logo

বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্প ও বিবিধ উজ্জ্বল অর্জন

র বি উ ল হু সা ই ন
এক
স্থাপত্যশিল্প একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম, যার মাঝ থেকে উঠে আসে দেশ, কাল, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তিগত নান্দনিক শিল্পবোধ এবং বিজ্ঞাননির্ভর প্রযুক্তি আর বাস্তবভিত্তিক করণকৌশল। যুগে যুগে রাজা-বাদশাহরা প্রধানত তাঁদের নাম স্মরণীয় করে রাখতে স্থাপত্যশিল্পের বিশেষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, যেহেতু নির্মাণসামগ্রী অর্থাৎ লোহা, পাথর, ইট মানুষের আয়ুষ্কালের তুলনায় কালের প্রকোপের বিপরীতে বেশি দিন টিকে থাকত বা থাকে প্রাকৃতিকভাবে এবং সেই সুদূর পেছনের আমল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে দেশে বিভিন্ন শাসকের শাসনকালে স্থাপত্যশিল্পের বাস্তবায়ন তাঁদের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকালীন সামগ্রিক অবস্থা, ক্ষমতা ও উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দরিদ্র দেশে স্থাপত্যশিল্পের প্রসার খুব স্বাভাবিকভাবেই অপ্রতুল। বাংলাদেশ নামক চল্লিশ বছর বয়সী অন্যান্য দেশের তুলনায় দরিদ্র যতই হোক, দেশটি একদা ভারতের পলিমাটিসমৃদ্ধ কৃষি জমিনির্ভর শস্যভান্ডার হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম বিত্তশালী বলে পরিচিত ছিল। শস্যের পর্যাপ্ত উৎপাদনের কারণে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এদেশে ভিড় করত এসে তো বটেই, সেই সঙ্গে উড়ে এসে জুড়ে বসত দুনিয়ার অন্যান্য দেশের ক্ষুধার্ত, লোভী, স্বার্থপর ও ধূর্ত জনগণ। ধর্মের নামে রাজনীতির সেই সময়ের মতবাদ – ‘জোর যার মুল্লুক তার’-এর পীড়নে তারা অতিথি নারায়ণ যেন বা রামায়ণ-মহাভারতের শ্বেতাঙ্গ-ফর্সা চামড়ার দেবতা হয়ে স্বর্গ থেকে নেমে এসে গৃহ এবং ধীরে ধীরে সমগ্র তামাটে বর্ণ মানুষের দেশ দখল করে শত শত বছর ধরে দেশটিকে কঠোর শাসনের মধ্যে নিষ্পেষিত করা শুরু করেছিল এবং আর্য হয়ে অনার্য ও দ্রাবিড়দের ওপরে। সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ তখন শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষা, ধর্ম, সঙ্গীত, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের খুব উঁচু স্থানে বিরাজ করত। এখনকার লোহা, তামা, রুপা, সোনা ও ব্রোঞ্জের কারিগরদের বংশপরিক্রমায় লোকশিল্প যেমন, বয়নশিল্প, সীবনশিল্প, ধাতবশিল্প, মৃন্ময়শিল্প, মসলিন ও নকশিকাঁথা সৃজন, মসলা, রন্ধনশিল্প, শস্য, ফল, ফুল, মাছ, মধু, গবাদিপশু পালন, সর্বোপরি চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর থেকে জাহাজ নির্মাণ করে বর্তমানের মতো ইউরোপসহ অন্য দেশে সরবরাহ করা হতো। সেই গৌরবময় যুগের অবসান হয় ঔপনিবেশিক শাসক ইংরেজ-বণিকের শাসনকাল থেকে। বিজয় সেনের আমলে তাঁর নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কায় বাঙালিরা উপনিবেশও স্থাপন করেছিল। ধর্মভিত্তিক শাসন পাল, গুপ্ত, সেন, পরে সুলতানি ও মোগল শাসনের শেষে ইংরেজ, ভারত ভাগ ও পাকিস্তানিদের আগমন। এর আগে বল্লাল সেনের আমলে হিন্দু বর্ণপ্রথার তীব্র নিষ্পেষণে অতিষ্ঠ ও জর্জরিত সাধারণ মানুষ আফগানি বখতিয়ার খিলজির সতেরো অশ্বারোহী দ্বারা বাংলাদেশ দখল স্বাগত জানিয়েছিল, যদিও তিনি বিহারের পৃথিবীখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীহ প্রতিভাবান শত-সহস্র বিজ্ঞজন, অধ্যাপক, পন্ডিত, শিক্ষাবিদ, ছাত্রসহ সমগ্র এলাকা অমানুষিক ও নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে এদেশে আগ বাড়িয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, ইংরেজ আর পরে বর্বর অশিক্ষিত পাকিস্তানিরা ছাড়া অন্য কোনো শাসকদল এদেশের সংস্কৃতি বা অর্থবিত্ত ও সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজ নিজ দেশে নির্লজ্জের মতো পাচার, প্রসার এবং সরিয়ে নেওয়ার হীন চেষ্টা কেউ করেনি। তাই দেখা যায়, এত কিছুর বৈরিতার পর স্থাপত্যশিল্পের বেলায় পাল আমলে সর্বপ্রথম এদেশে মাটি পুড়িয়ে ইট এবং পোড়া মাটির শিল্পকর্ম, মৃৎশিল্পের কালজয়ী ঐতিহ্যপিয়াসী বিভিন্ন মৌলিক সৃষ্টি দিয়ে মন্দির, প্রাসাদ, বৌদ্ধবিহার ও পাথরের দেব-দেবীর অপূর্ব ভাস্কর্যের অনুপম সৃষ্টিসম্ভার দেখা যায়। এসব বাংলার মৃন্ময়শিল্প ও স্থাপত্যশিল্পের আদি পরিচয় এবং মূলধারার অস্তিত্বে ভাস্বর হয়ে এদেশের গৌরবময় অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য দেয়। সেই সময়ের শিল্পী, ভাস্কর ও স্থপতি ধীমান ও বীতপাল পাল যুগ ও চিরকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠোজ্জ্বল শিল্পস্রষ্টা বলে বিবেচিত। পরে সুলতানি আমলে এসবের বিপুল ব্যাপ্তি মসজিদ, প্রাসাদ, দুর্গ, স্মৃতি-সমাধিসহ সর্বত্র প্রসার লাভ ঘটে এবং প্রাক-মোগল যুগে তা আরো বিকশিত হয়ে মোগল আমল পর্যন্ত গড়ায়। আমাদের স্থাপত্যশিল্পের প্রথম অর্জন যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সেই সব গৌরবময় কালকে গুরুত্বসহকারে ধরতে হবে, যা ছাড়া বা তা ধর্তব্য বলে বিবেচিত না হলে এই গর্ববোধ শূন্যতার বোধে পর্যবসিত হবে।

দুই
সেই সব মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি ও শিল্পের আগ্রাসন ও দখল আমাদের আদি শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশে ছিন্নসূত্র করেছে ঠিকই, তবে এটাও ঠিক যে, সেই সব বিজাতীয় ধারা দ্বারা আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত – সব বিভিন্নভাবে ঋদ্ধবান ও পরিপুষ্টি লাভও করেছে। তিনশ তেত্রিশ বছর আগে মোগলীয় লালবাগ দুর্গের পর সেই কালে জয়সিংহ-দুই, যার নামে ভারতের জয়পুর, পিংক সিটি বা গোলাপিনগর বাঙালি প্রতিভাধর স্থপতি ও নগরবিদ বিদ্যাধর ভট্টাচার্য দ্বারা সামগ্রিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। স্থাপত্যশিল্পের বেলায় বিশেষ করে এই কথাটি তাৎপর্যময় এবং যুগে যুগে সব দেশে সব শিল্পমাধ্যমের বেলায় এটিই প্রযোজ্য ও বাস্তব সত্য যে, সবসময় শিল্প নতুন মিশ্রণ চায়, চায় নতুন সঙ্গম, নতুন গতি, নতুন দিকনির্দেশনা এবং দাবি করে নতুন ভাবনা, নতুন মাত্রা, স্তর বা তল, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন দর্শন। দেবে আর নেবে, মিলাবে মিলিবে – এই আপ্তবাক্যই শিল্প সৃষ্টির উত্তরণ ঘটায় ও শিল্পচর্চার নতুন পথে নতুন শিল্প সৃষ্টি লাভ সুগম করে। আমাদের সার্বিক শিল্প
পরিবেশ-প্রতিবেশে এই প্রক্রিয়া এক ইতিবাচক আহরণের প্রভাব সৃষ্টি করে, তাই তা গ্রহণীয় ও স্বীকৃত। এ কারণে এটাকে দ্বিতীয় অর্জন বলে গণ্য করা যায়, বিশেষ করে স্থাপত্যশিল্পের বিষয়ে এবং তা কখনো মাটি ও মানুষের মৌলিক মূল্যমানের বিনিময়ে নয়।

তিন
তবে এটা ঠিক যে, এই সব পথ পাড়ি দিতে যুগে যুগে এদেশের তামাটে মানুষ ও তার শিল্পচর্চার কৃতিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। শঙ্করাচার্যের আমলে ধর্ম ও বর্ণপ্রথার নামে বহিরাগত নির্মম হিন্দু ব্রাহ্মণরা নিরীহ বৌদ্ধদের এদেশ ছাড়তে বাধ্য করে পাশের অন্যান্য দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তারা দিনাজপুর অর্থাৎ এই দেশের বোধ করি প্রথম নৃপতি কৈবর্ত পরিবারের দিব্যক, ১০০ শতাব্দীতে যিনি স্বাধীন রাজ্য গঠন করেছিলেন, ওই অভাবনীয় ঘটনাটি ব্রাহ্মণদের চরম অসম্মান ও পরাজয় ছিল মনে করে তারা তাকে সমূলে উৎখাত ও ধ্বংস করেছিল। কলোনিগর্বী বিভক্ত-বিভাজন করে শাসন করো – এই নিকৃষ্ট মনোভাবের ধারক ও বাহক শ্বেতাঙ্গ ইংরেজরা এদেশের সোনারগাঁয়ের মসলিন শিল্পীদের দুই হাতের বুড়ো আঙুল নির্মমভাবে কর্তন করে তাদের বস্ত্র ও বয়নশিল্পের বাণিজ্যিক হীন প্রসার ঘটিয়েছিল, যে শিল্প-অপরাধের কোনো ক্ষমা হতে পারে না, যেহেতু পৃথিবী থেকে চিরকালের জন্যে সেই বিশ্ব শিল্পঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি শিল্পমাধ্যম মসলিন হারিয়ে গেল, যার জন্যে বিশ্ব আদালত বা জাতিসংঘে তাদের এখনো বিচার শুরু করা যেতে পারে। এভাবে তারা ভয়ংকর শিল্প-দস্যু ও চরম অপরাধী হিসেবে বিবেচ্য ও ঘোষিত হওয়ার অপেক্ষা করে। তারাই ভারত ভাগের মূল শক্তি, যার নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক আকর্ষণে সেই সময়ের ডাকসাইটে রাজনীতির তথাকথিত নেতারা নেতিয়ে গিয়েছিলেন। এরই জের ধরে সেই বর্বর, অশিক্ষিত সেনাজান্তা পাকিস্তানিরা বাংলার ওপর চরম নির্যাতন চালিয়ে ধর্মের নামে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও শিল্পের ক্ষতি সাধন সেনাশাসন দ্বারা চালিত করতে গেলে এদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে হাজার হাজার বছর ধরে পরাধীন থাকার পর এই প্রথমবারের মতো দেশকে স্বাধীনতার পাদপীঠে সমাসীন করে এবং এইভাবে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন স্বাধীন দেশের সৃষ্টি হয়। নিঃসন্দেহে তাই এটা একটা বিশাল ও অন্যতম উজ্জ্বল সফল ঘটনা এবং তাই বলা যায় তৃতীয় অর্জন।

চার
কোনো শিল্প সৃষ্টির মহত্তম অর্জনের কাছে একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের কোনো তুলনা হয় না। বিষয়টি সবসময় শ্রেষ্ঠতমের কাতারে গিয়ে উচ্চতম শিখরে অবস্থান করে। যেহেতু একটি দেশের স্বাধীনতা সেই দেশের মানুষকে গৌরবময় এক আত্মপরিচয়ের গর্ব ও অহংকারে তাদের উজ্জীবিত জীবনের মৌলিক অস্তিত্বকে মূল্যবান করে তোলে – এইখানেই স্বাধীনতার অপরিসীম যথার্থতা এবং সেইজন্য তা এত মহার্ঘ্য ও আত্মসম্মানজনক। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাবলীল বিকাশে স্বাধীনতার কোনো তুলনা নেই। শিল্প রাষ্ট্রের মতো অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক, উদার, পক্ষপাতহীন, গণতান্ত্রিক, অন্যের ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত ও সবার প্রতি সহনশীলতার শিল্প ও জীবনদর্শনে ঋদ্ধ থাকতে হবে, তা না হলে তার স্বাভাবিক বিকাশে বাধার সৃষ্টি হয়। কেননা কখনো শিল্প বা রাষ্ট্র একক সত্তায় বিরাজ করে না, তার পরিমন্ডল সর্বত্রগামী। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই তার স্বাভাবিক পথচলা এবং এটাই তার ধর্ম ও মূল অস্তিত্বের মৌলিক সূত্র। এ রকম না হলে তা যথাযথভাবে ও পূর্ণাঙ্গরূপে গড়ে উঠতে পারে না, ফলে তা শিল্প না হয়ে এক অপশিল্প হিসেবে জন্ম নিয়ে অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে যায়। আমাদের স্থাপত্যশিল্প স্বাধীনতার পর অন্যান্য শিল্পের মতোই ইতিবাচক পরিবেশে গড়ে উঠতে থাকে। পাল, সুলতানি, প্রাক-মোগল, মোগল ইত্যাদি যুগের আদি বাংলার স্থাপত্যের পরিচয়ে গড়ে উঠলেও ইংরেজ আমলে তা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল তার স্বাভাবিক বিকাশে ঠিকই, তবে সেই প্রথম এদেশের স্থাপত্য ইউরোপীয় আধুনিক স্থাপত্যধারায় রূপ নেয়, বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ সময়ে। ঢাকায় প্রাদেশিক রাজধানী স্থাপন করতে বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন তৈরিতে যে ইন্দো-সারসেনিক রীতির নিদর্শন পরিলক্ষিত হয় তাতে সেই কথা প্রমাণিত হয়। সত্যিকারভাবে আধুনিক স্থাপত্যের কীর্তি এই চারশো বছরের পুরনো শহরে প্রথমবারের মতো দেখা যায় এদেশেরই বাঙালি গর্বিত সন্তান স্থপতি মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যকর্মে। তাঁর সৃষ্ট আর্ট কলেজ এখন ইনস্টিটিউশন ও পাবলিক লাইব্রেরি বর্তমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় – এই ভবন দুটি তো সেই সময় অর্থাৎ পঞ্চাশের দশক থেকে এখন পর্যন্ত একটা বিশাল ও মূল্যবান অর্জন, যা সম্পূর্ণত কোনো বাঙালি সন্তান দ্বারা সমাধা হয়েছে এবং সেই হিসেবে চতুর্থ অর্জন। স্থাপত্যকর্মগুলো আন্তর্জাতিক স্থাপত্যমানের গৌরবময় দৃষ্টান্ত ও সাক্ষী।

পাঁচ
সেই সময় এই দেশে কোনো স্থপতির সেবা পাওয়া যেত না বললেই চলে, যেহেতু সে-রকম কেউ ছিলেন না এবং স্থাপত্যশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠানও স্থাপিত হয়নি। এ কারণে সরকারি বা বেসরকারিভাবে বহু নিচুমানের ভবন নির্মিত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি উঁচুমানের স্থপতিদের স্থাপত্য নিদর্শনও দেখতে পাওয়া যায়। সেনাশাসক পাকিস্তানিদের পৃষ্ঠপোষকতায় থারিয়ানি, ভামানি প্রমুখ ছাড়াও সরকারের অধীনে হিকস বা ম্যাককোনেল – সব স্থপতি নামধারী কর্মকর্তাদের নিম্ন পর্যায়ের কাজ যেমন দেখা যায়, এই সঙ্গে ইতালি, গ্রিস ও আমেরিকার বিশ্বখ্যাত অনেক স্থপতির স্থাপত্যকর্মও। গ্রিক স্থপতি ডক্সিয়াডিসের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কুমিল্লা বার্ড, ঢাকার হোম ইকোনমিক্স কলেজ, ঢাকা কলেজের পাশে শিক্ষকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইতালিয়ান স্থপতি স্পিরোর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান স্থপতি পল রুডলফ ও রিচার্ড নয়ট্রার ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, টাইগারমানের পাঁচ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, বব বুইয়ের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস, নটর ডেম কলেজ শিক্ষকনিবাস, কমলাপুর রেলস্টেশন, রিচার্ড ভ্রুম্যানের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপত্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ড্যানিয়েল ডানহাম ও জেমস ওয়ালডেনের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকাবাস – এ রকম অনেক উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকর্ম উপহার দিয়ে আমাদের সামগ্রিক স্থাপত্যশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখ্য শেরেবাংলা নগরের স্থাপত্যকর্মের জন্যে পরিচিত পৃথিবীখ্যাত লুই কানের স্থাপত্যশৈলী, বিশেষ করে তাঁর সংসদ ভবন যেটি আধুনিক ধ্রুপদী স্থাপত্যশিল্পের অসাধারণ শিখরস্পর্শী উজ্জ্বল উদাহরণ – একালের তাজমহল অভিধায় আখ্যায়িত। তাই এটি পঞ্চম স্থাপত্য অর্জন নিঃসন্দেহে, যার জন্যে আমরা গর্ব অনুভব করি। এই অনুপম শিল্পসৃষ্টিটি আমাদের জনগণ, স্থপতি ও স্থাপত্য শিক্ষার্থীদের কাছে চিরকালের স্থাপত্য-প্রেরণা হয়ে রইবে এবং সঙ্গে সঙ্গে এর দৃঢ়-কঠিন প্রশস্ত কংক্রিট-দেয়াল নির্মিত ভবন রূপ এদেশের গণতন্ত্র, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, মা, মাটি ও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার উজ্জ্বল ও চিরস্থায়ী প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বিবেচিত হয়ে থাকবে চিরদিন।

ছয়
এদেশে প্রথমবারের মতো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই ষাটের দশকে স্থাপত্যশিক্ষার প্রবর্তন হয় আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকার টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযত্নে ও সেই দেশের এইডসের আনুকূল্যে। এর ফলে কালক্রমে ধীরে ধীরে দেশমুখী স্থাপত্যশিক্ষার প্রসার ও বাস্তবায়নের জন্যে বিদেশি স্থপতিদের বদলে স্থানীয় শিক্ষাপ্রাপ্ত স্থপতিদের হাতে স্থাপত্য সৃষ্টির পেশা ও কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে চলে আসে। বর্তমানে তাই স্থাপত্য শিল্পচর্চা সম্পূর্ণভাবে স্বাবলম্বী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের দেশের স্থপতিদের সৃষ্টিশৈলী ও তার মান সারাবিশ্বে সর্বজনস্বীকৃত এবং সেইমতো সুপ্রতিষ্ঠিত। স্থাপত্যশিক্ষার প্রসার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন, ঢাকার প্রকৌশল, খুলনা ও শাহজালাল ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ব্র্যাক, এশিয়া প্যাসিফিক, আহ্ছানউল্লাহ, নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, শান্ত মারিয়াম ইত্যাদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ্য। প্রতিবছর তাই শিক্ষাপ্রাপ্ত স্থপতিবৃন্দ পেশাগত ক্ষেত্রে নিয়োজিত হতে পারছেন। এ কারণে অন্যান্য দেশের মতো বিদেশি স্থপতিদের অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত আধিক্য আমাদের স্থাপত্যশিল্প চর্চা ও পেশায় নেই বললেই চলে। এখানে উল্লেখ্য, আমাদের বাঙালি স্থপতি ও প্রকৌশলী অনেকে বিদেশে বা সারাবিশ্বে তাঁদের সৃজনপ্রতিভার জন্যে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। প্রয়াত প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান তাঁর যুগান্তকারী নতুন কাঠামো মৌলিক নির্মাণপদ্ধতি ‘টিউব ইন টিউব সিস্টেম’, আমেরিকার সিয়ার্স টাওয়ার, জন হ্যানকক ভবন, সৌদি আরবের হজ টার্মিনাল ইত্যাদি বহু কাঠামোগত সৃজনকর্মের জন্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তাছাড়া বর্তমানে দেশের অনেক তরুণ প্রজন্মের স্থপতি
দেশে-বিদেশে তাঁদের স্থাপত্যশিল্প পেশা ও চর্চায় সৃজনী কুশলতা ও নতুন সৃষ্ট কৌশলের জন্যে সম্মানিত ও পুরস্কৃত হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক স্থাপত্য পেশা ইনস্টিটিউট যেমন কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টস (সিএএ), এশিয়ার সতেরোটি দেশের স্থাপত্য ইনস্টিটিউট সমন্বয়ে গঠিত আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল অব এশিয়া (আর্ক এশিয়া), সার্কভুক্ত আটটি দেশের স্থপতি ইনস্টিটিউট নিয়ে সার্চ – এইসব সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানে দায়িত্বে নির্বাচিত চেয়ারম্যান বা সভাপতি পদে আমাদের দেশের স্থপতিরা প্রথমবারের মতো ক্ষমতা নিয়েছেন যেমন বর্তমানে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। অনেক স্থপতি ও শিক্ষক সৌদি আরব, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আমেরিকা, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, কোরিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ইত্যাদি বহির্বিশ্বে স্থাপত্য পেশা, শিক্ষকতা ও বিশেষ বক্তা হিসেবে প্রায় প্রতিবছর যোগদান করছেন। অনেকে স্থাপত্যবিষয়ক প্রবন্ধাবলি বিদেশি ম্যাগাজিনে নিজের কাজ বা সার্বিক বিবেচনায় নিয়মিতভাবে প্রকাশ করছেন, সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্যশিল্প নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বইপুস্তকও। নিঃসন্দেহে প্রাগুক্ত সবকিছুই আমাদের জন্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, গর্ব ও অহংকারের বিষয় এবং তাই এগুলোকে অন্যতম উজ্জ্বল ষষ্ঠ অর্জন বলে স্বীকার করতে হয়।

সাত
বিশেষ করে বলা যায়, আমাদের তরুণ স্থপতিদের কৃতিত্ব ও সফলতা। তাঁরা সব শিল্পমাধ্যমে বিশ্বমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মৌলিক সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন। স্থাপত্যে সফল হওয়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণ, অভিনয়, সংগীত, সাহিত্য, কবিতা, নাটক, নৃত্য, চিত্রশিল্প, অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, নিসর্গ রচনা ইত্যাদি বহু বিষয়ে ব্যাপ্ত ও কুশলতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তাঁদের প্রতি সব দিক দিয়েই আশা রাখি, বিশ্বাস করি এবং তাই আগামী সুন্দর ভবিষ্যতের পূর্ণ দায়িত্বভার তাঁদের ওপর ন্যস্ত করে খোলা মন নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারি। ডেভেলপারদের অনেকেই আজ স্থপতি, তবুও তাঁদের ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের পাশাপাশি এইসব স্থপতি বাংলার আদি স্থাপত্যরীতি, প্রকৃতি, মৃত্তিকা, জল, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ, আবহাওয়া, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অবদান, রুচি, ঔচিত্যবোধ ও সর্বোপরি স্থাপত্য নির্মাণসামগ্রী এবং শিল্পবোধ নিয়ে বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্প সৃষ্টিতে এদেশীয় পরিচয় ও অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বা বিশ্বমান মিলিয়ে নিরন্তর স্থাপত্যশিল্প সৃজনের সংগ্রাম করে চলেছেন। অর্থ ও প্রযুক্তিসর্বস্ব প্রদর্শনী বাতিকগ্রস্ত ধনী দেশসমূহ সিঙ্গাপুর, চীন বা আরবীয় মধ্যপ্রাচীয় বিজাতীয় স্থাপত্যকর্মের বিপরীতে ও বিরুদ্ধে তাঁরা যে নিজেদের উজ্জ্বল অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্যে শিল্প-যুদ্ধ চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে, সেই জন্যে অবশ্যই তাঁরা প্রশংসা আর কৃতিত্বের দাবিদার। মৌল এই মনোবৃত্তিকে ধরে অনেক অনেক স্বপ্ন, কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সুদূরপ্রসারী কল্যাণময় সব শিল্পমাধ্যমসহ স্থাপত্যশিল্পের সুষ্ঠু সাবলীল বিকাশ এবং প্রসারে তা এক বিশাল ভূমিকা রাখবে আর এটাই হবে আমাদের দেশ ও জনগণের জন্যে অনন্য-অসামান্য একমেবাদ্বিতীয়ম্ সপ্তম অর্জন। 

 

Leave a Reply

*