logo

দেবব্রত বিশ্বাসের জর্জদা হয়ে ওঠা

শ ঙ্ক র লা ল  ভ ট্টা চা র্য
জর্জদার চরিত্রের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর আদিখ্যেতার অভাব। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধা ছিল, কিন্তু অহেতুক গদগদ ভাব ছিল না। অধিকাংশ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও তথাকথিত রবীন্দ্রভক্তদের মধ্যে এই যে এক পায়ে পড়া বিনয় এটা স্বাভাবিক, আন্তরিক শ্রদ্ধা নয়, এ এক যুক্তিহীন আত্মপ্রত্যয়হীন আত্মসমর্পণ। সৎ, সরল ও ন্যাচারাল ট্যালেন্ট-সমৃদ্ধ জর্জদার এসবের দরকার ছিল না। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা সেটা জর্জদা কবির গান গেয়েই বুঝিয়ে দিতে পারতেন। গদগদ ভাব ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয়, যাঁদের মধ্যে এটা বেশি তাঁরা শিল্পী হিসেবে ততখানিই ছোট হয়ে যান। বরং রবীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর অপরিশোধ্য, অশেষ ঋণের জন্য জর্জদা কিছুটা খেপেখুপেই থাকতেন কবির ওপর, পিতার প্রতি যেমন কিছুটা ক্রুদ্ধ থাকে পুত্র। যা খুব স্বাভাবিক কারণ তা মানবিক, প্রাকৃতিক ও অনুভূতিময়।
জর্জদার গানের বিপুল সাফল্যের কারণও লুকিয়ে আছে রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত মনোভাবের মধ্যে। শান্তিনিকেতনের বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরীরা যে আত্মহারা, নির্মল আবেগে কবির গান গেয়ে বেড়ায় খোলা মাঠে, ক্যানালের ধারে কিংবা আরেকটু এগিয়ে পড়ে গোয়ালপাড়ার মেঠোপথ বা শীর্ণ কোপাই নদীর পাড়ে বসে, জর্জদা রবীন্দ্রসংগীতকে ঠিক সেই চেহারায় ধরে রাখতে চেয়েছিলেন তাঁর কনসার্ট হল, স্টুডিও রেকর্ডিং, খুব ঘরোয়া কিংবা খুব পোশাকি যে-কোনো অনুষ্ঠানে। এর মানে এই নয় যে, তিনি গানের স্বরলিপি বা ভাব সব নিজের মতো ওস্তাগরি করে নিতেন, তা নেওয়ার প্রয়োজন বা প্রবণতা কোনোটাই তাঁর ছিল না। শুধু রবীন্দ্রসংগীত গাইবার সময় অধিকাংশ শিল্পী (খুব কমজনকেই বাদ দেওয়া যায়) যে একটা মুডের ফর্মুলা রপ্ত করেন সেটিকে তিনি বিষের মতো বর্জন করতেন। আজকের রবীন্দ্রসংগীত যে এত নীরস তার কারণ কোনো শিল্পীই এই ফর্মুলার মধ্যে নিজেকে গুঁজে না দিয়ে কোনো গানের তল পান না এবং ওই ফর্মুলা একই সঙ্গে তাঁদের জীবন ও মৃত্যু হয়। মানুষ কথা বললে, হাসলে, কাঁদলে তাদের কত আলাদা ধ্বনি, অথচ তারা রবীন্দ্রসংগীত ধরলে সেই এক নকল খাদ, বাধা কৃত্রিম উচ্চারণ, পরিকল্পিত কণ্ঠপ্রকম্পন, কল্পিত আবেগ ও অবধারিত, অনুত্তেজক অলংকার। ফলে তাদের আওয়াজগুলোও ক্রমে ক্রমে একরকম হয়ে আসে। কেউ গান শোনানোর জন্য হাঁ করলেই বাকিটুকুও আমাদের শোনা হয়ে যায়। অথচ এত কষ্ট, অত কসরৎ না করেও যে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া যায় এবং শ্রোতার মনে প্রবেশ করা যায় তা জর্জদা ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমাণ করে দিলেন। দুজনের কেউই শান্তিনিকেতনি নন বলে এঁদের প্রশংসায় কিছু বলাও একসময় বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এতদিনে সেই বিপদ বোধহয় কাটল।
কিন্তু যা বলছিলাম। বলছিলাম যে, রবীন্দ্রনাথের গানের যে একটা মুক্ত মেজাজ ও হৃদয়বৃত্তি আছে জর্জদা সেই মেজাজটিকে ধরার জন্য একটা সরল সমাধান বার করেছিলেন। তিনি কার গান, কী বৃত্তান্ত ইত্যাদি সমস্ত ভুলে গিয়ে সেগুলিকে নিজের মনের ভাষা হিসেবে গাইতেন। কথা ও সুর অন্যের থাকত, কিন্তু শিল্পী নিজের থাকতেন। রবীন্দ্রনাথের মতো একটা বিশাল ব্যাপার ঘাড়ের ওপর চেপে বসে থাকলে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া যে অসম্ভব এটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে আমাকে তাই বলেছিলেন, কোনো গান গাইবার সময় বিশেষ কোনো ছবি, রবিঠাকুরের কোনো দর্শন আমার মাথার মধ্যে ঘোরে না, তাহলে তো ওইসব ভাবতে ভাবতে বেসুরো হয়ে যাব। আমি গানের সুরটা ভাবি আর কথাগুলোকে কতটা সুন্দরভাবে বলে ফেলা যায় তাই ভাবি। কবি কী ভাবতেন, তার চেয়ে বড় আমি কী বুঝলাম। অন্যভাবে বলতে গেলে জর্জদা গায়নকালে নিজেকে একটা কারিগর জ্ঞান করতেন, যার সামনে কতকগুলো যন্ত্রপাতি ও একটা কাজ আছে। ওই যন্ত্রগুলোর তাৎপর্য তিনি জানেন এবং কাজটা যে খুব সহজ নয় তাও পরিষ্কার বোঝেন। কিন্তু এ এমন এক ভাবের কারিগরি যে সারাক্ষণ যন্ত্রের সামনে থাকলে কাজটাও নেহাতই যান্ত্রিক হয়ে পড়বে, কারণ এ কাজে যন্ত্রের অনেকখানিই হলো যন্ত্রী নিজে। যন্ত্রী
হিসেবে নিজের এই গুরুত্ব সম্পর্কে জর্জদা চিরকালই ষোলো আনা হুঁশিয়ার ছিলেন। শিল্পীর স্বাধীনতা প্রসঙ্গটা উঠলে আজো সর্বাগ্রে আমার জর্জদার কথা মনে আসে। এই স্বাধীনতা কোনো বোর্ড, কোনো সমালোচক বা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও দেন না, এ স্বাধীনতা উঠে আসে গান নিবেদনের দুরূহ গায়ন থেকে, স্রষ্টার থেকে সৃষ্টিকে জয় করে নেওয়ার বিরল সাফল্য থেকে। রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু গান এমন এক সৌন্দর্যে জর্জদা পরিবেশন করেছেন যে গানগুলির সঙ্গে জর্জদার গানের অমলিন স্মৃতি বরাবরের মতো মিশে গেছে। তাঁর ভক্তদের কাছে আজ সেই সব গান ততটাই তাঁর যতটা রবীন্দ্রনাথের।
জর্জদার গান অত জনপ্রিয় হতে পেরেছিল কারণ তা সরল বলে নয় (ওই সরলতা যে কী ভীষণ কঠিন তা গায়ক ও বোদ্ধা শ্রোতামাত্রই জানেন), কারণ তা এক ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মনের ভাষার মতো করে গাওয়া। তাঁর কণ্ঠের গুণে এবং পরিবেশনে একটা অহৈতুকী সরল আনন্দের বিস্তারে গানগুলো রীতিমতো সংক্রামক হয়ে ওঠে। বিরহের গানও তো আমাদের অনেকখানি অহৈতুকী সুখ দেয়, কারণ গানের তাই ধর্ম, আমাদের মনের কামনা-বাসনারও তাই রীতি। কী দুঃখের গান, কী সুখের গান জর্জদা কিছু গাইলে আমরা এক সহমর্মী মানুষের সন্ধান পাই। রবিশঙ্কর তাঁর রাগ-অনুরাগে বলেছেন জর্জদার গানের দরদের কথা। বলেছেন, ‘ওঁর গান শুনলে বোঝা যায় উনি গান গাইতে ভালোবাসেন।’ আসলে এই দরদ আর এই ভালোবাসাই তাঁর গানের অন্তিম অ্যাসেট। রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে এত সুন্দর সঙ্গ জর্জদার মতো আর কেউ দেন না। এবং সেটা সম্ভব করে তোলার জন্য তিনি খুব জেনেবুঝে, সন্তর্পণে গানের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্বচর্চা করে গিয়েছিলেন। গান রেকর্ড করা নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যকে তিনি অভিমানের সঙ্গে বিজ্ঞাপিত করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, তাঁর শ্রোতা তাঁর চেহারা চেনে, তাঁর রসিক, বাউণ্ডুলে স্বভাবের কথাও জানে। তিনি অবিবাহিত এবং দিলখোলা স্বভাবের, এই বার্তাও ক্রমে ক্রমে পৌঁছে গেল শ্রোতৃসমাজে। কিন্তু জর্জদা মনেপ্রাণে খোঁজ করছিলেন একটা প্রেমিক ভাবমূর্তির, নিরালম্ব, অবিজড়িত এক মনোহরণ ইমেজের। শুধু গানে এই ইমেজ হয় না, দরকার হয় মানুষটিকেও। গোটা ষাট ও সত্তরের দশক ধরে জর্জদা একাগ্রভাবে তাঁর ভেতরকার এই প্রেমিকটিকে জগতের সামনে নিয়ে এসেছেন। বোর্ড ও সমালোচকদের সঙ্গে তাঁর বিতর্ক এই মূর্তি প্রক্ষেপণ আরো সহজ করে দেয়। অভিমান তাঁর বরাবরই ছিল, কিন্তু নিজের অভিমান নিয়ে এতখানি বিলাসিতার সুযোগ তিনি আগে কখনো পাননি। আমার সঙ্গে জর্জদার আলাপ এই অভিমানের সময়টাতে। আমি আনন্দবাজার গোষ্ঠীর এক ইংরেজি পত্রিকার কর্মী জেনে তিনি বহুৎ কিছু অভিমান অকাতরে আমার ওপর বর্ষণ করার সুযোগ নিতেন এবং আমি ওঁর একান্ত ভক্ত জেনে ভেতরে ভেতরে বেশ  েস্নহও করতেন আমাকে। আমি আনন্দবাজারের সমর্থনে কোনো কথা তাঁকে বলতাম না, কারণ আনন্দবাজারের মতামতের কোনো ধারও আমি ধারতাম না। আনন্দবাজারের প্রতি আমার আনুগত্য নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু ভালোবাসা ছিল জর্জদার প্রতি। একদিন তাই অভিমানের তোড়ে বেফস্কা বলেই ফেলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে মিশতাছেন, আপনের ক্ষতি হইব না তো?’ আসলে আমি ‘না, না’ করে যে প্রতিবাদ করলাম সেইটাই ওঁর শুনতে খুব ভালো লেগেছিল।
শেষদিকে একটা অদ্ভুত জিনিসও নজর করেছিলাম। ওঁর গানের আলোচনার থেকেও তখন তাঁর শুনতে ভালো লাগত ওঁকে নিয়ে বিতর্ক, ওঁর বই, ওঁর চিঠিপত্রের কথাবার্তা। তিনি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তাঁর গান থাকবে, তাঁর অবদান একটুও টোল খাবে না। তাই নিজের দুঃখ, অভিমান নিয়ে ভক্তদের সঙ্গে এক রসময় খেলা চালিয়ে যেতে তাঁর খুব ভালো লাগত। একবার আমাকে এবং আমার বন্ধু অভিজিৎ দাশগুপ্তকে ব্রয়লার চিকেনের রোস্ট খাওয়াবেন বলে নেমন্তন্ন করেছিলেন। শিফটের ডিউটির কবলে পড়ে গিয়ে সেই নেমন্তন্নয় যেতে পারিনি। পরদিন যেতে সে কী অভিমান ভদ্রলোকের! ‘আপনারা মশায় টাকার মর্ম কবে বুঝব্যান কন দিকি? আমি ব্রয়লার চিকেন আইন্যা রাঁইধলাম সারা সকাল ধইর‌্যা আর আপনাগোর পাত্তা নাই। আর সামনে আইয়া তো ‘জর্জদা, জর্জদা’ কইর‌্যা হ্যাদাইয়া যান। আপনে হইলেন আসলে সন্তোষ ঘোষের চর। আমি সব বুঝতাছি।’
কঠিন অবস্থা সামাল দেওয়ার কিছু টেকনিক রপ্ত আছে আমার। আমি তার একটা ব্যবহার করলাম। যেন কিছুই ঘটেনি এমন ভাব করে  বললাম, ‘আচ্ছা জর্জদা, ইদানীং ভীষণ দুঃখের গান শোনার নেশা হয়েছে আমার। দুঃখের গান ছাড়া দেখি কিছুই ভালো লাগে না। এটা কি কোনো  ডিপ্রেশনের  লক্ষণ?’  এ-কথার  সঙ্গে  সঙ্গে জর্জদার সারা মুখে
‘আহা-বেচারি!’ ভাব একটা ছড়িয়ে পড়ল, তিনি অনেকক্ষণ একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে শেষে বললেন, ‘আপনে কি প্র্যামে পড়তাছেন নাহি?’ আমি কিছু উত্তর করলাম না। তিনি তখন হারমোনিয়াম বাগিয়ে গান ধরলেন, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’। এক ফাঁকে জানালার বাইরে চোখ চালিয়ে দেখে নিলেন আকাশজুড়ে কী রকম ঘন কালো মেঘ এবং তুমুল বৃষ্টির সম্ভাবনা। আমার কল্পিত দুঃখ এবং তাঁর ধূর্ত চিকিৎসা মিলেমিশে এক হয়ে এক অসাধারণ দ্বিপ্রহর সৃষ্টি হলো।
আমার মনে হয়, উপরোক্ত থেরাপিটা জর্জদা তাঁর সমস্ত শ্রোতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতেন এবং সেটাই তাঁর আদত সাফল্য। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি ছিলেন এক বিশালসংখ্যক বাঙালি শ্রোতার মনের ডাক্তার। সুখে-দুঃখে তিনি ছিলেন বাঙালি সমাজের নির্জন, একান্ত দাদা জর্জদা। দেবব্রত বিশ্বাসের ক্রমে ক্রমে জর্জদা হয়ে ওঠাটা শিল্পী ও শ্রোতা উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জর্জদা হয়ে উঠেছিলেন জনগণের ধারণার সেই আর্কিটাইপাল অপেশাদার গানের মানুষ, যদিও জীবনের এক বড় সময় জর্জদা গানকে পেশা হিসেবেও নিয়েছিলেন। তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সদস্য হিসেবে মাঠে-ঘাটে গান করেছেন, তারও আগে বন্ধু-বান্ধবের মেসবাড়ি কিংবা ঘরোয়া জলসায় গেয়েছেন, কিন্তু পরে ডাকসাইটে গাইয়ে হয়ে ওঠার পরও ওই সরল, ঘরোয়া চেহারা ও চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসেননি। তাঁর পেশাদার গাইয়ে চেহারা ও চরিত্র ছিল অনেকটা পেশাদার লোক হিসেবে শিবরাম চক্রবর্তীর চেহারা-চরিত্রের মতো। ব্যাচেলর শিবরামবাবুর মতো জর্জদাও একটা খোশমেজাজি, সদানন্দ মানুষ থেকে গিয়েছিলেন শ্রোতা ও পাঠকের কাছে। তাঁরা তাঁদের শিল্পী ও লোক পরিচয়ের বাইরেও একটা স্বাধীন, øিগ্ধ পরিচয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন স্রেফ শিরাম আর জর্জদা।
তাঁর খোলামেলা, আটপৌরে চালচলন সত্ত্বেও জর্জদার কিন্তু একটা নির্ভুল শিল্পী উপস্থিতিও ছিল। একজন যথার্থ শিল্পীর অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্বে ছেয়ে থাকত। পোশাকি নয় অথচ শিল্পীজনোচিত এই চরিত্রভাব, খুবই বিরল ব্যাপার এবং তা তাঁর চরিত্রে সম্ভব হয়েছিল বলে জর্জদাকেও এক ধরনের বিরল, সোনার পাথরবাটি গোছের কিছু বলে মনে হতো। জর্জদা তাঁর শ্রোতা ও ভক্তদের থেকে দূরবর্তী মানুষ ছিলেন না, কিন্তু লোকের সমাজে থেকেও তিনি ভেতরে ভেতরে অনেকখানি নিঃসঙ্গ এবং সুদূর হয়ে পড়তে পারতেন। মিশুকে সামাজিক মানুষটা এদিক দিয়ে খুব অন্তর্মুখিনও, দুই বিপরীত অনুভূতির মধ্যে যাতায়াত করায় এক অনায়াস চাতুরীও ছিল তাঁর। তবে মানুষের কাছাকাছি আসার জন্য যেমন তাঁকে অনাবশ্যক আদিখ্যেতা করতে হতো না তেমনি ভেতরে ভেতরে সুদূর হয়ে ওঠার সময়ও তিনি অযথা কষ্ট দিয়ে ফেলতেন না। তাঁর যে খামখেয়ালি, whimsical স্বভাব সম্পর্কে আমরা সবাই জানি তিনি সেটিকেই নিপুণ প্রয়োগে ভেতরের ও বাইরের দূরত্ব কমাতেন কিংবা বাড়াতেন। তাঁর সাত খুন তো বটেই সত্তর খুনও মাফ ছিল, কারণ কোনো খুনই তাঁর পক্ষে কোনোদিন সম্ভব ছিল না। তিনি অদৃশ্য রক্তপাতে নিয়মিত যে খুন করে যেতেন তা তাঁর গানের মাধ্যমে। ‘মম দুঃখের সাধনে’র মতো গান তিনি যে নির্মম দক্ষতায় গেয়েছেন তারপর তাঁকে খুনি ছাড়া কিছু বলাও বোধহয় যায় না। আমরা সবাই ওই গানে খুন হয়েছি এবং বারবার খুন হতে চেয়েছি। ওই ধরনের অজস্র গানের মাধ্যমে জর্জদা হয়ে উঠেছেন আমাদের নিঠুর দরদি।
রাগ-অনুরাগ তখন ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে দেশ পত্রিকায়। একদিন জর্জদার ডেরায় গেলাম লন্ডন প্রবাসী বন্ধু সুভাষ গাঙ্গুলিকে নিয়ে। সুভাষ কিছু ওষুধ এনেছিল জর্জদার জন্য। আমায় দেখতেই জর্জদা বলে উঠলেন, ‘আরে মশায়, আমার মতন হরিজন মেথররে আবার ঝামালায় ফেলাইলেন ক্যান?’ অবাক হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন, কী করলাম আবার?’ তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘রবিশঙ্কর নাকি আমারে দু-একটা গাল দিছেন অর লেখায়?’ আমি বললাম, ‘গাল!’ তিনি ফের পান চিবুতে চিবুতে বললেন, ‘ওই হৈল আর কি! আমারে প্রশংসা দেয় সন্তোষ ঘোষ আর আনন্দবাজার। কিছু শিল্পী-টিল্পীও আছে যারা প্রশংসা দ্যায়। বাকি সবই তো গাল।’ আমি বুঝলাম, রবিশঙ্করের প্রশংসায় জর্জদা ভেতরে ভেতরে কী ভীষণ মুগ্ধ হয়েছেন। বললাম, তাহলে এই নিন ওষুধ। গালাগালির ক্ষত সারাতে লাগবে।
এরপর জর্জদা বহুক্ষণ রবিশঙ্করের গল্প করলেন। চীনে তাঁরা ভারতীয় সাংস্কৃতিক দলে একসঙ্গে ছিলেন। বললেন, ‘কেউ ভারতের গানবাজনা নিয়া আমারে কিছু শুদাইলেই আমি আঙুল দিয়া রবিশঙ্কররে দ্যাখায় দিতাম। কইতাম, ওই সুন্দর মতন লোকটারে ধরেন, ওই সব জানে থিওরিফিওরি, আমরা হইলাম, মুখ্যা-সুখ্যা। অরে ধরেন, ওই কইব সব।’
কথা শেষ হতেই জর্জদা একটা প্যাডের কাগজ বার করে খস খস করে একটা চিঠি লিখলেন রবিশঙ্করকে। তাতে তাঁর স্বাভাবিক হাসি-মশকরার স্টাইলে লিখলেন, ‘মাই ডিয়ার পণ্ডিত মশায়, কোথায় কী যেন ভালো ভালো কথা লিখেছেন এই অধমকে নিয়ে। সবাই যাকে ম্লেচ্ছ বলে তাকে প্রশংসা করে কী ঝামেলায় ফেললেন বলুন তো। নিন্দুকদের খুবই মুশকিলে ফেললেন বলে মনে হয়। যাই হোক অধমের তরফ থেকে অনেক, অনেক শুকরিয়া। ভালো থাকেন, জোরসে চালিয়ে যান। ইতি জর্জ।’
চিরকুটটা কোটের পকেটে নিয়ে গেলাম। কিন্তু যেদিন রবিশঙ্করের কাছে গেলাম সেদিন অন্য একটা কোট গায়ে। পকেট হাতড়াই, কিন্তু কিছুই পাই না। রবিশঙ্কর বললেন, ‘হারিয়ে ফেললে জর্জদার চিঠি?’
এর মাস কয়েক পরে আমি প্যারিসে পড়তে গেলাম। কোট ঝাড়াঝাড়ি করতে গিয়ে জর্জদার চিরকুট বেরোলো। ফের সেটা পকেটে নিলাম, বিলেতে রবিশঙ্করের হাতে তুলে দেব বলে। প্যারিসে দেখাও হলো রবিশঙ্করের সঙ্গে, কিন্তু ততদিনে ব্রাসেলস ও প্যারিসে বেমক্কা ঘোরাঘুরিতে চিঠিটা যে কোথায় ফেলেছি তার পাত্তা নেই। বরাবরের মতো চিঠিটা হারিয়ে গেল।
এই দুঃখ আমার কোনোদিনও যাবে না।

Leave a Reply

*