logo

দ্বাদশ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব

জা কি র  হো সে ন  রা জু
সিনেমার শুরুটা হয়েছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ছবি দিয়ে। বা বলা ভালো যে, সে-সময়ে ছবির দৈর্ঘ্য কত হবে তার কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। যখন থেকে সিনেমার বাণিজ্যিক প্রদর্শনকেন্দ্র অর্থাৎ সিনেমা হলগুলোর প্রতিষ্ঠা শুরু হলো – ১৯১০ ও ’২০-এর দশকে – তখন থেকে সিনেমাকে দৈর্ঘ্যরে বাঁধনে বেঁধে ফেলা হলো। গল্পের আগমন সিনেমার পুঁজির প্রাধান্যকেও জায়গা করে দিলো – ১৯৩০-এর দশক থেকে সিনেমা হয়ে উঠল মূলত পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, যা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়।
চলচ্চিত্রশিল্পীর স্বাধীনতাকে সীমায় বেঁধে দেওয়ার এ-প্রক্রিয়ায় দেশে-বিদেশে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির নির্মাণ ও প্রদর্শন যেন এক মূর্তিমান বিদ্রোহ। বিচিত্র সব বিষয়ে, বেশিরভাগ সময়ে প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে বা বাইরে গিয়ে স্বাধীন নির্মাতারা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির এক বর্ণিল ভুবন নির্মাণ করেন। এ ভুবন অনেকটাই অবরুদ্ধ – সাধারণের চোখের বাইরে – নিভৃতের এক জগৎ। মুক্তমনের প্রকাশ এ-ধরনের ছবিগুলো সিনেমা হল বা টেলিভিশনের চেনা পর্দায় দুর্নিরীক্ষ্য। এ অবস্থায় আমাদের দেশেও স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির আন্দোলন বিষয়ে খুব একটা জানাশোনা ছিল না মধ্য-আশির দশক পর্যন্ত।
স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি বা বলা ভালো যে, ‘শর্টফিল্ম’ শব্দটি এদেশে প্রচলন লাভ করে ১৯৮০-র মাঝামাঝি। মোরশেদুল ইসলামের আগামী (১৯৮৪) ও তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া (১৯৮৫) – এ দুটি ত্রিশ মিনিট দৈর্ঘ্যরে, ষোলো মিলিমিটারের, সাদা-কালো ছবি সারাদেশে নতুন এ শব্দবন্ধটি পরিচিত করে তোলে। ১৯৮৬ সালে মোরশেদুল, তানভীর, তারেক মাসুদ, এনায়েত করিম বাবুল প্রমুখের নেতৃত্বে শর্টফিল্ম ফোরাম গঠিত হলে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে। প্রয়াত আলমগীর কবিরের পৌরোহিত্যে ও নির্দেশনায় শর্টফিল্ম ফোরামের তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীরা ১৯৮৮-র ডিসেম্বরে ঢাকায় আয়োজন করেন প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব। শুধুমাত্র স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির এত বড় আসর এর আগে দক্ষিণ এশিয়ায় আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর প্রতি দুবছরে একবার এ আসর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির মধ্য দিয়ে সিনেমার বিকল্প গল্প বলার যে ধারা বিশ্বের নানা দেশে চলছে – তার কিছু সংস্পর্শ এদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা পেয়ে আসছেন এই উৎসবগুলোর মধ্য দিয়ে। ১৯৮৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত বারোটি উৎসবের মধ্য দিয়ে এ মুহূর্তে এটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম (নিয়মিত) চলচ্চিত্র উৎসবের মর্যাদা লাভ করেছে।
দ্বাদশ আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন হয় ১৩ ডিসেম্বর ২০১২। বরাবরের মতো ঢাকা পাবলিক লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নির্বাচিত বিদেশি ছবির পাশাপাশি বাংলাদেশের একটিমাত্র ছবি প্রদর্শিত হয় – আবু শাহেদ ইমনের দ্য কন্টেইনার। এর আগে ছবিটি এশিয়ার সেরা চলচ্চিত্র উৎসব পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের মর্যাদা লাভ করে। সিউলে কোরীয় জাতীয় শিল্পকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে মাস্টার্স অধ্যয়নরত ইমন এ ছবিতে কোরিয়ার একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের একাকিত্ব ও বঞ্চনার চিত্র এঁকেছেন। একটি পরিত্যক্ত কন্টেইনারে তার বসবাস, সেই শ্রমিককে বিশাল কন্টেইনারসহ একটি লরিতে তুলে নিয়ে যাবার কয়েকটি মিনিট এ-ছবিতে আমরা দেখি। একরকম সংলাপহীন এ-ছবির শেষে শ্রমিকটি যখন কন্টেইনার খুলে বেরিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকায়, আমরাও তার চোখ দিয়ে যেন সমুদ্রের ওপারের আকাশটাকে দেখি।
‘মুক্ত চলচ্চিত্র, মুক্ত প্রকাশ’ – এ স্লোগান নিয়ে আয়োজিত এবারের উৎসবে ত্রিশটি দেশের প্রায় দুশটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি প্রদর্শিত হয়। সবসময়ের মতো পাবলিক লাইব্রেরি ও জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনের পাশাপাশি এবার প্রথমবারের মতো ছবি প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে। এখানেই ১৫ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের প্রধান আলোচনা-অনুষ্ঠান ‘আলমগীর কবির স্মারক বক্তৃতা’। ১৯৮৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আলমগীর কবির নিহত হওয়ার পর থেকে প্রতিটি উৎসবে এ বিশেষ বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অন্যান্য বছরে এখানে বক্তৃতা দিয়েছেন ক্রিস্টফ জানুসি, কুমার সাহানী, মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন বা গাঁস্ত রোবের্জের মতো চলচ্চিত্রবিদেরা। এবার বক্তা হিসেবে ছিলেন ফিলিপাইনে গত এক দশকে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে ‘সিনে মালায়া’ আন্দোলনের জনক নেস্টর জার্ডিন। স্বল্প বাজেটে ডিজিটাল-মাধ্যমে কীভাবে তরুণদের উৎসাহ জুগিয়ে বিকল্প এক চলচ্চিত্র-ধারা সিনে মালায়া ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছে তা জার্ডিন বিস্তারিত তুলে ধরেন তাঁর বক্তৃতায়।
উৎসবের জাতীয় সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় গোলটেবিল বৈঠক আকারে ১৭ ডিসেম্বর ২০১২। এতে আলোচ্য বিষয় ছিল – কী করে একটি যথাযোগ্য জাতীয় চলচ্চিত্র-নীতি প্রণয়ন করা যায়। মানজারেহাসীন মুরাদ প্রস্তাবিত প্রবন্ধের ওপর ভিত্তি করে এ বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, ক্যাথরিন মাসুদসহ চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট অনেকে অংশ নেন। তথ্যমন্ত্রী একটি যথাযোগ্য চলচ্চিত্র-নীতি সবমহলের মতামত নিয়ে প্রণয়নের প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে বলে মত দেন।
২০১১-র আগস্টে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও চলচ্চিত্র-গ্রাহক মিশুক মুনীরের প্রতি এ উৎসব উৎসর্গ করা হয়। তারেক ও মিশুক উৎসবের শুরুর দিনগুলো থেকে গত দুই যুগ জড়িয়ে ছিলেন এ উৎসবের সঙ্গে। এবারের উৎসবে তাঁরা পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে হাজির হয়েছেন ফ্রেম-করা ছবির আকারে – তাদের বন্ধু-সতীর্থ-অনুজেরা এ সত্য কোনোভাবে মানতে পারছিলেন না।
তারেক-মিশুককে স্মরণের পাশাপাশি এ উৎসব শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে সদ্যপ্রয়াত চারজন চলচ্চিত্রকারের প্রতি। তাঁরা হলেন – ফরাসি নির্মাতা ক্রিস মার্কার ও এরিক রোহ্মার, গ্রিক চলচ্চিত্র-স্রষ্টা (থিও) এঞ্জেলো পোরোস ও ভারতীয় নবতরঙ্গের অন্যতম প্রবর্তক মনি কাউল।
এই চারজনের নির্মিত ছবি নিয়ে এক বা একাধিক চলচ্চিত্র অধিবেশন আয়োজিত হয় এবারের উৎসবে। ফরাসি দূতাবাসের সহায়তায় এই প্রথম ঢাকায় প্রদর্শিত হলো সৃজনশীল প্রামাণ্যচিত্রের শিল্পী ক্রিস মার্কারের আটটি ছবি।
উৎসবের মূল বিভাগ ‘সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ও প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বেশি ছবি প্রদর্শিত হয়। এখানে সাম্প্রতিক বিশ্ব-চলচ্চিত্রে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির যে গতি-প্রকৃতি তার একটা ছাপ পাওয়া যায়। বিশেষত চলচ্চিত্র-ভাষা নিয়ে বিশ্বের নানা দেশে যে নতুন নতুন চিন্তাভাবনা ও নিরীক্ষা চলছে তার নমুনা পাওয়া গেছে। বলা যায় ক্রোয়েশিয়ার ছবি দেন আই সি তানজার কথা। অসুস্থ মায়ের জন্য একটি পরচুলা কিনে দিতে কিশোর ছেলের ব্যাকুল চেষ্টা ও তার নাটকীয় সমাপ্তি এ ছবির উপজীব্য। তেত্রিশ মিনিটের এ শর্ট ফিকশনটি নির্মিত হয়েছে কতগুলো স্টিল ছবির সমাহারে! দ্য কন্টেইনারসহ আরো ছবিকে হারিয়ে দিয়ে এ ছবিটি জিতে নেয় সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের পুরস্কার।
প্রামাণ্যচিত্রের বড় এক ভাণ্ডার প্রদর্শিত হয় এবারের উৎসবে। নেপালের ‘ফিল্ম সাউথ এশিয়া’ ও কলকাতার ‘ডক এজ’ উৎসব-প্রতিযোগিতার নির্বাচিত সম্ভার এখানে দর্শকদের জন্য প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশের নির্মাতাদের মধ্যে তারেক মাসুদের মুক্তির গান ও মুক্তির কথা, তানভীর মোকাম্মেলের সাড়ে তিন ঘণ্টা দীর্ঘ ছবি ১৯৭১ ছাড়াও তরুণ নির্মাতা সাইফুল ওয়াদুদ হেলালের অপরাজেয় বাংলা ও আহমেদ আবিদের ড্রিমিং ভেন্ডরস দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। তবে প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার জিতে নেয় ডেনমার্কের ছবি ফুটবল ইজ গড।
উৎসবে কাহিনি ও প্রামাণ্য-ছবি ছাড়াও ভালোসংখ্যক অ্যানিমেশন ও নিরীক্ষাধর্মী ছবি স্থান পায়। বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতা গাউশের পিজাসিন অ্যানিমেশন মাধ্যমে একটি ভালো প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত হয়। রাজনীতিবিদদের ব্যঙ্গ করে বুমস অব পলিটিশিয়ান ক্লাসিক অ্যানিমেশন হিসেবে দর্শকদের মনে থাকবে অনেকদিন।
নিরীক্ষাধর্মী ছবির ধারায় বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতা ইশতিয়াক জিকোর ৭২০ ডিগ্রি ছবিটির কথা বলতেই হয়। ক্যামেরা তার অক্ষের ওপর দুবার প্রদক্ষিণ করে একটি সমুদ্র সৈকতবর্তী এলাকাকে। ৩৬০ ডিগ্রি করে এ দুই প্রদক্ষিণের গল্প ৭২০ ডিগ্রি। এ দুই প্রদক্ষিণই ধারণ করা হয়েছে একটি লং টেকে। দুবারের এই ঘূর্ণনে আমরা দেখি সৈকতে ক্রীড়ারত কটি কাঁকড়া ও কয়েকজন মানুষকে। প্রথম দেখায় যাদের মনে হয়েছে শান্তিপূর্ণ, পরেরবার তাদের আমরা দেখি নানা বিরোধে-সংঘাতে লিপ্ত। ছবিটি দেখার পর প্রশ্ন জাগে ছবিটির বিষয় কী তা নিয়ে। তারেক শাহরিয়ারের বেস্ট ইনডিপেনডেন্ট শর্ট পুরস্কার জিতে-নেওয়া এ ছবি এক সংশয়ের বোধ জাগিয়ে তোলে। নিছক ভালো লাগা, মন্দ লাগা নয়, বিচিত্র ধারার স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির জগৎ আমাদের যে বিস্মিত ও উৎকণ্ঠিত করে তোলে সে জন্যই আমরা পরবর্তী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের অপেক্ষায় থাকব।

Leave a Reply

*