logo

চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা : সম্পাদনার ভাষা

হাসনাত আবদুল হাই

আমেরিকায় সিনেমার জন্য তোলা শটগুলিকে যুক্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয়েছে সম্পাদনা (এডিটিং) বা কাটছাঁট (কাটিং) করা। ইউরোপে এর নামকরণ হয়েছে ‘মন্তাজ’। আমেরিকায় ‘এডিটিং’ শটের মধ্যে যেসব কাহিনি বর্ণনায় (ন্যারেটিভে) অপ্রয়োজনীয় সেসব বাদ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। সম্পাদনায় কাঁচামালকে (ফিল্ম ফুটেজ) বাছাই করে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়। ‘মন্তাজ’ বলতে বুঝিয়েছে কাঁচামাল নিয়ে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। হলিউডের ক্লাসিক এডিটিং স্টাইলের বৈশিষ্ট্য ছিল মসৃণতা, প্রবহমানতা (ফ্লুয়িডিটি) আর সংক্ষিপ্ততা। ইউরোপে জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট আন্দোলন আর রাশিয়ায় আইজেনস্টাইনের পর থেকে মন্তাজে সংমিশ্রণের (সিনথেসিস) ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যার ফলে শট কেটেছেঁটে নয়, শটগুলি যোগ করে সিনেমা তৈরি হয়। দুটি শব্দ প্রায় একই মনে হলেও তাদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে।

‘মিজ আঁ সিঁ’ (স্থানিক সম্পর্ক) যদি হয় অনেক জটিলতার সংমিশ্রণ, ‘মন্তাজকে’ বলা যায় খুবই সহজ ও সরল প্রক্রিয়া, অন্তত বাহ্যত। মিজ আঁ সিঁর অংশই মন্তাজ অর্থাৎ এর সৃষ্টির জন্যই মন্তাজের ব্যবহার। দুই খন্ড ফিল্মকে যুক্ত করার দুটিই উপায় আছে : একটির ওপর অন্যটি স্থাপন করা (ওভারল্যাপ), যে প্রক্রিয়াকে বলা যায় ডাবল এক্সপোজার, ডিসলভ, মাল্টিপল ইমেজেস। অথবা ফিল্ম দুটিকে পরপর রেখে সাজানো। ইমেজের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদ্ধতি বেশ সুবিধাজনক এবং সেই জন্য বেশ সাধারণ। কিন্তু শব্দের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদ্ধতিই উপযোগী। এর নামকরণ হয়েছে ‘মিক্সেজ’।

হিচকক বলেন যে, সিনেমায় অবশ্যই সম্পাদনার প্রয়োজন। যে সব শট নেওয়া হয়েছে সেগুলি একত্রিত করে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন বর্ণিত কাহিনির ঘটনাগুলি যুক্তিসংগতভাবে এবং অর্থপূর্ণভাবে অগ্রসর হয়; তিনি এর ওপর জোর দেন। শটগুলি নির্বাচন ও সাজানোর জন্য এডিটিংয়ে নিচের নির্দেশকগুলি অনুসরণ করা হয়ে থাকে – (ক) ন্যারেটিভে তাদের স্থান বা ভূমিকা, (খ) একটি দৃশ্যে যে আবহ (মুড) সেখানে তার অবদান, (গ) সম্পূর্ণ ছবিতে তার অবদান, (ঘ) সিনেমার গতি বা ছন্দ প্রসারিত করার শর্ত পূরণ, (ঙ) সিনেমার নিগূঢ় অর্থ ব্যাখ্যায় শটের ভূমিকা, (চ) চিত্র-নির্মাতা যে উদ্দেশ্য নিয়ে সিনেমা তৈরি করছেন, সেই উদ্দেশ্য পূরণে এডিটিংয়ের কার্যকারিতা।

ন্যারেটিভধর্মী ফিল্মে সবচেয়ে সাধারণ এডিটিং হলো ধারানুক্রমিক (কনটিনিউটি) সম্পাদনা। এখানে শটগুলি এমনভাবে একত্রিত করা হয় যেন তারা একের পর এক মসৃণ গতিতে কোনো হোঁচট না খেয়েই এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু শট নেওয়ার সময় হয় এর উল্টোটা অর্থাৎ বিক্ষিপ্তভাবে পরম্পরা ছাড়াই সেসব নেওয়া হয়ে থাকে বা হতে পারে। যদিও সিনেমার শট সিকোয়েন্স অনুযায়ীই নেওয়া হয় (সাউন্ড স্টেজ ফিল্মিংয়ের আগে লোকেশন শুটিং অথবা অভিনেতা-অভিনেত্রীর সুবিধা ও সময় অনুযায়ী শট নেওয়া), দর্শকদের পক্ষে কোন দৃশ্য আগে, আর কোনটা পরে নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে কৌতূহল দেখানো বা প্রশ্ন করার কিছু থাকে না। ধারানুক্রমিক সম্পাদনা (কনটিনিউয়াস এডিটিং) একটি চলমান ন্যারেটিভের মায়া সৃষ্টি করে। মন্তাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ধারানুক্রমিক সম্পাদনার তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় ও উন্নত পর্যায়ের মনে করা হলেও একে কেবল সিকোয়েন্স অনুযায়ী একের পর এক শট সাজিয়ে যাওয়া বলে মনে করা ভুল হবে। ধারানুক্রমিক সম্পাদনা (কনটিনিউয়াস এডিটিং) আরো অন্যান্য নীতিমালা বা বিবেচনার ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে, যার ফলে ফিল্মের ছন্দ বা গতি (রিদম), সময়ের যাত্রা, স্থানের অনুভব (স্পেস), গভীরতা (টোন) এবং বিষয় (থিম) প্রভাবান্বিত হয়। সম্পাদনার ভাষা নিয়ে আলোচনায় কারিগরি ভাষার কিছু উল্লেখ থাকবে, যা পুনরুক্তি বলে মনে হতে পারে। বিষয় দুটিতে (সম্পাদনা ও সিনেম্যাটোগ্রাফি) মাঝে মাঝে ওভারল্যাপ থাকায় এই পুনরাবৃত্তি আবশ্যিক।

 

ছন্দ (রিদম) বা স্পন্দন (বিট)

কোনো সিনেমাই ছন্দ বা গতির দিক দিয়ে আগাগোড়া সমানভাবে অগ্রসর হয় না। কোনো শট স্ক্রিনে অন্য শটের তুলনায় বেশিক্ষণ থাকে। কোনো সিকোয়েন্স অন্য সিকোয়েন্সের তুলনায় দ্রুত অগ্রসর হয়। একটি শট মনে হতে পারে অন্যটির তুলনায় অতিমাত্রায় ধীরগতিসম্পন্ন। দক্ষ চিত্র-নির্মাতা জানেন যে দীর্ঘ ফিল্ম স্ট্রিপে শট এবং সিকোয়েন্সের গতি, মুভমেন্ট এবং লয় ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করা যায়।  দক্ষ চিত্র-নির্মাতা আরো জানেন যে ফিল্মের দীর্ঘ খন্ডে গতি ধীর হয়ে আসে আর ছোট খন্ড দ্রুত গতি সৃষ্টি করে এবং এই জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি শট ও সিকোয়েন্সের গতি ও মুভমেন্ট ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করেন। এখানে প্রক্রিয়া (প্রসেস) গুরুত্বপূর্ণ নয়, ফলাফল (ইফেক্ট) গুরুত্বপূর্ণ। সিটিজেন কেইনের প্রথম দুটি সিকোয়েন্সে (‘দি ডেথ অফ কেইন’ এবং ‘নিউজ অন দি মার্চ’) ইফেক্টের জন্যই গতির হেরফের করা হয়েছে। নিচে এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ও বিশে�ষণ দেওয়া হলো।

সিটিজেন কেইন সিনেমার শুরুতেই ক্যামেরা ওপর থেকে ‘যানাডু’ ভবনের গেটের ওপর নামতে দেখা যায়, যেখানে ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা আছে। যেন সেটা অমান্য করেই ক্যামেরা ভেতরে প্রবেশ করেছে। এরপর কয়েকটি স্বপ্নের দৃশ্যের মতো ডিসলভের পর একটি জানালা দেখা যায়, যা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়। পড়তে থাকা বরফের ভেতর একটি কণ্ঠস্বরে শোনা যায় ‘রোজ বাড’ কথাটি। প্রায় একইসঙ্গে ভেতরে বরফে ঢাকা বাড়ির মডেল বিশিষ্ট একটি পেপারওয়েট প্রায় শব্দহীনভাবে ভেঙে যায়। একজন নার্স ঘরে ঢুকে মৃত ব্যক্তির হাত তার বুকের ওপর বিন্যস্ত করে। ‘ডেথ অফ কেইন’, এই সিকোয়েন্সে যে মুড সেটি বেশ ধীরগতিতে এবং প্রায় আলস্যের সঙ্গে তৈরি হয়েছে। ক্যামেরা যখন জানালার দিকে যেতে থাকে তখনই গতি দ্রুত হয়। তখন বরফ শব্দ করে পড়তে থাকে, যার ভেতর কেইনের কৈশোরে কলোরাডোতে স্ফটিকস্বচ্ছ বরফ পড়ার সংগীত শোনা যায়। পেপারওয়েটটি যখন নিঃশব্দে ভেঙে যায় আর নার্স ঘরে ঢোকে, সেই সময় গতি ধীর হয়ে আসে এবং ভাবগম্ভীর আবহ সৃষ্টি  হয়, যার ভেতর সে মৃত ব্যক্তির (কেইনের) হাত দুটি বুকের ওপর জড়ো করে রাখে।

এর পরের সিকোয়েন্সে কোনো নোটিশ বা জানান না দিয়েই একটি কণ্ঠস্বর শোনা যায় : ‘নিউজ অন দি মার্চ’ আর তারপর নিউজ রিলে কেইনের জীবন-বৃত্তান্ত দেখা ও শোনা যায়। এই দ্বিতীয় সিকোয়েন্সের গতি প্রবল, কেননা কেইনের জীবনের পঞ্চাশ বছর এখানে কয়েক মিনিটে বর্ণিত হয়েছে। এই গতি ক্রমাগত বাড়তে থাকে যে পর্যন্ত না ‘নিউজ অন দি মার্চ’ সিকোয়েন্স শেষ হয় এবং প্রজেক্টর বন্ধ হওয়ার যান্ত্রিক শব্দ শোনা যায়।

 সময়

 

সমান্তরাল কাটছাঁট (প্যারালাল কাটিং) দ্বারা একইসঙ্গে সংঘটিত দুটি ঘটনা (অ্যাকশন) স্ক্রিনে দেখানো সম্ভব হয়, যার ফলে একটি ঘটনা শেষ হতে না হতে অন্যটি শুরু হয়ে যায়। চিত্র-নির্মাতা এখানে আগে আর পেছনে (সময়ের নিরিখে) গিয়ে ঘটনা দুটির শট কেটে নেন। একজন ঔপন্যাসিক কদাচিৎ একইসঙ্গে ঘটতে থাকা দুটি ঘটনার বর্ণনায় প্রথমে একটির সমাপ্তি টেনে দ্বিতীয়টি বলতে থাকবেন। তিনি প্রথমটি একটি পর্যায়ে এনে পাঠকের কৌতূহল সৃষ্টি করে দ্বিতীয় ঘটনার বর্ণনা করবেন – এটাই নিয়ম। এইভাবে তিনি দুটি ঘটনাকেই পাশাপাশি রেখে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং অন্তিমে হয় ঘটনা দুটি পৃথকভাবে শেষ হবে অথবা এক জায়গায় মিলিত হয়ে একই সমাপ্তি লাভ করবে। ডি ডাব্লু গ্রিফিথ এই পদ্ধতি বেশ রপ্ত করেছিলেন এবং প্যারালাল কাটিংয়ের সাহায্যে যুগপৎ ঘটতে থাকা দুটি ঘটনাকে (বা একাধিক) একইসঙ্গে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের পার্থক্য বুঝতে পারা যায়। আইজেনস্টাইনের মতে, গ্রিফিথ এই ক্ষেত্রে ডিকেন্সের উপন্যাস দ্বারা বেশ প্রভাবান্বিত ও উপকৃত হন। ডিকেন্স তাঁর একাধিক উপন্যাসে প্যারালাল কাটের মতো বর্ণনায় সাহায্য নিয়ে দুটি ঘটনাকে সময়ের গতির সঙ্গে তাল রেখে প্রায় যুগপৎ বর্ণনা করেছেন। গ্রিফিথ তাঁর লোনলি ভিলা (১৯৩৯) সিনেমায় এক দৃশ্যে একটি বাড়িতে দরজা ভেঙে চোর ঢুকে মা ও মেয়েকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে আর অন্য দৃশ্যে গৃহস্বামী তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসছে, এই দুটি যুগপৎ ঘটনার বর্ণনায় প্যারালাল কাটের সাহায্য নিয়েছেন। এখানে সময় একই থাকছে, কিন্তু তার ভেতর ঘটে যাওয়া একই যোগসূত্রে বাধা কিন্তু ভিন্ন ঘটনা দুটির বর্ণনা এগিয়ে যাচ্ছে। সময় এখানে ঘটনার সঙ্গে গতিশীল।

নির্বাক চলচ্চিত্রে সময়ের অতিক্রমণ সম্বন্ধে ধারণা ‘কাটিং’য়ের গতি (রেট) দিয়ে বোঝানো হতো। নাটকীয়তার হেরফের নিয়ন্ত্রণ ও তা বোঝানোর জন্য গ্রিফিথ ছবির অন্তর্গত গতি বদলে নিয়েছেন। তাঁর সিনেমায় ক্লাইম্যাক্স প্রায় ক্ষেত্রেই দ্রুতগতিসম্পন্ন ক্রস-কাট সিকোয়েন্সে দেখানো হয়েছে, যেমন গাড়ির পেছনে ধাওয়া করা। আইজেনস্টাইন সিনেমায় সময় সম্বন্ধে একটি বিশদ তত্ত্ব তৈরি করেন, যা পটেমকিন সিনেমায় ওডেসা স্টেপস সিকোয়েন্সে গতি ও ছন্দের দ্রুত পরিবর্তনে দেখা যায়। তত্ত্ব যাই থাক, শটের জন্য যে সময়, সেটি নির্ধারিত হয়েছে ভিস্যুয়াল দৃশ্যের ভিত্তিতেই। সবাক চলচ্চিত্রে এর প্রয়োজন থাকেনি। সবাক চলচ্চিত্র শুরু হওয়ার পর সাউন্ড ট্র্যাকের সঙ্গে ছবিকে সংযুক্ত করার সময়কাল নির্ধারণ করে পরিচালক অনেক ধরনের ইফেক্ট তৈরি করার সুযোগ পেলেন। এইসব ইফেক্ট কেবল ইমেজ কিংবা শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংলাপের সাহায্যে পরিচালক অনেক ইফেক্ট দেখাতে পারেন। সংলাপের ফলে বক্তার মুখে যে প্রতিক্রিয়া হয়, সেখানে (শটে) যাওয়া সম্ভব হয়। সবাক চলচ্চিত্রে শব্দ ও ছবি সমান্তরালভাবে অথবা একে অন্যের বিপরীতে দেখানো ও শোনানো যেতে পারে। সময়সংক্রান্ত এইসব ডিটেইলস সম্পাদক এবং সাউন্ড এডিটরের জন্যই রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পরিচালকও জড়িত থাকেন।

স্থান (স্পেস)

সিনেমা স্থান (স্পেস) সম্বন্ধে দর্শকের ধারণা বদলাতে সক্ষম। একজন চিত্র-নির্মাতা একটি দৃশ্যে নদীতীরে একজন মানুষের হত্যাকান্ড দেখাতে পারেন এবং এর পরই অন্য দৃশ্যে ঘরের ভেতর ভীতসন্ত্রস্ত একটি চরিত্রকে দেখানো যেতে পারে। এ থেকে দর্শক বুঝতে পারবে যে এই চরিত্রটি নদীতীরের হত্যাকান্ডটি দেখার পরই ঘরে এসেছে, যার জন্য সে এমন ভীতসন্ত্রস্ত।

গ্রিফিথের ইনটলারেন্স সিনেমায় চারটি প্লট রয়েছে, যার বিষয় অবিচার ও অন্যায়। কিন্তু চারটি পৃথক সময়ে এবং স্থানে এই ঘটনাগুলি দেখানো হয়েছে। প্রথমটি সময়কাল বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ, দ্বিতীয়টি খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে সাইরাস দি গ্রেটের সময়ে ইরানে, তৃতীয়টি যিশু খ্রিষ্টের সময় জুডিয়ায় এবং চতুর্থটি ফরাসিদেশে হিউগনটদের সময়ে সেন্ট বার্থলোমিউজ ডে ম্যাসাকারের সময়। যদিও সিনেমায় পৃথিবীর চারটি বিভিন্ন স্থানে চারটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, প্রতিটি ঘটনার অন্তিমেই মনে হয় যেন একই স্থানে সব ঘটছে। প্যারালাল কাটের সাহায্যে গ্রিফিথ যিশুর ক্রুশ কাঁধে ক্যালভ্যারি যাত্রার দৃশ্য, সাইরাসকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য পাহাড়ি মেয়েটির যাত্রা, একজন মানুষের মৃত্যু রোধের জন্য একটি গাড়িকে ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গিয়ে ধরতে যাওয়ার দৃশ্য এবং হিউগনট প্রসপারকে প্যারিসের রাস্তা দিয়ে দৌড়ে গিয়ে তার প্রেয়সী কর্তৃক বাঁচানোর চেষ্টা, এই সবই মনে হয় কেবল একই সময়ে ঘটছে না, একই স্থানে হচ্ছে। এই ইফেক্ট তিনি সৃষ্টি করেছেন প্যারালাল কাটিংয়ের সাহায্যে, একবার এক দৃশ্যের শট দেখিয়ে আবার অন্য দৃশ্যের শট সামনে এনে। প্যারালাল কাটিং এখানে দর্শকের স্থান ও কালের জ্ঞানকে প্রভাবান্বিত করেছে। সিনেমার যে বিষয় তার জন্যও এই পদ্ধতি বেশ উপযোগী, কেননা গ্রিফিথ দেখাতে চেয়েছেন সর্বকালে এবং সর্বস্থানে অসহিষ্ণুতার উপস্থিতি।

 গভীরতা (টোন)

 

গতি যেমন ফিল্মের ভেতর বিভিন্ন দৃশ্যে বদলাতে পারে, দৃশ্যের গভীরতার ব্যঞ্জনাও সেইভাবে পরিবর্তিত হয়। নান্দনিকতার বিচারেও এর প্রয়োজন রয়েছে। আলো, ছায়া এবং রঙের মাধ্যমেই দৃশ্যের এই গভীরতাবোধ সৃষ্টি হয়। উদাহরণের জন্য আবার সিটিজেন কেইনের উলে�খ করা যায়।  ‘দি ডেথ অফ কেইন’ সিকোয়েন্সে দৃশ্যের গভীরতা সূচিত হয়েছে অন্ধকার এবং রহস্যময়তার আবহ দিয়ে। দ্বিতীয় সিকোয়েন্স ‘নিউজ অন দি মার্চে’ হয়েছে এর উল্টো অর্থাৎ এখানে গভীরতা নেই। নিউজ রিলের যে অমসৃণতা আর সাদামাটা ভাব, তার উপস্থিতি রয়েছে এখানে।

 বিষয়

 

একজন চিত্র-নির্মাতা দুটি বিপরীতধর্মী শটকে পাশাপাশি রেখে বিষয়কে গভীরতা দিতে ও তাৎপর্যময় করে তুলতে পারেন। ‘স্লেভ’ সিনেমায় একটি কাট আছে, যেখানে তাদের শৃঙ্খলিত পায়ের দৃশ্য থেকে দৌড়ে যাওয়া ঘোড়ার খুরের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। ঘোড়াগুলি দাসদের মতো একই স্থানে রয়েছে কি না সেই প্রশ্ন অবান্তর। এই কাটের উদ্দেশ্য শৃঙ্খলিত দাসদের সঙ্গে স্বাধীন ও উদ্দাম ঘোড়াগুলির মধ্যে তুলনা করা।

এডিটিংয়ে কাটের সাহায্যে এমন অনেক ব্যাখ্যা, দ্যোতনা আর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করা যায়, যা শটের বা সিকোয়েন্সের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে উপস্থিত নেই।

মন্তাজ

সম্পাদনার ভাষায় ‘মন্তাজ’ বেশ প্রাধান্য পাবে এবং এর জন্য আলোচনা বিশদ হবে। মন্তাজ আর এডিটিংকে প্রায়ই সমার্থক মনে করা হয় এবং বলা হয়ে থাকে যে প্রথমটির উৎপত্তি ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্সে আর দ্বিতীয়টি আমেরিকায় হলিউডে। কিন্তু এই দুটি কথার ভিন্ন অর্থ ও গভীরতর তাৎপর্য ছিল বিখ্যাত রাশিয়ান পরিচালক সার্জেই আইজেনস্টাইনের কাছে। তাঁর মতে, শট শুধুমাত্র একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য নয়, তাদের সম্পর্ক পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষেরও। শটের এই সংঘর্ষ (কলিশন) দ্বারা দর্শকদের প্রভাবান্বিত করতে হবে, এই ছিল তাঁর মত। সুতরাং ‘মন্তাজ’ নিজ গুণেই এবং অধিকারে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে। কনটিনিউটি এডিটিং, যা হলিউডের হলমার্ক বা মূল বৈশিষ্ট্য, সেখানে শটের সঙ্গে শটের সম্পর্ক প্রায় অদৃশ্যই থাকে এবং থাকা সমীচীন বলে মনে করা হয়। ‘মন্তাজ’ অনুযায়ী যদি একজন লোক ময়ূরের মতো অঙ্গভঙ্গি করে, তাহলে কাট করে লোকটির ইমেজ থেকে ময়ূরকে দেখাতে হবে। যদি একটি দৃশ্যের উদ্দেশ্য হয় মানুষকে জীবজন্তুর মতো হত্যা করা হচ্ছে এটা দেখানো, তাহলে এই হত্যার দৃশ্যের পরপরই পশু জবাই করার দৃশ্যের শটে আসতে হবে। যদি কোনো চিত্র-নির্মাতা দেখাতে চান যে ঈশ্বরের নামে পরিচালিত সব যুদ্ধই অনৈতিক, তাহলে তিনি যদি যিশু খ্রিষ্টের প্রতিকৃতির শট দেখিয়ে একজন ডিক্টেটরের ছবি দেখান তখন এর মাধ্যমে মানুষের অধোগমন ও অনৈতিকতাকে প্রতিফলিত করা যাবে। আইজেনস্টাইন শটের ভেতর বৈপরীত্য ও সংঘটনের সম্পর্ক দেখানোর জন্য মন্তাজের ব্যবহার করতে চেয়েছেন।

আইজেনস্টাইন যে সংঘর্ষ ও বৈপরীত্য দেখাতে চেয়েছেন সেটি সামগ্রিকভাবে সিনেমার ভেতরই থাকতে পারে অথবা একটি শটের ভেতরও হতে পারে। পটেমকিন সিনেমায় ওডেসা স্টেপসে হত্যাকান্ডের দৃশ্যে একটি মৃতদেহ কোনাকুনি সিঁড়ির ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায়। কসাক সৈন্যদের ছায়া ভীতিকরভাবে সিঁড়ির ওপর তির্যকভাবে এসে পড়েছে। এইভাবে সিঁড়িতে তিনটি বিপরীত সমতলের (প্লেইন) সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে ওপর থেকে কসাক সৈন্যরা নিচের সিঁড়িতে একটি মহিলার প্রতি গুলি ছুড়ছে। পেছনে সারি সারি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এখানে বৈপরীত্য ও সংঘর্ষ সূচিত হয়েছে। আইজেনস্টাইন আবিষ্কার করেছিলেন কীভাবে ইমেজের বৈপরীত্য ও সংঘর্ষ থেকে ধারণা বা আইডিয়ার জন্ম হতে পারে। তিনি কার্যকারণ দেখানোর জন্য অনেক শট না দেখিয়েই পটেমকিন সিনেমার শুরু করেন আছড়ে পড়া ঢেউয়ের দৃশ্য দিয়ে। এই ইমেজের পরপরই তিনি জাহাজের ভেতর হ্যামকে শুয়ে থাকা নাবিকদের দেখিয়েছেন। হ্যামকগুলি আচ্ছাদনের মতো জড়াজড়ি করে আছে, খাবার টেবিলগুলি আলোড়নে এদিক-সেদিক যাচ্ছে, পোকাভর্তি মাংস গড়িয়ে পড়ছে, এই প্রতিটি শটই দর্শককে ধাক্কা দেয়, অস্থির করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত নাবিকদের বিদ্রোহের জন্য মানসিকভাবে প্রস্ত্ততি নিতে সাহায্য করে।

আইজেনস্টাইনের কাছে ‘মন্তাজ’ মানেই দুই শটের ইমেজের ভেতর সংঘর্ষের বর্ণনা। ইউরোপে ‘মন্তাজ’ বলতে বোঝানো হয়েছে সম্পাদনা : নির্বাচন ও শটগুলি এমনভাবে সম্পাদনা করা যেন তার ভিত্তিতে সিনেমার সিন ও সিকোয়েন্স সৃষ্টি হয়। ইংল্যান্ডে একই প্রক্রিয়াকে বলা হয়েছে এডিটিং (সম্পাদনা) বা কাটিং (কাটছাঁট) করা। কিন্তু এখানে একটু পার্থক্যও ছিল এবং তা হলো কাটিং রুমে ধাপে ধাপে (স্টেপ বাই স্টেপ) শটগুলি মেলানো (এসেম্বলি)। এখানে মন্তাজ ছিল সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে বোঝানো। বিভিন্নভাবে ‘মন্তাজ’ ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আর একটি জটিলতা হলো গত শতাব্দীর তিরিশ ও চল্লিশের দশকে হলিউডে ‘আমেরিকান মন্তাজ’ নামে পদ্ধতির ব্যবহার। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, আমেরিকান মন্তাজের উদ্দেশ্য ছিল সময়কে সংক্ষিপ্ত করে দেখানো। আমেরিকান মন্তাজ দৃশ্যের একটি বহুল পরিচিত দৃষ্টান্ত হবে স্ক্রিনে সংবাদপত্রের পাতা দ্রুত উল্টে যাওয়া, যার ভেতর একটি হত্যাকান্ডের খবর শেষে কোর্টে তার বিচারের কথা বলা হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় হেডলাইন বদলাতে থাকবে। বিচারকের মুখ ডিসলভ হয়ে আসামির মুখে পরিণত হবে। এইভাবে বিচার চলাকালীন দৃশ্যে একটি শট অন্য একটি দ্বারা ‘ওয়াইপ’ বা মুছে ফেলা হবে। অভিযুক্তের মুখের ওপরে চাপানো হবে তার স্ত্রীর উদ্বিগ্ন মুখ এবং তার মুখের ওপর এসে পড়বে প্রকৃত আসামির মুখ যে কোর্টের বাইরে কোথাও লুকিয়ে রয়েছে। এই ধরনের আমেরিকান মন্তাজের উদ্দেশ্য ছিল কয়েকটি ওয়াইপ, ডিসলভ এবং ওপরে চাপানো শটের সাহায্যে সময়কে সংক্ষিপ্ত করে আনা। এই পদ্ধতি এখন আর প্রচলিত নয়। প্রথমদিকে এই পদ্ধতি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, ক্রেডিটে মন্তাজ এডিটরের নাম উল্লেখ করা হতো। মি. স্মিথ গোজ টু ওয়াশিংটন সিনেমায় এমন উল্লেখ আছে।

সাধারণভাবে ‘মন্তাজ’কে তিনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রথমটি হলো এর হলিউডি ব্যাখ্যা ও ব্যবহার। দ্বিতীয়টিতে দুটি পরস্পরসংলগ্ন শটের ভিত্তিতে অর্থের ঊর্ধ্বে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় তৃতীয় একটি অর্থের উন্মোচন, যার প্রধান প্রবক্তা আইজেনস্টাইন। তৃতীয়ত, এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে সংক্ষিপ্ত সময়ের ভেতর অনেক তথ্যাবলি পরিবেশ সম্ভব করার উদ্দেশ্যে কয়েকটি ছোট শটকে যুক্ত করা হয়। শেষের ব্যাখ্যাই মন্তাজের সাধারণ সংজ্ঞা বলে ধরা হয়েছে। সচেতনভাবে অথবা সচেতনতা ছাড়াই দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া যে-কোনো মন্তাজেই উপস্থিত, যার জন্য এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব নেই বলে মনে করেছেন অনেকে।

হলিউডের নিজস্ব যে এডিটিং পদ্ধতি গড়ে ওঠে সেখানে সময়ের পরিক্রমায় বিশদ নিয়ম এবং নির্দেশিকা নির্ধারিত হয়। যেমন, সূচনাকারী (ইস্টাবলিশিং) শট দিয়ে সিনেমা শুরু করে বৃহৎ অথবা সাধারণীকরণ থেকে সংকীর্ণ পরিসরে উত্তরণ। অথবা সংলাপের দৃশ্যে মাস্টার শট এবং রিভার্স অ্যাঙ্গেলের ব্যবহার সম্পর্কিত ধরাবাঁধা নিয়ম। হলিউডের সম্পাদনার ব্যাকরণে নিয়মকানুন অনুসরণের উদ্দেশ্য ছিল শট থেকে মসৃণভাবে যাত্রা এবং যে ঘটনা ঘটছে তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা। যে ধরনের সম্পাদনায় তাৎক্ষণিকতার অনুভব এবং ঘটনার প্রবাহ নিশ্চিত হতো, তাই ছিল সন্তোষজনক। এর বিপরীত হলেই তা পরিত্যাজ্য।

প্রকৃতপক্ষে যে-কোনো ধরনের মন্তাজই যে ঘটনা চিত্রায়িত হয় তার দ্বারাই সংজ্ঞায়িত বা পরিচিত হয়ে থাকে। স্থিরচিত্র পাশাপাশি রাখা যায় কেবল পরবর্তী শটের গতির কথা মনে রেখে। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ঘটনার (ডায়াক্রনিক) শট নেওয়া হলে সম্পাদনার সময় তাদের অন্তর্গত মুভমেন্ট বিবেচনায় আনতে হয়। হলিউডের ক্লাসিক এডিটিং পদ্ধতি এবং সাম্প্রতিককালের এডিটিং কীভাবে একটি সমস্যার সমাধান করে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ জাম্প-কাট।

হলিউডি সিনেমায় ‘অদৃশ্য কাটিং’ (ইনভিজিবল) ছিল সাধারণ আর জাম্প-কাট কেবল অতিবাহিত সময়কে সংক্ষিপ্ত করার জন্য ব্যবহার করা হতো। একটি লোক ঘরে ঢুকে আরেক প্রান্তে টেবিলে গিয়ে বসবে। জাম্প-কাট মেঝে দিয়ে লোকটির হেঁটে যাওয়া না দেখিয়েও গতি বোঝাতে পারে, কিন্তু এটি বেশ প্রচ্ছন্নভাবেই করতে হবে। হলিউডে কাটিংয়ের যে নিয়ম সেই অনুযায়ী লোকটির হেঁটে যাওয়ার অতিরিক্ত সময়টি মসৃণভাবে অতিক্রম করতে হবে, যার জন্য একই দৃশ্যের ভেতর অন্য বস্ত্ততে পৌঁছানো যেতে পারে (যেমন, টেবিলের দৃশ্য) অথবা ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল বদলাতে হবে যথেষ্টভাবে, যাতে মনে হয় দ্বিতীয় শটটি (টেবিলের) ক্যামেরার অন্য অবস্থান থেকে নেওয়া হয়েছে। একটি শট থেকে বিশেষ অ্যাঙ্গেলে নেওয়া অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেললে হবে না। এতে করে হোঁচট খাওয়ার মতো অবস্থা হতে পারে।

হলিউডি এডিটিংয়ে কাটিং পদ্ধতির পর ইউরোপে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে সেখানে বেশ স্বাধীনতা রয়েছে। ব্রেথলেস (১৯৫৯) সিনেমায় গদা সিনেমার মাঝখানে জাম্প-কাট করে সিনেমা-সমালোচক ও নন্দনতাত্ত্বিকদের বেশ চমকে দিয়েছিলেন। এইসব জাম্প-কাটের কোনো প্রয়োজনীয় ভূমিকা ছিল না এবং সেই জন্য বেশ গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেছে। গদা নিজেই পরবর্তীকালে এ ধরনের কাট আর ব্যবহার করেননি। কিন্তু ব্যাকরণবহির্ভূত তার এই এডিটিং পদ্ধতি সাধারণভাবে মন্তাজশৈলীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ছন্দময় (রিদমিক) প্রতিক্রিয়া (ইফেক্ট) সৃষ্টির জন্য জাম্প-কাট ব্যবহার করা হয়। এমনকি প্রয়োজনের জন্য (ইউটিলিট্যারিয়ান) যে সরল জাম্প-কাট, সেসবও শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট নিয়মের ভেতর আনা হয়েছে। কয়েকটি দ্রুত ডিসলভের সাহায্যে এইসব জাম্প-কাটকে মসৃণ ও স্বতঃস্ফূর্ত করা যায়।

এখানে আবারো স্মরণ করা প্রয়োজন যে, যখন শটগুলি সম্পাদনা করা হয় সেই সময় দুটি প্রক্রিয়া জড়িত। প্রথমটিতে দুটি শটকে যুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে কোনো বিশেষ শটের আগের ও পরের শটের এবং যে অ্যাকশনের সঙ্গে সম্পর্কিত, তার প্রেক্ষিতে দৈর্ঘ্য নিরূপণও গুরুত্বপূর্ণ। সনাতনি হলিউডি এডিটিংয়ের (তিরিশ ও চল্লিশের দশকে) নীতিমালা বা সূত্র অনুযায়ী শট এমনভাবে ‘কাট’ করতে হবে যেন শটের কেন্দ্রীয় ঘটনার ওপর বিরূপ প্রভাব না পড়ে। যেমন, কোনো শটের অ্যাকশন জামিতির রেখার সাহায্যে দেখানো হলে এই রেখা প্রথমে ওপরে উঠে পরে নিচে নামতে থাকবে। হলিউডি কাটিং পদ্ধতি অনুযায়ী রেখাটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরপরই যেন কাট করা হয়, তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাইকেলঅ্যাঞ্জেলো এন্টোনিওনির মতো পরিচালকরা এই নিয়ম না মেনে রেখা নিচে অবতরণ শুরু করার পরও (অর্থাৎ অ্যাকশন ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছার পরও) শটটি অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর দি প্যাসেঞ্জার সিনেমার শেষ শটটি এর উদাহরণ।

সম্পাদনার ছন্দময় মূল্য বা ভূমিকা বেশ স্পষ্ট করে দেখা যায় দ্রুতায়িত (এক্সিলারেটেড) মন্তাজের নিয়ম-পদ্ধতিতে (কোড), যেখানে কোনো দৃশ্যের প্রতি আগ্রহ তীব্রতর করা যায় দুটি বিষয়ের (যেমন, গাড়ির পেছনে ছোটা) মধ্যে শটগুলিকে ক্রমাগতভাবে সংক্ষিপ্ত করে একের পর এক দেখানোর মাধ্যমে। ক্রিশ্চিয়ান মেৎজ ‘দ্রুতায়িত মন্তাজকে’ সিনেমার অনন্য কোড হিসেবে অভিহিত করেছেন। ‘দ্রুতায়িত মন্তাজ’ দ্বিতীয় ধরনের এডিটিংয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

মন্তাজ কেবল একটি দৃশ্যে শটের ভেতরকার সম্পর্ক ও ধারানুক্রম দেখাবার জন্য ব্যবহার করা হয় না। একটি সিনেমায় যে সময়কাল ধারণ করা হয়েছে সেটি পরিবর্তনের জন্যও এটি প্রাসঙ্গিক। দুটি ঘটনা বা কাহিনি যাদের ভেতর সম্পর্ক থাকতে পারে অথবা নাও থাকতে পারে, এমন দুটি ঘটনা বা কাহিনির ভেতর সমান্তরাল মন্তাজ (সমান্তরাল কাটিং) ক্রস-কাটিং করে পালাক্রমে যাতায়াতের সুযোগ দেয়। দ্রুতায়িত মন্তাজ সমান্তরাল মন্তাজেরই একটি বিশেষ রূপ। ফ্ল্যাশ ব্যাক এবং ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ডে ভবিষ্যদ্বাণী করতে এবং সাময়িকভাবে অমনোযোগী (ডাইগ্রেশন) হতে সাহায্য করে। জট পাকানো মন্তাজ (ইনভল্যুইটেড) সময়ের ধারানুক্রম অনুসরণ না করেই একটি সিকোয়েন্স বর্ণনায় সহায়তা করে। যেমন, এর সাহায্যে অ্যাকশনের পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে এবং সম্পাদনায় শটকে ক্রম (অর্ডার) থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। মন্তাজ কোডের এই প্রতিটি সম্প্রসারণই মন্তাজে সময়ের সহজ ধারানুক্রম সৃষ্টি ব্যতীত অন্য কিছুর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেয়, যা হলিউডের ক্লাসিক সম্পাদনা নীতিমালায় বা সূত্রের ওপর ভিত্তি করে ধারানুক্রমিক কাটিংয়ে খুব কম গুরুত্বই লাভ করেছে। মন্তাজের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো ‘ম্যাচ-কাট’, যার দ্বারা দুটি বিভিন্ন দৃশ্যের যোগাযোগ স্থাপন করার উদ্দেশ্যে একটি অ্যাকশন বা ফর্মের পুনরাবৃত্তি করা হয় অথবা মিজ অাঁ সিঁর উপকরণ পুনর্ব্যবহৃত হয়। কুব্রিকের ২০০১ : এ স্পেস ওডেসি সিনেমায় শূন্যে ঘূর্ণায়মান একটি প্রাগৈতিহাসিক হাড় এবং একবিংশ শতাব্দীর মহাশূন্য স্টেশন দেখানোর দৃশ্যে উপনীত হওয়ার জন্য যে ম্যাচ-কাট তাকেই বলা হয়েছে এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখানে প্রাগৈতিহাসিক কালের সঙ্গে ভবিষ্যতের মিলন ঘটানো হয়েছে নৃ-বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে। আবার, একইসঙ্গে ম্যাচ-কাটের ভেতরই হাড় এবং মহাশূন্যের ভূমিকার প্রতি (অস্ত্র বা যন্ত্র হিসেবে, মানুষের ক্ষমতার পরিচয় হিসেবে) একটি বিশেষ অর্থের দ্যোতনাও সৃষ্টি হয়েছে।

 মন্তাজের কোড

 

মন্তাজের কোডগুলি খুব সহজেই বা প্রথম দৃষ্টিতেই উপলব্ধি করা নাও যেতে পারে, যা সম্ভব মিজ অাঁ সিঁর ক্ষেত্রে। খুব কম সিনেমা-তাত্ত্বিকই সমান্তরাল মন্তাজ, ধারানুক্রমিক মন্তাজ, দ্রুতায়িত মন্তাজ, ফ্ল্যাশ ব্যাক এবং জট পাকানো মন্তাজের অতিরিক্ত কিছু বলেছেন। গত শতাব্দীর বিশ দশকে ভি আই পুডোভকিন এবং তাঁর ছাত্র সার্জেই আইজেনস্টাইন মন্তাজের প্রচলিত ধারণার বাইরে তাঁদের মতামত ও তত্ত্ব দিয়ে মন্তাজের তত্ত্বকে প্রসারিত করেন। পুডোভকিনের মতে পাঁচ ধরনের উদ্দেশ্যে মন্তাজের ব্যবহার করা যায় : (ক) বৈপরীত্য, (খ) সমান্তরালবর্তিতা, (গ) প্রতীকীকরণ, (ঘ) যুগপৎ অবস্থান এবং (ঙ) নিরন্তর উপস্থিতি (লেইটমোটিফ)। তিনি এরপর ‘সম্পর্কময় সম্পাদনা’ বা যোগাযোগের (লিংকেজ) উপযোগী শটের ভেতর আন্তঃসম্পর্ক ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যার জন্য একটি তত্ত্ব তৈরি করেন। অপরদিকে আইজেনস্টাইন শটের ভেতরকার সম্পর্ককে সংঘাতের রূপে দেখেছেন, মিলনের রূপে নয়। তিনি এই তত্ত্বকে আরো এগিয়ে নিয়ে পৃথক পৃথক শট এবং সামগ্রিকভাবে শটের ভেতরকার সম্পর্ক ব্যাখ্যার জনা তত্ত্ব তৈরি করেন। একেই তিনি বলেছেন ‘আকর্ষণীয় মন্তাজ’ (‘মন্তাজ অফ অ্যাট্রাকশনস’)

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে ক্রিশ্চিয়ান মেৎজ বিভিন্ন মন্তাজ থিওরির নির্যাস নিয়ে সমন্বিত বা সম্মিলিত ব্যাখ্যা (সিনথেসিস) করবার প্রয়াস পেয়েছেন। একটি চার্টের সাহায্যে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আট ধরনের মন্তাজ যুক্তির ভিত্তিতে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। যদিও মেৎজের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে মতদ্বৈততা থাকতে পারে, তাঁর বিশ্লেষণী পদ্ধতিতে মার্জিত রূপ রয়েছে এবং এর দ্বারা সব ধরনের মন্তাজই বর্ণনা করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, এর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মন্তাজের জটিল শ্রেণি ও পদ্ধতি উপলব্ধির জন্য এটাই এখন পর্যন্ত সার্বিক তত্ত্ব বলে স্বীকৃত।

মেৎজ বর্ণনার উপকরণের প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। এই উপকরণকে তিনি বলেছেন ‘সিনট্যাগমা’। এই ‘সিনট্যাগমা’ বা ন্যারেটিভের উপকরণ শটের ভেতর এবং তাদের মধ্যবর্তী স্থানেও থাকতে পারে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা, কেননা অনেক ধরনের মন্তাজের ফলাফল (ইফেক্ট) ‘কাট’ ছাড়াই একটি শটের ভেতর দেখানো যেতে পারে বা দেখা যায়। যেমন, ক্যামেরা যদি ‘প্যান’ করে একটি দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যায়, তখন দৃশ্য দুটি পরস্পরের সম্পর্কের ভিত্তিতে এমনভাবে থাকে যেন মনে হবে যে তাদেরকে ‘কাট’ করে মেলানো হয়েছে।

মেৎজ তাঁর আলোচনা শুরু করেছেন একটি সিনেমার স্বায়ত্তশাসিত (অটোনমাস) বা স্বয়ংসম্পূর্ণ অংশের ভেতর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে। এইগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ শট(স) হতে হবে এই অর্থে যে তাদের আগে বা পরে কি এসেছে বা আসবে, তার থেকে তারা স্বাধীন। অথবা তাদের হতে হবে এমন শট যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ অর্থময় সম্পর্ক আছে। শেষোক্তদের ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন ‘সিনট্যাগমাজ’। অন্যেরা এই সিনট্যাগমাজকে হয়তো ‘সিন’ বা সিকোয়েন্স বলতে পছন্দ করবেন কিন্তু মেৎজ ওই দুটি শব্দ সিনট্যাগমাজের বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করার কারণে ‘সিনট্যাগমাজই’ যথাযথ মনে করেছেন। দুই বিপরীত প্রান্ত (অর্থ) বিশিষ্ট (বাইনারি) এই পদ্ধতির প্রতি পর্বে আরো পৃথকীকরণ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে রয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সম্পর্কযুক্ত শটের ভেতর পার্থক্য, যা মন্তাজের শ্রেণিবিভাগের প্রধান ভিত্তি। এই শ্রেণিতে একটি শট তার পারিপার্শ্বিকের (পূর্ববর্তী বা পরবর্তী শটের) সঙ্গে হয় সম্পর্কিত অথবা সম্পর্কিত নয়। দ্বিতীয় পর্বে যে পার্থক্য তা হলো সেই সব সিনট্যাগমাজ শট বা সিকোয়েন্স যা সময়ের ক্রম অনুযায়ী বিন্যস্ত এবং বিন্যস্ত নয়, এই দুই শ্রেণি। এখানে সম্পাদনার দ্বারা একটি কাহিনির বর্ণনা অথবা ধারণার গঠন সময়ের ক্রম অনুযায়ী সম্ভব হয় অথবা হয় না। তৃতীয় পর্বে দুই ধরনের সম্পর্কভিত্তিক এই পৃথকীকরণ বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। মেৎজ দুই ধরনের সময়ের ধারানুক্রমহীন সিনট্যাগমা শনাক্ত করেন, যার একটি সমান্তরাল (প্যারালাল) এবং অন্যটি বন্ধনীর (ব্রাকেট) ভেতর থাকে। এরপর তিনি ধারানুক্রম অনুসারে সিনট্যাগমাকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করেন ও তাদের মধ্যে পৃথকীকরণ ঘটান। প্রথম শ্রেণিতে সিনট্যাগমা বর্ণনা (ডেসক্রাইব) করে অথবা কাহিনি কথন করে (ন্যারেটস)।

যদি কাহিনির কথন হয় তাহলে এটি সরলরৈখিক হতে পারে অথবা তার বিপরীতে থেকে অর্থাৎ সরলরৈখিক না হয়ে কথন করে যায়। যদি সিনট্যাগমা সিকোয়েন্সের প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে হয় এটি হবে অনুকাহিনিধর্মী (এপিসডিক), অথবা সাধারণ (অর্ডিনারি) সিকোয়েন্স।

মেৎজের শ্রেণিবিন্যাসে আট ধরনের মন্তাজ দেখা যায়, যাকে তিনি বলেছেন আটটি সিনট্যাগমাজ। স্বয়ংসম্পূর্ণ শটকে সিকোয়েন্স শটও বলা হয়েছে যদিও মেৎজ এখানে ছোট, বিচ্ছিন্ন অংশ ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। তিনি যাকে সমান্তরাল (প্যারালাল) সিনট্যাগমা বলেছেন সেটি অতি পরিচিত সমান্তরাল বা প্যারালাল এডিটিং। তৃতীয় শ্রেণিতে যে ‘বন্ধনী সিনট্যাগমা’ সেটি মেৎজের নিজস্ব উদ্ভাবন বা আবিষ্কার। সিনেমায় সময়ের ধারানুক্রম অনুসরণ করে সিনগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত না দেখিয়ে বাস্তবতার সাধারণ দৃষ্টান্ত হিসেবে ঘটনাসমূহ দেখাবার জন্য পরপর বেশ কয়েকটি ছোট ‘সিনের’ ব্যবহারকে তিনি এই অভিধা দিয়েছেন। একে বলা যেতে পারে এক ধরনের পরোক্ষে বর্ণনা (অ্যালিউড) করা। এর একটা উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত গদার এ ম্যারিড উওম্যানে (১৯৬৪) ব্যবহৃত ইমেজের সমষ্টি, যার সাহায্যে তিনি ছবিটি শুরু করেছেন। এই ইমেজগুলির মাধ্যমে যৌনতাকে আধুনিক দৃষ্টিতে বা ধারণার ভিত্তিতে যেভাবে দেখা হয়, তার প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। গদার তাঁর অনেক ছবিতেই ‘বন্ধনী সিনট্যাগমা’ ব্যবহার করেছেন বলে এটি তাঁর প্রিয় বলে মনে হয়। এর ফলে সিনেমাকে সাহিত্যিক প্রবন্ধের ভূমিকা দেওয়া যায় অথবা তাকে সেই রকম কার্যকর হতে দেওয়া সম্ভব হয়।

‘বর্ণনামূলক (ডেসক্রিপটিভ) সিনট্যাগমা’ কেবল বর্ণনাই করে। এখানে যেসব অংশ, তাদের মধ্যে সম্পর্ক কেবল স্থানিক, সময়ের কোনো ভূমিকা এখানে নেই। প্রায় যে-কোনো সূচনাকারী শট বা সিকোয়েন্সই বর্ণনাকারী সিনট্যাগমার উদাহরণ হতে পারে। হিচককের রিয়ার উইন্ডো সিনেমার ইস্টাবলিশিং শট সম্বন্ধে এই কথা বলা যায় এবং এটি ‘বর্ণনাকারী সিনট্যাগমার’ একটি দৃষ্টান্ত। ‘বিকল্প সিনট্যাগমাকে’ (যা মেৎজের পঞ্চম শ্রেণির মন্তাজ) বলা যায় ‘সমান্তরাল সিনট্যাগমা’, শুধু এই পার্থক্য ছাড়া যে, সমান্তরাল সিনট্যাগমায় দুটি সিন বা সিকোয়েন্স দেখানো যেতে পারে যাদের ভেতর কথনের ভঙ্গিভিত্তিক (ন্যারেশন) সম্পর্ক নেই। কিন্তু ‘বিকল্প (অলটারনেট) সিনট্যাগমার’ সমান্তরাল অথবা বিকল্প অংশের মধ্যে সম্পর্ক থাকে। শেষোক্ত ক্ষেত্রে ফলাফল হয় যুগপৎ ঘটনার কথন সৃষ্টিতে। যেমন, গাড়ির পেছনে তাড়া করার দৃশ্যে একবার যাকে অনুসরণ করা হচ্ছে তার এবং আর একবার যে অনুসরণ করছে, মন্তাজে তার শট দেখানো হয়।

যদি ঘটনা একইসঙ্গে না ঘটে তাহলে যেসব একটার পর একটা ঘটে এবং সরল রৈখিকভাবে হয়, তার জন্য অন্য সিনট্যাগমা রয়েছে। এখানে মেৎজের বাকি তিনটি সিনট্যাগমা বা মন্তাজের অবতারণা করা যায়। তার ষষ্ঠ শ্রেণিতে রয়েছে ‘সিন’, সপ্তম শ্রেণিতে ‘অনুঘটনাভিত্তিক’ ‘এপিসডিক সিকোয়েন্স’ এবং অষ্টম শ্রেণিতে ‘সাধারণ সিকোয়েন্স’। ‘সিন’ এবং ‘সিকোয়েন্স’ নিয়ে সিনেমার আলোচনায় সবসময়ই বেশ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্ষেত্রে মেৎজের শ্রেণিবিভাগ ও সংজ্ঞা বেশ স্পষ্ট ও কার্যকর। মেৎজ সিনেমার সংজ্ঞা নিয়েছেন থিয়েটার থেকে। ‘সিন’ ঘটনার পরম্পরা এবং এখানে কথন ভঙ্গির সরলরৈখিকতা সাধারণত নিরবচ্ছিন্ন। সিকোয়েন্সে ঘটনার এই পরম্পরা থাকে না, একে ভেঙে ভেঙে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু কথন ভঙ্গির সরলরৈখিকতা এখানেও থাকে এবং এখানে সময়ের ক্রমানুসারে কথন ভঙ্গি এমনভাবে অগ্রসর হয় যে, বিভিন্ন অংশের মধ্যে সম্পর্ক থাকে। কিন্তু এটি নিরবচ্ছিন্ন নয়। মেৎজ ‘এপিসডিক’ বা অনুঘটনাভিত্তিক ও সাধারণ সিকোয়েন্সের ভেতর যে পার্থক্য করেছেন, সেটি খেয়ালখুশিমাফিকই করা হয়েছে বলতে হয়। এই কারণে এটি খুব যুক্তিপূর্ণ নয়। ‘এপিসডিক সিকোয়েন্সে’ যে নিরবচ্ছিন্নতার অভাব, সেটি বেশ পরিকল্পিত, কিন্তু সাধারণ (অর্ডিনারি) সিকোয়েন্সে নিরবচ্ছিন্নতা পরিকল্পিত নয়। ‘এপিসডিক সিকোয়েন্সের’ একটি উত্তম দৃষ্টান্ত সিটিজেন কেইন সিনেমার দৃশ্যে, যেখানে অরসন ওয়েলস নাস্তার টেবিলে পরপর কয়েকটি অনুঘটনার (এপিসড) সাহায্যে তার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘটনা দেখিয়েছেন। একে বলা যেতে পারে ‘সিনে সিকোয়েন্স’ এবং এটাই এপিসডিক সিকোয়েন্সের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে অংশগুলি এমনভাবে পরিকল্পিত হয়, যেন প্রত্যেকটিরই নিজস্ব পরিচিতি থাকে।

‘বন্ধনী (ব্রাকেট) সিনট্যাগমা’ এবং ‘বর্ণনাকারী (ডেসক্রিপটিভ) সিনট্যাগমার’ ধারণা (কনসেপ্ট) এত কাছাকাছি যে তাদের ভেতর পার্থক্য করা বেশ অলীক মনে হয়। ‘সমান্তরাল সিনট্যাগমা’ এবং ‘বিকল্প (অলটারনেট) সিনট্যাগমার’ ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। এপিসডিক ও সাধারণ সিকোয়েন্সের ক্ষেত্রেও কমবেশি তাই হয়। এই সব সমস্যা সত্ত্বেও মেৎজের শ্রেণিবিন্যাস ও পদ্ধতি এই ক্ষেত্রে নির্দেশক হিসেবে বেশ সহায়ক। সিনেমায় কাহিনি বর্ণনার যে বিস্তৃত ক্ষেত্রে জটিল, নিয়ত পরিবর্তনশীল এবং সূক্ষ্ম বাক্যবন্ধ (সিনট্যাক্স) রয়েছে, সেই বাক্যবন্ধে এই পদ্ধতির ব্যবহার দর্শক সমালোচকের জন্য উপকারে আসতে পারে। তার আটটি  শ্রেণিবিভাগ যুক্তিসংগত কি না সেই বিচারে না গিয়েও সেসব বিবেচনার ভিত্তিতে তিনি যেভাবে শ্রেণিবিভাগ এবং পার্থক্যকরণ করেছেন সেসব বেশ তাৎপর্যময়। পরস্পর বিপরীত পরিচিতির (বাইনারি) ভিত্তিতে তাদের সংক্ষেপে পুনঃবর্ণনা করা যায় :

* একটি ফিল্মের অংশ হয় স্বয়ংসম্পূর্ণ অথবা তা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

* একটি সিনেমার অংশ হয় সময়ের ক্রমানুবর্তী অথবা তা নয়।

* একটি সিনেমার অংশ হয় বর্ণনাকারী অথবা তা কথনভঙ্গিভিত্তিক।

* একটি সিনেমার অংশ হয় সরলরৈখিক অথবা তার বিপরীত।

* একটি সিনেমার অংশ নিরবচ্ছিন্ন অথবা তা নয়।

* একটি সিনেমার অংশ হয় পরিকল্পিত অথবা তার বিপরীত।

মিজেআঁ সিঁ আর মন্তাজের আলোচনায় বিভক্তিকরণের (পাংচুয়েশন) উল্লেখ করা হলেই সিনেমার নিজস্ব ভাষায় বাক্যবন্ধের (সিনট্যাক্স) এই জরিপ মোটামুটি সমাপ্ত হবে। যেহেতু বিভক্তিকরণের পদ্ধতিগুলি বেশ সহজেই শনাক্ত করা যায় এবং স্পষ্ট করে সংজ্ঞায়িত করে বোঝানো যায়, সেই জন্য সিনেমার ভাষায় তাদের বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। লিখিত ভাষায় ‘কমার’ মতোই সিনেমার ভাষার এই বিভক্তিকরণ কার্যকর ও সহায়ক। সিনেমার ভাষায় সবচেয়ে সহজ বিভক্তিকরণ হলো চিহ্নহীন ‘কাট’ (আনমার্কড কাট)।

একটি ইমেজ শেষ হয়ে আর একটি শুরু হয়, চিহ্নহীন কাট ব্যবহার করে দুটির মধ্যে সীমানা চিহ্নিত হয়। ফেড অথবা আইরিস (যা আগে খুব জনপ্রিয় ছিল) দিয়ে এই শুরু ও সমাপ্তির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে ‘ওয়াইপ’ বা মুছে ফেলে একটি ইমেজের স্থানে অন্য একটি ইমেজ আনা জনপ্রিয় ছিল। এখানে আগেই বলা হয়েছে, বর্তমানে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া (ওয়াইপের) ব্যবহার কেবল নস্টালজিয়ার কারণে দেখা যায়। টেলিভিশনে, যেখানে ইলেকট্রনিক স্পেশাল ইফেক্টস তৈরি পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছে, সেখানে এর নতুন ভূমিকা দেখা দিয়েছে।

সিনেমার মাঝখানে টাইটেল (ইন্টারটাইটেল) ব্যবহার নির্বাক যুগে বিভক্তিকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপায় ছিল এবং এখনো কখনো কখনো এর ব্যবহার করা হয়। ফ্রান্সোয়া ত্রুফো তাঁর দি ফোর হানড্রেড ব্লেজ (১৯৫৯) সিনেমায় ব্যবহারের পর ফ্রিজ শটও জনপ্রিয় বিভক্তিকরণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। ত্রুফোকে বলা হয় সিনেমার পাংচুয়েশনের ক্ষেত্রে সি এস লুই (শিশুসাহিত্যিক)।

চিত্র-নির্মাতারা পুরনো অনেক বিভক্তিকরণকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে ব্যবহার করে যাচ্ছেন। যেমন, রঙের ক্ষেত্রে কালোর পরিবর্তে ‘ফেড’ করে (ইঙ্গমার বার্গমানের প্রিয় পদ্ধতি) অথবা এক রং-বিশিষ্ট শূন্যতাকে ফ্রেমে কাট করে, যেমন করেছেন গদা। শটের শেষে ফোকাসের বাইরে ধীরে ধীরে চলে যাওয়া অথবা শুরুতে ফোকাসের ভেতর আসাকেও বিভক্তিকরণ বলা চলে, যা খুব বিরল দৃষ্টান্ত নয়। যেসব বিভক্তিকরণের (পাংচুয়েশনের) কথা বলা হলো সেসবই সময়ের একটি বিন্দুকে বোঝায়, অর্থাৎ হয় শুরু অথবা শেষ। ফেড ইন/ফেড আউটের সাহায্যে সম্পর্ক বোঝানো গেলেও তারা দৃশ্যত কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগকারী ভূমিকায় থাকে না। ডিসলভ, যা ফেড ইনের ওপর ফেড আউটকে চাপিয়ে দেয়, অবশ্য যোগাযোগ স্থাপনের ভূমিকা পালন করে। ফিল্মের ভাষায় যদি মানুষের ব্যবহৃত ভাষার মতো ‘কমা’ বলে কিছু থেকে থাকে তাহলে সেটি ‘ডিসলভ’, যার বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। ডিসলভের সাহায্যে যে অনেক কাজ করা হয়ে থাকে, তারও উল্লেখ করা হয়েছে। এর সাহায্যে সাধারণত ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাওয়া যায়, অন্যদিকে জাম্প-কাট দিয়ে ‘কনটিনিউটি মন্তাজ’ বা এডিটিংয়ে যাওয়া যায়। আবার এর মাধ্যমে সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমাকেও প্রতিনিধিত্ব করা যায়, বিশেষ করে ঘটনার পরম্পরার ভিত্তিতে। সিনেমার ভাষায় বিভক্তিকরণ চিহ্ন হিসেবে ‘ডিসলভই’ একমাত্র পদ্ধতি, যা ইমেজকে মিশ্রিত করে এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগও স্থাপন করে।

 এডিটিংয়ের অন্যান্য প্রসঙ্গ

‘সিনেমার বাস্তবতার পেছনে রয়েছে সম্পাদনার সৃজনশীলতা। আর পারিপার্শ্বিকের যে বাস্তবতা, সেখানে শুধু এই বাস্তবতা সৃষ্টির জন্য উপকরণ রয়েছে’, এই উক্তি করেছিলেন পুডোভকিন (ফিল্ম টেকনিক, ১৯২৯)। তাঁর মতে, ক্যামেরায় তোলা শটগুলিকে নির্বাচন ও সময়ের কাঠামোতে আবদ্ধ করে এবং সাজিয়ে নিয়ে সম্পাদনা সিনেমার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। সিনেমা নির্মাণে এটিই তাঁর কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল প্রক্রিয়া। এখন অবশ্য অনেকে সম্পাদনার এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তেমন জোরের সঙ্গে বলেন না, কেননা সিনেমার অন্যান্য উপকরণ-প্রকরণের (যেমন, অভিনয়, সংলাপ, মঞ্চসজ্জা) ওপরও যে অনেক কিছু নির্ভর করে, সে বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। কিন্তু কারেল রেইযের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে নির্বাক যুগে তাৎপর্যময় সম্পর্কের ভিত্তিতে শটগুলি পাশাপাশি রেখে যেভাবে বাঙ্ময় করা হতো, সেই আঙ্গিক সবাক যুগে এসে পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে সিনেমার ক্ষতি হয়েছে। পুডোভকিনের মতো কারেল রেইযও মনে করেছেন যে, ‘সৃজনশীল সম্পাদনার’ মাধ্যমেই সিনেমার বাস্তবতা রূপ পায় এবং সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয় (দি টেকনিক অফ ফিল্ম এডিটিং, ১৯৬৮)।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সম্পাদনা যান্ত্রিক এক প্রক্রিয়া নয়, একইসঙ্গে এটি একটি মননশীল ও সৃজনশীল কাজ, যেখানে মেধা, মনন ও কল্পনার ভূমিকা রয়েছে।

শিল্প হিসেবে সিনেমা মাধ্যমের যে প্রকাশময়তা দেখা যায় এবং লুমিয়েঁর ভ্রাতৃদ্বয়ের স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা থেকে বিশ শতকের দুই দশকের শেষে পৌঁছে তার যে উৎকর্ষ সাধিত হয়, তার জন্য সম্পাদনাকেই চিহ্নিত করেছেন কারেল রেইযের মতো অনেকে। সম্পাদনা বিষয়ে নিজস্ব চিন্তাভাবনার ভিত্তিতেই ১৯২৮ সালে পুডোভকিন তাঁর তৈরি সিনেমায় ল্যুমিয়েঁর ভ্রাতৃদ্বয়ের তুলনায় আরো জটিল ধারণা এবং গভীরতর আবেগ প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। সিনেমার নান্দনিকতার সঙ্গে সৃজনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে এডিটিং জড়িত হয়েছে এই নবতম শিল্পের সূচনালগ্নেই। এর ইতিহাস এবং বিবর্তন সেই জন্য কিছুটা বিশদভাবে আলোচনার দাবি রাখে।

লুমিয়েঁর ভ্রাতৃদ্বয় তাদের প্রথমদিকের ছবি তৈরির সময় খুব সহজ ও সাধারণ পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন। আকর্ষণীয় হবে এবং আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে, এমন একটি বিষয় নির্বাচন করে তাঁরা সেই বিষয়ের সামনে বা সুবিধাজনক স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করে যে পর্যন্ত ফিল্মের স্টক শেষ না হয়, সেই পর্যন্ত ছবি তুলতে থাকেন। এই সব সাধারণ বিষয়ের মধ্যে ছিল ‘বেবি অ্যাট দি লাঞ্চ টেবিল’, ‘এ বোট লিভিং দি হারবার’, ‘এ ট্রেন এনটারিং প্লাটফর্ম’ ইত্যাদি। তাঁরা এখানে বিষয়ের দৃশ্য এবং তার গতি ধারণ করার জন্য ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন। গতি ছাড়া এইসব সিনেমার সঙ্গে স্থিরচিত্রের কোনো পার্থক্য ছিল না। এখানে বাস্তবে যে উপকরণ, সেসব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা দেখা যায়নি। কেবল ওয়াটারিং দি গার্ডেন নামক নির্বাক সিনেমায় তাঁরা পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা ও তার সঙ্গে সামঞ্জস্যময় দৃশ্যের ভিত্তিতে ছবি তৈরি করেন। এই সিনেমাতেই প্রথম বাস্তবে যেসব উপকরণ, যেমন, অভিনেতা, দৃশ্যের অন্তর্গত বস্ত্ত ইত্যাদির সচেতন বিন্যাস (অ্যারেঞ্জমেন্ট) দেখা যায়। ঘটনা এবং গতি, দুইই তারা এমনভাবে সাজান এবং ধারণ করেন যেন দর্শকের মনোরঞ্জন করা সম্ভব হয়। কিন্তু আগের ছবির মতোই এখানেও একটি শটের মধ্যেই সিনেমা শেষ করতে হয়েছে।

জর্জ মেলিজের সিনেমায় অনেক চাতুর্য এবং একইসঙ্গে সরল মাধুর্য ছিল। কিন্তু তাঁর সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, কাহিনির বর্ণনায় একটি নয়, একাধিক শটের ব্যবহার করা হয়েছে। লুমিয়েঁর ভ্রাতৃদ্বয়ের সিনেমায় দৈর্ঘ্য যেখানে ছিল ৫০ ফুট, তার তুলনায় জর্জ মেলিজের দ্বিতীয় সিনেমা সিন্ডারেলার দৈর্ঘ্য ছিল ৪১০ ফুট। এখানে সিনেমার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে বিশটি গতিশীল দৃশ্যে (ট্যাবলু), যাকে সিকোয়েন্স বলা যেতে পারে। প্রতিটি দৃশ্যই ছিল ল্যুমিয়েঁর ভ্রাতৃদ্বয়ের ওয়াটারিং দি গার্ডেনের মতো, কেননা এখানে সাধারণ ঘটনাকে আগে থেকে সাজানোর পর একটি নিরবচ্ছিন্ন ফিল্মে ধারণ করা হয়েছে অর্থাৎ কাট ছাড়াই, কেননা তখনো ‘কাটের’ আবিষ্কার (উদ্ভাবন) হয়নি। কিন্তু লুমিয়েঁরদের ছবিতে যেমন স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং একটি মাত্র ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছবি তৈরি হয়েছে, সেখানে জর্জ মেলিজ তাঁর সিনেমা-কাহিনিতে কয়েকটি ঘটনা বলতে চেয়েছেন। এই সব ঘটনার মধ্যে ধারাবাহিকতা বিভিন্ন শটের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। বিশটি দৃশ্যভিত্তিক শট অনেকটা লেকচার গাইডের মতো একই চরিত্র (সমূহ)-কেন্দ্রিক হয়ে এক ধরনের ঐক্যসূত্রে গ্রথিত হয়েছে। এইভাবে সিঙ্গল শটে যা সম্ভব ছিল না, একাধিক শট পরপর উপস্থাপিত হয়ে সাধারণের তুলনায় কিছুটা জটিল কাহিনি বর্ণনা করতে পেরেছে। সিনেমায় সম্পাদনার সেই থেকে শুরু, একথা বলা যায়।

মেলিজের সম্পাদনা পদ্ধতির দুর্বল দিক অনেকের চোখে পড়েছে। প্রতিটি ঘটনাই একই সময় ও স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল, কেননা ক্যামেরা এক স্থানে স্থিরভাবে রাখার কারণে কোনো ঘটনাই এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যেতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, তাঁর সিনেমায় যে ধারাবাহিকতা তা ছিল শুধু বিষয়ের, ঘটনা বা অ্যাকশনের নয়। ঘটনা শট থেকে শটে অগ্রসর হয়নি এবং দুটি শটের ভেতরকার সম্পর্ক অস্পষ্ট থেকে গিয়েছে। এই অর্থে মেলিজের সিনেমার সঙ্গে মঞ্চে অভিনীত নাটকের খুব একটা পার্থক্য ছিল না। মেলিজের সমসাময়িক কিছু চিত্র-নির্মাতা যে নতুন পদ্ধতিতে ছবি তৈরি করতে সক্ষম হলেন তার পেছনে ছিল সম্পাদনার নতুন ব্যবহার।

এডউইন পোর্টার দি লাইফ অফ অ্যান আমেরিকান ফায়ারম্যান ছবিতে পুরনো ফিল্মের স্টক থেকে ফায়ারম্যান ও তাদের ডিপার্টমেন্টের ওপর তোলা অনেক ছবি দেখে একটি কাহিনির মাধ্যমে সেসব ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেন। কাহিনিটি তাঁর কল্পিত এবং এখানে ফায়ারম্যান কর্তৃক একজন মা ও তার শিশুকে অগ্নি প্রজ্বলিত একটি ভবন থেকে উদ্ধার করতে দেখা যায়। আগের তোলা ফুটেজ (শট) থেকে একটি কাহিনিভিত্তিক সিনেমা তৈরি করা ছিল সেই সময়ে অভূতপূর্ব। এখন অবশ্য এই ধরনের কাজে তেমন নতুনত্ব নেই, যদিও কৃতিত্ব দেখানোর সুযোগ রয়েছে যথেষ্ট, যেমন ক্যাথরিন মাসুদ ও তারেক মাসুদ পুরনো ফিল্ম ফুটেজ থেকে তৈরি করেছেন প্রায় কাহিনিভিত্তিক মুক্তির গান ডকুমেন্টারি।

দি লাইফ অফ অ্যান আমেরিকান ফায়ারম্যান সিনেমায় ঘটনা তিন পর্বে বলা হয়েছে। প্রথম পর্বে নাটকীয়ভাবে সমস্যাটি (আগুন লাগা) উপস্থাপিত হয়েছে, যা তৃতীয় বা শেষ পর্বের আগে সমাধান (মা ও শিশুকে উদ্ধার) করা হয়নি। ঘটনা ও অ্যাকশনকে এক শট থেকে পরবর্তী শটে নেওয়া হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার মায়া সৃষ্টি করেছেন পোর্টার। ঘটনাকে তিনটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অংশে বিভক্ত করে তাদেরকে স্থিরচিত্রে টাইটেল দিয়ে যুক্ত না করে, পোর্টার শটগুলিকে পরপর যোগ করেছেন। এর ফলে দর্শকের মনে হয়েছে যেন তারা একটি ধারাবাহিক ঘটনাই দেখছে। সম্পাদনার মাধ্যমে ফিল্মকে এইভাবে গঠন করে হঠাৎ করে বদলানো এবং হোঁচট খাওয়ার মতো ধারাবাহিকতার পরিবর্তন না করে (যেমন হয় মেলিজের ক্ষেত্রে) পোর্টার একটি দীর্ঘ এবং জটিল কাহিনি বর্ণনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর ফলে যে ধারাবাহিকতা স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছে শুধু তাই না, পরিচালকের পক্ষে ঘটনাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও সহজ হয়েছে। দি লাইফ অফ অ্যান আমেরিকান ফায়ারম্যানে পোর্টার পুরনো ফিল্ম ফুটেজের (যা বাস্তবেরই প্রতিফলন) সঙ্গে নিজের তোলা পরিকল্পিত শট যুক্ত করেন, কিন্তু অ্যাকশনের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেই। দ্বিতীয়ত, শটের এই মিশ্রণের মাধ্যমে দর্শককে সময় সম্বন্ধেও ধারণা দেওয়া সম্ভব হয়। দি লাইফ অফ অ্যান আমেরিকান ফায়ারম্যান ছবিতে একজন ফায়ারম্যান চেয়ারে ঘুমিয়ে অগ্নি প্রজ্বলিত এক বাড়িতে এক মা ও শিশুর স্বপ্ন দেখছে। এরপরের শটেই অ্যালার্ম বেল বেজে ওঠে এবং পরপর চারটি শটে ফায়ারম্যানদের উপদ্রুত বাড়ির দিকে যেতে দেখা যায়। শেষের শটে মা ও শিশুকে উদ্ধার করার দৃশ্য রয়েছে। এখানে একটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী ঘটনাকে সংক্ষিপ্ত করে দেখানো হয়েছে, কিন্তু এর ফলে বর্ণনায় কোনো বিচ্ছিন্নতা ঘটেনি। কেবল ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থময় অংশগুলিই নির্বাচিত করে কাহিনির ভেতর যেন ধারাবাহিকতা থাকে, এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। পোর্টার বলতে চেয়েছেন যে, একটি ঘটনার অসম্পূর্ণ অংশ ধারণ করে যে সিঙ্গল শট, তার ভিত্তিতেই সিনেমার গঠন হতে হবে। এইভাবে তিনি সিঙ্গল শটের গুরুত্ব ও ভূমিকা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সম্পাদনার একটি মূলনীতি সম্বন্ধেও তাঁর মত রাখেন। তাঁর পরবর্তী দি গ্রেট ট্রেন রবারি সিনেমায় এই এডিটিং পদ্ধতির আরো বিশদ ব্যবহার হয়েছে। এই সিনেমায় তিনি শুধু আগের মতো ঘটনা বা অ্যাকশনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেননি, সমান্তরাল ঘটনাও দেখান, যা একই সময়ে ঘটছে, কিন্তু বিভিন্ন স্থানে। ‘কনটিনিউটি এডিটিং’য়ের পাশাপাশি তিনি ‘প্যারালাল এডিটিং’য়ের নীতিও উদ্ভাবন করলেন, তবে সূচনাপর্বে সেসবই ছিল অনুন্নত পর্যায়ের।

গ্রিফিথের সিনেমাতেই ‘প্যারালাল এডিটিং’য়ের পরিপূর্ণ ব্যবহার করা হয়। পোর্টারের সিনেমার কাহিনির বর্ণনায় দূরত্বের হেরফের করা যেত না, কেননা প্রতিটি ঘটনাই ক্যামেরা থেকে একই দূরত্বে দেখানো হতো। কেবল অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অঙ্গভঙ্গি দিয়েই নাটকীয়তার মাত্রা সম্বন্ধে ইঙ্গিত দেওয়া যেত এবং কণ্ঠস্বরের উঁচু-নিচু খাদের সাহায্যেও কিছুটা। গ্রিফিথ তাঁর দি বার্থ অফ এ নেশন সিনেমায় পোর্টারের ঘটনাকেন্দ্রিক যে ধারাবাহিকতা, সেই নীতি অনুসরণ করেই নাটকীয় মুহূর্তের সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের উপযোগী পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

দি বার্থ অফ এ নেশন সিনেমায় লিংকনের হত্যা সিকোয়েন্স দেখানো হয়েছে ৬ নম্বর রিলে। এখানে ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত এবং সরল। লিংকনের নিরাপত্তারক্ষীরা দায়িত্বহীনভাবে দূরে থাকার সুযোগ নিয়ে থিয়েটারে ঢুকে লিংকনকে গুলি করে আততায়ী বুথ। পোর্টার হয়তো পাঁচ-ছটি শটের মাধ্যমে ঘটনাটিকে দেখাতেন। কিন্তু গ্রিফিথ কেবল ঘটনাটি পুনঃসৃষ্টি করার প্রতি গুরুত্ব দেননি, কেমনভাবে এটা পুনঃসৃষ্টি করা হবে, তার ওপরও জোর দেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি দৃশ্য ও ঘটনাটিকে চার শ্রেণির চরিত্রের মাধ্যমে গঠন করেন। যখনই তিনি একশ্রেণির চরিত্রের অ্যাকশন থেকে অন্য একটি শ্রেণির চরিত্রের অ্যাকশনে ‘কাট’ করে অন্য শটে নিয়ে যান, তখন সেই উত্তরণ গ্রহণযোগ্য হয়, কেননা সব চরিত্রই যে একই দৃশ্যে উপস্থিত, তা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। এর ফলে যদি প্রধান ঘটনা/অ্যাকশন (লিংকনের প্রতি বুথের গুলি ছোড়া) ঘন ঘন বাদ পড়ে (অথবা বাধাগ্রস্ত হয়) এবং পার্শ্ববর্তী ঘটনা দেখানোও হয়, তার ফলে কাহিনি-বর্ণনার ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ণ হয় না। কিন্তু এখানে ঘটনা/অ্যাকশনকে স্বল্পদৈর্ঘ্য অংশে বিভক্ত করার কারণের ক্ষেত্রে পোর্টার আর গ্রিফিথের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। পোর্টার একটি ইমেজের শট থেকে অন্য ইমেজের শটে কাট করেছেন মূলত বস্ত্তগত (ফিজিক্যাল) কারণে, একটি শটের ভেতর ঘটনা সম্পূর্ণভাবে ধারণ করার জন্য। কিন্তু গ্রিফিথ যেভাবে কাহিনির বর্ণনায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন তার জন্য ঘটনা/অ্যাকশনকে প্রায় ক্ষেত্রেই একটি শট থেকে অন্য শটে নেওয়া হয় না। শটের পরিবর্তন করা হয় বস্ত্তগত (শটের সীমাবদ্ধতা) কারণে নয়, নাটকীয়তার জন্য। এর ফলে দর্শক সামগ্রিক ঘটনার যে সংশ্লিষ্ট অংশগুলি কোন মুহূর্তে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, উদ্দেশ্যের বিভিন্নতার ভিত্তিতে সেসব স্পষ্ট করে দেখতে পায়। সম্পাদনার ক্ষেত্রে গ্রিফিথের পদ্ধতি তাই পোর্টারের চেয়ে অনেক পৃথক। গ্রিফিথ উল্লিখিত ঘটনা/অ্যাকশন কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে তাদের ভিত্তিতে দৃশ্য পুনঃসৃষ্টি করেছেন। এখানে অনেক ডিটেইলসের পুঞ্জীভূত ধারণা দৃশ্যের ইফেক্ট সৃষ্টি করে। আগের পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতির সুবিধা দুই ধরনের। প্রথমত, এর ফলে পরিচালক তাঁর বর্ণনায় গভীরতার অনুভব সৃষ্টি করতে পারেন। একটি নির্দিষ্ট পটভূমিতে সিঙ্গল শটের সাহায্যে কোনো বাস্তবধর্মী ঘটনার বর্ণনায় অনেক ডিটেইলসের ব্যবহার আরো সম্পূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। দ্বিতীয়ত, পরিচালক এখানে দর্শক-প্রতিক্রিয়া আরো নিশ্চিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কেননা তিনিই নির্ধারণ করেন দর্শক কোন সময়ে ঘটনার কোন ডিটেইলটি দেখবে। কারেল রেইযের মতে, গ্রিফিথের সম্পাদনা পদ্ধতি কাহিনির বর্ণনাকে আরো বিশদ এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপিত করতে পেরেছে।

সম্পাদনার ক্ষেত্রে গ্রিফিথের মূল উদ্ভাবন ছিল এই ধারণা যে, অসম্পূর্ণ শটের সমাহারেই ফিল্মের সিকোয়েন্স তৈরি করতে হবে এবং এইসব শটের ক্রম ও নির্বাচন নাটকের প্রয়োজনেই নিষ্পন্ন হতে হবে। পোর্টারের ক্যামেরা যেখানে লং শটে দূর থেকে অ্যাকশন বা ঘটনা নিস্পৃহভাবে ধারণ করেছে, গ্রিফিথ সেখানে ক্যামেরাকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে কাহিনি বর্ণনায় ক্যামেরার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রমাণ রেখেছেন। একটি ঘটনাকে সংক্ষিপ্ত আকারে খন্ডে খন্ডে বিভক্ত করে বেশ সুবিধাজনক স্থানে ক্যামেরা রেখে সেসব রেকর্ড করে তিনি দেখিয়েছেন যে, শট থেকে শটে গুরুত্বের হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে কাহিনির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়তার বিবর্তনের সঙ্গেও সামঞ্জস্য রাখা সম্ভব। দি বার্থ অফ এ নেশন সিনেমার একটি সিকোয়েন্সে একই সময়ে সংঘটিত চারটি অ্যাকশনের ক্রস-কাটিং করে তিনি এর দৃষ্টান্ত রেখেছেন। একই পদ্ধতির বা এডিটিং প্রিন্সিপলের আর একটি দৃষ্টান্ত হলো তাঁর ‘ক্লোজ শটের’ ব্যবহার।

সিনেমা তৈরির শুরু থেকেই গ্রিফিথ ক্যামেরা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে একটি পুরো দৃশ্য বা সিন রেকর্ড করার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেন। যেখানে চরিত্রের মনোগত চিন্তা বা আবেগ প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তখন তিনি ক্যামেরা কাছে নিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীর মুখের অভিব্যক্তি বিশদভাবে দেখিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সূচনাকারী (ইস্টাবলিশিং) লং শট থেকে ক্লোজ শটে গিয়ে মুখের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। আবার যখন সামগ্রিকের ধারণা দিতে চেয়েছেন, তিনি লং শটের সাহায্য নিয়েছেন। ক্লোজ শটের ব্যবহার এখন এত জনপ্রিয় যে এক্ষেত্রে পথিকৃৎ হিসেবে গ্রিফিথের ছবির দৃষ্টান্ত না দিলেই নয়। তার ইনটলারেন্স সিনেমায় ‘দি ডিয়ার ওয়ানস’-এর উদ্বিগ্ন এবং অস্থিরতায় চঞ্চল হাতের ক্লোজআপ শট  মুখের ক্লোজআপ শটের সঙ্গে একত্রে থেকে কোর্টের রায়ের আগে তার মনের অবস্থার কথা জানিয়ে দেয়।

কাহিনির ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, কেবল নাটকীয়তার জন্যই ব্যবহৃত, গ্রিফিথের এমন একটি উদ্ভাবন বা নতুন ব্যবহার ছিল অনেক দূরত্ব থেকে নেওয়া লং শট (এক্সট্রিম লং শট)। দি বার্থ অফ এ নেশনে যুদ্ধক্ষেত্রের যে বিশাল প্রসারিত (প্যানোরামিক) দৃশ্য সেটি ক্যামেরুন আর স্টোনম্যানদের কাহিনি বর্ণনার পটভূমিতে জাতীয় পর্যায়ে বিশাল বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। এর মাধ্যমে একটি সামগ্রিক প্রেক্ষিত সৃষ্টি হয়, যা কাহিনির গুরুত্বের জন্য প্রাসঙ্গিক।

গ্রিফিথের আরো একটি উদ্ভাবন ‘ফ্ল্যাশ ব্যাকের’ ব্যবহার। তিনি মনে করেছেন যে, দর্শক যদি জানতে পারে চরিত্রের অতীত জীবনে কী ঘটেছে বা তার স্মৃতিতে কী চিন্তাভাবনা হচ্ছে, তাহলে দৃশ্যে তার বর্তমান অ্যাকশন আরো স্পষ্ট হবে। দর্শককে ফ্ল্যাশ ব্যাকে সেই ঘটনা বা স্মৃতিচারণাভিত্তিক অভিজ্ঞতা দেখানো প্রয়োজন। ইনটলারেন্স সিনেমায় যখন ‘দি ফ্লেন্ডলেস ওয়ান’ চরিত্র কিশোরটিকে হত্যাকান্ডে জড়িত করতে যায়, সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ে যে ছেলেটি অতীতে তার উপকার করেছিল। এই স্মৃতি তার মুখের অভিব্যক্তিতে অনুতাপের স্পর্শ এনে দেয়। এখানে বর্তমান দৃশ্য থেকে গ্রিফিথ আগের দৃশ্যে গিয়েছেন এবং তারপর বর্তমানের সঙ্গে দৃশ্যটি মিলিয়ে দিয়েছেন।

সম্পাদনার নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করার ফলে গ্রিফিথকে প্রতিটি দৃশ্য বা সিন সম্পূর্ণভাবে ভাবতে বা তৈরি করতে হয়নি। পোর্টারকে যেখানে গাড়ির পেছনে ছোটার দৃশ্য সম্পূর্ণভাবে সাজিয়ে এবং দেখিয়ে ক্যামেরাবন্দি করতে হতো, গ্রিফিথ সেখানে যে চরিত্র গাড়ি নিয়ে পালাচ্ছে এবং যে চরিত্র অনুসরণ করছে, তাদের পৃথক পৃথক শট নিয়ে এডিটিংয়ের সময় একসঙ্গে জুড়ে দেখাতেন যে গাড়ি ‘চেজ’ করা হচ্ছে। এইভাবে আগে যেসব দৃশ্য (সিন) খুব কষ্ট করে রেকর্ড করা হতো, গ্রিফিথের পদ্ধতি অনুযায়ী সেসব সহজে ধারণকৃত শটের ভিত্তিতে একত্রিত করা সম্ভব হয়েছে। যথাযথ এডিটিংয়ের মাধ্যমেই বিশাল যুদ্ধের, মারাত্মক দুর্ঘটনা এবং গাড়ির অনুসরণ, এইসব জটিল দৃশ্য (সিন) দর্শকের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। তবে গ্রিফিথের এডিটিং পদ্ধতি যেমন বিশাল এবং জটিল দৃশ্য সাজানো, দেখানো এবং চিত্রায়িত করা সহজ করেছে, একইসঙ্গে সেই পদ্ধতি অভিনেতার কাজকে দুরূহও করে ফেলেছে। ক্লোজ শটে অভিনয় করতে গিয়ে অভিনেতাকে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়েছে এবং অভিব্যক্তির সূক্ষ্মতা প্রদর্শন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পোর্টারের সময় থেকেই অভিনয়ে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও ইফেক্ট সৃষ্টির দায়িত্ব পরিচালকের ওপরই রয়ে গিয়েছে। শটগুলি পরপর যেভাবে দেখানো হয়, তাদের সেই ক্রম (অর্ডার) এবং উপায় পরিচালকই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এর ফলে তিনি একটি দৃশ্যকে গুরুত্বপূর্ণ অথবা সাধারণের পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছেন। তিনি ‘কাট’ করে ক্লোজ শটে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে যে বড় আকারের ইমেজ দেখা যায়, তার ফলে দর্শক বুঝতে পেরেছে যে বড় কোনো নাটকীয় মুহূর্ত আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। একটি দৃশ্যের শটে কোনো অভিনেতার অভিনয় এইভাবে পরিচালকের ক্যামেরা ব্যবহার এবং যে প্রেক্ষিত থেকে তিনি শটটি দেখাতে চান, তার ওপর নির্ভর করেছে।

গ্রিফিথের ছবিতে সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণও অভিনেতার কাছ থেকে পরিচালকের ওপর অর্পিত হয়। তিনি যেভাবে দৃশ্যকে কেটে খন্ড খন্ড করেন, তার ফলে এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে যে প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয় তা হলো, প্রতিটি শট কতক্ষণ যাবৎ পর্দায় দেখানো হবে? দি বার্থ অফ এ নেশন থেকে দেখা যায় যে, শটের মেয়াদ একটি দৃশ্যের
অভিঘাত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছানোর আগে শটের কাটিংয়ের গতি বৃদ্ধি পেলে বুঝতে হবে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। এইভাবেই দৃশ্যে ছন্দ ও গতির সৃষ্টি আরো স্পষ্ট হয়।

গ্রিফিথ ছিলেন একজন প্রতিভাবান গল্প বর্ণনাকারী। সিনেমার মাধ্যমে ন্যারেটিভের যে ক্ষমতা ও সুযোগ, তা সম্পাদনার বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী করতে পারাই তার মূল সাফল্য। সার্জেই আইজেনস্টাইন তাঁর ফিল্ম ফর্ম বইতে (১৯২৯) ‘ডিকেন্স, গ্রিফিথ এবং বর্তমানের সিনেমা’ নামক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, গ্রিফিথ উপন্যাসে বর্ণনার যে পদ্ধতি, তা কীভাবে গ্রহণ ও রূপান্তরের মাধ্যমে ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি ডিকেন্সের উপন্যাসের উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে, উপন্যাসের ন্যারেটিভ যার মাধ্যমে এটা হয়েছে, সেই আঙ্গিক হলো সম্পাদনা। তিনি দেখিয়েছেন ক্লোজ শট, ক্রস-কাটিং, ফ্ল্যাশ ব্যাক, এমনকি ডিসলভও উপন্যাসের ন্যারেটিভে রয়েছে। গ্রিফিথ ডিকেন্সের উপন্যাস থেকে সেসব আবিষ্কার করে সিনেমায় ব্যবহার করেছেন। এটা করতে গিয়ে তিনি অবশ্যই ফিল্মের মাধ্যমের কথা মনে রেখেছেন। গ্রিফিথের অনুপ্রেরণার এবং পদ্ধতির উৎস শনাক্ত করার পর আইজেনস্টাইন নতুন প্রজন্মের রাশিয়ান চিত্র-নির্মাতাদের ওপর তার প্রভাব বিশে�ষণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, যদিও তারা গ্রিফিথের পথিকৃৎ ভূমিকা স্বীকার করেছে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁর সীমাবদ্ধতার বিষয়ও উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘গ্রিফিথের (আমেরিকার) ব্যবহৃত পরপর বিকল্প (অলটারনেটিং) ক্লোজআপের সমান্তরালতার স্থানে আমরা (অর্থাৎ নবীন রাশিয়ান চিত্র-নির্মাতারা) এইসব ক্লোজআপকে মিলিত করে ‘মন্তাজ ট্রপে’ সৃষ্টির যে বিপরীত পদ্ধতি, তা ব্যবহার করতে চাই। সাহিত্যে ‘ট্রপে’র অর্থ যেমন প্রচলিত অর্থের অতিরিক্ত বা বাইরে অন্য এক অর্থ বোঝানো (যেমন, ‘ধারালো বুদ্ধি’) হয়, সিনেমাতেও তাই সম্ভব। কিন্তু গ্রিফিথ এই ‘ট্রপের’ জন্য মন্তাজ ব্যবহার করে সিনেমা তৈরি করেননি। তাঁর ক্লোজআপ শট আবহ সৃষ্টির মাধ্যমে চরিত্রের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করে। মুখ্য চরিত্রগুলির একের পর এক সংলাপে কাহিনি বিকল্প (অলটারনেটলি) ধারায় অগ্রসর হয় এবং ক্লোজআপে ধাবমানকারী ও ধাবিতকে ‘ধরে ফেলবার’ (চেজ) গতিতে সব শট হয়। কিন্তু গ্রিফিথের সবসময় লক্ষ্য থাকে সঠিক প্রতিনিধিত্ব আর বস্ত্তগতভাবে সঠিক থাকার ওপর। শটগুলি পাশাপাশি সাজিয়ে তাদের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং নতুন ইমেজ সৃষ্টির সম্ভাবনার প্রতি তিনি দৃষ্টি দেন না।’

গ্রিফিথ যেভাবে সম্পাদনা পদ্ধতি ব্যবহার করে কাহিনি বর্ণনা করতে চেয়েছেন (যেমন, দি বার্থ অফ এ নেশনে) নতুন প্রজন্মের রাশিয়ান চিত্র-নির্মাতারা তার তুলনায় সিনেমার উপকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো এক ধাপ সামনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করেছে। নতুন সম্পাদনা পদ্ধতির ব্যবহার করে তারা কেবল কাহিনি বর্ণনা করতে চায়নি, নতুন ব্যাখ্যা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উপসংহারেও পৌঁছাতে চেয়েছে।

ইনটলারেন্স সিনেমায় গ্রিফিথের অবশ্য একই উদ্দেশ্য ছিল। এই সিনেমার শিরোনাম ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে চারটি কাহিনি সমান্তরালভাবে বর্ণনা করে তিনি সিনেমার কেন্দ্রীয় বিষয় উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। এখানেও ব্যাখ্যা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপসংহারে আসাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। আইজেনস্টাইনের মতে, চারটি কাহিনি সুষ্ঠুভাবে বলা হলেও কেন্দ্রীয় ধারণাটি অস্পষ্টই থেকে গিয়েছে। গ্রিফিথ যে বুদ্ধিবৃত্তিক উপসংহারে আসতে চেয়েছেন তা দর্শকদের বোধগম্য হয়নি, কেননা এটি সরাসরি ব্যক্ত হয়নি। এই ব্যর্থতার জন্য আইজেনস্টাইন মনে করেন সম্পাদনা সম্বন্ধে গ্রিফিথের ভ্রান্ত ধারণা দায়ী। তাঁর মতে, গ্রিফিথ ইনটলারেন্স সিনেমায় যে-ধরনের সাধারণীকৃত ধারণা সিনেমার মাধ্যমে ব্যক্ত করতে চেয়েছেন তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এডিটিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে, যাকে তিনি বলেছেন ‘মন্তাজ’। (‘মন্তাজ’ ফরাসি শব্দ, সেখানে একে ‘কাটিং’য়ের সমার্থক মনে করা হয়। আমেরিকায় মন্তাজ কথাটি চালু হয়েছে এডিটিংয়ের সমার্থক হিসেবে এবং শটের প্রকার হিসেবেও। এ-সম্পর্কে আগে আলোচনা হয়েছে।)

রাশিয়ায় বিপ্লবের পর চিত্র-নির্মাতাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব ছিল দ্বিবিধ : (ক) রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার জন্য জনগণকে সিনেমার মাধ্যমে তাদের ইতিহাস ও রাজনৈতিক আন্দোলন বা বিপ্লব সম্বন্ধে ধারণা দেওয়া এবং (খ) চিত্র-নির্মাতাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দান করে সিনেমার মাধ্যম ও শক্তি সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এই পরিস্থিতিতে দুটি ফল দেখা দিয়েছে। প্রথমত, নবীন চিত্র-নির্মাতারা সিনেমামাধ্যমে ভাব প্রকাশের জন্য নতুন পন্থা ও পদ্ধতির অনুসন্ধান করেছে, যেন রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হয়। দ্বিতীয়ত, তারা চিত্র নির্মাণের এমন থিওরি তৈরি করতে আগ্রহী হয়, যা গ্রিফিথ তার বাস্তবতাবোধ ও সহজাত প্রবণতার জন্য পারেননি।

রাশিয়ান পরিচালকদের সিনেমাবিষয়ক তত্ত্বগুলি দুই শ্রেণিতে পড়ে। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে পুডোভকিন এবং কুলেশভের মতামতসংবলিত লেখা। এর সুষ্ঠু এবং প্রাঞ্জল বর্ণনা আছে পুডোভকিনের ফিল্ম টেকনিক বইটিতে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাওয়া যায় কিছুটা এলেমেলোভাবে লেখা আইজেনস্টাইনের রচনাবলি। পুডোভকিনের সিনেমাবিষয়ক মতামত ও লেখাকে বলা যায় গ্রিফিথের সিনেমা নির্মাণকে বৈধ ও যৌক্তিকীকরণের প্রচেষ্টা। গ্রিফিথ যেখানে সমস্যার উদ্ভব হওয়ার পর তার সমাধানে ব্যাপৃত হয়েছেন, পুডোভকিন সিনেমা সম্পাদনার জন্য একটি তত্ত্ব তৈরি করেন, যা সাধারণভাবে নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে বলে তাঁর প্রত্যাশা ছিল। এক্ষেত্রে তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল এই : ‘আমরা যদি চিত্রপরিচালকের কাজ দেখি তাহলে দেখা যাবে যেসব কাঁচামাল নিয়ে তিনি প্রকৃত অর্থে কাজ করেন, সেসব বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা অ্যাকশনের বিভিন্ন শট-সংবলিত সেলুলয়েড বা ফিল্ম স্ট্রিপ। এইসব সেলুলয়েড খন্ড থেকেই পর্দায় ইমেজগুলি দেখানো হয়, যা অ্যাকশন শটের প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং পরিচালকের কাছে যে কাঁচামাল থাকে, সেসব প্রকৃত স্থান ও কালের প্রক্রিয়া নয়, বরং সেলুলয়েডের সেই সব খন্ড যেখানে স্থান ও কালের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই ধারণ করা হয়েছে। এই সেলুলয়েড খন্ডগুলি পরিচালকের ইচ্ছার অধীন এবং তিনি সহজেই এসব সম্পাদনা করতে পারেন। ফিল্মে ফর্মের যে-কোনো আকার ও প্রকার দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালক যে-কোনো অংশ বাদ দিতে পারেন এবং অ্যাকশনকে ইচ্ছেমতো দেখাতে পারেন।’

এই প্রক্রিয়াকে পুডোভকিন বলেছেন, ‘গঠনমূলক সম্পাদনা’। এরপর তিনি গ্রিফিথের সিনেমার সূত্র ধরে সিনেমার ন্যারেটিভে এই পদ্ধতির ব্যাখ্যা করেছেন। এই পর্যন্ত তিনি কেবল গ্রিফিথের কাজের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এরপর তিনি সম্পাদনা সম্বন্ধে তাঁর তাত্ত্বিক ধারণার অবতারণা করেছেন, যেখানে তাঁর সঙ্গে গ্রিফিথের কাজের এবং চিন্তার বড় পার্থক্য দেখা যায়। গ্রিফিথ যেখানে লং শটের জন্য ‘সিন’ তৈরি করেছেন এবং তার ভেতর ডিটেইলসের ক্লোজ শট দিয়ে নাটকীয়তা তীব্র করেছেন, পুডোভকিন ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন যে, এই সব ডিটেইলসের ওপর ভিত্তি করে সিকোয়েন্স তৈরি করা হলে আরো চমৎকারভাবে ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কেবল একটি পদ্ধতি ভিনণভাবে ব্যাখ্যা করে না, এর ফলে চিত্রনাট্য লেখা বা চিন্তার পর থেকেই বিষয়ের প্রতি পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গিও (অ্যাপ্রোচও) বদলে যেতে পারে। পুডোভকিনের মতে যদি ফিল্ম ন্যারেটিভকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কার্যকর রাখতে হয়, তাহলে প্রতিটি শটকেই নতুনভাবে ও নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে হবে। যেসব পরিচালক দীর্ঘ শটে অভিনেতার অ্যাকশন দেখিয়ে এবং কেবল মাঝে মাঝে ক্লোজ শটে ডিটেইলস ব্যবহার করে কাহিনি বলতে চান, তিনি তাঁদের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, মধ্যবর্তী এই সব ক্লোজআপ শট বাদ দেওয়াই সমীচীন, কেননা ‘সৃজনশীল সম্পাদনায়’ তাদের কোনো ভূমিকাই নেই। যেসব ডিটেইলস দৃশ্যের অন্তর্গত, তাদেরকে দৃশ্যের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট করালে হবে না, বরং তাদের ভিত্তিতেই দৃশ্য গঠন করতে হবে, এই ছিল তাঁর মত।

পুডোভকিন সম্পাদনা সম্পর্কে নিজস্ব ধারণায় উপনীত হন পরিচালক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা এবং আংশিকভাবে তাঁর সহকর্মী কুলেশভের কাজের ওপর ভিত্তি করে। কুলেশভ সম্পাদনা নিয়ে যে নিরীক্ষা করেন তা থেকে তাঁর উপলব্ধি হয় যে, সম্পাদনা একটি ধারাবাহিক কাহিনি বর্ণনার পদ্ধতির অতিরিক্ত কিছু। তিনি দেখতে পান যে, উপযুক্তভাবে শটগুলি পাশাপাশি রেখে তাদেরকে এমন অর্থ দেওয়া যায়, যা আগে ছিল না বা বোঝা যায়নি। যেমন, যদি একজন হাস্যরত অভিনেতার শটের পরই একটি রিভলবারের শট দেখিয়ে এর পরের শটে তাকে ভীতসন্ত্রস্ত দেখানো হয় তাহলে একজন কাপুরুষের চেহারা ফুটে উঠবে। আর যদি শটগুলির পরম্পরা উল্টে দেওয়া হয়, তাহলে দর্শকরা অভিনেতাকে সাহসী হিসেবে দেখবে। যদিও দুটি ক্ষেত্রে একই ধরনের শট ব্যবহৃত হয়েছে, তাদের পরম্পরার পরিবর্তন করার ফলে ভিন্ন প্রকৃতির আবেগ সৃষ্টি হয়।

সম্পাদনায় শট পাশাপাশি রেখে ইফেক্ট তৈরির এই ক্ষমতায় পুডোভকিন এবং কুলেশভ এতই মুগ্ধ হন যে, তাঁরা পদ্ধতিটিকে একটি নান্দনিক সূত্রের রূপ দেন। পুডোভকিনের ভাষায় : ‘কুলেশভের ধারণা ছিল খুব সহজ ও সরল। তাঁর মতে, সব শিল্পেই উপকরণ থাকে, যা শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষভাবে সাজানো বা কমপোজ করা হয়। কুলেশভের মতে, সিনেমার কাঁচামাল বা উপকরণ হলো ফিল্মের শট। একটি বিশেষ ও সৃজনশীল রূপে সেসব যুক্ত করাই কমপোজিশনের (সাজানোর) প্রক্রিয়া। যখন অভিনেতা অভিনয় করে এবং শট নেওয়া হয়, তখনই ফিল্ম আর্ট সূচিত হয় না, কেননা এসবই কাঁচামাল তৈরির পর্ব। পরিচালক যখন ফিল্মের অংশগুলি যুক্ত করতে শুরু করেন, তখনই ফিল্ম আর্টের বিকাশ ঘটতে থাকে। বিভিন্নভাবে যুক্ত করে এবং ক্রম অনুসারে সাজিয়ে তিনি ভিন্ন ভিন্ন ফল লাভ করেন।

Leave a Reply

*