logo

চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা – শ্রুত ভাষা

হা স না ত আ ব দু ল হা ই
প্রথম দিকে সিনেমা ছিল নির্বাক। নির্বাক যুগের পরের দিকে সিনেমা হলে মঞ্চের সামনে কিংবা পাশে পিয়ানো, অর্গান বা কখনো কখনো অর্কেস্ট্রার সংগীত বাজানো হতো। বৈচিত্র্য ছাড়াও প্রজেক্টর যন্ত্রের ঘড়ঘড় শব্দ আড়াল করা অথবা বিশেষ দৃশ্যের সম্পূরক হিসেবেও সংগীত বাজানোর রেওয়াজ ছিল। ঘোড়ার খুরের শব্দ, ঝড়ের তর্জন-গর্জন, সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস – এইসব সাউন্ড ইফেক্ট সৃষ্টির জন্য প্রদর্শনের সময়ে বাদকরা প্রয়োজনমতো শব্দ তৈরি করতো। সিনেমা-নির্মাতার এর জন্য কোনো দায়িত্ব বা ভূমিকা ছিল না। অবশ্য কোনো কোনো পরিচালক এই ক্ষেত্রে নির্দেশনা বা ইঙ্গিত দিয়ে রাখতেন। যেমন, ব্যাটলশিপ পটেমকিনে আবহসংগীত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এর ব্যবহার সিনেমাভক্তদের কাছে সুবিদিত।
নির্বাক ছবিতে সংগীত কিছুটা থাকলেও সংলাপ একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। ১৯২৭ সালে দা জাজ সিঙ্গার সিনেমায় প্রথম অভিনেতা-অভিনেত্রীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। নায়ক-গায়ক আল জনসন এই ছবিতে কণ্ঠ দেন। এরপর থেকেই সবাক চিত্র নির্মিত হতে থাকে। সংলাপের মাধ্যমে শব্দের এই সংযোজন সিনেমাকে বাস্তব করে তোলে এবং এর আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু নতুন উদ্ভাবনের ফলে উৎসাহের প্রাবল্যে বাড়াবাড়িও হতে থাকে। ছবিতে দৃশ্য যা দেখাচ্ছে, শব্দ ধ্বনিগতভাবে যদি তার প্রকাশকে আরো স্পষ্ট না করে তাহলে কেবল শব্দ থাকার জন্য দর্শকের উপলব্ধিতে নতুন কোনো মাত্রা যুক্ত হয় না। ইমেজকে আরো অর্থময় ও গভীরতর করার কারণেই শব্দ বা ধ্বনি প্রয়োগ সার্থক হতে পারে। সংলাপের অবশ্যই একটি ফাংশনাল ভূমিকা আছে, যার জন্য এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু সংলাপে কেবল আক্ষরিক অর্থই যদি প্রকাশিত হয় তাহলে সচল দৃশ্যকল্পের সাহায্যে ইমেজের প্রকাশক্ষমতার ব্যাপ্তি ও গভীরতা অব্যবহৃত ও অনাদৃতই থেকে যায়। অপরদিকে সবাক যুগের সূচনার পর দেখা গেল বেশ কিছু চলচ্চিত্র-নির্মাতা সংলাপের বাইরে শব্দ ও ধ্বনির অন্য সম্ভাবনা অর্থাৎ ব্যঞ্জনা সম্পর্কে তেমন সচেতন থাকলেন না। শিল্পসমৃদ্ধ ছবিতে শব্দের এমন সূক্ষ্ম ও জটিল ব্যবহার সম্ভব, যা বিদগ্ধ দর্শক ও সমালোচকের জন্য আনন্দ-উপভোগের কারণ হতে পারে।
সিনেমায় বেশ কয়েক রকমের শব্দের ব্যবহার হতে পারে। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের মুখের সংলাপ এবং ধারা বিবরণকারীদের ধারাবর্ণনা। সাধারণত চিত্রনাট্যে এসব অন্তর্ভুক্ত থাকে। সংলাপ বেশি হলে সিনেমার প্রধান যে ভাষা ‘ইমেজ’, তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। কোনো কোনো পরিচালক এই জন্য তাঁদের সিনেমায় সংলাপ প্রায় রাখেনই না। যেমন নিউ ওয়েভ পরিচালক এলে রেনেঁ তাঁর লাস্ট ইয়ার ইন ম্যারিয়েনবাদ সিনেমায় অভিনেতা-অভিনেত্রীর মুখের সংলাপ ন্যূনতম পর্যায়ে রেখেছেন। অনেক দৃশ্যে তারা কোনো কথাই বলে না। এটি অবশ্য চরম ধরনের দৃষ্টান্ত। রবার্ট ব্রেসোঁও সংলাপ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার পক্ষপাতী। শব্দের ব্যবহার সম্বন্ধে তাঁর চিন্তা ও বক্তব্য শুধু রক্ষণশীল নয়, বেশ চরম। যেমন, তিনি নিজের ব্যবহারের জন্য নোটের আকারে যেসব কথা লিখেছেন তার মধ্যে রয়েছে : (ক) যা চোখে দেখার, তা শোনার জন্য পরিবেশ করা ঠিক না; (খ) যদি চোখের সামনেই সব উপস্থিত করা যায় তাহলে কানের জন্য কিছুই দেওয়া ঠিক হবে না; (গ) ইমেজের সাহায্যে সাউন্ড ব্যবহার করা উচিত নয়, আবার সাউন্ডের স্বার্থেও ইমেজকে আনা সমীচীন নয়; (ঘ) ইমেজ এবং সাউন্ডের একে অন্যকে সাহায্য করা উচিত নয়, বরং এদেরকে একের পর এক ‘রিলে’র মতো কাজ করতে হবে; (ঙ) শুধু যদি চোখে আকর্ষণ করা হয় তাহলে কান অধৈর্য হয়ে যায়। যদি কান আকর্ষণ করা হয় তাহলে চোখ অধৈর্য হয়। এই অধৈর্যকে ব্যবহার করতে হবে। এই দুটি বোধশক্তির প্রতি যে চিত্রনির্মাতা শান্তিপূর্ণভাবে আবেদন রাখতে পারেন তার ক্ষমতা আছে।
ব্রেসোঁর নোট বেশ ধাঁধার মতো শোনায় এবং একে কোনো তাত্ত্বিক কাঠামোতে ফেলা যায় না। তিনি দুটোরই গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ও প্রয়োজনের স্বার্থে তাদেরকে কমবেশি প্রাধান্য দিতে চান। সাউন্ড ট্র্যাকের আধুনিক তত্ত্বে তার এইসব বিক্ষিপ্ত চিন্তা-ভাবনা বেশ প্রভাব ফেলেছে। প্রথম দিকের চিত্রনির্মাতা-তাত্ত্বিকরা (যেমন, ক্লেয়ার) অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাউন্ডকে ইমেজের অধীনস্থ এবং তার উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন। নির্বাক এবং সবাক সিনেমার তুলনা করতে গিয়ে অ্যান ডোয়ান বলেছেন, নির্বাক সিনেমায় এক ধরনের সংহতি প্রকাশ পেয়েছে। যদিও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কথা বলতে পারতো না, অঙ্গভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তি ব্যবহার করে তাদের শরীর সংলাপের আভাস দিতে পারতো। তিনি মনে করেন, সবাক চলচ্চিত্র এই সংহতিকে বিপন্ন করেছে। সিনেমা এখন বস্ত্তগত বৈচিত্র্যের বিভিন্নতার (অর্থাৎ সাউন্ড এবং ইমেজ) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই বিভিন্নতা (হেটেরোজেনেটি) যে সংহতির বিপরীত, তা প্রকাশ করে দেয়, যদি না সাউন্ড এবং ইমেজের দ্বৈত সত্তা সতর্কভাবে প্রচ্ছন্ন রাখা যায়। ডোয়ানের মতো ক্লাসিকাল তাত্ত্বিকরা মনে করেছেন যে, সিনেমার ভাষা তৈরি হয়ে গিয়েছে এবং দর্শকদের কাছেই তা বোধগম্য। সাউন্ডের আবির্ভাবে তা পরিত্যাজ্য নয়। এইসব তাত্ত্বিকের বিপরীতে দেখা যায় সংলাপবহুল সিনেমা, যার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হু ইজ অ্যাফ্রেড অফ ভার্জিনিয়া উলফ অথবা ফাসবাইন্ডারের বিটার টিয়ার্স অফ পেট্রা। দুটি সিনেমায় সংলাপই প্রধান বলা যায়, যার জন্য এগুলি নাটকধর্মী। ক্লাসিকাল এবং আধুনিক তাত্ত্বিকদের বিতর্কে জড়িত না হয়ে যা স্মর্তব্য তা হলো সংলাপে মিতব্যয়ী হওয়া এবং মনে রাখা যে, সিনেমা নাটক নয়। ভিস্যুয়াল ইমেজকে সংলাপ দিয়ে বাধাগ্রস্ত করা হলে সিনেমার নান্দনিক গুণ হ্রাস পায়।
সংলাপ কোন ধরনের হবে তা নিয়ে বিতর্ক আছে। সত্যজিৎ রায়ের মতে মুখের ভাষাই সংলাপে থাকা উচিত, পোশাকি বা অ্যাকাডেমিক ভাষা নয়। তিনি এই প্রসঙ্গে উদয়ের পথে সিনেমায় নায়কের এফোরিজম সূচক সংলাপ উল্লেখের পর তার বেশ সমালোচনা করেছেন। বাস্তবধর্মী সিনেমায় মুখের ভাষাই এবং আঞ্চলিক হলেও তাই-ই ব্যবহার করা সমীচীন। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমও থাকতে পারে। যেমন, ইনটেলেকচুয়াল বা দার্শনিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে যে-সিনেমা সেখানে অ্যাকাডেমিক ভাষা অপ্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে। ক্লাসিকধর্মী কাহিনির চিত্রায়ণে এমন প্রয়োজন হতে পারে। যেমন, শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট অথবা শার্লোট ব্রন্টির জেন আয়ার। যদি ক্লাসিক কাহিনিকে সমকালীন করা হয় তাহলে অবশ্য মুখের ভাষা (স্ট্রিট ল্যাঙ্গুয়েজ) মানানসই হবে। যেমন, এমটিভির প্রযোজনায় উইদারিং হাইটস।
শব্দের দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত সংগীত। এখানে সংগীতের দুই প্রকার ভূমিকা থাকতে পারে। সিনেমায় কেউ যখন গান গায় তাকে বলা যেতে পারে বাস্তববাদী, যদিও অনেক হিন্দি এবং বাংলা সিনেমায় গানকে বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তিতে বাস্তববাদী বলা যায় না। সংগীতের দ্বিতীয় যে ভূমিকা তা হলো ইমেজে অতিরিক্ত কিছু আরোপ করা। অর্থাৎ সংগীতের এই যোগে অর্থের প্রসার ঘটে এবং কাহিনিতে তাৎপর্য বা ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়। সংগীতের এই ভূমিকাকে অনেকে এক্সপ্রেশনিস্ট এবং ইমপ্রেশনিস্ট, এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন। ইমপ্রেশনিস্ট ব্যবহারের প্রেক্ষিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আর এক্সপ্রেশনিস্টের প্রেক্ষিত ভাবগ্রাহ্যতা। শব্দের তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে ফলাফল সৃষ্টিকারী শব্দ বা ‘সাউন্ড-ইফেক্ট‘। যেমন, ধাবমান ঘোড়ার খুরের শব্দ দিয়ে দৃশ্যের ভেতর ঘোড়ার ছুটে যাওয়া বোঝানো। এখানে পরিবেশ ও পটভূমিতে যেসব স্বাভাবিক শব্দ থাকে, সেসব শব্দকে ইচ্ছাকৃতভাবে দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যময় করে ব্যবহার করা হয়। ফ্রেমের বাইরে থেকে আসা শব্দ অথবা ফ্রেমে প্রদর্শিত হচ্ছে না, এমন কোনো কিছুর শব্দের সূত্র দৃশ্যান্তরে যেতে সাহায্য করে। শব্দের চতুর্থ পরিচিতি শব্দহীনতা। এখানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একটি গানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে : ‘এমন কিছু শব্দ দিতে পারো যাতে কোনো শব্দ নেই’। নিস্তব্ধতার ব্যঞ্জনা কাহিনির বর্ণনায় স্থান বিশেষে অসাধারণ হতে পারে। সত্যজিতের পথের পাঁচালীতে ‘মিষ্টিওয়ালা সিকোয়েন্সে’ দুর্গা মাথা নেড়ে অসম্মতি জানায়। তার এই স্তব্ধতা মুখে ‘না’ বলার চেয়েও বাঙ্ময়।
যা চোখে দেখা যায়, শব্দে তার পুনরাবৃত্তি ঘটলে রসের ব্যাঘাত ঘটে। তথ্যচিত্রে প্রায়ই এমন হয়। সেখানে দর্শকরা পর্দায় যা দেখে তা বিস্তারিতভাবে বলে দেওয়া হলে সেক্ষেত্রে যা শোনা হয়, তার চেয়ে বেশি কিছু দেখা হয় না। এর ফলে শব্দ ইমেজকে ভালো করে দেখতে সাহায্য করে না। তবে এমন যদি হয় যে, শব্দ দ্বারা ছবিতে পরিবেশিত তথ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও সেখানে বাড়তি কিছু সৃষ্টি হয় তাহলে তার যৌক্তিকতা থাকে। আইভান দি টেরিবল ছবিতে আইজেনস্টাইন আইভানের মামি ইউফ্রোসাইনি এবং সাদা পোশাক পরিহিত বিশপ পাইমানের চরিত্র রূপায়ণের জন্য চিত্রনাট্য এমনভাবে ঠিক করেছিলেন যে, ইউফ্রোসাইনি বিশপ পাইমানের কুটিল চরিত্র বোঝাবার জন্য তার দিকে ভীত বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু ছবি তৈরির সময় তিনি ইউফ্রোসাইনিকে দিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলালেন, ‘বাইরে সাদা পোশাক আর অন্তরে কালো।’ এই শব্দ (সংলাপ) দৃশ্যের অতিরিক্ত কিছু অর্থ বহন করে বলেই এর প্রয়োগ সার্থক।
গাস্তেঁ রোর্বেজ সিনেমায় শব্দ ব্যবহারের কয়েকটি উপায় সম্বন্ধে বলেছেন। এর প্রথমটি কাট ওভার সাউন্ড। এখানে দর্শক পর্দায় একটি ঘটনা দেখতে পাচ্ছে। শব্দের ভেতর সে শুনছে আরেকটা ঘটনার বিষয়। ঘটনাটি দেখতে না পেলেও কোথা থেকে শব্দটি আসছে তা সে বুঝতে পারছে। ‘কাট’ করে এই ঘটনাটিতে নিয়ে যাওয়া হয় দর্শককে। এছাড়া আর একটি উপায় হলো অফ স্ক্রিন বা পর্দার বাইরে শব্দ। রোর্বেজ উদাহরণ দিয়েছেন : পথের পাঁচালীতে দুর্গা দূর থেকেই মিষ্টিওয়ালার ঘণ্টার ধ্বনি শুনতে পায়। সিনেমার আর একটি অংশে ‘মিষ্টিওয়ালা সিকোয়েন্সে’র শেষের দিকে দর্শকরা যখন দুর্গাকে দেখছে তখন পর্দার বাইরে থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকে। দুর্গা যখন পর্দার বাঁদিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকায় তখন দর্শক বুঝতে পারে যে চরিত্র তাকে ডাকছে সে ওই দিক থেকেই আসছে। পরবর্তী শটে দেখা যায় একটি মেয়ে দুর্গার দিকে এগিয়ে আসছে।
শব্দ ব্যবহারের আর একটি উদ্দেশ্য দৃশ্যে যা ঘটতে দেখা যায় তার পুনরাবৃত্তি করা। রবার্ট ব্রেসোঁ তাঁর দা ডায়েরি অফ এ কান্ট্রি প্রিস্ট ছবিতে এমন ব্যবহার করেছেন। এখানে ছবিতে একটি চরিত্রকে দর্শক যা করতে দেখছে তার মুখ দিয়ে সেই কাজটির বর্ণনাও দিয়েছেন। কেবল বিশেষ ক্ষেত্রেই এমন পুনরাবৃত্তি কার্যকর ও উপযোগী হতে পারে। সতর্ক না হলে এমন স্বগতোক্তিমূলক সংলাপ কাহিনি বর্ণনায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
শব্দ ব্যবহারের আর একটি উপায় স্বগত ভাষণ বা মনোলোগ। মনের অন্তঃস্থিত চিন্তা-ভাবনাকে প্রকাশের জন্য এর ব্যবহার করা হয়। হ্যামলেটের স্বগত সংলাপ এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

শব্দ ও সংলাপ
শব্দ ও সংলাপের সম্পর্ক নিয়ে পৃথক প্রেক্ষিত থেকে কিছু আলোচনা করা যায়। ক্যামেরার বাইরে অদৃশ্য থেকে কোনো চরিত্রের মুখ দিয়ে বর্ণনা, যাকে ইংরেজিতে ‘ভয়েস ওভার’ বলা হয় তার ব্যবহার সিনেমায় বেশ প্রচলিত। টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে এর উপস্থিতি প্রায় সার্বক্ষণিক। সিনেমায় ‘ভয়েস ওভারে’র বেশ অপব্যবহার করা হতে পারে যেজন্য এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। একে কি নাটকে স্বগত সংলাপের মতো অথবা ব্যাখ্যামূলক পূর্বকথনের মতো প্রয়োগ করা হবে, নাকি পরিচালক অন্য কিছুর কথা ভাবতে না পেরে অগত্যা এর শরণাপন্ন হয়েছেন? এই প্রশ্ন নান্দনিকতার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ। ‘ভয়েস ওভার’ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশিকা নেই এবং সেই জন্য এক্ষেত্রে বিচক্ষণতা ও সংযম দেখানো প্রয়োজন। শিল্পবোধসম্পন্ন চলচ্চিত্র-নির্মাতারা জানেন কখন ভয়েস ওভার প্রাসঙ্গিক আর কখন লিখিত টাইটেল দিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া সমীচীন। এমনভাবে বর্ণনা প্রদানের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত দেখা যায় ম্যাককনয়ের এ টেল অফ টু সিটিজ সিনেমায় ব্যবহৃত লিখিতভাবে আর ভয়েস ওভারে ব্যাখ্যা। এই সিনেমায় প্রথমেই অক্ষরে লেখা হয়েছে উপন্যাসের শুরুতে বর্ণিত বিখ্যাত উক্তিটি : ‘ইট ওয়াজ দা বেস্ট অফ টাইমস, ইট ওয়াজ দি ওয়াস্ট অফ টাইমস।’ সিনেমার শেষে সিডনি কটনের স্বগত সংলাপ কিন্তু ভয়েস ওভারেই বলা হয়েছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্ণনাকারী কাহিনির প্রথমে, মাঝখানে অথবা শেষে প্রথম পুরুষেই তার কথার মাধ্যমে কাহিনির ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। বর্ণনাকারী প্রথম পুরুষ একজন হতে পারে অথবা একাধিক। অরসেন ওয়েলসের সিটিজেন কেইনে একাধিক প্রথম পুরুষ ভয়েস ওভার দিয়ে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। সানসেট বুলেভার্ড সিনেমায় প্রথম দৃশ্যেই উইলিয়াম হোল্ডেনকে মৃত দেখানো হয় এবং তার প্রথম পুরুষের ভয়েস ওভারে কাহিনির বর্ণনা শুরু এবং শেষ হয়। এই টেকনিক সফল হয়েছে এই জন্য যে, কাহিনির মৃত চরিত্রের ভয়েস ওভার জীবন্মৃত নায়িকা নর্মা ডেসমন্ডের যেভাবে বর্ণনা করে সেখানে বেশ আয়রনি আছে।
অনেক ছবিতে ঈশ্বরের কণ্ঠস্বরের মতোও ভয়েস ওভার ব্যবহৃত হয়। সেমি-ডকুমেন্টারি বা বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি কাহিনিচিত্রে অদৃশ্য চরিত্রের ভয়েস ওভারে পূর্বকথন বর্ণিত হয়, যার দ্বারা দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, কাহিনিটি সাম্প্রতিক এক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যেহেতু কণ্ঠস্বরটি কোনো চরিত্রের নয় (যেমন হয় প্রথম পুরুষে বর্ণনার ক্ষেত্রে) সেই জন্য এই অদৃশ্য চরিত্রের কণ্ঠস্বর ইচ্ছামতো ঘটনার আগে, মাঝখানে এবং পরে শোনা যেতে পারে যেখানে তার মাধ্যমে সমালোচনা, মন্তব্য করা, প্রশ্ন রাখা এবং উপসংহার টানতে দেখা যায়। সেমি-ডকুমেন্টারি ধরনের ফিল্মে এই ভয়েস ওভারকে বলা হয়েছে ‘ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর’। এই শ্রেণির সিনেমায় ‘ভয়েস অফ গড’ চরিত্রের ভয়েস ওভার ব্যবহারের সুবিধা হলো এই যে, এর মাধ্যমে নৈর্ব্যক্তিকতার আবহ সৃষ্টি করা যায়। দ্বিতীয়ত, চরিত্রের অন্তর্গত হয়ে তাদের মনোভাব এবং আবেগ-অনুভূতি প্রকাশে তা সাহায্য করে। স্ট্যানলি কুব্রিক তাঁর ব্যারি লিনডেন সিনেমায় নৈর্ব্যক্তিক ভয়েস ওভার ব্যবহার করেছিলেন, যদিও এটি সেমি-ডকুমেন্টারি ছিল না। তবে ভয়েস ওভার সিনেমায় ভবিষ্যতে কী ঘটবে সে-সম্বন্ধে দর্শকদের অবহিত করে এবং কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কী ঘটবে সে সম্বন্ধেও নাটকীয়তা ছাড়াই তথ্য প্রদান করে।
সিনেমায় চরিত্রের মানসিক জগতের প্রতিফলন অথবা সে যা ভাবছে তার প্রকাশে নির্বস্ত্তক কণ্ঠস্বরও (সাবজেকটিভ ভয়েস) ব্যবহার করা হয়। গ্রেট এক্সপেকটেশন সিনেমায় পিপস্ চরিত্রটি তাদের গ্রামের কামার জো গার্গেরি কীভাবে তাকে অভ্যর্থনা জানাবে, এ সম্বন্ধে তার চিন্তাকে সাবজেকটিভ ভয়েসে প্রকাশ করেছে। হিচককের সাইকো সিনেমায় ফিনিক্স থেকে চলে যাবার সময় ম্যারিয়ন ক্রেন তার মালিক কি বলবে, সেই চিন্তা মনে মনে করলেও নৈর্ব্যক্তিকভাবে তা প্রকাশ করা হয়েছে। নৈর্ব্যক্তিক (সাবজেকটিভ ভয়েস) কণ্ঠস্বরের শিল্পিত ব্যবহার বিশেষ করে দেখা যায় যেসব সিনেমায় চেতনা প্রবাহের ব্যবহার রয়েছে সেখানে। জাগ্রত মানসে চিন্তার নিরবচ্ছিন্ন ধারা, স্বপ্ন এবং স্মৃতির সংশ্লিষ্ট ধারাই চেতনা প্রবাহের বিষয় আর এই সবই দেখা যায় এলেঁ রেনেঁর হিরোশিমা মঁ আমু চলচ্চিত্রে। এই সিনেমায় নায়ক-নায়িকার যে-কণ্ঠস্বর শোনা যায় প্রকৃতপক্ষে তা তাদের সংলাপ নয়, চরিত্র দুটি মনে মনে যা ভাবছে, তাদের স্মৃতিচারণের বর্ণনা। এই স্মৃতিচারণায় ভাষার শব্দ এবং সচল দৃশ্য উভয়ই মিশে আছে। ছবিতে জাপানি স্থপতি-নায়ক যখন বলে, ‘তুমি হিরোশিমার কিছুই জানো না’, তখন ফরাসি অভিনেত্রী-নায়িকার সচেতন চিন্তাধারায় জেগে ওঠে মিউজিয়ম ও নিউজ রিল ফুটেজে দেখা হিরোশিমার আণবিক বোমা বর্ষণের দৃশ্যাবলি। মেয়েটি যখন বলে, ‘তুমি কে?’ তখন হিরোশিমার রাস্তা দেখা যায়। বোঝানো হয়। নায়কই হিরোশিমা, যে-নামের সঙ্গে নায়িকা সবসময় তাকে ভবিষ্যতে স্মরণ করবে। বিষয়টি এই সংক্ষিপ্ত সংলাপ আর দৃশ্যের দ্রুত মিশ্রণে স্পষ্ট হয়।
সিনেমায় কোনো কণ্ঠস্বর বা সংলাপ বারবার ব্যবহৃত হতে পারে। এটি প্রায় ক্লিশে হয়ে গিয়েছে। কিন্তু উপযুক্ত মুহূর্তে এবং যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহৃত হলে এর মূল্য অনস্বীকার্য। যেমন গন উইদ দা উইন্ড সিনেমার শেষে স্কারলেট তার বাবা জমির মূল্য সম্বন্ধে যা বলেছিলেন সেই কথা স্মরণ করে। এখানে সেই কণ্ঠস্বর শোনাই যথেষ্ট। মার্ডার ইন দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে শুধু কণ্ঠস্বর নয়, যাত্রীদের প্রতিক্রিয়ার দৃশ্য বারবার দেখানো হয়। ক্রাইম থ্রিলারে এটা বেশ মানানসই।
চলচ্চিত্রে সংগীতের ব্যবহার নির্বাক যুগেও ছিল, যদিও সিনেমার পর্দার বাইরে। সবাক চলচ্চিত্রের সূচনা হবার পর যন্ত্রসংগীত এবং কণ্ঠস্বরের সংগীত চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। আবহ সৃষ্টি বা প্রতিনিধিত্বের জন্য আবহসংগীত (প্রায় ক্ষেত্রেই যান্ত্রিক) এবং পরিবেশ ও মনের আবেগ প্রকাশে কণ্ঠস্বরে গান প্রচলিত হয় সবাক যুগের শুরুতেই। প্রথম দিকে অবশ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিজেদেরই গান গাইতে হতো। পরে প্লেব্যাক গানের টেকনিক ব্যবহৃত হওয়ার পর তাঁরা কেবল ঠোঁট মেলাতেন।
কোনো কোনো চলচ্চিত্র-নির্মাতার কাছে চলচ্চিত্রে সংগীতের ব্যবহারিক প্রয়োগ অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয়। তাঁরা মনে করেন, চলচ্চিত্র একটি বাস্তব মাধ্যম। এই বাস্তব মাধ্যমে যে-ইমেজ বা প্রতিরূপ থাকে, তার সঙ্গে সংগীত অবাস্তব উপাদান হিসেবে উপস্থিত হয়। কেবল বাস্তব সংগীত বা বাস্তব শব্দই, যা দৃশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বা তা থেকে উত্থিত, এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ও ব্যবহার্য হতে পারে। একথা স্বীকার করা যায় যে, বাছবিচার না করে প্রয়োগ করা হলে একটি সিনেমায় সামগ্রিক আবেদনের ক্ষেত্রে এই ধরনের সংগীতের ব্যবহার ক্ষতিকারক হতে পারে। কিন্তু হিসেব ও বিবেচনা করে সংগীতের ব্যবহার করা হলে চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সংগীত কাহিনি বর্ণনার প্রকাশ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। চলচ্চিত্র বাস্তবানুগ শিল্প হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবতা সম্বন্ধে দর্শকের ধারণা ও উপলব্ধিকে চলচ্চিত্র বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করে এবং চিত্রনির্মাতা কি বোঝাতে চান তা প্রকাশ করার ভূমিকা পালন করে। সুতরাং এটি স্থিরচিত্র তোলার মতো যান্ত্রিকভাবে হুবহু বাস্তবের প্রতিফলন নয়। এখানে ব্যাখ্যা, দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্পচিন্তা জড়িত, যার জন্য সংগীত একটি উপকরণ হিসেবে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় হতে পারে। ‘দা টেকনিক অফ ফিল্ম মিউজিকে’ আর ম্যানভেল এবং জে হান্টলি যে উক্তি করেছেন তা স্মরণ করা যেতে পারে : ‘চলচ্চিত্রের সংগীত ব্যবহারিক হতে শুরু করে তখনই যখন সে আর পশ্চাৎপটের (ব্যাকগ্রাউন্ড) সংগীত থাকে না এবং ফিল্মের নাটকীয় বিন্যাসে তার যথাযথ আসন গ্রহণ করে।’ কয়েকটি উপায়ে এটি ঘটানো যায়, যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।

সংগীত ও অ্যাকশন
চলচ্চিত্রের ভেতর অ্যাকশনের দৃশ্যে সংগীত একটি অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করতে পারে। সংগীত ও অ্যাকশন এমনভাবে সমন্বিত হতে পারে যে তার ফলে কাহিনির উপলব্ধি মনোগ্রাহী হয়। ‘মিষ্টিওয়ালা সিকোয়োন্সে’ মিস্টিওয়ালা, তার পেছনে গ্রামের ছোট ছেলেরা এবং কুকুরটি লাইন দিয়ে পুকুরপাড় দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যে-সংগীত বাজে, সেটি এই দৃশ্যের অর্থ সম্প্রসারিত করেছে এবং একে ব্যঞ্জনা দিয়েছে। এখানে সংগীত অ্যাকশনের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। এইভাবে সংগীত পর্দায় প্রতিফলিত অ্যাকশনের ওপর বিষণ্ণতা বা আনন্দের আবহ আরোপ করতে পারে।

স্থান এবং সময়জ্ঞাপক সংগীত
চলচ্চিত্রের কোনো দৃশ্যকে একটি বিশেষ স্থান কিংবা সময়ের প্রেক্ষিতে স্থাপনে সংগীত সহায়ক হয়। যেমন, সমুদ্রে ঝড়ের সময় এক ধরনের সংগীত ব্যবহৃত হয়ে স্থান ও সময় দুটিই স্পষ্টতর করা যায়। ভীতিকর বা ‘হরর’ ফিল্মে রাতের বেলা অন্ধকারের বা কুয়াশার ভেতর যে সংগীত ব্যবহৃত হয় তার ফলে ভীতিকর পরিবেশ এবং সেই বিশেষ সময় দর্শকের উপলব্ধির খুব কাছাকাছি চলে আসে।

নাটকীয় মূহূর্ত
সংগীত দ্বারা একটি ঘটনার মধ্যে টেনশন বৃদ্ধি করা যায়। অ্যাডভেঞ্চার এবং ভীতিকর সিনেমায় এর বহুল ব্যবহার করা হয়েছে। এমনও সম্ভব যে, পর্দায় ছবিতে শান্ত সমাহিত ভাব বিরাজ করছে কিন্তু সংগীত দ্বারা ঘটনা সম্পর্কে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে।
যেহেতু সংগীত সমস্ত মানবিক আবেগের প্রকাশ বা সেই আবেগকে উদ্দীপ্ত করার ক্ষমতা রাখে, সেই জন্য সবাক চলচ্চিত্রে এর বহুল ব্যবহার হয়েছে। মিউজিকাল বলতে যে ধরনের সিনেমা বোঝায় সেখানে আবহ সংগীতের পাশাপাশি কণ্ঠস্বরের সংগীত প্রাধান্য পায়। বাংলা এবং হিন্দি সিনেমাকে ‘মিউজিকাল’ বলা না গেলেও সেখানে কণ্ঠস্বরের সংগীত প্রায় অনিবার্য। এখানে আবহসংগীতের মতোই কণ্ঠস্বরের সংগীত আবেগ ও উচ্ছ্বাস এবং অন্যান্য অনুভূতির প্রকাশেই ভূমিকা নেয়। ইংরেজি মিউজিকালে অবশ্য যে সংগীত থাকে তা কাহিনি বর্ণনার সম্পূরক এবং কখনো বা দুটি চরিত্রের মধ্যে সংলাপের ভূমিকা পালন করে।
বাংলা এবং বিদেশি সিনেমায় আবহসংগীত অনেক ক্ষেত্রেই ক্লাসিকাল সংগীতের ওপর ভিত্তি করে অথবা তার অনুসরণে রচিত এবং উপস্থাপিত হয়। ক্লাসিকাল সংগীতে বিভিন্ন তালে ও লয়ে বিচিত্র রসের সৃষ্টি সম্ভব বলেই চলচ্চিত্রের আবহসংগীতে তার এই জনপ্রিয়তা, এমন মনে করা যেতে পারে। ক্লাসিকাল সংগীতের বড় গুণ এই যে, এর ব্যবহারের জন্য চলচ্চিত্রের ভিস্যুয়াল ইমেজ বা ঘটনাকে গৌণ করার প্রয়োজন পড়ে না বা তা অনিবার্য হয় না।
কীভাবে সাউন্ড ট্র্যাকে সংগীতসহ শব্দ গ্রহণ করা হয়, সেটি টেকনিকাল বিষয়। এ সম্বন্ধে দর্শকেরা না জানলেও সিনেমার নান্দনিক বিচারে শব্দ ও সংগীতের ভূমিকা সম্বন্ধে ধারণা পেতে অসুবিধা হবে না। সেই জন্য এই কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।
ক্রিশ্চিয়ান মেৎজে সিনেমায় পাঁচ ধরনের তথ্য সরবরাহ-মাধ্যম শনাক্ত করেছেন : (ক) ভিস্যুয়াল ইমেজ বা দৃশ্য প্রতিরূপ, (খ) প্রিন্ট এবং অন্যান্য গ্রাফিকস (ছাপা অক্ষর ও অন্যান্য ছাপচিত্র), (গ) সংগীত, (ঘ) সংলাপ এবং (ঙ) শব্দ সাউন্ড ইফেক্ট। এদের অধিকাংশই শ্রবণযোগ্য। এই পাঁচটির মধ্যে কেবল দুটি যেমন, ভিস্যুয়াল ইমেজ এবং শব্দ সিনেমার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত থাকে। অন্য তিনটি মাঝে মাঝে আসে এবং চলে যায়। এই দুটি মাধ্যম (ভিস্যুয়াল ইমেজ এবং শব্দ) সবসময় উপস্থিত থাকে, কিন্তু তাদের প্রকাশময়তায় ভিন্নতা আছে। দর্শক ভিস্যুয়াল ইমেজ মনোযোগ দিয়ে দেখতে পায় কিন্তু মনোযোগ দিয়ে শব্দ শুনতে হয় না, অন্তত তেমন সচেতনভাবে নয়। এর কারণ শব্দ শুধু সবসময় না, সব দিকেই থাকে। যেহেতু এটি সর্বত্র বিস্তৃত সেইজন্য দর্শক এর সম্বন্ধে তেমন বিশেষভাবে চিন্তা করে না। ভিস্যুয়াল ইমেজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে দর্শক বেশ বুঝতে পারে। কিন্তু শব্দের ক্ষেত্রে তা হয় না।
শব্দের সর্বত্রময়তা (পারভেসিভনেস) তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। শব্দ স্থান ও কাল উভয়কেই ধারণ করে। একটি লোকেশনের ধারণা দেওয়ার জন্য এর ভূমিকা আছে। ধ্বনি-প্রতিধ্বনির সাহায্যে শব্দ একটি ‘সিগনেচার টিউন’ বা পরিচিত সংগীত হয়ে যেতে পারে। সার্জেই লিওনির স্প্যাঘেটি ওয়েস্টার্নে এই ধরনের শব্দের ব্যবহার আছে এবং বেশ উঁচু-গ্রামে। তুলনায় ‘ড. জিভাগোর’ থিম সুর অনেক বিনম্র কিন্তু মর্মভেদী। শব্দ দিয়ে সময়েরও প্রতিনিধিত্ব করা হয়। সাউন্ড ট্র্যাকে শব্দ শুরু হতেই একটি স্থির ইমেজ সজীব হয়ে ওঠে এবং তার ফলে সময়ের গতির অনুভব সম্ভব হয়। ধারাবাহিকতার ভিত্তি সৃষ্টি করে শব্দ যে ইমেজ দর্শকের মনোযোগ বেশি আকর্ষণ করে সেই ইমেজ প্রাধান্য পায়। সংলাপ এবং সংগীতের বিশেষ অর্থ থাকার জন্যই তাদের স্বীকৃতি বেশি, কিন্তু সাউন্ড ট্র্যাকের ‘সাউন্ড ইফেক্টই’ প্রধান। এর দ্বারাই শব্দময় পরিবেশ তৈরি হয়।
কোলাহল বা ‘ইফেক্ট’ বলা হলে শব্দের শিল্পের প্রতি সুবিচার করা হয় না। সাউন্ড ট্র্যাকের এই পরিচয়কে বলা যায় ‘পারিপার্শ্বিক শব্দ’। সমসাময়িককালে সংগীতে পারিপার্শ্বিকের শব্দের প্রভাব দেখা গিয়েছে, বিশেষ করে যাকে বলা হয় ‘মিউজিক কংক্রিট’। এর প্রভাব রেকর্ডে ধারণকৃত বক্তৃতার ওপরও দেখা যায়। রেডিওর যুগে সাউন্ড ইফেক্টস সীমাবদ্ধ ছিল এবং শারীরিকভাবে কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে সৃষ্টি করা যেতো। সিনথেসাইজার, মাল্টি-ট্র্যাক রেকর্ডিং এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক পদ্ধতির উদ্ভাবনের ফলে সাউন্ড ইফেক্ট বিশেষজ্ঞরা এখন স্বাভাবিক ও কৃত্রিম, উভয় ধরনের অনেক শব্দ তৈরি করতে পারে। সিনেমার শব্দের এই সমৃদ্ধি ও উন্নতি সবার কাছে স্বীকৃতি পেয়েছে, যদিও এর কৃত্রিমতা ও আতিশয্য নিয়েও সমালোচনা হয়। সবাক চিত্রের প্রথম দিকে মিউজিকাল সিনেমা ছিল দৃশ্যগতভাবে খুব দীর্ঘ ও বিশদ। দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে তখন সংগীত-পরিচালক সাংগীতিক ধারণার (আইডিয়াজ) প্রতিনিধিত্ব করার জন্য খুব সূক্ষ্ম ও জটিল ভিস্যুয়াল চিত্রায়ণ উদ্ভাবন করতেন। এখন মিউজিকাল ফর্মের সবচেয়ে সফল প্রকাশ ঘটেছে কনসার্টে। সাউন্ড ট্র্যাক এখন ফিল্মকে বহন করে, আর এইভাবে ইমেজের ওপর কর্তৃত্ব করে সাউন্ড ট্র্যাক।
কিন্তু সাউন্ড ট্র্যাক গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ইমেজ থেকে একে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সাউন্ড ট্রাকের সংকেত-পদ্ধতি (কোডস) আলোচনা বা বিশ্লেষণের জন্য যে ভাষা ব্যবহার করা হয় তার অধিকাংশই ধ্বনি এবং ইমেজের (প্রতিরূপ) ভেতরকার সম্পর্ককেন্দ্রিক। সিগফ্রিড ক্র্যাকায়ার প্রকৃত শব্দ (অ্যাকচুয়াল সাউন্ড) এবং মন্তব্যকারী (কমেনটেটিভ) শব্দের ভেতরকার পার্থক্য দেখাবার জন্য বলেছেন যে, প্রকৃত শব্দ ইমেজের সঙ্গে যুক্ত হয়, কিন্তু মন্তব্যকারী শব্দে তা হয় না। একটি দৃশ্যে চরিত্রের সংলাপ ‘প্রকৃত শব্দ’, কিন্তু যেসব চরিত্র দৃশ্যে উপস্থিত নেই তাদের যে সংলাপ শোনা যায় তা হলো ‘মন্তব্যকারী শব্দ’। কেউ কেউ অবশ্য দৃশ্যে দেখা যায়, কিন্তু অ্যাকশনে জড়িত নয়, এমন চরিত্রের জন্য মন্তব্যকারী শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। সিনেমাতাত্ত্বিক কারেল রায়েথ একটু ভিন্নভাবে বলেছেন যে, সব শব্দই দুইভাবে বিভক্ত : (ক) সিনক্রনাস, (খ) অ্যাসিনক্রনাস। সিনক্রনাস শব্দের উৎস ফ্রেমের ভেতরই থাকে, যা সম্পাদনার সময় সিনক্রনাইজ বা সামঞ্জস্যময় করে নিতে হয়। এর বিপরীতে অ্যাসিনক্রনাস শব্দ ফ্রেমের বাইরে থেকে আসে। এই দুটি পরস্পরসংলগ্ল শব্দকে জোড়া দিলে তৃতীয় একটি শব্দ সৃষ্টি হয়, যার দুই মেরু হলো সমান্তরাল শব্দ এবং কন্ট্রাপুন্টাল শব্দ। প্রকৃত শব্দ সিনক্রনাস এবং ইমেজের সঙ্গে সমান্তরাল শব্দ যুক্ত। কন্ট্রাপুন্টাল শব্দ মন্তব্যকারী শব্দ, যা অ্যাসিনক্রনাস এবং ইমেজের বিপরীতে অথবা তার বিকল্প (কাউন্টার পয়েন্ট?)। সংলাপ, বক্তৃতা, সংগীত অথবা পারিপার্শিবকের শব্দ, যাই বলা হোক না কেন, সব শব্দই কখনো সমান্তরাল আবার কখনো কন্ট্রাপুন্টাল, প্রকৃত অথবা মন্তব্যকারী, সিনক্রনাস অথবা অ্যাসিনক্রনাস। হলিউডের সাউন্ড স্টাইলকে বলা যায় প্রবলভাবে সমান্তরাল। সেখানে প্রথম দিকের সিনেমায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আবহসংগীত সহজ থেকে জটিল সব দৃশ্যকেই আচ্ছন্ন করে রাখতো এবং সংগীত-রচয়িতার আবেগ সব ইমেজকেই প্রভাবান্বিত করতো। যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে তার ভিত্তিতেই সমান্তরাল এবং কন্ট্রাপুন্টাল শব্দের মধ্যে পার্থক্য রচিত হয়। ইমেজের সঙ্গে স্বাভাবিক সংগতি রেখে কাজ করে অথবা ইমেজের বিপরীতে ভূমিকা নেয়, সাউন্ড ট্র্যাকের এই ধারণা বা পরিচিতিই শব্দের দ্বন্দমূলক বাস্তবতার নান্দনিক বিচারের ভিত্তি।
সাম্প্রতিককালে ‘কন্ট্রাপুন্টাল’ শব্দ সমসাময়িক স্টাইলে বেশ পরিহাসমূলক মাত্রা যোগ করেছে। প্রায়ই সাউন্ড ট্র্যাককে ইমেজের সমান কিন্তু পৃথক করে উপস্থাপন করা হয়। ফরাসি লেখিকা-চিত্রনির্মাতা মার্গারিটা দুরা তাঁর ইন্ডিয়া সং সিনেমায় ‘মন্তব্যমূলক শব্দ’ নিয়ে বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং ইমেজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখিয়েছেন। এখনো থিম বা বিষয়সূচক সংগীতের ব্যবহার প্রচলিত কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই সংগীতকে মন্তব্যমূলক শব্দ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। যেমন, সমসাময়িক কালের মেজাজ ও আবহ সৃষ্টির জন্য ‘রক’ মিউজিক বেশ সম্ভাবনাময় হয়ে দেখা দিয়েছে। জর্জ লুকাসের আমেরিকান গ্রাফাইটি সিনেমায় এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু নিয়তির পরিহাস এই যে, আগে যেখানে সংগীতকে সাউন্ড ট্র্যাকের সবচেয়ে শক্তিশালী সিনক্রনাস এবং মন্তব্যমূলক উপকরণ বা অংশ হিসেবে দেখা হতো তা বাস্তব জীবনে এতই বিস্তৃতভাবে উপস্থিত যে, একজন চলচ্চিত্র-নির্মাতা প্রকৃত শব্দের সিনক্রনিক বৈশিষ্ট্য নিবিড়ভাবে রক্ষা করে এখন সম্পূর্ণ মিউজিক ট্র্যাক তৈরি করতে পারেন।
সবাক চলচ্চিত্রের অভিজ্ঞতা আট দশক অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে সিনেমার শিল্পরূপের অনেক বিবর্তন হয়েছে এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও এসেছে। নির্বাক যুগে এখন ফিরে যাবার প্রশ্ন ওঠে না, কেননা সাউন্ড (সংলাপ এবং সংগীতসহ) সিনেমার ভাষাকে ‘বিস্তৃত’ করেছে। কিন্তু অহেতুক সংলাপ বা শব্দের ব্যবহার ‘সিনেমার ভাষাকে’ বিস্তৃত না করে বিকৃত করতে পারে। সেই জন্য সিনেমার ‘মৌলিক ভাষা’ দৃশ্যকল্পকে সামনে রেখে বিচার করতে হবে অন্য সব শ্রুত ভাষা (সংলাপ, সংগীত, শব্দ) তাকে আরো অর্থবহ করে কি না এবং জীবন ও জগৎকে আরো বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপনে সমর্থ হয়েছে কি না। যা দৃশ্যগতভাবেই বোঝানো যায়, তার ব্যাখ্যায় মুখের ভাষা যেমন অনাবশ্যক শুধু নয়, সিনেমার শিল্পগুণের জন্য ক্ষতিকর, একইভাবে সংগীত বা শব্দ যোগ করে তার প্রকাশময়তা খর্ব করা উন্নতির লক্ষণ বলা যাবে না। দৃশ্যকল্পের শ্রেষ্ঠত্ব এই যে তা দর্শক-শ্রোতাকে ভাবতে দেয়, চিন্তা করতে বলে এবং কল্পনার সুযোগ দেয়। এই জন্য দৃশ্যকল্পের সমর্থনে আইজেনস্টাইন-পুদোভকিন থেকে শুরু করে ব্রেসোঁ-গদাঁ হয়ে অল্টম্যান বা ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা যা করেছেন তার সবই প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। এটা খুব আশ্চর্যের নয় যে, সাউন্ড প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নিঃশব্দতাকে নির্বাক যুগের চেয়ে আরো বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ এসেছে এবং অনেকেই এটা গ্রহণ করেছেন। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইমেজ রেকর্ডিং যেমন বৈচিত্র্য এবং সমৃদ্ধি লাভ করেছে, সাউন্ড টেকনোলজিতেও এর প্রয়োগ সাউন্ডের ব্যবহারে সূক্ষ্মতা ও বিচক্ষণতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। অতিরিক্ত সংলাপ, যা প্রথম দিকের সবাক সিনেমাকে ‘টকিজে’ পরিণত করেছিল তার ব্যবহার সিরিয়াস ধরনের প্রায় সব সামাজিক (সোস্যাল ড্রামা), সিনেমায় এখন বেশ কমে এসেছে। অবশ্য আধুনিক ফিল্ম নোয়া, সায়েন্স ফিকশন এবং অ্যাকশন শ্রেণির সিনেমায় কথার চেয়ে শব্দই বেশি এবং সেই কারণে এদের বিনোদনমূলক ভূমিকা যাই হোক নান্দনিকতার বিচারে প্রশংসনীয় বলা যায় না। সংলাপের সংক্ষিপ্ততা, নিঃশব্দতার ভূমিকা, সংগীত ও শব্দের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার সবাক সিনেমার নান্দনিকতা উঁচু পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এ কথা বিস্মৃত হবার উপায় নেই। সিনেমার ‘শ্রুত ভাষা’ (সংলাপ, সংগীত এবং শব্দ), চিত্রনির্মাতাদের যেমন অনেক স্বাধীনতা দিয়েছে, একইভাবে এদের ব্যবহার তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জও বটে। 

 

Leave a Reply

*