logo

পাসোলিনির ইদিপো রে একজন ক্যাথলিক মার্কসিস্টের চোখে ভাগ্য

মো.  হা সা ন  আ শি ক   র হ মা ন

পিয়ের পাওলো পাসোলিনির ইদিপো রে নির্মিত হয় ১৯৬৭ সালে। সময়টা ইউরোপ তো বটেই, সারা পৃথিবীর জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্যাসিবাদের পর মার্কসবাদ হয়ে উঠছে পুঁজিবাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হতাশা কাটিয়ে মার্কসীয় দর্শনের আলোকে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের রূপরেখা নির্ণয়ে ব্যস্ত ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীরা। শিল্প-সাহিত্যে চলছে নতুন ধারার চর্চা। আফ্রিকার দেশগুলো স্বাধীন হচ্ছে; এশিয়া, লাতিন আমেরিকায় একত্রিত হচ্ছে তৃতীয় বিশ্ব। উত্তর-আধুনিকতা এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ হয়ে উঠছে অতীত ও বর্তমানকে দেখার মূল দৃষ্টিভঙ্গি। ঠিক এই সময়টায় এসে প্রাচীন এবং ইতোমধ্যে বহু ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে ওঠা ইডিপাস রেক্স নাটককে আরেকবার চলচ্চিত্রে ফিরিয়ে আনেন নির্মাতা পিয়ের পাওলো পাসোলিনি।

কেন পাসোলিনির মতো একজন নির্মাতা ষাটের দশকে বাস করেও প্রায় দুই হাজার চারশো বছর আগের ইডিপাসের গল্পে ফিরে গেলেন – এই ভাবনার সূত্র ধরে আজকের লেখাটি সাজানো।

 

দুই

অসংখ্য কবিতা, কিছু উপন্যাস, রাজনৈতিক প্রবন্ধ, চিত্রনাট্য এবং চারটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পর ইদিপো রে পাসোলিনির পঞ্চম চলচ্চিত্র। ইদিপো রেকে তাঁর নির্মাতাজীবনের প্রথম দিককার কাজ ধরা গেলেও পাসোলিনির শিল্পীজীবনের শেষ দিককার কাজ এটি।

কে ছিলেন পাসোলিনি? তাঁর জীবনী থেকে জানা যায়, মূলত ফ্রিউলিয়ান ভাষার একজন কবি হিসেবে তাঁর প্রাথমিক প্রতিষ্ঠা। সাত বছর বয়স থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। বড় হন বোলোগনা এবং এর আশপাশের শহরে। পড়াশোনা সাহিত্যে। পঞ্চাশের দশকে ঔপন্যাসিক হিসেবে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পান। ছিলেন মার্কসবাদের কট্টর সমর্থক এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। পার্টির সঙ্গে বনিবনা বেশি দিন না হলেও আমৃত্যু নিজেকে কমিউনিস্ট দাবি করেছেন। ছিলেন হারিয়ে যাওয়া ধর্মবিশ্বাসের প্রতি নস্টালজিক। কেউ কেউ তাঁকে ক্যাথলিক মার্কসিস্টও বলেন। স্ববিরোধী জীবনদর্শন এবং প্রথাবিরোধী জীবনাচারে অভ্যস্ত হলেও ছিলেন পুঁজিবাদী সংস্কৃতির ঘোর বিরোধী। চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে এসে মনোযোগ দেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের একান্ত দর্শন আর ভিন্নধর্মী স্টাইলের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিও পাওয়া শুরু করেন। কিন্তু তাঁর শিল্পযাত্রা মাঝপথে থেমে যায়; আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হন তিনি। খুনের মূল কারণ নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও একটি সম্ভাব্য কারণ তাঁর ফ্যাসিবাদবিরোধী কট্টর রাজনৈতিক মতবাদ। পাসোলিনি বেঁচেছিলেন মাত্র তেপ্পান্ন বছর। ১৯২২-এ জন্ম, ১৯৭৫-এ মৃত্যু। তাঁর নির্মিত মোট কাহিনিচিত্রের সংখ্যা বারো ।

 

তিন

সফোক্লেসের ইডিপাস রেক্স নাটকের মূল দ্বন্দ্বটি হচ্ছে মানুষের ভাগ্য এবং কর্মফলের মধ্যে। মানুষের জীবনে ব্যর্থতা বা কোনো করুণ পরিণতির জন্য কে দায়ী? মানুষ নিজে নাকি তার অদৃষ্ট? যাঁরা অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসীই নন, তাঁদের জন্য এ প্রশ্ন ওঠে না। যাঁরা কট্টরভাবে স্রষ্টা এবং পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যে বিশ্বাসী তাঁরাও এই দ্বিধা থেকে মুক্ত। তাহলে প্রশ্নটা বাকি থাকে দুই মৌলবাদের মাঝে অবস্থানকারীদের জন্য, যাঁরা স্রষ্টাকেও মানেন আবার বিশ্বাসও করেন তাঁর নিজের জীবনের ভালো-মন্দের জন্য তিনি নিজেই দায়ী।

যুবক ইডিপাস জানতে পারে, সে ভবিষ্যতে তার বাবাকে খুন করবে, তারপর তার নিজের মাকেই বিয়ে করবে, জনক হবে কিছু অদ্ভুত সম্পর্কের ছেলেমেয়ের, যারা একই সঙ্গে তার সন্তান এবং ভাইবোন হবে। এই ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী শুনে ইডিপাস আর ঘরে ফেরেনি, পাছে ভাগ্যের দুর্বিপাকে ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়ে ওঠে। কিন্তু অমোঘ নিয়তির হাত থেকে রক্ষা পায়নি সে।

যাঁরা অদৃষ্টবাদী তাঁরা বলেন, ইডিপাস অনেক চেষ্টা করেছে; কিন্তু ভাগ্যকে এড়াতে পারেনি। সে নিজ দেশ, নিজ মা-বাবা থেকে চিরতরে দূরে সরে গেছে, কিন্তু ভাগ্য তার জন্মের আগ থেকেই তার জীবনের ছক এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছে যে, তার কিছুই করার ছিল না। অন্যদিকে যাঁরা ইডিপাসকেই দায়ী করতে চান তাঁরা বলেন, এমন ভবিষ্যদ্বাণী জানা থাকার পরও ইডিপাস কেন মানবহত্যা করল, কেনইবা জীবনে বিয়ে করার সাহস দেখাল।

মজার বিষয় হচ্ছে, ইডিপাস যদি মানবহত্যা এবং বিয়ে থেকে বিরতও থাকত, তাতেও কিন্তু অদৃষ্টকেই বিনা পরীক্ষায় মেনে নেওয়া হতো। হয়তো সফোক্লেসের উদ্দেশ্যও ছিল মানুষকে তার নিজ ক্ষুদ্রতা, সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভাবানো, তাকে স্রষ্টা বা আইনের অনুসারী রাখা। আবার অন্যদিকে সবকিছু যদি পূর্বনির্ধারিত হয় তবে মানুষের অবস্থা পরিবর্তনের যাবতীয় চেষ্টাই বৃথা, যা হওয়ার তা হবেই, চেষ্টা করলেও হবে, না করলেও হবে। আত্মমর্যাদায় বিশ্বাসী মানুষ এমন কাপুরুষোচিত দর্শন মেনে নিতে পারে না। ইডিপাসের ক্রোধ ও অন্ধত্ব তাই অনেকের কাছে মানবিক হয়ে ওঠে। দর্শন ও কাহিনির মারপ্যাঁচে সফোক্লেসের নাটকটি এমনই কৌশলে সাজানো যে, এটি যুগ যুগ ধরে মানুষকে ভাবায় ও ভাবাচ্ছে।

নাটকটিকে আজো প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ার আরেক কারণ হতে পারে এর মানুষের মূল্যবোধ প্রথার শেকড় ধরে টান মারার প্রবণতা। কিছু মৌলিক বিশ্বাসের ওপর আমাদের এই সমাজ দাঁড়িয়ে। কার্ল গুস্তাভ জং এগুলোকে হয়তো কালেক্টিভ সোশ্যাল আনকনশাস বলবেন। মায়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের নিষিদ্ধতা একটি ‘আর্কেটাইপ’, দলমত-নির্বিশেষে সবসময়ের সব মানুষের অবচেতনে যা আপনাআপনি লেখা হয়ে যায়। আবার মানুষের ইতিহাস, বিশেষ করে তার সৃষ্ট মিথগুলো আমাদের আরেক আর্কেটাইপের সন্ধান দেয়, তা হলো ‘নিষিদ্ধের প্রতি অদমনীয় আকর্ষণ’। অ্যাডাম-ইভের ইডেন থেকে বিতাড়িত হওয়া এ-ধারার সবচেয়ে প্রচলিত মিথ। সফোক্লেসের এই নাটক এক হিসেবে এই দুই আর্কেটাইপের দ্বন্দ্ব, যে-কোনো মানুষ তাই এর অমোঘ আকর্ষণে আকৃষ্ট হতে বাধ্য।

কথা হলো, পাসোলিনি কেন এসবে ফিরে গেলেন?

 

চার

পাসোলিনির ইদিপো রে প্রাচীন গ্রিসের প্রেক্ষাপটেই নির্মিত। শুরু ও শেষের যথাক্রমে বারো এবং পাঁচ মিনিট বাদ দিলে, মাঝের পুরো অংশটাই সফোক্লেসের ইডিপাস রেক্সের বাস্তবানুগ চলচ্চিত্রায়ণ। কিন্তু শুরুর ও শেষের অংশ দিয়ে পাসোলিনি যা করেছেন তা হচ্ছে এই গল্পটিকে তাঁর সমসাময়িক সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তোলার অভিনব চেষ্টা।

শুরুর প্রেক্ষাপট ১৯২০-এর দশক, ফ্যাসিবাদী ইতালি। এক সেনা সদস্যের ঘরে জন্ম হয় এক ছেলেশিশুর। ছেলেসন্তানটির প্রতি তার মায়ের মমতা ও মনোযোগ দেখে ঈর্ষান্বিত হন তাঁর বাবা। রাতের অন্ধকারে শিশুসন্তানের পা চেপে ধরেন তিনি। এরপর ফ্ল্যাশব্যাকের মতো করে শুরু হয় রাজা ইডিপাসের গল্প।

ইদিপো রেকে অনেক সমালোচক পাসোলিনির আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। চলচ্চিত্রটির সঙ্গে মিল রেখে পাসোলিনির জন্ম এবং বেড়ে ওঠাও ১৯২০-এর দশকে। বাবা সেনাবাহিনীর নন-কমিশনড অফিসার ছিলেন। বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না। বাবার প্রতি ক্ষোভের প্রমাণও পাওয়া যায় তাঁর সেই সময়ের জীবনে। তরুণ বয়সে একপর্যায়ে মদ্যপায়ী বাবাকে ছেড়ে মাকে নিয়ে রোমে চলে আসেন তিনি।

আবার ফ্রয়েডীয় দর্শন অনুযায়ী দেখলে বাবা হচ্ছেন সামাজিক অনুশাসনের প্রতীক। ছেলেসন্তান ও মায়ের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। এখান থেকেই ছেলেদের মধ্যে জন্ম নেয় রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা। তাঁর জীবনীতে বাবাকে সমাজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে আমরা পাই, বিশের দশকে তাঁকে বেড়ে উঠতে হয় ফ্যাসিবাদী সমাজ কাঠামোয়, যা তিনি কখনোই সমর্থন করেননি। পরিণত পাসোলিনি সমাজতন্ত্রও নয়, একেবারে সাম্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। শৈশবের সময় ও সমাজের প্রতি তাই খুব বেশি অনুরাগ ছিল না তাঁর। সমসাময়িক সমাজের অনেক সমস্যার শেকড়ও তিনি অতীতের এই ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিতে দেখতে পান।

ইদিপো রে চলচ্চিত্রের শেষ পাঁচ মিনিটে আমরা দেখি ইডিপাস নির্বাসন নিয়ে থেবস ছেড়ে চলে যায়। পরের দৃশ্যে আধুনিক ইতালির একটি সুউচ্চ ভবনের, সম্ভবত একটি গির্জার সামনের সিঁড়িতে বসে আধুনিক পোশাকে সেই একই ইডিপাস বাঁশি বাজাচ্ছে। সে আজো অন্ধ, কিছুটা কালচে হয়ে গেলেও তার হাতে সেই একই বাঁশি। অন্ধ ইডিপাসের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আমরা ষাটের দশকের বোলোগনা শহরের নাগরিকদের দেখি। ছবির মাঝে ইডিপাসের গল্পের সঙ্গে পার হয়েছে পাসোলিনির জীবনের চল্লিশ বছর। নতুন এই সময় ও সমাজটি কেমন?

নাগরিকদের প্রাত্যহিকতায় ইডিপাসের দৃষ্টি এবং বাঁশি যেন এক গভীর করুণার ছায়া ফেলে, যেন সবকিছুর মধ্যে এক প্রকার পাপ মিশে আছে, যেন মানুষগুলো জানে না নিয়তির কাছে তারা কতটা অসহায়। দীর্ঘ জীবন কাটানোর পর পাসোলিনি যেন বলতে চান আধুনিক প্রত্যেক মানুষই একেকজন ইডিপাস। ভাগ্য ও প্রবৃত্তির হাতে বন্দি। সেই প্রাচীন মিথ এখনো কালোত্তীর্ণ হয়ে সমাজে ফিরে ফিরে আসছে। সিনেমার একেবারে শেষ দৃশ্যে ইডিপাসকে তার সাহায্যকারী অ্যাঞ্জেলো সিনেমার শুরুতে দেখানো ইতালির একই পার্কে নিয়ে আসে। তখন পাসোলিনির ইডিপাসের শেষ সংলাপ
হয় : Life ends where it begins.  অর্থাৎ জীবনকে একটি চক্রাকার যাত্রা বলতে চেয়েছেন তিনি। উন্নতি-অবনতি, উত্থান-পতন শেষে জীবন যেন একই রকম থেকে যায়।

আত্মজৈবনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ অংশেও গল্পটা মিলে যায়। সমকালীন ইতালি নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না পাসোলিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন সাহায্যপুষ্ট মার্সাল প্ল্যানের হাত ধরে রিপাবলিকান ইতালিতে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। এতই উন্নতি হয় যে পঞ্চাশের দশকের শেষ সময়টাকে ইতালির জন্য ‘ইকোনমিক মিরাকল’ বলে চিহ্নিত করা হয়।

কিন্তু পাসোলিনি এ-সময়ে এই নগ্ন পুঁজিবাদের কট্টর সমালোচক হয়ে ওঠেন। পণ্যবাদ ও ভোগবাদ – পুঁজিবাদী এই দুই সংস্কৃতি ইতালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও চিরায়ত জীবনধারা পালটে দিচ্ছিল। তাই এর প্রতিরোধে সোচ্চার হতে চেয়েছিলেন তিনি। টিভি সংস্কৃতি, বিশ্বায়ন, অন্য সংস্কৃতির আগ্রাসন তাঁকে ক্ষুব্ধ করেছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া, শিল্প-সংস্কৃতিতে স্বকীয়তা কমে যাওয়া ভালোভাবেই লক্ষ করছিলেন তিনি। এ পর্যায়ে আমরা তাঁর মাঝে শিল্পায়ন-পূর্ববর্তী কৃষিভিত্তিক প্রাকৃতিক জীবন নিয়ে এক ধরনের রোমান্টিসিজম দেখি, আবার অন্যদিকে অতীতকে অন্ধ অনুসরণের একরকম রক্ষণশীলতাও দেখি। নিজে সমকামিতাকে প্রকাশ্যে গ্রহণ করলেও গর্ভপাতের ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ কমানোর মতো স্বাধীন চিন্তায় তিনি সায় দেননি।

পাসোলিনির চোখ থেকে দেখলে, ষাটের দশকের ইতালির মানুষ ইডিপাসের মতো অন্ধ। পণ্য ও পুঁজিবাদ তাদের নিয়ন্ত্রণ করে, তারা তা বুঝেও বোঝে না। প্রবৃত্তি ও ভোগবাদে তারা এতটাই নিমজ্জিত যে, তারা নিজেদের অজ্ঞতাকে দেখতে পায় না। শেষবার পার্কে যাওয়ার আগে আমরা ইডিপাসকে একটি সরু রাস্তায় বিদ্যুতের পিলারের নিচে বসে বাঁশি বাজাতে দেখি। চারপাশজুড়ে শিল্প-কলকারখানা, মাঝের এই রাস্তায় ইতালির ভবিষ্যৎ তরুণেরা মহানন্দে ফুটবল খেলছে। বাঁশি থামিয়ে হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ইডিপাস, তাকে তক্ষুনি সেখান থেকে নিয়ে যেতে বলে।

 

পাঁচ

ছবির মাঝের অংশে সফোক্লেসের ইদিপো রেকে ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে পাসোলিনি তাঁর শিল্পশক্তির প্রমাণ দেন। নিজেকে নিওরিয়ালিস্ট ঘরানার মনে না করলেও তাঁর কাজে এ-ধারার প্রভাব সুস্পষ্ট। নিওরিয়ালিস্ট ঘরানার সিনেমায় আমরা গল্প বর্ণনায় নির্মাতার এক প্রকার নির্লিপ্ততা দেখি। যা ঘটেছে তার হুবহু চিত্রায়ণ ছাড়া যেন তার বাড়তি কিছু বলার নেই। এ ধরনের দূরত্ব এবং নৈর্ব্যক্তিকতা নিওরিয়ালিস্ট সিনেমাকে প্রামাণ্যচিত্রের মহিমা দেয় এবং চলচ্চিত্রটিকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

পাসোলিনির প্রাচীন গ্রিস গতানুগতিক বিনোদনমূলক সিনেমার মতো জৌলুসময় নয়। এমনকি রাজা-রানিদের জীবনযাপনও খুব আহামরি কিছু নয়। শিশু ইডিপাসকে পেয়ে তরুণ পলিবাস যখন তার প্রাসাদে ফিরে আসে তার বাহন ছিল একটি দুর্বলদেহী খচ্চর, তার সঙ্গে কোনো সৈন্যসামন্ত ছিল না। রাজা-রানি থেকে শুরু করে কোরিন্ত ও থেবসের সাধারণ মানুষদের পোশাক, সাজসজ্জা, বাসস্থান, আচরণ ইত্যাদি ছিল খুবই সাধারণ ও বিশ্বাসযোগ্য। সাধারণ মানুষদের দারিদ্র্যকে লুকিয়ে কোনো সমৃদ্ধ গ্রিসের মিথ তৈরি করেননি তিনি।

অভিনয় নিয়ে পাসোলিনির যে অভিনব দর্শন ছিল তার ছাপ আছে এ চলচ্চিত্রেও। পাসোলিনির মতে, ক্যামেরা ব্যক্তিকে ছাপিয়ে তার মনোজগৎকে দেখতে পায়। পেশাদার অভিনেতারা চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে যে অভিনয়ের চেষ্টা করেন তা নাকি প্রায়ই চরিত্রের অন্তর্লোককে আড়ালে ফেলে দেয়। পাসোলিনির সমাধান তাই এমন চরিত্র খুঁজে বের করা, যার স্বভাব-চরিত্র আপনাআপনি স্ক্রিপ্টের চরিত্রের সঙ্গে মিলে যায়। একবার মনমতো অভিনেতা পেয়ে গেলে পাসোলিনি তাঁদের খুব বেশি নির্দেশনা দিতেন না। পাসোলিনির নিজের ভাষায় :

‘I did not even tell them precisely what characters they were playing. Because I never chose an actor as an  interpreter. I chose an actor for what he is. That is, I never asked anyone to transform himself into anything other than what he is.’

ইদিপো রে ছবির বেশিরভাগ অভিনেতাই অপেশাদার। এঁদের কয়েকজন পাসোলিনির অন্য ছবিতেও অভিনয় করেছেন। মূল চরিত্রের বাইরে গ্রিসবাসী নারী, পুরুষ, শিশুর সাধারণত্ব এবং সময় সময় ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তাদের অভিব্যক্তি প্রামাণ্যচিত্রের আবেদন তৈরি করে।

যথাসম্ভব কম সংলাপ ব্যবহার করে দৃশ্য তৈরির মানসিকতা চলচ্চিত্রটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। কাহিনিকে বাস্তবানুগ রাখার জন্য যতটুকু সংলাপ না রাখলেই নয় পাসোলিনি শুধু ততটুকু সংলাপই রেখেছেন। তাঁর মূল প্রবণতা দেখা যায় অভিনেতাদের অভিব্যক্তি, ওয়াইড ল্যান্ডস্কেপ, আর সংগীত দিয়ে ‘সিনেমাটিক’ মোমেন্ট তৈরি করার দিকে, অর্থাৎ শক্তিশালী দৃশ্য মন্তাজ দিয়ে দর্শকের মনে কাঙ্ক্ষিত অনুভূতির জন্ম দিতে। সংলাপপ্রধান সিকোয়েন্সগুলোর পর প্রায় সমপরিমাণ সংলাপহীন সিকোয়েন্স চলচ্চিত্রটিতে এক প্রকার নৈঃশব্দ্যজাত সারল্যের জন্ম দেয়।

গল্পের ঘটনাক্রম উপস্থাপনায় পাসোলিনি সফোক্লেসের ফ্ল্যাশব্যাক টেকনিক ভেঙে ফেলে অতীত থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘটনাগুলো তুলে ধরেন। তাঁর সিকোয়েন্স নির্বাচন ও উপস্থাপনায় কঠোর পরিমিতিবোধের প্রমাণ পাওয়া যায়। শিশু ইডিপাসকে বাড়ি নিয়ে স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়ার পরের সিকোয়েন্সেই আমরা যুবক ইডিপাসকে দেখি। আবার এরপরের দুই সিকোয়েন্সের মধ্যেই যুবক ইডিপাস তার দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। কোরিন্ত রাজপ্রাসাদে ইডিপাসের গল্প বলতে চারটির বেশি সিকোয়েন্স নেননি পাসোলিনি। রানি জোকাস্টার সঙ্গে তার প্রথম মিলনের পরই আমরা থেবস নগরে মরণব্যাধির করুণ দৃশ্য দেখি। তারপর রাজা ইডিপাস প্রজাদের সঙ্গে কথা বলছে। বিয়ে এবং রাজা হয়ে ওঠার মাঝে যে বেশ কিছু সময় পার হয়েছে তা বোঝাতে কোনো বাড়তি সময় ব্যয় করা হয়নি। মূল নাটকের বাইরে থেকে যোগ হওয়া দৃশ্যের সংখ্যাও খুব কম। যেগুলো যোগ হয়েছে তা মূলত মঞ্চনাটক থেকে চলচ্চিত্রে মাধ্যমগত পরিবর্তনের জন্য যতটা না হলেই নয় ততটুকুই।

ক্যামেরার কাজেও আমরা সাধারণ থাকার সচেতন স্টাইল দেখি। ক্রেন, ডলি ইত্যাদি প্রচলিত ‘ভারি’ শট যেমন নেই, তেমনি নেই আলো দিয়ে বাড়তি চমক সৃষ্টির চেষ্টা। বেশিরভাগ শটই হ্যান্ডহেল্ড। কখনো কখনো হয়তো তা হ্যান্ডহেল্ড অবস্থায়ই চরিত্রদের দিকে ট্র্যাক করে এগিয়ে যায়। এর ফলে তৈরি হওয়া কাঁপা শট ছবিটিকে আরো প্রামাণ্যচিত্র টাইপের আবেদন তৈরিতে সাহায্য করে। দুটি রাতের সিকোয়েন্স বাদে পুরো ছবিটি দিনের বেলার গল্প, বেশিরভাগ দৃশ্যই আউটডোর। আছে সূর্যালোক, ধু-ধু ল্যান্ডস্কেপ আর প্রাচীন গ্রিসের স্থাপত্যশৈলীর সৃজনশীল ব্যবহার।

সম্পাদনায় আমরা দেখি ইডিপাস ও জোকাস্টার প্রতিটা মিলন দৃশ্যের পরই মৃত মানুষের বিকৃত দেহের দৃশ্য। সঙ্গে মরুভূমির মতো রু ল্যান্ডস্কেপ, শকুনের পাল, কখনো ব্যাকগ্রাউন্ডে করুণ সুর। মন্তাজগুলো প্রমাণ করে পাসোলিনির দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে সফোক্লেস থেকে খুব একটা সরে আসেনি। পাসোলিনি একে ভয়ংকর হিসেবেই দেখিয়েছেন। আবার দেশত্যাগী ইডিপাসের ভবিষ্যৎ গন্তব্য ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া, লাইয়াসের সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা,  থেবসের প্রজাদের প্রতি রাজা হিসেবে তার দায়বদ্ধতা ও নিষ্ঠা, রানি জোকাস্টার প্রতি তার ভালোবাসা ইত্যাদি দৃশ্যও শক্তিশালীভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।

খুব অল্প বাজেটে একটি ঐতিহাসিক পটভূমির সিনেমা হিসেবে ইদিপো রে সকলের দৃষ্টি কাড়ে। ইদিপো রে তার চিত্রনাট্য, অভিনয়, সেট, ক্যামেরা, সম্পাদনা ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই সচেতনভাবে সাধারণ। কিন্তু পুরো ছবিতে মিশে থাকা পাসোলিনির কাব্যিক সংবেদনশীলতা একে একটি অনন্য সৃষ্টিতে পরিণত করেছে।

 

ছয়

পাসোলিনির নির্মাতা হিসেবে প্রথম দুটি কাজ আকাতোনে (১৯৬১) এবং মামা রোমা (১৯৬২) ইতালির সমকালীন সমাজের প্রান্তসীমায় বসবাসকারী শোষিত মানুষের বেদনাতুর জীবনের গল্প। পতিতাবৃত্তি, দালালি, অপরাধজগৎ ইত্যাদি নানান অসামাজিক পেশায় জড়িত ‘নিম্নশ্রেণি’র মানুষেরা আসলে সমকালীন সমাজব্যবস্থার কাছে কতটা অসহায় তার চিত্র আমরা এখানে দেখি।

কিন্তু তৃতীয় ছবি দ্য গোসপাল অ্যাকরডিং টু ম্যাথিউতে (১৯৬৪) আমরা ভিন্ন পাসোলিনিকে দেখি। রোমান ক্যাথলিক চার্চের সহায়তায় এবং পোপ ত্রয়োদশ জন পলকে উৎসর্গ করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে যিশুখ্রিষ্টের গল্পকে প্রামাণ্যচিত্রের মতো বাস্তবানুগ ও সরল করে পর্দায় নিয়ে আসেন পাসোলিনি। ইদিপো রেতে আমরা পাসোলিনির যে মুন্শিয়ানা দেখি তার প্রথম প্রমাণ এই ছবিতেই দেখা যায়। ছবিটির জন্য কিছু আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পান তিনি।

ইডিপো রে নির্মাণের পরের বছরই তিনি নির্মাণ করেন তিওরেমা (১৯৬৮)। তিওরেমার গল্প বেশ অদ্ভুত এবং রক্ষণশীল সমাজের জন্য বেশ আপত্তিকর। উচ্চবিত্ত পরিবারের একটি বাড়িতে বেড়াতে আসা এক অতিথি একে একে যৌনসম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বাড়ির প্রতিটি সদস্যের সঙ্গে; মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে এবং গৃহপরিচারিকা। সবার জীবনেই তিনি প্রশান্তি বয়ে আনেন। আবার হঠাৎ করে এই অতিথি চলে গেলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। শান্তির জন্য নিজেদের পালটে ফেলে তারা। সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণির মানসিক বিপর্যয় নিয়ে ছবিটি নির্মিত।

চৌষট্টিতে বাইবেল অবলম্বনে যিশুর জীবন বনাম আটষট্টিতে যৌনতা, সমকামিতার অদ্ভুত বক্তব্যপূর্ণ তিওরেমা। মাঝে সাতষট্টিতে ইদিপো রে। কোনো একক নিক্তিতে কি ফেলা যায় পাসোলিনিকে? পাসোলিনিকে নিয়ে যে-কোনো সরলীকৃত উত্তর তাই বেশ বিপজ্জনক। তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলো আরো গভীরভাবে এই বক্তব্যকে তুলে ধরে। কেউ কেউ এই ভিন্নধর্মিতার মাঝেই একজন বাস্তবসচেতন রাজনীতিবিদের সঙ্গে একজন স্বপ্নচারী কবির অন্তর্লোকের পার্থক্য খুঁজে পান। তিনি নাস্তিক – এক সাংবাদিকের এমন দাবির উত্তরে পাসোলিনি বলেছিলেন,  “If you know that I am an unbeliever, then you know me better than I do myself. I may be an unbeliever, but I am an unbeliever who has a nostalgia for a belief.”

মানুষের জন্ম, মৃত্যু, সৃষ্টিরহস্য ইত্যাদি দার্শনিক জিজ্ঞাসার কোনো সদুত্তর মার্কসবাদে পাননি পাসোলিনি। কিন্তু এই ‘অন্য’ জিজ্ঞাসাগুলোও তাঁকে পীড়া দেয়। পাসোলিনির ‘ক্যাথলিক মার্কসিস্ট’ উপাধিটা এই মানসিক বৈপরীত্য থেকেই আসে।

 

সাত

‘মানুষের জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা ইত্যাদি সব পরিণতির জন্য সে নিজেই দায়ী’ – এ ধরনের আইডিওলজিকে – পুঁজিবাদে বিশ্বাসী এবং এর বিরোধী – দুদলের বক্তব্য হিসেবেই দেখা যায়। পুঁজিবাদ এ ধরনের চিন্তার বিস্তার চায়, যাতে শোষিত মানুষ সমাজব্যবস্থার দিকে আঙুল না তুলে নিজেদের নিয়েই চিন্তিত থাকে। অন্যদিকে পুঁজিবাদবিরোধীরা একে ব্যবহার করেন সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তুলতে; তারা যেন প্রচলিত সমাজব্যবস্থার কাছে হার না মেনে লড়াই চালিয়ে যায়।

পাসোলিনির ইদিপো রেকেও তাই শেষ বিবেচনায় দুভাবে দেখা যায়। হতে পারে সমকালীন সমাজ নিয়ে এটি পাসোলিনির হতাশার প্রতীকী অভিব্যক্তি, আবার হতে পারে হতাশা নয়, এটি মানুষকে সচেতন করে তোলার একটি শৈল্পিক প্রয়াস।

Leave a Reply

*