logo

নারীর পরাবাস্তবতা

রা জী ব  ভৌ মি ক
মানবমনের গহিন কোণের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে কাজ-কারবার সুররিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তববাদী শিল্পীদের। কল্পনা আর বাস্তবতার মিশ্রণ তৈরি করাটা তো যে-কোনো শিল্পীর জন্যই প্রধান কাজ। কিন্তু পরাবাস্তববাদীরা আবার এক ধাপ এগিয়ে। অবচেতন মনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্য সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করেন তাঁরা। দাবি করেন, এতেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত সত্য।
১৯২০-এর দশকে কবিতায় পরাবাস্তববাদের সূত্রপাত করেছিলেন ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রেতো, কবিতা ও চিত্রশিল্পের সৃজনে এই আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষা তত্ত্বকে তিনি প্রয়োগ করেছিলেন তাঁদের সৃজনে। ব্রেতো লিখেছিলেন –

‘তাঁর বিছানায় হঠাৎ উদয় হয় জাজ্বল্যমান ছিদ্র
সেই ছিদ্র দিয়ে দৃশ্যমান হয় বনবীথির আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রবাল হরিণের শিং
আর খনির কিংবা আমার তলদেশে পড়ে থাকা নগ্ন নারী’
– পোস্টম্যান শেভাল, আঁদ্রে ব্রেতো, ১৯২৪
ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে শিল্পের অন্যান্য শাখায়। স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির ছবি তো সবাই দেখেছেন। ১৯৩১ সালে আঁকা তাঁর ছবি ‘দ্য পার্সিসটেন্স অফ মেমোরি’ খুব সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পরাবাস্তববাদী ছবি।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের মাঝে – সে এক অস্থির সময়। শিল্পের চিরাচরিত অস্ত্র দিয়ে আর লড়া সম্ভব হচ্ছে না রূঢ় বাস্তবের সঙ্গে। বর্ণনা করা যাচ্ছে না যুদ্ধোত্তর হিউম্যান ওয়েস্টল্যান্ডের। অসহায় এই ভাষাহীনতায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শিল্পীর মনন, তাঁর কলম, তাঁর তুলি, এমনকি ক্যানভাসও। মানবতার ছাই থেকেই জন্ম পরাবাস্তববাদ নামের এই ফিনিক্স পাখির।
তবে পরাবাস্তবতা নিয়ে নারী শিল্পীরা কাজ করেছেন নিভৃতেই। পাদপ্রদীপের আলো কখনই খুব একটা পড়েনি তাঁদের ওপর। তবে পুরুষদের তুলনায় কল্পনার উদ্ভট ঘোড়া ছুটিয়ে সত্যটাকে আরো প্রকট করে তুলতে নারীরাও যে কম যান না, তার প্রমাণ মিলছে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের এক প্রদর্শনীতে। নাম ‘ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড : দ্য সুররিয়ালিস্ট অ্যাডভেঞ্চার্স অফ উইমেন আর্টিস্টস ইন মেক্সিকো অ্যান্ড দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’। শুরু হয়েছে জানুয়ারির ২০১২ সালের ২৯ তারিখ, চলবে মে মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত। যৌথভাবে আয়োজন করেছে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাউন্টি মিউজিয়াম অফ আর্ট এবং মেক্সিকোর মিউজিও দে আর্তে মোদের্নো।
‘গত শতাব্দীর তিরিশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোতে যেসব নারী পরাবাস্তবতার চর্চা করেছেন, তাঁদের কাজই তোলা হয়েছে এখানে। ছবি, ভাস্কর্য, ফটোগ্রাফ, স্কেচ, ড্রয়িং, সিনেমা – স্থান পেয়েছে সবই,’ জানালেন আয়োজকদের একজন ড. ইলিন সুস্যান ফোর্ট।
নারীর মনোজগতের গহিনতম কোণের প্রতিফলন দেখা গেছে প্রদর্শনীর একশত পচাত্তরটি শিল্পকর্মে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় কাজগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই আত্মপ্রতিকৃতি। নিজেদের আঁকার ক্ষেত্রে এসব শিল্পী ছিলেন নিষ্ঠুর রকম সৎ। সৃজনশীল অস্তিত্বের শৈল্পিক প্রকাশের ক্ষেত্রে, এই নারীরা দেদার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন পরাবাস্তববাদের সমস্ত যন্ত্রপাতি নিয়ে। এতে কোনো কোনো শিল্পকর্ম হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী, আবার কোনোটিতে দেখা গেছে ব্যক্তিজীবনের আশ্চর্য আত্মসমীক্ষা।
‘এসব শিল্পকর্ম শুধু কল্পনার চিত্ররূপ নয়। এই নারীদের আছে নিজস্ব একটা জগৎ। নিজেদের ছবি আঁকার ক্ষেত্রে, পুরুষ শিল্পীদের চেয়ে নারীরা একেবারেই স্বতন্ত্র,’ বললেন প্রদর্শনীর আরেক আয়োজক তেরে আর্ক।
আভাঁ-গার্দ আমেরিকান পরিচালক মায়া ডেরেনের ১৯৪৩-এর সিনেমা ‘মেশেস ইন দ্য আফটারনুন’। পুরোপুরি নিরীক্ষাধর্মী এই ছবিটি তিনি শুট করেছিলেন হলিউড হিলসে, সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্বামী এবং চিত্রগ্রাহক আলেকজান্ডার হামিদ। গল্পটি একটি স্বপ্নের ভেতর, যেখানে কুশীলবরা পিছু ধাওয়া করে হুড পরিহিত রহস্যময় এক চরিত্রের।
প্রদর্শনীর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ছবিটির নাম ‘বার্থডে’। মার্কিন শিল্পী ডরোথি ট্যানিং অতিবাস্তব এই আত্মপ্রতিকৃতিটি এঁকেছিলেন ১৯৪২ সালে। রেনেসাঁস যুগের ব্লাউজ পরা উন্মুক্তবক্ষা এক সুন্দরী, যাঁর স্কার্ট বেয়ে উঠেছে ড্রিফটউডের লতাপাতা। তাঁর পেছনে দরকার এক অনিঃশেষ গোলকধাঁধা। পায়ের কাছে বসে আছে পৌরাণিক প্রাণী ব্যসলিস্ক, যার একটুখানি বিষনিঃশ্বাস কেড়ে নিতে পাওে যে কারো প্রাণ। সমান্তরালটা এখানে শিল্পী অনেকটা আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রাণ কেড়ে নিতে এই নারীর নিঃশ্বাস নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল এক ঝলক কাকচক্ষু কটাক্ষ। লুই বুর্জোয়া, ফ্রিদা কালো, লিওনারা ক্যারিংটন, সিলভিয়া ফেইন, লি মিলার, জিয়ান রেইনাল, রেমেদিওস ভারো, রোসা রোল্যান্ড, কে সেইজ, ডরোথি ট্যানিং এবং হেলেন লান্ডবাগেসহ প্রায় ৫০ জন উত্তর আমেরিকান নারী শিল্পীরা পরাবাস্তববাদী শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। আত্মপরিচয়, শরীর, রোমান্স, বিপদ, শিশু – এসবই তাঁদের ছবির মূল উপজীব্য। তবে এর সবই চিত্রিত হয়েছে অবচেতন চিন্তা আর স্বপ্নের মিশেলে। কারণ পরাবাস্তববাদীরা বিশ্বাস করত যে, প্রকৃত সত্য বিরাজ কওে কেবলমাত্রা অবচেতনেই।

Leave a Reply

*