logo

জীবন নৌকার গল্প

আবু সাঈদ তুলু

সম্প্রতি ঢাকার ‘সুবচন নাট্য সংসদ’ সংগীত সাধক শাহ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শন নিয়ে মহাজনের নাও শিরোনামে নাট্য প্রযোজনা করেছে। নাট্যটি রচনা করেছেন – শাকুর মজিদ এবং নির্দেশনায় সুদীপ চক্রবর্তী। শিরোনামের ‘মহাজন’ ও ‘নাও’ শব্দদ্বয় প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘মহাজন’ শব্দের প্রতীকী অর্থে ‘সৃষ্টিকর্তা’, ‘পরমাত্মা’, ‘অধীশ্বরে’র ইঙ্গিত এবং আঞ্চলিক ‘নাও’ প্রমিত ‘নৌকা’ শব্দে ‘জীবাত্মা’ ‘সৃষ্টি’ ‘জীবকুল’ ‘প্রাণী’ হিসেবে ব্যাখ্যাত। গানের ব্যবহৃত শব্দদ্বয়ের ভাবার্থে শাহ আবদুল করিম নিজেকে মনে করতেন – এ জগৎ-জীবনে তিনি মহাজনের ক্ষণকালীন ‘নাও’ বা ‘নৌকা’। এমনই ভাবজাত ইঙ্গিত করা হয়েছে প্রযোজনাটিতে।
বাংলা গানের জগতের অপ্রতিরোধ্য কবি; প্রকৃতি, জীবন, মানবিক আবেগ; হাজার বছরের বহমান বাংলাদেশি সংস্কৃতির প্রত্যাবীক্ষক শাহ আবদুল করিম। বাংলাদেশের গানের জগতে ‘বাউল সম্রাট’ উপাধিপ্রাপ্ত চারণকবি। শাহ আবদুল করিমের বাউলত্বের স্বরূপে সাধারণত অনুজিজ্ঞাসু না হয়ে পারা যায় না। কারণ প্রচলিত বাউল ঘরানার সংসার বিত্যাগী বৈরাগ্য তাঁর মধ্যে অলক্ষণীয়।
শাহ আবদুল করিম একজন মরমি সংগীত সাধক। তাঁর গানের মধ্যে জীবন-জগৎ, প্রকৃতি-প্রেম, বাস্তবতা, আত্মচেতনাজাত মিস্টিকতা ফুটে উঠেছে। তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে’, ‘কেমনে ভুলিব আমি বাঁচি না তারে ছাড়া’, ‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছে’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু’, ‘আইলায় না আইলায় নারে বন্ধু’, ‘মহাজনে বানাইছে ময়ূরপঙ্খি নাও’, ‘আমি তোমার কলের গাড়ি’, ‘সখী কুঞ্জ সাজাও গো’, ‘জিজ্ঞাস করি তোমার কাছে’, ‘বন্ধু দরদিয়ারে’, ‘মানুষ হলে তালাশ করলে’, ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে’ ইত্যাদি।
শাহ আবদুল করিম ‘বাউলসম্রাট’, ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’, ‘লোককবি’, ‘মরমিকবি’, ‘চারণকবি’, ‘সাধককবি’, ‘বাউলকবি’ ইত্যাদি নানা উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। সম্ভবত তাঁর গানে জীবনঘনিষ্ঠ আবেগতাড়িত হয়েছে বলেই নানা উপাধিতে তাঁকে রূপায়িত করতে চেষ্টা করেছেন। শাহ আবদুল করিমের গানের বিন্যাসে – প্রকৃতি, মানবিক আবেগ, জীবনসংগ্রাম, ঐতিহ্য, রাজনীতি, প্রেম, বিরহ, সৃষ্টিতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, ভক্তিগীতি, পির-মুর্শিদ বন্দনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে বিধৃত। প্রখ্যাত আবুল আহসান চৌধুরীর মতে, ‘লালন ও হাছনের পর মরমি সংগীতজগতের আর কেউ বোধহয় শাহ আবদুল করিমের মতো বাংলার জনমানসকে এত গভীরভাবে স্পর্শ ও আন্দোলিত করতে পারেননি।’ (শাহ আবদুল করিম স্মারক গ্রন্থ সম্পাদনা – সুমনকুমার দাশ, অন্বেষা প্রকাশন, ২০০৯, পৃষ্ঠা ৩২)
শাহ আবদুল করিমের গানে সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের মানুষের মানবিক আবেগগাথা অত্যন্ত নিপুণ দক্ষতায় ফুটে উঠেছে। লৌকিক ধারার সংগীতের মধ্য দিয়ে সকল অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-কুসংস্কার ও নিপীড়নের দৃপ্ত প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনার এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনবিরোধী। গবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরী তাঁর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন, ‘বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের পূর্বসূরি মরমি সাধকরা তত্ত্বকথা বলে গেছেন। সমাজে সাম্য সৃষ্টির আন্দোলন করেছেন। কিন্তু শাহ আবদুল করিমের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন মাত্রার। দেশের, দশের, জনগণের, সমাজের দুঃখ-দুর্দশার কথা তিনি তাঁর রচনায় উল্লেখ করে ভিন্নধর্মী সংগ্রাম করেছেন।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪৫) তাঁর ধলমেলা
পুস্তিকায় তাঁর পরিচয়ে বলা হয়েছে, ‘আবহমান বাংলার লোকায়ত ধারার ঐতিহ্য আর জনজীবনের চালচিত্র যাঁর সৃষ্টিকর্মে বাঙ্ময় তিনি বাউলকবি, জনগণের চারণ শাহ আবদুল করিম।’
শাহ আবদুল করিমের প্রকাশিত গ্রন্থ আফতাব সংগীত (আনু. ১৯৪৮), গণসংগীত (আনু. ১৯৫৪/১৯৫৭), কালনীর ঢেউ (১৯৮১), ভাটির চিঠি (১৯৯৮), কালনীর কূলে (২০০১), ধলমেলা (১৯৯০) ইত্যাদি। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটে শুভেন্দু ইমামের সংকলনে শাহ আবদুল করিম রচনা সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলা গানের কিংবদন্তি শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার ধলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোহাম্মদ ইব্রাহিম আলী, মাতা নাইওরজান বিবি। পিতা-মাতার ছয় সন্তানের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ছেলে সন্তান। তাঁর বাল্যকাল থেকেই গানের প্রতি ছিল অদম্য ঝোঁক। দাদা নসিবউল্লাহ ছিলেন তাঁর প্রথম ও শৈশবকালীন অনুপ্রেরণা ও প্রথম দীক্ষাগুরু। নসিবউল্লাহ ছিলেন অবিবাহিত ও ফকির মানুষ। তাঁর কাছে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হিন্দু-মুসলমান সাধু-ফকিররা আসতেন। আসরে শরিয়ত-মারফতি নানা ধরনের গান হতো। সেখান থেকেই মূলত শাহ আবদুল করিমের সংগীতের ধ্যান-ধারণা ও প্রচেষ্টার শুরু। এভাবেই বাল্যকাল থেকে শাহ আবদুল করিম গানের নেশায় পেয়ে বসে। শাহ আবদুল করিম বার্ধক্যের সময়ও দাদার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আনমনে দাদা নসিবউল্লাহর গান ‘ভাবিয়া দেখ মনে/ মাটির সারিন্দারে বাজায় কোন জনে’ গেয়ে ওঠেন। এ সময় প্রসঙ্গে সুমনকুমার দাশ উল্লেখ করেন, ‘করিম গানের প্রতি দুর্বল হতে থাকেন। মানুষজন করিমের আপন খেয়ালে গান বেশ উপভোগ করতেন। তবে মাত্র গুটিকয়েক গান মুখস্থ থাকার কারণে একসময় তাঁর ভান্ডার ফুরিয়ে যেত। তখনই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ‘চারণকবি’র মতো আসরে বানিয়ে বানিয়ে গান গেয়ে শোনাতেন। পুরোপুরিভাবে করিম জড়িয়ে পড়েন গানের সঙ্গে। এভাবেই বেড়ে উঠতে থাকেন।’ (বাংলা মায়ের ছেলে, অন্বেষা প্রকাশন, পৃষ্ঠা-১৯) বাল্যকাল থেকে চরম দরিদ্রতার মধ্যে বেড়ে উঠলেও কখনো গান থেমে থাকেনি তাঁর। এ সময় থেকেই তাঁর মধ্যে লক্ষ করা যায় গান ছাড়া তাঁর জাগতিক সবকিছুই তুচ্ছ। এভাবেই জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত গান গেয়ে গেছেন শাহ আবদুল করিম।
ধীরে ধীরে ভাটি অঞ্চলের গানের জগতে পরিচিত হতে থাকেন শাহ আবদুল করিম। যুবক বয়সেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের প্রিয় ‘করিম বাউল’ হিসেবে। মাত্র আটাশ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালে গণসংগীতশিল্পী হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন হাওরবাসীর কাছে। তাঁর স্ত্রী তাঁকে গানের সাধনায় অব্যাহত রাখতে নিরন্তর মহত্ত্ব দেখিয়েছেন বলে স্ত্রীকে আদর করে ‘সরলা’ নামে ডাকতেন।
শাহ আবদুল করিম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে গানের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর মধ্যে স্বদেশি চেতনাপ্রসূত গণসংগীতের জোয়ার লক্ষ করা যায় সে-সময়ে। সভা-সমিতিতে গণসংগীত গাওয়ার সুবাদে তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সাহচর্য ঘটে। শাহ আবদুল করিমের রাজনৈতিক চেতনা সম্পর্কে গবেষক মিহিরকান্তি চৌধুরী বলেন, ‘ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের রাজনীতি, তার ব্যর্থতা ও কারণ, বাংলাদেশের অভ্যুদয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রসঙ্গ, কাগমারী সম্মেলনে যোগদান, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন, বঙ্গবন্ধু হত্যা, স্বৈরশাসন, গণতন্ত্রে উত্তরণ – সবকিছুই তিনি প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার আলোকে দেখেছেন, অন্যদের দেখতে সহায়তা করেছেন।’ (শাহ আবদুল করিম : জীবন ও কর্ম, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১০, পৃষ্ঠা ৫১)
শাহ আবদুল করিমের গানের আদর্শ ছিল লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ প্রমুখের দর্শন। ভেকধারী বাউলের মতো সাধনসংগীত তাঁর মধ্যে লক্ষ করা যায় না বা সংসারী বাউলের মতো অনুষ্ঠাননির্ভর সংগীতও তাঁর মধ্যে অলক্ষণীয়। তাঁর গানে সমকালীন রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনবাস্তবতার প্রায় প্রতিটি বিষয়ই দেখা যায়। আধ্যাত্মিক ও বাউল গানের দীক্ষা নিয়েছিলেন কামাল উদ্দিন, সাধক রশিদ উদ্দিন, শাহ ইব্রাহিম মস্তান প্রমুখের কাছ থেকে। (উইকিপিডিয়া, শাহ আবদুল করিম অন্তর্ভুক্তি)
শাহ আবদুল করিমের সংগীত সাধনায় ‘সুফি’, ‘বাউল’ ও ‘বৈষ্ণব’ ঘরানা লক্ষণীয়। সংগীতজীবনের প্রথম দিকের গানগুলোতে সুফি সাধনার প্রভাব দেখা যায়। পরবর্তী পর্যায়ে বাউলত্ব এবং জীবনের অন্তিম পর্যায়ে বৈষ্ণব ঘরানার প্রভাব স্পষ্ট। যদিও সহজিয়া সাধনা ও সুফি সাধনার সংশ্লেষণ বাউল। প্রকৃত অর্থে ভজন-সাধনমার্গীয় বিশুদ্ধ বাউলত্ব তাঁর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো একক ঘরানার বাইরে মৌলিক ও প্রকৃতিজাত উপলব্ধিতে তিনি স্থিত ছিলেন। সম্ভবত সেজন্যে তাঁর গানগুলোতে ভজন সাধনার নিরীক্ষীয় রূপও অনুপস্থিত। নির্যাসীয় উপলব্ধিজাত বস্ত্তজগতের ভাবাত্মক গীতিময় আত্ম-অনুভূতি প্রকাশই প্রধান। ফলে সূত্রগত জায়গার বিপরীতে প্রকৃতিনির্ভরতা, ভাটি অঞ্চলের জীবনবোধ, দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, মানবিক প্রেম-বিরহ, মিলনজাত ভাবাবেগের প্রবল প্রাধান্য দেখা যায়; যা আবহমান বাংলার একজন মরমি সংগীতসাধক হিসেবেই সমধিক গুরুত্ব বহন করে।
বাংলাদেশের নদীবিধৌত ভাটিপল্লী প্রকৃতি, জীবনমানস, বাস্তবতা প্রভৃতি তাঁর গানে রূপকথার নিরিখে চিত্রল। শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক প্রফেসর আনিসুজ্জামান বলেন, ‘শাহ আবদুল করিমের গানগুলো আমাদের দেয় অপার আনন্দ আর সুদূরপ্রসারী চেতনা। তাঁর অমর গানে ফুটে ওঠে ভাটি বাংলার অপূর্ব সৌন্দর্য আর সাধারণ মানুষের আকুতির চিত্রকল্প।’ (শাহ আবদুল করিম স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা-সুমনকুমার দাশ, অন্বেষা প্রকাশন, পৃষ্ঠা ১৭)
শাহ আবদুল করিমের গানে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের হাজার বছরের বহমান ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সমকালী জীবনবাস্তবতার নিরিখে তাঁর মধ্যে আবেগ সঞ্চার হয়েছে। প্রখ্যাত লোকবিশেষজ্ঞ শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘গ্রামীণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন সাধনার এই ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জনে গ্রামীণ ভাবুক, চিন্তক, মরমি সাধক, কবিয়াল, বয়াতি, বাউল, কীর্তনিয়াদের অবদানই যে সবচেয়ে বেশি সে সম্বন্ধে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আসলে এরাই সাধারণ মানুষের বিশ্ববীক্ষা ও ইহজাগতিক চেতনা সৃষ্টির বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিনিধি ও লৌকিক মানবিক সংস্কৃতি ধারার মহান স্রষ্টা। শাহ আবদুল করিম এমনই এক প্রভাবশালী মানবতাবাদী সংস্কৃতিসাধক হিসেবে আমাদের মৌল-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর স্থানটি উজ্জ্বল করে রেখে গেছেন।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২২)
সংগীতশিল্পী হিসেবে সাধারণ পরিচিতি পেলেও শাহ আবদুল করিম প্রথম জীবনে পুরস্কার ও স্বীকৃতি পাননি। তিনি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে পেয়েছিলেন বিরল সম্মান। তাঁর প্রাপ্ত সম্মাননাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে – সিলেট রোটারি ক্লাব সম্মাননা (১৯৯৫), অহনা পর্ষদ সংবর্ধনা (১৯৯৭), দর্পণ থিয়েটার সম্মাননা (১৯৯৭), ভোরের কাগজ সম্মাননা (১৯৯৯), বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন সম্মাননা (১৯৯৯), একুশে পদক (২০০১), আবদুল রউফ চৌধুরী স্মৃতি পদক (২০০১), ফুলঝুড়ি (২০০১), সিলেট আনন্দন (২০০১), দিরাই সমিতি সম্মাননা (২০০১), আইডিয়া সংবর্ধনা (২০০২), মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা (২০০৪), নিউইয়র্ক হাছন রাজা লোক উৎসব সম্মাননা (২০০৫), কলিদম (২০০৫), অভিমত সম্মাননা (২০০৬), বাংলাদেশ জাতিসংঘ সমিতি সম্মাননা (২০০৬), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা (২০০৮), বাংলালিংক সম্মাননা (২০০৮), হাতিল অ্যাওয়ার্ড (২০০৯) ইত্যাদি।
শাহ আবদুল করিম ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর ইহলোকলীলা সাঙ্গ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনমানসনির্ভর গানের জগতে অসীম শূন্যতার সৃষ্টি হয়। বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন বলেন, ‘শাহ আবদুল করিম গুরুস্থানীয়। তিনি এমনই একজন মানুষ, যিনি সংগীতের মাধ্যমে সমাজের জন্য, মানবকল্যাণের জন্য, সারাজীবন নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৪০) সৈয়দ আবদুল হাদী বলেন, ‘তিনি ছিলেন বাউল গানের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর হাত ধরে বাংলার বাউল গান জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছে। তাঁর মৃত্যুতে বিশাল এক শূন্যতা সৃষ্টি হলো। এই শূন্যতা আদৌ পূরণ হবে কিনা তা আমার জানা নেই।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৪০)
শাহ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শনভিত্তিক মহাজনের নাও নাট্যটি মঞ্চে এনেছে ঢাকার স্বনামধন্য নাট্যদল ‘সুবচন নাট্য সংসদ’। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, জনপদের বিকাশমান জীবন-সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, আনন্দ-বেদনা ইত্যাদি মানুষের জীবনাচার প্রকাশেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সুবচন নাট্য সংসদ। (বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার নির্দেশিকা অনুসারে, পৃষ্ঠা ৩৩)। প্রচারিত দলীয় মুখপত্রে উল্লেখ – ‘পিছনে ফেলে আসা প্রিয়পদরেখা, কঠিন শিলায় অাঁকা ছবি আর সূর্যোদয়ের প্রতি সম্ভাবনা-প্রতিশ্রুতির আরেক নাম ‘সুবচন’। ‘সুবচন নাট্য সংসদে’র উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা হচ্ছে নিচুতলার মানুষ, একটি পয়সা দাও, অমৃতস্যপুত্রা, খান্দানী কিসসা, সোনালী স্বপ্ন, রাষ্ট্র বনাম, টুয়েলভ নাইট, তীর্থঙ্কর ইত্যাদি। সুবচন নাট্য সংসদের তেত্রিশতম প্রযোজনা মহাজনের নাও।
মহাজনের নাও নাটক সম্পর্কে স্যুভেনিরে বলা হয়েছে, ‘বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের সারাজীবনের সাধনা ছিল নিজেকে জানা এবং সৃষ্টিকর্তার রহস্য উদ্ঘাটন করা। এক্ষেত্রে দেহতত্ত্বকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি অনেক গান লিখেছেন। এবং যেহেতু শাহ আবদুল করিম সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের মানুষ ছিলেন, তাঁর গানে তিনি নৌকাকে অনেক বেশি ব্যবহার করেছিলেন। নিজের দেহের রূপক হিসেবে। তিনি নিজেকে ভেবেছিলেন যেন কোনো এক মহাজনের কাছ থেকে ধার পাওয়া এক নৌকা। যে নৌকার মালিক তিনি নন, শুধুমাত্র সঠিকভাবে কোনো এক সোনারগাঁও পৌঁছানোর গুরুদায়িত্ব তাঁর।’
মহাজনের নাও নাট্যটি প্রযোজনায় কুশলী যাঁরা ছিলেন – চরিত্রাভিনয়ে : করিম – ফজলুল হক রাসেল, ইমরান হোসেন, রূপা নাসরিন, মেহেদী হাসান সোহাগ, আহাম্মেদ গিয়াস, আমিরুল ইসলাম বাবুল, ইমাম : আসাদুল ইসলাম আসাদ, আনসার আলী, ডিসি : আনসার আলী/ সাইফুল ইমাম দিপু/ মনিরুল হোসেন শিপন, ইউএনও : রফিক, রুহি : তানভীর আহম্মেদ, আকবর : রনি আলম লিমন, সুনন্দ : প্রশ্ন, সরলা : তাসলিনা হক লিনা, রূপা নাসরিন/ সোনিয়া হাসান সুবর্ণা, সাত্তার মিয়া : লিঠু রানী মন্ডল, আবদুর রহমান : আমিরুল ইসলাম বাবুল। গায়েন ও কথক – আমিরুল ইসলাম বাবুল, আহাম্মেদ গিয়াস, রূপা নাসরিন, ইমতিয়াজ, লিঠু রানী মন্ডল, ফজলুল হক রাসেল, ইমরান হোসেন, মেহেদী হাসান সোহাগ, সোহেল খান, শাহ সালাউদ্দিন, তানভীর আহমেদ, সাঈদ বাবু, আসাদুল ইসলাম আসাদ। গীতিতে – তানভীর আহমেদ ভুঁইয়া, সোহেল খান, শাহ সালাউদ্দিন, মেহেদী হাসান তাসলিনা হক লিনা, পান্থ, সম্ভব, পাভেল, নোবেল, তানিম, প্রশ্ন, রফিক, আনসার আলী, আসাদুল ইসলাম আসাদ, সাঈদ বাবু, রনি আলম লিমন, শ্রীনিবাস দাস। নেপথ্যে – আলো, মঞ্চ, পোশাক ও দ্রব্য : সুদীপ চক্রবর্তী, আবহসংগীত : আহসান হাবীব নাসিম, পোস্টার ও প্রচ্ছদ : সাইফুল, ইমাম দিপু, মুখোশ : শ্যামল সরকার, আলোক পরিকল্পনা সহযোগ : গর্গ আমিন, পোশাক পরিকল্পনা সহযোগ : কাজী তামান্না, সৈয়দা ইফাত আরা, সুশান্ত সরকার, রনি আলম লিমন, পোশাক নির্মাণ : আরিফ, দ্রব্য পরিকল্পনা সহযোগ : সোহেল খান, পাভেল, মুনিম তরফদার, বেলাল মিয়া, আবহসংগীত সহযোগ : ইমতিয়াজ, বাদ্যযন্ত্র সমন্বয় : ইমতিয়াজ, রংপট অঙ্কন : রঘুনাথ চক্রবর্তী, বাউল করিমের গান ও সুর প্রশিক্ষণ : বাউল আবদুর রহমান ও শাহ আবদুল তোয়াহিদ, সহযোগ : দোলন, লাঠি খেলা প্রশিক্ষণ : আবদুল হেলিম বয়াতী ও তাঁর দল (নেত্রকোনা), মঞ্চ ব্যবস্থাপনা : সোহেল খান, প্রচার ও প্রকাশনা : সাইফুল ইমাম দিপু, বিশেষ সহযোগিতা : ড. ইস্রাফিল শাহীন, প্রযোজনা অধিকর্তা : আহাম্মেদ গিয়াস।
নাটকটি রচনার পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে নাট্যকার শাকুর মজিদ বলেন, ‘নাটকটি লেখার জন্য আমি বেছে নিই গীতি কবিতার ছন্দ ‘পয়ার’। শাহ আবদুল করিম এ ছন্দে গান লিখেছেন। নাটকটি লেখার জন্য তাঁর নিজের লেখা ‘আত্মস্মৃতি’ এবং ভাগিনা শাহ আবদুল তোয়াহিদের ‘স্মৃতিকথা’ থেকে অনেক তথ্য নিয়েছি। মূলত সেসব তথ্যের আলোকেই এ নাটকের শরীর গঠিত। কবি ইরফানের একটি ছাড়া এ নাটকে প্রায় কুড়িটি গানের অংশ ব্যবহার করা হয়েছে শাহ আবদুল করিমের গান থেকে।’
গীতিকাব্যময়তায় উপস্থাপিত হয়েছে মহাজনের নাও নাটকটি। উপস্থাপনায় আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী এরিনা বা চারদিকের খোলা মঞ্চ ব্যবহৃত হয়েছে। বাঙালি জীবনের সংস্কৃতির বহমান ‘পালা’ রীতি অবলম্বনে নাট্যটি প্রদর্শিত। এরিনা মঞ্চে গানের মধ্য দিয়ে শাহ আবদুল করিমের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কাহিনিবর্ণন নাট্য-উপস্থাপনাটির মূল বিষয়। বর্ণনা ও সংলাপগুলো ছিল ছন্দোবদ্ধ। পালা পরিবেশনারীতির নিয়মতান্ত্রিকতা মানা হয়েছে। প্রথমেই আল্লাহ-রাসুলের বন্দনা দিয়ে শুরু এবং শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নাট্যের শেষ। নাট্যে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতির অংশটি অত্যন্ত নাটকীয়। শাহ আবদুল করিমের চরিত্রে বিভিন্ন অভিনেতা অভিনয় করেছেন। নাট্যের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত করিম চরিত্রের ক্রমবিকাশে বিভিন্ন অভিনেতার অভিনয় নান্দনিক। একটি চরিত্রের বিভিন্ন অভিনেতার মধ্যে গতির পরম্পরা চমৎকার ছিল। করিমের চরিত্রের ক্রমবিকাশ অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটে উঠেছে। শাহ আবদুল করিমের স্ত্রী ‘সরলা’র সঙ্গে ভাববিনিময় অংশটুকু আলোক নিপুণতায় অত্যন্ত নাটকীয়। নাট্যের প্রথম দিকে শাহ আবদুল করিমের জবানিবর্ণন খুবই কম। কিন্তু নাট্যের শেষ পর্যায়ে আবদুল করিমের জবানিতে তাঁর দর্শনগত জীবনবাস্তবতা ফুটে উঠেছে। নাট্যে শাহ আবদুল করিমের প্রতিবাদী রূপও দেখা গিয়েছে। সমকালীন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পরিচিতি ও তাঁর রাজনৈতিক মতবাদও প্রকাশ পেয়েছে। মূলত গানের মাধ্যমে কাহিনি-পরম্পরায় করিমের জীবনবিকাশ মুখ্য ছিল। দৃশ্যগত আলাদা কোনো নাটকীয় দ্বন্দ্ব দেখা যায়নি। অনেকটা গানের ভিত্তিতে ডকুমেন্টারিসুলভ প্রকাশিত জীবনচিত্র। দুর্গা ও গাজীর পট ব্যবহার দর্শকের জন্য তাঁর চেতনা উপলব্ধিতে অত্যন্ত সহায়ক। এ লোকজ সাংস্কৃতিক উপাদান উপস্থাপন অত্যন্ত চমৎকার ও নান্দনিক। আলো পরিবেশ সৃষ্টিতে যথার্থ ভূমিকা পালন করেছে। তবে কাহিনি বর্ণনা বা উপস্থাপন আরো স্পষ্ট ও সাবলীল হলে দর্শক বেশি কমিউনিকেট করতে পারত। সেজন্য বর্ণনাত্মক বিষয়টি আরো ঘটনাবর্ণন পর্যায়ে প্রাঞ্জল হওয়া উচিত। শারীরিক ক্রিয়া ও গেমসগুলো অত্যন্ত পরিশ্রমী। কস্টিউমের কালারটি বৈরাগ্যের আবহে পূর্ণ। সমস্ত নাট্যটি আরো কালারফুল হলে দর্শকের মধ্যে আরো বেশি আনন্দ সঞ্চার হতে পারত বলে মনে হয়। নাট্যটির মধ্যে লালনের ডকুমেন্টারির প্রতিচ্ছাপ এবং সক্রেটিসের বিষপানের পূর্বের কথোপকথন স্টাইল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বেহুলার ভাসানে’র প্রভাব নির্দেশনার মধ্যে কিছুটা লক্ষ করা গেছে। শাহ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শন ভিত্তিতে গানে গানে অত্যন্ত সুন্দর চরিতপালা উপস্থাপিত হয়েছে, যা সাধারণ দর্শককে অতি সহজেই শাহ আবদুল করিমকে জানতে ও বুঝতে সাহায্য করবে।
মহাজনের নাও নাট্যের নির্দেশক ও পরিকল্পক সুদীপ চক্রবর্তী প্রযোজনা সম্পর্কে বলেন, ‘বাউল করিমের কর্মজীবন, সাধনা ও দর্শনকে বিষয় করে নাট্য আয়তনে উপস্থাপন করার অনেকদিনের যে সাধ ছিল, তা বুঝি এবার সাধ্যে পরিণত হবে। সাধ ছিল খেলার মাঠে (চারপাশে বসার আসন ঘেরা মাঠ) শতাধিক কুশীলবসমৃদ্ধ একটি গীতল নাট্য প্রযোজনা নিয়ে দেশময় চষে বেড়ানোর। ব্যয়বহুল ও প্রায় দুঃসাধ্য এ স্বপ্নযাত্রা তার আয়তন পরিবর্তন করে খোলা মাঠ থেকে চার দেয়ালের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তবে অভ্যন্তরে এলেও বাংলা নাট্যের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়। সঙ্গে যোগ হয় বিদেশি প্রয়োগ-কলা। সুবচন ব্যাকুল, কুশীলবেরা অধীর। দলপ্রধান এবং নাট্যকারের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় পান্ডুলিপি থেকে প্রযোজনার পথ ভ্রমণ হয়ে ওঠে গতিময়। মঞ্চ ও নেপথ্য কুশীলবদের সঙ্গে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা থেকে আসা প্রশিক্ষকবৃন্দের সম্মিলিত মেধা ও পরিশ্রমের নিরন্তর ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়োগে তিলে তিলে গড়ে ওঠে মহাজনের নাও।’
শাহ আবদুল করিম বাংলা গানের জগতের গর্ব। দীর্ঘদিন ধরে গানের একনিষ্ঠ সাধক হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশের সর্বত্র জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় তাঁর জীবনচরিত নিয়ে নাট্য প্রযোজনা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। শাহ আবদুল করিমের মতো অসংখ্য সংগীতশিল্পী বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সৃষ্টি হোক – এটা আমাদের সবারই কাম্য। 

 

Leave a Reply

*