logo

বাংলাদেশে পঞ্চাশের দশকের শিল্প ও শিল্পী

ন জ রু ল  ই স লা ম

Three Women_1 Oil on Masonite boarb 1955 Quamrul Hassan

Three Women_1 Oil on Masonite boarb 1955 Quamrul Hassan

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাস ছয় দশকের অল্প অধিক সময়ের। ১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদিন ও তাঁর কলকাতার সহযোগী শিল্পী-বন্ধুদের উদ্যোগে ঢাকায় সরকারি চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা থেকে এর আনুষ্ঠানিক শুরু। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী পাকিস্তান রাষ্ট্রের একেবারে শুরুতেই, বস্তুত মাত্র এক বছরের মধ্যে চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠা ছিল রীতিমতো একটি বিপ্লবী ঘটনা, তারপর আর দু-চার বছরের মধ্যেই এর পাশাপাশি (১৯৫০ সালে) সম্পূর্ণ ব্যক্তি-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা আর্ট গ্র“প নামের শিল্পীদের একটি নিজস্ব সংগঠন। ইনস্টিটিউটের প্রাণপুরুষ ছিলেন জয়নুল আবেদিন, আর্ট গ্র“পের মূল উদ্যোক্তা কামরুল হাসান। দুটো সংস্থার পরিপূরক আয়োজন প্রথম থেকেই ঢাকার চারুশিল্প আন্দোলনকে অত্যন্ত অর্থবহ ও বেগবান করেছে সন্দেহ নেই।
চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সময় এর মূল উদ্যোক্তা জয়নুল আবেদিন বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন এর সঙ্গে ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদার মতো শ্রদ্ধাভাজন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ও উদারমনা জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা সলিমউল্লাহ ফাহমীর মতো মানুষের সমর্থন নিশ্চিত করে। একইভাবে ঢাকা আর্ট গ্রুপ প্রতিষ্ঠার সময় কামরুল হাসান শিল্পী জয়নুল আবেদিনসহ অভিভাবক ও সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, অজিত গুহ, আবদুল গণি হাজারি, সরদার জয়েনউদ্দিন, মুনীর চৌধুরী, সানাউল হক, সিকান্দার আবু জাফর, আবদুল আহাদ, সৈয়দ নুর উদ্দিন, খান সারওয়ার মুর্শিদ ও অন্যান্যের মতো প্রগতিশীল অধ্যাপক, কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের। ঢাকা আর্ট গ্র“প একটি ব্যাপকভিত্তিক আধুনিক শিল্প সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এক বছরের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলে চৌত্রিশজন শিল্পীর দুশো চুয়াত্তরটি ছবি নিয়ে ঢাকা আর্ট গ্র“পের প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় (জানুয়ারি ১৯৫১)। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেছিলেন পূর্ব বাংলা (তখন এটাই ছিল প্রদেশের নাম) সরকারের উজিরে আলা জনাব নুরুল আমিন। এটি ছিল ঢাকার চিত্রকলা আন্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবল প্রভাব থাকলেও বছর না ঘুরতেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিকল্প পথ ধরতেই উদ্যোগী হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তাদের মাতৃভাষা বাংলার ন্যায্য মর্যাদার দাবিই এক্ষেত্রে মূল প্রেরণা ও শক্তি হিসেবে কাজ করে। উদারপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-শিক্ষকরাই এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি গণআন্দোলনে রূপ পেতে থাকে এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির মতো  মর্মান্তিক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ আন্দোলন প্রকৃত রূপ পেতে থাকে। এই আন্দোলনে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীদের নেতৃস্থানীয় বড় এক অংশের। সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র, যেমন আমিনুল ইসলাম, বিজন চৌধুরী প্রমুখ গোড়া থেকেই বাম ধারার রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে একাত্ম, দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, রশিদ চৌধুরী প্রমুখ একই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন, তাঁদের অন্য সতীর্থরাও তেমনভাবে বামপন্থী না হলেও নিশ্চিতভাবে উদার প্রগতিবাদী চিন্তাচেতনার অনুসারী ছিলেন। চারুশিল্পকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য ঢাকা আর্ট গ্র“পের দ্বিতীয় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল (মার্চ ১৯৫২)।
বাংলা ভাষা তথা সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি চিত্রকলার আধুনিক বা (এক অর্থে) পাশ্চাত্য শিল্পধারার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম শিল্পীসমাজ।
পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের (তথা পাকিস্তানের) রাজনৈতিক  মঞ্চে অতি দ্রুতলয়ে একাধিক দৃশ্যবদল ঘটেছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অগ্রণী রাজনৈতিক দল ইসলামী ভাবধারার মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ও  গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক যুক্তফ্রন্টের ক্ষমতা লাভ ও হারানো, মার্শাল ল ও সামরিক শাসনের প্রতিষ্ঠা – সবই এক দশকের মধ্যেই সংঘটিত হয়। এই পটভূমিতেই বাংলাদেশের চিত্রকলা আন্দোলন এগিয়ে যেতে থাকে। স্বভাবতই চিত্রকলার চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য নির্মাণে সমসাময়িক রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতি যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। পঞ্চাশের দশকের শিল্প ও শিল্পীদের সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনায় দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা গুরুত্ববহ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশও প্রণিধানযোগ্য। কেননা প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও ঢাকা তথা পূর্ব পাকিস্তানেও আন্তর্জাতিক, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মোটেও উপেক্ষণীয় ছিল না। জাপান বা চীনসহ প্রাচ্যদেশীয় রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রভাব পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত তেমন লক্ষণীয় হয়ে ওঠেনি।
পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশের চিত্রকলাবিষয়ক আলোচনায় আমরা দুটো প্রসঙ্গ বিবেচনা করতে পারি। এক, সচরাচর এরকম আলোচনায় যা করা হয়, অর্থাৎ ওই দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের এই দশক, এমনকি পরবর্তী সময়েও তাঁদের শিল্পচর্চা নিয়ে আলোচনা এবং দুই, শুধুমাত্র ওই দশকে সৃজিত ও প্রদর্শিত যে-কোনো প্রজন্মের শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা।  পঞ্চাশের দশককে এদেশের চিত্রকলার আধুনিক পর্বের ভিত্তি বলা হয় এবং তাতে পঞ্চাশ প্রজন্মের শিল্পীদের পাশাপাশি, এমনকি বলা সংগত হবে তাঁদের আগেই, পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের ভূমিকা ও অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময়ে আমরা বিষয়টি তেমনভাবে উল্লেখ করি না। উল্লেখ্য, আমার বর্তমান আলোচনাটি শুধুমাত্র পঞ্চাশের দশকে সৃজিত ও প্রদর্শিত শিল্পকর্মের ওপর সীমিত রাখব।
পঞ্চাশ-পূর্ব প্রজন্মের আধুনিক ধারার শিল্পীদের মধ্যে অবশ্যই অগ্রগণ্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, আনোয়ারুল হক ্এবং এস এম সুলতান। পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের সংখ্যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এঁদের মধ্যে মোহাম্মদ কিবরিয়া কলকাতা আর্ট কলেজের স্নাতক (১৯৫০)। তিনি ঢাকা আসেন ১৯৫১ সালের প্রথম দিকে। ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের পঞ্চাশের দশকের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন প্রথম ব্যাচের আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমান (তৃতীয় বর্ষের ছাত্রাবস্থায় ১৯৫০ সালে ইউরোপ চলে যান), সৈয়দ শফিকুল হোসেন, বিজন চৌধুরী (পরে কলকাতা চলে যান) প্রমুখ, দ্বিতীয় ব্যাচের আবদুর রাজ্জাক, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর ও কাইয়মু চৌধুরী এবং পরবর্তী ব্যাচসমূহের দেবদাস চক্রবর্তী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, কাজী আবদুল বাসেত, নিতুন কুন্ডু প্রমুখ। এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন ইমদাদ হোসেন, জুনাবুল ইসলাম, কাজী আবদুর রউফ, মুবিনুল আজিম, শাহতাব প্রমুখ।
জয়নুল আবেদিন (১৯১৪-১৯৭৬) ছিলেন কলকাতা আর্ট কলেজের অত্যন্ত কৃতী ছাত্র, চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকেই তিনি তাঁর ‘৪৩-এর দুর্ভিক্ষ’ চিত্রমালার মাধ্যমে ভারতখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তৎকালীন উপমহাদেশীয় চিত্রকলায় তাঁর এসব বাস্তবধর্মী প্রকাশবাদী কাজ ছিল রীতিমতো মোড় ঘোরানো শিল্পকর্ম। চল্লিশের দশকের পরবর্তী সময়ে অবশ্য তিনি মূলত নিসর্গভিত্তিক বাস্তবধর্মী সাধারণ মানের ছবি এঁকেছেন। কিন্তু তাঁর কাজে বড় রকমের বাঁক আসে ১৯৫১-৫২ সালে তাঁর ইংল্যান্ড অবস্থানের সময়। সেখানে তিনি স্লেড স্কুল অব আর্টে শিল্পচর্চা করেন, লন্ডনে নিজের আঁকা ছবির একক প্রদর্শনী করেন। এই প্রদর্শনীর জন্য তিনি মেমোরিভিত্তিক কিছু অসাধারণ জলরং ছবি আঁকেন, যা কৌশল ও শৈলী উভয় মানদণ্ডে অভিনবত্ব ও চমৎকারিত্ব দাবি করেছিল। ড্রইংয়ের শক্তিমত্তা, জলরং টেকনিকের সাবলীলতা ও বিষয় নির্বাচনে সামান্যীকরণ – সব মিলিয়ে তাঁর ‘বৈশাখী ঝড়’, ‘মই দেয়া’, ‘বিদ্রোহী গরু’ ইত্যাদি চিত্রকর্মকে (১৯৫১) আধুনিক ও পূর্ব ও পশ্চিমের আশ্চর্য সমন্বয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে তাঁর আরো তাৎপর্যপূর্ণ আধুনিক পর্বটি আমরা পাই তাঁর বিলেত থেকে ফিরে আসার অব্যবহিত পরে, ১৯৫৩-৫৫ সময়কালে। প্রবাসে অবস্থানকালে পাশ্চাত্যের চিত্রকলা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনার পর তাঁর নিজের এমন উপলব্ধি হয়েছিল যে, বিশ্ব শিল্পমঞ্চে অবদান রাখতে হলে স্বদেশের শিল্পকলার লোকঐতিহ্য ও জীবননির্ভর শিল্পশৈলী উদ্ভাবনে মনোযোগী হওয়া আবশ্যক। এরকম উপলব্ধি থেকেই লোকজ শিল্পশৈলীকে উপজীব্য করে  জয়নুল গোয়াশ ও তেলরং মাধ্যমে আঁকেন তাঁর অবিস্মরণীয় চিত্রমালা, ‘পাইন্যার মা’, ‘বঁধু’, ‘গুণটানা’, ‘দুই রমণী’, ‘গ্রাম্য মহিলা’ ইত্যাদি ছবি (১৯৫৩-১৯৫৫)। একই সময়ে তিনি আরো একধাপ এগিয়ে সৃষ্টি করেন তেলরং ছবি ‘মুখ চতুষ্টয়’ (১৯৫৩)। মুখের আদলের অত্যন্ত সরলীকৃত উপস্থাপন, মুখের রং ব্যবহারে  পরাবাস্তবতা ও ফর্মে জ্যামিতিক আধুনিকতা, সব মিলিয়ে এই শিল্পকর্মটি আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করতে আগ্রহী। জয়নুলের এই স্টাইল উপমহাদেশের তৎকালীন শিল্পধারা থেকে ভিন্নতর ছিল, একই সঙ্গে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য শিল্পশৈলী থেকেও তা দূরত্ব বজায় রেখেছে। দুঃখ হয়, এই ধারাটি জয়নুল-পরবর্তী সময়ে অব্যাহত রাখেননি বা এটিকে ভিত্তি করে আরো এগিয়ে যাননি।
আনোয়ারুল হক (১৯১৮-৮০) একপর্যায়ে চমৎকার জ্যামিতিক ফর্মভিত্তিক অল্প কিছু বিশুদ্ধ বিমূর্ত ছবি এঁকেছেন।
চল্লিশের দশকের শিল্পী কামরুল হাসান (১৯২১-১৯৮৮) পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই অত্যন্ত আধুনিক ধারার শিল্পী। ১৯৫০ সালে তেলরঙে আঁকা তাঁর ‘মাছ ধরা’ ছবিটিতে দুই পল্লী কিশোরের দেহের অতিরঞ্জিত গড়ন ও   গাত্রবর্ণের সাহসী পরাবাস্তবতা, চোখের আদলে বঙ্গীয় লোকজ মোটিফের ব্যবহার, সবকিছু মিলিয়ে এক চমৎকার আধুনিকতা। ১৯৫৭-৫৮-র দিকে তিনি নারী অবয়ব আঁকেন বাংলার পুতুলের ফর্ম ব্যবহার করে। ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা আর্ট গ্র“পের দ্বিতীয় প্রদর্শনীর ক্যাটালগের প্রচ্ছদে ব্যবহৃত কামরুল-অঙ্কিত ব্রাশ-ড্রইং ‘মা’ কিংবা অন্য একটি ছবি ‘প্রতীক্ষা’ অত্যন্ত আধুনিক কাজ। তাঁর বিখ্যাত ‘তিন কন্যা’ ছবিটির প্রথম সংস্করণটি ১৯৫৫ সালে আঁকা খুবই আধুনিক আঙ্গিকের। অনেকটা ইউরোপীয় ফভিস্ট চিত্রশৈলীর সমান্তরাল। ‘মা ও শিশু’ শীর্ষক টেম্পেরায় আঁকা চিত্রটিতে ব্যাপকভাবে তিনি ফর্ম ভেঙেছেন। উল্লেখ্য, কামরুল তখনো বাংলার বাইরে যাননি। পরবর্তীকালে প্রায় তিন দশক তিনি অনবরত ফর্ম ভাঙা-গড়ার নিরীক্ষা অব্যাহত রেখেছেন।
সফিউদ্দীন আহমেদও (১৯২২) চল্লিশের দশকের শিল্পী। তিনি ওই দশকে মূলত নিসর্গ ও জীবনভিত্তিক বাস্তববাদী শিল্পকর্ম সৃজন করেছেন। মধ্য-পঞ্চাশ পর্যন্ত প্রায় একই ধারা অনুসরণ করেন, কিন্তু তারপর কিছুটা স্টাইলাইজেশনে মনোযোগী হন। অবশ্য তিনি ব্যাপকভাবে বদলে যান ১৯৫৬-৫৮ সালে বিলেতে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণলাভের সময় থেকে। ছাপাই মাধ্যমের দক্ষ শিল্পী ছিলেন তিনি আগেই, লন্ডনের ট্রেনিং বিশেষ করে স্ট্যানলি হেইটারের শিষ্যত্ব তাঁকে বদলে দেয়। এচিং, অ্যাকুয়াটিন্ট ইত্যাদি মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত আধুনিক রীতির সম-বিমূর্ত, অনেকটা রেখাপ্রধান জ্যামিতিক আঙ্গিকের, নিজস্ব স্টাইল নির্মাণ করেন। স্মরণীয় কাজ, ১৯৫৭-৫৮ সালের ‘জাল, নদী, নৌকা’ সিরিজ ছাপচিত্রগুলো। ১৯৫৯-এর জুলাই মাসে যখন তিনি লন্ডন থেকে ঢাকা ফেরেন, দেশে তখন আইয়ুব খানের মার্শাল ল শাসন। সফিউদ্দীন আহমেদ ইতোমধ্যে অত্যন্ত উঁচু মানের সম-বিমূর্ত ও প্রায় সম্পূর্ণ বিমূর্ত আঙ্গিকের ছবি আঁকছেন, সামরিক শাসকদের তাতে কোনো আপত্তি থাকে না। সফিউদ্দীনের এ-জাতীয় আধুনিক ছবি ঢাকার পঞ্চাশের দশকে সাধারণের খুব একটা দেখার সুযোগ হয়নি। তবে তাঁর সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের সে-সুযোগ হতো। ইতোমধ্যে অবশ্য ঢাকার শিল্পাঙ্গন ইউরোপ-আমেরিকার তৎকালীন শিল্পশৈলীর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করেছে।
এস এম সুলতান (১৯২৮-১৯৯৩) বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালে জীবনবাদী তেজস্বী শিল্পী হিসেবে বিপুল খ্যাতি লাভ করেছেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তিনি ছিলেন ভ্যান গগীয় শৈলীর ইম্প্রেশনিস্ট ধারার নিসর্গ শিল্পী। বলা যায়, পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশে তাঁর পরিচিতি বেশ সীমিতই ছিল এবং তাঁর তখনকার কাজের নমুনাও খুব একটা দেখা যায় না।
সাল-তারিখের নিরিখে সংক্ষেপে বলা যায়, এদেশের আধুনিক ধারার শিল্পচর্চার পথিকৃৎ অবশ্যই জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান। সফিউদ্দীন আহমেদ যখন তাঁর নতুন শিল্পশৈল্পী নিয়ে বিদেশ থেকে ফিরে আসেন (১৯৫৯ সালের জুলাই মাসে), ততদিনে পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত তরুণ শিল্পীরা ইউরোপ-আমেরিকার আন্তর্জাতিক র্শিল্পশৈলী এদেশে বেশ জোরালোভাবেই প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান পাশ্চাত্য আধুনিক শিল্পশৈলীর দ্বারা তেমন প্রভাবিত না হয়ে নিজস্ব চিন্তাচেতনা দিয়ে এক ধরনের বঙ্গীয় আধুনিকতা প্রতিষ্ঠা করেন। লোকজ শিল্প-ঐতিহ্য এক্ষেত্রে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাছাড়া তাঁদের ছবিতে যে আবেগ ও প্রাণের ছোঁয়া ছিল তা শিল্পবোদ্ধা ও সাধারণ উভয় ধরনের দর্শককেই মুগ্ধ ও ভাবিত করতে সমর্থ হয়েছিল। তাঁদের তখনকার কাজ কালোত্তীর্ণ নিঃসন্দেহে।
পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের (পাশ্চাত্য আধুনিক চিত্ররীতি প্রভাবিত) নিরীক্ষাধর্মী শিল্পকর্মকে অনেকে বাংলাদেশের আধুনিক ধারার শিল্পের সূচনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে আগ্রহী। পঞ্চাশের মেধাবী শিল্পীদের বেশ কয়েকজন দশকের শুরু থেকেই চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকা যাবার সুযোগ গ্রহণ করেন। এঁদের মধ্যে সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হামিদুর রাহমান (১৯২৮-৮৮) দ্বিতীয় বর্ষ সমাপ্ত করেই ১৯৫০ সালে শিক্ষার্থী হিসেবে প্যারিস চলে যান, তারপর লন্ডন ও ফ্লোরেন্সে শিক্ষা গ্রহণ করে ১৯৫৬ সালে দেশে ফেরেন, পরে আবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান ১৯৫৮ সালে। বস্তুত হামিদই ঢাকা থেকে সর্বপ্রথম শিল্পশিক্ষার জন্য পশ্চিমে যান। জয়নুল আবেদিন প্রথম বিলেত যান ১৯৫১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে, মাত্র নয় মাসের জন্য। ভাস্কর নভেরা আহমেদ (১৯৩০-) বাংলাদেশে আদৌ শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেননি। তিনি প্রথম থেকেই (১৯৫০) লন্ডনে ভাস্কর্য শিক্ষালাভ করেন, পরে প্যারিস ও ফ্লোরেন্সেও। আমিনুল ইসলাম (১৯৩১-২০১১) ঢাকা থেকে স্নাতক হয়েই ১৯৫০ সালে বৃত্তি নিয়ে ইতালি যান, ফ্লোরেন্সে চিত্রকলা ও মোজাইকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফেরেন ১৯৫৬ সালে। হামিদ ও নভেরাও প্রায় কাছাকাছি সময়ে দেশে ফেরেন।
১৯৫৬-এর শেষ দিকে হামিদুর রাহমান এবং আমিনুল ইমলাম ঢাকায় নিজেদের একক চিত্র-প্রদর্শনী করেন। তাঁদের ইউরোপকালীন শিল্পচর্চার আধুনিকতার সঙ্গে ঢাকার শিল্পানুরাগীদের পরিচয় করান। হামিদ ও নভেরা একটি যৌথ প্রদর্শনী করেন ১৯৫৭ সালে। নভেরা তাঁর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করেন ১৯৬০ সালে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে। তার আগেই তিনি এবং হামিদুর রাহমান একাধিক বৃহৎ ম্যুরাল ও রিলিফ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন পাবলিক লাইব্রেরির দেয়ালে। মূলত জীবনভিত্তিক তাঁদের এসব কাজে ফর্ম ভেঙে নতুন ফর্ম নির্মাণের দৃষ্টান্ত ছিল। নভেরার ভাস্কর্য এদেশে আধুনিক ভাস্কর্যচর্চার পথিকৃৎ। হেনরি ম্যুর ও বারবারা হেপওয়ার্থের স্টাইলের চমৎকার সমন্বয় ছিল নভেরার ভাস্কর্যে। হামিদ ও নভেরা যৌথভাবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থাপত্য নকশা ও শৈল্পিক অঙ্গসজ্জার পরিকল্পনায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমিনুল ইসলাম ইউরোপ যাবার আগেই তাঁর শিক্ষানবিশি সময়ে বাস্তবধর্মী জলরং ও তেলরং কাজের জন্য পরিচিতি লাভ করেছিলেন, ইউরোপে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকালে মূলত কিউবিজম প্রভাবিত বেশ কিছু অসাধারণ কাজ করেছেন, যেমন ‘ফ্লোরেন্স’ (১৯৫৪), ‘রাখাল’ (১৯৫৪), ‘নারী ও কবুতর’ (১৯৫৫) ইত্যাদি। দেশে ফেরার পরও তাঁর এ-ধরনের শিল্পশৈলী অব্যাহত রাখেন ও ‘নৌকা’ (১৯৫৭) কিংবা ‘দুর্গত’ (১৯৫৯)-এর মতো স্মরণীয় ছবিগুলো আঁকেন। মোজাইক মাধ্যমটিকে তিনিই এদেশে পরিচিত করেন।
ইতোমধ্যে আবদুর রাজ্জাক (১৯৩২-২০০৫) ১৯৫৫ সালে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টারস ইন ফাইন আর্টস অর্জন করে ১৯৫৭ সালে দেশে ফেরেন। তিনিই প্রথম শিল্পী যিনি চিত্রকলায় স্নাতকোত্তরসহ বিদেশি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। রশিদ চৌধুরীও (১৯৩২-৮৬) প্রায় দুবছর (১৯৫৬-৫৭) স্পেনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ঢাকায় ফেরেন। ১৯৫৮ সালে আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক ও রশিদ চৌধুরী ব্রিটিশ কাউন্সিলে একটি যৌথ প্রদর্শনী করেন। এটি ছিল সমকালীন পাশ্চাত্যধারায় প্রভাবিত বাংলাদেশের  শিল্পীদের  একটি  উল্লেখযোগ্য  প্রদর্শনী।  তাঁদের  কাজে কিউবিজম (আমিনুল), সুররিয়ালিজম (রশিদ) ও এক্সপ্রেশনিজমের (রাজ্জাক) প্রতি আনুগত্য ধরা পড়েছে। মুর্তজা বশীর (১৯৩২-) ইতালিতে শিল্পে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন (১৯৫৬-৫৮), দেশে ফিরে তিনি দশকের শেষ দুটো বছর (১৯৫৮-৬০) বেশিরভাগ সময় পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শিল্পকলা কেন্দ্রে ফ্রিল্যান্স কাজ করেন। প্রদর্শনী করেন। বিদেশ যাওয়ার আগেই মুর্তজা বশীর স্টাইলাইজড ফিগারেটিভ কাজ করেন। ১৯৫৫ সালে আঁকা তাঁর ‘আগামীদিনের অপেক্ষায়’-শীর্ষক অসাধারণ তেলরং ছবিটি বার্নার্ড বুফের অঙ্কনশৈলীর অনুরূপ। সৈয়দ জাহাঙ্গীরও (১৯৩৫-) ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৬-৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
পঞ্চাশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের মধ্যে মোহাম্মদ কিবরিয়া (১৯২৯-২০১১) উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যান ১৯৫৯ সালে, তবে পশ্চিমে নয়, জাপানে। একই প্রজন্মের শিল্পী কাজী আবদুল বাসেত (১৯৩৫-২০০২) ও দেবদাস চক্রবর্তী (১৯৩৩-২০০৮) বিদেশে যান ষাট ও সত্তরের দশকে। পঞ্চাশের দশকের আরেক অত্যন্ত মেধাবী শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী (১৯৩৪-) চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষার জন্য কখনই বিদেশ যাননি। নিতুন কুন্ডুর (১৯৩৫-২০০৬) বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য।
পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের চিত্রকলায় যে নবধারার সূচনা, তার মূল ভিত্তি অনেকটাই পঞ্চাশ-পূর্ব প্রজন্মের জয়নুল-কামরুলের দেশজ আধুনিকতার মাধ্যমে যেমন, তেমনি বিদেশে উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত শিল্পী ও তখনো পর্যন্ত দেশেই শিল্পচর্চায় নিয়োজিত শিল্পীদের মাধ্যমে। শেষোক্তদের মধ্যে মোহাম্মদ কিবরিয়া ও কাইয়ুম চৌধুরীর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য-পঞ্চাশের পর অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রদর্শনী ও নিখিল পাকিস্তান জাতীয় প্রদর্শনীতে তাঁদের যেসব শিল্পকর্ম পুরস্কৃত হয়েছিল সেগুলোতে পাশ্চাত্যের কিছু শিল্পশৈলীর প্রভাব দেখা গেছে। তবে বিষয়নির্ভরতা ছিল নিসর্গ, মানুষ ও পরিচিত জীবন। কিবরিয়া প্রধানত মানব অবয়বপ্রধান আধা কিউবিস্ট ছবি এঁকেছেন। এসব ছবির মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিঃসঙ্গতা ও বিষণœতা, যা হয়তো শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন ও মনের প্রতিফলন। কাইয়ুম চৌধুরীর ছবির বিষয় পল্লী প্রকৃতি, গ্রাম, নদী ও নারী। আমিনুল, হামিদ, রাজ্জাক, রশিদ, বশীর প্রমুখের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে পঞ্চাশের দ্বিতীয়ার্ধে কিউবিজম, সুররিয়ালিজম ও বিশেষত অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম ইত্যাদি ধারা বা শৈলীর প্রচ্ছন্ন প্রভাব দেখা গেছে। অনেকটা ওই সব পাশ্চাত্য শৈলীর অনুকরণই বলা যায় সেগুলোকে। আত্মস্থ করে দেশজ নিজস্ব শৈলী নির্মাণের মেধাবী প্রয়াস তাঁরা শুরু করেছিলেন মাত্র, তার চূড়ান্ত ফল পেতে আমাদের আরো বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমিনুল, বশীর, রাজ্জাক, রশিদ প্রমুখ পরবর্তী দশকগুলোতে তাঁদের প্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে পেরেছেন। মোহাম্মদ কিবরিয়া মূলত ষাটের দশকের প্রথম থেকে বিশুদ্ধ বিমূর্ত ধারার দিকে এগোন এবং ক্রমশ এই ধারায় পরাকাষ্ঠা দেখাতে সমর্থ হন এবং রীতিমতো আচার্যের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হন। কাইয়ুম চৌধুরী দেশজ ইমেজ ও মেজাজসমৃদ্ধ নিজস্ব চিত্রশৈলীতে অসাধারণ মৌলিকত্ব আনেন। রশিদ চৌধুরীর বেলাতেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়। তিনি ট্যাপিস্ট্রি ও চিত্রকলা উভয় মাধ্যমেই উজ্জ্বল রং ও খোলামেলা ফর্ম-সংবলিত তাঁর একটি নিজস্ব শৈলী দাঁড় করিয়েছিলেন। কাজী আবদুল বাসেত শেষদিকে শুধুই রং-ফর্ম-প্রধান বিমূর্ত ধারার ছবি এঁকেছেন। তবে আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ প্রতিভাবান শিল্পী মাঝে মাঝেই তাঁদের স্টাইল বদল করেছেন, হয় একই মাধ্যমে, অথবা মাধ্যম ভিন্নতায়। রাজ্জাক অবশ্য শেষ পর্যায়ে পেইন্টিংয়ে প্রকৃতি-উদ্বুদ্ধ প্রকাশবাদী বিমূর্ততায় নিজস্বতা নিয়ে অনেকটা স্থিত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত শিল্পীদের প্রসঙ্গে যে-কথাটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, তা হলো প্রথম থেকেই তাঁদের অনেকের মধ্যেই শিল্পের তাত্ত্বিক দিক সম্পর্কে ঔৎসুক্য ছিল, শৈলী ও কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ছিল একাগ্রতা, দক্ষতা অর্জনের জন্য ছিল প্রচণ্ড  অধ্যবসায়। তাছাড়া তাঁরা সমসাময়িক জাতীয় আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাশীল ছিলেন, বৈশ্বিক শিল্পধারা সম্পর্কে তাঁদের অনিঃশেষ আগ্রহ ছিল। বিষয় নির্ধারণে অবশ্য তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিসর্গ ও নগর অথবা জীবননির্ভর থেকেছেন, পুরোমাত্রায় বিমূর্ত শিল্পকর্ম পঞ্চাশের দশকের শিল্পীরা সেই দশকেই করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত খুব কম। তাঁদের কারো কারো মধ্যে বিশুদ্ধ বিমূর্ততা এসেছে শক্তিশালীভাবে পঞ্চাশ-পরবর্তী সময়ে। পঞ্চাশের দশকের চিত্রকলা ও ভাস্কর্য মূলতই আধা-বিমূর্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল।
তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে অবশ্যই দেখা যেত দেশের উজ্জ্বল কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক বা সংস্কৃতিকর্মীদের।
শিল্প-সমালোচকরাও ছিলেন তাঁদের সহচর। বাংলাদেশের (অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের) শিল্পীদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে (পশ্চিম) পাকিস্তানের শিল্পবোদ্ধা ও শিল্প-পৃষ্ঠপোষকদের চমৎকার সখ্যও ছিল সেই দশকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ঢাকার শিল্পীদের মধ্যে হামিদুর রাহমান, মুর্তজা বশীর, সৈয়দ জাহাঙ্গীর প্রমুখ করাচি, লাহোর কিংবা পিন্ডিতে একক প্রদর্শনী করেছেন, স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থানও করেছেন, সেখানকার প্রগতিশীল সেক্যুলার বন্ধুদের সাহচর্য লাভ করেছেন। মুবিনুল আজিমের মতো কেউ কেউ সে-দেশে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের প্রধান ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য তাঁদের অত্যন্ত উদার, প্রগতিশীল, সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক মনমানসিকতা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শেও ছিলেন তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। শিল্পীদের এসব বৈশিষ্ট্যই নির্মাণ করেছিল পঞ্চাশের চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের চরিত্র। একটি অনগ্রসর, দারিদ্র্যপীড়িত সমাজ, যা আবার এক পর্যায়ে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অধীনস্থ হলো, এরকম পরিবেশে তৎকালীন (পঞ্চাশের দশকের) পূর্ব পাকিস্তানের তথা আমাদের বাংলাদেশের শিল্পীদের সৃজনকর্ম এদেশের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
পঞ্চাশ-পরবর্তী পাঁচের দশকে বাংলাদেশের চিত্রকলা ও ভাস্কর্য অনেক দূর এগিয়েছে সন্দেহ নেই, উত্তর-আধুনিক শিল্পধারার সঙ্গে একাত্ম হয়েছে অনেক তরুণ শিল্পী। এমনকি ‘নন আর্ট’ জাতীয় শিল্পও নির্মাণ করছেন কোনো কোনো বাঙালি শিল্পী। এদেশের নব-প্রজন্মের সর্বসাম্প্রতিক অর্জন ২০১১-এর ভেনিস বিয়েনালে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ। আর এ সবকিছুর পেছনে যে পঞ্চাশের শিল্প ও শিল্পীদের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা ছিল, বলাই যায়।
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১

Leave a Reply

*