logo

ডেমিয়েন হার্স্ট ও শিল্পের ইতিহাস

মূল : জর্জিও গুইলিয়েলমিনো
ভাষান্তর : রা জী ব ভৌ মি ক

সমকালীন শিল্পের অভয়ারণ্য টেইট মডার্ন। সম্প্রতি এই গ্যালারিতে শুরু হয়েছে এমন একটি প্রদর্শনী, যেখানে তুলে ধরা হয়েছে ডেমিয়েন হার্স্টের অনন্যসাধারণ প্রতিভা, সমৃদ্ধ সৃজন এবং খ্যাতিকে। বয়স এখনো পঞ্চাশ পেরোয়নি কিন্তু এরই মধ্যে তিনি লাভ করেছেন বিশ্বজোড়া নাম এবং ঈর্ষণীয় যশ।
ফর্মালডিহাইডে ডোবানো টাইগার শার্ক, নাম ‘দ্য ফিজিক্যাল ইম্পসিবিলিটি অফ ডেথ ইন দ্য মাইন্ড অফ সামওয়ান লিভিং’ (জীবিত কারো চিন্তায় মৃত্যুর কায়িক অসম্ভবতা); ‘স্পট পেইন্টিংস’; দ্বিখন্ডিত ভেড়া (‘আওয়ে ফ্রম দ্য ফ্লক’); ক্যানভাসের ওপর মৃত মাছির স্তূপ যার নাম আবার হার্স্ট রেখেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ছোঁয়াচে রোগগুলোর নামে (কলেরা, প্লেগ ইত্যাদি); হীরকশোভিত করোটি (‘ফর দ্য লাভ অফ গড’) – ডেমিয়েন হার্স্টের এমনি আরো অনেক সৃষ্টি এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বশিল্পীসত্তার অভিন্ন কল্পনাপ্রবাহে।
হার্স্টের অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্যের পেছনের একটি মাত্র যৌক্তিক কারণ খুঁজে বের করাটা খুব সহজ নয়। এক্ষেত্রে কারণ হতে পারে বহুবিধ। দারুণ ব্যবসাসফল গ্যালারি-মালিক জে জপলিনের সঙ্গে হার্স্টের পরিচয়; গোটা পৃথিবীর মনোযোগ এখন ওয়াইবিএ, ইয়াং ব্রিটিশ আর্টিস্টসের দিকে – ইতিহাসে আর কখনই তরুণ ব্রিটিশ শিল্পীদের ওপর এত আলো এসে পড়েনি; মৃত্যুর প্রতি হার্স্টের অমোচনীয় মোহ, মৃত্যু এমন একটি বিষয় যা যে কাউকে মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারে; নতুন প্রজন্মের একদল শিল্প সংগ্রাহকের উত্থান যারা একটুখানি প্রগতিশীল হলেই উঠেপড়ে লাগে
যে-কোনো কিছুর পেছনে। তারপরও একটা কিছু রহস্যময় ও বিভ্রান্তিকর ব্যাপার আছে, যা ব্রিস্টলে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর সঙ্গেই থেকেছে তাঁর ক্যারিয়ারের একেবারে শুরু থেকেই। ওইসব যৌক্তিক কারণ একসঙ্গে যোগ করলেও এই রহস্যময় ও বিভ্রান্তিকর কিন্তু অজানা ব্যাপারটির সমান হবে না, যা সবাইকে বাধ্য করেছে তাঁর সৃষ্টির দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকাতে।
হার্স্টকে পছন্দ করুন আর না-ই করুন, তাঁর অনির্বচনীয় প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ নেই। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, দূর ভবিষ্যৎ অর্থাৎ দেড়-দুইশো বছর পর হার্স্টকে সবাই কী হিসেবে মনে রাখবে – মাস্টার নাকি শিল্পের আকাশে হঠাৎ উদয় হয়েই মিলিয়ে যাওয়া এক ধূমকেতু হিসেবে? সে প্রশ্নের উত্তর তো আসলে এখুনি দেওয়া সম্ভব নয়।
এ কারণেই ইতিহাসের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দুধরনের শিল্পীকে আলাদা করে বোঝাটা আমাদের জন্য জরুরি। একদিকে তাঁরা যাঁদের কাছে শিল্প একবচনাত্মক, যেখানে ব্যক্তির উপস্থিতি পায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব, যাঁরা নিজেদের সৃজনশীলতা নিয়ে মেতে ওঠে নিজেকে আর সবার চেয়ে একদমই স্বতন্ত্র প্রমাণে। সাম্প্রতিক উদাহরণ ফ্রান্সিস বেকন। তাঁকে দেওয়া হয় বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের মহানতম শিল্পীর মর্যাদা। বেকনের অাঁকার ধরন এমনই স্বতন্ত্র এবং সৃষ্টিতে তাঁর নিজস্ব বিশ্বচেতনার উপস্থিতি এতটাই প্রকট যে, তাঁর ছবিকে মনে করা হয় অনন্য। বেকনের কাজের পুনরাবৃত্তি করা আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি প্রণিধানযোগ্য – ‘আমি আয়নায় তাকালে মৃত্যুকে দেখতে পাই।’ ইনি সেইসব সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের একজন যাঁরা গভীর ছাপ রেখে গেলেও শিল্পের ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা করেননি। এঁরা কেবল ইতিহাসের একটি একমুখী ধারারই প্রতিনিধিত্ব করেছেন, ইতিহাসকে ভিন্ন পথ দেখাননি।
শিল্পের গতিপথ যদি কেউ পালটে দিয়ে থাকেন তাহলে তা করেছেন শিল্পীদের ছোট্ট একটি দল। সবাই হয়তো এঁদের কাজকে স্বীকৃতি দিতে রাজি হবেন না। কিন্তু এঁদের সমগ্র সৃষ্টি কিংবা যেভাবে তাঁরা সৃষ্টি করেছেন বা
চিন্তা করেছেন অথবা যেভাবে নিজেদের সৃষ্টিকে তুলে ধরেছেন, তাতে শিল্পের ইতিহাস বাধ্য হয়েছে নিরাপদ রৈখিক পথ ছেড়ে নতুন পথ বেছে নিতে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধেরই এমন দুজন শিল্পী হলেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্ডি ওয়ারহল এবং ইউরোপের জোসেফ বয়েস। ইতিহাসের গতিপথ পালটাতে এঁদের অবদানই সবচেয়ে বেশি।
ফ্রান্সিস বেকন এবং এই দুজনের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য আছে। বেকনের সৃজন যদি কখনো হারিয়ে যেত, তাহলে অবশ্যই আমরা কিছু সত্যিকারের মাস্টারপিস হারাতাম, কিন্তু শিল্পের ইতিহাস তার নিজস্ব গতিপথ ধরেই এগিয়ে যেত। কিন্তু ওয়ারহল ও বয়েস দৃশ্যপটে আবির্ভূত হওয়ার পর, শিল্প ভোল পালটেছে চিরকালের মতো।
ওয়ারহলের সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য হলো ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজড রিপ্রোডিউসিবিলিটি’। নিজেকে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। অন্যদিকে বয়েস সূচনা করেছেন কনসেপচুয়াল আর্ট এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিল্পীর জড়িত হবার ধারণা। শিল্পের ইতিহাসকে যদি একটি সরলরেখা হিসেবে কল্পনা করি তাহলে ওয়ারহল ও বয়েসের সৃজনের ধারা সেই রেখার ওপর বিপরীতমুখী দুটি সমকোণী রেখা।
ডেমিয়েন হার্স্টের হাজারো সৃষ্টিকর্মের একেবারে খাঁটি শিল্পমূল্যও বাদ দিয়ে যদি ভাবি, তাহলে আমরা বিপদে পড়ে যাব যে তিনি আসলেই কি সেই ছোট্ট দলটির অংশ, যাঁরা শিল্পকে নতুন চেহারা দিয়েছেন।
ডেমিয়েন হার্স্টের শিল্পকর্মের শিল্পমূল্য নিয়ে ধরুন যদি আপনি একেবারে না-ই ভাবেন, তবু তাঁর জীবনের এমন কিছু ভীষণ উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা আছে যাদের পেছনে কিছুটা সময় আপনি ব্যয় করতেই পারেন।
১৯৮৮ সালে লন্ডনের গোল্ডস্মিথ কলেজে যখন পড়তেন তখনই ‘ফ্রিজ’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন হার্স্ট। পরবর্তী সময়ে যাঁরা ওয়াইবিএর অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবারই শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছিল সেখানে। এখানেই হার্স্ট অনন্য। সাধারণত তাঁর মতো শিল্পীরা অন্যের প্রতিভা চিহ্নিত করতে খুব একটা পারঙ্গম হন না।
নিজের পরিচিতি বাড়াতে এবং শিল্পকর্মের প্রচারে হার্স্ট বিচিত্র সব পথ অবলম্বন করতে শুরু করেন। অ্যালবামের কভার, শার্টের কাফলিংক, এমনি নানা বিচিত্র জিনিস নকশা করেন তিনি। ‘দ্য ফার্মেসি’ নামের একটি
রেস্তোরাঁও খুলেছিলেন তিনি। সেখানে ফর্মিকার টেবিলে সার্ভ করা হতো হ্যামবার্গারসহ নানা খাবার। আর চারপাশে থাকত শেলফভর্তি ওষুধপত্র। কয়েক বছর পর সেই রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেন হার্স্ট। সেখানকার সবকিছু পরে সোদবি’স নিলামে বিক্রি করে দেয়। বাথরুমের কিউবিকলের দরজাগুলো অবধি নিলামে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, কারণ সেগুলোতে হার্স্টের নিজ হাতে সই করা ছিল।
হার্স্টের স্টুডিওটা রীতিমতো একটা কারখানা (জেফ কুন্স এবং তাকাশি মুরাকামির স্টুডিওর ব্যাপারেও অবশ্য একই কথা বলা যায়)। সেখানে শতাধিক কর্মচারী শিল্পকর্ম ‘উৎপাদন’ করে এবং হার্স্ট পরে নিজ হাতে সেগুলোতে সই করেন।
শিল্পবাণিজ্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও যদি হার্স্টের দিকে তাকান, তাহলেও একজন জিনিয়াসকেই দেখতে পাবেন আপনি। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০৮ সালে। সেবার একটা আস্ত প্রদর্শনীর জন্য একেবারে টাটকা সব শিল্পকর্ম বানিয়েছিলেন হার্স্ট – তার সবগুলোকেই আবার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সোদবি’সের হাতুড়ির তলায়। ওই নিলামটিও আয়োজন করা হয়েছিল শুধু হার্স্টের প্রদর্শিত শিল্পকর্মের জন্যই। ‘বিউটিফুল ইনসাইড মাই হেড ফরএভার’ (আমার মাথার ভেতর চিরকালের সুন্দর) শিরোনামের সেই নিলাম/প্রদর্শনী শেষমেশ দারুণ ব্যবসা করেছিল, আয় হয়েছিল প্রায় বিশ কোটি মার্কিন ডলার। তবে ওই নিলামের গুরুত্ব শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয় যে, সেখান থেকে শিল্পীর বা সোদবি’সের অনেক টাকা আয় হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানের দুটি বিশেষ উদ্ভাবনী ব্যাপার ছিল :
অর্থনীতির সংজ্ঞার দিক থেকে, অকশন হাউসগুলোকে মনে করা হয় মাধ্যমিক বাজার। তবে সেবার তা হয়ে উঠেছিল প্রাথমিক বাজারই। এমন কিছু শিল্পকর্ম সেখানে নিলাম হয়, যা আগে কখনো কোথাও প্রদর্শিত হয়নি। এ ঘটনা অকশন হাউসগুলোর ইতিহাসে প্রথম।
সেবার অকশন হাউস এবং শিল্পী মিলে আর্ট গ্যালারিগুলোর বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেন। তার আগে পর্যন্ত, শিল্পী ও সংগ্রাহকদের মাঝে যোগাযোগ স্থাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল এই আর্ট গ্যালারিগুলোই।
গত কয়েক দশকের মধ্যে শিল্প-বাজারে ওটিকেই মনে করা হয় সবচেয়ে উদ্ভাবনী ঘটনা হিসেবে। কিন্তু ব্যাপারটি কি একবারেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি আর্ট গ্যালারি/জাদুঘর/অকশন হাউসগুলোর মধ্যে যে ভারসাম্য তাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারবে? ক্রিস্টিস ও সোদবি’স এ ধরনের অভিনব ব্যাপারই খোঁজে সবসময়। এই দুটি প্রতিষ্ঠান এমন কিছু ব্যক্তিগত সেল ও কিউরেশন প্রকল্প শুরু করেছে, যা আগে ভাবাই যেত না।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ওই নিলাম এখন পর্যন্ত একমাত্রই। এর ঠিক পরপরই শুরু হওয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা হতে পারে তার একটা কারণ। আবার এমনও হতে পারে যে, গ্যাগসিয়ানের মতো বড় বড় নামকরা আর্ট গ্যালারির জন্য এ ধরনের নিলাম/প্রদর্শনী ক্ষতিকারক। তাই তারাই হয়তো এ ধরনের প্রদর্শনী ঠেকিয়ে দিয়েছে। কারণ এরকম প্রদর্শনী বেশি হলে আর্ট গ্যালারিগুলো তাদের প্রাথমিক বাজারটি হারিয়ে ফেলবে।
ডেমিয়েন হার্স্টের এ উদ্যোগ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো প্রভাব ফেলতে পারে এবং অকশন হাউসগুলো যদি সরাসরি শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে কিছু অপ্রদর্শিত শিল্পকর্ম তুলে আনতে পারে তাহলে একদিন এমনও হতে পারে যে, হার্স্টকে শিল্পের ইতিহাসে না হলেও শিল্প-বাজারের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র হিসেবে সবাই অবশ্যই মনে রাখবে। 

Leave a Reply

*