতের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে তিনি এক নতুন শৈলীর প্রবর্তন করেছেন। স্রষ্টাসুলভ সাহসের সঙ্গে নবাবিষ্কৃত স্বকীয় রীতিতে আস্থা রেখে উপমহাদেশের অমর সংগীতের সুপরিণত ধারাকে ভিন্ন খাতে পরিচালনা করে নিয়ে গিয়েছিলেন বিস্ময়কর শক্তিধর এই মহান কম্পোজার। তাঁর উদ্ভাবিত নতুন শৈলীর সংগীত কালে কালে ‘রবিবাবুর গান’, ‘রবীন্দ্রসংগীত’ এবং সর্বশেষ ‘রবীন্দ্রনাথের গান’ বলে পরিচিত। এ ধারায় সুদূরের কোনও ভাবীকালে হয়তো তাঁর বর্ষার গান ‘ঠাকুর কি মল্লার’, ঊষার গান ‘ঠাকুর কি টোরি’, গোধূলির গান ‘ঠাকুর কি পূরবী’ প্রভৃতি নামেই অভিহিত হবে।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক আরও চারজন সংগীতজ্ঞ আধুনিক বাংলা গানকে কথায়, সুরে, তালে, ছন্দে, বিষয়বৈচিত্র্যে উদ্ভাসিত করেছেন – দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০), অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১-১৯৩৪) ও কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৮-১৯৭৬)। এঁরা একাধারে গীতিকার এবং সুরকার, কিন্তু কেউই কারুর সঙ্গে তুলনীয় নন। গানের প্রকাশভঙ্গি, আঙ্গিক, বিষয়বস্তু, সুরারোপ ইত্যাদি ক্ষেত্রে এঁরা সকলেই মৌলিকত্ব দেখিয়েছেন এবং নিজ নিজ স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন প্রত্যেকেই। আধুনিক গানের বৈশিষ্ট্য এঁদের গানে সার্থক রূপ পেয়েছে।
এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে পিছনের সহায়তার গুরুত্ব যথেষ্ট – সে সত্য এঁদের সৃজনেও সুপ্রমাণিত। বাংলা গানের ঐতিহ্য এই ঐতিহাসিক সত্যকে প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও বারবারই প্রমাণ করবে। সারবান গানের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সে গানের দায়িত্ব সুখে-দুখে, হরষে-বিষাদে, স্বজনে-বিজনে, অন্তরে-বাহিরে সকল সময়ে মানুষকে সঙ্গ দেওয়া, তার রুচিকে শুদ্ধ করা, মনকে নির্মল করা, চেতনাকে উন্নত করা। এ দায়িত্ব সর্বাংশে পালন করেছে বলেই পঞ্চপ্রধান, পঞ্চভাস্কর, পঞ্চপ্রদীপ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রেমার্দ্র অভিধায় অভিহিত বাংলা গানের এই চিরন্তন রচয়িতাদের সৃজিত গান কালোত্তীর্ণ হয়ে একালেও গীত হচ্ছে এবং মনে হয় সর্বকালেই গীত হবে।

বারো
বর্ণিত ধারাবাহিকতাতেই বাংলা গান দেবাঙ্গন থেকে বেরিয়ে জনাঙ্গনের সর্বকোণে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরোহিতের মন্দির, সম্রাটের দরবার, জমিদারের জলসাঘর, জনপদের প্রেক্ষাগার ইত্যাদি মাতিয়ে, খোল-নলচে পাল্টে, শহরাঞ্চলে, গ্রামেগঞ্জে – মাজমা, সম্মেলন, সেমিনার, প্রতিযোগিতা, শিক্ষাসূচি প্রভৃতির মাধ্যমে বাংলা গানের প্রেক্ষাপট নিরবচ্ছিন্ন গতিতে সজ্জিত ও প্রসারিত হয়ে চলেছে।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সমকালীন সম্প্রচার-মাধ্যমগুলির। পরবর্তীকালীন অপরিসীম ক্ষমতাধর গণসম্প্রচার মাধ্যমসমূহ যথা রেডিয়ো, গ্রামোফোন, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং অসংখ্য পত্রপত্রিকা বাংলা গানের প্রসারকে ব্যাপকতম রূপ দান করল। ফলে    সর্বস্তরের মানুষের মনে আধুনিক বাংলা গান অনায়াসে জায়গা করে নিল এবং প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল আপন মহিমায়। তাই আজ নির্দ্বিধায় বলা যায় – বাংলা গানই হল বাংলার প্রাণ।
রবীন্দ্র-নজরুলের পর একাধারে বহু কথাকার, সুরকার ও রূপকারের সুসমন্বিত প্রয়াসে ঐশ্বর্যময় আবহসংগীত সহযোগে পরিবেশনগুণে বাংলা গান আজকের এই সুবিপুল সাফল্যটি অর্জন করেছে। সাফল্যের মূলে ছিল শুধু কথা আর সুরই নয়, তাতে আরেকটা মাত্রা যোজন করেছিল অভূতপূর্ব যন্ত্রানুষঙ্গও। গানে উৎকর্ষসাধনের ক্ষেত্রে যন্ত্রীদের অবদান বিকল্পবিহীন। তাঁরা কাজ করেন নেপথ্যে। কিন্তু তাঁদের কাজের প্রসাদগুণেই গান আজ সকল ধরনের মঞ্চ থেকেই সীমার বাঁধন ছাড়িয়ে অসীমের অজানায় পাড়ি জমাতে পারে।
‘সাত ভাই চম্পা’ (লতা মুঙ্গেশকর), ‘এ শুধু গানের দিন’, ‘মধু মালতী ডাকে আয়’, ‘মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা’ (সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়), ‘যা যারে যা পাখি’ (শ্যামল মিত্র), ‘তুমি সুন্দর যদি নাহি হও’ (তালাত মাহমুদ), ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্র“বতারা’ (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়), ‘এলো বরষা যে সহসা’ (ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য), ‘কথায় কথায় যে রাত হয়ে যায় (মান্না দে) ইত্যাদি গানের প্রেলিউড-ইন্টারলিউড কি কোনওদিন ভোলার? এই সময়কার গানের কথা, সুর, কাব্যময়তা, যন্ত্রানুষঙ্গ – সব মিলিয়ে এ যেন এক ঐন্দ্রজালিক মেলবন্ধন, এক অলৌকিক ককটেল। ফলত এসব গান হতে পেরেছে সকল প্রজন্মের, অন্যকথায় চিরায়ত।
বাংলা গানের অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির এই পর্বে একপাল সমমানের কথাকার, সুরকার ও রূপকারের চাঁদের হাট থেকে যদৃচ্ছচয়িত কয়েকজনের নামোল্লেখ করছি শুধু এটুকু বোঝাতে যে আলোচনাটা কল্পজগতের নয়, বাস্তবজগতেরই। গীতিকার : অজয় ভট্টাচার্য (১৯০৬-১৯৪৩), সুবোধ পুরকায়স্থ (১৯০৭-১৯৮৪), প্রণব রায় (১৯০৮-১৯৭৫), শৈলেন রায় (১৯১০-১৯৬৩), মোহিনী চৌধুরী (১৯২০-১৯৮৭) প্রমুখ। সুরকার : লালচাঁদ বড়াল (১৮৭০-১৭০৭), তুলসী লাহিড়ী (১৮৯৭-১৯৫৯), ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় (১৯০৯-১৯৭৭), রাইচাঁদ বড়াল (১৯০৩-১৯৮১), হিমাংশুকুমার দত্ত সুরসাগর (১৯০৮-১৯৪৪), অনুপম ঘটক (১৯১১-১৯৫৬), কমল দাশগুপ্ত (১৯১২-১৯৭৩) প্রমুখ। রূপকার : কৃষ্ণচন্দ্র দে (১৮৯৩-১৯৬২), ইন্দুবালা (১৮৯৮-১৯৮৪), আঙ্গুরবালা (১৯০০-১৯৮৪), জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী (১৯০২-১৯৪৭), কুন্দনলাল সায়গল (১৯০৪-১৯৪৭), কমলা ঝরিয়া (১৯০৬-১৯৭৯), শচীন দেববর্মন (১৯০৬-১৯৭৫) প্রমুখ। আর একটি নাম দাবি রাখে স্বতন্ত্রস্বরূপ উল্লেখের। তিনি উনিশ শো বিশ-ত্রিশ দশকের শিল্পীকুলের শিরোভূষণÑ যুগপৎ গীতিকার ও সুরকার কাজী নজরুল ইসলাম। এঁর এক স্বাতন্ত্র্য তো এই যে, পঞ্চপ্রধানের মধ্যে একমাত্র নজরুলই ছিলেন বর্ণিত শিল্পীগণের মধ্যমণিস্বরূপ সহশিল্পী।
যুগ, সমাজ, ব্যক্তিরুচি চিরকালই সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। এই সময়কার বাংলা গানে রোমান্টিকতার খরস্রোতেও যুগের প্রভাব ও সমাজের চাহিদাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। চল্লিশের দশকে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, স্বাধীনতা-আন্দোলন, জাতিগত দাঙ্গা ইত্যাদি মিলে দেশজুড়ে যে বিশৃঙ্খলা – তার প্রভাব গানেও অবিস্মরণীয়ভাবেই পড়েছে। যাঁদের গান এই সময়ে জনমানসে প্রবল সাড়া জাগিয়েছিল তাঁদের কয়েকজন : জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, বিনয় রায় প্রমুখ। জ্যোতিরিন্দ্রের ‘নবজীবনের গান’ এক বিশেষ কালে সৃষ্ট চিরকালীন শিল্প এবং সময়ের ঐতিহাসিক দলিল। ১৩৫০ সালের মন্বন্তর গোটা বাংলাদেশে, বিশেষ করে কলকাতায়, যে করাল ছায়া বিস্তার করেছিল তা-ই বর্ণিত ও অঙ্কিত হয়েছিল এই গায়ক-কবির গানে এক অসামান্য দক্ষতায়।
এছাড়াও ১৯৪৭ সালের গণহৃদয়বিদারক দেশভাগের চিরস্মরণীয় স্মারক ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর ’পরে রাগ কর/তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ কর’ (কথা – অন্নদাশঙ্কর রায়, সুর – সলিল চৌধুরী), ‘অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি/জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।’ (কথা-সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুর – সলিল চৌধুরী), ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে/কত প্রাণ হল বলিদান/লেখা আছে অশ্রুজলে।’ (কথা – মোহিনী চৌধুরী, সুর ও কণ্ঠ – কৃষ্ণচন্দ্র দে), ‘স্বপন যদি মধুর এমন’ (কথা – জলধর চট্টোপাধ্যায়, সুর ও কণ্ঠ – কৃষ্ণচন্দ্র দে) প্রভৃতি ভিন্নস্বাদের আধুনিক বাংলা গান বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল এবং কালের স্মারক হিসেবে শ্রোতাপ্রিয় থাকবে বহুকাল।
চল্লিশ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত তিনটি দশক আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে একটা হীরকোজ্জ্বল অধ্যায়। নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ অধ্যায়টি রচিত। অনেক সংগীতপিপাসু মানুষের সধৈর্য প্রস্তুতি, গভীর
চিন্তাভাবনা ও অপরিসীম গবেষণার ফসল  এই  পর্যায়ের  বাংলা গান। অনেক সময় একটি গানের নির্মিতিতেই লেগে যেত মাসকে মাস সময়। নির্বাচিত রূপকারকে কথাকার তাঁর রচিত গীতিটি কয়েকদিন বারবার উচ্চারণ ও আবৃত্তির মাধ্যমে স্বরের বাঞ্ছিত উচ্চাবচতা নির্ধারণ করে দিতেন। তারপর সুরকার কয়েকদিন তাঁর সুর গুনগুন করিয়ে রূপকারের মনের খাঁজে খাঁজে বসিয়ে দিতেন।
তারপর শুরু হত গানটি গাওয়ানোর পূর্ণাঙ্গ মহড়া। বর্ণিত প্রক্রিয়াটি জুড়েই চলত সর্ববিষয়ে সংস্কারÑসংযোজন-বিয়োজন, সংশোধন-পরিমার্জন, এমনকি প্রয়োজনে পরিবর্তনও। এত সব যতেœর অন্তেই একটিমাত্র ‘টেক’-এ শ্রোতা পেত ‘নাই বা ঘুমালে প্রিয়’, ‘তুমি আজ কত দূরে’র মতো চিরকালীন গান। কারণ দুই টেকে দুনো খরচ বহন করতে রাজি হত না রেকর্ড কোম্পানি। এখনকার মতো অংশ অংশ রেকর্ড করার ভার্সেটাইল ফ্যাসিলিটি তখন ছিল না।
এই অমরত্বের পেছনে রয়েছে আরেক দূর্নিরীক্ষ্য অনির্বচনীয়ের জোগান। উপমহাদেশীয় সব ধরনের সংগীতের পুঞ্জীভূত প্রসাদগুণ থাকত এসব চিরন্তন বাংলা গানের দেহে লীন হয়ে – যেমন কোথাও সাঁওতাল পরগনার ঝুমুর, কোথাও উত্তরপ্রদেশের লোকলোর, কোথাও বিহার অঞ্চলের লাউনি, ইত্যাদি। এমনকি পাশ্চাত্য সুরের ভাবধারাও সুন্দর এবং সুচারুরূপেই দেশীকরণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত হত এতে।  সব মিলিয়ে এ এক অপূর্ব রন্ধন ও বিরল আস্বাদন সংগীতের।
যে সমস্ত বিরল প্রতিভাধর গীতিকার, সুরকার এবং রূপকারের সুসমন্বয়ে বাংলা গানের এই ঐশ্বর্যমণ্ডিত অধ্যায় রচিত হয়েছিল – তাঁদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি, যাঁরা ফোকাসে এসেছিলেন পূর্ববর্ণিতদের পরে। গীতিকারের তালিকার কয়েকজন হলেন – শ্যামল গুপ্ত, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৩-১৯৯৯), গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার (১৯২৪-১৯৮৬), সুনীলবরণ প্রমুখ। সুরকারদের কয়েকজন শৈলেশ দত্তগুপ্ত (১৯০৫-১৯৬০), পঙ্কজ মল্লিক (১৯০৫-১৯৭৮), হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৯), নচিকেতা ঘোষ (১৯২৪-১৯৭৬), অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, অনল চট্টোপাধ্যায়, রবীন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। গীতিকার-সুরকার বলতে সুধীন দাশগুপ্ত, সলিল চৌধুরী (১৯২২-১৯৯৫), প্রবীর মজুমদার প্রমুখ। রূপকারদের কয়েকজন সন্তোষ সেনগুপ্ত, বেচু দত্ত, রবীন মজুমদার (১৯১৮-১৯৮৩), হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৯), মান্না দে, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় (১৯২৯-১৯৯২), শ্যামল মিত্র (১৯২৯-১৯৮৭), সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকর, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, আশা ভোঁসলে প্রমুখ।
কথা ও সুরের বৈচিত্র্যে, নব নব মৌলিক সৃষ্টির সমাহারে, নিপুণ নিখুঁত উপস্থাপনায় এই সময়কার বহু বহু গান জনপ্রিয়তার শীর্ষে উন্নীত হয়েছিল এবং এখনও শীর্ষেই রয়েছে। বিরল প্রতিভার অধিকারী এই সব শিল্পী ছিলেন যাঁর যাঁর ক্ষেত্রে আত্মস্থ, ধ্যানমগ্ন। উপলব্ধির সমুদ্রের এসব ডুবুরি ততক্ষণই নিমজ্জিত থাকতেন, যতক্ষণ না তাঁদের সন্ধিত মুক্তোটি খুঁজে পেতেন।
চল্লিশের দশক থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত তিনটি দশক ধরে এত উচ্চমানের এত বেশিসংখ্যক সংগীতগুণী কমবেশি একই সময়ে নানা ধরনের অজস্র গানে সর্বস্তরের অগণিত শ্রোতার মনেপ্রাণে যে সুখ, তৃপ্তি, আনন্দ ইত্যাদি নানা ভাবাবেগের সঞ্চার করেছেন, সে উপহার অদূর তো নয়ই, সুদূর ভবিষ্যতেও বাংলা গানের শ্রোতা আর পাবেন বলে মনে হয় না। কারণ বিবিধ। তার মধ্যে নগ্ন অনুকরণের মাধ্যমে বাংলা গানকে মলিন এবং কলুষিত করার প্রবণতা, অবক্ষয়ী ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রভাব, শিল্পীদের জীবিকাতাড়িত মানসিকতা, সর্বগ্রাসী ব্যবসাদারি হামলা এবং সস্তায় বাজার মাত করার ধান্দার কথা বলতেই হয়।
এর পর থেকে, নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে সত্তরের দশকের শেষার্ধ থেকেই যেন সমকালীন বাংলা গান ক্রমশ পথহারা হয়ে উঠল। আস্তে আস্তে সংগীতরসিকদের মনে আধুনিক গান সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে লাগল। পরিলক্ষিত হতে থাকল কেমন যেন চমকহারা একটা ম্রিয়মাণ ভাব। আশির দশকে তো সমকালীন বাংলা গান প্রায় অবলুপ্তির মুখে বলেই ধারণা করেছেন সকলে। এই ধারণা অমূলক ছিল না। কারণ, যে-কোনও শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে মৌলিকত্বই প্রধান কথা। এই পর্বে যার অভাবে বাংলা গান ধুঁকছিল।
ফলে ঐতিহ্যবাহী বাংলা গানের জয়যাত্রার গতি যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। কেন এমন হল – তা ভাবার অবকাশ ও প্রয়োজন দুই-ই ছিল। গান তার অন্তর্নিহিত মৌলিক গুণাবলী ও নান্দনিক আবেদন নিয়ে মানুষের মনে নাড়া দেয়, আবেগ ও রসের সঞ্চার করে – যার রেশ মানুষের মন ও প্রাণকে আবিষ্ট করে রাখে সুদীর্ঘ কাল। আশির দশকে বাংলা গানের ক্ষেত্রে এসব কথার যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
তেরো
ইতিমধ্যে অবশ্য বেশ কয়েকজন কণ্ঠীর উদয় হয়েছিল – হেমন্ত-কণ্ঠী, মান্না-কণ্ঠী, লতা-কণ্ঠী, আশা-কণ্ঠী প্রভৃতি। তাঁদের আগমনে বাংলা গানের আঙিনা আভিজাত্যে বা বর্ণচ্ছটায় কতটা উজ্জ্বল হয়েছে, তা একমাত্র তাঁরা এবং তাঁদের শ্রোতারাই বলতে পারবেন। কোনও কোনও কণ্ঠী আবার শুধুমাত্র স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বকণ্ঠসম্পদে গান গাইতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। বৈদ্যুতিন যন্ত্রে কণ্ঠস্বরকে পরিবর্তন করে নকল গলায় গাওয়া কণ্ঠীদের গান কতটা মূল্যবান বা আদৌ শ্র“তিমধুর কিনা, তা সময় নিশ্চয়ই ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখবে।
কণ্ঠীদের সঙ্গে প্রায় গলাগলি করেই রিমেকের বায়না নিয়ে ধেয়ে এল জনপ্রিয় শিল্পীগোষ্ঠী – অতীতের অমর গানগুলির অমরত্ব বিঘিœত করতে। বেরুতে লাগল মহৎ গায়ক-গায়িকাদের চিরায়ত গানগুলি – রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণহীন হয়ে। এতকালের বাংলা গানের যে ধারাবাহিকতা, অনবদ্য রূপের যে
পারম্পর্য – তা আর রক্ষা করা গেল না যথোপযুক্ত মর্যাদায়। আধুনিক বাংলা গানের ‘স্বর্ণযুগ’ বলে অভিহিত সেই যুগের ডালি থেকে এক এক করে গানগুলোকে টেনেহিঁচড়ে এনে, অসতর্ক উপস্থাপনায় ক্ষত-বিক্ষত করা হল। আজ রিমেকের দূষিত বায়ু বাংলা গানের আকাশে যে কালো মেঘ পুঞ্জীভূত করে চলেছে, তার অশনি-সঙ্কেতকে আর উপেক্ষা করা উচিত হবে না।
পণ্যসর্বস্ব যুগে গানও ভীষণরকম পণ্য হয়ে গেল। গান-ব্যবসায়ীরা মেতে উঠলেন আধুনিক বাংলা গান নিয়ে ব্যবসার সকল শাখায়। পণ্য হয়ে যাওয়া শিল্পের পসারি শিল্পীরাও মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেললেন মনের হরষে দিশেহারা হয়ে। সহজলভ্য আসল নকল ক্যাসেটবন্দি ‘স্বর্ণযুগের গান’ এইভাবে পরিণত হয়ে গেল ‘লৌহযুগে’র গানে। রিমেক গানগুলির অত্যাধুনিক যান্ত্রিক কোলাহলে, ন্যূনতম যন্ত্রযোগে গীত হার্দিক মূল গানগুলি যেন লজ্জায় মুখ লুকাতে লাগল। এই প্রক্রিয়ায় এসব রিমেড গানের শ্রোতাদের অরিজিনাল গানগুলির অমর রূপকারদের মহান নামগুলি পর্যন্ত ভুলিয়ে দেওয়া হল।
জনৈক ‘কণ্ঠী রিমেকার’-এর গলায় মান্না দে’র ‘হয়ত তোমারি জন্য’ গানটার সঞ্চারীর অংশটুকু শুনলে বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। ‘ঝড়ের দিগন্ত জুড়ে স্বপ্ন ছড়াই’ – এই কলিটিতে মান্না দে তাঁর গায়কির মধ্য দিয়ে যে আবেশের সঞ্চার করেছেন তা যথাযথ প্রকাশ করার জন্য আরেকজন মান্না দে’র প্রয়োজন। তাঁর অবিকল্প স্বর তো সকলের বাকযন্ত্র দিয়ে নির্গত হয় না, এমনকি তাঁর তথাকথিত ‘কণ্ঠী’দেরও না। এদিকে এই সস্তা চর্চায় শ্রীকান্ত আচার্য, ইন্দ্রনীল সেনদের ঐন্দ্রজালিক কণ্ঠেরও সদ্ব্যবহারের বদলে হচ্ছে অপব্যবহার। কিন্তু যে সমাজে অর্থকড়ির ব্যাপারটা প্রায় সর্বসম্মতভাবেই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত, সেখানে অনাচার অনিবার্য।
গান তো এক রসমধুর ধ্বনিসমষ্টির সুচারু বিন্যাসে অঙ্কিত সুচিক্কন আলপনা। যেমন বলেছি, এ শিল্প চোখে দেখার নয়। অন্তরে উপলব্ধি করার বিষয়। কথার গায়ে সুরের সূক্ষ্ম নিপুণ কারুকাজ মানুষের মন ছুঁয়েই শুধু যায় না, মনে রেখে যায় অনুরণনের রেশ। কখনও কখনও সেই রেশ চিরস্থায়ীও হয়ে যায়। অতীতের সাড়াজাগানো এই রকম বহু বহু গানের রেশ নিয়ে তৈরি আমাদের যে-কান, অভিভবে ভরা যে-প্রাণ – সেখানে রিমেকের যান্ত্রিক পরিবেশনার কি কোনও আবেদন থাকতে পারে?
নিখুঁত রূপায়ণেই গানের সৌন্দর্যের স্থায়ী বাস। সেই তো গানের লীলা। গানের লীলার সেই অলৌকিক কিনারে কখনওই সহজে পৌঁছানো যায় না। সংগীতকারীতে রূপায়ণই হল শেষকথা। রূপকার তালাত মাহমুদ-ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যদের রূপায়ণ অনুপ ঘোষালের কাছে কি আদৌ প্রত্যাশিত? ‘আধোরাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়/মনে পড়ে মোরে প্রিয়’ আর ‘প্রিয় হে প্রিয়,/তুমি ফিরাবে কি শূন্য হাতে/আমারে’ – গান দুটির প্রাচীন রেকর্ড আর অর্বাচীন রেকর্ডগুলো স্বকর্ণে আরেকবার শুনেই উত্তরটা দিন। শেষোক্ত গানটির শেষ পঙ্ক্তিটির শুদ্ধ বাণী সেকালের শ্রোতাদের নিশ্চয় মনে আছে – ‘তুমি ফিরালেও তাই ফিরে আসি/বারে বারে অভিসারে’। ডক্টর অনুপ ঘোষাল এখানে বাণীও ‘রিমেক’ করে গেয়েছেন – ‘বারে বারে অভিসারে’-র স্থলে ‘বারে বারে স্মরি তোমারে’।
প্রাচীন গীতধারা বা গীতরূপের সঙ্গে বর্তমান বাংলা গানের মিল খুঁজতে অনুসন্ধানী মন দরকার, তা অনায়াসও নয়। কিন্তু একথা কি অস্বীকার করা যায় যে, আজকের বাংলা গান প্রাচীনের অনুপ্রেরণা নিয়েই প্রাণবান ও গতিশীল এবং প্রাচীনের চেতনার আলোকেই আলোকিত। যুগ-যুগান্তের গানের সুর, তাল, লয়, ছন্দ আজ আর আমাদের কানে যুগানুবর্তী হয়ে না বাজলেও আমাদের আজকের এই সংগীতচর্চা তো বিগত কালের চর্চারই পরিণতি।
অগ্রগতির যে স্রোত, তার শুরুটাকে ঢেউয়ের দোলায় দোলায় বহু যুগের এ পারে এসে হয়তো আর দেখা যায় না। কিন্তু শুরুর সেই সত্যকে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে গেলে শুরুর অনুসন্ধান না করলে চলে না। প্রতিটি যুগ অনেক ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার ছন্দে ছন্দে নানাবিধ ঐতিহ্যের যে নিদর্শন গেঁথে গেছে, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভাণ্ডারে যে সম্পদ গচ্ছিত রেখে গেছে, তা যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করার দায় বর্তমানের। এইভাবে তিলতিল করে সঞ্চিত অবদানে অলংকৃত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে এসেছে বাংলা গান।
যে-কোনও গান কণ্ঠে ধারণ করতে গেলে সেই গানের কথা ও সুরকে মর্মঙ্গম করতেই শুধু নয়, গানটিকে উপলব্ধিতেও লালন করতে হয় বেশ কিছু কাল। এ না হলে যে-কোনও গানের শতভাগ সফল পরিবেশন সম্ভব নয়। কারণ গানের উদ্দেশ্য শুধু শ্রবণেন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধনই নয়, শ্রোতার হৃদয়কে উদ্বেলিত, উচ্ছলিত ও চিরঋণী করে তোলা। আর তা করতে পারলেই কেবল সে গান হয় চিরকালীন।

চৌদ্দ
উনিশ শ সত্তরের দশকের শেষ নাগাদ বাংলা গানে মেলডি হারিয়ে যাবার পরে এর শূন্য আসনে বসে পড়ে ম্যালাডি – অর্থাৎ মধুর সুরের স্থলে বিধুর ব্যাধি। অন্যকথায়, সিম্ফনির বদলে ক্যাকফনি – অর্থাৎ সম্মোহক শব্দসঙ্গতি ও সুরলহরীর বদলে উৎপীড়ক শব্দাশব্দি আর ধস্তাধস্তি। প্রকৃতপক্ষে এই কর্কশ কোলাহলের মধ্যে সামনে এগোতে না পেরেই বাংলা গানকে পিছু হটে অতীতে ফিরে গিয়ে সেকালের গান রিমেকের মাধ্যমে কোনওমতে দিন গুজরান করতে হচ্ছিল।
রিমেক-প্রকল্পের সফল হওয়ার কারণ ‘রিমেড’ গানগুলি ছিল ‘সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী’। এ শব্দবন্ধটি রামতনু অধ্যাপক শশিভূষণ দাশগুপ্ত ব্যবহার করেছিলেন রচনা-সাহিত্যের স্বরূপ বোঝাতে গিয়ে যে লেখক এবং পাঠকের মধ্যে রসের যোগেই ঘটে হৃদয়-সংযোগ, হৃদয়-সংযোগে জাগে দুটি হৃদয়ের রস-সংবাদ – এই হৃদয়ের সংবাদই সাহিত্যের ‘সাহিত্য’। হৃদয়ের সংবাদ থাকে বলে ‘রচনা’ (essay)  ‘সাহিত্য’ হয়। এই হৃদয়ের সংবাদের বদলে মস্তিষ্কের তত্ত্ব থাকে বলেই প্রবন্ধ (treatise) ‘সাহিত্য’ হয় না, ‘আর্টিক্ল’ হয় (প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়)। এই হৃদয়-সংবাদ স্পষ্টতম হয়ে ওঠে পদ্যে লিরিক কবিতায় এবং গদ্যে রচনা-সাহিত্যে। এজন্যই ‘রচনা’কে অনেকে নাম দিয়েছেন ‘গদ্য লিরিক’। (‘বাংলা সাহিত্যের একদিক/রচনা-সাহিত্য’,
(পৃ. ২৮-২৯), ওরিয়েন্ট বুক, ১৯৯৩, কলকাতা)।
কথাগুলোকে প্রতিস্থাপন করে বক্ষ্যমাণ প্রসঙ্গে লেখকের স্থলে গায়ক, পাঠকের স্থলে শ্রোতা এবং সাহিত্যের স্থলে সংগীত বসিয়ে আমরা বলতে পারি হৃদয়ের সংবাদই সংগীতের ‘সংগীত’, গানের ‘গান’। বলতে পারি গায়কের রসসৃষ্টির প্রেরণা আর শ্রোতার রসাস্বাদের বাসনা গানকে
‘সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী’ করে তোলে এবং তা হয়ে ওঠে শ্রোতার চিরসখা। তত্ত্ব ও তথ্যের আদান-প্রদানে গায়কের সঙ্গে শ্রোতার বুদ্ধির যোগ ঘটতে পারে, হৃদয়ের যোগ ঘটে না। তাই তারা গানের উপাদান হতে পারে না। তাই তথাকথিত ‘জীবনমুখী গান’ গান হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে বড় জোর স্লোগান; ‘র‌্যাপ গান’ও হৃদিবল্লভ হয়ে হৃদয়ে বসত করে না।
তাই আমার সার কথাটি হল – বাংলা গান থাকুক ‘সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী’ হয়ে। মস্তিষ্কের তথ্যবাহক বা তত্ত্ববিশ্লেষক হওয়া গানের কাজ নয়। সে কাজের জন্য ‘প্রতিবেদন’ আছে। ‘গান’ থাকুক হৃদয়ের সংবাদবাহী হয়ে। অন্যকথায় – হৃদয়বৃত্তিক এই চারুশিল্পটি মস্তিষ্কবৃত্তিক কারুশিল্প হয়ে না উঠুক। তেমনটি হয়ে ওঠার ব্যাপক আলামত দেখেই প্রসঙ্গটার অবতারণা করতে হল।

পনেরো
সম্পূর্ণ বিমূর্ত এই চারুশিল্পটির প্রযুক্তিগত উন্নতি প্রাচীন কাল থেকে এই হাল পর্যন্তই ছিল সুধীর, তবে ক্ষতিকারক নয়। কিন্তু তাতে এই শিল্পটি অন্যান্য সুকুমার শিল্প তথা সাহিত্যশিল্প, চিত্রশিল্প, ভাস্কর্যশিল্প প্রভৃতির দ্রুতগতিশীল উন্নতির  যাত্রায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছিল হাজার হাজার বছর ধরে।
অবশেষে আজ থেকে মাত্র শতাধিক বৎসর পূর্বে সংগীতশিল্প হাতে পেল এমন একটি প্রযুক্তি, যাকে আলাদীনের চেরাগ বললেও কম বলা হয়। চেরাগটির প্রারম্ভিক অবদান হল sound recording technology কিংবা ধ্বনিধারণ প্রযুক্তি।
সংগীতের বিস্ময়কর সম্ভাবনাময় এই প্রযুক্তিটি বিজ্ঞান-শাসিত স্থান-কালের মঞ্চে প্রবেশ পেয়েই হুঙ্কারে আর দাপটে বাকি সব চারুশিল্পকে কোণঠাসা করে ফেলে। তবে এই প্রযুক্তিরই অপরিসীম ক্ষমতা বুমেরাং হয়ে হিতে-বিপরীতরূপে দেখা দিচ্ছে ইতিমধ্যেই। হৃদয়বৃত্তিক এই চারুশিল্পটিকে প্রযুক্তি আজ বুদ্ধিবৃত্তিক কারুশিল্পে পর্যবসিত করার পথে এতখানি এগিয়ে গিয়েছে যে প্রমাদ গুণে আমি আমার অকিঞ্চিৎকর এ লেখাটির মাধ্যমে হৃদয়-সংবাদবাহী এই চারুশিল্পটির বিশেষজ্ঞ মহলের কাছে এর সপক্ষে সোচ্চার হওয়ার অনুরোধ রাখছি।
এই সহস্রাব্দের শুরু থেকেই যুব সম্প্রদায় গত শতাব্দীর ‘জেনারেশন ওয়াই ১৯৮০-১৯৯৭’-এর হাত ধরে ‘ডিজিটাল’ জীবনধারায় অভ্যস্ত হওয়ামাত্র আগেকার ‘অ্যানালগ সাউন্ডট্র্যাক’-এর স্থলে ‘ডিজিটাল সাউন্ডট্র্যাক’-সমৃদ্ধ সংগীতবিশ্বের নাগরিক হয়ে গেল। ফলে আগেকার সাউন্ডট্র্যাকের মিউজিককে পেছনের সারির দিকে চলে যেতে দেখা গেল। ছোটোদের ও তরুণদের জীবনে ভিডিয়ো গেমস, ই-মেল, ইন্সট্যান্ট মেসেজিং, মিউজিক ডাউনলোড, মুভি রেন্টাল, কেব্ল-টেলিভিশন আর ব্লগ ঢুকে পড়ল বেশ জোরেশোরেই। কাজে কাজেই, আগে রেডিয়ো বা টিভি-র মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পদ্ধতিতে পাঠানো খবরাখবর দেওয়া এবং গান শোনাবার যে ব্যবস্থা ছিল সে-দুটির আবেদন কমতে দেখা গেল।
১৯৯৮ সালে বিশ্ব ওয়েব-ওয়ার্ল্ডের অবিসংবাদিত নেতা ‘গুগল’ এসে চোখের পলকে প্রযোজক ও ভোক্তাকে প্রায় মুখোমুখি নিয়ে আসে। দুনিয়ার সব ওয়েবসাইটের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বের এক বিলিয়ন নেটবন্ধুদের ফাইল-শেয়ারিঙের প্রযুক্তির জালে জড়িয়ে জগতের ঘরে ঘরে ডেস্কটপ এবং ল্যাপটপের ভেতরে কোটি কোটি গৎ ও গানের অডিয়ো-ভিডিয়ো লাইব্রেরি সৃষ্টি করে বলতে গেলে – হার্দিক সংগীতকে হান্ড্রেড পার্সেন্ট যান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে এই দানবিক সার্চ-এঞ্জিনটি একাই।
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সার্চ-এঞ্জিন হিসেবে স্বীকৃত গুগল গানের ভুবনে নেতৃত্ব অর্জনে প্রেরণা পায় বিশেষ একটি ভোক্তা সম্প্রদায়ের কাছে। গোষ্ঠীটির সামাজিক অভিধা ‘সিঙ্গল প্যারেন্ট’, বিশেষত ‘সিঙ্গল উইম্যান’। লক্ষণীয় যে জেনারেশন ‘ওয়াই’-এর গানের শ্রোতাদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, যার একটা বড়ো কারণ হল পঁচিশ থেকে চল্লিশ  বছরের ‘একলা-নারী’র সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। প্রধানত এদের ভেতর থেকেই ‘সিঙ্গল উইম্যান’ হিসেবে পরিচিত সামাজিক গোষ্ঠীটি দেখা দিচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন নতুন চাহিদা নিয়ে। ‘সিঙ্গল প্যারেন্ট’-এর হার বিস্ময়কর রকম বেড়ে যাওয়ার কারণ – সমৃদ্ধ সমাজে বিবাহবন্ধনের অটুটতা হাস্যকর বলে পরিগণিত হওয়া। প্রতীচ্যের এই প্রভাব বাংলাদেশেও দ্রুত বর্ধমান।
‘সিঙ্গল প্যারেন্ট’ ছাড়াও একালের নাগরিকদের পরম আশ্রয়স্থল হল এমপি-৩ এবং এমপি-৪ ফাইলের যথাক্রমে ডিজিটাল অডিয়ো কিংবা ভিডিয়ো মিউজিক – যেসবের প্রধান প্রোভাইডারের ভূমিকায় সময়মতো আবির্ভূত হল গুগল। এমনকি সংগীতে তাদের পেশাদার অবস্থানকে সংহত করে ইন্টারনেট-বিশ্বে নেতৃত্ব বহাল রাখার উদ্দেশ্যে সংস্থাটি ‘গুগল মিউজিক্যাল সার্ভিস’-শীর্ষক বিশেষ একটি সেবাকেন্দ্রও খুলেছে ২০০৯ সালে এবং এর তৎপরতা দ্রুতগতিতে বাড়িয়ে চলেছে।
গুগলের এই ‘সংগীত পরিষেবা’কে সময়মতো বলছি এ কারণে যে প্রতীচ্য বিশ্বে দিবারাত্রি বিভিন্ন মিডিয়ায়, বিশেষত টেলিভিশনে, সংবাদ পরিবেশন চলতে থাকায় মানুষ হয়ে উঠেছিল তিক্তবিরক্ত। কারণ মিডিয়ার উনুনে রান্না খাবার ক্রমশ অখাদ্য জাঙ্ক ফুডেরও কেরিকেচার হতে শুরু করেছে। সেখানে সবকিছুই হয় কেবল কর্ণগোচর, মর্মদোসর হয়ে ওঠে না কিছুই। মনে দাগ কাটার আশা প্রতিভাত হয় সুদূরপরাহত।
মিউজিককে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে ঘরে এনে দিল কম্পিউটার আর তার সফ্টওয়্যার মোডেম। এখন আরও হাতের মুঠোয় পুরে দিয়েছে ওয়্যারলেস মোডেম। ১৯৯৮ সালে পি-সি আর পোর্টেবল এমপি-৩ এসে গেলে জনসাধারণের প্রায় বিনা খরচায় নিজের মনের মতো গান শোনবার পথ খুলে যায়। শ্রোতারা ফাইল শেয়ারিং করতে থাকলে কনজিউমারিজমের ধারা সম্পূর্ণ পাল্টাতে শুরু করে। মিউজিক কোম্পানি বাজার ধরতে প্রলোভন দেখাতে থাকে। যেমন ‘আই-টিউন’-এ ঘরে বসেই আড়াই কোটি গান শোনার সুযোগ এনে দেয় অ্যাপেল।
ইন্ডাস্ট্রির নতুন গতিপ্রকৃতিতে রেকর্ড-লেবেলের বিক্রির হার দ্রুত কমছে। সিডি-র দাম মিউজিক-শপে যখন ২৫ ডলার, তখন অন-লাইনে মাত্র ২ ডলারেই সেই গান পাওয়া যায়। স্যাম্পলার পাওয়া যায় ফ্রি-ও। এতদিন ডিস্ক জকিরা গান শোনালেও প্রায়ই গায়কগায়িকাদের নাম বা বৃত্তান্ত এবং রেকর্ড কোন্ লেবেলের সে-সব প্রয়োজনীয় তথ্য জানার তেমন ব্যবস্থা ছিল না। এখন ডাউনলোড করলে সবই পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। হালের ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার সেলফোন কোম্পানিগুলির বিপণিত প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে মোডেমের তেলেসমাতি গ্লোবাল মিউজিক্যাল এন্টারটেইনমেন্টটাকে যেন অপার আনন্দের এক বিনিপয়সার ভোজেই রূপান্তরিত করে দিয়েছে।
গান বিক্রি বাড়াবার জন্য আগে যেসব মিউজিক ক্রিটিক বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করত তারা এখন প্রায় বেকার। গান শোনানো এবং শোনার কালচার এখন কোনও ট্রেনারের শিক্ষাধীন ডিসিপ্লিন নয়, অশিক্ষিত কনজিউমারদেরই ইচ্ছাধীন ব্যাপার। তবুও ল্যাপটপ, আইপড বা এমপিথ্রি-র মাধ্যমে এন্তার গান অনায়াসে শোনানোটাই সবাইকে তৃপ্ত করবে না। তার থেকে উন্নতমানের ক্রোমাটিক সাউন্ডের গান শোনার আগ্রহে যাদের এখনো ভাটা পড়েনি, তারা আরও ভালো যন্ত্রের মদির ধ্বনির আশায় নিশ্চয়ই পথ চেয়ে অপেক্ষা করবে।
তাই বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর নজর সেদিকেও থাকবে বইকি। একটা নতুন ‘জাগরণ’ যা বিগত শতাব্দী তামাদি না-হতেই টফলারের হাত ধরে উপস্থিত হয়েছিল, সেটি ছিল একটি পোর্টম্যান্টো-ওয়ার্ড বা জোড়কলম শব্দ ‘প্রসিউমার’। প্রডিউসার ও কনজিউমার শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত শব্দটি যুগোপযোগী পরিভাষা হিসাবে সংগীতগঞ্জের সকল গলিঘুঁজি-অন্ধিসন্ধির চাহিদাদিও উদ্যোক্তা পক্ষকে স্মরণ করিয়ে যাবে নিশ্চয়।
এদেশে আমাদের মতো কিছু গড্ডল এখনো গ্রামোফোন, ইপি, এলপি, স্পুল, টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করে। আমরা এখনো রেডিয়োতে, বিশেষত এফএম-এতে গান শুনি, টেলিভিশনে নাচগান দেখাশোনাও ছাড়িনি। এসব খোঁয়ারি আমরা উপভোগ করি – ওয়াকম্যান, আইপড, ডিভিডি, এমপিথ্রি প্রভৃতির দ্রুত অনুপ্রবেশের পরেও। ঘরে ঘরে ‘হোম থিয়েটার সিস্টেম’ গড়ে তোলার পরেও – ফাইভ-ইজ-টু-ওয়ান সাউন্ড ব্লাস্টার সমৃদ্ধ পিসি-তে গান শোনার ব্যবস্থা আমাদের সমাজে কমছে না।
কারণ ডেস্কটপ-ল্যাপটপ আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। গান শোনার জন্য এদের আসঙ্গ ছেড়ে ক্ষণেকের তরেও অন্য যন্ত্রের অঙ্গনে যেতে মন চায় না। মূলে ১৯৯০-এর দশকে ইন্টারনেট বিপ্লব শুরু হবার কারণেই বাণিজ্যিক মিউজিকের পরিস্থিতি ওলট-পালট হতে থাকে। সংগীতের বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো হাইব্রাউ কালচারকেও বাগে আনবার চেষ্টা করবে সম্ভবত আমাদের মতো অতীত-আর্তজনের জন্যেই।
অ্যাংলোস্যাক্সন রক মিউজিক এখন করণশালা ছেড়ে শয়নশালাতে বসে কম্পোজ করাই সহজ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে রকব্র্যান্ডের মতো অন্য সব জাতের মিউজিকও আজ ঘরে বসেই করা সম্ভব। ইন্টারনেটে মিউজিকের ফাইল লোড করে দেশের কি বিদেশের বিভিন্ন শহরে বসে একটা রক গ্র“প তাদের ব্যান্ড তৈরি করতে পারে। গিটার, বেস গিটার, ড্রাম, অন্যান্য বিটযন্ত্র এবং ভোকালিস্ট নিজের আস্তানায় বসে মিউজিক তৈরি করে তাদের স্টুডিয়ো-সাইটে পাঠিয়ে দেয়। সবার মিউজিক একত্রিত করে সফ্টওয়্যার ও হার্ডওয়্যারে রাখা হয়। স্টুডিয়ো থেকে সাউন্ড মিক্স করে মিউজিক-মেকিঙের সম্পূর্ণ কর্মই এভাবে সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে। হলে পরে সেই মিউজিক ই-মেইলে ‘সেন্ড’ও করা যায়, সিডিতে ‘বার্ন’ও করা যায়, অন-লাইনে ‘সেল’ও করা যায়।
ভারতের প্রখ্যাত শল্যচিকিৎসক ও সংগীত বিশেষজ্ঞ ডা. সমীরকুমার গুপ্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রযুক্তিপুষ্ট সাম্প্রতিক সংগীতের এরকম বিশ্বায়নের ওপর সংক্ষেপে বেশ স্বচ্ছ আলোকপাত করেছেন :
‘গত শতকের শেষ দশকে কলকাতায় কলেজ-কালচার থেকে ব্যান্ড মিউজিক সিন্ডারেলার মতো উঠে এসে অল্পবয়সী শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আদৃতি লাভ করেছে। প্রথম দিকের একটি গ্র“প ‘মিডাস টাচ’ কলকাতায় রক মিউজিক বাজাত ও কম্পোজ করত। তাদের শিল্পীরা – রাজীব, চার্লি, বাপি, রাজা, সুমিত, অমিত, আনন্দরূপ, মিলি এখন দেশবিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আনন্দরূপ এখন কানাডার ক্যালগ্যারি থেকে একটা নতুন দল করে মিউজিক কম্পোজ করছে। তার সঙ্গী শিল্পীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইংল্যান্ডের নরফোকে, কানাডার নানা শহরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে। তাদের সৃষ্ট রক মিউজিক পৃথিবীব্যাপী ইন্টারনেটে শোনার যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে কেনার সুযোগও। আমি এখন বাড়িতে বসেই পিসি-তে তাদের পারফরমেন্স দেখতে ও শুনতে পাই। বোঝা যাচ্ছে মিউজিক পরিবেশন ধনতান্ত্রিক রূপ ছেড়ে গণতান্ত্রিক রূপ নিতে শুরু করেছে।’ [পৃ. ৩১২-৩১৩, মিলেমিশে, শারদীয় সংখ্যা ১৪১৬, কলকাতা]।
ষোলো
ইলেকট্রনিক টেকনলজি কিংবা বৈদ্যুতিন প্রযুক্তির মধ্যে কমপিউটারই প্রথম জীবন্ত সংগীতে অনুপ্রবেশ শুরু করেছিল যান্ত্রিক মৃত সংগীত দিয়ে – এবং সেটা উনিশ শ সত্তরের দশক থেকেই। শুরুটা ছিল একান্তই কল্যাণকর। মূলত কমপিউটারই সংগীতের নিত্যসঙ্গী তানপুরা-তবলাকে স্বয়ংক্রিয় করে দিয়েছিল। প্রথমে এল ইলেকট্রনিক ‘সুরপেটি’ কিংবা ‘শ্রুতিবক্স’। সেটা রূপ নিল হালের স্কেল-বাঁধা বৈদ্যুতিন তানপুরার – যা সুইচ টিপলেই আপনা-আপনি বাজতে থাকে শিল্পীর কাক্সিক্ষত স্কেলে – ভ্রমশূন্য যাথাযথ্য বজায় রেখে।
পরপরই এল ইলেকট্রনিক তবলা – ‘লহরা’ এবং ‘তালমালা’র সাজে। দাদরা-কাহারবা-তেওড়া-রূপকড়া যে-কোনও নির্দেশিত তালে এবং নির্ধারিত লয়ে বাজতে থাকলো নির্ভুল যান্ত্রিক যাথার্থ্য নিশ্চিত করে। অভূতপূর্ব সুবিধে পেল শিল্পী তার রেয়াজে। এসবের সৃষ্টি হল প্রধানত ভারতের ব্যাঙ্গালোরে এবং বাংলাদেশে এল বেশির ভাগ কলকাতা হয়ে। অনেকখানি স্বয়ম্ভর হতে পারল সংগীতশিক্ষার্থী। এমনকি অতি মূল্যবান সহায়তা পেল সংগীতের রূপকারও। অত্যন্ত হ্যান্ডি এসব বৈদ্যুতিন বাদ্যযন্ত্র নানান কাজে আসে তাঁর, আসরে-মঞ্চে তো বটেই – এমনকি মুক্তাঙ্গনের অনুষ্ঠানেও, যেমন বনভোজনের।
কিন্তু রোমাঞ্চকর সেই প্রাথমিক পর্বে কেউ লক্ষ করল না যে কল্যাণের বানানো সেই ফোকরটি দিয়ে অকল্যাণ দেখল নানান ধরনের ফাঁক। সৃষ্ট মৌলিক ফাঁকটি ছিল – ভারতবর্ষীয় গুরুমুখী চারুশিল্প সংগীতের আবহমানকাল থেকে চলে আসা অবিকল্প ‘তালিম’-নির্ভর গুরু-শিষ্য পরম্পরার ‘ভার্টিক্যাল’ বা ‘পূর্বাপর’ ধারাটি আর নির্বিঘ্ন রইল না। তার পাশাপাশি সৃষ্ট হল অসংখ্য ‘হরাইজন্টাল’ বা ‘সমান্তরাল’ ধারা।
এদেশীয় সংগীতের আদ্যন্ত প্রবহমান একক ওই ‘উল্লম্ব’ ধারাটিতে ভেজাল মেশানোর উপাদানস্বরূপ এসব ‘পার্শ্বধারা’ জোগান দিল কারা? দিল বিশেষত কমপিউটার-আর-টেলিফোনের মিলনের ফলে জন্মানো ‘ইন্টার নেটওয়ার্ক’ ওরফে ইন্টারনেট। এর ফলে মুখ্যত যে-হুমকিটির সৃষ্টি হল, বরং ক্ষতিটির সূচনাই ঘটে গেল – সে হল সংগীত-নামক প্রধানত হৃদয়ের সম্পদটি হতে চলল প্রধানত মগজের ঐশ্বর্য। কারণ ইলেকট্রনিক ওয়ার্ল্ড বা বৈদ্যুতিন বিশ্বটি যতখানি  মস্তিষ্কসর্বস্ব, ততখানি হৃদয়বর্জিতও। আজকের বিশ্বের হৃদয়ের বেদনার চেয়ে বেশি মস্তিষ্কের প্রেরণা দ্বারা শাসিত জেনারেশনগুলি
আন্তর্জাতিক পরিভাষায় জেনারেশন X, Y, Z এবং A নামে পরিচিত। এই জনতাত্ত্বিক বর্গীকরণটি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক দেশটির নিজের প্রেক্ষাপটে উদ্ভাবিত এবং  প্রবর্তিত হলেও, বিশ্বায়নের নেতা হিসেবে মার্কিন প্রভাবেই বর্গবিন্যাসটি আজ সমগ্র বিশ্বময় প্রচলিত।
সবশেষে জেনারেশন আলফা বা A (১০১০-)। এ প্রজন্মটির নামকরণের ধারাবদলকে অপরিহার্য বলতে হয়। কারণ XYZ-এর সঙ্গে ল্যাটিন বর্ণমালা শেষ হয়ে যাওয়াতে এবার গ্রিক অ্যালফেবেটের প্রথম অক্ষর Alpha-র A দিয়ে শুরু করাই তো সঙ্গত। গ্লোবাল জেনারেশন্স সম্পর্কে লিখিত ‘The ABC Of XYZ’-নামক গবেষণা গ্রন্থে গ্রন্থকার ম্যকক্রিন্ডল বলেছেন যে আসন্ন এই জেনারেশন অ ইতিহাসের সবচেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত প্রজন্ম হবে। তারা আগের সব জেনারেশনের চেয়ে স্কুলে যাবে আগে এবং পড়বে অনেক বেশি কাল যাবৎ। তারা হবে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বস্তুগতভাবে সরবরাহকৃত জেনারেশন – বলেছেন রিসার্চ ডিরেক্টার ম্যকক্রিন্ডল। ‘গুগল কিড’-অভিহিত এই প্রজন্মকে গড়ে তোলা হবে প্রযুক্তি এবং ভোগবাদের জগতে। তবে এদের আগলে রাখতে হবে, যাতে এরা এদের আগের জেনারেশন জেডের মতো অমূল্য শৈশবটি সম্পূর্ণ হারিয়ে না-ফেলে।
জেনারেশন ওয়াই ও জেডের ভোগবাদী বৈশিষ্ট্য মনুষ্যপ্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবণতাকে ক্যাশ করে হৃৎপিণ্ডের সংগীত-শীর্ষক চারুশিল্পটিকে মাথামুণ্ডুর কারুশিল্পে নামিয়ে নিয়েছে। কারণ মাতৃস্তন্যস্বরূপ কমপিউটার-পণ্য পান করা জেনারেশনটি ঠিকই বুঝেছিল যে লাইভ মিউজিক থেকে ডেড মিউজিক সৃষ্টি সোজা ও সস্তা এবং সেজন্যেই বেশি মুনাফাদায়ী। যথা দশটা যন্ত্রসহ দশজন যন্ত্রী জোগাড় করে খাটানোর চেয়ে ইলেকট্রনিক কি-বোর্ড আর তার প্লেয়ারটিকে এনে দশভাগের একভাগ দামে একই পেটি থেকে বেহালা, সেতার, সরোদ, বাঁশি, ক্ল্যারিওনেট, অর্গ্যান, পিয়ানো, ম্যান্ডোলিন, সানাই, এমনকি তারসানাইয়ের বদলি হিসেবে সরোলিন ইত্যাদি যাবতীয় বাদ্যযন্ত্র দিয়ে মুহূর্তে গান রান্না করে মিডিয়া মারফত সমগ্র বিশ্বকে খাইয়ে দেওয়া সোজাই তো। কথা শুধু এই যে সৃষ্ট ও পরিবেশিত এই সংগীতটি হবে মৃত ধ্বনির। তাই তার স্বাদও হবে মরা মাছের মতোই। হবেই তো। ইন্সট্যান্ট কফিতে কি পারকোলেটারের কফির স্বাদ প্রত্যাশিত?

সতেরো
এই প্রাণবান আর প্রাণহীন সংগীত সম্পর্কে আমার নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ছোট্ট একটি নজির দিচ্ছি। ইউনেস্কোর হেরিটেজ সংরক্ষণ প্রোগ্রামে ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার পপ-সম্রাজ্ঞী ঊষা উত্থুপের স্টুডিয়ো ভাইব্রেশন্সে যন্ত্রসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি পণ্ডিত ভি. বালসারার সংগীত-আয়োজনে আমার কণ্ঠে রেকর্ডিং হচ্ছিল ‘ভ্যালু অ্যাডেড রিপ্রোডাকশন অফ লং লস্ট মেলডিজ’। আমি তখন ইলেকট্রনিক মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট সম্পর্কে বেশি কিছু জানতাম না।
একদিন, কিংবদন্তি বেহালা-বাদক পরিতোষ শীল তনয় সমীর শীল স্টুডিয়োতে পৌঁছাতে দেরি করাতে বালসারাদা কি-বোর্ড প্লেয়ার, সুবর্ণ যুগের অমর সুরকার দুর্গা সেন তনয় প্রশান্ত সেনকে বললেন Ñ কী আর করা, প্রথম গানের বেহালার পিসটা তুমি কি-বোর্ডেই বাজিয়ে দাও। অপ্রত্যাশিত চান্সটি পেয়ে নবীন বাদক প্রশান্ত তার নতুন কেনা দামি যন্ত্রে চটপট সংশ্লিষ্ট ক্যাপসুলটি পুরে দিয়ে বেহালার আওয়াজ বের করতেই অ্যাকুস্টিক ভায়োলিন-হাতে  দৌড়াতে  দৌড়াতেই  স্টুডিয়োতে ঢুকে পড়লেন প্রতীক্ষিত
বেহালাবাদক। সিনিয়র শিল্পী সমীর ইলেকট্রনিক ভায়োলিনের সিন্থেটিক ধ্বনি শুনে ক্ষেপে গিয়ে বালসারাসমীপে নালিশ পেশ  করলেন :
‘বালসারাদা, আপনার সামনে প্রশান্ত তার কি-বোর্ডে সিন্থেটিক বেহালা বাজিয়ে আমার অর্গ্যানিক বেহালাকে অপমান করলো কী কারণে?’
‘তোমার দেরির কারণে।’
‘তাহলে সে-ই বাজাক এই গানে।’
‘বেশি গর্ব কোরো না সমীরদা। তোমার চেয়ে ভালো বাজিয়ে দেবে আমার লেটেস্ট যন্ত্র।’
চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে হেঁকে উঠলো টগবগে তরুণ প্রশান্ত। বাহাসটা বালসারাদা উপভোগই করছিলেন বোধ হল। তিনি বললেন :
‘দুজনেই বাজাও। যারটা বেশি ভালো লাগবে সেটাই ‘টেক’ করবো।’
প্রথমে প্রশান্ত প্রেলিউডটা পুরোই বাজালেন তাঁর সদ্য হংকং থেকে আনা রোল্যান্ডের লেটেস্ট কি-বোর্ডে। তারপরে সমীর তাঁর অতি পুরাতন সনাতন বেহালাটায় ছড়ের প্রথম টানটা দিতেই সমবেত যন্ত্রীদলের সকলেই যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আর প্রশান্ত? মাথাটা হেঁট করে বেচারা খামুশ খেয়ে বসে রইল। বালসারাদার মন্তব্যটা ছিল অ্যাকাডেমিক :
‘প্রশান্ত দুর্দান্তই বাজিয়েছে। আসলে ডেড মিউজিকের ফেইট এমনি ট্র্যাজিকই হয় Ñ লাইভ মিউজিকের মুখোমুখি হলে।’
আমার পাদটীকাটি ছিল :
‘হৃদয়ের কাজ কেবল হৃদয়ই করতে পারে। মস্তিষ্কের কাজ করতে পারে ডস্-ও।’ (্গুগল্ তখনও অনাগত)।
এটা ছিল ডিজিটাল বিপ্লবের গোড়ার কথা, বরং বিশ শতকের শেষ দশকের একেবারে সূচনালগ্নের কথাটাই Ñ যখন প্রযুক্তি সবেমাত্র বাদ্যযন্ত্রের প্রাণবান যন্ত্রীপ্রণীত ধ্বনির বিকল্প হিসেবে সৃষ্টি করেছিল প্রাণহীন যন্ত্রপ্রণীত ধ্বনির Ñ যেমন কি-বোর্ডসৃষ্ট বেহালা-বাঁশি-ম্যান্ডলিন-সানাই ইত্যাদির। আর ভয়েস-প্রোসেসর, কমপ্রেসর, ইকোয়ালাইজার, লিমিটার ইত্যাদি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ছিল হার্ডওয়্যারের অংশস্বরূপ এবং কাজ করত ব্যয়বহুল সাউন্ডরেকর্ডিং স্টুডিয়ো বা ধ্বনিধারণ কর্মশালার বিশাল মিক্সার-কনসোলের সঙ্গে কেব্ল মারফত যুক্ত হয়ে ম্যানুয়েল কন্ট্রোলে, মানে হস্তসাধিত নিয়ন্ত্রণে। তাই প্রযুক্তির এসব মহার্ঘ প্রসাদলাভের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। ফলে টেকনলজির মূল্যবান উপহারের অপব্যবহারের আশঙ্কাও ছিল পরিমিত।

আঠারো
একুশ শতকের প্রথম দশকের সফ্টওয়্যার-বিস্ফোরণ ছুটি দিয়ে দিল শুধু সাউন্ড-রেকর্ডিস্টের রাজকীয় বিশাল মিক্সার-প্যানেলটিকেই নয়, মাস্টার-জাগলার কি-বোর্ডটিকেও। ধ্বনিধারণ-অলঙ্করণ-সংশোধন-ঘটিত যাবতীয় উপকরণই ঢুকে গেল পার্সনাল কমপিউটারে Ñ ফুটপাতের শরবতের মতো সস্তা পাইরেটেড-সফটওয়্যারের বদৌলতে। এককথায় মিউজিশিয়ানদের বিদায় করে দিল টেকনিশিয়ানরা। অন্যকথায় মিউজিশিয়ানপাড়া হয়ে গেল টেকনিশিয়ানপাড়া। সাউন্ড-রেকর্ডিং স্টুডিয়ো বা পেশাদার ধ্বনিধারণের কর্মশালা হয়ে গেল অ্যামেচার সংগীতরন্ধনের পাকশালা, যা স্বভাবতই এখন ঘরে ঘরে বিরাজ করে। ফাস্টফুডের মতো ঘরে প্রোসেস করা মিউজিক-ট্র্যাক স্টুডিয়োতে পৌঁছালে এবং ভোকালিস্ট এসে ভয়েস যোগ করে দিলে গান বিপণন করা চলে।
যদি প্রশ্ন করেন গানটি কার কণ্ঠস্বরে বিপণিত হল? উত্তর হবে অর্ধেক মানবিক কণ্ঠে, অর্ধেক বৈদ্যুতিন স্বরে। কারণ অনেক ফিফটিপার্সেন্ট বেসুরো-বেতালা কণ্ঠশিল্পীর স্বরকেও প্রায় হান্ড্রেডপার্সেন্ট সুরে-তালে এনে দিচ্ছে স্টেইনবার্গ, সোনার, প্রোটুল্স প্রভৃতি ইলেকট্রনিক অটো-টিউনার। এসব যন্ত্র এমনকি শিল্পীবিশেষের কণ্ঠবিশেষের টিম্বারবিশেষের জন্য লাগসই মাইকটিও বাছাই করে দিচ্ছে ভয়েস-ক্যারেক্টার ফাইন্ডার-নামক ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সাহায্যে। মনুষ্যকণ্ঠকে কমপিউটার হুবহু ‘কোকিলকণ্ঠ’ করে দিচ্ছে বৈদ্যুতিন বংশীর সঙ্গে বেটে দিয়ে, বলতে পারেন, ভর্তা বানিয়ে। মানুষের কণ্ঠের বদলে কোকিলের কণ্ঠ কোনও শ্রোতা শুনতে চায় কিনা জানি না, আমি তো সইতেই পারি না। কারণ চিরকালই সংগীত-গুরুগণ একবাক্যে অকারণ বলে আসছেন না যে সংগীতবিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ যন্ত্রটির নাম Ñ মনুষ্যকণ্ঠ।
বৈদ্যুতিন যন্ত্রের প্রশ্রয়ে বিপথগামী এমন একজন জননন্দিত কণ্ঠশিল্পীর কথা শুনি, যিনি এতই যন্ত্রাশ্রিত যে লাইভ পারফরমেন্স ভালো করতে পারেন না। আলামতটা কি ভালো? না, ভালো নয়। এমনকি ভালো ছিল না প্রথম জাগলারিটিও Ñ গানের কলিটি একবার রেকর্ড করে, সেটিকে প্রয়োজনীয় স্থানগুলিতে কেবল পেইস্ট করে দেওয়া। কেননা কণ্ঠশিল্পীকে প্রতিটি অন্তরা থেকে তো বটেই, কখনও-সখনও
আভোগ-সঞ্চারী থেকে গানটির মুখে ফিরতে হলেও, তিনি একই আবেগানুভূতি কিংবা আকুলিবিকুলির প্রভাব বা অভিঘাত নিয়ে ফেরেন না। সুতরাং এক বিশেষ ব্যাকুলতার আবেগে কণ্ঠনিঃসৃত গানের কলিকে আরেক বিশেষ বিহ্বলতার আবেশে সেঁটে দিলে তা শ্রোতার মনে যথোপযুক্ত ভাব বা রূপটি ফুটিয়ে তুলবে কী করে, তাঁর প্রাণে দোলা দেবে কী করে?
তাহলে প্রযুক্তি কি অভিশাপ? না, প্রযুক্তি আশীর্বাদ। তবে তার ব্যবহারটা হতে হবে সুবিবেচিত। নির্ভেজাল শিল্পীকে মনে রাখতে হবে যে তাঁর প্রযুক্তিপুষ্টির প্রয়োজন পরিমিত। অপরিমিত প্রয়োজনটা থাকবে কেবল ভেজাল শিল্পীর।  কারণ তাঁর বেসুরো গলাকে টেনে সুরে তোলা, বেতালা ছন্দকে টেনে ছন্দে ফেলা, এমনকি তালের লয়কেও টানা-হেঁচড়া করে জয় করার জন্য সকল রকম সফ্টওয়্যারই অপরিহার্য।
তিনি জানেন যে হার্ডডিস্কের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি তাঁর জন্য ব্লেসিং-আনলিমিটেড, যেহেতু তাঁর মতো অসিদ্ধ শিল্পীকে অর্ধসিদ্ধ শিল্পী বানিয়ে কিংবা Ñ ‘কিলায়কে কাঁঠাল পাকিয়ে’ Ñ বিপণনযোগ্য করে দিচ্ছে এসব সস্তা সফ্টডিস্কই। পূর্ণসিদ্ধির অভাব অনেকটা তো ঘটাচ্ছে ‘অ্যাকুস্টিক ট্রিটমেন্ট’বিহীন চারদেয়ালের ভেতরে হোম-মেইড মিউজিকট্র্যাকের নির্মিতি, এমনকি পরিস্থিতিবিশেষে তেমন নয়েজি পরিবেশে তড়িঘড়ি কণ্ঠধ্বনিধৃতিও।
বিপণনশীলতার এহেন উন্নতি ঘটছে সৃজনশীলতার ত্বরিত অবনতির বিনিময়ে। প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাজারে একাকার হয়ে যাচ্ছে এক ডজন নির্ভেজাল শিল্পীর সঙ্গে এক শত ভেজাল শিল্পী। এমন ‘গুণীতান্ত্রিক’ একটি শিল্পের এমনি ‘গণতান্ত্রিক’ হয়ে যাওয়া কি ভালো? যে-প্রযুক্তির বলে হেমন্ত ‘মুখোপাধ্যায়’ হতে পারব না, সে-প্রযুক্তির ছলে হেমন্ত ‘যুগোপাধ্যায়’ হওয়ার দরকার আছে কি?
রচনাকাল ২০১১

সূত্র :
১।    জাতক, ঈশানচন্দ্র ঘোষ অনূদিত, করুণা প্রকাশনী, ১৪০৮, কলকাতা।
২।    বাঙ্গালীর রাগসঙ্গীত চর্চা, দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায়, ফার্মা কেএলএম, ১৯৭৬, কলকাতা।
৩।    সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, ১৯০৭, কলকাতা।
৪।    লোকসঙ্গীত জিজ্ঞাসা, সুকুমার রায়, ফার্মা কে এলএম, ১৯৮৩, কলকাতা।
৫।    বাংলা সাহিত্যের একদিক/রচনা-সাহিত্য, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, ১৯৯৩, কলকাতা।
৬।    ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, উৎপলা গোস্বামী, দীপায়ন, ১৯৯০, কলকাতা।
৭।    ডা. সমীরকুমার গুপ্ত, মিলেমিশে, শারদীয় সংখ্যা, ১৪১৬, কলকাতা।
৮।    বাংলা গানের বিবর্তন, করুণাময় গোস্বামী, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩, ঢাকা।

Leave a Reply

*