logo

পিকাসো ও জেনেভিয়েভ মধ্যরাতের অগ্নিগোলক

হা সা ন  ফে র দৌ স

১৯৪৩ সালের মে মাসের কথা। প্যারিস তখনো একটি জার্মান অধিকৃত শহর। এই শহরে পিকাসো নিষিদ্ধ, কোনো মিউজিয়ামে অথবা গ্যালারিতে তাঁর ছবি প্রদর্শনীর অনুমতি নেই। কিন্তু তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে নেই পিকাসো। দুহাতে ছবি আঁকছেন, প্রতিদিন তাঁর ৭ র্যু  দেগ্রাঁ-আগুস্তিনে ধরে আঘাত করলেন ফ্রাঁসোয়া। দরজা খুলে দিলেন সাবারতে, পিকাসোর পুরনো ও অনুগত বন্ধু, তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী। ‘আপনাদের কি সাক্ষাতের সময় ঠিক করা আছে?’, সাবারতে জানতে চাইলেন। ‘জি, আছে’, জানালেন ফ্রাঁসোয়া। কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্ট সাবারতে দরজা খুলে দিলেন।
এই ছিল পিকাসো ও ফ্রাঁসোয়া জিলোর পরিচয়ের শুরু। তখন পিকাসোর বয়স ৬২। সে-পরিচয় দ্রুত পরিণত হয় প্রেমে। কম বয়েসি মেয়েটি তাঁর পিতার সমান বয়সের এই খ্যাতিমান ও বিত্তবান চিত্রকরের দিকে ছুটে আসে অগ্নিহত পতঙ্গের মতো। দশ বছর স্থায়ী সে-প্রণয়, যার ফসল পিকাসোর দুই সন্তান – ক্লদ ও পালোমা।
আমাদের গল্প অবশ্য জিলোকে নিয়ে নয়, ডোরা মারও নয়। আমাদের লক্ষ্য পিকাসোর এক প্রায়-অজ্ঞাত প্রেমিকা, জেনেভিয়েভ লাপোরতকে নিয়ে। তাঁদের প্রথম পরিচয় ১৯৪৪ সালে, যখন প্যারিস সদ্য মুক্ত হয়েছে জার্মান বাহিনীর হাত থেকে। ততদিনে ফ্রাঁসোয়া জিলোর সঙ্গে পিকাসোর প্রণয় গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে, পিকাসো ফন্দি আঁটছেন কীভাবে ফ্রাঁসোয়াকে পাকাপাকি করে ঘরে তুলবেন। তখন হঠাৎ, একদম আকস্মিকভাবে জেনেভিয়েভের সঙ্গে পরিচয়। সাক্ষাৎকার নেওয়ার উদ্দেশ্যে জেনেভিয়েভ নিজেই এসেছিলেন গ্রাঁ-আগুস্তিনের সেই একই অ্যাপার্টমেন্টে। তিনিও সেখানে ঢুকে প্রথমে সাক্ষাৎ পান সাবারতের, যিনি তাঁকেও জিজ্ঞেস করলেন সাক্ষাৎকারের কথা আগে থেকে বলা আছে কি না।
জেনেভিয়েভ তখন মোটে সতেরো বছরের এক কিশোরী, ঠিক যে বয়সে মারি-তেরেসকে পাকড়াও করেছিলেন পিকাসো। মারি-তেরেস ও ফ্রাঁসোয়ার মতোই স্বেচ্ছায়, উন্মত্ত পতঙ্গের মতো পিকাসোর দিকে ছুটে আসেন জেনেভিয়েভ। অবশ্য পিকাসোর অধিকাংশ প্রেমিকার তুলনায় এক জায়গায় তাঁর অভিজ্ঞতার ব্যতিক্রম রয়েছে। পিকাসো নামক অগ্নিগোলকে তিনি ঝলসেছিলেন র অ্যাপার্টমেন্টে অতিথির আগমনেরও কোনো ক্ষান্তি নেই। প্রথম স্ত্রী ওলগার সঙ্গে ছাড়াছড়ি হয়ে গেছে, যদিও কাগজে-কলমে বিচ্ছেদ হয়নি। ফটোগ্রাফার ডোরা মার সে-সময়ে তাঁর চলতি প্রেমিকা, যদিও দুজনের মধ্যে নানা কারণে রাগ, বিরাগ ও বিবাদ সমানে চলছে। বোঝা যাচ্ছিল, ডোরাকে ঝেরে ফেলতে চাইছেন পিকাসো; কিন্তু দৈনন্দিন অপমান সত্ত্বেও ডোরা আঠার মতো জড়িয়ে আছেন। মানসিক বৈকল্যের লক্ষণ তখন সদ্য নজরে আসছে।
ঠিক এমন একসময়ে পিকাসোর আমন্ত্রণে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে ছবি দেখতে এলেন ফ্রাঁসোয়া জিলো। আলো ঝলমলে সদ্য একুশে পা দেওয়া তরুণী, চিত্রশিল্পী হবেন, এমন আশা প্রবল। আগের সপ্তাহে এক বান্ধবীর সঙ্গে গিয়েছিলেন পিকাসোর বাড়ির কাছেই লে কাতালান নামের একটি ক্ষুদ্র রেস্তোরাঁয়। সেখানে পিকাসোর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। পাশের টেবিলে দুটি কম বয়েসি মেয়ে দেখে পিকাসো নিজে উঠে এসে কথা বললেন। তাঁরা দুজনেই ছবি আঁকে জানতে পেরে, প্রথমে হো হো করে হেসে ওঠেন। ‘সুন্দরী মেয়েরা আবার ছবি আঁকতে পারে নাকি?’ বিদ্রুপ করে বললেন পিকাসো। তারপর, কিছুটা নরম হয়ে বললেন, ‘শোনো, আমিও একজন চিত্রকর। তোমরা চাও তো ছবি দেখতে আমার স্টুডিওতে আসতে পার।’ ডোরা নিজের টেবিলে বসে আড় চোখে সবই দেখেছিলেন, তাঁদের কথাও শুনেছিলেন। না, আপেল কাটার কোনো ছুরি তাঁর হাতে সে সময় ছিল না, যদিও বুকের ভেতর খচখচে ছুরির আঘাত ঠিকই তাঁকে ক্ষতাক্ত করছিল।
পরের সপ্তাহে গ্রাঁ-আগুস্তিনের পাথুরে রাস্তা মাড়িয়ে পিকাসোর বাসায় এসে খড়খড়িবটে, কিন্তু পুড়ে মরেননি। তাঁকে উন্মাদ হতে হয়নি, অথবা আত্মহননের পথও বাছতে হয়নি। ব্যক্তিগত ও পেশাদারি জীবনে সফল হয়েছেন, ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মাতা ও কবি হিসেবে যশ-খ্যাতিও হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, পিকাসোর কারণে কখনো মনস্তাপ বা মনোবৈকল্যের সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়নি।
জেনেভিয়েভ ছবি আঁকতে চেয়েছিলেন, পিকাসো তাঁকে সে-পথে না গিয়ে কবিতা লেখায় উৎসাহ দিয়েছিলেন। ফ্রাঁসোয়ার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর জেনেভিয়েভকে তাঁর সঙ্গে এক বাসায় উঠে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন পিকাসো। রাজি হননি, সময় থাকতেই তাঁকে ছেড়ে আসেন। পরে সানশাইন অ্যাট মিডনাইট এই নামের একটি চটি বইয়ে জেনেভিয়েভ পিকাসোর সঙ্গে তাঁর প্রণয়ের আনন্দঘন বিবরণ দিয়ে গেছেন।
ফ্রাঁসোয়ার তাঁর সঙ্গে মিল এইখানে যে, দশ বছর স্বেচ্ছায় তাঁর প্রেমিকা ও দুই সন্তানের মাতা হিসেবে সময় কাটানোর পর পিকাসোকে ছেড়ে আসেন ফ্রাঁসোয়া। নতুন করে প্রেমে পড়েন ও বিয়েও করেন, পিকাসোকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে। শিল্পী হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন। কিন্তু পিকাসোর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সবিস্তার যে-বিবরণ লিখেছিলেন তিনি পিকাসোর জীবদ্দশাতেই, সে-বইটি যেমন পিকাসোর প্রতি ঘৃণা ও বিবমিশায় পূর্ণ, তেমনি মিথ্যাচারে ভরা, এই অভিযোগ পিকাসোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এমন একাধিকজন করেছেন (যেমন, পিকাসোর বন্ধু ও পরে জীবনীকার পিয়ের ডেই, ‘পিকাসো : লাইফ অ্যান্ড অ্যার্ট, অলিভিয়া এমেটের অনুবাদ, হার্পার কলিন্স, নিউইয়র্ক, ১৯৮৭)। জেনেভিয়েভের বইটি তার উলটো। েস্নহপরিহাস ও কৌতুকময় অভিজ্ঞতায় পূর্ণ বইটিতে কোথাও বিন্দুমাত্র তিক্ততা নেই। সে-বই প্রকাশের আগ পর্যন্ত খুব কম লোকই জানত তাঁদের প্রণয়ের কথা। সে-বই থেকেই জানা গেল, জেনেভিয়েভকে মডেল বানিয়ে গোটাকয় ছবি এঁকেছিলেন পিকাসো, অধিকাংশই কলম-কালির স্কেচ। সেসব ছবি জেনেভিয়েভের কাছে সযতেœ রক্ষিত ছিল, ২০০৫ সালে নিলামে বিক্রির আগে সেসব ছবি খুব কম লোকের চোখেই পড়েছে। জেনেভিয়েভের সঙ্গে তাঁর গোপন নিষিদ্ধ সে-প্রণয়ের প্রভাব পিকাসোর ছবিতেও পড়েছিল। কোমল, সুন্দর ও কামজ প্রভায় উজ্জ্বল সে-ছবি, ঠিক যে-কোমলতা আমরা দেখেছি মারি-তেরেস পর্যায়ের ছবিগুলোতে। অবাক কী যে বিশেষজ্ঞরা পিকাসোর এই পর্যায়ের ছবিকে অভিসিক্ত করেছিলেন ‘টেন্ডার পিরিয়ড’ এই নামে।
জেনেভিয়েভের বইয়ের ভিত্তিতে আমরা চেষ্টা করব অসম বয়সী এই দুই প্রেমিকের অভিজ্ঞতার ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করতে। পাশাপাশি নিরীক্ষণ করব জেনেভিয়েভের প্রভাবে তাঁর ‘কোমল পর্যায়ের’ ছবি।

দুই
২৫ আগস্ট ১৯৪৪ সালে দীর্ঘ চার বছরের অবরোধ শেষে প্যারিস অবশেষে জার্মান বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে শহরে প্রবেশ করলেন জেনারেল শার্ল দ্য গল। সেদিন সন্ধ্যায় এক বেতার ভাষণে তিনি সহর্ষে জানালেন : ‘প্যারিস মুক্ত। ভিভা প্যারিস।’
অবরুদ্ধ হলেও সে-শহরে প্রায় গতানুগতিক প্রাত্যহিক জীবন যাপন করেছেন অনেকেই। মোড়ে মোড়ে জার্মান টহল ছিল, কোনো কোনো ভবনে তারা এসে তালা ঝুলিয়ে দেয়, কিন্তু এর বাইরে প্যারিস মোটের ওপর অপরিবর্তিতই ছিল। খাবারের কমতি ছিল না, হোটেল-রেস্তোরাঁ জমজমাট, নাটক অপেরা, সেও খোলা। এমনকি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জঁ ককতোর নাটক অভিনীত হয়েছে, সার্ত্রের বই মুদ্রিত হয়েছে। পিকাসোর ছবি আঁকাতেও কোনো বাধা ছিল না, যদিও তাঁর ছবি প্রকাশ্যে প্রদর্শনীর অনুমতি ছিল না। নাৎসি সরকার পিকাসোকে ‘ডেঞ্জারাসম্যান’ এই নামে অভিযুক্ত করেছিল, মুখ্যত তাঁর ‘গের্নিকা’ ছবির জন্য। যুদ্ধের পর, মুক্ত প্যারিসে, যে-কজন নায়ক বলে অভিষিক্ত হলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন পিকাসো।
জেনেভিয়েভ লাপোরত সে-সময় এই শহরের লিসে ফেনেলোঁর শেষ বর্ষের স্কুলছাত্রী। তাঁর নানা গুণ – সুন্দরী, বিদুষী, স্কুলের ছাত্র পরিষদের সভাপতি, স্কুল পত্রিকা ফেনেলোর কণ্ঠর সম্পাদক, লেখালেখির জন্যও বন্ধু মহলে জনপ্রিয়। সিদ্ধান্ত হলো, নাৎসি অবরোধ বিষয়ে পিকাসোর একটি সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত হবে তাঁদের স্কুল পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায়। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে প্যারিসের বিখ্যাত হৈমন্তি শিল্প প্রদর্শনীতে পিকাসোর দু-একটি ছবি নাৎসি গুণ্ডাদের প্ররোচনায় প্রদর্শনীর দেয়াল থেকে টেনে জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি, কিন্তু মনের ভেতর জমেছিল প্রচণ্ড ঘৃণা। সাক্ষাৎকারের বিষয় হবে সে-ব্যাপারে পিকাসোর প্রতিক্রিয়া। স্কুল থেকে খুব দূরে নয় পিকাসোর অ্যাপার্টমেন্ট; ঠিক হলো, জেনেভিয়েভই যাবেন তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে।
৭ রু দ্য গ্রাঁ-আগুস্তিনে এসে কড়া নাড়লেন জেনেভিয়েভ। প্রথমে দেখা হলো পিকাসোর বিশ্বস্ত সহকারী সাবারতের সঙ্গে। আগে কখনো পিকাসোকে দেখেননি, গম্ভীর মুখ সাবারতেকে দেখে ভাবলেন, এই বুঝি সেই বিখ্যাত চিত্রকর। কী বলবেন আগে থেকে মহড়া দিয়ে রেখেছিলেন, গড় গড় করে সব কথা বলে দিলেন। বিশেষ করে জোর দিলেন প্রতিরোধ আন্দোলনে তাঁদের পত্রিকার ভূমিকার ওপর। স্মিত হেসে সাবারতে বললেন, তিনি পিকাসো নন। দরজা বন্ধ করে ওপরে উঠে যাচ্ছিলেন, কী মনে করে ফের দরজায় ফিরে এসে কিশোরীটিকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি কাল বিকেলে আসো, তোমার সঙ্গে পিকাসোর দেখার ব্যবস্থা করে দেব।’
পরদিন আবারো সেই বাড়ি, সেই খড়খড়ি নাড়া, সদর দরজা ডিঙিয়ে আবারো সেই সাবারতে। তাঁকে দরজার কাছে দাঁড় করিয়ে রেখে সাবারতে উচ্চেঃস্বরে ঘোষণা করলেন, ‘প্রতিরোধ আন্দোলনের যে মেয়েটির কথা বলেছিলাম, সে এসেছে।’ পিকাসো নিজেই তাঁকে পাশের একটি ঘরে নিয়ে এলেন – দীর্ঘ, প্রশস্ত কক্ষ, অসংখ্য ছবি, শিল্পকর্ম, বই ইত্যাদি সেখানে কিছুটা এলোমেলো অবস্থায় ছড়ানো-ছিটানো। কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা অবিশ্বাস নিয়ে সবকিছু দেখছিলেন জেনেভিয়েভ। পিকাসোর ঠোঁটে মৃদু হাসি। কাগজ-কলম নিয়ে সাক্ষাৎকার নিতে তৈরি হলেন জেনেভিয়েভ। সভয়ে জানালেন, পিকাসোর ছবি নিয়ে তাঁর বন্ধুমহলে উৎসাহের অন্ত নেই, কিন্তু তাদের অনেকের কাছেই অধিকাংশ ছবি ধাঁধার মতো। অনেকেই তাঁর ছবির কোনো অর্থ বুঝে পায় না। তাঁর ছবির কী অর্থ, শিল্পী কি একটু বুঝিয়ে বললেন?
ফেটে পড়লেন পিকাসো। ‘ছবি নিয়ে বোঝার আবার কী আছে? ছবি কি অঙ্ক নাকি যে তা আঁক কষে বোঝাতে হবে? ছবি নিয়ে ব্যাখ্যারও কিছু নেই। ছবির একমাত্র কাজ, তা দেখে মানুষের মন, তার হৃদয় যেন আন্দোলিত হয়, তার ভাবাবেগ জাগে। কোনো ছবি দেখে মানুষ উদাসীন থাকবে, তা হবে না। ছবি এমন হবে না যেন তার পাশ দিয়ে হাঁটার সময় কেউ মাত্র একবার অনাগ্রহী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে যাবে।’
বস্তুত সেদিন সতেরো বছরের সেই ফরাসি কিশোরীটিকে পিকাসো একজন অধ্যাপকের মতো গাম্ভীর্য ও মনোযোগ দিয়ে শিল্পবিষয়ক একটি ছোটখাটো ভাষণই দিয়ে বসেন। নিজের ছবি নিয়ে লম্বা বক্তৃতা করা পিকাসোর অভ্যাস-বিরুদ্ধ। এ কাজটি তিনি শিল্প-সমালোচকদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে জেনেভিয়েভের কাছে তাঁর শিল্প বিষয়ক এই ভাষণটি সবিশেষ উল্লেখের দাবিদার। তাঁর স্কুলের পত্রিকায় জেনেভিয়েভ পরে এ নিয়ে যে নাতিদীর্ঘ রচনাটি লেখেন, তাতে পুরো ভাষণটিই তিনি তুলে দেন। সেখান থেকে নির্বাচিত অংশ পড়া যাক:
‘(ছবি দেখে) দর্শকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হবে, সেই উত্তেজিত বোধ করবে, শিল্প নির্মাণে উৎসাহী হবে, আর কিছু না হোক তার কল্পনা সঞ্জীবিত হবে। শিল্পী অবশ্যই দর্শককে তার নির্জীবতা কাটাতে সাহায্য করবে, তাকে আন্দোলিত করবে, তাকে খামচে ধরে বোঝাবে, যে পৃথিবীতে সে বাস করে তার চেহারা কেমন। তবে সে সাফল্য অর্জন করতে হলে শিল্পীকেও তার শিল্পকর্মের বাইরে পা বাড়াতে হবে।’
পিকাসো এমন উত্তেজিত ছিলেন যে, মনে হলো রীতিমতো ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তবে সৌভাগ্য যে সে ঝড় ক্রমশ থেমে আসছিল। এরই মধ্যে পিকাসো নিজের শিল্পকর্ম বিষয়ে কমবেশি অনেক কথাই বলে ফেললেন। অবশ্য কথা তাঁর তখনো শেষ হয়নি।
‘এমন লোকের অভাব নেই যারা মনে করে শিল্পকর্মকে অবশ্যই একটা না একটা ‘সুন্দর’ কিছু প্রকাশ করতে হবে। এটা খুবই ভুল, কারণ এর ফলে শিল্পীর ওপর একধরনের সীমাবদ্ধতা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই যে ‘সুন্দরে’র কথা তাঁরা বলেন, তার কী অর্থ, আমি সে কথা তুলছি না। সুন্দর ব্যাপারটা তো খুবই আপেক্ষিক, এর সঙ্গে জড়িত, প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, সময় ও কাল, স্থান, শিক্ষা, বয়স, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি। আর্ট, তা যে প্রকারেরই হোক না কেন, তার প্রতি একজন মানুষকে পুরোপুরি অঙ্গীকারবদ্ধ হতে বাধ্য করবে, কোনো সংশয় ছাড়া নিজেকে উজাড় করে দিতে উৎসাহী হতে হবে। ‘সৌন্দর্য’ অবশ্যই সে লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি পথ, একধরনের মনো-অনুভূতি, যার মাধ্যমে সে লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, মানুষের আত্মাকে জাগাতে হবে। আত্মা যদি না জাগে, তাহলে সেখানে পলি জমবে। কাদামাটি হলো গতিহীন, অন্যদিকে জলস্রোত হলো স্বচ্ছ ও শুদ্ধ। সাহিত্যে তো তোমরা ‘রিয়েলিস্ট’ ধারা মানো, তাই না? সেখানে তো সবসময় গৎবাঁধা সৌন্দর্যের কথা বলা হয় না, জীবনের নোংরা, কদর্য দিকও তুলে ধরা হয়, যেমন তুলে ধরেছেন বালজাক, জোলা ও সাম্প্রতিক সময়ে অঁরি ত্রোয়া। তোমরা কি বোঝো না যে, কদর্যতার ভেতরেও সৌন্দর্য রয়েছে? সাহিত্যে যা গ্রহণযোগ্য, ছবির বেলায় তা হবে না কেন? নিজের মন দিয়ে যা স্বীকার করো, হৃদয় ও অনুভূতিকে তা থেকে কেন বাদ দেবে?
তোমার কি মনে হয় না, একজন শিল্পী যাঁর শিল্পকর্ম মানুষের মনে মহৎ বোধের জন্ম দেয়, তিনি নিজেকে নন্দনতাত্ত্বিকের চেয়েও বড় কিছু একটা অর্জনে সমর্থ? মনে রাখবে, সবার আগে যা দরকার তা হলো তোমার কল্পনাশক্তিকে মুক্ত রাখা। তারুণ্যের এই দান, তোমরা খুব সহজেই হারিয়ে ফেল। আমার চেষ্টা তোমাদের মধ্যে এই কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে রাখা। মনে রাখবে, এই কল্পনাশক্তির জোরেই ঘোড়ার জিন আর এক জোড়া হাতল দিয়ে বৃষের শিং বানাতে পারি, অথবা দেখাতে পারি দুই ছাদের মাঝখানে এক ফালি আকাশ, তার ঘন নীল অসীমতা।’
তার বিমূর্ত শিল্পের জন্য খ্যাত পিকাসো এমন এক শিল্পধারার কথা বলে গেলেন, তা একদিকে যেমন বাস্তবমুখী, তেমনি মানব অভিজ্ঞতার নিকটবর্তী। সারাজীবন পিকাসো সবচেয়ে যা বেশি এঁকেছেন তা হলো নারীর মুখ ও শরীর। ‘সুন্দর’ বলতে প্রথাগতভাবে যা বোঝায়, এমন নারী চিত্র যে পিকাসোর নেই তা নয়, কিন্তু তাঁর অধিকাংশ ছবি স্মরণীয় নারীদেহের সৌন্দর্য চিত্রণের জন্য, অথবা তার বাস্তবমুখিনতার জন্যও নয়, বরং তার বিকৃতির জন্য। ভাবা হয়, এই বিকৃতির – ডিসটরশনের এক উদ্দেশ্য দর্শককে চমকে দেওয়া, তাকে ঝাঁকুনি দেওয়া। কিন্তু অন্য উদ্দেশ্য, নারীদেহের প্রতি গভীর লালস্যপূর্ণ কামনার নির্মাণ। কামজ চেতনাই সে চিত্রণের মুখ্য প্রকাশ, যদিও মনস্তত্ববিদেরা সে-চেতনার অন্তরঙ্গ অর্থ উদ্ধারে অবচেতন ও অধচেতনের নানা স্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে চেষ্টায় পাণ্ডিত্য আছে, কিন্তু প্রকৃত শিল্পবোধের প্রকাশ নেই।
তাঁর ছবিতে নারীদেহের এই কামজ প্রকাশ নিয়ে পিকাসো নিজে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন জেনেভিয়েভকে। ১৯৫১ সালে পিকাসো বলেছিলেন, ‘আমি নিজে একজন নারী। শুধু আমি নই, প্রতিটি শিল্পী আসলে নারী এবং অন্য নারীর প্রতি তার স্বাদ মনে থাকতে হবে। যারা সমকামী তাদের পক্ষে শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়, কারণ তারা পুরুষদের ভালোবাসে।’ অন্যত্র, কোনো এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে জেনেভিয়েভকে বলেছিলেন, তিনি কাঠ, প্লাস্টার, পাথর, এমন কিছু নেই যে মাধ্যমে কাজ করেননি। সে-কথা শুনে জেনেভিয়েভ ফোড়ন কেটেছিলেন, ‘এবং নারী’। প্রীত হয়ে পিকাসো বলেছিলেন, ‘ব্যাপার কী জানো, ছবি আঁকার চেয়েও অনেক বেশি জটিলতা আমার জীবনে সৃষ্টি হয়েছে নারীর জন্য। কে একজন আমাকে বলেছিল, তোমার হৃদয় হচ্ছে সুলতানের মতো, তোমার দরকার একটা আস্ত হারেম।’ কথাটি ঠিক, ‘আমি আরব বা প্রাচ্যের মানুষ হলে বেশ হতো।’
তাঁর সে-কথা শুনে পিকাসোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু পল এলুয়ার মন্তব্য করেছিলেন, ‘ওর হৃদয় সুলতানের মতো হতে পারে, কিন্তু নিশ্চয় লক্ষ করেছ, ওর হাতে এখনো (ওলগার সঙ্গে) বিয়ের আংটি। ওলগাকে সে তালাকও দেবে না। আবার দেখো, যে একমাত্র সন্তানকে সে নিজের পদবি ব্যবহারে অনুমতি দিয়েছে সে পল, ওলগার সন্তান।’
তাঁর এই প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ততদিনে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, কাগজে-কলমে ছাড়াছাড়ি না হলেও তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন জীবন যাপন করছেন। ওলাগার জীবনে একাধিক পুরুষের উপস্থিতির বিবরণ নেই, অন্যদিকে পিকাসোর পরিচয় বহুগামী পুরুষ হিসেবে। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, পিকাসোর সঙ্গে জেনেভিয়েভের পরিচয় ও অন্তরঙ্গতা মুখ্যত এলুয়ারের মাধ্যমে। এই প্রতিভাবান চিত্রকর বন্ধুটির প্রতি এলুয়ার এই পরিমাণ আসক্ত ছিলেন যে, নিজের স্ত্রী নুশকে তিনি ভোগের জন্য তুলে দিয়েছিলেন তাঁর হাতে। সে-কারণে পিকাসো এলুয়ারকে বন্ধু হিসেবে ভালোবাসলেও তাঁকে কখনো একজন পূর্ণ মানব হিসেবে শ্রদ্ধা করেননি।

আমরা অবশ্য আমাদের গল্প থেকে দূরে সরে গেছি।

জেনেভিয়েভের সঙ্গে প্রথম আলাপে পিকাসো জীবনঘনিষ্ঠ আর্ট নিয়ে যে নানা কথা বলেন, তা বিস্ময়কর মনে হলেও সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল না। সোভিয়েত ধাঁচের ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার’ অনুসারী পিকাসো কখনই ছিলেন না, তবে রাজনৈতিকভাবে তিনি ব্যারিকেডের পেছনে, জনতার সঙ্গে, এ-কথাও কখনো গোপন করেননি। নাৎসিবাদকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন, ফ্রাঙ্কোর সামরিক একনায়কতন্ত্রকে প্রথমাবধি প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন। যুদ্ধ – যে-কোনো ধরনের যুদ্ধ – তাঁকে আহত করত। শিল্পের সাহায্যে মানবকল্যাণ অর্জন সম্ভব এবং প্রকৃত শিল্পীমাত্রই নিপীড়িত জনতার পাশে থাকবে, এ-কথাও তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর জীবনযাপন অথবা তাঁর শিল্পকর্মে সে-বিশ্বাসের প্রতিফলন সর্বদা না থাকলেও।
ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে পিকাসোর ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের, যদিও সর্বদা সে-সম্পর্ক মধুর হয়নি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে কমিউনিস্ট গেরিলাদের সাহসী ভূমিকা ফরাসিদের বিস্ময় ও গর্বের কারণ ছিল। পিকাসোর অধিকাংশ বন্ধুবান্ধব, বিশেষত লুই আরাগঁ ও পল এলুয়ার হয় ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন, অথবা রাজনৈতিকভাবে তাঁদের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সংহতি বোধ করতেন। পিকাসো নিজে অবশ্য মার্কসবাদ সম্বন্ধে কোনো দীক্ষা গ্রহণ করেননি, এ নিয়ে কোনো পাঠাভিজ্ঞতাও ছিল না। কিশোরী জেনেভিয়েভ, যে নিজে গভীরভাবে কমিউনিস্ট চেতনা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল, পিকাসোর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পর জানতে চেয়েছিলেন তিনি কার্ল মার্কসের কোনো বই পড়েছেন কি না। পিকাসো ‘না’ বলায় জেনেভিয়েভ যে ব্যথিত হয়েছিলেন তা নয়, তবে বিস্মিত হয়েছিলেন। বিস্ময়ের কারণ পিকাসো ততদিনে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছেন, এ নিয়ে কমিউনিস্ট দৈনিক লু’মানিতে পত্রিকার প্রথম পাতায় বিশাল খবর ছেপেছিল। নিজেকে ‘কমরেড পিকাসো’ বলতেও দ্বিধা করতেন না, যদিও প্রকৃত গর্ববোধের চেয়ে কৌতুকই সেখানে মুখ্য ছিল।
পিকাসোর কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্যপদ গ্রহণ আকস্মিক ছিল না। তিনি রাজনীতিক নন, যে-ধরনের ছবি তিনি আঁকেন, তাও কোনোভাবেই কোনো ধরনের আদর্শগত প্রচার-প্রচারণার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। বস্তুতপক্ষে, আধুনিকতার যে-ধারণার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্তি, তাকে যদি কোনো আদর্শগত মোড়কে ফেলতে হয়, তাহলে তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার বিপরীত মেরুতে তাঁকে স্থাপন করতে হয়। এই বৈপরীত্যের কারণে পিকাসো ফরাসি এবং বিশেষত সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবর্গের প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হন। পিকাসো একজন কমিউনিস্ট, এর পেছনে যে প্রচারগত গুরুত্ব আছে, শুধুমাত্র সে কারণেই তিনি পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হননি।
তা সত্ত্বেও পিকাসোর কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্য লোকদেখানো এবং খামখেয়ালি কোনো ব্যাপার ছিল না। কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্যপদ গ্রহণের বড় কারণটি তিনি নিজেই জেনেভিয়েভকে জানিয়েছিলেন সেই ১৯৪৪ সালে। ‘আমি ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে। আমার এই বিরুদ্ধতা প্রকাশের একমাত্র উপায় কমিউনিস্ট পার্টিতে অংশগ্রহণ এবং সে-কথা সবাইকে জানানো।’
স্পষ্টতই ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধাচরণের একটি বড় প্রমাণ তিনি ইতিমধ্যে দিয়েছেন – তাঁর ‘গের্নিকা’। সে ছবি ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে এক প্রবল ঘৃণার উচ্চারণ হিসেবে অনন্তকালের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্যারিসে তাঁর স্টুডিওতে সে-ছবি দেখে একজন জার্মান সৈনিক জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এ তোমার কাজ?’ জবাবে পিকাসো বলেছিলেন, ‘না, তোমাদের।’ পিকাসো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না হলেও বরাবরই নিজেকে মানবিকতার পক্ষে একজন সৈনিক বিবেচনা করতে ভালোবাসতেন। আমাদের এ-কথাও মনে রাখা ভালো যে, যাঁদের সঙ্গে পিকাসো তাঁর তরুণ বয়স থেকে ওঠাবসা করেছেন, তাঁরা সবাই প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চার অন্তর্গত ছিলেন। পল এলুয়ার তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন। লুই আরাগঁকে তিনি ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন। প্যারিস মুক্ত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি যে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন, তার পেছনে এই বন্ধুদ্বয়ের কোনো ভূমিকা ছিল না, সে-কথা বলা অসত্য হবে। তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত প্রধান যে কারণ, তা হলো কমিউনিজমের – বিশেষত তার ফরাসি স্রোতধারার প্রতি পিকাসোর নিঃশর্ত আনুগত্য।
আমরা এমন একসময়ের কথা বলছি, যখন পিকাসো বিশ্বের প্রধান সমকালীন চিত্রকর হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পথে। মাতিস অথবা ব্রাকের চেয়েও তাঁর ছবির অর্থমূল্য অধিক। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণের ফলে আমেরিকানদের কাছে তাঁর কদর কমবে। ফরাসি এস্টাবলিশমেন্টের কাছে তিনি অনাকাক্সিক্ষত হয়ে উঠবেন। এমনকি সোভিয়েত কমিউনিস্টরাও তাঁকে সমালোচনা থেকে রেহাই দেবে না। তবু কেন কমিউনিস্ট পার্টি, তার ব্যাখ্যা পিকাসো নিজে নিউইয়র্কের বামপন্থী সাময়িকী নিউ মাসেসের পল জিলারডের কাছে দেন এই ভাবে :
‘আমি লেখক নই, চিত্রকর। কথায় না বলে ছবি দিয়ে আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়া সহজ। কিন্তু তারের মাধ্যমে আমার রং আপনার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়, অতএব কথায় বলার চেষ্টা করছি। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান আমার সমগ্র কর্মজীবন ও সকল চিত্রকর্মের এক যৌক্তিক পরিণতি। আমি কখনই চিত্রকলা মনোরঞ্জক বা হালকা আনন্দের মাধ্যমে এমন এক শিল্প মনে করিনি। যে রেখা ও রং আমার হাতিয়ার, আমি সবসময় তাকে ব্যবহার করেছি বিশ্ব ও মানবজাতি সম্পর্কে আমার বোধ ও বিবেচনা সম্প্রসারিত করতে, যাতে এই উপলব্ধি আমাদের সবাইকে অধিক মুক্তির সন্ধান দিতে পারে, সে-লক্ষ্যে। আমার নিজের মতো করে আমি যা সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে সুনিপুণ ও সর্বোত্তম তাই প্রকাশ করতে চেয়েছি। আর সকল মহৎ শিল্পীমাত্রই জানেন, সেরকম শিল্পকর্ম সবচেয়ে সুন্দরও বটে।
হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি, আমার ছবির মাধ্যমে একজন প্রকৃত বিপ্লবীর মতোই আমি লড়াই করেছি। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পেরেছি, সেই লড়াই-ই যথেষ্ট নয়। যে অভাবনীয় নির্যাতনের ভেতর দিয়ে গত কয়েক বছর আমাদের যেতে হয়েছে তা থেকে আমি বুঝেছি, শুধু আমার শিল্প দিয়ে নয়, আমার সকল অস্তিত্ব দিয়ে আমাকে লড়তে হবে।
আর সে কারণেই আমি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছি সর্বান্তঃকরণে, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া। পার্টির সঙ্গে আমি আগাগোড়াই যুক্ত ছিলাম। আরাগঁ, এলুয়ার, কাসু, ফুগেরঁ ও আমার অন্যান্য (কমিউনিস্ট) বন্ধু সে-কথা খুব ভালো করেই জানেন। আমি যে আগে দলে যোগ দিইনি তা সম্ভবত আমার সরল মানসিকতা, আমি ভাবতাম, আমার শিল্পকর্ম ও আমার হৃদয় তো দলের জন্য নিবেদিত রয়েছেই, এই দল তো আমার নিজের দল। এ-কথা কি সত্য নয়, কমিউনিস্ট পার্টির অন্য আর সকলের তুলনায় বিশ্বকে বোঝার ও তাকে বদলাবার জন্য সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রম করে? বিশ্বের মানুষ যাতে স্পষ্টভাবে সবকিছু অনুধাবন করতে পারে, যাতে সে মুক্ত ও সুখী হতে পারে? কমিউনিস্টরাই কি সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স বা আমার স্পেনে সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রমী নয়? তাহলে দ্বিধার প্রশ্ন ওঠে কীভাবে? আমি অঙ্গীকারবদ্ধ হব, সেই ভয়? কিন্তু (দলে যোগ দেওয়ার পর) আমি এর চেয়ে অধিক মুক্তি ও অধিক সম্পূর্ণ কখনই বোধ করিনি। আমি নিজের জন্য পুনরায় একটি দেশ খুঁজে পেতে প্রবল রকম উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমি বরাবরই নির্বাসিত ছিলাম, কিন্তু এখন আর নই। যতদিন আমি স্পেনে ফিরে না যেতে পারি, ততদিন ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি আমাকে আশ্রয়ের দুই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দলে আমি তাঁদের পেয়েছি, যাঁদের আমি সবচেয়ে শ্রদ্ধা করি, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন সেরা বিজ্ঞানী, সেরা কবি, রয়েছে সেই সব উজ্জ্বল মুখ, যাদের আমি আগস্ট মাসে প্যারিসে (নাৎসি প্রতিরোধে) জ্বলে উঠতে দেখেছি। আমি পুনরায় আমার ভাইদের খুঁজে পেয়েছি, আমি তাদের সঙ্গে রয়েছি।’
এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট হয়, খেয়ালের বশে, এলুয়ার বা আরাগঁর অনুরোধে পিকাসো কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেননি। শিল্প, এমনকি যে বিমূর্তধারার তিনি অনুসারী তার এক বিপ্লবী ভূমিকা রয়েছে, এ-বিষয়ে আর যাই হোক পিকাসোর মনে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। তিনি এ-কথাও জানতেন, জার্মান ফ্যাসিবাদ হয়তো পরাস্ত হয়েছে, কিন্তু একনায়কতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র নিশ্চিহ্ন হয়নি। পৃথিবীর মানুষের মৌলিক সমস্যা – তার সার্বিক মুক্তি – তাও অর্জিত হয়নি। অতএব মানুষের সংগ্রামেরও সমাপ্তি হয়নি। আঁন্দ্রে-লুই দুবোয়ার কাছে লেখা এক চিঠিতে পিকাসো সে-কথা এই ভাবে ব্যাখ্যা করেন :
আমরা এখনো নাৎসিদের হাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত নই। এখনো এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছে, যারা নাৎসিবাদের রোগে আক্রান্ত, যদিও তারা নিজেরা সে অসুখের কথা জানে না। অচিরেই সে কথা আমরা জানতে পারব। আর অসংখ্য দরিদ্রজন, তাদের কী হবে? সম্ভবত আমরা তাদের ত্যাগ করব। কিন্তু একসময় তারা নিজেরাই নিজেদের আত্মরক্ষার পথ নির্ধারণ করবে। বিক্ষোভ হবে, মিছিল হবে, দাঙ্গা হবে। আপনি কি ভাবেন তখন নিজের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি সে খেলা দেখব? অসম্ভব! আমি তাদের সঙ্গে থাকব, আমাকে পাবেন রাস্তায়, সেইসব বিক্ষোভকারীর সঙ্গে।
এ-কথায় অবশ্য কোনো ভুল নেই, ফরাসি ও সোভিয়েত কমিউনিস্টদের সঙ্গে পিকাসোর সখ্য খুব মধুর ছিল না। তাঁর শিল্পকর্ম যথেষ্ট বাস্তবধর্মী নয়, এই কথা জানিয়ে মস্কো থেকেও নেতিবাচক অভিমত এসে পৌঁছায়। ১৯৪৯ সালে প্যারিসে প্রথম আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনের জন্য পিকাসো যে ‘পায়রা’র ছবিটি এঁকে দেন, তা কমিউনিস্টদের কাছে প্রবল রকম আদৃত হয়েছিল, সে-ছবির জন্য তিনি ‘লেনিন শান্তি পুরস্কার’ও পেয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট শুদ্ধাচারীদের কাছে তিনি কখনই পুরোপুরি আদৃত হননি। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ, এমনকি ফরাসি কমিউনিস্টরাও পিকাসোর শিল্পকর্মকে খোলামেলাভাবেই ‘অবক্ষয়িত’ – ডেকাডেন্ট বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁদের কাছে পিকাসোর তুলনায় অনেক বড় শিল্পী ছিলেন ফুগেরঁ, যার সরল কিন্তু প্রবল রকম বাস্তবধর্মী ছবির ‘প্রচারমূল্য’ ছিল অনেক বেশি। ব্যাপারটা পিকাসোকে ব্যথিত করেছিল : ‘ওরা আমার কাছে কী চায়?’, এমন কথা বলে প্রতিবাদ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু দল থেকে বেরিয়ে আসার কথা কখনো ভাবেননি। বস্তুত ১৯৭৩ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত পিকাসো ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন।
কমিউনিস্টদের ফরমায়েশে পিকাসো গোটাকয় বাস্তবধর্মী ছবি আঁকেন, যেমন, ১৯৫১ সালে আঁকা ‘ম্যাসাকার ইন কোরিয়া’। কোরিয়ায় মার্কিন সেনাবাহিনীর নির্বিকার হত্যাকাণ্ডকে চিত্রিত করার উদ্দেশ্যে আঁকা হলেও কমিউনিস্ট মহলে আপত্তি ওঠে, সে-ছবিতে কোরীয় জনগণের প্রতিরোধের কোনো প্রকাশ নেই। পিকাসোর অন্য কোনো ছবিতে আমরা এর আগে এমন সুস্পষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ ধারণের চেষ্টা দেখিনি। একদল নগ্ন সৈনিক বন্দুক ও বেয়নেট হাতে নিরীহ ও অসহায় নারী, যাদের কেউ কেউ গর্ভবতী, প্রায় সবাই নগ্ন – তাদের হত্যায় উদ্যত। পিকাসো তাঁর নিজস্ব প্রতীকী ধারা থেকে সরে এসে প্রায় সোভিয়েত পোস্টার চিত্রের অনুকরণে ‘কোরিয়ায় গণহত্যা’ আঁকলেও কমিউনিস্ট কর্তাদের তিনি খুশি করতে পারেননি। কারণ এই ছবি দেখে বোঝা অসম্ভব এই ‘ম্যাসাকার’ কোরিয়ায় মার্কিনিদের হাতে ঘটেছে। যাদের হত্যা করা হচ্ছে এবং যারা হত্যাকারী, তারা যে-কোনো দেশের, যে-কোনো জাতিগোষ্ঠীর হতে পারে। সম্ভবত পিকাসো যুদ্ধের এই সর্বজনীন চরিত্র ধারণেই অধিক আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু কমিউনিস্ট নেতাদের কাছে ‘স্থান ও পাত্র সুনির্দিষ্ট’ না হওয়ায় এই ছবির প্রচারমূল্য কার্যত ছিল না।
এই সময়ে তার আঁকা সবচেয়ে বড় কাজ ‘যুদ্ধ’ ও ‘শান্তি’, এই নামের দুটি ম্যুরাল। ভালায়ুরির একটি অব্যবহৃত গির্জাঘরের দেয়ালের জন্য প্রস্তুত ম্যুরাল দুটির কথা খুব বেশি লোক মনে রাখেনি, তার মুখ্য কারণ ছবি দুটো খোলামেলাভাবে ‘প্রোপাগান্ডা’ ধাঁচের। ‘যুদ্ধ’ – এই ম্যুরালে শিংবিশিষ্ট এক দানব, তার কাঁধে মৃত মানুষের ঝুলি, হাত দিয়ে ভয়াবহ-দর্শন পোকা ছড়াচ্ছে। বোঝা কঠিন নয়, পিকাসো মার্কিনির ‘জীবাণু যুদ্ধ’ তৎপরতা চিত্রিত করেছেন। এই দানবের মুখোমুখি বর্ম হাতে ‘শান্তি’, সে-বর্মের কেন্দ্রে রয়েছে শান্তির পায়রা। ‘পায়রা’ ইতোমধ্যেই কমিউনিস্ট শান্তি আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে পিকাসো যে কমিউনিস্টদের শান্তির রক্ষক হিসেবে চিত্রিত করলেন, তাতে সন্দেহ নেই। ‘যুদ্ধ’ নামক ম্যুরালটির তুলনায় ‘শান্তি’ অনেক কম রাজনৈতিক, এর বিষয় শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্বের বদলে আসন্ন কোনো একসময় বিশ্বজুড়ে শান্তি স্থাপিত হবে, সে শান্তি সুপ্রসন্ন সূর্যালোকে মানবশিশু লালিত হবে আনন্দ ও মুক্তচিত্তে। পিকাসো, তাঁর বন্ধু এলুয়ারের প্রভাবেই, শান্তিকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বর্ম বলে চিত্রিত করেছিলেন। এই ছবি আঁকা শেষ হওয়ার পর ১৯৫২ সালে, পিকাসো স্পেনের তরুণ চিত্রকরের একটি খোলা চিঠিতে সরাসরি বলেছিলেন, ‘তুমি, তরুণ চিত্রকর, মনে রাখবে, তোমার স্থান হলো সেইসব মানুষের পাশে, যারা মুক্তির সপক্ষে লড়াই করছে।’
জেনেভিয়েভ স্মরণ করেছেন, এলুয়ার ও আরাগঁ পিকাসোর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন। এঁদের দুজনের মধ্যে আরাগঁ তাঁর বন্ধুকে নিয়ে অধিক উচ্চাকাক্সক্ষী ছিলেন। তাঁকে ব্যক্তিগত ট্রফির মতো ব্যবহার করেছেন আরাগঁ, কিন্তু এলুয়ার, জেনেভিয়েভের কথামতো, কমরেড পিকাসোর আনুগত্য বিষয়ে কম আস্থাবান ছিলেন। এ-কথায় কোনো ভুল নেই, ফরাসি কমিউনিস্টদের কাছে নিজেকে গ্রহণীয় করতে পিকাসোর নিজের চেষ্টা ও আগ্রহের কমতি ছিল না। যখন কোনো অনুরোধ এসেছে, বিনা প্রতিবাদে অন্য সকল কাজ সরিয়ে তা সম্পাদন করেছেন। সর্বদা যে তার ফল খুব আনন্দকর হয়েছে তাও নয়। জেনেভিয়েভ স্মরণ করেছেন, ১৯৫৩ সালে স্তালিন মারা যাবার পর, ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির তরফ থেকে অনুরোধ এলো সোভিয়েত নেতার একটি স্কেচ। বিনা বিলম্বে পিকাসো সে-স্কেচ করে দিলেন, কিন্তু আরাগঁ যখন সে-স্কেচ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে নিয়ে এলেন, সবাই একবাক্যে সে-ছবি প্রত্যাখ্যান করলেন। শুধু প্রত্যাখ্যানই নয়, স্তালিনের প্রতি অসম্মানের জন্য তীব্র ধিক্কারের সম্মুখীন হলেন পিকাসো।
এর আগে ১৯৪৯ সালে স্তালিনের ৭০তম জন্মদিবস উপলক্ষে পিকাসো স্তালিনের উদ্দেশে প্রথম ছবিটি আঁকেন, তা  স্তালিনের কোনো পোর্ট্রেট ছিল না, ছিল এক হাতে তুলে ধরা এক পান পাত্র, সঙ্গে এই বাক্য, ‘আপনার স্বাস্থ্য কামনা করি, কমরেড স্তালিন।’ বলা বাহুল্য, সে-ছবি কাউকেই খুশি করেনি। কিন্তু সদ্য পার্টিতে যোগ দেওয়া পিকাসোর বিরুদ্ধে কোনোরকম শোরগোল না করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ১৯৫৩ সালে স্তালিনের যে পোর্ট্রটেটি পিকাসো আঁকেন, যেখানে একজন তরুণ যুবক, যার সঙ্গে
স্তালিনের সাদৃশ্য খুবই সামান্য তা পার্টি নেতারা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করলেন। আরাগঁর নির্দেশে লু’মানিতে পত্রিকায় সে-ছবি ছাপা হলে পার্টি সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। সত্তরোর্ধ্বস্তালিনের মৃত্যু নিয়ে দলের সমর্থকেরা যখন শোকাহত, সে-সময় পিকাসোর এই তরুণ স্তালিন তাদের কাছে ঠাট্টা মনে হয়েছিল। পার্টির নির্দেশে আরাগঁকে লু’মানিতে পত্রিকায় শুধু যে সে-ছবি প্রত্যাখ্যান করে প্রবন্ধ ছাপাতে বাধ্য করা হলো তা-ই নয়, পাতার পর পাতা ভরে সাধারণ পার্টি সমর্থকদের চিঠিপত্র প্রকাশ করা হলো, যেখানে তাঁরা পিকাসোর ‘বুর্জোয়া’ মানসিকতার তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। আরাগঁ নিজে লিখলেন এক আত্মসমালোচনা, যার শিরোনাম ছিল ‘উচ্চৈঃস্বরে পাঠের জন্য’।
জেনেভিয়েভ স্মরণ করেছেন, পার্টির কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ক্রুদ্ধ ও ব্যথিত হয়েছিলেন পিকাসো। ‘যত্তোসব নির্বোধ।’ ক্রুদ্ধ পিকাসো সে ছবি ছিঁড়ে ফেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, আর কখনো স্তালিনের পোর্ট্রটে না করার প্রতিজ্ঞা করেন। সে ছবি ছিঁড়ে ফেলা হয়নি এবং পিকাসো পার্টির সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ করেননি। বস্তুত পরের পার্টির নির্দেশেই তিনি বিশ্বের বিভিন্ন শহরে কমিউনিস্টদের আয়োজিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
শান্তির সপক্ষে নিজের কণ্ঠকে শ্র“ত করা পিকাসোর জন্য বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুদ্ধকে তিনি ঘৃণা করতেন, জেনেভিয়েভকে সে-কথার ব্যাখ্যা হিসেবে পিকাসো বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের ভয়াবহ দিক হলো মানুষের নির্বিকার মৃত্যু। ফ্লোরেন্স ধ্বংস হয়েছে, তা খুবই বেদনার কথা, কিন্তু তার চেয়েও বেদনার ব্যাপার হলো, যারা এই শহর পুনর্নির্মাণ করতে পারত তাদের মৃত্যু। যুদ্ধের সময় ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় সে কেবল এ-কথা বোঝাতে যে এখানে যুদ্ধ হয়েছে, তার প্রমাণ না থাকলে কেউ সে-কথায় বিশ্বাস করবে না। কিন্তু ফ্লোরেন্স ধ্বংস হওয়ার ভেতর দিয়ে সে-যুদ্ধে জয় বা পরাজয় কিছুই প্রমাণিত হয় না।’ যুদ্ধের বিভীষিকার আসল প্রকাশ মানব মৃত্যু, এ কথা তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন বলেই তাঁর প্রতিটি যুদ্ধবিরোধী ছবির প্রধান অনুষঙ্গ মানুষ – মৃত ও জীবিত মানুষ।

আমাদের গল্পতে ফেরা যাক।

জেনেভিয়েভের সঙ্গে আলাপচারিতায় পিকাসো খুশি হয়েছিলেন, সম্ভবত একজন আয়ত-চক্ষু বালিকাকে তাক লাগানোর মতো অনেক কথা বলে ফেলেছেন, এমন একটি ভাবনা তাঁকে তুষ্ট করেছিল। কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পিকাসো জেনেভিয়েভকে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলে তার এক কপি নিয়ে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। সরবে, তাঁর স্টুডিওতে অন্য অতিথিদের সামনেই, মেয়েটিকে তাঁর ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দিতে সাবারতেকে নির্দেশ দিলেন।
পিকাসো ও জেনেভিয়েভের সম্পর্কের সেই শুরু। এরপর প্রতি বুধবার বিকেলে জেনেভিয়েভ আসতেন। পিকাসোর জীবনীকার প্যাট ও’ব্রায়ান লিখেছেন, ‘বিকেলবেলা ছিল পিকাসোর কাজের সময়। অথচ সব কাজ বাদ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি কিশোরী মেয়েটির সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যয় করেছেন, কখনো ঘরে, কখনো ধারেকাছের কোনো পার্কে। পিকাসো ততদিনে নামজাদা শিল্পী হলেও তাঁর চেহারা দেখেছে এমন লোক খুব বেশি ছিল না, ফলে অসম বয়সী এই দুজনের আলাপচারিতা কারো কাছে নিষিদ্ধ কোনো আগ্রহের জন্ম দেয়নি। পিকাসোর কোনো কোনো জীবনীকার যেমন, অ্যারিয়ানা হাফিংটন এমন ইঙ্গিত করেছেন যে, সে-সময় থেকেই জেনেভিয়েভ পিকাসোর অঙ্কশায়িনী, যদিও জেনেভিয়েভের নিজের লেখায়, অথবা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন এমন লেখকদের স্মৃতিচারণে সে-কথার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। জেনেভিয়েভ পিকাসোর অঙ্কশায়িনী হবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সে আরো পাঁচ-ছয় বছর পরের ব্যাপার।
আমরা বলছি ১৯৪৪-১৯৪৫ সালের কথা। ওলগা তখনো বেঁচে। শুধু বেঁচে নন, তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে চলেছেন। পিকাসোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এমন নারীদের সঙ্গে মেয়েলি ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছেন, এমনকি চুলোচুলিও। একসময়ের কিশোরী প্রেমিকা মারি-তেরেসের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ততদিনে চুকেবুকে গেছে, কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি, মুখ্যত কন্যা মায়ার প্রতি তাঁর নিবেদিত øেহের কারণে। মারি-তেরেসকে স্থানচ্যুত করেছিলেন বিদুষী ডোরা মার, পিকাসো ততদিনে তাঁর প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। পিকাসোর অবহেলার কারণেই ডোরা মারের মানসিক বৈকল্যের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চোখে পড়ছে। তাঁকে হটিয়ে নতুন প্রেমিকা ফ্রাঁসোয়া জিলো ইতোমধ্যে পিকাসোর জীবনে নিজের স্থান ও শয্যা গ্রহণ করেছেন। জিলো নিজে চিত্রকর, শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতির প্রবল বাসনা পোষণ করেন, তিনি পিকাসোর দ্বারস্থ হয়েছিলেন ব্যক্তিগত স্বার্থ মাথায় রেখে। পরে লাইফ উইথ পিকাসো – এই নামের গ্রন্থে জিলো পিকাসোর প্রতি তাঁর গভীর প্রেম ও আনুগত্যের ফিরিস্তি দিয়েছেন। একই সঙ্গে এ-কথাও বলছেন, পিকাসোর সঙ্গে তাঁর বয়সের তারতম্য তাঁদের দুজনের সম্পর্কে দেয়াল হয়ে উঠেছিল। পিকাসো নিজেও বুঝতে পারছিলেন, জিলোর অব্যাহত অনুযোগ তাঁকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে। রূপসী ও বিদুষী বলেই এই যুবতীটির প্রতি তিনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলেন। এই সময়ে জেনেভিয়েভের প্রবেশ। আমরা অনুমান করতে পারি সে-বালিকার প্রতি পিকাসো – যার যৌনক্ষুধা অপরিসীম – প্রলুব্ধ হয়তো হয়েছেন, কিন্তু তাকে নষ্ট ফুল বানাতে চাননি। এখনই নয়।
প্যাট ও’ব্রায়ান জানিয়েছেন, ফ্রাঁসোয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যত জটিল হয়েছে, জেনেভিয়েভ লাপোরতের সঙ্গে পিকাসো তত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। এই দুইয়ের মধ্যে অবশ্য কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল, তা নয়। পিকাসোর কাছে জেনেভিয়েভ তখন পর্যন্ত চমৎকার একটি বালিকা মাত্র। ১৯৪৪ ও ১৯৪৫ সালের হেমন্তে ও নির্দয় শীতে জেনেভিয়েভের আগমন অব্যাহত থাকে। পিকাসোর শয্যায় মোষের চামড়ার যে রোমশ চাদর ছিল, জেনেভিয়েভের স্থান হলো তার ওপর। মেয়েটি সেখানে এসে বসত, পিকাসো তাকে নিজে হাতে চা বানিয়ে খাওয়াতেন, তাকে স্কেচ খাতায় কি এঁকেছেন, তা দেখাতেন। একবার তাকে রাত্রিযাপনের অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু জেনেভিয়েভ ব্যাপারটাকে ঠাট্টা বলে ধরে নেন। তখন পর্যন্ত পিকাসো ওই কিশোরীকে আপনি – তুমি নয় – বলে সম্বোধন করতেন।
জেনেভিয়েভ আমেরিকায় পাঠ শেষে প্যারিস ফিরে আসেন ১৯৫১ সালে। তাঁর উৎসাহেই পুনরায় যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় পিকাসোর সঙ্গে। জেনেভিয়েভ তখন আর কিশোরী স্কুলছাত্রী নন, রীতিমতো যুবতী। ফের প্রতি সপ্তাহে তাঁদের দুজনের দেখা-সাক্ষাৎ শুরু হয়। পল এলুয়ারকে সে কথা জানিয়ে পিকাসো বলেন, ‘জেনেভিয়েভের জন্য আমি আবার হাসতে পারছি।’ শুধু হাসি-ঠাট্টাই নয়, অধিকাংশের ধারণা, এই সময় – অর্থাৎ ১৯৫১ সাল নাগাদ – জেনেভিয়েভ পিকাসোর অঙ্কশায়িনী হন। পিকাসো সম্ভবত যথার্থই জেনভিয়েভের নিকটবর্তী হয়ে প্রকৃত সুখী বোধ করেছিলেন। প্যারিস থেকে দূরে সেন্ট ট্রপিজের সমুদ্রসৈকতে এক গ্রীষ্মকালীন অবসর নিবাসে ওঠেন তাঁরা দুজন। জেনেভিয়েভের বর্ণনা থেকে তাঁদের সে সময়ের অভিজ্ঞতার বিবরণ মেলে।
‘পিকাসোকে আমি স্কুলছাত্রী হিসেবে প্রতি বুধবার তাঁর গৃহে আমার গল্প-গুজবের কথা স্মরণ করিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে সময় আমি জানতে চেয়েছিলাম, বিশ বছর বয়স হলে আমার কি করা উচিত। তুমি উপদেশ দিয়েছিলে, ভালো দেখতে কোনো ছেলে পেলে প্রেম করো।’ সে-কথা শুনে পিকাসো হো হো করে হেসে বললেন, ‘তাই নাকি? আসলে আমি নিজের কথাই ভাবছিলাম। আমি যদি মাঝেমধ্যে আয়নায় নিজের চেহারা না দেখতাম, তাহলে সম্ভবত আমার বয়স হয়েছে, সে কথা মনেই পড়ত না।’

তিন
পিকাসোর বয়স যখন ৭০, জেনেভিয়েভ লাপোরত আনুষ্ঠানিকভাবে সেই বৃদ্ধ শিল্পীর প্রেমিকার ভূমিকা গ্রহণ করলেন। এ-কথার অর্থ, তিনি কেবল পিকাসোর অঙ্কশায়িনীই নন, তাঁর সার্বক্ষণিক সহচর। লোকচক্ষুর ভয় না থাকলেও ছিল পুরনো প্রেমিকাদের উৎপাত। তাঁদের এড়িয়ে চলতে হয়, অন্যথায় চুলোচুলি হওয়ার আশঙ্কা। পিকাসো প্রথমে গ্রাঁ-আগুস্তিনের অ্যাপার্টমেন্টেই তাঁকে তুলেছিলেন, যে-বাড়িতে তাঁদের দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ। পরে অবশ্য তাঁরা দুজন সারা ফ্রান্স চষে বেরিয়েছেন। পিকাসো নিজে গাড়ি চালাতে জানতেন না। সদ্য ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছেন জেনেভিয়েভ, তিনি গাড়ি চালিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে নিয়ে গেছেন। পিকাসোর একাধিক জীবনীকার এ-ব্যাপারে একমত যে, চার-পাঁচ বছর এঁরা দুজন ঘনিষ্ঠ ছিলেন, পিকাসো সম্ভবত তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখী ও সুন্দর সময় কাটিয়েছেন। পল এলুয়ারকে পিকাসো বলেছিলেন, ‘জেনেভিয়েভ তাঁকে রক্ষা করেছে, তাঁর মুখে হাসি ফুটিয়েছে।’ তিনি জেনেভিয়েভকে কোনো ভণিতা ছাড়াই বলেছিলেন, ‘আমাদের দুজনের প্রেম এখনো জমাট বাঁধছে, আমার আশা সে প্রেম আমরা নির্মাণ করব।’ একদিন প্যারিস ছেড়ে যাওয়ার আগে পিকাসো চোখে জল নিয়ে বলেছিলেন, ‘এর আগে আমি কখনো কোনো মেয়ের জন্য চোখের জল ফেলিনি।’
জেনেভিয়েভ, তখনো পরিণত অভিজ্ঞতার মানুষ নন তিনি, পিকাসোর কথা বিশ্বাস করেছিলেন। অথবা আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, পিকাসোর প্রেম নিবেদনে বিশ্বাস স্থাপনে তিনি উন্মুখ ছিলেন। ‘আমি কীভাবে এ-কথা লিখতে সাহস অর্জন করি যে আমিই ছিলাম পিকাসোর জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রেম, সম্ভবত শেষ প্রেম?’ আমরা জানি, জেনেভিয়েভ পিকাসোর শেষ প্রেম ছিলেন না, অথবা তাঁর জীবনের শেষ নারীও তিনি নন। অনুমান করি, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে জেনেভিয়েভ পিকাসোর সান্নিধ্য কামনা করেছিলেন। তিনি বুদ্ধিমতী, বিদুষী, তার চেয়েও বড় কথা, পূর্ণ যৌবনের লাবণ্যে ধন্য। পিকাসোর প্রতিভা কাছ থেকে দেখার ও অনুভব করার অভিজ্ঞতা তাঁকে অভিভূত করেছিল, সম্ভবত কিঞ্চিৎ অতি-আত্মবিশ্বাসী করেছিল। তাঁদের সম্পর্ক অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, দেনা-পাওনার হিসাব-নিকাশ ওঠার আগেই তিনি সরে আসেন।
পিকাসোর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও জেনেভিয়েভকে প্রীত দৃষ্টিতে গ্রহণ করেছিলেন। সাবারতে ও পিকাসোর দীর্ঘ সময়ের গৃহপরিচারিকা ইনেস জেনেভিয়েভকে গ্রাঁ-আগুস্তিনে দেখতে পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। আরেক মৌ-লোভী সে নয়, এ-কথা বুঝতে তাদের বিলম্ব হয়নি। সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন পল এলুয়ার। সেন্ট ট্রপিজের যে বাড়িতে তাঁরা দুজন ১৯৫১-এর গ্রীষ্ম কাটান, এলুয়ারই তাঁর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
পিকাসোর সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের যে বিবরণ জেনেভিয়েভ লিপিবদ্ধ করেছেন, তাতে এক ভিন্ন পিকাসোর পরিচয় মেলে। তিনি কৌতুকপ্রবণ, বন্ধুবৎসল, আন্তরিক ও নিবেদিত প্রেমিক। ডোরা মার ও ফ্রাঁসোয়ার অহর্নিশ বিদ্রুপ ও কলহে ক্লান্ত পিকাসোর জন্য সদ্য যৌবনে পড়া এই মেয়েটি ছিল যেন হঠাৎ দমকা হওয়ার মতো। যতটা সম্ভবত তাঁকে গায়ে জড়িয়ে রাখতে চেয়েছেন পিকাসো। বিবাহিত জীবন তাঁর কাছে কতটা দুর্বিষহ, তার ব্যাখ্যা হিসেবে পিকাসো একসময় তাঁকে বলেছিলেন, ‘প্রেম নিয়ে তুমি দেদার কথা বলতে পার, কিন্তু একসময় পুরো ব্যাপারটা তেতো হয়ে আসে। প্রেম উধাও হয়, যা অবশিষ্ট থাকে তা হলো ধোপাখানার খর্চা-খাতার হিসাব-নিকাশ।’
মেয়েটিকে হাতে ধরে ছবি আঁকতে শেখানোর চেষ্টা করেন পিকাসো। সোজা লাইন আঁকার চেয়ে কঠিন কাজ আর নেই, একসময় তিনি বলেছিলেন। তারপর দুই টুকরো কাগজ নিয়ে দুটোতেই একটা ফুলদানি আঁকলেন – অনেকটা কলসের মতো, খাড়া দাঁড়ানো, প্রশস্ত ভূমি ও মোটা পেট, কিন্তু গলাটা সরু, ওপর দিকে ওঠানো। তারপর এক টুকরো কাগজ জেনেভিয়েভের দিকে বাড়িয়ে বললেন, ‘আমি এবার একটা পেঁচা এঁকে শেষ করব।’ এক মুহূর্তের মধ্যে তিনি দুটো বৃত্ত এঁকে দিলেন, যা হয়ে উঠল এক জোড়া চোখ, একটা লাতিন ‘ভি’ অক্ষর, যার আড়াআড়ি একটা সরলরেখা, হয়ে উঠল চঞ্চু। মাঝামাঝি টানলেন দুটি গাঢ় কালো রেখা, যা হয়ে উঠল পাখা, আর মাঝখানে কিছু ফোঁটা এঁকে দিলেন, যা দেখে মনে হয় পাখির পালক। আঁকা শেষ হলে জেনেভিয়েভের দিকে কালি ও কলম বাড়িয়ে বলেন, এবার তুমি আঁকো। বলা বাহুল্য, জেনেভিয়েভ যা আঁকলেন তা ভয়াবহ। বিব্রত জেনেভিয়েভকে সান্ত্বনা দিয়ে পিকাসো বললেন, ‘শোনো, প্রথমে আঁকতে হয় মোটা দাগের লাইন। তা না হলে তোমার রেখা দেখে মনে হবে তা বুঝি উড়োজাহাজ, যে উড়তে চাইছে কিন্তু ক্রমশই মাল বাড়িয়ে চলেছে। দেখো, আমি কালো কালি ব্যবহার করেছি, কিন্তু আমার পেঁচা হলো সাদা, আর তোমারটা হলো খয়েরি। তোমার কালো দাগগুলো খুব মোটা, তাদের পরস্পরের মধ্যে ব্যবধানও বিস্তর।’
স্টেন ট্রপিজে থাকার সময় গল্প-গুজব করতে করতেই পিকাসো জেনেভিয়েভের বেশকিছু কালি-কলমের পোর্ট্রটে এঁকে দেন। সাদা কাগজে কালো কালির স্কেচ, জেনেভিয়েভ বিস্মিত হয়ে লিখেছেন, প্রতিটি স্কেচের বৈশিষ্ট্য তার শ্বেত-শুভ্রতা। কাগজের ওপর একটি রেখা টেনে দিলেই মনে হয় সাদা কাগজের ওপর ঝকঝকে রুপোর চাকতি। বেণু-বাঁশ, যা দিয়ে কোথাও কোথাও বেড়া দেওয়া হয়, তা দিয়ে বানানো একটি কলমে ছবিগুলো আঁকা। পিকাসোর মন্তব্য ছিল, ‘ঠিক যেমন ভ্যান ঘগের মতো।’ ভ্রুর জন্য পেনসিল দিয়েও গোটা কয়েক পোর্ট্রেট রয়েছে। একটি পোর্ট্রটে-কোলাজ এঁকেছিলেন পিকাসো, যাতে জেনেভিয়েভের পোশাক এসেছিল পুরনো বইয়ের জ্যাকেট থেকে, মুখখানা এঁকেছিলেন বল পয়েন্ট কলম দিয়ে, স্তনাগ্র এঁকেছিলেন লিপস্টিক দিয়ে।
পিকাসো বরাবরই তাঁর লাইন-ড্রয়িংয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত যতœ নিতেন, সবিশেষ গুরুত্ব দিতেন। পিকাসো একাধিকবার বলেছেন, পেইন্টিংয়ে অনুকরণ সম্ভবত, কিন্তু লাইন ড্রয়িংয়ে অনুকরণ অসম্ভব। সেখানে শিল্পীকে অনেক বেশি যথাযথতা অনুসরণ করতে হয়, তাঁকে অনেক বেশি তির্যকতা অর্জন করতে হয়। পিকাসোর আঁকা জেনেভিয়েভের লাইন ড্রয়িং থেকে সেই যথাযথতা ও তাৎক্ষণিকতা অনিবার্যভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। কালির রেখায় আঁকা ছবি, আপাতসরল সেই রেখাতে গভীর, অতীন্দ্রিয় ইঙ্গিতময়তার সন্ধান মেলে, সে কারণে শিল্পবোদ্ধাদের চোখে পিকাসোই সম্ভবত বিশ শতকের সেরা রেখাঙ্কন শিল্পী।
জেনেভিয়েভ একবার মন্তব্য করেছিলেন, পিকাসোর আঁকা ভূচিত্র (ল্যান্ডস্কেপ) খুব কম, কিন্তু কেন? পিকাসোর জবাব ছিল, ‘কারণ খুব বেশি ভূচিত্র আমার দেখা হয়নি। আমি সারাজীবন নিজের ভেতরেই বাস করেছি। আমার অন্তর্গত ভূচিত্র এমন সুন্দর, এমন বৈচিত্র্যময় যে, প্রকৃতিতে এমন সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
জেনেভিয়েভকে মডেল করে পিকাসোর আঁকা সবচেয়ে বিখ্যাত ছবির নাম ‘ওডালিস্ক।’ কাগজে পেনসিলে করা এই স্কেচটি সম্ভবত পিকাসোর সবচেয়ে বাস্তবধর্মী ন্যুড স্কেচের একটি, এখানে প্রতিটি রেখা জীবন্ত। ছবিটি আঁকা শুরু হলে জেনেভিয়েভ ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, সেই ঘুমন্ত নগ্নিকার ছবিটিই তিনি এঁকে শেষ করেন। এন্ড্রু ব্রিঙ্ক, যাঁর গ্রন্থ ডিজায়ার অ্যান্ড এভয়ডেনস পিকাসোর চিত্রকলার নিষিদ্ধ ইঙ্গিতময়তার জন্য পাঠকদের দৃষ্টি কেড়েছেন, তাতে মন্তব্য করেছেন, পিকাসোর হাতে মেয়েদের পোর্ট্রটে শুরু হয় গভীর মমতায়, প্রকৃত ভালোবাসায়। ক্রমশ তা পরিবর্তিত হয় ঘৃণায়। কথাটা পিকাসোর অধিকাংশ প্রেমিকার বিষয়ে হয়তো সত্য, কিন্তু জেনেভিয়েভ তার ব্যতিক্রম। এর এক কারণ, খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি তাঁদের সম্পর্ক, তিক্ততায় গড়ানোর আগেই সে সম্পর্কে ইতি পড়ে। রিচার্ডসন অবশ্য পিকাসো জেনেভিয়েভের যে কয়টি স্কেচ এঁকেছেন তার সব কয়টিকেই এক জায়গায় জড়ো করে এই বলে উড়িয়ে দিয়েছেন যে, এই স্কেচগুলো বড়জোর ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। তাঁর সে-কথার সঙ্গে একমত হতে হবে এমন কোনো কারণ নেই। ‘ওডালিস্কে’র বেলায় ছবিটি ‘ন্যাচারালিস্টিক’, কিন্তু তার অনিবার্য কামজ প্রভাব – তার সেঞ্জুয়ালিটি আমাদের মুগ্ধ না করে পারেই না। অবশ্য এ-কথাও ঠিক, পিকাসোর ছবিতে যে দ্ব্যর্থবোধকতা, একই সঙ্গে কামনা ও প্রত্যাখ্যানের যে বৈপরীত্য দেখি – এখানে তা অনুপস্থিত।
তাঁর পোর্ট্রেেটর যে দ্ব্যর্থবোধকতা, পিকাসো ভিন্নভাবে তা জেনেভিয়েভের কাছে নিজেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁরা যখন একে অপর বিচ্ছিন্ন, সে-সময় স্মৃতি থেকে জেনেভিয়েভের একটি স্কেচ আঁকেন পিকাসো, যাকে শিল্পী ও তাঁর মডেলের যৌথ ‘সন্তান’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ‘দেখো, এই ছবির শিল্পী আমরা দুজনেই, অথচ সে তুমিও নও, আমিও নই। এর এক সম্পূর্ণ নিজস্ব জীবন রয়েছে। আমি যখন তোমার স্কেচ করি, আমি চাই তাতে এক জন্তুর জীবন দিতে। কিন্তু তা কখনো হয় এক ক্ষুদ্র বালিকা, অথবা পূর্ণ রমণী। আর এজন্যই ড্রয়িং ব্যাপারটা বড় জটিল, বড় কঠিন।’
পিকাসো এ-কথা জানতেন তিনি সুপুরুষ, সেজন্য সুন্দরী রমণীকুল তাঁর চতুর্দিকে জড়ো হয় না। তাঁর প্রতিভার দ্যুতি তাদের কাছে টেনে আনে, সম্ভবত তাঁর বিত্তও। জেনেভিয়েভের কাছে সে-কথা সম্ভবত স্বগতোক্তির মতোই বলেছিলেন তিনি। ‘দেখো, প্রেম নিয়ে বিস্তর আজেবাজে কথা বলা হয়। কোনো মেয়ে যদি অর্থের জন্য কোনো পুরুষকে ভালোবাসে তো সেটা যেন মহা অপরাধ বলে ভাবা হয়। কিন্তু এতে সমস্যা কোথায়? আসল ব্যাপার হলো, মেয়েটা পুরুষটা ভালোবাসছে কি না! কারো লম্বা নাকের বদলে যদি তার অর্থের জন্য ভালোবাসা হয় তো ক্ষতি কী?’
পিকাসো তাঁর যশ ও বিত্ত উভয় ব্যাপারেই সচেতন ছিলেন। জেনেভিয়েভের কাছে ভালো মানুষ সাজার চেষ্টা হয়তো তিনি করে থাকবেন, কিন্তু জেনেভিয়েভের বুঝতে কষ্ট হয়নি এই মানুষটির বিধ্বংসী ক্ষমতা। জেনেভিয়েভ লিখেছেন, ‘পিকাসো ছিলেন সূর্যের মতো, আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ। তিনি জ্বলে উঠতেন, পুড়তেন, অন্যকে পোড়াতেন এবং তাঁর নিকটবর্তী হয়েছে এমন সবাইকে ছাইয়ে পরিণত করতেন।’ জঁ ককতো, পিকাসোকে যিনি নিজের হাতের তালুর মতো চিনতেন, তার মূল্যায়ন তেমন ভিন্ন কিছু ছিল না। ‘পিকাসো চিরকাল কারো সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ায় ভীত। যে তাঁর জীবনে জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করেছে, পিকাসো তাকে নিঃশেষ করে ছেড়েছেন। আর তাঁর একাকিত্বের সেটাই আসল কারণ।’
পিকাসোর নিজের ব্যাখ্যা অবশ্য ছিল ভিন্ন। জেনেভিয়েভকে তিনি এই বলে বুঝ দিয়েছিলেন যে, তিনি অন্যকে কখনো আঘাত করেননি, অন্যকে আঘাত করতে তিনি ভয় পেতেন। ‘ফ্রাঁসোয়ার কথা ধরো। মেয়েটিকে আমি কখনো ভালোবাসিনি, অথচ মেয়েটার পেয়ালা-ভরা স্মতি, যে পেয়ালা থেকে কিছু পান করতে আমার আর কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু সে কাপ গুঁড়িয়ে ফেলতেও আমি চাই না।’ ডোরা মারকে নিয়েও পিকাসো প্রায় একই মন্তব্য করেছিলেন জেনেভিয়েভের কাছে। ‘ওকে আমি কখনো ভালোবাসিনি। ডোরা আমার কাছে ছিল একটা পুরুষ মানুষের মতো।’ ডোরা তার কথা শুনে চোখের জলে ভাসত, সে-কথা বলে যেন আনন্দ পেতেন পিকাসো। ‘কী রকম কাঁদাকাটি জুড়ে দিত ডোরা, না দেখলে বিশ্বাস করবে না। আমি মোটেও বিস্মিত হইনি যে মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে যায়।’
পিকাসো ও জেনিভিয়েভের প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। পিকাসোর বয়স এক কারণ, অন্য কারণ পিকাসোর জীবনে অন্য নারীর উপস্থিতি। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল এই কয়েক বছর যখন তাঁরা দুজন একে অপরের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে সময় কাটান, তার পুরোটা সময় কালো মেঘের মতো জুড়ে ছিলেন ফ্রাঁসোয়া ও ডোরা মার। ১৯৪৫ সাল থেকে, ফ্রাঁসোয়ার আবির্ভাবের পর থেকে ডোরা ও পিকাসোর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ডোরার মানসিক ভারসাম্য হারানোর লক্ষণ প্রকট হলে পিকাসো তাঁর এক ঘনিষ্ঠ চিকিৎসক বন্ধুর মাধ্যমে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এ-কথা ঠিক, কিন্তু সে-চিকিৎসা সম্ভবত ভালো না হয়ে মন্দই হয়েছিল। ডোরার প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি ছিল না পিকাসোর, জেনেভিয়েভকেই তিনি সরাসরি বলেছিলেন ডোরাকে তিনি ঘৃণা করেন। শুধু ডোরা নয়, ফ্রাঁসোয়ার প্রতি নিজের বিরক্তি ও  অতৃপ্তি লুকোননি তিনি। শুধু তাকে অপমান করার জন্য সর্বসমক্ষে পিকাসো ফ্রাঁসোয়াকে বিদ্রুপ করে বলেছেন, তোমাকে এখানে আনাই ভুল হয়েছে। এর চেয়ে অনেক ভালো ছিল কোনো বেশ্যার কাছে যাওয়া।
পিকাসো শুধু তাঁর প্রেমিকাদের প্রতি নয়, তাঁর বন্ধুদের ব্যাপারেও নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারতেন, তাদের নিয়ে কদর্য মন্তব্যে অভ্যস্ত ছিলেন। এলুয়ারকে নিয়ে তিনি জেনেভিয়েভকে জানান, এলুয়ার তাঁকে বারবার অনুরোধ করেছে তার স্ত্রী নুশের সঙ্গে যেন সঙ্গমে লিপ্ত হন। ‘না করা হবে তাঁর বন্ধুত্বের অবমাননা।’ আমরা অন্য সূত্র থেকে জানি, পিকাসো বন্ধুর সে-অনুরোধ রেখেছিলেন। জেনেভিয়েভের কাছে অবশ্য ভালো মানুষ সেজে বলেছিলেন, কখনো কখনো পল বেশ্যা নিয়ে হোটেলে ভাড়া ঘরে তুলত, আর তিনি ও নুশ হোটেলের লবিতে বসে আলাপচারিতা সারতেন।
সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষজনের প্রতি কীরূপ বিদ্রুপ ও অশ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাবে সমর্থ ছিলেন পিকাসো তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন জেনেভিয়েভ। সেন্ট ট্রপিজের রাস্তায় একবার বছর তিরিশেকের এক শিল্পী, তাঁর হাতে এক তোড়া ফুল, পিকাসোকে অনুরোধ করলেন, তাঁর স্টুডিও খুব কাছে, শিল্পী যদি একবার অল্প সময়ের জন্য সেখানে পা রাখেন তাহলে সে কৃতজ্ঞ হবে। পিকাসো তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ফুল হাতে নিয়ে তুমি কী করছ? যুবকটি জানালো, সে-ফুলের ছবি আঁকবে। পিকাসো ভদ্র মিষ্টি গলায় পালটা প্রশ্ন করলেন, তুমি ফুলের ছবি কেন আঁকবে? যুবকটির উত্তর, কারণ ফুলের সুবাস। এবার পিকাসো জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি বিবাহিত? হ্যাঁ, উত্তরে সে-কথা জানালে পিকাসো ব্যঙ্গস্বরে বললেন, ‘বেশ, এক কাজ করো। তোমার বউকে নিয়ে এসো। আমি তাকে সঙ্গম করব, তারপর তুমি আমার শিশ্ন শুঁকে দেখতে পার। দেখবে তার গন্ধ তোমার ফুলের চেয়েও সুন্দর।’ সে-কথা বলে হো হো করে হেসে জেনেভিয়েভকে বগলদাবা করে হেঁটে গেলেন পিকাসো।
পিকাসোর নির্মমতার সেটাই শেষ ছিল না। সন্ধ্যায় রেস্তোরাঁয় তাঁদের ফের দেখা সেই যুবকের সঙ্গে। সে সবিনয়ে জানাল, সে অস্ট্রিয়া থেকে এসেছে চিত্রাঙ্কন পেশায় দক্ষতা অর্জন করতে। বিখ্যাত চিত্রকর পিকাসো কি তাকে ছবি আঁকা নিয়ে কোনো সদুপদেশ দেবেন? জবাবে পিকাসো বললেন, ‘এক কাজ করো। তুমি ভিয়েনা ফিরে যাও, সেখানে তোমার বাবাকে বলাৎকার করো, তারপর দেখবে তোমার ছবি আঁকায় উন্নতি হয়েছে।’ হাত বাড়িয়ে যুবকটিকে বললেন, ‘এবার বিদেয় হও।’
১৯৫৪ সালের শেষ নাগাদ ফ্রাঁসোয়া শেষ পর্যন্ত পিকাসোকে বরাবরে মতো ছেড়ে আসেন। ফ্রাঁসোয়া নিজের জবানিতে সে-ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি চলে যাচ্ছেন, একথা শোনার পর পিকাসো জিজ্ঞাসা করেন, কেন, তোমার জীবনে কি অন্য কোনো পুরুষ আছে? উত্তরে ফ্রাঁসোয়া না বলেন, যদিও একাধিক জীবনীকার জানিয়েছেন, ফ্রাঁসোয়া তার বেশ আগে থেকেই একজিন গ্রিক যুবকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ফ্রাঁসোয়ার গৃহত্যাগের পর অকস্মাৎ সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন পিকাসো। আশ্রয় পাবেন এ-আশায় তিনি হাত বাড়ান জেনেভিয়েভের দিকে।
কিন্তু ততদিনে অবশ্য পিকাসোর সঙ্গে জেনেভিয়েভের কিঞ্চিৎ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ১৯৫২ সালের নভেম্বরে আকস্মিকভাবে মারা যান পল এলুয়ার। তাঁর মৃত্যু পিকাসো ও জেনেভিয়েভ উভয়কেই গভীরভাবে আঘাত করে। তাঁদের দুজনের যোগসূত্র ছিলেন এলুয়ার। সে-সময় থেকে বেশ কয়েক মাসের জন্য জেনেভিয়েভ পিকাসোর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেন। চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাঁদের অবশ্য যোগাযোগ ছিল, কবিতা নিয়ে তাঁদের মতবিনিময় হতো, কিন্তু মুখোমুখি দেখা হয়নি। সে-সময় ফন্তেনব্লর অরণ্য ঘেঁষে আরবঁতে একটি খামারবাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন জেনেভিয়েভ, সেখানে একটি কবিতাগ্রন্থ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। ফ্রাঁসোয়ার গৃহত্যাগের পর কিছুটা দিশেহারার মতোই জেনেভিয়েভের সঙ্গে যোগাযোগ করেন পিকাসো। হঠাৎ পিকাসোর টেলিগ্রাম এসে হাজির, অবিলম্বে তাঁকে ফোন করতে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। ফোনে কথা হতেই পিকাসো অস্থির হয়ে বললেন, ‘শিগগির আসো।’ কেন, তার কোনো ব্যাখ্যা করলেন না।
প্যারিসে গ্রাঁ আগুস্তিনের বাসায় আসতেই দরজা খুলে দিলেন ইনেস। ফিসফিস করে জানালেন, ছেলেমেয়ে নিয়ে শেষমেশ ঘর ছেড়ে চলে গেছে ফ্রাঁসোয়া। এ-কথা তাঁকে জানাতে ইতস্তত করছিলেন পিকাসো, ইনেসই জেনেভিয়েভের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। জেনেভিয়েভ তাকিয়ে দেখলেন এক একাকী ও অসহায় বৃদ্ধ। সম্ভবত কিঞ্চিৎ করুণার সঞ্চার হলো, তিনি জানালেন নিজের খামারবাড়ির কথা, প্রস্তাব করলেন তাঁর সঙ্গে সেখানে কিছু সময় কাটালে পিকাসোর হয়তো ভালো লাগবে। সম্মত হয়ে নীরবে গাড়িতে উঠলেন পিকাসো। প্যাট্রিক ও’ব্রায়ান সে মোটর ভ্রমণের বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, পিকাসো আন্তরিকভাবে চাইছিলেন জেনেভিয়েভ যেন তাঁর সঙ্গে এক ঘরে এসে ওঠে, প্রেমিকা হিসেবে স্থায়ী আসন গ্রহণ করে। কিন্তু লজ্জা ও অস্বস্তির কারণে মুখ ফুটে সে-কথা বলতে পারলেন না। জেনেভিয়েভের খামারবাড়িতে এসে কিছুটা স্বাভাবিক হলেন পিকাসো, ঘরে লণ্ঠন জ্বেলে দিলে তাঁরা দুজন মুখোমুখি হলেন। পিকাসো তামার লণ্ঠন ও বসার ঘরের লাল-সাদা পর্দার দিকে তাকালেন। চোখের তারা নাচিয়ে, কিছুটা দুষ্টামি নিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি কি সেই চীনা প্রবচনটা জানো? যখন লণ্ঠনের আলো জ্বলে ওঠে, তখন অতিথির চলে যাওয়ার সময় হয়।’
পরদিন পিকাসোর জ্যেষ্ঠ পুত্র পল, যে পিতার গাড়িচালকের দায়িত্ব পালন করছিল, এসে হাজির। পিকাসো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি সেই সকালেই ভাউরির নিজের বাড়িতে ফিরে আসবেন। বাড়িটি তিনি ফ্রাঁসোয়ার জন্য কিনেছিলেন। জেনেভিয়েভ বিস্মিত হয়েছিলেন, কারণ তাঁর আশা ছিল দিনকয়েকের জন্য হলেও পিকাসো তাঁর সঙ্গে এই খামারবাড়িতে সময় কাটাবেন। গাড়িতে ওঠার আগে পিকাসো সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি, তুমি আসছো তো?’ জেনেভিয়েভ একবার সে-বাড়িতে গেছেন বটে, কিন্তু সে-স্মৃতি তাঁর জন্য খুব মধুর ছিল না। সে-বাড়ির প্রতিটি কোনায় ফ্রাঁসোয়ার স্মৃতি। মুখ ফসকে বলে ফেললেন, ‘তার আগে বিছানার চাদরগুলো বদলানোর ব্যবস্থা করুন।’
একা ফিরে গেলেন পিকাসো।
সেদিন সন্ধ্যায় এলুয়ারের বিধবা ডোমিনিক জানালেন, পিকাসো খুব আশা করেছিলেন জেনেভিয়েভ তাঁর সঙ্গে স্থায়ীভাবে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নির্মাণে সম্মত হবে, ফ্রাঁসোয়ার স্থান সে গ্রহণ করবে। সে-ঘটনার অনেক পরে, প্রায় তিরিশ বছর পর, নিজের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন জেনেভিয়েভ। পিকাসো তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য কামনা করেছিলেন, এ-কথা বুঝতে তাঁর কষ্ট হয়নি। কিন্তু পিকাসো নিজে মুখ ফুটে সে-কথা বলতে পারেননি। সম্ভবত বিনয়, অথবা লজ্জার জন্যই। একদম শেষ মুহূর্তে পিকাসো তাঁর মনের কথা ইঙ্গিতে জানালেও তা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না জেনেভিয়েভ।
তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও যোগাযোগ কিন্তু শেষ হয়নি। প্যারিসে ফিরে যাওয়ার পর চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাঁদের ফের যোগাযোগ হয়। পিকাসো কথা দিয়েছিলেন জেনেভিয়েভের কবিতার বইয়ের অঙ্গসজ্জা করে দেবেন। সে-কথা রেখেছিলেন পিকাসো। মাত্র দুশো কপি সে বই ছাপা হয়েছিল, দেখতে না দেখতেই তা শেষ হয়ে যায়, এমনকি পিকাসো নিজেও এক কপি বই পাননি।
জেনেভিয়েভ মঞ্চ থেকে অন্তর্হিত হওয়ার পর সেখানে প্রবেশ জ্যাকলিন রকের। ১৯৫৩ সালে সাতাশ বছর বয়স্ক জ্যাকলিনের সঙ্গে পিকাসোর পরিচয় ও প্রেমের শুরু। অর্থাৎ জেনেভিয়েভকে যখন স্থায়ী প্রেমিকার সম্মান দেওয়ার প্রস্তাব করেন পিকাসো, তার আগেই জ্যাকলিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। এই তথ্য মাথায় রাখলে জেনেভিয়েভের কাছে পিকাসোর প্রস্তাব খুব আন্তরিক মনে হয় না। ছয় বছর পর, ১৯৬১ সালে, তাঁর প্রথম স্ত্রী ওলগার মৃত্যুর পর, পিকাসো আনুষ্ঠানিকভাবে জ্যাকলিনকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। সম্ভবত ১৯৫৫ সালের গ্রীষ্মে কান-এ পিকাসো ও জেনেভিয়েভের শেষ দেখা। সে সময় তাঁর সঙ্গে ছায়ার মতো রয়েছেন জ্যাকলিন। পিকাসোর স্টুডিওতে নিজ থেকেই দেখা করতে এসেছিলেন জেনেভিয়েভ। কিন্তু তেমন কোনো কথা হয়নি তাঁদের। কিছুটা অস্বস্তি, কিছুটা অনাগ্রহ নিয়ে তাঁদের সাক্ষাৎ শেষ হয়।

চার
পিকাসোর অধিকাংশ প্রেমিকাই তাঁকে নিষ্ঠুরতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। নারীকে তিনি নারী হিসেবে গ্রহণ করেননি, তাকে ভোগের, অধিকারের ও যথেচ্ছ ব্যবহারের একটি উপকরণ মাত্র বিবেচনা করেছেন, ফ্রাঁসোয়ার এই প্রকারান্তর অভিযোগ তাঁর কাছের বন্ধু সাবারতের সাক্ষ্যভাষ্য থেকেও মেলে। তিনি লিখেছেন, পিকাসো নারীদের তাঁর ব্যক্তিগত বিজয়ের প্রমাণ, তাঁর ট্রফি হিসেবেই লোকজনকে দেখাতে ভালোবাসতেন। মেয়েরা প্রেমের নয়, তাঁর প্রভুত্ব প্রকাশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রজেক্ট। ‘নারী হিসেবে তাদের ভূমিকা ততদিন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য, যতদিন সে-নারী বিষয়ে পিকাসোর যে ট্যাবলো রয়েছে, অর্থাৎ তাঁর মনে যে-চিত্র আঁকা রয়েছে, তা অক্ষরে অক্ষরে পালনে সে প্রস্তুত। কিন্তু তার জন্য নির্ধারিত ভূমিকা ত্যাগ করে নারী যদি তার অন্তরঙ্গতা সরাসরি অর্জনে উদ্যোগী হয়, তাহলে পিকাসো ব্যক্তিগত জীবনচারিতার যে স্টাইল নিজের মনে গেঁথে রেখেছেন, তা বিপর্যস্ত হওয়ার উপক্রম ঘটে।’
পিকাসো মেয়েদের হয় দেবী নয় পাপোশ ভাবতেন, ফ্রাঁসোয়া জিলোর এই মূল্যায়ন মাথায় রেখে প্যাট্রিক ও’ব্রায়ান আরেকটি ব্যাখা দিয়েছেন। মারি-তেরেস, ডোরা মার বা জিলো, এঁরা সবাই পিকাসোর পরিণত বয়সের প্রেমিকা। এঁদের কাছে পিকাসো ছুটে এসেছিলেন তারুণ্যের উত্তাপ শুষে নিতে। তাঁদের যৌবনকে তিনি পুজো করতেন, কিন্তু তাঁদের পাশে নিজের বার্ধক্য লুকানোও তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। সম্ভবত তাঁদের যৌবনকে তিনি মনে মনে ধিক্কার দিতেন এবং সেই ধিক্কারবোধ থেকেই তাঁদের প্রতি কঠোর ও নিরুত্তাপ ব্যবহার করতেন। নিজের প্রেমিকাদের তাঁদের প্রয়োজন ফুরানোর পরেও যে নিজের সম্পত্তি বলে বিবেচনা করতেন, ও’ব্রায়ান তার এক ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রেমিকাদের তিনি কেবল অঙ্কশায়িনী ভাবতেন না। তাঁদের জৈবিক প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেও তাঁদের কারো সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে-বুকিয়ে দিতেন না, কারণ তাঁদের প্রতি নিজের বন্ধুত্ব ধরে রাখতেন। প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত তিনি প্রশস্ত রেখেছেন। মারি-তেরেসকে আজীবন আর্থিক সাহায্য করে গেছেন। ডোরা মার মানসিকভাবে অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা তিনিই করেছেন। এঁদের জন্য তিনি কেবল প্রেমিক ছিলেন না, বন্ধু ছিলেন।
ও’ব্রায়ান তাঁর বন্ধুর প্রতি সম্ভবত কিছুটা উদারতা দেখিয়েছেন, জিলোর সাক্ষ্যভাষ্য থেকে তা-ই মনে হয়। ফ্রাঁসোয়া পিকাসোর মধ্যে নিজের জন্য ভিন্ন ভূমিকা নির্মাণে আগ্রহী ছিলেন এবং লড়াই করে সে-ভূমিকা অর্জনও করেছিলেন। শুধু চিত্রকর হিসেবে নয়, পিকাসোর প্রেমিকা ও তাঁর সন্তানের জননী হিসেবেও। কিন্তু পিকাসো নিজ থেকে তাঁর কোনোটি প্রদানেই আগ্রহী ছিলেন না। সন্তান উৎপাদন পর্যন্ত  সে-নারীতে তাঁর আগ্রহ। এরপর তাঁর সকল আগ্রহ নিবদ্ধ হতো সন্তানদের ওপর, গর্ভধারিণী মাতা হয়ে পড়ামাত্রই সে হয়ে পড়ে ব্রাত্য। জিলো পিকাসোর সঙ্গে তাঁর জীবনকে নরকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবু দশ বছর তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছেন এই বিশ্বাস থেকে যে, পিকাসো হয়তো বদলাবেন, নারী হিসেবে তাঁকে ভালোবাসতে শিখবেন। ‘এসবই ছিল এক অলীক কল্পনা Ñ ইউটোপিয়ান ড্রিম।’
তাঁর প্রথম স্ত্রী ওলগাকে পিকাসো গ্রহণ করেছিলেন সামাজিক মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে, সে-লক্ষ্য অর্জিত হওয়ামাত্রই ওলগা তাঁর কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন। পিকাসোর প্রয়োজন পড়ে নতুন খেলনার, মনোরঞ্জনের নতুন আবিষ্কার। মারি-তেরেস তাঁকে মুগ্ধ করেছিলেন তাঁর যৌবনে ও নিঃশর্ত সমর্পণে। ডোরা মার, তাঁর তীব্র বুদ্ধিমত্তা ও ছুরির মতো ধারালো সৌন্দর্য তাঁকে কাবু করেছিল, অল্পতেই তাঁর প্রতি তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। জেনেভিয়েভ, তিনি যখন নিজে যৌবনে প্রবেশের প্রথম পাদে, পিকাসোকে উন্মাদ করেছিলেন উপরোক্ত সকল গুণ দিয়ে। নিজের প্রয়োজনেই তিনি এঁদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, প্রত্যেককে নিজের ব্যক্তিগত অধিকার বলে ধরে নিয়েছিলেন এবং এঁদের কারো কোনো নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বা সত্তা থাকতে পারে, সে-কথা মনে রাখার প্রয়োজন দেখেননি। হয়তো সে-কারণেই ডোরা মার পিকাসোকে বলেছিলেন, শিল্পী হিসেবে তুমি বড় হতে পারো, কিন্তু মানুষ হিসেবে, নৈতিকতার বিচারে তোমার কানাকড়িও মূল্য নেই।’
ফ্রাঁসোয়া জিলোর মূল্যায়নটিও খুব ভিন্ন ছিল না : ‘ওলগা, মারি-তেরেস ও ডোরা মার বিষয়ে তাঁর স্মৃতি তর্পণ এবং মঞ্চের বাইরে তাঁদের অব্যাহত উপস্থিতি থেকে মনে হয়, পিকাসোর এক ধরনের ‘সদর রাস্তার মানসিকতা’ ছিল, তিনি চেয়েছেন নিজের ব্যক্তিগত জাদুঘরে তাঁর সংগৃহীত নারীদের মাথা কেটে সাজিয়ে রাখতে। কিন্তু মাথা তাঁদের পুরোপুরি কাটতেন না। তিনি চাইতেন এসব মেয়ে টুটা-ফুটা অবস্থায় বেঁচে থাকবে এবং মাঝেমধ্যে উঁকিঝুঁকি দেবে, যাতে বোঝা যায় তারা একদম মরে যায়নি। হালকা সুতোয় তারা কোনো মতে ঝুলে থাকবে, সে সুতোর এক মাথা থাকবে পিকাসোর হাতে।’
সব জিনিস ধরে রাখার এই প্রবণতার কথা জেনেভিয়েভও স্বচক্ষে দেখেছেন। সবকিছু, এমনকি গায়ের ধুলোটিও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পিকাসোর তরুণ বয়সের একটি বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন তিনি, পিকাসোর কাছ থেকে শুনে। প্যারিসে তেমন সুবিধা না করতে পেরে স্পেনে পিতৃগৃহে ফিরে এসেছেন পিকাসো, অসহ্য ক্লান্তি, এসেই শুয়ে পড়েছেন। তাঁর মা নিদ্রারত পুত্রের পা থেকে জুতো খুললেন, সযতেœ তার গায়ের ধুলো ঝেড়ে দিলেন। ঘুম থেকে জেগে পিকাসো রেগে অস্থির। তাঁর সারা গায়ে জড়ানো ছিল প্যারিসের ধুলা, তাঁকে বহন করে এনেছিলেন স্মৃতি হিসেবে। পুত্রের বেমক্কা ব্যবহার দেখে পিকাসোর মা সেদিন কেঁদে ফেলেছিলেন।
ফ্রাঁসোয়া মেয়েদের ব্যাপারে পিকাসোর মালিকানাসুলভ মনোভাবের আরো এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ‘পিকাসো পুরনো কোনো কিছু ফেলে দিতেন না, এমনকি পুরনো কোনো ম্যাচ বাক্স, যার আর কোনো প্রয়োজন নেই, তবু। আমি পরে ক্রমশ বুঝতে পেরেছি, মানুষের ব্যাপারেও পিকাসোর দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। তাঁর কাছে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি এ-কথা কিছুতে সহ্য করতে পারতেন না যে, তাঁর নারীদের কারো নিজস্ব কোনো জীবন থাকবে। অতএব, তাঁদের প্রত্যককেই তিনি আঁকড়ে থাকতেন, নিজেকে কণামাত্র বিতরণ না করে।’
মেয়েদের কুকুরের সঙ্গেও তুলনা করতে দ্বিধা করেননি পিকাসো। এক কুকুর থেকে আরেক কুকুরে কোনো তফাৎ নেই। সেরকম এক নারী থেকে অন্য নারীতেও কোনো ভিন্নতা নেই। এ-কথা তিনি ফ্রাঁসোয়াকে বলেছিলেন। ক্ষিপ্ত পিকাসো একবার ফ্রাঁসোয়ার মুখে জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরেছিলেন, তাঁকে বেশ্যার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, সেন নদীতে তাঁকে ছুড়ে ফেলার কথাও বলেছিলেন। পিকাসো নিজের প্রতিভা সম্বন্ধে পূর্ণ সচেতন ছিলেন, কিন্তু নিজের শারীরিক অপূর্ণতা বিষয়েও অনবহিত ছিলেন তা নয়। সম্ভবত এই সচেতনতা থেকেই পিকাসো বরাবর দৈর্ঘ্যে তাঁর চেয়ে খাটো এমন মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কোনো সম্পর্ক স্থায়ী হোক, পিকাসো তা কখনই চাননি। কারণ তাঁর নিজের ব্যাখ্যায়, যেই মুহূর্তে তিনি নতুন কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তেন, আগের নারীর সকল চিহ্ন, সকল স্মৃতি তিনি মুছে ফেলতেন। ‘আমি যখনই স্ত্রী বদল করি, তখন আগের স্ত্রীকে একদম পুড়িয়ে মারতে চাই। তাদের রাহু থেকে মুক্ত হওয়ার এ হলো একমাত্র উপায়। হয়তো এই মুক্তির ভেতর দিয়েই আমি নিজের যৌবনকে পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হব। সে-মেয়েকে যদি তুমি খুন করো, খুনের পর যে অতীতের সে প্রতিনিধিত্ব করে, তা একদম ঝেড়েমুছে ফেলা যায়।’
তাঁর নিকটবর্তী সকল নারীকে পিকাসো ব্যবহার করেছেন তাঁর মডেল হিসেবে। নিখুঁত নারীদেহ তাঁর অভিনিবেশ কাড়তে সমর্থ হলেও ছবিতে সে দেহের পুনর্নির্মাণ তাঁর লক্ষ্য ছিল না। সকল আনুষ্ঠানিক বিন্যাস ভেঙে তিনি তাকে ব্যবহার করেছেন বিচিত্র ও বিপরীতমুখী মনোভাব ও অন্তর্গত আততি উদ্ধারে। লক্ষণীয়, যেসব প্রেমিকার চিত্র নির্মাণে তিনি সবচেয়ে অধিক আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই অসাধারণ সুন্দরী, এক মারি-তেরেস ছাড়া তাঁরা প্রত্যেকেই বিদুষী। পিকাসোর ছবিতে তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব চিহ্নিত করা কঠিন নয়। জেনেভিয়েভকে মডেল হিসেবে নির্মিত ‘ওডালিস্কে’র কথা ধরা যাক। ছবিটি ন্যাচারালিস্টিক ধাঁচের, অথচ যে ইঙ্গিতময়তার জন্য পিকাসো বিখ্যাত, এখানে তাও মোটেই অনুপস্থিত নয়। যে সামান্য ‘ডেকোরেটিভ’ অনুষঙ্গ রয়েছে তা মূলত আমাদের নজর ধরে রাখার জন্য, চিত্রধৃত রমণীর নিষ্পাপ সৌন্দর্যের দৃষ্টিবদ্ধ রাখার জন্য।
জেনেভিয়েভকে নিয়ে করা এই ‘ওডালিস্ক’ ও অন্যান্য পোর্ট্রেট প্রায় পঞ্চাশ বছর লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল। ২০০৫ সালে জেনেভিয়েভ তাঁর কাছে সংরক্ষিত বিশটি ছবি, যার অধিকাংশই কলম-কালির স্কেচ Ñ নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিলে প্রথমবারের মতো সে ছবি দিনের আলোর দেখা পায়। শুধু ‘ওডালিস্ক’ স্কেচটিরই দাম ওঠে প্রায় এক মিলিয়ন ডলার।
ডোরা মার ও ফ্রাঁসোয়াকে হারিয়ে পিকাসো ডুবন্ত মানুষের কুটো ধরে টিকে থাকার চেষ্টার মতো জেনেভিয়েভকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলেন। জেনেভিয়েভের সারল্য তাঁকে প্রীত করেছিল, তার চেয়েও বড় কথা, তাঁকে মই ভেবে ওঠার কোনো চেষ্টা তাঁর নেই, এই ব্যাপারটির জন্য পিকাসো গভীরভাবে কৃতজ্ঞ ছিলেন। সেন্ট ট্রপিজে এক বিকালে জেনেভিয়েভ তেমন কিছু না ভেবেই একদিন বলে বসেন, ‘ভাবুন তো, এখন থেকে পঞ্চাশ বছর পর আমি আমার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের বলতে পারব যে, আমি আপনাকে চিনতাম। আরো অনেক কথাই তাদের আমি বলব।’ জবাবে পিকাসো বলেছিলেন, ‘আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। ভাবতে ভালো লাগছে যে যখন আমি থাকব না, তখনো এমন কেউ থাকবে যে আমাকে ভালোবাসবে, আমার সম্বন্ধে সত্যি কথা বলবে, বানানো কথা নয়।’
জেনেভিয়েভ তাঁর সে বিশ্বাস বিনষ্ট করেননি, ১৯৭২ সালে লেখা তাঁর সানশাইন অ্যাট মিডনাইট গ্রন্থ সে-কথার প্রমাণ। পিকাসো মারা যান ৮ এপ্রিল ১৯৭২, তখন তাঁর বয়স ৯২। জেনেভিয়েভ তাঁর বই লিখে শেষ করেন পিকাসোর মৃত্যুর ছয় মাস আগে। যে স্বল্প কয়েক বছর পিকাসোকে তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন, যে স্বল্প সময় তাঁর জীবনের অংশীদার তিনি ছিলেন, অসীম মমতায় তার রেখাঙ্কন করেছেন সে-বইয়ে। তিনি লিখেছেন : জীবনের স্ফুলিঙ্গ একসময় নিভে আসে আমাদের অলক্ষ্যেই, যা রয়ে যায়, তার নাম স্মৃতি। ‘স্মৃতিই লাফিয়ে বেড়ায় গাছের শাখা থেকে মানুষের মুখে, প্রশাখা থেকে চন্দ্রালোকে, প্রস্তর থেকে কাগজের ওপর আঁকিবুঁকিতে।’
এই বই লেখার সময় পিকাসোর ও নিজের মৃত্যু সম্ভাবনা তাঁর ভাবনায় ছিল। ‘মৃত্যু, যা গত কয়েক সপ্তাহ আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে, তা আমাদের সঙ্গ নিয়েছে। পাবলোর এখন ৯২ বছর বয়স, হয়তো এ-বছরই মৃত্যু তাঁকে আঘাত করবে। ‘সামান্য ব্যবধানে মৃত্যু আমাকে নিস্তার করেছে। সময় আমার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছে, ফলে বইয়ের পাতায় যাপিত জীবনের স্মৃতি ও তার বেদনা নতুন করে যাপন করা সম্ভব হয়েছে। স্মৃতি, কোনো অগ্নিপাত্রে দাউ-দাউ করে জ্বলন্ত শুকনো পাতার মতো জ্বলে উঠেছে, যা থেকে আমি খুঁজে পেয়েছি অনির্বচনীয় সুখ।’

২৫ নভেম্বর ২০১২
নিউইয়র্ক

Leave a Reply

*