logo

পিকাসোর সঙ্গে কিছুক্ষণ

আ বু ল  মো মে ন

গত বছর জুলাই মাসে দিনকয়েকের জন্যে গিয়েছিলাম কানাডা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দুদিক থেকে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের অভূতপূর্ব সব দৃশ্য যতটা সম্ভব উপভোগ করে পৌঁছে যাই টরন্টো শহরে – সেদেশে বাঙালিদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। আমাদের দলে দেশের খ্যাতিমান বর্ষীয়ান শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন, ছিলেন তাঁর স্ত্রী তাহেরা খানম, আর বেঙ্গল আর্ট গ্যালারির কাণ্ডারি সুবীর চৌধুরী। ফলে আর্ট গ্যালারি দেখার উৎসাহ আমাদের আরো বেড়ে গেল। সৌভাগ্যবশত তখন টরন্টোর সবচেয়ে বড় গ্যালারি AGO বা আর্ট গ্যালারি অব অন্টারিওতে চলছিল পাবলো পিকাসোর এক ব্যতিক্রমী রিট্রসপেক্টিভ। অ্যাগো এবং প্যারিসের ম্যুজি ন্যাশনাল পিকাসোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ-প্রদর্শনীর শিরোনাম – পিকাসো : মাস্টারপিসেজ ফ্রম দ্য ম্যুজি ন্যাশনাল পিকাসো, প্যারিস। প্রদর্শনী চলেছে গত বছর ১ মে থেকে আগস্টের ২৬ তারিখ পর্যন্ত। আমরা প্রদর্শনী দেখি ১৩ জুলাই।

দুই
পিকাসো নিজে রসিকতা করে বলতেন – আমিই হলাম সারাবিশ্বে পিকাসোর শিল্পকর্মের সবচেয়ে বড় সংগ্রাহক। সাত বছর বয়স থেকে ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন। সে হিসাবে দীর্ঘ পঁচাশি বছর ধরে কাজ করেছেন। কিন্তু প্রচুর আঁকলেও পিকাসো ছবি বিক্রি করতেন কম, বন্ধুদের বিলোতেও কৃপণতা ছিল, আর প্রদর্শনীর জন্যে ধার দেওয়া ছিল তাঁর অপছন্দের কাজ।
মৃত্যুর পরে দেখা গেল, তাঁর বিভিন্ন স্টুডিওতে প্রায় সত্তর হাজার কাজ আছে। তাঁর অনেকগুলো অসমাপ্ত, বেশ কিছু ছিল বড় কাজের নানা অংশের খসড়া। তিনি মারা যান ১৯৭৩ সালে বিরানব্বই বছর বয়সে। ১৯৭৮ সালে তাঁর উত্তরাধিকারীরা পিকাসোর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে দুই লাখ সংগ্রহ রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেন ভালোভাবে সংরক্ষণের আশায়। এতে তাঁর চিঠিপত্রের বিশ হাজার পাণ্ডুলিপি, এগারো হাজার পত্রিকা কাটিং, পনেরো হাজারের বেশি আলোকচিত্র ছিল। ১৯৮৬ সালে জ্যাকুলিন পিকাসোর মৃত্যুর পরে তাঁর কন্যা আরো প্রচুর শিল্পকর্ম দান করেন এ সংগ্রহে।
১৯৮৫ সালে তখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সংগ্রহ থেকে বাছাই করে ফরাসি সরকার প্যারিসের বিখ্যাত হোটেল সালেতে গড়ে তোলেন ম্যুজি পিকাসো। বর্তমানে এ-জাদুঘরে রয়েছে পিকাসোর পাঁচ হাজার উল্লেখযোগ্য কাজ। এছাড়া পিকাসোর সংগ্রহে থাকা অন্য বড় শিল্পীদের কাজ আছে নয়শর মতো। এসব শিল্পীর মধ্যে রয়েছেন করো, কুরবে, ভুইয়ার্দ, দেগা, সেজান, স্যুরাট, রেনোয়া, মাতিস, ব্রাক প্রমুখের মতো বিখ্যাত সব পূর্বসূরি ও সমকালীন শিল্পী।
অ্যাগোতে আমাদের দেখা প্রদর্শনী সাজানো হয়েছে একশো পঞ্চাশটি শিল্পকর্ম নিয়ে। তাতে ছিল চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও রিলিফ, প্রিন্ট ও ড্রয়িং এবং এছাড়া ছিল বারোটি অলংকৃত বই এবং বিরাশিটি আলোকচিত্র, যার মধ্যে চুয়াল্লিশটি পিকাসোর তোলা এবং অন্যান্য আলোকচিত্রীর মধ্যে চলচ্চিত্রকার-নাট্যকার জাঁ ককতো ও পিকাসোর পরাবাস্তববাদী বান্ধবী ডোরা মারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।

তিন
ফ্রাঁসোয়া জিলো তাঁর লাইফ উইথ পিকাসো বইতে পিকাসোর বরাত দিয়ে লিখেছেন – ‘কিছু মানুষ যেভাবে আত্মজীবনী লেখে, আমি সেভাবেই ছবি আঁকি। আঁকা শেষ হোক বা অসমাপ্ত থাকুক, ছবিগুলো আমার ডায়েরির পাতা, আর তাই এগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন নেই।’ কথা শেখার আগে আঁকতে শিখেছেন তিনি, নেহায়েত বাল্য বয়সে রীতিমতো দক্ষ শিল্পীর নৈপুণ্যে ছবি এঁকেছেন। আর তিরিশ বছরে পৌঁছুতে পৌঁছুতে বিশ্ব শিল্পকলার রাজধানী প্যারিসে সাড়া ফেলে দেন।
কোন ছবি টিকে থাকবে সে ভার পিকাসো অনাগতকালের শিল্পরসিকদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। কিছুই ফেলতে চাননি, বিখ্যাত ছবির প্রাথমিক খসড়া, বড় কাজের অংশবিশেষের খসড়া, মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া কাজ, অসমাপ্ত কাজ কিছুই যেন ফ্যালনা নয়। নিজের প্রতি যেমন তেমনি নিজের কাজের প্রতি আসক্তি ছিল অবশ্যই, আত্মবিশ্বাসও ছিল প্রবল, আর হয়তো তাই শিল্পরসিকদের ওপর বিচারের ভার সবটা ছেড়ে দিতে পেরেছেন অনায়াসে।
সব রকম প্রভাব আত্মসাৎ করেছেন সহজেই, একের পর এক দিগন্ত উন্মোচন করে এমন নতুন সব শৈলী সৃষ্টি করেছেন, যা আধুনিক শিল্পের গতিপথ পালটে দিয়েছে। আত্মসচেতন প্রতিভাবান শিল্পী মহত্ত্বের পথে নিজের পথ নিজেই কেটেছেন।
পিকাসো শারীরিক-মানসিক উভয় দিক থেকেই ছিলেন বলিষ্ঠ মানুষ, অর্থাৎ তাঁর মধ্যে নিহিত দুর্বলতার উৎস দেখা যায় না। আপন খেয়ালে আপন গতিতে চলেছেন তিনি। তাতে অনেক সময় পাশের মানুষ, নিকটজন উপেক্ষিত হয়েছেন, অন্যায্য কঠোর আচরণের শিকার হয়েছেন। জীবনরসিক সৃষ্টিশীল মানুষটির কোনো পূর্বসংস্কার কিংবা অন্ধবিশ্বাস ছিল না। তাঁর মস্তিষ্ক ও হৃদয় বরাবর সচল, নতুনত্ব ও পরিবর্তনমুখী ছিল। জীবনে এবং সৃজনে তিনি নাটকীয়তা, গতিশীলতা, বাঁক পরিবর্তন উপভোগ করতেন। তাতে বারবার নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন, পরিবার ভেঙে গেছে, সন্তানরাও উপেক্ষা-বঞ্চনার পাত্র হয়েছে। সর্বশক্তি তিনি বিনিয়োগ করেছেন ছবির কাজে। তিনি বলেছেন, ছবির জন্যে আমি বাকি সবকিছু বিসর্জন দিতে পারি, এমনকি নিজেকেও। সত্তর বছরের সিরিয়াস শিল্পী-জীবনে পিকাসো প্রায় সাড়ে তিন হাজার ক্যানভাসে ছবি এঁকেছেন।
আমরা জানি, পিতৃভূমি হিস্পানি পূর্বসূরিদের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল, এর বাইরে ফরাসি শিল্পী পল সেজানকে তাঁর নিজের অনন্য গুরুর সম্মান দিয়েছেন, বলেছেন – He was my only, my unique master. ভ্যান গঘের তুলির আঁচড়ের প্রতি লক্ষ রেখেছেন, আফ্রিকার আদিম শিল্পের সারল্য ও শক্তি পছন্দ করেছেন, আইবেরিয়ান ভাস্কর্যের আর্কাইক ফর্ম থেকে নিয়েছেন। ইতালির এট্রুস্কান রেখচিত্রশৈলীতে মগ্ন হয়েছেন। কিন্তু পিকাসোর ক্ষমতা এত বিপুল, দক্ষতা এত নিপুণ এবং কল্পনার গতিবিধি এত বিচিত্রগামী যে আহƒত সব সঞ্চয়ই তাঁর স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। সৃষ্টির কত পর্ব তাঁর – নীল, গোলাপি, কিউবিজম, তার আবার রকমফের, কোলাজ ভাস্কর্যসদৃশ অবয়বে অধুনা-ধ্র“পদী রীতি, অভিব্যক্তিবাদী নানা রূপান্তর-উত্তরণ থেকে পৌঁছে যান মানবজীবন ও সমকালীন বিশ্বের জটিল আবর্তে। দুঃসাহসী নাবিক যেন জীবনের ফেনিল ঘূর্ণাবর্তে পাড়ি জমিয়েছেন – এর সংগ্রাম এবং সংগ্রামের নির্যাস সত্য এবং উšে§ষ সৌন্দর্যকে খুঁজে বের করার ব্রত নিয়ে।
না, পিকাসোর কাছে চিত্রকলা কোনো নান্দনিক অভিযাত্রা নয়। বরং এ হলো এই অদ্ভুত, বিরূপ পৃথিবীর সঙ্গে মধ্যস্থতার মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতার জাদুকরী প্রকাশ। তাঁর ছবিতে নাটকীয়তা ও সংগ্রামের ছাপ বেশি, লালিত্য বা মোহনীয় রূপের  িস্নগ্ধতা কম। আর জীবনসংগ্রামের নাটকীয়তায় নিজের ভূমিকা সবসময়ই এসে যায়, তাই পিকাসোর ভাণ্ডারে ফিরে ফিরে জমেছে নানা বয়সের নানা ঢঙের নানান তাৎপর্যের আত্মপ্রতিকৃতি এবং জীবনসংগ্রামের অংশীদার তাঁর নারীদের প্রতিকৃতি।

চার
অ্যাগোর দ্বিতীয় তলার সাতটি কক্ষে প্রদর্শনীটি সাজানো হয়েছে। এছাড়া অ্যাগোর নিজস্ব সংগ্রহের আরো কিছু আনুষঙ্গিক কাজ প্রথম তলার নানা কক্ষে ছড়ানো ছিল। এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে মূলত মৃত্যুর পরে তাঁর বাড়িতে ও স্টুডিওতে পাওয়া অসমাপ্ত কাজ, বড় ও বিখ্যাত ছবির প্রথম খসড়াই বেশি। প্রথম কক্ষে ছিল ১৯০০-১৯০৫-এ আঁকা ছবি, শিরোনাম : ‘স্পেন থেকে প্যারিস’। উনিশ বছর বয়সে বিশ্বজয়ের আকাক্সক্ষা নিয়ে বিশ্বশিল্পের রাজধানী প্যারিসে হাজির হয়েছিলেন হিস্পানি চিত্রশিল্পী-পিতার সন্তান পাবলো রুইজ পিকাসো (১৮৮১-১৯৭৩)। এখানে এসে ইম্প্রেশনিজম, পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম এবং সিম্বলিজম ঘরানার চৌকস সব ছবি দেখে তরুণের চোখ খুলে যায়, অনুপ্রাণিত হন চারুশিল্পের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্যে। এ সময় বার্সেলোনা-প্যারিসে যেমন ছোটাছুটি করতে হয়েছে, তেমনি ছবির মনোমত শৈলীর খোঁজেও তৎপর থাকতে হয়েছে তাঁকে। শেষ পর্যন্ত ১৯০৪ সালে প্যারিসে থিতু হতে হতে তাঁর বিখ্যাত নীল পর্বের সূচনা ও সমাপ্তি ঘটে। আধুনিক মহানগরীর প্রান্তিক মানুষের ঘিঞ্জি জীবন আর উঞ্ছবৃত্তির অভিজ্ঞতা তাঁর কৈশোরের খোলা-প্রান্তরের স্মৃতির পাতায় ধূসর-নীল রঙে কষ্টের অভিব্যক্তি হয়ে ফুটে উঠতে চেয়েছে। এ সময়ে পতিতা, গৃহহীন, দরিদ্র শ্রমজীবীদের এঁকেছেন তিনি। এই কক্ষে মন কাড়ার মতো ছবি ছিল ১৯০৪ সালে ক্যানভাসে তেলরঙে আঁকা সেলেস্টিনা বা একচক্ষু রমণী। সমাজের সাধারণ উপেক্ষিতা নারীর ব্যক্তিত্বময়ী উপস্থাপনা পিকাসোর জনমুখী মনের পরিচয় তুলে ধরে।
১৯০৪-এর পরে পিকাসোর ছবিতে বিষণ্ন আবহ কাটতে থাকে। সার্কাস আর থিয়েটারের সংস্পর্শে এসে তাঁর মনোজগতে ঔজ্জ্বল্যের ছটা লাগে। গোলাপি আর মেঠো খয়েরি রঙের প্রভাব বাড়ছে এখন। তাঁর গোলাপি পর্ব শুরু হয় এ সময়।
দ্বিতীয় কক্ষটিতে ১৯০৬-১৯০৯-এ আঁকা ছবি ছিল, যেখানে প্রাচীন আইবেরীয়, আদিম আফ্রিকীয় আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের অনুপ্রেরণার ছাপ মিলবে। গাছের নিচে তিন অবয়ব – ক্যানভাসে তেলরঙে আঁকা ছবিটিতে অবয়বগুলোতে ভাস্কর্যের আদল আর পেইন্টিংয়ের আমেজ চমৎকারভাবে মিলেছে। এখানেই মুখোশসদৃশ মুখ, চোখাভাবে ফুটিয়ে তোলা প্রত্যঙ্গ এবং শরীরের কৌণিক উদ্ভাস ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এভাবে পিকাসো যেন ইউরোপীয় চিত্রকলার সনাতন পথ ছেড়ে নিজের পথ ধরলেন স্পষ্টভাবে।
তৃতীয় কক্ষে আছে ১৯০৯-১৯১৫ কাল পর্বের কাজ। এখানে তাঁর ও বন্ধু জর্জেস ব্রাকের হাতে সৃষ্ট কিউবিজমের সূচনাপর্বের কিছু কাজ দেখি। আর আছে কোলাজ এবং নানান নির্মাণের নমুনা। একেবারেই অভিনব পথে হাঁটছেন শিল্পী এখন, আগে কখনো কেউ করেননি এমন সব কাজ করে পিকাসো ইউরোপীয় শিল্পজগতে যেন বিপ্লব শুরু করেছেন। এখানে ধাতুর রঙিন পাত কেটে ভাঁজ করে তৈরি বিখ্যাত ভায়োলিন শীর্ষক নির্মাণশিল্পটি বিশেষভাবে নজর কাড়বে সবার।
চতুর্থ কক্ষে আছে ১৯১৪-১৯২৪ কাল পর্বের কাজ। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হতে না হতে অনেক শিল্পীই চলে গেছেন রণাঙ্গনে। বিদেশি নাগরিক পিকাসো মন দিলেন ছবি আঁকা আর ভ্রমণে, ঘুরলেন ইউরোপের রৌদ্রকরোজ্জ্বল অংশ ইতালি আর দক্ষিণ ফ্রান্স। প্রাচীন রোম আর পম্পেইর শিল্পকর্ম তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার সঙ্গে যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে স্থিতি ও শৃঙ্খলার জন্যে সৃষ্ট আকুতি মিলে পিকাসো যেন ফিরলেন ধ্রুপদী শিল্পের ধারায়। বিয়ে আর পরিবারও অভিজ্ঞতার জগতে নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছে। এ কক্ষে প্লাইউডের ওপর গোয়াশে আঁকা বিখ্যাত সৈকতে দৌড়াচ্ছে দুই নারী ছবিটি তাঁর চিত্রকলায় গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। পৃথুল নারীর উদ্বাহু দৌড়, প্রসারিত প্রায় উড্ডীন শরীরে আদিম সারল্য ও শক্তির প্রকাশ আছে, স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দের উদ্দামতা আছে, আর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নারীকে এক অনভ্যস্ত ভূমিকায় হাজির করেছেন। সব মিলে তাঁর ছবি দর্শকের দৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে মননের অর্গল খুলে দেয়। এ সময় তিনি রুশ ব্যালেরিনা ওলগা খাখলোভার প্রেমে পড়েছেন, তাঁকে বিয়ে করেছেন এবং ব্যালের পোশাক ও সেট ডিজাইন করেছেন। এসব কাজের ছাপ শিল্পকর্মেও পড়েছে।
১৯২৪-১৯৩৪-এর দশকে তাঁর মধ্যে পারিবারিক জীবন থেকে সৃষ্ট সংবেগ ও আকাক্সক্ষা তুমুল আবেগের সৃষ্টি করছিল। এটা প্রকাশের উপযুক্ত মাধ্যমের সন্ধানে নেমে সাহিত্যে আঁদ্রে ব্রেতঁ-র সৃষ্টি পরাবাস্তবতাবাদের মধ্যে ভাবনা ও শিল্পরসের খোরাক পান। আমরা জানি, পিকাসো যে-কোনো তত্ত্বে বা আন্দোলনে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দেওয়ার ব্যাপারে বরাবর দ্বিধান্বিত থাকতেন। তবে নতুন যে-কোনো ভাবনা, যে-কোনো সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উৎসাহে কখনো ভাটা পড়েনি তাঁর। পঞ্চম কক্ষে এই সময়ের টানাপড়েনের ছবি ও খসড়া রয়েছে। এবার ক্যানভাসে তেলরঙে তিনি যে শরীরগুলো তৈরি করেছেন তার গঠনে ভাস্কর্যের দৃঢ়তা আর ভূমিকায় রয়েছে সংঘাতের আতিশয্য। তেলরঙে ক্যানভাসে আঁকা সৈকতে অবয়ব ছবিতে ভাস্কর্যের ত্রিমাত্রিকতার বোধ যেমন মেলে তেমনি দর্শকের বোধে শিল্পীর ভেতরকার টানাপড়েনই প্রধান হয়ে ওঠে।
ষষ্ঠ কক্ষে আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে আঁকা ছবি, যাতে প্রেম আর যুদ্ধ বিষয় হিসেবে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে। তবে এ সময় কিছুদিন ছবি আঁকা বন্ধ রেখে কবিতা লিখেছেন পিকাসো। ততদিনে ওলগার সঙ্গে বিয়ে ভেঙে গেছে, প্রেমিকা মারি-তেরেস অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। আবার পরাবাস্তববাদী আলোকচিত্রী ও লেখিকা ডোরা মারের প্রেমে পড়েছেন শিল্পী। একেবারে ঝোড়ো দশক কেটেছে তাঁর।
স্পেনের গৃহযুদ্ধ পিকাসোকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। এতটাই যে তিনি বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত বাস্ক গ্রাম গুয়ের্নিকা নিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক ছবিটি আঁকলেন। এ সময় ডোরা এ কাজের বিভিন্ন পর্বের সিরিজ ছবি তুলেছে। এ কক্ষে সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাজ হলো ডোরার ক্যামেরায় ধরা গুয়ের্নিকার রূপায়ণের ছবিগুলো। নাৎসি-অবরুদ্ধ প্যারিসে বসে মৃত্যু, ধ্বংস এবং উত্তেজনাকর অনিশ্চয়তার মধ্যে পিকাসো জীবনের নিষ্ঠুরতা আর অন্ধকারকে উপলব্ধি করলেন। তাঁর মনে হয়েছে – চিত্রকলা ঘর সাজানোর সামগ্রী নয়, এটি নিষ্ঠুরতা ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হাতিয়ার।
তাঁর ছবিতে একদিকে ভয়ংকরের রূপ আর অন্যদিকে অসহায়ত্বের ছাপ ফুটে উঠছে এ সময়। ষাঁড়, ঘোড়া, গ্রিক পুরাণের অর্ধনর অর্ধষাঁড় মিনোটর এলো, ফর্ম হিসেবে তাদের এবং মানুষের আদলে-অবয়বে ব্যাপক ভাঙচুর ঘটেছে এ সময় তাঁর কাজে। পিকাসোর ষাঁড় একই সঙ্গে শক্তি ও ভঙ্গুরতার প্রতীক। এ সময়ে করা তাঁর বিখ্যাত ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ভেড়ার সাথে মানুষ মানুষের প্রাণশক্তি ও ভঙ্গুরতার মোক্ষম প্রতীক।
সপ্তম কক্ষে আছে ১৯৫০ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত শেষ দুই দশকের কাজ। এ সময় তিনি থাকেন রৌদ্রøাত উজ্জ্বল দক্ষিণ ফ্রান্সে। বন্ধু অঁরি মাতিসের প্রভাবে যেন তিনিও ছবিতে রঙিন ও আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে একমাত্র মাতিসকেই পিকাসো নিজের সমকক্ষ মনে করতেন। এ সময়ে আবার কিউবিজমে ফিরেছেন। তাঁর স্বদেশি গুরু দেলাক্রোয়া, ভেলাজকোয়েজ এবং ফরাসি মানের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁদের কাজের অন্যতর রূপ এঁকে তিনি যেন শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি চিত্রকর হিসেবে ইতিহাসে নিজের অবস্থান নিশ্চিত ও পাকাপোক্ত করে নিলেন। এ কক্ষে ১৯৬৯ সালে আঁকা চুম্বন আর ১৯৫৬ সালের ক্যালিফর্নির স্টুডিও শিরোনামের তেলরঙের ছবি দুটি অনেকক্ষণ দেখতে হয়। চুম্বন ছবিতে বিশাল দুটি মুখ – দাড়ি ও টেকো মাথার আড়ষ্ট মুখটায় প্রবল আসক্ত চুম্বনে নারীর গভীর তৃপ্তির প্রকাশ দর্শককে আবার এবং বারবার দেখতে ও ভাবাতে বাধ্য করে।
সাতটি কক্ষ ঘুরে যাদের তৃষ্ণা আরো বাড়বে তাদের জন্যে অ্যাগো কর্তৃপক্ষ নিজেদের সংগ্রহের ছবি ও ডকুমেন্ট দিয়ে সাজিয়েছেন পিকাসো যাত্রা। লেভেল-১-এ বিভিন্ন কক্ষে এগুলো শনাক্ত করা আছে। এখানে তাঁর প্রথম জীবনের ছটি প্রিন্ট ও ড্রয়িং দিয়ে যাত্রা শুরু করুন। তারপর নীল পর্বের ‘সেলাইরত নারী’, ‘ফার্নান্দের প্রতিকৃতি’, নিজের ও ওলগা এবং তাঁদের সন্তান পাওলোকে নিয়ে ত্রিমূর্তি ইত্যাদির সঙ্গে আছে আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের যেসব শিল্পসামগ্রী পিকাসোকে অনুপ্রাণিত করেছিল সেসবের কিছু নমুনা।
তাঁর সৃষ্টির তুলনায় এ প্রদর্শনী সামান্যই। কিন্তু পিকাসোর স্বকীয়তা এমন দুর্বার, কল্পনা এতটা দুঃসাহসী এবং দক্ষতা এত উচ্চমানের যে এটুকুর মধ্যেও দর্শককে গ্রাস করে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর অসীম। প্রদর্শনী দেখার পরে প্রাথমিক অনুভূতি হলো প্রাকৃতিক বা পৌরাণিক কোনো প্রবল প্রভুর বীরোচিত তাক-লাগানো লীলার দর্শকদের শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর শিল্প প্রবলভাবে দৈহিক, আমাদের প্রাচ্য-মানসের ভাবাবেগের তোয়াক্কা না করে যেন সরাসরি সশরীরে উপস্থিত সর্বক্ষণ। পিকাসোময়তায় বুঁদ হয়ে থাকি সকলেই এবং আত্মস্থতা না ভেঙে প্রাঙ্গণে ধাতব ভাস্কর্যের পাশে বসে থাকি কতক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে গ্যালারি ছেড়ে আমরা বেরিয়ে আসি।

পাঁচ
এদেশ থেকে উন্নত বিশ্বে বেড়াতে যাওয়ার মধ্যে তাড়াহুড়া থাকেই। কতটা বেশি দেখে নেওয়া যায় সে হিসাব তো থাকেই, তার পরে যাতায়াত, পরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট রক্ষা, দেখা-সাক্ষাতের তাগাদা মিলে জাদুঘর বা গ্যালারির প্রতি সুবিচার করা হয় না।
আমাদের অবশ্য প্রধান লক্ষ্যের মধ্যে ছিল জাদুঘর, গ্যালারি ও প্রদর্শনীগুলো ভালোভাবে দেখা। তা সত্ত্বেও সাধ মিটিয়ে সময় দিয়ে মন ভরে দেখার অবকাশ মেলে না। এদিকে সেই জুলাই মাসে দেখা প্রদর্শনী নিয়ে লিখতে বসেছি প্রায় আট মাস পরে। ফলে স্মৃতির চেয়ে নির্ভর করতে হয়েছে কিছু তখনকার নোট, আর এ উপলক্ষে অ্যাগো থেকে প্রকাশিত বিস্তৃত ও সংক্ষিপ্ত দুটি ক্যাটালগের ওপর।
পিকাসোর ড্রয়িং বরাবর নিখুঁত ও নিপুণ, তুলির আঁচড় তাঁর বলিষ্ঠ, সূক্ষ্ম কাগজ থেকে শক্ত ধাতু সবরকম মাধ্যমকেই শক্ত হাতে শিল্পের শাসনে রাখেন; তিনি জীবনরসিক, প্রবল পরাক্রান্ত জীবনবাদী মানুষ হলেও সমকালের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন; পুরনো বিচিত্র ভাণ্ডার থেকে মানুষের সৃজনশীলতার শক্তি ও সৌকর্যে আকৃষ্ট হন। কোনো এক বিষয়ে এক ধারায় সন্তুষ্ট নন তিনি, নিজেকে সবরকম অভিজ্ঞতার জন্যে উš§ুক্ত রেখেছেন, তার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, মোকাবিলা করেছেন এবং সবই করেছেন আঁকতে আঁকতে কিংবা গড়তে গড়তে।
তাঁকে কবি গিওম অ্যাপোলিনিয়র আখ্যা দিয়েছেন চিত্রকলার শল্যবিদ। সত্যিই তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে নিষ্ঠুর বর্বর বাস্তবতার গভীর বিবর থেকে মানবিক বিপর্যয়ের অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে মানুষের কাছেই তার বারতা ফিরিয়ে দেওয়া। এভাবেই সৃষ্টি হয় গুয়ের্নিকা। অসংকোচ দৃঢ়তায় নিরাভরণ সব সত্যের মুখোমুখি হতে পারেন পিকাসো। শেষ বয়সে যৌনতা ও প্রাণশক্তির উদ্যাপনে পিকাসো যেন মেতে উঠেছিলেন – নিপুণ শৈলীতে মানুষের উপস্থিতি ও ভূমিকার সত্যকে অনাবৃত করে মুক্তি দিয়েছেন। সৃষ্টিকর্ম তো মুক্তিরই নামান্তর – সব আবরণ-আভরণ ছিন্ন করে দেয়।

Leave a Reply

*