logo

জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান : বাঙালির কল্পচিত্রের কারুকার

সৈ য় দ  ম ন জু রু ল  ই স লা ম

ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন ঘরে বসেই জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান এবং আমাদের শিল্পচর্চা আন্দোলনের শুরুর দিকের অনেক পথনির্দেশকের অনেক ছবি দেখা যায়। তারপরও একটি চিত্রকর্ম অথবা ভাস্কর্য সামনাসামনি দেখার আনন্দ এবং তৃপ্তিটাই আলাদা। জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের চিত্রকর্মের প্রতিলিপিসমৃদ্ধ বেশ কয়েকটি বই ও অ্যালবাম আমার সংগ্রহে আছে, যেমন আছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশিত কিছু ফোল্ডার। তারপরও যখনই সুযোগ পাই, এ দুই শিল্পীর মূল ছবি দেখি। জয়নুলের রেখা আর কামরুলের রেখা-রং, তাঁদের অন্য অনেক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে, আমাকে সবসময় আকর্ষণ করে। মূল ছবি দেখে কাগজে-ক্যানভাসে তুলি-কাঠকয়লার আঁচড়গুলি যেন জীবন্ত দেখতে পাই।

ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে জয়নুল-কামরুলের অনেক ছবি একসঙ্গে দেখার সুযোগ সৃষ্টি করে দিলো বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বেঙ্গল গ্যালারি। জাদুঘর আয়োজন করল এ দুই শিল্পীর ছবি নিয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনীর। বেঙ্গলে উদ্যাপিত হলো জয়নুলের শততম জন্মবার্ষিকী এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত হলো ‘শিল্পাচার্যের প্রসারিত শিল্পাঙ্গন’। এ-প্রদর্শনীতে জয়নুলের পাশাপাশি তাঁর বৃহত্তর পরিবারের সদস্যদের ছবিও দেখানো হলো। জয়নুলের বেশকিছু ছবি ছিল দুর্লভ, যেগুলো আমি আগে দেখিনি। জাদুঘরের কিছু ছবিও। জয়নুল-কামরুলের কাছে আমাদের মাঝে মাঝেই ফিরে যেতে হয়। শুধু যে আমাদের শিল্পকলার শুরুর উৎসাহ-উদ্যম অথবা নান্দনিক মেজাজটি বোঝার জন্য তা নয়, আমাদের ক্রমবর্ধমান হারে জটিল হতে থাকা বাস্তবতার প্রতিকূলে একটি কল্পচিত্র বা ইমাজিনারি আবিষ্কার অথবা শনাক্ত অথবা পুনর্নির্মাণ করার জন্য। এই কল্পচিত্রটি আমাদের সৃষ্টিশীলতা এবং শিল্পমেধার একটি যোগফল বটে, কিন্তু তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক এবং কালিক চিন্তার একটি শক্তিশালী প্রকাশ হিসেবে এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকাটি। একাত্তরে যখন সারাদেশে পাকিস্তানি বর্বরতা ও নৃশংসতা চলছিল, আমরা বিচলিত না হয়ে ‘সোনার বাংলার’ সময়হীন কল্পচিত্রের সম্ভাবনাকে ধরে ধরে অগ্রসর হচ্ছিলাম, যুদ্ধ করছিলাম। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ছিল সেই কল্পচিত্রের একটি ধ্বনিগত প্রকাশ। বাংলাদেশে সামরিক, ছদ্ম-সামরিক এবং প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যখন ক্ষমতায় এলো তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের বিদ্বেষের কারণে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ থেকে জিন্দাবাদ শব্দটি ধার করে জয় বাংলার কল্পচিত্রটিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়াশীলেরা এ বিষয়টি বুঝতে অপারগ ছিল যে, কোনো কল্পচিত্র বা ইমাজিনারি সময়কালের গন্ডি অতিক্রম করে মানুষের সৃষ্টি-কল্পনায় একটি চিরস্থায়ী জায়গা করে নেয়। সাত কোটি মানুষ যে-কল্পচিত্র সৃজন করে, তাকে এক লাখ বা এক কোটি মানুষ নির্বাসনে পাঠাতে পারে না। গত বছর ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগের তরুণরা যখন জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে একটি প্রত্যয়কে ঘোষণা করছিল, তাতে প্রমাণ হয়েছিল এই কল্পচিত্রটি নির্বাসিত হয়নি, অথবা দলীয় মালিকানায় হারিয়ে যায়নি।

কল্পচিত্র বা ইমাজিনারির অনেক শক্তি। এস এম সুলতান যেসব ছবি এঁকেছেন, সেগুলিতে কল্পচিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা থেকে ভিন্ন। তাঁর স্বাস্থ্য ও লাবণ্যভরা মানব-মানবীর সঙ্গে বাংলাদেশের দারিদ্র্যপীড়িত ভগ্নস্বাস্থ্যের মানব-মানবীর ফারাকটা প্রবল। কিন্তু এই কল্পচিত্র আমাদের একদিকে এক কল্পিত অতীত, অন্যদিকে অর্জন-সম্ভব ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়। সুলতানের কল্পচিত্র জাতি হিসেবে আমাদের অসাফল্যগুলির পরিবর্তে পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে আমাদের সম্ভাবনাকেই তুলে ধরেছিল। সুলতানের কৃষককে আমাদের মাঠে পেতে আরো বহুদিন লাগবে, হয়তো পাঁচ অথবা সাত দশক। কিন্তু সেদিকে আমরা তো এক পা এক পা করে এগোচ্ছি। উত্তরের মঙ্গাকে তো এই কৃষকই অতীতের বিষয়ে পরিণত করেছেন। হয়তো আরো সাফল্য আসবে আগামীতে। কিন্তু জিন্দাবাদের অনুসারীরা এক বছর ধরে সহিংসতা চালিয়ে কৃষকের সেই অর্জনকে ক্ষেতেই শুকিয়ে দেওয়ার উৎসবে নেমেছে। তারপরও সুলতানের কল্পচিত্রে যদি আমরা বিশ্বাস করি, কৃষক আবার নতুন উদ্যমে মাঠে নামবেন, কাস্তে হাতে তুলে নেবেন এবং একটু একটু করে তার পেশিতে শক্তি বাড়াবেন। এ-কাজটি কৃষক নিজেই করবেন, যেমন করার চেষ্টা করেছেন তার পূর্বপুরুষেরা, যুগ যুগ ধরে।

কল্পচিত্র/ইমাজিনারির আরেকটি দিক হচ্ছে এর শেকড়-অন্বেষা, একটি স্থির কেন্দ্রের প্রত্যাশা এবং অতীত-রাগ বা নস্টালজিয়ার প্রতি এর পক্ষপাতিত্ব। নস্টালজিয়া মানুষকে অতীতে নিয়ে যায়। কিন্তু অতীতের দুঃখ-বঞ্চনা অথবা অপ্রাপ্তিকে তার যতটা মনে থাকে, তার থেকে বেশি থাকে এর প্রাপ্তি অর্জন ইত্যাদি অথবা এগুলির ধারণাগুলিকে। নস্টালজিয়া অতীতকে পুনর্নির্মাণের অথবা পুনঃসৃজনের শক্তি জোগায়। এ জন্য কল্পচিত্র/ইমাজিনারিতে কালকে অতিক্রম করে স্থানের কাছে পৌঁছানোর তাগিদটা থাকে বেশি। স্থান মানে পরিসর, দেশ, ভূগোল – ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত – উভয়েই। সময়ের কল্পচিত্রে প্রতিকূল সময়কে কাটিয়ে এক সুবর্ণ, সময়হীন সময়কে খোঁজার অভিলাষ থাকে, স্থানের কল্পচিত্রে থাকে হারানো স্বর্গ অথবা দেশ অথবা ব্যক্তিগত পরিসর পুনরুদ্ধারের প্রয়াস।

একই সঙ্গে, কঠোর এবং জটিল কোনো বাস্তবতাকে যখন কোনো শিল্পী ধারণ করেন এবং তাঁর কল্পচিত্রের একেবারে বিপরীতে যখন তা অবস্থান নেয়, তখন সমাজ ও মানুষের বিকৃতিগুলি, পাশবিকতার প্রকাশগুলি অনেক মোটা দাগে তিনি চিহ্নিত করতে পারেন। একাত্তর নিয়ে যাঁরাই ছবি এঁকেছেন, ওই সময়টিকে পাশবিকতার একটি প্রকাশ হিসেবে এবং মনুষ্যত্বের অপমান হিসেবেই শুধু তাঁরা দেখাননি, বরং সেসবের পেছনে নির্যাতিত মানুষের দেশপ্রেম, সংগ্রামী মানুষের বীরত্ব – এসবের একটি চিত্রও তুলে ধরেছেন। অ্যানামরফিক ছবির মতো যেন ওপরতলের নিচে উঁকি দিলেই নিম্নতলের কল্পচিত্রটি তখন ভেসে ওঠে।

জয়নুল-কামরুলের ছবি আমার প্রিয় তাদের শক্তিশালী, অনুপ্রেরণাদায়ী কল্পচিত্রের জন্য। এই কল্পচিত্রের মাঝখানে যে দেশ বা পরিসর, তা প্রথমত সামষ্টিক, অতঃপর ব্যক্তিগত। এই দেশের কেন্দ্র গ্রাম – সেই গ্রাম যা একসময় এখনকার তুলনায় ছিল অর্থনীতি, স্বাস্থ্যনীতির অনেক সূচক অনুযায়ী, অনুন্নত; শহর থেকে দূরে, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। কিন্তু সেই গ্রাম ছিল মানুষের কর্মোদ্যোগের কেন্দ্রে। গ্রামে মানুষে মানুষে সম্পর্ক ছিল। শিল্পায়নের ফলে মালিক-শ্রমিকের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হলো, অপরিচয়ের দেয়াল উঠল, তা কৃষিসভ্যতায় ছিল না। গ্রামে জোতদার-মহাজনের সঙ্গেও মানুষের মুখোমুখি কথা হতো, পরিচয় ছিল, ভাববিনিময় হতো। বলা যায়, মানুষের সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রতিভা, কর্মকুশলতা এবং সামষ্টিক সম্পর্ক পরিচালনার মতো বিষয়গুলির স্ফুরণ হতো, সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-বঞ্চনার ঘটনাগুলি, সামাজিক কূটনীতির নাটকগুলি ক্রমাগত ঘটতে থাকত। এজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামকে জাতীয় উন্নয়নের মূল কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, শহরকে নয়। শহরভিত্তিক, কেন্দ্রীয় উন্নয়নচিন্তা ও জাতীয়তাবাদের ধারণাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; চেয়েছিলেন যেন গ্রাম থেকেই ভারতবর্ষের পুনর্জাগরণ শুরু হয়। কিন্তু ভারতের রাজনীতিবিদরা ভেবেছিলেন ভিন্ন কথা। তাঁরা দেখেছিলেন ক্ষমতার অবস্থান হচ্ছে কেন্দ্রে, রাজধানীতে, প্রাদেশিক প্রধান শহরগুলিতে। রাজনীতির কাঁচামাল সেই ভোটাররা গ্রামে থাকলেও কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত হয় যে যন্ত্রে, তা নিয়ন্ত্রিত হয় শহর থেকে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রক্রিয়াটাকে উল্টে দিয়ে, গোড়া থেকেই শুরু করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়টিও স্থাপন করেছিলেন প্রকৃতির মাঝখানে, অবারিত গ্রামীণতায়। ছিন্নপত্রে যে-কল্পচিত্র তিনি এঁকেছেন, পদ্মা বোট থেকে নদীর দুই পারের চলমান গ্রামীণজীবনের দৃশ্যগুলির মর্মমূলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে, তা উৎসারিত বাংলাদেশের হৃদয় হতে।

জয়নুল-কামরুলের গ্রামে শান্তি আছে, স্বস্তি আছে, পরিপূর্ণ জীবন আছে, কিন্তু দ্বন্দ্ব-সংঘাতও আছে, অপ্রাপ্তি বঞ্চনাও আছে। গ্রামের কৃষক অপুষ্ট, তার সানকিতে সবসময় খাদ্য জোটে না। তাদের কৃষকেরা প্রান্তবাসী, নিম্নবর্গীয়। তাদের নারীরা থাকে ওই আর্থসামাজিক নিম্নবর্গীয়তার নিচে আরেক পারিবারিক-সামাজিক নিম্নবর্গীয়তার অচলায়তনে। তাদের দিন যায় ঘরের কাজে, সন্তান প্রতিপালনে, স্বামী ও শ্বশুরকুলের সেবাযত্নে। তাদের পরিভ্রমণের ভূগোলটি নিতান্তই সংকুচিত। কিন্তু তাদের প্রাণশক্তির ক্রমাগত পরীক্ষা দিতে দিতে, তাকে নিঃশেষ করতে করতে তারা তাদের কল্পশক্তিকে কখনো বিসর্জন দেয় না। তারা অবসরের সামান্য সময়টাকেই সৃজনশীল কিছু মুহূর্তে রূপান্তরিত করে। তারা প্রসাধন করে এবং প্রসাধনের মুহূর্তে তারা ভিন্ন মানুষে পরিণত হয়। কয়েকজন নারী যখন অবসরে গল্প-গুজবে রত হয়, তাদের প্রাত্যহিকতাকে ছাপিয়ে কিছু মুহূর্ত তাদের এক ভিন্নলোকে নিয়ে যায়, সেখানে তারা আর পুরুষ-দৃষ্টির নিচে সীমাবদ্ধ থাকে না, যেখানে তাদের বোধ অনুভূতিগুলি নির্ধারিত হয় তাদের নিজস্ব শর্তে।

গ্রামীণ সমাজের প্রাত্যহিকতার বিষয়টি অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এ দুই শিল্পী। তাঁরা গ্রামের জীবন, জনজীবনকে ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, প্রকৃতির ভেতরের জীবনটি পর্যবেক্ষণ করেছেন, ঋতুচক্রের পালাবদলকে এবং প্রকৃতির মেজাজকে অনুসরণ করেছেন এবং মানুষ ও প্রকৃতির পরস্পর-নিবিষ্টতাকে দেখেছেন। মানুষ যখন প্রকৃতির ভেতরে অবস্থান নেয় এবং প্রকৃতিও যখন মানুষের অন্তঃপুরে একটা জায়গা করে নেয়, তখন যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি হয়, তা হয় একটি কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য। জয়নুল-কামরুলের কল্পচিত্র/ইমাজিনারিতে এই ভারসাম্য একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। ভারসাম্যটি নষ্ট হয়েছে যখন শহরের রাজনীতি, বস্ত্তপৃথিবী আর অর্থনীতির হাত যখন গ্রামের ভেতরে পৌঁছে গেল। জয়নুল-কামরুল গ্রামনির্ভর কোনো ইউটোপিয়া অাঁকেননি, তাঁদের কল্পচিত্রও নিখাদ কোনো ইউটোপিয়া ছিল না। এর কারণ ইউটোপিয়ার অনেক উপাদান এমনকি সোনার বাংলার কল্পচিত্রেও অনুপস্থিত। তারপরও, তাঁদের কল্পচিত্রে শান্তি এবং সুস্থিরতা, মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক ও ভালোবাসা, গোলাভরা ধান ও পুকুরভরা মাছের ছবি ছিল এবং সবচেয়ে বেশি ছিল সম্পন্ন গৃহ ও ব্যক্তিগত পরিসর এবং তার বাইরে সম্পন্ন সমাজ এবং অবারিত
সামাজিক-নৈসর্গিক পরিসর। তাঁদের কল্পচিত্রে তাই পূর্ণতা, সমাজের সুস্থিরতা এবং ব্যক্তির নানান পরিচিতির একটি সমন্বয় চোখে পড়ে। তবে ইউটোপিয়া না অাঁকলেও এ দুই শিল্পী ডিসটোপিয়ার ছবি এঁকেছেন। জয়নুলের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা থেকে নিয়ে মনপুরার মৃত মানুষদের ছবিতে এই ডিসটোপিয়া চোখে পড়ে। একাত্তর নিয়ে কামরুল যে কিছু ছবি এঁকেছেন, শেয়াল মোটিফটি ব্যবহার করে আরো কিছু ছবি এঁকেছেন, সেগুলিতেও ডিসটোপিয়ার উপস্থিতি লক্ষণীয়। এসব ডিসটোপিয়া অাঁকতে সময় তাঁদের বাধ্য করছে; তাঁরা এঁকেছেন ক্রোধ থেকে, প্রতিবাদ হিসেবে। কিন্তু ক্রোধের সঙ্গে মমতার এক অবাক সমীকরণও তাঁরা ঘটিয়েছেন। দুর্ভিক্ষের চিত্রগুলি জয়নুল এঁকেছেন এক চোখে আগুন, অন্য চোখে অশ্রু নিয়ে।

জীবনের সঙ্গে একাত্ম না হলে শিল্পের অন্তর্জগৎ নিশ্চয় উন্মীলিত হয় না। জয়নুল-কামরুলের ছবিতে জীবনের সঙ্গে তাঁদের একাত্ম হয়ে যাওয়াটা নিয়ে আমি ভাবি। শুধু প্রকৃতি নয়, শুধু মানুষ নয় – গৃহস্থালির যন্ত্রগুলি, পশুপাখি এসবও সেই একাত্মতার মুহূর্তে বাঙ্ময় হয়। জয়নুলের বিদ্রোহী ষাঁড়টি শুধু একটি গৃহপালিত জন্তু হয়ে থাকেনি, থেকেছে প্রতিরোধের এক আইকন হিসেবে। আমার এক বন্ধু কামরুলের বিখ্যাত সেই নাইওর যাওয়ার ছবি দেখে বলেছিল, যে গরুর গাড়িতে মেয়েটি নাইওর চলেছে, সেই গরুদুটিও যেন হাসছে। সে সারাজীবন গ্রামে থেকেছে, গরুকে সে কাঁদতে দেখেছে। একটি বাছুরকে মা-গরু থেকে সরিয়ে নিলে মা-টি কাঁদে। পশুরাও কাঁদে, আনন্দ প্রকাশ করে, তাদেরও প্রেম-ভালোবাসা কাম-যৌনতার প্রকাশ ঘটে। এসব আমাদের গ্রামীণ প্রাত্যহিকতার অংশ। জয়নুল-কামরুলের প্রাত্যহিকতা ধরা পড়ে একাধিক মাত্রায় – সেখানে কাজ আছে, অবকাশ আছে, দিবাস্বপ্ন আছে, পশুপাখির আনাগোনা আছে – তাদের সঙ্গে এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আদান-প্রদান আছে, প্রকৃতি-পশুপাখিরও জীবন আছে, মানুষের সঙ্গ-নিঃসঙ্গতা আছে।

প্রাত্যহিকতাকে বিষয় করেছেন আরো অনেক শিল্পী। কিন্তু আমাকে যা অবাক করে, জয়নুল-কামরুলের প্রাত্যহিকতায় পৌনঃপুনিকতা নেই। একই ছবি যদি তাঁরা তিনবার দেখান, দেখা যাবে তিনবার তিনটি ভিন্ন মাত্রায় তাদের উপস্থাপন করেছেন। যদি ঘরকে দেখান, ঘরের ভেতরের অথবা ঘরের বাইরের জীবনকে প্রধান-অপ্রধান করে হয়তো দ্যোতনার হেরফের করেন। জয়নুলের একটি ছবি আছে, প্রসাধনরতা রমণীর। রমণীর মুহূর্তটি নিজস্ব, একান্ত, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি দূরবিস্তারী। কোথায় চোখ মেলেছে নারীটি? নিজের জীবনে? ভিন্ন কোনো জীবনে অথবা দিগন্তে? কোনো অপ্রাপ্তির বা প্রাপ্তির অঞ্চলে? স্বপ্নে? তার নিজস্ব পরিসরটিকে তার দৃষ্টি একটা ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়। অথবা কামরুলের সেই বিখ্যাত ছবি, ‘উঁকি’। একটি মেয়ে ঘরের ভেতর থেকে উঁকি মারছে, দেখছে বাইরের পৃথিবীকে। কী দেখছে সে? আমরা বুঝতে পারি, বাইরে যা ঘটছে, তা সামনাসামনি দেখতে যাওয়ার মতো প্রস্ত্ততি তার নেই; অথবা সে দৃশ্যে তার উপস্থিতি কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু যতক্ষণ আমরা জানতে না পারি – এবং কোনোদিনই তা আমাদের জানা হবে না – কী সেই দৃশ্য যা মেয়েটি দেখছে, ততক্ষণ আমরা তা নিয়ে শুধু কল্পনাই করতে পারি। অবাক কান্ড, আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে উঁকি মেরে দেখত যদি কোনো পুরুষ, আমরা প্রথমেই ধরে নিতাম, সে কোনো নারীকে দেখছে, হয়তো স্নানরতা কোনো নারীকে। কিন্তু উঁকি দিচ্ছে যেহেতু একটি মেয়ে, পুরুষচিন্তার নির্মাণগুলি আমাদের আর কাজে লাগে না। এক নারীর প্রাত্যহিকতার চর্চায় কামরুল কী সহজে ব্যাখ্যা-অনুমানের বিষয়গুলি অনির্দিষ্ট করে ফেললেন, ছবিটির ভেতরে রহস্যের একটা মাত্রা ঢুকিয়ে দিলেন।

জয়নুল-কামরুল শুধু প্রাত্যহিকতার ছবিই অাঁকেননি, সেই প্রাত্যহিকতাকে কখনো-সখনো রহস্যময় করেছেন, তাতে অপরিচয়ের একটি মাত্রা দিয়েছেন, পুরুষভাষ্যের বাইরে নিয়ে গেছেন। এই প্রাত্যহিকতাটি অন্তরঙ্গ, কাঙ্ক্ষিত; এর ভেতরে দ্বন্দ্ব থাকলেও তা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় না, দুঃখ-বঞ্চনা থাকলেও তা-ই একমাত্র শর্ত হয়ে দাঁড়ায় না। সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রাত্যহিকতায় পুরুষ-নারীর অবস্থান কোনো অবস্থানক্রম মেনে আসে না।

জয়নুল-কামরুল জনজীবনের উত্তাপটুকু ধারণ করতে পেরেছিলেন। জয়নুলের ছবিতে এই উত্তাপের বিষয়টি প্রথমেই বলে নেওয়া যায়। তাঁর ছবিতে মূলধারার বাঙালি আছে, সাঁওতাল আছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃগোষ্ঠীর মানুষজন আছে; আছে ফিলিস্তিন অথবা মিশর অথবা মেক্সিকোর মানুষজনও। এই মানুষগুলি প্রতিদিনের কাজে লিপ্ত – অথবা কাজের ফাঁকে অবসরে, অথবা প্রতীক্ষায় – অথবা প্রকৃতি সমর্পিত, অথবা সংগ্রামরত। মানুষজনের জীবনের নানা প্রকাশ অাঁকতে তাঁকে সাহায্য করেছিল তাঁর বাস্তবতা। জয়নুলের প্রধান শৈলীচিন্তায় ছিল বাস্তবতা অথবা বস্ত্ত এবং মানুষ, পরিপার্শ্ব এবং মানুষের ও প্রকৃতির নানা মেজাজের প্রতিনিধিত্বশীল রূপায়ণ। এই রূপায়ণে বস্ত্ত ইত্যাদির মাত্রিকতার তিনি হেরফের ঘটাননি। জ্যামিতিকে বহিঃস্থ বিন্যাসেই উপস্থাপন করেছেন। বস্ত্ত ইত্যাদির আন্তঃসম্পর্কেও কোনো কারুকাজের আশ্রয় নেননি। তাঁর ছবিতে একজন মানুষ একজন মানুষের, একটি নৌকা একটি নৌকার এবং একটি কাক একটি কাকের আদল নিয়েই উপস্থিত হয়। চিত্রপটে সম্মুখ-পেছনের বিস্তার ও তাদের অনুপাত অক্ষুণ্ণ থাকে, আকাশ-নদী-ভূমি থাকে তাদের পরিচিত স্থিতি-অস্থিতি নিয়ে। বাস্তববাদী ছবিতে অনুকল্প, অনুকৃতি এবং প্রতিরূপ ফুটিয়ে তোলার যত প্রয়োজন-প্রণোদনা অথবা করণীয় থাকে, তার সবই দেখা যায় জয়নুলের ছবিতে, কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি বাস্তবকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে যান, বাস্তবের গভীরে কোনো তলের সন্ধান করেন, বাস্তবের ভিন্ন কোনো মাত্রা দেন অথবা বাস্তবের অনুষঙ্গগুলিকে পুনর্নির্মাণ করেন। তাঁর নারীদের জন্য মাঝেমধ্যে তিনি ময়মনসিংহের পুতুলের আদল সংগ্রহ করেন, বিশেষ করে উল্লম্ব গলা এবং আয়ত চোখের – কারণ তিনি তাদের নিজস্ব মুহূর্ত ও পরিসরের ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দিতে চান। তিনি তাঁর সাঁওতাল যুবক বা নারীকে উল্লম্ব একটি দেহবল্লরী দেন, দার্ঢ্য দেন, মাটির সঙ্গে সম্পৃক্তির একটি ইঙ্গিত দেন, যেহেতু এদের বস্ত্তজগতের স্পর্শহীন প্রকৃতির সন্তান হিসেবে তিনি দেখাতে চান। তিনি প্রতীকের ব্যবহার করেন, যাতে বাস্তবের ভেতরের কোনো জটিলতা, অস্পষ্টতা, কঠিনতা-ক্রুরতাকে তিনি আলাদা করে দেখাতে পারেন, অথবা একটা আতশ কাচের মধ্য দিয়ে বৃহৎ করে উপস্থাপন করতে পারেন। প্রতীকের ব্যবহার অনেক
বাস্তববাদী শিল্পীর কাজকে বহুস্তরে অর্থবহ করেছে, জয়নুল আবেদিনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

জয়নুলের বাস্তবতায় প্রতীকধর্মিতা আছে, ব্যঞ্জনা-দ্যোতনা আছে এবং প্রধানত আছে আখ্যানের গতিশীলতা। তাঁর ছবিগুলি জনজীবনের প্রাত্যহিকতার, সংগ্রামের, কর্মময়তার, দুঃখকষ্টের, আনন্দ-উদ্যাপনের এক একটি আখ্যান। তাঁর আখ্যানের পেছনে তিনটি সূত্র কার্যকর : তিনি মূলত প্রাত্যহিকতাকে চলমান একটি জীবনপ্রবাহে স্থাপন করে এক একটি ফ্রেমে তাকে দেখান। সেজন্য এককভাবে সেগুলি যেমন বিশিষ্ট, সম্মিলিতভাবেও তেমনি একটি বৃহৎ চিত্রের প্রক্ষেপণ; তাঁর আখ্যানে প্রকৃতি থাকলেও এর প্রধান কুশীলব মানুষ – খেটে খাওয়া মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, জীবনযোদ্ধা এবং রণযোদ্ধা; এবং তাঁর আখ্যান আমাদের মৌখিক আখ্যানগুলির মতোই, উন্মুক্ত। তাদের কোনো যতিচিহ্ন নেই। একটি আখ্যান তাই পরিব্যাপ্ত হয়ে ভিন্ন একটি আখ্যানকে ধারণ করতে পারে।

জয়নুলের ছবিগুলিতে তারিখ দেওয়া আছে – তাঁর মন্বন্তরের ছবিগুলি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের, তাঁর মনপুরার ছবিগুলি সত্তরের প্রলয়ঙ্করী সামুদ্রিক ঘুর্ণিঝড়ের পরবর্তী ইত্যাদি। কিন্তু তাঁর আখ্যানের কোনো তারিখচিহ্ন নেই। তিনি একটি বিশেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে পেছনে-সামনে অনেকদূর চলে যান। দুর্ভিক্ষের ছবিগুলিতে মৃতপ্রায় ও বিপন্ন মানুষগুলি ইতিহাসে চিরকালই উপেক্ষিত, মানুষের ক্ষমতা ও অর্থ-সম্পত্তির লোভের শিকার। যারা এই দুর্ভিক্ষের প্রকৌশলী; যারা দুর্ভিক্ষকে পুঁজি করে সিন্দুক ভরে ফেলেছে টাকায়, সেই মহাজনেরা একদিনের নয়, চিরদিনের। জয়নুল এদের ছবি যখন অাঁকেন – কাগজে বিপন্নদের এবং কাগজের অদৃশ্যতলে বিবেকহীনদের – তাঁর চোখে বর্তমানটি প্রধান হয়ে থাকে না, বরং তিনি ছবির দৃশ্যের বিপরীতে ভিন্ন একটি ছবি দেখেন, যে-ছবিতে বিপন্নরা সম্পন্ন, দুর্ভিক্ষের জায়গায় থাকে সমৃদ্ধি এবং বিবেকহীনদের জায়গায় দাঁড়িয়ে যান বিবেকবান মানুষেরা। এই ছবিটিই জয়নুলের ইমাজিনারি।

কামরুলের ছবিতেও যে-ইমাজিনারিটি আমরা পাই, যে-কল্পচিত্রের উদ্ভাস, তাতেও একটি বিকল্প বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কামরুলের ছবিতে রং অত্যন্ত সতেজ, সবল; নকশা এবং গীতিময় বিন্যাসও চোখে পড়ার মতো, যেমন চোখে পড়ার বিষয় গ্রামীণ সরলতা। তাঁর নারীরা রহস্যময়ী, তাদের ঘিরে কল্পনা ও রোমাঞ্চ ডানা মেলে। নগ্নবক্ষা রমণীরা প্রাচীন অনেক কল্পকাহিনিকে মনে করিয়ে দেয়, যাদের নিয়ে অজন্তার দেয়ালচিত্র অাঁকা হয়েছে, পাথরে মাটিতে ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। এই রমণীরা প্রেমিকা, দয়িতা, জননী এবং মা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রচলকে, পুরুষদৃষ্টিকে অরক্ষিত করে কামরুলের নারীরা যে অবস্থান ঘোষণা করেন, তা বাঙালির ইতিহাস-আশ্রিত সেক্যুলার চিন্তা, শরীর-চিন্তা এবং সামাজিক গতিশীলতার চিন্তা।

জয়নুল ও কামরুলের ছবির একটি বড় আকর্ষণ তাঁদের শরীর-ভাবনা। প্রান্তিক মানুষজনের অর্থ-সম্পদ-সম্পত্তি নেই, অনেকের কোনো ঠিকানা নেই, কিন্তু তাদের শরীর আছে। এই শরীর তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। শুধু যে কায়িক পরিশ্রম তাদের বাঁচিয়ে রাখে, তা নয়, দেহকে যখনই তারা ব্যবহার করে, তখনই জগতের সঙ্গে তাদের একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয় (যে জগৎ তাদের গণনার মধ্যে আনে না)। দেহ তাদের প্রতিবাদের ভাষা, দেহ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার অস্ত্র। দেহ দিয়ে এলিট সমাজকে তারা জানিয়ে দেয়, তারা আছে। নারীদেহ – শ্রেণি নির্বিশেষে – যে রহস্যময়তাকে তুলে ধরে, প্রান্তিক নারী তাতে পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবিচারে পিছিয়ে থাকে না। আর নারী যখন মা, তখন যে প্রতীকে তার অবস্থান থাকে, তাতে তাকে অবহেলা করা কারো জন্য সহজ হয় না।

জয়নুল ও কামরুল বেশ কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেহের ব্যবহার করেছেন। জয়নুলের ছবিতে পরিশ্রমী মানুষ, প্রান্তিক মানুষ যেমন আছে, ক্ষুধার্ত, বিপন্ন মানুষও তেমনি আছে। যেভাবেই তিনি তাদের দেহকে উপস্থাপনা করেন, তাঁর ছবিতে জীবনের উত্তাপ, স্পর্শ-গন্ধ এবং নানান বৈপরীত্যকে বাঙ্ময় করে তোলেন। জয়নুলের নারীদেহ কামরুলের নারীদেহের তুলনায় কম রহস্যময়। তাঁর নারীরা অনেক বেশি পরিচিত; তাদের গন্ডিও সীমাবদ্ধ। কামরুলের নারীরা প্রাত্যহিকতাকে ছাড়িয়ে এক মিথের জগতে চলে যায়, পুরাণ-কিংবদন্তির নারীদের মতো। কামরুলের ছবিতেও কাগজ-ক্যানভাসজুড়ে দেহের উপস্থিতি প্রবল – সুলতানের মতো অতটা প্রবল না হলেও কাছাকাছি। জয়নুল-কামরুল দ্বিতীয় যে পরিপ্রেক্ষিতে দেহের ব্যবহার করেছেন, তা ইউরোপীয় রেনেসাঁসের শিল্পীদের মতো দেহকে একটি অনুবিশ্ব হিসেবে রূপায়িত করার জন্য। মানুষ সকল সৃষ্টির কেন্দ্র, অথবা, মানুষকে কেন্দ্র করেই বিশ্বজগতের অবস্থান, এই বিশ্বাসে স্থিত ছিলেন এই দুই শিল্পীও। ফলে, মনুষ্যকেন্দ্রিক তাঁদের বিশ্বে প্রান্তিক মানুষও একদিন কেন্দ্রে তাদের জায়গা করে নেবে – এ প্রত্যয়টি দুই শিল্পীরই ছিল। তাঁরা মানুষের দেহ এঁকেছেন অনেক যত্নে, অনেক ভালোবাসায়। তাঁদের কাছে ঊণজন-ভদ্রজনের কোনো তারতম্য ছিল না। বরং ঊণজনের প্রতিই ছিল তাঁদের পক্ষপাতিত্ব।

জয়নুল ও কামরুল মনুষ্যদেহে আরেকটি বিষয়ের সন্ধান করেছিলেন এবং তা ছিল সমীম-অসীম, জীবন-মৃত্যু এবং দৃশ্যমান দৃশ্যের অন্তরালের দ্বৈততা। জয়নুল একদিকে মৃত্যুকে উপস্থাপন করেছেন ক্রোধ, হতাশা এবং প্রতিবাদ থেকে; অন্যদিকে জীবনকে উদ্যাপন করেছেন বিস্ময় ও আনন্দ নিয়ে। কামরুলে এই বিস্ময়বোধটি আরো বেশি প্রবল; আনন্দের প্রকাশগুলিও। মানুষ সামান্য হতে পারে। কিন্তু শরীরের সামান্য ভূগোলে মানুষ অসামান্য – এই ছিল তাঁদের উপলব্ধি। এই অসামান্যতাকে তাঁরা উদ্যাপন করেছেন, এতে অনেক অভিনিবেশ বিনিয়োগ করেছেন। কামরুলের নারীরা তাদের রহস্যময়তায় কত সহজেই অসীমকে স্পর্শ করে। তাদের রহস্যময়তার বিষয়টিই তো দৃশ্যের অন্তরালের রূপ-রসের জগতে তাদের অধিষ্ঠিত করে।

মানবদেহের প্রতি জয়নুল ও কামরুলের আরো ছিল এক সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক আগ্রহ। গ্রামের সমাজকে তাঁরা দুজন ঘনিষ্ঠভাবে পড়েছিলেন : পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নানা প্রকাশ, আচার-আচরণ ও বিশ্বাস-কুসংস্কারের বিষয়ে তাঁরা জ্ঞাত ছিলেন : একই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষজনের জীবনও তাঁরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁরা দুজনই ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্র ছিলেন। ইতিহাসের নানা বাঁকফেরা তাঁদের মনোযোগ আকর্ষণ করত। তাঁরা বিশ্বজুড়ে উপনিবেশী মনস্তত্ত্ব এবং উত্তর-উপনিবেশী সংগ্রামের সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কালে বাঙালির স্বাজাত্যচিন্তা ও মুক্তিসংগ্রামকে তাঁরা প্রবলভাবে সমর্থন করেছেন এবং নানাভাবে এসব সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন। জয়নুল ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করতে প্যালেস্টাইন গিয়েছেন। তাঁর কালি-তুলিতে তিনি সেসব মুক্তিযোদ্ধার বীরত্ব ও আত্মদানকে উদ্যাপন করেছেন। মনপুরা নিয়ে জয়নুল যে বিশাল স্ক্রলচিত্র এঁকেছিলেন, তা প্রতিটি বাঙালিকে মুক্তিসংগ্রামে প্রত্যয়ী করেছিল। আর জয়নুল যখন পাকিস্তানি জেনারেল ইয়াহিয়ার ছবি এঁকে এসব জানোয়ারকে রুখে দেওয়ার ডাক দেন, মুক্তিযুদ্ধের সারাটা সময় তা ছিল প্রতিরোধের একটি মন্ত্র।

জয়নুল আবেদিন অবশ্য উত্তর-উপনিবেশী সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় সেই ১৯৪৮ সালেই বাস্তবায়ন করা শুরু করেন। এবং এ পর্যায়টি ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের। পাকিস্তান রাষ্ট্র শুরু থেকেই ছিল একটি অচলায়তন। পাকিস্তানি শাসকদের এদেশীয় দোসরেরা – প্রধানত মুসলিম লীগ ঘরানার ভূস্বামী ও তথাকথিত এলিট শ্রেণি ও পরবর্তীকালে ধর্মভিত্তিক নানা দল – আমাদের বাংলা ভাষাভাষী পরিচয়কে অস্বীকার করে আসছিল। পাকিস্তানি শাসকরা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী। তারা ভাস্কর্যকে বিধর্মী আখ্যা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নজরুল ইসলামকে ‘ইসলামী’ পোশাক পরাতে চেয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করতে চেয়েছে। সেই প্রতিকূল পরিবেশে কয়েক সহকর্মীর সহযোগিতায় জয়নুল যখন তাঁর চিত্রকলার স্কুলটি খোলেন, ঘটনাটি আবশ্যকভাবেই এবং মৌলিকভাবেই ছিল বিপ্লবী। ভাবতে অবাক লাগে, স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরও ঢাকা বিমানবন্দরের সামনে একটি বাউল ভাস্কর্য বসাতে গিয়ে মৌলবাদীদের প্রতিরোধের মুখে পিছপা হয়েছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার’। অথচ সেই ১৯৪৮ সালে মাত্র কয়েকজনের সহযোগিতায় জয়নুল এদেশে শিল্পকলা শিক্ষার প্রথম এবং প্রধান কেন্দ্রটির গোড়াপত্তন করেন।

জয়নুল ও কামরুলের ছবি নিয়ে দুটি প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে আমার বারে বারে মনে হয়েছে, তাঁদের হাত ধরেই কীভাবে শুরু হলো শিল্পকলায় আমাদের নবযাত্রাটি। জয়নুল যখন তাঁর স্কুলটি শুরু করেন, তার অনেক আগে কুড়ি শতকের একেবারে গোড়ার দিকে খুলনায় একটি আর্ট স্কুল ছিল বটে, কিন্তু তার পরিচিতি ছিল সীমাবদ্ধ, তার অভিঘাতও তেমন ব্যাপক ছিল না। তাছাড়া, ওই স্কুল থেকে পাস করা কোনো শিল্পী যে নিরবচ্ছিন্ন শিল্পচর্চা করেছেন, তাও নয়। বলা যায়, জয়নুলের হাত ধরেই এদেশে আধুনিক শিল্পচর্চার শুরু। অথচ মাত্র দশ-বারো বছরে, তিনি ও তাঁর সহযোগীরা পাকিস্তানের শিল্পকলার জগতে সামনের আসনগুলি দখল করে নিলেন। জয়নুল অবশ্য সর্বভারতীয় একটি পরিচিতি ইতিমধ্যেই আদায় করে নিয়েছিলেন। সফিউদ্দীন-কামরুলের মতো শিল্পীরাও পরিচিত হচ্ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে ভারতের অন্যত্রও। ঢাকায় বসে শিল্পচর্চা করে ভারতে পরিচিত হওয়ার রাস্তাটা অবশ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁদের; কিন্তু পাকিস্তানের শিল্পকলায় তাঁদের অগ্র-অবস্থান তাঁদের একটা সুযোগ করে দিয়েছিল বাইরে পরিচিতি পাওয়ার। জয়নুল-সফিউদ্দীন-সুলতান সকলেই লন্ডনে প্রদর্শনী করেছেন। বাংলাদেশের শিল্পচর্চা আন্দোলনের শুরু থেকেই এই বহিঃসংযোগ এবং পরিচিতি একটি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

একজন শিল্পী একই সঙ্গে শিল্পগুরু এবং একটি নতুন শিল্প আন্দোলনেরও প্রধান পুরোহিত – এমনটি জয়নুল ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে ভাবাটা মুশকিল। পশ্চিমের নানা শিল্প আন্দোলনে, পুবের নানা দেশের আধুনিক শিল্পচর্চা আন্দোলনে নানা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সংযুক্তি চোখে পড়ে। জয়নুলের পেছনে কোনো প্রতিষ্ঠান এমনকি সরকারের সমর্থন ছিল না। তাঁর সমর্থন বলতে ছিল কয়েকজন নিষ্ঠাবান সহকর্মীর কর্মোদ্যোগ। একজন শিল্পগুরু হিসেবে তাঁকে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়েছে। তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন বাস্তববাদী রীতিতে। কিন্তু একসময় যে তিনি বিমূর্ত ছবি এঁকেছেন, তা সম্ভবত নতুন একটি রীতি বাজিয়ে দেখার জন্য : এ-ধারার প্রতি তাঁর সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ ও মনোভাবটি বোঝার জন্য। তিনি বিমূর্তরীতিতে কিছুটা আড়ষ্ট ছিলেন বলে আমার মনে হয়েছে এবং এই রীতিকে তিনি দূরেই রেখেছেন বেশিরভাগ সময়। কিন্তু যে-কটি ছবি তিনি এই রীতিতে এঁকেছেন, মনে হয়েছে, একজন শিল্পগুরুর আগ্রহ নিয়েই তিনি তা করেছেন; যেন দেখতে চেয়েছেন, এই ধারার বিষয়আশয়কে, এর কলকব্জাগুলিকে।

জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসান শুধু শিল্পীই ছিলেন না, তাঁরা দুজন ছিলেন বাঙালি জাতির চিরন্তন পরিচিতির রূপকার। নানা মনীষী নানাভাবে এটি করেছেন – আলাওল-লালন থেকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-শামসুর রাহমান-সৈয়দ হক; এ দুই শিল্পী করেছেন রং-কালি-তুলিতে। এবং এটি করতে গিয়ে তাঁরা একদিকে শরণ নিয়েছেন এ জাতির নৃতত্ত্ব-সমাজতত্ত্ব-ইতিহাসে, অন্যদিকে দৃষ্টি দিয়েছেন তার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা চিন্তায়, আবার একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার প্রতিদিনের জীবনকে, তার প্রাত্যহিকতার নানা চর্চাকে। ছবিগুলি দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছে, একটি জাতির এতগুলি প্রকাশকে একসঙ্গে ধারণ করতে যাওয়ার পেছনে তাঁদের একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল – সর্বকালের জন্য এর নানান সম্ভাবনা-স্বপ্ন-সদিচ্ছার একটি কল্পরূপ বা ইমাজিনারি তৈরি করা। ছবিগুলি আমি দেখেছি এবং সেই কল্পরূপের সন্ধান পেয়েছি – পুরোটা না হলেও যতটা আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, সামনে তাকানোর প্রণোদনা দিতে পারে, বর্তমান বাস্তবের একটি বিকল্প উপহার দিতে পারে, ততটা। এ দুই শিল্পীর রেখাচিত্র সবসময় আমাকে মুগ্ধ করে। এত সবল-প্রবল রেখা, রেখার এতটা সহজ গতিময়তা কীভাবে উঠে এলো তাঁদের কাগজে-ক্যানভাসে, তা ভাবতে গিয়ে মনে হলো, আমাদের নিসর্গের যে-কোনো দিগন্তে চোখ ফেললেই তো রেখার বিস্তার – পাখির চোখ দিয়ে একটি নদীকে দেখলেই তো কামরুলের নারীদেহের ডৌল চোখে পড়ে। তাঁরা নিসর্গকে নিবিষ্টভাবে পড়েছেন বলে নিসর্গ থেকেই রেখা নিয়েছেন, রং নিয়েছেন; নিসর্গের স্বচ্ছতা নিয়েছেন, জলের সহজ প্রবাহ নিয়েছেন। জয়নুল-কামরুলের বিষয়বস্ত্ত, শৈলী এবং পছন্দের মধ্যে ভিন্নতা ছিল – এবং সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এক জায়গায় তাঁদের মিল ছিল – তাঁরা তাঁদের ছবির জগৎটাকে ঘনিষ্ঠভাবে লোকজীবনের সঙ্গে মিলিয়েছেন।

লোকজীবনের বাস্তব তাঁদের উৎসাহ দিয়েছে একটি কল্পরূপ সৃষ্টিতে। সেটি করতে তাঁরা দুজনই দারুণ সফল হয়েছেন। এবং সেজন্যই বাংলাদেশের শিল্পকলা মাত্র ছয়-সাড়ে ছয় দশকে এতটা উৎকর্ষ অর্জন করতে পেরেছে।

Leave a Reply

*