logo

চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা : কারিগরি ভাষা

হা স না ত  আ ব দু ল  হা ই

সিনেমার ভাষায় প্রধান নির্ভর বা উপকরণ সচল ভিস্যুয়াল ইমেজ। বলতে গেলে এটিই তার আদি ও নিজস্ব ভাষা। ক্যামেরা দিয়ে ফ্রেমের ভেতর শট নিয়ে এই ইমেজ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। ইমেজে সিনেমার চরিত্ররাই (কাহিনিচিত্রে) প্রাধান্য পায়। নানা পরিবেশে এবং নানা ভঙ্গিতে তাদের দেখানো হয়। তাদের চলাফেরা, সংলাপ এবং মুখের ভাষা দিয়ে কাহিনির মূল প্রবহমানতা নিশ্চিত করা হয়। অনেক সময় আবহসংগীত এবং দৃশ্যের অন্তর্গত বস্ত্ত বা নিসর্গও চরিত্রের মনোভাব প্রকাশে অংশ নেয়। কোনো বস্ত্ত বা প্রাকৃতিক দৃশ্যও ভিস্যুয়াল ইমেজ হতে পারে। প্রতীক হিসেবে এই ইমেজ কাজ করে চরিত্রের মনোভাব বা ঘটনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে। সিনেমার ভিস্যুয়াল বা দৃশ্যকল্প ফটোগ্রাফির সৃষ্টি, যাকে বলা যায় মোশন-পিকচার ক্যামেরা এবং সমস্ত প্রক্রিয়াকে ‘সিনেমাটোগ্রাফি’। মোশন-পিকচার মাধ্যমের প্রকাশশক্তি ব্যাপক ও গভীর। এর দ্বারাও দ্বিমাত্রিক সমতলে ত্রিমাত্রিক দৃশ্যরূপ প্রতিফলিত বা পরিস্ফুট করতে পারে। নৃত্যের মতো এই মাধ্যমে গতির সঞ্চার করা যায় এবং কবিতার মতো একাধিক চিত্রকল্প পাশাপাশি স্থাপন করা যায়। সিনেমাটোগ্রাফির সাহায্যে যে বক্তব্য বা কাহিনির সূত্রপাত করা যায় সেটি সম্ভব হয় চলমান দৃশ্যকল্পের সাহায্যে। এই চলমান বা জঙ্গম দৃশ্যকল্পই সিনেমার মূল ভাষা অথবা বলা যায় ভাষার কেন্দ্রে অবস্থিত।

বাস্তবধর্মী বা প্রতিনিধিত্বশীল শিল্পকে যথার্থ অর্থে বাস্তব বলা যায় না। চলমান বা সচল দৃশ্যকল্প একটি বাস্তবকে তুলে ধরলেও প্রকৃতপক্ষে সেটি বাস্তব নয়, তার প্রতিরূপ। যখন ধাবমান অশ্বকে পর্দায় দেখানো হয় তখন ঘোড়া নয়, তার দৃশ্যকল্পই দর্শক দেখে। অন্যান্য প্লাস্টিক শিল্পে যেমন শিল্প বাস্তব থেকে ইমেজ গ্রহণ করে তার প্রতিরূপ সৃষ্টি করলেও সেখানে যেমন বাস্তব সম্পূর্ণভাবে থাকে না, শিল্পীর সৃজনশীলতা বা কল্পনাও এসে যায়; সিনেমাতেও তেমন হয়। ক্যামেরাকে প্রথমে মনে করা হয়েছে বাস্তবের ‘লিপিকার-মাত্র’। কিন্তু ফিল্মতাত্ত্বিকরা দাবি করলেন যে ক্যামেরা শুধু রেকর্ড করে না, সৃষ্টিও করে, ঠিক যেমন করে চিত্রশিল্পী। বেলা বালাজ তাঁর ‘থিওরি অফ ফিল্মে’ জোর দিয়ে লেখেন যে, ক্যামেরা দিয়ে যে-সিনেমা তৈরি হয় তা একটি সৃজনশীল সৃষ্টি, বাস্তবের পুনরুৎপাদন নয়। আর এই কারণেই এটি স্বাধীন ও নতুন শিল্প হতে পেরেছে। তাঁর মতো পুডোভকিনও বললেন যে, বাস্তবের দৃশ্য এবং পর্দায় তার আবির্ভাবের ভেতর বেশ পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যই সিনেমাকে শিল্পরূপ দিয়েছে (‘ফিল্ম টেকনিক অ্যান্ড ফিল্ম অ্যাকটিং’ লন্ডন, মে ফ্লাওয়ার এডিশন, ১৯৫৮)। আর্নহাইমও মনে করেছেন যে, সিনেমা শিল্পের চরিত্র পাবে তখনই যে মুহূর্তে ক্যামেরার পুনরুৎপাদনমূলক কাজের অতিরিক্ত হতে পারবে পর্দার সচল ছবি। সিনেমা এইভাবে যন্ত্রের না হয়ে মানুষের সৃষ্টি হতে পারবে। বাস্তবভিত্তিক হয়েও ক্যামেরার সৃষ্টি যে দৃশ্যকল্প দিয়ে সিনেমা, সেখানে বাস্তবতার ওপর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর থাকবে। কীভাবে বাস্তবকে রেকর্ড করা হলো অর্থাৎ তার ছবি তোলা হলো তার ওপরই নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সঙ্গে সিনেমার বাস্তবতার পার্থক্য। শিল্পে সৌন্দর্য সম্বন্ধে ক্লাইভ বেল যেমন জোর দিয়েছিলেন অর্থময় রূপের (ফর্ম) ওপর, আর্নহাইমের মতো ফিল্ম তাত্ত্বিকরাও বললেন, ইমেজকে হতে হবে বাস্তবের অতিরিক্ত কিছু অর্থাৎ অর্থময়ভাবে আয়োজিত। বালাজ ‘দি ক্রিয়েটিভ ক্যামেরায়’ বললেন, সিনেমার নির্মাণে সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণ হলো ক্যামেরা অ্যাঙ্গল, যার জন্য বাস্তবতার পুনরুৎপাদন নয়, নতুন সৃষ্টি সম্ভব হয় (থিওরি অফ দি ফিল্ম, ১৯৫২)। সিনেমায় দৃশ্যকল্পের যে-অনন্যতা, তার পেছনে রয়েছে (এবং থাকা উচিত) ক্যামেরার এই ক্ষমতার সৃজনশীল ব্যবহার। বস্ত্তর বা দৃশ্যের সচেতন নির্বাচন এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যামেরা তার এই ভূমিকা পালন করে। ক্যামেরাকে বাস্তবের পুনরুৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হলে তার সৃজনশীল সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করা হয়। আর্নহাইম চ্যাপলিনের সিনেমাকে সত্যিকার অর্থে সিনেমা বলতে চাননি, কেননা সেখানে বাস্তবের হুবহু পুনরুৎপাদন করা হয়েছে। বোথা রবার্ট ওয়েনের দি ক্যাবিনেট অফ ড. ক্যালিগ্যারি সিনেমার মঞ্চসজ্জায় সৃজনশীল  মনের  প্রকাশ  দেখে  এতই অভিভূত হয়েছিলেন যে, একে তিনি বলেছেন প্রথম কল্পনাভিত্তিক সিনেমা, যেখানে সিনেমার নান্দনিকতা স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর কাছে বার্থ অব দি নেশন পছন্দ হয়নি এই জন্য যে, সেখানে আব্রাহাম লিংকনের ঘর এবং থিয়েটারের হুবহু বাস্তব প্রতিরূপ ব্যবহৃত হয়েছে (দি ফিল্ম টিল নাউ, ১৯৪৯)।

ক্যামেরা যে বাস্তবতার রেকর্ড করে, তাকে কমপোজিশন, আলোকসম্পাত, শব্দ এবং গতির বিন্যাস (প্যাটার্ন ইন মোশন) দ্বারা সংশোধন, পরিবর্ধন ইত্যাদি করা সম্ভব কিন্তু তবু তার বৈশিষ্ট্য ঘটনার বা দৃশ্যের রেকর্ড করা হিসেবেই চিহ্নিত হয়। এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের জন্য প্রমাণ করতে হয় যে, সিনেমা নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অন্যান্য প্লাস্টিক আর্টের মতোই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বা সুযোগ রয়েছে। এই ক্ষমতা বা সুযোগ এসেছে সম্পাদনা বা মন্তাজের মাধ্যমে। যেহেতু ফিল্ম স্ট্রিপ যে-কোনো জায়গায় কেটে অন্য স্ট্রিপের সঙ্গে জোড়া দেওয়া যায় তার ফলে সিনেমার ইমেজের ভেতর যে স্থান-কালের স্বতঃস্ফূর্ত পুনঃসৃষ্টি হয় তার ওপর সিনেমা-নির্মাতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। যেসব ঘটনা নিরবচ্ছিন্ন নয় এবং যা নিরবচ্ছিন্ন, উভয়কেই তার পক্ষে পাশাপাশি দেখানো সম্ভব হয়। ক্যামেরার সৃষ্টি দৃশ্যকল্পে সৃজনশীলতা নিশ্চিত করতে এডিটিং এবং মন্তাজের (অনেকের কাছে একই) ভূমিকা নিয়ে গ্রিফিথ, পুডোভকিন, আইজেনস্টাইন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এখন দেখা যাক কিছু দৃশ্যকল্পের সৃষ্টি কেন করা হয় এবং কীভাবে। এর মাধ্যমে সিনেমার ভাষায় কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এই প্রকরণের গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করা সম্ভব হবে।

ক্লোজ-আপ, লং শট, লো-অ্যাঙ্গল শট, হাই অ্যাঙ্গল শট, এসবই ক্যামেরার যান্ত্রিক ভাষাকে সৃজনশীল করার উপায়। এর সঙ্গে যোগ করা যায় ফ্রেম এবং মিজ আঁসিঁ অর্থাৎ ফ্রেমের ভেতর কী থাকবে, সেই পরিকল্পনা। ভিস্যুয়াল ইমেজ এই সবকিছু নিয়েই। এদের সাহায্যে কাহিনির বর্ণনা যেমন করা হয়, একই সঙ্গে কোন ইমেজের ভেতর কোন অর্থ প্রকাশ করা হচ্ছে তার ইঙ্গিতও থাকে। সিনেমার কাহিনি ইমেজের সমাহারেই মূলত হয়ে থাকে বলে এর তুলনামূলকভাবে ভূমিকা প্রধান।

সিনেমার ভিস্যুয়াল ইমেজ অনেক কিছু নিয়েই হয় – মানুষ, পশুপাখি থেকে শুরু করে নিষ্প্রাণ বস্ত্ত এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য। মানুষ কথা বলে এবং যখন বলে না, চুপ করে থাকে, তখনো তার অর্থ থাকে। ভিস্যুয়াল ইমেজে চরিত্রের কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে নিশ্চুপ থাকাও কাহিনি বর্ণনার অংশ। এটি সিনেমার ক্যামেরা ওয়ার্কে অর্থাৎ ইমেজ সৃষ্টিতে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং করা উচিত। যেমন সত্যজিতের পথের পাঁচালীর শেষ দৃশ্যে গরুর গাড়িতে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার সময় হরিহর, সর্বজয়া এবং অপুর তৃষিত নয়নে গ্রামের দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্য তাদের মনোবেদনার কথা বলে। উপন্যাসে লেখক এই মনোবেদনা অনেক কথার সাহায্যে ব্যক্ত করেছেন। অথবা দুর্গার মৃত্যুর পর অপু যখন তার চুরি করা বাক্সটি আবিষ্কার করে সেটি পুকুরে ছুড়ে ফেলার পর ভাসমান শেওলা ছড়িয়ে গিয়ে শূন্যতা সৃষ্টি এবং তারপর সেই শূন্যতা পূরণ করে  শেওলাগুলির ফিরে আসার দৃশ্যে অতীতকে এবং গোপন একটি সত্যকে ঢেকে দেওয়ার ব্যঞ্জনা মূর্ত হয়েছে। উপন্যাসে এই দৃশ্য নেই, কেবলই বাঁশবাগানে গিয়ে অপুর বাক্সটি ছুড়ে ফেলা এবং আপন মনে বলা, ‘থাক এখানে’ আছে। অথবা হরিহরের চিঠি পাওয়ার পর সমস্ত পরিবারের মনে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের কথা বলতে গিয়ে বৃষ্টিস্নাত পুকুরে ফড়িং ও পোকামাকড়ের আনন্দিত সঞ্চরণের দৃশ্য। সিনেমা আদিতে নির্বাক ছিল এবং এই ধরনের ভিস্যুয়াল ইমেজই ছিল তার প্রকাশের বাহন। প্রচুর উন্নতি ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের পরও ভিস্যুয়াল ইমেজের ওপর এই নির্ভরতা ও প্রাধান্যকেই বলতে হয় সিনেমার ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য। এইজন্য সিনেমার নান্দনিকতায় এর ভূমিকা অন্যসব কিছু অতিক্রম করে যায়।

 

দৃশ্যবন্ধ (মিজ আসিঁ)

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী ক্যামেরার শটকে মনে করা যেতে পারে সিনেমার ভাষার একটি শব্দ (ওয়ার্ড)। কয়েকটি শট নিয়ে তৈরি হয় ‘সিন’ বা দৃশ্য, যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বাক্যের। বেশ কয়েকটি ‘সিন’ নিয়ে যখন তৈরি হয় ‘সিকোয়েন্স’ তার সঙ্গে তুলনা করা যায় কয়েকটি বাক্য নিয়ে গঠিত অনুচ্ছেদের (প্যারাগ্রাফের)। বলা বাহুল্য, এটি খুব সহজীকরণ এবং সিনেমার প্রচলিত ভাষার সঙ্গে এই তুলনায় সীমাবদ্ধতা আছে, যার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে। শটের পরিবর্তে একটি দৃশ্য (সিঙ্গল ইমেজ) বা ফ্রেমকেও যদি মনে করা যায় সিনেমায় ভাষার ক্ষুদ্রতম ও মূল ইউনিট এবং সেই অর্থে শব্দের সমতুল্য, তাহলে তাও যে পুরোপুরি সঠিক হবে না, সে-কথাও আগে বলা হয়েছে। ‘শট’ অর্থের দিক দিয়ে ‘শব্দের’ সমতুল্য হোক না হোক, শট দিয়েই হাতেনাতে (প্র্যাকটিক্যাল) সিনেমা তৈরি শুরু হয়।

কিসের শট নেওয়া হবে এবং কীভাবে শট নেওয়া যাবে, এই দুটি প্রশ্নের উত্তরই চিত্রনাট্যে উল্লিখিত থাকে। ক্যামেরার সাহায্যে ছবি তুলতে গিয়ে এই ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য থেকে সরে আসাও যায় এবং প্রায়ই তা হয়। কিন্তু চিত্রনাট্য এ-বিষয়ে একটা নির্দেশনা বা ইঙ্গিত দেয়। এই দুটি প্রশ্ন মূলত যে-বিষয় নিয়ে, ফরাসি ভাষায় তাকে বলা হয়েছে ‘মিজে আঁসিঁ’ বা দৃশ্যবন্ধ। এই দৃশ্যবন্ধের নির্ধারণে চিত্রনির্মাতা যেসব সংকেত-নিয়ম (কোডস) ব্যবহার করেন তার সাহায্যেই সিনেমা বিষয়ে দর্শকের উপলব্ধি নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্তত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শট বলতে যেহেতু অর্থের ছোট এবং বড় ইউনিট, দুই-ই বোঝানো যেতে পারে, সেই জন্য এর আলোচনায় দুটি অংশের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া সংগত হবে।

প্রথম অংশে রয়েছে ফ্রেমের ভেতর দৃশ্য। ফ্রেমের ভেতর যেসব সংকেত-নিয়ম (কোডস) রয়েছে, অন্যান্য দৃশ্যশিল্পের (ভিস্যুয়াল আর্টস) সঙ্গে তার সাদৃশ্য দেখা যায়। দৃশ্যশিল্পে রেখা, আকার এবং রঙ – এই তিনটি মূল বিষয়ের যে-ভূমিকা, তার সঙ্গে সিনেমার দৃশ্যবন্ধে যে সংকেত-নিয়ম ব্যবহার করা হয় তার কোনো না কোনোটির মিল আছে। রুডলফ আর্নহাইম সিনেমার দৃশ্যবন্ধে (মিজ আঁসিঁ) দশটি বিষয়ের বা সংকেত-নিয়মের (কোড) উল্লেখ করেছেন : ভারসাম্য, আকার, গড়ন (শেপ), বেড়ে ওঠা (গ্রোথ), জায়গা (স্পেস), আলো, রঙ, নড়াচড়া (মুভমেন্ট), উত্তেজনা (টেনশন) এবং অভিব্যক্তি (এক্সপ্রেশন)। সিনেমায় ফ্রেমের ভেতর যে-দৃশ্য তার গঠনে (সেনট্যাক্স) এসব সংকেত নিয়মের কিছু ব্যবহার আলোচনা করা যেতে পারে।

প্রথমেই ফ্রেমের ভেতর যে দৃশ্য, তার দুটি দিকের প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এর একটি হলো ফ্রেমের কারণে দৃশ্যের সীমাবদ্ধতা এবং দ্বিতীয়টি ফ্রেমের অন্তর্গত দৃশ্যের গঠন (কমপোজিশন)। ফ্রেম সীমানা চিহ্নিত করে বলেই  কমপোজিশনের বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা ভাবা যায়। সিনেমার প্রথম পর্বে পর্দায় প্রতিফলিত ছবির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত বা হার সম্বন্ধে সাধারণভাবে স্ক্রিনের জন্য ৪ : ৩ হারে (প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য) ছবি তোলাই ছিল নিয়ম। সেই জনপ্রিয় সাধারণ অনুপাতকে প্রমিত করে আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার্স ১ : ১.৩৩ বা ১.৩৩ এই আনুপাতিক হারে। অবশ্য প্রস্থ ও দৈর্ঘ্যের জন্য এটিই একমাত্র আনুপাতিক হার ছিল না, যদিও অ্যাকাডেমি-প্রচলিত এই প্রমিত আনুপাতিক হারই ছিল সাধারণভাবে ব্যবহৃত। ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ অ্যাকাডেমির এই হারই ব্যবহার করেছেন বেশি। কেবল মাঝে মাঝে ঢেকে দিয়ে (মাস্ক) ফ্রেমের ভেতর ইমেজের আকার তিনি বদলে দিয়েছেন কখনো কখনো। যখন শব্দ (সাউন্ড) সংযোজিত হয় এবং ফিল্ম স্টকের পাশে সাউন্ড ট্র্যাক অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন প্রস্থ ও দৈর্ঘ্যের আকৃতি হয়ে যায় স্কয়ার অর্থাৎ সমান সমান। কিন্তু কিছু পরেই অ্যাকাডেমির অনুসরণে ফ্রেমের ভেতরকার যে-স্পেস ব্যবহার করা হবে, তার আয়তন কমিয়ে এনে আবার ১.৩৩ আনুপাতিক হারে প্রত্যাবর্তন করা হয়। সাধারণভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এই অনুপাত ব্যবহার প্রায় গুপ্ত রহস্যের (মিস্টিক্যাল) মর্যাদা পেয়ে যায়। অনেক ফিল্ম টেক্সটে এখনো ক্ল্যাসিক্যাল শিল্পকলা ও স্থাপত্যে সোনালি সীমানা (গোল্ডেন সেকশন বা গোল্ডেন মিন) বলতে যে অলৌকিক বা অতীন্দ্রিয় রহস্যময় সূত্র প্রকৃতির সর্বত্র দেখা যায় বলে বিশ্বাস করা হয়েছে তার সঙ্গে ১.৩৩ ফ্রেমের অন্তর্গত প্রস্থ ও দৈর্ঘ্যের এই আনুপাতিক হারকে তুলনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘সোনালি সীমানা’ পাওয়ার সূত্র ছিল : ক/খ= খ/(ক+খ) যেখানে আয়তক্ষেত্রের ছোট অংশের অর্থাৎ দৈর্ঘ্যের মাপ হলো ‘ক’ এবং বড় অংশের অর্থাৎ প্রস্থের মাপ হলো ‘খ’। ‘সোনালি সীমানার’ যে গাণিতিক সংখ্যা, সেটি যুক্তিপূর্ণ হোক আর না-ই হোক, এর সঙ্গে ১ : ১.৬১৮, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের মধ্যে এই আনুপাতিক হারের মিল রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ইউরোপীয় সিনেমায় ওয়াইড স্ক্রিনে যে আনুপাতিক হার ব্যবহৃত হয় সেটি এই অঙ্কের খুব কাছাকাছি। অবশ্য এর সঙ্গে অ্যাকাডেমি-প্রচলিত ১.৩৩, এই আনুপাতিক হারের (প্রস্থ ও দৈর্ঘ্য) অনেক দূরত্ব রয়েছে। অ্যাকাডেমি-প্রচলিত আনুপাতিক হার ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ শুরু হওয়ার বিশ বছর পর্যন্ত প্রভাবশালী ছিল এবং চিত্রনির্মাতারা তার অনুসরণ ও ব্যবহার করেছেন। টেলিভিশনের ফ্রেমের প্রমিতকরণ (স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন) এই আদর্শের সূত্রের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছে। ফিল্মের ফ্রেমের আকার নির্ধারণে অ্যাকাডেমির সূত্র এখন তেমন কার্যকর না হলেও ফ্রেমের অন্তর্গত কমপোজিশনের ওপর তার প্রভাব অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

১৯৫০-এর দশক থেকে স্ক্রিনে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আনুপাতিক হার (অ্যাসপেক্ট রেশিও) নির্ধারণে চিত্রনির্মাতাদের জন্য বেশ বিস্তৃত সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। মূলত দুটি পদ্ধতিতে ওয়াইড স্ক্রিনে আনুপাতিক হার নির্ধারিত হয়ে থাকে। প্রথম এবং সহজতর পদ্ধতি হলো ওপর ও নিচ অংশ ঢেকে দিয়ে (মাস্ক) দুটি ফ্ল্যাট ওয়াইড স্ক্রিন আনুপাতিক হার ব্যবহার করা। যেমন, ইউরোপে ১.৬৬ এবং আমেরিকায় ১.৮৫। ঢেকে দেওয়ার জন্য অবশ্য ফ্রেমের ভেতর অনেক অংশ ব্যবহারের বাইরে থাকে, যার ফলে ইমেজের প্রক্ষেপণ বিঘ্নিত হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতির নাম হয়েছে ‘সিনেমাস্কোপ’। ফ্রেমের অংশ ঢেকে দেওয়ার (মাস্কিং) চেয়ে ওয়াইড স্ক্রিনে আনুপাতিক হার নির্ণয়ের দ্বিতীয় পদ্ধতি ফ্রেমের ভেতর অনেক জায়গা ব্যবহার করতে পারলেও এর জন্য ক্যামেরার যে-লেন্সের (এনামর্ফিক) প্রয়োজন তার দাম অনেক। সেসব লেন্সের সংখ্যাও বেশ কম ছিল। এনামর্ফিক লেন্সের ব্যবহার স্বাভাবিক দৈর্ঘ্য-প্রস্থের স্ক্রিনের জন্য যে তথ্য বা ইমেজ সামঞ্জস্যময় বা যথাযথ তার চেয়ে দুই গুণ বড় স্ক্রিনে ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে ছবির মধ্যে দানাদার (গ্রেইন) অংশ বড় হয়ে দেখা দেয় এবং ইমেজও অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়।

চিত্রনির্মাতারা ওয়াইড স্ক্রিন নিয়ে অনেক দিন থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকের প্রথম দিকে টেলিভিশন আবির্ভাবের পর সিনেমা যে হুমকির মুখোমুখি হয় তার ফলেই সিনেমায় ওয়াইড স্ক্রিনের ব্যবহার প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে গিয়েছিল বলা যায়। ১.৩৩, স্ক্রিনের এই আনুপাতিক হার টেলিভিশনের জন্য ছেড়ে দিয়ে সিনেমায় ওয়াইড স্ক্রিনের ব্যবহার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে ‘সিনেরামা’ পদ্ধতিতে তিনটি ক্যামেরা ও তিনটি প্রজেক্টর নিয়ে ১৯৫২ সালে এই ব্যবহার শুরু হলেও একটি ক্যামেরাভিত্তিক ওয়াইড স্ক্রিন হিসেবে ‘সিনেমাস্কোপ’ এবং পরে ‘প্যানাভিশন’ নামে ওয়াইড স্ক্রিন সিনেমার প্রচলন হয়। ১৯৫০-এর দশকে সিনেমাস্কোপের সঙ্গে যে ওয়াইড স্ক্রিন পদ্ধতি প্রতিযোগিতায় নামে সেই ‘ভিস্টাভিশন’ পদ্ধতি টিকতে না পারলেও দৈর্ঘ্য-প্রস্থের আনুপাতিক হার পছন্দ করার ক্ষেত্রে বেশ বিস্তৃত পরিসরে সুযোগের সৃষ্টি হয়। ভিস্টাভিশন পদ্ধতি থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ফিল্ম যদি বড় হয় (মিলিমিটারের ভিত্তিতে) তাহলে বেশ প্রাঞ্জলভাবে ওয়াইড স্ক্রিনের জন্য ছবি তোলা সম্ভব হবে। এই সূত্রের অনুসরণে ৬৫ এবং ৭০ মিলিমিটার ফিল্ম স্টক তৈরি করা শুরু হয়, যদিও এই নিয়ে গবেষণার সূত্রপাত হয় ১৯০০ সাল থেকে। ভিস্টাভিশনের দ্বিতীয় যে-সূত্র প্রতিষ্ঠিত হয় তা ছিল এই যে, ফটোগ্রাফির জন্য পদ্ধতি আর ডিস্ট্রিবিউশন এবং প্রজেকশনের পদ্ধতি এক হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এর ফলে অনেক ধরনের আনুপাতিক হার পাওয়া গেল, যার কিছু ফটোগ্রাফির জন্য, কিছু ডিস্ট্রিবিউশন প্রিন্টের জন্য, আবার কিছু উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য।

প্রথম দিকে ছবি তোলার জন্য অ্যাকাডেমি অ্যাপারচারে ১ : ৩৩ অনুপাতে ছবি তোলাই সাধারণ ছিল। ওয়াইড স্ক্রিনের অনুপাত জনপ্রিয় হওয়ার ফলে অ্যাকাডেমি অ্যাপারচারে যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা যেত তার অবসান হয়ে যাওয়ার জন্য তখনকার সিনেমা-নন্দনতত্ত্ববিদেরা আহাজারি করলেও এই পরিবর্তনে গুরুতর কোনো ক্ষতি হয়নি। তার জন্য সিনেমার নান্দনিকতা (দৃশ্যকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে) বিপন্ন হয়েছে বলা যায় না। কোন অনুপাত যথাযথ, এই প্রশ্নের চেয়ে সিনেমায় ব্যবহৃত কোন সংকেত-নিয়ম (কোড) কোন অনুপাতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হতে পারে বা প্রয়োগ করা যায়, সেই প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের আগে ঘরের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য এবং সংলাপই সিনেমায় প্রাধান্য পেয়েছে। ওয়াইড স্ক্রিন উদ্ভাবিত হওয়ার পর বহির্দৃশ্য, লোকেশন এবং অ্যাকশন সিকোয়েন্স গুরুত্ব লাভ করে। অ্যাকশন এবং ল্যান্ডস্কেপের যে সংকেত-নিয়ম (কোডস), তাদের ব্যবহারের জন্য ওয়াইড স্ক্রিন বেশ উপযোগী মনে হয়। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার এই অগ্রগতির জন্য ফ্রেমের ভেতর দৃশ্যের সীমানা বেড়েছে এবং তার ভেতর ছবির কমপোজিশনের সম্ভাবনাও প্রসারিত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ আর বহির্দৃশ্যের শটের সমন্বয়ে সিনেমার বৈচিত্র্য শুধু নয়, নান্দনিকতার উৎকর্ষ লাভের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। কিন্তু যদি কেবল ওয়াইড স্ক্রিনের জন্যই ছবি তোলা হয়, যেমন সিনেমাস্কোপে অথবা প্যানাভিশনে, তাহলে ১ : ৩৩ স্ক্রিন সাইজের জন্য যে ক্ল্যাসিক দুই শট (টু শট) পদ্ধতিতে অভিনেতা ও অভিনেত্রীর ওপর গভীর মনোযোগ দিতে পারা যেত, তা আর সম্ভব হয় না। ওয়াইড স্ক্রিনের যে-অনুপাত (২ : ৩৩ এবং ঊর্ধ্বে) তার ভেতর এত কিছু এসে যায় যে কেবল চরিত্রের ওপর ফোকাস নিবদ্ধ থাকে না। কিন্তু একে ভালো বা মন্দ বলা যাবে না, কেননা এর ফলে দুই শটের (টু শট) যে সংকেত-নিয়ম (কোড), তার পরিবর্তন ঘটে। তাছাড়া চিত্রনির্মাতা ছবি তোলার সময় ঢাকনির (মাস্ক) ব্যবহার করে ফ্রেমের ভেতর কমপোজিশনের আকারে তারতম্য ঘটাতে পারেন।

ফ্রেমের আকারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো ফ্রেমের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি। যদি ফ্রেমের অন্তর্গত দৃশ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় তাহলে একে বলা যায় ‘ক্লোজ ফ্রেম’। এর বিপরীতে পরিচালক যদি ফ্রেমের ভেতর শটের কমপোজিশন এমনভাবে নির্ধারণ করেন যে এটি ফ্রেমের বাইরে, এ-কথা মনে না করে উপায় থাকে না, তাহলে একে বলা হয় ‘ওপেন ফ্রেম’। ফ্রেমের ভেতর মুভমেন্টের সঙ্গে ক্লোজ এবং ওপেন ফ্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। যদি কোনো চরিত্র ফ্রেম থেকে বেরিয়ে বাইরে চলে যায় এবং আবার প্রবেশ করে তাহলে ‘ওপেন ফ্রেম’ প্রাসঙ্গিক হবে। ফ্রেমের ভেতরকার মুভমেন্ট এবং ক্যামেরার মুভমেন্টের সম্পর্কের সঙ্গে সংকেত-নিয়ম (কোড) সংশ্লিষ্ট। হলিউডের ক্ল্যাসিক কমপোজিশনে ক্লোজড ফর্মই ছিল প্রধান। পঞ্চাশের দশকে ইতালির মাইকেল অ্যাঞ্জেলো এন্টোনিয়নি এবং অন্যান্য পরিচালক ওয়াইড স্ক্রিনে চিত্রের মধ্যবর্তী স্পেস দেখানোর সুবিধাকে উন্নত পর্যায়ের ক্যামেরা ওয়ার্ক মনে করে এর ব্যবহার শুরু করেন।

কমপোজিশনের গঠনে যেসব উপাদান তার সবই ফ্রেমের ওপর তাদের অবস্থানের জন্য বা শনাক্তকরণের ওপর নির্ভর করে না। যদি ফ্রেমিং (কোডের) আঙ্গিক ব্যবহারে ফ্রেমের চারদিক অস্পষ্ট হয়ে যায় তাহলে মৌলিক আগ্রহ, নৈকট্য, গভীরতার উপলব্ধি, দৃষ্টিকোণ (অ্যাঙ্গল অফ অ্যাপ্রোচ) এবং আলোকসম্পাত – এইসব  সংকেত-নিয়মের (কোডস) মধ্যেও একইভাবে কার্যকর হতে পারে, যেমন সম্ভব সুস্পষ্ট সীমানা চিহ্নিত ফ্রেমের ভেতর।

অন্যান্য দৃশ্যশিল্পীর মতো চিত্রনির্মাতাও ত্রিমাত্রিকেই ছবির দৃশ্যের কমপোজিশন করেন। এই ক্ষেত্রে তাঁর কাজে কমপোজিশনের তিন ধরনের নিয়ম-সংকেত ব্যবহৃত হয়। প্রথমত দৃশ্যের সমতল বা দ্বিমাত্রিক। দ্বিতীয়ত নিয়ম-সংকেত হলো কমপোজিশনে যে-স্থানের দৃশ্য শটে নেওয়া হয়, তার ভৌগোলিক রূপরেখা (যা সমতল ভূমি এবং দিগন্তের সমান্তরাল)। তৃতীয় নিয়ম-সংকেতের ক্ষেত্রে রয়েছে গভীরতা উপলব্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সমতল, যা ফ্রেমের এবং ভৌগোলিক সমতলের সঙ্গে উল্লম্ব। স্বাভাবিকভাবেই এই তিনটি সমতল পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। কোনো বিশেষ সমতল কীভাবে কমপোজিশনকে প্রভাবান্বিত করে, এ-বিষয়ে বিশদভাবে বিশ্লেষণ না করলেও চিত্রনির্মাতা সমতলের জুড়ির (পেয়ার) ওপর দৃষ্টি রেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। স্পষ্টতই ফ্রেমের সমতল এখানে প্রধান হবে, কেননা পর্দায় এই সমতলই দেখা যায়। কিন্তু ফ্রেমের সমতলের কমপোজিশন গঠনে ভৌগোলিক সমতলের ভূমিকা থাকে, কেননা ক্যামেরা চালককে ভৌগোলিক সমতলেই ফ্রেমের সমতল গঠন করে নিতে হয়। একইভাবে ভৌগোলিক সমতল এবং গভীরতা উপলব্ধির সমতল (ডেপথ পারসেপসন প্লেন) সমন্বিত (কম্বাইন্ড), কেননা দ্বিমাত্রিক এবং ত্রিমাত্রিক উপস্থাপনায় (রিপ্রেজেন্টেশন) উপলব্ধির যে-ক্ষমতা বা দক্ষতা তা ভৌগোলিক সমতলের ওপরই নির্ভর করে। প্রকৃতপক্ষে গভীরতা বা দূরত্বের উপলব্ধি দূরবীক্ষণ জাতীয় দৃষ্টি ক্ষমতার আঙ্গিক ছাড়াও অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে, যার জন্য সিনেমার ত্রিমাত্রিকতার এমন শক্তিশালী সাড়া সৃষ্টি সম্ভব হয়। এই কারণেই থ্রি-ডির মতো স্টেরিওস্কোপিক ফিল্ম টেকনিক তুলনামূলকভাবে অকার্যকর মনে হয়। থ্রি-ডি ফিল্ম টেকনিক দর্শকদের দূরত্ব সম্পর্কিত ধারণাকে বিকৃত করে, কেননা এই টেকনিকে কোনো একটি সমতলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা সম্ভব হয় না। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি আঙ্গিকে সিনেমা তৈরি হলে একই মন্তব্য প্রযোজ্য হবে।

নৈকট্য (প্রক্সিমিটি) এবং অনুপাত (প্রোপোরশন) দৃশ্যকল্পে (মিজ আঁসিঁ) গুরুত্বপূর্ণ উপ-সংকেত পদ্ধতি (সাবকোড)। বিষয় (চরিত্র বা বস্ত্ত) যত কাছে তাদের ততই গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে। থিয়েটারে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী অন্য চরিত্র দ্বারা গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারে কমপোজিশনের সমতলে অবস্থানের কারণে; কিন্তু সিনেমায় পরিচালক কোনো দৃশ্যবন্ধে চরিত্র ও বস্ত্তর অবস্থানের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন। রিভার্স অ্যাঙ্গল ব্যবহার করে তিনি দৃশ্যের অন্তর্গত চরিত্র ও বস্ত্তর ভেতর ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন। সিটিজেন কেইনের এক দৃশ্যে নৈকট্য ও অনুপাতে বা মাত্রার সুন্দর দৃষ্টান্ত আছে। কেইন তার স্ক্রিপট রাইটারকে নিয়ে দৃশ্যের পেছনে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। মাঝখানে বিছানায় শুয়ে আছে তার স্ত্রী এবং দৃশ্যের সামনে ঘুমের ওষুধের বোতল বড় আকারে দেখা যাচ্ছে। এখানে ঘুমের ওষুধের ব্যবহারের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই প্রাধান্য না দিয়ে দৃশ্যটির কমপোজিশন উলটে দিলেই বোতল চলে যাবে পটভূমিতে এবং কেইনের প্রবেশই প্রাধান্য পাবে তখন। কাহিনির বর্ণনায় কোন দৃশ্যে কী প্রাধান্য পাবে সেইসব সাব-কোডের ওপরই নির্ভর করবে কমপোজিশনের সমতলে তারা (সাব-কোড) কীভাবে ক্রিয়াশীল হবে। কমপোজিশনের প্রধান দায়িত্বই হলো ফ্রেমের ভেতর সামঞ্জস্য বিধান।

ফ্রেমের সমতল অর্থাৎ কমপোজিশনের সমতলই সিনেমায় একমাত্র এবং প্রকৃত সমতল। এই সমতলেই কমপোজিশনের প্রায় সব উপাদান অন্তর্ভুক্ত এবং ব্যক্ত হয়। শূন্য ফ্রেম হলেই সেটি বিষয়হীন হয় না, দ্বিমাত্রিক ডিজাইনেও গভীরতার কল্পনা, ওপরে এবং নিচের অ্যাঙ্গলে কোণের উপস্থিতি এবং বাঁয়ে ও ডানে অপস্রিয়মাণ এবং অনুপ্রবেশকারী আকারের কল্পনা করা হয়, যার ফলে শূন্য ফ্রেম শূন্য থাকে না। সুতরাং দৃশ্যে বস্ত্ত বা মানুষের প্রতিকৃতি আসার আগে শূন্য ফ্রেমের ভেতরও অর্থ থাকে। ফ্রেমের ওপর দিকের তুলনায় নিচের দিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর ডানদিকের আগে বাঁদিক আগে আসে। নিচের দিক ওপরের দিকের তুলনায় বেশি স্থির। ফ্রেমে উল্লম্বের চেয়ে সমান্তরালকে মনে করা হয় দীর্ঘতর।

 

শটের ফ্রেম

ছবি অাঁকার মতো সিনেমার শটও ফ্রেমের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। ফ্রেমের ভূমিকা হলো যে-শট নেওয়া হয় তাকে অর্থময় করা। এটি করতে গিয়ে শটের পূর্বাপর পরিপ্রেক্ষিত মনে রাখতে হয়। একটি শট কমপোজ করা বা নির্ধারণ করাই ফ্রেমিংয়ের কাজ। শিল্পী যেমন ক্যানভাস কেমন দেখাবে মনে করে ছবি অাঁকেন, সিনেমা নির্মাতাও তেমনভাবে সিদ্ধান্ত নেন এই ক্ষেত্রে। এটিও একটি শিল্পকর্ম এবং ফ্রেমিংয়ের নান্দনিকতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সিনেমা-নির্মাতার ক্যানভাসই হলো ফ্রেম, সেলুলয়েডের সেই অংশ যেখানে ইমেজকে ফুটিয়ে তোলা হয়। চিত্রকরের মতো সিনেমা-নির্মাতাকেও যেসব ধারণা বা দৃশ্য অথবা নাটকীয় বিষয় দেখাতে চান সেসব ফ্রেমের ডিটেইলসে ধারণ করতে হয়। মিজ অাঁ সিঁর আলোচনায় এর উল্লেখ করা হয়েছে। ফ্রেমিংয়ের জন্য ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম না থাকলেও কয়েকটি নীতির উল্লেখ করা যায় :

(ক) খুব ঘনবদ্ধ অর্থাৎ সীমিত ফ্রেমিং করা হলে বিষয় ফ্রেমের সমান্তরাল ও উল্লম্ব সীমারেখার ভেতর আটকে যায়, যার ফলে স্ক্রিনের বাইরে কোনো স্পেসের কথা ভাবা যায় না। এটা এক ধরনের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার মতো অবস্থা। কোনো চরিত্রের অসহায়ত্ব বা আত্মসমর্পণের ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলার জন্য ঘনবদ্ধ বা টাইট ফ্রেমিংয়ের ভেতর শট নেওয়া হয়ে থাকে। এই প্রয়োজন কেবল বিশেষ ক্ষেত্রেই হয়।

(খ) ফ্রেমিং কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। যা কিছু ফ্রেমে প্রাধান্য পাওয়ার কথা, তাকে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করতে হবে, কিন্তু মাঝখানে কখনই নয়। মাঝখানে হলে গভীরতার বোধ হারিয়ে যায়, কেননা তখন মনে হবে বিষয়টি ফ্রেমের ভেতর আটকে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখাতে হয়, যেমন দুর্ঘটনায় মৃত্যু অথবা আত্মহত্যা, তাহলে একপাশে দেখানোই ভালো।

(গ) সমান্তরাল এবং উল্লম্ব কমপোজিশনস দ্বারা ঐক্য বা ভারসাম্য বোঝানো হয়। অপরদিকে কোনাকুনি (ডায়াগনাল) বা তির্যক (অবলিক) কমপোজিশন অস্থিরতা বা উত্তেজনার পরিচায়ক। আইজেনস্টাইনের পটেমকিন ছবিতে জাহাজের মাস্ত্তল, নাবিকদের উত্থিত হাত এবং তীরে জনগণের হাত নাড়ানোর ভঙ্গিতে ঐক্য সূচিত হয়েছে, যা কসাক সৈন্যরা ওডেসা সোপানে এসে ভেঙে দেয়। সোপানে তাদের যে কোনাকুনি ছায়া পড়ে তা ঐক্যের ভারসাম্য বিনষ্ট করে। ‘ক্যান্টে শট’ (যা ‘ডাচ অ্যাঙ্গল শট’ নামেও পরিচিত) তির্যক কমপোজিশন সৃষ্টি করে, যেখানে ফ্রেমকে ভারের নিরিখে অসমান মনে হয় (লপ সাইডেড)। থার্ড ম্যান সিনেমায় ক্যারল রিড এই ধরনের ফ্রেম ব্যবহার করে সবকিছু উল্টোপাল্টা করে অনেকটা সেই ভাব আনতে চেয়েছেন। কোথাও কোথাও তির্যক কমপোজিশন এমন তির্যক হতে পারে যে, মনে হবে ফ্রেম পড়েই যাবে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।

কখনো উল্লম্ব ফ্রেমিং ইচ্ছা করেই কৌতুককর করা হয়। যদিও উল্লম্ব ফ্রেমিং আশাবাদ ব্যক্ত করে কিন্তু চরিত্রের জন্য যে-পরিণতি অপেক্ষা করছে এই ফ্রেমের ভেতর তা যদি হয় বিয়োগান্ত বা করুণ, তাহলে উল্লম্ব ফ্রেমিংয়ের ব্যবহার ঠাট্টা (আয়রনি) হিসেবেই করা হয়।

চরিত্রের মুখের ওপর যদি উল্লম্ব রেখা পড়ে তাহলে তার মধ্যে রহস্য, বন্দিত্ব এবং প্রত্যাখ্যান বোঝানো হয়। লাভস অফ কারমেনে রিটা হেওয়ার্থ যখন গোলাকার বিন্দুর (বিডস) তৈরি পর্দার পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন মুখে লম্বা দাগ পড়ে তাকে রহস্যময়ী দেখায় এবং বিপজ্জনক করে তোলে।

(ঘ) জ্যামিতিক কমপোজিশন একই সঙ্গে দৃশ্যগতভাবে আকর্ষণীয় এবং প্রতীকী হতে পারে। কার্ল ইয়ুংয়ের মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী একটি বৃত্ত সম্পূর্ণতার প্রতীক, যার ভিত্তিতে একতা এবং সাধারণ চরিত্র বোঝানো হয়। সাহারা সিনেমায় হামফ্রে বোগার্ট যখন চক্রাকারে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের মধ্যে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দেয়, তখন এই একতার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো ফ্রেমের ভেতর যদি তিনটি চরিত্র থাকে, তাহলে ত্রিকোণ কমপোজিশন তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে পারে, যেমন ফ্রান্সোয়া ট্রুফোঁর জুলে অ্যান্ড জিম ছবিতে দুই বন্ধু তাদের একই বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কিত, এটা বোঝানোর জন্য কিছু দৃশ্যে ত্রিকোণ কমপোজিশনে তাদের দেখানো হয়েছে।

(ঙ) ফ্রেমের ভেতর কমপোজিশনে কোনো নির্মিত প্রতিমূর্তির (ছবি বা ভাস্কর্য) ব্যবহার খুব স্পষ্ট হলে বা প্রাধান্য দেওয়া হলে তা আরোপিত মনে হবে। লুই বুনুয়েলের ভিরিডিয়ানা সিনেমায় ভিখিরিদের টেবিলে বসে আহারের দৃশ্যের সঙ্গে লাস্ট সাপারের তুলনা করার প্রচেষ্টায় কোনো সূক্ষ্মতা নেই। আবহসংগীত হিসেবে ‘হালেলুইয়া’ কোরাস ব্যবহার করে এই তুলনা আরো স্পষ্ট করা হয়েছে। তুলনায় রবার্ট আল্টম্যানের ম্যাস সিনেমায় লাস্ট সাপারের প্রতীকী ব্যবহার অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত এবং সেই জন্য নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ।

(চ) যে-অ্যাঙ্গলে কোনো বিষয় দেখা হয় তা নির্ভর করে দুটি উপকরণের ওপর : বর্ণনাভঙ্গির যথার্থতা (লজিক) এবং প্রতীকী সংশ্লেষ বা ব্যঞ্জনা। হাই-অ্যাঙ্গল শটে নিচের বিষয়কে নগণ্য বা তুলনামূলকভাবে ছোট দেখায় এবং লো অ্যাঙ্গল থেকে তোলা ছবিতে বিষয়কে দেখায় বড়। সেই জন্য হাই-অ্যাঙ্গল শট পরাজয়, অত্যাচার অথবা তুলনামূলকভাবে নিকৃষ্টতার প্রতীক হতে পারে। অন্যদিকে লো-অ্যাঙ্গল শট ক্ষমতা, প্রভুত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব এদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। সিটিজেন কেইন সিনেমায় সুসান কেইনকে প্রায়ই হাই-অ্যাঙ্গলে দেখানো হয়েছে কেননা তার ওপর স্বামীর প্রভুত্ব বেশি এবং একই কারণে স্বামীর ছবি লো-অ্যাঙ্গল থেকে তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে পরে আরো আলোচনা হবে।

(ছ) ফ্রেমের ভেতর ছবির ফোকাস নির্ভর করে কত বেশি বা কম দেখানো হবে তার ওপর। যদি চিত্রনির্মাতা চান যে একটি শটে সম্মুখভাগ, মধ্যভাগ এবং পটভূমি একইভাবে দৃশ্যমান হবে, তাহলে গভীর বা ডিপ ফোকাসের প্রয়োজন। সিটিজেন কেইনে অরসন ওয়েলস কয়েকটি কারণে ডিপ ফোকাসের ব্যবহার করেছেন : (১) গভীরতার বোধকে বেশ জোর দিয়ে বোঝাবার জন্য, (২) একটি শট থেকে অন্য শটে যাওয়ার জন্য কাটের ব্যবহার কম করার উদ্দেশ্যে (৩) এবং এমন অর্থ প্রকাশ করতে যা হয়তো অন্যভাবে আনা সম্ভব হতো না।

কখনো কখনো অগভীর ফোকাসই উপযোগী হয়। যেমন, যে ক্ষেত্রে পটভূমিকে সম্মুখভাগের চেয়ে কিছুটা অপ্রধান ও অস্পষ্ট করে দেখাবার প্রয়োজন হয়। এতে করে সম্মুখভাগের ওপর দৃষ্টিপাতে জোর দেওয়া যায়। আবার যদি এমন হয় যে, পটভূমিকে সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট না করে একটু সময় দিয়ে দেখাবার প্রয়োজন হয় তাহলেও অগভীর ফোকাস কার্যকর। অবশ্য এই ক্ষেত্রে অগভীর ফোকাসের নামকরণ হবে ব্যাক ফোকাস, যেখানে পটভূমি প্রথমে থাকে অস্পষ্ট এবং সম্মুখভাগ স্পষ্ট ও উজ্জ্বল। এর ওপরই পটভূমি স্পষ্ট হতে থাকবে এবং সেই তুলনায় সম্মুখভাগ হবে অস্পষ্ট। যদি কোনো চরিত্রের পেছনের চরিত্রকে প্রথমে গোপন করে রাখতে হয় এবং পরে তাকে দেখাবার প্রয়োজন হয় (যেমন, রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভীতিকর ছবিতে দেখা যায়) তাহলে এই ফোকাসের ব্যবহার বেশ প্রাসঙ্গিক।

ফোকাসকে ইচ্ছে করে এলোমেলো ও অবিন্যস্ত করা যায়, যার ফলে কোনো চরিত্রের দৃশ্য কখনো দৃশ্যমান আবার কখনো অদৃশ্য মনে হবে। কোনো চরিত্র যদি ধাঁধায় পড়ে বা অপ্রকৃতিস্থ হয় তাহলে এমন ফোকাসের প্রয়োজন হবে।

(জ) ফোকাসের আকার যদি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তখন ফ্রেমকে ঢাকতে (মাস্ক) হয়। এখানে অন্যান্য ফ্রেমিং টেকনিক সম্বন্ধে যে বিবেচনা রয়েছে সেসবই প্রযোজ্য। এর মধ্যে প্রধান হলো বর্ণনার যৌক্তিকতা (লজিক) এবং প্রতীকী মূল্য। যেমন, কোনো চরিত্র যদি দূরবীক্ষণ, অণুবীক্ষণ অথবা দরজার ছিদ্র দিয়ে দেখছে, এই দৃশ্য তোলা হয় তাহলে পরবর্তী শটে যথোপযুক্ত নকশা বা বাহ্যিক গঠন (কনফিগুরেশন) থাকতে হবে।

(ঝ) যদি কোনো চরিত্র দরজার সামনে থাকে তাহলে ফ্রেমের ভেতর ফ্রেম হয়ে যাবে। একে বলা হয় ডাবল ফ্রেমিং। এখানে দরজাই একটা ফ্রেম তৈরি করে নেয় আর সেইসঙ্গে থাকে শটের ফ্রেম। হলিউডের আগের সময়ে পরিচালক জন ফোর্ডের ছবিতে এই ধরনের ফ্রেমের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। দরজা অথবা তোরণের সঙ্গে প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের সম্মুখভাগের মিল থাকায় এই ধরনের ফ্রেমে বেশ নাটকীয়তা আসে।

(ঞ) এক মিনিটের বেশি স্থায়ী লং শটকেও ফ্রেমের ভেতর আনা যায়। যদিও সিনেমার ক্যামেরায় দশ মিনিটের মেয়াদেও শট নেওয়া যায়, খুব কম সিনেমা-নির্মাতাই এত সময় ধরে শট নেন বা নিতে দেবেন। হিচকক্ অবশ্য তাঁর রোপ সিনেমায় এটা করেছিলেন। এই আশি মিনিটের ছবিতে আটটি দশ মিনিটের শট ছিল। রোপ সিনেমা অবশ্য একটি নিরীক্ষাধর্মী ছবি ছিল এবং এটা খুব সফলও হয়নি। গড়পড়তা একটা শট দশ থেকে বিশ সেকেন্ডের ভেতরই নেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক শটই এর বেশি সময়ের হয়, এমনকি তিন মিনিটের শটও একটি ফ্রেমে ধরা যায়। আমেরিকান সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত লং টেক হলো অরসন ওয়েলসের (তিনি সিনেমার নান্দনিকতা বিচারে অনিবার্যভাবে বারবার আসেন) ছবি টাচ অফ ইভিলে তিন মিনিটব্যাপী ক্রেডিট সিকোয়েন্সের শট। এই দৃশ্যে একজন গাড়ির পেছনে টাইমবোমা রেখে দেয়। দুইজন গাড়িতে উঠে মেক্সিকো সীমান্তে এক শহরের পথ দিয়ে যেতে থাকে এবং মি. ও মিসেস ভার্গাসকে অতিক্রম করে। গাড়িটি পৌঁছাবার আগেই ভার্গাস দম্পতি কাস্টম চেকপোস্টে পৌঁছায়। মিসেস ভার্গাস আমেরিকান নাগরিক এবং মি. ভার্গাস একজন নারকোটিক এজেন্ট, সেই তথ্য পাওয়া যায়। এই সময় দুই আরোহী নিয়ে বোমাভর্তি গাড়িটি সেখানে পৌঁছায়। গাড়ির আরোহিণী পেছনে শব্দ শোনা যাচ্ছে, সে কথা বললেও কাস্টম কর্মকর্তা তাতে কর্ণপাত করে না। গাড়িটি সীমান্ত পার হয়ে কিছুদূর গিয়ে বোমায় বিস্ফোরিত হয়। তিন মিনিটের নিরবচ্ছিন্ন ক্যামেরার শটে সিনেমার ক্রেডিটস (লাব কুশের নাম), সিনেমার দুই প্রধান চরিত্রের (ভার্গাস দম্পতি) সঙ্গে পরিচয়, মাদক ব্যবসা যে সিনেমার প্রধান বিষয় হবে সেই সম্বন্ধে ধারণালাভ, একটি গাড়ির বিস্ফোরণে ধ্বংসের চিত্র এবং অনিশ্চয়তা ও অনির্ধারণযোগ্য ঘটনার পরিবেশ, এই সবই সৃষ্টি হয়। ওয়েলস এই সিনেমার ক্রেডিট সিকোয়েন্সকে লং টেকে (শটে) নিয়ে এবং সেই অনুযায়ী ফ্রেমে আবদ্ধ করে ক্যামেরা দ্বারা একটি অস্থিরতার আবহ সৃষ্টি করেছেন। এই লং টেকে ক্যামেরা তিন মিনিট ধরে অনবরত গতিময়।

চিত্রনাট্য দ্বারা বিশেষভাবে চিত্রায়ণের নির্দেশনা বা ইঙ্গিত অনুসরণ করে একটি ‘সিন’ একভাবে নেওয়া হয়। অথবা নান্দনিক বিবেচনা দ্বারা পরিচালিত হয়ে সেই সিনটি যেন ন্যারেটিভের মূল্য বৃদ্ধি এবং চিত্রনাট্য উন্নীত করে, এইসব বিবেচনায় চিত্রনির্মাতা এই ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। দর্শকের পক্ষে বিবেচনা না করে নির্বিচারে এই সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করা সমীচীন হবে না। তাঁকে জানতে হবে কেন এবং কোন উদ্দেশ্যে একটি শট সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তা সঠিক কি না। কাহিনির বর্ণনা বা ন্যারেটিভের প্রয়োজনই এখানে প্রধান বিবেচনা হবে।

ফ্রেমের ভেতর যখন ইমেজ দেখানো হয় তার ফলে ফ্রেম আরো অর্থবহ হয় এবং সেখানে রেখা, আকার ও রঙের বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। রেখা, আকার ও রঙের নিজস্ব গুণও আছে – যেমন, ওজন ও দিকনির্দেশনা। ইমেজের ডিজাইনে স্পষ্ট রেখা থাকলে দর্শক বাঁ থেকে ডান দিকে দেখবে। কোনো বস্ত্তর অন্তর্নিহিত হালকা তাৎপর্যকে অতিক্রম করার জন্য বড় আকারে বা আলোকিত করে দেখে তার তাৎপর্য বৃদ্ধি করা যেতে পারে। যেমন সিটিজেন কেইনের উল্লিখিত দৃশ্যের বোতলটি। রঙ দিয়েও তাৎপর্য বৃদ্ধি করা যায়, যেমন হিচককের মার্নি সিনেমায় নায়িকার কাছ থেকে নেওয়া উজ্জ্বল হলুদ পকেট বুকের শট। মার্নি যে টাকা চুরি করেছে সেটি ওই ব্যাগে এবং তার জীবন এই ধরনের চৌর্যবৃত্তির জন্যই বিপন্ন, একথা পরে জানা যাবে, যার পূর্বাভাস রয়েছে হলুদ রঙের ব্যাগের ক্লোজ-আপে। হলুদ রঙ দিয়ে উজ্জ্বল করার কারণ ব্যাগের এই ভূমিকা। কাহিনি শেষ বা  পরিণতির দিকে যাওয়ার আগেই দর্শক রঙের এই গুরুত্ব এবং ব্যাগের তাৎপর্যের আভাস পায়। রঙ এখানে প্রতীক। একইভাবে রেখা এবং আকার (ফর্ম) তাদের নিজস্ব তাৎপর্য বহন করে, আবার ফ্রেমের কমপোজিশনের অন্তর্গত হয়েও তাৎপর্যময় হয়। এরা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পরস্পর ক্রিয়াশীল থেকে সামঞ্জস্য, ভারসাম্য এবং ফলাফলের তীব্রতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। ফ্রেমের জন্য দর্শকের যে আনুষঙ্গিক প্রত্যাশা থাকে তার সঙ্গে যুক্ত হয় কমপোজিশনের সমতলের বিভিন্ন সংকেত-নিয়ম (কোড) এবং উপ-সংকেত (সাব-কোড) নিয়ম।

একসঙ্গে একাধিক ইমেজ প্রদর্শন (স্প্লিট স্ক্রিন) এবং একের ওপর অন্য দৃশ্যের আরোপণ (ডাবল এক্সপোজার) যদিও সবসময় ব্যবহৃত হয় না, নিয়ম-সংকেতের (কোডস) গুরুত্ব বৃদ্ধিতে তারা খুব সহায়ক। একইভাবে টেক্সচার যদিও সিনেমার নান্দনিকতায় খুব উল্লিখিত হয় না, কিন্তু এর গুরুত্ব প্রয়োগ অনস্বীকার্য। এই গুরুত্ব কেবল বিষয়ের নিজ গুণের জন্য নয়, ইমেজের টেক্সচার বা দানাদার অমসৃণতার (গ্রেইন) চরিত্রের জন্যও। সিনেমায় বা ফটোগ্রাফিতে দানাদার (গ্রেইনি) বা অমসৃণতাকে ইমেজের আকার বড় করার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। ডকুমেন্টারিতে এই পদ্ধতির ছবি বেশ সাধারণ। ইমেজে এই টেক্সচার ব্যবহারও চিত্রনির্মাতার জন্য একটি সংকেত-নিয়ম। দানাদার অমসৃণ ইমেজ বাস্তবতা বা সত্যের প্রতিনিধিত্ব করে বলে মনে করা হয়। মাইকেল এঞ্জেলো এন্টোনিওনির ওয়ান হানড্রেড ব্লোজ সিনেমার ক্লোজ-আপে ইমেজের আকার বড় করার জন্য দানাদার অমসৃণতার ব্যবহার একটি সাব-টেক্সট হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, কেননা এর ফলে সত্যের অনুধাবন রহস্যাবৃত প্রমাণিত হয়েছে।

 

শট

ক্যামেরার শটে বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ সবই আসে। সেইসঙ্গে থাকে বিভিন্ন স্থান। একই স্থানের বিভিন্ন সময়ের ছবি তোলা হতে পারে, যাকে বলা যায় ডায়াক্রনিক শট। একই স্থানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের ছবি তোলা হলে সেই শট হবে সিনক্রফনিক শট। স্থির একটি ফ্রেমে যেসব নিয়ম পদ্ধতি (কোডস) ব্যবহার করা হয় তাদের তালিকা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, দৃশ্যের অনুপাত অর্থাৎ ওয়াইড স্ক্রিন ও সীমিত স্ক্রিন, ওপেন ও ক্লোজড ফ্রেম, ভৌগোলিক ও গভীরতাসূচক সমতল, গভীরতার উপলব্ধি বা ধারণা, নৈকট্য ও পরিমাণ, রঙের নিজস্ব গুণ, আকার, রেখা, ওজন এবং দিক নির্দেশ, অন্তর্গত বা সুপ্ত প্রত্যাশা (লেটেন্ট এক্সপেক্টেশন), বাঁকা বনাম সামঞ্জস্যময় কমপোজিশন, টেক্সচার এবং আলোকসম্পাত ইত্যাদি। ডায়াক্রনিক শটে এইসব কোডের বা নিয়ম-সংকেতের বহুল ব্যবহার হয়ে থাকে। সিনেমার সঙ্গে নাটকের একটা বড় পার্থক্য হলো বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন স্থানের ছবি শটের মাধ্যমে তোলা, যা নাটকে তেমন সম্ভব নয়।

‘শটে’র প্রসঙ্গে বিভিন্ন নামকরণ হয়েছে। দূরত্ব, ফোকাস, অ্যাঙ্গল, মুভমেন্ট এবং দৃষ্টিকোণের ওপর নির্ভর করে এই শ্রেণিবিভাগ নির্ধারণ করা হয়। স্থির ফ্রেমের ভেতর এই সব বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে, কিন্তু এদেরকে গতিশীলতার পরিপ্রেক্ষিতেই দেখা যুক্তিযুক্ত।

দূরত্ব শটের মূল বৈশিষ্ট্য, যা পরিবর্তনশীল। ক্লোজ-আপ, লং শট, এক্সট্রিম লং শট, মিডিয়াম শট – সবই দূরত্বের পরিচায়ক। অপরদিকে নর্মাল শট বলতে বোঝায় বিষয়কে কতটুকু দেখানো হবে, সেই বৈশিষ্ট্য। এখানে ফুল শট, থ্রি-কোয়ার্টার শট, হেড অ্যান্ড সোলডার শট ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এর কোনোটির সঙ্গেই ক্যামেরা লেন্সের ফোকাল লেংথের সম্পর্ক নেই। আরো স্মর্তব্য যে, অভিধাগুলি ব্যক্তিনির্ভর অর্থাৎ একজনের কাছে যা মিডিয়াম শট, অন্য চিত্রনির্মাতা বা ক্যামেরাম্যানের কাছে সেটিই হতে পারে লং শট। ক্লোজ-আপে আশেপাশের দৃশ্য থাকে না, কিন্তু যে-মুখ বা বস্ত্তর দৃশ্য দেখানো হয় তার ভিত্তিতে দর্শকের প্রতিক্রিয়া হয় তাৎক্ষণিক এবং নাটকীয়। চরিত্রের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য ক্লোজ-আপ মোক্ষম। কোনো বস্ত্তর কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকলে (যেমন, হিচককের মার্নি সিনেমায় নায়িকার হলুদ পকেটবুক) তার ক্লোজ-আপও দর্শককে সেই বস্ত্তর গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদি শট বিষয়ের খুব কাছে হয়, কিন্তু মুখ নয়, তার মাথা এবং কাঁধ দেখায়, তাহলে সেটি হবে ক্লোজ শট। এখানে কেবল মুখের অভিব্যক্তি নয়, দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। যদি মুখের একটি বিশেষ অংশ যেমন, ঠোঁট অথবা চোখ দেখানো হয়, তবে সেটি হবে ‘এক্সট্রিম ক্লোজ-আপ’। পটভূমিসহ মানুষের দেহের পূর্ণ ছবি দেখানো হলে সেটি ফুল শটের অথবা লং শটের পর্যায়ে পড়বে। যদি দৃশ্য থেকে ক্যামেরা অনেক দূরে থাকে যার জন্য সমান্তরাল বা প্যানোরামিক দৃশ্য ধরা পড়ে, তাহলে সেটি হবে এক্সট্রিম লং শট। যে শট লং নয়, ক্লোজও নয়; দুইয়ের মধ্যবর্তী, তাকেই বলা হয় মিডিয়াম শট। যেমন, চরিত্রের মাথা থেকে কোমর, অথবা কোমর থেকে পা দেখানোর জন্য এর ব্যবহার হতে পারে।

একটি শট দ্বারা যদি দৃশ্যের অন্তর্গত এলাকা স্পষ্ট করে দেখানো হয়, তাহলে সেটি হবে ইস্টাবলিশিং শট। সাধারণত একটি লং শটকে খন্ডে খন্ডে ভেঙে দেখানোর ফলে দৃশ্যপটের এই পরিচিতি ঘটে। যেমন, একটি ঘরের দৃশ্য। এই শট দিয়ে লোকেশনও দেখানো যেতে পারে (যেমন রমনা পার্ক), যাতে দর্শক বুঝতে পারে কোথাও ঘটনা ঘটছে।

শটের ভেতর যা থাকে তার দ্বারাও শ্রেণিবিভাগ করা যায়। টু-শটে দুটি চরিত্র, থ্রি-শটে তিনটি চরিত্র থাকে। শট/ রিভার্স শটে পর্যায়ক্রমে দুটি বা তার বেশি চরিত্রের একক দৃশ্য দেখানো হয়। যেমন, সংলাপে রত দুটি চরিত্রকে পরপর দেখিয়ে সংলাপটি জীবন্ত করে তোলা হয়।

জাঁ লুক গদার মতে, ক্লোজ-আপ ট্র্যাজেডি এবং লং শট কমেডির জন্য উপযুক্ত। এটি খুব সহজীকরণ শোনালেও এর মধ্যে চিত্রনির্মাতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টির ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটি প্রণিধানযোগ্য। কোন ধরনের ছবি তৈরি হচ্ছে এবং দৃশ্যের শট নেওয়া হবে তার ওপরই নির্ভর করবে শটটি ক্লোজ হবে, না লং। চরিত্রের আবেগ প্রকাশে ক্লোজ-আপ যেমন সচল, লং শট কখনই নয়। স্বামীকে দুর্গার মৃত্যুর খবর দেওয়ার দৃশ্যে সর্বজয়ার ক্লোজ-আপ অপরিহার্য, আবার মিষ্টি বিক্রেতার পেছনে দুর্গা, অপু এবং কুকুরের অনুসরণের দৃশ্য লং শটে ছাড়া দেখানোর উপায় নেই। এই শটে গ্রামীণ পরিবেশও স্বাভাবিক হয়ে ধরা পড়েছে। কোনো কিছুর তাৎপর্য বা গুরুত্বের ওপর আলোকপাতের জন্য (আক্ষরিক অর্থেও) ক্লোজ-আপ শটের প্রয়োজন রয়েছে। হিচককের সাসপিসিয়ন ছবিতে সন্দেহজনক দুধের গ্লাস অথবা স্যাবোটিয়ার ছবিতে নাৎসি এজেন্টের ফেলে যাওয়া এনভেলাপের ক্লোজ-আপ শট কাহিনির বর্ণনায় এদের গুরুত্বের পরিচায়ক।

কোন শ্রেণির সিনেমা তার ওপরও নির্ভর করে ক্লোজ-আপের ব্যবহার। যেমন আতঙ্ক সৃষ্টিকারী (হরর) সিনেমায় ভয়ার্ত চোখ এবং আর্তচিৎকারে ক্লিষ্ট মুখের ক্লোজ-আপ দেখানো অনিবার্য। হিচককের সাইকো সিনেমায় গোসলখানায় ম্যারিয়ন ক্রেনের চোখ ও মুখের ক্লোজ-আপ এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এই ধরনের সিনেমায় চোখের এক্সট্রিম ক্লোজ-আপ শট প্রায় অপরিহার্য এবং ক্লিশের পর্যায়ে এসে গিয়েছে। অতিমাত্রায় এক্সট্রিম ক্লোজ-আপের ব্যবহার সিনেমার দৃশ্যে যে-ভারসাম্য তা বিঘ্নিত করতে পারে। সেই জন্য এর ব্যবহারে সুবিবেচনা ও সতর্কতার প্রয়োজন। গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এটি এমন একটি চরম পদ্ধতি যে তা মুদ্রাদোষের পর্যায়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

গদাঁ ক্লোজ-আপ শটকে ট্র্যাজেডির অন্তর্গত গভীর আবেগ প্রকাশে সহায়ক মনে করলেও লং শটেও একই আবেগ দেখানো সম্ভব। যেমন, মৃত্যুদৃশ্য এইভাবে দেখানো হলে ইন্দ্রিয়জভাবে খুব সচকিত হতে হয় না। বরং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তি ও বোধের ভূমিকাও থাকে, সেই ধরনের ট্র্যাজেডির দৃশ্যে লং শটও যথাযথ এবং কার্যকর হতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করে কাহিনি কীভাবে এগিয়েছে এবং কোন দৃশ্যে সেই কাহিনির কোন অংশ কীভাবে দেখানো উচিত তার ওপর। আর্থার ফেলেডির নেকেড ডন সিনেমায় সান্টিয়াগোর মৃত্যু লং শটে দেখানো হয়েছে। যখন সান্টিয়াগো বুলেটবিদ্ধ হয়, সেই সময় সে অশ্বপৃষ্ঠে। দর্শক তার ভয়ার্ত চোখ কিংবা বুলেটের আঘাত থেকে নিঃসৃত রক্ত কিছুই দেখতে পায় না। এই দৃশ্যে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত সৌন্দর্য আছে, যার সঙ্গে তুলনা করা যায় ব্রুঘেলের ‘ফল অফ ইকারাস’ চিত্রকর্মের, যেখানে ইকারাসের মৃত্যুকে দেখানো হয়েছে দৃশ্যের অনুষঙ্গ হিসেবে।

ওয়েস্টার্ন বা কাউবয় সিনেমায় লং শট এবং এক্সট্রিম লং শটে চরিত্রগুলিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ হিসেবে দেখানো যায় বলে চিত্রনির্মাতারা পছন্দ করতেন। জর্জ স্টিভেন্সের সেন্ সিনেমায় বরফ শোভিত পাহাড়ের পাদদেশে একটি হরিণ ঝরনা থেকে পানি খায়। জন ফোর্ডের মাই ডার্লিং ক্লেমেন্টাইন সিনেমায় টম্বস্টোন জনপদের ধূলিধূসরিত পথের ওপর আকাশের গম্ভীর মুখ দেখা যায়, যার নিচে রয়েছে একটি পানশালা, যেটি আলো-অাঁধারিতে কখনো দৃশ্যমান, কখনো অদৃশ্য। আর দূরে দেখা যায় মনুমেন্ট ভ্যালির ঢেউ খেলানো শরীর। এইসব দৃশ্যে পরিবেশ নিজ গুণেই উপস্থিত। ক্লোজ-আপের মতোই লং শট বা এক্সট্রিম লং শট ব্যবহারে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। ছবির প্রয়োজনেই এদের ব্যবহার নির্ধারিত হবে। তবে যেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশ বেশ প্রধান, তার দৃশ্য ধারণে লং শট অপরিহার্য, একথা বলা যায়।

শট কেবল দূরত্ব নয়, বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যামেরা কীভাবে ধরে রাখা হয় তার ওপরও নির্ভর করে। ফ্রেড জিনামানের জুলিয়া সিনেমায় জুলিয়া যখন তার হোটেলকক্ষ থেকে নিচে তাকায় তখন যে দৃশ্য তার চোখে পড়ে সেটি ‘হাই-অ্যাঙ্গল শটে’ নেওয়া। হাই-অ্যাঙ্গল শটে বিষয়ের ওপরে স্থাপিত হয় ক্যামেরা। একে অনেক সময় বলা হয় ‘গডস আই ভিউ’ এবং এটিও হিচককের খুব পছন্দের, কেননা এখানে প্রায় অদৃশ্যে থেকে কেউ বিষয় বা দৃশ্য অবলোকন করছে, এই রহস্যময়তা রয়েছে। এর বিপরীতে রয়েছে ক্যামেরা যখন ‘লো-অ্যাঙ্গল শটে’ নিচে থেকে ওপরের দৃশ্যের ছবি ধারণ করে। লো-অ্যাঙ্গল শটে বিষয় প্রকৃত অবস্থার তুলনায় বড় আকৃতির দেখায়। এর ফলে কারো বা কোনো কিছুর প্রাধান্য প্রকাশ করা যায়, যে-সম্বন্ধে আগেই বলা হয়েছে। যেমন, সিটিজেন কেইন সিনেমায় শ্লেড খেলার সময় কেইনের অভিভাবক যখন ওপর থেকে তার দিকে তাকায় তখন নিচ থেকে দেখা তার কর্তৃত্বময় চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাই-অ্যাঙ্গল শটে যেমন বিষয়কে ছোট (উভয় অর্থে) দেখানো হয়, লো-অ্যাঙ্গলে তার বিপরীত ঘটে। দুই পরিস্থিতিতেই দৃশ্যের অন্তর্গত বিষয়ের অসহায়ত্ব, তুলনামূলক দুর্বলতা বা সামান্যতা অভিব্যক্ত হয়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতীকী অর্থ প্রকাশ নয়, কারিগরি কারণেই লো-অ্যাঙ্গল বা হাই-অ্যাঙ্গল শটের ব্যবহার হতে পারে। যেমন, যদি কোনো দৃশ্যে সিঁড়ির নিচে একজন পুরুষকে অপেক্ষা করতে দেখা যায় এবং নারী চরিত্রটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে তাহলে নারী চরিত্রকে লো-অ্যাঙ্গল শটেই দেখাতে হবে। এখানে এই শটের কোনো তাৎপর্য নেই। অ্যাকশনের পরিপ্রেক্ষিতই নির্ধারণ করে শটটি কেমন হবে।

উল্লেখযোগ্য এবং স্মর্তব্য যে, চিত্রনাট্য এবং চিত্রনির্মাতার পরিকল্পনার ভিত্তিতেই শটের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়ে থাকে। এখানে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা বিষয়ে চিত্রনাট্য লেখার সময়ই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

বস্ত্তগত ও নির্বস্ত্তক শট

বস্ত্তগত শটে ক্যামেরা যা দেখে তা-ই তোলা হয়। নির্বস্ত্তক শটে (কখনো একে নির্বস্ত্তক ক্যামেরাও বলা হয়)। চরিত্র যা দেখে তাই দেখানো হয়। গ্রেপস্ অফ র‌্যাথ সিনেমায় জোয়াডস পরিবার যখন হুভারভিলে ট্রাকে করে আসে, সেই সময় স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের দিকে সোজা তাকিয়ে থেকেই পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। তারা জোয়াডসদের দিকে তাকিয়ে আছে, যদিও ছবিতে জোয়াডসদের দেখা যাচ্ছে না। মনে হয় যেন স্থানীয় অধিবাসীরা দর্শকদের দিকেই তাকিয়ে আছে। দর্শকদেরই যেন ট্রাকের হুইলের পেছনে বসিয়ে তাদের দারিদ্র্যপীড়িত চেহারা দেখানো হয়েছে। জোয়াডের চোখেই যেন দর্শক এই দৃশ্য দেখছে। এটি নির্বস্ত্তক শট, কেননা এখানে দর্শকের পরিবর্তন ঘটেছে। দারিদ্র্যপীড়িত লোকগুলি জোয়াডকে নয়, দর্শক অর্থাৎ জাতির বিবেকের প্রতি প্রশ্ন রাখছে।

কখনো সিনেমার দৃশ্যে কোনো চরিত্র ছাড়াই অন্য চরিত্রের নড়াচড়া দেখা যায়। যেমন হিচককের মার্নি সিনেমায় যখন মার্নি ঘরে প্রবেশ করছে মার্ক (সিয়ান কনারি) টেবিলের সামনে বসে আছে কিন্তু মার্নিকে ফ্রেমের ভেতর দেখা যাচ্ছে না। মার্ক মার্নির উপস্থিতি অনুভব করে ক্যামেরার দিকে তাকায়, যেন ক্যামেরা বা দর্শকই মার্নি। মার্নি যখন টেবিলের কাছে পৌঁছে যায়, দর্শক আর মার্নির কল্পিত ভূমিকায় (নির্বস্ত্তক) থাকে না। নির্বস্ত্তক ক্যামেরায় বাস্তবতার আংশিক দৃশ্যই ধরা পড়ে (অন্তত প্রথম দিকে) সেই জন্য এর বহুল ব্যবহার বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। লেডি ইন দি লেক সিনেমায় রবার্ট মন্টগোমারিকে আয়নায় ছাড়া কোনো দৃশ্যে দেখা যায় না। তাকে দেখতে গিয়ে অন্য চরিত্ররা ক্যামেরার দিকে তাকায়, যেন ক্যামেরাই সে (মার্লো চরিত্র) অথবা দর্শক তার প্রতিনিধি। যখন একটি মেয়ে তাকে চুম্বন করে, সেই সময় তার ঠোঁট লেন্সকেই স্পর্শ করে, যার ফলে মনে হয় দর্শকদেরই সে চুম্বন করছে। মার্লোর সিগারেটে আগুন ধরাবার জন্য সে লাইটারটি ক্যামেরা লেন্সের দিকেই এগিয়ে দেয়, যার ফলে মনে হয় সে যেন দর্শকদের অগ্নিদগ্ধ করতে চাইছে। বলা হয়েছে যে, লেডি ইন দি লেক এমন ছবি যেখানে দর্শকদের অ্যাকশনে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এবং অতিরিক্ত মাত্রায় অংশ নিতে দেখা যায়। এর ফলে সিনেমায় কাহিনির উপলব্ধিতে বিঘ্ন ঘটেছে এবং এর নান্দনিকতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কেবল খুব বিশেষ ক্ষেত্রেই এবং নির্বাচিত দৃশ্যেই নির্বস্ত্তক ক্যামেরার ব্যবহার সমীচীন। ডার্ক প্যাসেজ সিনেমায় হামফ্রে বোগার্টকে দুইভাবে দেখাতে হয়েছে। প্রথম তিরিশ মিনিটে তার নিজস্ব চেহারায় এবং পরবর্তীকালে প্লাস্টিক সার্জারির ফলে পরিবর্তিত চেহারায়। হামফ্রে বোগার্টকে তিরিশ মিনিট পর সিনেমায় দেখানো হলে তিনি হয়তো সেই ভূমিকা গ্রহণই করবেন না, তাই চিত্র-নাট্যকারকে প্রথম তিরিশ মিনিটে বাধ্য হয়ে নির্বস্ত্তক ক্যামেরা ব্যবহার করতে হয়েছে, যেখানে শুধু বোগার্টের কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছে, কিন্তু চেহারা নয়। এমন ক্ষেত্রে নির্বস্ত্তক ক্যামেরা বা শট যুক্তিসংগত।

নির্বস্ত্তক ক্যামেরা বা শটের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট দৃষ্টিকোণভিত্তিক (পয়েন্ট-অফ-ভিউ) শট। এই শটে একটি চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যা দেখা যায় বা তার প্রতি গুরুত্ব আরোপিত হয়। সিনেমায় একটি বিখ্যাত দৃষ্টিকোণভিত্তিক শটের দৃষ্টান্ত হিচককের স্পেলবাউন্ড সিনেমার শেষ দৃশ্য, যেখানে ড. মার্চিসনকে একটি মানসিক হাসপাতালের প্রাক্তন পরিচালক থাকাকালীন হত্যাকান্ডের জনা দায়ী দেখানো হয়।  ড. মার্চিসন  তাকে যে অভিযুক্ত করছে তার প্রতি পিস্তল তাক করে ধরে থাকে এবং তারপর ধীরে ধীরে নিজের দিকে পিস্তল ঘুরিয়ে নিয়ে গুলি ছোড়ে। এখানে পিস্তলের ক্লোজ-আপ শটটি একটি দৃষ্টিকোণভিত্তিক শট। এই দৃশ্য তিনি আত্মহত্যার সময় দেখেছেন। একই দৃশ্য দেখা যায় সাম্প্রতিককালের ফিউচারিস্টিক ফিল্ম দি মাইনোরিটি রিপোর্টে, যেখানে ম্যাক্স ভ্যান সাইডো একইভাবে পিস্তল ব্যবহার করে আত্মহত্যা করেছেন।

যে-কোনো ধরনের শটই হোক না কেন, তাকে সমগ্রের অংশ হিসেবে না দেখলে অর্থোদ্ধার সম্ভব হয় না। অনেক শটই চমৎকার মনে হবে কিন্তু সেসব প্রেক্ষিতবিহীন হয়ে অর্থময় নয়। যেমন অমাডিউস সিনেমায় ক্রুসিফিক্সের জ্বলন্ত ইমেজ একটি অনুভূতিময় দৃশ্য। কিন্তু প্রেক্ষিতের আলোকেই এর পরিপূর্ণ অর্থ স্পষ্ট হয়। স্যালিয়েরি মোজার্টের প্রতিভায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তার বিশ্বাসের প্রতীক ক্রুসিফিক্সে আগুন ধরিয়েছে। এই তথ্য জানা না থাকলে কেবল জ্বলন্ত ক্রুসিফিক্স দেখে এর তাৎপর্য ও অর্থ বোঝা যাবে না। একইভাবে ইঙ্গেমার কার্গমানের ওয়াইল্ড স্ট্রবেরি সিনেমায় কাঁটাবিহীন ঘড়ি দেখে সময় স্তব্ধ হওয়া অথবা মৃত্যুর প্রতীকের কথা মনে হলেও, এটি যে সিনেমায় অনেকগুলি মৃত্যুর প্রতীকের একটি, তা বোঝা যাবে না। এই জন্য পুরো সিনেমাই দেখতে হবে, যেখানে মৃত্যুর দিকে যাত্রার প্রতীক ব্যক্ত হয়েছে।

শট হলো উদ্ধৃতির মতো। কোনো উদ্ধৃতি অনেক তথ্য দেয়, আবার কোনো উদ্ধৃতি তা দিতে ব্যর্থ হয়। শটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। উদ্ধৃতি যেমন কোনো টেক্সটের অংশ, শটও সম্পূর্ণ সিনেমার অংশ। কিন্তু তাই বলে পৃথকভাবে শটের গুরুত্ব কিছুমাত্র কমে না। কেননা, আগেই বলা হয়েছে সিনেমার নিজস্ব যে ভাষা সেখানে শটই হলো শব্দ।

লিখিত শব্দকে বানান করে শুদ্ধভাবে লিখতে হয়। এটা খুব কঠিন নয়, অন্তত অনেকের ক্ষেত্রে। ‘শব্দ’ হিসেবে সিনেমার শটকে বানান করার প্রতিতুলনা চলে তার ‘ফ্রেম’ করা দিয়ে। ফ্রেম করা থেকেই শট রূপ নেয়। এটি খুব সহজ মনে হলেও সহজ নয়। চিত্রনাট্যে এর ইঙ্গিত থাকে, ক্যামেরাম্যানও মোটামুটি বোঝে ফ্রেমটি কীভাবে ঠিক করা যাবে। শেষ পর্যন্ত চিত্রনির্মাতাই (পরিচালক) সিদ্ধান্ত নেন শটের ফ্রেম কী হবে। শটের ফ্রেমের ভেতরই সিনেমার ভাষায় প্রায় সব উপকরণ (ইমেজ, সংলাপ, সংগীত, দৃশ্য ইত্যাদি) এসে যায়, যার ফলে শট ‘শব্দ’ থেকে ‘বাক্যে’ পরিণত হতে পারে এবং কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। ফ্রেমই ইতিপূর্বে উল্লিখিত মিজ অাঁ সিঁ বা দৃশ্যবন্ধ, যার অন্তর্গত থাকে কমপোজিশন।

 

গতিশীল শট (মুভিং শট)

সিনেমায় গতি বেশ বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে। টাচ অফ ইভিল সিনেমায় তিন মিনিটের লং টেকে (শটে) ক্যামেরা আক্ষরিক অর্থেই ‘মুভ’ করেছে। কিন্তু যদি ক্যামেরা একটি নির্দিষ্ট ও স্থির অক্ষের (অ্যাক্সিস) দুদিকে সমান্তরালভাবে বৃত্তাকার অথবা অর্ধবৃত্তাকারে ঘোরে, তাকে বলা হবে ‘প্যান শট’ অথবা অক্ষের ওপরে ও নিচে উল্লম্বভাবে ঘোরে, তাকে বলা হয় ‘টিল্ট শট’। এই দুটি ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে ক্যামেরাকে গতিশীল বলা যাবে না, কেননা তার অবস্থান এক জায়গাতেই নিবদ্ধ। কেবল ক্যামেরার মুখই ঘুরছে। কিন্তু ক্যামেরা যখন সম্পূর্ণ শারীরিকভাবে অথবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাত্রা করে এবং গতিশীল (মোবাইল) শটের জন্য ক্যামেরাকে চাকাযুক্ত গাড়ির ওপর স্থাপন করা হয় (যার নামকরণ হয় ‘ডলি’ যেমন, গাড়ি, ট্রাক) অথবা রেললাইনের মতো সমান্তরাল দুটি ট্র্যাকের ভেতর দিয়ে ট্রেনের একটি ট্রলির মতো একটি যানে করে টেনে নেওয়া যায় তখনই (গতিশীল মোবাইল) শট নেওয়া হয়, একথা বলা যায়। ক্রেনেও এটা সম্ভব। যেভাবেই নেওয়া হোক, স্থির স্থানে থাকার তুলনায় গতিশীল ক্যামেরা আরো বেশি দৃশ্য স্থান ধারণ করে ন্যারেটিভের আয়তন ও পরিধি বিস্তৃত করতে পারে। এর ফলে দর্শকের দেখার সীমানা বিস্তৃত হয় এবং সেইসঙ্গে কাহিনির অর্থময়তা আরো স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ পায়। প্যান এবং টিল্ট শটের দ্বারাও জানাশোনার পরিধি কিছুটা বিস্তৃত হতে পারে। প্যান শট সাধারণত বই পড়ার মতো বাঁদিক থেকে ডানে যায়, কিন্তু কখনো কখনো এর উলটোটাও হতে পারে। কোনো কোনো শটের প্যান দুই দিক দিয়েই হয়। প্যানিং শট দিয়ে একজন চিত্রনির্মাতা কোনো বিশেষ দৃশ্যের অন্তর্গত বিষয়ে (ঘটনার) ক্যামেরা দিয়েই মন্তব্য রাখতে পারেন, যার ফলে ক্যামেরাই হয়ে যায় একজন চরিত্র। খুব দ্রুত প্যান করা হলে দৃশ্য কিছুটা অস্পষ্ট ও ধোঁয়াটে হতে পারে। একে বলা হয় ‘সুইশ প্যান’। এর দ্বারা হঠাৎ কিছুর পরিবর্তন বা রূপান্তর বোঝানো হয়। ড. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইড সিনেমায় সুইশ প্যান ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে ড. জেকিল ওষুধ খেয়ে মি. হাইড হয়ে যান, এই দৃশ্য দেখা যায়।

আগেই বলা হয়েছে, ক্যামেরা যখন উল্লম্বভাবে ওপরে-নিচে যায় তখন তাকে ‘টিল্ট শট’ বলে। একে ‘ভার্টিক্যাল প্যানও’ বলা হয়ে থাকে, যার জন্য এর নামকরণ হয়েছে প্যান আপ-ডাউন। টিল্ট শট দিয়ে চোখের ওপর-নিচে দেখার ভঙ্গি অনুকরণ করা হয়। যেমন, কোনো ভবনের উচ্চতা দেখার সময় এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করা হয় অথবা দীর্ঘ তালিকায় নাম পড়ার সময়। সিটিজেন কেইনে (আবারো তার দৃষ্টান্ত দিতে হয়!) কেইনের এস্টেট ‘যানাডু’র প্রবেশদ্বারের ওপর দিকের টিল্ট শট নিয়ে ‘নো ট্রেসপাস’ নোটিশটি দেখিয়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে (ক্যামেরা ছাড়া) সবার জন্য এখানে প্রবেশ নিষেধ। সিনেমার শেষে ক্যামেরা টিল্ট শটে অধোমুখী (টিল্ট ডাউন) হয়ে প্রবেশ দ্বারের ‘নো ট্রেস পাসিং’ নোটিশ অতিক্রম করে তার শেষ যাত্রাবিন্দুতে এসে স্থির হয়।

প্যানের মতোই টিল্ট শটও নীরব দর্শক হয়ে দৃশ্যের অন্তর্গত পরিস্থিতির ওপর মন্তব্য করে। ল্যাম্বার্ট হিলাইয়ারের ড্রাকুলাস ডটার সিনেমায় ভ্যাম্পায়ার যেই মুহূর্তে তার শিকারের গলায় দাঁত বসাতে শুরু করে, ক্যামেরা টিল্ট শট দিয়ে দেয়ালের ওপরে চলে যায়। পরে কী ঘটবে, সেই কল্পনা তখন দর্শককেই করতে হয়। টিল্ট শট একটি চরিত্রের বাস্তব বা সম্ভাব্য ভাগ্যের কথাও জানিয়ে দিতে পারে। হিচককের নর্থ-বাই নর্থ-ওয়েস্ট সিনেমায় ফিলিশ ভ্যান এম যখন জানতে পারে যে তার বান্ধবী একজন আমেরিকান এজেন্ট তখন সে তাকে প্লেনের ভেতর হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। ‘এই বিষয়টি বেশ ওপরে (হাইট) নিয়ে ফায়সালা করতে হবে, পানির ওপরে’, এই সংলাপে ‘হাইট’ কথাটির উল্লেখে ক্যামেরা টিল্ট শটে ওপরে উঠে যায়, যেখানে কেবলই শূন্যতা।

ডানে-বাঁয়ে ঘোরা অথবা ওপর-নিচে নামার (প্যান অথবা টিল্ট) সময় ক্যামেরা চোখকে সমান্তরালভাবে অথবা উল্লম্বভাবে দেখার সুযোগ দেয়, যার মাধ্যমে দিকনির্দেশনা এবং দর্শকের দর্শনীয় বস্ত্ত, উভয়ই নির্ধারিত হয়। উঁচু-নিচু এবং ডানে-বাঁয়ে অথবা ডানে-বাঁয়ে এবং উঁচু থেকে নিচে ক্যামেরা ঘোরানোর মিলিত ব্যবহারও করা সম্ভব, যারা দ্বারা দর্শকের অথবা চরিত্রের দৃষ্টি সমতলের (সারফেস) ভেতর নিবদ্ধ এবং অন্য সমতলের ওপরে-নিচে যেতে সাহায্য করে। যেমন, কোনো শটে দেয়ালের নিচ থেকে ওপরে বৈদ্যুতিক তার দেখাতে দেখাতে হঠাৎ দরজায় করাঘাত শুনে ক্যামেরা দিক পরিবর্তন করে মেঝের সমান্তরালভাবে দরজার দিকে প্যান করে ঘুরে শট নিতে পারে। হিচককের স্টেজ ফ্রাইট সিনেমায় একটি ফ্ল্যাশব্যাকে প্যানিং এবং টিল্টিংয়ের মিলিত ব্যবহার দেখা যায়। এখানে নায়ক রিচার্ড টড নায়িকা শার্লোট ইনউডের (মার্লিন ডিয়েট্রিচ) ঘরে গিয়ে যখন তার স্বামীর মৃতদেহ দেখে তখন ক্যামেরা প্যান করে, আর তারপরই টিল্ট করে ওয়ার্ডরোবের দরজার ওপরে উঠতে থাকে। এর দ্বারা বোঝানো হয় যে, ইনউডের ঘরের অভ্যন্তরে আসবাবপত্র সম্বন্ধে নায়ক খুব ওয়াকিবহাল ছিল না। যদি নায়ক সরাসরি ওয়ার্ডরোবে গিয়ে ইনউডের অনুরোধ অনুযায়ী পোশাক বের করে আনত তাহলে তার এই অজ্ঞতা প্রকাশ পেত না এবং কাহিনিতে তার ভূমিকাই বদলে যেত। ক্যামেরার মুভমেন্টে সিনেমার চরিত্র ও কাহিনির বর্ণনা এইভাবে বেশ অর্থময় হয় এবং কোনো সংলাপ ছাড়াই এটা হতে পারে। এর জন্য বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ক্যামেরা মুভমেন্টের প্রয়োজন হয়।

প্যানিং এবং টিল্টিং মুভমেন্টে ক্যামেরার অবস্থানে যে হেরফের হয় না, এটা বেশ পরিষ্কার। একটি ট্রইপয়েডে থেকে ক্যামেরা কেবল ঘোরে, বাঁয়ে-ডানে অথবা নিচ থেকে ওপরে। একে গতিশীল (মুভিং) শট বলা যায় না। গতিশীল শটে ক্যামেরা বিষয় বা বিষয়াদির দিকে, তার পাশাপাশি অথবা তাদের থেকে দূরে যেতে থাকে। ক্যামেরা কীভাবে গতিশীল হয় তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রকারের মুভিং শট হতে পারে। যদি রেললাইনের মতো ট্র্যাকের ওপর দিয়ে গতিশীল হয় তাহলে ক্যামেরার এই শট হবে ট্র্যাকিং শট। যদি ডলির ওপর স্থাপন করে ক্যামেরা দিয়ে শট নেওয়া হয় তাহলে তার নাম হবে ডলি শট। ক্রেনে করে ক্যামেরা যদি ওপরে-নিচে অথবা দৃশ্যের ভেতর বা বাইরে চলে যায় তাহলে এটি ক্রেন শট নামে পরিচিত হবে। অনেকেই ট্র্যাকিং শট এবং ডলি শটকে সমার্থক মনে করে। তাদের মতে, ক্যামেরা বিষয়ের দিকে যেতে থাকলে ডলি ইন (ট্র্যাক ইন) আর বিষয় থেকে দূরে সরে আসতে থাকলে ডলি আউট (ট্র্যাক আউট) হয়। অন্যদের কাছে কোনো যানবাহনের (ট্রাক, ডলি অথবা সাইকেল) ওপর স্থাপিত ক্যামেরা সামনে-পেছনে যেদিকেই যাক তখন তার নেওয়া শটকেও ট্র্যাকিং শট বলে। ক্যামেরার গতিবিধির ওপর নির্ভর করে ফরওয়ার্ড ট্রাকিং শট, ভার্টিকাল ট্র্যাকিং শট এবং ডায়াগনাল ট্র্যাকিং শট নেওয়া যায়।

আগেই বলা হয়েছে, অন্যান্য শটের তুলনায় ট্র্যাকিং শটের সুবিধা ও কার্যকারিতা অনেক বেশি, কেননা এই শটে অনেক বেশি এলাকা দেখানো যায় এবং ডিটেইলও উঠে আসে বেশি। এইভাবে একটি দৃশ্যের যে আবেগময় প্রকাশ (মুড), এই শটে তা অনেকক্ষণ ধরে রাখা যায়। প্যান আর টিল্ট শটে যেমন নির্বাক মন্তব্য করা হয়, ট্র্যাক শট ব্যবহার করা যায় একটি চরিত্রের অলটার-ইগো অথবা তার অদৃশ্য দোসর হিসেবে।

ক্যামেরার গতিশীল শট (মুভিং শট) দিয়ে দর্শকদের প্রায় শারীরিকভাবে দৃশ্যের ভেতর অ্যাকশনের অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং এটা যে-ছবিতে যত বেশি হবে তার সফলতা সেই পরিমাণেই। এর সঙ্গে অবশ্য বাট্রল্ট ব্রেখটের নাটক সম্বন্ধে ‘এলিয়েনেশন থিওরি’র পার্থক্য রয়েছে। এমনকি মুভিং শট কোনো চরিত্রের চেতনা স্রোতকেও সংশ্লিষ্ট করতে পারে, যেমন হয়েছে ইউজিন ও নিলের লং ডেজ জার্নি ইন টু নাইট সিনেমায়। যে ক্রেন শট দিয়ে সিনেমাটি শেষ হয়েছে তাকে মনে করা হয় চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাসে এক বিরাট সাফল্য। এই দৃশ্যে পরিচালক নায়িকার (ক্যাথারিন হেপবার্নের) বিশাল মনোলগের সবটাই ধারণ করেছেন। এই দৃশ্যে নায়িকা মেরি তার বসার ঘরে স্বামী এবং দুই পুত্রকে নিয়ে বসে স্মৃতিচারণের মতো বলে যাচ্ছে যে, যখন সে কনভেন্টে প্রবেশ করতে থাকে, সেই সময় এক সন্ন্যাসিনী তাকে নিষেধ করেছিল, কেননা সে আওয়ার লেডি অফ লুদোঁর অলৌকিক মূর্তি দেখতে পেয়েছিল। এই মনোলগ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরা তার কাছ থেকে পেছনে সরে আসতে থাকে এবং তারপর তার চিন্তা অপার্থিব হওয়ার সঙ্গে তাল রেখে ওপরে উঠতে থাকে। আকারে মেরি ক্রমেই ছোট হয়ে আসে এবং তার স্বামী ও পুত্রদের অবয়বেও সেই পরিবর্তন হয়। মনোলোগ যখন শেষ হয় সেই মুহূর্তে মেরিকে ক্লোজ-আপে দেখা যায় এবং সে তখন শেষ বাক্যটি বলে : ‘সেটা ছিল সিনিয়র বর্ষের শীতকাল। তারপর বসন্তে আমার জীবনে এক পরিবর্তন এলো। হ্যাঁ, আমার মনে পড়ছে, আমি জেমস টাইরনের প্রেমে পড়ি এবং একসময়ে অত্যন্ত সুখী হই।’ মেরির ক্লোজ-আপের সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামী (জেমস টাইরন) এবং পুত্রদের ক্লোজ-আপও দেখা যায়। সবশেষে ক্লোজ-আপে মেরির মুখের ছবি দেখানো হয়। খুব প্রশান্ত দেখায় তাকে। এই দৃশ্যে দর্শককে চরিত্রের চেতনার সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।

 

জুম এবং ফ্রিজ শট

অনেক পরিচালক মুভিং শটের তুলনায় ‘জুম’ শট পছন্দ করেন কেননা এটি কম খরচে হয়। কারিগরি দিক দিয়ে ‘জুম শট’ মুভিং শট নয়, কেননা এখানে ক্যামেরা নড়ে না, কেবল ক্যামেরায় এডজাস্টেবল লেন্স দিয়ে বিষয়ের কাছে অথবা দূরে চলে যাওয়া দেখানো হয়। এই কারণে এই শটের প্রক্রিয়াকে বলা হয়েছে ‘জুম ইন/ জুম আউট’। কোনো কোনো দৃশ্যে ‘জুম শট’ বেশ উপযোগী যেমন, ভিড়ের মধ্যে কোনো মুখ বিশেষভাবে দেখানোর প্রয়োজন হলে অথবা মুখের কোনো বিশেষ অভিব্যক্তি এমনভাবে দেখাবার প্রয়োজন হয় যে সময় চরিত্রটি জানতে না পারে। এর দুর্বল দিক হলো জুম শটে দৃশ্য ফ্ল্যাট (?) হয়ে যেতে পারে অথবা দূরত্ব সম্বন্ধে অবাস্তব ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। যদি দ্বিমাত্রিক দৃশ্য দেখাবার প্রয়োজন হয়, তাহলে জুম শটের ব্যবহারে ঝুঁকি নেই। কুব্রিকের ব্যারি লিনডন ছবিতে তিনি ‘ক্লোজ-আপ’ থেকে ‘জুম আউট’ করে বেরিয়ে এসে পেইন্টিংয়ের মতো দ্বিমাত্রিক দৃশ্য দেখান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খরচ কমানোর জন্য জুম শটের ব্যবহার করা হয় বলে এর নান্দনিকতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে না।

জুমের বিপরীতে যে-শট তাকে ‘ফ্রিজ’ বলা হয়। সেখানে নড়াচড়া সম্বন্ধে মায়ার (ইল্যুশন) সৃষ্টি করা হয়। ফ্রিজ শটে নড়াচড়া আসলে বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রিজে সব মুভমেন্ট হঠাৎ বন্ধ হয় এবং দৃশ্য (ইমেজ) ফ্রি হয়ে স্থিরচিত্র হয়ে যায়। ফ্রান্সোয়া ক্রুফোঁর ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ সিনেমার শেষে যে ফ্রিজ শট, তাকেই মনে করা হয় চলচ্চিত্রের এক বিখ্যাত শট। আন্তোয়াঁ দয়নেল (জাঁ পিয়ের লিয়ড) একটি মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে সমুদ্রতীরে যায়। সেখানে গিয়ে সে ধীরে ধীরে অগভীর পানির ভেতর পা ডুবিয়ে দিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। আর তখন শটটি ফ্রেমের ভেতর ফ্রিজ হয়ে যায়। ফ্রেমের ভেতর ধরা পড়ে আন্তোয়াঁ, তার একদিকে থাকে মানসিক হাসপাতাল, অন্যদিকে সমুদ্র। অতীত ও বর্তমানের প্রতীক এই দৃশ্য ধারণ করে।

জুম এবং ফ্রিজ শট অন্যান্য শটের তুলনায় ডিটেইলসের প্রতি নাটকীয়ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারার কারণে বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে প্রায় একই। কিন্তু তাদের অন্তর্গত সম্ভাবনার জন্য তাদের অপব্যবহারও করা হয়। প্রায় সিনেমাতেই শেষে ক্রেডিট দেখাবার সময় ফ্রিজ শটের ব্যবহার করে শেষ দৃশ্য ফ্রিজে দেখানো হয়, যা খুব অযৌক্তিক ও অর্থহীন। একজন দক্ষ ও প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা যুক্তিসংগত কারণেই শট ফ্রিজ করবেন আর গড়পড়তা পরিচালক সেই শট ব্যবহার করবেন কেবলই ‘ইফেক্ট’ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। কেন রাসেলের উইমেন ইন লাভ ছবিতে নায়ক বার্কিন (এলান বেইটস) প্রেমিকা উরসুলাকে জানায় যে, সে একজন পুরুষের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। তখন নায়িকা বলে যে, সে এমন সম্পর্কের কথা ভাবতেই পারে না। ডি এইচ লরেন্সের এই উপন্যাসে সেই মুহূর্তে নায়িকার উক্তি ছিল : ‘এমন সম্পর্ক তুমি স্থাপন করতে পারবে না, কেননা এটি অলীক এবং অসম্ভব।’ সিনেমায় নায়িকার মুখ দিয়ে এই উক্তি না করিয়ে নায়িকার মুখকে হতবুদ্ধিকর অবস্থায় ফ্রিজ করে দেখানো হয়। সে নির্বাক হয়ে গিয়েছে এবং সেই অভিব্যক্তি ফ্রিজ শটের চেয়ে আর কোনো শটে বা সংলাপে বেশি কার্যকর হতে পারত কি না সন্দেহ।

 

শট থেকে শটে যাওয়া

কাট

ক্যামেরা যখন ছবি তুলতে থাকে অর্থাৎ শট নেয়, তখন শট থেকে শটে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু শব্দ (টেকনিক্যাল টার্ম) ব্যবহৃত হয়, যা সিনেমা নির্মাণের ভাষা-সমগ্রীয় (ভোকাবুলারি) অংশ হয়ে গিয়েছে। এই ‘ভাষা-সমগ্রীয়’ অবশ্য সিনেমার ভাষা বলতে যা বোঝানো হয়েছে তা নয়। এদের সম্বন্ধে ধারণা চিত্রপরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং এডিটরের থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু নান্দনিকতার বিচারে দর্শকের জন্য সেই পরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে সিনেমার উৎকর্ষ বিচারে এদের সম্বন্ধে সামান্য হলেও দর্শকের জানা উচিত।

‘কাট’ কেবল একটি ক্রিয়াপদ হতে পারে, যখন পরিচালক ‘কাট’ বলে চিৎকার করে ‘শট’ বন্ধ করতে বলেন। অথবা এটি বিশেষ্যও হতে পারে, যখন এক টুকরো (স্ট্রিপ) ফিল্ম বোঝানো হয় অথবা দুটি বিভিন্ন শটের ভেতরকার জোড়া লাগানোর অর্থে ‘কাট’ ব্যবহৃত হয়। একটি সিনেমা নির্মাণের বিভিন্ন পর্বে তার পরিচিতি হিসেবেও ‘কাট’ ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন, রাফ কাট, ডাইরেক্টরস কাট, ফাইনাল কাট ইত্যাদি। নান্দনিকতার বিচারে ‘কাটের’ যে সংজ্ঞা, পরিচয় ও প্রক্রিয়া তাৎপর্যময়, সেটি হলো দুটি পৃথক শটের জোড়া লাগানো, যার ফলে প্রথমটি মুহূর্তেই দ্বিতীয়টি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় (রিপ্লেসড)। এর ফলে প্রথম শটে যা দেখানো হয়নি তা (দৃশ্যের ভেতর বস্ত্ত, চরিত্র ইত্যাদি) দেখানো সম্ভব হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচটি বিশেষ কাটের উল্লেখ করা যেতে পারে : (ক) সরাসরি (স্ট্রেইট), (খ) বৈপরীত্যমূলক (কন্ট্রাস্ট), (গ) সমান্তরাল অথবা কোনাকুনি (প্যারালেল ও ক্রস), (ঘ) লাফ (জাম্প) দেওয়া, (ঙ) আকার (ফর্ম)।

সরাসরি (স্ট্রেইট) কাটে একটি দৃশ্য অন্য একটির স্থান সঙ্গে সঙ্গে অধিকার করে অর্থাৎ তাকে প্রতিস্থাপিত করে। এই শটই সবচেয়ে সাধারণ (কমন)। যেমন, একটি ছবিতে ‘ক’ শটে একটি চরিত্রকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখানো হলো। এরপরই ‘খ’ শটে দেখা যাচ্ছে যে-কয়েকজন লোক তার প্রতি তাকিয়ে আছে। বৈপরীত্যমূলক কাটে যেসব দৃশ্যকল্প (ইমেজ) দেখানো হয় তাদের প্রকৃতি ভিন্ন। যেমন, দাসদের শৃঙ্খলাবদ্ধ পায়ের শটের পরই যখন দৌড়ে যাওয়া ঘোড়ার খুরের ছবি দেখানো হয় তখন বন্দিত্ব ও স্বাধীনতার মধ্যে বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়। সমান্তরাল বা কোনাকুনি (প্যারালেল) ও ক্রস কাটে দুটি ঘটনার যুগপৎ উপস্থিতি দেখানো হয়। যেমন, একটি দৃশ্যে হয়তো কারো জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেটি দেখানোর পরপরই তাকে হত্যার ছবি দেখানো যেতে পারে। জোসেফ লুজির কিং অ্যান্ড কান্ট্রি সিনেমায় দুটি অ্যাকশন পরপর দেখানো হয়েছে। প্রথমটিতে কয়েকজন সৈন্য বৃষ্টিতে হই-হল্লা করে একটি ইঁদুরের বিচার শুরু করেছে। এরপরই দেখতে পাওয়া যায় যে একজন পলাতক সৈনিকের বিচার হচ্ছে। এখানে পলাতক সৈন্যের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে ইঁদুরের ভাগ্যকে এক করে দেখা হয়েছে। দুজনই ভিকটিম এবং একই সঙ্গে তাদের পরিস্থিতি দেখানো হচ্ছে। এটি ‘ক্রস-কাটের’ একটি দৃষ্টান্ত।

যখন ‘কাটের’ ফলে ঘটনার বা দৃশ্যের সরলরৈখিক ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটে, তখন তাকে বলা হয় জাম্প কাট। জন শ্লেসিঙ্গারের ডার্লিং সিনেমায় বিশ গজ দূরে থেকে একটি দম্পতি বাড়ির দরজার দিকে এগুচ্ছে, এই দৃশ্য দেখানো হয়েছে। পরের যে-শট এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সেখানে তাদেরকে বাড়ির প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়। জাম্প কাটের উদ্দেশ্য হলো একটি ‘সিনে’ সবকিছুই না দেখানো। কিন্তু খুব বেশি জাম্প কাট করা হলে কমিক স্ট্রিপের মতো সিনের ধারাবাহিকতা দ্রুত এসে যেতে পারে। জাঁ লুক গদার ব্রেথলেস সিনেমায় প্রথম শটে নায়ক মার্সাই নগরে পুলিশ অফিসারকে গুলি করার পরপরই দেখা যায় সে একটি মাঠের মধ্যে দিয়ে দৌড়াচ্ছে এবং এরপরই তাকে দেখা যায় প্যারিস শহরে। অর্থাৎ এখানে ধারাবাহিকতা হঠাৎ হঠাৎ করে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কিন্তু এর ফলে কাহিনির বর্ণনায় ক্ষতি হয়নি বরং দর্শককে নিজের সাধারণ বুদ্ধি ব্যবহার করে বুঝতে হয়েছে শটের কার্যপরম্পরা। লো-বাজেট ফিল্মে এই টেকনিক বেশ কার্যকর, কেননা এর ফলে মধ্যবর্তী স্থান ও সময় না দেখিয়েও এক লোকেশন থেকে অন্য লোকেশনে যাওয়া যায়। ‘ফর্ম কাটে’ একটি বস্ত্ত থেকে আকার অন্য বস্ত্তর দৃশ্যের ছবিতে উপস্থাপন করা যায়, যেখানে বস্ত্ত দুটি একই আকারের। যেমন, যদি কোনো সিডি ক্যাসেটের ছবি থেকে গাড়ির টায়ারের শট দেখানো হয় তাহলে এটি হবে ‘ফর্ম কাট’। ফর্মের মতো একই চরিত্রের হলো ‘ম্যাচ কাট’, যেখানে একটি শট অন্য একটি শটকে ‘ম্যাচ’ করে। এটি এমনভাবে হয় যে পরম্পরায় কোনো ছেদই ঘটে না। ‘ম্যাচ কাটে’ যে-আকার দেখানো হয় অনেক সময় সেটি দুই শটে দেখতে একই, যদিও এমন না হলেও চলে। ম্যাচ কাটের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্ট্যানলি কুব্রিকের ২০০১ : এ স্পেস ওডেসি, যেখানে একটি প্রাগৈতিহাসিক মানব আকাশের দিকে হাড় ছুড়ে মারে এবং তারপরের শটেই দেখা যায় মহাশূন্যে স্পেস স্টেশন ঘূর্ণায়মান। এখানে ম্যাচ-কাট মানুষের বিবর্তনে দুটি পর্বকে সংক্ষিপ্ত করে বর্ণনা করেছে।

কাটে দুটি শটের ভেতর কোনো সেতুবন্ধ থাকে না। লেখায় যেমন একটি বাক্যের সঙ্গে অন্য একটি বাক্যের মধ্যে সেতুবন্ধ হয়ে ‘কিন্তু’,  ‘অধিকন্তু’ এইসব শব্দ ব্যবহার করা হয়, সিনেমায় কাটের ক্ষেত্রেও দুটি কাটের মধ্যে সংযোগকারী পদ্ধতি বা পন্থা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দুটি শটের ভেতর যোগাযোগ স্থাপনকারী অন্তর্বর্তীকালীন এইসব পদ্ধতি বা পন্থা বেশ উপলব্ধি করা যায় এবং দেখাও যায়। কাটের তুলনায় এই অন্তর্বর্তীকালীন (ট্রানজিশনাল) পদ্ধতি বা পন্থা বেশ স্পষ্ট। নিচে এদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো :

 

ফেড আউট/ফেড ইন

‘ফেড আউট’কে বলা যায় সবচেয়ে সহজ অন্তর্বর্তীকালীন (ট্রানজিশনাল) পন্থা। এখানে দৃশ্যের আলো ক্রমে হ্রাস পায় এবং পর্দা অন্ধকার হয়ে আসে। এর উলটোভাবে ক্রমেই আলো ফুটে ওঠে এবং আস্তে আস্তে পর্দার ছবি দেখা যায়। একেই বলে ‘ফেড ইন’। অবশ্য ‘ফেড’ বলতে সাধারণত ফেড আউটই বোঝায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘ফেড আউট’ একটি শূন্য পর্দা দেখিয়ে নতুন করে শুরু করার প্রক্রিয়া।

কিন্তু কারিগরি প্রক্রিয়া ছাড়াও ‘ফেডের’ নান্দনিক দিক থাকতে পারে এবং সেইসব সম্ভাবনা ব্যবহার করা যায়। যেমন উইলিয়াম ওয়াইলারের ‘মিসেস মিনিভার’ সিনেমায় প্রথম ফেড আটটের আগের সিকোয়েন্সে দেখানো হয়েছে নায়িকা একটি জিনিস কিনে (হ্যাট) অন্যে কী বলবে, তাই ভেবে বিব্রত বোধ করছে। দিনের শেষে তাদের শোবার ঘরে ক্যামেরা প্যান করে বিছানার শীর্ষে গুরুত্বের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখা হ্যাটটির ওপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থেকে ফেড আউটে ‘সিন’ শেষ করে। ফেড আউট সম্পূর্ণ হওয়ার আগে হ্যাটটির ‘সিলুয়েট’ দেখা যায়। এইভাবে সিকোয়েন্সটি বৃত্তাকারে সম্পূর্ণতা পায়। দর্শক এখানে বস্ত্তটি (হ্যাট) প্রথমে এবং শেষে দেখে তার তাৎপর্য বোঝে অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত নায়িকা হ্যাটটি নিয়ে সুখীই হয়েছে, না হলে অমনভাবে প্রদর্শন করত না, এই উপলব্ধি হয়। এইভাবে ফেড আউট একটি অ্যাকশনকে শিল্পিতভাবে সমাপ্ত করতে পারে।

থিয়েটারে কখনো কখনো একই অ্যাক্টের দুটি ‘সিনের’ মধ্যে পর্দা ফেলে সময়ের পরিবর্তন বোঝানো হয়। সিনেমায় ‘ফেডও’ সেই ভূমিকা পালন করতে পারে। হিচককের নটোরিয়াস সিনেমায় প্রথম ফেড-ইনে সান্ধ্যকালীন পার্টিতে একজন অতিথির কেবল পিঠ দেখা যায়, যার জন্য তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। যখন সবাই চলে যায় এই অতিথি বসেই থাকে এবং তার পেছন দিক দেখিয়েই ফেড আউট হয়। পরবর্তী শটে তার মুখ দেখিয়ে ফেড ইন হয় এবং তখন চেনা যায় চরিত্রটি ক্যারি গ্র্যান্টঅভিনীত। হিচকক পার্টির মধ্যেই ‘ফেড আউট’ করে একটু সময় চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে ‘ফেড ইন’ করে ক্যারি গ্র্যান্ট চরিত্রকে দেখান। যে ‘ফেড’ দুটি সিনকে যুক্ত করেছে, এই চরিত্র তার মাধ্যমে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। পরিচালক যদি কারি গ্র্যান্টের পেছন দিক দেখানোর পরপরই ক্লোজ-আপে তার সামনের দিক (মুখ) দেখাতেন (ফেড ছাড়া), তাহলে সময়ের পরিবর্তন জানা যেত না এবং স্বাভাবিক ছন্দও অক্ষুণ্ণ থাকত না।

ফেড দিয়ে মন্তব্যও করা যায়। ভিনসেন্ট শেরম্যানের মি. স্কেফিংটন ছবিতে বর্ষীয়সী ফ্যানি স্কেফিংটন (বেটি ডেভিস) তার প্রাক্তন অনুরক্তদের পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছে। তাদের অনেকেই এখন বিবাহিত এবং প্রৌঢ়। এই দৃশ্যটি ফেড আউট হয় যখন তারা নৈশ ভোজনের জন্য খাবার ঘরের দিকে যায়। ফেড ইনে দেখা যায় এক অনুরক্ত অতিথির হ্যাট এবং হাতমোজা। শুধু কাটে এই দৃশ্যের ব্যঞ্জনা হারিয়ে যেত। হ্যাট এবং হাতমোজা তার যে অনুরক্তের, সে এখনো দরিদ্র এবং তার প্রাক্তন প্রেমিকার অনুগ্রহলাভের আশায় এইজন্য এসেছে যে, তার ধারণা মহিলা এখনো ধনী। কিন্তু ফ্যানি এখন ধনী নন এবং একই সঙ্গে সে বিগতযৌবনা। প্রাক্তন অনুরক্তদের পুনর্মিলনী আয়োজনের উদ্দেশ্য নিজের আবেদনময়ী  সত্তা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া। দুজনের দুটি উদ্দেশ্যই এখানে ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটা দেখাতেই একটির দৃশ্য ফেড আউট হয়ে আর একটি দৃশ্য ফেড ইনে দেখা দেয়। যদি কাট খুব দ্রুত এবং হঠাৎ করে দুটি সিনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করত তাহলে এই প্রহসন স্পষ্ট হতো না।

 

ডিসল্ভ

ফেডে বোঝানো হয় সীমানা চিহ্নিতকরণ (ডিমার্কেশন), যার মাধ্যমে একটি বর্ণনামূলক অধ্যায়ের (ন্যারেটিভ সিকোয়েন্স) পরিসমাপ্তি ঘটে। অপরদিকে ‘ডিসল্ভ’ বলতে বোঝায় পরম্পরা বা ধারাবাহিকতা (কনটিনুয়িটি), যেখানে ক্রমশ একটি শটকে ধীরে ধীরে অন্য একটি শট দিয়ে অপসারিত বা প্রতিস্থাপিত করা হয়। এই ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা বা পন্থা, যেখানে একটি অন্তর্নিহিত শট এবং একটি আবির্ভূত শট মিশে যায় তখন বেশ কয়েকটি কাজ হয় এবং শট বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে। সংলাপে যেভাবে ‘ইতোমধ্যে’ অথবা ‘পরে’ ব্যবহৃত হয় ‘ডিসলভেরও’ সেই একই ভূমিকা থাকে। নর্থ বাই নর্থ ওয়েস্টে হিচককের নায়ক তার সঙ্গিনীকে হোটেলের রিসেপশন থেকে ঘরের চাবি আনার জন্য প্ররোচিত করে যেদৃশ্যে, সেটি ডিসলভ্ হবার পর তারা দুজন হোটেলের করিডর দিয়ে হেঁটে সেই ঘরের দিকে হেঁটে যাচ্ছে, এই শট দেখানো হয়। এখানে বাক্যে বা সংলাপে ‘পরে’ বলতে যা বোঝায়, এই ‘ডিসলভের’ উদ্দেশ্য একই।

‘বলতে না বলতেই ঘটে গেল’, ডিসল্ভ দিয়ে এ কথাও বলা হয়ে থাকে। দি সং অফ বার্নাদেত ছবিতে মাদার সুপিরিয়ির বার্নাদেতকে দেখতে না দেখতে শটটি ডিসল্ভ হয়ে বার্নাদেতের ঘরের ছবি ফুটিয়ে তোলে। কট সিনেমায় একটি মেয়ে মিঙ্ক কোট পরিহিত মডেল তারকার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ করে নিজেই মডেল তারকা হয়ে মিঙ্ক কোট পরে বসে থাকে।

ডিসল্ভকে কখন অন্তর্বর্তীকালীন দৃশ্য আর কখনইবা তাকে অন্তর্বর্তীকালীন দৃশ্যের অতিরিক্ত বলা যেতে পারে? এটা পানিকে তরল হিসেবে দেখা অথবা জীবন, পুনর্জীবন অথবা উর্বরতার প্রতীক হিসেবে দেখার সমতুল্য। পরিস্থিতির ওপরই সব নির্ভর করে। টি এস এলিয়টের কবিতায় পানি কখনই পানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। ডিসল্ভ সম্বন্ধেও তাই বলা যায়। এর অর্থ নির্ভর করবে পরিস্থিতির (কনটেক্সট) ওপর। নর্থ বাই নর্থ ওয়েস্ট সিনেমায় ডিসল্ভ অবশ্য কেবল দুটি চরিত্রকে হোটেলের লবি থেকে একটি ফ্লোরে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু দুটি দৃশ্য যদি এমনভাবে মিশে যায় যে তাদের মিলনে একটি প্রতীকী অর্থ সৃষ্টি হয়, তাহলে এটি হবে রূপকমন্ডিত (মেটাফরিকাল) ডিসল্ভ। এই ডিসলভ্ এমন একটি রূপকালঙ্কার (মেটাফর), যেখানে অংশ দিয়েই পরিপূর্ণকে বোঝানো হয় (যেমন, ছাদ দিয়ে ঘর অথবা পাল দিয়ে নৌকা) অথবা একটি চিহ্ন, যার দ্বারা একটি বিশেষ অর্থ বোঝানো হয় – যেমন ‘সবুজ’ মানে তরুণ, ‘মুকুট’ মানে রাজা।

ডিসলভের ফলে কখনো কখনো দুধ আর সরকে এক করে দেখার মতো হয়। জর্জ স্টিভেন্সের সিনেমায় এই ফলাফল প্রায়ই ঘটে। তাঁর সেন সিনেমায় স্টারেট এবং সেন চরিত্র দুটি যখন একটি গভীরে প্রোথিত গাছের গুঁড়ি উপড়ে ফেলে, সেই মুহূর্তে তাদের প্রসন্ন মুখকে দেখা যায় প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে মিশে যেতে। মানুষ আর প্রকৃতি তখন একাকার হয়ে যায়। এখানে যেসমীকরণ ঘটে তা এই : মানুষ + প্রকৃতি = স্বাভাবিক বা প্রকৃতিপরিবেষ্টিত মানুষ। আবার একই ছবিতে যখন স্টারেট একজন বসতিস্থাপনকারীর (সেটলার) বাড়িতে আগুন লাগতে দেখে, তখন তার প্রতিহিংসামূলক মুখ জ্বলন্ত বাড়ির দৃশ্যে ডিসলভ্ হয়ে যায় (মুখ + জ্বলন্ত বাড়ি = বিশাল ক্রোধ)। এতে করে প্লট সামনে এগিয়ে যায় না, কিন্তু কাহিনির একটি প্রধান উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়। যেমন, আমেরিকার সেই সময়ের নিউ ফ্রন্টিয়ারে পাইওনিয়ার মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া, যার ফলে সে যা দেখে বা করে সেসবই তার অস্তিত্বের বা চেতনার অঙ্গীভূত হয়।

ডিসল্ভ ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নাটকীয়ভাবে ইঙ্গিত দেওয়া যায়, যদি পরিচালক ভবিষ্যতে যা ঘটবে তার ফলাফল সম্বন্ধে দর্শককে আগে থাকতেই মানসিকভাবে প্রস্ত্তত করে নেয়। ‘কিং অ্যান্ড কান্ট্রি’ সিনেমায় কাদায় পড়ে থাকা একটি মানুষের মাথার খুলির দৃশ্য ডিসলভ্ হয়ে যাওয়ার পর একজন সৈন্যকে হার্মোনিকা বাজাতে দেখা যায়। ডিসলভ্ দিয়ে আগে থেকেই সৈন্যটির ভাগ্যে কী ঘটবে তা জানানো হয়েছে। পরের দৃশ্যে হার্মোনিকা বাজাতে বাজাতেই একটি গুলি এসে তার মুখে প্রবেশ করে সংগীত স্তব্ধ করে দেয় এবং সে কাদায় লুটিয়ে পড়ে। এরই পূর্বাভাস ছিল ডিসলভের আগের দৃশ্য। ভবিষ্যদ্বাণীর মতো ডিসল্ভ স্মরণও করতে পারে। কলোরেডো টেরিটরি সিনেমায় ওয়েস এবং কলোরেডো চরিত্র দুটি মৃত্যুর সময় একে অন্যের হাত ধরে রাখে এবং তারপরই গির্জায় একটি ঘণ্টা বাজার শটে ডিসল্ভ হয়ে যায়। এখানে ডিসল্ভ শুধু দুটি দৃশ্যকে যুক্ত করে না, দুটি ঘটনার (প্রেমিকদের হাত দুটি এবং ঘণ্টার বাজনা) প্রতিনিধিত্বও করে। কেননা, আগেই দেখানো হয়েছে যে ওয়েস একটি পরিত্যক্ত গির্জায় তার চুরি করা টাকা লুকিয়ে রেখেছিল। এক পাদ্রি পরে সেই টাকা দেখতে পেয়ে গির্জার ঘণ্টাটি মেরামত করে। টাকা লুকিয়ে রাখার পুরনো ঘটনাটি পুনরুদ্ধারে ডিসল্ভ ব্যবহৃত হয়।

চিত্রনির্মাতা একই আকারের দুটি ইমেজকে পরস্পরের সঙ্গে ‘ফর্ম ডিসল্ভের’ সাহায্যে মিশিয়ে দিতে পারে। জেন আয়ার সিনেমায় একটি মিউজিক বক্সের ওপর খেলনা ব্যালেরিনার ফিগার ডিসল্ভ হয়ে একই পোশাক পরিহিতা জীবন্ত এক কিশোরীকে দেখা যায়। আবার ‘ফর্ম ডিসল্ভ’ দ্বারা কাহিনির প্লটের সঙ্গেও সংযোগ স্থাপিত হতে পারে। দি রং ম্যান সিনেমায় একজন জাজবাদককে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের দোষে অভিযুক্ত করা হয়। জাজবাদক যখন যিশুর ছবির সামনে প্রার্থনা করে, তখন ‘সিন’ ক্রমে বদলে যায় এবং একটি লোককে অন্ধকার রাস্তায় হেঁটে আসতে দেখা যায়। এরপরই লোকটির মুখ জাজবাদকের মুখের সঙ্গে মিশে যায়। এই দৃশ্যে সেই মুহূর্তে জাজবাদকের মুখ ফাঁপা হয়ে বৃহদাকারের ভেতর অন্য মুখটি ধারণ করে। যে মানুষটির মুখ জাজবাদকের মুখের সঙ্গে মিশে যায়, সেই-ই প্রকৃত অপরাধী। এই ডিসল্ভ দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে নির্দোষ ব্যক্তিকে কত সহজে দোষী মনে করা যেতে পারে। একটা মুখের ওপর অন্য একটা মুখ বসিয়ে দিয়েই এমন ফলাফল পাওয়া যায়। এটা অবশ্য ডিসল্ভের খুব ভালো একটা ব্যবহার নয় এই অর্থে যে, এখানে কোনো সূক্ষ্মতা নেই, যার জন্য নান্দনিকতার বিচারে বেশ দুর্বল।

 

ওয়াইপ (মুছে ফেলা)

টেলিভিশন সংবাদ পড়ার অনুষ্ঠানে দেখা যায় একটি সংবাদ থেকে অন্য সংবাদে যাওয়ার সময় পর্দায় একটি উল্লম্ব রেখা একপাশ থেকে অন্য পাশে সরে যায়। ভ্রাম্যমাণ এই রেখাটিকে বলা হয় ওয়াইপ বা মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়া। তিরিশ এবং চল্লিশের দশকে এটিই ছিল খুব জনপ্রিয় ও আধুনিক অন্তর্বর্তীকালীন (ট্রানজিশনাল) সীমার সূচক। যেহেতু সিনেমার পর্দা আয়তাকার, সেই জন্য ওয়াইপের রেখা  সমান্তরাল, উল্লম্ব অথবা কোনাকুনি সরে যেতে পারে। ওপরে উঠে অথবা নিচে নেমে ওয়াইপ বেশ নাটকীয়তারও সৃষ্টি করতে পারে। কখনো একটি অন্যটির সম্পূরক হতে পারে। ওয়াইপ ডানদিক থেকে বাঁয়ে চলে যাবার সঙ্গে একটি ‘সিন’ শেষ হতে পারে এবং বাঁদিক থেকে ডানে গিয়ে একটি ওয়াইপ অন্য শট দেখাতে পারে। ‘ওয়াইপ’, ‘কাটের’ চেয়েও অস্থির (ফ্লুয়িড) এবং ডিসল্ভের তুলনায় দ্রুত, যার জন্য কয়েকটি ঘটনা পরপর দেখানোর জন্য ‘ওয়াইপ’ খুব কার্যকর। ফ্রাঙ্ক কাপরার কাছে এটি খুব প্রিয় ছিল। তার ইট হ্যাপেনড ওয়ান নাইট সিনেমায় প্রথম সিকোয়েন্সে এর সফল ব্যবহার রয়েছে। মি. স্মিথ গোজ টু ওয়াশিংটন সিনেমাতেও ওয়াইপ দেখা যায়, যেখানে হাতের লেখা বিষয়ে সিকোয়েন্সে একের পর এক বিশেষজ্ঞ দাঁড়িয়ে জেফ স্মিথের স্বাক্ষর সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়। এই দৃশ্যে একজন বিশেষজ্ঞ তাঁর বক্তব্য রাখার পর কাপরা তাকে পর্দা থেকে মুছে (ওয়াইপ) ফেলে দেন, যার মাধ্যমে এই তদন্তের হাস্যকরতা প্রমাণিত হয়।

রুবেল মাসুলিয়ানের তৈরি ড. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইড ছবিতে ওয়াইপের চমৎকার ব্যবহার রয়েছে। জেকিল (ফ্রেডারিক মার্চ) মি. হাইডে রূপান্তরিত হওয়ার পর সে তার প্রেয়সী মুরিয়েল ক্যারুকে ত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়। ক্যারু তার জন্য অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে ডিনার পার্টিতে অপেক্ষা করে। এই দৃশ্যে একটি ওয়াইপ হাতপাখার মতো খুলে যায় এবং পর্দাকে কোনাকুনি ভাগ করে।
বাঁদিকে দেখা যায় অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকা জেকিলকে এবং ডান দিকে ক্যারুর বাড়িতে ডিনার পার্টির অংশ। জেকিল ক্যারুদের বাড়ি ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফ্রেম থেকে মুছে (ওয়াইপ) ফেলা হয় এবং ফ্রেম তখন প্রসারিত হয়ে কেবল ডিনার পার্টির দৃশ্য দেখায়, যেখানে মুরিয়েল ক্যারু চিন্তিত হয়ে জেকিলের প্রতীক্ষায় থাকে। এরপর পর্দা আবার কোনাকুনি ভাগ হয়ে যায়, ডান দিকে দেখা যায় হাইড যাকে হত্যা করবে সেই মেয়েটিকে এবং বাঁয়ের অংশে থাকে জেকিলের প্রেয়সী মুরিয়েল ক্যারু। এখানে ওয়াইপ ‘প্যারালেল কাটের’ ভূমিকা নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে দর্শকদের জানানো হয়েছে যে, যখন মুরিয়েল ক্যারু ডিনার পার্টিতে প্রতীক্ষায় আছে সেই সময় হাইড যে-মেয়েকে হত্যা করতে যাচ্ছে, সেই মেয়েটি তার বাড়িতে বসে শ্যাম্পেন খাচ্ছে। ওয়াইপে বিভক্ত পর্দা নায়কের মনের আদর্শ নারীকেও প্রতিনিধিত্ব করেছে, যে-নারী জেকিলের মতোই দ্বিধাবিভক্ত (প্রেয়সী ম্যুরিয়েল এবং দ্বিতীয় মেয়েটি, যাকে জেকিল হত্যা করতে যাচ্ছে)।

মুরিয়েলের বাবা যখন জেকিলের অনুপস্থিতি দেখে চিৎকার করে বলেন, ‘মুরিয়েল, তুমি আর ওই লোকটাকে পাত্তা দিও না’, তখন একটি ওয়াইপ বাঁ-থেকে পর্দার মাঝখানে এসে থামে এবং ‘লোকটি’কে দেখা যায়। কিন্তু লোকটি জেকিল নয়, হাইড। ম্যুরিয়েলের বাবা ‘লোকটি’ বলতে জেকিলকেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে জেকিল হাইডের রূপেই আবির্ভূত হয়। সুতরাং তিনি যেন তার সম্বন্ধেই (হাইড) বলছেন, এমন মনে হবে।

কারো কাছে ওয়াইপকে মনে হয়েছে গাড়ির উইন্ডশিল্ড ওয়াইপারের মতো। হিচকক তাঁর রেবেকা সিনেমায় এভাবেই এর ব্যবহার করেছেন। গাড়ির কাচে বৃষ্টির পানি ওয়াইপার মুছে দেওয়ার পরই মিসেস ডি উইন্টারের চোখের সামনে তার স্বামীর প্রাসাদ ‘ম্যান্ডারলে’ চোখে পড়ে। ‘সাইকো’তে হিচককও একই আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন। ম্যারিয়ন বৃষ্টির ভেতর গাড়ি চালিয়ে আসছে, উইন্ডশিল্ডে ওয়াইপার ঘুরছে এবং একটু পর তার ভেতর দিয়ে বেটস মোটেলের সাইনবোর্ড দেখা যায়। এই দুটি দৃশ্যেই উইন্ডশিল্ডে ওয়াইপার ‘ওয়াইপ’ হিসেবে কাজ করে চরিত্রের ভবিতব্যকে যেন সামনে নিয়ে আসে।

 

আইরিস (বৃত্তাকার শট)

নর্থ বাই নর্থ ওয়েস্ট সিনেমায় মাউন্ট রাশোমোরকে দেখা যায় টেলিস্কোপের ভেতর দিয়ে একটি গোলাকার বৃত্তের ভেতর, যার চারদিকে অন্ধকার। এটি একটি ‘মাস্কিং শট’ অথবা আরো সতর্ক হয়ে বলা যায়, একটি ‘আইরিস শট’, যেখানে যা তীক্ষ্ণভাবে কাছে থেকে দেখবার সেই ইমেজ ছাড়া আর সবই অন্ধকারাবৃত। অবশ্য গোলাকার বৃত্তে ইমেজ দেখানো ছাড়াও অন্য ফ্রেমের ব্যবহার হতে পারে। যেমন দরজার চাবি খোলার ফাঁকা স্থান দিয়ে তাকানোর দৃশ্য, ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখা দৃশ্যের ফ্রেম ইত্যাদি। কোন আকারে (ফর্ম) দেখাতে হবে তার ওপর নির্ভর করছে এই দৃশ্যের ফ্রেম।

আইরিস শট ছাড়াও রয়েছে ‘আইরিসিং ইন’ এবং ‘আইরিসিং আউট’। ‘আইরিসিং ইনে’ অন্ধকার ফ্রেম একটি বৃত্তাকার আলো দিয়ে উদ্ভাসিত করা হয়, যে-বৃত্ত প্রসারিত হতে হতে পুরো পর্দার ফ্রেমে দৃশ্যটি জেগে ওঠে। ‘আইরিসিং আউট’ এর ঠিক উলটো, যখন মনে হয় অন্ধকার যেন চারদিক থেকে গোল হয়ে ক্রমেই কেন্দ্রের দিকে (অথবা একপাশে) আসতে আসতে দৃশ্যটিকে ফ্রেমের ভেতরবিন্দুতে পরিণত করে শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য করে দেয়।

একজন পরিচালক গাড়িতে ক্যামেরা বসিয়ে ‘ডলি ইন’ অথবা ‘ডলি আউট’ করতে পারেন, অথবা ‘জুম ইন’ এবং ‘জুম আউট’ করতে পারেন; কিন্তু আইরিস যেভাবে ফ্রেমের উন্মোচন করে, তেমন আর কোনো শট পারে না। বার্থ অফ নেশন সিনেমায় গ্রিফিথ সমুদ্রের দিকে শেরম্যানের যাত্রাকে দেখাবার জন্য আশ্চর্য নিপুণতার সঙ্গে আইরিস আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন। এই দৃশ্যে ফ্রেম ওপরের বাঁদিক থেকে উন্মোচিত হয়ে একটি পাহাড়ের ওপর মা ও তার ছেলেমেয়েদের দেখায়। প্রথমে বোঝা যায় না তারা কেন ভয়ে কুঁকড়ে আছে। কিন্তু ফ্রেম যতই খুলতে থাকে দর্শক শেরম্যানের সৈন্যদের নিচের উপত্যকায় দেখতে পায়। ইনটলারেন্স সিনেমায় গ্রিফিথ ধীরে ধীরে ব্যাবিলনের ঐশ্বর্য ও জাঁকজমকের দৃশ্য দেখানোর জন্য নিচে ডানদিকের কোনা থেকে শুরু করে ফ্রেমকে ধীরে ধীরে প্রসারিত করেছেন।

মৃত্যুদৃশ্যের ফ্রেমে আইরিসের ব্যবহার খুব কার্যকর। ‘ইনটলারেন্সে’ মাউন্টেন গার্ল আইরিসের ফ্রেমেই মৃত্যুবরণ করে। অন্ধকার ক্রমেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরে ফ্রেমের কেন্দ্রকে, যার জন্য মনে হয় যেন মৃত্যু এগিয়ে আসছে। ইমেজটি ফ্রেমের কেন্দ্রে একটি বিন্দুতে পরিণত হয়ে শেষে যখন অদৃশ্য হয়ে যায়, সেই মুহূর্তে মৃত্যু ঘটেছে বোঝা যায়। অরসন ওয়েলস তাঁর ম্যাগনিফিসেন্ট অ্যাম্বারসন্স ছবিতে আইরিস ব্যবহার করে ইমেজের ভেতর দিয়ে একই সঙ্গে মৃত্যু ও একটি যুগের অবসানকে দেখিয়েছেন। লং শটে বরফের ভেতর একটি অশ্ববিহীন গাড়িকে যেতে দেখা যায়, যার যাত্রীরা ফুর্তিতে গান গাইছে। কিন্তু তাদের গানের সঙ্গে পারিপার্শ্বিকের রিক্ততা ও শূন্যতার দারুণ বৈপরীত্য। মোটরচালিত গাড়িটি ফ্রেমের বাইরে চলে গেলে অরসন ওয়েলস ‘আইরিসিং আউট’ করে সেটিকে চারদিক থেকে এগিয়ে আসা অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে দেন। তিনি আইরিস আউট করে ফেডে চলে যান। দর্শক এরপর আশা করে যে তিনি একটি সিন থেকে আইরিস আউট করে অন্য একটিতে আইরিস ইন করবেন। কিন্তু ফেডের পর যে-শট দেখানো হয় সেখানে অ্যাম্বারসনের বাড়ির দরজায় একটি শোকসূচক ফুলের মালা ঝোলানো। এখানে আইরিস এবং ফেডের ব্যবহারে ওয়েলস দুইভাবে চূড়ান্ত পরিণতিকে দেখিয়েছেন : আইরিসে কাব্যিকভাবে এবং ধীরে; ফেডে অনিবার্য এবং অপরিবর্তনীয়ভাবে।

আইরিসের টেকনিক ফ্ল্যাশ ব্যাকের দৃশ্যের অবতারণা করতে পারে। জর্জ স্টিভেন্সের পেনি সেরেনেড সিনেমায় নায়িকা জুলিয়া পুরনো রেকর্ড বাজাবার সময় সেইসব গানের সঙ্গে তার অতীতের স্মৃতির উল্লেখ করে। প্রতিটি ফ্ল্যাশ ব্যাকই শুরু হয় রেকর্ডের কেন্দ্রবিন্দুর ক্লোজ-আপ শটে, যা আইরিসের মতো প্রসারিত হয়ে অতীতের সংশ্লিষ্ট দৃশ্যটি দেখায়।

অতীতের সিনেমা ও তার টেকনিকের প্রতি অনুরাগ ও দুর্বলতার জন্য ফ্রান্সোয়া ক্রুফো এবং জাঁ লুক গদার তাঁদের সহকর্মীদের তুলনায় আইরিসের ব্যবহার করেছেন অনেক বেশি। ব্রেথলেস সিনেমায় হামফ্রে বোগার্টের সিনেমার পোস্টারের দিকে তাঁর নায়কের  তাকিয়ে থাকার দৃশ্যকে গদা ‘আইরিস আউট’ করে যেন পুরনো হলিউডকেই আইরিস আউট করেছেন। গ্রিফিথের মতো অথবা অরসন ওয়েলসের মতো আইরিসের ব্যবহার এখন এত ব্যাপক না হলেও এটি একেবারেই লুপ্ত হয়ে যায়নি। পুরনো সময়ের ছবিতে সেই সময়ের আবহ সৃষ্টিতে আইরিসের ব্যবহার এখনো বেশ দেখা যায়। দি স্টিং সিনেমায় দুই প্রতারককে শেষ দৃশ্যে দেখিয়ে যখন আইরিস আউট করা হয়, তখন সেই সমাপ্তিতে অতীতের আবহ বেশ স্পষ্ট হয়েই ধরা পড়ে। পুরনো সময়ের ওপর ভিত্তি করে ছবির সত্যতা প্রমাণে আইরিস আউট বেশ সহায়ক।

স্টিভেন স্পিয়েলবার্গ, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপ্পোলা এবং মার্টিন স্কোরসেজে অতীতের সিনেমা এবং তার টেকনিক বিষয়ে বেশ কৌতূহলী এবং জ্ঞান রাখেন। তাঁদের ছবিতে ওয়াইপ, আইরিস এবং ফেডের ব্যবহার রয়েছে। এর দুটি কারণ : (১) অতীতের স্মারক হিসেবে ওইসব টেকনিককে তাঁরা শ্রদ্ধার চোখে দেখেন, (২) অতীতের টেকনিক এখনো কাহিনি বর্ণনার জন্য খুব প্রাসঙ্গিক হতে পারে। স্টিভেন স্পিয়েলবার্গ এম্পায়ার অফ দি সান সিনেমায় কালোতে ফেড আউট করে বোঝান যে, অ্যাকশনের প্রথম ভাগ শেষ হয়েছে। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপ্পোলা তাঁর পেগি সু গট ম্যারিড সিনেমায় ওয়াইপ ব্যবহার করে প্রথমে পেগি সুকে (ক্যাথলিন টার্নার) হাই স্কুলে তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে কথা বলছে, এই দৃশ্য দেখিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তার শোবার ঘরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে দেখান। নিউইয়র্ক স্টোরিজ সিনেমায় তিনটির মধ্যে প্রথমটিতে (ফিল্ম লাইফ স্টাডিজে) স্কোরসেজে ঘন ঘন আইরিস ব্যবহার করেছেন। স্টার ওয়ারস সিনেমায় ওয়াইপ এবং আইরিস বহুল ব্যবহৃত হয়ে অতীতের সিনেমার প্রতি নস্টালজিয়া প্রকাশ করেছে এবং একই সঙ্গে ন্যারেটিভকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

Leave a Reply

*