logo

প্যারিস আবিষ্কার

রা জী ব  ভৌ মি ক

ব্রিটিশরা সবসময়ই প্যারিসকে খুব পছন্দ করে। সুতরাং যদি শোনেন যে ঊনিশ শতকের গোড়ার দিককার কয়েকজন ব্রিটিশ শিল্পী প্যারিসকে কীভাবে দেখেছেন তা নিয়ে একটি প্রদর্শনী হচ্ছে তাহলে আপনার পক্ষে ভাবাটা খুব স্বাভাবিক যে, সেখানে রূপসী প্যারিসের শত শত মনোমুগ্ধকর চিত্রকর্মের দেখা মিলবে।

আসলে, লন্ডনের ওয়ালেস কালেকশনে ‘দ্য ডিসকভারি অব প্যারিস : ওয়াটার কালারস বাই আর্লি নাইনটিনথ সেঞ্চুরি ব্রিটিশ আর্টিস্টস’ শীর্ষক যে প্রদর্শনীটি জুনের ২০ তারিখে শুরু হয়েছে, সেখানে চিত্রকর্ম আছে সত্তরটিরও কম। জোসেফ ম্যালর্ড উইলিয়াম টার্নার, টমাস গার্টিন এবং রিচার্ড পার্কস বনিংটনের মতো শিল্পীদের অাঁকা এই ড্রয়িং ও জলরঙের কাজগুলো সংখ্যায় কম হলে কী হবে, প্যারিসের এমন এক চেহারা তারা আপনাকে সবাই মিলে দেখাবে যা আপনি কখনো দেখেননি।

যেমনটা আগেই বলছিলাম, এই চিত্রকর্মগুলোতে যে প্যারিসকে দেখানো হয়েছে তা কিন্তু ব্যারন হসমানের নকশা করা রূপবতী প্যারিস নয়। এই প্যারিস বরং নোংরা, জনাকীর্ণ, মধ্যযুগীয় গলি-ঘুপচি ও ঘরবাড়ির এক গোলকধাঁধা। প্যারিস নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যে উচ্ছ্বাস, তা খুঁজে পাওয়াটা একটু দুরূহই!

আসল বিষয়টা হলো, ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে প্যারিস আসলে অনেকটা লন্ডনের মতোই ছিল। তাই ব্রিটিশ শিল্পীদের জন্য সেখানে নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ ধরে রাখাটা একটু কঠিন ছিল। সে সময়ের ব্রিটিশ শিল্পীরা বরং ছুটে যেতেন সুইজারল্যান্ডের নৈসর্গিক রূপ বা ইতালীয় স্থাপত্যের রমণীয়তা উপভোগ করতে।

গল্পের শুরু তখন যখন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মাঝে চলছে তুমুল যুদ্ধ। সে সময় ১৮০১-০৩ – এ দুবছরের জন্য একবার খুব সংক্ষিপ্ত শান্তি স্থাপিত হয় দুপক্ষের মধ্যে, যার নাম ছিল এমিয়েন্স শান্তি চুক্তি। ওই সময়ই বহু বছর বন্ধ থাকার পর আবারো খুলে দেওয়া হয় দুদেশের সীমান্ত। ব্রিটিশ শিল্পীরাও আবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসতে শুরু করেন প্যারিসে। তবে তাঁদের মূল আকর্ষণের জায়গা কিন্তু প্যারিস ছিল না। নেপোলিয়ন সারা ইউরোপ থেকে যেসব বিখ্যাত চিত্রকর্ম লুট করে এনে লুভের জাদুঘরে রেখেছিলেন, ব্রিটিশ শিল্পীদের মূল আকর্ষণ ছিল সেখানে।

যেমন ধরা যাক টমাস গার্টিনের ‘প্যারিস, ভিউ ওভার দ্য রুফটপস টুয়ার্ডস মন্তমার্ত্রে’। এখানে যে প্রাসাদটিকে শিল্পী দেখিয়েছেন তা কিন্তু কোনো পর্যটন গাইড বইয়ের অংশ হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। এটি বরং যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরতে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। আকাশেও রাজনীতির ছায়া – ধূসর আকাশে ঝড়ের কালো মেঘ। ভীষণ রাজনৈতিক এই ছবিতে নান্দনিকতার ছাপ একেবারেই নেই।

এইচ এ বেকারের ১৮০২ সালে অাঁকা প্যারিসের ‘প্যানোরামিক ভিউ’য়ের উদ্দেশ্যও প্রায় পুরোটাই রাজনৈতিক। বেকার খুব ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন যে শিল্পরসিক ব্যক্তিরা প্যারিসের নান্দনিক সৌন্দর্যের চেয়ে সে-সময়ের চলমান রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বিষয়েই অনেক বেশি আগ্রহ বোধ করবেন।

তবে এই প্রদর্শনীতে যাদের ছবি তোলা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই প্যারিসে গেছেন ১৯২৮-এর পরে। তখনো প্যারিস রূপসী হয়ে ওঠেনি। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কেবল মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তাই নান্দনিক ছবির বিষয়বস্ত্ত হয়ে ওঠার যোগ্যতা তখনো প্যারিস ঠিক অর্জন করে উঠতে পারেনি।

জেমস হল্যান্ড সেইন্ট-সাভেরিন গির্জার যে ছবি এঁকেছেন তাতে গির্জার গথিক কাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বেঢপ আকৃতির স্ট্রিট লণ্ঠনটি। ইংল্যান্ড থেকে প্যারিসে আসা পর্যটকরা সে-সময় প্রায়ই অভিযোগ করতেন যে লন্ডনের রাস্তাঘাটে চমৎকার আলোর ব্যবস্থার তুলনায় প্যারিসের এই তারে ঝোলানো বেঢপ লণ্ঠন খুবই দৃষ্টিকটু এবং অপ্রতুল।

প্যারিসের রাস্তায় বিচিত্র পোশাকের চরিত্রেরাও ব্রিটিশ শিল্পীদের বড় আগ্রহের বিষয় ছিল। অ্যামব্রোস পয়েন্টারের অাঁকা ছবিতে দেখা মিলবে প্যারিসের সে-সময়ের একজন ঝাড়ুদার, একজন বেকার এবং একজন মাতালের।

টমাস শটার বয়েসের ‘দ্য প্যাভিলিয়ন ডি ফ্লোর’ ছবিতে দেখা যায় প্যারিসের মানুষজন রাস্তাঘাটে এমনভাবে বসে আছে বা গল্প-গুজব করছে, যা লন্ডনে সম্ভব হতো না। গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে ওপর থেকে দেখে ধনী ও ফ্যাশনসচেতন মানুষের তফাৎ করাটা একটু যেন কঠিনই হয়ে ওঠে বয়েসের এই ছবিতে।

জন স্কারলেট ডেভিসের পেনসিল স্কেচ ‘অ্যান আর্টিস্টস বুটস ইন দ্য নাইনটিনথ সেঞ্চুরি’তে দেখা যায়, সে-সময়ের ফ্যাশনেবল ব্রিটিশরা কী ধরনের জুতো পরত। এই স্কেচটির ঠিক পাশেই রাখা হয়েছে অন্য আরেকজন শিল্পীর অাঁকা প্যারিসের কাঁকর-ওঠা একটা রাস্তার ছবি। ওয়ালেস কালেকশনের আয়োজকরা যেন অনেকটা এই বোঝাতে এই দুটি ছবি পাশাপাশি টাঙিয়েছেন যে নরম সোলের এই ফ্যান্সি জুতো পরে প্যারিসের রাস্তায় হাঁটা আর জ্বলন্ত কয়লার ওপর হাঁটা যেন একই কথা।

প্যারিসের ছবি এর আগে অনেক শিল্পীই এঁকেছেন। কিন্তু উনিশ শতকের গোড়ার দিককার ব্রিটিশ শিল্পীরা যেভাবে এঁকেছেন, সেভাবে আগে আর কেউ পারেননি। তাঁদের চিত্রকর্মে উঠে এসেছে প্যারিসের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন। অনেক চিত্র-সমালোচক দাবি করেন যে প্যারিসের আজকের যে ঠাঁটবাঁট, তার পেছনে বিরাট অবদান রয়েছে ব্রিটিশ এই শিল্পীদের, কারণ তাঁরাই তাঁদের ছবির মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন প্যারিসের খামতির দিকগুলো।

সেই খামতিগুলোর সমাধান করেই আজকের প্যারিস বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর মাঝে একটি হয়ে উঠেছে। একসময় যে প্যারিস ছিল মধ্যবিত্তের বিনোদনস্থল, সেই প্যারিসই কালের পরিক্রমায় হয়ে ওঠে উচ্চবিত্তের প্রিয় গন্তব্য।

যে কারণে সাধারণ আলু ভাজাকে ব্রিটিশরা বলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর ফরাসিরা বলে ইংলিশ ফ্রাই; ব্রিটিশ ও ফরাসিদের এই চিরন্তন প্রতিযোগিতা চিরকালই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে বিনোদন দিয়ে এসেছে।

ফরাসি শিল্পীদের চোখে লন্ডন কেমন ছিল – এ বিষয়ের ওপরও এবার তাহলে একটা প্রদর্শনী হোক – ওয়ালেস কালেকশনের কাছে এমনটা প্রত্যাশা করা যেতেই পারে। ‘দ্য ডিসকভারি অব প্যারিসে’র মাধ্যমে ‘দ্য ডিসকভারি অব লন্ডন’ শিরোনামের আরেকটি প্রদর্শনীর দরজা খুলে গেল বলেই মনে হচ্ছে।

 

রাজীব ভৌমিক

৭ জুলাই ২০১৩

Leave a Reply

*