logo

নাটকে রতন থিয়াম

কামালউদ্দিন নীলু

 

এই নিবন্ধে আমি আলোচনা করব রতন থিয়ামের আশিবাগি এশেই নাটকটি সম্পর্কে। এই নাটকটি আমত্মঃসাংস্কৃতিক নাট্য প্রযোজনার প্রেক্ষাপটে হেনরিক ইবসেনের হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেন নাটকটির একটি ট্রান্সক্রিয়েশন। আমি বলব, রতন থিয়ামের প্রযোজনাটি সুসংবদ্ধ আমত্মঃসাংস্কৃতিক নাট্য প্রযোজনার একটি চমৎকার উদাহরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নাটকটিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বেশকিছু দেশীয় ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক উপাদান। ফলে তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী নাট্যশক্তি, আর এ কারণেই বোধগম্যতার বিচারে নাটকটি যে শুধু দেশীয় দর্শকদের সঙ্গেই যোগাযোগ সৃষ্টি করেছে তাই নয়, এটি ভিনদেশি দর্শকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করেছে।

আমি এখানে রতন থিয়ামের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি উপস্থাপন করছি। আমার মনে হয় এটি তাঁর আশিবাগি এশেই নাটকটি বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে-

রতন থিয়াম ভারতের মণিপুর রাজ্যের একটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর অংশভুক্ত। মণিপুর রাজ্যে সবসময়ই দেখা যায় শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি ও তাদের দমন-পীড়ন। এছাড়া সীমান্ত সংঘাত তো রয়েছেই এবং বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী দলও সেখানে দেখা যায়। এ সম্পর্কে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমনটি বলেছেন, ‘সমস্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সেখানে বিদ্রোহ বলেই ধরে নেয়া হয়’, আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সেখানে খুব দুর্বল। উপরন্তু, দারিদ্র্য সেখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। নারীদের পরিস্থিতি সেখানে যথেষ্টই খারাপ এবং তাদের আচার-আচরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক রীতিনীতি। আঞ্জুম কাত্যাল মণিপুরের নারীদের পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন ত্রিমাত্রিকতার প্রতিরূপ হিসেবে : ‘নারী একাধারে মা, বোন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতিত প্রতিনিধি।’ রতন থিয়াম তাঁর নাট্য প্রযোজনাগুলোতে মানুষের যন্ত্রণাকে তুলে ধরেছেন মণিপুরি দৃষ্টিকোণ থেকে এবং তাঁর মতো করে :

…এই প্রযোজনাগুলোর মূল বিষয় হচ্ছে সমস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ধরনের আক্রমণ সৃষ্টি করা। …মণিপুর আসলে কলকাতা, দিলিস্ন বা মুম্বাইয়ের মতো না। ভেতরে ভেতরে এটির রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বাইরে আপনি দেখবেন সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে, সবাই অফিসে যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে আসলে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আর থিয়েটার হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম যেখানে এই সমস্ত ব্যাপার, অন্তরের ভাবনা-চিমত্মা, জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা নিগূঢ় সত্যটি প্রকাশ করা উচিত এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ করা যায়। আমার কাছে মনে হয় আমরা এ কারণেই থিয়েটার করি, অন্তত থিয়েটারে এগুলোই তুলে ধরি।

 

ইবসেনের মতোই রতন থিয়ামের নাট্য প্রযোজনাগুলোও বিদ্যমান সমস্যাগুলোর ব্যাপারেই আলোকপাত করে, যেমন – ব্যক্তিমানুষ ও সামাজিক-ধর্মীয় শৃঙ্খলার মধ্যে টানাপড়েন এবং মানবপ্রকৃতির ভেতরে ভালো ও মন্দের সহাবস্থানকে। তাঁর বেশিরভাগ নাটকের প্রেক্ষাপট হলো যুদ্ধ ও সংগ্রামের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা। কয়েক বছর ধরেই তাঁর নির্দেশিত নাটকগুলোতে ক্রমবর্ধমানভাবে আশাবাদের ব্যাপারটি দেখা যাচ্ছে, আর এই আশাবাদ আবর্তিত হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একটি নতুন সমাজের সৃষ্টি, পুনর্মিলন ও শাস্তি প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে। নির্যাতন, সন্ত্রাস ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে রতন থিয়াম হচ্ছেন এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ।

আধুনিক থিয়েটার শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও ইবসেনের একটি নাটক নির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে রতন থিয়াম তাঁর সারা কর্মজীবনে একটিও পাশ্চাত্য নাটক মঞ্চস্থ করেননি। এ কারণেই আমি জানতে খুব আগ্রহী ছিলাম তিনি কেন ইবসেনের একটি নাটক নির্দেশনা দিতে চাচ্ছেন, তাও আবার তাঁর সর্বশেষ নাটক হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেনের? রতন থিয়ামের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমি যখন আলোচনা করলাম, তখন তিনি বললেন, যে-কোনো নাটকের ক্ষেত্রেই তিনি প্রথমেই চিমত্মা করেন নাটকটি সমসাময়িক জনসমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক কিনা। কারণ তিনি প্রাথমিকভাবে তাঁর স্থানীয় দর্শকদের জন্যই নাট্য প্রযোজনাগুলো নির্মাণ করেন। পরে তিনি আরো বললেন, অধিকাংশ আধুনিক পশ্চিমা নাটকই মণিপুরের সমসাময়িক অবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না, বিশেষ করে মণিপুরের সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা পাশ্চাত্যের যে-কোনো দেশের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। তবে চিরায়ত নাটকগুলো যেহেতু সর্বকালের জন্যই সর্বজনীন, সেজন্য এই নাটকগুলো মণিপুরের অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রূপান্তর করা যায়। হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেন নাটকটি বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এটি একটি নন-রিয়েলিস্টিক নাটক, তাই এটিকে তাঁর নিজস্ব নাট্য অভিব্যক্তিতে রূপান্তর করাটা অনেক সহজ হবে। শুধু তাই নয়, নাটকটির মূল বক্তব্য হলো মুক্তি, যেটি ভীষণভাবে মণিপুরের অবস্থার সঙ্গে মিলে যায়। আর এই বিষয়টিতে রতন থিয়ামের সঙ্গে এরিকা ফিশার-লিশতের একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায় :

আমত্মঃসাংস্কৃতিক নাট্য প্রযোজনার বিষয়টি কিন্তু একটি ভিনদেশি নাটককে সেই দেশের সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে মঞ্চস্থ করা নয়, বরং সেটি হওয়া উচিত নিজ দেশের সংস্কৃতিকে ভিত্তি করেই।

 

রতন থিয়ামের নাট্য প্রযোজনাগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কারণ সেগুলো মঞ্চস্থ হয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী বিষয়কে কেন্দ্র করে। এছাড়া প্রযোজনাগুলো অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং শিল্পীদের অভিনয়ও অত্যন্ত তেজস্বিতাপূর্ণ। তিনি তাঁর নাটকের পা-ুলিপি তৈরি করেন মহাকাব্য, পৌরাণিক কাহিনি ও লোককাহিনি থেকে বা এগুলোর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তারপর এটির সঙ্গে তিনি মিশ্রিত করেন বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি, সেইসঙ্গে মণিপুরের ঐতিহ্যবাহী সংগীত, নৃত্য, মার্শাল আর্ট এবং অন্যান্য আধুনিক, সমসাময়িক নাট্য উপাদান ও যান্ত্রিক কলাকৌশল। সব মিলিয়ে রতন থিয়ামের নাট্য প্রযোজনাগুলোকে বলা যায় মনো-শারীরিক। আর এই ব্যাপারটিকেই তিনি অবলম্বন করেছেন ইবসেনের নাটকে প্রবেশ করার সময়ে।

আমার দৃষ্টিতে রতন থিয়ামের আশিবাগি এশেই নাট্য প্রযোজনাটি হলো থিয়েটারের মধ্যে সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার জটিল কাঠামো। এর অর্থ হলো, নতুন শৈল্পিক অভিব্যক্তিগুলো সৃষ্টি হয়েছে একটি সংস্কৃতির বিষয়বস্ত্ত (ভাবনা, লিখিত পাঠ) পুরো কাঠামোসহ (নাট্য অভিব্যক্তি) অন্য একটি সংস্কৃতির উপাদান ও কৌশলগুলোর সঙ্গে মিশ্রিত করার মাধ্যমে। জটিল সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার সবচেয়ে সাধারণ ও সফল উপায়গুলোকে ভাগ করা যায় চারটি প্রধান শ্রেণিতে :

১.   একটি পশ্চিমা নাটক (আধুনিক বা চিরায়ত) কিংবা মহাকাব্য মিশ্রিত হতে পারে একটি অ-পশ্চিমা দেশের একটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্যগত নাট্যকাঠামোর সঙ্গে।

২.   একটি পশ্চিমা নাটক মিশ্রিত হতে পারে এক বা একাধিক অ-পশ্চিমা ঐতিহ্যগত নাট্যকাঠামোর সঙ্গে বা অন্য কোনো ঐতিহ্যগত শিল্পকাঠামো, যেমন – সংগীত, স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গ সঞ্চালন, নৃত্য ইত্যাদি।

৩.  একটি পশ্চিমা নাটক মিশ্রিত হতে পারে একটি অ-পশ্চিমা শিল্পকলার উপাদান ও কৌশলের সঙ্গে এবং সেইসঙ্গে আধুনিক পশ্চিমা শিল্পকলার উপাদান ও কৌশলের সঙ্গেও।

৪.   একটি অ-পশ্চিমা ঐতিহ্যবাহী নাটক বা মহাকাব্যে ব্যবহার করা যেতে পারে পশ্চিমা সমসাময়িক নাট্যকৌশল ও শৈলী এবং বিভিন্ন উপাদান ও কলাকৌশল।

সব ধরনের জটিল সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া প্রকৃতিগতভাবেই অত্যন্ত নিরীক্ষামূলক হয়। এটি একটু ঝুঁকিপূর্ণও বটে, কারণ বিষয়বস্ত্ত ও নাট্যকাঠামো মিশ্রিত করতে হয় একটি অর্থপূর্ণ উপায়ে। এটির অর্থ হলো, যে-কোনো বিষয়বস্ত্তই যে-কোনো নাট্যকাঠামো, উপাদান বা কলাকৌশলের সঙ্গে মিশ্রিত করা যায় না। তেল ও পানি মেশাতে গেলে যেমনটি হয় আর কি। অর্থপূর্ণ নতুন অভিব্যক্তি যেটি দর্শকদের কাছে বোধগম্য হবে সেটি তৈরি করতে গেলে নাটক ও নাট্যকাঠামো বাছাই করার ব্যাপারটিতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে।

ঝুঁকিটি হলো একটি নতুন শৈল্পিক অভিব্যক্তি সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে দুই সংস্কৃতির মূল অংশগুলোর মধ্যে পার্থক্যটি দূর হয়ে যাবে। প্যাট্রিস পাভিস ‘আমত্মঃসাংস্কৃতিক থিয়েটার’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন এবং যুক্তিসহকারে দেখিয়েছেন যে এই ভাবনাটি,

… সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের অসমসত্ত্বতা এবং সংলাপ, সংগীত, অঙ্গভঙ্গি ও নৃত্যের মধ্যে যে পার্থক্যগুলো আছে সেগুলো বজায় রাখার অসম্ভব প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন রীতি রয়েছে, ফলে থিয়েটারের প্রকাশভঙ্গিটিও ভিন্ন হয়ে যায় তাল, লয়, শারীরিক অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গির অর্থ, কণ্ঠের ব্যবহার, রঙের সাংকেতিক অর্থ ইত্যাদির ভিন্নতার কারণে। হুগো ভোলিস্ন যেমনটি বলেছেন :

ভিনদেশি কিছু চমৎকার নৃত্য খুঁজে পাওয়ার অর্থ কিন্তু এটিই নয় যে এগুলো খুব সহজেই নিজেদের সংস্কৃতিতে আমদানি করা যায়; এগুলোকে নিজেদের সংস্কৃতির আলোকে পুনর্গঠন করতে হবে, আর এজন্য প্রয়োজন একটি অনুপ্রেরণা, একটি স্বপ্নকল্পনা অথবা আরো সঠিকভাবে বলা যায় বেশকিছু পদ্ধতিগত তত্ত্ব।

 

এই একই ব্যাপার প্রযোজ্য একটি লিখিত নাটকের অন্য সংস্কৃতিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও, যেমনটি দেখা যায় রতন থিয়াম নির্দেশিত ইবসেনের হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেন নাটকটির ক্ষেত্রে। এখানে লিখিত সংলাপ হুবহু খুব কমই ব্যবহৃত হয়েছে, বরং দেশ বা অঞ্চলের আলোকে এটিকে পরিবর্তন ও পুনর্গঠন করা হয়েছে। একটি আমত্মঃসাংস্কৃতিক নাট্য প্রযোজনার চূড়ান্ত পরীক্ষাটি হলো দর্শকরা নাটকটি কীভাবে গ্রহণ করছেন রতন থিয়ামের প্রযোজনাটি দেখার পরে, ভারতের প্রসিদ্ধ চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগাল বলেছেন, ‘আমি বিশ্বের যেখানেই গিয়েছি ইবসেনের অসংখ্য নাটক দেখেছি। এবার দিলিস্ন ইবসেন উৎসবেও একটি নাটক দেখলাম, সেটি রতন থিয়ামের। আমার মতে, রতন থিয়ামের এই নাটকটিই আমার দেখা সবচেয়ে সেরা।’

 

 

  সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার জটিল কাঠামো – নতুন শৈল্পিক  

  অভিব্যক্তি সৃষ্টি হয় মিশ্রিত করার মাধ্যমে

বিষয়বস্ত্ত (ভাবনা, টেক্সট) একটি সংস্কৃতি থেকে।

কাঠামো (নাট্য অভিব্যক্তি) কিংবা উপাদান এবং কলাকৌশল অন্য সংস্কৃতির এক বা একাধিক শৈল্পিক কাঠামো থেকে, যেটি মিশ্রিত করা হয় প্রথম সংস্কৃতির উপাদান, কলাকৌশল বা প্রতিচ্ছবির মাধ্যমে।

  যা করতে হবে :

দর্শকদের কাছে নাটকটি বোধগম্য করার জন্য ওপরের বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে।

 

 

আমি যেটি দেখেছি, ভিনদেশি দর্শকরাও রতন থিয়ামের প্রযোজনাটির প্রশংসা করেছেন। এই প্রযোজনাটি দেখে ভারতীয় এবং ভিনদেশি দর্শকদের প্রশংসাকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব, যেটি প্রদর্শিত হয়েছে এমন একটি ভাষায় যে ভাষাটি মণিপুরের বাইরে খুব কম মানুষই বোঝে এবং শুধু কয়েকটি ইংরেজি সাবটাইটেল ছাড়া? কোন ব্যাপারটি রতন থিয়ামের প্রযোজনাটিকে এত শক্তিশালী করেছে?

আশিবাগি এশেই কথাটির অর্থ হলো ‘মৃত্যুর গান’। মূল নাটকে স্মৃতি হচ্ছে একটি বাহন, আর এই বাহনেসওয়ার হয়ে মনস্তাত্ত্বিক ও উদ্ভাবনী মৃত্যুটি প্রকাশ হয়ে পড়ে, এবং টিকে থাকা স্মৃতিই তখন সকল সুখের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। নাটকটি প্রথমবার পড়ার পরে রতন থিয়াম কাব্যের মতো করে কিছু কথা বলেছিলেন : ‘সময় বয়ে যায়, কিন্তু রয়ে যায় স্মৃতি, ওটা নিঃশব্দে যন্ত্রণা দেয়, বেঁচে থাকার দিনগুলোতে।’১০

রতন থিয়ামকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল নাটকটি আসলে কী নিয়ে, তিনি তখন বলেছিলেন : ‘…এটি জীবন, মৃত্যু এবং মানুষের জীবনের সীমাহীন আকাঙক্ষা নিয়ে।’১১

এই কথাগুলো আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে জীবন সম্পর্কে বৌদ্ধ দর্শনটিকে, জীবন হলো ক্ষুধার্ত। আমি থিয়ামের প্রযোজনায় এই ক্ষুধার রূপটিকে দেখেছি মুক্তি এবং সুখপ্রাপ্তির আকাঙক্ষার মধ্যে। পুরো প্রযোজনায় মুক্তির ক্ষুধাটি প্রকটভাবে উচ্চারিত হয়েছে এবং এটি প্রতিফলিত হয়েছে সংলাপের মধ্যে, সেইসঙ্গে নাট্যদৃশ্য ও রূপকের মধ্যেও। ব্যক্তিমানুষের মুক্তির ক্ষুধার ওপরে জোর দেওয়ার ব্যাপারটি বোঝা যায় নাটকটির দেশীয়করণের ওপরে, বিশেষভাবে এমন একটি সমাজে সেটি মঞ্চস্থ হচ্ছে যেখানে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেই রয়েছে মুক্তির প্রচ- অভাব। থিয়াম ব্যাপারটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করছেন :

মায়া তার স্বাধীনতা অর্জন করেছে রুবেকের কাছ থেকে এবং সে অন্য আরেকজনের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেছে। এটিও আসলে এক ধরনের মুক্তি। আরেকটি মুক্তি হলো আত্মার। আত্মাটিও এখন মুক্ত।১২

 

রতন থিয়ামের আশিবাগি এশেই (মৃত্যুর গান)-এর বিষয়বস্ত্ত

স্মৃতি

স্মৃতির টিকে থাকা

মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চক্র

 

মুক্তি

l   সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা

l   আত্মার স্বাধীনতা

 

 

নাটকটির একেবারে শুরুতে দর্শক কিছু মঞ্চসামগ্রী দেখতে পায়, যেগুলো অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বুঝিয়ে দেয় যে নাটকটির মূল বিষয় হলো মুক্তি এবং মানব-মানবীর সম্পর্কই হলো এর কেন্দ্রবিন্দু। নাটকটি শুরু হয় একটি বাস্তবানুগ পরিবেশে রুবেকের স্টুডিওতে, সেখানে সে মণিপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রেমময় গান শুনছে, আপাতদৃষ্টিতে সে আসলে স্মৃতিবেদনাতুর অবস্থায় আছে। মঞ্চের অপর পাশে একটি পাটিতে বসে আছে মায়া এবং সে পুতুল বানাচ্ছে। যে পুতুলগুলো সে বানাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে একটি পুরুষ এবং একটি নারী, পুতুলগুলোর গায়ে সে পরিয়ে দিয়েছে বিয়ের পোশাক। তার পাশে তিনটি পুতুল সম্পূর্ণ তৈরি করা অবস্থায় আছে, পুতুলগুলোর মধ্যে একটি পুরুষ এবং দুটো নারী। আমি বুঝতে পেরেছি, যে পুতুলদুটো তৈরি করা হচ্ছে সেগুলো দিয়ে বোঝানো হয়েছে নারী-পুরুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কটিকে এবং বাকি যে তিনটি পুতুল আছে সেগুলো উপস্থাপন করছে রুবেক, মায়া এবং আইরিনের মধ্যকার ত্রিভুজ সম্পর্কটিকে। তবে একটি আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, মঞ্চের পেছনের অংশে কয়েকটি বিকলাঙ্গ মানুষের প্রতিমূর্তির সঙ্গে একটি বড় পাখির প্রতিমূর্তি আছে। আমি বুঝতে পেরেছি, পাখিটি আসলে তৃতীয় অঙ্কে মায়ার দেওয়া একটি সংলাপের প্রতিচ্ছবি, ‘একটি পোষ মানানো শিকারি পাখি আমার দিকে নজর রাখছে’, এটি মায়ার মানসিক অবস্থাকেই নির্দেশ করে।

থিয়াম নিজেই বলেছেন, এই প্রযোজনাটি তৈরি করার সময়ে তিনি আ ডলস হাউস থেকে প্রেরণা লাভ করেছেন :

মায়ার ভেতরে নোরার একটি সম্ভাবনা দেখতে পাওয়া যায়, তবে এটি যে শুধু তার একের পর এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তা কিন্তু নয়, বরং সে খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারছে। আসল ব্যাপারটি হলো গান, নোরার গান, সে যে চলে যাচ্ছে নোরার এই ঘোষণাটির চেয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ।১৩

 

রূপান্তরিত নাটকটিতে যে প্রধান পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে

 

গঠন

অঙ্ক থেকে ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে।

বাড়ির বাইরের দৃশ্যের চেয়ে ভেতরের দৃশ্যকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

অগ্রগতি : স্টুডিও-জলপথ-আধ্যাত্মিক স্থান।

নাটক

প্রথম অঙ্ক বাদ দেওয়া হয়েছে।

সংলাপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপিত হয়েছে দৃশ্য তৈরির মাধ্যমে।

চরিত্র

শুধু চারটি চরিত্র : রুবেক, মায়া, আইরিন, উলফহাইম।

নামগুলো পরিবর্তিত হয়েছে মণিপুরি ভাষায়, যেগুলোর অর্থ – ভাস্কর, সুন্দরী রমণী, প্রতিচ্ছবি, আগন্তুক।

রুবেকের ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। একই ব্যাপার ঘটেছে উলফহাইমের বন্যতার ক্ষেত্রেও।

কাল

সুনির্দিষ্ট কিছু নেই।

সমাপ্তি

বদলে দেওয়া হয়েছে মৃত্যু থেকে বেঁচে ওঠার মাধ্যমে (মৃত্যুর পরে পুনর্জন্ম)।

 

 

দেশীয় বিষয়গুলোর আলোকে নাটকটি রূপান্তর করতে গিয়ে থিয়াম আরো কিছু পরিবর্তন এনেছেন :

প্রথমত, পারফরম্যান্স টেক্সটের গঠনটি মূল নাটকের তুলনায় ভিন্ন। আমরা জানি, মূল নাটকে আছে তিনটি অঙ্ক, যেগুলো ক্রমান্বয়ে সমতল থেকে উচ্চে এবং সাগরের তীর থেকে ঘরের ভেতরে চলে গেছে : প্রথম অঙ্কটি হোটেলের বাইরে সমুদ্রের কাছাকাছি একটি ঝরনাতে ঘটছে, দ্বিতীয় অঙ্কটি ঘটছে একটি মালভূমিতে এবং তৃতীয় অঙ্কটি পাহাড়ের ওপরে। নাটকের এই গঠনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বেশ কয়েকটি উপায়ে : অঙ্ক প্রতিস্থাপিত হয়েছে ইউনিট দিয়ে, যেমনটি দেখা যায় ভারতের উপাখ্যানভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী থিয়েটারে। থিয়ামের প্রযোজনাটি শুরু হয় মূল নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক থেকে এবং এই অঙ্কের গল্পটিই প্রযোজনাটির মূল গল্পে পরিণত হয়। সব শেষে, নাটকের স্থানটি ভিন্ন, কারণ থিয়াম তাঁর প্রযোজনার বেশিরভাগ অংশই রেখেছেন ঘরের মধ্যে, বিশেষ করে রুবেকের স্টুডিওতে। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন :

আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি, এটি হচ্ছে কাজ করার একটি জায়গা, বাড়ি না। কারণ কাজ করার একটি জায়গা ছাড়া কোনো ভাস্করই কাজ করতে পারে না। এটি খুবই সাধারণ ব্যাপার – একটি কাজ করার জায়গাতেই সবকিছু ঘটতে পারে, এখানেই স্মৃতিরা ফিরে আসে। আর স্মৃতি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল – বিশেষভাবে রুবেকের স্মৃতি।১৪

 

যাহোক, কাঠামোগতভাবে নাটকটির এত কিছু পরিবর্তনের পরেও ঘটনার স্থান অনুযায়ী থিয়াম তিন ধাপ অগ্রগতির ধারণাটি ব্যবহার করেছেন, বিশেষ করে স্থানটি যখন স্টুডিও থেকে পরিবর্তিত হয়ে একটি জলপথের আধ্যাত্মিক স্থানে পরিণত হয়। এখানে এটি উল্লে করা জরুরি, ভারতীয় ধ্যান-ধারণা অনুসারে আধ্যাত্মিক স্থানটি অসীম এবং বাস্তবতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, অর্থাৎ সবচেয়ে ঊর্ধ্ব স্থানে। এভাবে থিয়াম তাঁর নাটকে স্মৃতির অসিত্মত্বকে যুক্ত করেছেন হিন্দু ও বৌদ্ধ মতবাদ অনুসারে মৃত্যু ও পুনর্জন্ম চক্রটির সঙ্গে। একই সঙ্গে এই প্রযোজনাতে দেখা যায় বাস্তব জগৎ থেকে পরাবাস্তব জগতের দিকে একটি যাত্রা।

দ্বিতীয়ত, একটি নাটকের রূপান্তর বা ট্রান্সক্রিয়েশনের ক্ষেত্রে চরিত্রগুলোকেও পরিবর্তন করতে হয়। থিয়ামের প্রযোজনাতে শুধু রুবেক, মায়া, আইরিন ও উলফহাইম চরিত্রগুলোই আছে, বাকি অপ্রধান চরিত্রগুলোকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই প্রযোজনায় জোর দেওয়া হয়েছে রুবেক ও আইরিন এবং রুবেক ও মায়ার সম্পর্কটিকে। উলফহাইমকে অপ্রধান চরিত্রে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং তার চরিত্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্য ফেলে দেওয়া হয়েছে, শুধু তার মুক্তির আকাঙক্ষা ছাড়া। থিয়াম বলেছেন, স্থানীয় বিষয়বস্ত্তর সঙ্গে মেলানোর জন্য এই পরিবর্তনগুলো অনিবার্য ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি চাচ্ছিলেন ইবসেনের নাটকটির মূল বিষয়বস্ত্তও যেন টিকে থাকে :

আমি মূল বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্ক ছিলাম। ইবসেন এক ধরনের মৌলিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, যেটি আমি লিখেছি ঠিক সেরকমই। পুরো এক পৃষ্ঠা সংলাপ না লিখে, আমি চেষ্টা করেছি ইবসেনের মাত্র একটি বাক্য ব্যবহার করেই সেটি বোঝাতে। আপনি যদি এটি উপলব্ধি করতে না পারেন, তাহলে নাটকটি বুঝতে পারবেন না।১৫

 

আমরা সবাই জানি, ইবসেন এই নাটকের চরিত্রগুলোর নাম খুব সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করেছিলেন, যাতে সেগুলোর একটি অর্থ থাকে। ফলে এই একই কারণে, আমত্মঃসাংস্কৃতিক নাট্য প্রযোজনার ক্ষেত্রে চরিত্রগুলোর স্থানীয় নাম নির্বাচন যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। থিয়ামের প্রযোজনাতে যে চারটি চরিত্র আছে তাদের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। থিয়াম বলেছেন, তিনি নামগুলো নির্বাচন করেছেন চরিত্রগুলো সম্পর্কে যেটি অনুভব করছেন ঠিক সেই অনুসারে, আর স্থানীয় দর্শকরা যাতে নামগুলো সহজভাবে গ্রহণ করে সেটির দিকেও তাঁর নজর ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে এই পরিবর্তনগুলোর কারণে চরিত্রগুলো সর্বজনীন হয়েছে।

থিয়ামের প্রযোজনাতে, অধ্যাপক রুবেককে তার উচ্চ সামাজিক শ্রেণি, বুদ্ধিজীবীসুলভ অবস্থান এবং আধুনিকতা থেকে একটু সরিয়ে আনা হয়েছে। কারণ, মণিপুরের আবহে মূল নাটকের এই চরিত্রটির মতো কোনো প্রতিরূপ নেই। এখানে রুবেক হয়ে পড়েছেন ‘শাকতাম লাকপা’, এর অর্থ যিনি কল্পনাপ্রবণ বা যিনি ভাস্কর্য তৈরি করতে পারেন, অর্থাৎ, ‘ভাস্কর’। তাকে চিত্রিত করা হয়েছে একটি বিধ্বস্ত, বন্য চরিত্র হিসেবে এবং তার যন্ত্রণাটি সামনে টেনে আনা হয়েছে। ফলে এভাবেই রুবেকের চরিত্রটিকে এমন একটি চরিত্রে বদলে ফেলা হয়েছে, যার মধ্যে উলফহাইমের বন্যতাও আছে। এ ব্যাপারে আমার দুটো ব্যাখ্যা আছে : একটি হলো, ভারতীয় পুরাণে চরিত্র রূপান্তরের যে বিষয়টি আছে সেটি থেকে থিয়াম অনুপ্রেরণা নিয়েছেন, কারণ সেখানে দেব-দেবীরা সৃষ্টিশীল ও ধ্বংসাত্মক এই উভয় রূপেই আবির্ভূত হন। আমি বলব এ ব্যাপারটি মূল নাটকেও আছে। সেখানে দেখা যায়, পাথরে প্রাণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রুবেকের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সম্পর্কে উলফহাইম কিছু কথা বলছে। তার কথাগুলোর অর্থই হলো, রুবেক নিজেই তো জীবন থেকে মৃত্যুর রূপান্তরে আবৃত হয়ে আছে। আমার আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, ভারতীয় আবহে মায়া এবং উলফহাইমের সম্পর্কটির মধ্যে মুক্তির যে ব্যাপারটিকে থিয়াম জোর দিতে চেয়েছেন, সেটির জন্যই উলফহাইমের চরিত্রে একটি ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল বৈশিষ্ট্য যোগ করার প্রয়োজন হয়েছে।

মূল নাটকে ‘গডসায়ার উলফহাইম’ একটি মিশ্র চরিত্র – ‘গডসায়ার’ অর্থ হলো, ‘যার একটি বড়সড় জমি আছে’ এবং ‘উলফহাইম’ অর্থ হলো ‘যেখানে বুনো পশু লালন পালন করা হয়’, অর্থাৎ সোজা কথায় ‘ভলস্নুকের বাড়ি’। যাহোক, ইংরেজি অনুবাদে চরিত্রটিকে শুধু ‘উলফহাইম’ বলা হয় এবং তার শিকারিসত্তাটিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর এই ব্যাপারটিই সমস্যা হয়ে দেখা দেয় যখন মূল নাটকটিকে অন্য কোনো সংস্কৃতিতে রূপান্তর করা হয়, যেমনটি থিয়াম হোয়েন উই ডেড অ্যাওয়েকেনের ইংরেজি অনুবাদ থেকে প্রস্থান নিতে গিয়ে বলেছেন :

আমাদের মণিপুরে পেশাদার শিকারির ব্যাপারটি আসলে নেই। তবে একজন আগন্তুক হিসেবে সে আসতেই পারে। কিছু উপজাতীয় জিনিসপত্র ব্যবহার করে তাকে খুব সহজেই শিকারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা সম্ভব।১৬

 

‘মায়া’ নামটি হয়তো ভিন্ন কোনো উৎস এবং ভাষা থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে আমার ধারণা, ইবসেন হয়তো ‘মেই’ শব্দটি থেকে এটি নিয়েছেন, যেটির নরওয়েজীয় অর্থ হলো ‘মে’ মাস। এই মাসটি বসন্ত ঋতুকে ধারণ করে। এই ঋতুটি হলো প্রকৃতির বার্ষিক চক্রের এমন একটি সময়, যখন নতুন জীবনের সৃষ্টি হয়। থিয়ামের প্রযোজনাটিতে ‘মায়া’ নামটি পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শাখেনবি’, অর্থাৎ, ‘সুন্দরী রমণী’।

থিয়ামের প্রযোজনাতে আইরিন নামটি পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শাকতাম’, যেটির অর্থ হলো ‘প্রতিচ্ছবি’, আর তাকে পুরো প্রযোজনাটিতেই বারবার দেখা যায়। এর কারণটি হলো সে শাকতাম লাকপার (রুবেক) স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসে।

চতুর্থত, ইবসেনের মূল নাটকে সংলাপ, স্থান ও নাট্যক্রিয়ার মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরো ঘটনাটি ঘটছে গ্রীষ্মকালে। কিন্তু থিয়াম কোনো সুনির্দিষ্ট কাল অনুসরণ করেননি।

পঞ্চমত, থিয়াম তাঁর প্রযোজনাটিতে সমাপ্তি বদলে দিয়েছেন। ইবসেনের মূল নাটকে রুবেক ও আইরিন তুষারের নিচে চাপা পড়ে, এটি অমত্মঃস্থ মৃত্যুর একটি রূপক। ফলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, কীভাবে এই রূপকটি স্থানীয় সংস্কৃতি এবং একটি স্বাভাবিক পরিবেশে অর্থপূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব?

এই প্রযোজনাটি দেখে আমার মনে হয়েছে, থিয়াম এ দৃশ্যটি প্রতিস্থাপন করেননি, যেটি মূল নাটকের মতো একই অর্থ বহন করবে। ইবসেন তাঁর নাটকটি সমাপ্ত করেছেন মৃত্যুর মাধ্যমে, থিয়াম তাঁর প্রযোজনাটি সমাপ্ত করেছেন জীবনের মাধ্যমে, অর্থাৎ, মৃত্যুর পরে পুনর্জন্ম।

তুষারে চাপা পড়ে রুবেক ও আইরিনের মৃত্যুর প্রতিস্থাপন সম্পর্কে থিয়াম যেটি বলেছেন : ‘মৃত্যুর ধারণাটিই এখানে বড় কথা, মৃত্যু কীভাবে ঘটছে সেটি কোনো ব্যাপার নয়।’ তাঁর প্রযোজনাটির শেষ ইউনিটে তিনি মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চক্রটিকে যুক্ত করেছেন রুবেক ও আইরিনকে একটি মেটাফিজিক্যাল স্থানে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে, আরো পরিষ্কারভাবে যদি বলি – একটি আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে। এটি আমরা বুঝতে পারি এই দৃশ্যটিতে সাদা রঙের ব্যবহার দেখে। ভারতীয় উপমহাদেশে সাদা রং হলো মৃত্যুর প্রতীক, তবে এটি শুদ্ধতারও প্রতীক, অর্থাৎ, পুনর্জন্ম। এ ব্যাপারটি বুঝতে পারা যায় বেশ কয়েকটি নারী প্রতিমূর্তির মাধ্যমে। তাদের দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিল তারা বোধহয় ভাস্কর্য, তারা মৃত। কিন্তু পরে রুবেক যখন বলে, ‘ওখানে আমরা আমাদের বিয়ের উৎসব করব’ এবং আইরিন উত্তর দেয়, ‘সূর্যের নজর কিন্তু আমরা এড়াতে পারব না’, তখন প্রতিমূর্তিগুলো মৃত থেকে জীবিত হয়ে ওঠে এবং তারা নাচতে থাকে ও গাইতে থাকে – ‘আমি মুক্ত! আমি মুক্ত! আমি মুক্ত! আমি এখন আর বন্দি নই। আমি মুক্ত! আমি পাখির মতো উড়ে বেড়াব! আমি এখন মুক্ত!’

সুস্পষ্টভাবে, প্রতিমূর্তিগুলোর ধারণাটি নেওয়া হয়েছে মণিপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘রাস নৃত্য’ থেকে, কিন্তু থিয়াম এই নাচটি ভেঙেছেন এবং শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা ও এটির সঙ্গে মৃত্যু ও পুনর্জন্মের যোগাযোগ ঘটানোর জন্য যে সমস্ত উপাদান প্রয়োজন সেগুলো ব্যবহার করেছেন। এছাড়া তিনি রাস নৃত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বৃত্তাকারে নৃত্য করার ব্যাপারটি রেখেছেন ঠিকই কিন্তু অন্য আরো কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বাদ দিয়েছেন, বিশেষ করে দলগত নৃত্যের ব্যাপারটি। তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন :

…প্রত্যেকেই তার মতো করেই নাচছে। ঐতিহ্যবাহী রাস নৃত্য হচ্ছে একটি দলগত নৃত্য। প্রতিটি নৃত্যশিল্পীরই থাকে একই ভঙ্গি, একই বিন্যাস, একই বিষয় তারা প্রকাশ করে। কিন্তু এখানে আমরা কাজ করছি প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে এবং প্রত্যেকেই নাচছে ভিন্নতাসহকারে এবং ভিন্ন অঙ্গভঙ্গি নিয়ে।…আমরা জানি মৃত্যু মানেই হচ্ছে চূড়ান্ত একটি ব্যাপার, এবং আমরা সবাই পুনরুত্থান এবং পুনর্জন্ম এই ব্যাপারটির সঙ্গে পরিচিত।১৭

 

প্রযোজনাটি প্রসেনিয়ামের জন্য বানানো হলেও এটির প্রকৃতি আসলে দেশীয় ঐতিহ্যগত নাট্যের মতোই। থিয়াম বলেছেন :

আমি আমার প্রযোজনাগুলোতে সবসময়ই একটি পদ্ধতি অনুসরণ করি, আর সেটি হলো ‘আঁকা এবং মুছে ফেলা’। একটি নাটকের প্রত্যেকটি ইউনিটেই আমি কিছু একটা আঁকার চেষ্টা করি প্রপস দিয়ে, কস্টিউম দিয়ে এবং রং দিয়ে, তারপর সেটি মুছে ফেলি। এরপরে আমি আবারো একটি ইউনিট ধরি এবং একই কাজ করি।…প্রত্যেকটি ইউনিটই নাটকে কিছু না কিছু যোগ করে এবং নাটকের মূল বিষয়বস্ত্তর সঙ্গে সেগুলোর একটি সংযোগ ঘটে যায়। ফলে তৈরি হওয়া ছবিগুলো একটির ওপরে একটি স্থাপিত হয় এবং অত্যন্ত পুরু হয়ে ওঠে।১৮

 

থিয়ামের ‘আঁকা এবং মুছে ফেলা’ রীতি

l   প্রতিটি ইউনিটে ‘আঁকা এবং মুছে ফেলা’ : প্রপস, কস্টিউম ও রং দিয়ে আঁকা এবং পরে মুছে ফেলা।

l   প্রতিটি ইউনিটই নাটকে কিছু না কিছু যোগ করে এবং তৈরি হওয়া ছবিটি পুরু হয়ে ওঠে।

l   ভারতীয় ঐতিহ্যগত থিয়েটারের উপাখ্যানগুলোর সঙ্গে প্রধান পার্থক্য : ঐতিহ্যগত থিয়েটারের  বহুমুখী প্রপসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিটি   ইউনিটের সুনির্দিষ্ট প্রপস।

 

 

আমার দৃষ্টিতে, এই রীতিটি আসলে গ্রহণ করা হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যগত নাট্যকাঠামো থেকে। একটি ঐতিহ্যগত নাটক গঠিত হয় উপাখ্যানের সমন্বয়ে, আর প্রতিটি উপাখ্যানই পুরো পারফরম্যান্সের সম্পূর্ণ গ–র মধ্যে অবস্থান করেই আমাদের একেকটি সম্পূর্ণ গল্প উপহার দেয়। যাহোক, থিয়ামের পদ্ধতিটি ঐতিহ্যগত নাট্যকাঠামো থেকে দুটো উপায়ে ভিন্ন :

প্রথমত, স্বসীমাবদ্ধ আখ্যানগুলো প্রতিস্থাপিত হয়েছে থিয়ামের ‘ইউনিট’-এর মাধ্যমে, যেটি একটি গল্প সম্পূর্ণভাবে বলতে পারে না। গল্প শেষ করার জন্য এক বা একাধিক ইউনিটের প্রয়োজন হয়। এটির একটি চমৎকার উদাহরণ হলো, রুবেক ও আইরিনের একটি কথোপকথন তিনি একটি ইউনিট (অঙ্কিত চিত্র) থেকে টেনে নিয়ে আরেকটি ইউনিটে ফেলেছেন। রুবেক ও আইরিন যে ইউনিটে কথা বলছে সেটি ঘটছে একটি নৌকার ভেতরে। তাদের কথাগুলো ঠিক এমন :

রুবেক :  আমাদের জীবন! ওহ! জীবনটা আমরা নষ্ট করে ফেলেছি।

আইরিন :  আমরা যা হারিয়ে ফেলি, তা আমরা তখনই খুঁজে পাই, যখন…

রুবেক :  যখন?

আইরিন    :        যখন আমরা মৃত্যু থেকে বেঁচে উঠি। আমরা তখন বুঝতে পারি আমরা আসলে কখনো বেঁচে ছিলাম না।

 

এই সংলাপটি চলতে চলতেই পরের ইউনিট এসে যায়, যেটি একটি আধ্যাত্মিক স্থান এবং আইরিন তার সংলাপের বাকি অংশটি বলে : ‘আমি হঠাৎ করেই বুঝতে পারলাম তুমি আসলে মরে গেছ। বহু বছর ধরেই তুমি মৃত।’১৯

দ্বিতীয়ত, থিয়ামের রংতুলির টানটি ঐতিহ্যগত নাটকের তুলনায় অনেক বেশি পুরু ও শক্তিশালী, কারণ নাট্যদৃশ্যগুলো অনেক বেশি স্পষ্ট এবং খুব দ্রম্নতই বদলে যায়। দেশীয় ঐতিহ্যগত নাটকে দেখা যায় নাট্যদৃশ্যগুলো এক জায়গাতেই ঘটছে এবং কয়েকটি বহুমুখী প্রপসের সাহায্যেই সেটি চিত্রায়িত হচ্ছে আর প্রপসগুলো সারা পারফরম্যান্সে মঞ্চেই থেকে যাচ্ছে। থিয়ামও কয়েকটি কাপড় এবং অন্যান্য প্রপস ব্যবহার করেছেন, তবে সেগুলো মঞ্চে প্রবেশ করেছে সুনির্দিষ্ট ইউনিটের সময়গুলোতে। আর এভাবেই তিনি দেশীয় ঐতিহ্যগত ভাবনাকে ভেঙে ফেলেছেন এবং আধুনিক থিয়েটারের কলাকৌশল ব্যবহার করেছেন।

এই আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহার করার ব্যাপারটি চারটি দৃশ্যে খুব ভালোভাবে বোঝা গেছে, যেটি প্রতিস্থাপন করেছে বা কখনো কখনো শক্তি জুগিয়েছে – মূল নাটকের সংলাপগুলোকে :

১.         আইরিনকে ঘিরে রুবেকের স্মৃতিগুলোর দৃশ্যায়ন করা হয়েছে কয়েকটি বুদবুদের মাধ্যমে, আর এটি ঘটে যখন আইরিন প্রথম মঞ্চে প্রবেশ করে এবং বুদবুদগুলোও মঞ্চের এক পাশ থেকে আরেক পাশে চলে যায়। আইরিন প্রবেশ করে ঢেউয়ের মতো নড়তে থাকা একটি কাপড়ের ভেতর থেকে।

২.         রুবেক আইরিনের ভাস্কর্যটিকে নতুন করে গড়েছে, এই ব্যাপারটি মূল নাটকের যে দৃশ্যটিতে রুবেক আইরিনকে বলছে, সেই দৃশ্যটি থিয়ামের প্রযোজনাতে দেখানো হয়েছে একটি শক্তিশালী কম্পোজিশনের মাধ্যমে, সেখানে প্রতিচ্ছবির মতো আইরিনকে রাখা হয়েছিল বিকলাঙ্গ ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে।

৩.        দ্বিতীয় অঙ্কের যে দৃশ্যে রুবেক ও আইরিন একটি ঝরনার পাশে বসে আছে এবং টুনিটজ হ্রদে তাদের ঘুরে বেড়ানোর গল্পটি করছে, সেই দৃশ্যটি থিয়ামের প্রযোজনায় একটি ছোট নৌকায় করে ভ্রমণের দৃশ্যে প্রতিস্থাপিত হয়েছে এবং মূল সংলাপের অংশগুলো শক্তিশালী নাট্যদৃশ্যের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি হলো, লোহেনগ্রিনের নৌকাটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে নৌকার সামনের দিকে লাগানো একটি রাজহাঁসের প্রতিকৃতির মাধ্যমে। এটা জেনে রাখা খুব প্রয়োজন যে লোহেনগ্রিনের পুরাণে আছে – একজন বীর অতিমানবীয় ক্ষমতা অর্জন করে এবং তার আচরণ ও নৈতিকতার জন্য সে মাপ দেওয়ার একটি লাঠিতে পরিণত হয়। ভারতেও এই একই ব্যাপার দেখা যায় কর্ণের কাহিনিতে এবং কৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে যে কথোপকথনটি ভগবদ্গীতায় লিপিবদ্ধ আছে সেটির মধ্যেও এই ব্যাপারটি দেখা যায়। এছাড়া হিন্দু পুরাণে রাজহাঁস একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। থিয়ামের প্রযোজনায় রাজহংস নৌকা, যেটি ইবসেনের নাটকের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত, সেটি একটি প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাতে স্থানীয় দর্শক তাদের নিজেদের পুরাণের সঙ্গে সেটি মেলাতে পারে। এভাবেই থিয়াম মানব অসিত্মত্বের সঙ্গে মহাবিশ্বের আধ্যাত্মিক ভাবনাগুলোর সংযোগ ঘটিয়েছেন।

নৌকার দৃশ্যে শক্তিশালী নাট্যদৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে মুক্তির ব্যাপারটি বোঝানোর জন্য, আর এটি করা হয়েছে উড়ন্ত মাছের মাধ্যমে। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি শাগালের চিত্রকর্ম ‘দ্য ফ্লাইং ফিশ’ (১৯৪৮)-এর মাধ্যমে অনুপ্রাণিত, একই সঙ্গে এটি উড়ন্ত পাখির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই প্রতীকগুলো দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে লোকজ সংস্কৃতির একটি কৌশল, প্রতিটি মাছ বা পাখিকে বাঁধা হয়েছে একটি লাঠির মাথায় এবং মঞ্চকর্মীরা এগুলো নিয়ে মঞ্চের পেছনের অংশ দিয়ে একপাশ থেকে আরেক পাশে গিয়েছেন। এভাবেই তিনি ভিনদেশি উপকরণ ব্যবহার করেছেন এমনভাবে, যেটির সঙ্গে স্থানীয় দর্শকরা আগে থেকেই পরিচিত। উড়ন্ত মাছগুলো একটি পরাবাস্তব পরিবেশেরও সৃষ্টি করেছে এবং প্রযোজনার শেষদিকে যে আধ্যাত্মিক স্থানটি তৈরি হয়, সেটির জন্য দর্শকদের প্রস্ত্তত করারও এটি একটি উপায় হতে পারে।

৪.         আইরিনের একটি সংলাপ এরকম, ‘তুমি আমার হাতদুটো টেনে নিলে, তারপর উষ্ণতার সঙ্গে হাতদুটোতে চাপ দিলে। আমি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম নিঃশ্বাস বন্ধ করে, আর অপেক্ষা করছিলাম। তারপর তুমি বললে, আমি তোমার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, শাকতাম।’ এই ‘তুমি বললে’ সংলাপটির একটি অংশ ছিল এরকম, ‘এটা ছিল আমার জীবনের একটা অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়’, এই অংশটি থিয়াম তাঁর প্রযোজনায় দেখিয়েছেন সালভাদর দালির চিত্রকর্ম ‘পারসিসটেন্স অব মেমোরি’ (১৯৩১) অনুপ্রাণিত একটি নাট্যদৃশ্যের মাধ্যমে।

 

দৃশ্যটিতে ছিল একটি গলন্ত ঘড়ি ঝুলছে একটি নিষ্ফলা ও বিকলাঙ্গ গাছ থেকে এবং আইরিন অসাড় হয়ে শুয়ে আছে ও পেছনদিকে মাথাটি ঝুলিয়ে রেখেছে, যেটি অনেকটা সালভাদর দালির গলন্ত ঘড়িরই অনুরূপ। এটি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে আইরিন ‘অধ্যায়’ শব্দটি শোনার পরে অসাড় হয়ে গেছে এবং এ ব্যাপারটি তার স্মৃতিতে এত দৃঢ়তাসহকারে টিকে আছে যে এটি তাকে মানসিকভাবে মেরে ফেলেছে।

পরের অংশগুলোর ক্ষেত্রে, থিয়াম এভাবেই পাশ্চাত্য থেকে বিভিন্ন প্রতিচ্ছবি গ্রহণ করেছেন এবং সেগুলোকে যুক্ত করেছেন স্থানীয় উপকরণ ও প্রতীকের সঙ্গে। যেসব প্রতিচ্ছবি ও উপাদান নাটকটির মূল বিষয়বস্ত্তর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে, সেগুলো আমার দৃষ্টিতে দেশি এবং ভিনদেশি দর্শকরাও মেনে নিয়েছেন যে নাটকটির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে। এটির আরেকটি অর্থ হলো স্থানীয় দর্শকরা আমদানি করা উপাদানগুলোকে কখনো ভাবেনি সেগুলো ‘ভিনদেশি’। সুস্পষ্টভাবেই থিয়ামের নাট্য উপাদানগুলো দর্শকরা খুব সহজেই বুঝতে পেরেছে, এমনকি তারা যদি দালি বা শাগালের চিত্রকর্ম না-ও দেখে থাকে, তাহলেও বুঝতে পেরেছে।

থিয়ামের প্রযোজনাটি এভাবেই উৎস এবং লক্ষ্য-সংস্কৃতির মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে, যেটি মার্ভিন কার্লসন ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

ভিনদেশি উপাদানগুলো দেশীয় ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির মধ্যে সম্পৃক্ত হয়ে যায় এবং এটির মধ্যে শোষিত হয়ে যায়। দর্শকরা এসব উপাদানের মাধ্যমে আকর্ষিত, বিনোদিত এবং উদ্দীপ্ত হতে পারে, তবে তারা কখনো এগুলোর মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয় না। এমনকি তারা বুঝতেই পারে না এগুলো ভিনদেশি।২০

শেষে বলব, রতন থিয়ামের নাট্য প্রযোজনা আশিবাগি এশেই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও সৃজনশীল দেশীয় নাট্যনির্দেশক কেমন করে একটি শক্তিশালী ও বিশুদ্ধ আমত্মঃসাংস্কৃতিক নাট্য প্রযোজনা নির্মাণ করতে পারেন। আমরা সবাই জানি, এ ধরনের সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার বিষয়টি শুধু পশ্চিমা নাট্যনির্দেশকদের অধিকারেই ছিল, বিশেষ করে পিটার ব্রম্নক, আরিয়ানে নুশকিন এবং ইউজিনিও বারবার নামটিই এক্ষেত্রে সবার আগে আসে। এ ধরনের আমত্মঃসাংস্কৃতিক প্রযোজনা পাশ্চাত্যের সমালোচক ও দর্শকরা খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করে আসছেন। তবে যাহোক, তারা মাঝেমধ্যেই অস্থিরতারও সৃষ্টি করেছেন। একটি সফল আমত্মঃসাংস্কৃতিক নাট্য প্রযোজনা নির্মাণ করতে গেলে যে ব্যাপারটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটি হলো একটি নতুন শৈল্পিক অভিব্যক্তি সৃষ্টি করতে হবে এবং একে প্রযোজনাটির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে দৃষ্টিগোচর করাতে হবে। আর এ সাফল্যের পূর্বশর্ত হিসেবে আধুনিক থিয়েটার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে, একই সঙ্গে গভীর বোঝাপড়া থাকতে হবে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী শৈল্পিক নাট্যকাঠামো ও এগুলোর বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কেও, এবং এগুলোকে কীভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করা যায় সে ব্যাপারেও দৃষ্টি রাখতে হবে। n

 

তথ্যপঞ্জি

 

১.    Produced by Chorus Theatre, Imphal, Manipur, India in 2008. As a part of the project Delhi Ibsen Festival ’08, the organizer Í Dramatic Art & Design Academy Í commissioned three distinguished Indian theatre directors, Ratan Thiyam among them, to make productions of Ibsen’s plays. Thiyam himself selected When We Dead Awaken.

২.    Samik Bandyopadhya : The New Karnas of Manipur, p. 73.

৩.    Anjum Katyal, p. 12.

৪.    Ratan Thiyam : The audience is inside me, p. 64.

৫.    Fischer-Lichte, J. Riley and M. Gissenwehrer (eds), (1990) The Dramatic Touch of Difference, quoted from Patrice Pavis The Intercultural Performance Reader, p. 11.

৬.    In contrast to what I call simple forms of cultural encountering which can be created entirely within the context of modern theatre, see Kamaluddin Nilu (2007).

৭.    Patrice Pavis : The Intercultural Performance Reader, p. 2.

৮.   Quoted from Patrice Pavis : Theatre at the crossroads of culture, p. 17.

৯.    Quoted from When We dead Awaken : Another Masterpiece of Ratan Thiyamby Meghachandra Kongbam.

১০.  Ratan Thiyam in Dramatic Art & Design Academy (2009), p. 28.

১১.  Ibid, p. 23.

১২.  Ibid,ªp. 32.

১৩. Soumyabrata Choudhury (2009), p. 132.

১৪.  Ratan Thiyam in Dramatic Art & Design Academy (2009), p. 28.

১৫.  Ibid, p. 27.

১৬. Ibid, p. 27.

১৭.  Ibid, p. 32-33.

১৮. Ibid, p. 29.

১৯.  From Thiyam’s performance text, unpublished.

২০.  Marvin Carlson (1996), p. 82.

 

 

 

গ্রন্থপঞ্জি

 

১.    Bandyopadhyay, Samik (1997) : The New Karnas of Manipur, in Seagull Theatre Quarterly, Issue 14/15 Theatre in Manipur Today.

২.    Carlson, Marvin (1996) : Brook and Mnouchkine Í Passages to India? in Patrice Pavis (ed.) The Intercultural Performance Reader.

৩.    Choudhury, Soumyabrata (2009) : When We Dead Awaken : The Temperature of the Symbol, in Dramatic Art & Design Academy : Proceedings Ibsen Conference 2008 Í The Contemporary Relevance of Ibsen & Inroads into Theatre Dramaturgy in India.

৪.    Dramatic Art & Design Academy (2009) : Proceedings Ibsen Conference 2008 Í The Contemporary Relevance of Ibsen & Inroads into Theatre Dramaturgy in India. New Delhi.

৫.    Katyal, Anjum (1997) : Editorial, in Seagull Theatre Quarterly, Issue 14/15, Theatre in Manipur Today.

৬.    Kongbam, Meghachandra (2008) : When We dead Awaken : Another Masterpiece of Ratan Thiyam, in Manipur Comments, http://manipurcomments.com

৭.    Nilu, Kamluddin (2007) : Cultural diversity within professional theatre : Possibilities and challenges, in : www2.scenekunst.no/artikkel_3995.nml

৮.   Pavis, Patrice (1992) : Theatre at the crossroads of culture. London and New York : Routledge.

৯.    Pavis, Patrice, ed. (1996) : The Intercultural Performance Reader. London and New York : Routledge.

১০.       Thiyam, Ratan (1997) : The audience is inside me, in Seagull Theatre Quarterly, Issue 14/15 Theatre in Manipur Today.

Leave a Reply

*