logo

তারকোভস্কির চলচ্চিত্রে ঈশ্বর এবং বিজ্ঞান

র ত ন পা ল

সোভিয়েত ইউনিয়ন যুগের চলচ্চিত্র পরিচালক আন্দ্রে তারকোভস্কি বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের গুরু-পরিচালকদের একজন। তিনি নানা কারণে আলোচিত। একদল মনে করেন তিনি খুব দুর্বোধ্য, একান্তই নিজের জন্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। আরেকদল মনে করেন, তিনি চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রকার। তাঁর সৃষ্টি কাব্যিক, চলচ্চিত্রের নতুন দিগন্ত তিনি উন্মোচন করেছেন, চলচ্চিত্রের প্রতি তিনি ছিলেন একাগ্র; নিজের বিশ্বাসের প্রতি একনিষ্ঠ থেকে সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সর্বক্ষণ যুদ্ধ করে শিল্পসৃষ্টি তাঁকে অন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।
আন্দ্রে তারকোভস্কি ১৯৩২ সালের ৪ এপ্রিল মস্কোর অনতিদূরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আর্সেনি তারকোভস্কি ছিলেন বিখ্যাত রুশ কবি। মা পড়েছিলেন সাহিত্যে। আর্সেনি তারকোভস্কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধ শেষে স্ত্রীর কাছে ফিরে আসেননি। তারকোভস্কি থেকেছেন তাঁর মায়ের সঙ্গে। বাবার বিরুদ্ধে তাঁর এ-ব্যাপারে অভিযোগের কোনো প্রমাণ আমরা পাই না। মিরর চলচ্চিত্রে বাবা-মায়ের প্রসঙ্গ এনেছেন, সেখানেও বাবা-মায়ের আলাদা থাকার বিষয়টি কোনো বিষয় হিসেবে আসেনি। তিনি নিজে বিয়ে করেছেন দুবার।
তারকোভস্কির ছোটবেলা কেটেছে গ্রামের বাড়িতে। সেখানে স্কুলে পড়ার সময় শিখেছেন পিয়ানো। তারপর মস্কো এসে আরবি ভাষা শিখেছেন এক বছর, কিন্তু সেটি অসমাপ্ত রেখে তিনি ভর্তি হন খনিজ বিজ্ঞানে। এই পাঠের অংশ হিসেবে এক বছরের জন্য সাইবেরিয়ার বনাঞ্চলে গবেষণা দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। সাইবেরিয়ার বনাঞ্চলেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন চলচ্চিত্রে অধ্যয়ন করবেন। তারকোভস্কি সেখান থেকেই ভর্তির আবেদন করেন ফিল্ম স্কুলে (ভিজিআইকে)। সেখানে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় অধ্যয়ন করেন। তাঁর ডিপ্লোমা ফিল্ম স্টিমরোলার অ্যান্ড ভায়োলিন প্রশংসিত হয় এবং ১৯৬১ সালের নিউইয়র্ক স্টুডেন্ট ফিল্ম উৎসবে প্রথম পুরস্কার পায়।
আন্দ্রে তারকোভস্কি মারা যান প্যারিসে, ১৯৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর। তাঁর ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছিল। প্যারিসে মৃত্যুবরণের কারণ তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাসনে গিয়েছিলেন।
ছাপ্পান্ন বছরের জীবনে তারকোভস্কি মাত্র সাতটি চলচ্চিত্র তৈরি করতে পেরেছেন। প্রথম চলচ্চিত্র আইভানস চাইল্ডহুড তিনি পেয়েছিলেন কপালের জোরে। এটা যথারীতি মস ফিল্মের প্রডাকশন। পরিচালক এডয়ার্ড এবালভকে কর্তৃপক্ষ ‘ফায়ার’ করলে তারকোভস্কি পেয়ে যান কাজটি। ছবিটির একটি চিত্রনাট্য তিনি হাতে পেয়েছিলেন, কিন্তু তারকোভস্কি আবার চিত্রনাট্য করেছিলেন মূল গল্পের লেখক বোগোমোলভের সঙ্গে। তিনি এজন্যে ক্রেডিটে নাম-স্বীকৃতি পাননি। তিনি ‘কিছু’ পরিবর্তন করতে পেরেছিলেন, কিছু পারেননি। সেজন্যেই হয়তো চলচ্চিত্রটি নিয়ে তেমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। আবার অন্য কারণও থাকতে পারে। একজন শিল্পীর মাধ্যমের ওপর দখল পেতে সময় লাগে – অনেকে সারাজীবনেও পান না খুঁজে। হয়তো সেজন্যেই চলচ্চিত্রটিতে কম্পোজিশন, মিজোসিন, লেন্সিং ইত্যাদিতে পূর্বসূরিদের উদ্ভাবিত পদ্ধতি যেমন রাশিয়ান অ্যাঙ্গেল, রাশিয়ান শট-বিভাজনের প্রভাব লক্ষ করা যায়। সেইসঙ্গে কিছু মোটিফ, যেমন যুদ্ধের ধ্বংসলীলার মধ্যে খ্রিস্টীয় প্রতীক ক্রুশের সোজা দাঁড়িয়ে থাকা; কিছু দৃশ্যকল্প যেমন আইভানের স্বপ্নদৃশ্যে ‘উড্ডয়ন’; কিছু শব্দ যেমন, দূরের কুকুরের ডাক, নিস্তব্ধতার মধ্যে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ার শব্দ, মেঝেতে কোনো কিছুর পতনের শব্দ, কোনো পতিত জিনিসের মেঝেতে গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ ইত্যাদির ব্যবহার মাত্রাযুক্ত মনে হয়, যা পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে নতুন মাত্রায় তারকোভস্কীয়তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
আইভান’স চাইল্ডডের প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আইভান নামে একটি সাধারণ বালকের যুদ্ধকালীন সময়ে অতিমানবীয় সাহস অর্জন এবং প্রশিক্ষিত সোভিয়েত সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সমানতালে তার যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং সবশেষে চিরদিনের মতো হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্রায়ণ করেছেন পরিচালক। চলচ্চিত্রটিতে বেশ কয়েকটা ফ্ল্যাশব্যাক আছে। আইভানের দৃষ্টিকোণ থেকে সেসব সৃষ্ট, কিন্তু চলচ্চিত্রটির শেষের ফ্ল্যাশব্যাকটি কার দৃষ্টিকোণ থেকে সৃষ্ট সেটা নিয়ে নানান আলোচনা চলে। চলচ্চিত্রটি কি এটি ছাড়া শেষ হতে পারে না, হলে কেমন হতো? আমরা দেখি যুদ্ধ শেষ হয়, তৃতীয় রাইখের পতনের মাধ্যমে। আমরা চলে যাই বার্লিনের সেই অংশে, যেটি সোভিয়েত ইউনিয়ন দখল করেছে। নির্যাতন কক্ষ। সোভিয়েত সামরিক কর্মকর্তা সেখানে ভাগ্যাহত নিহত ব্যক্তিদের ছবিসহ কাগজপত্র দেখছে। সে দেখে আইভানের ছবি। পরিষ্কার হয়ে যায়, আইভান এখানে নির্যাতিত হয়ে নিহত হয়েছে। এরপর সেই ফ্ল্যাশব্যাক – নদীর ধারের দৃশ্যপট, আইভান দৌড়াচ্ছে, গাছে আঘাত পায়। চলচ্চিত্রটি শেষ হয়।
চলচ্চিত্রটির কয়েকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা দরকার। গল্পের রৈখিকতা মাঝেমধ্যেই ভেঙেছেন তারকোভস্কি, যা পরের চলচ্চিত্রগুলোতে আরো বেড়েছে; ছবিতে আইভানের দৃষ্টিকোণ ছাড়াও অন্য একটি পাতি দৃষ্টিকোণ (সাব-প্লট) আছে। ক্যাপ্টেন কোলিন এবং নার্স মাশার জন্য তারকোভস্কি ব্যয় করেছেন কিছু সময়, কোলিন আকৃষ্ট হয় নার্সটির প্রতি – যেমনটি তারকোভস্কির পরের চলচ্চিত্রগুলোতে একদম অনুপস্থিত। তাঁর বাকি ছয়টি চলচ্চিত্রে দেখা যায় নায়ক (কখনই নায়িকা নয়) এক সংকটের সম্মুখীন। এই সংকট তাকে পরিশুদ্ধ করে, মহান করে, এই সংকট অনেক ক্ষেত্রে সামষ্টিক হয়েও শুধুই ব্যক্তিগত।
তারকোভস্কি ভীষণভাবেই ঈশ্বর-বিশ্বাসী। আইভান’স চাইল্ডহুড- তৈরির সময় তিনি মস ফিল্মকে প্রস্তাব দেন চোদ্দ শতকের রাশিয়ান আইকোনোগ্রাফার আন্দ্রেই রুবলেভকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর। এবার এ চলচ্চিত্রটির ‘অথর’ হওয়ার সুযোগ তিনি নিতে চান। মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাস থেকে আন্দ্রে রুবলেভ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। এমনকি তাঁর জন্মস্থান, শৈশব, মৃত্যুস্থান এবং মৃত্যুর বছর নিয়ে আছে নানান মত। তবে তারকোভস্কির জন্যে এটুকু নিশ্চয় অনুমান করার সুযোগ ছিল যে, সে-সময়ের বাইজেনটাইন শিল্পীদের মতন আন্দ্রে রুবলেভও ঈশ্বরের পায়ে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু চিত্রনাট্য তৈরির পূর্বক্ষণে তারকোভস্কির জন্য দুটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়; প্রথমটি হলো, ঈশ্বরের পথের পথিকের লক্ষ্য কী? তিনি উত্তর তৈরি করেন এইভাবে, একজন শিল্পীর উদ্দেশ্য হলো ঈশ্বরানুসন্ধান। দ্বিতীয় প্রশ্ন, ঈশ্বরানুসন্ধানে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গগুলো কী? প্রথমত, শিল্পীকে প্রকৃতির সঙ্গে থাকতে হবে। প্রকৃতিই তার ঘর, ঠিকানা। আর দ্বিতীয়ত, জাগতিক বিষয়াদির প্রতি নির্মোহ হতে হবে এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য হতে হবে ধীশক্তির অধিকারী। চলচ্চিত্রটিতে আন্দ্রে রুবলেভকে ঠিক এমন চরিত্রাধিকারী হিসেবে দেখতে পাই আমরা এবং যে রাশিয়ার পটভূমিতে তিনি ভ্রমণ করছেন, সেখানে কক্ষপথচ্যুতির জন্য অনুঘটকের অভাব নেই। আমরা দেখি, আন্দ্রে রুবলেভসহ একদল চিত্রশিল্পী স্থান থেকে স্থানান্তরে গমন করছেন। তাঁরা খ্রিষ্টীয় মতবাদের পবিত্র মানুষদের মুখচিত্র অাঁকছেন, গির্জা নির্মাণ করছেন, গির্জা অলংকরণ করছেন। তাঁরা রাজশক্তি, ক্ষমতালোভী বহিঃশক্তির আক্রমণ-অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন কিন্তু থাকছেন নির্মোহ। সবসময় যে পারছেন তাঁরা তা নয়। তাতারদের দানবীয় আক্রমণ পর্যবেক্ষণ করে রুবলেভ জীবনবিমুখ হয়ে পড়েন, তখন হাজির হন তাঁর গুরু – থিয়োপেন দ্য গ্রিক। শিল্প, শিল্পী, জীবন নিয়ে গুরু-শিষ্যে চলে আলোচনা, কিন্তু এ কোন থিয়োপেন দ্য গ্রিক? তিনি কি জীবিত, না মৃত? এটা স্বপ্নদৃশ্য, সত্য ঘটনা, নাকি কল্পনা?
প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, আন্দ্রে রুবলেভ চলচ্চিত্রে দুটি জিনিসের সম্মুখীন হই আমরা। দ্ব্যর্থকতা এবং দ্যোতনা। এই দুটির ব্যবহার পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে আরো নতুন মাত্রায় ব্যবহার করেছেন তারকোভস্কি। গল্পের রৈখিক প্রবাহ তো প্রথম চলচ্চিত্রেই ভেঙেছেন এবং সেটি অনুধাবন করা যায় গল্পের অগ্রসরতার সঙ্গে; কিন্তু পরের চলচ্চিত্রগুলোতে শুরুতে মনে হয় না যে গল্পের প্রবাহ রৈখিকতা ভেঙেছেন, কিন্তু একপর্যায়ে এসে তেমনটি ভাবনার অবকাশ দেয়, এই অবকাশ সৃষ্টি শুধু দৃশ্য সাজানো দেখে মনে হয় তা নয়, শব্দের তারকোভস্কীয় ব্যবহারে এমন দ্ব্যর্থকতা বা দ্যোতনা সৃষ্টি হয় যে, পুরো বিষয়টি বহুমাত্রাযুক্ত হীরকখন্ডের মতন জ্যোতি ছড়ায়। সমালোচকেরা বলেন, এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণপ্রক্রিয়ায় তারকোভস্কি নিজের জীবনদর্শনকে শাণিত করেছেন, পরিশীলিত করেছেন, সন্ধান পেয়েছেন সেটিকে প্রকাশ করার শৈলী। আন্দ্রে রুবলেভে আলো-ক্যামেরা-শব্দের ব্যবহার, গল্পের বুনন, অভিনয়শৈলী এবং সর্বোপরি এসব উপাদানের মাধ্যমে স্বীয় দর্শনের উপস্থাপন চলচ্চিত্রতত্ত্বে তারকোভস্কীয় নাম পরিগ্রহ করে।
সোলারিস আন্দ্রে তারকোভস্কির তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। আইভান’স চাইল্ডহুড এবং আন্দ্রে রুবলেভের পর বিখ্যাত পোলিশ কল্পবিজ্ঞান লেখক স্টেনিশল লেমের একই নামের উপন্যাস থেকে তারকোভস্কি নির্মাণ করেন চলচ্চিত্রটি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিল্প এবং শিল্পী নিয়ে এমন সুন্দর একটি চলচ্চিত্র উপহার দেওয়ার পর পরবর্তী চলচ্চিত্র তৈরির জন্য কল্পবিজ্ঞানকে কেন নির্বাচন করেছিলেন তারকোভস্কি? যেখানে তারকোভস্কি আন্দ্রে রুবলেভ তৈরির সময় বলছেন যে, শিল্পী প্রকৃতি থেকে দূরে থাকতে পারেন না সেখানে তিনি চলে যাচ্ছেন মহাকাশে। কল্পবিজ্ঞান বলতে সাধারণে যে দৃশ্য ভেসে ওঠে সেটা হলো, ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপট – সেখানে সে-সময়ের বিচিত্র বেশভূষায় পাত্র-পাত্রীরা বিচরণ করছে, তাদের সংকট হলো তারা ভিন গ্যালাক্সির অতি বিচিত্র দেখতে প্রাণীদের আবির্ভাবে চিন্তাকুল বা নতুন কোনো বীজাণুর আবির্ভাবের ফলে তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ইত্যাদি। সোলারিসের কাহিনি সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। স্টেনিশল লেম আসলে একদম অন্যরকমের কল্পবিজ্ঞান লেখক। তিনি উচ্চশিক্ষা নেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে, কিন্তু সেটাকে পেশা হিসেবে না নিয়ে শুরু করলেন কবিতা লেখা। একপর্যায়ে তিনি আগ্রহী হলেন কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনি লেখায়। বিষয়ের বৈচিত্র্যের জন্য তাঁর লেখা বিদগ্ধ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, পূর্ব ইউরোপের ভাষাগুলোতে অনূদিত হলো, কিন্তু কল্পবিজ্ঞানের সেইসব পশ্চিমীয় জনপ্রিয় উপাদানসমূহ না থাকায় সেদেশগুলোতে তিনি থেকে গেলেন অজানা। স্টেনিশল লেম সোলারিস লিখেছিলেন ১৯৬১ সালে। গল্পটি এই রকম : মহাকাশে সোলারিস নামের একটা প্লানেটের ওপর একদল বিজ্ঞানী গবেষণা চালিয়ে আসছে বহুদিন হয়, এটা এলিয়েনদের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টির একটা প্রকল্প। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয় সেই স্টেশনটির বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখছে না। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কাউকে সেখানে পাঠাতে হবে। কেলভিন একজন মনোবিজ্ঞানী। তাকে সেখানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। বইটি শুরু হয় কেলভিনের স্পেসশিপে অবতরণের মধ্য দিয়ে। স্পেসশিপে সে অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। সবাই যার যার মতন থাকছে, রহস্যময় আচরণ করছে। ক্রমে সে জানতে পারে, বেশ কয়েকদিন আগে স্পেসশিপ থেকে সোলারিসের ঘন বলয়ের ওপর বিজ্ঞানীরা উচ্চশক্তিসম্পন্ন এক্স-রে আঘাত করেছে আর এতে হয়েছে যত বিপত্তি। এলিয়েনরা বিজ্ঞানীদের মনস্তত্ত্ব পড়ছে আর তাদের অতীতের বেদনাদায়ক ঘটনার সঙ্গে জড়িত চরিত্রদের তৈরি করে পাঠিয়ে দিচ্ছে স্পেসশিপে। ঘটনাক্রমে কেলভিনও পড়ে একই রকম ঘটনার মুখোমুখি। তার স্ত্রী হারি একদিন মাটির পৃথিবীতে তার সঙ্গে ঝগড়া করে আত্মহত্যা করেছিল। সেই হারির আগমন ঘটে স্পেসশিপে কেলভিনের ঘরে। কেলভিন তাকে কৌশলে রকেটে করে পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু আবার ফিরে আসে ‘সে’। ক্রমে এই হারির মধ্যে মানবিক সত্তা ফিরে আসতে থাকে। একদিন তাকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের সন্দেহের আলোচনা শুনে তরল নাইট্রোজেন খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু তার পুনর্জন্ম হয়। লেম বইটি শেষ করেছেন এইভাবে – জীবনের পরিসমাপ্তি আছে কিন্তু ভালোবাসা অনন্ত, অসীম।
তারকোভস্কি পরবর্তী চলচ্চিত্রের জন্য লেমের কাছে এই সোলরিসের জন্য আবেদন করলে তিনি রাজি হয়ে যান। ঠিক হয় দুজনে মিলে চিত্রনাট্য তৈরি করবেন। কিন্তু বেধে যায় গন্ডগোল। তারকোভস্কি নিজের মতো করে সাজাতে চান গল্পটিকে, যা লেখক হিসেবে লেমের পক্ষে মানা খুব কঠিন! তারকোভস্কি বললেন যে, তিনি শুরু করতে চান পৃথিবীতে, স্পেসে নিয়ে যাবেন কেলভিনকে একটু পরে। তিনি দেখাবেন, কেলভিন তার বাবা, মা আর কিশোরী মেয়েসহ থাকে, বাস করে। তার কাছে ডাক এসেছে স্পেসস্টেশনে যাওয়ার। খবরটি তার বাবার বন্ধু শুভাকাঙ্ক্ষী ব্রিটন পায় – যে একসময় সেই স্টেশনে গবেষণায় ছিল। সে তাকে সাবধান করে দিতে আসে। বলে, ভৌতিক ব্যাপার-স্যাপার সে দেখেছে সেখানে। সে একটা ভিডিও টেপ চালিয়ে দেখায়, সেখানে সোলারিস থেকে ফেরার পর বিজ্ঞানীরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার দৃশ্য দেখা যায়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রিটনের কথা মানা কঠিন। কেউ বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। কেলভিনও বিশ্বাস করে না। ব্রিটন বিফল মনোরথ হয়ে চলে যায়। এখানেই শেষ হয় না। একটু পরে ভিডিও ফোন আসে ব্রিটনের কাছ থেকে। সে বলে ফেচনার নামের একজন বিজ্ঞানীর কথা। ফেচনারের বাড়িতে সে একবার গিয়েছিল এবং তার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। পরে স্পেসশিপে গেলে ব্রিটন ফেচনারকে দেখেছিল তার সেই ছেলের সঙ্গে, যে লম্বায় ছিল অনেক বড়।
এরপর কেলভিন স্পেসে যায়। লেমের বইয়ের মতোই কাহিনি এগিয়ে চলে। কিন্তু তারকোভস্কি একটু নতুন বিষয় যোগ করেছেন। জিব্রায়েল নামের একজনের কাছে হাজির হয়েছিল একজন, এবং সেটা সে সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। কেলভিনের স্ত্রী হারির আবির্ভাব ঘটে। দুবার। কিন্তু শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসে কেলভিন, যা বইতে নেই। লেম সবচেয়ে যে বিষয়টি অপছন্দ করেছেন সেটা হলো স্পেসের সংলাপ, ঘটনাপ্রবাহ। চলচ্চিত্রটি দেখার পর তিনি একবাক্যে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন – মহাকাশে দস্তয়েভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট দেখলাম।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। তাঁর পঞ্চম চলচ্চিত্র স্টকারের উৎস বরিস এবং আর্কাডে নামের দুই ভাইয়ের ‘রোড সাইড পিকনিক’ নামের একটি বড় গল্প। এটির কাহিনি কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক। স্টকার তৈরিতে গল্পটার মূল ধরে টেনেছেন তারকোভস্কি, পটভূমিতে কল্প-স্পেসের ধারণা নেননি – স্টকারের নেতৃত্বে লেখক এবং বিজ্ঞানীদ্বয় যে জায়গায় যায় সেটা অব্যাখ্যেয়, বিশ্বাসের জায়গা। সময় হিসেবে সোভিয়েত দেশের চলমান সময়কে বেছে নিয়েছেন। সোলারিস এবং স্টকারের মাঝখানের চলচ্চিত্রটি হলো মিরর – আত্মজৈবনিক; যেখানে বাবা-মা এসেছে, কেউ কবিতায়, কেউ সশরীরে। স্টকারের পরে আরো দুটো চলচ্চিত্র তৈরির সুযোগ পেয়েছেন তারকোভস্কি – দুটোই ভিনদেশে, দেশত্যাগী হয়ে। নস্টালজিয়া বানিয়েছেন ইতালিতে আর স্যাক্রিফাইস বানিয়েছেন সুইডেনে।
আগে ফেলে আসা প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। আন্দ্রে রুবলেভের পর তিনি কল্পকাহিনি বেছে নিলেন কেন? সময় অনির্দিষ্ট কেন? তারকোভস্কির একটা ডায়েরি আছে, যার নাম টাইম উইদ ইন টাইম – দ্য ডায়েরি। তারকোভস্কিপ্রেমীদের কাছে বইটি অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। ডায়েরিটি দিনক্ষণ অনুসরণ করে লেখেননি তারকোভস্কি। কিন্তু শিল্পসৃষ্টির প্রতি তাঁর অদম্য ইচ্ছা এবং সেজন্য সকল বাধাবিপত্তি অতিক্রমে সংগ্রাম করে যাওয়ার চিত্র অনেকটা কোলাজ ফর্মে পাওয়া যায়। এ ডায়েরিতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ এটি তিনি লেখা শুরু করেছিলেন ১৯৭০ সালের ৩০ এপ্রিল অর্থাৎ আন্দ্রে রুবলেভ (১৯৬৬) নির্মাণের চার বছর পর এবং সোলারিস তৈরির এক বছর আগে। এ-সময়টিতে তিনি সোলারিসের পাত্র-পাত্রী, লোকেশন ইত্যাদি ঠিক করছেন। বিবি এন্ডারসনকে ভাবছেন হারি চরিত্রের জন্য, তার সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে প্রস্ত্ততি নিচ্ছেন। কিন্তু বেদনাদায়ক বিষয় হলো, রুবলেভ তখনো মুক্তি পায়নি। সমাজের বিশিষ্টজনদের সম্মানে মস্কোতে একটা প্রদর্শনী করা হয়েছে মাত্র। তারপর থেকে নানান নাটক চলছে মুক্তি নিয়ে। কর্তৃপক্ষ শুধু বলে, এটা বীভৎসতা, নগ্নতায় ভরা। তাদের প্রশ্ন, কোন রাশিয়াকে দেখানো হয়েছে? তারা খ্রিষ্টীয় বিষয়গুলো নিতে পারছিলেন না। ১৯৬৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি আয়োজন করে অক্টোবর বিপ্লব উপলক্ষে বিশেষ রেট্রোস্পেকটিভ। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলেন চলচ্চিত্রটি এখনো মুক্তি পায়নি, পাঠানো যাবে না। ’৬৯-এ আবার চলচ্চিত্রটিকে আমন্ত্রণ জানায় কান কর্তৃপক্ষ। এবার সম্মতি জানানো হয়, কিন্তু একটা শর্তে : কোনো প্রতিযোগিতা বিভাগে চলচ্চিত্রটিকে স্থান দেওয়া যাবে না। সে বছরের কান উৎসবে রুবলেভ ছিল শেষ প্রদর্শনী, ভোর ৪টায়। প্রচুর লোকসমাগম হয় এবং পুরস্কার জিতে নেয়। অবশেষে ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে মুক্তি পায় রুবলেভ। তারকোভস্কি ডায়েরিতে এ-ব্যাপারে লিখেছেন, আন্দ্রে রুবলেভ মুক্তি পেল, কিন্তু শহরে একটাও পোস্টার দেখলাম না।
রুবলেভের এই বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সময় শিল্পী তারকোভস্কির মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল সেটা ডায়েরিতে লেখা সোলারিসের মুক্তির ব্যাপারে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা পড়ে অাঁচ করা যায়। সেন্সরে সোলারিস জমা দিলে কর্তৃপক্ষ যখন উদ্ভট প্রশ্নবাণে জর্জরিত করল তখন তারকোভস্কি লিখছেন, ‘মনে হচ্ছে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি, এরা বোধহয় আমাকে আর চলচ্চিত্র বানাতে দিতে চায় না। এই কয়দিনে আমি বুড়ো হয়ে গেছি।’ রুবলেভের সঙ্গে এই চলচ্চিত্রটির বিস্তর ফারাক। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বিষয়ের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো চরিত্র এই চলচ্চিত্রে নেই। সংগত কারণে রুবলেভের মতো এটা রাশিয়ার অতীতের কোনো ঘটনা নয়, এমনকি ভবিষ্যৎও নয়। স্পেসস্টেশনের সেটের যন্ত্রপাতিগুলো লক্ষ করলে বোঝা যায়, চলচ্চিত্রটির ‘কাল’ যদি ভবিষ্যৎ হয়, তাহলে বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে যন্ত্রপাতির গ্রাফিক্স, আকার-আকৃতির যে সামঞ্জস্য দরকার সেটি অনুপস্থিত। কিন্তু আছে বিজ্ঞানী সন্টের জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষে স্পেসস্টেশনের কক্ষপথ পরিবর্তনের সময় ওজনহীনতার কারণে কিছুক্ষণের জন্য যখন কেলভিন এবং হারি ঘরটিতে উড্ডয়ন করবে, তার ঠিক আগমুহূর্তে হারির দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রগুলের পেইন্টিং দেখি। ক্যামেরা সেটির কাছে যায়, আমরা গির্জা দেখতে পাই এবং ঘণ্টার শব্দ শুনি। এছাড়া আছে পুরো চলচ্চিত্রে তারকোভস্কির শৈল্পিক মানবদর্শনের প্রদর্শন, কেলভিনের মা ছাড়া প্রত্যেকটা চরিত্র যেন দার্শনিক।
তারকোভস্কিকে সেন্সর কর্তৃপক্ষ চলচ্চিত্রটির ছাড়পত্র লাভের লক্ষ্যে তিরিশের ওপর অবশ্যকরণীয় উপদেশ এবং আদেশ দিয়েছিল, তার মধ্যে দুটির কথা বলা যায় : ১) যখন কেলভিন স্পেসে যাত্রা করে তখন পৃথিবীতে কোন সামাজিক অবস্থা বিরাজ করছে? সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম, নাকি পুঁজিবাদ? ২) কেলভিনের ফিরে আসাটা আরো পরিষ্কার করা যায়।
উপদেশ বা আদেশ দুটির যে-কোনো একটি শিল্পীর জন্য বিপজ্জনক। এই দোষে যেকোনো শিল্পই দুষ্ট, যদি ঊর্ধ্বতন দফতর কোনো বিশেষ মতবাদে বিশ্বাসী হয় বা নাবালকের মতো অবুঝ হয়। তবে বিষয় নির্বাচন এবং উপস্থাপনে তারকোভস্কি কৌশলী হয়েছিলেন বলে মনে হয়। রুবলেভ নিয়ে পাঁচ বছর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তিনি হয়তোবা ভেবেছিলেন গল্প নির্বাচনে চতুর হতে হবে। কল্পবিজ্ঞান বিশেষণ ঢাল হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু তিনি নিজে পড়েছিলেন নিজের তৈরি ফাঁদে। তিনি মাটির শিল্পী, তাই পৃথিবী-অংশ যোগ করেছেন, যা লেমের মূল বইতে নেই, এমনকি স্পেসশিপে আমরা দেখি পাত্রে জন্মানো পৃথিবীর সবুজ ঘাস। ক্যামেরা যখন বিজ্ঞানী সন্টের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ব্রগুলের পেইন্টিংয়ের ওপর দিয়ে বিচরণ করে আমরা পৃথিবীর মানুষ, কুকুর, গির্জা দেখি, আমরা শুনতে পাই মানুষের কোলাহল, কুকুরের ডাক এবং গির্জার ঘণ্টা। এই বিষয়গুলো হয়তো কর্তৃপক্ষকে ভাবতে উস্কানি দিয়েছে, পৃথিবী তখন কোন মতবাদে শাসিত হচ্ছে। সমাজতন্ত্রের পরাজয় হয়েছে কি? দ্বিতীয় বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। তারকোভস্কি চলচ্চিত্রের কবি। উপরন্তু তিনি উচ্চকিত স্লোগানওয়ালা শিল্প পছন্দ করেন না। তিনি তাই রহস্য, মনের অতলতা, বিস্ময়, দেখার আনন্দ, অনুভূতি ইত্যাদি নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন। সেন্সর কর্তৃপক্ষ ভেবে নিয়েছে যে, কেলভিন ফিরে এসেছে, কিন্তু এটা কি নিশ্চিত করে বলা যায়? এটার কি দরকার আছে? নানান কোণ থেকে দেখলে বিভিন্ন রকম মনে হবে। এই দ্ব্যর্থবোধকতা এবং দ্যোতনা কবিতার তথা শিল্পের ধর্ম।
কবিতার সঙ্গে তারকোভস্কি যে বিজ্ঞান নিয়েও উৎসাহী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই উৎসাহ যে উদ্দেশ্যমূলক তার প্রমাণও পাওয়া যায় তাঁর কথাবার্তা শুনলে। ধর্মীয় পন্ডিতেরা যেমন নিজের বিশ্বাসকে যাচাই করার জন্য বিজ্ঞানের মতবাদের সঙ্গে মিলিয়ে নেন, তারকোভস্কি তেমনটা করতেন এবং বিশেষ করে বিখ্যাত কোনো বিজ্ঞানীর শিল্প-সাহিত্য নিয়ে মতবাদ, যা তার বিশ্বাসকে পোক্ত করে তার অনুসন্ধান করতেন এবং লিখে রাখতেন। আইনস্টাইন যখন বলেন, ‘গউস (বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ) বা যে-কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির চেয়ে দস্তয়েভস্কি বেশি কিছু শেখায়’ – তখন তিনি খুশি হন। কিন্তু বিজ্ঞানের কোন বিষয়? মেটাফিজিক্স কি? বিজ্ঞানের এই শাখা অনেক রহস্যময়। বিজ্ঞানীকে এই বিদ্যা বুঝতে হলে অনেক সময় যুক্তিকে এক পাশে সরিয়ে রেখে এগোতে হয়। কল্পনাপ্রবণ হতে হয়। অনেক তত্ত্ব তখন অবাস্তব লাগে। কল্পবিজ্ঞান কি এজন্যই তারকোভস্কির পছন্দ?
যা হোক, সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগের আগে আর দুটো চলচ্চিত্র তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন – মিরর এবং স্টকার। সোলারিসে অনেক লোকের সমাগম – সমাজ, সময় ইত্যাদি ক্ষীণভাবে হলেও উপস্থিত। কিন্তু এই দুটি চলচ্চিত্রে তা নয়। এটা হয়তোবা আরেকটি কৌশল ছিল তারকোভস্কির। মিরর আত্মজৈবনিক। আর স্টকার তিনটি পাত্রের মধ্যে দূর কোনো স্থানে ঘটা ঘটনা, যে স্থানের সন্ধান পাওয়া যায় বিশ্বাসের মাধ্যমে। স্টকারের একটি চরিত্র বিজ্ঞানী, সেও সেই স্থানের সন্ধানে যায় স্টকারের নেতৃত্বে। স্থানটি আসলেই রহস্যজনক। তেমন স্থানে তারা বিজ্ঞান নিয়ে আলাপ করে। বিজ্ঞানীর উদ্দেশ্য কী শুধু নোবেল পুরস্কার অর্জন? এই চলচ্চিত্রে শব্দ এবং লং শটের মাধ্যমে দ্যোতনা সৃষ্টি করেছেন তারকোভস্কি। আমরা সবাই বৈষয়িক। তাই জানতে চাই সোলারিসের মতন স্টকারের মিশন সফল হয়েছিল কি না। আমরা এক্ষেত্রে বুঝতে সফল হইনি। কিন্তু কেন সফল হইনি তার কারণ খুঁজি না। বিজ্ঞানকে ভালোবাসি বৈষয়িক কারণে। স্টকারে বিজ্ঞানের উন্নয়নের কারণে যেসব দানবীয় বিষয় মানুষকে গ্রাস করেছে সেগুলোর কেমন করে প্রতিকার হতে পারে ভাবি না। তারকোভস্কি একটি কল্পবৈজ্ঞানিক কাহিনিকে চমৎকারভাবে বাস্তব কিন্তু অধিবাস্তব মোড়কে উপস্থাপন করেছেন। স্টকার চরিত্রটি যেন তাঁর প্রতিরূপ যে বিজ্ঞানী এবং সাহিত্যিককে নিয়ে যেতে চান সেই আদিবৈজ্ঞানিক স্থানে, যেখানে জীবনের সকল প্রশ্নের উত্তর আছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারকোভস্কি একই রকম রোষানলে পড়েছিলেন এই দুটি চলচ্চিত্র নিয়ে। শেষে তিনি ত্যাগ করেন তাঁর স্থান। যান ইতালিতে পরের কাজটি করার জন্য। নস্টালজিয়ায় আমরা পাই গির্জাকে। পাই তাঁর জীবনেরই যেন চিত্রায়ণ। দেশত্যাগী মানুষটির অন্তর্যাত্রা। কিন্তু এই চলচ্চিত্রটি করতে গিয়ে পাশ্চাত্যকে বুঝতে পারেন তারকোভস্কি। সোভিয়েত নীতিনির্ধারক এবং ইতালির চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা একই পথের পথিক। তিনি বুঝতে পারেন, এদের কাছে চলচ্চিত্র একটি পণ্য। এই চলচ্চিত্রেও অধিবিদ্যার বিষয় আছে। তারকোভস্কি খ্রিষ্টীয় প্রতীক শুধু গির্জা নয়, করাতের শব্দও ব্যবহার করেছেন। মজার বিষয় হলো, এই আওয়াজ ইলেক্ট্রনিক। চলচ্চিত্রটির বিশেষ বিশেষ মূহূর্তে নন-ডাইজিটিক শব্দ হিসেবে আমরা শুনতে পাই।
পরের চলচ্চিত্রটি তিনি তৈরি করেছেন সুইডেনে – স্যাক্রিফাইস। এখানেও বিজ্ঞান। এখানে বিজ্ঞানের যথেচ্ছাচার ব্যবহারের বিষয়টি আর অব্যক্ত নয়। স্টকারে আমরা দেখি, লেখক এবং বিজ্ঞানীকে না জানিয়ে স্টকার স্থানটিতে পড়ে থাকা বিধ্বংসী জিনিসগুলো লুকিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে বাগ্বিতন্ডা শুরু হলে বিজ্ঞানী বের করে সঙ্গে রাখা বোমা। স্যাক্রিফাইসে পৃথিবী নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণে ধ্বংসের মুখে। আলেকজান্ডার কোথা থেকে যেন জানতে পারে এই বিপদ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে। সে উৎসর্গ করতে প্রস্ত্তত হয় সমস্ত অর্জন। শেষে আবার সেই দ্ব্যর্থবোধকতা। পৃথিবী কি সত্যিই তেমন বিপদের মুখে পড়েছিল? তবে বিজ্ঞানের যে ভয়ানক রূপটি আমরা স্যাক্রিফাইসে পাই, ঠিক তেমনিভাবে ধর্মেরও একটা চিরন্তন রূপের প্রকাশ দেখি এইখানে। আলেকজান্ডার যখন তার বাড়ি পুড়িয়ে দিতে যাবে তখন সে পরিধান করে জাপানের মঙ্কদের পোশাক। শুরুতে আলেকজান্ডার যখন তার ছেলের সঙ্গে কথা বলছে – সে একাই বলছে, কারণ তার ছেলের গলায় অস্ত্রোপচার হয়েছে, সে নিশ্চুপ – সে বলছে মহাত্মা গান্ধীর মৌনব্রত পালনের কথা। এই প্রথম তারকোভস্কি বিশ্বকে সংযুক্ত করছেন তাঁর সৃষ্টিতে। জাপানের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল, সোলারিসের একটি দৃশ্য তিনি জাপানে শুটিং করেছেন, তিনি ছিলেন জাপানের শিল্পী এবং শিল্পকলার ভক্ত, এর সঙ্গে ভারত যোগ হলো। তিনি যেন একটি চিরচেনা গন্ডি পেরিয়ে বৃহৎ পরিসরে নিজেকে যুক্ত করছেন।
তারকোভস্কি নাতিদীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে মূলত ঈশ্বর এবং বিজ্ঞান নিয়েই কাজ করেছেন বললে বেশি বলা হয় না। তাঁর এই পথচলার শেষ প্রান্তে এসে তিনি ঈশ্বরকে করেছেন বিশ্বজনীন, হয়তোবা আরেকটি চলচ্চিত্র তৈরির সুযোগ পেলে তিনি সেই জায়গায় পুরোপুরি পৌঁছাতেন। তারকোভস্কি সবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন মানবশক্তিকে, যে শক্তি বিজ্ঞানের প্রলয়ঙ্করী শক্তির চেয়ে ক্ষমতাবান। সেই শক্তির সাহায্যে আমাদের শুদ্ধ হতে হবে। এ-ব্যাপারটা খটমট, রহস্যময়। কিন্তু তাঁর কাছে এটাই সত্যি। তাই তথাকথিত বস্ত্তগত বিজ্ঞানকে সবার ওপরে স্থান দিতে তিনি নারাজ, বস্ত্তবিজ্ঞান সবকিছু জানে, এটা হতে পারে না। আজকের যুগে এই অনুভব এবং উপলব্ধির ভীষণ দরকার। 

 

Leave a Reply

*