logo

দ্বৈত সত্তার নিঃসঙ্গ এক শিল্পী

ম ন জু রু ল হ ক
’মায়ের স্মৃতি আমার তেমন মনে নেই। মাকে আমি হারিয়েছি সেই ছোটবেলায়। তখন থেকেই বড় ভাইবোন আর আত্মীয়স্বজনের আদর-যত্ন আর অবহেলার মধ্য দিয়ে আমার বেড়ে ওঠা। সেই ছোটবেলায় আমাদের পরিবার ছিল বড় এক যৌথ পরিবারের অংশ। ফলে বাড়িতে লোকজনের অভাব কখনই ছিল না। তারপরও সুযোগ পেলেই আমি একা বের হয়ে যেতাম, দেখতাম মাটি দিয়ে নানা কিছু সৃষ্টিতে নিয়োজিত কুমোরদের। আমার মনে তখন দেখা দিত সেরকম কিছু করতে পারার বাসনা। সৃজনশীল কাজে জড়িত হওয়ার আদি উৎস মনে হয় সেখানেই। কখনো আবার বাবা কিংবা কাকাদের সঙ্গে গ্রামের মেলায় যাওয়ার সুযোগ হলে মাটির তৈরি নানারকম খেলনা আর পুতুল আমাকে আকৃষ্ট করত। অবাক হয়ে সেগুলো আমি দেখতাম আর বায়না ধরতাম সেসব কিনে দেওয়ার জন্য। তারপর বাড়ি ফিরে অজান্তেই গাছের ছোট কোনো ডাল হাতে নিয়ে মাটিতে অাঁকার চেষ্টা করতাম মনের ভেতরে দেখা দেওয়া নানারকম ছবি। বাড়ির কেউ সেগুলোর দিকে তাকিয়েও দেখত না। তবে তাতে আমার কোনো দুঃখ ছিল না। সৃষ্টির আনন্দে আমি তখন বিভোর ছিলাম। কী তৈরি হচ্ছে তার মূল্যায়নে নয়। ফলে কোথা থেকে ছবি অাঁকার প্রেরণা, তা বোধহয় নির্ধারণ করা এখন আর সম্ভব নয়। ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে বাড়িতে কারো মধ্যে শিল্পের প্রতি কোনোরকম অনুরাগ কিংবা আকর্ষণ আমি লক্ষ করিনি।’
কোথা থেকে ছবি অাঁকার প্রেরণা, সেই উৎস খুঁজে দেখার তাগিদ কাজী গিয়াসউদ্দিন আগে কখনো সেভাবে অনুভব করেননি। ফলে প্রশ্নের উত্তরে তাঁকে হাতড়ে বেড়াতে হয়েছে শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলো। তবে কি আমরা ধরে নিতে পারি, যে মায়ের স্মৃতি তিনি এখন আর আদৌ মনে করতে পারছেন না, সেই মা-ই অজান্তে শিল্পীর মনে গেঁথে দিয়ে গেছেন সৃষ্টিসুখের উল্লাস, যা কি না আজো তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে এক অজানার রাজ্য থেকে আরেক অজানার দেশে, আর যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রং-তুলির অাঁচড়ে তিনি কাগজ আর ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছেন স্বপ্নিল সব দৃশ্য!
বাংলাদেশের যেসব শিল্পী নিজ প্রতিভার গুণে দেশের বাইরে শিল্পকলার জগতে তাঁদের স্থায়ী আসন তৈরি করে নিতে সমর্থ হয়েছেন, কাজী গিয়াসউদ্দিন হলেন তাঁদেরই একজন। বিদেশের অজানা-অচেনা বৈরী পরিবেশ আর পরোক্ষ কোনো অবলম্বনহীন অবস্থা সৃজনশীলতার জগতে জায়গা করে নেওয়ার কাজটাকে অনেক বেশি কঠিন করে তোলে। ফলে একমাত্র প্রতিভাই সেই বাধা দূর করে নেওয়ায় সাহায্য করতে সমর্থ। বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে অতীতে অনেকে বিদেশে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে এসেছেন এবং আজো অনেকে বিদেশে যাচ্ছেন। তবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে সাফল্য পেয়েছেন কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন। বিদেশে সৃজনশীল সৃষ্টিকর্মে সফল না হতে পারার আরেকটি কারণ অবশ্যই শিল্পকলার সৃজনশীলতার দিকটির সঙ্গে মাটির নিবিড় যে যোগসূত্র, তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
শিল্পী তাঁর মনের পর্দায় যেসব দৃশ্য কল্পনা করে নেন, তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে দেশের মাটির ঘ্রাণ ও পারিপার্শ্বিকতা, যে দৃশ্যাবলির সঙ্গে বিদেশি মনের সম্পর্ক তেমন নেই বললেই চলে। ফলে বিদেশে জায়গা করে নিতে হলে শিল্পীকে মনের গভীরে গেঁথে থাকা তাঁর সেই পরিচিত পরিমন্ডলকে চারদিকের ভিন্ন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে হয়, যে ছবির সঙ্গে বিদেশি দর্শক যেন সহজেই গড়ে নিতে পারেন এমন একধরনের সখ্য, যা কি না দূর করে দেবে দূরত্বের অনুভূতি।
তবে সব শিল্পীই যে তা করতে সমর্থ তা তো নয়। এমনকি নামি, প্রতিষ্ঠিত অনেক শিল্পীকেও দেখা গেছে প্রবাসের বৈরী পরিবেশে হোঁচট খেতে। ফ্রান্সিসকো গয়া শেষ বয়সে প্যারিসের নির্বাসিত জীবনে অন্ধকার ঘরে কেবলই হাতড়ে বেরিয়েছেন সেরকম এক চাবি, যার খোঁজ পেলে আবারো তিনি পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন বলিষ্ঠ সেইসব প্রতিফলন, যা তাঁকে চিত্রকলার জগতে অমরত্ব এনে দিয়েছে। তাঁর মতো বড় মাপের শিল্পীর বেলাতেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তেমন কিছু ঘটেনি এবং গয়াকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে অনেকটা যেন উন্মাদ এক শিল্পীর মতো সাদা-কালোয় জীবনের কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন এঁকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে, উদ্ভট যেসব দৃশ্যের মধ্যে আমরা দেখি অনেকটা যেন আত্মপ্রতিকৃতি হিসেবে অাঁকা পাগল এক বুড়োকে, শিশুর মতো দোলনায় চড়ার আনন্দ উপভোগে যে লিপ্ত। কাজী গিয়াসউদ্দিন সেদিক থেকে নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী এক সফল শিল্পী, ভিন্ন দুই প্রেক্ষাপটের মিলন ঘটিয়ে রং-তুলিতে যে চমক তিনি তৈরি করছেন, তা সত্যিকার অর্থে একক পরিচয়ের গন্ডিকে অতিক্রম করে গেলেও এর গভীরে পাওয়া যায় এর উৎসের সন্ধান।
কাজী গিয়াসউদ্দিনের ছবি অাঁকার ভুবনের ব্যাপ্তি চার দশকের কিছু বেশি সময় ধরে হলেও এর উৎস কিন্তু বরাবরের মতোই গাঁথা আছে এরও অনেক আগে, শিল্পীর সেই বাল্যকাল আর কৈশোরের দিনগুলোতে, গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে ধুলার আস্তরণের ওপর অাঁচড় কাটা, কিংবা মাটির দলা হাতে নিয়ে তা দিয়ে কিছু একটা তৈরি করতে পারার নেশার মধ্যে। সৃষ্টির এই নেশা শিল্পীর মনে শৈশবে দেখা দিয়েছিল কুমোরদের নিপুণ হাতের কাজ লক্ষ করার মধ্য দিয়ে, পরে যার সঙ্গে একাকার হয়ে মিশে গেছে চারপাশের প্রকৃতির রং, আকাশ আর নদীর বিশাল ব্যাপ্তি; যা কি না শিল্পীর অবচেতন মনে অনেকটাই দৃষ্টির আড়ালে থেকে গিয়ে শিল্পীকে জুগিয়ে গেছে অনুপ্রেরণা। কাজী গিয়াসউদ্দিনের অাঁকা পরবর্তী জীবনের নানারকম ছবিতে দৃশ্যের বাইরে থেকে যাওয়া আদি সেই উৎসের সঙ্গে খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর মনে গড়ে ওঠা সেরকমই এক নিবিড় সখ্যের অদ্ভুত মিল। শিল্পী তাঁর দূর অতীতে হারিয়ে যাওয়া শৈশবে যে চোখ দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন প্রকৃতির ভেতরের সৌন্দর্য, দৃষ্টির সেই স্বচ্ছতা তাঁর আজো রয়েছে অমলিন, দীর্ঘ প্রবাসজীবনেও যা কি না হারিয়ে ফেলেনি এর দ্যুতি। ফলে বিদেশে চিত্রকলার ওপর সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাগ্রহণ শেষ করার পর প্রথাগত সেই শিক্ষা রং-তুলির ব্যবহারগত শুদ্ধতা শিখে নিতে নানাভাবে তাঁকে সাহায্য করলেও ছবির বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে কাজী গিয়াসউদ্দিন থেকে গেছেন নিজের আদি উৎসের প্রতি পুরোপুরি অঙ্গীকারবদ্ধ।
চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে জাপানে দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছরের প্রবাসজীবনে কাজী গিয়াসউদ্দিনের সৃজনশীলতার বিকাশে উত্তরণের ভিন্ন কয়েকটি পর্যায় লক্ষ করা যায়। শিল্পীর এ পর্যায়ক্রমিক উত্তরণ ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারার সবচেয়ে নির্ভরশীল মাধ্যম এখন হয়ে উঠেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সক্রিয় সহযোগিতায় ইউরোপের নামি প্রকাশনা সংস্থা স্কিরার সদ্য প্রকাশিত অ্যালবাম। বাস্তবধর্মী ছবি থেকে শুরু করে যে-কোনো শিল্পীর স্বাভাবিক যে পরিক্রমণ পথ সেই স্টিললাইফ বা স্থিরচিত্র হয়ে বিমূর্ত পথে কাজী গিয়াসউদ্দিনের চলার খুবই বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় এই অ্যালবাম তুলে ধরছে। সেইসঙ্গে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় আমাদের চোখে আরো যা ধরা দেয় তা হলো, রঙের ব্যবহারে হেরফের ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টিতে শিল্পীকে মনোযোগী হতে। আর উত্তরণের সেরকম এক নিজস্ব পথ ধরে বাংলার প্রকৃতির শুদ্ধতম প্রকাশ রং-তুলিতে জাপানি দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন বলেই বিদেশে সহজেই তিনি জায়গা করে নিতে পেরেছেন। এই নিজস্ব পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে গেছে সাফল্যের সোপান পার হওয়া ভিন্ন এক উচ্চতায়, যার প্রকাশ সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর অ্যালবামে।
ষাটের দশকের মধ্যভাগে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে ছবি অাঁকার নিয়মকানুন আর চিত্রকলার জগতের আধুনিকতার সঙ্গে কাজী গিয়াসউদ্দিনের প্রথম সরাসরি পরিচয়। মফস্বল থেকে আসা তরুণের প্রতিভার পরিচয় খুঁজে পেতে খুব বেশি সময় শিক্ষকদের লাগেনি। চারুকলা ইনস্টিটিউটের পাঠ শেষ করে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য চালু হওয়া স্নাতকোত্তর ক্লাসে। ছবি অাঁকার বেলায় তখনো তাঁর চলছিল পরীক্ষামূলক সেই পর্যায়, যখন পর্যন্ত তিনি ঠিক করে নিতে পারছিলেন না কোন পথটি তাঁর জন্য হবে সবচেয়ে জুতসই। ফলে বিমূর্তধারার পথ ধরে যাত্রা সেই সময়ে শুরু হলেও ফিগারেটিভ আর্ট বা বাস্তব প্রতিচ্ছবির প্রকাশও একই সঙ্গে পাশাপাশি অবস্থান করতে থাকে। ১৯৭১-এর শেষ নাগাদ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে ফিরে আসার পরই প্রকৃত অর্থে শুরু হয় শিল্পীসত্তার নিজস্ব অবস্থান খুঁজে পাওয়ায় কাজী গিয়াসউদ্দিনের চালিয়ে যাওয়া নিরলস প্রয়াস।
জাপানে কাজী গিয়াসউদ্দিনের উত্তরণ-পর্বের অনেকটাই রঙের খেলায় পরিপক্বতা নিয়ে আসার সঙ্গে সম্পর্কিত। রঙের এতটা ব্যতিক্রমী ব্যবহারে জড়িত হওয়া আমাদের শিল্পীদের বেলায় সচরাচর দেখা যায় না। ফলে জাপানের প্রভাব তাঁর শিল্পকর্মের এই দিকটিতে অন্তত অবধারিত বলে আমরা ধরে নিতে পারি। তবে জাপানি চিত্রকলার বিশেষ কোন পথ কিংবা ধারা এককভাবে যে তাঁকে প্রভাবিত করেছে তা অবশ্য বলা যায় না। তুলির প্রলেপে জাপানের নিজস্ব ছবি অাঁকার রীতির ছাপ লক্ষ করা গেলেও শিল্পী নিজে অবশ্য মনে করেন সবচেয়ে বেশি যেটা তাঁকে প্রভাবিত করেছে তা হলো জাপানি মৃৎশিল্প। রঙের মার্জিত ব্যবহারে মৃৎশিল্পের সেই প্রভাব অবশ্য সহজেই চোখে পড়ে।
১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে অাঁকা শিল্পীর অনেক ছবিতেই রং এসেছে অনেক বেশি গভীরতা নিয়ে। ক্যানভাস নিজেই সেখানে যেন হয়ে উঠেছে শ্রাবণের বিরামহীন বর্ষণ শুরু হওয়ার আগের আকাশ, যার আছে নিজস্ব গাম্ভীর্য আর মেজাজ। তবে নববইয়ের দশকের শেষ দিক থেকে ক্যানভাস ক্রমশই রূপ নিতে শুরু করে বর্ষণ শেষ হয়ে যাওয়ার পরের মেঘমুক্ত স্বচ্ছ আকাশে, যেখানে এমনকি রাতের আকাশে তারার ঝিলিমিলি খেলাও যেন আমাদের চোখে ধরা দেয়। ছবি অাঁকার প্রক্রিয়ায় লক্ষণীয় নতুন এই বিবর্তনকে কনস্ট্রাকটিভ বা গঠনমূলক ধারা থেকে সরে এসে মনের গভীরে দেখা দেওয়া তাগিদ থেকে ছবি অাঁকায় সরে আসার প্রতিফলন বলে শিল্পী নিজে মনে করেন। আগের সেই গঠনমূলক ধারায় ছবি অাঁকার প্রক্রিয়ায় নিজের চোখে দেখা বিশেষ কোনো দৃশ্যকে মনের পর্দায় ভেঙে নিয়ে সেটাকে নতুনভাবে বিন্যাস করে নেওয়া জড়িত থাকলেও, এখন তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় মনে যা আসছে, সেটাকেই
রং-তুলিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। ছবি অাঁকার এই প্রক্রিয়া আপাত দৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও বিশুদ্ধতার ছাপ এখানে অনেক বেশি প্রকট হয়ে ফুটে ওঠায় ছবি অাঁকার প্রক্রিয়াও হয়ে উঠছে অনেক বেশি দীর্ঘ। যেহেতু মনের তাগিদে সাড়া দিয়ে ছবি অাঁকা, ফলে এমনকি শেষ হয়ে যাওয়া কোনো কাজও মন পরিতৃপ্ত না হলে সাদা রঙের প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে সেটাকে মুছে ফেলতে কোনো রকম দ্বিধা শিল্পী করছেন না। তাই বিশেষ একটি কাজ শেষ করতে কখনো বা এমনকি তিন থেকে পাঁচ বছরও লেগে যাচ্ছে। শিল্পীর এই বিধ্বংসী মন শিল্পের স্বার্থেই থাকা দরকার বলে কাজী গিয়াসউদ্দিন মনে করেন। সেইসঙ্গে তিনি আরো মনে করেন, সাহসী না হলে শিল্পীর পক্ষে তা করা সম্ভব নয় এবং সাহসী শিল্পীই পারেন নতুন পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরতে।
গত সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে জাপানে কাজী গিয়াসউদ্দিনের স্থায়ী নিবাস হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার অদূরে গড়ে নেওয়া নিজস্ব স্টুডিওতে বছরের বড় একটা সময় তিনি কাটাচ্ছেন, যা কি না অন্যভাবে ছবি অাঁকা এবং ছবি অাঁকার প্রক্রিয়ায় নতুন পরীক্ষা চালানোর অনুপ্রেরণা তাঁর মনে এনে দিচ্ছে। ফলে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া দ্বৈত সত্তা আর অস্তিত্ব শিল্পীর মননশীলতার পথে বাধা হয়ে দেখা দেয়নি, বরং তা হয়ে উঠেছে একে অন্যের পরিপূরক।
দেশে অবস্থানের সুযোগে বাংলার পরিচিত প্রকৃতি আবারো তাঁর মনে ফিরিয়ে আনছে শৈশবে দেখা মনমাতানো, প্রাণভোলানো নানারকম দৃশ্যের স্মৃতি, যা কি না অনেকটা শিল্পীর অজান্তেই জায়গা করে নিচ্ছে তাঁর অাঁকা ছবির ফ্রেমে। ফলে কাজী গিয়াসউদ্দিন বরাবরের মতোই থেকে গেছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য হাতড়ে বেড়ানো এমন এক শিল্পী, হৃদয়ে যার গভীরভাবে গেঁথে আছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রবাসজীবন ছবি অাঁকার দক্ষতা আরো উন্নত করে নিতে নানাভাবে তাঁকে সাহায্য করে গেলেও শৈল্পিক সত্তার অবস্থানগত ভিত্তি থেকে তাঁকে সরিয়ে দিতে পারেনি। সেদিক থেকে অন্য এক পরিমাপে কাজী গিয়াসউদ্দিনকে নিঃসঙ্গ এক শিল্পীও বলা যায়, যার সেই নিঃসঙ্গতা অনেকটাই যেন হচ্ছে নিজেকে নিজের ভেতরে গুটিয়ে রাখার ঐকান্তিক চেষ্টার এক নিঃসঙ্গতা। আর এই নিঃসঙ্গতাই তাঁকে রাখছে সজীব, দিচ্ছে অনুপ্রেরণা, জুগিয়ে চলেছে তৃপ্তিভরে সৃষ্টিসুখের উল্লাস উপভোগ করে যাওয়ার অনাবিল আনন্দ।
পোল্যান্ডের সদ্য প্রয়াত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি ভিস্লাভা শিম্বোর্স্কা হল্যান্ডের রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ের শিল্পী ইওহানেস ভেরমিরের অাঁকা একটি ছবি নিয়ে চমৎকার যে কবিতা লিখেছেন, অনুবাদে সেটা হবে অনেকটা এরকম :
রিক্স মিউজিয়ামের সেই ছবিতে অাঁকা রমণী
নিঃশব্দ মনোনিবেশে যতদিন ধরে
দিনের পর দিন
জগ থেকে পাত্রে ঢেলে যাবেন দুধ
ততদিন ধরে বিশ্ব বঞ্চিত হবে
পৃথিবীর সমাপ্তি টেনে দেওয়ার
সুযোগ থেকে।

ওলন্দাজ শিল্পকলার ডেলফট ধারার গুরু হিসেবে চিহ্নিত ইওহানেস ভেরমিরকে দেখা হয় ক্যামেরার চোখধারী এক শিল্পী হিসেবে। আলোছায়ার নিখুঁত প্রতিফলন হাতে অাঁকা ছবিতে এতটা দক্ষতার সঙ্গে খুব কম শিল্পীই তুলে ধরতে পেরেছেন। সংক্ষিপ্ত জীবনকালে (১৬৩২-১৬৭৫) খুব বেশি ছবি অাঁকার সুযোগ ভেরমিরের হয়নি, এবং তারপরও সময়ের বিবর্তনে শিল্পীর অাঁকা বেশ কিছু ছবি হারিয়ে যাওয়ায় মাত্র তিরিশটির মতো ছবি এখন সংরক্ষিত আছে বিশ্বের নামি বিভিন্ন জাদুঘরে। সেরকম একটি ছবি হচ্ছে হল্যান্ডের রিক্স মিউজিয়ামে রাখা ‘দুধ ঢালছে রমণী’ নামের সেই ছবি, যেখানে আমরা এক নারীকে দেখি শান্ত ভঙ্গিতে ভান্ড থেকে পাত্রে দুধ ঢেলে যেতে, গড়িয়ে পরা সেই দুধের ধারাও যেখানে সহজেই আমাদের চোখে ধরা দেয়। আপাত দৃষ্টিতে খুবই সাধারণ মনে হওয়া সেই ছবির অসাধারণ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতেই শিম্বোর্স্কা সেটাকে তুলনা করেছেন এমন এক মোহনীয় ক্ষমতার সঙ্গে, যা কি না বিশ্বকে বাঁচিয়ে রাখছে সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে।
শিল্পীরা নিজের অজান্তেই ভালোবাসার বাণী আমাদের শুনিয়ে যান, হৃদয়জুড়ে স্নেহ-মমতার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে যা কি না আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া সেই প্রেরণার উৎসে আছে আমাদের দেখা এই জগৎসংসারের প্রতি আরেকটু যত্নশীল, আরো একটু স্নেহপ্রবণ হতে পারার শিক্ষা। ফলে শিল্পের যাঁরা প্রকৃত অনুরাগী, তাঁদের পক্ষে ধ্বংসের খেলায় মত্ত হওয়া কখনো সম্ভব নয়। কাজী গিয়াসউদ্দিনের মতো শিল্পীরাও নিজেদের অজান্তেই সেই একই বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন, যে বার্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সামান্য কিছু পরিমাণে হলেও সহনশীলতা আর ধৈর্যের শিক্ষা আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা হয়তোবা সম্ভব। ফলে ভেরমিরের সেই পাত্রে দুধ ঢেলে যাওয়া রমণীর মতোই কাজী গিয়াসউদ্দিনের বাংলার প্রকৃতিও আমাদের হৃদয়ে মমতার সামান্য অনুভূতির ছোঁয়া এনে দিয়ে আমাদের হয়তো করে তুলতে পারে আরেকটু বেশি সহনশীল। শিল্পীর অাঁকা ছবির দিকে তাকিয়ে সেই বার্তা যতদিন আমরা অনুভব করতে সমর্থ হব, ততদিন ধরে হানাহানি আর আত্মকলহে মত্ত হওয়ার উন্মাদনা থেকে মুক্ত থেকে জগৎসংসারের দিকে আরেকটু মমতাভরা হাত আমরা হয়তো বাড়িয়ে দিতে পারব।
নিঃসঙ্গ শিল্পী কাজী গিয়াসউদ্দিন আগ বাড়িয়ে এসব কথা আমাদের শোনাতে না চাইলেও তাঁর অাঁকা ছবি কিন্তু শান্তির সেই বার্তাই আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। আমরা দেখি প্রকৃতির গভীর উৎস থেকে উঠে আসা বিমূর্ত এক শিল্পী মনমাতানো রঙের প্রলেপে এঁকে যাওয়া সব ছবিতে লিপিবিদ্ধ করছেন একক সেই মর্মবাণী, যেখানে লেখা আছে – সৌন্দর্যের যারা অনুরাগী তাদের স্বপ্নের ভুবনে গড়ে নেওয়া জগৎ, সে যে অবিনশ্বর।

Leave a Reply

*