logo

তৃতীয় সিনেমা : রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণের হাতিয়ার

ই উ সু ফ  আ ল – মা মু ন

তৃতীয় সিনেমা বা থার্ড সিনেমার কথা বলতে গেলে প্রসঙ্গক্রমেই তৃতীয় বিশ্ব শব্দটি চলে আসে। পুঁজিবাদী প্রথম বিশ্ব এবং সমাজতান্ত্রিক দ্বিতীয় বিশ্বের সঙ্গে জোটনিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্বের রয়েছে আর্থসামাজিক ফারাক। এই ব্যবধানে চলচ্চিত্রও তার জায়গা করে নেয়। হলিউডি ধামাকা বাণিজ্যিক সিনেমা, যা কি না আর্থিক সাফল্যের মানদন্ডে বিবেচিত হয়, তা প্রথম সিনেমায় সদা বিরাজমান। এর বিপরীতে রয়েছে উঁচু শিল্পমানসর্বস্ব আভাঁ গার্দ ও ইউরোপীয় আর্ট সিনেমা, যা দ্বিতীয় সিনেমার প্রতিনিধিত্ব করে। প্রথম ও দ্বিতীয় সিনেমার বড় দূরত্বে থাকা তৃতীয় সিনেমার মাধ্যমে প্রকাশ ঘটে অপেক্ষাকৃত নিরীক্ষাধর্মী ও প্রতিবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের। তবে তৃতীয় সিনেমা মানে যে শুধুই তৃতীয় বিশ্বের সিনেমা তাও কিন্তু নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ।

থার্ড সিনেমা কী?

থার্ড সিনেমার প্রবক্তা আর্জেন্টিনীয় চলচ্চিত্রকার ফার্নান্দো সোলানাস ও অক্টাভিও গেটিনো হলিউডের মুনাফামুখী সিনেমাকে ফার্স্ট সিনেমা, ইউরোপীয় অথর নির্ভর অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক সিনেমাকে সেকেন্ড সিনেমা এবং তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লবী ও রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকে ‘থার্ড সিনেমা’ বলে উল্লেখ করেন।

তৃতীয় সিনেমার ধারণাটি পরিষ্কার করতে গিয়ে আফ্রিকীয় চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক টেশম গ্যাব্রিয়েল তাঁর টুয়ার্ড আ ক্রিটিক্যাল থিওরি অব থার্ড ওয়ার্ল্ড ফিল্মস বইতে উল্লেখ করেন যে, তৃতীয় সিনেমা ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি, মৌলিক চিন্তার উন্নয়ন ও সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের ক্ষেত্রে নতুন চলচ্চিত্রিক ভাষা সৃষ্টি ও তা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতীতি পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঔপনিবেশিকতার বিলোপ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্ফুটন তার সাংস্কৃতিক জাগরণে শক্তি জোগাতে থাকে। ঊনসত্তরে ‘টুয়ার্ড আ থার্ড সিনেমা’ নামক ইশতেহারের মাধ্যমে থার্ড ওয়ার্ল্ড সিনেমার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন বামপন্থী লাতিন চলচ্চিত্রকার সোলানাস ও গেটিনো, যা পরবর্তী সময়ে স্পেনীয় ভাষায় প্রকাশিত হয় চলচ্চিত্র জার্নাল ট্রাইকন্টিনেন্টালে, যার প্রকাশক ছিল অর্গানাইজেশন অব সলিডারিটি উইথ দ্য পিপল অব এশিয়া, আফ্রিকা অ্যান্ড লাতিন আমেরিকা (ওসপাল)। আজ অব্দি বিশ্ব চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই ইশতেহারকে একটি অন্যতম প্রধান সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

সোলানাস ও গেটিনোর মতে, বাজার ও মুনাফানির্ভর প্রথম সিনেমার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে তার ব্যবসায়িক সফলতা, যার ওপর ভিত্তি করে তার মান নির্ধারণ করা হয় এবং হলিউড যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কারিগরি ভেল্কি আর চোখ-ধাঁধানো আভিজাত্যে মোড়া উদ্ভট কল্পনাপ্রসূত এইসব পুঁজিবাদী সিনেমা দর্শকদের একধরনের নেশার ঘোরে বুঁদ করে রাখে। এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।

এর বিপরীতে ইউরোপীয় নবধারা থেকে উদ্ভূত দ্বিতীয় সিনেমার অবস্থান থাকলেও তার মধ্যে সমাজ পরিবর্তনের কোনো জাগরণ নেই, বরং এটি শুধুমাত্র উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিল্পমানসর্বস্ব। কারণ নয়, শুধুমাত্র ফলাফল নিয়েই এটি মেতে থাকে। গণমানুষের সংগ্রামের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। চলচ্চিত্র উৎসব আর শিল্পসংঘনির্ভর এইসব চলচ্চিত্র শুধু ক্ষুদ্র আভিজাত্যেরই প্রকাশ ঘটায়।

এই দুইয়ের বিপরীতে তৃতীয় সিনেমা তার নিজস্ব অবস্থান তৈরি করে নেয় রাজনীতি ও নান্দনিকতার সমন্বয়ের মাধ্যমে, যার ফলে চলচ্চিত্র সংস্কৃতি পরিণত হয় এক সফল সামাজিক আন্দোলনে। সাম্রাজ্যবিরোধী চেতনাসমৃদ্ধ এইসব চলচ্চিত্র তৃতীয় বিশ্বের মানুষের অধিকারের কথা বলে, তাদের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ধারণ করে তাদের মুক্তির সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক ইশতেহার। কারণ এবং ফলাফল এই দুইয়ের অনুসন্ধান করাই তৃতীয় সিনেমার কাজ।

তবে তৃতীয় সিনেমা আর তৃতীয় বিশ্বের সিনেমার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তৃতীয় সিনেমা কতগুলো রীতিনীতি মেনে চলে। রাজনৈতিকতা ও নান্দনিকতার মিশেলে এটি আগ্রাসী শক্তিমত্তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সাধারণ অর্থে তৃতীয় বিশ্ব অর্থাৎ আফ্রিকা, এশিয়া আর লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রকাররা তাঁদের অঞ্চলের দর্শকদের উদ্দেশ করেই তৃতীয় সিনেমা বানিয়ে থাকেন। তবে একইভাবে প্রথম বিশ্ব বা দ্বিতীয় বিশ্বের নির্মাতারাও এধরনের রীতিনীতি মেনে থার্ড সিনেমা বানাতে পারেন। যেমনটি ঘটেছে ইতালীয় চলচ্চিত্রকার গিলো পন্টেকর্ভোর ব্যাটল অব আলজিয়ার্স নির্মাণের মধ্য দিয়ে, থার্ড সিনেমার ক্ষেত্রে যেটিকে একটি অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে আজো ধরে নেওয়া হয়। বিষয়টি হচ্ছে নির্মাণের, অঞ্চলের নয়। তাই মাঝেমধ্যে তৃতীয় সিনেমাকে তৃতীয় বিশ্বের সিনেমা বলা হলেও তৃতীয় বিশ্বের সিনেমার বিষয়টি কিন্তু আরো বিস্তৃত, কেননা তৃতীয় বিশ্বের সিনেমা মানে সে অঞ্চলের নির্মাতাদের বানানো বাণিজ্যিক প্রথম সিনেমা এবং শৈল্পিক দ্বিতীয় সিনেমাও বটে। শুধু তাই নয়, থার্ড সিনেমা মুভমেন্ট এর আগে-পরে এবং এর রীতিনীতিবহির্ভূত তৃতীয় বিশ্বে বানানো রাজনৈতিক-সামাজিক চলচ্চিত্রও এর অন্তর্ভুক্ত।

দেশ, কাল, রাজনীতি, সমাজ, উৎস, উপাদান ও চলচ্চিত্রকার ভেদে তৃতীয় সিনেমার ধরন পরিবর্তিত হলেও তৃতীয় সিনেমা কিন্তু কিছু সহায়ক রীতিনীতি মেনে চলে। যেমন অবৈধ শাসন ও শক্তিমত্তার উৎসকে সে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় এর ঔপনিবেশিকতাবিরোধী অবস্থানের ক্ষেত্রে। আফ্রো-ফরাসি দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক, লেখক ফ্রানজ ফ্যানন এ প্রসঙ্গে তাঁর রেচড অব দ্য আর্থ গ্রন্থে ঔপনিবেশিকতার বিরূপ ফলাফলকে বিশ্লেষণ করে এর বিলোপ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করে অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা সম্পর্কে সচেতন থাকার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে তিনি আফ্রিকার অন্তর্দ্বন্দ্বকে স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে অন্যান্য মহাদেশীয় পরিপ্রেক্ষিত থেকে আলাদা করে দেখেছেন এবং জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি যে সংঘবদ্ধ স্বাধীনতা লাভের শক্তি জোগাতে পারে সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। আর জনগণের মধ্যে এই শক্তির বার্তা যে থার্ড সিনেমাই পৌঁছে দিতে পারে সেটি তিনি তাঁর বইতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

একইভাবে গণতন্ত্রের নামে ভন্ডামি বা সমাজতন্ত্রের নামে নিপীড়নের বিরুদ্ধেও তৃতীয় সিনেমা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শ্রেণি, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে তৃতীয় সিনেমা অবস্থান নেয় নিপীড়িতের পক্ষে। যে সমস্ত মানুষ অত্যাচার, নিপীড়নে কিংবা অর্থনৈতিক কারণে দেশান্তরী হয়ে পরদেশী-পরবাসী হয়, বড় জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে মিশে থাকা এ সমস্ত মানুষের পরিচয় ও সমাজ নিয়ে কথা বলে তৃতীয় সিনেমা। ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করে তার মধ্যেকার কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সেখানে নারী অধিকার, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিপন্নতা এবং শ্রেণিসংগ্রাম নিয়ে কথা বলে সে। সমাজের বুদ্ধিজীবী ও গণমানুষের মধ্যে শিক্ষা ও সংলাপের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে তৃতীয় সিনেমা। রাজনীতির ক্ষেত্রে খোলা মন নিয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনাকেও মেলে ধরে থার্ড সিনেমা। সোলানাস-গেটিনোর আওয়ার অব ফার্নেসেস, গিলো পন্টেকর্ভোর ব্যাটল অব আলজিয়ার্স, ওসমান সেম্বেনের হাল্লা, থমাস গুতিয়েরেজ আলিয়ার মেমোরিজ অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট, মৃণাল সেনের পদাতিক, ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা কিংবা জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া এগুলোর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

দারিদ্র্যকে কোনো কল্পকাহিনি হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং এর বাস্তব অবস্থারই বিশ্লেষণ করে তৃতীয় সিনেমা। ব্ল্যাক গড হোয়াইট ডেভিল চলচ্চিত্রের স্রষ্টা ব্রাজিলীয় চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক গ্লবার রোশা বিষয়টি উল্লেখ করেন তাঁর অ্যাসথেটিকস অব হাঙ্গার নামক বইতে। তাঁর মতে, তৃতীয় সিনেমা নির্মাতারা যেভাবে ক্ষুধাকে বোঝে, ইউরোপীয় এবং অধিকাংশ ব্রাজিলীয় সেটা বুঝতে চেষ্টা করে না। ইউরোপীয়রা একে বলে ‘অদ্ভুত ক্রান্তীয় পরাবাস্তবতা’ আর ব্রাজিলীয়রা বলে ‘জাতীয় লজ্জা’। তারা খেতে পায় না অথচ বলতে লজ্জা পায়। আর সে কারণেই ক্ষুধার উৎস সে জানতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মৃণাল সেন তাঁর আকালের সন্ধানে চলচ্চিত্রটির নির্মাণ প্রসঙ্গে উদয়ন গুপ্তকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দারিদ্র্যকে পবিত্র বা মহান মনে না করে বরং এর উৎস ও কারণ অনুসন্ধান করতে হবে, নইলে এই দারিদ্রে্যর জন্য দায়ী শাসকদের টলানো যাবে না।

 

দেশ ও কালভেদে তৃতীয় সিনেমা

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে লাতিন আমেরিকায় তৃতীয় সিনেমার চর্চা হলেও এর শুরুটা হয়েছিল পঞ্চাশের দশকের শেষে আর্জেন্টিনার সান্তা ফের ডকুমেন্টারি স্কুল থেকে, যার নেতৃত্ব দেন ফার্নান্দো বিরি তাঁর টায়ার ডাই নামের প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের মধ্যে দিয়ে। এরপর ষাটের দশকের শুরুতে রিও ডি জেনেরিওতে ব্রাজিলীয় সিনেমা নভোর মাধ্যমে এর চর্চা প্রসার লাভ করে। একই সময়ে হাভানায় গড়ে ওঠে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আর কিউবান বিপ্লবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে কিউবান সিনেমা। পাশাপাশি চিলিতে এর সূচনা হয় সালভাদর আয়েন্দের হাত ধরে। এক দশক পরে এল সালভাদরে পুনর্জন্ম হয় মিলিট্যান্ট সিনেমার, যার শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে চেগেভারার আমলে। আর্জেন্টিনা ও কিউবায় অবাণিজ্যিক সামাজিক সিনেমা নির্মাণের একটা অস্থিরতা বরাবরই ছিল। এটি ছিল নতুন দিনের সিনেমা, যার বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক। এই সমস্ত অস্থিরতার সঙ্গে আরো যুক্ত হয় ইতালির নব্য বাস্তবতার প্রভাব আর জন গ্রিয়ার্সনের সামাজিক প্রামাণ্যচিত্রের ধারণা। হালকা ক্যামেরার বদৌলতে শুরু হয়ে যায় গেরিলা চলচ্চিত্র নির্মাণের কৌশল। এসবের ফলে খুব দ্রুত তৃতীয় সিনেমা নির্মাণ একটি বহুমাত্রিক রূপ পেতে থাকে।

ষাটের দশকে চলচ্চিত্র উৎসবের বদৌলতে থার্ড সিনেমা যখন ঢুকে পড়ে ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকায়, তখন দর্শকরা যে শুধুমাত্র এর অদ্ভুত ক্ষমতাকে অনুভব করেন তা নয়; বরং তাঁরা এর মধ্যে খুঁজে পান নিজেদের অস্তিত্বকে। যদিও হলিউডি সিনেমার দাদাগিরি থার্ড সিনেমার বিকাশে একটা বড় বাধা ছিল, তার পরও হাভানার তৎকালীন ইন্ডাস্ট্রি একে যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে।

ফরাসি ন্যুভেল ভাগের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় আন্তোনিওনি আর বার্গম্যানদের পথচলা। তাঁরা ছিলেন আধুনিক সিনেমার রূপকার। লাতিন সিনেমায় এই অনুপ্রেরণা দারুণভাবে কাজে লাগে। কারণ ওইসব নির্মাতা চাইছিলেন তাঁদের বিপ্লব আধুনিক রূপ লাভ করুক। যাঁরা এই ধারা অনুসরণ করেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কিউবার থমাস গুতিয়েরেজ আলিয়া, বলিভিয়ার হোর্হে সাঁহিনেস, চিলির মিগুয়েল লিতিন ও প্যাট্রিসিও গুজমান, যাঁরা নির্মাণ করেন মেমোরিজ অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট, ব্লাড অব দ্য কনডর, জ্যাকল অব নাহুয়েলতরো এবং দ্য ব্যাটল অব চিলির মতো চলচ্চিত্র।

এ সমস্ত অঞ্চলে ঔপনিবেশিকতার কারণে স্পেনীয় সংস্কৃতির আধিপত্য থাকলেও সেখানে তৃণমূল পর্যায়ে তাদের নিজস্ব কেচুয়া ও আয়মারা সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত ছিল এবং এসব ছিল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। ঔপনিবেশিক এবং নিজস্বতার মিশেলে সেখানে একটি বিশেষ সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। এইসব নির্মাতা চেষ্টা করছিলেন এমন সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে, যেখানে সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে এবং যারা শোষিত, নিষ্পেষিত ও বঞ্চিত তাদের কথা যেন উঠে আসে। নির্মাতাদের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের অধিকার ও মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। আর সে কারণেই তাঁরা রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন নতুন ধারায়, নতুন আঙ্গিকে। এইসব চলচ্চিত্র বিপ্লবের ও জাতীয়তাবাদের পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

লাতিন আমেরিকার পাশাপাশি আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তৃতীয় সিনেমার চর্চা। প্রথম প্রজন্মের মৌরিতানীয় চলচ্চিত্রকার মেড হন্ডো আফ্রিকায় থার্ড সিনেমার অন্যতম একজন প্রবক্তা হন। তিনি ১৯৬৭-তে নির্মাণ করেন সোলেইল ও এবং পরে ’৭৪-এ অ্যারাবস অ্যান্ড নিগার্স-ইওর নেবারস এবং ’৯৪-এ ব্ল্যাক লাইট। সেনেগালের ওসমান সেম্বেনে নির্মাণ করেন হাল্লা, ব্ল্যাক গার্ল ও মুলাদি, যার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন সমসাময়িক রাজনীতির টানাপড়েন, নব্য ঔপনিবেশিকতা আর সামাজিক অবক্ষয়ের খুঁটিনাটি। রাজনৈতিক ও বিপ্লবী চলচ্চিত্রের মধ্যে আরো রয়েছে গিলো পন্টেকর্ভোর ব্যাটল অব আলজিয়ার্স, ইউসুফ শাহীনের আলেকজান্দ্রিয়া হোয়াই? এবং জাঁ মারিয়ে টেনোর আফ্রিকা আই উইল ফ্লিস ইউ।

এশিয়ার মধ্যে চীন ও ভারতে তৃতীয় সিনেমার প্রকাশ ঘটে সত্তরের দশকে। চীনে নবধারার সিনেমার সূচনা করেন ঝাং ইমু, চেন কাইগি ও তিয়ান ঝুয়াং ঝুয়াং। এঁদের বলা হতো ‘শিল্পের   সন্তান’। ষাট-সত্তরের দশকে চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে যে ফিল্ম অ্যাকাডেমির গোড়াপত্তন ঘটে তার মধ্যে থেকেই বেরিয়ে আসেন প্রতিভাবান সব চলচ্চিত্রকার। তবে তাঁদের ছবি সন্দিহান করে তোলে চীনা সরকারকে, যদিও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এইসব চলচ্চিত্র ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। কাইগির ইয়েলো আর্থ ছবিটি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া এশিয়ার মধ্যে ফিলিপিনো চলচ্চিত্রকার কিদলাত তাহিমিকের নামটিও সহজেই চলে আসে তৃতীয় সিনেমার কাতারে। তাঁকে বলা হয় ফিলিপিনো নিউ ওয়েভ সিনেমার জনক। ওয়ার্নার হারজগের আশীর্বাদপুষ্ট এই চলচ্চিত্রকার পর্যবেক্ষণ করেছেন নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং কাজ করেছেন তার ফলাফল নিয়ে। তাহিমিকের পারফিউমড নাইটমেয়ার এবং তুরুম্বা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য ফ্রাঙ্কো-ভিয়েতনামী নির্মাতা ট্রান আন হাংয়ের নাম, যিনি কাজ করেছেন উত্তর-উপনিবেশভিত্তিক গল্প আর আত্মজীবনী নিয়ে। তাঁর কাজের মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখ করা যেতে পারে মাফিয়া সংকট নিয়ে নির্মিত সাইকো চলচ্চিত্রটির নাম।

ভারতে তৃতীয় সিনেমার আগমন ঘটে ইন্ডিয়ান প্যারালাল সিনেমা ও ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভের হাত ধরে। ১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন পথের পাঁচালী, যা পরবর্তী সময়ে ইন্ডিয়ান প্যারালাল সিনেমা নামে একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করে। একই বছর মৃণাল সেন নির্মাণ করেন রাতভোর। এর আগে ১৯৫২ সালে যদিও ঋত্বিক ঘটক নাগরিক নির্মাণ করেন, তবে ১৯৫৮ সালে তাঁর নির্মিত অযান্ত্রিক ছবিটি দর্শক ও বোদ্ধাদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৬০ সালে সরকারি উদ্যোগে ফিল্ম ফিন্যান্স কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা হলে ইন্ডাস্ট্রির বাইরে পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টিকোণ থেকে অবাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণের সুযোগ ঘটে, যা নিউ ওয়েভ ইন্ডিয়ান সিনেমা বা নিউ ইন্ডিয়ান সিনেমা নামে পরিচিতি লাভ করে।

এফএফসির অর্থায়নে ১৯৬৯ সালে মৃণাল সেন নির্মাণ করেন ভুবনসোম এবং একই বছর মনি কাউল নির্মাণ করেন উসকি রোটি, যার মধ্যে ছিল ফরাসি ন্যুভেল ভাগের অনুপ্রেরণা। এই সিনেমার ভাষা ও সংবেদনশীলতা দুটোই আকৃষ্ট করে দর্শক-বোদ্ধাদের। এই পথরেখা ধরে হিন্দি ভাষায় ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভ সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসেন এফটিআই গ্র্যাজুয়েট কুমার সাহানি, মনি কাউল, সাঈদ মীর্জা, শ্যাম বেনেগাল ও কেতন মেহতা।

তবে আশির দশকে সত্যজিৎ রায়ের কলকাতা ট্রিলজি অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১) ও জন অরণ্য (১৯৭৬) এবং মৃণাল সেনের কলকাতা ট্রিলজি অর্থাৎ ইন্টারভিউ (১৯৭১),
কলকাতা-৭১ (১৯৭২) ও পদাতিক (১৯৭৩) ছবিতে থার্ড সিনেমার জোরালো বৈশিষ্ট্যগুলো প্রতিফলিত হয় এবং ভারতে থার্ড সিনেমার বিকাশে এই ছবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আশির দশকে ভারতের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক অবক্ষয়, সীমাহীন দুর্নীতি, নগর কাঠামোর পরিবর্তনে উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে সাধারণ মানুষের ছিটকে পড়া, নক্সালবাড়ি আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও এর প্রভাব এবং সর্বোপরি দেশভাগের ক্ষত – সবকিছুই প্রতিবাদী চলচ্চিত্রিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে এইসব সিনেমায়। এই প্রতিবাদ কখনো প্রকট আবার কখনো বা প্রচ্ছন্ন হয়ে ফুটে উঠেছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী একটি সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী একজন আদর্শবাদী তরুণের নৈরাশ্য ও নতুন জীবন অনুসন্ধানের গল্প। জন অরণ্য ছবিতে আমরা আরেক তরুণকে দেখতে পাই ক্ষয়িষ্ণু সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আদর্শগতভাবে হোঁচট খেয়ে আপস করে সামনে এগিয়ে যেতে। এছাড়া সামনে এগোনোর পথে যখন উচ্চাকাঙ্ক্ষা একটি অবধারিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন আপসকামিতা কী করে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় ছুটে চলা একজন মানুষকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে এবং নীতিহীনতার চোরাবালিতে টেনে নেয় সে গল্পই চিত্রায়ণ করা হয়েছে সীমাবদ্ধ ছবিতে।

জন অরণ্য নির্মাণ প্রসঙ্গে সিনেস্তে ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলেন, ‘আমি আমার চারপাশে দেখেছি, অনুভব করেছি সীমাহীন দুর্নীতি। সারা কলকাতাজুড়ে মানুষ এ নিয়ে কথা বলেছে। সবাই জানে সড়ক ও পাতাল রেলের জন্য যে সিমেন্ট বরাদ্দ হতো তা লোপাট করত ঠিকাদাররা, সেই সিমেন্ট দিয়ে নির্মাণ হতো তাদের বহুতল ভবন। জন অরণ্য এমনই এক সীমাহীন দুর্নীতির গল্প, যার কোনো সমাধান নেই।’ তবে এটা ঠিক, কোনো সমাধান বা দিকনির্দেশনায় না গিয়ে সত্যজিৎ বরং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দর্শকের মনে আঘাত করে তাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। কলকাতা ট্রিলজি তারই অনন্য উদাহরণ।

অপরপক্ষে মৃণালের চলচ্চিত্রিক ভাষা সরাসরি প্রতিবাদে মুখর, আক্রমণাত্মক ও বিপ্লবী আহবানে পরিপূর্ণ। তাঁর ট্রিলজিতে ফুটে উঠে ভাগ্য অন্বেষণে ছুটে চলা মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্গতির চিত্র, কারণ অনুসন্ধান, আত্মসমালোচনা এবং পরিশেষে প্রতিবাদের ডাক। তাঁর ইন্টারভিউ চলচ্চিত্রটি মূলত বেশভূষার অভাবে চাকরিপ্রার্থী একজন মানুষের সামাজিকভাবে নাকাল হওয়া এবং পরিশেষে এই আরোপিত বেড়াজাল ছিন্ন করার প্রচেষ্টা, যা একটি প্রতীকী অর্থে উপস্থাপিত। কলকাতা-৭১ এ দেশভাগের আগে-পরে মানুষের অস্তিত্ব, রাজনৈতিক ও আর্থসামজিক সংকট, সংশয়, বিপর্যয়, মুক্তি ও সংগ্রামের অস্থিরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশভাগের আগে-পরের ইতিহাসকে চিত্রায়িত করতে গিয়ে সেটাকে মূলত হাজার বছরের এই ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করে হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। এর পরম্পরায় পদাতিক ছবিটিও ছিল পুরোপুরি আত্মসমালোচনায় মুখর। নারীমুক্তি থেকে শুরু করে শ্রেণিসংগ্রাম পর্যন্ত সবই স্থান পেয়েছে এতে। এছাড়া রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণের নামে দমন, নিপীড়ন ও অন্ধ অনুকরণে বাধ্য করা এবং দলছুট ও অবিশ্বাসীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াসহ সবকিছুরই সমালোচনা করা হয়েছে।

 

সত্যজিৎ, মৃণাল ছাড়াও দেশভাগ ট্রিলজি বানিয়েছেন ঋত্বিক ঘটক। তাঁর মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখা ছবিতে দেশভাগের ফলে স্থানান্তরিত মানুষের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক বিপন্নতার যে চিত্র ফুটে ওঠে তার মধ্যে মিশে আছে থার্ড সিনেমার অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ। বাংলা ভাগকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি মৃণাল। সে হাহাকার বিদ্যমান তাঁর ট্রিলজির সর্বত্র। তবে একদিকে নিয়তির নির্মম পরিহাসকে তুলে ধরলেও অন্যদিকে তিনি ডাক দিয়েছেন জাগরণের। মেঘে ঢাকা তারার অন্তিম মুহূর্তে শিলংয়ের পাহাড়ে ৩৬০ ডিগ্রি প্যানে প্রতিধ্বনিত নীতার চিৎকার ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’ কিংবা সুবর্ণরেখার শেষ দৃশ্যে আধো বোলে পবিত্র সুরে শিশু বিনুর কণ্ঠে উচ্চারিত হওয়া ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়া’ গানটি এবং ন্যুব্জ ঈশ্বরকে স্বপ্নের নীল পাহাড়ের দিকে বিনুর টেনে নেওয়া অথবা কোমল গান্ধারে ভৃগু, অনসূয়া, ঋষি আর জয়ার পুনর্মিলন আর তার সঙ্গে শাঁখের আওয়াজ, উলুধ্বনি, পাহাড়, নদী, আকাশ, মাটির ক্রস ডিজলভ যেন পুনর্জাগরণের ডাক দিয়ে যায়। এগুলো আমাদের তৃতীয় সিনেমা সম্পর্কে ফ্রানজ ফ্যাননের আদর্শিক সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে সাংস্কৃতিক স্মৃতিকাতরতার বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়।

সমসাময়িক ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর বেশ কিছু কাজে থার্ড সিনেমার প্রবণতা দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে তাহাদের কথা, বাঘ বাহাদুর ও লাল দরোজার নাম উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া গৌতম ঘোষের কিছু কাজেও থার্ড সিনেমার প্রভাব রয়েছে। তবে সম্প্রতি যে চলচ্চিত্রটিকে তৃতীয় সিনেমার একাধিক বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ বলে উদাহরণ দেওয়া যায়, সেটি হচ্ছে নবারুণ চট্টোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত সুমন মুখোপাধ্যায়ের ছবি হারবার্ট। সময়ের নির্মমতার শিকার ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত একজন আত্মহননকারী সাধারণ মানুষের ওপর ভিত্তি করে একটি বিপ্লবের পূর্বাভাস দিতে চেষ্টা করা হয়েছে পুরো ছবিজুড়ে, যার মধ্যে গেঁথে আছে নক্সালবাড়ি-মাওবাদী আন্দোলনের কথা। এ ছবির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ একটি সংলাপ ‘ভূত ছিল, ভূত আছে, ভূত থাকবে’। শুধু বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং কাঠামোর ক্ষেত্রেও তৃতীয় সিনেমার অনন্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করে হারবার্ট। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের শক অ্যান্ড অ্যাসটোনিশমেন্ট, ভিক্টর শেক্লাভোস্কয়ের মেকিং স্ট্রেঞ্জ কিংবা ব্রেখটের ডিসট্যানসিয়েশনের বহুবিধ প্রয়োগ রয়েছে এতে, যা ক্ষেত্রবিশেষে মৃণাল ও সত্যজিতের কলকাতা ট্রিলজিতেও ব্যবহৃত হয়েছে।

বাংলাদেশে মূলধারার চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে তৃতীয় সিনেমার চর্চা করেছেন পথিকৃৎ চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ও চলচ্চিত্রাচার্য আলমগীর কবির, যাঁদের দুজনই ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। এক্ষেত্রে জহির রায়হানের একটি উদাহরণই যথেষ্ট, যার নাম জীবন থেকে নেয়া। এছাড়া তাঁর পরিকল্পিত একুশে ফেব্রুয়ারী কিংবা অসমাপ্ত লেট দেয়ার বি লাইটের নামও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে বাঙালির স্বাধীনতার যে মূলমন্ত্র তিনি উচ্চারণ করেছেন জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রে তা দেশ-কাল ছাপিয়ে তৃতীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক মানচিত্রে স্থান করে নেওয়ার কথা ছিল; যদিও বাস্তবে হয়নি। সম্ভবত জহির রায়হান সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতা বা প্রচারবিমুখতাই এর জন্য দায়ী। অথচ সবচেয়ে সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা যে ব্যাটল অব আলজিয়ার্সের নাম উচ্চারণ করি তা কিন্তু নির্মিত হয়েছিল সফল বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর, স্বাধীন দেশে, সেইসব বিপ্লবীর পৃষ্ঠপোষকতায়। আর জীবন থেকে নেয়া নির্মিত হয়েছিল সবচাইতে প্রতিকূল রাজনৈতিক অবস্থা ও গণ-আন্দোলনের সময়, যে চ্যালেঞ্জ তাকে পেরোতে হয়েছে সাফল্যের সঙ্গে, কৌশলে। আর সেজন্যই তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে রূপকের, যার জাদুকরী ক্ষমতা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত টের পেয়েছিল।

জহির রায়হানের অন্তর্ধানের পর তাঁর সহযোদ্ধা আলমগীর কবির রাজনৈতিক ও বিপ্লবী চলচ্চিত্র নির্মাণের যে গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, তার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে তাঁর সূর্যকন্যা, সীমানা পেরিয়ে, ধীরে বহে মেঘনা, রূপালী সৈকতে আর মোহনার মতো যুগান্তকারী সব কাজ। সূর্যকন্যায় তিনি নারীমুক্তির কথা বলেছেন সাহসী উচ্চারণে, বলেছেন সমাজ পরিবর্তনের কথা। ধীরে বহে মেঘনায় বলেছেন বাংলাদেশের পুনর্জাগরণের কথা। অন্য ছবিগুলোতেও প্রকাশ পেয়েছে পরিবর্তনের কথা। আলমগীর কবিরের এই ধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীকালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী নির্মাণ করেন নব্য ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ছবি ঘুড্ডি, শেখ নিয়ামত আলী এবং মশিহউদ্দীন শাকের যৌথভাবে নির্মাণ করেন সূর্যদীঘল বাড়ি।

মূলধারার পাশাপাশি বিকল্পধারার ও স্বাধীন চলচ্চিত্রকাররা কাঠামো ও শৈলী নিয়ে শুরু করেন নানা ধরনের নিরীক্ষা। এর মূলে ছিল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও চলচ্চিত্রের পঠন-পাঠন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি নাম মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল ও তারেক মাসুদ। মোরশেদুলের আগামী, সূচনা ও চাকা এবং মোকাম্মেলের হুলিয়া, নদীর নাম মধুমতি ও চিত্রা নদীর পাড়ে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, যেগুলোর মধ্যে থার্ড সিনেমার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে সমসাময়িক বাংলাদেশি চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে যে নামটি এক্ষেত্রে গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হতে পারে তিনি হচ্ছেন অকালপ্রয়াত কুশলী নির্মাতা তারেক মাসুদ, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রভূমিকে যিনি জহির রায়হান-আলমগীর কবিরের পর উর্বর করেছেন পরম মমতায়। তাঁর নির্মিত মাটির ময়না চলচ্চিত্রটি একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যেটিকে তিনি কাহিনির সঙ্গে প্রামাণ্যচিত্রের মিশেলে শক্তিশালী করে তুলেছেন। এছাড়া অন্তর্যাত্রা ও রানওয়ের নির্মাণেও লক্ষ করা যায় থার্ড সিনেমার অনন্য বৈশিষ্ট্য।

থার্ড সিনেমার উদ্ভব, বিকাশ ও চারণ একটি বিশেষ সময়ে হলেও এটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়নি বা এর মৃত্যু ঘটেনি, বরং এই চলচ্চিত্ররীতি বেঁচে আছে এর আদর্শিক নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে। তাই তৃতীয় বিশ্বের মানুষ কিংবা সেখান থেকে প্রথম বিশ্বে পরদেশী-পরবাসী হওয়া তাদের সহযোদ্ধারা সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে আজো বেছে নেয় তৃতীয় সিনেমা নির্মাণের কাজ। মীরা
নায়ার-দীপা মেহতাদের বেশ কিছু কাজের মধ্যে এই প্রবণতা চোখে পড়ে। প্রথম বিশ্বের চলচ্চিত্রকাররাও যোগ দিয়েছেন এ ধারায়। যেমন স্পাইক লি নির্মাণ করেছেন তাঁর বর্ণবাদবিরোধী ছবি ডু দ্য রাইট থিং, জিম জারমুশ বানিয়েছেন কফি অ্যান্ড সিগারেট, জন অ্যাকমফ্রা করেছেন হ্যান্ডসওয়ার্থ সংস আর সারা গ্যাভরন চিত্রায়ণ করেছেন ব্রিকলেন। এভাবে তৃতীয় সিনেমার ধারা ও চর্চা বিশ্বসমাজে নিরন্তর চলমান থাকবে বলে ধারণা করা যায়, কারণ সময়ের প্রয়োজনে এটি আত্তীকরণ করে নেয় সহায়ক উপাদান ও ব্যাকরণ। আর তাই এর মৃত্যু নেই।

 

 

তথ্যসূত্র

১.  Third Cinema in the Third World : The Aesthetics of Liberation. Teshome H Gabriel. Umi Research Press, 1979.

২.  Political Film : The Dialectics of Third Cinema. Mike Wayne, Pluto Press, 2001

৩.  http://www.mchanan.com/latin-america

৪.  Rethinking Third Cinema : The Role of Anti-colonial Media and Aesthetics in Postmodernity by Frieda Ekotto

৫.  East-West Encounters : Franco-Asian Cinema and Literature By Sylvie Blum-Reid

৬.  Rethinking Third Cinema edited by Anthony R. Guneratne, Wimal Dissanayake

৭.  New Indian Cinema in Post-Independence India : The Cultural Work of Shyam Benegal’s Films (Intersections : Colonial and Postcolonial Histories) by Anuradha Dingwaney Needham

৮.       http://offscreen.com/view/third_cinema_today

Leave a Reply

*