logo

চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা : সম্পাদনার ভাষা

হা স না ত  আ ব দু ল  হা ই

 

গ্রিফিথ, পুডোভকিন ও আইজেনস্টাইন

 

যদিও সম্পাদনা বর্তমানে বেশ অতিরঞ্জিত মনে হবে, পুডোভকিন উল্লিখিত পদ্ধতির ব্যবহার করে বেশ ভালো ফল লাভ করেছিলেন। গ্রিফিথের নির্বাক ছবির সঙ্গে তাঁর ছবিগুলির তুলনা করলেই এটা বেশ বোঝা যায়। গ্রিফিথের ন্যারেটিভ যেখানে অভিনেতার নড়াচড়া ও আচার-আচরণের মাধ্যমে দর্শকের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে, পুডোভকিন সেখানে সতর্ক ও নিপুণভাবে পরিকল্পিত ডিটেইলসের সাহায্যে ‘সিন’ তৈরি করেন এবং সেসব শট পাশাপাশি রেখে ঈপ্সিত ফল লাভ করেন। তার ফলে ইফেক্টের দিক দিয়ে ন্যারেটিভ হয় খুব নির্দিষ্ট এবং জোরালো, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত আবেদন হয় দুর্বল। এই পার্থক্যের কারণ, গ্রিফিথ ও পুডোভকিনের নাটকীয় গুণ অর্জনের লক্ষ্য সম্বন্ধে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। গ্রিফিথ যেখানে মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ ও বিরোধ নিয়ে ব্যস্ত, পুডোভকিন তার স্থানে কাহিনির অর্থ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রতি বেশি আগ্রহী। সংঘর্ষ বা বিরোধ তাঁর কাছে আকর্ষণীয় নয়। পুডোভকিনের কাহিনির প্লট সবসময়ই সংখ্যার দিক দিয়ে সহজ ও সরল। তিনি তাদের ব্যাখ্যা ও সংশ্লেষের প্রতিই বেশি সময় দেন। দি এন্ড অফ সেন্ট পিটার্সবুর্গ সিনেমায় পুডোভকিন এক সিকোয়েন্সে ১৯১৪-১৮-এর মহাযুদ্ধে সৈন্যরা ট্রেঞ্চে যুদ্ধ করছে এবং মারা যাচ্ছে, এই দৃশ্য দেখিয়ে ক্রস-কাট করে ট্রেঞ্চের দৃশ্য থেকে অন্য এক সিকোয়েন্সে শহরের ব্যবসায়ীরা স্টক মার্কেটের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ার জন্য কেমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, সেই দৃশ্য দেখান। এই দৃশ্যের সম্পাদনায় পুডোভকিনের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক নয়, বরং ট্রেঞ্চে যুদ্ধরত সৈন্যদের পরিস্থিতি কেন্দ্র করে দর্শকের আবেগ উচ্চকিত করা। শটগুলি পাশাপাশি রাখার ফলেই এই ফল বা ইফেক্ট সৃষ্টি হয়। প্রায় একইভাবে মাদার সিনেমায় পুডোভকিন ঘটনা বা দৃশ্যের ধারাবাহিকতা যেমন রেখেছেন, পাশাপাশি শট রেখে মন্তাজ সৃষ্টি করে আবেগের সৃষ্টিও করেছেন। মাদার সিনেমায় কারাগারে এক বন্দি হঠাৎ কাগজের টুকরো পেয়ে সেটি পড়ে জানতে পারে যে সে আগামীকাল মুক্তি পাবে। তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ না দেখিয়ে পুডোভকিন প্রথমে তাঁর চঞ্চল হাত দেখিয়েছেন যেখানে চিঠিটা ধরা আছে, তারপর ক্লোজআপে মুখের নিচের অংশ, যেখানে ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে, সেই শটকে তিনি অন্যান্য শটের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। যেমন, ঝরনার স্রোত, বসন্তের রোদ, গ্রামের পুকুরে পাখির স্নান এবং শেষে হাস্যময় এক শিশুর মুখ। এইসবের মিলনে পুডোভকিন বন্দির আনন্দানুভূতি প্রকাশ করেছেন। এখানে বন্দির মুখের ক্লোজআপে তাঁর আনন্দ-উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে আবেগ প্রকাশের জন্য বিভিন্ন দৃশ্যের মন্তাজ সিকোয়েন্স ব্যবহার করা হয়েছে। পুডোভকিনের প্রায় ছবিতেই শটের ভেতর এই ধরনের সম্পর্ক দেখা যায়, যার উদ্দেশ্য একটি ধারণা বা আবেগের প্রকাশ। দি আর্ট অফ ফিল্ম বইতে আর্নেস্ট লিন্ডগ্রেন অবশ্য বলেছেন যে তিনি ঝরনা, পানি, এইসবের ইমেজকে ন্যারেটিভের ধারাবাহিকতায় এনেছেন, কেননা এসব দেখানোর আগে টাইটেলে লেখা হয়েছে ‘এবং বাইরে এখন বসন্ত’। এই অর্থে এই ছবিতে আইজেনস্টাইন যে ধরনের ধারাবাহিকতা (কনটিনিউটি) রাখতেন তার ইঙ্গিত বা আভাস পাওয়া যায়। আইজেনস্টাইনের অনুসৃত সেই পদ্ধতি গ্রিফিথের সহজ সরল সম্পাদনা পদ্ধতির তুলনায় বেশ পৃথক।

পুডোভকিনের নির্বাক ছবিতে নাটকীয় মুহূর্তগুলিই দর্শকের কাছে মুখ্য হয়ে থাকে, কাহিনির ওপর যে পরোক্ষ মন্তব্য বা বক্তব্য সেসব তাঁর মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গৃহীত হয় না, বড়জোর তারা নাটকীয়তাকে তীব্রতা দান করে। আইজেনস্টাইনের নির্বাক ছবি যেমন, অক্টোবরে, কাহিনি ও মন্তাজের ভেতরকার সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। আইজেনস্টাইনের কাছে কাহিনির ভূমিকা ছিল তাঁর বক্তব্যকে ধারণ ও প্রচার করা। ঘটনা থেকে বিমূর্ত ধারণা গ্রহণ এবং উপসংহারে আসা যায় কি না, এটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যে তিনি যে সম্পাদনা পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তাকে বলা হয়েছে ‘ইনটেলেকচুয়াল মন্তাজ’।

আইজেনস্টাইন তাঁর সম্পাদনায় পূর্বসূরিদের ন্যারেটিভ পদ্ধতি থেকে সরে এসে সিনেমায় শিল্পমাধ্যমকে নিছক গল্প বলার দায়িত্বের ঊর্ধ্বে নিতে চেয়েছেন। তাঁর ভাষায় : ‘প্রচলিত সিনেমা, আবেগকে পরিচালিত করে, আর ‘ইনটেলেকচুয়াল মন্তাজ’ সামগ্রিকভাবে চিন্তা-ভাবনাকে পরিচালিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে’ (ফিল্ম ফর্ম, ১৯৪৯)। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে অক্টোবর সিনেমায় তিনি কাহিনির বর্ণনামূলক (ন্যারেটিভ) অংশটি প্রায় উপেক্ষাই করেছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-ভাবনার ওপর ভিত্তি করেই সিনেমাটির ধারাবাহিকতা গড়ে উঠেছে, ঘটনার ওপর নয়। এখানে প্রতিটি ‘কাট’ আগের শটের অ্যাকশনের পরিবর্তে একটি ধারণাকে সামনে নিয়ে গিয়েছে। পরম্পরার ভিত্তিতে ইমেজগুলি একটি বক্তব্যের অবতারণা করে, কিন্তু ঘটনার বর্ণনা দেয় না। ঘটনাকে স্থান ও সময়ের সীমানা থেকে মুক্ত করে বিশুদ্ধভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক ফিল্ম তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেছেন।

পুডোভকিন গঠনমূলক সম্পাদনায় বলেছিলেন যে, ‘একটি ‘সিনের’ (দৃশ্য) অন্তর্ভুক্ত অ্যাকশনগুলির নির্বাচিত ডিটেইলসকে পরম্পরা অনুসারে সংযুক্ত করা হলে সেই ‘সিন’ সবচেয়ে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা যায়।’ আইজেনস্টাইন এর বিপরীতে গিয়ে বলেছেন, ‘এই পদ্ধতি হলো সম্পাদনার একেবারে প্রাথমিক ও মামুলি পর্যায়।’ তাঁর মতে, শটগুলিকে পরপর যুক্ত না করে ফিল্মের আদর্শ ধারাবাহিকতা এমন হতে হবে যেন দর্শক দেখতে গিয়ে হোঁচট খায়। প্রতিটি ‘কাটকেই’ দুটি পরস্পর সংযুক্ত শটের ভেতর বিরোধিতা বা সংঘর্ষের আভাস গড়ে তুলতে হবে, যার ফলে দর্শকের কাছে ওই দুটি শটের অতিরিক্ত তৃতীয় একটি (নতুন) অর্থ উন্মোচিত হয়। মন্তাজের শটগুলিকে তিনি তুলনা করেছেন ইনটার্নাল কমবাস্সান ইঞ্জিনের ভেতরকার বিস্ফোরণের সঙ্গে। দুই ক্ষেত্রেই যান্ত্রিক পদ্ধতির ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়া হয়। ‘ইনটেলেকচুয়াল মন্তাজই’ ফিল্মকে সম্পূর্ণতা দেয় বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। দুটি শটকে কেটে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হলে (যা মন্তাজে হয়) দুটি শটের যোগফল হয় না, ‘সৃষ্টি হয় নতুন অভিব্যক্তি’, এই উপসংহারে এসেছিলেন তিনি।

এখানে চলচ্চিত্র-নির্মাতা কীভাবে সম্পাদনার সাহায্যে এইসব নতুন ‘সৃজন’ সম্পন্ন করতে পারেন, তার উদাহরণ দিতে গিয়ে আইজেনস্টাইন ‘ইনটেলেকচুয়াল মন্তাজের’ নীতিমালা বা সূত্রের সঙ্গে অন্যান্য শিল্প, বিশেষ করে প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত হাইরোগ্লিফিকসের বা চিত্রময় ভাষার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন : ‘পানি এবং একটি চোখের ছবি দেখানোর অর্থ দাঁড়াবে কান্নার দৃশ্য বোঝানো। একটি কান যদি দরোজার সামনে থাকে তাহলে বোঝা যাবে যে, শুনবার প্রক্রিয়া দেখানো হয়েছে। শিশুর ছবির সঙ্গে সঙ্গে যদি মুখ দেখানো হয়, তাহলে শিশুর কান্নার প্রতিনিধিত্ব করা হয়। পাখি এবং মুখ পর পর দেখানো হলে, গানের কথাই মনে হবে। এই সবই মন্তাজের উদাহরণ। আমরা সিনেমায় এমনই করি। এমন সব শট যুক্ত করে দেখাই যে সব পৃথক অস্তিত্বে একটা বিশেষ বিষয়ের বর্ণনা করে, এককভাবে অর্থ বহন করে এবং আধেয়ের (কনটেন্ট) দিক দিয়ে নিরপেক্ষ থাকে। কিন্তু যুক্ত হওয়ার ফলে সেইসব শটের একক, নিরপেক্ষ এবং পৃথক পরিচিতি ও ভূমিকা থাকে না। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমন্ডলে তারা বিশেষ একটি ব্যাখ্যার অন্তর্গত হয়’ (আইজেনস্টাইন, ফিল্ম সেন্স, ১৯৪২)। তিনি অক্টোবর সিনেমায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যেখানে কারেনস্কির ব্যক্তিত্বের অসারতা দেখানোর জন্য মহা-সমারোহে প্রাসাদের সোপান দিয়ে তাকে উঠতে দেখার দৃশ্যের পাশাপাশি ‘ডিকটেটর’, ‘জেনারেলিসিমো’ এইসব কথা লিখিত টাইটেলে এবং প্রস্তর মূর্তির হাতে ফুলের মালার দৃশ্যের ব্যবহার করা হয়েছে। আইজেনস্টাইনের মতে, পরিচালকের দায়িত্ব হলো এই ধরনের শটের মাধ্যমে সংঘর্ষের ‘ইফেক্ট’ তৈরি করে নতুন অর্থের (তৃতীয় অর্থ) ভিত্তিতে নিজের ধারণাকে ব্যক্ত করা। তাঁর কাছে ফিল্মের আদর্শ ধারাবাহিকতা বলতে বোঝায় এমন সম্পাদনা, যেখানে প্রতিটি ‘কাট’ই বিস্ময়ের সৃষ্টি করে এবং দর্শককে অভিভূত করে। তিনি তাই মসৃণভাবে ‘কাট’ করে দৃশ্যকে সহজ-সরল করে দর্শককে নিশ্চিন্তে বসে দেখতে দেওয়ার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, সিনেমায় যে ধারাবাহিকতা, সেটি কয়েকটি সংঘর্ষের ভিত্তিতেই হতে হবে, যার ফলে একটি নিখুঁত, পরিবর্তনশীল এবং অগ্রসরমাণ বক্তব্যকে বোঝানো যাবে।

 

নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্র

নির্বাক যুগের সিনেমা নির্মাণ বিশদ এবং নিখুঁত সম্পাদনার মাধ্যমে সিনেমার ভিস্যুয়াল আবেদনকে প্রসারিত করার প্রয়াস পেয়েছে। চিত্র-নির্মাতাদের এমন অনেক আঙ্গিক উদ্ভাবন করতে হয়েছে, যার ভিত্তিতে ক্যামেরা দিয়ে বাস্তব দৃশ্য ধারণ করার অতিরিক্ত হিসেবে উঁচুমানের নান্দনিক মাধ্যম সৃষ্টি করা যায়। জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগময় বিষয় বর্ণনার জন্য পরিচালকদের নতুন এবং প্রকাশক্ষমতাসম্পন্ন ভিস্যুয়াল কনটিনিউটি নিয়ে নিরীক্ষা করতে হয়েছে। এইভাবে তাঁরা নির্বাক যুগের শেষ পর্যন্ত (১৯২৭) সিনেমা তৈরির ‘ব্যাকরণ’ গঠন করতে পেরেছিলেন। সবাক চলচ্চিত্র এসে সম্পাদনার এইসব আঙ্গিক, পদ্ধতি ও সিনেমা নির্মাণের ব্যাকরণ প্রায় সম্পূর্ণ বদলে দিলো। সিনেমার সমস্ত নাটকীয় ইফেক্ট সৃষ্টির দায়িত্ব গিয়ে পড়ল সাউন্ড ট্র্যাকের ওপর। তখন ফিল্ম-তাত্ত্বিকরা বললেন যে, সংলাপ সিনেমার সামগ্রিক আবেদন হ্রাস করতে পারে। শব্দকে (সাউন্ড) তারা দৃশ্যের বিপরীত হিসেবে (সামঞ্জস্যময় করে নয়) দেখানোর কথাও বললেন। কিন্তু বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাতারা সবাক চলচ্চিত্রে সবকিছুই পূর্ণভাবে (ইমেজ, সংলাপ, শব্দ) গ্রহণে উৎসাহ দেখালেন। এর ফলে অনেক সবাক চলচ্চিত্রে ছবি (পিকচার) হয়ে গেল শব্দের কল্পনারহিত পটভূমি। এর একটা কারণ ছিল এই যে, প্রথমদিকে সাউন্ড মাইক্রোফোন ফিল্ম তৈরির সেটেই স্থির অবস্থায় রাখতে হতো। নির্বাক যুগে যেমন একটি দৃশ্য ক্যামেরার একাধিক অবস্থান থেকে ধারণ করা যেত (প্যানিং, ট্র্যাকিং), সবাক যুগের প্রথম পর্বে সেইসব শট একটি নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। প্রথমদিকে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এই অস্থিরতা ও সমস্যা অবশ্য পরবর্তীকালে অতিক্রম করা গিয়েছে। এখানে বিবেচ্য, শব্দ ও সংলাপ কীভাবে সিনেমার আবেদন বৃদ্ধি করেছে এবং সম্পাদনার ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলেছে।

শব্দ ও সংলাপ প্রয়োগের ফলে পরিচালক এখন ছবিতে সময় ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে পারেন এবং একটি চরিত্র বা স্থানের বর্ণনা সরাসরি দিতে পারেন। সবাক চলচ্চিত্রে সংলাপের একটি বাক্যে এত তথ্য দেওয়া যায় যার জন্য নির্বাক চলচ্চিত্র নির্মাতাকে হয় সাব-টাইটেল তৈরি অথবা দীর্ঘ সময় ধরে ভিস্যুয়ালি বর্ণনা করতে হতো। সবাক চলচ্চিত্রে পরিচালক নাটকীয়তার প্রতি গুরুত্বকে ইচ্ছেমতো বিভিন্ন অংশে ভাগ করে দেখাতে পারেন এবং যেসব দৃশ্য নাটকীয়তার নিরিখে তেমন তাৎপর্যময় নয়, সেসবের জন্য কম সময় দিতে পারেন। গ্রিফিথ যেমন তাঁর দি বার্থ অফ এ নেশন সিনেমা শুরু করেছিলেন দীর্ঘ এবং নাটকীয়ভাবে দুর্বল (ফ্ল্যাট) দৃশ্য দিয়ে, সবাক চলচ্চিত্রের নির্মাতা সিনেমার চরিত্র এবং স্থান সম্বন্ধে ধারণা দেওয়ার জন্য কয়েকটি সুনির্বাচিত শট এবং কয়েক লাইন সংলাপেই সেই কাজ করতে পারেন। একটি দৃশ্য (সিন) থেকে অন্য দৃশ্যে যাবার মধ্যবর্তী সময়ে (ট্রানজিশন) এই পরিবর্তন বেশ লক্ষণীয়। নির্বাক যুগে চলচ্চিত্র নির্মাতা একটি সাব-টাইটেল এবং লং ইস্টাবলিশিং শট ব্যবহার করে কাহিনিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতেন। সবাক চলচ্চিত্র-নির্মাতা সংলাপে সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত দিয়ে একই কাজ করতে পারেন। সবাক চলচ্চিত্রে শব্দ ও সংলাপ এইভাবে দুটি মূল পরিবর্তন নিয়ে আসে : (ক) কাহিনি বর্ণনা পদ্ধতিতে ন্যূনতম উপকরণ ব্যবহার, যার ফলে সবাক সিনেমার ন্যারেটিভ ক্রমান্বয়ে জটিল হতে পেরেছে এবং (খ) বাস্তবতার উঁচুমানের প্রতিনিধিত্ব। নির্বাক ছবিতে চিত্র-নির্মাতার উদ্দেশ্য ছিল এই মাধ্যমের অন্তর্গত কিছু বিশেষ এবং পরোক্ষ উপায় দ্বারা একটি স্টাইল তৈরি করে দর্শককে আকর্ষণ ও প্রভাবান্বিত করা। যেমন, প্রকাশভঙ্গিতে অতিরঞ্জন, ভিস্যুয়াল কমপোজিশনে বিশদ ভঙ্গি, প্রতীকী চিহ্নের ব্যবহার, প্রকাশময় (ইভোকেটিভ কাটিং) প্রক্রিয়া। এর বিপরীতে সবাক চলচ্চিত্রে দর্শকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, সরাসরি আবেদন রাখা হয়েছে। এখন যদি কেউ ইনটলারেন্স, ব্যাটলশিপ পটেমকিন অথবা দি ক্যাবিনেট অফ ড. ক্যালিগারি দেখেন তাহলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা ওইসব ছবিতে যে বাস্তব জীবনের তুলনায় বড় করে ভিস্যুয়াল ইফেক্টস সৃষ্টি করেছেন, সেই উপলব্ধি হবে। দেখা যাবে, একটি সমতলে নিজেদেরকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য তাঁরা দর্শকের কাছে বাড়াবাড়িভাবেই ইমেজ নিয়ে আবেদন করেছেন। শব্দ ব্যবহার করতে না পারার জন্যই নির্বাক ছবিতে ভিস্যুয়াল ইমেজ দিয়ে দর্শকের দর্শনশক্তির প্রতি আবেদনে অতিশয়োক্তি ছিল। কিন্তু এর জন্য নির্বাক ছবি সবাক ছবির তুলনায় বেশি সফল ছিল বা কম, তা বলা যাবে না। নির্বাক এবং সবাক ছবি বাস্তবতার প্রতিনিধিত্বের জন্য দুটি পৃথক পর্যায়ে (প্লেনে) কাজ করে বলে তুলনামূলকভাবে কোনটি শ্রেষ্ঠ, সেই উপসংহারে আসা যায় না। তাদের মধ্যে কেবল পার্থক্য নিরূপণ করা সম্ভব এবং সমীচীন।

শব্দ এবং ছবির মধ্যবর্তী সম্পর্ক দর্শকের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে যে মনোযোগ দাবি করে বা করা উচিত, সে সম্বন্ধে সাধারণভাবে মন্তব্য করা যায়, চূড়ান্তভাবে নয়। ডি সিকার বাইসাইকেল থিভস সিনেমায় সংলাপের ব্যবহারে দারুণ মিতব্যয়িতা রয়েছে, কিন্তু সব সিনেমাতেই এটা প্রযোজ্য, এমন বলা যাবে না। সিটিজেন কেইনের মতো সবাক চলচ্চিত্রে শব্দ ও সংলাপের বহুল ব্যবহার কাহিনির সঙ্গে বেশ সংগতিপূর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা, এই ধরনের ছবিতে ইমেজের ভূমিকাই প্রধান, যা চলচ্চিত্রের ভাষায় কেন্দ্রবিন্দু। ছবি এবং শব্দের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেয়ে ভিস্যুয়াল ইমেজের প্রাধান্য বজায় রাখাই সবাক চলচ্চিত্রের নান্দনিকতার বিবেচনায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

নির্বাক যুগে সম্পাদনার জন্য (প্রথমত দৃশ্য ধারণের জন্য) যেসব মূল সূত্র নির্বাচিত হয়েছিল তার আলোচনা হয়েছে। যেমন ক্লোজ শট, ফ্ল্যাশ ব্যাক, ডিসলভ, প্যানিং ও ট্র্যাকিং শট ইত্যাদি। এসব এখন সবারই জানা এবং বহুল ব্যবহৃত। যদিও এদের ব্যবহারে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু নাটকীয়তার মূল্য সৃষ্টিতে তাদের অবদান অনস্বীকার্য এবং তা আগের মতোই রয়েছে। শব্দ ও সংলাপের ফলে যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, তার ভিত্তিতে সম্পাদনায় কিছু পরিবর্তন হয়েছে। যেমন, গতির (পেস) নির্ধারণ, যা নির্বাক চিত্রে ‘কাটিং’য়ের মাত্রা ও পরিমাণ দিয়েই নির্ধারিত হতো, তা এখন সাউন্ড ট্র্যাকের ভল্যুম ও প্রয়োজনের নিরিখে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। (কমপিউটার ও ডিজিটাল পদ্ধতির উদ্ভাবনের পর এখানে আরো পরিবর্তন এসেছে)। সময়ের অতিক্রমণ দেখানোর জন্য আগে যেমন সাব-টাইটেল ব্যবহার করা হতো, এখন সংলাপে সংক্ষিপ্তভাবে সেটা দেখানো যায়। আগের মতো সবাক চলচ্চিত্রে অপসৃয়মাণ ল্যান্ডস্কেপের দৃশ্যের পাশাপাশি ইন্টার-কাট করে ট্রেনের ভেতরের দৃশ্য দেখিয়ে ট্রেনটির যাত্রা দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না। একটি শটে ব্যাক প্রজেকশনের সাহায্যেই এই ধারণা দেওয়া যায়। সবাক চলচ্চিত্র শুরু হওয়ার পর এই ধরনের আরো কিছু কারিগরি পরিবর্তন আসে। কিন্তু সম্পাদনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে শব্দ ব্যবহারের পর ন্যারেটিভ স্টাইলে যে পরিবর্তন হয়, তার জন্য। বাস্তবতার প্রতি জোর দেওয়া সবাক চলচ্চিত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দেয়। সম্পাদনা পদ্ধতিতে এর প্রভাব পড়ে। যেসব পদ্ধতি নির্বাক যুগে ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু পরবর্তীকালে বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ণ করে বলে মনে হয়েছে, সেসব সবাক চলচ্চিত্রে বাদ দেওয়া হয়েছে অথবা গৌণ হয়ে গিয়েছে। যেমন, ‘আইরিস শট’, যার সাহায্যে একটি ডিটেইলের ওপর দর্শকের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হতো, তা এখন জনপ্রিয় নয় এবং খুব কম ব্যবহৃত হয়, কেননা তার মধ্যে অস্বাভাবিকতা রয়েছে। একই কারণে গ্রিফিথ যে ‘মাস্কিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে শট নিতেন, তার ব্যবহারও প্রায় পরিত্যক্ত। দ্রুত এবং ক্ষণিকের জন্য ফ্ল্যাশ ব্যাক, যা গ্রিফিথ দি বার্থ অফ এ নেশনে করেছেন, সেটিও তেমন সাধারণ নয় এখন। এইসব টেকনিকের প্রতি গুরুত্ব বাস্তবতা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার কারণে হ্রাস পেয়েছে বলে কারেল রেইযের ধারণা। অবশ্য তিনি এ-ও বলেছেন যে, এইসব পদ্ধতি ভবিষ্যতেও ব্যবহৃত হবে, আগের মতো অত বেশি আর সাধারণভাবে না হলেও। প্রকৃতপক্ষে তাই হয়েছেও।

সবাক চলচ্চিত্রের পর সম্পাদনায় যে পরিবর্তন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তা হলো কাহিনি বর্ণনায় ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সম্পাদনার কাজ। শব্দ ও সংলাপ যোগ হওয়ার পর সবকিছুই ভিস্যুয়ালি দেখাবার প্রয়োজন হয় না। কারেল রেইযের অনুসরণে সম্পাদনার ক্ষেত্রে নির্বাক ও সবাক চলচ্চিত্রের কয়েকটি মৌলিক পার্থক্য নিচে আলোচনা করা হলো।

 

শটের ক্রম (অর্ডার অফ শটস)

নির্বাক যুগে পরিচালক ও সম্পাদক (একই ব্যক্তি) স্বাধীনভাবে কাজ করে সিদ্ধান্ত নিতেন শটের ক্রম কী হবে। সবচেয়ে সন্তোষজনক ভিস্যুয়ালে ধারাবাহিকতা থাকবে, এমন উদ্দেশ্যের ভিত্তিতেই শটের ক্রম নির্ধারিত হতো। গ্রিফিথ এবং আইজেনস্টাইন দুজনেই স্ক্রিপ্টের বাইরে অনেক শট নিতেন এবং ‘কাটিং’য়ের পর্বে (সম্পাদনায়) এসে সেসব সাজাতেন ও একটি আকার দিতেন (দৃশ্য বা সিকোয়েন্স)। এইভাবে তাঁরা সিনেমা তৈরির মূল উপকরণ (শট বা ফুটেজ) ব্যবহারে বেশ স্বাধীন ছিলেন। জার্মান চিত্রপরিচালকরা (যেমন, কার্ল মেয়ার) অবশ্য চিত্রনাট্যের ওপরই নির্ভর করে শট নিতেন ও তাদের ক্রম নির্ধারণ করতেন। কিন্তু যে যাই করুক না কেন, নির্বাক যুগে শুটিংয়ের পরও সৃজনশীল ও মিতব্যয়িতার সঙ্গে ধারাবাহিকতার সাধারণ শর্ত মেনে নেওয়া সম্ভব হতো। তখনকার সম্পাদনা পদ্ধতি ছিল খুবই নমনীয়, যার জন্য এক শট থেকে অন্য শটে যাওয়া সহজ ছিল। অনেকে মনে করেন, আইজেনস্টাইন তাঁর নির্বাক ছবিতে কাটিং রুমেই (সম্পাদনার সময়ই) অনেক শটের পাশাপাশি অবস্থান নির্ধারণ করেছেন।

প্রথমদিকে সবাক চলচ্চিত্রে কাটিং রুমে বসে শটগুলি পুনর্বিন্যস্ত করা বা ইচ্ছেমতো সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। এর একটি কারণ শব্দকে ছবির সঙ্গে সামঞ্জস্যময় বা সমকালীন করার ফলে শব্দই ইমেজের অবস্থান নির্ধারণ করে। আর একটি কারণ সাউন্ড শুটিংয়ের খরচ এতই বেশি যে, দীর্ঘ ফুটেজ নেওয়ার পর তা বাদ দেওয়া আর্থিকভাবে বেশ ক্ষতিকর। সংলাপ অনেক ক্ষেত্রে কাহিনি সম্বন্ধে এমন সব তথ্য দেয়, যা একটি প্রেক্ষিতেই যথাযথ, অন্য স্থানে নয়। এর ফলে যে ইমেজের সঙ্গে এটি সম্পর্কিত সেটি শট নেওয়ার সময়েই একটি সিনে বা প্রেক্ষিতে অবস্থান নিয়ে ফেলে। এইসব কারণে শব্দসহ সিকোয়েন্সের শট নেওয়ার ফলে তাদের (শট) ক্রম আগে থেকেই পরিকল্পিত হতে হয়। এর ফলে সম্পাদনার দায়িত্ব অনেকটাই চিত্রনাট্যকারের ওপর বর্তিয়েছে। কমপিউটার, ইলেকট্রনিকস এবং ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে এখন অবশ্য পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে।

 

ক্যামেরা স্থাপন নির্বাচন

গ্রিফিথ প্রথম প্রয়োগ করার পর থেকে বিভিন্নভাবে গুরুত্ব বোঝানোর জন্য লং, মিডিয়াম এবং ক্লোজ শটের সূত্র অপরিবর্তিতই থেকে গিয়েছে। চিত্রনাট্যকার সবাক চলচ্চিত্রে ক্যামেরার যে অবস্থান সবচেয়ে উপযোগী, তার ইঙ্গিত দেন। তিনি না দিলেও পরিচালক বুঝতে পারেন সিনেমার যে ধারাবাহিকতা সাজানো হয়েছে, তার কোন অংশে কোন ক্যামেরা সেটআপ প্রাসঙ্গিক। যদি কোনো দৃশ্য বিভিন্ন ক্যামেরা সেটআপ থেকে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে পুরো দৃশ্যটাই বিভিন্ন সেটআপের প্রতিটি থেকে শটে নেওয়া হয় এবং পরে সম্পাদনার সময় একত্রিত করা হয়। এটা খুব আদর্শ বা সন্তোষজনক পদ্ধতি নয়। যদি সম্পাদক আর পরিচালক পৃথক হন, তাহলে যতই বিশদভাবে শট নেওয়া হোক না কেন, কীভাবে এইসব এডিট করা হবে পরিচালক সে সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হতে পারেন না। তখন সেই সিনের ইফেক্টে নির্দিষ্টতার অভাব ঘটে, যা পরিকল্পিত শুটিংয়ে হয় না।

 

উপস্থাপনা : মসৃণতা

যদিও একটি শট থেকে অন্য শটে উত্তরণ, দৈনন্দিন জীবনে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অভিজ্ঞতা তার সঙ্গে তুলনীয়, এর অর্থ এই নয় যে, ‘শট’ থেকে ‘কাট’ করা হলে তা টের পাওয়া যাবে না। নির্বাক ছবিতে হঠাৎ করে ‘কাটের’ মাধ্যমে যে পরিবর্তন আনা হয়, দর্শক সে সম্বন্ধে বেশ সচেতন থাকত। গ্রিফিথের ছবিতে ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের ঘন ঘন পরিবর্তন দর্শক সহজেই বুঝতে পারত এবং এর ফলে ইমেজের ধারাবাহিকতায় যে ছন্দপতন ঘটত তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের বেশ বেগ পেতে হতো। আইজেনস্টাইন দুটি শটের মধ্যে ‘মসৃণ উত্তরণের’ পরিবর্তে ‘সংঘর্ষময় সম্পর্ক’কে প্রাধান্য দিয়েছেন, তার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে। এঁদের দুজনের তুলনায় বিংশ শতাব্দীর বিশ শতকের জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতারা মসৃণভাবে প্রবাহিত ধারাবাহিকতা সৃষ্টির জন্য খুব নমনীয়ভাবে ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন।

সবাক চলচ্চিত্রের যুগে বাস্তবতার প্রতিনিধিত্বের ওপর জোর দেওয়ার কারণে ইমেজের মসৃণ প্রবহমানতা (ধারাবাহিকতা) অর্জনের সমস্যা বেশ জটিল আকার ধারণ করে। হঠাৎ করে জোরের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে ‘কাট’ করা হলে সেই আঙ্গিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। এর ফলে দর্শকের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে অ্যাকশন দেখার যে ‘মায়া’ থাকে তা বিঘ্নিত হয়। এই কারণে মসৃণভাবে এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই এখন সম্পাদনার মূল লক্ষ্য ও প্রধান বিবেচনা।

ওপরে উল্লিখিত সম্পাদনার সঙ্গে সম্পর্কিত চারটি প্রক্রিয়া বা পদ্ধতির বর্ণনা করে কারেল রেইয বলেছেন যে, এদের ভিত্তিতে সম্পাদনার মূল বিষয়গুলি সম্পাদকের কাছ থেকে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকের কাছে চলে গিয়েছে, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অপরদিকে সবাক চলচ্চিত্রের বিকাশের জন্য যেসব নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেসবের দায়িত্ব যে সম্পাদকের ওপর বর্তেছে, তিনি সে কথাও বলেছেন। বর্তমানে অবশ্য এমন সূক্ষ্ম বিভাজন সম্ভব নয়, বিশেষ করে পরিচালকের প্রধান ভূমিকা ও মূল দায়িত্বের বিবেচনায়।

 

সম্পাদনার গুরুত্ব

সম্পাদনার গুরুত্ব যে অনেক, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সিনেমা তৈরির অন্যান্য অংশে ভুল হলে তার সংশোধন হতে পারে, কিন্তু একবার সম্পাদিত হয়ে ছবি প্রদর্শিত হয়ে গেলে সেটি সংশোধন বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। সেই জন্য সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে সবসময়ই টানা-হেঁচড়া হয়েছে। কখনো সম্পাদক পৃথকভাবে কাজ করেছেন, কখনো পরিচালকের সঙ্গে যৌথভাবে। কখনো পরিচালকই সম্পাদক হয়েছেন। আবার প্রডিউসারকেও সম্পাদনার ভূমিকায় দেখা গিয়েছে।  চিত্রনাট্যকার সম্পাদনার মাধ্যমে কী ইফেক্ট সৃষ্টি করা যাবে, সেটা মনে করে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজেও নিতে পারেন। অর্থাৎ চিত্রনাট্যেই বলে দিতে পারেন চূড়ান্ত পর্যায়ে সিনেমাটির রূপ কী হবে। যদি চিত্রনাট্যকার আর পরিচালক সিনেমার কাহিনি বর্ণনার ধারাবাহিকতা সম্বন্ধে নিশ্চিত না হন, তাহলে সম্পাদকের ওপরই দায়িত্ব বর্তায়। সম্পাদনার দায়িত্বে কে থাকবেন, এটি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ছবিটি কীভাবে অর্থায়িত হচ্ছে, কে পরিচালনা করছে, কে সম্পাদনার দায়িত্বে রয়েছে এদের ব্যক্তিত্ব ও গুরুত্বের ওপর। তবে সম্পাদনাই যেহেতু কাঁচামালকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার পর্যায়, সেইজন্য পরিচালক কমবেশি এই পর্বে যুক্ত না থেকে পারেন না। এক্ষেত্রে অবশ্য স্টুডিওর ঐতিহ্যও ভূমিকা রাখে।

ইংল্যান্ডে পরিচালকই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি চিত্রনাট্য লেখায় সহযোগিতা করেন এবং সম্পাদনায় তদারক করেন। সিনেমার কাহিনি বর্ণনার ধারাবাহিকতার দায়িত্ব তাঁর এবং সম্পাদকের ওপর থাকে। হলিউডে স্টুডিওভিত্তিক সিনেমা নির্মাণে এর উল্টোটা হয়েছে। সেখানে চিত্রনাট্যকার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন বিশদভাবে এবং অনেক সময় স্টুডিও বা প্রডিউসারের ফরমায়েশ অনুযায়ী। লিখিত চিত্রনাট্যের ভিত্তিতে পরিচালকের জন্য সীমিত ভূমিকাই রাখা হয়েছে। হলিউডে সিনেমা নির্মাণে প্রডিউসারদেরকে ইংল্যান্ডের তুলনায় আরো সক্রিয় অংশ নিতে দেখা গিয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি সম্পাদনার তদারকি করেছেন। এর মধ্যে ব্যতিক্রমও ছিল। জন হাস্টন নিজেই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন এবং পরিচালনা ও সম্পাদনা করেছেন। চ্যাপলিন প্রডিউসার, পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার ও সম্পাদকের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। অরসন ওয়েলস সিটিজেন কেইন সিনেমার নির্মাণে সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন। এঁদের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে কারেল রেইয মনে করেছেন যে, সাধারণ বুদ্ধিতে বলে ছবির পরিচালনা এবং সম্পাদনা এক ব্যক্তির দ্বারাই হওয়া উচিত। ফিল্ম শুটিংয়ের সময় পরিচালকই ভিস্যুয়াল ধারাবাহিকতা পরিকল্পনা করে থাকেন (চিত্রনাট্যের ওপর ভিত্তি করে অথবা নিজের মতো করে)। সুতরাং তিনিই সিনেমা নির্মাণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ঐক্যের সূত্রে গ্রথিত করার সুযোগ ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সম্পাদনার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হলে যে কাঁচামাল (ফিল্ম ফুটেজ) কাটিং রুমে আসে সেসব শুটিংয়ের সময়ে তিনি ধারাবাহিকতা সম্পর্কে যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করে গ্রহণ-বর্জন করতে পারেন।

 

আধুনিক মন্তাজ

আধুনিক মন্তাজ সিকোয়েন্স, যার ব্যাখ্যা আগেই দেওয়া হয়েছে, তার উৎপত্তি ঘটে প্রথমদিকের (গত শতাব্দীর বিশ শতকে) রাশিয়ান সিনেমা নির্মাণে নিরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে। সেই সময়ের রাশিয়ান ফিল্মের সঙ্গে বর্তমানের ‘সিকোয়েন্স মন্তাজের’ যে সম্পর্ক তা হলো দুই ক্ষেত্রেই সংক্ষিপ্ত, সংযোগহীন ফিল্ম স্ট্রিপের ব্যবহার। কিন্তু এই মিলের চেয়ে তাদের মধ্যে পার্থক্যই প্রধান। রাশিয়ান পরিচালকরা, বিশেষ করে আইজেনস্টাইন ও তাঁর অনুসারীরা, শটগুলি পাশাপাশি রেখে প্রকাশময়তা বা তৃতীয় এক অর্থ আনতে চেয়েছেন। আধুনিক ‘মন্তাজ সিকোয়েন্সে’ ইমেজের সমাহারে যে পুঞ্জীভূত ইফেক্ট, সেটি সৃষ্টি হয়। রাশিয়ান পরিচালকদের সিকোয়েন্সে ‘ক’ শট ‘খ’ শটের সঙ্গে সংঘর্ষমূলকভাবে সম্পর্কিত হয়ে নতুন অর্থ সৃষ্টি করেছে। আধুনিক মন্তাজ সিকোয়েন্সে ‘ক’-এর সঙ্গে ‘খ’, ‘গ’ ইত্যাদি শট পরপর যুক্ত হয়ে যখন ‘ন’ শটটি দেখানো হয় তখন ঘটনার ভিত্তিতে ‘ক’ থেকে ‘ন’-এ উত্তরণকে বোঝায়। আধুনিক সিকোয়েন্স এইভাবে কয়েকটি ঘটনা বা তথ্য একসঙ্গে তুলে ধরে অন্য একটি ঘটনা বা তথ্যে উপনীত হওয়ার প্রক্রিয়াকে দেখায়। এখানে শটগুলির সহাবস্থান পৃথকভাবে তেমন গুরুত্ব পায় না এবং দুটি শটের পাশাপাশি অবস্থানকে ডিসলভ করে মুছে দেওয়া হয়। রাশিয়ান এবং আধুনিক মন্তাজে পরপর দ্রুতগতিতে যেতে থাকা শট ব্যবহার করা হলেও তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন, এটা মনে রাখা প্রয়োজন।

আধুনিক মন্তাজে সাধারণত কাহিনির বর্ণনার জন্য প্রয়োজনীয় কিন্তু আবেগশূন্য, এমন ঘটনা বা বাস্তবতাকে সুবিধাজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়। যেসব ঘটনা বা বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ দেখাতে গেলে জটিলতা দেখা দিতে পারে অথবা কাহিনি বর্ণনার জন্য বিশদভাবে দেখানোর প্রয়োজন নেই, সেসব দেখানোর জন্য আধুনিক মন্তাজ ব্যবহার করা হয়। এখানে ক্যারল রিডের দি থার্ডম্যান সিনেমার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এই সিনেমার শেষে মেজর ক্যালোওয়ে হলি মার্টিকে বিশ্বাস করাতে চায় যে পুলিশ তার বন্ধু হ্যারি লাইমের অপরাধ সম্বন্ধে জানে। কিন্তু মার্টিন তার বন্ধু হ্যারি সম্বন্ধে একথা বিশ্বাস করতে চায় না। মেজর ক্যালোওয়েকে তখন তার বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণাদি না দেখালে চলে না। দর্শকদের যদি বোঝাতে হয় যে মেজর ক্যালোওয়ে সত্যি সত্যি এইসব বিশদ প্রমাণ হাজির করেছে, তাহলে অনেক সময় ধরে সেসব সিনেমায় দেখাতে হবে। কাহিনি যখন ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছেছে সেই সময় এ-ধরনের উপস্থাপনা সিকোয়েন্সকে ভেস্তে (ফ্ল্যাট করে) দিতে পারে। ক্যারল রিড এই সমস্যার সমাধান করেছেন আঙুলের ছাপ, দলিল আর চিঠিপত্র, হ্যারি লাইমের ব্যবহার করা কতিপয় বস্ত্ত ইত্যাদির শট নিয়ে মন্তাজ সিকোয়েন্স তৈরি করে। এর ফলে দর্শক বুঝতে পেরেছে যে মার্টিন প্রমাণাদি দেখে শেষ পর্যন্ত তার বন্ধুর অপরাধ সম্বন্ধে বিশ্বাস করেছে। কিন্তু এর জন্য ঘটনা বা অ্যাকশনের গতি শুধু অল্প একটু শ্লথ হতে হয়েছে। এই ধরনের ‘মন্তাজ সিকোয়েন্সই’ এখন সাধারণ। কিন্তু এটা খুব সুবিধাজনক হলেও এখানে আবেগ সৃষ্টি করা যায় না। প্লট খুব মসৃণভাবে এগিয়ে যেতে পারে, কিন্তু আবেগ নিরপেক্ষভাবে।

‘মন্তাজ সিকোয়েন্স’ সম্পাদনার কাজ ফিল্ম শুটিং শেষ হওয়ার পরই হাতে নেওয়া হয়, কেননা তখনই বোঝা যায় কতটুকু স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন। তবে সম্পাদনায় দুটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয়। প্রথমত, মনে রাখতে হয় যে, সরল ধরনের বর্ণনা (ন্যারেটিভ) ব্যবহার করে বাস্তবতার যে পদ্ধতিতে (প্লেন অফ রিয়েলিটি) বোঝানো হয়, মন্তাজ সিকোয়েন্স সেই একই বাস্তবতার পদ্ধতি অনুসরণ করে না। যদি কাহিনির ভেতর কোনো শূন্যতাকে প্রায় অদৃশ্যভাবে থেকে পূরণ করতে হয় তাহলে তাকে এটি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। মন্তাজ সিকোয়েন্স দীর্ঘ হলে ন্যারেটিভের অবশিষ্ট অংশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে অনাবশ্যকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এইভাবে যে ইফেক্টের জন্য এর ব্যবহার, সেটিও বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মন্তাজ সিকোয়েন্সটি সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পিত হতে হবে। সাধারণত একটি নিরবচ্ছিন্ন এবং মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সংগীতের ব্যবহার করে ইমেজগুলি গ্রথিত করা হয়ে থাকে। এর ফলে ঘটনার অতিক্রমণের যে ছন্দ তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অপরিকল্পিত থাকলে কিছু বাস্তব সংলাপের অংশের পর চাপানো সাধারণ ইমেজ দেখানো হলে তাতে কৃত্রিমতা দেখা দেয়, যার জন্য কাঙ্ক্ষিত ইফেক্ট সৃষ্টি হয় না। ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যার জন্য মন্তাজের যে ব্যবহার, সেটি সুচিন্তিত এবং সতর্ক হয়েই হতে হবে। দ্রুতগতিতে ইমপ্রেশনিস্টিক সিকোয়েন্স ব্যবহার করে দর্শককে দূর থেকে অ্যাকশন দেখতে বলা হলে ন্যারেটিভের যাথার্থ এবং সত্যতা বিঘ্নিত হতে পারে, কেননা দর্শককে হঠাৎ করে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে কাহিনি দেখতে বলা হচ্ছে।

স্বাভাবিক ন্যারেটিভ থেকে মন্তাজ সিকোয়েন্সের ব্যবহার যুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় বেশ সাধারণ। একদল সৈন্য সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, অথবা সমুদ্রতীরে অবতীর্ণ হচ্ছে, এই মন্তাজ সিকোয়েন্স সাধারণ দৃশ্যের পটভূমি সৃষ্টি করে, যার ফলে নির্বাচিত চরিত্রগুলির ভূমিকা স্পষ্ট এবং আবেদনময় হয়। ব্যক্তি থেকে সাধারণে এই উত্তরণের ফলে নাটকীয় উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। কিন্তু এইভাবে কাহিনিকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে রোমঞ্চকর অ্যান্টি-ক্ল্যাইম্যাক্সও দেখানো যায়।

কেবল ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য যে মন্তাজ সিকোয়েন্সের ব্যবহার, তার জনপ্রিয়তা বেশ হ্রাস পেয়েছে। প্রথাগত যেসব মন্তাজ ইমেজ যেমন, গাছের পাতা ঝরে যাওয়া, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়া, ট্রেনের চাকার দ্রুত ঘোরার দৃশ্য অর্থাৎ সব পুরনো ক্লিশে বাদ দিয়ে পরিচালকরা আরো সহজে উত্তরণ (ট্রানজিশন) দেখাতে চেয়েছেন। একটি চরিত্রকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দেখাবার জন্য ট্রেনের চাকা, ইঞ্জিন, রেললাইন এইসব দেখানো বেশ অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে এবং তার স্থানে সংলাপে চরিত্রটি যে স্থানান্তরে যাচ্ছে, সেই ইঙ্গিত দেওয়ার পরই শটটি ডিসলভে মুছে দিয়ে যে স্থানে চরিত্রটি গিয়েছে সেখানকারই ইস্টাবলিশিং শট অথবা সেখানে পৌঁছানোর পর চরিত্রটির মুখের সংলাপে এই স্থানান্তর দেখানো যথেষ্ট ও সন্তোষজনক মনে হয়েছে।

এক সময়ে কেবল কাজের উপযোগী (ইউটিলিটারিয়ান) ‘মন্তাজ সিকোয়েন্স’ খুব বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। চিত্রনাট্যে পরিকল্পিত মন্তাজ, যা নাটকীয়তার অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে, তেমন মন্তাজের ব্যবহার হয়েছে কম। বুদ্ধির সঙ্গে এবং সৃজনশীলভাবে ব্যবহৃত হলে মন্তাজ সিকোয়েন্স বেশ ভালো এবং আকর্ষণীয় ফল দিতে পারে। নাটকীয়তার অনেক পরিস্থিতি বা মুহূর্ত আছে, যা সরল ন্যারেটিভ দিয়ে বোঝানো যায় না। এইসব ক্ষেত্রে মন্তাজ খুব উপযোগী এবং সফল। সিটিজেন কেইনের উদাহরণ দিয়ে এর ব্যাখ্যা করা যায়। এই সিনেমায় কেইনের মৃত্যুর পর ‘মার্চ অফ টাইম’ নিউজ রিল শেষ হয়ে গেলে সেই পত্রিকার সম্পাদক কেইনের জীবন-বৃত্তান্ত লেখার জন্য একাধিক রিপোর্টারকে কেইনের বন্ধুদের মধ্যে যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের ইন্টারভিউ করতে পাঠান। কেইনের এক বিশ্বস্ত বন্ধু হাসপাতালে বারান্দায় বসে যখন তাঁর স্মৃতিচারণ করেন তখন ফ্ল্যাশ ব্যাকে কেইন আর তাঁর প্রথম স্ত্রী এমিলিকে ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেখা যায়। ফ্ল্যাশ ব্যাকে পরপর কয়েকটি ব্রেকফাস্ট দৃশ্য ও সংলাপ দেখিয়ে তাদের দাম্পত্য জীবনের ভাঙন তুলে ধরা হয়েছে। ক্রমেই ফ্ল্যাশ ব্যাকে দেখানো সিনগুলি সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্তাকার হতে থাকে, যার মধ্যে বোঝানো হয় যে দাম্পত্য সম্পর্ক মধুর থেকে তিক্ততায় পর্যবসিত হচ্ছে। ক্রমাবনতি দেখাবার জন্য সংগীতও মধুর থেকে বেসুরো হয়ে আসে। শেষ পর্যায়ে অভিনয়ও সংলাপ এবং সম্পর্কের এই অবনতির প্রতিনিধিত্ব করে। সংলাপ, সংগীত, অভিনয় এবং কাটিংয়ের রেট (ক্রমাগত বৃদ্ধি), সবই প্রতিটি দৃশ্যের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই সিকোয়েন্সে ব্যবহৃত মন্তাজ কেবল ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য না, এই মন্তাজ সিকোয়েন্স ন্যারেটিভের জন্য যথাযথ হবে বলেই ব্যবহৃত হয়েছে। আর কোনো পদ্ধতিতে দুই চরিত্রের মধ্যে ক্রম অবনতিশীল সম্পর্ক এমন জোরালোভাবে দেখানো যেত বলে মনে হয় না।

মন্তাজ এবং এডিটিংয়ের প্রসঙ্গে যে কথা বলে এই অংশের সমাপ্তি টানা যায় তা হলো কমপিউটার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকসের নানা উদ্ভাবন (যেমন স্পেশাল ইফেক্টস) ছবি তোলার প্রক্রিয়া, রঙের সংমিশ্রণ, সংলাপ ধারণ, শব্দ ও সংগীত ব্যবহারের প্রক্রিয়া যেমন সহজ করেছে, একইভাবে সম্পাদনার পদ্ধতিও যান্ত্রিকভাবে বদলে দিয়েছে। এর ফলে কম সময় এবং অনেক ক্ষেত্রে কম অর্থও ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু নান্দনিকতার ক্ষেত্রে উৎকর্ষ উল্লেখযোগ্য হয়েছে কি না, এ বিষয়টি বিতর্কিত। সিনেমার ভাষায় যে প্রধান অংশ, ভিস্যুয়াল ইমেজ, নতুন প্রযুক্তি যদি সেখানে এমনভাবে হস্তক্ষেপ না করে যাতে তার প্রকাশময়তা ক্ষুণ্ণ হয়, তাহলে আগের মতোই (নির্বাক বনাম সবাক চলচ্চিত্র) নতুন প্রযুক্তি সিনেমার নান্দনিক উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। অবশ্য এটা নির্ভর করবে যে বা যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তাদের বুদ্ধি, বিবেচনা ও সৃজনশীলতার ওপর।

Leave a Reply

*