logo

চিত্তপ্রসাদের ছবি কিছু ভাবনা কিছু জিজ্ঞাসা

সু শো ভ ন  অ ধি কা রী
শিল্পী চিত্তপ্রসাদের কথা বললেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে শানিত দৃষ্টির এক জোড়া উজ্জ্বল চোখ, ধারালো নাক আর সমগ্র মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে থাকা এক আকর্ষণী দীপ্তি – যা থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া শক্ত। এই আশ্চর্য মানুষটি আমৃত্যু অক্লান্তভাবে রচনা করে চলেন অজস্র ছবি। যেখানে প্রতিবাদের ভাষা আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার মতো দুর্বার বেগে ধেয়ে এসে দর্শককে হকচকিত করে দেয়। মানুষের সংগ্রাম-আর্তি-হাহাকার-অনাহার আর মৃত্যুর অসহায় যন্ত্রণা, সব একাকার হয়ে তাঁর ছবিতে যেন জ্বলে ওঠে সুতীব্র আগুনের হল্কা। হয়তো ইন্দ্রজালের মতো অলৌকিক বলে মনে হয়, যখন দেখি, সাধারণ একফালি সাদা কাগজের টুকরোয় শিল্পীর হাতের কালি-তুলির কয়েকটা তীক্ষè আঁচড় কী ভীষণ শক্তি ধারণ করতে পারে! চিত্তপ্রসাদের যে-কোনো ছবির সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়, মনের সঙ্গে তাঁর কব্জির জোরও কোন স্তরের! অথচ তিনি কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পাঠ গ্রহণ করেননি। স্বশিক্ষিত এই শিল্পী নিজের উদ্যম আর অধ্যবসায়ের দৃঢ়তায় নিজেকে উন্নীত করেছিলেন এই জায়গায়। শুনেছি, এই অভিমানী মানুষটি নন্দলাল বসুর শিল্পকলার আদর্শকে বুকের মধ্যে নিভৃতে লালন করে চলেছিলেন আমৃত্যু। মহাভারতের সেই একলব্যের মতো শিল্পাচার্যের এগিয়ে চলা পথটিকে নিজের মতো করে আত্মস্থ করে পথ চলেছিলেন চিত্তপ্রসাদ।
সম্প্রতি এই দুর্মর শিল্পীর কিছু কাজের প্রদর্শনী হয়ে গেল কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে, আয়োজক দিল্লির প্রখ্যাত সংগ্রাহক-প্রতিষ্ঠান ‘দিল্লি আর্ট গ্যালারি’। প্রদর্শনীতে ছিল তিরিশ-চল্লিশের দশকের কাজ থেকে প্রায় তাঁর শেষবেলাকার কাজের নিদর্শন, বন্ধু ও প্রিয়জনকে লেখা কিছু মূল চিঠিপত্র, আলোকচিত্র, সেই সময়ের সংবাদপত্রের কর্তিকা ইত্যাদি। সব মিলিয়ে চিত্তপ্রসাদের বিশাল শিল্প-ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল আলোর একটা আভা ফুটে উঠেছিল এ-প্রদর্শনীতে। আর সেখানে গ্যালারির এক পাশে কোনায় দেখানো হচ্ছিল চিত্তপ্রসাদের ওপর নির্মিত একটি বিদেশি তথ্যচিত্র। আর তার পাশে ছোট্ট সুসজ্জিত বিপণিতে পাওয়া যাচ্ছিল শিল্পীর কাজের চিত্রিত ক্যাটালগ, বইপত্র, ছবি ও পুস্তিকা, যা অনেকেই সংগ্রহ করছিলেন।
কিশোর বয়সেই চিত্তপ্রসাদের মধ্যে শিল্পের এক সোনার আলোকরেখা দেখা দিয়েছিল। প্রায় সতেরো বছরের কিশোর চিত্তপ্রসাদের হাতে বাংলার পটের ধরনে আঁকা কয়েকটি ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন অতুল বসু ও রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কিছু পরে রমেন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায় শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ‘মাস্টারমশাই’ নন্দলাল বসুর কাছে চিত্তপ্রসাদ তাঁর আঁকা কিছু ছবি নিয়ে দেখা করেছিলেন, ইচ্ছে ছিল নন্দলালের কাছে শিল্পের পাঠ গ্রহণ। কিন্তু নন্দলাল তাঁর পাকা হাতের ছবি দেখে বলেছিলেন, ‘তোমার তো শেখা হয়ে গেছে – নতুন করে আর কী শিখবে?’ এ-কথায় ভুল বুঝেছিলেন চিত্তপ্রসাদ, অভিমানে ক্ষুব্ধ হয়ে শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বোধ করি, সেই টিনএজ শিল্পীর চিত্তপটে নন্দলালের ব্যক্তিত্ব ও কাজ এক সুগভীর রেখা টেনে দিয়ে যায়। যে-রেখাটির ছাপ আজীবন সুস্পষ্টভাবে আঁকা ছিল চিত্তপ্রসাদের মনে। জীবনের অত ঝড়ঝাপটার মধ্যেও অনুজ শিল্পী সোমনাথ হোরের মাধ্যমে পাওয়া নন্দলালের আশীর্বাদী চিঠি পেয়ে কী আশ্চর্য রকম প্রাণিত হয়েছিলেন, কী বিপুল উৎসাহ পেয়েছিলেন, তা সোমনাথকে লেখা চিঠি পড়লেই বোঝা যায়। যদিও চিত্তপ্রসাদের ছবি বলতেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জীবন-যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। অথচ সাধারণভাবে তাঁর ছবিতে, তাঁর জীবনদর্শন ও ভাবনায় যে পথপরিক্রমা – তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শিল্পের এই প্রাণ-ভ্রমরের কথাটুকু আমাদের কাছে হয়তো অজানাই থাকত, যদি এই চিঠির খবর আমরা না পেতাম। ওই চিঠিটিতে উচ্ছ্বসিত চিত্তপ্রসাদ সোমনাথকে লিখেছেন – ‘নন্দবাবুর আশীর্বাদী যে চিঠিখানি পাঠিয়েছ তা পেয়ে যেমন অসীম আনন্দ হলো তেমনি অবাক হলাম। অতোটুকু কাজের অতো বড়ো পুরস্কার আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না কাল সারাদিন। অনেকের প্রশংসা েস্নহ পেয়েছি জীবনে কিন্তু নন্দবাবুর েস্নহ আশীর্বাদ যেন আমার কাছে স্বপ্নাতীত রকমের অপ্রত্যাশিত আর কতো বড়ো মূল্যবান আমার কাছে ঐ চিঠিটুকু তা তোমায় বলে বোঝাতে পারবো না।’ ওই চিঠিতে শিক্ষক নন্দলালের কথার ভেতরের ঠিক সুরটি ছুঁতে পেরেছিলেন তিনি, যা হয়তো তাঁকে কিঞ্চিৎ ভাবিয়েছিল। তাই একটু অ্যানালিটিকালি বুঝতে চেয়েছিলেন নন্দলালের চিঠির ভাষার অন্দরের ভাবটুকু। লিখেছিলেন, ‘নন্দবাবুর চিঠি পড়ে তাঁকে যেন নতুন করে দেখলাম এবার। তিনি ‘হাতের কায়দা’র চেয়ে ‘যাহা বলতে চাচ্ছি’কে ‘ভালোকাজের’ মাপকাঠি করেছেন চিঠিতে, মানে ফর্মের উর্দ্ধে কনটেন্টকে। তাঁর নিজের কাজ থেকে এটি আমি বুঝতে পারিনি কখনো।’ এ চিঠি পড়ে মনে হয়, ছবির ফর্ম ও কনটেন্ট – এই দুয়ের মধ্যে ফর্মের থেকে কনটেন্টকে খাটো করে না দেখার এই ভাবনায় চিত্তপ্রসাদ নিজেও বিশেষ আনন্দিত হয়েছেন। যা চিত্তপ্রসাদের ছবির অন্যতম দিকও বটে, যেখানে ‘কায়দা’ অর্থাৎ টেকনিকের চেয়ে ছবির ভেতরের জোর তার সোজাসাপটা ঋজু বক্তব্যই বারংবার প্রধান হয়ে ওঠে।
চিত্তপ্রসাদ যে কমিউনিস্ট পার্টির একজন প্রত্যক্ষ কর্মী ছিলেন, যাকে বলে হোল-টাইমার – এ-কথা যেমন নতুন করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই, সেই সঙ্গে এ-কথাও আমাদের জানা চিত্তপ্রসাদের শিল্পীসত্তা কখনই নির্বিচারে কারো দাসত্ব করে চলেনি। সে কোনো ব্যক্তি হোক বা কোনো রাজনৈতিক পার্টি। সুতীব্র এক আত্মসম্মানের বোধ তাঁকে সর্বদা স্বতন্ত্র করেছে, কখনো বা ঠেলে নিয়ে চলেছে স্রোতের বিপরীতে নিঃসঙ্গ একাকিত্বের দিকে। এক রাজনৈতিক আদর্শের ছায়ায় থাকলেও, নিঃসন্দেহে এ-কথা স্বীকার করতে হয় যে, তিনি ছিলেন প্রকৃত বুদ্ধিবেত্তার শিল্পী – যিনি মাথা নোয়াতে শেখেননি, কারো কাছে আপস করেননি এবং সারাজীবন জুড়ে দাঁতে দাঁত চেপে যার মূল্য চুকিয়ে গেছেন।
চিত্তপ্রসাদের সত্যিকারের পরিচয় তাঁর সাদা-কালোর কাজে। এসব ছবির কিছু উদাহরণ হিসেবে জনযুদ্ধ বা পিপলস ওয়ার পত্রিকায় মুদ্রিত ছবির কথা চকিতে আমাদের মনে পড়বে। চিত্তপ্রসাদের আঁকা পঞ্চাশের দশকের মহামন্বন্তরের ছবি দেখে, জার্মান শিল্পী ক্যাথে কোলহিৎসের কথা আমাদের মনে পড়তে বাধ্য – যাঁর ছবিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মৃত্যুর হিমশীতল অবসেশন। ক্যাথের ছবিতে, যুদ্ধের মর্মান্তিক প্রেক্ষাপটে কোথাও এক অসহায় মা তার পুত্রকে খুঁজে চলেছে অসংখ্য শবের মধ্যে, কখনো সেই মা বুকে জাপটে ধরে আছে পুত্রের মৃতদেহ। আবার কোথাও বা ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে জননীর বুকফাটা আর্তনাদ। ক্যাথের ছবিতে জননীর এই আর্তি আমাদের মনের মধ্যে কী যে ভয়ানক মোচড় দিয়ে যায়, তা তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়। একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, চিত্তপ্রসাদেরও একটা অত্যন্ত প্রিয় বিষয় ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’। পরবর্তীকালে চিত্তপ্রসাদের কাজে যেমন মা ও শিশুর আনন্দময় ছবি আঁকা হয়েছে বারে বারে – যা বাংলার লোকায়ত পুতুলের আদলে, কখনো বা রাজস্থানি পাপেটের ঘরানায় নির্মিত। তেমনি এই আনন্দঘন মুহূর্তের বিপরীত প্রান্তে দুর্ভিক্ষ-মড়ক-মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে কালি-তুলি বা চারকোলে আঁকা সেই মায়ের কোলে আগলে রাখা মৃত বা জীবন্মৃত ক্ষয়ে যাওয়া শিশুর চিত্রমালা অনায়াসে ক্যাথের ছবির প্রতিবেশী হয়ে ওঠে। যে-কোনো আর্ট গ্যালারিতে টাঙানো চিত্তপ্রসাদের এই সিরিজের ছবিগুলি দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয়। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না এসব ছবির সামনে। আর এ-কথা নির্দ্বিধায় বলতে হয় যে, লিনোকাটের ক্ষেত্রে চিত্তপ্রসাদ ছাড়া এত বড় মাপের আরেকজন শিল্পীর নাম সহসা স্মরণে আনা শক্ত। এসব ছবিতে জীবনের সপ্রাণতা, তার গতি আর ছন্দের তুলনা হয় না। সাদা কাগজের পটে তুলি বা কলমের মতোই অবলীলায় লিনোর ওপরে টুলসের অনায়াস স্বচ্ছন্দ বিচরণ মাঝে মাঝে আমাদের চোখে অবিশ্বাস্য ঠেকে। সে সাদার বিপরীতে কালো সিল্যুয়েটের দৃঢ় জ্যামিতি হোক বা হোক কালোর মধ্যে থেকে সাদা বিদ্যুৎরেখার ঋজু নির্মাণে তৈরি অবয়ব! সেই যে নন্দলাল তাঁকে চিঠিতে লিখেছিলেন,   ‘হাতের   কায়দা’র  চেয়ে  ‘যাহা  বলতে  চাচ্ছি’  সেইটেই ‘ভালোকাজের’ মাপকাঠি, শিল্পাচার্যের সেই আপাত সরল শব্দমালার আড়ালেই বুঝি লুকিয়ে আছে চিত্তপ্রসাদের ছবির মর্মকথা।
শিল্পের আসরে সুদীর্ঘকাল ধরে একটা তর্কের প্রবাহ বয়ে চলেছে, তা হলো শিল্প কি কেবল বিশুদ্ধ সুন্দরের বেদিতেই তার অর্ঘ্য সাজিয়ে দেবে? নাকি তাকে জীবনের প্রত্যক্ষ তাপ থেকে উঠে আসতে হবে? তার কাজে পরিপার্শ্বের ছাপ থাকতেই হবে, নাকি পাশ কাটিয়ে যেতে জীবনের যন্ত্রণা? তবে কি তথাকথিত অসুন্দরের দ্বারে তার পূজার নৈবেদ্য কোনো দিনই পৌঁছোবে না? শিল্প কি সর্বদা নিরপেক্ষ পথে চলবে শুচিবাতিকগ্রস্ত মানুষের মতো সব রকমের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে! মানুষের জীবনের ছবি, শিল্পীর জীবনের সংগ্রামের ছবি তবে কি প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠবে না তার কাগজে, ক্যানভাসে, পাথরে, ব্রোঞ্জে? জীবনের আর্তি হতাশা বেদনা যন্ত্রণার কোনো ঠাঁই হবে না সেখানে? সে কি কেবল অব্যক্ত সুন্দরের কথা বলবে? কিন্তু সুন্দরের কি সংজ্ঞাও কালের হাত ধরে ক্রমে বদলে যায়নি? অবশ্যই বদলেছে। কিন্তু কোনো কোনো স্রষ্টার গায়ে আমরা আজো কোনো কোনো বিশেষ লেবেল সেঁটে রেখেছি। চিত্তপ্রসাদের গায়েও তেমনি লেগে আছে একটা মার্কা। তাঁর কাজ দেখতে গিয়ে আমরা প্রায়ই সেই বিশেষ কাচের মধ্যে দিয়ে দেখি। কিন্তু চিত্তপ্রসাদের মতো বহুমুখী প্রতিভাধরের গায়ে একটা বিশেষ টিপছাপ কেন সেঁটে দেওয়া হবে? তাঁর ফ্যাসিস্ট সেনাদের অত্যাচারের ছবি, দুর্ভিক্ষের হাহাকার, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ধিক্কার Ñ এইসব হাড় হিম করা ছবির রাশি কালের সাক্ষী হিসেবে যতখানি, তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এর ভেতরের অন্তর্নিহিত ছবির উৎকর্ষ। সেইটা কেন আমাদের কাছে বড় নয়, এও কি শিল্পের এক প্রকার রাজনীতি নয়? এ তর্ক কোনোদিন থামবে না। বিশ্বশিল্পের ইতিহাসে এমন অনেক শিল্পীর নাম করতে পারি যাঁরা ভিন্ন ভাবনা ও দর্শনে বিশ্বাসী। কিন্তু কাজের দিক দিয়ে কেউই আগে-পরে নন, শিল্পবিচারের মাপকাঠিতে তাঁদের স্থান পাশাপাশি। স্বভাবতই এখানে এসে যাবে মাতিস ও পিকাসোর নাম। আমাদের দেশেও বিনোদবিহারী বা রামকিঙ্করের নাম উচ্চারিত হয় পাশাপাশি, অথবা নীরদ মজুমদার বা সোমনাথ হোর – এঁরা কেউ কি আগে বা পড়ে? তাহলে চিত্তপ্রসাদের ছবি নিয়ে আমাদের ভুল ভাঙবার সময় কি আজো আসেনি?

Leave a Reply

*