logo

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উৎকর্ষের খোঁজে

মাহমুদুল হোসেন

১. যা খালি চোখে দেখি

সিনেমা নিয়ে এখন নানারকম উত্তেজনা বাংলাদেশে। আপাত এরকম মনে হয় যে, ভীষণ ব্যসত্ম সিনেমার পৃথিবীটা, নানা সম্ভাবনার দরজা খুলে যাচ্ছে যখন-তখন; সিনেমা, চলমান ছবি নিয়ে ভাবছে অনেকে, কাজ করছে আরো বেশি লোক, অনেক নতুন লোক। আমাদের, যাদের চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো না কোনো প্রকারে আগ্রহ আছে, তাদের সকলের মধ্যে এরকম বিষয়ীগত একটা বোধ কাজ করে হালে। বেশ কয়েক বছর, দশকও হতে পারে গোটা দুই, পর প্রায় নিয়মিতই রাসত্মার পাশের দেয়ালে নতুন ছবির পোস্টার পড়ছে প্রতি সপ্তাহে। পত্রিকার সংস্কৃতির পাতা খুললেই নতুন ছবির প্রিমিয়ার, নয়তো কাজ শুরম্ন হবার খবর চোখে পড়ছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে সিনেমা প্রযোজনায়। বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের ছবি স্থান করে নিচ্ছে, হঠাৎ পুরস্কার পাচ্ছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দেশের ছবির ওপর নানারকম অনুষ্ঠান, নতুন তারকার মেলা – অভিনয় তারকা, গানের তারকা। সরকারি ফিল্ম ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়বার রকমারি ব্যবস্থা হয়েছে। আবার নানা সংগঠনের উদ্যোগে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স, মেকিং কর্মশালা, নানা আকারের এবং ব্যাপ্তির চলচ্চিত্র উৎসব, নানা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিভিন্ন রকম অনানুষ্ঠানিক দেশি ও বিদেশি ছবির স্ক্রিনিং চলছে। চলমান ছবির আরো যে চলাচল, যেগুলো এ আলোচনার শুরম্নতে জুড়ে দিলে প্রচলিত সিনেমা নিয়ে আলোচনা একটু ধাক্কাই খায়, সেসব প্রসঙ্গ না হয় আরো পরের জন্যেই তোলা থাক। কিন্তু মোটের ওপর সিনেমার এখন ব্যসত্ম জীবন – বাংলাদেশে। এই উত্তেজনার কোনো গাণিতিক মূল্যায়ন, অথবা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এই বিষয়ে সিদ্ধামেত্ম উপনীত হওয়া এ-লেখার লÿ্য নয়। বছরে কটি ছবি সেন্সর বোর্ডে জমা পড়ছে, সেসব ছবি কেমন ব্যবসা করছে, আজকাল কোন ধরনের ছবি বানানোর বাজেট কেমন – এসব হিসাবের ভিত্তিতে আমার প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার কিছু নেই। আসলে এ-লেখার হালটি ধরেছি একটি চূড়ামত্মভাবে পÿপাতমূলক বিষয় বিবেচনার উদ্দেশ্য নিয়ে। সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের সিনেমার উৎকর্ষের সম্ভাবনা বিবেচনা। আমি নিশ্চয়ই চলচ্চিত্রের উৎকর্ষ বলতে কী বুঝি তা ব্যাখ্যা করব। কিন্তু বাংলাদেশের সিনেমার আয়, মুনাফা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ÿমতা, আঞ্চলিক বা বিশ্ববাজার দখলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সম্ভাবনা বা কৌশল – এসব বিষয়ে আমার সেভাবে লেখার কিছু নেই। যদি এসব নিয়ে কিছু লিখেও ফেলি সেটা ওই উৎকর্ষের সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখা প্রসঙ্গের মধ্যেই ঘটবে। কিন্তু খালি চোখে যে উত্তেজনা চোখে পড়ছে চলচ্চিত্র, চলমান ছবিকে ঘিরে, সেখান থেকেই আমার এই উৎকর্ষ বিবেচনার শুরম্ন বটে। কারণ মানের বিবেচনায় সংখ্যা একটি গুরম্নত্বপূর্ণ মাত্রা। আসলে সংখ্যার আধিক্য মান বা উৎকর্ষ অর্জনের সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি করে; গণিত তা-ই বলে, কা-জ্ঞানও। যত বেশি সিনেমাবিষয়ক কর্মকা- সূচিত হবে, সিনেমার উৎকর্ষ অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনাও ততই বাড়বে। এÿÿত্রে আমরা ধরে নিচ্ছি যে, অন্যান্য শর্ত স্থির রয়েছে (ceteris paribus)।
উইকিপিডিয়ার সিনেমা অব বাংলাদেশ পাতায় গিয়ে চমকে ওঠা গেল। পাতার নিচের দিকে এদেশের চলচ্চিত্রের চারটি ভাগ করা হয়েছে। ক্লাসিকস, মডার্ন এরা ফিল্মস (আধুনিক সময়ের ছবি), কাল্ট ফিল্মস, কমার্শিয়াল সাকসেস (বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবি)। ক্লাসিকস বলতে এরা এবং আরো অনেকেই বোঝেন পুরনো নামকরা কাজ। সে বোঝায় ভুল কতখানি, তার বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই, কারণ আমার বিবেচ্য যে বাংলাদেশের সিনেমায় তা সাম্প্রতিককালের। অতএব তাদের ‘ক্লাসিকস’ বাদ। কিন্তু চমকে ওঠার কারণটি হলো বাকি তিনটি ভাগ। বাকি যে তিন ভাগ ছবি তারা শনাক্ত করেছে আমিও মোটামুটি এরকম তিনটি ভাগই যেন দেখতে পাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সিনেমায়। আমার দেওয়া নামগুলো হয়তো তাদের নামগুলোর চেয়ে আলাদা হবে, কিন্তু নামে কী আসে যায়! কিন্তু ‘কাল্ট ফিল্মস’ বলতে কী বোঝায়? সচেতন পাঠক লÿ করেছেন, আমি এই পদটির বাংলা করিনি। বরং আবার উইকিপিডিয়ারই শরণাপন্ন হওয়া যাক। তাঁরা কাল্ট ফিল্মের সংজ্ঞায় বলছেন, ‘A cult film, also commonly referred to as a cult classic, is a film that has acquired a cult following. Cult films are known for their dedicated, passionate fanbase, an elaborate subculture that engage in repeated viewings, quoting dialogue, and audience participation.’ খুব আপত্তির কিছু দেখছি না কিন্তু যখন এই ভাগের ছবির তালিকাটি দেখছি। মাটির ময়না, শুনতে কি পাও, বৃহহ্নলা, রানওয়ে, রাবেয়া, মুক্তির গান, আগুনের পরশমণি, দুই দুয়ারি, লালন, আমার বন্ধু রাশেদ, মুক্তির কথা – এসব ছবি মিলে তাদের কাল্ট ফিল্মের তালিকা। উইকিপিডিয়া যে ভাগ করেছে সেটি ভাগ বটে, কিন্তু শ্রেণিকরণ নয়। সে কারণে একই সিনেমার নাম দুই তালিকাতে আছে, এরকমটি ঘটেছে। সেটি সংগতও বটে। কারণ আধুনিক সময়ের ছবি হলে সেটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারবে না এমন কোনো কথা নেই। আবার তর্কের খাতিরে বলা যায়, কাল্ট ছবিও বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারে। আমি বরং একটি স্পষ্ট শ্রেণির বিভাজনই দেখতে পাই হালের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে। একেবারে সরল ভাষায় প্রথম, দ্বিতীয় ও অন্য চলচ্চিত্র। প্রথম সিনেমা বাংলাদেশের প্রচলিত বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি। এসব ছবি ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে বটে, কিন্তু বিষয় ও প্রকাশভঙ্গির কারিগরি দিক থেকে গ্রাম্যতা এদের ছেড়ে যায়নি। প্রায় ছয় দশক ধরে এদেশের প্রধান প্রচলিত ধারার ছবিতে যে চলচ্চিত্রায়িত যাত্রার মেজাজটি বজায় আছে এসব ছবি তাদের উত্তরসূরি। নববইয়ের দশকের কাটপিসের যুগে যে ছবি ডুবতে বসেছিল, সেই ছবিই নিজেকে পুনরম্নদ্ধারের চেষ্টা করছে; মূল্যবোধে, রম্নচিতে যেটুকু পার্থক্য ঘটেছে সে সামান্যই এবং অসিত্মত্বের প্রয়োজনে। উদাহরণ দেওয়া যাক। অগ্নি (২০১৪), রাজত্ব (২০১৪), কিসিত্মমাৎ (২০১৪), হিরো (২০১৪), মোস্ট ওয়েলকাম (২০১২), নিঃস্বার্থ ভালোবাসা (২০১৩) ইত্যাদি। দ্বিতীয় সিনেমার আবির্ভাব ঘটেছে অ্যাড ফিল্ম, প্যাকেজ নাটক, স্যাটেলাইট টেলিভিশন, টেলিফিল্ম এসব সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতায়। হলিউডের কোনো কোনো সমালোচক একসময় কমার্শিয়াল আর্ট ফিল্ম বলে একধরনের সিনেমাকে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিশেষ করে ষাটের দশকে ফিল্ম স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করে নিউ হলিউডের গোড়াপত্তনের সঙ্গে জড়িত থেকে পরে স্টুডিও সিস্টেমের মধ্যেই জড়িয়ে গেছেন, যেমন স্টিভেন স্পিলবার্গ বা জর্জ লুকাস – এঁদের ছবিগুলো প্রসঙ্গে এই পদটি (কমার্শিয়াল আর্ট ফিল্ম) ব্যবহৃত হতে দেখেছি। অথবা রবার্ট অল্টম্যান বা টেরেন্স মালিক যাঁরা কখনই সরাসরি স্টুডিও সিস্টেমের মধ্যে হারিয়ে যাননি, কিন্তু চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক বিষয়টিকে একটি প্রধান বিবেচনা হিসেবে গ্রহণ করেছেন ছবি করার সময় – এরা এই ঘরানার আরো জুতসই উদাহরণ। আমাদের দ্বিতীয় সিনেমার বিবেচনায় আমার এই পদটির কথা মনে পড়ল! মনপুরা (২০০৯), ব্যাচেলর (২০০৩), পিঁপড়াবিদ্যা (২০১৩) – এসব হাল আমলের ছবিকে এই ধারায় ফেলব কি না, সে নিয়ে দ্বিধা কাজ করে। বরং পুরনো সময়ের নারায়ণ ঘোষ, আমজাদ হোসেন, আবদুলস্নাহ আল মামুন অথবা হুমায়ূন আহমেদ একটি পর্যায় পর্যমত্ম এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এসব ছবিকে জনসংস্কৃতির বিবেচকরা কখনো মূলধারার ভেতরই অফবিট চলচ্চিত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। সাম্প্রতিক যেসব ছবির নাম করা গেল তাদের সঙ্গে বৃহত্তর বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় একই সূত্রে গাঁথা দেখি আরো নানারকম ছবি; যেমন, অল্প অল্প প্রেমের গল্প (২০১৪), চোরাবালি (২০১২)। এসব ছবিকে বিবেচনায় নিলে ওই পদটি আর খুব প্রাসঙ্গিক থাকে বলে মনে হয় না। কিন্তু কী সেই বৃহত্তর বৈশিষ্ট্য? এসব ছবির নির্মাতারা বেশির ভাগ এসেছেন বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনের নাটক নির্মাণের অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে। তাঁদের একধরনের চলচ্চিত্রিক স্মার্টনেস আছে, তাঁরা চলচ্চিত্রের সমসাময়িক কারিগরি বিষয় নিয়ে উত্তেজিত এবং তাঁরা দÿ চলচ্চিত্র কারিগরদের নিয়ে কাজ করেন। তাঁরা আশা করেন যে, চলচ্চিত্র নতুন প্রজন্ম এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে চলচ্চিত্রসহ তাবৎ পণ্যের বিশ্ববাজারের সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত জনগোষ্ঠী তাঁদের নির্মিত সিনেমা দেখবেন এবং আমোদিত হবেন। বাকি থাকল অন্য চলচ্চিত্র। উইকিপিডিয়ার কাল্ট ফিল্মের তালিকাটির কিছু যোজন-বিয়োজন করলেই অন্য চলচ্চিত্রগুলোকে পেয়ে যাব আমরা। অবশ্য প্রতিটি তালিকাই তো চলমান, নতুন ছবি যুক্ত হচ্ছে সেগুলোতে প্রায়ই। অন্য চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য ভিন্ন। আমেরিকার চলচ্চিত্রকার স্টিভেন সডারবার্গ বছর দুই আগে এক বক্তৃতায় শিল্পের প্রয়োজন এবং শিল্পকে শনাক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘… sometimes when you get a really good artist and a compelling story, you can almost achieve that thing that’s impossible which is entering the consciousness of another human being … literally seeing the world the way they see it. Then, if you have a really good piece of art and a really good artist, you are altered in some way, and so the experience is transformative and in the minute you’re experiencing that piece of art, you’re not alone. You’re connected to the arts.’ অন্য চলচ্চিত্র শিল্প হয়ে উঠতে চায়, যে শিল্পের অভিজ্ঞতা মানুষকে অন্য মানুষের চেতনার মধ্যে প্রবেশ করতে, আরেকটি অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হতে অনুপ্রাণিত করে। এমন শিল্প, এমন চলচ্চিত্র বিষয় ও আঙ্গিকের দিক থেকে হতে পারে সর্বাধিক বৈচিত্র্যময়। শিল্প হিসেবে চলমান দৃশ্যমানতা – এই তাহলে চলচ্চিত্রের উৎকর্ষ, এ লেখায় আমরা যার সন্ধান করছি। পঞ্চাশের দশকের শেষভাগ থেকে ষাটের দশকের পুরোটা জুড়ে অন্য চলচ্চিত্রের প্রচেষ্টা আছে অধারাবাহিকভাবে সালাউদ্দিন, সুভাষ দত্ত, সাদেক খান ও জহির রায়হানের চলচ্চিত্রে। একটু এগিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের পর ধারাবাহিকতার প্রশ্নটি গুরম্নত্ব দিয়ে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের অন্য চলচ্চিত্রের সূত্রপাত ঘটেছিল আলমগীর কবিরের ছবিগুলোর ভেতর দিয়ে। ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), সূর্যকন্যা (১৯৭৬), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), রূপালী সৈকতে (১৯৭৯) – এসব ছবির ভেতর দিয়ে। কিন্তু তারও আগে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার, জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড (১৯৭১) বাংলাদেশের প্রথম অন্য ছবি। আলমগীর কবিরের সমকালেই সূর্য দীঘল বাড়ি (১৯৭৯), ঘুড্ডি (১৯৮০), এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০) – এসব ছবি অন্য ছবির আকাঙÿাকে চলমান রেখেছিল। আশির দশকে একটি সংগঠিত আন্দোলন হিসেবে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের আবির্ভাব এই আকাঙÿাকে একটি স্পষ্ট আকৃতি দিয়েছিল। আগামী (১৯৮৪) ও হুলিয়া (১৯৮৪) এই আন্দোলনকে সূচিত করার বাসত্মব ভিত্তি দিয়েছিল এবং এরপর আবর্তন (১৯৮৯), সূচনা (১৯৮৮), চাকা (১৯৯৩), নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৫), চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯), লালসালু (২০০১), লালন (২০০৪), আদম সুরত (১৯৮৯), মুক্তির গান (১৯৯৫), মাটির ময়না (২০০২), অমত্মর্যাত্রা (২০০৬), কীর্তনখোলা (২০০০) ও শঙ্খনাদ (২০০৪) – এভাবে অগ্রসর হয়েছিল অন্য চলচ্চিত্র। এসব ছবিরই উত্তরসূরি সাম্প্রতিককালের শুনতে কি পাও (২০১৩), মেঘমলস্নার (২০১৪), অনিল বাগচীর একদিন (২০১৫), জালালের গল্প (২০১৫) – এসব ছবি।
অন্য ছবির দলে একটি উপদল হচ্ছে নতুন প্রামাণ্যচিত্র। গত দুই দশক থেকে প্রামাণ্যচিত্রের ÿÿত্রে ব্যাপক কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছে। স্মরণ করি যে, স্টপ জেনোসাইড, প্রথম অন্য ছবি আমাদের, প্রামাণ্যচিত্রই। তারপর আদম সুরত, রোকেয়া, মুক্তির গান – এসব প্রধান কাজের ভেতর দিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের ধারাটি জারি রয়েছিল। গত বিশ বছরে অন্য ছবির ফিকশননির্মাতারা যেমন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে গেছেন, তেমনি কেবল প্রামাণ্যচিত্রে বিশেষায়ণ করেছেন এমন নির্মাতারা আবির্ভূত হয়েছেন এবং উলেস্নখযোগ্য কাজ করেছেন। বিশেষত নতুন হালকা চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রযুক্তি অন্য ছবির সংবেদনকে বহুধাগামী, প্রামত্ম পর্যমত্ম পরিব্যাপী, অংশগ্রহণমূলক করে তুলেছে। অন্য চলচ্চিত্রের চলচ্চিত্র নির্মাণ বাসত্মবতার ভেতর যে স্বাধীন অভিব্যক্তির সংলাপটি রয়েছে, সেখানে প্রামাণ্যচিত্র ব্যাপকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আবার একই সঙ্গে কিয়দংশে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলোর নানা এজেন্ডাবিষয়ক কার্যক্রম প্রামাণ্যচিত্রের আরেকটি ধারাকে ক্রিয়াশীল করেছে। রোকেয়া (১৯৯৫), আমাদের ছেলেরা (১৯৯৭), কর্ণফুলীর কান্না (২০০৫), স্বপ্নভূমি (২০০৭), স্বাধীনতা (২০০৩), জীবন জলে বেলে (২০০২), শিল্প শহর স্বপ্নলোক (২০০৫), আমাকে বলতে দাও (২০০৫), অপরাজেয় বাংলা (২০১১), নট আ পেনি, নট আ গান (২০১৩) এবং আরো অনেক ছবি মিলে অন্য ছবির এই অধ্যায়, উপদল। নির্মাতাদের কেউ কেউ প্রবাসী বাংলাদেশের নাগরিক।
চলমান ছবি আরেক রকম অভিব্যক্তির জন্যে গুরম্নত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এখন। যাঁরা নিউ মিডিয়া আর্টের চর্চা করছেন তাঁরা তাঁদের কাজে আরো নানা মাধ্যমের সঙ্গে ভিডিওতে ধারণ করা চলমান ছবিও ব্যবহার করছেন। এই চলমান ছবি প্রচলিত অর্থে চলচ্চিত্র নয়। আলাদাভাবে একটি একক প্রকাশমাধ্যম হিসেবে এই ছবি নির্মিত হয় না এবং দর্শক একে উপভোগ করে না। সিনেমা বা হোম থিয়েটারে নয়, বরং আর্ট গ্যালারি বা বিশেষ উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো স্পেসে এই ছবি প্রদর্শিত হয়, প্রায় ব্যতিক্রমবিহীনভাবেই তার সঙ্গে থাকে আরো নানা উপাদান। তার ভেতর পারফরমেন্স থাকতে পারে, শব্দের বিশেষ আয়োজন থাকতে পারে, ফটোগ্রাফ, টেক্সট, অাঁকা ছবি, সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার, যেমন জিআইএস বা জিপিএসের আউটপুট থাকতে পারে… এর কোনো শেষ নেই। নিউ মিডিয়া আর্টে ব্যবহৃত চলমান ছবি, পৃথিবীর আর সব স্থানের মতোই চলচ্চিত্রের এক বিশেষায়িত যাত্রা। তবে প্রযুক্তি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে করে প্রচলিত চলচ্চিত্র এবং নিউ মিডিয়া আর্ট ভবিষ্যতে এক মোহনায় মিলবে না, এমন নিশ্চিত করে বলা যায় না। আপাতত বলার কথা অবশ্য এই যে, নিউ মিডিয়া আর্টের চর্চা ক্রমেই বিসত্মার লাভ করছে বাংলাদেশে।
চলচ্চিত্রবিষয়ক আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার বিসত্মার ঘটেছে অনেকদূর। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের সনদ প্রদান করা হচ্ছে। অবশ্য নামের ÿÿত্রে ভিন্নতা আছে বিষয়ের। কোথাও মিডিয়া স্টাডিজ, কোথাও ফিল্ম স্টাডিজ, কোথাও টেলিভিশন অ্যান্ড সিনেমা স্টাডিজ নামে চলছে এসব লেখাপড়া। লÿণীয় যে, স্টাডিজ আখ্যাটি প্রায় সকলের মধ্যেই রয়েছে। পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতায় আমরা জানি, স্টাডিজ এবং প্রোডাকশন দুটি আলাদা ধারা চলচ্চিত্রবিষয়ক আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার। এই ভিন্নতা বিষয়ে সমালোচনা আছে, কিন্তু এটা বাসত্মবতা এবং আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের চলচ্চিত্রবিষয়ক লেখাপড়া মূলত পশ্চিমের ফিল্ম স্টাডিজ পাঠ্যক্রমকেই অনুসরণ করতে চাইছে। অমত্মত একটি অধ্যয়ন প্রকল্পের যে অংশটুকু চলচ্চিত্রের জন্যে প্রাসঙ্গিক সেÿÿত্রে তো বটেই। এটি, আমার ধারণা, খোলা চোখে দেখে যে, নানা সীমাবদ্ধতাজনিত একটি সিদ্ধামত্ম। চলচ্চিত্র নির্মাণবিষয়ক লেখাপড়া চালু করার জন্যে যে কারিগরি সুবিধাগুলো প্রয়োজন এবং জনবল প্রয়োজন তার অপ্রতুলতা বিষয়টিকে অনেকটা তাত্ত্বিক পর্যায়ে রেখে দেওয়ার সিদ্ধামত্মকে প্ররোচিত করেছে। মজার কথা, বিপুলসংখ্যক উৎসাহী ছাত্র এ লেখাপড়ায় অংশগ্রহণ করছে চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক নয়, নির্মাতা হওয়ার লÿÿ্য। অমত্মত হাতে-কলমে কাজ করতে চায় তারা ভবিষ্যতে সিনেমায়, টেলিভিশনে, বিজ্ঞাপনচিত্রে। আপস ফর্মুলা হিসেবে এসব ফিল্ম স্টাডিজের পাঠক্রমে কোথাও কোথাও শেষের দিকে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণবিষয়ক কোর্স থাকে। পেশা হিসেবে চলচ্চিত্রবিষয়ক সম্ভাবনা নিয়ে এখন বেশ উত্তেজিত তারম্নণ্য। এই উত্তেজনার একটি বড় কারণ অবশ্য গজিয়ে ওঠা অনেক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সুযোগে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং চলচ্চিত্রের নানা কারিগরি ÿÿত্রে কাজ করাও নতুন প্রজন্মের আকাঙÿার একটি বড় অধ্যায়।
বাংলাদেশ সরকার চলচ্চিত্র নিয়ে এখন বেশ উত্তেজিত। ফিল্ম ইনস্টিটিউট শেষ পর্যমত্ম চালু হয়েছে, ফিল্ম আর্কাইভের নিজস্ব ভবন নির্মিত হচ্ছে, আর্কাইভের কার্যক্রমের গতিও সঞ্চারের আভাস মেলে। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্যে অনুদান একটি নিয়মিত বার্ষিক প্রক্রিয়ায় পড়ে গেছে। স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণের জন্যে আলাদা করে অনুদান দেওয়া শুরম্ন হয়েছে। এফডিসির ডিজিটাল আধুনিকায়ন ঘটেছে একটি পর্যায় পর্যমত্ম। জেলা শহর পর্যমত্ম ডিজিটাল প্রÿÿপণ ব্যবস্থাকে বিসত্মৃত করার কথা শোনা যাচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে চলচ্চিত্র এখন খানিকটা জায়গা পেয়েছে। সেখানে চলচ্চিত্র সংসদগুলো চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠান আয়োজনের অবকাঠামোগত সুবিধা পাচ্ছে। শিল্পকলা একাডেমীর উদ্যোগে জেলায় জেলায় গুরম্নত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর নিয়মিত আয়োজনের কথাও শোনা যাচ্ছে।
চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত গতানুগতিক পুঁজির বাইরে নানারকম করপোরেট প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্র প্রযোজনায় এগিয়ে আসছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, মোবাইল ফোন কোম্পানি, অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকা– ইতিমধ্যে পৃষ্ঠপোষকতা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এমন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগ মূল্যায়নের সময় সম্ভবত এখনো আসেনি, কিন্তু তিন ধারার চলচ্চিত্রনির্মাতারাই এ ধরনের আনুকূল্যে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং পরে আমরা দেখব এই লেখায় যে, চলচ্চিত্রের তিনটি ধারার ভেতরই নানা ধরনের গুণগত পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে তার একটি বড় কারণ এই নতুন ঘরানার পুঁজির আবির্ভাব।

২. কিছু অনুধাবন
প্রথম সিনেমা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উৎকর্ষ বিবেচনায় সেভাবে প্রাসঙ্গিক নয়। এ ধরনের ছবি বরং যারা গণমাধ্যম বা ভিজ্যুয়াল নৃতত্ত্বের ছাত্র তাদের আগ্রহের বিষয়। তবে এ আলোচনায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সার্বিক প্রেÿাপট রচনায় সংÿÿপে কিছু অনুধাবনের কথা লেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রথম ছবি আশির দশকের শেষভাগে সংকটের মুখোমুখি হয় এবং গত দশকে সে সংকট চরম অবস্থায় পৌঁছে যায়। প্রথমে ভিসিআর এবং এরপর স্যাটেলাইট টেলিভিশনের আবির্ভাব বিনোদন সিনেমার দর্শকের সামনে বিকল্প পথ খুলে দেয়। অপেÿাকৃত নিমণ কারিগরি মানের, দুর্বল নির্মিতি, দুর্বল কাহিনি ও অভিনয়সমৃদ্ধ, অনেক ÿÿত্রেই ভারতীয় কোনো ছবির নকল বা কপিরাইট নিয়ে শট বাই শট কপি করা এসব ছবি আর বিনোদন-প্রত্যাশী দর্শককে টানতে পারছিল না। এ সময় মরিয়া প্রথম সিনেমা ভয়ংকর ভায়োলেন্ট ও অশস্নীল হয়ে ওঠে। ‘কাটপিস’ নামের পর্নোগ্রাফিক উপাদানে ভারী হয়ে ওঠে সিনেমার সার্বিক পরিবেশ। এসব উপাদান দর্শককে প্রেÿাগৃহবিমুখ করে তোলে এবং প্রথম চলচ্চিত্র প্রায় ধ্বংসের সীমানায় পৌঁছে যায়। সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থা, প্রযোজক ও নির্মাতাদের নিজেদের অবস্থা অনুধাবন, নতুন ঘরানার করপোরেট পুঁজির আবির্ভাব, ডিজিটাল প্রযুক্তিতে উত্তরণ – এসব মিলে প্রথম চলচ্চিত্রের একধরনের চিকিৎসা এখন চলছে। যেসব ছবির নাম আগে উলেস্নখ করেছি তার সব কটিই এই দশকে নির্মিত এবং কিছুমাত্রায় ব্যবসায় সফল হয়েছে। কিন্তু নকলের বা কপিরাইট কেনার প্রবণতা এই চলচ্চিত্রকে ছেড়ে যায়নি। কপিরাইট কিনে রিমেক করে বিনোদন হিসেবে এই চলচ্চিত্র দর্শক ধরে রাখতে পারবে, এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। এই লেখা যখন লিখছি তখন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় আশিকি নামের একটি ছবি তৈরি হচ্ছে। এই ছবির মূল সূত্র এক তেলেগু ছবি, যার নাম ইশ্ক। সে ছবির রিমেক হয়েছে কলকাতায় লাভ গার্ডেন নামে। এখন থার্ড হ্যান্ড আশিকি কতখানি দর্শক পাবে সে চিমত্মা তারা করে দেখতে পারেন, বা হঠাৎ হুজুগে একটি-দুটি এরকম ছবি তাদের পুঁজির ধান্ধায় সফল হলেও এটি একটি ক্রমাগত প্রক্রিয়া হওয়া সম্ভব কি? এটি অবশ্যই আমার চিমত্মার বিষয় নয়, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, প্রথম সিনেমা বলতে আমরা যে ধরনের অবাধ বাণিজ্য চলচ্চিত্রকে বুঝি তা নিয়ে আসলে কারোই উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই। এ তো আর্ট অবশ্যই নয়, ভারী বা ওজনহীন শিল্প কার্যক্রমও নয়, যা ষোলো কোটি মানুষের দেশে কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। এ করে কোথাও পৌঁছনো যাবে না। এর যারা আঞ্চলিক এবং বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বী তারা অনেক শক্তিমান এবং আজকের যোগাযোগের বাসত্মবতায় অপ্রতিরোধ্য। আমাদের প্রথম চলচ্চিত্র ষাট ও সত্তরের দশকে যে বন্ধ দরজা-জানালার প্রটেকশন পেয়ে এসেছিল সে নিয়ে মরাকান্না কাঁদতে দেখা যায় মাঝে মাঝে এ ঘরানার লোকদের। তাঁরা সেই ‘সুদিন’ ফেরত চান সুযোগ পেলেই। এই দাবি ও আশা হাস্যকর। একটি সত্যিকারের লৌহবেষ্টনীর রাষ্ট্রকাঠামো ছাড়া আজকের দিনে এরকম প্রটেকশন দেওয়া সম্ভব নয়, আর আমরা নিশ্চয়ই সেরকম রাষ্ট্রকাঠামো কামনা করি না। ধারণা করা যেতে পারে, নতুন ধারার যে পুঁজি এখন আসছে চলচ্চিত্র প্রযোজনায়, তারা এসব বাসত্মবতা আমাদের চেয়ে কম বোঝে না। অনুমান করা যায়, তারা দীর্ঘ মেয়াদে নানা কৌশল অবলম্বন করবে। সে কৌশলের ভেতর দ্বিতীয় এমনকি অন্য চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ (ইতিমধ্যে এরকমটি ঘটে গেছে), বিদেশি পুঁজি এবং প্রযুক্তি ডেকে এনে হাইব্রিড অথবা একধরনের গেস্নাবাল এন্টারটেইনমেন্ট বাণিজ্য – এসবই অমত্মর্ভুক্ত হতে পারে।
মুশকিল হচ্ছে এখনকার দ্বিতীয় সিনেমার মানুষদের নিয়ে। তাঁরা অবশ্য নিজেদের দ্বিতীয় ভাবতে চান না, প্রাণপণে প্রথম হতে চান। তাঁরা তারকাসমৃদ্ধ, চকচকে যে বিনোদন উপস্থাপন করবেন তাতে খাদ যতটাই থাকুক না কেন দেশজোড়া হলভরা মানুষ তা দেখবেন এবং বিনোদিত হবেন – এটা আশা করেন। তাঁরা মধ্যবিত্ত দর্শককে প্রেÿাগৃহে ফেরত আনার সংকল্প ব্যক্ত করেন এবং তাঁরাও প্রটেকশন চান। তাঁদের চাওয়ার ভঙ্গিটি ভিন্ন। ‘ওরা যদি আমাদের টেলিভিশন না দেখে আমরা ওদের টেলিভিশন দেখব কেন?’ ‘আমাদের ছবি যদি ওদের দেশে না দেখানো হয় তাহলে আমরা ওদের ছবি দেখাব কেন?’ – এধরনের তৃতীয় শ্রেণির দেশপ্রেমকে সুড়সুড়ি দিয়ে তাঁরা দেশি সিনেমার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। আর মধ্যবিত্ত দর্শক বলতে কারা কী বোঝেন সেও এক প্রশ্ন। ষাট ও সত্তরের দশকের চিত্রালী পড়া, রিকশা চড়ে রিয়ারস্টলে কবরী-রাজ্জাককে দেখতে আসা সে মধ্যবিত্ত আর নেই। অর্থনীতি জটিল হয়ে উঠেছে, নীল কলারের মানুষেরা, বিশেষত যারা কোনো প্রযুক্তিকর্মে নিয়োজিত তারা সাদা কলারের করম্নণ কলম পেষাদের চেয়ে বেশি উপার্জন করে। আবার যোগাযোগের উন্নতি আর গতির তোড়ে নগর, মফস্বল আর গ্রামের রম্নচি, চিমত্মা, প্রকাশ একাকার। এ সময়ে নিরাপদ, নির্বিষ মধ্যবিত্ত পাবেন কোথায়? বরং তাঁরা, দ্বিতীয় সিনেমার মানুষেরা, নতুন প্রজন্মের কথা যখন বলেন তখন সেটা বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তরম্নণেরা এখন অর্থনৈতিক সিদ্ধামত্ম গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ÿমতাশালী হয়ে উঠছে। তারা যদি প্রেÿাগৃহমুখী হয়, বাংলাদেশের সিনেমা দেখবে বলে, তাহলে ‘সুদিন’ ফিরতে পারে। করপোরেট পুঁজিতে এখন ব্র্যান্ডিং একটি গুরম্নত্বপূর্ণ ধারণা। তারা কেবল নিজেদের পণ্য ও সেবার ব্র্যান্ডিং করে না; তারকা, স্বদেশ, দেশপ্রেম, জনসেবা এসব বস্ত্ত ও অবস্ত্তগত বিষয়েরও ব্র্যান্ডিং করে; আসলে নিজেদের পণ্য ও সেবা বিক্রয়ের জন্যে এরকম বিষয়কে জড়িয়ে মার্চেন্ডাইজিং করে। দ্বিতীয় সিনেমা, এমনকি তর্কের খাতিরে বলা চলে প্রথম সিনেমাও, যদি এরকম ব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়ায় জনচেতনায় হুজুক সৃষ্টির সুযোগ নিতে পারে তাহলে তার বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ আছে হয়তো। জনপ্রিয় সাহিত্য বা সংগীতের ÿÿত্রে এরকম কিছু আমরা ঘটতে দেখছি তো। তবে সিনেমার সঙ্গে ওই মাধ্যমগুলোর অমিলেরও অভাব নেই। আর দ্বিতীয় সিনেমা বলে আলাদা করে কিছু থাকবে কি না সেটা অনেকটাই নির্ভর করে এ ধারায় কাজ করার জন্যে কিছু নির্মাতা নিজেদের সচেতনভাবে প্রস্ত্তত করছেন কি না তার ওপর। কেউ রবার্ট অল্টম্যান বা টেরেন্স মালিক হতে চান কি না সেই সিদ্ধামত্ম তাঁকেই নিতে হবে। এটুকু বলা যায়, দ্বিতীয় সিনেমা তার শ্রেষ্ঠ অবয়বে চলচ্চিত্রের এক উৎকৃষ্ট ধারা হয়ে উঠতে পারে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্যে বিষয় ও আঙ্গিক ভাবনায় তাকে সরল ও উদার হতে হবে সম্ভবত। একধরনের লোকজ চলচ্চিত্রের কথাই হয়তো বলছি আমরা, সমকালীন বাংলাদেশের লোকচিমত্মায় যা আবেগ ও বোধের তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। অন্য চলচ্চিত্রের সঙ্গে মিলে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উৎকর্ষে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে পারে।
অন্য চলচ্চিত্র শিল্প হয়ে উঠতে চায়। আমরা এরপর থেকে এই লেখায় অন্য চলচ্চিত্র অর্থে শিল্প-চলচ্চিত্র পদটি ব্যবহার করব। স্টপ জেনোসাইড থেকে শুরম্ন করে সাম্প্রতিক মেঘমলস্নার পর্যমত্ম পঞ্চাশ বছরের যে শিল্প-চলচ্চিত্র অনুধাবন, নির্মাণ ও প্রসারের গ–বদ্ধ আন্দোলন তার অভিব্যক্তি এসব ছবি। মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন প্রক্রিয়ার চূড়ামত্ম বৈরিতার মুখে এবং আশির দশকের সামরিক শাসনের কালে তরম্নণ চলচ্চিত্রনির্মাতাদের ব্যাপক রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে এই শিল্প-চলচ্চিত্র নির্মাণপ্রক্রিয়ায় জড়িতদের একটি বড় অংশ বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তারা বিষয়, ফরম্যাট, দৈর্ঘ্য, নির্মিতি, প্রদর্শন – চলচ্চিত্রের পুরো জীবনচক্রেই বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে নিরীÿা করেছিল। এমন এক প্রকল্প আশি ও নববইয়ের দশকের গোড়ায় প্রচলিত হয়েছিল যে, বিকল্প ও শিল্প-চলচ্চিত্র যেন সমার্থক ধারণা। আসেত্ম আসেত্ম নানা সম্ভাবনার দরজা খুলতে শুরম্ন করলে বা
শিল্প-চলচ্চিত্রনির্মাতারা একধরনের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের ভেতর দিয়ে র‌্যাডিক্যাল বিকল্প প্রকল্পের বাইরেও শিল্প-চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরম্ন হয়েছে। প্রথম প্রজন্মের বিকল্প চলচ্চিত্রনির্মাতাদের পর এমন নতুন নির্মাতাদের আবির্ভাব ঘটছে, যাঁদের অনেকে হয়তো শিল্প-চলচ্চিত্র আন্দোলনের যাত্রাটির ভেতর দিয়ে যাননি। হয়তো তাঁরা চলচ্চিত্রবিষয়ক কিছু প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ সমাপ্ত করেছেন। হয়তো ডিজিটাল প্রযুক্তির হালকা আয়োজন ও উত্তেজনাকর সম্ভাবনা তাঁদের আকর্ষণ করেছে, হয়তো চলমান ছবির যে ব্যাপক সম্ভাবনা একালে তা তাঁদের টেনে এনেছে নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণে। নতুন যে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ জোয়ারের কথা উলেস্নখ করেছি, সেখানে এমন নির্মাতাদের পাওয়া যাচ্ছে যাঁরা চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্বে চলচ্চিত্র-আন্দোলনে সংশিস্নষ্ট ছিলেন না। অনেকে চলচ্চিত্র নির্মাণপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই এই আন্দোলনের বর্তমান যে অবয়ব তার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, কিছু মাত্রায় হয়তো সংশিস্নষ্টও হচ্ছেন, অনেকে থেকে যাচ্ছেন এর বাইরেই। যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে এরকম ঘরানার নির্মাতারা ফিকশন ছবির ÿÿত্রেও আত্মপ্রকাশ করবেন বা ইতিমধ্যে করেছেন। এটি কোনো নেতিপ্রবণতা হিসেবে দেখার চেষ্টা করছি না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বাসত্মবতায় বিকল্পই একমাত্র সম্ভাবনা নয় তারম্নণ্যের সামনে, আর বিকল্প এ মুহূর্তে তাদের সামনে কী ধরনের আদর্শ তুলে ধরে সেও এক প্রশ্ন। সেই সঙ্গে যে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরম্ন হয়েছে চলচ্চিত্র বিষয়ে, সেখানে আদর্শিক কোনো সংগ্রামের, কেবল চলচ্চিত্র বিষয়েও, অধ্যায় আলোচিত হয় কি? পড়ছিলাম কদিন আগেই, ‘Over the years, the historical separation between theoretician and filmmaker has become institutionalized to everyone’s detriment. Film as a commodity first and art second (if at all) has been historically embedded within the North American film industry. Now, this skewed division is further buttressed by an ever-expanding educational system that quite often presents film production and film theory as conflicting interests. Thus we have distinctions like critical studies, vs. film production, cinema studies vs. filmmaking, political films vs. films notarized as art. What these separations create is a peripheral cinema that is socially conscious, but for the most part ideologically invisible.’ এইসব প্রশ্ন বাংলাদেশের শিল্প-চলচ্চিত্রে ক্রমশ জরম্নরি হয়ে উঠবে। যাঁরা বিকল্প চলচ্চিত্রের প্রথম প্রজন্মের নির্মাতা তাঁদেরও কেউ কেউ নব্য করপোরেট পুঁজির ব্যবস্থাপনায় এখন ছবি নির্মাণ করছেন। এভাবে আমরা হয়তো এমন ছবি পাব যা সামাজিকভাবে সচেতন বটে, কিন্তু আদর্শিক দিক থেকে অদৃশ্য! এমন ছবি ভালো ছবির তালিকায় একটি সংখ্যা বৃদ্ধি করবে, করপোরেট পুঁজিকে একধরনের সিনেমা-প্রেস্টিজ দেবে – হয়তো এক অর্থহীন নিগেশনই শেষ পর্যমত্ম। তবে এ মুহূর্তে প্রামিত্মকতা তার সবচেয়ে বড় সমস্যা। যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে এই লেখা তাতে মনে হতে পারে যে, শিল্প-চলচ্চিত্র গুরম্নত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে লোকপ্রিয়তার না হলেও লোকস্বীকৃতির ÿÿত্রে, অমত্মত। বাসত্মবে, দৃশ্যমানতার যে ব্যাপক ÿÿত্র আমাদের জীবনে সেখানে শিল্প-চলচ্চিত্র আজো চূড়ামত্ম রকম প্রামিত্মক এক সংবাদ; সংবেদ সৃষ্টির ÿÿত্রে প্রামিত্মকতর এক উপযোগ।
বরং শিল্প-চলচ্চিত্রের মধ্যে প্রামাণ্যচিত্র অধ্যায়টিই এÿÿত্রে যেন এগিয়ে! এ কথায় অনেকেই, প্রায় সকলেই, আপত্তি তুলবেন। কথা এই যে, প্রামাণ্যচিত্র অবশ্যই চলচ্চিত্রের অপেÿাকৃত কম উত্তেজক এক অধ্যায়। কিন্তু শিল্প-চলচ্চিত্রের যে নিয়তি এখন আমাদের দেশে – সে বিবেচনায়, একটি ফিকশনের তুলনায় একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হবার এবং দর্শকের কাছে পৌঁছুবার সম্ভাবনা বেশি। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, সহজ বিবেচনায়, কম ব্যয়সাধ্য। প্রামাণ্যচিত্র অপেÿাকৃত কম মানুষের যৌথতায় রচিত হতে পারে – ফলে একজন স্বাধীন নির্মাতার জন্যে আয়োজনটি সহজসাধ্য হয়। আর প্রামাণ্যচিত্র প্রায়ই আদর্শ, এজেন্ডা, প্রতীতি ধরে অগ্রসর হয়। এভাবে দেশে এবং বিদেশে আগ্রহী গোষ্ঠী এ ধরনের ছবির পÿাবলম্বন করতে চাইতে পারে নানাভাবে। এসব গেল নির্মাণ পার্শ্বের কথা। প্রামাণ্যচিত্র অধিকাংশ ÿÿত্রেই একটি ফিকশনের তুলনায় কম দৈর্ঘ্যের হয় এবং সে কারণেই এর অনানুষ্ঠানিক প্রদর্শনী আর্থিকভাবে সহজতর। আর যেমন উলেস্নখ করা গেছে, প্রামাণ্যচিত্র অনেক ÿÿত্রেই সমাজের আগ্রহী গ্রম্নপের পÿÿ কাজ করে। একই ÿÿত্রে কর্মরত অনেক প্রতিষ্ঠান এরকম প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করে থাকে। এভাবে প্রদর্শন পার্শ্বেও প্রামাণ্যচিত্র ফিকশনের চেয়ে এগিয়ে থাকে। অনেকে হয়তো আপত্তি তুলবেন যে, এভাবে প্রামাণ্যচিত্রকে একটি গৎবাঁধা কাঠামোর মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সে খানিক হচ্ছে তো নিশ্চয়ই; আমরা বাংলাদেশে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের ÿÿত্রেই যে বিষয়বৈচিত্র্য দেখেছি তাতে করে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এসব ছককে খুব সহজেই ভুল প্রমাণ করতে পারে প্রামাণ্যচিত্র। কিন্তু সংখ্যার বিচারে সেরকম বৈচিত্র্যের তুলনায় বরং আমাদের কাঠামোর ভেতরে এঁটে যাবে এমন ছবির সংখ্যাই বেশি। সুতরাং এই চিমত্মা গ্রাহ্যই হতে পারে যে, শিল্প-চলচ্চিত্রের মধ্যে প্রামাণ্যচিত্রের সম্ভাব্যতা, নির্মাণে ও প্রদর্শনে অধিক।
গেল দুই দশকে প্রযুক্তির প্যারাডাইম পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কথাটি এখন পুরনো। কিন্তু চলচ্চিত্রের আলোচনায় কথাটি বারবার না পেড়ে পারা যায় না। নতুন প্রযুক্তি দৃশ্যমানতাকে সমাজের কেন্দ্রীয় প্রবণতায় পরিণত করেছে। এই দৃশ্যমানতা বাসত্মব অথবা ভারচুয়াল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, নানারকম অনলাইন সাইটে, বস্নগে, অ্যাপিস্নকেশনে (apps), টেলিভিশনে ও সিনেমায় দৃশ্যমানতা এখন উপস্থিত হওয়া, মতামত প্রকাশ করা, মতামত সৃষ্টি করা, চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা – এ সকল কর্মতৎপরতার বাহন হয়ে উঠেছে। এখন আমরা যখন চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলছি তখন প্রচলিত অর্থে সিনেমার কথা বলছি না কেবল; আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে চালিত করছে যে দৃশ্যমানতা তার কথা বলছি। প্রযুক্তির পরিবর্তনে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং প্রদর্শন অপেÿাকৃত সহজ হয়ে গেছে, এরকম সহজীকরণ করা যেতেই পারে; কিন্তু চলমান দৃশ্য-প্রযুক্তি তারও চেয়ে বেশি কিছু। আমরা তো একথা মানব যে আগামী এক দশকের ভেতর বিপুলসংখ্যক দর্শক চলচ্চিত্র দেখবে তার একটি ব্যক্তিগত ডিভাইসে; হয়তো সেটি তার স্মার্টফোন, ফ্যাবলেট বা ট্যাবলেট। এই দেখা আবার ইন্টারঅ্যাকটিভ হয়ে উঠছে। দর্শকের এই সক্রিয়তা চলচ্চিত্রনির্মাতার জন্যে নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনাও। আর দৃশ্যমানতার এইসব নতুন ডায়নামিকস নিয়ে ÿমতার নতুন রাজনীতিও বিকশিত হচ্ছে। চলচ্চিত্র একজন দর্শকের যে সময় আশা করে তা ক্রমশ দুর্মূল্য হয়ে উঠছে। কারণ দৃশ্যমানতার শক্তি ব্যক্তির কাছে গুরম্নত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে আরো বেশি সময় দাবি করতে পারছে। আপনার চলচ্চিত্রকে এখন কেবল চলচ্চিত্র নয়, দৃশ্যমানতার এক গোটা ব্যবস্থার সঙ্গে দর্শকের সময়ের জন্যে লড়তে হবে। এসব চিমত্মা কিন্তু চলচ্চিত্রের উৎকর্ষের সামগ্রিক চিমত্মায় প্রাসঙ্গিক।

৩. অনিশ্চিত ভাবনাগুলো
একটি পুঁজিনির্ভর রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে চলচ্চিত্র কর্মকা- চলতেই থাকবে। সে চলায় রাজতব বা মোস্ট ওয়েলকাম জাতীয় ছবি জয়ী হবে না মনপুরা, ব্যাচেলর বা পিঁপড়াবিদ্যা জয়ী হবে, নাকি তারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে সেটা আন্দাজ করার সহজ নয়। প্রবণতা যা দেখা যাচ্ছে তাতে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, চিকন, চকচকে বিনোদন একটু একটু করে জায়গা করে নেবে। মোস্ট ওয়েলকাম ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নিয়ে আরবান ফোক, উত্তরাধুনিকতা – এরকম নানা কঠিন জ্ঞানমুখী কথাবার্তা অ্যাকাডেমিক ও বুদ্ধির নৈরাজ্যের জগতে কিছুকাল চলমান থাকবে, কিন্তু পাবলিক তার থোড়াই কেয়ার করবে। ঊর্ধ্বমুখী অর্থনীতি সমাজের পণ্য-ভোগ-রম্নচির একধরনের ‘উন্নয়ন’ ঘটাবে এবং এটা এ কারণেও ঘটবে যে, বিনোদনপ্রত্যাশী ভোক্তা বিদেশি এ জাতীয় বিনোদন সিনেমার সঙ্গে আরো বেশি করে পরিচিত ও স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে থাকবে। এভাবে চাহিদা-পার্শ্বে এ ধরনের চলচ্চিত্র গুরম্নত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সুতরাং চ্যালেঞ্জটা সরবরাহ-পার্শ্বের ওপর, তারা কতটা স্মার্ট হয়ে উঠবে, বিনিয়োগে, উদ্ভাবনে ও দÿতায় তার ওপর। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কে দর্শকের সময়-চাহিদার সঙ্গে সবচেয়ে ভালো খাপ খাওয়াতে পারবেন সেও এক বড় প্রশ্ন। দেশি বাজারে এই চলচ্চিত্র ক্রমাগত প্রভাব বিসত্মারী হয়ে উঠবে, অথবা আরেকটি সম্ভাবনা এই যে, এদের বিদেশি শত্রম্ন যারা তারা সিনেমার এই দেশি বাজার দখল করে নেবে। এটা নির্ভর করবে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত কর্তৃপÿÿর বায়াস এবং স্থানীয় নির্মাতা-পুঁজি খাটিয়ে প্রভৃতির স্মার্টনেসের ওপর। আঞ্চলিক ও আমত্মর্জাতিক বিনোদন সিনেমা এবং সেগুলো বিকিয়ে এদেশে টাকা কামাতে চান যাঁরা তাঁরা তো ওত পেতেই আছেন। সুযোগ পেলে তাঁরা এদেশের বিনোদন সিনেমার বাজার পুরোটাই দখল করে নেবেন এবং দেশি বিনোদন সিনেমার বারোটা বাজবে। তেমনটি আমরা চাই কি? অমত্মত আমি তা মনে করি না। কারণ একটি টিকে থাকতে সমর্থ ইন্ডাস্ট্রির অভাবে আমাদের চলচ্চিত্র নানামুখী সংকটের মুখোমুখি হবে। এর মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে চলচ্চিত্রবিষয়ক শিÿার যে ব্যবস্থা রয়েছে নানা আকারে, সেটি অনেকখানি কমে যাবে। কারণ চলচ্চিত্র একটি পেশা হিসেবে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় থাকবে না, চলচ্চিত্রশিÿার চাহিদা হ্রাস পাবে। আপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের এই প্রকল্প বিরাজমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কাঠামোয় বাসত্মবসম্মত। এভাবে চলচ্চিত্রের জন্যে প্রয়োজনীয় দÿ জনশক্তির অভাব দেখা দিতে পারে। তর্কের খাতিরে বলা যেতে পারে, টেলিভিশন এরকম জনশক্তির চাহিদাকে সবসময় জিইয়ে রাখবে। কিন্তু চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলে দেশি টেলিভিশনের বাণিজ্যের কী অবস্থা হবে তা কে জানে! তবে সেও যে সংকটে পড়বে তা আন্দাজ করা যায়। কারণ যে বাসত্মবতা দেশি চলচ্চিত্রে বাণিজ্যের এই অবস্থার সৃষ্টি করবে সেই বাসত্মবতাই দেশি বাণিজ্য টেলিভিশনকে অনিরাপদ, বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতার হাতে ছেড়ে দিতে পারে। আর আরেকটি বিষয় কিঞ্চিৎ বিমূর্ত কিন্তু জরম্নরি। তা হলো প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার জন্যে একটি আবশ্যক শর্ত হলো স্বাস্থ্যবান প্রতিষ্ঠানের অসিত্মত্ব। আমাদের চলচ্চিত্রের এক প্রধান সমস্যা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের অভাব। সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই চলচ্চিত্রের যে মূল অবয়ব সেটি দুর্বল : তার আকার, বাজারে প্রভাব, তার নিজের বেছে নেওয়ার ÿÿত্রে (বিনোদন সরবরাহ) পারঙ্গমতা সব কটিতেই। এর বিপরীতে যখন অন্য চলচ্চিত্রের আন্দোলন শুরম্ন হয়েছে তার ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। অনেকটা রেসের পেস সেটার (pace setter) যে কাজটি করে প্রতিষ্ঠান তো সে কাজটিই করে প্রতিষ্ঠানবিরোধীদের জন্যে! কিন্তু আমরা সম্ভবত আমাদের আলোচনাটিকে অধিক বিসত্মৃত করে ফেলছি। আমরা বরং ধরে নিই যে, একটি মোটামুটি আকারের দেশি বিনোদন সিনেমা টিকে থাকবে এবং এ সিনেমা সাম্প্রতিক প্রবণতাকে অনুসরণ করে একধরনের স্মার্ট, প্রযুক্তি-আশ্রয়ী, তরল বিনোদন সরবরাহ করবে। দ্বিতীয় সিনেমা আলাদা করে তার অসিত্মত্ব বজায় রাখতে পারে, যদি কিছু নির্মাতা রম্নচি ও চেতনায় এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন যেটি তরল বিনোদনে মিশিয়ে দিতে পারবে গভীর কিছু সংবেদ। যে সিনেমা সেরিব্রাল অথবা কমিটেড হবে না, কিন্তু তার থাকবে মানুষের সদাকাঙÿা ও স্বপ্নকে নাড়া দেওয়ার ÿমতা। অথবা মানুষ একটি রÿণশীল, নিরাপদ ঘেরাটোপের মধ্যে এরকম চলচ্চিত্রকে উপভোগ করবে। একটি বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, এই চলচ্চিত্র; দ্বিতীয় সমেত; নিয়ে পৃথিবীময় আমরা একটা সাড়া ফেলে দেব, যেমন আমেরিকার স্টুডিওনির্ভর সিনেমা বা ভারতের হিন্দি/তামিল ছবি পারে – সেরকমটি ঘটবে না। কারণ চলচ্চিত্র শ্রমঘন নয়, পুঁজিঘন ইন্ডাস্ট্রি এবং ভীষণ প্রযুক্তিপরায়ণ। এই দুটি বিষয়ই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রামত্মসীমায় অবস্থিত রাষ্ট্র হিসেবে এরকম একটি পণ্য দিয়ে বিশ্ব বা আঞ্চলিক বাজার দখল করার ÿÿত্রে আমাদের পÿÿ কাজ করবে না। অন্যদিকে একথা বলার স্পর্ধা দেখাতে চাই যে, এই চলচ্চিত্র একটি জাতীয় সিনেমার ÿÿত্র প্রস্ত্তত করবে না। কারণ আমত্মর্জাতিক যে সিনেমার সঙ্গে এমনকি নিজের দেশের বাজার দখল নিয়ে সে যুদ্ধ করবে, সে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেষ্টায় তাকে যে মালমসলা দিয়ে এই বিনোদন উৎপাদন করতে হবে তা চলচ্চিত্রের নতুন বিশেষায়িত, স্থানিক ভাষা নির্মাণে যেমন উৎসাহী হবে না, তেমনি বিষয়-ভাবনায় স্থানিক গভীরতা প্রধান হবে না। অগভীর, প্রতিভাধর, ইয়ার্কি নিয়ে খুব বেশি দূর যাওয়া যায় না। জাতীয় সিনেমা তার চেয়ে অনেক দূরযাত্রা তো বটেই।
কিন্তু জাতীয় সিনেমা গুরম্নত্বপূর্ণ কেন? আসলে চলচ্চিত্রের উৎকর্ষ অর্জন গুরম্নত্বপূর্ণ। জাতীয় চলচ্চিত্রকে এই উৎকর্ষ অর্জনের বাহন মনে করছি আমাদের মতো সমাজে। উৎকৃষ্ট চলচ্চিত্রবিষয়ক কর্মকা-কে একটি ক্রমাগত প্রক্রিয়া হিসেবে প্রচলিত রাখার জন্যে তার একটি জাতীয় অবয়ব প্রয়োজন। জীবনযাপনের কেন্দ্রে এখন দৃশ্যময়তা। এই দৃশ্যময়তায় নেতিপ্রবণতার কোনো সীমা নেই। পণ্য-সংস্কৃতির পÿÿ প্রচার, স্মার্ট ও সিস্নক পণ্যসম্ভারের সঙ্গে বিক্রি করা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল যত মতামত। প্রামত্মজনবিরোধী, নারীবিরোধী, ভায়োলেন্ট, পারভার্ট, সংস্কারাচ্ছন্ন, অগভীর-অস্বচ্ছ দেশাত্মবোধক কূপম-ূকতা প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে দৃশ্যমাধ্যমসমূহে। প্রেÿাগৃহে, টেলিভিশনে, স্মার্টফোনে সর্বত্র দৃশ্যমানতার ভেতর দিয়ে এই নেতিপ্রচার, মগজ ধোলাই। আর তার সঙ্গে আছে সমতায়িত, একশৈলিক, ভয়ারিস্ট বিশ্বভাবনা। যেন এই পৃথিবী হচ্ছে এক সর্বাধুনিক শপিং মল আর মানবজীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ধনী, শ্বেতচর্ম, পুরম্নষ ট্যুরিস্ট হিসেবে সেই শপিং মলে সওদা করা, ভোগে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হওয়া। চলমান ছবির হাজারো উপস্থাপনা – দেশি ও বিদেশি বাণিজ্য চলচ্চিত্র, পণ্যবিজ্ঞাপন, টেলিভিশন, ইন্টারনেট মিলে এই নেতিদৃশ্যজগৎ। এই নেতিপ্রবণতার বিপরীতে দেশের চলচ্চিত্রের উৎকর্ষের গুরম্নত্ব বিবেচিত হচ্ছে এবং এই বিবেচনায় আমরা জাতীয় চলচ্চিত্রের ধারণাটিকে সামনে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। কিন্তু চলচ্চিত্রের ছাত্ররা জানেন যে, জাতীয় চলচ্চিত্র বিষয়ে সারা পৃথিবীতে অ্যাকাডেমিশিয়ানরা বিসত্মর গবেষণা করেছেন এবং মোটা দাগে জাতীয় সিনেমার কয়েকটি পরিচিতিকে তারা শনাক্ত করেছেন। এই পরিচিতিগুলোর সারসংÿÿপ নিমণরূপ।

ক. ইউরোপীয় আর্ট হাউস সিনেমা যারা হলিউডের চলচ্চিত্র-প্রবণতার চেয়ে ভীষণভাবে আলাদা, কিন্তু তাদের লÿ্য একটি ছোট, আলাদা বাজার (দর্শক); তারা হলিউডের সিনেমার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; ইউরোপের বাইরেও, বিশেষত ষাট ও সত্তরের দশকে এরকম সিনেমার উদাহরণ রয়েছে;
খ. ইউরোপ ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বাণিজ্যিক ছবি, নিজস্ব জাতীয় স্পেসে হলিউডের ছবির সঙ্গে যাদের সীমিত মাত্রার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়;
গ. লাতিন আমেরিকার তৃতীয় চলচ্চিত্রের ঘরানার চলচ্চিত্র; তৃতীয় বিশ্বের র‌্যাডিক্যাল সিনেমা;
ঘ. এমন চলচ্চিত্র যা হলিউডকে পাত্তা দেয় না, এমনকি চ্যালেঞ্জ পর্যমত্ম করতে পারে – এর শ্রেষ্ঠ বা সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ বলিউড;
ঙ. এমন চলচ্চিত্র যা একটি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি এবং সংরÿণের মাধ্যমে বিকশিত হয়; ঠা-া যুদ্ধের সময়ের কমিউনিস্ট দেশসমূহের সিনেমা, গেল তিন দশকে ইরানি সিনেমা, ভারতের ফিল্ম ফাইনান্স কর্পোরেশন প্রযোজিত চলচ্চিত্র;
চ. জাতিরাষ্ট্রের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে অস্বীকার করে প্রামিত্মক জাতিসমূহের (সংস্কৃতি ও ভাষার দিক থেকে স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার) নিজস্ব সিনেমা।

বলাবাহুল্য, এই শ্রেণীকরণ সর্বজনমান্য নয়। জাতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেণীকরণে আরো নানা পদ্ধতি অন্যরা অনুসরণ করেছেন; তবে মোটা দাগে এই শ্রেণীকরণ কোনো বড় আকারের মতানৈক্য সৃষ্টি করবে না। তবে যেমন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শ্রেণীকরণের ÿÿত্রে আমরা লÿ করেছি, ঠিক তেমনি জাতীয় চলচ্চিত্রের এই শ্রেণীকরণেও একটি ধারার সঙ্গে আরেকটি ধারার মিশ্রণ, দ্রবীভবন আবার পাতন সবই ঘটছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান যে অবয়ব আমরা দেখতে পাচ্ছি তাতে ওপরে চিহ্নিত কোনো নির্দিষ্ট ধারায় জাতীয় চলচ্চিত্রের বিকাশের সম্ভাবনা প্রবল নয়। যেমন আমরা দেখিয়েছি আগেই যে, আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র এমন আকার এবং মানে পৌঁছুবে না যে তা এমনকি তার নিজস্ব স্পেসেও আমত্মর্জাতিক বা আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সিনেমাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। আবার চলচ্চিত্রের উৎকর্ষের বিবেচনায় সেটি পারা বা না পারা কোনো পরিমাত্রা নয়। অন্যদিকে এখন যেভাবে অন্য সিনেমা বা শিল্প-চলচ্চিত্র নির্মিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে বা হচ্ছে না, তাতে করে এই সিনেমা একটি চূড়ামত্ম প্রামিত্মক ইতিবাচকতামাত্র হয়ে থাকতে বাধ্য। এই প্রামিত্মকতা কোনোভাবেই জাতীয় চলচ্চিত্রের রূপ নেবে না; উৎকৃষ্ট চলচ্চিত্রের যে ধারাবাহিকতার ওপর আমরা গুরম্নত্ব দিচ্ছি তা এরকম নিয়তির হাতে ছেড়ে দেওয়া একটি প্রক্রিয়ায় অর্জিত হবে না। এই বিবেচনায় আমাদের এই লেখার শেষ অধ্যায়টির সূত্রপাত।

৪. একটি ব্যাপকভিত্তিক জাতীয় চুক্তির প্রসত্মাবনা ও র‌্যাডিক্যাল সিনেমা
যে জাতীয় চলচ্চিত্রকে চলচ্চিত্রের উৎকর্ষের প্রধান শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করছি তার জন্যে কিন্তু রাষ্ট্রের প্রাসঙ্গিক অংশীদারদের মধ্যে একধরনের চুক্তি প্রয়োজন। যে চুক্তি অনুযায়ী দেশপ্রেমিক পুঁজি এবং রাষ্ট্র
শিল্প-চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করবে, রাষ্ট্র চলচ্চিত্র শিÿা এবং প্রদর্শন অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগ করবে এবং প্রাইভেট বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে, নির্মাতারা স্বাধীন অভিব্যক্তি নির্মাণে, বিশেষায়িত একটি স্বদেশি চলচ্চিত্র ভাষার সন্ধানে নিরত হবেন, প্রযুক্তির সর্বশেষ পরিবর্তনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে নির্মাণ করবেন সমকালীন সিনেমা – সকলের লÿ্য থাকবে এই চলচ্চিত্রের ভেতর দিয়ে একটি সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে ক্রমাগত পরিচালিত করা। এই সংগ্রাম দৃশ্যগত যে সমতায়ন ও একশৈলিকতা, পণ্যের ÿুধা নির্মাণের নৃশংসতা তার বিরম্নদ্ধে পরিচালিত এক মহৎ প্রচেষ্টা। এই চুক্তি কীভাবে অর্জিত হবে, রাষ্ট্রের ভেতর কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া এ রকম চুক্তি আদৌ সম্ভব কি না, এসব প্রশ্ন ও তর্ক জরম্নরি। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অনিখুঁত রাষ্ট্র-কাঠামোর ভেতর থেকেই এ ধরনের চুক্তি অর্জন এবং জাতীয় চলচ্চিত্রের বিকাশ সম্ভব হয়েছে। মূলত, আমাদের দেশে নানা ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম, জনগণের ক্রয়ÿমতা বৃদ্ধি, উদ্বৃত্ত পুঁজির সৃষ্টি, আমলাতন্ত্রের মধ্যে আলোকিত চিমত্মার মানুষের অনুপ্রবেশ, প্রযুক্তির প্যারাডাইম পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক শক্তির কোনো কোনো অংশের মধ্যে কল্যাণ-রাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবিষয়ক নানা স্ববিরোধী ভাবালুতা এই সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তর্কের খাতির বলা যায় ভালো সিনেমার আন্দোলন আসলে এই চুক্তি অর্জনের চেষ্টাই করে আসছে আধা-শতক ধরে। লেখা যায়, একটি বাতাবরণ এই চুক্তিটি নির্মাণের জন্যে স্থির লÿÿ্য কাজ করে যেতে পারে। বস্ত্তত এটি কোনো কাগজে লিখিত দলিল নির্মাণ প্রচেষ্টা নয়, নির্দিষ্টসংখ্যক দফার দাবি আদায়ের সংগ্রাম নয়, বরং, প্রায় বা মোটামুটি প্রস্ত্তত অথবা কয়েকটি বিরম্নদ্ধ স্রোতকে একটি বিসত্মৃত অনুধাবনের মধ্যে প্রবেশ করানো, এবং ক্রমাগত সংলাপ, অর্জন এবং আবারও সংলাপের ভেতর দিয়ে যাত্রা। এরকম ব্যাপকভিত্তিক বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এমন এক কালে প্রবেশ করতে পারে যখন আমরা বছরে অমত্মত দশটি এমন ছবি নির্মাণ করব, যাদের বিষয়ে আমাদের গর্ব করার সুযোগ থাকবে। এইসব চলচ্চিত্র আমাদের জাতীয় সংবেদকে ঋদ্ধ করবে বিষয় ও উপস্থাপনার সর্বাধিক বৈচিত্র্যের মধ্যে। এই সিনেমা এমন ইমেজ আইকন নির্মাণ করবে, যার রাজনীতি আমরা সামষ্টিক অর্থে জাতীয়ভাবে অনুমোদন করি অথবা যা আমাদের মধ্যে একটি ব্যাপকভিত্তিক স্বাস্থ্যকর বিতর্কের জন্ম দেয়। এই সিনেমার ইমেজ স্পেস হবে আমাদের জন্ম-জন্মামত্মরের পরিচিত, কিন্তু উপস্থাপনার নৈপুণ্যে বিস্ময়করভাবে নতুন। এই সিনেমা নিয়ে আমরা গেস্নাবাল আর্ট সিনেমার হাটে পসরা সাজাব। জাতীয় চলচ্চিত্র ত্রম্নটিহীন, মেধাহীন পুনরাবৃত্তি হবে না; আমরা কোনো কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অধীনে চলচ্চিত্র কারখানা গড়ার কথা তুলছি না; আমরা আসলে এখন যাঁদের অন্য চলচ্চিত্রনির্মাতা বলে জানি তাঁদের জন্যে জাতীয় পর্যায়ে স্পেস নির্মাণের কথা বলছি মাত্র। এই স্পেস নির্মাণে দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করার বা একটি সুশৃঙ্খল, মসৃণ কর্মচক্র সৃষ্টির সম্ভাবনার লÿÿ্য কাজ করার কথা বলছি। এই চক্র চলচ্চিত্র-শিÿা থেকে নির্মিতি হয়ে প্রদর্শন পর্যমত্ম মেধাবী চলচ্চিত্রনির্মাতার সঙ্গে অবৈরী আচরণ করবে। সহজ কথায়, চলচ্চিত্র শিÿা হবে যুগোপযোগী এবং সে শিÿায় শিল্পবোধ ও দÿতা অর্জনের সমন্বয় ঘটবে; সরকার এমত চলচ্চিত্র নির্মাণে এবং প্রদর্শনে সহায়তা করবে। কারণ একটি কল্যাণরাষ্ট্রের অধিবাসীরা যাতে দৃশ্যমানতাবিষয়ক দূষণে আক্রামত্ম না হন, যাতে শিশুরা দৃশ্য জিঘাংসার শিকার না হয়, যাতে দেশের মানুষের শিল্প-সংবেদ মহৎ উচ্চতা অর্জন করে তা নিশ্চিত করতে চাইবেন; দেশপ্রেমিক ভালো পুঁজি চলচ্চিত্র নিয়ে গর্বিত হতে চাইবে, দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের শিল্প-চলচ্চিত্রের খ্যাতির গর্বিত অংশীদার হতে চাইবে; সেন্সর নামক বিষয়টি হয়তো থেকেই যাবে, কিন্তু সে একটি চলচ্চিত্র একটি প্রামিত্মক নৃগোষ্ঠীর ভাষায় নির্মিত হয়েছে এমন যুক্তিতে ছবিটিকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চাইবে না। দেশের মানুষ এরকম একটি বিষয়ে গর্ব-সচেতন হবে যে, আমরা ভালো ছবি করি, আমত্মর্জাতিক মানে। যাঁরা নিখুঁত ও আদর্শ পরিস্থিতির জন্যে অপেÿা করতে চান, এই চুক্তি নির্মাণ তাঁদের কাজ নয়।
র‌্যাডিক্যাল সিনেমার যুদ্ধটি অবশ্য ভিন্ন। যাঁরা ওপরে উলিস্নখিত প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখতে পারবেন না; তাঁদের জন্যে খোলা পথটি র‌্যাডিক্যাল সিনেমার পথ। আমরা ধরে নেব তাঁদের আদর্শিক অবস্থান অনেক সুদৃঢ় এবং লড়াইয়ের জন্যে তাঁদের মানসিক ÿমতা আছে। তাঁরা লাতিন আমেরিকার তৃতীয় চলচ্চিত্রের মতো সংগঠিত রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। অন্যদিকে আজকের প্রযুক্তি ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রকে একটি সম্ভাব্য প্রতিপাদ্যে পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত নির্মাণ, ব্যক্তিগত দর্শন (viewing) – এভাবে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ আছে তাঁদের যাঁরা এরকম ঢিলে একটি চুক্তির খোলসে নানা ধরনের আপসের পথে হাঁটতে রাজি নন এবং যাঁর চলচ্চিত্রে উপস্থাপনের মতো বিপস্নবী আইডিয়া আছে। সেই সিনেমা সমাজ বা রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনকে সূচিত করতে পারে কি না, সে ভিন্ন বিতর্ক। কিন্তু অনেক মৌলিক চিমত্মা, এগিয়ে থাকা আইডিয়া এই চলচ্চিত্রের হাত ধরে প্রবহমান থাকতে পারে; সময়ে হয়ে উঠতে পারে প্রবল ও প্রধান। অথবা র‌্যাডিক্যাল সিনেমা চলচ্চিত্রবিষয়ক ব্যক্তিগত নিরীÿাও হতে পারে, যা এখনই জাতীয় চলচ্চিত্রের মতো একটি সামাজিক বাতাবরণে গুরম্নত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারছে না। এরকম অভিব্যক্তির আধার হিসেবে আমরা নিউ মিডিয়া আর্টকেও দেখতে পারি। কারণ সেখানে কাজের স্বাধীনতা অনেক; চলচ্চিত্রের ভাষা ব্যবহারে এবং কোনো কর্তৃপÿীয় চোখ রাঙানি ছাড়াই সম্ভাব্য দর্শকের কাছে পৌঁছার ÿÿত্রে। নিউ মিডিয়া আর্টে আমরা তো এরই মধ্যে এমন অভিব্যক্তির উপস্থাপনা দেখেছি, যা সেন্সরের বাধা ডিঙিয়ে প্রথাগত চলচ্চিত্রে অসম্ভব। অবশ্য নিউ মিডিয়া র‌্যাডিক্যাল পথে হাঁটবে নাকি আমত্মর্জাতিক শিল্প-সাম্রাজ্যবাদের তল্পি বহন করবে সেটা একটি খোলা প্রকল্প।
কিন্তু এটা ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি যে, নিউ মিডিয়ার যে আপাত বিপস্নবী আবহ তাতে করে তাকে আমরা শিল্প-সম্ভাবনার এই দুই চরম প্রামেত্মই দেখতে থাকব। ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনাবে, কিন্তু সকল প্রবণতা এমত নির্দেশ করে যে, ক্রমশ ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র ও নিউ মিডিয়া আর্ট একাকার হয়ে যাবে এবং চলচ্চিত্র এক নতুন প্রশাখায় প্রবাহিত হবে। বিশেষ করে ইন্টারঅ্যাকটিভ সিনেমা, ননলিনিয়ার ডকুমেন্টারি বা ডাটাবেইস ডকুমেন্টারির মতো নব্য প্রযুক্তির প্রায়োগিক ধারণাগুলো এরকম সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়। এমন এক অভিব্যক্তির আধার রচিত হবে, যা হয়তো অষ্টম শিল্প হয়ে উঠবে। কিন্তু সে কেবল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ব্যাপার নয়, সারা পৃথিবীর চলমান ছবিবিষয়ক বয়ানেরই এক নতুন অধ্যায়। আমরা কেবল আশা করতে পারি যে, সেই নতুন অভিব্যক্তি-মাধ্যম এদেশের শিল্পের উৎকর্ষের আরেক বাহন হবে। আর যে ধারণাটি আমাদের এই লেখায় প্রায় বিবেচিতই হলো না, তা হচ্ছে চলচ্চিত্রের বিকল্প প্রতিপাদ্য। অথচ একদা বিকল্পের হাত ধরেই একটি ধারা হয়ে উঠেছিল অন্য চলচ্চিত্র – এদেশে। বিকল্পের প্রয়োজন তো ফুরিয়ে যাবার নয়। বরং জাতীয় চলচ্চিত্র যদি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিমান হয়ে ওঠে আমাদের দেশে তখন সে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার জন্যেই বিকল্প সিনেমার প্রয়োজন পড়বে। সে বিকল্পের অভাবে জাতীয় সিনেমার আইডিয়া একটি ডগমায় পরিণত হবে। তার পরিণতি আমরা কিন্তু ইতিহাসের পাতায় দেখেছি। কে জানে, হয়তো নিউ মিডিয়ার হাত ধরে র‌্যাডিক্যাল সিনেমা সেই বিকল্প প্রকল্পের বাহন হবে!
এ সকলই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উৎকর্ষের সন্ধানে বিবেচ্য। 

 

  1. Grazyna Reply

    Very nice post, i surely love this website, keep on it

  2. monster squad hack Reply

    You’ve a great blog here! Do you want to make some invite posts on my blog?

Leave a Reply

*