logo

চলচ্চিত্রের ভাষা – জনজীবনে চলচ্চিত্রের – প্রভাব ও চলচ্চিত্রে জনজীবন

মা হ মু দু ল হো সে ন
১. চলচ্চিত্রের ভাষা

‘There are voices in every film, regardless of how idealist and corny the sentiment reads; under the voices of the actors, characters and CGI dreamscapes, a consistent film identity is rambling off about its thousand moving parts. The audience ‘hears’ this voice, and decides if it is one they agree with, find annoying, or respect.’১
সম্ভবত বাহুল্যই; তবু লিখে নেওয়া যাক যে, এ-রচনায় আমাদের আগ্রহের বিষয় দুটি। প্রথমত, চলচ্চিত্রের ভাষা এবং দ্বিতীয়ত, জনজীবন এবং চলচ্চিত্রের দ্বিমুখী সম্পর্ক। আপাত এক সম্পর্ক এই দুই অধ্যায়ের মধ্যে যেন রচিত হয়েই আছে যে, একটি প্রকাশমাধ্যম হিসেবে ভাষার ভেতর দিয়েই চলচ্চিত্রের উপস্থিতি এবং তার গ্রাহ্যতা। আর সাধারণভাবে চলচ্চিত্রের গ্রাহ্যতা অবশ্যই অনেক মানুষের মধ্যে – যেন জনজীবনেই। তাহলে এই গ্রাহ্যতা অর্জিত হয় যে-ভাষার ভেতর দিয়ে – চলচ্চিত্রের ভাষা, আশা করা যেতেই পারে যে, জনজীবনের সঙ্গে তার একটি নিবিড় সম্পর্ক থাকবে; অন্তত অনেক মানুষের কাছে এই ভাষার একটা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা থাকবে। এরকম লেখার সময় আমরা যেন সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, চলচ্চিত্রের একটি সাধারণ ভাষা আছে; সারা পৃথিবীর তাবৎ চলচ্চিত্র একই ভাষায় কথা বলে – অন্তত এরকম একটি ভাষা যা বিশ্বের সকল চলচ্চিত্র-দর্শক একটি পর্যায় পর্যন্ত পাঠ বা উপলব্ধি করতে পারে। এ সিদ্ধান্তটি কিন্তু গ্রহণ করার অপেক্ষায় থাকে।
চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরো এক ধরনের দ্বিধার ভেতর পড়তে হয় যেন। আসলে ঠিক কী নিয়ে আলোচনা করতে চাই আমরা? চলচ্চিত্র একটি প্রকাশমাধ্যম হিসেবে কী কৌশলে কাজ করে তা-ই আমাদের আলোচ্য নাকি চলচ্চিত্র কীভাবে কাজ করে দর্শকের মধ্যে তা আমাদের আগ্রহের বিষয় – এই নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। কিন্তু মনে হতে পারে, আমরা কী আসলে একই প্রসঙ্গের দুই প্রান্ত ধরে কথা বলছি না! যে কৌশলে বিবৃত হয় চলচ্চিত্র তা কি দর্শকের পাঠের জন্যেই জরুরি নয়? এ বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ দেখি না। কিন্তু লক্ষ না করে পারি না যে, চলচ্চিত্রের প্রকাশের যে কৌশলগুলি তারা এক ধরনের স্থিতাবস্থা অর্জন করেছে চলচ্চিত্রের আবির্ভাবের চার দশকের ভেতরই। কিন্তু চলচ্চিত্র কীভাবে কাজ করে দর্শকের মধ্যে – এই আলোচনা ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠেছে এবং মানুষের জ্ঞানকান্ড যতই বিস্তৃত হয়েছে এই আলোচনা ততই নানা চিন্তাকে ধারণ করে এগিয়ে গেছে। দেখছি কাজ – অর্থাৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ; চিন্তা – অর্থাৎ চলচ্চিত্র-ভাষাতত্ত্ব বেশ আলাদা দুটি যাত্রা হয়ে উঠেছে। এই দুই যাত্রার মধ্যে ফারাকটি সমান্তরাল এবং অনিরামেয় – এরকম সিনিক্যাল মত প্রকাশ করছি না, কিন্তু চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে কথা বলতে গেলে এই ফারাকটির মুখোমুখি হতে হয় এবং কিছু দুরূহ ভাবনার পথ পাড়ি না দিয়ে প্রসঙ্গটির প্রতি সুবিচার করা যায় না।
‘Film grammar was and is a necessity for exhibiting crucial information to the audience, but film language is the voice that arises from the grammar…. The communicative methods of film are not the product of grammatical rules (although they work out of that as a base) but plug directly into our own perceptual experience of reality.’২
গত শতকের পাঁচের দশকে আন্দ্রে বাজাঁ চলচ্চিত্র-ভাষার বিকাশের যে তাত্ত্বিক ইতিহাস রচনা করেছিলেন তা প্রকাশমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রকে বিবেচনা করার প্রথম সর্বব্যাপী উদ্যোগ এবং সেই বিবেচনায় চলচ্চিত্র-ভাষার ধ্রুপদী তত্ত্ব হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। বিশেষ করে বাজাঁ এমন সময় লিখছিলেন যখন চলচ্চিত্র-কৌশল এক ধরনের স্থিতাবস্থা অর্জন করেছিল। বিভিন্ন দূরত্বের শট, ডেপথ অব ফিল্ড, মন্তাজ,
মিজ-অঁ-সীন, সম্পাদনার আরো সব সৃষ্টিশীলতা, বিভিন্ন অপটিক্যাল এফেক্ট, শব্দ, রং – এসব মিলে চলচ্চিত্রের প্রকাশের কৌশল-ভান্ডারটি তখন মোটামুটি পরিপক্ব। বিভিন্ন ফিল্ম ফরম্যাট ও প্রক্ষেপণ সুবিধা, ত্রিমাত্রিকতা, কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজ এবং ডিজিটাল স্টোরেজ পরে চলচ্চিত্রের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে এবং সেভাবে তর্ক করলে বলা যায় একজন নির্মাতার প্রকাশচিন্তাকে তারা প্রভাবিত করতেই পারে; কিন্তু তার প্রকাশের কৌশল-ভান্ডারে মৌলিক কিছু যোগ করেনি। লিখতে চাইছি চাইছি, দর্শকের যে কল্পনার জগৎ বা ডায়েজিসিস চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চায় তার কাঠামোটি সার্থকভাবে নির্মাণের উপকরণগুলি বাজাঁর চলচ্চিত্র-ভাষা বিবেচনার আগেই বা সমকালেই উপস্থিত ছিল। লেখা যাক, চলচ্চিত্র-ভাষার ব্যাকরণটি তখন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
বাজাঁ যেভাবে দেখতে চেয়েছিলেন তাতে করে আদিতে
চলচ্চিত্র-নির্মাতারা দুটি ভাগে বিভক্ত ছিলেন। একদলকে বাজাঁ অভিহিত করেছিলেন ইমেজিস্ট নামে এবং অপর দলকে রিয়ালিস্ট নামে। ইমেজিস্টরা আবার দুটি উপধারার প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। একদলে প্লাস্টিকস – যাঁরা আলো, দৃশ্যসজ্জা, কম্পোজিশন অথবা অভিনয় – এমনি সব কৌশলকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। আর অন্য দলে মন্তাজিস্টরা – যাঁরা দৃশ্য সম্পাদনার সম্ভাবনার মধ্যে চলচ্চিত্রের ভাষার মৌলিকত্ব অনুসন্ধান করছিলেন। অন্য প্রধান দলে ছিলেন রিয়ালিস্ট বা বাস্তববাদীরা – যারা মন্তাজিস্টদের মতো সময়কে ভেঙে ফেলেন না বা ‘বিকৃত’ করেন না এবং প্লাস্টিকসের চর্চাকারীদের মতো স্পেসের শুদ্ধতাকে বিনষ্ট করেন না। সেই চারের দশক পর্যন্ত রিয়ালিস্ট শিবিরে বাজাঁ যাঁদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তাঁদের ভেতর ছিলেন এরিক ফন স্ট্রহাইম, এফ ডব্লিউ মুরনাউ, কার্ল ড্রেয়ার আর জ্যাঁ রেনোয়া। অন্যদিকে মন্তাজিস্ট শিবিরকে আবার সময় ধরে দুই ভাগ করেছিলেন আন্দ্রে বাজাঁ। গত শতকের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় দশকের মধ্যে আবেল গাঁস, গ্রিফিথ এবং আইজেনস্টাইন আর তারপরে পুডভকিন প্রভাবিত আমেরিকার ধ্রুপদী ‘ইনভিজিবল’ ঘরানা। বাজাঁর মতে, তিনের দশক পর্যন্ত ইমেজিস্ট, বিশেষত, মন্তাজিস্ট এবং এক্সপ্রেশনিস্টরা প্রাধান্য বজায় রাখলেও তারপর ক্রমশ চলচ্চিত্র রিয়ালিস্ট আঙ্গিকেই বিকশিত হতে থাকে এবং এই সময়ের মধ্যে প্রায় সব প্রযুক্তিগত কৌশল যা চলচ্চিত্রের ভাষাকে প্রভাবিত করতে পারে তারা আবির্ভূত হতে যায়। এসব আবির্ভাব, বাজাঁর মতে চলচ্চিত্রের অভীষ্ট লক্ষ্য, চূড়ান্ত বাস্তববাদিতার সম্ভাবনাকে শক্তিমান করে তোলে এবং রিয়ালিজম দুটি ধারায় বিকশিত হতে থাকে। একটিকে বিশুদ্ধ অবজেক্ট রিয়ালিজম (বিভিন্ন ধরনের প্রামাণ্যচিত্র এবং নিওরিয়ালিজম) এবং অপরটিকে স্প্যাটিয়াল বা দেশগত রিয়ালিজম (রেনোয়া, অরসন ওয়েলস প্রমুখের কাজ) বলে আখ্যায়িত করা হয়।
বাজাঁর চিন্তায় এক ধরনের একরৈখিকতা কাজ করেছে; বিশেষ করে ‘চূড়ান্ত বাস্তববাদিতাই বিশুদ্ধ চলচ্চিত্র’ – এই মত এবং এই মত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিজ-অঁ-সীনের পক্ষে এবং মন্তাজের বিপক্ষে তার যুক্তিক্ষেপ প্রায় ডগমায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং দর্শনের দুটি দিক নিয়েই কাজ করেছিলেন – দেখতে চেয়েছিলেন কীভাবে চলচ্চিত্র-নির্মাতারা অগ্রসর হতে চেয়েছেন তাঁদের প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে এবং কীভাবে চলচ্চিত্র কাজ করে দর্শকের মধ্যে। তিনি মিজ-অঁ-সীনের পক্ষে দুটি প্রধান যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। এক. এইভাবে দৃশ্যগ্রহণ স্পেসের ঐক্যকে রক্ষা করে এবং স্পেসের মধ্যে যে-অবজেক্ট (বস্ত্ত এবং জীবন) রয়েছে তাদের সম্পর্কের ভিজুয়াল যৌক্তিকতাকে রক্ষা করে। দুই. মিজ-অঁ-সীন দর্শককে তার দেখার প্রক্রিয়াটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। কী দেখব, কোন ক্রমে দেখব, কতক্ষণ ধরে দেখব – এসব সিদ্ধান্ত দর্শক নিজে গ্রহণ করতে পারে এবং এভাবে এই দর্শনপ্রক্রিয়ার একটি সংশ্লেষণ নিজেই করে নিতে পারে। দেখছি, বাজাঁ নির্মাণ এবং দর্শন দুটি দিক নিয়েই ভাবছিলেন। এমনকি তিনি যখন মন্তাজের বিরুদ্ধে তাঁর মত এবং যুক্তি দাঁড় করাতে গেছেন তখনো নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং দর্শনপ্রক্রিয়া তাঁর চিন্তায় রয়েছে। তিনি একটি দৃশ্যের ভেতর শট কাটার তিনটি কারণ দেখতে পেয়েছেন। এক. গল্প বর্ণনার বিশুদ্ধ যৌক্তিক বিশ্লেষণ হিসেবে, দুই. চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হিসেবে এবং তিন. দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হিসেবে। তাঁর মতে, দেশগত এবং মনস্তাত্ত্বিক এসব কাট একটি দৃশ্যের বর্ণনায় কোনো কিছু যোগ করে না; কেবলমাত্র গুরুত্ব বা তীব্রতা বৃদ্ধি করে। এটি তাঁর কাছে অর্থহীন মনে হয়েছে এবং দর্শকের বুদ্ধিমত্তার প্রতি তিনি একে অপমানজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আন্দ্রে বাজাঁর অসাধারণ পান্ডিত্যপূর্ণ এবং মৌলিক এসব বিশ্লেষণের সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে আজ হয়তো একমত হওয়া মুশকিল। কিন্তু লক্ষ করি যে, তিনি যেমন চলচ্চিত্র-ভাষার আলোচনায় নির্মাণ এবং দর্শন দুটি দিককেই বিবেচনা করতে চেয়েছিলেন; তেমনি চলচ্চিত্রকে তাঁর নিজস্ব করণকৌশলের মধ্যে স্থিত রেখে এই আলোচনা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। চলচ্চিত্রকে বাস্তবতার প্রতি সময়ের দিক থেকে, স্পেসের দিক থেকে এবং নৈতিকতার দিক থেকে বিশ্বস্ত এক প্রকাশমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করার জন্যে জ্ঞানকান্ডের অন্য কোনো শাখার প্রতি তিনি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেননি। ফলে চলচ্চিত্রের ভাষার আলোচনা অ্যাকাডেমিক হয়ে উঠলেও তা চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করেনি, বরং তাকে উপাত্ত করেই এগিয়েছে। এই ধারা কিন্তু চলচ্চিত্র-ভাষার আলোচনায় পরে বজায় থাকেনি।
চলচ্চিত্র-ভাষা বিষয়ে আলোচনা ক্রমশ একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাডেমিক প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে কীভাবে চলচ্চিত্র কাজ করে দর্শকের মধ্যে – এই বিবেচনার দিকে। একটি ভিজুয়াল প্রকাশমাধ্যম হিসেবে যেভাবে চলচ্চিত্র জাগায় কোনো অনুভব
চলচ্চিত্র-ভোক্তার ভেতরে তা চলচ্চিত্র-ভাষার মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে। অথবা চলচ্চিত্র একটি গণমাধ্যম হিসেবে কীভাবে কাজ করে জনমানসে সেটা যাঁরা খতিয়ে দেখতে চান চলচ্চিত্রের ভাষা তাঁদের জন্যে ভাবনার প্রধান উপাত্ত বিশেষ। আর এসব আলোচনায় ভাষাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি-তত্ত্ব প্রধান জায়গা করে নিয়েছে। চলচ্চিত্রের নির্মাণপ্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা এসব আলোচনায় খুব প্রবল নয়।
বাঁজা রিয়ালিস্টদের প্রতাপশালী অবস্থান গ্রহণের যে-সময়কাল নির্দেশ করেছিলেন; অর্থাৎ যে-সময়ে চলচ্চিত্র-ভাষার (অথবা ব্যাকরণেরই আসলে) মূল বিষয়গুলো উদ্ভাবিত হয়ে গিয়েছিল তখনই চলচ্চিত্রের একটি সাধারণ ভাষার মান নির্ধারিত হয়ে যায়। একটি প্রকাশমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের সাধারণ সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতাগুলোর চৌহদ্দি নির্ধারিত হয়ে যায়। এভাবে যে-স্থিতাবস্থার সৃষ্টি হয় তা হলিউডের এবং ইউরোপের এবং আরো পরে মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় সিনেমা হাত ধরে চলচ্চিত্র-ভাষার এক আশ্চর্য সমতায়িত, স্থির এবং কার্যকর অবস্থা সৃষ্টি করে। যেভাবেই হোক দর্শক, বিশ্বব্যাপী, এই ভাষার সঙ্গে স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠে। এরকম লেখা যেতে পারে – চলচ্চিত্র হচ্ছে একটি যোগাযোগের মাধ্যম, যা নানা রকম পরিশীলনের ভেতর দিয়ে কিছু নির্দিষ্ট ব্যাকরণ এবং আনুষ্ঠানিক প্রথাকে গ্রহণ করেছে (যেমন, ক্যামেরা কোণ, সম্পাদনা, শব্দ)। এই ব্যাকরণ এবং প্রথা মিলে চলচ্চিত্রের সাধারণ ভাষার সৃষ্টি হয়েছে এবং দর্শক এই ভাষার ভেতর দিয়ে চলচ্চিত্রকে পাঠ অথবা উপলব্ধি করতে পারে।
এই সাধারণ চলচ্চিত্র-ভাষাই চলচ্চিত্র-ভাষাবিষয়ক আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে ক্রমে। অন্যদিকে পরবর্তীকালে সৃষ্টিশীল নির্মাতারা, দেশে দেশে, চলচ্চিত্র-ভাষায় নিজেদের মৌলিক চিন্তাগুলো স্থাপন করেছেন। এভাবে চলচ্চিত্রের বিশেষ ভাষাগুলো সৃষ্টি হয়েছে। জাপানে ওজু, রাশিয়ায় তারকোভস্কি, সুইডেনে বার্গম্যান, ভারতে ঋত্বিক ঘটক বা মনি কাউল, ফরাসি নবতরঙ্গ, নতুন জার্মান সিনেমা, ডগমা ৯৫… এভাবে লিখে যাওয়া যাবে অনেক নাম। এসব বিশেষ চলচ্চিত্র-ভাষা চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হলেও চলচ্চিত্রের ভাষাবিষয়ক আলোচনায় আলাদা করে বিবেচিত হয় না। যখন চলচ্চিত্র-ভাষার আলোচনায় তারকোভস্কির স্যাক্রিফাইস প্রসঙ্গ ওঠে, তখন তারকোভস্কির ক্যাথলিকিজম, পাগান বিশ্বাসে আগ্রহ, নিটসের দর্শনের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ, তার চলচ্চিত্রে প্লাস্টিক গুণ, স্প্যাটিয়াল
মিজ-অঁ-সীনের ব্যবহার – এসব কিছুই প্রাধান্য পায় না। বরং দর্শকের ভেতর চলচ্চিত্রের কাজ করার কোনো তত্ত্বে কীভাবে ফিট করে এই ছবি তার আলোচনা গুরুত্ব লাভ করে। মনে করি যে, এর কারণটি লুকিয়ে আছে চলচ্চিত্রকে নিয়ে সৃষ্টি হওয়া একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে। আমরা যেসব চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের বা আন্দোলনের নাম ওপরে লিখেছি তাঁদের ছবি কতজন মানুষ দেখেছেন? হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। অথচ রয়েছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের এমন এক ভান্ডার যা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ভোগ করছে। সত্য এই যে, আগে উল্লিখিত ওইসব নির্মাতা এবং তাঁদের নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলো; যাদের নামকরণ করা যায় ‘অন্য চলচ্চিত্র’; বিশ্ব চলচ্চিত্র কর্মকান্ডে প্রান্তিক কিছু নাম। এই প্রান্তিকতা তাত্ত্বিকদের অনাগ্রহী করে তোলে, সম্ভবত, তাঁদের নির্মিতির বিশ্লেষণকে
চলচ্চিত্র-ভাষাবিষয়ক আলোচনার বিষয় করে তুলতে। কেননা ভাষা বলতে ব্যাপকভাবে গ্রাহ্য একটি ব্যবস্থাকেই বুঝতে চাওয়া হয়। বিশেষ মানুষের বিশেষ প্রকাশ-আঙ্গিক ভাষাবিষয়ক আলোচনায় সৃষ্টি করতে পারে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ, হয়তো অরাজকতা! অন্যদিকে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হয় এবং অনেক মানুষ দেখে যেসব চলচ্চিত্র তারা চলচ্চিত্রের ভাষায় নতুন কিছু যোগ করে না, চারের দশকে স্থিতাবস্থা অর্জনকারী সাধারণ ভাষাতেই কথা বলে। এসব ছবির নির্মিতি নিয়ে আলোচনা করে চলচ্চিত্রের ভাষা বিষয়ে নতুন কিছু বলা যাবে বলে কেউ ভাবতে পারেন না। এভাবে নির্মাণের দিকটি চলচ্চিত্রের ভাষাবিষয়ক আলোচনায় পেছনের আসন গ্রহণ করে। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের কিছু গুণ চলচ্চিত্র পাঠের ব্যাপারে নানা বিষয়ে জ্ঞানচর্চাকারীদের আগ্রহী করে তোলে। চলচ্চিত্রের দর্শকের মধ্যে সমান্তরাল পৃথিবী সৃষ্টির ক্ষমতা, অনেকের কাছে পৌঁছনোর ক্ষমতা, মত, পণ্য এবং আদর্শ প্রচারের ক্ষমতা এসব গুণের অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা দুদিক থেকেই চলচ্চিত্রের ভাষার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রথমত, চলচ্চিত্র কীভাবে প্রভাবিত করে জ্ঞানকান্ডের তাদের শাখাকে এবং তাদের জ্ঞানকান্ড শাখা কীভাবে প্রভাবিত করে চলচ্চিত্রকে। আর এই বিবেচনায় চলচ্চিত্রে ভাষা পদটি চর্চিত হয়। কেননা ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম এবং যোগাযোগেই সকল জ্ঞানচর্চার চূড়ান্ত সাফল্য।
চলচ্চিত্রের ভাষার আলোচনায় একসময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল ফিল্ম সেমিওটিক্স। ক্রিশ্চিয়ান মেটজের Film Language, Language and Cinema গ্রন্থের ভেতর দিয়ে চিহ্ন এবং সংকেত চলচ্চিত্র পাঠের ক্ষেত্রে মূল উপাত্ত বলে বিবেচিত হয়েছিল। চলচ্চিত্রের সংকেত কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং কীভাবে দর্শক সাধারণ নির্দেশনা
(denotation) এবং গূঢ়ার্থ বিবেচনার (Connotation) ধাপগুলো পার হয় চলচ্চিত্র পাঠের ক্ষেত্রে তা-ই ফিল্ম সেমিওটিক্সে আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে এক ধরনের টেক্সট হিসেবে বিবেচনা করে তার পাঠোদ্ধারে সেমিওটিক্সের সূত্রগুলি ব্যবহৃত হয়েছিল। রোলাঁ বার্থ যেভাবে সাহিত্যের সংকেতগুলিকে চিহ্নিত করেছিলেন, মেটজ একইভাবে চলচ্চিত্রের সংকেতসমূহ চিহ্নিত করতে উদ্যোগ নেন।
আর সাতের দশকে উত্তর কাঠামোবাদী নানা মতবাদ চলচ্চিত্র-ভাষার বিবেচনায় প্রযুক্ত হয়েছিল। খানিকটা মার্কসবাদী, খানিকটা আগেকার সেমিওটিক্স থেকে উৎসারিত এবং খানিকটা মনস্তত্ত্ব-বিশ্লেষণী অ্যাপারাটাস থিওরি নামে পরিচিত মতবাদ চলচ্চিত্রকে চরিত্রগতভাবে আদর্শিক বলে শনাক্ত করেছিল। বলা হয়েছিল, এর উপস্থাপনার যে কারিগরি সম্ভার যেমন ক্যামেরা বা সম্পাদনা – এসবই আদর্শিক উপকরণ। দর্শকও, এই দৃষ্টিকোণ থেকে, এই চলচ্চিত্রিক উপস্থাপনার মধ্যে একটি আদর্শিক অবস্থানে থাকে। চলচ্চিত্র দর্শকের মধ্যে সমাজে প্রাধান্য অর্জন করেছে এমন সংস্কৃতির আদর্শকে সঞ্চারিত করে এবং এই আদর্শ চলচ্চিত্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না বরং এটা চলচ্চিত্রের চরিত্রেরই অংশ।
এরপর আটের দশকে ডেভিড বোর্ডওয়েল, নোয়েল ক্যারল, জোসেফ অ্যান্ডারসন প্রমুখের চিন্তার সমন্বয়ে আবির্ভূত হয় কগনিটিভ ফিল্ম থিওরি বা চলচ্চিত্রের অবধারণ বা বোধতত্ত্ব। এই তত্ত্ব চলচ্চিত্র দর্শকের বোধকে বিশ্লেষণ করে। চলচ্চিত্র দেখার ভেতর দিয়ে দর্শকের মধ্যে যে-উপলব্ধি অর্জিত হয়, যা চলচ্চিত্রের টেক্সটের পাঠের অতিরিক্ত কিছু তা গুরুত্ব লাভ করে। বিশ্লেষণে দেখানো হয়, কীভাবে চলচ্চিত্র তার প্রধান বর্ণনাত্মক তথ্যসম্ভারের দিকে দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং কীভাবে চেনা পৃথিবীর বস্ত্ত এবং ধারণাগুলিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যাতে দর্শকের মধ্যে এক নতুন অভিজ্ঞতার অনুভব ঘটে। বোর্ডওয়েল এবং তাঁর সঙ্গীরা পূবর্তন উত্তর কাঠামোবাদী তত্ত্বগুলিকে আরেক ধরনের গ্র্যান্ড থিওরি বলে আখ্যায়িত করে দেখিয়েছেন যে, এই তত্ত্বগুলি কিছু পূর্বনির্ধারিত তাত্ত্বিক কাঠামোকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করে মাত্র। এভাবে কগনিটিভ ফিল্ম থিওরির হাত ধরে চলচ্চিত্র-ভাষার আলোচনায়
চলচ্চিত্র-নির্মাতার প্রকাশবিষয়ক বিবেচনা খানিকটা গুরুত্ব অর্জন করে। কিন্তু এই বিবেচনা কোনো চলচ্চিত্র-নির্মাতার বিশেষ ভাষা-আঙ্গিককে বিশ্লেষণ করে না, বরং চলচ্চিত্রের সাধারণ ভাষার মানকে গ্রহণ করে তার আলোকেই চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা করতে উদ্যোগী হয়। নব্য-আঙ্গিকবাদী
যে-চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ এই ধারায় লক্ষ করা যায় তা চলচ্চিত্রের মৌলিক ব্যাকরণকে উপজীব্য করেই অগ্রসর হয়।
আরো পরে সেমিওটিক এবং কগনিটিভ চলচ্চিত্রতত্ত্বের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা শুরু হয়েছে। যার নামকরণ করা হয়েছে কগনিটিভ ফিল্ম সেমিওটিক্স। ভাষাতত্তেবর ক্ষেত্রে কগনিটিভ সেমানটিক্সের উদ্ভব এই সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইনানসিয়েশনের ধারণা, যা চলচ্চিত্রের টেক্সটের সঙ্গে দর্শকের সম্পর্কের একটি কাঠামো দাঁড় করানোর কথা বলে। আর উত্তর কাঠামোবাদী নানা তত্ত্ব চলচ্চিত্র দেখার প্রক্রিয়াকে একটি অক্রিয় (passive) প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন, পরবর্তীকালে কগনিটিভ এবং কগনিটিভ ফিল্ম সেমিওটিক তত্ত্বের প্রবক্তারা এই বক্তব্যও গ্রহণ করেননি এবং চলচ্চিত্র-দর্শনের কাজকে একটি সক্রিয় (active) প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
এভাবে চলচ্চিত্র-ভাষা জটিল হয়ে ওঠেনি, জটিল হয়ে পড়েছে চলচ্চিত্র-ভাষাবিষয়ক ভাবনা এবং বিতর্ক। আবার দেখছি এই বিতর্ক তুঙ্গে থাকতেই চলচ্চিত্র পাঠের আলোচনাকে সমকালে প্রাসঙ্গিক রাখার জন্যে এর নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে নজর ফেরানোর কথা উঠেছে। এই উদ্ধৃতিটি লক্ষ করা যেতে পারে।
‘Distinctions between passive and active viewing in contemporary, or more specifically, postmodern cinema, are incompatible with ways of seeing, or spectating, that contemporary culture employs. On one level, the activity of intellectually or emotively responding to La Aventura is vastly removed from a response to a multi-million dollar film franchise in which a complex engagement with the film text requires immersion in its performance as a product in the market : soundtracks, computer games, action
figures, clothing and various other marketing strategies employed by most sections of the marketplace. Film theory must re-engage with the complexities of how a film is read, or viewed, and this analysis (if it is to be a qualitative analysis of popular culture) must begin with an analysis of its film aesthetics.’৩
লক্ষ না করে পারি না যে, চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্ব বা অন্য কথায় নির্মাণের দিক থেকে চলচ্চিত্র-ভাষার ওপর জোর দিতে চাওয়ার আগে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র এবং আর্ট সিনেমার (আমরা বরং লিখি অন্য সিনেমা) একটা দূরত্বের কথা এই উদ্ধৃতিতে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক জনপ্রিয় সিনেমাকে একটি বিশাল পণ্যবাজারে প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে টিকে থাকতে উদ্যোগী একটি কর্মোদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে জনপ্রিয়-সংস্কৃতির নন্দনতত্ত্বকে বুঝতে সচেষ্ট হওয়ার যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে তাও শেষ পর্যন্ত বাজার, পণ্য, বিপণন এমনি সব পুঁজি-বাণিজ্য পদে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। আর ‘অন্য সিনেমা’ আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে এখন যে আরো বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়েছে তা লেখা যেতেই পারে। একথা আমরা মানব যে, পাঁচের দশকের নিওরিয়ালিজম, ছয়ের দশকের ফরাসি নবতরঙ্গ বা সে সময়কার অন্য প্রধান নির্মাতা, যেমন বার্গম্যান বা কুরোসাওয়ার ছবি সাধারণ দর্শক সে-সময় যতটা দেখেছেন সে তুলনায় গেল তিন দশকের হো সিয়ে সিয়েন, থিও অ্যাঞ্জেলোপউলাস বা বেলা টারের ছবি সমকালের সিনেমামোদী দর্শকরা অনেক কম দেখেছেন। এর জটিল এবং সম্ভবত একাধিক কারণ রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় কারণটি হচ্ছে অন্য বা জনপ্রিয় সিনেমা যার কথাই বলি না কেন, সাম্প্রতিক বাস্তবতা এই যে, চলচ্চিত্র আর দৃশ্যসংস্কৃতির কেন্দ্রীয় ভূমিকায় নেই। গত আড়াই দশকের ডিজিটাল প্রযুক্তি দৃশ্যসংস্কৃতিতে এত উপাদান যুক্ত করেছে যে, চলচ্চিত্র এখন অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। প্রায় এক শতক ধরে চলচ্চিত্র মানুষের দেখার সমান্তরাল জগৎ নির্মাণের ক্ষেত্রে একচেটিয়া রাজত্ব করেছে। আলোকচিত্র বা তারও আগে চিত্রকলা মানুষকে as if জগতের অনুভব দিতে পারেনি, যা চলচ্চিত্র পেরেছিল। কিন্তু টেলিভিশন, ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোন এই as if জগৎকে অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছে। আমরা ভারচুয়াল রিয়ালিটি শব্দটি স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করছি। চলচ্চিত্র কেবল মাত্র মানুষের এক গল্প-জগৎ সৃষ্টি করেছিল মাত্র এবং তর্ক করা যেতে পারে যে, বাস্তব জগৎকে
যে-উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতার সম্ভার ব্যবহার করে মানুষ পাঠ করে সেই জগৎকেও মানুষ একইভাবে পাঠ করে; এবং বেশ কিছু অসংগতি এবং অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিয়ে মানুষ এই পাঠ সম্পন্ন করে। কিন্তু নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি ‘দেখা’ ক্রিয়া পদটির দ্যোতনা ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছে। দেখা এখন সম্পর্কিত হওয়া, যোগাযোগ করা, উপস্থিত হওয়া, পাঠ করা, মতামত দেওয়া এমনি সব ক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। এরকম লেখা যেতে পারে যে, ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে দৃশ্যসংস্কৃতির প্যারাডাইম পরিবর্তিত হয়ে গেছে, মানুষের সভ্যতায় এক ধরনের চালকের আসনে বসে পড়েছে নানা দৃশ্যমাধ্যম; সেখানে প্রচলিত ধারা চলচ্চিত্র, জনপ্রিয় বা অন্য, প্রধান নয়। আবার চলচ্চিত্রের নানা মাত্রার গণায়ন হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিই চলচ্চিত্রের নির্মিতিকে সহজ ও সুলভ করেছে। এর ফলে চলচ্চিত্র একটি বিশেষায়িত প্রকাশমাধ্যমের কৌলীন্যও খানিকটা হারিয়ে বসেছে। এখন যে কেউ চলচ্চিত্রকার হতে পারেন; মার্টিন স্করসিসে থেকে শুরু করে বাংলাদেশের গ্রামের মোবাইল ফোন হাতে কোনো কিশোরী। এবং তাদের চলচ্চিত্র একই সঙ্গে পাওয়া যেতে পারে ইউ টিউবে। অন্যদিকে নানা ধরনের ভিজুয়াল প্রকাশের জন্যে নিউ মিডিয়া আর্ট নামের নবতম শিল্পধারায় চলমান ছবি ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাপকভাবে এবং শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্যে ব্যবহৃত এসব চলমান ছবি কীভাবে বিবেচিত হবে সে এক প্রশ্ন বটে। অথবা বিবেচনা বা ক্যাটালগিং, শ্রেণিকরণ এসব বাদ দিয়ে আমরা এক ক্রীড়াময়, অনানুষ্ঠানিক তারল্যের ভেতরেই ঢুকে যাই না কেন – এই কথাও বলা হচ্ছে জোরেশোরেই। জনজীবনে চলচ্চিত্রের প্রভাব নিয়ে লিখতে গিয়ে আমাদের এই বিবেচনাগুলো হিসেবের ভেতর রাখতে হবে।

২. চলচ্চিত্র ও জনজীবন
চলচ্চিত্র সাধারণভাবে বাস্তবতার প্রতিরূপ নির্মাণ করে। চলচ্চিত্র-ভাষার এই ভৌত গুণটির সঙ্গে চলচ্চিত্রের টেক্সট বা ন্যারেটিভের কোনো সম্পর্ক নেই। পরিকল্পিতভাবে কোনো চলচ্চিত্র অবাস্তব আবহ নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু তারা বিরলই। অন্যদিকে টেক্সট যতই প্রথাবিযুক্ত এবং ন্যারেটিভ যতই অসরল হোক না কেন; যেমন তারকোভস্কির মিরর বা মনি কাউলের সিদ্ধেশ্বরী; যেসব ইমেজ গেঁথে এসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয় তারা বাস্তবের প্রতিরূপই বটে। কিন্তু এই প্রতিরূপ নির্মাণ জীবনের প্রতিফলনকে নিশ্চিত করে না। বরং চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে এ এক প্রাচীন অভিযোগই যে, সে-বাস্তবের বিভ্রম সৃষ্টি করে অলীকের মোহ নির্মাণ করে। চলচ্চিত্রের সর্বজনীন ভাষা বাস্তবের বিভ্রম সৃষ্টিতে মূল ভূমিকাটি পালন করে। কিন্তু যে-বিষয়টি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটি এই যে, চলচ্চিত্র তার অস্তিত্বের জন্যে বাস্তবের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতা একটি সমাজে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে জায়মান বাস্তবতা। আবার উলটো দিকে চলচ্চিত্রের গল্প-পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ত হবার ক্ষমতাও এখন অনেক পরিপক্ব। এই পরিপক্বতা বিংশ শতাব্দীর মানুষের চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে ক্রমাগত অর্জিত হয়েছে। সুতরাং চলচ্চিত্র-ভাষার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত চলচ্চিত্রিক-বাণী মানুষ সহজেই আত্মস্থ করে। চলচ্চিত্র ব্যক্তি এবং সামাজিক মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে এবং কাজ করে। অতএব একটি পর্যায়ে চলচ্চিত্র এবং সমাজ বা জনজীবন পরস্পরের মধ্যে
প্রবিষ্ট – এ কথা লেখা যায়।
লক্ষ করি, চলচ্চিত্র-নির্মাণ একটি এমন কর্মপ্রক্রিয়া যা তার সমাজ ও সময়কে এড়িয়ে সম্পন্ন হতে পারে না। একটি চলচ্চিত্রের নির্মিতির মধ্যে তার সময় ও সমাজের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাজনৈতিক স্পেস – এসব বিষয়ের স্বাক্ষর বহন করে। চলচ্চিত্রের বিষয় যা-ই হোক না কেন, চলচ্চিত্রের অভিব্যক্তির মধ্যে এই সামষ্টিক বিষয়গুলো, যারা সে-সময়কার জনজীবনের নিয়ামক, ধরা থাকে। স্টপ জেনোসাইড এবং ১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুটি প্রামাণ্যচিত্র। প্রথমটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্মিত হয়েছিল আর দ্বিতীয়টি মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পর নির্মিত হয়েছে। স্টপ জেনোসাইডের নির্মিতির মধ্যেই ধরা আছে সংগ্রামী এবং অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত একটি সমাজের একটি নির্দিষ্ট সময়। এর প্রযুক্তি সামান্য এবং উপকরণ সীমিত অথচ তার মধ্যেই অভিনব বা বলা যাক মৌলিক কিছু করার প্রচেষ্টা কাজ করেছে। একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র নির্মাণের চেষ্টার মধ্যে যে-সৃজনশীলতা কাজ করে তার সমান্তরালে স্থাপন করা যায় এই ছবির নির্মিতিকে। আবার যে হত্যাযজ্ঞ এবং স্থানচ্যুতির ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সমকালে নির্মিত এই ছবি তার ছাপ সে বহন করে তার ফ্রেমে। যে-ক্যামেরা অনুসরণ করে শরণার্থীর মিছিলকে সেও আসলে শরিক ওই স্থানচ্যুত অনিশ্চয়তার। তার সম্পাদনায় আতঙ্কিত, বিক্ষুব্ধ এক্সপ্রেশনিজমের ছাপ স্পষ্ট। চল্লিশ বছর পর নির্মিত ১৯৭১ তার সময়কে ধারণ করেছে ভিন্নভাবে। ছবির ডিজিটাল ফরম্যাট তার সময়ের প্রযুক্তির অগ্রগতিকে নির্দেশ করেছে। এই ছবির মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথ্য ইতিহাস নির্মাণের যে-চেষ্টা আছে তার মধ্যে একটি প্রজন্মের ইতিহাস-চেতনার ছাপ আছে, আছে যৌথ বিস্মৃতিকে কাটিয়ে নিজের অতীতকে বুঝবার অঙ্গীকার। এ ছবি ১৯৭১ সালে নির্মিত হওয়া সম্ভব ছিল না তো বটেই, এমনকি গেল শতকের সাত, আট বা নয়ের দশকের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আবহে, বাংলাদেশে, এই ছবির নির্মাণ সম্ভব ছিল না। এভাবে ১৯৭১ সমকালের বাংলাদেশের একটি চলচ্চিত্র-প্রচেষ্টা হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইতালিতে যে-বাস্তবতায় নিওরিয়ালিজম যাত্রা শুরু করেছিল তার ছাপ পড়েছিল সেসব ছবির নির্মিতিতে। উল্লেখ করা যেতে পারে, নিওরিয়ালিস্ট ধারার নির্মাতারাই যখন সময়ের যাত্রায় পৌঁছেছেন ছয়ের দশকে এবং তারও পরে তখন তাঁদের ছবিতে নিওরিয়ালিজমের নিরাভরণ আঙ্গিকটি আর বজায় থাকেনি। যে ফেলিনি স্ত্রাদা নির্মাণ করেছিলেন তিনিই পরে এইট অ্যান্ড হাফ নির্মাণ করেছিলেন। কেননা ফেলিনি এই দুটি ছবি নির্মাণের সময় একই সামাজিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছিলেন না। এমনকি একটি কল্পকাহিনি বা রূপকথাও তার নির্মাণের সময়কালকে ধারণ করে। মনে আছে, ছয়ের দশকে ঢাকায় নির্মিত লোককাহিনিভিত্তিক ছবি আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীতে যখন সওদাগর বিদেশযাত্রা করবেন বলে স্থির করলেন তখন তার সারেং বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে দুই হাত চোঙার মতো করে মুখে তুলে হাঁক দিয়ে মাঝিমাল্লাদের ডাক দিলেন। প্রায় নিশ্চিতভাবেই লেখা যায়, আজ এই দৃশ্যটি এরকম সাদামাটাভাবে চিত্রায়িত হতো না, এই ডাক দেওয়ার ব্যাপারটি এরকমভাবে মেনে নিতে পারতেন না আজকের দর্শক, এমনকি নির্মাতা পর্যন্ত। চলচ্চিত্র একটি প্রকাশমাধ্যম হিসেবে তার নির্মিতির মধ্যেই তাহলে তার সময়কে ধারণ করে।
বেশিরভাগ চলচ্চিত্র যেসব লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত হয় তার মধ্যে আর্থিক বিবেচনাটি একেবারে সামনের সারিতে থাকে। সুতরাং তাকে লোকপ্রিয় হতে হবে – এই চ্যালেঞ্জটি তার সামনে থাকে। দর্শক কী দেখতে চায়, অনেক দর্শক, এটা অবশ্যই চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একটি প্রধান বিবেচনা হিসেবে কাজ করে। এভাবে দেখলে, চাহিদার দিক থেকে চলচ্চিত্র জনজীবন-প্রভাবিত একটি কর্মকান্ড। তবে এরকম বিবেচনাও ক্রিয়াশীল যে, আসলে চলচ্চিত্রই এ-চাহিদা নির্মাণ করে। জনসংস্কৃতি নির্মাণে জনগণের কোনো ভূমিকা থাকে না, জনগণ একে নিয়ন্ত্রণ করে না, কেবল ভোগ করে মাত্র – এরকমভাবে ভাবলে চলচ্চিত্র একটি সরবরাহ দিক-নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক পণ্য। আবার চাহিদার দিকটিকে গুরুত্ব দিলেও এ-কথা লেখাই যায় যে, এই চাহিদা সৃষ্টিতে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ প্রভাব বিস্তার করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় হলিউডের স্টুডিওগুলো প্রধান নির্মাতাদের দিয়ে এই যুদ্ধের নানা প্রেক্ষাপট নিয়ে ছবি তৈরি করিয়েছিল। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এ সময় যত ছবি তৈরি হয়েছিল তার বেশিরভাগের বিষয় ছিল ওই যুদ্ধই। লক্ষ করি যে, নয়ের দশক থেকে মুম্বাই চলচ্চিত্রে টিনএজারদের বিষয় করে ছবি নির্মাণের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। কুচ কুচ হোতা হ্যায়, থ্রি ইডিয়টস, লাভ স্টোরি, জানে তু ইয়া জানে না – এসব ছবি তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বাস্তবে গত দুই দশক ধরে তরুণ প্রজন্ম সমাজে অত্যন্ত শক্তিশালী এক জনগোষ্ঠী হয়ে উঠেছে – যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে সকলের চেয়ে এগিয়ে থাকছে এবং পণ্য ক্রয়বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায় সফল চলচ্চিত্র নির্মাণে তারুণ্যের বন্দনা প্রাধান্য লাভ করেছে। মনে করি পশ্চিমে বিষয়টির শুরু আরো দুই দশক আগে এবং চলচ্চিত্রেও তার ছাপ যথাসময়েই পড়েছিল। জর্জ লুকাচের ১৯৭২-এর ছবি আমেরিকান গ্র্যাফাটি দিয়ে এর শুরু।
গীতি আরা নাসরিন এবং ফাহমিদুল হক তাঁদের গ্রন্থ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প সংকটে জনসংস্কৃতিতে দেখিয়েছেন যে, ষাটের নাগরিক রোমান্স ও লোকজ কাহিনি, সত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো ও জনজীবন, আশির ফ্যান্টাসি ও অ্যাকশন, নববইয়ের টিনএজ প্রেম ও দাঙ্গা, পরে ভায়োলেন্স, পর্নো – এভাবে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশের প্রচলিত ধারার চলচ্চিত্র। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এই বিবর্তনের সঙ্গে সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিবর্তনপ্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে জড়িত।
জাতীয় চলচ্চিত্র জনসম্পৃক্ত একটি ধারণা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত হয়ে যে-জাতিরাষ্ট্রগুলোর জন্ম হয় তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে জাতীয় চলচ্চিত্র এক প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এশিয়া এবং আফ্রিকার এরকম নতুন জাতিরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র নির্মাতারা অনেক ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় (যেমন ভারতে এনএফডিসির প্রযোজনায়) এসব ছবি নির্মাণ করেছেন। যেন জাতি গঠনের একটি অংশ হিসেবেই এসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ভারতে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, আদুর গোপাল কৃষ্ণন, গিরীশ কাসারাভাল্লি এবং ভারতীয় নবতরঙ্গের আরো কজন নির্মাতা মিলে যে জাতীয় চলচ্চিত্রের ভারতীয় অধ্যায়টি রচনা করেছেন। মনে রাখা ভালো, জাতীয় চলচ্চিত্র কোনো সংগঠিত, পরিকল্পিত আন্দোলন নয়; কিন্তু একটি জাতির যৌথ চেতনা, বিশ্বাস, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকে ধারণ করে নির্মিত চলচ্চিত্রের ভান্ডার। বাংলাদেশে জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া জাতীয় চলচ্চিত্রের সম্ভাবনার সূচনা করেছিল। স্বাধীনতার পরে আলমগীর কবীরের ছবিগুলি এই ধারাকে চলমান রেখেছিল। পরে মসিহউদ্দীন শাকের, শেখ নেয়ামত আলী, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মানজারেহাসীন মুরাদ প্রমুখ নির্মাতার কাজ জাতীয় চলচ্চিত্রের ধারণাকে বহন করে ঠিকই; কিন্তু মূলধারার প্রদর্শনব্যবস্থার অসম্ভব রকম ফিলিস্টাইন চরিত্রের কারণে তাঁদের ছবিগুলি দর্শকের কাছে পৌঁছে না বললেই চলে। এভাবে যে প্রান্তিকতার সমস্যায় তাঁরা জর্জরিত হয় তা আমাদের দেশে জাতীয় চলচ্চিত্রের মূল চেতনাটিকেই সংকটাপন্ন করে তোলে। কেননা জাতির আইকনিক ইমেজ নির্মাণ করে যেসব চলচ্চিত্র তা আন্তর্জাতিক ফেস্টিভাল সার্কিটে নয়, নিজ দেশে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হবে – সেটাই কাম্য। এখানে লিখে রাখা ভালো যে, অনেক চলচ্চিত্র-লেখক এশিয়া, আফ্রিকার বাইরে পশ্চিমের বিভিন্ন দেশ যেমন, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড, রাশিয়া বা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের জাতীয় চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। হলিউডের চলচ্চিত্রের বিশ্বায়িত বাজারে স্থানীয় চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাকে যাঁরাই পরখ করে দেখতে চেয়েছেন – জাতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচেষ্টার মর্যাদাটি এভাবে তাঁদের অনেকেরই প্রাপ্য হয়েছে। আর স্থানীয় চলচ্চিত্র কোনো না কোনোভাবে স্থানীয় জনচেতনা এবং জনজীবনের প্রতিফলন ঘটিয়েছে; তার ইমেজ নির্মাণে, সংগীতের ব্যবহারে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র-ভাষার ইঙ্গিত বহন করেছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র তার এজেন্ডার কারণেই জীবনঘনিষ্ঠ। রাজনৈতিক চলচ্চিত্র কোনো সমসাময়িক বা ঐতিহাসিক ঘটনাকে একটি পক্ষপাতমূলক অবস্থান থেকে উপস্থাপন করে। রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য তার পক্ষপাতকে প্রচার করে দর্শককে বিক্ষুব্ধ, প্ররোচিত ও সম্পৃক্ত করা। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর লেনিন ঘোষণা করেছিলেন, ‘You must remember that, of all the Arts for us the cinema is the most important.’। নাৎসি জার্মানিতে জনমত গঠনে চলচ্চিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ছয় ও সাতের দশকে লাতিন আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে চলচ্চিত্র ছিল সামনের সারিতে। এসবের বাইরে বুনুয়েল, গদার, কস্টা গাভরাস, লিন্ডসে অ্যান্ডারসন, স্পাইক লি, বারবারা কপল, শাতাল আকারমান এবং আরো অনেক শক্তিমান চলচ্চিত্র-নির্মাতা কাহিনিচিত্রেই সরাসরি রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক কাজ করেছেন। অন্যদিকে প্রামাণ্যচিত্র রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বনের ছবি হোক বা না হোক প্রায় অবধারিতভাবেই জীবনঘনিষ্ঠ। প্রামাণ্যচিত্র সাধারণভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে, ‘creative treatment of reality’ হিসেবে। বায়োগ্রাফি ফিল্ম, সোশাল ডকুমেন্টারি, এথনোগ্রাফিক ডকুমেন্টারি, পলিটিক্যাল ডকুমেন্টারি যেভাবেই ভাবি না কেন – প্রামাণ্যচিত্রের বিষয়ের এবং ভৌত অস্তিত্বের বীজায়ন ঘটে বাস্তব জীবনের উপাদান নিয়ে। এভাবে প্রামাণ্যচিত্রের হাত ধরে চলচ্চিত্রের একটা বড় রকমের জনসম্পৃক্তি ঘটে।
জনপ্রিয় চলচ্চিত্র জনজীবনকে প্রভাবিত করে। তবে এটা কতটা প্রত্যক্ষভাবে ঘটে সেটা লেখা মুশকিল। মানুষ সম্ভবত চলচ্চিত্রকে বিশ্বাস করে না; গল্প-পৃথিবীর উপলব্ধি বোধগম্যতার জন্যে সত্য-পৃথিবীর যুক্তি ও শ্রেয়োবোধ ব্যবহার করলেও শেষ বিবেচনায় তাকে বাস্তবের মর্যাদা দেয় না। কেবলমাত্র চলচ্চিত্র দেখে উত্তেজিত হয়ে কোনো আদর্শ, মত বা বিশ্বাসের পক্ষে বা বিপক্ষে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় না মানুষ। অন্তত আজকের দিনের পরিপক্ব চলচ্চিত্র-দর্শকের ক্ষেত্রে এ-কথা সত্য। কিন্তু চলচ্চিত্র দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করা কাজটি ঠিকই করে। এখানে চলচ্চিত্রের সাধারণ ভাষা, যে ভাষায় নির্মিত হয় বেশিরভাগ জনপ্রিয় সিনেমা, দারুণভাবে কার্যকর হয়। জীবন ও সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনে চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতা সমাজের যৌথ চেতনে কাজ করে। আন্তঃমানবিক সম্পর্ক, সুপ্ত কামনা ও বিশ্বাস, অভিব্যক্তি, প্রতিক্রিয়া – এসব ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র প্রভাব বিস্তার করে। এভাবেই কাজ করে চলচ্চিত্র প্রভাবিত ফ্যাশন, বাচনভঙ্গি, সামাজিক সম্পর্কের সংজ্ঞা ইত্যাদি। সাতের দশকের গোড়ায় ঢাকায় রংবাজ নামে একটি ছবি নির্মিত হয়েছিল। এই ছবি দেখার আগে থেকেই রংবাজ এবং রংবাজি শব্দগুলোর সঙ্গে তখনকার তরুণ সমাজের পরিচয় ছিল। কোনোভাবে কলকাতায় প্রচলিত রকবাজ ও রকবাজি (কলকাতার বেকার তরুণদের মধ্যে ছয়ের দশকে বাড়ির রোয়াকে বসে আড্ডা দেওয়ার প্রচলন ছিল) শব্দ দুটি থেকে এ ধরনের শব্দের উৎপত্তি হয়েছিল। কিন্তু এই ছবিতে নায়ক রাজ্জাকের পোশাক, চুলের ছাঁট, বাচনভঙ্গি, সামাজিক আচরণ এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল শহুরে তরুণদের যে, সেটা একটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরই সূচনা করেছিল বলা যায়। বেলবটম প্যান্ট, চওড়া কলারওয়ালা টাইট হাওয়াই শার্ট, ভারী চপ্পল অথবা হাইহিল জুতা, অকারণ ঔদ্ধত্য, দলবেঁধে হাঙ্গামা – এসব তারুণ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এবং এই পুরো ব্যাপারটিকে সবাই রংবাজি হিসেবে চিনতে পারতেন। অর্থাৎ রংবাজ চলচ্চিত্র রংবাজির একটি সামাজিক আইকন তৈরি করতে পেরেছিল। আবার এভাবেও ভাবতে পারি যে, রংবাজি সমাজের চাহিদার মধ্যেই ছিল; যুদ্ধোত্তর সমাজের নানা হতাশার এবং শূন্যতার মধ্যে প্রতিষ্ঠানে অনাস্থার যে-ব্যাপারটি ছিল রংবাজ তাকে কাজে লাগিয়েছিল মাত্র। এভাবে দেখলে লেখা যায়, যে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র সমাজের ডমিনেন্ট সংস্কৃতিকে আরো শক্তিমান করে তোলে; বিশেষ করে পুরুষ প্রধান দৃষ্টি, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার, শ্রেণি-বিদ্বেষ এসব বিষয়কে উস্কে তোলে। আবার কখনো সমাজে বিরাজমান নানা অভাববোধ এবং অসাম্যকে নাটকীয় মাত্রায় উপস্থাপন করে এবং অলীক সমাধান দেয়। মানুষ এসব সমাধান বিশ^াস করে না, কিন্তু এক ধরনের দায় মোচনের অনুভব ঘটে তার মধ্যে; সে স্বস্তি অনুভব করে এবং এই আত্মপ্রতারণার সঙ্গে এক বিচিত্র সমঝোতার মধ্যে প্রবেশ করে। যদিও পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক নয়, তবু লেখার লোভ সামলানো কঠিন যে, সাম্প্রতিক মেগা-সিরিয়ালগুলো সম্ভবত এভাবেই ধরে রাখে দর্শক; বছরের পর বছর।
চলচ্চিত্র ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পকে। মুম্বাই চলচ্চিত্রের সংগীত আর জনপ্রিয় হিন্দি সংগীত সমার্থক ধারণা। বাংলাসহ ভারতের অন্যান্য ভাষাতেও চলচ্চিত্রের সংগীতই নির্ধারণ করে জনপ্রিয় সংগীতের গতি-প্রকৃতি। বলা হয়ে থাকে, এটা তর্কাতীত অবশ্যই নয় যে, রবীন্দ্রসংগীত পাঁচ এবং ছয়ের দশকে যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে তার মূলে ছিল কিছু প্রতিভাবান সংগীত পরিচালকের চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহার। নয়ের দশকের হলিউডের জনপ্রিয় ছবি টাইটানিকের গান ‘My heart will go on’ সম্ভবত গত দুই দশকের মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত ও গীত গান।
পুঁজিবাদী সমাজের বিপণন শিল্পের এক প্রধান ধারণা মার্চেন্ডাইজিং। হলিউড বা মুম্বাই চলচ্চিত্রশিল্পের ব্র্যান্ড নিয়ে যে মার্চেন্ডাইজিং চলে তা হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়কে ছাড়িয়ে যায় কখনো। স্টার ওয়ারস ছবি নির্মাণের তিরিশ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো এই ছবির ব্র্যান্ড-নামে হাজারো রকম পণ্য বাজারে ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে টি-শার্ট, চুইংগাম, খেলনা, প্রসাধনসামগ্রী, গেরস্তালি কাজের জিনিস থেকে কম্পিউটার গেমস পর্যন্ত সবই আছে। এই বিপণন পণ্যের অভাববোধ সৃষ্টির মাধ্যমে জনজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। পণ্য বিপণনের কথা উঠলে বিজ্ঞাপনচিত্রের কথা অবধারিতভাবেই মনে পড়বে। বিজ্ঞাপনচিত্র জনসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য, অনিরামেয় অঙ্গ।
সাধারণভাবে একথা লেখা যায় যে, উচ্চ ভোগের এই সময়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রশিল্প একটি বৃহত্তর সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। চলচ্চিত্রকে নিয়ে এই বৃহত্তর ব্যবস্থার এজেন্ডাগুলো হচ্ছে বাজার সম্প্রসারণ, মনোজগতের দখল নেওয়া এবং সমাজের ক্ষমতাধর অংশের চিন্তা, বিশ্বাস ও রুচির প্রচার এবং প্রসার। সুতরাং জনপ্রিয় চলচ্চিত্র জনজীবনে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত – এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এই জনসম্পৃক্তিতে তার ভাষা আরো কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে একজোট হয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিশেষ ভাষার অধিকারী যে চলচ্চিত্র, আমরা যাকে শনাক্ত করেছি ‘অন্য চলচ্চিত্র’ নামে, সে চলচ্চিত্র জনজীবন থেকে অনুপ্রাণিত হলেও জনজীবনকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে সে প্রান্তিকই। প্রথমত, যে বিশেষ চলচ্চিত্র-ভাষার কথা লেখা হচ্ছে, তা প্রায় প্রত্যেক চলচ্চিত্র-নির্মাতার জন্যে আলাদা, কখনো একটি বিশেষ চলচ্চিত্রের জন্যেও আলাদা। এই বিষয়টি নতুন চলচ্চিত্র-ভাষার সঙ্গে পরিচিতির একটা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে – যেটা দর্শক সহজে গ্রহণ করে না। বিশেষত, বর্তমান সময়ে এই অনীহা আরো প্রবল হয়ে উঠেছে, কারণ দৃশ্যবিনোদনের বিকল্প নানা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, দৃশ্যসংস্কৃতি অনেক নতুন অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নতুন প্রযুক্তিপরায়ণ প্রজন্ম চলচ্চিত্র-ভাষার চ্যালেঞ্জ নেওয়ার চেয়ে প্রযুক্তির অ্যাডভেঞ্চারেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমরা লিখেছি আগেই যে, এই নতুন দেখার সংস্কৃতি সমগ্র চলচ্চিত্রশিল্পকেই এক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের যে সর্বব্যাপী দখলদার চরিত্র আছে, যেটা পুঁজিবাদী বিপণনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা এরকম বিশেষ ভাষার চলচ্চিত্রের জন্যে খুব একটা স্পেস রাখে না। সেটা প্রদর্শন, বিপণন, মিডিয়া-ডিসকোর্স সকল ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। তবে বিশেষ ভাষার চলচ্চিত্র যদি চরিত্রে রাজনৈতিক বা প্রচারধর্মী হয় এবং কোনো বিশেষ গোষ্ঠী সেই চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তাদের নিজস্ব কার্যসাধন পদ্ধতিতে সে-চলচ্চিত্র উদ্দিষ্ট দর্শকের কাছে পৌঁছুতে পারে। দর্শককে সে প্রভাবিত করবে কি না, সেটা নির্ভর করবে ব্যবহৃত কার্যসাধন পদ্ধতির আরো নানা বৈশিষ্ট্যের ওপর।
যদিও এ বিভাজনে বিস্তর আপত্তি উঠবে তবু একথা লেখার বিকল্প নেই যে, চলচ্চিত্র অন্তত ভাষার দিকে থেকে সাধারণ ও বিশেষ; অন্য কথায় জনপ্রিয় এবং অন্য – এই দুই ধারায় বিভক্ত। এই দুই ধারা
সমান্তরাল নয়; অন্য চলচ্চিত্র তার বিশেষ ভাষায় পৌঁছনোর আগে অবধারিতভাবেই সাধারণ ভাষাকে আত্মস্থ করে। কিন্তু অন্য চলচ্চিত্র দর্শকপ্রিয়তার দিক থেকে প্রান্তিক এবং ভাষার আলোচনাতেও প্রান্তিক। তবে জনজীবনকে ‘প্রভাবিত’ করার প্রসঙ্গটিকে সবচেয়ে প্রধান না করে তুলে চলচ্চিত্রকে সামাজিক ডিসকোর্সের একটি ফাংশনাল উপাদান হিসেবে চিন্তা করলে ভিন্ন কোনো দৃষ্টিকোণ পাওয়া যেতে পারে। চলচ্চিত্রের ভাষা এবং জনজীবনবিষয়ক এই ভাবনা আরো মূর্ত এবং বস্ত্তনিষ্ঠ হতে পারে যদি সেসব চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করা যায়, যারা কোনো সামাজিক ডিসকোর্সের জন্ম দিতে পেরেছে অথবা কীভাবে কোনো সামাজিক ডিসকোর্স একটি চলচ্চিত্রের জন্ম দিতে পারে এরকম আলোচনায় রত হওয়া যায়। এরকম একটি প্রচেষ্টা পরবর্তী কোনো লেখার জন্যে তোলা থাকতে পারে। 

টীকা
১. Alec McKay, A Case for the Existence of Film Language, Source : Internet
২. ওই
৩. Bruce Isaacs, Film Cool : Towards a New Film Aesthetic, pg 11-12

সহায়ক সূত্রপঞ্জি
১. গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প : সংকটে জনসংস্কৃতি, শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০৮।
২. Bruce Isaacs, Film Cool : Towards a New Film Aesthetics, Internet, 2008.
৩. Todd Oakley, Toward a General Theory of Film Spectatorship, Internet.
৪. Donato Totaro, Andre Bazin, Part 1, Film Style Theory in its Historical Context, Internet, 2003.
৫. Alec McKay, A Case for the Existance of Film Language, Internet.
৬. www.wikipedia.com

 

Leave a Reply

*