logo

নভেরা আহমেদ

ন জ রু ল  ই স লা ম

অসাধারণ প্রতিভাধর ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব বাঙালি শিল্পী নভেরা আহমেদ সম্প্রতি (৬ মে, ২০১৫) প্যারিসে লোকান্তরিত হয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল আশির ঊর্ধ্বে। বেশিরভাগ সূত্র তাঁর জন্মসাল উল্লেখ করে ১৯৩০, অন্য সূত্র বলে ১৯৩৫, এমনকি ১৯৩৯ও। তবে যেহেতু তিনি ১৯৪৭ সনের দিকে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন, অনুমান করা যায়, তখন তাঁর বয়স পনেরো বা তার বেশি হতেই পারত। (সম্ভবত) ১৯৭০ সন থেকে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর প্যারিসে প্রবাসজীবন যাপন শেষে নভেরার মৃত্যু বাংলাদেশের শিল্পকলার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

নভেরা আহমেদ পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে এদেশের সাংস্কৃতিক মহলের একটি অত্যন্ত আলোচিত নাম। এবং সেটি তাঁর শৈল্পিক পরিচয়ের জন্য যেমন, তেমনি তাঁর ব্যক্তিসত্তার কারণে। তাঁর নামটিরও নতুনত্ব ছিল।

বাঙালি সমাজে, এমনকি বাঙালি মুসলিম সমাজেও নভেরার আবির্ভাব, অর্থাৎ মুসলমান পরিবারের এক মেয়ে একজন শিল্পী বা ভাস্কর, আমি এতে কখনো খুব একটা বিস্মিত হইনি, কেননা ততদিনে আমরা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে (১৮৮০-১৯৩২) চিনেছি। নারী শিক্ষা ও নারী উন্নয়নে স্বশিক্ষিত রোকেয়ার অবদানের কথা বাদই দিলাম, সুলতানা’জ ড্রিম (১৯০৫) শীর্ষক তাঁর লেখা ইংরেজি রচনাটির ভাষার চমৎকারিত্ব, বিষয়ের অভিনবত্ব ও চিন্তার আধুনিকতা ছিল আমাদের উপমহাদেশে অভূতপূর্ব। রোকেয়ার উত্তরসূরি কোনো বঙ্গললনা প্রথাবিরোধী হবেন, বিপ্লবী হবেন, এতে কোনো বিস্ময় থাকার কথা নয়। তারপরও বলতেই হয়, নভেরা বস্ত্ততই ছিলেন ব্যতিক্রম, কর্মক্ষেত্র নির্বাচনে ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে। এদেশে পথিকৃৎ ছিলেন তিনি আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে। এবং জীবনাচরণের আধুনিকতায়, তাঁর সময়ের বাঙালিদের তুলনায় অগ্রসরতায়।

ঢাকার কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির নবনির্মিত আধুনিক ভবনে ১৯৬০ সনের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত তাঁর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী ‘ইনার গেজ’ দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। এবং তাঁকেও দেখার। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষ সম্মানের ছাত্র। নভেরাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছি; সুন্দর অবশ্যই, কালো শাড়িতে ব্যতিক্রমী। তখনকার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এমনটি দেখা যেত না, সাদা শাড়ি, সাদা পাজামা-শার্টই বেশি চলত। নভেরার ছিল উঁচু ঝুঁটি করে চুল বাঁধা, গলায় দীর্ঘ মালা। আমরা লাইব্রেরিতে পড়তে যেতাম, আমার যেহেতু শিল্পকলার প্রতি টান ছিল, নভেরার প্রদর্শনী বিশেষ আগ্রহভরে দেখেছি, বারবার দেখেছি, হালকাভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি। প্রদর্শনীতে বিকেলবেলা তাঁর সুদর্শন স্মার্ট বন্ধু এস এম আলীকে দেখেছি তাঁকে সঙ্গ দিতেন। তাঁর সঙ্গেও কথা বলেছি। আমি নভেরার প্রদর্শনী নিয়ে ইংরেজিতে ডাকসুর সাইক্লোস্টাইল ম্যাগাজিন স্পেকট্রাতে ‘নভেরা’জ ইনার গেজ’ শিরোনামে দুপাতার একটা রিভিউ লিখেছিলাম। আফসোস, সে লেখাটির কপি আমার সংগ্রহে নেই। স্পেকট্রার কপিও পরে পাইনি। নভেরার সেই প্রদর্শনী আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছিল। ঢাকার সমসাময়িক চিত্রকলা তদ্দিনে ইউরোপীয় আঙ্গিকের অনুসারী হয়েছে, বেশ কয়েকজন মেধাবী শিল্পী ইউরোপ-আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে সদ্য দেশে ফিরেছেন। খুব ভালো নিরীক্ষাধর্মী কাজ হচ্ছিল, কিন্তু ভাস্কর্য ছিল না সেই শিল্পচর্চায়।

নভেরার পঞ্চাশের দশকের কাজে, বিশেষ করে (১৯৫৭-৬০ এর কাজে) দেশে বসেই করা কাজগুলোতে, যা অবশ্যই তাঁর শ্রেষ্ঠতম কাজের উদাহরণ, ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় আধুনিক ভাস্কর্য আঙ্গিকের প্রভাব ছিল। বিশেষ করে হেনরি ম্যুর, বারবারা হেপওয়র্থ প্রমুখের প্রভাব দেখা গেছে, আবার বাংলাদেশের লোকশিল্প, বিশেষ করে টেপা-পুতুলের ফর্ম, তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে মনে করা হয়।

প্রসঙ্গত, আমার মনে পড়ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই অবস্থান ছিল ঢাকা জাদুঘরের। আর সেখানে সংরক্ষিত ছিল (এখন জাতীয় জাদুঘরে) বাংলার হাজার বছরের ভাস্কর্য ঐতিহ্যের অপূর্ব সব নিদর্শন। নভেরা বা চারুকলার যে-কোনো সাধক সেসব নিদর্শন মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করলে অনেক কিছুই পেতে পারতেন। সম্ভবত তখন ‘জাদুঘর স্টাডি’ ঢাকার শিল্পীদের জন্য আবশ্যক ছিল না। অধিকাংশ শিল্পী পাশ্চাত্য শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হতেন। নভেরার শিল্পশিক্ষা তো ছিল পুরোটাই পাশ্চাত্যে। সেসব দেশের মিউজিয়ামেও উপমহাদেশের ভাস্কর্যের সংগ্রহ থাকে।

নভেরা আহমেদ এদেশের শিল্পচর্চায় পথিকৃৎ এভাবেও যে, তিনি প্রথম ব্যক্তি (নারী বা পুরুষ), যিনি শিল্পশিক্ষা শুরুই করেছিলেন ইংল্যান্ড ও ইউরোপে। (পরে) নভেরার অন্তরঙ্গ বন্ধু হামিদুর রাহমানও কাছাকাছি সময়ে ১৯৫০ সনে চিত্রকলা অধ্যয়নের জন্য প্যারিসে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপ যাওয়ার আগে হামিদ দুবছর ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। নভেরাকে তাঁর অভিভাবকরা ১৯৫০ সনে লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য, হয়তো আইন পড়ার জন্য, নভেরার মেজ বোন শরীফা আলম তখন বিবিসিতে কর্মরত। কিন্তু কার্যত লন্ডনে নভেরার পড়াশোনার বিষয় হয়ে গেল শিল্পকলা, তাও আবার ভাস্কর্য। এই নির্বাচন ছিল একান্তই তাঁর নিজস্ব। হামিদুর রাহমান শিল্পশিক্ষার জন্য ১৯৫১ সনে প্যারিস থেকে লন্ডনে যান। হামিদের বড় ভাই নাজির আহমদও তখন বিবিসিতে কর্মরত ছিলেন। এভাবেই হয়তো হামিদের সঙ্গে নভেরার পরিচয় ও পরে বন্ধুত্ব হয়। নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রাহমান দুজনেই ছিলেন সচ্ছল পরিবারের সন্তান। পারিবারিক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল তাঁদের বিলেত ও ইউরোপ যাত্রায়। ঢাকায় হামিদের শিক্ষক চারুকলার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিন কাছাকাছি সময়ে ইংল্যান্ডে যান সরকারি বৃত্তি নিয়ে ১৯৫১ সনের আগস্ট মাসে, অর্থাৎ নভেরা বা হামিদের বছরখানেক পরে। নভেরা লন্ডনে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাস্কর্য শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ও সেখান থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেছেন, শিক্ষকের প্রশংসাও লাভ করেছেন। লন্ডনে হামিদুর রাহমানের সঙ্গে নভেরার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৫৪ সনের শীতকালে দুজনে একসঙ্গে ইতালির ফ্লোরেন্সে গিয়ে শিল্পী আমিনুল ইসলামের ডেরায় কয়েকদিন কাটিয়েছেন, পরে নিজের থাকার ব্যবস্থা করে ফ্লোরেন্সে ভাস্কর্যচর্চা করেছেন। আমিনুল ইসলামের আত্মজীবনী পাঠে জানা যায়, নভেরা তরুণ বয়সেও কতটা আত্মপ্রত্যয়ী ও আধুনিকমনা ছিলেন। তাঁর সমকালীন পাশ্চাত্য ভাস্কর্য শিল্পধারা থেকে তিনি সহজভাবেই অনেক কিছু আত্মস্থ করেছিলেন।

নভেরা আহমেদের ভাস্কর হিসেবে আবির্ভাব আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয় না এ কারণে যে, তিনি অত্যন্ত প্রাকৃতিকভাবেই ছিলেন সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী, যেমন ব্যতিক্রমী ছিলেন ভারতে তাঁর অনেকটাই সিনিয়র শিল্পী অমৃতা শেরগিল (১৯১৩-৪১), সমসাময়িক ভাস্কর মীরা মুখার্জি (১৯৩২-৯৮), অথবা পাকিস্তানের প্রবীণ শিল্পী আন্না মুলকা আহমদ কিংবা সমকালীন জুবাইদা আগা বা রুমানা সাঈদ প্রমুখ নারী শিল্পী।

নভেরার শিল্পী ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার কাহিনি বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পীর মতো খুব একটা নয়। পৈতৃক বাসস্থান চট্টগ্রাম হলেও তাঁর জন্ম কলকাতায়। স্কুলশিক্ষা অভিজাত ইংরেজি মাধ্যম স্কুল লরেটোতে। প্রবেশিকা পাশও সেখান থেকে, তারপর তাঁর বাবার বদলির কারণে স্বল্পকালীন বাংলাদেশের কুমিল্লা শহরের ভিক্টোরিয়া কলেজে। তারপর সরাসরি লন্ডনে ১৯৫০ সনে। সেখানেই তাঁর শিল্পশিক্ষা শুরু।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বা বর্তমান বাংলাদেশে) নভেরার ভাস্কর পরিচয় অবশ্যই ব্যতিক্রমী, এজন্য হয়তো যে তিনি মুসলিম নারী, কিন্তু মজার বিষয় হলো, তখন কোনো পুরুষ শিল্পীও ভাস্কর্যচর্চা করতেন না। এমনকি অমুসলিম বা হিনদু শিল্পীরাও, যদিও প্রতিনিয়ত অসংখ্য প্রথাগত আকর্ষণীয় প্রতিমা গড়া হতো। সুতরাং ধর্মীয় কারণে এদেশে আধুনিক ভাস্কর্যচর্চা হতে পারত না, এমন যুক্তি টেকে না। নেহাতই ঘটনাক্রমে ঢাকায় জয়নুল আবেদিনদের মধ্যে কোনো ভাস্কর না থাকায় শুরু থেকে ভাস্কর্য শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া যায়নি। অন্য অনেক বিভাগও তখন শুরু করা সম্ভব হয়নি। ভাস্কর্যচর্চায় অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব অবশ্যই গ্রাহ্য।

নভেরার পঞ্চাশের দশকের ঢাকায় বসে নির্মিত কংক্রিটের ভাস্কর্যগুলো অসাধারণ। তাঁর নিজস্ব স্টাইল তখনই এক উচ্চমান অর্জন করেছিল। একক ফিগার, মা ও সন্তান, মা-বাবা-সন্তান, পুরুষ ও গরু, পরিবার ও গরু, এ-ধরনের বিষয় সহজ আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন, এগুলোকে সেমি-ফিগারেটিভ বা অবয়বভিত্তিক আধা-বাস্তবধর্মী আঙ্গিকের বলে ধরা যায়। মাধ্যমের কারণেই আঙ্গিক বা ফিগার-গড়নে সহজতা এনেছেন। হেনরি ম্যুরের মতো শূন্য স্পেস (কোটর) রেখেছেন। মানুষের মাথা আকারে ছোট দেখিয়েছেন, অনেকটা বাংলার মাটির পুতুলের মতো আবার হেনরি ম্যুরের আঙ্গিকের মতো বলা যায়। প্রায় একই আঙ্গিকে ভাস্কর্য গড়েছেন তাঁর সমকালীন পাকিস্তানি শিল্পী নাসির শামসি ও ওয়াজির জুবি। এঁরা দুজনেই কাছাকাছি সময়ে পাকিস্তান ও ইউরোপে ভাস্কর্য শিক্ষা নিয়েছিলেন। নভেরা বিষয় বিবেচনায় ছিলেন অনন্য, তিনি বাংলার কৃষক পরিবারের অন্তরঙ্গ পরিবেশ চমৎকারভাবে শিল্পায়িত করেছেন। তিনি কিছু কাজে সাদা ও কালো রঙের সিমেন্ট ব্যবহার করেছেন। কোনো কোনো ছোট কাজে সিমেন্টে রেড অক্সাইডও ব্যবহার করেছেন। এসব কাজের কিছু দৃষ্টান্ত বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। সাদা সিমেন্ট ও মার্বেল কণা ব্যবহার করে ভাস্কর্য নির্মাণ বাংলাদেশের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শুরু করেছিলেন।

নভেরার পঞ্চাশের দশকের অত্যন্ত বড়মাপের একটি কাজ তৎকালীন পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি) দেয়ালে নির্মিত সিমেন্টের রিলিফ কম্পোজিশন। এতে মানুষ, গরু, হাতি ইত্যাদির একটি পরিবার গড়া হয়েছেসম-বিমূর্ত আঙ্গিকে। নভেরার ভাস্কর্যের মৌলিক আঙ্গিক এতে প্রত্যক্ষ করা যায়।

নভেরার ১৯৫৭-৬০ এর ভাস্কর্য নিদর্শনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পানুরাগীদের প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয়। এগুলো ছিল যথাযথই আধুনিক ধারার। তিনি ষাটের দশকের প্রথম দিকে কিছুটা বাস্তবধর্মী প্রতিকৃতি গড়েছেন (‘চাইল্ড ফিলোসফার’ ১৯৬১), পাকিস্তানে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, ষাটের দশকে ধাতব ভাস্কর্য করেছেন, অনেকটা কনস্ট্রাকটিভ রীতিতে তাঁর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্যাংককে (১৯৭০ সনের অক্টোবর মাসে)। এতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত বিমান ও যুদ্ধাস্ত্রের ভগ্নাবশেষ ওয়েল্ডিং পদ্ধতিতে জোড়া লাগিয়ে নানা কম্পোজিশন গড়েছেন। আগের কাজ থেকে এই কাজগুলো ছিল যথেষ্ট ভিন্ন আঙ্গিক ও কৌশলের।

১৯৫৬ সনে দেশে ফিরে নভেরা ও হামিদ যৌথ প্রদর্শনী করেছেন ১৯৫৭ সনে। ১৯৫৭-৫৮তে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণে নভেরা হামিদুর রাহমানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। মিনারের মূল নকশা ছিল হামিদুর রাহমানের, সেভাবেই তিনি সরাসরি চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন সরকারের সঙ্গে। তবে নভেরা তিনটি ভাস্কর্য করবেন, এমন ব্যবস্থাও হামিদ রেখেছিলেন। স্থাপত্যিক নকশার সঙ্গে ইউরোপীয় নগর-শিল্পের আদলে চত্বরে পানির ফোয়ারা থাকবে, এমন ধারণাও নকশায় সংযোজন করেছিলেন নভেরা। তাছাড়া শহীদ মিনারের বেসমেন্টের দেয়ালে এক হাজার বর্গফুট ম্যুরাল অাঁকার পরিকল্পনা ছিল হামিদুর রাহমানের। পারিশ্রমিক হিসেবে হামিদের প্রাপ্য ছিল পঁচিশ হাজার আর তিনটি ভাস্কর্যের জন্য নভেরার প্রাপ্য ছিল দশ হাজার টাকা। তিনি তাঁর ভাস্কর্য করে দিয়েছিলেন, সেগুলো মিনার চত্বরেই রাখা ছিল; কিন্তু ’৫৮-তে সামরিক শাসন প্রবর্তন-পরবর্তী সময়ে আর সেসবের খোঁজ পাওয়া যায়নি, হামিদুর রাহমানের ম্যুরাল চিত্রগুলোও ধ্বংস করা হয়েছিল। এতে দুই শিল্পীই মর্মাহত হন। প্রাপ্য অর্থের সামান্য অংশই তাঁরা পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে শহীদ মিনারের নকশা ও নির্মাণেঅদল-বদল হয়েছে আর তাতে হামিদুর রাহমানের নাম বলা হলেও প্রায়শই নভেরার ভূমিকার কথা অনুল্লিখিত থাকে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।

ছাপ্পান্ন সনে নভেরা ও হামিদ একসঙ্গে লন্ডন থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন, শহীদ মিনার নিয়ে একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজও করেন। দুজনের ঘনিষ্ঠতার কথা অনেকেরই জানা ছিল। ১৯৫৮-৫৯ সনে হামিদ ফেলোশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৬০ সনে তিনি আশরাফ জাহানের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন (হামিদুর রাহমান পরবর্তীকালে কানাডায় অভিবাসী হন, সেখানে শিক্ষকতা ও শিল্পচর্চা করেন। তিনি ১৯৮৮ সনে মারা যান। শহীদ মিনারের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুজন শিল্পীই ঘটনাক্রমে দীর্ঘ প্রবাসী হন ও বিদেশেই মৃত্যুবরণ করেন)।

১৯৬০ সনের পর যে-কোনো কারণেই হোক, নভেরা ঢাকা বা পূর্ব বাংলা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান, লাহোরে একাধিক প্রদর্শনীতে অংশ নেন, জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করেন। সেখান থেকে মাঝে ভরতনাট্যম শেখার জন্য বোম্বে যান, তারপর অসুস্থ অবস্থায় চলে যান লন্ডন, তারপর প্যারিস। ১৯৭০ সনে ব্যাংককে একটি একক প্রদর্শনী করেন। তখন সঙ্গে ছিলেন ফটোগ্রাফার গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনস। তখন থেকে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত নভেরা প্যারিসেই জীবন কাটান। চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সে পারিবারিক ইচ্ছায়, সম্ভবত তাঁর অমতেই, তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল, যা অবশ্য কয়েক মাসের বেশি টেকেনি, পরে প্যারিসে তাঁর আমৃত্যু সঙ্গী ছিলেন গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনস।

শিল্পচর্চায় প্রথম থেকেই নভেরা ছিলেন যথেষ্ট বৈশিষ্ট্যময়, ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও তিনি ছিলেন খুবই ব্যতিক্রমী। আগাগোড়াই ভিন্ন মেজাজের শিল্পী। একপর্যায়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, আর ফেরেননি, কারণ দেশের ওপর অভিমান নাকি কোনো ব্যক্তির ওপর, না অন্য কিছু, আমরা জানি না। অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে তাঁর প্রাপ্য শ্রদ্ধা বা সম্মান বা ভালোবাসা জানায়নি। তবে তারা তাঁকে একেবারে ভুলে গেছে তাও নয়। পথিকৃৎ আধুনিক ভাস্কর হিসেবে তাঁকে সবসময়ই স্মরণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্মানও দেখানো হয়েছে, ‘একুশে পদক’ (১৯৯৮) হয়তো তাঁর অনেক আগেই প্রাপ্য ছিল।

Leave a Reply

*