logo

পদ্মাবতী

আ বু  সা ঈ দ  তু লু

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের অবশ্যপাঠ্য পদ্মাবতী সাহিত্য-অনুরাগী, সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষকের কাছে নতুন করে পরিচয়ের দাবি অত্যন্ত কম। রোমান্টিক ধারার সাহিত্যকৃতি পদ্মাবতী কাব্যটি রচনা করেছেন সৈয়দ আলাওল, যিনি বাংলা সাহিত্যে ‘মহাকবি’ উপাধিতে সর্বজনস্বীকৃত। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ মঞ্চ-উপস্থাপনে এনেছে এই বহুলপঠিত কাব্যটি। নাট্য-নির্দেশনায় বিভাগীয় শিক্ষক শামীম হাসান। গত ২৬ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর, ২০১২ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ আয়োজিত সপ্তম কেন্দ্রীয় বার্ষিক নাট্যোৎসবের দ্বাদশ দিন প্রদর্শিত হয় নাট্যটি। পদ্মাবতী বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। উৎকৃষ্ট ও বহুল প্রচলিত সাহিত্য যখন নাট্য হিসেবে উপস্থাপন হয়, তখন স্বভাবতই নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করে। কালজয়ী সাহিত্য পদ্মাবতী নাট্য হিসেবে উপস্থাপন বিধায় আলোচনায় আলাওল, সমকাল ও পদ্মাবতী প্রসঙ্গকে প্রাধান্য দিয়ে প্রযোজনায় উপস্থাপনরীতি, বৈশিষ্ট্য, শিল্পচিন্তন, নান্দনিকতা ও প্রযোজনা মনস্তত্ত্ব অনুসন্ধানই লেখাটির মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নাট্যশিক্ষণের পথিকৃৎ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ। প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চা শুরু আশির দশকে। ‘নাট্যশিক্ষাঙ্গন’ ‘থিয়েটার স্কুল’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নাট্যশিক্ষণ শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিখন পর্যায়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগই প্রথম। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রখ্যাত নাট্যতাত্ত্বিক জিয়া হায়দারের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধীনে নাট্যকলা বিভাগ চালু হয়। ১৯৯০ সাল থেকে নাট্যকলা বিভাগ অত্যন্ত প্রাণোদ্যমী ভূমিকায় বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে বিরাজমান ছিল। প্রখ্যাত নাট্যতাত্ত্বিক জিয়া হায়দারের নেতৃত্বে বাংলার ঐতিহ্য-উৎসারিত নাট্যচিন্তার পাশাপাশি বিশ্বনাট্যতত্ত্ব পঠন-পাঠন ও অনুশীলনের ব্যাপকতর পথ সুগম হয়। প্রসঙ্গত, বিভাগীয় শিক্ষক প্রয়াত জিয়া হায়দারের ‘থিয়েটারের কথা’ ছাড়া এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বিশ্বনাট্যতত্ত্ব শিখন অনেকাংশে দুরূহ। ওই সময়ে নাট্যকলা বিভাগের সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যনির্দেশক কামাল উদ্দীন নিলু ও রহমত আলী। বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ নাট্যশিখনতীর্থসদৃশ ছিল। পাশাপাশি ঢাকার নাট্যশিখন স্কুলগুলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধীনতা থেকে ২০০৯ সালে নাট্যকলা বিভাগ স্বতন্ত্র যাত্রা শুরু করে। ২০০৯ সালে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে যাত্রার শুরু থেকেই নাট্যকলা বিভাগ মৌলিক চিন্তনবিকাশী ও নান্দনিক প্রযোজনা উপস্থাপন করছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা হচ্ছে – ম্যারেজ প্রপোজাল, জমাখরচ, নূরলদীনের সারাজীবন, তৃষ্ণায়, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, বহ্নিপীর, এখনো দুঃসময়, অপেক্ষাবয়ান, পরীবানু, তাসের দেশ ইত্যাদি। সম্প্রতি নাট্যকলা বিভাগের ঐতিহ্যবাহী বা লোকনাট্যশিক্ষণ ধারায় তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রযোজনায় এনেছে আলাওলের পদ্মাবতী কাব্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল জন্মোৎসব পালন উপলক্ষে নাট্যটি প্রথম উপস্থাপিত হয়।
আলাওল বাংলা সাহিত্যের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সৃজনশীল শিল্পী। বিভিন্নজনের হাতে লেখা অর্ধশতাধিক (একই গ্রন্থের একাধিক কপি) প্রাপ্ত গ্রন্থের (পুঁথি) ওপর ভিত্তি করে প্রাপ্তি-শুরু থেকেই বিদ্যমান রয়েছে নানা বিতর্কের জাল। পদ্মাবতী কাব্য আলাওলের প্রথম রচনা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অধ্যায়ে আরাকান বা রোসাঙ্গের রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ধারায় আলাওল ও তাঁর রচনাসমূহ ব্যাখ্যাত। যদিও ইতিহাস তত্ত্ববিশ্লেষণে এ-ধারা বা উপধারা সাহিত্য ইতিহাসের মূল প্রবাহের সাহিত্যের চেয়ে সাহিত্যগুণে কোনো অংশে কম নয়। রোমান্টিক প্রণয়নির্ভর কাহিনি ধারাভিত্তিক রিপ্রেজেন্টেশন বা উপস্থাপন-বিশ্লেষণ অনেকাংশে তুচ্ছ বা অবজ্ঞার চিহ্ন বহন করে। মানবীয় আখ্যান ও কাব্যশিল্প নিপুণতায় পদ্মাবতী অনন্যসাধারণ। প্রসঙ্গত, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসধারায় শাহ মুহম্মদ সগীরকে মূল স্রোতের অধিষ্ঠিত প্রতীয়মান হলেও তা আরাকান অঞ্চলকেন্দ্রিক সাহিত্য বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত। শাহ মুহম্মদ সগীরের বিখ্যাত রচনা ইউসুফ জুলেখা গৌড়াধিপতি সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের (১৩৮৯-১৪১০) তত্ত্বাবধিত। গিয়াসউদ্দীনের সভাকবি হিসেবে তিনি আরাকানে খুব সম্ভবত বসবাস করতেন না। ইউসুফ জুলেখা কাব্যে ব্যবহৃত কিছু শব্দ দেখেই পণ্ডিতগণ আরাকান বা চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বিবেচনায় ফেলতে ব্যস্ত। রোসাঙ্গ বা আরাকানকেন্দ্রিক ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে মুসলমানদের সাহিত্যচর্চা বেশি ক্ষেত্রেই বৌদ্ধ রাজার নৈকট্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় বৃহত্তর গৌড় বা বাংলা অঞ্চলে এ মুসলিম সাহিত্যচর্চার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় না। অথচ সুলতানি যুগে ও ইসলামি পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে শুরু করে রামায়ণ-মহাভারত অনুবাদ, বৈষ্ণবীয় ধারাসহ নানা মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনাধৃত ধারায় সাহিত্যচর্চা ব্যাপৃত ছিল। বিস্মিত হতে হয় ইসলামি শাসনের স্বর্ণযুগে মূল ভূখণ্ডিত স্থানিক ইসলামি বিশ্বাস-আশ্রিত উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি না হয়ে হাজার মাইল ব্যবধানের সেরূপ সাহিত্যচর্চা হওয়া। আরব বণিকদের ব্যবসা সংক্রান্ত কারণই কি যথার্থ? নাকি তথ্য-উপাত্ত নিদর্শনহীনতা বা ইতিহাসকরণী সমস্যা। স্বরূপ বা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে অনুসন্ধিৎসু না হয়ে পারা যায় না। সাহিত্যতত্ত্ব ও শিল্পমূল্যে এ আরাকানস্থানীয় মুসলিম বিশ্বাস-আশ্রিত সাহিত্যগুলো অনন্ত মানবীয়, কাব্যিক ও উঁচুমার্গীয়।
আলাওলের প্রকৃত নাম, জন্মতারিখ ও স্থান নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মনে করতেন আলাওলের প্রকৃত নাম ‘আলাউক হক’। যদিও পরবর্তীকালে তিনি ‘সৈয়দ’ যুক্তের পক্ষেই সমর্থন করেছেন। ড. মুহম্মদ এনামুল হক মনে করেন তাঁর প্রকৃত নাম সৈয়দ আলাওল। আবার অনেক পণ্ডিত ‘শাহ’ যুক্তও ব্যবহার করেন। আলাওলের নামের বানান নিয়েও নানা বিভ্রাট ও বিতর্ক রয়েছে। তবে ‘আলাওল’ নামই সর্বজনস্বীকৃত। বর্তমানের প্রতিটি স্তরে ‘আলাওল’ নামেই পরিচিতি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও সৈয়দ আলী আহসান মনে করেন আলাওলের জীবনকাল ১৫৯৭ থেকে ১৬৭৩-এর মধ্যে; ড. আহমদ শরীফ ১৬০৭ থেকে ১৬৭৩/৮০; ড. মুহম্মদ এনামুল হক ১৬০৭ থেকে ১৬৮০ বলে মনে করেন। নানা তথ্য ও উপাত্তভিত্তিক আলাওলের জন্মসাল হিসেবে ১৬০৭ সালকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে বর্তমানে অনেকেই মনে করেন। আলাওলের জন্মস্থান নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে – ড. দীনেশ চন্দ্র সেন ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আলাওলের জন্মস্থান হিসেবে ফরিদপুরের ফতেহাবাদ পরগনার জালালপুর বলে নানা তথ্যভিত্তিক অভিমত দেন। কবির আত্মপরিচয় পর্বে জালালপুর আদি নিবাস উল্লিখিত হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। অধিকাংশ তাত্ত্বিক এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। কিন্তু ড. মুহম্মদ এনামুল হক চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার অন্তর্গত জোবরা গ্রামে আলাওল জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করেন, যেখানে আলাওলের নির্মিত মসজিদ, দিঘি রয়েছে এবং এলাকাটি আলাওলনগর নামে পরিচিত। (মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, মুনসুর মুসা সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী, দ্বিতীয় খণ্ড, ১৯৯৩, পৃ ৭৫)। দীনেশচন্দ্র সেন থেকে বিতর্ক শুরু হয়ে দেশবিভাগ-উত্তর সময়ে আরো চূড়ান্ত রূপে বিদ্যমান ছিল। বর্তমানে সাধারণে জন্ম ১৬০৭ সাল এবং ‘আলাওল’ নামেই পরিচিতি ধরে নিয়ে থাকেন। কিন্তু অনুসন্ধিৎসুদের মধ্যে সত্য-নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চায় প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন-বিশ্লেষণের তৎপরতা লক্ষ করা যায়।
আলাওলের জীবনচরিত নিয়ে নানা কিংবদন্তি – আলাওলের পিতা ছিলেন ফতেহাবাদ রাজ্যের মজলিস কুতুবের মন্ত্রী। একবার শৈশবে পিতার সঙ্গে জলপথে পর্তুগিজদের কবলে পড়লে তাদের বন্দি করে রাখেন (অন্যত্র পর্তুগিজদের সঙ্গে যুদ্ধের উল্লেখ আছে)। পর্তুগিজদের হাতে আলাওলের পিতা নিহত হন এবং সর্বস্ব লুণ্ঠিত হয়। উপায়ান্তর না দেখে দীর্ঘ কষ্টভোগের পর আলাওল আরাকানে উপস্থিত হন। আরাকানে মগরাজার সেনাবাহিনীতে অশ্বারোহী সৈনিকের পদে নিযুক্ত হন (প্রাপ্ত হাতে লেখা কাব্যে বর্ণিত আত্মপরিচয় ও অন্যান্য সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে কেউ কেউ সৈনিক, দেহরক্ষী, কেউ কেউ সংগীতশিক্ষক হিসেবে যোগদানের উল্লেখ করেন)। আলাওল ছিলেন সংগীতজ্ঞ। ধীরে ধীরে আলাওলের কাব্যকলা জ্ঞান ও সংগীতজ্ঞের পরিচয় প্রকাশিত হয়ে পড়লে কোরেশী মাগন ঠাকুরের সহযোগিতায় কাব্যচর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাজসভার সৈয়দ মুসা, মুহম্মদ খান, মজলিস নবরাজ খানের সহযোগিতায় সৃষ্টি করেন অনন্যসাধারণ কালজয়ী সব সাহিত্য। আলাওলের পদ্মাবতী (১৬৪৮, মতান্তরে ১৬৫২) সমাপ্ত হওয়ার পর অনাকাক্সিক্ষত আরেক দুর্ঘটনায় পতিত হন। নবাব শাহ সুজা বঙ্গের বিদ্রোহের জেরে আরাকান রাজসভায় আশ্রয় প্রার্থী হন এবং অকস্মাৎ নিহত হন। এ-সময় আলাওলের সতীময়না-লোর-চন্দ্রানী (১৬৫৯) সমাপ্ত হয়। চক্রান্তের অপরাধে নিরীহ আলাওল দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। এ-সময় আলাওলের প্রধান আশ্রয়দাতা মাগন ঠাকুরও মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীকালে আর্থিক নানা অভাবের জন্য পরিবার-পরিজনসহ প্রায় দীর্ঘ দশ বছর ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনধারণ করেন (বাংলাপিডিয়া ‘আলাওল’ অন্তর্ভুক্তি)। আলাওলের আত্মপরিচয়কেন্দ্রিক জীবনী পাঠ সমকাল ও আলাওল সম্পর্কে নানাবিধ প্রশ্নের সৃষ্টি করে। ওই সময় পর্তুগিজদের নানা অত্যাচারে ভারতীয় জীবন অতিষ্ঠ ছিল। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ইসলামবাদ গ্রন্থে আরাকানকেন্দ্রিক পর্তুগিজদের নানা অত্যাচার ও কর্মচিত্র আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। বিচ্ছিন্ন নানা তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন জাগে – তারাই আলাওলের পিতাকে হত্যা করে আলাওলকে আরাকান সভায় পাঠিয়েছিল কি না! কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য পূর্ণ হওয়ার বিপরীতে আলাওল সভাসদে সম্মানিত হলে প্রতিহিংসায় আলাওলকে চক্রান্তের দায়ে কারাবদ্ধ করা হয়েছিল। কেউ কেউ বৌদ্ধ রাজাই শাহ সুজাকে সপরিবারে হত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু বৌদ্ধ রাজার পরবর্তী মুসলমান শাসনের সঙ্গে সখ্যও বিস্মিত করে। তথ্যে আলাওল ফতেহাবাদ পরগনার অমাত্য তনয়। তাহলে সর্বস্ব লুণ্ঠিত হওয়ার পর ফতেহাবাদ পরগনায় ফেরত গেলেন না কেন? আরাকানের অতিকষ্টের জীবন বেছে নিলেন। পর্তুগিজরা মুসলমানদের সম্প্রীতি ও ক্ষমতাকে খর্ব করার নানা কৌশলী তৎপরতা, আচরণ ও অত্যাচার চালাত বলে নানা তথ্য পাওয়া যায় (অতুল চন্দ্র রায়, ভারতের ইতিহাস, মৌলিক প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৮১, পৃ-৪৮-৫৩)। আলাওল সম্পর্কে যথার্থ তথ্য না থাকায় প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন প্রায় অসম্ভব। তারপর আলাওলের স্বতঃস্ফূর্ততা বিনষ্ট হয়ে গেলে তার আত্মমানসিক অবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। সম্ভবত সে-পরিপ্রেক্ষিতে আলাওলকে আধ্যাত্মিক গুরু মসউদ শাহ ‘কাদেরী খিলাফত’ প্রদান করেছিলেন। শেষজীবনে তিনি আধ্যাত্মিক মার্গতায় চলে গিয়েছিলেন। আলাওলের কাব্যে আত্মপরিচয়ে শেষজীবনে ভিক্ষা করে বাঁচার ঘটনা আমাদের ব্যথিত করে। হয়তোবা অতিকষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন-যাপন করেছেন। আলাওলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা – সপ্তপয়কর (১৬৬৫), সিকান্দরনামা (১৬৭৩), নীতিকাব্য তোহফা (১৬৬৪)। এছাড়া তিনি সংগীতবিষয়ক রাগতালনামা এবং বৈষ্ণবপদের অনুদর্শী কিছু পদাবলি রচনা করেছেন।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেন, ‘তাঁহার (আলাওল) কাব্য সুধাপানে কাব্যমোদিগণ যেমন বিভোর, কাব্যরসপিপাসু অশিক্ষিত জনগণও (শিক্ষিত পাঠকের মুখে) তাঁর সুমধুর কবিত্ব রসাস্বাদনে তেমনই আগ্রহান্বিত। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ এবং প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কবি।’
পদ্মাবতী কাব্যটি আলাওলের সর্বপ্রণিধান্য সাহিত্যকৃতি। পদ্মাবতী কাব্যটি মালিক মুহম্মদ জায়সীর হিন্দি পদুমাবৎ কাব্যের ভাবমূলক। অনুবাদধর্মী হলেও পদ্মাবতীর ভাষা, নাগরিক রুচি-শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা অনন্যসাধারণ হয়ে ফুটে উঠেছে সর্বত্র; ফলে মৌলিকতার মর্যাদায় সমাসীন। এ-কাব্যে বিধৃত  জ্ঞান-গভীরতায় অনেকে আলাওলকে পণ্ডিতকবি হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। জায়সীর পদুমাবৎ কাব্যটি ইতিহাস-আশ্রিত ও সুফিতত্ত্বভিত্তিক। ভগবত পুরাণকেন্দ্রিক বাঙালি জয়দেবের গীতগোবিন্দ, বিদ্যাপতির পদাবলি ধারায় বৈষ্ণবীয় তত্ত্বের উত্থান, যা পরবর্তী চৈতন্যদেবের মধ্যে দিয়ে বাঙালির কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। সম্ভবত জয়দেবকালীন বৈদিক তত্ত্বের নব-রূপায়ণে বৈষ্ণবীয় তত্ত্বের প্রচার ও প্রসারের বিপরীতে জায়সী সুফিতত্ত্বের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। সুফিতত্ত্ব, বৈদিক আত্মা-পরমাত্মাবাদ বা ভগবত ও নব্য বৈষ্ণববাদের মধ্যে ভাষা-রূপক ছাড়া মূল এক ও অভিন্ন। জায়সীর কাব্যবিন্যাসে স্থান-কাল-পাত্রকে ভারতীয় প্রেক্ষাপট রেখে সুফিবাদী রূপকতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। অন্যদিকে আলাওলের পদ্মাবতী মানবীয় আখ্যান; সঙ্গে সুফিবাদী ও বৈদিক ঘরানাজাত পরমাত্মিক তত্ত্বের মিশ্রণ ঘটেছে। কারণ কাব্যে মহাদেবের অবস্থান; রাধা-কৃষ্ণের উল্লেখ পাওয়া যায় না। পদুমাবৎ ভারতবর্ষের খিলজি শাসনকালীন ইতিহাস-আশ্রিত। পদুমাবৎ কাব্যের ইতিহাস সত্যতা অনেকেই অস্বীকার করেন। সেজন্য সুফিবাদী রূপকতাকেই সর্বজনে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। পদুমাবৎ গ্রন্থটি সাধারণত পাওয়া না, বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত কাহিনির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। যা হোক, পদুমাবৎ কাব্যের ঘটনার নির্যাস এরকম – রাজা রতœসেনের স্ত্রী পদ্মাবতী। পদ্মাবতী অপরূপ সুন্দর। একবার চিতোরের রাজা রতœসেন তাঁর পরিষদে রাঘবচেতন নামে এক ব্রাহ্মণকে অপমান করেন। অপমানের প্রতিশোধ নিতে ব্রাহ্মণ দিল্লির বাদশাহ আলাউদ্দীনকে পদ্মাবতীর রূপ-গুণের নানা প্রশংসা করে পদ্মাবতীকে হরণে অনুপ্রাণিত করে তোলেন। দিল্লির বাদশাহ আলাউদ্দীন রতœসেনকে অনুরূপ প্রস্তাব পাঠান। রতœসেন এতে খুব অপমানিত হন এবং পরিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। ফলে আলাউদ্দীন ও রতœসেনের মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। যুদ্ধে রতœসেন বন্দি হলেও নানা কৌশলে মুক্তি ঘটে। পরে দেওপালের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে দেওপাল নিহত ও রতœসেন আহত হন। সে-সুযোগে আলাউদ্দীন চিতোর আক্রমণ করেন। আলাউদ্দীন বিজয়ী বেশে চিতোর রাজপ্রাসাদে পৌঁছলে দেখতে পান, রাজা রতœসেন মারা গেছেন এবং পদ্মাবতী স্বামীর সঙ্গে জ্বলন্ত চিতায় দাহ হচ্ছে। আলাউদ্দীন চিতার প্রতি সনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করে ফিরে আসেন। জায়সীর পদুমাবৎ কাব্যটি সম্পূর্ণ রূপকাশ্রিত। ইতিহাসভিত্তিক হলেও ইতিহাস সত্যকে ছাপিয়ে সুফিদর্শনজাত তত্ত্বীয় জীবনবাস্তবতা বিশ্লেষিত।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ পদ্মাবতী কাব্যের ছত্রিশটি হাতে লেখা গ্রন্থ (পুঁথি) সংগ্রহ করেছেন। লিপান্তর বানান ছাড়া আখ্যানভাগ প্রায় অভিন্ন। আলাওল কাব্যের শুরুতে স্র্র্র্র্রষ্টার স্তুতি, রাসুল (স)-এর সিফতের বিবরণ, চার খলিফার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়ে শুরু করেছেন। মূল পদুমাবতে পদ্মাবতীর রূপ বর্ণনার অতটা চিত্র নেই বলে বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেন, যতটা আলাওলের পদ্মাবতীতে বিধৃত। এ রূপবর্ণনার নৈপুণ্যে অনেকে আলাওলকে ধন্যবাদ দিয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাস্তরে আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যের মূল বিষয়, ব্যঞ্জনা ও তত্ত্বকে ছাড়িয়ে পদ্মাবতীর রূপবর্ণনাই যেন প্রধান হয়ে ওঠে। মূল তত্ত্ব, কাব্যব্যঞ্জনা-বিষয়ে পঠনে অনুযোগ প্রয়োজন। আলাওলের পদ্মাবতী ও উপস্থাপনকৃত নাট্যের কাহিনিবিন্যাস প্রায় অভিন্ন। কাহিনি এমন – রাজভবনের অদ্ভুত শুকপাখি – হীরামন পদ্মাবতীর অত্যন্ত প্রিয়। পদ্মাবতী ক্রমে যৌবনবতী হলে তাঁর রূপের সংবাদ সমস্ত ভূমণ্ডলে পরিব্যাপ্ত হলো। তাঁর বিয়ে হচ্ছে না দেখে হীরামন তাকে বলল, সে     দেশ-দেশান্তরে ঘুরে তার উপযুক্ত বর খুঁজে আনবে। এ সংবাদ শুনে রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে শুককে মারার আদেশ দিলেন। পদ্মাবতী অনুনয়-বিনয় করে শুকের প্রাণ রক্ষা করলেন। এরপর থেকে শুক সুযোগ খুঁজতে লাগল কোনোক্রমে রাজভবন ছেড়ে চলে যেতে।
একদিন পদ্মাবতী মানসসরোবরে সখীদের সঙ্গে নিয়ে ম্লান করতে গেলে শুকপাখি এক সুযোগে বনে উড়ে গেল। চিন্তাশীল শুক সেই বনে এক ব্যাধের হাতে ধরা পড়ল। ব্যাধ শুককে সিংহলের হাটে নিয়ে বিক্রি করতে এলে চিতোরের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আসা ব্রাহ্মণ শুকপক্ষীর জ্ঞান এবং পাণ্ডিত্যের কথা শুনে শুককে ক্রয় করে চিতোর দেশে এলেন। শুকের প্রশংসা শুনে চিতোরের রাজা রতœসেন লাখ টাকা দিয়ে হীরামন ক্রয় করলেন। এদিকে রানী নাগমতী শুকের কাছে পদ্মিনী রমণীগণের রূপের বর্ণনা শুনে ভাবলেন, যদি এখানে এ-পাখি থাকে তাহলে একদিন না একদিন রাজা এসব শুনবেন এবং তাঁকে ছেড়ে পদ্মাবতীর জন্য গৃহত্যাগ করবেন। তিনি তাই ধাত্রীকে ডেকে শুককে হত্যা করতে আদেশ দিলেন। ধাত্রী পরিণামের কথা চিন্তা করে শুককে লুকিয়ে রাখল। রাজা ফিরে এসে শুককে না দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলে শুককে অন্তরাল থেকে তাঁর সামনে আনা হলো। শুক সমস্ত বৃত্তান্ত শোনাল। রাজা পদ্মাবতীর রূপের দীর্ঘ বর্ণনা শুনে উৎকণ্ঠিত হলেন। ব্যাকুল হলেন, তাঁর হৃদয়ে এমন প্রবল অভিলাষ জাগল যে, তিনি হীরামনকে সঙ্গে নিয়ে সিংহল যাত্রা করলেন। নানা দুর্গম পথ অতিক্রম করে তাঁরা অবশেষে সিংহল দেশে মহাদেবের মন্দিরে উপস্থিত হলেন। জপতপ করার জন্য এবং পদ্মাবতীর ধ্যান করবার জন্য। হীরামন পদ্মাবতীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় রতœসেনকে বলে গেল, বসন্ত পঞ্চমীর দিনে সে পদ্মাবতীর দর্শন পাবে এবং তাঁর আশা পূর্ণ হবে।
অনেকদিন পর হীরামনকে পেয়ে পদ্মাবতী আনন্দে আকুল হলেন। হীরামন রতœসেনের রূপ, কুল, শৌর্য ও ঐশ্বর্য বর্ণনা করল এবং বলল, রতœসেনই সবদিক থেকে তাঁর যোগ্য পুরুষ। পদ্মাবতী রতœসেনের ত্যাগ ও প্রেমের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিলেন, বসন্ত পঞ্চমীর দিন পূজা উপলক্ষ করে রতœসেনকে দেখতে যাবেন ও তাঁকে জয়মাল্য দেবেন। বসন্ত পঞ্চমীর দিন পদ্মাবতী সখীদের নিয়ে মণ্ডপে ঘুরতে ঘুরতে যেদিকে রতœসেন ছিলেন সেদিকেও এলেন। পদ্মাবতীর সঙ্গে রতত্নসেনের সাক্ষাৎ হলো। পদ্মাবতী রত্নসেনকে দেখে বুঝলেন, শুক যে-কথা বলেছে তার কোথাও ত্রুটি নেই। পদ্মাবতী ও রত্নসেনের প্রণয়-সংবাদ পেয়ে পদ্মাবতীর বাবা রাজা গন্ধর্ব্যসেন ক্রুদ্ধ হলেন। রত্নসেনের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। এ সময় মহাদেবের আগমন এবং তার মধ্যস্থতায় অনেক আড়ম্বরের মধ্যে রত্নসেনের সঙ্গে পদ্মাবতীর বিয়ে হলো।
এদিকে চিতোর বিরহিণী নাগমতী রাজার কথা ভেবে ভেবে এক বর্ষ কাটালেন। তাঁর বিলাপ শুনে পশুপাখি বিহ্বল হলো। একদিন অর্ধেক রাত্রে একটি পাখি নাগমতীকে তাঁর দুঃখের কারণ জিজ্ঞেস করলে নাগমতী তাঁকে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। পাখির কাছে নাগমতীর দুঃখের কথা এবং চিতোরের হীন দশার কথা শুনে রত্নসেনের মনে দেশের কথা উদয় হলো। তিনি চিতোরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। যাত্রার প্রাক্কালে সমুদ্র রাজাকে অমূল্য রত্ন দিলো। এসব অমূল্য রতœ নিয়ে রত্নসেন ও পদ্মাবতী চিতোরে উপস্থিত হলেন। নাগমতী ও পদ্মাবতী দুই রানীকে নিয়ে রাজা সুখে সময় নির্বাহ করতে লাগলেন। চিতোরের রাজসভায় যক্ষিণী সিদ্ধপণ্ডিত রাঘবচেতন দ্বিতীয়া নিয়ে অন্য পণ্ডিতদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হলেন। মিথ্যা এবং সত্যের পরীক্ষায় রাঘবের অপকৌশল ধরা পড়লে রাজা রত্নসেন তাঁকে নির্বাসনদণ্ড দিলেন। রাঘবচেতন প্রতিশোধস্পৃহায় দুরভিসন্ধি করে পদ্মাবতীর কঙ্কণ নিয়ে দিল্লিতে পৌঁছলেন। বাদশাহ আলাউদ্দীন পদ্মাবতীর রূপের বর্ণনা শুনে ব্রাহ্মণকে অনেক আপ্যায়নের সঙ্গে রাজদরবারে স্থান দিলেন এবং রাজা রত্নসেনের কাছে পত্র দিলেন – ‘আমাকে পদ্মাবতী দাও, তার বিনিময়ে যত রাজ্য চাও দেব।’ পত্র পেয়ে রাজা রত্নসেন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলেন এবং যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। শুরু হলো রাজা-বাদশাহ যুদ্ধ। আলাউদ্দীন চিতোরগড় আক্রমণ করলেন। আট বছর পর্যন্ত তিনি চিতোর বেষ্টন করে রইলেন, কিন্তু অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারলেন না। এ সময় দিল্লি থেকে সমাচার এলো আবার তাঁর রাজ্য আক্রমণ করেছে। বাদশাহ তখন গড়ে প্রবেশ অসাধ্য জেনে কপটতা করলেন। তিনি রত্নসেনের কাছে সন্ধির প্রস্তাব করলেন – ‘পদ্মাবতীর প্রয়োজন নেই, সমুদ্র থেকে তুমি যে পাঁচ অমূল্য বস্তু পেয়েছ, তা আমাকে দাও।’
রাজা স্বীকার করলেন এবং বাদশাহকে চিতোরগড়ের ভেতরে আমন্ত্রণ করলেন। কিছুদিন পর্যন্ত বাদশাহের আতিথ্য চলল। একদিন চলতে চলতে বাদশাহ পদ্মাবতীর মহলে এলেন। বাদশাহ পদ্মাবতীর মহলের সামনে এক স্থানে বসে রাজার সঙ্গে শতরঞ্জ খেলতে লাগলেন। সামনে এক দর্পণ রাখলেন, যদি পদ্মাবতী দাঁড়ান তবে দর্পণে তাঁর প্রতিবিম্ব দেখতে পাবেন। কৌতূহলবশে পদ্মাবতী ঝরোখার কাছে এলেন আর তাঁর প্রতিবিম্ব দর্পণে পড়ল। বাদশাহ প্রতিবিম্ব দেখে হতচেতন হলেন।
অবশেষে বাদশাহ বিদায় নিলেন। রাজা বিদায় দেবার জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চললেন। গড়ের এক সিংহদ্বারে বাদশাহ রাজাকে এক উপঢৌকন দিলেন। সর্বশেষ সিংহদ্বার অতিক্রম করার সময় রাঘবের ইঙ্গিতে বাদশাহ রত্নসেনকে বন্দি করে দিল্লিতে নিয়ে এক ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বন্দি করে রাখলেন। পদ্মাবতী গোরা এবং বাদলের গৃহে গিয়ে তাদের অনুরোধ করলেন রাজাকে মুক্ত করে আনতে। আলাউদ্দীন যেমন প্রতারণা করে রতœসেনকে বন্দি করেছিলেন, তারাও তেমনি অপকৌশলের সাহায্যে রাজাকে মুক্ত করবে সিদ্ধান্ত করল। ষোলোশো পাল্কির মধ্যে ষোলোশো সশস্ত্র রাজপুত যোদ্ধাকে রাখল এবং সর্বোত্তম পাল্কির মধ্যে বসাল একজন লোহারুকে। ঘোষিত হলো সর্বত্র যে, রানী পদ্মাবতী ষোলোশো দাসী সঙ্গে নিয়ে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য দিল্লি যাচ্ছেন। দিল্লিতে বাদশাহের কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে বশীভূত করা হলো। কেউ পাল্কি অনুসন্ধান করল না। বাদশাহের কাছে খবর গেল যে, পদ্মাবতী এসেছেন এবং অনুরোধ জানিয়েছেন যে, রাজার সঙ্গে প্রথমে সাক্ষাৎ করে চিতোরের রাজভাণ্ডারের চাবি তাঁকে অর্পণ করতে চান। তারপর মহলে যাবেন। বাদশাহ অনুমতি দিলেন। রত্নসেনের বন্দিশালায় সুসজ্জিত পাল্কি পৌঁছল। পাল্কির ভেতর থেকে লোহারু বেরিয়ে এসে রাজার বন্ধন খুলল। রাজা সশস্ত্র হয়ে নিকটে প্রস্তুত একটি ঘোড়ায় আরোহণ করলেন। এদিকে পাল্কি থেকে ষোলোশো সশস্ত্র রাজপুত বেরিয়ে এলো। গোরা এবং বাদল রাজাকে নিয়ে চিতোর যাত্রা করল। আলাউদ্দীন এদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন, গোরা তখন এক হাজার সৈন্য নিয়ে বাদশাহকে বাধা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। প্রচণ্ড যুদ্ধে গোরা সরজার হাতে নিহত হলো। ইতোমধ্যে রত্নসেন চিতোর পৌঁছলেন। চিতোরে পৌঁছেই রাজা পদ্মাবতীর কাছে দেবপালের ধৃষ্টতার কথা শুনলেন। সকালেই তিনি কুম্ভলনের অভিমুখে যাত্রা করলেন। রত্নসেন এবং দেবপালের মধ্যে দ্বৈরথ যুদ্ধ হলো। দেবপাল নিহত হলেন। রত্নসেন আহত অবস্থায় চিতোরে ফিরে এলেন এবং অল্পদিন পরেই প্রাণত্যাগ করলেন। প্রথা অনুযায়ী পদ্মাবতী ও নাগমতী রত্নসেনের চিতায় আরোহণ করতে গেলেন। তারপর জীবনবাস্তবতা ব্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে কাহিনির পরিসমাপ্তি ঘটে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রযোজনা পদ্মাবতী নাট্যটি উপস্থাপিত হয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যরীতির ধারায়। নাট্যটি বর্ণনা, উক্তি, প্রত্যুক্তি ও নৃত্যগীতির মধ্য দিয়ে ঘটনার পরম্পরায় উপস্থাপিত। আলাওলের পদ্মাবতীর ঘটনার চিত্রণ নাট্যমঞ্চে অত্যন্ত জটিল বলে সহজেই অনুমেয়। কিন্তু পদ্মাবতী নাট্যের নির্দেশক অত্যন্ত শিল্পকুশলতায় ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। বহুলপঠিত পাঠে সাধারণত পাঠক নিজস্ব কল্পনার সংমিশ্রণে নিজ নিজ কাল্পনিক সৌধ গড়ে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠিত কাহিনিধারার নাট্য উপস্থাপন অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কের স্থান রাখে। এ পদ্মাবতী নাট্যে দৃশ্য ও কাহিনি উপস্থাপনে এমন নৈর্ব্যক্তিক ও নান্দনিক কুশলতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যা ঘটনা বা ঘটনীয় বিষয় প্রকাশে মূল পদ্মাবতী অনুগামী হয়ে উঠেছে। ফলে বিতর্ক সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মূল পাঠের সর্বজনীন রূপ প্রতিভাত হয় নাট্যে। সংলাপে বা কথোপকথনের ক্ষেত্রে আলাওলের কাব্যের পঙ্ক্তিগুলোই হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে সাধারণ দর্শকের কাছে কাব্যিক পঙ্ক্তিক উক্তির চেয়ে ব্যবহার্য ভাষার দর্শক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। সম্ভবত আলাওলের কাব্যকে উপস্থাপনের সার্বিক প্রয়াস ছিল বিধায় কাব্যই বর্ণনা ও সংলাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যের বর্ণন পরম্পরায় স্রষ্টার স্তুতি, বন্দনা অংশ বাংলা নাট্য পরিবেশনারীতির নিরিখেই উপস্থাপিত। প্রথমে বন্দনা দিয়ে নাট্য শুরু হয়ে বর্ণনা-সংলাপ ও নৃত্যগীতের অদ্বৈত প্রবহমান ঘটনধারায় কাহিনির পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।
নাট্যটি বাংলা মঞ্চরীতিতে চারদিকের দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চে ডিজাইনে বা এরিনা স্টাইলে উপস্থাপিত। মঞ্চের মাঝখানে উঁচু স্থান বা পাটাতন ব্যবহার করা হয়েছে, যা কখনো গায়েন বা বর্ণনাকারীর স্থান, কখনো রাজসভা, মন্দির ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়েছে। নাট্যটি এরিনা স্টাইলে নির্মিত হলেও মঞ্চ প্রতিকূলতায় প্রসেনিয়াম মঞ্চেই এরিনা মঞ্চ আবহে উপস্থাপিত। মঞ্চের তিন দিকেই বায়েন ও দোহার সমবেত এবং সামনের দিকে দর্শক। গায়েনের বর্ণনা ও ঘটনার ঘনঘটায় একে একে দোহার দল থেকে বিভিন্ন দোহার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছে। নাট্যের দুটো বিষয় অত্যন্ত চমৎকার, চিরন্তন ও নান্দনিক। প্রথমত, নাট্যের পোশাক ও আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদি নির্ধারণ। পোশাক বিন্যাসকে পদ্মাবতী সমকাল ছাড়িয়ে চিরকালীন রাজকন্যার চিত্রে উপস্থাপিত। অত্যন্ত সহজ সাধারণ অথচ বর্ণাঢ্য ও নান্দনিক। এতে আধিক্য বা বাহুল্যবর্জিত সর্বোপরি নান্দনিক। রঙের নির্বাচন ও ব্যবহার যৌক্তিক ও নান্দনিক। বিষয় ও গুরুত্ব¡ বোঝাতে রঙের ব্যবহার অত্যন্ত পরিমিত ও অনিন্দ্যসুন্দর। চরিত্রগুলোর প্রায় প্রত্যেকেরই পোশাক ও রঙের ব্যবহার অনন্য ও নান্দনিক। নাট্যে ভারতীয় ইতিহাসধারার ধ্রুপদ চিহ্নিত ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ব্যবহারের রীতি বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় লক্ষণীয়। ফলে এ ক্লাসিক ধারার প্রপস প্রায় একই রকমের বিদ্যমান থাকে। কিন্তু পদ্মাবতী নাট্যের প্রপস ব্যবহারে অত্যন্ত শিল্পনিপুণতার পরিচয় বিধৃত হয়। প্রপসগুলোর সমকালীন ব্যবহার যৌক্তিকতা, প্রেক্ষাপট, বাহুল্যবর্জিত রং-রূপ ও গুরুত্বের উপযোগী নানা মাত্রায় উপস্থাপিত, যা অত্যন্ত শিল্পরুচি ও পরিশ্রম সাপেক্ষের পরিচয় বহন করে। মিউজিক বা সংগীত ব্যবহারে মঞ্চপাশে বায়েন দল বসেই সংগীত ও আবহ উপস্থাপন করেছেন। ধ্রুপদী ঢঙে, গানে, ধ্রুপদী নৃত্যে অনিন্দ্যসুন্দর উপস্থাপন নাট্যটি।
নাট্যটিতে মূল কাব্যের বিভিন্ন ঘটনার নৈর্ব্যক্তিক ও নান্দনিক উপস্থাপন ঘটেছে। পরিমিত মাত্রায় ও ব্যঞ্জনাপূর্ণ রাজসভা, মানসসরোবর, মন্দির, পদ্মাবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, হীরামনের দৌত্যক্রীড়া উপস্থাপিত। আলো ব্যবহারেও কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু দৃশ্য ও আবেগ অনুযায়ী আরো বেশি সূক্ষ্মতায় নির্দেশকের মনোযোগ প্রয়োজন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অভিনয় অত্যন্ত চরিত্র উপযোগী এবং নান্দনিক। কিছু কিছু চরিত্রাভিনয়ে প্রাণস্ফূর্ততা ও উদ্যমতার অভাব লক্ষ করা গেছে ওই প্রদর্শনীতে। চরিত্র-উপযোগী বিশ্বাসহীনতা বিধৃত হয়। তবে পদ্মাবতী ও নাগমতীর অভিনয় অত্যন্ত চমৎকার ও নান্দনিক। সমস্ত অভিনয়শিল্পীর মধ্যে প্রাণশক্তি ও বিশ্বাসযোগী পারিপার্শ্বিক অনুভব-দক্ষতা ও ক্ষমতার আরো বেশি প্রয়োজন। কাব্যের ছন্দোবদ্ধ পঙ্ক্তির পরিবর্তে সংলাপ বা উক্তি-প্রত্যুক্তিতে ভাষার সহজ ব্যবহার সাধারণ দর্শককে ঘটনার দিকে বেশি নিবিষ্ট করতে পারে। আলাওলের কাব্য-ব্যঞ্জনাধৃত পদ্মাবতী উপস্থাপন নান্দনিক। সেজন্য নির্দেশক নিঃসন্দেহে প্রশংসা প্রাপ্তির দাবি রাখে। নাট্যের শেষে সহমরণের প্রসঙ্গ দিয়ে সমাজের বিধ্বংসী কুসংস্কার-কুবিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুক্তবিশ্বাসের অবগাহন করেছেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত কালজয়ী সাহিত্য পদ্মাবতী নাট্য উপস্থাপন নিঃসন্দেহে মহত্তর। পদ্মাবতী উপস্থাপন একদিকে মূল অনুগামী, অন্যদিক হাজার বছরের বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতিতে নান্দনিক নাট্যপ্রযোজনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
নাট্যের নির্দেশক শাহীন হাসান বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য ধারা অনুশীলনের জন্যই পদ্মাবতী প্রযোজনা। পদ্মাবতী বাংলা সাহিত্যের অনন্য নিদর্শন। এ কাব্যব্যঞ্জনামণ্ডিত আখ্যানকে নাট্য উপস্থাপনে ঐতিহ্যগত ধারাকেই অবলম্বন করেছি। ডিজাইন চিন্তা ছিল এরিনা। কিন্তু আমাদের যে মঞ্চে থিয়েটার করতে হয় তা প্রসেনিয়াম। ফলে এরিনার আবহ তৈরি করে উপস্থাপন করতে হচ্ছে। বিশ্বচিন্তন উপযোগী আমাদের বাংলা নাট্যের বিকাশ ঘটুক তা আমরা সবাই চাই। এ ঐতিহ্যগত অনুশীলনের জন্যই আমাদের পদ্মাবতী নির্মাণে ব্রতী হওয়া।’
পদ্মাবতী নাট্যের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন – শওকত, লতিফা ইয়াসমিন, শারাবান তহুরা কুমকুম, তাহামিনা আক্তার পিংকি, আবির মণ্ডল, আলাউদ্দীন শাহ, ইমরান হোসেন, সাবরিনা ইয়াসমিন টুম্পা, নিশিগন্ধা দাসগুপ্তা, সানাউল হক, শহিদুল ইসলাম, তানভীর হাসান, জিহাদ, শাকিলা, কামরুল আলম, নাজমূল, নাঈমা আক্তার, মামুনুল হক, রুমা আক্তার, অভিজিৎ বড়–য়া, শহিদুল ইসলাম ওলি, আতাউর রহমান; সংগীতে – ড. দীপঙ্কর দে, অজয় চক্রবর্তী, রয়েল বড়–য়া, সৈকত চন্দ্র দাস। নেপথ্যে – মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা : শামীম হাসান, পোশাক পরিকল্পনা : ফাহমিদা সুলতানা তানজি, সংগীত : ড. দীপঙ্কর দে, নৃত্য নির্মিতি : নিশিগন্ধা দাসগুপ্তা ও শারাবান তহুরা কুমকুম, দ্রব্য সম্ভার : শহিদুল ইসলাম, মঞ্চ-ব্যবস্থাপনা : জিহাদ। পদ্মাবতী নাট্য সৃষ্টির উৎস আলাওলের পদ্মাবতী কাব্য। পদ্মাবতী নাট্যটির নির্দেশনায় বিভাগের তরুণ-প্রতিভাবান শিক্ষক শামীম হাসান।

Leave a Reply

*